উপন্যাস
টানাপড়েন ১৪৫
বাতাসে বহিছে বসন্ত
মমতা রায়চৌধুরী
১৯.৩.২২ সন্ধ্যে ৭. ৫৬
বিয়ে বাড়িতে বেশ দুদিন আনন্দ করে বাড়িতে ফিরে এসে রেখার কাজ আরো বেড়ে গেছে। এত জামা কাপড় সমস্ত কাঁচা ধোয়া ,কিছু লন্ড্রিতে পাঠানো। অন্যদিকে স্কুল আবার একদিকে লেখা পাঠানো আর সঙ্গে রয়েছে ক্লান্তি। সবমিলিয়ে রেখার অবস্থা খুব টাইট হয়ে গেছে। এতগুলো দিক সামলাতে হচ্ছে। এর মধ্যে সামনে আছে বসন্ত উৎসব। রেখাই বড়দিকে প্রস্তাব দিয়েছে। বিদ্যালয়ে প্রাক বসন্ত উৎসব করার জন্য । ফলে আর দুদিন মাত্র বাকি আছে ,এর মধ্যেই প্রস্তুতি সারতে হবে, তাই আগে খাতাটা খুলে বসলো কোন কোন মেয়ে গানে আছে, কোন কোন মেয়ে নাচে আছে সেই সমস্ত মেয়েদের ফোন নম্বর বের করে ফোন করতে শুরু করলো। মেয়েরা তো বসন্ত উৎসবের নাম শুনে আনন্দ উল্লাসে ফেটে প পড়ল ।প্রথমে ফোন করলো নন্দিনীকে 'হ্যালো ,হ্যালো"।
ওদিক থেকেও বলল" হ্যালো:।
এটা কি নন্দিনীর ফোন নাম্বার?
হ্যাঁ ,কে বলছেন?
"আমি স্কুল থেকে ওর মিস বলছি।"
"ম্যাম বলুন ।আমি নন্দিনীর মা বলছি।।"
"বলছি নন্দিনী আছে ?ওকে একটু দেয়া যাবে?"
"দেয়া যাবে ।আপনি ধরুন আমি ওকে ডেকে দিচ্ছি।'
"নন্দিনী, নন্দিনী, তোমার ম্যাম ফোন করেছেন তাড়াতাড়ি এসো।"
"যাচ্ছি ফোনটা রিসিভ করে বলল" হ্যাঁ ম্যাম বলুন।"
"বলছি সবই তো তোমাদের মোটামুটি রেডি থাকে অনুষ্ঠানের জন্য।তবে এবার ভাবছি একটা অন্যরকম আমরা উৎসব করবো বিদ্যালয়ে। এবার বসন্ত উৎসব করব ।"
"কি মজা ,কি মজা।"
হ্যাঁ রে, তাইতো বলি '
"বসন্তের বাতাস ডাক দিয়ে যায়
ফাগুন এসেছে হায় ।
আর ঘরে বসে নয়,
এসো দোলের রঙে রাঙিয়ে যাই।"
"ম্যাম কি সুন্দর বললেন কবিতার লাইন এটা কার কবিতা।"
রেখা একগাল হেসে বলল
"আরে পাগলি এটা আমি এক্ষুনি কবিতাটা ছড়ার আকারে আমিই বললাম।"
"ম্যাম আপনি?
কি সুন্দর বললেন কি ভালো লাগছে।"
ঠিক আছে শোন
"তোমাদেরই তো সব রেডি করতে হবে ।তা তোমাদের যে সমস্ত গানের মেয়ে আছে তুমি একটু কন্টাক্ট করো ,নাচের মেয়েদের সঙ্গেও, ঠিক আছে।"
"আমাদের অনেক দিনের সুপ্ত ইচ্ছা ছিল আমাদের বিদ্যালয়ে বসন্ত উৎসব হোক আপনি আমাদের সেই ইচ্ছে গুলো পূরণ করছেন। থ্যাঙ্ক ইউ ম্যাম।"
"ঠিক আছে, আগে ভালোভাবে অনুষ্ঠানটা
নামাও।"
" হ্যাঁ ,ম্যাম আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। আমি এক্ষুনি আমার কাছে যে সমস্ত আমাদের ক্লাসের মেয়েদের নাম আছে বা অন্য ক্লাসে যাদের যাদের সঙ্গে আমরা একসঙ্গে প্রোগ্রাম
করি মোটামুটি স্কুলে ।তাদের সঙ্গে কন্টাক্ট করে নিচ্ছি ।"
"কালকে তাহলে স্কুলে গিয়ে কিন্তু এর রিহার্সাল হবে কেমন ?সব বসন্তের উপর গানগুলো করবে। ভালো থেকো সবাই।"
আমাদের অনেকদিনের সুপ্ত ইচ্ছা আপনি পূরণ করছেন ম্যাম আপনাকে এজন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।
ঠিক আছে তোমাদের মনের ইচ্ছে গুলো পূরণ যাতে হয় সেই দিকে নজর দেওয়াইতো আমাদের লক্ষ্য ।তাই না?"
হ্যাঁ ম্যাম। আমরা প্রত্যেকে আপনাকে খুব ভালোবাসি ম্যাম।"
"তোমরাও আমার কাছে ভালোবাসার স্নেহের পাত্রী।"
"হ্যাঁ রে, আর কোন সময় নষ্ট নয়। বেশি সময়ও তো নেই আমাদের কাছে ।তাই না ?তুমি যোগাযোগ করো মেয়েদের সঙ্গে। আর আমিও কিছু করি ।তুমি আমাকে জানিও কেমন?"
" ঠিক আছে ম্যাম।"
"ফোনটা কেটে দিতেই ফোন আসলো।রেখা শুকনো জামা কাপড় গুলো ভাঁজ করছিল ।এই সময় আবার কে ফোন করল?
"হ্যালো।"
"ম্যাডাম।"
" ও আপনি? "
'আমার লেখা রেডি আছে। আমি পাঠিয়ে দেব। "
কথা শুনে হো হো হেসে সম্পাদক বললেন
" আমি জানি আপনার লেখা রেডি থাকবে। আমি একটা অন্য ব্যাপারে ফোন করেছি।"
"রেখা একটু আশ্চর্য ও কৌতুহলী হয়ে বলল' অন্য ব্যাপার !কি বলুন তো? '
সম্পাদক হেসে বললেন' সেরকম ভয়ানক কিছু নয়।সামনে বসন্ত উৎসব। বসন্ত উৎসবের ওপর কিছু লিখুন"
রেখা একটু জোরে শ্বাস টেনে নিয়ে বলল'। ও আচ্ছা আচ্ছা।'
"সবাই ভালো আছেন তো আপনারা ?"
"হ্যাঁ ভালো আছি।"
" আপনি?"
"আপনারা ভালো ভালো লেখা পাঠাচ্ছেন ।ভালো না থেকে পারি। ভালো লেখা না পেলেই তো মনটা খারাপ হয়ে যায়।"
রেখা এক গাল হেসে দিল।
"এরকম হাসি খুশি থাকুন, "
"রাখছি তাহলে ম্যাডাম'।
Ok
রেখা দৌড়ে ছাদে চলে আসলো। আরো কিছু জামা কাপড় রয়েছে সেগুলোকে তোলার
জন্য ।ছাদে একটা মিষ্টি হাওয়া বইতে শুরু করেছে । বসন্ত আসলে এরকমই মন প্রাণ জুড়ে যেন বসন্তের বাতাস বইতে থাকে। লেখার ছাদে গুনগুন করে গাইতে লাগলো। বাতাসে বহিছে প্রেম, নয়নে লাগিল নেশা, কারা যে ডাকিল পিছে।বসন্ত এসে গেছে।সবার বাড়ির ছাদের জামাকাপড় কেউ না কেউ তুলছে। রেখা ছাদ থেকে দেখছে পাশেই গঙ্গা নদী বয়ে চলেছে ।সেই জলের ধারাটার দিকে তাকিয়ে রেখা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো আর ভাবল জীবনের চলার নামই গতি। ঠিক যেমন নদী বয়ে চলে। সহস্র শৈবাল দাম আর পঙ্কিলতা যেদিন তাকে গ্রাস করে তখন তার গতি হারিয়ে ফেলে ।তখনই যেন সে সমস্ত কিছুতে রুদ্ধ হয়ে যায়। মানুষের জীবনটাও ঠিক একই রকম জীবনের গতি যদি রুদ্ধ হয়ে যায়, তখনই জবুথবু হয়ে যায়। রেখা ভেতরে দিক থেকে খুবই উইক ফিল করে। বেশ কয়েকদিন ধরেই শুধুমাত্র মনের জোরে এগিয়ে চলেছে। ও জানে এর গতি থামিয়ে দিলে সে একেবারে পড়ে যাবে ।ছোটন্ত ঘোড়া যেদিন বসে যায় সেদিন যেমন তার চলার কোন আর গতি ফিরে পায় না ।তাই সে মনের জোরে চলছে ডাক্তার দেখাতে যাবে যাবে করছে কিন্তু পেরেই উঠছে না ।কিছু না কিছু কাজ পড়ে যাচ্ছে। নদীর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে জামা কাপড় গুলো তুলে নিচে নেমে আসলো ততক্ষণে অনেকটা সময় কেটে গেছে নিজেকে নিয়ে বেশ খানিকটা সময় আজকে রেখা দিয়েছে ভাবার কিন্তু না ,গোধূলির ম্লান আলো ক্রমশ সরে যাচ্ছে অন্ধকার হয়ে আসতে চারিদিকে। সন্ধ্যে দিতে হবে।
ছাদ থেকে নেমে আসলো। নেমে আসতেই মনোজ বলল "এতক্ষণ কি করছিলে ছাদে?"
রেখা খুব মিষ্টি করে হেসে বলল নিজেকে আবিষ্কার করছিলাম বসন্ত বাতাসে গো।'
মনোজ বলে "মাঝে মাঝে যে তুমি কি বলো না? চা দেবে এখন?"
"কি ব্যাপার মহাশয়, আজকে এত তাড়াতাড়ি চা চাইছো?"
"চায়ের নেশা চেপেছে।।
সুরোদের ওখানে গিয়ে না হাবিটটা কেমন বদলে গেল দেখো ।"
"সত্যি ঠিকই বলেছ? কি করে যে দিনগুলো কেটে গেল।"
"বেশ ভালো সময় কাটালে বলো?"
"তা অবশ্য ঠিক বলেছ। এত ব্যস্ততা, কর্ম ক্লান্তি সব মিলিয়ে মিশিয়ে এইটুকু যেন রিফ্রেশমেন্ট এর দরকার ছিল।"
"একদমই তাই।"
"এই জন্যই তোমাকে মাঝে মাঝে বলি হাজবেন্ড ওয়াইফ এর মাঝে মাঝে কোয়ালিটি টাইম স্পেন্ড করা উচিত। এদিক-ওদিক বেরিয়ে পড়া..।"
রেখা কথা বলতে বলতেই খেয়াল করল দরজার কাছে রেখার ননদ আর শাশুড়ি মা দাঁড়িয়ে।
চুপ করে যাওয়াতে মনোজ রেখার মুখের দিকে তাকালো, রেখা ইশারায় দরজার দিকে দেখালো।
"তোমরা ওখানে কি করছ মা ,দিদি? ঘরে এসো,?"
বলতে বলতেই মনোজের মা আর দিদি ঘরে আসলো।
মনোজ বেশ ভালো মত বুঝতে পারছে কিছু একটা বলবে।
"কিছু বলবে মা?"
"হ্যাঁ, মানে, কি রে বল মনামি?"
"এত আমতা আমতা করছ কেন? বল কি বলতে এসেছ?"
"বলছি ভাই, আমি তো বেশ কয়েকদিন হল এসেছি ।এবার আমি যাব তা মা কয়েকদিন আমার কাছে থাকুক না ?কি বলছিস?"
"আমি কি বলবো ।বরাবর তো তোমরাই বলে এসেছ ।তোমরাই বল কি করবে?"
"বললেই কি থাকবে ?না যাবে না ,কোনটা?
তাও তো এখন বলতে এসেছ। যাবে কি, যাবে
না ?মাঝে তো তাও বলতে না।"
"ঠিক আছে মা ,তুমি কি চাইছো?"
"না বলছি কি শোন, ও একা যাবে? আমিও যাই ওর সঙ্গে ।কদিন আবার থেকে আসি।₹
"এক জায়গায় থেকে ভালো না লাগলে ,ঘুরে
এসো ।অসুবিধা কোথায়?"
" কবে যেতে চা ই ছো?"
"আগামীকাল?"
"ঠিক আছে তাই হোক।"
"কিন্তু বলছিলাম কি ভাই.. মনামী মাকে ধাক্কা দিয়ে বলল 'তুমি বলো না?'
মনোজ মনে মনে ভাবতে লাগলো কিছু একটা প্ল্যান করেছে এরা।"
"মানে গাড়ী বলে দিস .. "
কথা শেষ না হতেই মনোজ বলল'তাহলে খুব ভালো হয় তাইতো?'
তখন মনামী আর মনোজের মা দুজনেই উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল' হ্যাঁ।'।
ওকে তাহলে" পার্থকে বলে দিচ্ছি।"
ফোন করতে হবে ।ওদের গাড়িটা কি আবার বুক আছে কিনা ,কে জানে?"
রেখা চা করতে চলে গেল। রান্নাঘরে চা করতে করতে রেখা মনে মনে ভাবতে লাগলো কদিনের জন্য একটু হাফ ছেড়ে বাঁচবে।
চা এনে সবাইকে সার্ভ করল। মনোজকে কাপটা ধরিয়ে দিল। তখনও মনোজ ফোন বুক থেকে ফোন নম্বর ঘেঁটে বের করছে ।কারণ যে নম্বরটা সেভ করা আছে ,সে নম্বরটা সুইচড অফ আছে ।অন্য আরেকটা নম্বর দেয়া আছে। সেটা দেখবে এখন। মনোজ ফোন করল ।ফোনে রিং হতে লাগলো।
'হ্যালো'
"পার্থ,আমি মনোজ দা বলছি।"
"হ্যাঁ দাদা বলো।
কদিন তোমরা বাড়ি ছিলে না, না?"
"বিয়ে বাড়িতে গেছিলাম।"
"সব ঠিকঠাক আছো তো?
বৌদির শরীর ভালো আছে?"
"হ্যাঁ,সবাই ভালো আছে।"
শাশুড়ি আর ননদ মুখ ভেংচি কেটে বলল" দেখো এই মেয়ে মানুষটার কথা কেমন নির্লজ্জের মত জিজ্ঞেস করছে।"
ঠাকুর ঘরে যেতে যেতে রেখা কথাটা শুনতে পেল।
"হ্যাঁ যে জন্য ফোন করেছি। কালকে গাড়ি দিতে পারবে?"
"আগামীকাল?"
"হ্যাঁ আসলে মা আর দিদি যাবে ।"
"কোথায়? হালিশহর?"
"হ্যাঁ।"
"আসলে দাদা বিয়ে বাড়ি আছে তো। একটু আমাকে দেখে বলতে হবে। আচ্ছা আমি ড্রাইভারকে ফোন করি? দশ মিনিট সময় দাও দাদা, জানিয়ে দিচ্ছি।"
Ok
ফোনটা রেখে দিল ।মনোজের মা মনোজের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। মনোজের দিদি বলল "তাহলে কি গাড়ি পাওয়া যাবে না ভাই?"
"পাওয়া যাবে না কেন সবারই তো এখন সিজন চলছে ।এবার তোমরা হুট করে বললে কালকে যাবে। দেখি কি বলে?"
মনোজের মা বলল "পার্থর গাড়ি নিতে হবে এমন কি কথা আছে ?অন্য কোন গাড়ি নেই?"
মনোজ বলল "দেখো মা, পার্থ আমাদের বিশ্বস্ত পাশের বাড়ি। ওর গাড়িতেই আমরা সব জায়গায় যাতায়াত করি। নিশ্চিন্ত এবার অন্য অচেনা অজানা একটা গাড়িতে যাবে সেটা ভালো হবে কি?"
মনামী বললো "ভাই তো ঠিক কথাই বলছে মা।"
মনোজের মা চুপ করে গেল।
মনোজ বলল" হ্যাঁ রে , জাইবু তো একবারও ফোন করলো না। এতদিন থাকলি?"
মনামির মুখটা কেমন ফ্ পানসে হয়ে গেল ।
মনোজ সেটা খেয়াল করল মনোজ মনে মনে ভাবতে লাগলো। তাহলে কি দিদি জামাইবাবুর সঙ্গে কোন সমস্যা হচ্ছে ওদের?'
"মুখ ফুটে কিছু বলল না। ও যদি কিছু না বলে ,ওর ও বলাটা ঠিক হবে না। ওরা নিজেরা নিজেদের সমস্যা মিটিয়ে নিতে পারবে ।ভালো।"
মনামী শুধু বলল" হয়তো ব্যস্ত আছে।
তারপর মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল মা চলো গোজগাছ করে নিই। গাড়ি পেলে ভালো ,না হলে ট্রেনে বেরিয়ে যাব।"
মনোজ বলল "কেন কালকেই যেতে হবে আর একটা দিন ওয়েট করলে তোদের কি অসুবিধা হবে।"
"না রে ভাই কালকেই যেতে হবে।"।
মনোজ দেখল "ওর দিদি জোর দিয়ে যখন কথা বলছে, নিশ্চয়ই কোন কারণ আছে ।ঘাটাতে চাইল না।।
"দেখ যেটা ভালো বুঝিস করবি।"
মনামী আর মনোজের মা বেরিয়ে গেল রুম থেকে মনামীর বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধুকপুক করতে লাগলো। কি জানি এখনো কেউ অতী ন রেগে আছে মনামির উপর। কতদিন হয়ে গেল এসেছে একবারও ফোন পর্যন্ত করলো না। পরশু একটা রেকারিং ম্যাচুরিটি আছে।'
"বাড়িতে গিয়ে কি মূর্তি দেখবে কে জানে?"যাই হোক দুগ্গা দুগ্গা দুগ্গা করে যেতে হবে।