একান্ত মনেই লিখে চলেছেন লেখক। তার নিত্যদিনের আসা যাওয়া ঘটনার কিছু স্মৃতি কিছু কল্পনার মোচড়ে লিখছেন ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন "।
টানাপোড়েন (২০)
দুর্ভোগ
ভোর পাঁচটার সময় হঠাৎই কলিংবেলের আওয়াজ। বেলটা বেজে চলেছে। রেখা মনোজকে বলল 'দেখ না কে এসেছে?"
মনোজ ঘুম জড়ানো চোখে বলল ' তুমি যাও'। রেখা জানে ঘুম কাতুরে মনোজকে ভোর বেলায় ঘুম থেকে তোলা খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার।
আবার কলিংবেল ক্রিং ক্রিং ক্রিং। কি ঝামেলা হলো বাবা ,সাতসকালে কে?হঠাৎই রেখা হুড়মুড় করে উঠে পড়ে।,তখনও চোখ দুটো ঘুমে আরষ্ট হয়ে আছে। তবুও রেখা বলে 'আ্যই মনোজ,একটু ধাক্কা দিয়ে ।'
মনোজ বলে উঠলো 'কি হল রেখা?'
রেখা বলল ' নতুন কাজের মেয়েটা আসে নি তো?'
মনোজ বলে ' যাও দেখো গিয়ে। বলেই আবার ওপাশ ঘুরে শুয়ে পড়ল।'
রেখা বলল ' তা আমি কি মেয়েটাকে চিনবো নাকি?' 'মনোজ নাক ডাকতে শুরু করেছে।
রেখাকে বাধ্য হয়ে উঠতে হলো। ঘুমের রেশ কাটেনি তখন। দরজাটা খুলে বললো কে?'
আগন্তুক হেসে বলল 'ও বৌদি, আমি নতুন কাজের মেয়ে সুমিতা। ওই যে পুটুদি পাঠিয়েছে ।হাত দিয়ে ইশারা করে দেখাল।
রেখা বলল 'ও আচ্ছা। এসো ভেতরে এসো। তা তুমি এত সাত সকালে এসেছ কেন?পুটু টাইম বলে দেয় নি।'
সুমিতা বলল 'হ্যাঁ ।বলে দিয়েছে। কিন্তু আমি একটু তাড়াতাড়ি এলাম ।প্রথম দিন তো বুঝে নিতে হবে ।তারপর শুনেছি আপনি স্কুলে যাবেন। যদি লেট হয়ে যায়?(হেসে বলল)।
তা কি কি কাজ করতে হবে বৌদি?'
রেখা বলে 'কেন পুটু তোমাকে বলে দেয় নি?পুটুর কাজগুলোই তো করতে হবে'।'
সুমিতা বলে ''হ্যাঁ ,সব ঠিক আছে বৌদি ।কিন্তু আমি তো কাপড় কাচতে পারবো না'। আমার সিজার হয়েছে তো ,তাই আমার একটু অসুবিধা আছে।'
রেখা বললো 'তাহলে কাপড় কে কাচবে?'
সুমিতা বলে ' না, আমি তো পুটুদিকে বলেছি যে আমি কাপড় কাচতে পারবো না।পুটুদি বলল ঠিক আছে। তুই যা বৌদি ম্যানেজ করে নেবে।'
রেখা বলল 'মানে ম্যানেজ করে নেব মানে?'
সুমিতা আমতা আমতা করে বলে 'না, মানে আপনার তো ওয়াশিং মেশিন আছে, ওতে যদি...?
রেখা তো অবাক হয়ে গেল আর কি বলবে? তাহলে মাইনে তো তুমি বেশি পাবে না ।
সুমিতা গালে হাত দিয়ে বসে পড়ে বলে ' এ বাবা ।তা বললে কি করে হবে বৌদি?'
রেখা বলে ' কি আর হবে? তুমি কাপড় কাচতে পারবে না ।তোমাকে কাপড় কাচার মাইনে দেব ?এ আবার কি কথা?
এই কথা কাটাকাটির মধ্যেই মনোজ উঠে পড়ে চোখ রগড়ে এসে বলে 'কি হয়েছে ?এত কথা কাটাকাটি কিসের হচ্ছে?'
রেখার আগে সুমিতাই বলে উঠলো ' দাদা ,দেখুন না বৌদি বলছে মাইনে কমিয়ে দেবে?'
রেখা তো অবাক হয়ে যাচ্ছে, আর ভাবছে 'কি ধরনের মেয়ে রে বাবা।'একটু মনোজের দিকে তাকায়। মনোজ বলে উঠলো ' মানে পুটুর যা মাইনে, তুমি সেই মাইনেই পাবে ।রেখা কমাবে কেন ?আসল কথাটা খুলে বল কি হয়েছে?'
রেখা বলল ' কাপড় কাচবে না । তাহলে পুটুর মাইনে কি করে পাবে?'
'মনোজ বলে ওঠে 'সে কী কথা?
এরকম তো কথা ছিল না।'
রেখা বলল মনোজের দিকে তাকিয়ে-' দেখো ,সাতসকালে আমার কিন্তু ভালো লাগছে না এসব। তুমি বরং পুটুর সঙ্গে কথা বলে ,ঠিকঠাক করে ওর মাইনে ঠিক করো।
সুমিতা বলে 'পুরো মাইনে না দিলে আমি কিন্তু কাজ করবো না বৌদি।'
মনোজ মাঝখানে এসে সামাল দেয় ইশারায় রেখাকে হাত দিয়ে কিছু বুঝিয়ে।
তারপর মনোজ বলে 'ঠিক আছে সুমিতা। তুমি আজকে কাজ করো। তারপর আমি কথা বলে নিচ্ছি পুটুর সাথে ।ঠিক আছে।'
সুমিতা বলে 'ঠিক আছে।
সুমিতা কাজ করে চলে যাবার পর মনোজকে রেখা বলে 'একে আমার পোষাবে না। অন্য কাজের মেয়ের ব্যবস্থা করো।'
মনোজ রেখাকে বলে 'রেখা পুজোর সময় এখন লোক পাবে না কিন্তু ।পুজোর পরে আবার লোপ পাবে। কাজেই যা চাইছে দিয়ে দাও ।পরে ভালো লোক দেখে নেয়া যাবে আর তার মধ্যে যদি পুটুর সব সমস্যা মিটে যায় ।তাহলে তো পুটুই কাজ করবে ।'
রেখা বলে তাই বলে এইভাবে বল কাপড় কাচবে না তার টাকা নেবে কি দিনকাল পরলো গো? লোক রাখতে হবে না পুজোর এ কটা দিন আমি চালিয়ে নেব।'
মনোজ রেখার ক্রোধ বুঝতে পেরে বলে 'হ্যাঁ সোনা আমি তো জানি তুমি পারবে? তোমার যে ভীষণ কষ্ট হবে। সারাদিন স্কুল করে আসার পর তারপর আবার তুমি ঘরের সব কাজ করবে আবার স্কুলে যাবার আগে তারপর দুজনে মিলে যে আমরা সন্ধ্যেবেলায় ফিরে বা রাত্রের দিকে একটু আড্ডা দিই সে সব কিছুই হবে না রোজ ই ঝামেলা লেগে থাকবে ।সেটা কি ঠিক বল ,নিজেদের মধ্যে অশান্তি ডেকে আনা? রেখাকে বুকের কাছে নিয়ে নেয় তোমাকে এত পরিশ্রম করতে হবে না ।যাক না কটা টাকা যাবে ,তো কি হয়েছে?'
রেখা বলে 'দেখো, মেয়েটি বলতে পারতো বিনয়ের সঙ্গে,তা নয় ,উল্টে হুমকি দিল কাজ করবে না।এটি কিছুতেই মানতে পারছি না।'
মনোজ বলল ' সব কিছু এত ধরতে যেয়ো না।কষ্ট বাড়বে।দেখ কথায় কথায় অনেক বেজে গেল। তুমি কিন্তু ট্রেন মিস করবে? আর তোমার রিম্পা দি সঙ্গেও কথা হবে না পাশাপাশি বসে। রিম্পা দি তো আর বেশিদিন নেই স্কুলে?'
রেখা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে মনোজের বাহুবন্ধন থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলে 'এ বাবা কত দেরি হয়ে গেছে। আজ মনে হচ্ছে ট্রেন পাব না।'
মনোজ রেখাকে আশ্বাস দিয়ে বলে 'যাও ঠিক ট্রেন পাবে ।টেনশন নিও না।'
রেখা বলল 'তুমি কদিন ছুটি নিয়েছ অফিসে?'
মনোজ বলল 'আর দুদিন আছে?'
রেখা বলল 'ব্রেকফাস্ট রেডি করি নি। দুপুরের তরকারিটা করা হয়েছে।'
মনোজ বলল 'ঠিক আছে বাবা। আমি বাটার ব্রেড আর ডিম সেদ্ধ খেয়ে নেব। তুমি টিফিনে কি নিয়ে যাবে আমি রেডি করছি।'
রেখা বলল 'থাক আজকে নেব না।
মনোজ বলল 'তুমি রেডি হও ।যা করার আমি করে দিচ্ছি।'
রেখা তাড়াতাড়ি পূজা পাঠ করে নিয়ে রেডি হয়ে বলল 'আমাকে আজকে একটু ছেড়ে দেবে চলো।'
মনোজ বলল 'হ্যাঁ অবশ্যই। যতটুকু তোমার সঙ্গে থাকা যায়। দাঁড়াও দাড়াও, এই নাও ব্রেকফাস্ট করো বলেই হা করতে বলল।
রেখা বললো ' কি সুন্দর টেস্টি হয়েছে খেতে। তোমার হাতে জাদু আছে। আর খাব না চলো চলো তাড়াতাড়ি।
মনোজ বলল 'না ,বেবি।জুসটা খেতে হবে। গ্লাসটা মুখের সামনে ধরল।'
তারপর মনোজ গাড়ি স্টার্ট করে রেখাকে স্টেশনের দিকে পৌঁছে দিতে গেল। স্টেশন যাওয়ার পথে মনোজ রেখাকে বলল 'আমাকে জড়িয়ে ধরো না।'
রেখা মনোজকে জড়িয়ে ধরে যাবার সময় হঠাৎই গান ধরে ,এই পথ যদি শেষ না হয় তবে কি হত?'মনোজের গাড়ি স্টেশনে পৌঁছানোর আগেই ট্রেন স্টেশনে ঢুকে যায়। এনাউন্স শুরু হয়ে যায়। মনোজ কোনক্রমে রেখাকে স্টেশনে পৌঁছে দিল। কিন্তু ওভার ব্রিজ পেরিয়ে দুই নম্বর প্লাটফর্মে যেতে যেতেই ট্রেনটা ছেড়ে দিয়েছে। "
রেখার মন টা খারাপ হয়ে গেল। তারপর আবার ফিরে এলো এক নম্বর প্লাটফর্মে ।মনোজ তখনও দাঁড়িয়ে ।
মনোজ মিটিমিটি হাসছে ।
কিন্তু রেখার এটা দেখে ভীষণই রাগ হয়ে গেল। আর বলল তুমি 'হাসছো?"
মনোজ বললো ' চলো বাইকে চাপো।'
রেখা মুখ গোমরা করে বাইকে চাপল।
মনোজ বলল 'যা কি হবে আজকে তো নিম পাতার সঙ্গে তোমার...?'তবে আমার ক্ষেত্রে কিন্তু ভালো হয়েছে।'
রেখা বলল ' কেন?'
মনোজ হেসে বলল 'বাহ রে। কতদিন পরে একসঙ্গে আমরা সারাটা দিন কাটাবো বল তো? আজ শুধু তুমি আর আমি। আ্যই রেখা আজ বৃষ্টি হলে কেমন ভালো হতো বলো। বৃষ্টিভেজা দুপুরে তুমি আমি...?'
রেখা বলল 'তোমার বয়স বাড়ছে, না কমছে?'
মনোজ বলল 'আমার তো মনে হয় কমছে কিন্তু তুমি যেন বুড়িয়ে গেছো। কত আশা ভরসা নিয়ে তোমাকে কথাগুলো বলছি আর তুমি গুরুত্ব দিচ্ছ না।'
রেখা বলল 'আজ যা কিছু ঘটলো সব সুমিতার জন্য
সকাল বেলাটা এসে মেজাজ বিগড়ে দিয়েছে । তাই দুর্ভোগ পোহাতে হলো। কালকে কাজে এসে যদি ওরকম কথা বলে না?
আমি এই দুর্ভোগকে ছাড়িয়েই ছাড়বো।'
মনোজ বলল " ছাড়ো না। আমাদের কথার মাঝে আর ওকে টেনে এনো না।'
তার চেয়ে দেখো আজকের দিনটা কত ভালোভাবে কাটানো যায় সেটুকুই আমাদের জীবনের বড় প্রাপ্তি। দুজনাই তো কাজের মধ্যে থাকি। সারাদিন কতটুকু কে কার খবর রাখতে পারি ?আজ ব্যস্ততার যুগে সমস্ত সুখানুভুতিগুলো যেন মূল্যহীন হয়ে পড়ছে। তার চেয়ে যতটুকু পাওয়া যায় সুদে-আসলে মিটিয়ে নেয়াই ভাল নয় কি?
রেখা শুধু ঘার নাড়িয়ে সম্মতি জানায়।
ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন"২০ ক্রমশ