উপন্যাস
টানাপোড়েন ১৪১
অন্য পৃথিবীর স্বপ্ন
মমতা রায়চৌধুরী
সাতসকালে কলিং বেল বাজছে ''জয় রাধা মাধব জয় রাধা মাধব।" রেখা বাথরুমে থেকে কলিংবেলের আওয়াজ পাচ্ছে কিন্তু বের হতে পারছে না ,বেরোনোর কন্ডিশন নেই। আবার বাজছে' জয় রাধা মাধব, জয় রাধা মাধব ,জয় রাধা মাধব।'
রেখা ল্যাট্রিনের কলটা ফ্ল্যাশ করার পর তাড়াতাড়ি হাত পা ভালো করে ধুয়ে ছুটল দরজা খোলার জন্য।
রেখা মনে মনে বলল যেন যমরাজ নিতে আসলেও এ সংসারে কাজের জন্য আবার ফেরত আসতে হবে।
দরজা খুলেই তো রেখা অবাক
'একি মাসি ,তুমি ভোর পাঁচটায় এসে হাজির।'
মাসির চোখ মুখ শুকনো লাগছে, কিছু কি
হয়েছে ?মনে মনে ভাবছে রেখা।
'আর বোলো না বৌমা ,আমার ছাগলটা বাচ্চা দিতে গিয়ে কি কষ্ট পাচ্ছে বাচ্চা বের করতে পারছি না।'
মাসির চোখ দুটো জলে ভিজে গেল কথা বলতে বলতে।
সেকি মাসি?
তাই একটু তাড়াতাড়ি আসলাম কাজগুলো করে দিয়ে চলে যাব।
'তুমি ডাক্তারের কাছে যাও ।তোমাকে আজকে কাজ করতে হবে না।'
' মাসি কেমন অবাক হয়ে রেখার দিকে তাকিয়ে থাকলো। তারপর আর যেন চোখের জল বাগ মানলো না।
'কি বলছো বৌমা ,কাজ না করে চলে যাব?'
'আমি তো তোমাকে বলছি তুমি চলে যাও। তোমার কাজের থেকে ওর যে প্রাণ বাঁচানো অনেক বেশি জরুরী মাসি।
অনেক কষ্ট পাচ্ছে তুমি তাড়াতাড়ি ডাক্তারের কাছে যাও।'
রেখা বুঝল মাসির পৃথিবীটা ওদেরকে নিয়েই ওদের ভালো থাকা, মাসির ভালো থাকা।
'কিন্তু..?'
'কোন কিন্তু নয়।
তুমি বরং একটু বসো ,চা খেয়ে যাও।'
তুমি যে বলেছ এতেই আমার শান্তি কিন্তু তোমার শাশুড়ি মা যদি অশান্তি করে।'
'করুক অশান্তি।তুমি তো চেন উনাকে? ওনার কথা অতো ধ'রো না মাসি ।বয়স হয়েছে তো।'
'কত বাড়িতে কাজ করেছি ,তোমার মত করে কেউ কথা বলে না বৌমা। সবাই তাদের কাজটাই বুঝে নিতে চায়।
আসি তাহলে বৌমা?'
যেতে গিয়ে আবার ফিরে এসে বলে
'আমি কি বিকেলে এসে করে দেবো বৌমা কিছু?'
'তোমাকে বিকেলে আসতে হবে না।'
সারাদিন কি হ্যাপা পোহাতে হবে, কি হবে কে জানে ?ভগবান করুক সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যাক।'
ভগবানের কাছে এই প্রার্থনা একটু ক'রো বৌমা,আমার এই পোষ্যর জন্য।'
'হ্যাঁ মাসি, সে কথা আর বলতে।
তুমি কোন চিন্তা ক'রো না ।দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে। তাড়াতাড়ি ডাক্তারের কাছে যাও।'
'আচ্ছা বৌমা, আসি তাহলে। তোমার খুব কষ্ট হবে আমি জানি।'
'তুমি সব জানো ।একদিন নয় আমার কষ্ট হবে, কি হবে তো?'
মাসি চলে যাবার পর দরজাটা লাগাতে গিয়ে দেখে ওই দিকের কালী আর তার বাচ্চা এসে হাজির রেখার আওয়াজ পেয়ে ।
আসলে ওই দিকের বাচ্চাগুলো তো রেখা খাবার দিতে যায়। কোন কারনে হয়তো যাচ্ছিল।
লেজ নাড়তে নাড়তে গেটের কাছে আসলো।
রেখা বলল'দাঁড়া, বিস্কিট নিয়ে আসি।
আট-দশটা ব্রিটানিয়া বিস্কুট নিয়ে এল। রেখাকে দেখে বাচ্চাটা যেন হামলে পরল ।তখন রেখা আদর করে বিস্কিট গুলো খাওয়ালো ।
যা এবার খাওয়া হয়ে গেছে ।তোদের পাড়ায় যা। মিলি ওর বাচ্চা দেখলে কিন্তু চেঁচাবে।'
কি বুঝলো ,কে জানে? সত্যি সত্যি কালী তার বাচ্চা নিয়ে বেরিয়ে গেল। রেখা দরজা বন্ধ করে এসে ভাবতে লাগলো কোন কাজটা আগে করবে।
রেখা একটা ছক করে নিল কারণ স্কুলে যেতে হবে। তাড়াতাড়ি কাজে হাত লাগাবে।
ইতিমধ্যে রেখা বসার ঘরগুলো ঝাট দিতে শুরু করলো ।কোন কারণে মনোজ টয়লেট যাবে বলে উঠেছে ।রেখাকে কাজ করতে দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল
'তুমি উঠে কাজ করছ?কি ব্যাপার, মাসি আসবে না নাকি?'
'আজকে মাসি কাজে আসবে না। বলছিল ওর পোষা ছাগলটি নাকি বাচ্চা দেবে .তা ওর খুব সিরিয়াস অবস্থা ।বাচ্চার একটা পা বাইরে বেরিয়ে আছে ,বাকিটুকু সব ভেতরে অনেক টানাটানি করার পরও বাচ্চা বের করতে পারে নি। আহা রে গরিব মানুষ দুটো এসব পশু পুষে গরিবের টানাটানির সংসারে একটু আয়ের চেষ্টা।'
"কাজে এসেছিল মাসি?'
'হ্যাঁ এসেছিল।
আমি মাসিকে বাড়ি যেতে বললাম।'
"ঠিকই করেছ।
না না চলে যাও ডাক্তার ডাক।'
মনোজ টয়লেট কোরে যাবার পথে একটা বড় হাই তুলে বলল
"চা করেছ?'
তারপর কি মনে হল বসার ঘর টাতে টিভিটা চালিয়ে দিল।
নিউজ চ্যানেলে দেখাচ্ছে রাশিয়া-ইউক্রেন এর যুদ্ধ। কী ভয়ঙ্কর!
রেখাও তাকিয়ে থাকে। রেখার গা শিউরে ওঠে।
ছিন্নভিন্ন লাশ এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
রেখা হঠাৎ করেই কবিতা আবৃত্তি করে
কবি মৃদুল দাশগুপ্তের কবিতা'
"ক্রন্দনরতা জননীর পাশে
এখন যদি না থাকি
কেন তবে লেখা, কেন গান গাওয়া
কেন তবে আঁকাআঁকি?
নিহত ভাইয়ের শবদেহ দেখে
না -ই যদি হয় ক্রোধ
কেন ভালোবাসা, কেন বা সমাজ
কিসের মূল্যবোধ!"
মনোজ বলল' কবি মৃদুল দাশগুপ্তের কবিতা আওরাচ্ছ ঠিক আছে।
কিন্তু তুমিও তো লেখিকা ।তুমি ও সমসাময়িক বিষয় তোমার লেখায় স্থান দাও।"
রেখা কেমন অবাক হয়ে গেল। মনোজ রেখার লেখা নিয়ে ভাবছে ।
' ওকে বুঝেই উঠতেই পারে না রেখা ।আসলে কখন যে কি বলে?
মনোজ বলল 'চা দেবে?
দিদি, মায়েরা তো ওঠেনি।'
ঠিক আছে চা করে আনছি বসো একটু।"
রেখা রান্নাঘরে গেল চা করতে ।এদিকে মাথার মধ্যে ঘুরছে রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধের ভয়ঙ্কর দৃশ্য।
রেখার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে
'নিহত সব দেহের ওপর দাঁড়িয়ে
কিসের এত উল্লাস?
কত মা তার সন্তান হারিয়ে
অন্ধ হলো চোখের জলে।
কত পত্নী স্বামী হারালো
প্রেমিকা প্রেমিককে।
আর..
অগণিত সাধারণ মানুষ
প্রাণ দিল অকারণে।
তবুও হয় না জাগ্রত বিবেক
নির্লজ্জ অমানুষদের।
জিহ্বা তাদের লকলক করে
ক্ষমতার লোভে বলিয়ান হয়ে।
চালায় অসংখ্য গোলাবারুদ
তাজা প্রাণ ঝরায় অকাতরে।
একবার যদি তাকিয়ে দেখত
ওই প্রেমিকার দুটি চোখ
দেখ তো কত ভালোবাসা র
বীজ লুকিয়ে আছে
সৃষ্টি হতো শত শত।
সৃষ্টির চেয়ে মহৎ আর
কিছু নেই যে ভবে।
ধ্বংসলীলায় মত্ত হয়ে
কষ্ট শুধু বাড়ে
এই বোধ এই চেতনা যেদিন
আসবে ঘুরে মনে।
তখন..
পৃথিবীটাই অন্যরকম হবে।'
মনোজ বলল' বাহ কি অসাধারণ বললে গো।'
কবিতাটার একটা নাম দিয়ে তুমি পত্রিকায় দিয়ে দাও না।
দূর লিখছি এখন উপন্যাস ।এখন আবার কবিতা?
অনেকদিন পর দুজনে চা খেতে খেতে গল্প করছে।
ভয়ঙ্কর কোনো পরিস্থিতি মানুষকে কাছে এনে দেয় যুদ্ধের এই ভয়ঙ্কর খবরটা শুনে বোধহয় একটা আলাদা রকম রেখার মনোজের জীবনে মাত্রা এনে দিল।
এমন সময় রেখার ননদ শাশুড়ি মা ঘুম থেকে উঠে একই ঘরে দুজনকে দেখে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন কিন্তু মুখে কিছু প্রথমে বললেন না।
মনোজ বলল' দিদি মা এসো চা খাবে?'
মনোজের দিদি বলল ' না আমাদের ঘরে চা দিতে বল?'
ঠিক আছে।
"রেখা ওই ঘরে গিয়ে চা টা দিয়ে আসো।
মা শোনো আজকে মাসি কাজে আসবে না।
আর রেখা তো স্কুলে যাবে। সব রান্না করে উঠতে পারবে না। তোমরা হাতে হাতে করে নিও।'
রেখা কেমন অবাক হয়ে গেলো
রেখা ঝটপট চা দিয়ে কাজগুলো গুছিয়ে নিল।
মিলিদের খাবার টা আগেই করেছিল,ওদের খাবারটাও দিয়ে আসলো।
বেসিনে গাদাগুচ্ছ বাসন জমানো আছে। চটপট হাত লাগাল।
এদিকে জলখাবার করতে হবে।
বাসন মাজার আগে একদিকে পেশার কুকারে ডাল অন্যদিকে আলু চচ্চড়ি বসিয়ে দিলো।
বাসন মাজা হয়ে গেলে পরোটা করে ফেলল।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন টাইম হয়ে যাচ্ছে আর কিছু করতে পারবে না রেখা।
তবে ডাল সাতলে নেবার আগে বেগুন ভাজা করে নিল।
এবার রেখা স্নান করতে গেল। স্নান সেরে এসে ঝটপট পুজোর ঘরে গেল। শাশুড়ি মা তো বলেই খালাস পুজো করবেন। একদিনও পুজো করতে ঢোকেন না।
তাই ওনার ভরসায় না রাখাই ভালো ।বাড়িতে গোপাল আছে।
পুজো সেরে এসে মনোজ কে বললো
'তোমার জলখাবার কি এখন দিয়ে দেব?'
'হ্যাঁ দিয়ে দাও।
মা, দিদি তোমরা এখন খাবে নাস্তা?'
', এখন খাব না।'
'ঠিক আছে। রেখা ,তাহলে তুমি খেয়ে নাও।'
খেয়ে তুমি স্কুলে চলে যাও।'
রেখা অবাক হয়ে যাচ্ছে এই টুকুই তো শুধু চেয়েছে ? অথচ রেখাকে টানাপোড়েনের মধ্যে রাখতেই হবে।কেন যে মাঝে মাঝে মনোজ এরকম করে ওর সাথে ? রোদ্দুর ভরা আকাশে মাঝে মাঝে মেঘ ঘনিয়ে আসে। বুঝে উঠতে পারে
না ।সেই মেঘটা যদি সাময়িক হয় ,তাও হয় ।তার স্থায়িত্ব টা অনেক বেশি থেকে যায় ,চারিদিক তখন শুধু মনে হয় অন্ধকার আর অন্ধকার। দিশেহারা রেখা আলোর পথ হাতড়ে বেড়ায়।
সব সময় একটা মানসিক যুদ্ধ মাঝে মাঝে ঠেলে দেয় অন্য জগতে অথচ রেখা চেয়েছে মনোজকে নিয়ে একটা সুন্দর পৃথিবী গড়তে ।সেই পৃথিবীতে শুধু থাকবে চিরশান্তি।