শিক্ষিত বেকার যুবক
(উৎসর্গ- নুসরাৎ জাহানকে)
আজ পিয়ার বিয়ে। পিয়া পড়নে আছে বিয়ের সাজানো গোছানো নতুন বেনারসী শাড়ি। হাতে রুলি ও কাঁচের চুড়ি। আমার দেওয়া চুড়ি ও আংটি টা তার হাতে ও আঙুলে নাই। এখন শুধু নতুন মানুষের সব নতুন জিনিস পড়ে খুব ভালো লাগছে। তার থেকে বেশি ভালো লাগতো পিয়া যদি আমাকে ভুল না বুঝে, আমাকে বিয়ে করে – আমার হয়ে থাকতো। “এখন শুধু পথ চেয়ে আছি পিয়া তুমি আমার কাছে ফিরে এসো, ফিরে এসো পিয়া “।
আরে মামা খবর কি? কিছু খবর নাই রে, কেন মামা? আর বলিস না ম্যামের ক্লাস করতে করতে একটা নতুন মেয়েকে ক্লাস করতে দেখলাম। মেয়েটা তোর সাথে ভালো মানাবে, প্রেম- টেম কর। না মামা আর প্রেম, বেশিরভাগই মেয়ে যতক্ষণ প্রয়োজন আছে ততক্ষণ ভালোবাসবে, তারপর ছুঁড়ে ফেলে দিবে। চা খেয়ে চায়ের কাপটা যেমন ছুঁড়ে ফেলে দেয়, তেমনই ফেলে দিবে। মামা এটা বিশ্ববিদ্যালয় নোটস নেওয়ার জন্য তোমাকে জানের থেকে বেশি ভালোবাসবে। চলো ক্যান্টিনে কিছু খেয়ে আসি।
পিয়া ওইদিকে দেখ দুটো ছেলে বসে আছে ছেলেটাকে চিনিস,আরে আমি তো নতুন কি করে চিনবো বল, চল তোর সাথে পরিচয় করিয়ে দি,না রে পরে করে নিবো। কোনটা ওই মোটাটা,না রে পাতলা করে দেখতে হট হয়ে আছে ছেলেটা। ওর প্রতি আমাদের ডিপার্টমেন্টে সব মেয়েই ক্রাস হয়ে আছে। পড়াশোনায় খুব মেধাবী, আর পাশের টার নাম আজাদ। ওরা মামা ভাগ্নে। ডিপার্টমেন্টে খুব ভয় করে ক্লাসমেট গুলো। ছেলেটার নাম ফারহাদ। এই তুলি চল, রুমে যাই। ছেলেটা কিন্তু ভালো রে, ওকে ভালো করে চিনি প্রেম করে না, আর তুই তো করিস না। দুজনকেই ভালো মানাবে।
হায়, ফারহাদ কেমন আছো?
“ভালো”। তুমি “ভালোই আছি”।
কি পড়ছো?
বৈষ্ণব পদাবলীর পদ।
আমাকে পদ গুলো বুঝিয়ে দিবে, হ্যাঁ দিবো।
জ্ঞানদাসের পদ -----
“রূপের পাথারে আঁখি ডুবে সে রইল।
যৌবনের বনে মন হারাইয়া গেল।। “
ফারহাদ পিয়াকে জ্ঞানদাসের পদ বোঝাতে বোঝাতে দুজনের মধ্যে পূর্বরাগ থেকে অনুরাগে পরিণত হয়। আস্তে আস্তে পিয়ার সাথে ফারহাদের গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
( বছর চারেক পর )
“পিয়া M. A, B. Ed শেষ হয়ে গেল, চাকরির কোনো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেনি। টিউশনি ও একটা প্রাইভেট স্কুলে পড়িয়ে কোনো রকমে হাত খরচটা হচ্ছে। কি করব ভেবে পাচ্ছি না। পিয়া তোমাকে আর বেশিদিন কাছে পাবো না, মনে হচ্ছে তুমি অন্য কারোর হয়ে যাবে “ ।
“ফারহাদ তুমি কি বলছো, পাগল হয়ে গেছো নাকি, কি ভুলভাল বলছো “।
“আমার জন্য বাদাম নিয়ে এসেছো, হ্যাঁ এসেছি “।
“তুমি শুধু রোজ বাদাম খাবে, অন্যকিছু খাবে না। “ তুমি যেদিন চাকরি পাবে সেদিন খাওয়াবে”।
“এই ফারহাদ শুনো না। বলো ,বাড়িতে বিয়ের কথা বলছিল।আব্বা বন্ধুর ছেলের সাথে”। “তোমার জন্য প্রায় ১৫টা বিয়ে ভেঙেছি “।“ শুধু তোমার জন্য, তোমার হাতে হাত রেখে সারাজীবন কাটাতে পারি, শুধু তোমার জন্য ফারহাদ। “ এই বিয়েটা পরিবারের চাপে করতে হবে। কি করব কিছু ভেবে পাচ্ছি না “। চলো তোমাকে বাড়িতে ছেড়ে আসি।
পিয়া কালকে দেখা করো, ঠিক আছে, সকাল ১০ টার সময়। তুমি বাড়ি পৌঁছে ফোন করবে ফারহাদ।
“সাবধানে যেও, হ্যাঁ সাবধানে যাবো। “
ফারহাদ বাড়ি পৌঁছালে, হ্যাঁ।
তুমি কি করছো, খাওয়া দাওয়া হল দিয়ে, ঘুমাতে এলাম। ঠিক আছে পিয়া তাহলে কাল সকালে দেখা হচ্ছে।
সকাল ১০টাই সময় দিয়ে ১২ টাই আসতো, এতক্ষণে আসার সময় হল, রাস্তার ধারে কত বখাটে ছেলে কি সব বলছে এই গুলো শুনে থাকতে হবে। আচ্ছা বাবা, sorry sorry sorry.
আমার বাবুসোনা রাগ করে না, পিয়া এতক্ষণ ধরে রাগ করে থাকবে। আমার প্রাণের প্রিয় রাগ করে না, তোমার জন্য কি নিয়ে এসেছি কুরকুরে, আর আমার বাদাম কই, বাদামও আছে।
ফারহাদ,“বাড়িতে বিয়ের কথা বলছে, কি করবো ভেবে পাচ্ছি না ফারহাদ। আর সামনের সপ্তাহে বিয়ের দিন ঠিক করেছে “ । বিয়ে ঠিক করেছে তো, তুমি বিয়ে করে নাও, আমার জন্য আর কতদিন বসে থাকবে। পরিবারের ইচ্ছে মতো বিয়ে করে সুখে শান্তিতে সংসার করো।
ফারহাদ তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচব না, শুধু তোমাকে ভালোবেসেছি, তোমাকেই নিয়ে সারাজীবন কাটাতে চাই।
“পিয়া আমার সিচুয়েশনটা বোঝার চেষ্টা করো, আমি আজ বেকার, কোনো সরকারি চাকরি করি না, এই সমাজে এমনকি তোমার পরিবারে আমার কোনো মূল্য নেই “।
“এই বেকারের সব জায়গায় দোষ, খেতে- বসতে- ঘুমাতে-দাঁড়াতে। এমনকি একটা নতুন জামা পড়ে বাড়ি থেকে রাস্তায় বের হলে, লোকে বলতে শুরু করে, এই যে বেকারকে দেখ নতুন জামা পড়ে কত ফুটানি দেখাচ্ছে। যার দু টাকা রোজগার করার ক্ষমতা নেই “ ।
শুনো পিয়া তুমি বিয়ে করে নাও, পিয়া তুমি ভালো থেকো বলে কাঁদতে কাঁদতে ফারহাদ বাড়িতে চলে এলো।
(পাঁচ দিন পর)
বিয়ের আগের দিন রাতে, কি রে মা কি করছিস, এখনও ঘুমাসনি,ঘুম আসে না মা, “কোনো কিছু ভালো লাগছে না, আজ জীবনের সমস্ত কিছুই হারিয়ে যেতে চলেছে, যা হয়েছে পুরোনো কথা ভুলে নতুনভাবে সংসার শুরু করে। জীবনের ঘাত – প্রতিঘাত আছে। এই ঘাত-প্রতিঘাত না থাকলে জীবনকে উপলব্ধি করা যায় না। “
রাত অনেক হলো ঘুমিয়ে যা মা, আবার কাল সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতে হবে। ঠিক আছে মা, ঘুমিয়ে যাবো তুমি যাও।
ফারহাদ কি করছো, “এই ছাদে বসে সিগারেট খাচ্ছি”। কাল আমার বিয়ে আর তুমি সিগারেট খাচ্ছো।
“তোমাকে বারবার ফোন করা সত্ত্বেও, ফোন রিসিভ করছ না। শালা, কুত্তা, হারামি, কোথাকার কাল আমার বিয়ে, আর তুমি আরামে সিগারেট খাচ্ছো”।
পিয়া এখন ঘুমাও, অনেক রাত হয়েছে।
“ফারহাদ তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারবো না”।
“জীবনের প্রতিটি শ্বাস প্রশ্বাসে শুধু তোমাকে চাই, এক মুহূর্তের জন্য তোমাকে না দেখলে, এমনকি তোমার সাথে কথা না বললে আমি থাকতে পারবো না। “
“ফারহাদ আমি চলে আসছি তোমার কাছে, পালিয়ে বিয়ে করবো, চলো “।
“ফারহাদ ও পিয়া দুজনেই কাঁদতে কাঁদতে কখন যে পিয়া ফোন কেটে দিয়ে ঘুমিয়ে যায় এবং ফারহাদ বিষ খেয়ে চিরতরে পিয়ার জীবন থেকে হারিয়ে যায় “।
“এক ফোঁটা চোখের পানি ঝড়ার চেয়ে, এক ফোঁটা রক্ত ঝড়ার অনেক ভালো। কারণ, একফোঁটা রক্ত বের হতে হালকা ব্যথা লাগে, আর একফোঁটা চোখের জল পুরো হৃদয় ছিড়ে বের হয়”।
শিক্ষিত বেকারের যে যন্ত্রণা, একজন শিক্ষিত যুবকই জানে। চাকরি না পেয়ে নিজের প্রেমিকাকে অন্যের হাতে তুলে দিতে কতটা যন্ত্রণা সে শত শত ফারহাদের মতো যুবকেরা বুঝে। চাকরি না পেয়ে সকলের কাছে গঞ্জনা খেতে খেতে এবং প্রেমিকাকে না পেয়ে আত্মঘাতী হওয়াটা সমাজের কাছে একটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আরে ওই ছেলেটা তো বেকার, মরলে কোনো দাম নেই।
সমাজের কাছে শত কোটি অনুরোধ করছি, শিক্ষিত
যুবকদের কখনো বেকার ও গঞ্জনা করবেন না। তাদেরকে একটু মাথা উঁচু করে বাঁচতে দিন।
১৮/১০/২০