একান্ত মনেই লিখে চলেছেন লেখক। তার নিত্যদিনের আসা যাওয়া ঘটনার কিছু স্মৃতি কিছু কল্পনার মোচড়ে লিখছেন ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন "।
টানাপোড়েন (৩৬)
এক চিলতে আলো
রেখা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছে ।কি করবে? এখন কি করা উচিত? কার পরামর্শ নেবে? এরমধ্যে ফোনটা বেজে উঠল ক্রিং ক্রিং ক্রিং।
রেখা ফোনটা রিসিভ করতেই 'হ্যালো'
অপর পক্ষ বলল 'দিদি, আমি সোমদত্তা বলছি।'
রেখা বলল 'হ্যাঁ বল।'
সমু বলল' তোর কি শরীর খারাপ?'
রেখা বলল ' হ্যাঁ'।
সমু বলল ' ডাক্তার দেখিয়েছিস?'
রেখা বলল ' ডাক্তার দেখাতে যাই নি ।ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে তোর জামাইবাবু ওষুধের ব্যবস্থা করেছে।
সোমু বলল 'ঠিক আছে ।রেস্ট নে ,ভালো থাকিস। তবে একটা কথা আছে,আজকে আমাদের কোর্টে ডেট আছে ।জামাইবাবু আসতে পারবে?'
রেখা বলল 'ওর শরীরটা বোধহয় ঠিক নেই ।এখনো তো শুয়ে আছে ।ঠিক আছে। বলে দেখব।'
সমু বলল 'আজ হেয়ারিং আছে একটায়।'ঠিক আছে। ছাড়ছি।'
রেখা ফোনটা ছেড়ে মনে মনে বলল 'যত আদিখ্যেতা অন্যের সংসার ভাঙ্গার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। টের পাবি তুই দেখিস পরবর্তী ক্ষেত্রে।
পরক্ষণেই ভাবতে লাগল এবার তো মনোজকে খবরটা দিতে হবে। যেতেই হবে মনোজের ঘরে।
রেখা মনোজের ঘরে গিয়ে দেখলো মনোজ তখনও শুয়ে আছে। সাহস করে আস্তে আস্তে মানোজের মাথায় হাত বুলাতে লাগল আর ভাবতে লাগলো মানুষটা ভালো ছিল ।হঠাৎ করে এরকম হয়ে গেল কেন?ভালোবাসার কমতি তো আমাদের মধ্যে কখনো ছিল না । এখন কেন এরকম হচ্ছে । শনির দৃষ্টি পড়লো নাকি? হাতজোড় করে ভগবানের উদ্দেশ্যে বলল ,ভগবান সব ঠিক করে দাও।'
এমন সময় মনোজ চোখ খুলে তাকালো , অবাক হল ।উঠে বসলো এবং বলল ' কি ব্যাপার তুমি এখানে?'
রেখা বলল 'আসলে এতটা বেলা হল ।তোমাকে দেখতে পাচ্ছিলাম না ।তারপর সমু ফোন করেছিল?'
মনোজ বলল 'এই যা ,আজকে তো কোর্টের ডেট আছে। একদম ভুলে গেছি। দেরি হয়ে যাবে তো?''বলেই উঠে পড়ল, বাথরুমের দিকে গেল।
রেখা বলল 'হ্যাঁ ,সেই জন্যই তো তোমাকে ডাকতে এসেছিলাম। তুমি যাবে?'
মনোজ বলল 'না গেলে কেমন দেখায় না বল?'
রেখা বলল 'আমি বলে দিয়েছি ।বোধহয়, তোর জামাইবাবুর শরীরটা ভালো নেই।'
বাথরুমের দরজাটা ধড়াম করে লাগিয়ে দিয়ে বলল রেডি হই। দেখি, যদি টাইমে পৌঁছাতে পারি ,তাহলে যাব।'
রেখা বলল 'এখনো তো আমি খাবার করি নি ।তাহলে কি খেয়ে যাবে?'
মনোজ বলল 'তোমাকে অত টেনশন নিতে হবে না ।ডিম সেদ্ধ করে দাও আর পা রুটি আছে তো ?বাটার টোস্ট করে দাও। তুমি পারবে তো করতে? না হলে ছেড়ে দাও।'
রেখা বলল 'হ্যাঁ, হ্যাঁ পারবো।'
রেখা যতটা শরীর খারাপ ছিল মনের দিক থেকে মনোজের সঙ্গে কথা বলে অনেকটাই ভালো লাগছে। কে বলবে কাল রাতে কত কিছু ঘটনা ঘটে গেছে। কিছু মনে করতে চাইছে না ।সে বুঝতে পারছে মনোজের ভেতরে কিছু সমস্যা তৈরি হয়েছে। কি হবে ঝগড়াঝাটি করে ?এতে তো সমস্যার সমাধান হয় না। মানুষ মাত্রেই কিছু-না-কিছু ক্রাইসিস তৈরি হয়। সেগুলো হয়তো আমার সঙ্গে শেয়ার করতে পারছে না।
এসব ভাবতে ভাবতে রেখা রান্নাঘরের দিকে গেল। গ্যাস ওভেন টা জ্বালালো, ডিম সেদ্ধ করার জন্য বসিয়ে দিল।
এর ই মধ্যে মিলি চিৎকার করে উঠল। রেখা কান পেতে শুনল। এ চিৎকার তো খিদে পাওয়ার চিৎকার। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল ওর তো খাওয়ার টাইম হয়ে গেছে। চার পাঁচ বার খাবার খায়। কি হবে এখন ?রেখা তো খাবারই করে নি। যা ঝামেলা হয়ে গেল ।এসবের মধ্যে মিলির কথাটা মাথায় আসে নি। তাছাড়া শরীরটাও তো সাথ দিচ্ছিল না। এবার মিলির জন্য একদিকে ভাত বসিয়ে দিল। আর মনে মনে ভাবলো ,না মিলিকে কটা বিস্কিট খাইয়ে আসি।
এই ভেবে এবার কতগুলো ব্রিটানিয়া বিস্কিট হাতে নিল এবং সিঁড়ির কাছটায় গিয়ে ডাকলো 'মিলি, মিলি ।সঙ্গে সঙ্গে মিলি বেরিয়ে আসলো এবং হাও হাও করতে করতে লেজ নাড়তে লাগলো। মিলিকে গিয়ে গায়ে আদর করে দিল হাত বুলিয়ে বুলিয়ে আর মিলি বিস্কিট খেতে লাগল ।
অন্যদিকে রেখার আওয়াজ পেয়ে তার মধ্যে একটা বাচ্চা ঘেউ করে উঠলো। প্রথম মিলির বাচ্চা আওয়াজ করলো ।রেখা গিয়ে বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিল ,আদর করতে লাগল। এ যেন মিলির মাতৃত্বের সঙ্গে রেখার মাতৃত্ব একাকার হয়ে গেল ।যেন প্রথম বাচ্চার আওয়াজ শুনলে যে রকম আনন্দ হয় মায়েদের ।রেখার ও ঠিক তেমনি আনন্দ হতে লাগল ।অনেকক্ষণ ধরে বাচ্চাটিকে আদর করলো ।অন্যদিকে মনোজ ' রেখা ,রেখা ' করে ডাকতে শুরু করলো।
রেখা সিঁড়ির কাছ থেকে সাড়া দিল ' যাই।'
যাবার সময় মিলিকে বলে গেল দাঁড়া মা ।তোর এক্ষুনি খাবার হয়ে যাবে । মিলি ও যেন রেখার সব কথা বুঝতে পারল এবং সে বাচ্চাদের কাছে গিয়ে শুয়ে পড়ল।
মনোজ বললো 'কোথায় গিয়েছিলে?'
রেখা বললো ' মিলির খিদে পেয়েছে। চিৎকার করছিল কিন্তু আমি তো খাবার তৈরি করে উঠতে পারি নি ।কিছু বিস্কিট খাওয়াতে গিয়েছিলাম। সঙ্গে খুব খুশি মনে বলল ' জানো তো আজকে মিলির একটি বাচ্চা 'ঘেউ 'করে আওয়াজ করেছে। কি মিষ্টি বাচ্চাটি।'
মনোজ হেসে বলল ' তাই বুঝি?
তা ওর নাম কিছু রেখেছো?'
রেখা বলল 'তোমার সাথে ভেবেছিলাম আলোচনা করব নামের ব্যাপারে ,তা করা হয় নি । আমি কিন্তু ঠিক করেছি জানো তো রান্না ঘর থেকে রেখা বলতে লাগল ।অন্যদিকে বাটার টোস্ট বানাতে শুরু করে দিল আর একদিকে মিলিদের মাংস বসিয়ে দিল।
মনোজ বলল 'কি নাম ঠিক করলে?'
রেখা বলল 'যদি মেয়ে হয় তাহলে মিলি। আর যদি ছেলে হয় তাহলে নাম হবে পাইলট ক্যাপ্টেন কর্নেল।'
মনোজ বলল 'তুমি কি করে ভাবলে একটি মেয়ে হবে তিনটে মেয়েও তো হতে পারে?'
রেখা হেসে এসে বলল রান্নাঘর থেকে জানো তো আমার মন বলছে বাচ্চা গুলো যেভাবে তেজ দেখাচ্ছে কয়েকটা ,তাতে মনে হলো বাকীগুলো ছেলে,একটা মেয়ে বাচ্চা হবে?'
মনোজ বলল 'বাবা তুমি দেখছি গণনাও করতে পারো দেখা যাক কি হয় ।ঠিক আছে। তোমার খাবার রেডি তো ?খাবার দিয়ে দাও।'
রেখা বলল ' হ্যাঁ, তুমি টেবিলে বসো। খাবারর রেডি । দিচ্ছি।'
মনোজ বললে 'তোমার শরীর কেমন আছে? ডাক্তার কাকাকে কি আর খবর দিতে হবে?
রেখা বলল 'এখন ঠিক লাগছে ।তবে উইক আছে শরীর।'
মনোজ বলল ,'সুমিতা এসেছিল? তুমি রেস্ট নাও।'
রেখা বলল 'হ্যাঁ ,এসেছিল। আজকে এডভান্স টাকা নিয়ে গেছে। বলে গেল আজকে এক জায়গায় যাবে।
এর ই মধ্যে মনোজের ফোন বেজে উঠল-ক্রিং ক্রিং ক্রিং।
ফোনের আওয়াজ শুনলেই রেখার বুকের ভেতরটা যেন কেমন করে ওঠে।
মনোজ ফোন রিসিভ করল' হ্যালো''।
অপরপক্ষ বলল 'তুই এত টেনশন নিস না। আমি ব্যাপারটা দেখছি।'
মনোজ বলল 'হ্যাঁ ,তুইও ব্যাপারটা দেখ আর আমিও দেখছি ।মামদোবাজি নাকি বল তো ?হঠাৎ করে যা বলবে তাই কি মেনে নিতে হবে? এটা আমার পক্ষে কখনোই সম্ভব নয়। আমি যে কাজটা করি নি তার দায় আমি কেন নেব আর যদি তাই হয় তাহলে এত বছর পরে কেন? অনেকগুলো প্রশ্ন চিহ্ন থেকে যাচ্ছে না ,সুরো?'
রেখে এবার বুঝতে পারল সুরঞ্জনদার সঙ্গে কথা বলছে ওদের ওই ফোনকলটার ব্যাপারে।
ভগবান মুখ তুলে তাকাও।আমার স্বামীকে যেন কোনো সমস্যায় পড়তে না হয় ,দেখো ভগবান। তিনবার জোড়হাত করে প্রণাম করলো।
মনোজ তখন ও ফোনে কথা বলে যাচ্ছে' হ্যাঁ ভালো আছে। রেখার দিকে তাকিয়ে।'
রেখা বুঝলো সুরঞ্জনদা রেখার ব্যাপারে খোঁজখবর নিচ্ছে।
ফোনটা নামিয়ে রেখে মনোজ বলল রেখাকে ' কেন প্রনাম করলে কেন?'
রেখা বলল ' এমনি '।
মনোজ বলল ' তুমি কিছু মনে করো না ,কালকে তোমাকে অনেক খারাপ কথা বলেছি না?'
রেখা বলল ফোনটা ধরা উচিত হয়নি আমারই ভুল হয়েছে ।সরি।
মনোজ হেসে বলল 'না, না, ঠিক আছে ।ধরাটাই তো স্বাভাবিক।
ঠিক আছে আমি বেরোচ্ছি।'
রেখা বলল 'কিন্তু এখন তো ট্রেন পাবে না। তুমি কি করে যাবে?
মনোজ বলল 'পার্থর গাড়িকে বলে দিয়েছি।'
রেখা বলল 'ঠিক আছে, সাবধানে,এসো।'
এরইমধ্যে ফোন বেজে উঠল ক্রিং ক্রিং ক্রিং।
রেখা দেখল রেখার ফোন।
ফোন কল টা এসেছে রিম্পাদির কাছ থেকে।
রেখা ফোন ধরে বলল 'হ্যালো'।
রিম্পাদি বলল 'কিরে রেখা ,কালকে কতবার তোকে ফোন করেছি।'
রেখা বলল 'ও তাই বুঝি?
রিম্পাদি বলল 'কল লিস্ট চেক করিস নি। ঠিক আছিস তো?'
রেখা মনে মনে ভাবল ' কালকে যে কি অবস্থা হয়েছিল সেটা রিম্পাদিকে কি করে বলবে? শুধু বলল শরীরটা একটু খারাপ ছিল।
রিম্পাদি বলল 'তাই? তাহলে বড়দি ম্যাসেজ দিয়েছে সেটাও দেখিস নি? কালকে স্কুলে যেতে হবে পর্ষদ নির্দেশিত এমসিকিউ প্রশ্নপত্রের উত্তরপত্র জমা নিতে হবে।'
রেখা বলল 'তাই বুঝি ?কিন্তু আমার যে শরীর উইক, স্কুলে যেতে পারবো না।'
রিম্পাদি বলল 'সেটাই ভালো ।রেস্ট নে। আর বড়দিকে ফোন কর বা মেসেজ করে বলে দে।'
রেখা বলল 'হ্যাঁ, তাই করবো।'
রিম্পাদি বলল 'ঠিক আছে। ভালো থাকিস। ওষুধপত্র ঠিক করে খা ।ছাড়ছি রে।'
রেখা শুধু বলল হ্যাঁ, তুমিও ভালো থেকো।'
ফোনটা ছেড়ে রেখা মনে মনে ভাবতে লাগল আজকে মনোজকে যে অবস্থায় দেখল ,তাতে যেন মনে হলো কাল অমানিশির রাত ঘুচে, তার হৃদয়াকাশে উজ্জ্বল তারকারাজির স্নিগ্ধ আলো উঁকি দিয়েছে। খুশিতে তার হৃদয় ও গুনগুন করে উঠলো 'দেখো আলোয় আলো আকাশ ।দেখো আকাশ তারায় ভরা। দেখো যাওয়ার পথের পাশে ,ছোটে হাওয়া পাগল পারা ।এত আনন্দ আয়োজন সবই বৃথা, আমায় ছাড়া..।'
ক্রমশ