১২ জানুয়ারী ২০২২

কবি রুকসানা রহমান এর কবিতা





উদীয়মান সূর্য

 রুকসানা রহমান


প্রত্যাশার আশায় দীর্ঘশ্বাস নয়,সভ্যতার ঝরণা ধারায় মনস্তাপের খেলায় বেঁচে থাকা কাঁধে স্মৃতির বোঝা 
আর ধর্মান্ধতার ভিতর হেঁটে যাওয়া, তাম্রতামাশার
ঘুড়ির লাটাই নই। 

ঈশ্বর আপনি ওকি চান ? 
প্রাচীন নারীর মতো ব্রাকেট 
বন্দী হয়ে, জানতে হবে লাউ,চিংড়ি, রুই - ইলিশের
জটিল সমীকরণ ? 

এই আত্মা খোঁজে আকাশ ছুঁয়ে,  মাটির গন্ধ নিয়ে  শব্দ বর্ণের রহস্য ! 
ভাগ্যরেখায়  ত্রাণ বিতরণের মতো সঁপে       
দিবোনা  সম্পদ  নিশুতি খেয়ালি রাতে ?
আমি ভেসে যাবো জোয়ারে,মধ্য গ্রীষ্মের সূচনায়... 

পোড়া বসন্তের হাটে-বাজারে,অপবাদ গ্লানি, গোপন ব্যথা,পঞ্চভুতের
নগ্ন উপহাস অগ্রায্য করে দুঃসাহসী দ্রঢ়ীয়সী  শূণ্যতার  নেকাবের ভিতর  অদ্ভুত স্বপ্নরা ডাকে, ভাঁজখোলা পাহাড়ে উদীয়মান সূর্য, টিউলিপের গন্ধ বিলায়
আমি সেই - মন তিয়াসী তীর্থযাত্রী
এক্সপ্রেস ট্রেনের শব্দ
অপেক্ষা অনন্ত জংশন !

মমতা রায় চৌধুরী /৯০




উপন্যাস 

টানাপোড়েন৯০

খেয়ালী যেন

মমতা রায় চৌধুরী


ঘুম ভাঙার পর অনেকক্ষণ বিছানায় শুয়ে ছিল রুপসা। আজকাল এভাবেই বেশ কিছুক্ষণ চোখ বুজে শুয়ে  নিজেকে একটু আবিষ্কার করার চেষ্টা করে। কেমন যেন সব এলোমেলো হয়ে গেল কিছুই মাথায় ঢুকতে চায় না ।কোথাও কিছু ফাঁকা আছে কিনা সেই মন পাখিটাকে ধরে নিয়ে কল্পনায় নিজেকে তৈরী করার চেষ্টা করছিল।
হঠাৎই ভেতরের ঘরে ফোনটা বেজে ওঠে। বাজতে বাজতে কেটে গেলো ।আবার বাজতে শুরু করলো। বেজেই চলেছে। একটু বিরক্তই হলো এত সকালে কে ফোন করেছে! শব্দটা ক্রমশ তীক্ষ্ণ

হচ্ছে ।ফোনটা তুলছে না কেউ। ঝর্ণা কোথায় গেল? বিরক্তি নিয়ে রুপসা বিছানা থেকে উঠে বসল। নিজের অজান্তেই দেয়াল ঘড়িটার দিকে গেল ।ঘড়িতে তখন ৬.১০। ঝরনাটা তাহলে কোথায় গেল? ও কি  কোন কাজে বাইরে গেছে? ওদিকে নদীও ফোন ধরছে না।'

হাউসকোটটা গায়ে চাপিয়ে বিরস মুখে ফোনটা তুলে বলল 'হ্যালো।'
ও প্রান্ত মুহূর্তের জন্য নীরব। তারপর বলল'আমি সমুদ্র বলছি।'
রুপসা বলল' ও তো এখনও ঘুম থেকে ওঠে নি।
কিছু প্রয়োজন আছে?'
সমুদ্র নদীর বন্ধু। বেশ কয়েকবার বাড়িতে এসেছে। খারাপ লাগেনি। ছেলেটি সহজ-সরল। সব সময় চেষ্টা করে নদীকে হাসি খুশিতে রাখার। 
অথচ আগে নদী ছিল কতটা প্রাণবন্ত, উচ্ছল ছিল তার তরঙ্গ।
সজীব মারা যাবার পর থেকে যেন কেমন হয়ে গেছে। ছাইচাপা আগুন যেন। শুধু গুমড়ে গুমড়ে থাকে।
সমুদ্র বলল' না বলছিলাম..?'
 রুপসা বলল' আমি তো সেটাই জানতে চাইছি, কি বলতে চাইছো,?'
সমুদ্র যেন মাথা চুলকে বলল' না মানে আন্টি ,কথাটা ওকে ...।'
রুপসা বললো ' বুঝেছি কথাটা আমাকে বলবে না তাই তো?'
সমুদ্র নিরুত্তর।
রুপসা বলল 'ঠিক আছে। আমি চেষ্টা করছি ওকে ঘুম থেকে ডেকে দেবার। যদি ওঠে ভালো ।না উঠলে তো আমার কিছু করার নেই বাবা।'
সমুদ্র হেসে বলল 'ঠিক আছে আন্টি।'

রুপসার স্বামী মারা যাবার পর স্বামীর বস কোম্পানিতে জয়েন করতে বলেছেন। তাই স্বাভাবিকভাবেই নদীকে তেমনভাবে সময় দিতে পারে না।
মেয়েটা কেমন যেন একগুঁয়ে জেদি হয়ে যাচ্ছে।
একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে পা বাড়ালো নদীর ঘরের দিকে। প্যাসেজ টপকে নদীর ঘরের ভেজানো দরজাটা আস্তে করে ঠেলল।
ঘরে ঢুকে রূপসা নদীর ঘরের বিশৃঙ্খলা অবস্থা দেখে চমকে ওঠে। এ কি করেছে বৃষ্টি !ঘরটার বই ,খাতা ,পেন, সব খাটের ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখে দিয়েছে। টেডি বিয়ারটা মুখ থুবরে পড়ে আছে।
হঠাৎ দেখলে মনে হবে ঘরটা যেন কেউ তছনছ করে দিয়ে গেছে। রূপসার ত্রস্ত চোখ নির্জন ঘরটায় কয়েকবার পাক খেলেl
ছোটবেলা থেকেই নদীর সখ ছিল প্রিয় খুব কাছের মানুষদের ছবি টানিয়ে রাখা। রুপসা  প্রভাতী আলো  জানলার কাঁচ লাগানো ঝোলা ভারী পর্দা দুটোর  থেকে বেরিয়ে এসেছে। আর মন কেমন করা স্মৃতিগুলো যেন আঁকড়ে ধরছে।


তারপর কাছে গিয়ে নদীর গায়ে হাত দিয়ে ডাকতে শুরু করলো। নদী ,নদী, নদী ওঠো তোমার ফোন এসেছে?'
নদী চোখ দুটো বোজা অবস্থাতেই বলল' কার ফোন? '
রুপসা বলল'একটি ছেলের কন্ঠ। নাম  সমুদ্র।'
নদী ঘুমের ঘোরে বললো ''ওকে একঘন্টা পরে আসতে বল'।
রুপসা অগত্যা সমুদ্রের ফোনটাটা ধরে আস্তে করে বলল। ও তোমাকে পরে ফোন করতে বলl
লো কিন্তু..?'
সমুদ্র বলল' আন্টি ,আপনি ওকে বলবেন খুবই দরকার।'
রুপসা শুধু' হুম বলে  নদীর ঘরের দিকে পা বাড়ায় কিন্তু আশ্চর্য সেখানে গিয়ে নদীকে দেখতে না পেয়ে একটু আশ্চর্য হয়ে যায়।রুপসা গেস করলো 'নদী ছাদে গেছে'।কারণ ওর মন ঠিক করার একটি মাত্র জায়গা হচ্ছে ছাদ। আজ কাল নদী যেন একটু খেয়ালী হয়ে গেছে।'
রুপসাও তরতর করে সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেল ছাদে তারপর আরষ্ট গলায় ডাকলো' নদী তোমার ফোন ।'
সমুদ্র শুনতে পেল ।
রুপসা ছাদে উঠে দেখতে পেল রুপসা আলসেতে ভর দিয়ে আচ্ছন্নের মতো তাকিয়ে আছে। ক্ষণিকের জন্য  রুপসা নদীকে দেখে ভয় পেয়ে গেছিল ।
রুপসা আরষ্ট গলায় বলল 'নদী তোমার ফোন।'
নদী যেন শুনতে পেল না।
রুপসা আবার ডাকল।
এবার নদীকে ধাক্কা দিয়ে রুপসা বলল 'তোমার ফোন আছে?'
কিন্তু নদী যখন রূপসার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল তখন তাকে দেখে মনে হয়েছিল একটা ভাবলেশহীন কিছুটা উদাস দৃষ্টি।
রূপসার ভেতরটা কেমন হু হু করে উঠলো। কি হয়ে গেল তার মেয়েটার ।কেমন একটা উদাসী বাউল মন তার ভেতরটাকে দেখে আঁতকে উঠল।'
শুধু রূপসার কথাতে এবার নদী একটু ফিরে তাকালো।
রুপসা বললো 'সমুদ্র ফোন করেছিল?'
নদী তখনও একদৃষ্টিতে রূপসার দিকে তাকিয়ে। যে নাম শুনলে নদী যেন চঞ্চল অস্থির হয়ে ওঠে একটা কেমন যেন বিদ্যুৎ খেলে যায় তার শরীরের ভেতরে আজ এমন কি হলো?'
তারপর নদী কোন কথা না বলে তরতর করে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল।
রুপসা তার মেয়ের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো আর মনে মনে ভাবতে লাগল আজ যা কিছু হচ্ছে তার অবর্তমানে কিছুতেই তার মেয়েটাকে সে সময় দিতে পারছে 
না ।একদিকে তার কাজের জায়গা অন্যদিকে বাড়িতে মেয়ে। কি করবে সে জীবনে বেঁচে থাকার জন্য তার কর্ম দরকার আজ যদি সজীব থাকতো ,তাহলে তাকে এগুলো চিন্তা করতে হতো না। সজীব  চলে যাবার পর থেকেই সব কিছুই যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
'কি করবে  রুপসা?'
নদী যখন সিঁড়ি দিয়ে নামছিলো পেছন থেকে দেখে রুপসাকে নিজেই চমকে ওঠে ।তার মেয়েটা খুব সুন্দর হয়েছে।গোলাপী আভা তার শরীরে ,মাথা ভরা চুল । টানা টানা চোখ, কালো চোখের পাতা। স্লিম। 
ছোটবেলায় নদীকে নিয়ে কতজনা কত কথা বলতো নদীর পিসি ঠাম্মা বলতো রূপসার ডুবলিকেট ।কেউ কেউ বলতেন নদী হবে ওর বাবার মত দেখতে। এত ছোট অবস্থাতেও যে চেহারা বোঝা যায় এটা ভাবা কঠিন কিন্তু তার শ্বশুরবাড়ির লোকজনে এমনই বলতেন।
তিল তিল করে বড় হওয়া  নদী আজ ১৭+
নদী তখন বাথরুমে রুপসা যখন নদীর ঘরে ঢুকলো  নদী বাথরুম থেকে বেরিয়ে নিষ্পলক রূপসার দিকে তাকিয়ে ছিল যেন মনে হচ্ছে কিছুটা জরিপ করছে মাকে।।
রুপসাও প্রস্তুত মেয়ে এতক্ষণ তাকে  লক্ষ্য করছিল।
রুপসা বলল 'সমুদ্রের সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে?'
নদী র গলার স্বরে পরিস্কার ঝাঁঝ  রয়েছে ।আজকাল মাঝে মাঝে মুখ করে ওঠে ।ভালোভাবে কথা বলতেই চায় না।
নদী বলল 'তোমার সময় আছে ,সেসব শোনার?'
রুপসা সকাল সকাল আর কথা  বাড়ায় না।
এর মধ্যেই দেখতে পায় ঝরনা চলে যাচ্ছে পাশ দিয়ে। রুপসা সমস্ত রাগ ঝরনার ওপর গিয়ে পরলো ।তবুও নিজেকে কিছুটা শান্ত রেখে ডাকলো ঝরনা ঝরনা ঝরনা।
ঝর্ণা বললো  'কিছু বলছ বৌদি?'
রুপসা বললো' কোথায় গেছিলে তুমি না জানিয়ে?'
ঝর্ণা বললো আসলে বলে বেরোবার সে সময় ছিল না।
রুপসা বললো' কোথায় গিয়েছিলে?'
ঝর্ণা বললো' বাজারে গিয়েছিলাম? তোমাকে কদিন ধরেই তো বলছি বাজার নেই। তুমি এত ব্যস্ত..। তাই আজ একটু সময় পেলাম বলে বাজার করে নিয়ে আসলাম।'
রূপসার কথা বাড়ালো না ।ঠিকই তো বাজার না হলে  রান্না হবে কি?'
রুপসা বলল' কি এনেছে বাজার থেকে?'
ঝরনা বলল'কাতলা মাছ, চিকেন, সঙ্গে কিছু সবজি।'
রুপসা বললো আর কিছু আনো নি? দুধ গোবিন্দভোগ চাল কাজু কিসমিস ,খেজুরের গুড়?'
ঝর্ণা বললো ' এনেছি তো বৌদি?'
রুপসা বলল
ঠিক করেছ যাও তাড়াতাড়ি  নাস্তা রেডি করো। আমি বেরোবো।'
ঝর্ণা বললো বেশি সময় লাগবে না বৌদি তাড়াতাড়ি করে নিচ্ছি। তোমমায় কি আজকে টিফিনে ভাত দিয়ে দেবো?'
রুপসা বলল 'না না না ।তুমি আমায় হযlএকটু ভারী করে নাস্তা টা দাও টিফিনে আজকে আমি এখানে খাব না ।আমি বাইরে লাঞ্চ করে নেব।
নদী সবকিছু শুনতে পাচ্ছিলো আজকাল মা একটু ঘনঘন বাইরে লাঞ্চ করে , ও জানলা দিয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। মনে হচ্ছিল বৃষ্টির চোখে মুখে যেন বিষণ্ণতার ছাপ ।জানলা দিয়েছে এই কর্ম ব্যস্ততাকে দেখছিল । ও অনেকদিন হলো তারা গ্রাম থেকে শহরে এসেছে ।যবে থেকে মা কোম্পানিতে জয়েন করেছে আজকে শুধু নদী ভাবছে তার জীবনটা অন্যরকম হতে পারত আজকে তার বাপি বেঁচে থাকলে চারিদিকে রোদ্দুরে ভেসে থাকতে পারতো আজকে একটা বিশেষ দিন সেটা কি মা একদম ভুলেই গেল? ও কিছুই বলল না আজকে কি তার জীবনে নতুন একটা নীল আকাশ আসতে পারত না?
এর মাঝে বাইরে থেকে আওয়াজ পাওয়া গেল যে মায়ের ঘর থেকে একটা ফোনের আওয়াজ আসছে ।একবার ফোন হয়ে কেটে গেল ঝর্ণা বাইরে থেকে বলে গেল বৌদি তোমার ফোন বাজছে রুপসা মেয়ের দিকে তাকিয়ে তারপর বলল হ্যাঁ যাচ্ছি বেরিয়ে গিয়ে সামনের বারান্দার আটকে গিয়ে নিজের ঘরে ঢুকলো ঢুকে দেখছে ফোন করেছে তাদের কোম্পানির বস অরিন্দম ভদ্র। আজকাল বেশিরভাগ দিনই বস ফোন করেন ।রুপসা ভাবতে থাকে কেন কোন কারণ না থাকলেও তার স্যার ফোন করেন ভাবতে ভাবতেই ফোনটা রিসিভ করল বলল' হ্যালো'।
অপরপ্রান্ত থেকে উত্তর আসলো আজকে তোমার কথাটা মনে আছে তো?
রুপসা বলল হ্যাঁ স্যার?
ঠিক আছে তাহলে নির্দিষ্ট টাইমে অফিসে পৌঁছে যেও।তোমার জন্য কি গাড়ি পাঠাবো?'
রুপসা বলল 'না ,না, না আমি ঠিক চলে যেতে পারব।'
এরপর ফোনটা কেটে গেল। রুপসা ভাবতে থাকে সে কি কোন  রাজনীতিতে জড়িয়ে যাচ্ছে নাকি সে ভাবতে পারছে না ?তবে অফিসের বস তার প্রতি কিছুটা দুর্বল তা বোঝা যায়। আজকাল বেশ তার  কথাবার্তা বা ব্যবহারে ধরা পড়ে তাকে টিকিয়ে রাখতে হলে তাকে তো তার সঙ্গে ভালোভাবে কথা বলতেই হবে ।মফস্বল থেকে আসা রুপসা কতটা বদলে গেছে নিজেই মাঝে মাঝে ভাবে এই সেই রুপসা যে একদিন ভালো করে মানুষের সঙ্গে কথা বলতে ভয় পেত ।গ্রামের মানুষ এক রকম সহজ সরল তাদের সঙ্গে হেসে খেলে কাটিয়ে দিতে পারতো কিন্তু সজীব যেন চলে যাবার পর তাকে সবকিছু শিখিয়ে দিয়ে গেল ।এতটাই আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পথ দেখিয়ে দিয়ে গেল শেষ পর্যন্ত তার জীবনটা কোন দিকে যাবে? খড়কুটোর মতো ভেসে যাবে না তো ? তার সংসার তার মেয়েকে নিয়ে সে ঠিক রাখতে পারবে? এই টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়েই আজকাল বেশিরভাগ সময়ে তাকে চিন্তাগ্রস্থ করে তোলে।
মধ্য শীতের ভোরে বারবার তার বিশেষ দিনের স্মৃতিটা ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা করছিল নদী। নদীর জলের গভীরতা মাপার চেষ্টা করছিল। কিন্তু তার মনে হয়েছে এই নদীতে যেন  পাক জমে যাচ্ছে।

কবি ফাতেমা হক মুক্তামনি





অচেনা মেয়ে 
 ফাতেমা হক মুক্তামনি

একদিন আমি ভুল পথ ধরে একা একা হাঁটবো
হাঁটতে হাঁটতে তোমার বাড়ির উল্টো পথ ধরে
 চলে যাবো অনেক দূরে, অন্য কারো বাড়ির পথে।
যেতে যেতে আমি অতীতের সবকিছু ভুলে যাবো,
ভুলে যাবো আমি
 পিছনে ফেলে আসা পুরনো দিনের সব কথা।

একদিন আমি সকলের কাছে খুব অচেনা হবো
আমার পরিচয় আড়াল করে
আমি অন্য গাঁয়ের অচিন পড়শি হবো।
সেখানে আমি আমার নাম দেবো "অচিন মেয়ে"। 
আমাকে তোমরা কেউ কোথাও খুঁজে পাবেনা
কেউ জানাতেও পারবেনা 
আমি অচিন গাঁয়ের, অচিন মেয়ে হয়ে 
কোথায়, কেমন আছি।

আমি জানি 
একদিন তোমরাও আমাকে একদম ভুলে যাবে 
কেউ আর এখনকার মতো
শিওরে রাখবেনা আমার লেখা বইপত্র। 
অযথা বারান্দায় বসে বসে
কেউ আর পড়বেনা, আমারই লেখা অসংখ্য  কবিতা।
মুঠোফোনে আমার লেখা গান বাজিয়ে আনমনা হয়ে, কেউ আর থাকবেনা দক্ষিণের  জানালায় দাঁড়িয়ে। 
কেউ আর ক্ষণেক্ষণে আমাকে ডাকবে না 
সেই চেনা নাম ধরে
আমার দেয়া রুমাল, বুকপকেটে রেখে
 কেউ আর বলবে না,  তুমি এখন কোথায় আছো?

আমি জানি 
একদিন আমি কালের যাত্রায় ভেসে ভেসে
সকলের কাছে ধূসর স্মৃতি হয়ে রবো। 
আমার শূন্যস্থানে শিকড় গেড়ে বসবে
অসংখ্য জানা-অজানা পাহাড়ি বা সমতলের বৃক্ষ ,
আমার অস্তিত্বে শ্যাওলা জমে জমে 
সেখানে ফুটবে অসংখ্য লাল, নীল পদ্ম।
আমার অবর্তমানে 
তোমরা আবার উৎসবে মাতবে
নতুন কারো আগমনে।

কবি সোলেমান রাসেল এর কবিতা





দুঃখিত মৃত্যু'তে
সোলেমান রাসেল 

যদি দুঃখিত মৃত্যুতে হয় অপবাদ 
যাতনার শোকে দাও দেহখানা পুড়ে,
জন্ম সুর চিহ্নে যদি কালো দাগ লেগে 
সন্ধ্যার গহীনে দাও কালো নাম মোড়ে।

যদি বিসর্জন হই সন্ধ্যার তারায় 
তারা হয়ে বেঁচে থাকো আলোক সাড়ায়।

যদি মুখ ফুটে বলি মিছিলের শ্লোক
অভয়ের পাঠ করি সত্যের আশায়,
হলদের ঐ পাতা ঝরি-- বসন্তের ডাকে 
বৈশাখী তুফান হও নির্ভীক ভাষায়। 

যদি অভিযোগ হয়, কোনো একরতি 
জ্বালো না কখনো আর সে মোমের বাতি। 

যদি আগমনি হয়, প্রতিবাদে ফেরা 
ক্ষুধার্ত জীবন হবো- রিক্সার চাকা'য়, 
রক্তের গন্ধ শুকায়ে ঘাম ফোটা ঝড়ি
জেগে ওঠো মানচিত্র স্বপ্নিল আঁকায়। 

যদি ফুল সম ফুটি কুঠির মিনারে 
গুণ হয়ে বেঁচে থাকো- বারাক দীদারে। 

যদি কাষ্ঠে ফাঁসি হয়, মজলুমি কণ্ঠে 
জল্লাদের তৃষ্ণা ছুবো- রশি করে প্রিয়,
পথ হয়ে এঁকে যাই যুগান্ত মুক্তিতে
শহিদের রক্ত ছুঁয়ে স্বীকারোক্তি দিও। 

যদি বুটের আঘাত চেপে ধরে বুকে-
জল হয়ে ঝড়ে যাবো আকাশের চোখে।

শামীমা আহমেদ / পর্ব ৫৩





শায়লা শিহাব কথন 


অলিখিত শর্ত 
(পর্ব ৫৩)

শামীমা আহমেদ 


ওপ্রান্ত থেকে রিশতিনার স্বর ভেসে এলো
---শিহাব তুমি কি আজ আসবে না?আমি তোমার অপেক্ষায়। 
----আমিতো আসার কোন প্রয়োজন দেখছিনা।কেন অযথা  অপেক্ষা করছো?
---তাহলে তোমার জীবনে আমার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে?
---যেটা দুস্প্রাপ্য সেটার আশা ছেড়ে দেয়াই ভালো।আর তুমিতো জানো আমি খুব গোছানো একজন মানুষ। 
---হ্যাঁ,সে আমি জানি আর এও বুঝতে পারছি,তোমার জীবনে এমন কারো আগমন ঘটেছে যে তোমায় এতটা শান্ত রেখেছে।
---তোমার জীবনও নিশ্চয়ই শূন্য হয়ে রয়নি?আর আমার জীবনে যাই ঘটুক,আমার সন্তান আমার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান!
সন্তানের কথা বলাতেই রিশতিনা যেন আরো কিছু জানতে আগ্রহী হয়ে উঠলো! 
আমাদের ছেলে দেখতে কার মতো হয়েছে?
কি নাম রেখেছো তোমরা?
শিহাব খুবই বিরক্তভরা স্বরে উত্তর দিলো,
আচ্ছা রিশতিনা,আমি এখন রাখবো। অনেক কাজ পড়ে আছে।বাই।
রিশতিনাকে আর  কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে শিহাব দ্রুতই কল কেটে দিলো।
রিশতিনা একেবারেই অপ্রস্তুত হয়ে গেলো
শিহাব তাকে এড়িয়ে চলতে চাইছে।অথচ তার জন্য কতইনা ভালোবাসার প্রকাশ ছিল একসময়! অবশ্য এতটা ভালবাসার সঠিক মূল্যায়ন সে করতে পারেনি।পরক্ষণেই রিশতিনা ভাবলো,আমিওতো কম বড় রিস্ক নেইনি।সেই আঠারো বছরের একটি মেয়ে কতটা সাহসিকতা আর বিশ্বাসের উপর ভর করে একজনের হাত ধরতে পারে।তার জন্য বাবা মাকে ত্যাগ করতে পারে।তবে সবই নিয়তি! 
সব কিছুই আজ অতীতের।  ব্যরিস্টার বাবার প্রবল চাপে,জীবনে উচ্চশিক্ষার প্রয়োজনে তাকে বাবা মায়ের করায়ত্ত্ব হতে হয়।নিজের সন্তানকে ফেলে যেতে হয়।এত বছর চোখের দেখাটাও হয়নি। বাবা মায়ের ইচ্ছা পূরনে রিশতিনা ইংল্যান্ডে এল এল বি,এল এল এম কমপ্লিট করেছে। এখন ব্যরিস্টারি ডিগ্রির জন্য বাকী জীবন ন্যস্ত করতে হবে।দূর প্রবাসেও বাবা মায়ের তীক্ষ্ণ নজরিদারির মধ্যে রিশতিনার দিন কাটে।একরকম বন্দী দশায় জীবন কাটানো। ছকে বাধা চলমান জীবনে হঠাৎই একদিন রিশতিনার বাবার কোলন ক্যান্সার ধরা পরে।একেবারে খুবই অল্প সময় চিকিৎসার সুযোগ রেখে তা সারাদেহে ছড়িয়ে পড়ে। বাবার মৃত্যুকে খুব সহসা খুব কাছ থেকেই দেখলো রিশতিনা৷ তিনদিন আগে বাবার মৃতদেহ নিয়ে দেশে ফিরেছে রিশতিনা।কুমিল্লায় গ্রামের বাড়িতে তার দাফন সম্পন্ন হয়।আজ চার বছর পর রিশতিনা দেশে এলো তবে বাবার মরদেহ নিয়ে। কোথায় গেলো আজ সেই দম্ভ আর দাপট! সবই একদিন ফুরায়।মাঝে কেবল কিছু জীবনকে তছনছ করে দেয়া।রিশতিনা  বাবামায়ের একমাত্র সন্তান তাকেই সব দেখতে হচ্ছে। মাকে নিয়ে ওরা গুলশানের নতুন বাসায় উঠেছে।ঝিগাতলার বাড়িটা এখন পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে আছে। রিশতিনার সন্তানকে শিহাবদের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে জাঁদরেল ব্যরিস্টার সাহেব স্ত্রী কন্যাকে নিয়ে লন্ডন প্রবাসী হয়ে যান।রিশতিনার মনে আজ একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খায়। পিতামাতার কাছে উচ্চশিক্ষা আর জীবনে স্ট্যাবলিস্টড হওয়া কি সন্তানদের আবেগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ? অবশ্য
সন্তানকে লালন পালন করে তাদের কাছে পিতামাতার কিছু চাওয়া থাকতেই পারে সেটা কোন অন্যায় কিছু নয় কিন্তু কেন তবে আবেগ এসে সব কিছুকে ওলোট পালোট করে দেয়? রিশতিনা আজো এই দ্বিধা দ্বন্দের কোন উত্তর খুঁজে পায়না। রিশতিনার মায়ের জীবনে তার বাবার ভীষণরকম প্রভাব আর মাও তাতে একেবারেই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। অবশ্য এটা অভ্যস্ত হওয়া নয় এটা একপ্রকারের বশ্যতা।কিন্তু রিশতিনার জীবনে যতটুকু সময়ই সে শিহাবকে পেয়েছে শিহাব সবকিছুর সিদ্ধান্ত রিশতিনার উপরই ছেড়ে দিয়েছিল।রিশতিনার প্রথম প্রেম শিহাব।শিহাবকে ভুলে যাওয়া তার পক্ষে কোনদিনই সম্ভব নয়। এত বছরেও শিহাবকে সে এক মূহুর্তের জন্য মন থেকে সরাতে পারেনি।

শিহাবের প্রস্তাবে রাহাত বেশ ভাবনায় পড়ে গেলো।আপুকে শিহাব ভাইয়া তাদের জিগাতলার বাসায় নিয়ে যেতে চাইছেন। এতে তার সম্মতি থাকলেও মায়ের অনুমতিটা তো নিতে হবে।আর এক্ষেত্রে মাকে এখন পুরো ঘটনা বিস্তারিতভাবে জানানোর সময় হয়েছে।তাছাড়া মাকে তো সব জানতেই হবে। রাহাত অফিস থেকে ফিরে রাতের খাবার খেয়ে নিয়ে মায়ের ঘরে চলে এলো।মা একটু অবাক হলেও বুঝতে পারলো রাহাত কিছু বলতে চাইছে। রাহাতের আগমন, শায়লার লুকোচুরি, রুহি খালার কানাডার খবর নিয়ে আসা, বড় জামাই নোমান সাহেবের দেশে আসা সবকিছুই মায়ের কাছে নান্সন প্রশ্ন চিহ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।  আর সেদিন শিহাব নামটিও শুনেছে।যদিও তার সন্তানদের প্রতি তার অগাধ বিশ্বাস। রাহাত ,শায়লা ও শিহাবের ব্যাপারে মাকে একেবারে আদ্যোপান্ত সব খুলে বললো।একেবারে ওদের পরিচয় থেকে শুরু করে শিহাবের চার বছরের ছেলে আরাফ পর্যন্ত! সব শুনে মা ভীষণ আতংকিত হয়ে উঠলো! একদিকে মেয়ের মনের চাওয়া আরেকদিকে নিচতলার রুহি খালার কাছে তার এতদিনের মাথা উঁচু করে চলা শত সাহায্য নিলেও সম্মানের সাথে তা গ্রহন করা আজ যেন সবই ধুলায় মিশে গেলো।বিবাহিত মেয়ে অন্য পুরুষের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া এতো একরকম ব্যভিচার! রাহাত মাকে ধীরে ধীরে সব বুঝালো।দিনে দিনে এই পরিবারের জন্য আপার কত স্যাক্রিফাইস, সেটার কতটুকু মূল্য আমরা দিয়েছি।কোন কিছু না ভেবেই রুহি খালার কথামতো আপুর চেয়ে অনেক বয়সের ব্যবধানের একজনকে আপুর জীবনসঙ্গী করেছি।আপুর মন মতামত কিছুই জস্নতে চাইনি।রাহাত মাকে বুঝালো আপুর সারাজীবন এখনো পরে আছে।বিবাহিত জীবনে আপু অসুখী হউক সে স্মরা চাইনা মা।তাহলে আমার এত শিক্ষা,চাকরী সম্মান অর্জন সবই বৃথা হবে।
মা যেন কিছুটা বুঝের মধ্যে এলো।
অস্ফুট স্বরে কেবল বললো,নোমান সাহেব কি এটা মানবেন?
দেখা যাক কি করা যায় মা।আপা তাকে ডিভোর্স দিবেন। তার দুটো সন্তান আছে এই তথ্য গোপন করার অভিযোগে। প্রয়োজনে আমরা আইনের আশ্রয় নেবো মা।আপুকে অমন দূরদেশে পাঠিয়ে দুশ্চিন্তায় আমাদের ঘুম হবে না মা।তুমি রুহি খালাকে আমাদের এইসব কথা কিছুই জানাবে না। রাহাতের সরলমনা মা,তক্ষুনি দুহাত উপরে তুলে মহান আল্লাহতায়ালার কাছে সবকিছুর জন্য ক্ষমা চাইলেন আর এইসব জটিলতার সুষ্ঠু সমাধান চাইলেন।

শায়লা শিহাবদের জিগাতলার বাসায় যাওয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে।
একটু আড়ষ্ট লাগছে।কিন্তু শিহাব অভয় দিয়েছে। তাছাড়া আরাফকে দেখতে ভীষণ মন চাইছে।রাহাতের আজ অফিস থেকে ফিরতে বেশ দেরি হচ্ছে।হয়তো অনেক কাজের চাপ পড়েছে।কিন্তু আজ আর কোনকিছু ফোন করে জানায়নি।রাত সাড়ে নয়টা বাজতে চললো। শিহাবের সাথেও আজ সারাদিন কোন কথ্য হলো না।সেই সকালে মেসেজ রেখে গেছে।যাক হয়তো ব্যস্ততা বেড়েছে। খুব শীঘ্রই হয়তো শায়লার জীবনে বিরাট একটা পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। শি্ব এই বিষয়টিতে বেশ সিরিয়াস হয়ে উঠেছে।আসলে একাকীত্ব এক সময় অসহ্য হয়ে উঠে।মানুষকে ক্ষতবিক্ষত করতে করতে তখন নিজ থেকেই স্বস্তি খুঁজে ফেরে।যেই শিহাব পরিচয়ের শুরুতে কিছু অলখিত শর্তে শায়লার সাথে দেখা দিয়েছিল আজ সেই শর্ত যে কোথায় ভেসে গেলো! শিহাব শায়লার জন্য একেবারে মরিয়া হয়ে উঠেছে।শায়লার এক বোবাপ্রাণীর মত দিন কাটাতো।বিয়ের পর নোমান সাহেব কল দিলে শায়লা কি কথা বলবে  কোন কথাই খুঁজে পেতো না আর নোমান সাহেব বাংলায় কথা বলায় অতটা স্বচ্ছন্দ ছিল না। দীর্ঘ দিন বিদেশ জীবনে বাংলা বলা প্রায় ভুলেই গেছে। ভাষার বাধা থাকলে মনের ভাব কি আর প্রকাশ করা যায়? তাছাড়া নোমান সাহেবের তো শায়লার মন বুঝার প্রয়োজন নেই, তার বাচ্চাদের দেখভালের জন্য শায়লাকে প্রয়োজন। শিহাব আর নোমান সাহেবের মাঝে এতটাই পার্থক্য যে শায়লা বুঝে উঠতেভপারেবনা কেন বা কি ভেবে তার মা ভাই তাকে এই বিয়েটায় সম্মতি দিলো? 
দরজায় কলিংবেল হলো।শায়লার এলোমেলো ভাবনায় ছেদ পড়লো।ডাইংএর ঘড়িতে রাত দশটা।বেশ রাত হয়েছে।মাকেও খাবার দিতে হবে। আজ বেশিই দেরি হয়ে গেলো। রাহাত বেশ হাসিমুখে বাসায় ঢুকলো আর শায়লার দিকে তাকিয়ে রহস্যময় হাসি দিতে লাগলো।হাতের ব্যাগটা রেখে শায়লার দুই হাত ধরে আনন্দে দুলতেব্লাগলো! শুধু নাচতে বাকী।মা আর শায়লা রাহাতেরভেই কর্মকাণ্ড দেখে হেসে কুটিকুটি। কি হলো? কি হয়েছে বলবি তো? কি প্রমোশন হয়েছে? শায়লার জিজ্ঞাসায় রাহাত বলে উঠলো হু তবে  তার চেয়েও বেশি কিছু!
মা আর শায়লা মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলো।এবার মা এক কড়া ধমক লাগালো,বলবিতো কি হয়েছে? অমন ব্যাঙের মত লাফাচ্ছিস কেনো? 
এবার রাহাত হুশে এলো! বললো,জানো আপু এতক্ষন কার সাথে ছিলাম আমি? 
এতক্ষন শিহাব ভাইয়ার সাথে ছিলাম।প্রায় দুই ঘন্টা।অফিসের গাড়ি থেকে  এইতো আর্টিসানের উপরে  রেস্টুরেন্টটায় বসে কথা বললাম।ওখানে  টেবিল টপে শিহাব ভাইয়া যেতে বলেছিল।কফি আর ডেসার্ট খাওয়ালো।আরো অনেককিছু খাওয়াতে চাইলো। আমি রাজী হইনি।আপু শিহাব ভাইয়া দারুন করে কথা বলে।খুবই মন খোলা প্রাণ খোলা মানুষ। আজকের দেখা কিন্তু মনে হলো অনেকদিনের চেনা।অনেক আপন হয়ে গেলো খুব তাড়াতাড়ি।তার বাইকে আমাকে বাসায় নামিয়ে দিলো।আসলেও আপু, শিহাব ভাইয়াতো সত্যিই একটা হিরো!! রাহাতের কথায় শায়লা খুবই লজ্জা পাচ্ছিল।মা দূরে দাঁড়িয়ে সব শুনে ঘরে চলে গেলো।ভাইবোনের এই সব কান্ডকারখানায় মা ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলো। 
রাহাত একটু স্বাভাবিকে ফিরে এলো। শান্ত হয়ে বললো, আপু,খাবার দাও।আমি একটু শাওয়ার নিয়ে আসছি। কাল সকাল দশটায় শিহাব ভাইয়া তোমাকে নিয়ে জিগাতলার বাসায় যাবে।তুমি তৈরি থেকো।শায়লার মনের ভেতর এক অনাবিল আনন্দের ঢেউ বয়ে গেলো! বারবার শিহাবের মুখটা মনের মাঝে শায়লার নাম ধরে ডেকে যাচ্ছে।শায়লা রান্নাঘরে খাবার আনতে এগিয়ে গেলো।


চলবে....

মনি জামান



ধারাবাহিক উপন্যাস



সেদিন গোধূলি  সন্ধ্যা ছিল
৩ য় পর্ব 

মনি জামান


খোলা মাঠ মাঝখান দিয়ে একটি সরল রেখা যেন চলে গেছে ট্রেন লাইন,চারিদিক গাছের সারি যেন ওদের সাথে ছুটে চলছে।
গ্রামের পর গ্রাম যেন অতীত হয়ে যাচ্ছে,ঝিরি ঝিরি বাতাস নিলয় আর মেবিনের চুল গুলো এলোমেলো করে দিচ্ছে,বিকেল হয়ে গেলো কখন টের পাইনি ওরা দু'জন,মাঝে মাঝে ট্রেনের ঝাকুনি ওদের কে নাড়িয়ে দিচ্ছে।
মেবিন নিলয়ের গা ঘেঁষে বসলো,নিলয় বাম হাতে মেবিনের গাড়ের উপর হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরছে,ওরা আজ এত কাছাকাছি যে আগে কখনো এভাবে একসাথে হয়নি।সূর্য অস্ত যেতে আর বেশি সময় নেই,ট্রেন ছুটছে গন্তব্য কক্সবার।
ধীরে ধীরে সূর্য ডুবার আয়োজন সম্পন্ন করছে কিছুক্ষণ পর সূর্য ডুব দিলো,আস্তে আস্তে সন্ধ্যা গ্রাস করছে দিনকে,অন্ধকার নেমে আসলো।
দুরের গ্রাম গুলোয় মিটি মিটি আলোর মিছিলে যেন পরিণত হয়ে গেল মহুর্তে,এ যেন এক অপূর্ব আলোর দ্যুতি ওদের চোখ দুটোকে আটকে রেখেছে,মাঠের দুপ্রান্তে গ্রাম আর গ্রাম এমন ভাবে কখনো দেখা হয়নি মেবিন আর নিলয়ের।
আজ দুরের মিটি মিটি আলো গুলো গ্রামের পর গ্রামকে করছে যেন স্বর্গ রাজ্য,
মেবিন নিলয়কে জড়িয়ে ধরে আবেগ ঘন হয়ে বলল,নিলয় আজ এত ভালো লাগছে কেন বলতে পারো ঝিরি ঝিরি বাতাস দুজনকে আজ মাতাল করেছে।দুজন দুজনকে জড়িয়ে আছে,আরো অন্ধকার হলো চারপাশ নিলয়ের ভিতর কি যেন একটা বুনো স্বভাব ধীরে ধীরে মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো এবং সমস্ত শরীরে কি একটা প্রাপ্তির নেশায় সেটার যেন ছুঁয়ে দিতে ব্যাকুল।
নিলয়ের সমস্ত শরীরে বিদ্যুৎ প্রবাহ শুরু হলো মনের অজান্তেই মেবিনের ঠোটে চুম্বন করলো,আজ কোন লজ্জা শরম শান্ত ছেলে নিলয়ের ভিতর নেই,মেবিন ও নিলয়কে জড়িয়ে ধরে চুম্বন করলো মেবিনের ভিতর ও তোলপাড় শুরু হয়েছে।মেবিন নিলয়ের ঠোট দুটি স্পর্শ করলো তারপর পরস্পরকে আলিঙ্গ করলো এক আদিম উন্মাদনায় ডুবলো দুজন,দুজনের শ্বাস-প্রস্বাশ আর বুকের উঠানামা যেন উত্তাপ ছড়াচ্ছে,ধীরে ধীরে দুজন দুজনকে পাগলের মত জড়িয়ে ধরে কাছে আরো কাছে নিতে ব্যাকুল।আজ নিজের মত করে নিলয় অনুভব করলো মেবিন যেন সঙ্গমরত বিষধর গোখরো,দুচোখ মুখ সব লাল হয়ে গেছে,যেন অনন্তকাল ধরে জড়িয়ে আছে নিলয়কে।
নিলয়ের ভিতর ও আজ কোন ভদ্রতা নেই নম্র-স্বভাব গুলো সব অনুপস্থিত,আজ সাহসী এক পুরুষে পরিণত হয়েছে সে।
ট্রেন ঝিক ঝিক শব্দ তুলে তখন রাতের বুক চিরে ছুটে চলেছে,দুরে কোথাও এক ঝাক বুনো শিয়াল হুকাহুয়া চিৎকার করে ডেকে উঠলো,ঝক ঝকে আকাশ মিটি মিটি তারার অপূর্ব মিছিল রাতকে করেছে আরো গাঢ় আরো সুন্দর।
প্রকৃতির সব সৌন্দর্য আজ যেন প্রকাশ করছে অকৃপণের মত প্রকৃতি,কিছুক্ষণের মধ্যে চাঁদ উকি দিল,প্রকৃতি আলোময় হয়ে উঠলো,নিলয় আর মেবিন আজ উন্মাদ ওদের দু'জনের শ্বাস উঠানামা করছে খুব দ্রুত,দুজন দুজনকে এমন ভাবে জড়িয়ে আছে যেন কোন গুল্ম কোন বৃক্ষকে জড়িয়ে আছে অনন্তকাল ধরে।
আজ দুজন দুজনকে নতুন করে আবিস্কার করছে,নিলয় মেবিনের সমস্ত শরীর আস্তে আস্তে স্পর্শ করলো,মেবিনও নিলয়কে আদর করে আরো কাছে টেনে নিলো দুজনে যেন ঠিক এই মুহুর্তটার জন্য এতদিন ধরে অপেক্ষায় ছিল,ঈশ্বর প্রাপ্ত এক আদিম নেশায় পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে সেই চিরচেনা বাসনা পূর্ণ করার সংকল্প নিয়েছে আজ।কতক্ষণ ওরা পরস্পর জড়িয়ে ছিল ওরা নিজেরাই জানেনা,হঠাৎ নিলয় ও মেবিনের কানে ভেসে এলো ভোরের ফজরের আযানের ধ্বনি।
ওরা অবাক হয়ে গেলো সকাল হয়ে গেছে টেরই পাইনি!নিলয় মেবিনকে ডেকে বলল,এই কাক পাখি সকাল হয়ে গেছে ফজরের আযান হচ্ছে আমরা বোধয় পৌছে গেছি।
মেবিন চোখ মেললো এবং ঘড়ি দেখে বলল,আর আধা ঘন্টার ভিতর আমরা পৌছে যাব,নিলয় বলল,আমরা কোথায় উঠব হোটেলে?মেবিন বলল,আমার বান্ধবী চারুদের বাড়ি উঠব চারু আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।
নিলয় বলল,আমাকে আগে বলনি কেন কাক পাখি,মেবিন স্বভাব সুলভ সেই মিচকি হাসি দিয়ে বলল,এটা তোমার জন্য সারপ্রাইজ ছিলো বলে আমার পাগলু।নিলয় একটু অভিমানের সুরে বলল,আমাকে বলতে হতো,মেবিন নিলয়ের নাক টেনে আদর মাখা কন্ঠে বলল, হয়েছে আর পানসে অভিমান নয় এবারতো বললাম তোমাকে।
নিমেষেই নিলয়ের সব অভিমান উধাও হয়ে গেলো,নিলয়ও হেসে বলল,হুম খুব চালাকি আমার সাথে তাই না? বলেই নিলয় মেবিনকে একটু আদর করে চোয়াল টেনে দিলো,মেবিনও বলল,হয়েছে আর না স্যার সারারাত অনেক তো হয়েছে।নিলয় প্রশ্ন করলো মেবিনকে সারারাত কি হয়েছে কাক পাখি,এবার দুজনই হেসে উঠলো,ট্রেন ছুটছে আর মিনিট তিনেক লাগবে ওদের স্টেশনে পৌছাতে,ওরা অপেক্ষায় আছে স্টেশনে কখন থামবে ট্রেন।
মেবিন ঘড়ি দেখে নিলয়কে বলল,এইতো এখন ট্রেন থামবে পৌছে গেছি তুমি ব্যাগ দুটো নাও,বলতে বলতেই ট্রেন স্টেশনে এসে দাঁড়ালো।যাত্রীরা সবাই নামছে মেবিন আর নিলয় ওদের ব্যাগ পত্র নিয়ে নেমে পড়লো স্টেশনে।
নেমেই নিলয় মেবিনকে বলল,চলো যাওয়া যাক কাক পাখি,মেবিন বলল,না এখানে অপেক্ষা করতে হবে চারু গাড়ি নিয়ে আসবে আমাদের নিতে,নিলয় বলল,চলো তাহলে স্টেশনের ঐ বেঞ্চটায় গিয়ে বসি,মেবিন বলল,চলো নিলয়।
মেবিন আর নিলয় বার বার ঘড়ি দেখছে বেঞ্চে বসে,আর অপেক্ষা করছে মেবিনের বান্ধবী চারুর জন্য,চারু কখন আসবে ওদের দুজনকে নিতে।

চলবে...