টানাপোড়েন' (পর্ব৩০)
সেরা জুটি
নবমীর দুপুরের খাওয়া -দাওয়ার পর্ব শুরু হয়ে গেল বেলা বারোটা থেকে ,।গ্রামের লোকজন প্রচুর এজন্যই বোধহয়।
মাধুরী,সরজু, সুরঞ্জন ,আশিষ সবাই মিলে বেশ আড্ডা জমিয়েছে।
কিন্তু শিখার মনের ভেতরে একটা খচখচানি রয়ে গেছে ।কি হলো হঠাৎ কল্যানদার? হঠাৎই কেন অন্য মনস্ক, মনটা যেন মনে হলো ভালো নেই। সেই যে দুজনে একসাথে অষ্টমীর পুজোর পর বেরোলো ।তারপরে বাড়িতে এসে কল্যানদা নিজের রুমে ঢুকলো।শিখা কিছুই বুঝতে পারছে না। জানলার ধারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শিখা এসবই ভাবছে। মাঝে মাঝে দাদা বৌদিদের হাসি -ঠাট্টা ,মজার কথাগুলো কানে আসছে।
হঠাৎই বৌদিভাই বলল 'কি ব্যাপার কল্যাণের কি কিছু হয়েছে? দেখতে পাচ্ছি না? '
সবাই এর ওর মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে লাগলো।
মাধু সরজুকে বললো 'ও বৌদি, কল্যান কোথায় গেল।'
সরজু একটু উৎকণ্ঠায় বলল 'তাই তো? এতক্ষণ খেয়াল করি নি। ওই তো শিখা। (শিখার দিকে তাকিয়ে)। শিখা তোমরা তো একসঙ্গে বেরিয়ে ছিলে ।তা কল্যান কোথায়?'
শিখা বলল 'আমি জানি না তো?'
শিখা মনে মনে ভাবলো কি হলো? কেন হলো? কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না।
বৌদি বললো 'দুপুরের খাবার রেডি । চলো সবাই খাবে।'।
মাধু সুরঞ্জনকে বলল ',যাও । দেখো কল্যান কোথায়? ওকে ডাকো।'
সুরঞ্জন গেলো কল্যাণকে ডাকতে।। সুরঞ্জন দেখল কল্যান নিজের ঘরটাতে শুয়ে আছে। জানলা বন্ধ ।সুরঞ্জন ঢুকেই বলল জানালাগুলো বন্ধ করে শুয়ে আছো কল্যান।শীত করছে? সাড়া না পেয়ে সুরঞ্জন ডাকলো 'কল্যান ,কল্যান খাবে চলো।
কল্যান বলল 'আমি পরে খাবো।'
সুরঞ্জন বললো 'তোমার শরীরটা কি খারাপ?'
কল্যান বলল ,'মাথাটা একটু ধরেছে।'
সুরঞ্জন বলল ' ঔষধ খেতে হবে তো?'
কল্যান বললো 'রেস্ট নিলেই হবে। '
সুরঞ্জন বললো 'তাহলে তাই করো।'
খেতে বসে শিখা খেতেই পারলো না।
মাধু বললো 'তোর আবার কি হলো?
শিখা বলল ' আর খেতে ভাল লাগছে না বৌদি ভাই। 'মাধুবৌদি হেসে বলল 'তোর ও কি মাথা ধরেছে?'
শিখা বুঝতে পারল বৌদি কোন দিকে ইংগিত করতে চাইছে ।শুধু বলল 'না ।এমনি।'
মাধু বলল 'ও তাই বুঝি'? তোকেও তো রেস্ট নিতে হবে ,তাই তো? তবে একবার কল্যাণের ঘরে উঁকি দিস। দেখিস ,কি করছে বেচারা ।একটু খবর নিস।'
বৃষ্টি বলল 'পি মনি আমি যাব তোমার সাথে?'
মাধুরী বলল 'যা বৃষ্টি কে নিয়ে যা ওর খাওয়া হয়ে গেছে। আর শোন ওর এই জামাটা চেঞ্জ করে ওকে একটা কটনের জামা পরিয়ে দে।'
বৃষ্টি বলল 'না না আমি জামা চেঞ্জ করবো না।
মাধুরী বলল 'সব সময জেদ তাই না?'
তখন শিখা বৌদিকে হাতের ইশারায় বুঝিয়ে দিয়ে বৃষ্টিকে নিয়ে গেল আর বলল ' বৃষ্টির এতক্ষণ এই জামা পড়ে থাকলে জামা তো নষ্ট হয়ে যাবে ।তাহলে তোমাকে তো আর ভালো লাগবে না । তাহলে কি করবে এই জামাটা। এখন খুলে দিতে হবে তাই তো?''
বৃষ্টি মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো।
বৃষ্টিকে জামা চেঞ্জ করিয়ে দিয়ে তারপর কল্যাণের ঘরের দিকে গেল। ঘরে গিয়ে দেখছে জানলা বন্ধ ,লাইট অফ করে শুয়ে আছেন। প্রথমে দরজায় নক করল কিন্তু কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে বৃষ্টিকে নিয়ে ঢুকলো।
বৃষ্টিকে দিয়ে শিখা ডাকা করালো।
বৃষ্টি বলল 'মামু মামু (একটু ধাক্কা দিয়ে) তোমার কি হয়েছে? খাবে চলো?'
কল্যাণ তাকিয়ে দেখছে শিখা।বলল ' মাথাটা একটু ধরেছে বাবু ।আমি পরে খাব।'
তখন শিখা বলল ' না ,না। তা কি করে হয় ।আপনি চলুন, খাবেন।
কল্যান বলল 'এখন খাব না শিখা।'
শিখা বললো 'তাহলে কি আপনি ওষুধ খাবেন? ব্যবস্থা করি।'
কল্যাণ বলল 'না না একটু শুলেই আমার মাথা ঠিক হয়ে যাবে ।একটু বাম লাগাতে পারলে ভালো হতো।
শিখা বললো 'আপনার কাছে আছে?'
কল্যান বলল ' না, আমার কাছে নেই ।তবে দিদির কাছে পাওয়া যেতে পারে।'
শিখা বৃষ্টিকে বলল ' বৃষ্টি মামীর কাছ থেকে বাম নিয়ে এসো তো।'
বৃষ্টি বলল 'ওকে পিমনি।'
শিখা খাটের পাশটায় বসল। কল্যাণ পাশ ঘুরতে গিয়ে হঠাৎই টাচ হয়ে যায় শিখার সঙ্গে।
কল্যান বলল 'সরি শিখা।'
শিখা বললো না খেলে কি হয় ,একটু তো খেতেই হবে।
এরই মধ্যে বৃষ্টি এসে বাম ধরিয়ে দিলো পিমনির হাতে।
কল্যান বলল 'আমার হাতে দাও আমি লাগিয়ে নিচ্ছি।'
বৃষ্টি বলল 'মামু লাগিয়ে দেবো?'
কল্যান হেসে বলল 'আমার ছোট্ট মিষ্টি মা। আমাকে লাগিয়ে দেবে ?আচ্ছা দাও।'
ছোট্ট ছোট্ট হাতে বৃষ্টি বাম লাগাতে লাগলো। তখন শিখা বলল অনেক লাগিয়েছো বৃষ্টি ।দাও আমি লাগিয়ে দিচ্ছি।'
বাম নিয়ে শিখা আলতোভাবে কল্যাণের কপালে লাগাতে গেল।
কল্যাণ বললো ' থাক, শিখা থাক। বৃষ্টি যা লাগিয়েছে ওতেই হবে। শুধু শুধু তুমি কেন কষ্ট করবে?'
শিখা বলল 'বেশি কথা বলবেন না তো? আপনাকে কে বলেছে যে আমার কষ্ট হবে ?নাকি ,আপনি.জ্যোতিষী। সব বুঝতে পারেন?'
কল্যান কোন কথা খুঁজে পেল না। চুপ করে থাকলো।
শিখার হাতের বাম লাগাতে শিখার হাতের স্পর্শে কল্যাণ বারবার শিহরিত হতে লাগলো। ভেতরে যেন একটা উত্তেজনা সৃষ্টি হলএবং সেজন্যেই কল্যান শিখার হাত দুটো ধরল। কিন্তু কোন ভাষা খুঁজে পেল না।
শিখা বলল 'কিছু বলবেন?'
কল্যান এবার লজ্জা পেয়ে গেল ,বলল 'না। ঠিক আছে আর লাগাতে হবে না ।এতেই হবে।'
কল্যাণের হৃদস্পন্দন হাতুড়ির মত তার বুকে আঘাত করতে লাগলো। শরীরের ভেতর তপ্ত রক্তস্রোত তখন ও বয়ে চলেছে, যেকোনো সময় অঘটন ঘটে যেতে পারে।
কিন্তু আজ একি হলো কল্যাণের?
কল্যান বলল 'শিখা তুমি এবার এসো। আমি একটু বিশ্রাম নিই।'
শিখা সম্মতি জানিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।
এরই মধ্যে সরজুদি তখন খাবার নিয়ে ঢুকলো কল্যাণের ঘরে।
সরজু বলল 'কিরে ঠিক আছিস?'
কল্যান বলল 'হ্যাঁ দিদি।'
সরজু বলল 'তাহলে খেয়ে নে। আর বলল শোন আমি জানি কেন তুমি হঠাৎ করে এরকম ঘরে শুয়ে পড়লে। দেখ পুরনো স্মৃতি ধরে বসে থাকলে তো আর জীবন চলে না। বর্তমানকে নিয়ে ভাবো।'
কল্যাণ উঠে বসল এবং বলল 'সেটাই তো চেষ্টা করছি দিদি।'
সরজু বলল ' নবমী দশমী দুটো দিন খুব ভালো করে কাটা।এখনি ওঠ ।'
'কল্যান মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
সরজু কল্যানের মাথায় হাত বুলিয়ে চলে গেল।
দুপুর গড়িয়ে বিকেলে সোনালী রোদ্দুর তখন ম্রিয়মান। বুকের ভেতরে জমানো কষ্টের পাহাড় মোচড় দিচ্ছে বারবার। আস্তে আস্তে সন্ধ্যা নামছে, পুজো মন্ডপে ঢাক বেজে উঠলো। তখনই হঠাৎ 'যেভাবেই তুমি সকাল দেখো ,সূর্য কিন্তু একটাই। যত ভাগেই ভাগ করো না প্রেম।হৃদয় কিন্তু একটাই.. প্রতিবার প্রেমে নতুন জনম ,জীবন কি করে একটাই। ' গান কানে আসল। কল্যাণ মনোযোগের সঙ্গে শুনল। সত্যিই শিখা অপূর্ব গায়।
মেয়েটার ভেতরে কোয়ালিটি আছে।
এরইমধ্যে মাধরীর গলা শুনতে পেলো শিখাকে বলছে 'তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে। '
শিখা বলছে 'বৌদি ভাই আজকে আর আমি পুজো মণ্ডপে যাব না।'
মাধু বলল 'কেন রে তোর আবার কি হলো?'
কল্যান সব শুনতে পাচ্ছে। 'শিখার আবার কি হলো?'
মাধু বৌদি বলছে তোর তো দেখতে পাচ্ছি আজ দুপুর থেকেই মুড অফ ।কেন, কি কারণে কিছু বুঝতে পারছি না ।যাই একবার কল্যাণের ঘরে যাই দেখি ওর কি খবর।
কল্যান কথাটি শুনতে পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে ওয়াশরুমে গেল ।মাধু দরজা নক্ করল। কল্যান ভেতরে আসতে পারি। বাথরুম থেকে আওয়াজ দিল বৌদি আমি বাথরুমে আছি।
মাধুরী বলল 'ঠিক আছে তুমি রেডি হচ্ছো তো ? বেরোবে তো? এখন শরীর ঠিক আছে?'
কল্যান বলল 'হ্যাঁ বৌদি ।বেরোবো ।ঠিক আছি।'
মাধু বলল ঠিক আছে তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও।
অন্যদিকে শিখা সারাক্ষণ ভেবে যেতে লাগলো।কল্যানদার কি হয়েছে?
কল্যাণ পূজামণ্ডপে চলে গেল কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখতে পেল শিখা তখনও পুজোমণ্ডপে আসে নি।'
মাধু বৃষ্টিকে বলল 'বৃষ্টি যা তো পিমনিকে গিয়ে বল সবাই পূজামণ্ডপে এসেছে। পিমনিকে নিয়ে চলে আয়।'
বৃষ্টি তো নাচতে নাচতে চলে গেল।
বৃষ্টি বলল 'পিমনি চলো ।সবাই তোমার জন্য ওয়েট করছে। '
শিখা বৃষ্টিকে কায়দা করে জিজ্ঞেস করলো ' কে কে এসেছে রে? বৃষ্টি তো একে একে সবার নাম বলতে শুরু করল ,সঙ্গে যখন কল্যাণের কথাটা আসলো ।তখন শিখার মনে একটা আলাদা উত্তেজনা সৃষ্টি হল।
এবার শিখা বলল 'যা বৃষ্টি তোকে আর অত লিস্ট শোনাতে হবে না ।আমি যাচ্ছি।'
বৃষ্টি বলল 'ঠিক আছে। তুমি তাড়াতাড়ি এসো।'
শিখা বললো' হ্যাঁ। আমার মা। আমি ঠিক তাড়াতাড়ি চলে যাব।'
শিখা' আজ লাল কালো ঢাকাই জামদানি শাড়ি পরে মন্ডপে ঢুকতেই আশুদা বলল'শিখা তুমি ছাড়া মন্ডপ টা যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগছিলো।এখন পরিপূর্ণতা পেল।'
শিখা বলল ' কি যে ,বলেন না আপনি?'
আশুদা বলল 'মন্ডপে যারা উপস্থিত( সকলের দিকে তাকিয়ে )জিজ্ঞেস করে দেখো, আমি যদি মিথ্যা কথা বলে থাকি।
তখন কল্যান বলল 'একদম ঠিক।'
শিখার চোখ মুখ যেন লাজে রাঙা হয়ে উঠল।
তারপর শিখা বলল 'আজকে আমি কি করবো?'
আশুদা বলল ' কিছুই না। শুধু মন্ডপের শোভাবর্ধন করো আর মাকে দর্শন করো, পুজো দেখো ।আনন্দ করো'
কল্যাণ বলল ঢাকি ভাইয়ের দিকে এগিয়ে ' ভাই একটু ঢাকের কাঠিটা একটু দাও তো?'
সবার নজর তখন কল্যাণের দিকে
আশুদা অবাক হয়ে বলল 'তুমি ঢাক ও বাজাতে পারো।'
কল্যান বলল ' চেষ্টা করে দেখছি মাত্র।'
কল্যান ঢাক বাজাতে লাগলো। সকলে তন্ময় হয়ে গেল।ইতিমধ্যে পুজো শেষ হলো।
এবার নবমীর রাতের খেলা শুরু হলো। অভিনব খেলা সেরা জুটি নির্বাচন। সবাই বললো আশুদাকে এ আবার কি খেলা? জুটি নির্বাচন মানে? আমাদের তো জুটি আছে ।যাদের জুটি নেই ,তারাই কি জুটি নির্বাচন করবে?'
আশুদা বলল ' ওয়েট ওয়েট'। যারা যে বিষয়ে পারদর্শী ।ধরো গান, নৃত্য, কবিতা আবৃত্তি, ঢাক বাজানো, তারা সেই ভাবে তাদের জুটি নির্বাচন করে নেবেন। এবং যারা সেই বিষয়ে সফলতা লাভ করবে তারা হবে সেরার সেরা জুটি এবং তাদের জন্য পুরষ্কার ও থাকবে। '
সুরঞ্জন বলল 'আমরা তো আবার সহধর্মিনী ছাড়া অন্য জুটির কাছে যেতেও পারবো না ।তাহলেই তো গন্ডগোল( মাধুর দিকে তাকিয়ে হেসে।)
আমরা যে জুটি আছি সেই জুটি থাকি ।দেখি কি করতে পারি। অন্যদিকে সরজূ -আশিষ জুটি, এইভাবে যে যার জুটি নির্বাচন করে নিল। কল্যান আর শিখা পরল ধন্দে।
আশুদা বলল 'কল্যান ও শিখা তোমরা জুটি। তোমরা বাদ আছো। বাকি সকলের জুটি নির্বাচন হয়ে গেছে।'অন্যান্যরা শিখা ও কল্যান পরস্পর ,পরস্পরের মুখের দিকে তাকালো ।কল্যাণের প্রসন্ন দৃষ্টি শিখাকে মুগ্ধ করল। শুরু হলো গানের লড়াই।সকলের গানের শেষে শিখা ও কল্যানের গান। 'কেন মেঘ আসে হৃদয় আকাশে। তোমারে দেখিতে দেয় না। ..মোহমেঘে তোমারে দেখিতে দেয় না।মাঝে মাঝে তব দেখা পাই। চিরদিন কেন পাই না। ..।'
সত্যি খুব সুন্দর দু'জনে গান করল পুজো মণ্ডপ সকলে মোহাবিষ্ট হয়ে গেল। সেরা জুটি হিসেবে নির্বাচিত হ'ল শিখাও কল্যান। শিখা কল্যাণের দিকে তাকাল ।কল্যাণ প্রসন্ন দৃষ্টিতে শিখার দিকে ,যেন চোখে তাদের অনেক কথা হয়ে গেল।'মনে হল মাঝে মাঝে দেখা নয়, চিরদিনের জন্যই দেখা পেতে চায়। আশুদা বলে উঠলো ' তোমরা তো ফাটিয়ে দিয়েছো ভাই ।বাস্তব জীবনে কি তোমরা সেরা জুটি হবে? তাহলে আগাম আমাদের শুভেচ্ছা ,শুভকামনা রইল তোমাদের জন্য।'