
আত্মজ
অরুন্ধতীর মন আজ বেশ খুশি। বাড়িতে সবাই আনন্দে মেতে উঠেছে। পুচকি এখন ও ঘুমে কাতর। এবার তুলতে হবে। ওর জন্যই এত আনন্দ। একবছরের হয়ে গেল। কোথা থেকে যে দিন কেটে গেল বুঝতেই পারল না। ঠাকুর মশায় চলে এসেছে, বাড়িতে পুজো,মা ডাকছেন, সকাল সকাল স্নান করে সে তৈরি।
সোনার মুখের দিকে তাকিয়ে অরুন্ধতীর আজ পুরনো দিন গুলো সব মনে পড়ছে... তখন যেন দিন রাত সব একই মনে হত। বিয়ের পর পর কোন বেবি ওরা নেয়নি। তাতে অরুনাংশুর ও সায় ছিল। কিছু দিন নিজেদের মতো কাটিয়ে বাচ্চা নেবে। অরুনাংশু সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, প্রচুর কাজের চাপ, অরুন্ধতী প্রাইমারি টিচার।
দুজনে দুজনকে আগেই চিনত, কিন্তু সে ভাবে কথা বার্তা হয়নি। পাশাপাশি ফ্ল্যাটে থাকত। কিন্তু সমন্ধ আসার পর কিছু দিন নিজেদের চেনা জানার পর বিয়ে করেছে। দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ই সমন্ধটা এনেছিল। কিন্তু তখন জানত না পাশের ফ্ল্যাটেই থাকে অরুনাংশুরা। যাইহোক , দুবছর পরে যখন নিজেরা বাচ্চা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল দেখা দিল সমস্যা। এদিকে শাশুড়ী মা সারাক্ষণই বলে চলেছেন, একটা বাচ্চা না হলে বাড়ি কি বাড়ি মনে, কি ভাবছ তোমরা. তোমার শ্বশুর মশায় নাই, ছোটু ও বাইরে।আমি কি নিয়ে থাকব। ছোটু আমার ছোট দেওর, অরুনাংশুরা দু ভাই। ছোট ও ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে ব্যাঙ্কের কাজ নিয়েছে। পাঞ্জাবে পোষ্টিং।
দুবছরের পর যখন বাচ্চা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল, তখনই দেখা দিল সমস্যা। অনেক ডাক্তার দেখানো হলো, কোন ফল হল না, ডাক্তার বাবু আশ্বাস দিলেন অনেকেরই দেরিতে বেবি হয়। আমার কোন প্রবলেম নেই তাও জানিয়ে দিলেন। কিন্তু যা হয়, ক্রমশ যেন অরুনাংশু থেকে দূরত্ব বাড়তে লাগল। একটু খিটখিটে ও হয়ে গেল, যেটা ওর স্বভাব বিরুদ্ধ। শাশুড়ি মাও একটু অসন্তুষ্ট। এদিকে বাবার বাড়ি থেকেও সবাই বলছে তাড়াতাড়ি একটা বেবি নিয়ে নিতে। সবাইকে তো বোঝাতেও পারছি না। নিজের মধ্যেই একটা অশান্তি, অপরাধ বোধ কাজ করতে লাগল। কিছুই যেন ভালো লাগত না। এভাবেই চলছিল।
অরুনাংশু ও খুব চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল কেন প্রথমে বুঝতেই পারিনি। একদিন স্কুল থেকে বাড়ি আসছি , একটা কুরিয়ার এলো। তাতে অরুনাংশুর নাম। কুরিয়ারটা নিলাম। প্রথমে কিছু না ভেবেই খামটা ব্যাগে রেখে দিই। বাড়ি গিয়ে ভুলেই যাই কুরিয়ারের কথা। এদিকে অরুনাংশু বাড়ি ফিরে কেমন একটা ইতস্তত করছে। ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। হঠাৎ মাকে জিজ্ঞেস করল কোন কুরিয়ার এসেছে কিনা? তখনই মনে পড়ল , আমি বললাম হ্যাঁ এসেছে ,আমি নিয়েছি, মনে ছিল না। একটু যেন বিরক্তিই হলো । রুমে গিয়ে খামটা ব্যাগ থেকে নিলাম, তাতে একটা প্যাথলজি ক্লিনিক এর নাম। এটা ডঃ ভট্টাচার্য এর ক্লিনিক। যেখানে অরুন্ধতী ডাক্তার দেখায়।
ওরা প্রথম বারই দুজনে একসাথে গিয়ে ছিল। তার পর ও একাই যেত। কি হয়েছে অরুনাংশুর কিছু বলেনি কেন ? ভাবতে ভাবতে খামটা নিয়ে ডাইনিং এ এল অরুনাংশুর কাছে। ওরা কেউ কারো পারসোনাল চিঠি বা মোবাইল দেখে না। ভালোবাসা বিশ্বাস এ টিকে থাকে।এটাই ওদের বিশ্বাস। কিন্তু আজ মনটা খচখচ করছে। অরুনাংশু ও কিছু বলেনি। অরুন্ধতী ভাবল, রাতে জেনে নেবে। ডিনারের পর ভাবলো একবার জিজ্ঞেস করে। কিন্তু অরুনাংশু আরো যেন নির্লিপ্ত। কি করবে ভেবে পেল না। এক সময় ঘুমিয়ে পড়ল। মনে মনে ভাবল কাল ক্লিনিকে গিয়ে একবার জেনে নেবে। এতে তার অধিকার আছে জানার।
যা আন্দাজ করেছিল তাই। অরুনাংশু মেডিকেল চেকাপ করিয়েছে। তাতে নেগেটিভ এসেছে রিপোর্ট। সাফিসিয়েন্ট স্পার্ম নেই। এতদিন মুখে কিছু বলতে পারছিল না অরুন্ধতী। কিন্তু একটু সন্দেহ ছিল। ডাক্তার দিদি ও তাই বলেছিলেন। কিন্তু সাহস করে বলতে পারেনি কি ভাববে অরুনাংশু তাই ভেবে। কিন্তু এখন নিশ্চিত হয়ে গেল। নিজে থেকে কিছুই বলবে না ঠিক করল। কিন্তু একটা অস্বস্তি হতে লাগল দুজনেরই । প্রকাশ পেল সেদিনই , যে দিন বাড়িতে প্রথম কার্তিক পুজো করার জন্য বললেন শাশুড়ী মা বললেন , ওনার ধারণা পুজো করলেই ফুটফুটে বাচ্চা হবে।সারা বাড়ি ছোট্ট ছোট্ট নরম পায়ে খেলে বেড়াবে। তাই খুব রাগ করলেন , কিছু কথা ও শোনালেন। আমরাও তো তাই চাই এটা ওনাকে বোঝাতে পারলাম না।
সেই দিনই ও প্রকাশ করল। এতটা সংকোচ কেন বুঝলাম না। আসলে এখনও অনেকেরই ধারণা সন্তান না হওয়ার পেছনে শুধু মেয়েদেরই অপারগতা। ছেলেদের ও যে সমস্যা থাকতে পারে এটা মানতে বা মেনে নিতে কি আত্মমর্যাদায় লাগে ? বুঝে পাই না।
যাই হোক দুজনে একসঙ্গে ডাক্তারের কাছে গিয়ে পরামর্শ নিলাম। সবরকম টেস্ট করে ডাঃ শিবানী ভট্টাচার্য টেস্ট টিউব বেবি নেওয়ার পরামর্শ দিলেন।
প্রথমে কিছুটা অনিচ্ছাই প্রকাশ করেছিল। কিন্তু কোন উপায় নেই তাই শেষে রাজী হল। সত্যিই বিজ্ঞানের এই আবিষ্কারের ফলে কত সংসারে হাসি ফুটে উঠেছে। প্রথম বার সফল হয়নি। দ্বিতীয় বারে সফলতায় আমার পুচকি সোনা। শাশুড়ী মায়ের ধারণা বাড়িতে কার্তিক পুজো করে তিনি নাতনি পেয়েছেন। ঘটনা চক্রে এই দিন ই পুচকি জন্মে ছিল। সেই দিন ও বাড়িতে পুজো , আমি নার্সিং হোমে, আমার পুচকি সোনা আসছে.. সবাই খুব খুশি...
তাই এই দিনে এত ঘটা করে পুজো, জন্ম দিন ধরা। ভাবতে ভাবতে কখন যে পুচকি ওঠে পড়েছে বুঝতে পারিনি। অবাধ্য চোখের জল তখন দু গাল বেয়ে... পুচকি ততক্ষণে পায়ের আঙ্গুল মুখে... কাঁধে আলতো স্পর্শে ফিরে দেখি অরুনাংশু...