একান্ত মনেই লিখে চলেছেন লেখক। তার নিত্যদিনের আসা যাওয়া ঘটনার কিছু স্মৃতি কিছু কল্পনার মোচড়ে লিখছেন ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন "।
টানাপোড়েন (২২)
মন খোঁজে ভালোবাসার নীড়
দীর্ঘ ৭৫ বছরের বাড়ি। একসময় এই বাড়ি শহরের লোক চোখ তুলে তাকিয়ে দেখত। নামডাকও ছিল বাড়ির। এখনো চোখ তুলে তাকিয়ে দেখে শহরের সবথেকে জীর্ণ বাড়িটা ,চারিদিক থেকে পলেস্তার খসে খসে পড়ছে ,। আগেকার দিনের কড়ি বর্গার ঘর। যৌথ সম্পত্তি হলে যা হয়। রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কারো কোন হেলদোল নেই। চলছে যে রকম চলুক। বাড়ি টা দেখলে মনে হয় দূর থেকে জবুথবু বৃদ্ধ মুখ থুবরে পড়বে। বলে না ভাগের মা গঙ্গা পায় না। বাড়িটা সংস্কার করার জন্য সেই রকমই অবস্থা। এ বলে ও করবে।ও বলে এ করবে। কিন্তু সেদিন দুপুরবেলা জাঁকিয়ে বৃষ্টি পড়ছিল ।খাটের উপর বসে ছাদ থেকে তুলে আনা শুকনো জামা কাপড়গুলো পাট পাট করে ভাঁজ করছে বিপাশা। হঠাৎই মাথার ওপরে একটা ক্রাক করে আওয়াজ হয় ,সঙ্গে সঙ্গে উপরের দিকে তাকিয়ে দেখে কড়ি,বর্গা ভেঙ্গে পড়বে। মনে হচ্ছে যেন পুরো ছাদটা মাটির নিচে পড়বে। সঙ্গে সঙ্গে ভয়ে বিপাশা হুটোপুটি করে বেরোতে যায় ঘর থেকে ।যদি বিপদ থাকে কপালে ,কে ঠেকাবে?বেরোতে গিয়ে টেবিলের ধাক্কা লেগে ,তারওপর সাজানো স্টিল কাঁসার বাসন ঝনঝন আওয়াজ করে পরল পায়ের উপর। পায়ের আঙুলে চোট লাগল সাংঘাতিক। যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে ফোন করল দীপককে। সেদিন দীপকের ছুটির দিন ছিল ।বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা মারতে গেছে। কয়েকবার ফোন করার পরও যখন ধরল না । বিপাশা পা ফেলতে পারছে না ।এদিকে ঘরের ওই রকম পরিস্থিতি। তখন সে আবার রিং ব্যাক করে কিন্তু নো আনসার।ছেলেদুটো তখন নিচে খেলা করছিল ।টুবলু, টুকাই বলে হাঁক দিতেই ওরা ছুটে এসে মাকে এ রকম অবস্থায় দেখতে পেয়ে আর ঘরের ওই কন্ডিশন দেখে ওরাও ভয় পেয়ে যায় ।তখন টুকাই বাবাকে ফোন করে।
দীপক ফোন রিসিভ করে একটু বিরক্তির স্বরে বলে "একটু ছুটির দিনেও বন্ধুদের কাছে এসে গল্প করবো সেটাও তোমার সহ্য হচ্ছে না ।"
কিন্তু যখন টুকাই বলল 'আমি টুকাই বলছি বাবা ।মায়ের পায়ে প্রচন্ড চোট লেগেছে।তুমি তাড়াতাড়ি এসো "
দীপক বলে 'ঠিক আছে তোমাদের অত চিন্তা করতে হবে না ।সেরে যাবে।'
তখন টুকাই আবার বলে 'কিন্তু বাবা,-মায়ের খুব যন্ত্রণা হচ্ছে ।তুমি একবার আসো না ।ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে।'
দীপক বলে 'আমি ঠিক টাইমে চলে যাব ।
তোমাদের অত ভাবতে হবে না।'
কিন্তু টূকাই যখন বলে 'এদিকে আমাদের ঘরের কড়ি বর্গা ভেঙে গেছে ।'
দীপক অবাক হয়ে বলে "কি বলছিস টুকাই।'
প্রথমদিকে মায়ের কথা শুনে আমল দেয় নি ।কিন্তু পরের কথাটা যখন বলেছে কড়ি বর্গা ভেঙে পড়ার উপক্রম ।
তখন দীপক বলে 'ঠিক আছে। আমি আসছি।' বিপাশা সবকিছু শুনে ,ভেবে পায় না সত্যিই কোনো দিনও কি সে দীপকের মন পাবে না? কোনদিনও কি তার জীবনে ভালোবাসার সোনালী রোদ্দুর উঁকি দেবে না ।দীপক যা চেয়েছে ,সেরকমই হবার চেষ্টা করেছে ।কিন্তু তারপরেও মনের কোণে জায়গা নেই ।বোধহয় টুবলু টুকাইয়েরর জন্যই তাদের সম্পর্কটা টিকে রয়েছে ।অথচ বিপাশা তার স্বামীকে ভালোবাসে । তাই সে প্রত্যাশা করেছিল আজকের দিনটা অন্তত দীপক সহানুভূতির সঙ্গে ব্যাপারটা দেখবে ।সঙ্গে সঙ্গে ছুটে আসবে ।কিন্তু না স্ত্রীর জন্য নয।কড়ি বর্গা ভেঙে পড়ছে , সেজন্যেই উদগ্রীব হয়ে ছুটে এসেছে।
বাড়িতে এসেই দীপক বলল 'তোমার কি কোনদিনও কান্ডজ্ঞান হবে না বিপাশা। বাড়ির এই রকম অবস্থার খবর দিচ্ছ কত পরে। বলেই ফোন করতে শুরু করলো 'হ্যালো'
ওপার থেকে কন্ঠ ভেসে এলো 'কে?'
দীপক বলল 'আরে রবি, আমি দীপকদা বলছি।'
ফোনের ওপার থেকে আবারো কণ্ঠস্বর এলো "ভালো শোনা যাচ্ছে না। কে বলছেন?'
এদিকে বাইরে ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে তার আওয়াজ এতটাই জোরালো যে ফোনের কথা স্পষ্ট হচ্ছে না। দীপক আবার বলল 'রবি ,আমি দীপকদা বলছি।"
এবার রবি বলল 'হ্যাঁ ,দীপকদা বলুন।'
দীপক বলল "এক্ষুনি একবার আমাদের বাড়িতে আয় না ভাই। আমাদের কড়ি বর্গাটা ভেঙে পড়ছে একটু ব্যবস্থা করতে হবে।'
রবি বলল "কিন্তু দাদা বাইরে প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে এই মুহূর্তে কি করে যাব আপনার বাড়িতে?'
দীপক অনুনয়ের সুরে বলল 'দেখ ভাই একটু চেষ্টা কর না হলে তো আমরা মারা পড়বো।'
রবি বলল "ঠিক আছে দাদা ।যাচ্ছি"।
বিপাশা তখনও খাটের ওখানেই বসেছিল। রবি এসে বলল 'বৌদি আপনার তো ঘরেই থাকা উচিত নয় আপনি এখনো পায়ের যন্ত্রণা নিয়ে জামা কাপড় গুছিয়ে যাচ্ছেন ?আপনি . ঘর থেকে বেরিয়ে যান ।যে কোনো সময় বিপদ হতে পারে এবং আরো বলল বড় বিপদের হাত থেকে বেঁচে গেছেন।'
কোনোরকমে তারা এই তুমুল বৃষ্টির ভেতরে বাঁশ এনে ঠেকনা দিতে চেষ্টা করল ।তারপর বলল যে নতুন করে এসব লাগাতে হবে । অগত্যা কিছু করার নেই ।এতদিন ভাগের সম্পত্তি বলে যাবা হাত গুটিয়ে বসে ছিল ।এখন তো কিছু করার নেই।যে ঘরটাতে থাকা হয় ,সেই ঘরের ছাদে যদি ভেঙে পড়ে। তাহলে থাকবেটা কোথায়?
রবি মিস্ত্রি বলল 'দীপকদা জয়েসের ব্যবস্থা করতে হবে।"
সঙ্গে সঙ্গে জয়েসের জন্য লোক পাঠানো হয় এবং বিভিন্ন দোকান ঘুরে অবশেষে তা ব্রাদার্স দের দোকানে পাওয়া যায় ।
দীপক আবার রবি মিস্ত্রি কে ফোন করে বলল ' রবি ভাই,যত তাড়াতাড়ি পারিস কাজ শুরু কর।'
রবি মিস্ত্রি বলল 'তাই হবে দাদা চিন্তা করবেন না কিন্তু বৌদিকে যে অবস্থায় দেখে আসলাম ।বৌদিকে একটু ডাক্তার দেখানোর ব্যবস্থা করুন। '
দীপক বলল 'ও তেমন কিছু ব্যাপার নয় একটু বরফ লাগালে ঠিক হয়ে যাবে। দরকার হলে কয়েকটা পেনকিলার খাওয়াতে হবে । তাড়াতাড়ি কাজ শুরু করতে হবে ।সেটা মাথায় রাখিস।'
দীপক আরো বললো 'কি যে উটকো বিপদ হলো?'
দীপক এবার বিপাশা কে উদ্দেশ্য করে বলল "দুপুরের খাবার রেডি আছে তো নাকি?'
বিপাশা শুধু ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানায়।
দীপক বললো 'তাহলে খেতে দাও। আমার মাথায় অনেক চাপ কিচ্ছু ভালো লাগছে না।'
অথচ একবারও বিপাশাকে সহানুভূতির সঙ্গে জিজ্ঞাসা করল না যে তোমার কষ্ট হচ্ছে, তোমার খুব লাগছে?
বিপাশার দু চোখ ফেটে জল পড়তে থাকে। স্বামীর কাছ থেকে অবহেলা ,অবজ্ঞা একজন স্ত্রী যদি পেয়ে থাকে। তাহলে সেই স্ত্রীর মানসিক অবস্থা কেমন হতে পারে ?প্রত্যেক স্ত্রী তার স্বামীর ভালোবাসা ,একটু সহানুভূতি ,সুমিষ্ট কথা প্রত্যাশা করে কিন্তু বিপাশার ক্ষেত্রে..?
বিপাশা মাঝেমাঝে ভাবে কোন দিনের জন্য কি দীপক তাকে ভালোবাসে নি অথচ দু দুটো সন্তানের মা হয়েছে বিপাশা। তাহলে কি সেই সন্তান দুটো জৈবিক প্রবৃত্তি নিবৃত্ত ফসল? প্রশ্ন জেগেছে বারবার বিপাশার। উত্তর খুঁজে পায় নি। অথচ কলেজ লাইফে বিপাশাকে সুদীপ্ত ভালোবাসতো। বিপাশা জানতো। কখনো সাহস করে এগোতে পারে নি। তাই মাঝে মাঝে ভাবে সুদীপ্তর সঙ্গে বিয়ে করলে কি এর থেকে অনেক বেশি সে সুখী হতে পারতো না? ভালোবাসার ভেলায় চেপে দূর সাগরে ভেসে যেতে পারত না ? ভেবেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
এমন সময় দীপক চিৎকার করে ওঠে 'আর কতক্ষণ বসে থাকবে? খেতে দেবে তো নাকি?'
বিপাশা কিছু না বলে কোনরকমে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে রান্নাঘরের দিকে যায়।
অন্যদিকে টুবলু ও টুকাই বলতে থাকে ' মা তোমার লাগবে? তুমি সাবধানে।'
বিপাশার মনের কোণে জমানো কষ্টের ভিতর এক পশলা বৃষ্টি যেন এই দুই সন্তান। এইযে সহানুভূতি কেয়ারিং মনোভাব বাচ্চা দুটোর মধ্যে এই দেখে তার অন্তরাত্মা জুড়িয়ে যায়। ছেলেদুটোকে বুকে টেনে নেয়। আর বলে আমার কিচ্ছু হবে না সোনা। তোরা আছিস না?
ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন"২২ক্রমশ