উপন্যাস
টানাপোড়েন ১৫১
আনন্দ দোলা
মমতা রায় চৌধুরী
"ছোট বৌদি, ছোট বৌদি', ও ছোট বৌদি'
রান্নাঘর থেকে কাকিমা সাড়া দিল কি হয়েছে রে ভোলা?
"একবার বাইরে এসো না।"
"এখন আমার হাত জোড়া আছে বাইরে গেলে হবে? কড়াইতে খুন্তি দিয়ে কিছু ভাজার আওয়াজ আসলো তুই ওখান থেকেই বল ,আমি কানে শুনতে পাচ্ছি।"
"কানে শুনতে পাচ্ছে বললে তো হবে না। এটা দেখতে হবে এসোই না।"খুশিতে ডগ মগ হয়ে ভোলা বলল।
একটু বিরক্তি নিয়ে রেখার কাকিমা বলল'" মাঝে মাঝে যে এত জ্বালাস না ভোলা, কি হয়েছে বল? একি করেছিস? মাগো কি সুন্দর !আজকাল তো এই মাছ দেখাই যায় না ।'
কাকিমা এতক্ষন চন্ডী মূর্তিতে ছিল এখন ভোলাকে কত নরম হয়ে কথা বলছে । কাকিমা ও মাছগুলো দেখে খুব খুশি হয়েছে।
কাকিমা আর ভোলা কাকার এই আওয়াজে রেখাও ঘর থেকে বেরিয়ে আসলো এসে জিজ্ঞেস করল' কি হয়েছে কাকিমা?'.
" দেখ ,দেখ ,ননী, সত্যিই আজকে ননিরা আসাতেই মাছগুলো পড়েছে ।ভোলার তো জানিস ও মাছ ধরার জন্য পাগল। গেছিল নদীতে কিছু পেয়েছে বোধহয় ।মাছ দেখ ,কি ,কি মাছ।
"কি মাছ কাকিমা?"
"হ্যাঁ রে ভোলা, মাছগুলোর নাম বল ।
নানা পদের মাছ এসেছে টেংরা, পুঁটি ,চান্দা গুড়া সোনা। খলিসা ,কয়েকটা খয়রা মাছ, চিংড়ি মাছ।'
"আরে ভোলা আজকে ওই ঘোষদের পুকুরে যাসনি?"
"হ্যাঁ গেছিলাম ওখানে অনেক ভিড় বলে চলে এসেছি।"
'জানিস ননী ওই ঘোষদের পুকুরে মাঝে মাঝেই শিঙি মাছ ,কই মাছ পায় ওদেরকে দিয়ে আসে আবার কিছু বাড়িতে নিয়ে আসে।'
এসব মাছ তো হারিয়ে যেতে বসেছে রে।
একদম ঠিক বলেছো কাকিমা।
এই প্রজাতির মাছ এখন নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে, যেভাবে দূষণের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। দের বাঙ্গালীদের সেরা মাছগুলো আর পাতে উঠবে না। পাতে উঠবে কৃত্রিম ভাবে তৈরি করা মাছ।
হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর 'বেনের মেয়ে 'উপন্যাসে পড়িস নি আগে গ্রামে পুকুরে মাছ ধরার বিশাল বর্ণনা ।
শুধু উপন্যাসে কেন এটা তো সত্যিকারেরই ঘটনা কিন্তু আজ এসব হারিয়ে যেতে বসেছে।।
" তোদের এই ভোলা কাকাকে দেখে তাই সেই উপন্যাসের কথা আমার মনে আসলো।'
, ও ব্যাটা ওই মাছের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে।
এই নিয়ে কম বকা খায় ও আমার কাছে।
তবে যখন আবার মাছগুলো নিয়ে আসে দেখে প্রাণটা জুড়িয়ে যায়।
তোরাএসেছিস মাছগুলো পেয়েছে, তোদেরকে রান্না করে খাওয়াতে পারলে আমার ভালো লাগবে।'
কাকিমা রান্না ঘরে কি বসিয়ে এসেছ ,,?পোড়া পোড়া গন্ধ বেরোচ্ছে।"
"দেখেছিস বেগুন ভাজা ।উফ ভোলা সাধে কি তোর সাথে আমার রাগ হয় ।বলেই কাকিমা ছুটতে শুরু করল। সব রাগ গিয়ে পড়লো ভোলা কাকার উপর।
"ভোলা কাকা মাথা চুলকে বলে আমি আবার এখানে কি করলাম বলো তো ছোট বৌদি।"
"কি সর্বনাশ টা হল দেখে যা ।বেগুন ভাজার হাল কি হয়েছে ?জামাই মেয়ে এসেছে প্রথমেই পোড়া।
আবার বেগুন কেটে এবার বসাতে হবে।'
রেখা বললো 'ভোলা কাকা ঘোষেদের বাড়ি কি সেই আগের মত জমজমাটি আছে? সেই লক্ষ্মীপূজো সরস্বতী পুজো একসাথে হয় , তা এখনো হয়?'
'আছে মামনি কিন্তু আগের মত সেই আনন্দ আর হয় না ।সবাই যে যার মত বিদেশ বিভুইতে থাকে।ওই পুজোর সময় গুলোতে আসে , এই যা।
এখন তো পালা করে করে পূজো হয় বড় বাবুর পালা থাকলে বড়বাবু করে ,ছোট বাবুর পালা থাকলে ছোট বাবু করে এইরকম।
আর আগে তো সব একসঙ্গে পুজো হতো। কত লোকজন। গ্রাম শুদ্ধ লোকে সেখানে খাওয়া-দাওয়া করত।
এখন সব অতীত ইতিহাস।'
ভোলা কাকার কথায় রেখা চলে যায় সেই তার শৈশব কৈশোরের দিনগুলোতে সত্যি কি মজাটাই না করেছে পুজোর দিনগুলোতে । পুজোআসলেই ঘোষেদের বাড়িতে সাজো সাজো রব আর শুধু ঘোষেদের বাড়ি নয় ,গ্রামের প্রত্যেকের মুখে তখন হাসি ফুটে উঠত।
ঘোষেদের বাড়িতে পুজো দেখতে গিয়েই তো নীলুদার সঙ্গে প্রথম বৃষ্টিতে ভিজেছিল প্রথম বোধহয় ভালোবাসার গন্ধটা অনুভব করতে পেরেছিল।
কেমন একটা উদাসী হাওয়া এসে যেন রেখার মনটাকে টেনে নিয়ে যায় সেই কত বছর আগের দিনে বিস্মৃতির অন্তরালে হঠাৎ করেই যেন আনন্দের স্মৃতি উঁকি দিতে থাকে।
এমন সময় মনোজ বলে রেখা," একটু তাড়াতাড়ি করতে হবে কিন্তু। বেরোতে হবে তো আমাদের।'
কাকিমা রান্না করতে করতে শুনতে পেয়ে বলে, "আজকে তোমরা চলে যাবে?'
'না গেলে তো হবে না। বাড়ি ফাঁকা তো?'
"এ বাবা আমার এখনো রান্না বান্না কিছু হলো না কত কিছু রান্না করবো ভাবলাম।"
মনোজ বললো "অন্য একদিন এসে খাবো। 'সেগুলো তোলা থাক না কাকিমা আর তাছাড়া আমরা আসলে তো আপনি কম আয়োজন করেন না আবার কি করবেন?'
'তা কি হয় বাবা ।জামাই বলে কথা বাড়িতে এসেছ।'
"ননীর মা বেঁচে থাকলে কি এরকম করে ছেড়ে দিতে পারতো?'
রেখা বলল' মা বেঁচে থাকলে কি হতো সেটা নয় থাক কিন্তু মা বেঁচে নেই বলে আমরা তার অভাবটা এক বিন্দু অনুভব করি নাই এই বাড়িতে এসে। হ্যাঁ, মা থাকার জন্য তো একটা অভাব বোধ কাজ করে কিন্তু কাকিমা, তুমি তো মায়ের জায়গাটা কখনো অপূর্ন রাখনি। আমরা কখনো সেই অভাবটা এখানে এসে বোধ করি না।"
"দাঁড়া কোথায় গেল দেখি সতী ।ভোলা ,ভোলা রে?'
ভোলার কাঁধে গামছা আর একটা ছোট্ট পিরিন পরেছে ।পিরিন বলতে এখানে হচ্ছে ওই ছোট ধুতি গুলো খুব ছোট্ট করে কেটে পরা।
তারপর ভোলা এসে জিজ্ঞেস করল 'ডাকছো ছোট বৌদি,?'
"আরে দেখ না সতী কোথায় আছে? ওকে ওই মাছগুলো তাড়াতাড়ি কেটে দিতে বল ,না,?"
"ও তো সারাক্ষণ সেই গান গেয়েই চলেছে অবসর সময়ে আর চোখের জল ফেলছে ।'
"দেখ ,দেখ, কোথায় গেল । কোনো পুকুর ধারে গিয়ে বসে আছে কিনা?'
"সতী দিদি ও সতী দিদি.. ই. ই কোথায় গেলা ।এইখানে আইসো । ভোলা আপন মনে বলল বাঙাল ভাষা সতী দিদির কাছ থেকে শিখছি। গলা খাকারি দিয়ে বলল 'তোমাকে ছোট বৌদি ডাকতাছে ।'
'ও যাইতাছি।'
'এটু তাড়াতাড়ি আইসো।'
"আমার হাত বান্ধিবি পা বান্ধিবি, মন বান্ধিবি কেমনে"গান গাইতে গাইতে সতী এসে জিজ্ঞাসা করল'
'কি কও ছোট বৌদি।'
'ওই মাছগুলো তাড়াতাড়ি কেটে দে।মেয়ে জামাই বাড়ি চলে যাবে।'
'ও দিতাছি তাড়াতাড়ি কাইটা।'
"ইতিমধ্যে মাংস বসিয়ে দিয়েছে।
সরষে ইলিশ টা ও একদিকের উনুনে কড়াইতে চাপিয়ে দিল।
"ও ছোট বৌদি ,কইতাছি এই মাছ ভোলা দাদা কুন জায়ইগায় পাইলো।"
এই মাছগুলা দেইখ্যা আমার বাংলাদ্যাশের কথা মুনে পড়তাছে।
কতদিন পর এই মাছ দেখতাছি। বাংলাদ্যাশে কি কম মাছ খাইছি ।'
সতী তুই ওই বাইরের মাটির উনুনটাতে হাঁড়ি করে চাল ধুয়ে বসিয়ে দে ভাতের জন্য তাড়াতাড়ি।
"হ দিতাছি।'
"ক্যা মাইয়া জামাই এত তাড়াতাড়ি চইলা যাইব ক্যান।"
"বাড়ি ফাঁকা আছে রে।'
'ও তাইলে তো যাইতেই অইব।'
মনোজ রেখাকে বলল 'মাসিকে একটা ফোন করো দেখো কি করছে?'
"হ্যাঁ ঠিক বলেছ ভুলে গেছি একদম।'
মনোজ মজা করে বলে' সে তো আমি জানি বাপের বাড়ি আসলে আর শ্বশুর বাড়ির কথা কিছু মনে থাকে না তোমার।
'সেবার আমি হারে হারে টের পেয়েছি।'
'হ্যাঁ ,তাইতো।"
"তাইতো মানে ?ভুলটা কি বলেছি বলো?'
কাকিমা বলল "আসলে বাবা ,মাটির গন্ধ। এ গন্ধ যাদের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে ।তারা কখনো ভুলতে পারবে না গো।"
সতী বলল "এক্কেবারে হক কথা কইছো ছোট বৌদি।
মাটির গন্ধে পাগলা অইয়া যাই।
নাইলে কতজুনা শহরে কাজের লাইগা কইতাছিল যাইতে পারতাইম ।যাই নাই।'
রেখা রিং করলো বাড়িতে ফোন বেজে যাচ্ছে।
"কি ব্যাপার মাসি ফোন ধরছে না কেন?'
মনোজ বলল'তোমার বড্ড অধৈর্য জানো তো? হয়তো কোথাও কোনো কাজ করছে ,এসে ফোনটা ধরতে পারে নি। আর একবার কর আগেই এত দুশ্চিন্তা কেন করো তুমি?'
রেখা আবার ফোন করলো ।রিং হল। এবার ফোন ধরে কথা বললো মাসি' হ্যালো'।
"হ্যাঁ মাসি, কি করছিলে প্রথমে রিং হয়ে গেল ধরলে না।"
"আর বোলো না ঐ কতগুলো অন্য পাড়ার কুকুর এসে মিলির বাচ্চাগুলোকে জ্বালাতন করছিল তাই তাড়াতে গেছিলাম।'
"ও আমি ভাবলাম ঘুমিয়ে পড়েছিলে বোধ হয়।"
"না গো বৌমা ঘুম আসে না।'
"তুমি খেয়েছ?'
"হ্যাঁ খেয়েছি আর তোমার বাচ্চাদেরকে ও খাইয়ে দিয়েছি।'
রেখা হেসে বললো, "আমি জানি তো তবু জিজ্ঞেস করলাম।"
বাচ্চাগুলো কিছু করছিল?
"হ্যাঁ ওরা তো মাঝে মাঝে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছিল বোধহয় তোমাদেরকে খুঁজছিল।'
রেখা হেসে বললো পাগল বাচ্চা সব।
"আচ্ছা মাসি পার্থ ওষুধ দিয়ে গেছে তোমার?"
" হ্যাঁ ,দিয়ে গেছে খেয়ে নিয়েছি।'
ঠিক আছে প্রেসারের ওষুধ না খেয়ে থেকো না কখনো।
"তোমরা কখন আসবে বৌমা?"
"এইতো খেয়ে দেয়ে বেরোবো।'
কাকিমা তো আজকে থেকে যেতেই বলছিল।
'তবে থেকে এসো না।'
'না গো মাসি পরের দিন স্কুল আছে আর বাড়ি ফাঁকা রেখে থাকা যায়?"
"ঠিক আছে মাসি, রাখছি।"
ঘর থেকে রেখার কাকা ডাকছে 'ননী, ননীমা আমার কাছে এসে একটু বস মা ।এরপরেই তো চলে যাবি ।ঘরটা ফাঁকা হয়ে যাবে। আবার সেই একা একা থাকা আমাদের।'
"হ্যাঁ যাই কাকা।আচ্ছা কাকিমা, সোমুরা আসেনি আর?"
"হ্যাঁ, এসেছিল। তোর কথা জিজ্ঞেস করছিল।'
"সমুকে তোমরা আর ভুল বুঝনা কাকিমা।'
"আর কি বলবো মা , সন্তান তো।'
"ও এখনও ওই কাজটা করছে তো?'
"হ্যাঁ করছে"।
"পাবলো কেমন আছে?"
"যা পাবলোর কথা হয়েছে। শুনলে তুই পাগল হয়ে যাবি।"
সতী দিদি বলল "এটটা কুটটিপাড়া পোলা,. হাইসা হাইসা মইরা যাইবা।'
রেখা ঘরে কাকার কাছে গিয়ে বসলো তারপর কাকার মাথায় দিলি কেটে দিতে লাগলো।
কাকা বলল 'ননী মা ,তুই আসলে যেন এই বাড়িটা একটা অনাবিল আনন্দে ভরে ওঠে ।এই বয়সে আমরা আর কি চাই বল মা ?একটু শান্তি ,একটু আনন্দ।'
'কিন্তু কাকা আমার খুব খারাপ লাগে আমরা আসলে কাকিমা, তোমরা যা ব্যস্ত হয়ে পড়ো কাকিমার কত খাটুনি বাড়তে থাকে বলো তো? 'এখন তো বয়স হচ্ছে না?'
কাকিমা শুনতে পেয়ে বলল 'বয়স হলে কি হবে রে মা, এই আনন্দ বিশেষত সন্তান আসলে যে কি মায়েদের মনের অবস্থা হয়, তা বলে বোঝাতে পারবো না তোকে ।আমার কোন কষ্ট নেই মা।'
তোরা মাঝে মাঝে আসিস আমাদের শূন্য বুকে একটু আনন্দের দোলা দিয়ে যাস।'