উপন্যাস
টানাপোড়েন ৯৪
উচ্ছ্বলহীন নদী
মমতা রায় চৌধুরী
কি কুক্ষণে নদী স্বপ্ন দেখেছিল, তার স্বপ্ন যে বাস্তবায়িত হবে না সেটা তারা আগেই ভাবা উচিত ছিল। নইলে আজকে একটি বিশেষ দিনে কত কিছু ভেবে রেখেছিল, সে সবই চোরাবালিতে ডুবে গেল। মাকে নিয়ে হাজারো স্বপ্ন এঁকে ছিল মনের ভেতর ।হাজারো রং মশাল এর আলোতে জ্বলজ্বল করছিল তার মায়ের মুখচছবি । আজ একি দৃশ্য! মাকে যখন গাড়ি থেকে ধরাধরি করে নামাচ্ছিল, নদী অধীর আগ্রহে ছুটে গিয়েছিল সিঁড়ি দিয়ে তরতর করে নিচে ।
নদীর বিদ্যুৎ গতিতে নদীটাকে ঝরনা আটকানোর চেষ্টা করছিল ।
ঝর্ণা বললো 'কোথায় যাচ্ছো মামনি? কোথায় যাচ্ছ?'
নদী কোন কথার উত্তর না দিয়ে শুধু সামনের দিকে গাড়িটাকে হাতের ইশারায় দেখিয়ে ছুটতে শুরু করল।
ঝর্না বুঝতে পারল' আজ যেটা ঘটেছে সেটা কিছুতেই নদীর সামনাসামনি আসতে দেয়া যাবে না ।নদীকে আটকাতেই হবে।'
ভড়ন্ত বর্ষার নদী উদ্দাম তার গতিবেগ, উচ্ছ্বল তার জলধারা, তার গতিকে রুদ্ধ করবে
কে ? বাঁধ দিয়ে আটকাতে গেলেই সে সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। ঝরনার নদীকে আটকানোর চেষ্টা বৃথা হল ।আর কপাল চাপড়ে বলতে লাগল 'এরপর কি হবে ? কে জানে?
কিন্তু একি নদী হঠাৎ থমকে দাঁড়াল কেন?'
ঝরনা বেশ ভয় পেয়ে গেল। কালবৈশাখী ঝড় আসার আগে যেমন চারিদিকটা থমথমে থাকে ঠিক সে রকম।
নদী ভালো করে তার মাকে পরখ করতে লাগলো 'তার মায়ের কোথাও লাগে নি তো ?তাহলে কি হয়েছে?'
যে দুজন ব্যাপ্তি সঙ্গে এসেছিলেন, শুধু বললেন 'ওনার এখন রেস্ট এর দরকার ।ডিস্টার্ব করবেন না।'
নদী বলল' মায়ের কি খারাপ কিছু হয়েছে?
হঠাৎ করে এরকম কিভাবে হল?'
ঝরনা ততক্ষণে নদীর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
ঝর্ণা বললো' চলো, মামনি ভেতরে চলো।মা ঠিক হয়ে যাবে। মায়ের কিছু হয়নি।'
নদী বলল' তাহলে কেন মাকে সবাই ধরে নিয়ে যাচ্ছে?'
ঝর্ণা বললো' তুমি এসব কিছু বুঝবে না। তুমি ছোট আছো চলো?'
ঝরনা মনে মনে ভাবল' আজকের দিনটা এরকম কিছু না ঘটলেই ভালো হতো।'
ঝরনা জানে বৌদি কতটা অসহায়। বৌদি কেঁদে কেঁদে অনেক কথাই ঝরনাকে বলেছে। কিন্তু উপায় নেই। আজকে দাদা যদি বেঁচে থাকতেন হয়তো এরকম কিছু ঘটতো না। মানুষের ভাগ্য যে কোথায় কাকে টেনে নিয়ে যায়। সংসারটাকে বাঁচানোর তাগিদে আজকে বৌদিকে বলি দিতে হচ্ছে।
ঝরনার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল।
ঝরনা জানে বৌদি কতটা অসহায়। তাই এ সমস্ত দিকগুলো ঢাকার জন্য নদীকে নিয়ে ওপরে চলে আসলো।
নদী কেমন অসহায় ভাবে তাকিয়ে ছিল তার মায়ের দিকে ।সেই দৃষ্টিতে কি ছিল বোঝা মুশকিল হচ্ছিল।
ঝর্ণা নদীকে যেন বুঝে উঠতে পারছিল না। তার ভেতরে রাগ ,দুঃখ ,অভিমান, আক্রোশ, ঘৃণা কি জমা ছিল?'
মনের ভেতরের সেই অভিব্যক্তি যখন তার চোখে-মুখে ফুটে উঠেছিল, সত্যিই ঝরনা কিন্তু ভয় পেয়ে গেছিল।
হঠাৎই লোকগুলো যাবার সময় বলল
'কালকে ম্যাডামকে অফিসে যেতে হবে না। মিস্টার মালহোত্রা মানে আমাদের বস রেস্টে থাকতে বলেছেন।'
নদীর কানে কিন্তু সেই কথাগুলো এসেছে।
নদী মনে মনে ভাবছে 'কি এমন হয়েছে যার জন্য মাকে রেস্টে থাকতে হচ্ছে ?কোন আঘাতের বা অ্যাক্সিডেন্টের তো চিহ্ন দেখতে পেলাম না ।'
কেনই বা মিস্টার মালহোত্রা এ পরামর্শ দিলেন?
তবে কি কোন অন্ধকার অধ্যায় শুরু হতে চলেছে তাদের পরিবারে?
নদী আর নিতে পারছে না।
নদী আজ আবার সিগারেট ধরিয়েছে। ধোয়া গুলো শুধু ছুঁড়ে দিচ্ছে বাইরে দিয়ে জানলার দিকে। আর ভাবছে কদিন আগেই সৌম্যর বাবার কথা অর্ঘ্য বলছিল। ওর বাবা নাকি মাঝেমধ্যেই জীবনটাকে উপভোগ করে তারিয়ে তারিয়ে। অফিসের মহিলা সহকর্মীর সঙ্গে মাঝেমধ্যেই জড়িয়ে যান। সৌম্যর বাবা নাকি একটি বড় উঁচু পদে আছে। স্বাভাবিকভাবেই চাকরিটার অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রাখতে মহিলাদের নাকি একটু-আধটু মক্ষীরানী হতেই হয়।
কেমন যেন ঘুনে ধরা পোকাদের মতো কিলবিল করছে এই সমাজের মানুষেরা। নদী ভাবছে ' তার মাকে কি…?'
নদী ভাবতে পারছে না 'তার মা এরকম কাজ করতেই পারে ।'
আবার পরক্ষণেই ভাবছে যদি তাই হয় তাহলে তার মাকে নিয়ে দেখা স্বপ্নগুলো যে ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে।কি দরকার মায়ের এসব করার?
এলোমেলো ভাবনাগুলো কুরে কুরে খাচ্ছে
নদীকে ।একটা সিগারেট শেষ হয়েছে আর একটা ধরিয়েছে। জন্মদিনটা কি তাহলে ধোঁয়াশার মধ্যে দিয়েই কাটবে। এর ভিতরে তো কোন সোনালী রোদ্দুর উঁকি মারবে না। কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল একটু উষ্ণতার জন্য যে পরম আকাঙ্ক্ষা তার সন্ধান পাবে কিনা জানে না। চিরতরে হিমশীতল হয়েই থাকবে।
এরমধ্যে ঝরনা নিচ থেকে ডাকছে ' মামনি মামনি…?'
নদী সিগারেটটা ফেলে দিল। সে ঝর্নাকে ও ভালোবাসে। তাই ঝর্নাকে ছোট করতে চায় না।
ঝরনা ও বুঝতে পেরেছে নদী স্বাভাবিক নেই। কারণ ঝরনা জানে নদী আজকাল সিগারেট খায় আর ওর মুড অফ থাকলে এটি করে থাকে ।তাই নিজের সম্মান আর নদীর সম্মান বাঁচিয়ে রাখতে নিচ থেকেই মামনি বলে ডাকতে থাকে।
নদী শুধু বলে সিঁড়ির কাছে এসে 'কেনো ডাকছো ঝরনা মাসি?'
ঝরনা বলে 'এস মামনি খাবে এসো?'
নদী বলে' আমার খাবার ইচ্ছে নেই মাসি?'
ঝরনা বলে 'না সোনা, এরকম করলে হয় না। তুমি তো কখন একটুখানি পায়েস খেয়েছ বলো?'
নদী বলে' অনেকটাই পায়েস খেয়ে ফেলেছি মাসি খিদে নষ্ট হয়ে গেছে।'
ঝরনা বলে শরীর খারাপ হয়ে যাবে নিচে এসো খেয়ে যাও।
নদী বলে ', আমি পরে খাব এখন আমাকে একটু আমার মত থাকতে দাও।'
ঝরনা শুধু বলে "তাহলে আমাকে কথা
দাও "তোমাকে কখন ডাকতে আসবো?'
নদী বলে তোমাকে ডাকতে আসতে হবে না আমি ঠিক নিজে চলে যাব।
ঝরনা বলে "ঠিক আছে তাহলে তোমাকে পরে ডাকতে আসবো?'
নদীর মনের ভেতরে হঠাৎ এই প্রশ্ন জেগে ওঠে তার মা কেমন আছে কিন্তু সেটা প্রকাশ করতে পারল না। মা নামের অস্তিত্বটুকু ক্রমশ তার কাছ থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে ।একটা দূরত্ব সৃষ্টি হয়ে গেছিল সেটা যেনো আরও মজবুত হলো।
নদী 18 পা দিয়েছে। কাজেই এখন ওর অভিভাবক ও নিজে। ওর যেটা ভালো লাগবে সেটাই করবে।
ডিসেম্বর প্রায় শেষ হয়ে এল কলকাতায় এখন কদিন ধরেই থার্মোমিটারে পারদ দশ এগারো । দিল্লিতে হয়তো একেবারে থরহরি কম্প। নদী ভাবছে
এক্সকারশনে যাবে কি যাবে না যে একটা দ্বিধা দ্বন্দ্ব ছিল মনের ভেতরে এখন সেটা পুরো ঝেড়ে ফেলে দিয়ে সে ঠিক করে নিয়েছে সে যাবে।
ওয়ারড্রব খুলে নদী মিনিটখানেক চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো বাবার দেয়া লাস্ট গিফট টা বারবার নেড়েচেড়ে দেখতে লাগলো। বাবার গন্ধ খুঁজে খুঁজে নিজেকে শৈশবের দিনগুলো নিয়ে যেতে চাইলো। কিন্তু পারল না মনের ভেতরে একটা যেন কাঁটা বিঁধে আছে কিছুতেই সরিয়ে ফেলতে পারছে না।
এরমধ্যে আবার ঝরনা মাসি ডাকতে শুরু করলো "মামনি মামনি এসো খেয়ে যাও।'
এবার নদী আর কোন বিরক্তি প্রকাশ করলো না।
শুধু বলল' যাচ্ছি মাসি?'
হ্যাঙ্গার থেকে আর একবার বাবার দেয়া পশমিনা কাশ্মীরি শালটার গন্ধ শুকলো। এখনো যেন তার ভেতরে স্যান্ডেল উড এর গন্ধ লেগে আছে।
নদীর ভেতরটা আজ সুখ স্মৃতিগুলো যেন এখন মাতালের ঘুমে ডুবে যেতে বসেছে।
নদী ওয়ারড্রব বন্ধ করে এবার নিচে নেমে আসলো।
ঝরনা নদীর চোখমুখে একটা অন্যরকম ছবি যেন দেখতে পেল। ছবিতে স্পষ্ট করে কিছু বোঝা যাচ্ছে না কিন্তু যে টুকু বোঝা যাচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে এই কয়েক ঘন্টার মধ্যে নদী অনেক অনেক বড় হয়ে গেছে। নদীর সামনে ঝরনা পছন্দের খাবারগুলো রাখতে থাকলো। ফ্রাইড রাইস ,মটন কষা, আর হচ্ছে পাবদা মাছের ঝাল রাখল। ঝরনা লক্ষ্য করলো নদীর ভেতরে কিন্তু কোন উচ্ছ্বাস নেই। কয়েক ঘন্টার মধ্যেই যেন তার উৎসাহে ভাটা পড়ে গেছে।
নদী বলল 'ঝরনা মাসি এতো খাবারের আমার দরকার নেই, পেট ভর্তি নিয়ে কথা। এত রকম রেখো না?'
ঝর্ণা বললো 'মামনি তোমার মা নিজে বলেছে এতকিছু রান্না করতে?'
নদী বলল ' আমার তো খিদে নেই তোমাকে বললাম। তুমি বললে মাসি ,তাই আমি খেতে এসেছি ।যেকোনো একটা জিনিস দাও আমাকে খেতে।'
ঝর্ণা বললো 'মামনি আমি নিজে হাতে রান্না করেছি একটু টেস্ট করে দেখো?'
নদী কিছুক্ষণ ঝরনার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল দেখল ঝর্ণা মাসির মুখে একটা আলাদা রকম দীপ্তি ,প্রত্যাশা।'
নদী বলল' ঠিক আছে, অল্প অল্প দাও।'
ঝর্ণা বললো 'কেমন হয়েছে মামণি?'
নদী বলল' তোমার হাতের রান্না কোন দিন খারাপ হয়েছে মাসি?'
ঝরনা খুব খুশি হলো আর বলল ' আজকে বৌদি সুস্থ থাকলে তোমাকে নিজে হাতে খাওয়াতো।'
নদীর চোখমুখে থমথমে ভাব লক্ষ্য করলো ঝর্ণা।
নদী শুধু হাত নেড়ে মায়ের প্রসঙ্গ টানতে নিষেধ
করল।
নদী বলল' মাসি তুমি খেয়েছ?'
ঝর্ণা বললো 'বৌদিকে কিছু না খাইয়ে তো খেতে পারব না মামনি।'
নদী কোন কথার উত্তর দিল না। ডাইনিং এরচেয়ারটাকে জোরে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে বেসিনে হাত ধুয়ে ওপরে চলে গেল।
ঝরনা চেয়েছিল বিষয়টাকে স্বাভাবিক করতে কিন্তু না ,নদীর কোন ইচ্ছেই নেই।
নদী খাওয়া শেষ করে ওপরে উঠে গেল।
আর ঝর্ণা বসে বসে ভাবতে লাগল 'এরপর কি হবে ? '
নদী একবারও ওর মায়ের কথা জিজ্ঞেস করল না মা কেমন আছে ?মা এর খাবারটা কি করে খাওয়াবে? অথচ মা তো মেয়ে অন্তপ্রাণ। কিন্তু আবার দূরত্ব সৃষ্টি হল।