২৫ মার্চ ২০২২

মমতা রায়চৌধুরীর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৪১




উপন্যাস 

টানাপোড়েন ১৪১
অন্য পৃথিবীর স্বপ্ন
মমতা রায়চৌধুরী

সাতসকালে কলিং বেল বাজছে ''জয় রাধা মাধব জয় রাধা মাধব।" রেখা বাথরুমে থেকে কলিংবেলের আওয়াজ পাচ্ছে কিন্তু বের হতে পারছে না ,বেরোনোর কন্ডিশন নেই। আবার বাজছে' জয় রাধা মাধব, জয় রাধা মাধব ,জয় রাধা মাধব।'
রেখা ল্যাট্রিনের কলটা ফ্ল্যাশ করার পর তাড়াতাড়ি হাত পা ভালো করে ধুয়ে ছুটল দরজা খোলার জন্য।
রেখা মনে মনে বলল যেন যমরাজ নিতে  আসলেও এ সংসারে কাজের জন্য আবার ফেরত আসতে হবে।
দরজা খুলেই তো রেখা অবাক 
'একি মাসি ,তুমি ভোর পাঁচটায় এসে হাজির।'
মাসির চোখ মুখ শুকনো লাগছে, কিছু কি 
হয়েছে ?মনে মনে ভাবছে রেখা।
'আর বোলো না বৌমা ,আমার ছাগলটা বাচ্চা দিতে গিয়ে কি কষ্ট পাচ্ছে বাচ্চা বের করতে পারছি না।'
মাসির চোখ দুটো জলে ভিজে গেল কথা বলতে বলতে।
সেকি মাসি?
তাই একটু তাড়াতাড়ি আসলাম কাজগুলো  করে দিয়ে চলে যাব।
'তুমি ডাক্তারের কাছে যাও ।তোমাকে আজকে কাজ করতে হবে না।'
' মাসি কেমন অবাক হয়ে রেখার দিকে তাকিয়ে থাকলো। তারপর আর যেন চোখের জল  বাগ  মানলো না।
'কি বলছো বৌমা ,কাজ না করে চলে যাব?'
'আমি তো তোমাকে বলছি তুমি চলে যাও। তোমার কাজের থেকে ওর যে প্রাণ বাঁচানো অনেক বেশি জরুরী মাসি।
অনেক কষ্ট পাচ্ছে তুমি তাড়াতাড়ি ডাক্তারের কাছে যাও।'
রেখা বুঝল মাসির পৃথিবীটা ওদেরকে নিয়েই ওদের ভালো থাকা, মাসির ভালো থাকা।
'কিন্তু..?'
'কোন কিন্তু নয়।
তুমি বরং একটু বসো ,চা খেয়ে যাও।'
তুমি যে বলেছ এতেই আমার শান্তি কিন্তু তোমার শাশুড়ি মা যদি  অশান্তি করে।'
'করুক অশান্তি।তুমি তো চেন উনাকে? ওনার কথা অতো ধ'রো না মাসি ।বয়স হয়েছে তো।'

'কত বাড়িতে কাজ করেছি ,তোমার মত করে কেউ কথা বলে না বৌমা। সবাই তাদের কাজটাই বুঝে নিতে চায়।
আসি তাহলে বৌমা?'
যেতে গিয়ে আবার ফিরে এসে বলে
'আমি কি বিকেলে এসে  করে দেবো বৌমা কিছু?'
'তোমাকে বিকেলে আসতে হবে না।'
সারাদিন কি হ্যাপা পোহাতে হবে, কি হবে কে জানে ?ভগবান করুক সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যাক।'
ভগবানের কাছে এই প্রার্থনা একটু ক'রো  বৌমা,আমার এই পোষ্যর জন্য।'
'হ্যাঁ মাসি, সে কথা আর বলতে।
তুমি কোন চিন্তা ক'রো না ।দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে। তাড়াতাড়ি ডাক্তারের কাছে যাও।'
'আচ্ছা বৌমা, আসি তাহলে। তোমার খুব কষ্ট হবে আমি জানি।'
'তুমি সব জানো ।একদিন নয় আমার কষ্ট হবে, কি হবে তো?'
মাসি চলে যাবার পর দরজাটা লাগাতে গিয়ে দেখে ওই দিকের কালী আর তার বাচ্চা এসে হাজির রেখার আওয়াজ পেয়ে ।
আসলে ওই দিকের বাচ্চাগুলো তো রেখা খাবার দিতে যায়। কোন কারনে হয়তো যাচ্ছিল।
লেজ নাড়তে নাড়তে গেটের কাছে আসলো।
রেখা বলল'দাঁড়া, বিস্কিট নিয়ে আসি।
 আট-দশটা ব্রিটানিয়া বিস্কুট নিয়ে এল। রেখাকে দেখে বাচ্চাটা যেন হামলে পরল ।তখন রেখা আদর করে বিস্কিট গুলো খাওয়ালো ।
যা এবার খাওয়া হয়ে গেছে ।তোদের পাড়ায় যা। মিলি ওর বাচ্চা দেখলে কিন্তু চেঁচাবে।'
কি বুঝলো ,কে জানে? সত্যি সত্যি কালী তার বাচ্চা নিয়ে বেরিয়ে গেল। রেখা দরজা বন্ধ করে এসে ভাবতে লাগলো কোন কাজটা আগে করবে।
রেখা একটা ছক করে নিল কারণ স্কুলে যেতে হবে। তাড়াতাড়ি কাজে হাত লাগাবে।
ইতিমধ্যে রেখা বসার ঘরগুলো ঝাট দিতে শুরু করলো ।কোন কারণে  মনোজ টয়লেট যাবে বলে উঠেছে ।রেখাকে কাজ করতে দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল 
'তুমি উঠে কাজ করছ?কি ব্যাপার, মাসি আসবে না নাকি?'
'আজকে মাসি কাজে আসবে না। বলছিল ওর পোষা ছাগলটি নাকি বাচ্চা দেবে .তা ওর খুব সিরিয়াস অবস্থা ।বাচ্চার একটা পা বাইরে বেরিয়ে আছে ,বাকিটুকু সব ভেতরে অনেক টানাটানি করার পরও বাচ্চা বের করতে পারে নি। আহা রে গরিব মানুষ দুটো এসব পশু পুষে গরিবের টানাটানির সংসারে একটু আয়ের চেষ্টা।'
"কাজে এসেছিল মাসি?'
'হ্যাঁ এসেছিল।
আমি মাসিকে বাড়ি যেতে বললাম।'
"ঠিকই করেছ।
 না না চলে যাও ডাক্তার ডাক।'
মনোজ টয়লেট কোরে যাবার পথে একটা বড় হাই তুলে বলল 
"চা করেছ?'
তারপর কি মনে হল বসার ঘর টাতে টিভিটা চালিয়ে দিল।
নিউজ চ্যানেলে দেখাচ্ছে রাশিয়া-ইউক্রেন এর যুদ্ধ। কী ভয়ঙ্কর!
রেখাও তাকিয়ে থাকে। রেখার গা শিউরে ওঠে।
ছিন্নভিন্ন লাশ এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
রেখা হঠাৎ করেই কবিতা আবৃত্তি করে
কবি মৃদুল দাশগুপ্তের কবিতা'
"ক্রন্দনরতা জননীর পাশে
এখন যদি না থাকি
কেন তবে লেখা, কেন গান গাওয়া
কেন তবে আঁকাআঁকি?

নিহত ভাইয়ের শবদেহ দেখে 
না -ই যদি হয় ক্রোধ
কেন ভালোবাসা, কেন বা সমাজ
কিসের মূল্যবোধ!"

মনোজ বলল' কবি মৃদুল দাশগুপ্তের কবিতা আওরাচ্ছ ঠিক আছে।
 কিন্তু তুমিও তো  লেখিকা ।তুমি ও সমসাময়িক বিষয়  তোমার লেখায় স্থান দাও।"
রেখা কেমন অবাক হয়ে গেল। মনোজ রেখার লেখা নিয়ে ভাবছে ।
' ওকে বুঝেই উঠতেই পারে না রেখা ।আসলে কখন যে কি বলে?
মনোজ বলল 'চা দেবে?
 দিদি, মায়েরা তো ওঠেনি।'
ঠিক আছে চা করে আনছি বসো একটু।"
রেখা রান্নাঘরে গেল চা করতে ।এদিকে মাথার মধ্যে ঘুরছে  রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধের ভয়ঙ্কর দৃশ্য।
রেখার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে

'নিহত সব দেহের ওপর দাঁড়িয়ে
কিসের এত উল্লাস?
কত মা তার সন্তান  হারিয়ে
অন্ধ হলো চোখের জলে। 
কত পত্নী স্বামী হারালো
প্রেমিকা   প্রেমিককে।
আর..
 অগণিত সাধারণ মানুষ
প্রাণ দিল অকারণে। 
তবুও  হয় না জাগ্রত বিবেক
নির্লজ্জ অমানুষদের।
জিহ্বা তাদের লকলক করে
ক্ষমতার লোভে বলিয়ান হয়ে।
চালায় অসংখ্য গোলাবারুদ
তাজা প্রাণ ঝরায় অকাতরে।
একবার যদি তাকিয়ে দেখত
 ওই প্রেমিকার  দুটি চোখ
দেখ তো কত ভালোবাসা র
 বীজ লুকিয়ে আছে
সৃষ্টি হতো শত শত।
সৃষ্টির চেয়ে  মহৎ আর
কিছু নেই যে ভবে।
ধ্বংসলীলায় মত্ত হয়ে
কষ্ট শুধু বাড়ে
এই বোধ এই চেতনা যেদিন
আসবে ঘুরে মনে।
তখন..
পৃথিবীটাই অন্যরকম হবে।'

মনোজ বলল' বাহ কি অসাধারণ বললে গো।'
কবিতাটার একটা নাম দিয়ে তুমি পত্রিকায় দিয়ে দাও না।
দূর লিখছি এখন উপন্যাস ।এখন আবার কবিতা?
অনেকদিন পর দুজনে চা খেতে খেতে গল্প করছে।
ভয়ঙ্কর কোনো পরিস্থিতি মানুষকে কাছে এনে দেয় যুদ্ধের এই ভয়ঙ্কর খবরটা শুনে বোধহয় একটা আলাদা রকম রেখার মনোজের জীবনে মাত্রা এনে দিল।
এমন সময় রেখার ননদ শাশুড়ি মা ঘুম থেকে উঠে একই ঘরে দুজনকে দেখে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন কিন্তু মুখে কিছু প্রথমে বললেন না।
মনোজ বলল' দিদি মা এসো চা খাবে?'
 মনোজের দিদি বলল ' না আমাদের ঘরে চা দিতে বল?'
ঠিক আছে।
"রেখা ওই ঘরে গিয়ে চা টা দিয়ে আসো।
মা শোনো আজকে মাসি কাজে আসবে না।
আর  রেখা তো  স্কুলে যাবে। সব রান্না করে উঠতে পারবে না। তোমরা হাতে হাতে করে নিও।'
 রেখা কেমন অবাক হয়ে গেলো 
রেখা ঝটপট চা দিয়ে কাজগুলো গুছিয়ে নিল।
মিলিদের খাবার টা আগেই করেছিল,ওদের খাবারটাও দিয়ে আসলো।
বেসিনে গাদাগুচ্ছ বাসন  জমানো আছে। চটপট হাত লাগাল।
এদিকে জলখাবার করতে হবে।
বাসন মাজার আগে একদিকে পেশার কুকারে ডাল অন্যদিকে আলু চচ্চড়ি বসিয়ে দিলো।
বাসন মাজা হয়ে গেলে পরোটা করে ফেলল।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন টাইম হয়ে যাচ্ছে আর কিছু করতে পারবে না রেখা।
তবে ডাল সাতলে নেবার আগে বেগুন ভাজা করে নিল।

এবার রেখা স্নান করতে গেল। স্নান সেরে এসে ঝটপট পুজোর ঘরে গেল। শাশুড়ি মা তো বলেই খালাস পুজো করবেন। একদিনও পুজো করতে ঢোকেন না।
তাই ওনার ভরসায় না রাখাই ভালো ।বাড়িতে গোপাল আছে।

পুজো সেরে এসে মনোজ কে  বললো 
'তোমার জলখাবার কি এখন দিয়ে দেব?'
'হ্যাঁ দিয়ে দাও।
মা, দিদি তোমরা এখন খাবে নাস্তা?'
', এখন খাব না।'
'ঠিক আছে। রেখা ,তাহলে তুমি খেয়ে নাও।'
 খেয়ে তুমি স্কুলে চলে যাও।'
রেখা অবাক হয়ে যাচ্ছে এই টুকুই তো শুধু চেয়েছে ? অথচ রেখাকে টানাপোড়েনের মধ্যে রাখতেই হবে।কেন যে মাঝে মাঝে মনোজ এরকম করে ওর সাথে ? রোদ্দুর ভরা আকাশে  মাঝে মাঝে মেঘ ঘনিয়ে আসে। বুঝে উঠতে পারে
 না ।সেই মেঘটা যদি সাময়িক হয় ,তাও হয় ।তার স্থায়িত্ব টা অনেক বেশি থেকে যায় ,চারিদিক তখন শুধু মনে হয় অন্ধকার আর অন্ধকার। দিশেহারা রেখা আলোর পথ হাতড়ে বেড়ায়।
সব সময় একটা মানসিক যুদ্ধ মাঝে মাঝে ঠেলে দেয় অন্য জগতে অথচ রেখা চেয়েছে মনোজকে নিয়ে একটা সুন্দর পৃথিবী গড়তে ।সেই পৃথিবীতে শুধু থাকবে চিরশান্তি।

কবি তাহেরা আফরোজ এর কবিতা "শূন্যপুরে"




শূণ্যপুরে 
তাহেরা আফরোজ

নদীর মতো কুলু কুলু শব্দে বয়ে যায় 
প্রেম নাকি বিষাদ বুঝতে পারি না 
কেবল শূন্যতা টের পাই 
যতদূর দৃষ্টির সীমানা, ততোদূর বিস্তৃত শূণ্যতা।
পূর্ণতা দেবার প্রতিজ্ঞায় অবিচল থাকা যে মানুষ 
সেও শূণ্যপুরে টেনে নেয় আমাকে, 
আমার করতলে ফোঁটা সব পদ্ম 
হাওয়ায় উড়ে যায় 
আমি তাকে ধরতে চাই না 
আমি তাকে ধরতে যাই না।

কবি সুপর্ণা চ‍্যাটার্জ্জীর কবিতা




হঠাৎ ভালোলাগা 
সুপর্ণা চ‍্যাটার্জ্জী



কেমন করে হঠাৎ যেন ভালো লেগে গেল
সবকিছুকে।
ভালো লেগে গেল
দূরের সবুজ ও নীল দিগন্তকে।
ভালো লেগে গেল 
বৈশাখ ও  জৈষ্ঠ‍্যের ঝোড়ো হাওয়া 
আর মেঘলা আকাশকে।
কেন জানিনা 
খুব ইচ্ছে করে হাওয়ার সাথে ছুটে চলি
ক্ষেতের পারের আল ধরে।
কে যেন শুধালো কেমনকরে লাগল ভালো?
বলব নাগো সেই কথাটি,
সে যে আমার গোপন ঘরের আসল চাবি কাঠি।
ঐটুকু মোর সম্বল,
কেউ নিওনা কেড়ে 
যা আছে মোর করনীয় 
করব আমি সবার তরে।

কবি গোলাম কবির এর কবিতা





হাসির রাণীকে নিয়ে কবিতা 

   গোলাম কবির


   ফেসবুকে আমার একজন খুব কাছের
   দিদিমণি আছেন, তিনি প্রায়ই লিখেন - 
  " একদিন হারিয়ে যাবো এই অভিনয়ের
   শহর ছেড়ে! " কথাটা ভীষণ সত্যি!
  কিন্তু কিরকম সাবলীল ভাবে লিখেন 
  কথা গুলো ভাবতে অবাক লাগে! 
  এতো হাসিখুশি মেয়ের এই লিখা পড়ে 
  হৃদয় আদ্র হয় প্রায়শই, অথচ তাকে 
   আমি নাম দিয়েছি " হাসির রাণী "!  
  মাঝেমধ্যে ভাবি কি এমন দুঃখ আছে
  ওর যা সকলের কাছেই লুকিয়ে রাখে
  অথচ কী সুন্দর করে মজার মজার 
  পোস্ট দিতেই থাকে অবিরাম! 
  মানুষের মুখ এখনো পড়তে পারলাম না
  ভালো করে, কেউ কি পারে! 
  একটা মানুষ কী সুন্দর হাসে, সংসার করে, 
  কবিতা লিখে, মানুষকে হাসিয়ে মাতিয়ে 
  রাখে অথচ ঝিনুকের মতো নিজের
  ভিতরের কষ্টকে লুকিয়ে রাখে সযতনে, 
  তখন আমারও বলতে ইচ্ছে করে - 
  সত্যিই সেলুকাস, কি বিচিত্র এই দেশ 
  এবং দেশের মানুষ গুলো!

( কবিতাটি কবি বৈশাখী দাস ঝিলিক দিদিমণি কে উৎসর্গ করলাম)

কবি সেলিম সেখ এর কবিতা




যুদ্ধ নয় শান্তি চাই
 সেলিম সেখ

বইয়ের পাতায় পড়েছি মোরা 
যুদ্ধের সেই কথা,
স্বচক্ষে আজ দেখছে বিশ্ব
যুদ্ধের ওই ভয়াবহতা। 

মাথার ওপর উড়ছে বোমারু
পায়না জনমানব ঠাঁই, 
যুদ্ধের ওই রক্ত খেলায়
তাদের অনেক মজা চাই? 

করতে যুদ্ধ মোকাবেলা
নিয়েছে হাতে অস্ত্র, 
ভুখা পেটে চলছে তারা
পরনে ছিন্ন বস্ত্র।

দেশ বাঁচানোর তাগিদে
বেঁধেছে মাথায় কাফন, 
যদি যায় প্রাণটা চলে
হয় যেন তাতে দাফন।

স্কুল-কলেজ বৈদ্যশালা
করেছে লুটোপুটি ধুলায়, 
নতুন সূর্য দেখবে বলে
মনকে সদা ভোলায়। 

যেথা যাই আঁখি মোর
দেখে শুধু শব, 
মাটিতে শিশু নর-নারী
থামে না মোর ক্ষোভ। 

মানুষ হোক শান্তিপ্রিয়
ফিরুক আবার শান্তি, 
পৃথিবী হোক মানবপ্রেমী
কাটুক সকলের ভ্রান্তি। 

থামুক যুদ্ধ ফিরুক শান্তি
করি মিনতি প্রভু, 
এমন দৃশ্য দু নয়নে
চাইনা দেখতে কভু।

শামীমা আহমেদ এর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৭৬





ধারাবাহিক উপন্যাস 


শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত (পর্ব ৭৬)
শামীমা আহমেদ 

বারান্দায় বসে কাপের চা শেষ করে সিগারেট ফিল্টার এস্ট্রেতে গুজে দিয়ে শিহাব অফিসে যাওয়ার তাড়নায় উঠে দাঁড়ালো। ভেবে নিলো দ্রুত শাওয়ার সেরে বেরিয়ে যেতে হবে। বারান্দায় শুকাতে দেয়া নীল তোয়ালেটি খুঁজতেই দেখা গেলো রিশতিনা টাওয়েল হাতে নিয়ে অপেক্ষা করছে। শিহাব একটু চমকেই গেলো ! তবুও নিজেকে সংযত করে এক হেচকা টানে টাওয়েল নিয়ে বেশ বড় বড় পা ফেলে হেঁটে ওয়াশরুমে ঢুকল। রিশতিনা নির্বিকার দৃষ্টিতে শিহাবের দিকে তাকিয়ে রইল।ভাবলো, এই মানুষটা একসময় তারই ছিলো। সে নিজেও  কতটাই না আপন ছিল তার। দুজন দুজনার জন্য সেকি অনুভুতি আবেগের প্রকাশ ছিল।মনে হতো পৃথিবীর আর সব কিছুই তুচ্ছ।রিশতিনার বিয়ের দিনটির কথা ভীষণভাবে মনে পড়তে লাগলো। সেদিন ছিল অক্টোবর মাসের আঠারো তারিখ।দুজনে সকাল দশটায় শিহাবের এক সিনিয়র ভাই এবং বন্ধু নাঈম ভাইয়ের বাসায় যায়।তখন শিহাবকে  খুবই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত লাগছিল। সেখানে সামান্য নাস্তা সেরে সবাই কিভাবে কি করা যায়বতার আলোচনা চলছিল। রিশতিনার মনে আছে সেদিন সে  নীল শাড়ি পরেছিল আর শিহাব কালো শার্ট আর ক্রীম কালারের প্যান্ট পরেছিল।চোখে সানগ্লাস সেঁটে দুপুরে যখন কাজী অফিসের জন্য বেরুলো রিশতিনা অবাক হয়ে শিহাবের দিকে তাকিয়ে ছিল।রিশতিনা মুগ্ধ হয়ে শুধু শিহাবকেই দেখছিল!  শিহাবের কয়েকজন বন্ধুকে সাক্ষী করে   বিয়ে পড়ানো হয়। যদিও শিহাব এভাবে বিয়েটা করতে চায়নি কিন্তু রিশতিনার প্রবল চাওয়াকে বাস্তবরূপ দিতেই শিহাব রাজি হয়েছিল। রিশতিনা একদিকে যেমন বাবামায়ের প্রচন্ড শাসনে দমবন্ধ করা পরিস্থিতি থেকে বেরুতে চাইছিল আরেকদিকে ছিল ভীষণভাবে শিহাবকে হারানোর ভয়। তাইতো তার এত তাড়া ছিল। বিয়ে সেরে গুটিগুটি পায়ে দুজনে শিহাবদের বাড়িতে প্রবেশ করে।শিহাবের মা ভাবী সবাই তাকে সহজভাবে গ্রহন করলেও তাদের সবার চোখে মুখে ছিল এক চাপা ভীতি আর আতংক ! যে কোন মূহুর্তে রিশতিনার বাবার প্রবেশ ঘটতে পারে,ঘটতে পারে যে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা। ভাবী খুব অল্প সময় পেলেও ওদের বাসর ঘরটি ফুলে ফুলে খুব সুন্দর করে সাজিয়েছিল।সারাটা রাত রজনীগন্ধা আর বেলির ঘ্রাণে দুজনের সে এক মাতোয়ারা রাত কেটেছে ! এরপর রাত গভীরে কিছুটা সময় দুজন বারান্দায় নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থেকে একরাতে যতখানি সুখ শুষে নেয়া যায় তাতে পূর্ণ করেছে আর যখন ভোর ঘনিয়ে আসে রিশতিনা শিহাবের বুকে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ে। 
এসব  ভাবতে গিয়ে রিশতিনার চোখে জল ভরে গেলো। অথচ সে এখন শিহাবের বিছানায় একাকী বসে আছে। কাল রাতে একাকী রাত কাটিয়েছে।আর এজন্য শিহাবের মনে এতটুকু দুঃখবোধ নেই। এভাবেই শিহাব নিজেকে দূরে সরিয়ে নিলো ? রিশতিনার মনের ভেতর একটাই প্রশ্ন, কোথায় হারিয়ে গেলো সেই সুন্দর মায়াবী রাত ? বিবাহিত জীবনের দুইটি মাস যেন চোখের পলকে ফুরিয়ে গেছে ! কেমন করে শিহাব এতখানি বদলে গেলো ? সেতো শিহাবের অপেক্ষায় ছিলো কিন্তু শিহাব কেন তারজন্য অপেক্ষা করলো না।কেন তার জায়গায় অন্য আরেকজনকে মনে ঠাঁই দিলো। হঠাৎ ওয়াশরুম খোলার শব্দে রিশতিনা তাকাতেই শিহাবের দিকে চোখ আটকে গেলো। ভেজা শরীরে শিহাবের গায়ে বিন্দু বিন্দু জলকণা, ধবধবে সাদা শরীরে মনে হচ্ছে মুক্তোদানা বসানো ! নিচের অংশে আকাশনীলা টাওয়েল জড়ানো। রিশতিনার চোখে চোখ পড়তেই শিহাব একটু লজ্জিত হলো।এভাবে বেরিয়ে একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলো।হয়তো সে রিশতিনার কথা ভুলেই গিয়েছিল। রিশতিনা পরিবেশটা স্বাভাবিক করতে বিছানা ছেড়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো। নিচে রাস্তায় গাড়ি চলাচল দেখতে লাগলো। শিহাবকে নিজের স্বাধীনমত তৈরি হতে রিশতিনা দূরত্ব নিলো।যদিও বিয়ের পরের দুটি মাস রিশতিনা শিহাবের বাইরে যেতে হলে শার্ট প্যান্ট ম্যাচিং করে গুছিয়ে দিতো। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ছেলেমেয়েরা একটু এডভান্স এসব ব্যাপারে বেশ স্মার্টই থাকে।
শিহাব নিজের মত তৈরি হয়ে নিলো। এখন বেরুতে হবে।হাতে মোবাইল, বাইকের চাবি, হেলমেট সানগ্লাস নিয়ে ঘরের চাবি হাতে নিতেই রিশতিনার কথা খেয়াল হলো। সে বারান্দার দিকে এগিয়ে গেলো,রিশতিনাকে কোন নামে সম্বোধন না করে বললো, আমি যাচ্ছি।  ঘরের চাবিটা টেবিলে রইল। তুমি যাওয়ার সময়  লক করে চাবিটা কেয়ারটেকার বিল্লালের কাছে রেখে যেও। কথাটা শুনে রিশতিনার বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে গেলো, চোখ জলে ভরে উঠলো। 
তবে কি শিহাব চাইছে না যে সে এখানে আর থাকুক।এখনো কি তাকে ক্ষমা করা যায়না ? 
শিহাব আবার বলে উঠলো, আমি যাচ্ছি।
রিশতিনা এবার পিছনে ফিরলো এবং যারপরনাই অত্যাশ্চর্য হয়ে গেলো।শিহাব আজো সেই বিয়ের দিনের কম্বিনেশনের শার্ট প্যান্ট পরা! কালো শার্ট আর ক্রীম প্যান্ট!
শিহাব পিছনে আর না তাকিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে লিফট কল দিলো। মনে মনে ভেবে নিলো, রাতে শায়লার সাথে ভালোভাবে কথা বলা হয়নি। অফিসে গিয়ে কল দিতে হবে।
দরজা খোলাই রইল।রিশতিনা অচেনা এক শিহাবের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে পাথরের মূর্তির মত দাঁড়িয়ে রইল। 


চলবে...