রেখা হঠাৎ করেই দেখছে পরপর কতগুলো মেসেজ ঢুকছে। রেখা হোয়াটসঅ্যাপটা চেক করে দেখে স্কুল গ্রুপে মেসেজ ঢুকেছে। রেখা চশমাটা পরে ভাল করে দেখল"আরে এ তো এমসিকিউ 'এর মূল্যায়ণের জন্য খাতা ইমিডিয়েট সংগ্রহের কথা বলা হয়েছে। আগামী পরশু দিন খাতা জমা দিতে হবে।'
রেখা দেখল 'আজকে তো স্কুলে যায় নি। হাতে সময় মাত্র একটা দিন ।কালকে স্কুলে গিয়ে খাতা এনে চেক করে দেয়া অনেকটা টাফ ব্যাপার ।কি হবে এখন ?এদিকে মনোজ ও ফেরে নি ।ওদিকে কী হলো কে জানে? রিম্পাদিকে বললে হ'তো, খাতাটা যদি নিয়ে আসতো, স্টেশন থেকে সংগ্রহ করা যেত। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে ,সে সময় পেরিয়ে গেছে। এখন তো বলেও লাভ নেই। রিম্পাদি তো ট্রেনে চেপে পড়েছে ,কি হবে? শরীরটাও ভাল নেই। কী যে হচ্ছে ,কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না ।সবকিছু কেমন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে।'
অন্যদিকে মিলি চেঁচাচ্ছে। বাবা, ওর আবার খিদে পেয়ে গেল। এত ঘনঘন খিদে পাচ্ছে। ওকেই বা দোষ দিয়ে লাভ কি ?বাচ্চারা বড় হচ্ছে, দুধ খাচ্ছে ,ওর ক্ষিদের পরিমাণ বাড়ছে, তাছাড়াও ঠিক করে না খেলে বাচ্চাদের দুধ ই বা পাবে কোথা থেকে?এই ভেবে গেল মিলিকে কিছু খাবার দিতে। মিলির কাছে যেতেই মিলি রেখাকে ওর ভাষায় রাগ দেখাতে লাগলো ।মানে ওর ভাষায় কিছু বলতে চাইছে যে এত দেরি করে দিচ্ছ ?খিদে পাচ্ছে ।তোমার কি টাইম জ্ঞান নেই?
রেখা হেসে বলল ' মা গো, আমার তো কাজ থাকে নাকি, রাগ কোরো না। খেয়ে নাও। '
মিলিও সেই কথা শুনে রেখার দিকে একটু তাকালো, তারপর লেজ নেড়ে খেতে শুরু করল।
এরমধ্যেই শুনতে পেল ঘরেতে ফোনে আওয়াজ হচ্ছে। রেখা মিলিকে খেতে দিয়ে ছুটল ফোনের দিকে।যেতে যেতে ফোনটা কেটে গেল। ভাবলো হাতটা ধুয়ে নিয়ে ফোনটা রিসিভ করবে ।
এরমধ্যে আবার ফোন বেজে উঠলো। রেখা হাত ধুতে গিয়ে আবার ফিরে আসলো ।বাহাতে ফোনটা রিসিভ করল ,ডান হাত টা তখনও এঁটো।
রেখা বলল '"হ্যালো।
অপরপক্ষ বলল 'এই রেখা আমার ট্রেন পালপাড়া ছাড়ছে ।তুই রেডি হয়ে স্টেশনে চলে আয় ।আমি তোর খাতাগুলো নিয়ে এসেছি ।কারণ খাতাগুলো চেক করে তাড়াতাড়ি জমা দিতে হবে।'
রেখা খুব খুশি হয়ে বলল 'তুমি কি করে আমার মনের কথা বোঝো রিম্পা দি ।সত্যিই তুমি ছাড়া কে বুঝবে আমাকে বল তো?'
রিম্পাদি বলল ,'কি হয়েছে বল তো? হঠাৎ এরকম বলছিস কেন?'
রেখা বলল ' মনে মনে এটাই ভাবছিলাম যে রিম্পাদি কে বললে তো, খাতাগুলো দিয়ে যেত। মেসেজটা একটু আগে দেখতে পেলাম। আরেকটু আগে যদি বড়দি মেসেজ দিত। তাহলে হ'ত।'
রিম্পাদি বলল 'আমি জানি তো। সেই জন্যই তো আমি তোর খাতাগুলো নিয়ে আসলাম।'
রেখা বলল 'তোমাকে আমি থ্যাঙ্কস জানাবো না ।কারণ থ্যাংকস জানিয়ে আমি তোমাকে ছোট করতে চাই না ।তোমাকে আমি সব সময় আমার হৃদয়ের ভালোবাসায় তোমাকে সংযুক্ত করতে চাই। করতে চাই বললে ভুল, তুমি তো সংযুক্তি হয়েই গেছে ।না হলে বুঝলে কি করে আমার মনের কথা বল?
রিম্পা দি বলল ' হু, মন ভেজানো হচ্ছে না?'
রেখা বলল ,'না গো রিম্পাদি ,মন ভেজানো নয় ।সত্যি কথা বলছি।'
রিম্পা দি বলল 'ঠিক আছে তাড়াতাড়ি চলে আয় ।খাতা গুলো নিয়ে যা।'
রেখা বলল 'হ্যাঁ, তুমি রাখো ফোন ।আমি স্টেশনে যাচ্ছি।'
রেখা রেডি হয়ে হন্তদন্ত হয়ে কোনরকমে একটা অটোকে পাকড়াও করল। অটো তো অলরেডি বুকিং ।এবার খুব চেপে চেপে বসতে হবে।
অটোওয়ালা দাঁড়াতেই চাইছিল না। জোরজবস্তি
করে রেখা বলে ' এই অটো দাঁড়াও, রোজ যাই।'
অটোওয়ালা বলল 'না দিদি ,আপনি যেতে পারবেন না ঠাসাঠাসি করে বসতে হবে।
রেখা বললো 'আমাকে যেতেই হবে । আমি জানি এই ট্রেনটা মিস করলে আমার অসুবিধা আছে।'
অটোওয়ালা বলল 'কি বলব দিদি, বলুন তো ?আপনারা ডেলি প্যাসেঞ্জার করেন, কিছু বলার নেই ।ঠিক আছে উঠুন ।কষ্ট করে বসতে হবে আপনাকে।'
রেখা কোন কথা না বলে অটোতে উঠলো আর মনে মনে ভাবল অটোওয়ালা তো ঠিকই বলেছে। কিন্তু আমার তো কিছু করার নেই আর তাছাড়া অটোতে বসে আর যা কান্ড হবে, সেসব হজম করতে হবে ।তার চেয়ে মনে মনে ভালো কথাগুলো ভাবতে থাকি ।রিম্পাদির সঙ্গে দেখা হবে ,খাতা পাবো -এই খুশিতে যেটুকু পথ অতিক্রম করা যায়।
এই করতে করতে কল্যাণী স্টেশন এর কাছে নামিয়ে দিলো আর ঠিক তখনই ট্রেনটা ঢুকলো রেখা ছুটতে ছুটতে প্লাটফর্মে এসে উপস্থিত হল। রিম্পাদি ও একগাল হাসি নিয়ে গেটের কাছে দাঁড়িয়ে । বলল 'এই নে ,তোর আমানত। আমি খুব টেনশনে ছিলাম। কি জানি তুই আসতে পারবি কিনা?'
রেখা বলল 'আর বোলো না, আসতে পারতাম না ।অটোওয়ালা কিছুতেই তো আমাকে অটোতে তুলে ছিল না ।নেহাৎ ডেলি প্যাসেঞ্জার বলে এই ফ্যাসিলিটি পেলাম জানো তো?
যাই হোক আজকে নেমে যাও না ?কালকে একসাথে যাবো স্কুলে।
রিম্পা বলল ' হ্যাঁ , তাই আর কি ?আমার বাড়িতে মেয়েটা রয়েছে ,আমার বর রয়েছে ।আমি না বলে কয়ে, হঠাৎ করে তোর বাড়িতে থেকে যা ই তাই না ?ঠিক আছে অন্য দিন আসব ।
এর মধ্যে ট্রেন ছেড়ে দিল ।
ভালো থাকিস ।'হাত নাড়তে লাগল দুজনেই।
রেখা যতদূর ট্রেনটাতে রিম্পাদিকে দেখা গেল ,তাকিয়ে রইলো ।তারপর আবার অটোতে এসে বসলো। খেয়াল করে নি সেই অটোতেই বসেছে।
অটোওয়ালা তাকিয়ে বলল ' ও দিদি আপনি ট্রেনে গেলেন না ,এত হুটোপাটি করে যে আসলেন?'
রেখা একগাল হেসে বলল ' একটু দরকার ছিল দাদা।এই ট্রেন মিস করলে আমার খুব অসুবিধা হতো এইজন্য'।
অটোওয়ালা বলল ' তখন যা কষ্ট করে আসলেন ।এখন একটু জায়গা নিয়ে ঠিক ভালোভাবে যেতে পারবেন। বলেই হাঁকতে লাগল বুদ্ধ পার্ক, বি ব্লক ,বাগের মোর ।
এরমধ্যে মনোজ ফোন করলো ।
রেখা ফোন রিসিভ করে বলল' হ্যালো'।
মনোজ একটু অবাক হয়ে বলল ' আরে তুমি কোথায় ?আজকে স্কুলে যাও নি তো?'
রেখা বলল 'একটু স্টেশন এসেছিলাম। দরকার ছিল।'
মনোজ বলল 'এদিকে বাড়িতে এসে দেখি। মিলি কি চেঁচানো চেঁচাচ্ছে। আমাকে দেখে একটু শান্ত হলো।'
রেখা বলল 'আর বোলো না, ওর খাবার টাইম হয়ে গেছে।'
মনোজ বলল ।'আমি ওর খাবার দিয়ে দিয়েছি।'
রেখা বলল ' ও তাই? ভালো করেছো। ওদিকের কি খবর গো?'
মনোজ বলল 'আবার ডেট পড়েছে। জজ যা বলল তোমার বোনের তো লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যাবার মতো।'
রেখা বলল ' ঠিক আছে ।আমি বাড়িতে গিয়ে শুনবো'।
এর মধ্যে অটোওয়ালা গান চালিয়েছে 'এক রাস্তা হ্যায় জিন্দেগি,যো থাম গ্যেয়ে তো কুছ নেহি....।'
রেখা মনে মনে ভাবতে লাগল সত্যিই তো তাই আমাদের জীবনটাও ঠিক তাই।
অটোওয়ালা বলল 'দিদি ,এসে গেছেন নামুন।'
রেখা বলল ' আচ্ছা, আচ্ছা ।এই নিন ভাড়া।'
ভাড়া মিটিয়ে রেখা বাড়িতে ঢুকলো।
বাড়িতে এসে দেখে মনোজ কফি করে বসে আছে।
মনোজ বলল এই মাত্র কপি করলাম ফ্রেশ হও তাড়াতাড়ি।একটু গল্প করি দুজনে।'
রেখা কেমন অবাক হয়ে গেল ।কালকে অবধি তার জীবনটা কি অবস্থায় ছিল ?
এক টলমলে তরী ।যার মাঝির বেহাল অবস্থা ।আদৌ তরী তীরে নিয়ে গিয়ে থামাতে পারবে কিনা ?জীবন বিপর্যস্ত হয়ে যাবে কিনা? একটা টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে কাটিয়েছে ।আজকে মনোজকে অন্য মুডে দেখে রেখার চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগলো ।
মনোজ বলল ' তুমি কাঁদছো কেন ?যাও ফ্রেশ হও।' রেখা তারপরও যখন নড়লো না।
তখন মনোজ এসে রেখাকে হাত দুটো ধরে বলল 'সরি ,আমি যদি কোন খারাপ ব্যবহার করে থাকি, তার জন্য।আমার যে কি হয়েছিল..? আদপে আমি একটা সমস্যায় আছি ।তোমাকে না পারছি বলতে কি ভাববে ,না ভাববে ?আগে সমাধানটা করি ।তারপর তোমাকে সব বলবো ।আমার কোন কথা তো তোমার অজানা নয় ।শুধু হঠাৎ করে একটা উটকো ঝামেলায় মধ্যে কিভাবে জড়িয়ে গেলাম বুঝতে পারছি না। শুধু এটুকুই বলবো যে আমি ,আছি থাকবো তোমারি। তবে আমার কিছু খারাপ আচরণের জন্য সত্যিই আমি লজ্জিত।'
রেখা বলল 'এই যে তুমি মন খুলে আমাকে কথাটা বললে এতেই আমি খুশি। তোমাকে ঐরকম অবস্থায় দেখলে আমি একদম ভালো থাকি না।'
মনোজ বলল 'আসলে কেন যে আমি তোমার সাথে এরকম ব্যবহার করলাম আমি নিজেও জানি না।'
রেখা বললো ' ছাড়ো, যা হবার হয়ে গেছে। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি। দুজনে মিলে অনেকদিন পর বসে বসে আবার কফি খাবো , গল্প করবো। আমাদের ব্যস্ততম জীবনে এই টুকুই অক্সিজেন।'
রেখা ফ্রেস হতে চলে গেল।
বাথরুম থেকেই রেখা ফোনের আওয়াজ শুনতে পেল। মনোজ ফোনে কথা বলছে 'হ্যালো'।
অপর পক্ষ বলল 'আমি সুরো বলছি।'
মনোজ বলল ' হ্যাঁ বল।'
সুরঞ্জন বলল 'তিথিটা এত নির্লজ্জ হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে তোকে এবার ডিএনএ টেস্ট করতে হবে? না হলে তুই এই সমস্যার সমাধান করতে পারবি না।
মনোজ বলল 'ডিএনএ?'
রেখা কলের জোরটা একটু কমিয়ে দিল বাথরুম থেকে ডিএনএ টেস্টের কথা শুনতে পেল। ভাবলো 'কেন, ডিএনএ টেস্ট কেন হবে?'
সুরঞ্জন বলল 'আরে তুই তো ফ্রেশ আছিস, তোর এত চিন্তার কি আছে? তাছাড়া এই যাত্রায় তুই রক্ষা পাবি না।'
মনোজ বলল 'ও তো চিরকাল টাকার জন্যই সবকিছু করেছে। ও টাকার পেছনে ছুটেছে বলে আমার ভালবাসাটাকে অস্বীকার করেছিল ।আজকে আবার আমার কাছেই ছুটে এসেছে । এখন আমি তো ওকে মনেপ্রাণে চাই না।''
রেখা বাথরুম থেকে কথাগুলো শুনতে পাচ্ছে আর ভেতরে ভেতরে একটা কষ্ট পাচ্ছে।
রেখা ভাবছে যখনই ক্ষণিক ভালোবাসার সুখে হাসি ফুটে ওঠে ,তখনই কিছু না কিছু খারাপ সময় রেখার জীবনে এসে হাজির হয়।
আবার কোন কালবৈশাখী ঝড় আসতে চলেছে জীবনে কে জানে ?আদপেও এই ঝড়-ঝঞ্ঝার হাত থেকে মনোজকে, নিজেকে রক্ষা করতে পারবে কিনা?
কথাগুলো মনোজ আস্তে আস্তে বলছে না জোরেই বলছে। এটুকুর ভরসায় বুকে বল পাচ্ছে।