একান্ত মনেই লিখে চলেছেন লেখক। তার নিত্যদিনের আসা যাওয়া ঘটনার কিছু স্মৃতি কিছু কল্পনার মোচড়ে লিখছেন ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন "।
টানাপোড়েন পর্ব ২৪
নতুন অতিথি
রেখার আজ শুধু আনন্দ আর আনন্দ। মহালয়ার পুণ্য লগ্নে নতুন অতিথির আগমন। ধরিত্রী যেমন সেজে উঠেছে শিউলি, কাশ, পদ্মের সমারোহে, শরতের সোনালী রোদ্দুর মনের মাঝে উঁকি দিয়ে যায় পুজোর গন্ধে মাতোয়ারা মা আসার আর কতদূর?
তার মাঝে যদি উপরি পাওনা হিসেবে এসে যায় আরো কিছু বড় প্রাপ্তি তাহলে তো আর কিছু বলারই থাকে না। মহালয়ার পুণ্য লগ্নে যখন সকলে রেডিও-টিভিতে মায়ের আগমনী সুরে মাতোয়ারা, ঠিক তখনই ফুটফুটে সন্তানের জন্ম দিল রেখার প্রিয় পোষ্য মিলি। আসলে এই মিলি ছিল রাস্তার সারমেয়।
লকডাউনের মধ্যে মিলিসহ কয়েকজনকে সন্তানরূপে কাছে পায় রেখা। তার মধ্যে অতি প্রিয় ছিল তার স্নেহের মিলি। তারপর থেকেই তার জীবনে এরা একটা আলাদা জায়গা করে নেয় ।আজ ওকে সারমেয় বললে খুবই খারাপ লাগে ।এটা একটা রেখার বাড়তি গুণ বলা যেতে পারে ।রেখা ও মনোজ দুজনেই সন্তানের মত একে স্নেহ করে। তার মধ্যেই যখন ও সন্তানসম্ভাবনা হয় । তখন ওর যত্ন- আত্তির কোনো ত্রুটি থাকে না। কিন্তু কখনো কখনো রোডের ধারে শুয়ে থাকলে যখন কেউ ওকে আঘাত করে ।তখন মনে হয় যেন রেখাকে কেউ আঘাত করেছে ।রান্নাঘরে কাজ করতে করতে মিলির আওয়াজ পেলে সে আওয়াজ আনন্দের ,না আঘাতের ?রেখা কিন্তু তার আওয়াজ শুনেই বুঝতে পারে। সঙ্গে সঙ্গে ছুটে যায় মিলির কাছে। এভাবেই মিলিকে নিয়ে টানাপোড়েন থাকলেও ,আগলে আগলে রেখেছে । সেই মিলি তার মাতৃত্বের পূর্ণতা লাভ করল। রেখার কাছে এ যেন এক বিরাট প্রাপ্তি। কিন্তু সমস্যা তার পিছু ছাড়ে না ।যৌথ বাড়িতে থাকে। তাই মিলি যখন নিজের বাচ্চার জন্য সেফ জায়গা হিসেবে সিঁড়িটাকে পছন্দ করে ।তখন থেকেই রেখার মনে ভয় কাজ করতে থাকে ।কেননা রেখার যে জেঠতুতো ভাসুর,জা, জেঠতুতো শাশুড়ি আছে।কেউ এই ব্যাপারটাকে পছন্দ নয়।। তাই সময়-সুযোগ পেলেই রেখা মনোজের অজান্তে এমন মার ,মারে যে ,ভয়েতে দরজা পর্যন্ত ঢুকতেই সাহস পায় না।'
এই তো কিছুদিন আগে রেখার স্কুল থেকে ফিরতে দেরি হয়েছে ।মনোজ ও ফেরে নি ।তারমধ্যে কোন কারনে নাচ দরজার কাছে মিলির জন্য একটা জায়গায় জল রাখা হয় ।সেই জলটা খেয়ে সে ক্লান্তিবশত দরজার পাশে শুয়েছিল । রেখার ভাসুর বাইক টা এমন ভাবে ঢুকিয়েছিল যে ওর পায়ে চোট লাগে। স্কুল থেকে ফিরে এসে মিলিকে দেখতে না পেয়ে রেখার মনের ভেতরে একটা সন্দেহ দানা বাঁধতে থাকে।
রেখা কয়েকবার ডাকে 'মিলি মিলি মি..ই..ল..ই ই ।ডাকার পরেও যখন এলো না । তখন রেখা নিচে গিয়ে খুঁজতে থাকে। আর বলতে থাকে 'কোথায় গেল ?কোথায় গেল ?'
আশেপাশের কয়েকজন দোকানদার খুবই ভালো ।বিশেষত সন্টু দা (পশুপ্রেমী) ।পাগলের মতো তাকে খুঁজতে থাকলে সেই সময় সন্তুদা এসে বলেন, 'বৌদি ,আজকে মিলিকে আঘাত করেছে ।এই জন্য মিলি এখানে নেই ।একটু সবুর করুন ।আমি দেখি ।কোথায় আছে?'
তখন রেখা ব্যাঘ্র ভাবে বলে ' একটু দেখুন না ,সন্তুদা।
কিন্তু রেখা মনে মনে এটা কিছুতেই মানতে পারে না ।একটা অবলা জীব তাদেরকে তো খেতে পড়তে দিতে হয় না ।রেখাই দেয় ।তাহলে কেন তার ওপর এত রাগ সকলের।
আসলে তা নয় রেখাদের প্রতি ঈর্ষাবশত এই সমস্ত দাওয়াই গুলো দেয়া হয়।
কিছুক্ষণ পর সন্তুদা ফিরে এসে বলেন 'বৌদি চিন্তা করবেন না তাকিয়ে দেখুন (পেছনের দিকে ইশারা করলেন)।
রেখা তাকিয়ে দেখে মিলি আসছে লেজ নাড়তে নাড়তে কিন্তু পা টা একটু খুঁড়িয়ে চলছে।
রেখা মিলির দিকে তাকিয়ে বলে 'মিলি সোনা মা কোথায় গিয়েছিলে তুমি ?তোমাকে দেখতে না পেলে যে আমার কেমন কষ্ট হয় ,তুমি বোঝ না? যেন রেখার কথাগুলো বুঝতে পেরে রেখার কাছে এসে দাঁড়ায় ও যেন ওর ভাষায় কিছু বলতে চায় আও আও চিৎকারে।'
রেখা এমন ভাবে কথাগুলো বলছে রাস্তায় লোক যেতে যেতে তাকে ঘুরে ফিরে দেখছে ।কার সঙ্গে কথা বলছে পরক্ষণে লোকজনের বুঝতে অসুবিধা হয় না যে একটি সারমেয় সঙ্গে কথা বলছে ।তখন হাসতে হাসতে চলে যান।
আবার অনেকে মন্তব্য করেন 'আদিখ্যেতা দেখো।'
আবার অনেকে বলেন ' আপনি জীব সেবা করে, শিব সেবা করছেন ।ঈশ্বর আপনার মঙ্গল করুন।'
তখন খুবই ভালো লাগে ।এই উপলব্ধিটা রেখার জীবনে মনোজের সংস্পর্শে থেকে হয়েছে ।
মনোজ বরাবরই বলে 'মিথ্যা আচার অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে পুজো করে,কিছু হবে না ।তারচেয়ে বরং অসহায় জীবগুলোকে সেবা করো। তার মধ্যেই স্বয়ং ঈশ্বর বিরাজ করেন ।তাদের সেবা করলেই ঈশ্বরের সেবা করা হবে।'
তবে এই সবা করাটা অত সহজ নয় ,রেখা মিলিকে খাবার দেবার সঙ্গে সঙ্গে আরো কয়েকজন সঙ্গী-সাথী জুটেছে তাদের ও কেউ দিতে হয় .।তাদেরকে কোন ডিশ বা পাতায় দেয়া হলে , অভিযোগের তীর রেখার দিকে আসে এবং বলেন 'এখানে ওখানে খেতে দেবেন না ।'
এই নিয়ে রেখার সাথে তীব্র বচসা ও হয়ে যায়।
রেখার যেন সবসময় একটা মৃদু আতম্ক কাজ করে।রাত্রিতে শুয়ে থেকেও শান্তি পায় না।
একদিন অনেক রাত্রে মিলির আওয়াজ পেয়ে তিন তালার বারান্দার দাঁড়িয়ে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করে।
মনোজ হঠাৎই বুঝতে পারে যে রেখা তার পাশে নেই ।তখন সে 'রেখা রেখা 'বলে ডাকতে থাকে। শেষে মনোজ উঠে গিয়ে দাঁড়ায় বারান্দায়। মনোজ রেখার দুঃখটা বুঝতে পারে রেখার নিঃসন্তান জীবনে হাহাকার হুহু করে বেড়ায়।
মনোজ বলে ' সব ব্যাপার নিয়ে এতো ভেবো না ।মিলিকে মিলির মত থাকতে দাও। ওরা প্রকৃতির কোলে বেড়ে উঠেছে।'
রেখা বলে ' প্রাকৃতিক পরিবেশ নিয়ে আমার কোনো চিন্তা নেই,। যত চিন্তা মনুষ্য সৃষ্ট পরিবেশ নিয়ে।'
এভাবে ভয়ে আতঙ্কে রেখার দিনগুলি রাতগুলি কেটেছে।
সমস্ত বাধা বিঘ্ন পেরিয়ে অবশেষে মিলি জন্ম দিল তার সন্তানদের। তাই রেখার আজ আনন্দের দিন।
কতরাত মুখ লুকিয়ে কেঁদেছে মনের অজান্তে। শুধু মিলির জন্য নয় ,তার নিজের জীবনকে নিয়েও। এত বছরের বিবাহিত সম্পর্কে তাদের শূন্য জীবনে পরিপূর্ণতা আনার জন্য একটা শিশুর দরকার।
মনোজ অবশ্য এই নিয়ে কখনো অভিযোগ করে নি বরং রেখাকে বুঝিয়েছে , ধৈর্য ধরো ।দেখবে, তুমিও মা হয়েছ।'
মনোজ রেখাকে এমন ভাবে বলতো যেন মনোজের মনে কোন দুঃখ নেই, কষ্ট নেই।
কিন্তু রেখা জানে ,বোঝে ।মনোজ গভীরভাবে সন্তানকে চায়।
তাই মিলি তার সন্তানের জন্ম দিলে,মনোজের মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। নতুন অতিথিকে স্বাগত জানায় এবং বলে 'রেখা ,তুমি একবার রিম্পাদিকে বল ফোনটা করে।'
রেখা বলে 'ঠিক বলেছ। আজ তো আর স্কুলে যাব না।'
শরতের সোনালী রোদ্দুর রেখা চোখে মুখে মেখে নেয় আর পেঁজা তুলোর মতো মেঘ ভাসা আকাশের
তাকিয়ে বলে থ্যাংকস গড।
রেখা ফোনটা রিম্পাদিকে করে। একবার রিং হয়ে যাওয়ার পর যখন ফোনটা ধরে ওপার থেকে বলে '
হ্যালো।'।
রেখা বলে উচ্ছ্বসিতভাবে 'জানো তো রিম্পাদি, আমার মিলি মা হয়েছে।'
রিম্পা দি বলল 'কনগ্রাচুলেশন্স'। মানে তুই আর আজকে স্কুলে আসবি না ।তাই তো?'
রেখা হেসে বলে "একদম ঠিক ধরেছ ।এই জন্যই তো আমি তোমাকে এত ভালোবাসি ।আমার মনের কথাগুলো কি সুন্দর বুঝে যাও।'
রিম্পাদি বলে ,'ঠিক আছে ।তোমার নাতি নাতনীদের ভালো করে যত্ন নাও। একদিন গিয়ে দেখে আসব। মিষ্টি মুখটা করিয়ে দিও আমাদের (হাসতে হাসতে)।
রেখা বলে "একদম। যেদিন স্কুলে যাব অবশ্যই সকলকে মিষ্টিমুখ করাব। তোমরা সকলে আশীর্বাদ করো ।আমার মিলি এবং তার বাচ্চারা যেন সবাই ভাল থাকে, নিরাপদে থাকে।'
রিম্পাদি বলে "আমার আশীর্বাদ সব সময় রয়েছে।'
এরপর ফোনটা ছেড়ে দিয়ে রেখা আনন্দে গুনগুন করে গান গেয়ে ওঠে "কি আনন্দ ,আকাশে বাতাসে..।'
একটা সন্তানের জন্য বুকটা খাঁ খাঁ করে, সেই শূন্য জীবনে মিলি তার নতুন অতিথি এনে রেখাকে কিছুটা হলেও পরিতৃপ্তি দিয়েছে।
ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন"২৪ক্রমশ