ধারাবাহিক উপন্যাস
শায়লা শিহাব কথন
অলিখিত শর্ত (পর্ব ৭৪)
শামীমা আহমেদ
শায়লার স্বামী নোমা
ন সাহেব কানাডা থেকে খুব শীঘ্রই বাংলাদেশে আসছেন।তার আসতে হাতে গুনে আর মাত্র তিনদিন বাকী। প্রতিরাতেই তিনি নিয়ম করে শায়লাকে কল দিয়ে যাচ্ছেন। শায়লা তা ইচ্ছা অনিচ্ছায় রিসিভ করছে।
বাংলা ইংরেজির মিশ্রণে কথাগুলো শুনতে শুনতে শায়লা অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। নোমান সাহেব শায়লার জন্য, শায়লার পরিবারের সবার জন্য অনেক শপিং করেছেন। ভিডিও কলে তা দেখাতে চাচ্ছেন।কিন্তু শায়লা নিজেকে নীরব রেখে শুধু ওপ্রান্তের সব কথা শুনে যাচ্ছে।একেবারেই ভিডিও কলে কোন আগ্রহ দেখাচ্ছে না কিন্তু দিনে দিনে নোমান সাহেবের শায়লাকে জানার আগ্রহ বাড়ছেই।তবে শায়লা নিজেকে একেবারে শামুকের খোলসে গুটিয়ে রেখেছে।কিছুতেই শিহাবের বেষ্টনী থেকে সে বেরুতে চাইছে না।শিহাবের আবেশ আবেগ তাকে প্রচন্ডভাবে ঘিরে রয়েছে। শায়লা শিহাবকে ছাড়া তার বাকি জীবন ভাবতে পারছে না।মনে মনে সে বহুবার শিহাবের ঘরে ঘুরে এসেছে। শিহাবের সাথে কাটানো সময়গুলো চোখ বন্ধ করলেই যেন ছুঁয়ে দেখতে পারছে।গতরাতে শিহাবের কথাগুলোতে শিহাব তার মনোভাব খুবই স্পষ্ট করে জানিয়েছে। শায়লাকে তার নিজের করে পাওয়ায় সে যেন একটা সহজ সমাধান বাৎলে দিয়েছে। ওদিকে নোমান সাহেব ক্রমাগত কানাডার উন্নত জীবনযাপনের কথা বলে শায়লাকে সুন্দর জীবনের প্রত্যাশা দিচ্ছে। শায়লাকে নিয়ে সে আবার নতুন করে জীবন শুরু করতে চায়।তার বিদেশীনি বউ পামেলা দুটি সন্তান রেখে
তার বয়ফ্রেন্ডএর সাথে চলে গেছে।এরপর থেকে নোমান সাহেব আর কোন নারীর প্রতি আস্থা রাখতে পারছিল না।যদিও শায়লাকে বিয়ে করেছিল শুধু সন্তানদের কথা ভেবে কিন্তু এখন তিনি বেশ বুঝতে পারছেন ঘর বাঁধতে হলে দুটি মনের বন্ধন ভীষণ জরুরী। আর আমাদের বাঙালি মেয়েরা নিজেদের অনেককিছু বিসর্জন দিয়ে হলেও সংসার সন্তানের জন্য জীবন কাটিয়ে দেয়।এজন্যই নোমান সাহেব শায়লাকে নিজের কাছে নিতে আর দেরি করতে চাইছেন না। নোমান সাহেবের মনের এই পরিবর্তন এখন শায়লাকে দ্বিধাদ্বন্দের মাঝে ফেলেছে। শায়লা বুঝতে পারছে না শিহাবের প্রতি তার ভালবাসা আর নিজের পরিবারের মান সম্মান রক্ষা করা যেন দুটি বিপরীতমুখী অবস্থান নিয়েছে।
বাসায় আত্মীয়স্বজনেরা আসতে শুরু করেছে।শায়লার বিয়ের আনন্দ যেন এবার সবাই নিতে চাইছে। শায়লার কাজিনরা নানান রকম পরিকল্পনা করছে।তারা ছাদে গায়ে হলুদের আয়োজন করবে।গান নাচ করে আনন্দ করবে।বাসা বাড়িতে চলছে ঘষা মাজা।ঘরে নতুন জামাইয়ের আগমনে উপরে নিচে একেবারে সাজ সাজ রব চলছে!রুহি খালা যারপরনাই বিজয়ের আনন্দে একতালা দোতলা করছে তবে আড়চোখে ঠিকই শায়লার খেয়াল রাখছে।শায়লার গতিবিধি মনিটর করছে।যেন বিশাল এক দ্বায়িত্ব তার কাঁধে। সবাইকে ইশারা ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিচ্ছে শায়লাকে নজরবন্দী রাখতে।শায়লার মা আর রুহি খালা নানান পিঠা পুলি তৈরির প্রস্তুতিতে ব্যস্ত রয়েছে।কাজের বুয়ার কাজের উৎসাহ বহুগুণ বেড়ে গেছে।সে বিদেশি জামাইয়ের কাছ থেকে মোটা বখশিশ চাইবে বলে ঠিক করে রেখেছে।রাহাত চাইছে যে কয়দিন জামাই থাকবে বাড়িতে লাইটিং করা হবে যেন এলাকার মানুষ বুঝতে পারে এই বাড়ির বড় মেয়ের বিয়ে হচ্ছে।রাহাত সারাক্ষণ ঘরের খুঁটিনাটি সারাই করছে। সবাই বিনা কারণেই হৈ হৈ করে কথা বলে বিয়ে বাড়ির আবহ আনতে চাইছে।
নতুন জামাইয়ের জন্য শেরওয়ানী, নাগড়া, পাগড়ি কেনা হয়েছে। সাথে আরো আনুসাঙ্গিক এক সুটকেস বোঝাই দেশি কাপড়।শায়লাকে বলা হচ্ছে অনলাইনে শাড়ি অর্ডার করতে।এখন মার্কেটে যাওয়ার একদম সময় নেই।ইচ্ছে করেই এসব কেনাকাটা শায়লার ঘরে রাখছে যেন শায়লা শিহাবের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে।সে বুঝতে পারে বাড়ির সবাই কী চাইছে। এজন্য নায়লাকেও জানানো হয়েছে যেন তার শ্বশুরবাড়ির সবাইকে নিয়ে উপস্থিত থাকে।
শায়লা সবকিছুই দেখছে।
অথচ শায়লা নিজেই এখনো কোন সিদ্ধান্তে স্থির হতে পারছে না। শিহাবকে ছাড়া সে কিছু ভাবতে পারছে না। দেড় বছর আগে বিয়ের সময় ও তার পরবর্তী কয়েকটা দিন নোমান সাহেবের সাথে শায়লা হাতে গোণা কয়েকটি কথা হয়েছে।একবিন্দু কাছে ঘেষা হয়নি।কিন্তু শায়লা শিহাবের যতটা নিবিড় সান্নিধ্যে গেছে অথচ স্বামী হয়েও নোমান সাহেব শায়লাকে অতটা কাছে ডাকেনি।তাইতো শিহাবের স্পর্শই তার কাঙ্খিত। সে ভাবতে পারছে না কিভাবে সেই অচেনা মানুষের মধ্যে নিজেকে বিলিয়ে দিবে। শায়লার ভেতরের অস্থিরতাটা বাইরে কেউ বুঝতে পারছে না।সকাল হয়েছে।শায়লা বিছানা না ছেড়েই জানালায় তাকিয়ে এমনি শত ভাবনায় ডুবে আছে।খুব ইচ্ছে করছে শিহাবের কণ্ঠস্বরটা শুনতে। কিন্তু এত সকালে সে কি জেগেছে? কিন্তু সেদিন শায়লাকে দেখার জন্যতো ঠিকই চলে এসেছিল।এখন শায়লারও তেমনি ইচ্ছে হচ্ছে।এক ছুটে শিহাবের কাছে গিয়ে তার ঘুম ভাঙাতে।বারান্দায় বসে দুজনে একসাথে চা খেতে ইচ্ছে করছে।শায়লা বুঝতে পারছে না কেমন করে সে শিহাবকে তার মন থেকে সরাবে,নোমান সাহেবকে আপন করবে।শায়লা যেন ভেতর থেকে শক্তি পেলো।নিজে নিজেই বলে উঠলো, না, যে করেই হউক আমি শিহাবের কাছেই চলে যাবো।পৃথিবীর সবকিছু উলটে যাক,শিহাবকেই সে জীবন সঙ্গী করবে। শায়লা মোবাইল হাতে নিয়ে শিহাবকে কল করতে চাইলো।শিহাব অফলাইন হয়ে আছে। শায়লা শিহাবের মোবাইল নম্বরে কল দিলো।রিং হতে লাগল।
রিশতিনা ঘুম থেকে জেগে সরাসরি ড্রইং রুমে চলে গেলো।শিহাব সোফায় গুটিশুটি হয়ে গভীর ঘুমে আছে। ঘুমন্ত শিহাবকে দেখে রিশতিনার খুব মায়া হলো।সে ভেবে নিলো,তার জন্যই আজ শিহাবের জীবনটা এলোমেলো হয়ে গেছে। কেমন বিষন্ন মুখে ঘুমিয়ে আছে। পাশে টেবিলে এস্ট্রেতে সিগারেট ফিল্টার উপচে পড়ছে। রিশতিনা সেটা নিয়ে কিচেনে গিয়ে ক্লিন করে নিলো।রিশতিনা প্রতিদিন সকালে সুগারফ্রি একমগ গ্রীন টি নিয়ে টিভির সামনে বসে।আজ টিভি দেখতে মন চাইছে না। সে আভেনে একমগ পানি গরম করে গ্রীন টি ব্যাগটা ডুবিয়ে ঘরের জানালার পর্দা সরিয়ে মানুষের চলাচল দেখতে লাগলো। হঠাৎই শিহাবের ফোনে কল এলো।শিহাব গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে আছে। শায়লা এগিয়ে গেলো। মোবাইল স্ক্রিনে ইংরেজিতে শায়লার
নাম ভেসে উঠেছে। রিশতিনা বুঝতে পারছে না কাল রাতে শিহাবের মেসেঞ্জারে কল এলো মায়া নামে আবার এখন শায়লা নামে।দুজনই কি এক জনই? নাকি ভিন্ন দুইজন!
না,শিহাব শায়লাকে মায়া নামে ডাকে? রিশতিনার ভাবনায় মোবাইল রিং চলছেই।শিহাবের তাতে এতটুকুও নড়াচড়া নেই। খুবই কৌতুহলবশত রিশতিনা কলটি রিসিভ করলো।
চলবে....