১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২২

কবি বর্নালী সেনগুপ্ত'র কবিতা





নারী জনমের পাওনা

বর্নালী সেনগুপ্ত


সভ্যতার সেই উষালগ্ন থেকে তোমার পরিচয় তুমি পুরুষ,
তোমার জন্য গোটা বসুমতী ভোগের খোলা বাজার। 
আর আমরা ?
নারী মানে ভোগ্যপন্য!
বাহ! কি সুন্দর বিভাজন,
নারীকে মাপো তাই কখনো সুডৌল দৃঢ় গোলাকৃতি মাংসপিন্ডে,
কখনো অক্ষত জননযন্ত্রের নিক্তিতে। 

পুরুষ, নারী তোমার চোখে  অবলা। 
তবে তোমাদের পৌরুষের লাঙলে কি করে করো নারীকে ফালাফালা ?
কি করে ছিন্নভিন্ন করে দাও একটা কচি শরীরকে ?
রেহাই দাও না বলিরেখা ঘেরা কুঁজো বার্ধক্য পীড়িত সত্তরের বুড়ি কে ?

শাস্ত্র মতে নারীকে রক্ষা করা পুরুষের নাকি ধর্ম !
অন্ধকার রাস্তায় একা পেয়ে দলবদ্ধ পশুর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ো  কোন অসহায়ার দেহে,
তখন কোথায় থাকে পুরুষ তোমার বিবেক?
কোথায় লুকিয়ে রাখো তোমার দৃঢ় পৌরুষের গাঁথাকে ?

অর্জুন ও তো  কামন্মতা উর্বশীকে ফিরিয়ে দিয়েছিলো,
রাবন ও তো নলকুবেরের অভিশাপের ত্রাসে জানকি কে জোর করে ভোগ করেনি,
রাম তো শূর্পনখার দূর্বলতার সুযোগ নেয়নি,
ভীষ্ম ও তো অম্বাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলো,
তবেভ?

মনুর বিধান এর নামে পুত্র ক্রিয়তে ভার্যা বলবে,
অথচ নারীকে রক্ষনের দায়িত্ব ধূলোয় গড়াগড়ি খাবে ?
চমৎকার তোমাদের ব্যবস্হা। 

আজ যখন এই মানব শরীর পেয়েছি,
চুরাশি লক্ষ জন্মের চক্র পেরিয়ে,
তাতে তোমার অবদান কি পুরুষ ?
 পশু হয়ে ছিলাম যখন  তখনো তোমার নিষ্ঠুর কামনার শিকার করেছো আমায়,
আবাঞ্ছিতত মাতৃত্বের চিহ্ন বয়ে বেড়াতে বাধ্য করেছো। 
একপেট ক্ষুধা নিয়ে এ দোর থেকে ও দোরে ঘুরে মরেছি,
লাথি মেরেছে কেউ , কেউ দিয়েছে বিষ। 
কেউ দিয়েছে চাকার নিচে পিষে,
কেউ খেয়েছে কেটে !
এই তো আমার মানুষ জন্মের আগের  ইতিহাস,
আজ বুঝি  নারী জীবন মানে শুধু কষ্ট আর অবহেলাভরা এক অনন্ত দীর্ঘশ্বাস।

কবি ইকবাল বাহার সুহেল এর কবিতা




আমারও গল্প আছে 
ইকবাল বাহার সুহেল 
( ইংল্যান্ড ) 

কোলাহলে ভরপুর জোস্না ভরা হাত
একদম ফাঁকা , শূন্যতায় ভরা এই রাত

এভাবে দেখব ভাবিনি। যেন অনন্তকাল ওরা স্থির হয়ে আছে। এই ছবিটার মতো ছুঁয়ে দেওয়া সাথ

স্বপ্নলোক থেকে নিচে নেমে এলে যখন 
শরীর হিম করা বাতাস উপভোগ করতে থাকলাম হয়তো খানিকের স্বস্তির জন্য ! হয়তো এটাই ছিল প্রতিবাদ 

লেপটে আছে সামান্য একটু গ্লানি, 
সঙ্গে একটু অগৌরব ! মনের স্বেচ্ছাপ্রত্যাহার

এত সুন্দর নিখুঁত মায়াবী নীলয়
নীরব মুখটা হঠাৎই শহর থেকে হারিয়ে গেলো ! মনে হলো 
পুরো শহরটাই বছরের পর বছর ঝিম মেরে আছে ! ল্যাম্প পোষ্টের বাতি গুলো নিভে গেলো

শীতে শীত এল না, বর্ষায় বৃষ্টিও ! আকাশ ঠোঁট উল্টে থাকলো দিনের পর দিন ; নদীও শুকিয়ে গেলো ! দুটি পাড় এক হতে পারলো না কোন দিন চিরদিনের জন্য আলাদা হয়ে রইলো !

মমতা রায় চৌধুরী'র ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১০৬




উপন্যাস 


টানাপোড়েন১০৬
আলোর বিচ্ছুরণ

মমতা রায় চৌধুরী


আজ রেখা যতই ক্লান্ত-অবসন্ন থাকুক না কেন ও দৃঢ় প্রতিজ্ঞ আজকের উপন্যাসের একটি এপিসোড শেষ করতেই হবে। তাই ফ্রেশ হয়ে মিলি, তুলি ,পাইলটদেরকে খাবার খাইয়ে রাধা গোবিন্দের পুজো করে বসে পড়ল নিজের রুমে একটা পেন আর ডায়েরি নিয়ে। বাস্তবতা আর কল্পনার মিশেল দিয়ে মনের ক্যানভাসে চরিত্রগুলো সাজিয়ে তাদের মুখে ভাষা দিতে লাগলো। বেশ খানিকটা লেখার পর হঠাৎ মনে হল আগামি কালকে স্কুলে যাবে না একবার বড়দির গ্রুপে এটা জানিয়ে দি।
রেখা লিখল 'বড়দি আগামীকাল আমি স্কুলে যেতে পারবো না ,আমার বিশেষ অসুবিধা থাকার দরুন।'
এবার সেই 'সিড়ি'পত্রিকার সম্পাদককে একটা মেসেজ পাঠাল "গতকালের পর্ব টা ঠিকঠাক ছিল তো?,'
সঙ্গে সঙ্গে উত্তর আসলো'অসম্ভব সাড়া পেয়েছি ম্যাডাম ।আপনি শুধু লিখে যান।'
রেখা মেসেজ করল' থ্যাংক ইউ সো মাচ।'
সম্পাদক লিখলেন 'থ্যাংকস তো আমি আপনাকে জানাবো।'
রেখা বলল' কেন?'
এইযে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের লেখা পাঠকরা পড়তে পারছে সেজন্য। শুধু আলো আর আলোর দিকে এগিয়ে যান।
রেখা জানে অন্ধকারটাই আদিম পৃথিবীর আসল রং ,আলোটা শুধুমাত্র একটা কৃত্রিমতা ছাড়া আর কিছু নয় ,উপরের একটা স্তর। সব জায়গায় পৌঁছায় না। তবে আলোর বিচ্ছুরণ ঘটাতেই হবে।
রেখা হেসে মেসেজ পাঠাল  ' পুরো কৃতিত্ব আপনার।'
সম্পাদক লিখলেন' যাই বলুন না কেন? আপনার লেখার হাত আছে তাই?'
রেখা চুপ করে থাকলো এবং হাসি চিহ্ন দিয়ে মেসেজ পাঠালো।
সম্পাদক বললেন' এটা কিন্তু ধারাবাহিকভাবে আপনাকে লিখতে হবে । একদিনও বাদ গেলে চলবে না ।আজকের পর্ব টা লিখছেন তো?'
রেখা লিখে পাঠালো' হ্যাঁ লিখছি,।'
সম্পাদক বললেন 'ঠিক আছে আর ডিস্টার্ব করবো না আপনি লিখুন।'
রেখা হাসির  চিহ্ন দিয়ে পাঠাল।
এর মধ্যেই রেখার ফোন বেজে উঠলো। রিং হচ্ছে 'তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম...।'
সবেমাত্র কলমটা দিয়ে ডাইয়েরির পাতায় লিখছে আর অমনি ফোন। একটু বিরক্ত হলো।
' ভালো লাগে না বাবা, যখন তখন ফোন। এই সময় আবার কে ফোন করল ?'
দুবার ফোন বেজে যাবার পর বাধ্য হয়ে রেখা লেখা ছেড়ে উঠলো ফোনটা রিসিভ করল ।
বলল ' 
অপরপ্রান্ত থেকে বললেন' কে রেখা?'
রেখা বলল 'হ্যাঁ বলছি, আপনি কে বলছেন?'
অপরপ্রান্ত থেকে ভারী গলায় বললেন' আমি বড়দি বলছি'।
রেখা একটু আশ্চর্য হল হঠাৎ বড়দি কেনো ফোন করলেন? মনে মনে ভাবল ।তারপর বলল
' হ্যাঁ বলুন দিদি।'
বড়দি বললেন' কালকে তুমি স্কুলে আসবে না গ্রুপে লিখেছ, ওই জন্যে তোমাকে ফোনটা করলাম।'
রেখা বললো 'হ্যাঁ দিদি, কালকে আমি যেতে পারব না।'
বড়দি বললেন' কালকে তোমাকে আসতেই
 হবে ।রেখা তুমি না আসলে তো এই কাজটা করা যাবে না।
রেখা  বলল' কিন্তু দিদি আমার অসুবিধা আছে।'
বড়দি বললেন 'একটু কষ্ট করো রেখা   আমার কথাটা রাখো তুমি। তোমাকে তো কোন কাজ দিয়ে আমি নিরাশ হইনি। এটা স্কুলের স্বার্থে করো রেখা।'
রেখার মনটা একটু নরম প্রকৃতির । ভালোবেসে কথা বললে মনটা গলে যায়  ।
তাই বললো ' কি করতে হবে দিদি আমাকে?'
বড়দি বললেন 'কালকে তোমাকে একটু হসপিটালে যেতে হবে ।আমাদের মেয়েদের ভ্যাকসিন আছে হসপিটাল থেকে দেয়া হবে।'
রেখা বললো "কোন ক্লাস দিদি?'
বড়দি বলেন' কালকে দেয়া হবে নতুন নাইনদের।'
রেখা বলল 'কিন্তু দিদি, নাইনের ক্লাস টিচারকে দিলেই তো ভালো হতো?'
বড়দি বললেন 'সেটা আমি জানি কিন্তু গত দিনের ভ্যাকসিন নিয়ে যে গন্ডগোলটা হয়েছে  তাই আমি রিক্স নিতে চাই না।'
রেখা বলল' হ্যাঁ আমি শুনেছি যদিও।'
বড়দি বললেন 'স্কুলে তো অনেকেই হম্বিতম্বি
 করে ।কাজের বেলায় নেই কেউ।'
রেখা বলল 'কে দায়িত্ব ছিলেন সেদিন?'
বড়দি বললেন 'কে আবার যিনি নিজেকে সবজান্তা মনে করেন অনিন্দিতা?'
রেখা চুপ করে থাকল আর নামটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই মনের ভেতরটা কেমন যেন একটা অসহ্য জ্বলুনি হতে শুরু করল।
বড়দি বললেন 'এবার তুমি আমার কথাটা রাখো রেখা ।স্কুলের স্বার্থটা একটু দেখো।'
রেখা বলল' ঠিক আছে দিদি যাব। আমিও চাই ,যে প্রতিবন্ধকতার মধ্যে দিয়ে আমরা সকলে যাচ্ছি তাকে পেছনে ফেলে আলোর দিকে এগিয়ে যেতে ।
বড় দি বললেন' ঠিকই বলেছ, আমরা প্রত্যেকেই সেই আলোর সন্ধানী।'
 বড়দি ভেবেছিলেন যে রেখা হয়তো আজকে কিছু কথা বলবে অনিন্দিতার ব্যাপারটা নিয়ে কিন্তু রেখা কিছুই জানালো না।
বড়দি মনে মনে আরো ভাবতে লাগল সত্যিই রেখার  ভেতরে এত কোয়ালিটি রয়েছে সবাইকে নিয়ে ,ভালোবেসে চলতে চায়, কাজ দিলে কোনো কাজে না 
নেই। হ্যাঁ, অনেক সময় সত্য কথাটা মুখের উপর বলে দেয় বটে। কিন্তু ওর ভেতরে কোনো কারচুপি 
নেই ।সারল্যে ভরা, সততা দিয়ে গড়া। মুখটা দেখলেই মনে হয় কেমন স্নিগ্ধও
পবিত্রতায় ভরা।
কালকে যে অত বড় একটা কান্ড স্কুলে হয়েছে , ওর মনের ভেতরে কত টানাপোড়েন চলেছে।আমার কানে যে কথাটাএসেছে ভাবলাম রেখা ব্যাপারটা বলবে ।কিন্তু বলল না।
একেই বলে শিক্ষা।
কৃতিত্ব কখনো চাপা থাকেনা ,তা ফুটে বেরোবেই আলোয় আলোয় ভরে যাবে চারিদিক।
বড়দি বললেন 'তুমি আমাকে চিন্তামুক্ত করলে।'
রেখা বলল 'ও বড়দি কালকে কি তাহলে আমি সরাসরি হসপিটালে চলে যাব।'
বড়দি বললেন 'হ্যাঁ তুমি সরাসরি হসপিটালে চলে যেও।'
রেখা বলল 'কিন্তু দিদি নামগুলো তো লাগবে আমার।'
বড়দি বললেন' হ্যাঁ তাও তো  ব্যাপার রয়েছে একটা ।নাম টা মিলাতে হবে 
তো ?যারা আসবে না তাদেরকে আবার ফোন করে ডাকতে হবে। তারপর কতগুলো ভ্যাকসিন হলো  সেই রিপোর্ট পাঠাতে হবে।'
রেখা বলল' হ্যাঁ সেজন্যই তো।'
বড়দি বললেন' কোন টেনশন করো না আমি গ্রুপে তোমাকে পোটাল থেকে একটা কপি পাঠাচ্ছি ।ওটা আপাতত রাখো ।তারপর স্কুল থেকে হসপিটাল এর দূরত্ব বেশি নয় ।দরকার হলে আমি কাউকে পাঠিয়ে ওই কপিটা আবার তোমাকে পাঠিয়ে দেবো কেমন?'
রেখা বলল' হ্যাঁ ,ঠিক আছে দিদি। আর বলল দিদি…
বড়দি বললেন কিছু বলবে?
রেখা বলল' আমার সঙ্গে কি আর কেউ থাকবে?'
বড়দি হেসে বললেন 'তুমি কাকে চাইছো বলো ?তোমাকে কাকে দিলে তোমার সুবিধা হবে?,'
রেখা বলল' হ্যাঁ দিলে তো সুবিধা হত?'
বড়দি বললেন 'তুমি বলো কাকে দেব ?তবে আমি একটা কথা বলি রেখা ।আমার মনে হয় অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট হয়। তুমি এ কাজটা একাই করতে পারবে এবং খুব ভালোভাবে করতে পারবে আমার সেই বিশ্বাস তোমার প্রতি আছে।
রেখা বলল 'ঠিক আছে দিদি।'
বড়দি বললেন'তার পরেও যদি তোমার মনে হয় যে তুমি কাউকে নিতে চাইছ? তাহলে তুমি বলো কাকে দিলে তোমার সুবিধা?'
রেখা বলল' ঠিক আছে দিদি ,ছাড়ুন আমি একাই যাব।'
বড়দি বললেন 'তোমার কোন অসুবিধা হবে না। যদি মনে হয় ওখানে গিয়ে কোনো অসুবিধার সম্মুখিন হচ্ছ! তুমি আমাকে ফোন ক'রো দরকার হলে আমি যাব।'
রেখা হেসে বলল' ঠিক আছে দিদি ,তাই হবে'।
বড়দি বললেন 'তোমার লেখা কি রকম চলছে?
তুমিতো উপন্যাস লিখছো ? 
রেখা হাসল আর একটু অবাক হয়ে বললো' আপনি কি করে জানলেন দিদি?'
বড়দি বললেন'আকাশে চাঁদ উঠলে তার স্নিগ্ধ আলো ছড়িয়ে পড়বে না?'
রেখা বলল'ওই একটু আধটু লিখছি দিদি ,ভালো লাগে।'
বড়দি বললেন'

কথাসাহিত্যের আসরে তোমার উপন্যাসের একটা পর্ব পড়লাম ।'
রেখা  উৎসাহিত হয়ে বলল'ও তাই বুঝি দিদি?'
বড়দি বললেন'
ভালো লাগছে  তোমার লেখার গতি কিন্তু থামিও না ।লিখে যাও আমি তোমাকে আশীর্বাদ করছি ।একদিন তুমি সাহিত্যের ইতিহাসে জায়গা করে নেবে।'
রেখা গদগদ কন্ঠে বলল' বড়দি আপনি আশীর্বাদ করুন ,আমি যেন ভালোভাবে লিখতে পারি ।লেখনি শক্তি টা যেন আমার থেকে হারিয়ে না যায়। লেখার মধ্যেই এখন আমি নিজেকে আনন্দে রাখার উপকরণ খুঁজে পাই।'
বড়দি বললেন 'সবসময় তোমার উপরে আশীর্বাদ আছে ।ঠিক আছে ,ভালো থেকো 
কেমন ।আর কালকে  যথার্থ সময়ে পৌঁছে যেও ,ঠিক আছে।'
রেখা বলল 'ঠিক আছে দিদি।'
রেখা ফোনটা রেখে আবার লিখতে বসল। আজ বড়দিও আমার উপন্যাস পড়ছেন। খুবই ভালো লাগছে আর বেশ অনুপ্রাণিত হচ্ছি।


আর মনে মনে ভাবছে কবে কাগজে কাগজে তার নাম ছড়িয়ে পড়বে। আসন্ন সুখের কল্পনাতে যেন রেখার মুখখানি টস টস করছে।

মমতা রায় চৌধুরী'র ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১০৫





উপন্যাস 


টানাপোড়েন ১০৫

তুমি রবে নীরবে

মমতা রায় চৌধুরী



স্টেশনে বেশ খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল কিকারনে দাঁড়িয়েছিল ,কেন দাঁড়িয়ে ছিল, তা জানেনা। একটা এলোমেলো ভাবনা বেখেয়ালি মনে ঘুরপাক খেতে শুরু করেছে। কজন ডেইলি প্যাসেঞ্জার এ ভাবে বসে থাকতে দেখে একটু অদ্ভুত ভাবে তাকালো বটে । রেখা খেয়াল করে নি তা নয় কিন্তু উঠলো না। সারাদিনে স্কুলে ঘটে যাওয়া ঘটনা আবার যেন ডানা মেলেছে । বাণীদি তার মাঝে যেন একরাশ টাটকা  অক্সিজেন হয়ে এসেছিল। বাড়িতে গিয়েই বা কি করবে সেই তো একাকীত্ব। তবুও মিলি, তুলি, পাইলট আছে বলে বাড়ি এখনও বাড়ি আছে। আজকাল দেরি হলেও মনোজ ফোন করে খবর নেয় না ।প্রয়োজন পড়ে না ।দৈনন্দিন জীবনের সামান্য চাওয়া-পাওয়াটুকু,  প্রত্যাশাটুকু যেন ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। তবুও বাচ্চা গুলোর কথা মনে হওয়াতে রেখা উঠে পরল 
তাড়াতাড়ি ।এবার অটো স্ট্যান্ডের দিকে এগোলো একজন অটোওয়ালা বলল ' ও দিদি, আপনি এত কি ভাবছিলেন ?আপনি যে অটোতে যান, সে কতবার আপনাকে ডাকল। আপনি শুনতেই পেলেন না ।'
রেখা বলল 'ও তাই বুঝি খেয়াল করিনি।'
 ওরা বলল' হ্যাঁ আমরাও  সেটাই ভাবছিলাম আপনি একমনে কী যেন একটা চিন্তা 
করছিলেন।'
 রেখা বলল' ঠিক আছে, তুমি যাবে
 তো ?'
অটোওয়ালা বলল' হ্যাঁ যাবো ,বসুন বসুন। বলেই এক যাত্রীকে বললেন 'দাদা ,আপনি একটু এদিকে সরে আসুন, দিদিকে বসতে দিন।
হঠাৎই ফোনের আওয়াজ''তুমি রবে নীরবে...। রিংটোন বেজে উঠলো।
পাশের ভদ্রলোক নিজের ব্যাগ হাতরাতে শুরু করলেন ।তারপর ফোন খুলে দেখছেন না নিজের না ।তখন তিনি বলেন 'দিদি বোধহয় আপনার ফোন বাজছে দেখুন।'
রেখা কতটা বেখেয়ালি হয়ে গেছে নিজের ব্যাগে ফোন বাজছে তবু হুশ নেই ।
তারপর বললো' ও থ্যাংকস। দাঁড়ান দেখছি। খুলে দেখছে মিসকল হয়ে পড়ে আছে রিম্পাদির।'
রেখা মনে মনে ভাবল অনেকদিন পর রিম্পাদি ফোন করলো। অবশ্য আমারও করা হয়ে ওঠেনি নানা কারণে।
রেখা ফোন লাগালো রিম্পাদিকে । রিং হচ্ছে এবার বলল হ্যালো'।
রেখা বলল 'ফোন করেছিলে রিম্পা দি?'
রিম্পা দি বলল 'হ্যাঁ। আর আমিও এইখানে এসে নানা কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম, তোকে ফোন করা হয়ে ওঠেনি রাগ করিস নি তো?'
রেখা বলল 'রাগ ,অভিমান, ভালোলাগা ,ভালোবাসা ,এগুলো আপেক্ষিক মনে হচ্ছে আজকাল জানো তো?'
রিম্পা দি বলল'তোর কি হয়েছে রে?'
রেখা বলল'কই কিছু নাতো?'
রিম্পা দি বলল 'বললেই হলো, কিছু হয়নি ।আমি তোকে চিনি না, জানি 
না ?কিছু তো একটা হয়েছে তুই আমার কাছে আড়াল করছিস।'
রেখা চুপ করে রইলো।
রিম্পাদি বলল' আমি কিন্তু প্রত্যাশা করেছিলাম তুই একবার ফোন করবি।
আমার প্রত্যাশা ভালো লাগার বিষয়গুলো কিন্তু হারিয়ে যায়নি জানিস তো।'
রেখা বলল' সবাই তো তোমার মত নয়।'
রিম্পা দি বলল 'তুই যদি বলতে না চাস আমি জোর করব না আর এখন তো আমি তোর কাছেও নেই যে আমি তোকে জোর খাটিয়ে জিজ্ঞেস করবো। তবে কি জানিস তো মনটা একটু হালকা করতে পারতিস ।মনে হচ্ছে আমি ট্রানস্ফার নিয়ে এসে অনেকটাই তোর কাছ থেকে দূরে সরে এসেছি।'
রেখা বললো 'রাগ করো না রিম্পা দি।'
রিম্পাদি বলল 'রাগ করব কেন
 বল ? আমি বুঝতে পারছি তো'র কিছু একটা হয়েছে তুই' বলতে চাইছিস না তা কি বলবো বল?'
রেখার চোখের জল পড়তে 
লাগল। গলার স্বর বেদনাক্রান্ত ।
রিম্পাদি বলল' কি হয়েছে বল না?'
রেখা বলল 'আমার সাথেই কেনো এরকম হয় বলতে পারো রিম্পা দি।'
রিম্পাদি বলল' স্কুলে কিছু হয়েছে না রে?'
অনিন্দিতার সঙ্গে কিছু ঝামেলা হয়নি তো তোর?'
রেখা ভাবছে কি করে বুঝতে পারে রিম্পা দি।
রিম্পাদি বলল 'কিরে কথা বলছিস না?'
রেখা বলল' তুমি যা ভেবেছ ঠিকই।_
রেখা স্কুলের ঘটনা সব রিম্পা দি কে বলল।
রিম্পা দি বলল সাংঘাতিক 
কান্ড ।সেকি রে সিনিয়র জুনিয়রের কোন মান মর্যাদা থাকবে না ।কি হচ্ছে এসব আর ওর এত বড় স্পর্ধা?. বড়দি কোথায় ছিল?
রেখা বললো 'বড়দি আজকে আসেন নি। তুমি চলে যাওয়াতে এমনিতেই আমার মনটা খুব খারাপ ছিল ।তারপর এইসব কান্ড ।আমার না স্কুলে যেতে একদমই ভালো লাগছেনা।
রিম্পা দি বলল 'সেই তো তুই এক কাজ কর তুইও কাছেপিঠে চলে আয় এবার। স্কুলকে ভালোবেসে থেকে গেলি এত বছর ।নিজের সংসারের প্রতি একটু ধ্যান দে।'
রিম্পা দি বলল তোকে  একটা খারাপ খবর দেবার আছে?
রেখা বলল'আবার খারাপ খবর?
রিম্পা দি বলল' এটা না দিলেই নয় ,.তোর একজন প্রিয় রাইটার তিনি তো চলে গেলেন না ফেরার দেশে।'
রেখা বলল 'জানো তো আজকে স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে অনেকক্ষণ একা একা বসে ছিলাম মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে গেছিল শুধু স্কুলের ঘটনাটা জন্যই নয়, এমনিতেও মনটা যেন কেমন আমার হয়ে গেল বুঝতে পারলাম না অনেকক্ষণ ছিলাম বসে।
রিম্পা দি বলল ', হ্যাঁ, সেই জন্যই তো এখন তুই ফিরছিস ,আমি একটু অবাক হলাম।
রেখা বললো ,'কি বলবে বলো?
এরমধ্যে অটোওয়ালা বলল দিদি এসে গেছেন।
রেখা বলল' হ্যাঁ এই তো নাম  দিয়ে ব্যাগ থেকে টাকা বের করে ভাড়া মিটিয়ে দিল।
রিম্পা দি বলল 'নারায়ন দেবনাথ অমর্ত্য লোকে যাত্রা করেছেন।
কথা বলতে বলতেই রেখা এসে গেটের কাছে পৌঁছালো।
রেখা বলল'কি খবর শোনালে  তুমি'।
রিম্পা দি বলল 'খবরটা শুনে আমারও খুব খারাপ লেগেছে রে।'
রেখা বলল 'আমাদের শৈশবের সুতো ছিঁড়ে গেল গো।'
রিম্পা দি বলল'একদম ঠিক কথা বলেছিস।'
রেখা বলল মাল্টিপ্লেক্সহীন, নেটফ্লেক্সহীন , ইউটিউবহীন শৈশবের একমাত্র দুনিয়া ছিল যার হাতে ,তিনি আজ না ফেরার দেশে। নন্টে ফন্টে হাঁদা ভোঁদা,বাটুল অসাধারণ সব চরিত্র যার হাতে উঠে এসেছিল তিনিই নারায়ন দেবনাথ।
রিম্পা দি বলল একদম ঠিক বলেছিস আমাদের সময়কার ছোটবেলায় নন্টে ফন্টে পড়েনি এমন কেউ ছিলনা ।হাঁদা ভোঁদা পড়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়তাম আমরা।
রেখা বললো' আমাদেরকে অনাথ করে দিয়ে তিনি চলে গেলেন।'
রেখা কথা বলতে বলতে গেটের কাছে চলে আসলো কলিং বেল বাজালো। কিন্তু কোন সাড়া নেই।
রিম্পা দি বললো ভালো থাকিস এখন রাখছি পরে কথা হবে ।
রেখা আবার কলিং বেল বাজালো। মনোজ  বেরিয়ে এসে দরজা খুলে দিল।
রেখা ব্যাগটা নামিয়ে বাথরুমে গেল ফ্রেস হতে ।তখনো ভাবছে বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে পড়ন্ত বিকেলে চোখে পড়তো যেমন আকাশে উড়ে যাচ্ছে পাখিদের 
ঝাঁক ।।ছোট্ট বেলায় শুধু মনে হতো কোন দেশের বাসিন্দা? ওদের জন্য তো কোনো কাঁটাতার নেই, ওদের পাসপোর্ট লাগে 
না ।এই যে  কল্পনার পাহাড় ছোটবেলাতেই যে অপার বিস্ময় কৌতুহল সেই দিনগুলো আজ হারিয়ে যাচ্ছে । তবুও সাহিত্যিক নারায়ণ দেব বেঁচে থাকলে হয়তো আরো অনেক কিছু এরকম আমরা শৈশবের দিনগুলো নতুন করে ফিরে পেতাম।
এখন সে তো তাঁর অসাধারণ সৃষ্টির মধ্যে আমরা বেঁচে থাকব শৈশবের দিনগুলো কে নিয়ে।
চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে।
মনোজ  বললো কি ব্যাপার? তোমার চোখ-মুখ এরকম লাগছে কেন?
রেখা কোন উত্তর করছে না বলে আবারো একই কথা জিজ্ঞেস করল।
তখন রেখা বলল শৈশবের দিনগুলোকে মনের কোন গহীন গাঙে রেখেছি সেগুলোকেই ক্লান্ত চোখে মুখে খুঁজে পাবার চেষ্টা করছি ।
মনোজ কথার অর্থ কিছুই বুঝতে পারলো না। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।
আর বলল তুমি লেখিকা বলে আজকাল অনেক কিছুই তুমি অন্য ভাবে ব্যক্ত করো।
কিন্তু আমরা সাধারন মানুষ আমাদেরকে সেই ভাষাতেই বোঝাতে হবে।
রেখা বলল 'চা খেয়েছ, না খাবে?
মনোজ বলল' না খাইনি।'
রেখা গুন গুন করে গান গাইতে গাইতে গেল রান্নাঘরে দিকে গেল 'তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম….।'

কবি জাবেদ আহমেদ এর কবিতা




অনুভব
জাবেদ আহমেদ

হৃদয় ছোঁয়া কিছু ছবিতে
ভক্তি প্রেম আবেগ বিবেক
জড়িয়ে যায়।
অথচ কখনো চায়ের টেবিলে 
বসা হয়নি! 
কিছু ছবি হৃদয় কোণে খুটি 
খড়খুড়ে র নিলয় তৈয়ার করে
যাহা শুধু কল্পনার বুনন মাত্র,
তবুও নিদারুন অনুভূতির লালন বুকে
অনন্য যাতনার পোষ,
আজ বসন্তে বড় ইচ্ছে ইশ ছবিটি বাস্তব হলে
কিছু খুনসুটি হতো আর কি'বা হতো, 
প্রেম হৃদয়ে প্রদীপ ঝলমল করতো,
কাজল ভরা চোখ আদুল চোখে টক্কর হতো।
বিষন্নতার নগরে আনন্দে আগমন হতো হলুদ লালে বসন্তী হাওয়া বয়তো। ইশ্

মনি জামান এর ধারাবাহিক উপন্যাস ৯ পর্ব





ধারাবাহিক উপন্যাস


সেদিন গোধূলি সন্ধ্যা ছিল
( ৯ ম পর্ব ) 
মনি জামান

অফিস থেকে জিকু ছুটি নিয়েছে এক সপ্তাহের জন্য,ছুটি নিয়েই জিকু হাসপাতালে স্ত্রী আসমার কাছে চলে এসেছে,জিকুকে দেখে আসমা জানতে চাইলো ছেলের নাম কি ঠিক করেছো,
জিকুঃ নয়ন,বলেই আসমার কাছে জিকু জানতে চাইলো এ নাম কি তোমার পছন্দ হয় কিনা বলো?আসমা মাথা নেড়ে সম্মতি দিয়ে বলল হ্যাঁ সুন্দর নাম পছন্দ হয়েছে আমার,আসমা স্বামী জিকুর কোন পছন্দে আজ পর্যান্ত না বলেনি।
আসমাঃ জানো আজ যদি নয়নের দাদি আমাদের সাথে থাকতো তাহলে কতো খুশি হত উনি,
জিকুঃ হ্যাঁ সত্যি মা আজ থাকলে খুব খুশি হতো যেহেতু আমার আর দুভাইয়ের কোন ছেলে সন্তান নেই,দুই ভাইয়ের তিন মেয়ে,বড় ভাইয়ের দুটো,মেজ ভাইয়ের এক মেয়ে।পারিববারিক বিষয় নিয়ে আসমা আর জিকুর যখন কথা বলছে তখন জিকুর বাল্য বন্ধু সাংবাদিক ফিরোজ এসেছে হাসপাতালে জিকুর সন্তানকে দেখতে, জিকু ফিরোজকে দেখে বলল,কিরে কখন এলি!ফিরোজকে দেখে জিকু খুব খুশি হলো এবং বলল,ফিরোজ তুই যখন বাড়ি যাবি তখন মাকে বলিস আমাদের ছেলে হয়েছে এই খবরটা অবশ্যই মাকে দিবি,আর আমার শশুর ও শাশুড়িকেও খরবটা জানাস।
ফিরোজঃ মাথা নেড়ে বলল চিন্তা করিসনে দোস্ত কাকি মাকে আমি অবশ্যই এই খুশির খবরটা জানিয়ে তারপর তোর শ্বশুর শ্বাশুড়িকে দিয়ে আসবো।তারপর ফিরোজ আর জিকু গল্পে মেতে উঠলো বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রায় ঘন্টাখানেক হবে,
ফিরোজঃ ঘড়ি দেখে জিকুকে বলল,আরে দোস্ত অনেক বেজে গেছে খেয়াল করিনি,ওহঃ আমার অনেক কাজ পড়ে আছে অনেক সময় কাটালাম তোদের সাথে যাক তোর ছেলেও মাশাল্লা সুন্দর হয়েছে এবার আমাকে যেতে হবে।
জিকুঃ এখন না গেলে কি নয় একটু পরে যা,এলি তো কিছুক্ষণ আগে আজ আমাদের সাথে না হয় থেকে যা।
ফিরোজঃ নারে দোস্ত অনেক কাজ পড়ে আছে আজ যেতে হবে আমি সময় করে আবার এসে তোদের দেখে যাবো,আর সেদিন থেকে যাবো ওহ ভালো কথা কোন কিছুর দরকার পড়লে আমাকে অবশ্যই জানাস বলে ফিরোজ আসমাকে বলল ভাবি আসি তাহলে।
আসমাঃ ঠিক আছে ভাই তবে কথা দিলেন কিন্তু সময় করে আবার আসবেন,ফিরোজ হো হো করে হেসে উঠে বলল,কখন কথা দিলাম ভাবি।
আসমাঃ ফান করলাম তবে আসবেন কিন্তু
ভাই,বিপদে আপাদে সবসময় পাশে আছেন বলে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি,
ফিরোজঃধুর কি বলেন ভাবি,জিকু আমার ছোট বেলার বন্ধু আর বন্ধু তো বন্ধুর জন্য সব করে নইলে বন্ধু কেন।
ফিরোজ ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ির পথে রওনা হলো,আসমা আজ এত খুশি যে জিকু এবং তার পরিবারকে একটা ছেলে সন্তান উপহার দিতে পেরেছে,আসমা আজ নারীত্বকে নিয়ে গর্ব অনুভব করছে।আজ আসমার মা বাবার কথা ও খুব মনে পড়ছে,আসমা ভাবছে কতদিন হয় মা বাবাকে দেখেনি,খুব মিস করছে আসমা 
ফিরোজ ভাই বাড়ি গিয়ে খবরটা দিলে কত যে খুশি হবে বাবা মা এটা ভেবে আজ আসমার মনটা কেমন যেন আনমনা হয়ে গেলো।
করিম সাহেবের তিন ছেলের মধ্যে জিকুর প্রথম ছেলে সন্তান নয়ন,জিকুর আর দুই ভাইয়ের কোন ছেলে সন্তান হয়নি।
তাই জিকুর মায়ের খুব আফসোস তার দুই ছেলের কোন পুত্র সন্তান নেই তাই,
জিকুর ছেলে নয়ন করিম সাহেব পরিবারের প্রথম ছেলে সন্তান,আজ হাসপাতাল থেকে আসমাকে ছাড় করবে জিকু।এই পাঁচটাদিন আসমা হাসপাতালে আজ আসমা ও নয়নকে বাসায় নিয়ে যাবে জিকু,আসমা এখন অনেক সুস্থ্য হয়ে উঠেছে ডাক্তারের সাথে কথা বলে জিকু সব টাকা পয়সা পরিশোধ করে একটি প্রাইভেট কার ডেকে এনে আসমা এবং ছেলে কে গাড়িতেে তুলে নিজেই উঠে বসলো,গাড়ি বাসার পথে রওনা হলো,আজ জিকুর কি যে ভালো লাগছে সে একজন পিতা হয়েছে। পরিবারের অমতে ভালোবেসে গরিব ঘরের মেয়ে আসমাকে বিয়ে করে পরিবার ছাড়া হয়েছে তবুও জিকুর কোন কষ্ট নেই দুঃখ নেই,জিকু স্রষ্টার কাছে মনে মনে প্রার্থনা করলো আসমা ও তার ছেলে নয়নের জন্য আল্লাহ যেন ওর ছেলে ও স্ত্রীকে ভালো রাখেন।জিকু আসমাকে কখনো কষ্টে রাখেনি আর রাখবেও না, জিকুর যত কষ্টই হোক না কেন জিকু ভালোবাসার মুল্যায়ন করতে জানে,এসব কথা ভাবতে ভাবতে ওদের গাড়ি বাসার সামনে এসে দাঁড়ালো।
ড্রাইভারঃ স্যার এসে গেছি,
জিকুঃ হ্যাঁ ভাই আপনি একটু সাহার্য করুন আমাদের নামতে,ড্রাইভার ওদের সব জিনিষ পত্র গাড়ি থেকে নামিয়ে বাসায় উঠিয়ে দিয়ে ভাড়ার টাকা নিয়ে চলে গেলো।
বাসায় এসে আসমা ঘর দোর দেখলো সব অপরিষ্কার,কেমন যেন নোংরা নোংরা লাগছে, আসমা পরিস্কার করার জন্য প্রস্তুত হলো আসমার হাতে ঝাড়ু দেখে
জিকুঃ আসমা তুমি এখনো পুরোপুরিভাবে সুস্থ নও কি করছো এসব, তুমি চিন্তা করনা রেষ্ট নাও আর নয়ন কে রাখো আমি সব পরিস্কার করছি বলে আসমার হাত থেকে ঝাড়ু নিয়ে পরিস্কার করার জন্য রেডি হলো।
আসমাঃ জিকুর হাতটা ধরে বলল,একটা কথা বলবো,জিকুঃ বলো কি বলবে,আসমাঃ জিকুর হাতে একটা চুম্বন দিয়ে বলল,লোকে কি বলবে, 
জিকুঃ কে কি বলবে সেটা আমাদের বিষয় নয়,লোকে কি আমাদের খেতে দেয় না পরতে দেয়,যে তাদের কথা শুনতে হবে।
আসমাঃতুমি এত ভালো কেন,তুমি কি বলতো,জিকু আসমার কপালে চুম্বন দিয়ে বলল,তুমি যে আমার ভুবন যে।
কথাটি শুনেই আসমার দুচোখ অশ্রুতে ভরে গেলো,আজ এ অশ্রু দুঃখের নয় এ অশ্রু ভালবাসার,এ অশ্রু আনন্দের কারণ জিকু আসমাকে কতটা ভালবাসে আসমা
সেটা আজ মর্মে মর্মে অনুভব করতে পারছে, জিকুর প্রতিটা কাজে আসমা বুঝতে পারে।আজ আসমার নারী জীবন স্বার্থক কারণ জিকুর মত একজন সহজ সরল মনের স্বামী পেয়ে,আসমা আল্লার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে দোয়া করলো স্বামী জিকুর জন্য,যেন দুজনের ভালোবাসা আর সুখ গুলো অটুট রাখে।জিকু সব কাজ শেষ করে আসমাকে বলল,গোসল করার জন্য আসমা ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে গোসলের জন্য তৈরি হলো, জিকু আসমাকে ধরে ওয়াশ রূমে নিয়ে গোসল করিয়ে দিয়ে রূমে এনে কাপড় পরিয়ে দিয়ে নিজে গোসল করলো।
তারপর জিকু আসমাকে বলল,দুপুরের খাবার তো রান্না হলো না আজ এক কাজ করি আমি যায় হোটেল থেকে খাবার নিয়ে আসি বলে বের হয়ে গেলো,জিকু হোটেল থেকে খাবার নিয়ে বাসায় এলো,আজ দুপুরে ওদের রান্না হয়নি কারণ অনেক পরিশ্রান্ত জিকু,নইলে জিকু রান্না করতো। ঘরের সব কাজ আজ একা করতে সময় গেছে তাই রান্নাও হয়নি,হোটেল থেকে আনা খাবার আসমা আর জিকু দুপরে খেয়ে ক্লান্ত শরীর নিয়ে জিকু আর আসমা শুয়ে পড়লো,তারপর পরস্পর দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরলো আজ কতদিন দুজন পৃথক হয়ে থেকেছে,
আসমাঃ হেসে বলল এই কি করছ তুমি,
জিকুঃ আসমাকে বলল,জান আজ কত  দিন বা কত কাল মনে হয় তোমার স্পর্শ পাইনি আমি তাই জড়িয়ে ধরেছি,
আসমাঃ তুমি খুব দুষ্ট হয়েছো জান আমার শরীর ভালো না,কেন কষ্ট বাড়াও!
জিকুঃ বাড়ুক সমস্যা নেই শুধু তোমায় ভালোবাসি,আসমা এবার জিকুকে খুব করে কাছে আরো কাছে টেনে নিয়ে পাগলের মত চুম্বন করলো,মাথায় চুলের ভিতর হাত বুলিয়ে আদর করলো মনে হলো কতকাল আসমাও জিকুকে একান্তে এভাবে কাছে পাইনি।তারপর দুজন দুজনকে পরস্পর জড়িয়ে ধরে গল্প করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়লো জানে না ওরা।


চলবে.....

শামীমা আহমেদ এর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৫৯




শায়লা শিহাব কথন
অলিখিত শর্ত 
(পর্ব ৫৯)
শামীমা আহমেদ 


 


                                                          সুনায়রা আর আরুশের সাথে  শায়লার ক্যারাম খেলা বেশ জমে উঠেছে! শায়লার আদর কাড়া কথায় মাঝে মাঝেই সুনায়রা আর আরুশ আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠছে।ওরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠেছে!
মা ঘুমিয়ে পড়ায় শিহাব মায়ের ঘর থেকে বেরিয়ে  ওদের এই আনন্দঘন সময় দূর থেকে দেখছিল। অনেকদিন পর এই বাড়িতে শিহাব একটু প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারছে আর এর জন্য শায়লার কাছে তার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। খেলার ফাঁকে হঠাৎ শায়লা চোখ তুলতেই শিহাবকে দেখতে পায়।শায়লার মুখটি খুশিতে ঝলমল করে উঠলো! শিহাব চোখের ভাষায় শায়লার প্রতি একরাশ ভালবাসার প্রকাশ দেখালো। শায়লা এক লাজুক হাসিতে তা গ্রহন করে নিয়ে আবার খেলায় মেতে উঠলো। শিহাব ড্রইং রুমের সোফায় বসে মোবাইল  চেকিং এ ব্যস্ত হলো।
একটু পরেই আরাফ তার দাদার কোল দখল করে চারতলায় চলে এলো। শিহাব বাবার সাথে দেখা হওয়ায় সালাম জানিয়ে বাবার শরীরের খোঁজখবর নিয়ে পরিবেশটা শায়লার জন্য সহজ করে দিলো। শায়লা উঠে দাঁড়ালো। শিহাব তার বাবার সাথে শায়লার পরিচয় করিয়ে দিলো। শায়লার সালামের উত্তর দিয়ে তিনি ঘরের দিকে যেতে চাইতেই, আরাফ শায়লার সাথে আরুশ ও সুনায়রার এত আনন্দিত ভাব দেখে সেও খেলার লোভ 
সামলাতে পারল না। খুব দ্রুতই  সে দাদার কোল থেকে নেমে এলো। আরুশের পাশে বসে খেলার সঙ্গী হতে চাইল। শায়লা আরাফকে তার কাছে ডাকলেও  আরাফ আরুশের সাথে বসে রইল। মাঝে মাঝে চোরাচাহনীতে শায়লাকে দেখছে। শিহাব কাছে এসে আরাফের মাথায় হাত বুলিয়ে, খুবই আদুরী গলায় বললো,যাও বাবা, ঐটা তোমার আম্মু। আরাফ এবার যেন শায়লার দিয়ে স্থির দৃষ্টিতে তাকালো। শায়লা হাত বাড়িয়ে আরাফ বলে একটা মায়াভরা ডাক দিতেই আরাফ গুটিগুটি পায়ে শায়লার দিকে এগিয়ে গেলো। সুনায়রা বললো, যাও ভাইয়া এইটাতো তোমার আম্মু হয়। এবার আরাফ পুরোপুরিই কনভিন্সড হলো। শায়লার কাছে যেতেই শায়লা তাকে আদরে জড়িয়ে ধরে কোলে বসিয়ে নিলো।আরাফের মুখে এক স্বর্গীয় হাসি! শায়লাও যেন দুঃসাধ্য কিছু জয় করার আনন্দে শিহরিত হয়ে উঠলো!  শিহাবের চোখ আনন্দাশ্রু তে ভরে গেলো। এখন শায়লা যেন তার জীবনের পূর্ণতা এনে দিলো। ধীরে ধীরে  শায়লা আর আরাফ ঘনিষ্ঠ হয়ে গেলো। শায়লা আরাফকে বুকে জড়িয়ে নিলো। শায়লার বুকের ভিতরেও যেন কত কত যুগের সন্তান তৃষায় শুকিয়ে,শুস্ক মরু সাহারা হয়ে ছিল। এমন নরম নরম শিশুর হাত পায়ের ছোঁয়াতে শায়লার ভেতরে মাতৃত্বের নহর বয়ে গেলো। মা আর সন্তানের এমন মিলন দৃশ্য  শিহাবকে একবারে  নির্বাক করে দিলো।
দুপুরের  রান্না শেষ করে সুমাইয়া উপরে চলে এলো। ভাবী আজ ভীষণ ব্যস্ত।শায়লা ভাবীকে আজ কোন সাহায্যই করতে না পারায় তার দুঃখ প্রকাশ করতেই সুমাইয়া বলে উঠলো,না না  আজ তুমি  বাচ্চাদের সাথে থাকবে
দেখোনা তোমাকে পেয়ে ওরা কত খুশি হয়েছে।কতদিন পর ওরা চাচী পেলো! আরাফও তো দেখছি তোমার কাছে যাচ্ছে।
শায়লা অর্জনের হাসিতে বুঝিয়ে দিলো,হ্যাঁ ভাবী আমি আরুশের মন জয় করতে পেরেছি।সে আমার কাছে এসেছে। আমি এরপর একটু রকটু করে ওর সাথে বন্ধুত্বটা গড়ে তুললেই ও একেবারে আমার কাছে চলে আসতে চাইবে। যদিও কথাটায় সুমাইয়া আরাফকে হারানোর বেদনায় কষ্ট পেল, তবুও সে চায়, আরাফ বাবা মায়ের সাথে থাকুক।তার নিজের পরিবার সে চিনুক।
সুমাইয়া রান্না করা  সব খাবার চারতলা শ্বাশুড়ির ফ্ল্যাটে নিয়ে এলো।  সবাই একসাথে মিলে ডাইনিং টেবিলে খাবার খেতে বসলো।শায়লার কোলে আরাফ আর দুই পাশে সুনায়রা আর আরুশ বসেছে।চাচী তাদের খাবার তুলে দিচ্ছে। যদিও খুবই চেনা খাবার কিন্তু আজ চাচীর যত্নের বেড়ে  খাওয়ানোতে তারা আনন্দে আপ্লুত হয়ে যাচ্ছে। শায়লা নিজের প্লেটের খাবার থেকে কোলে বসা আরাফের মুখে একটু একটু করেচতুলে দিচ্ছে।
এই দৃশ্য দেখে সুমাইয়া বলে উঠলো, শায়লা তুমি বাচ্চাগুলোর মায়া বাড়াচ্ছো।তুমি আজ চলে গেলে ওরাতো খুব কষ্ট  পাবে।
এ কথার জবাবে মা বলে উঠলেন,শায়লা তুমি মাঝে মাঝেই আসবে।এই বুড়ো বাবা মাকেও দেখে যাবে।
শায়লা মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মতি জানালো।শিহাব বুঝে নিলো শায়লাকে ঘরে তুলতে বেশি দেরি করা যাবে না। ইতিমধ্যেই  সে এই পরিবারের সবাইকে আপন করে নিয়েছে।শায়লা তার নিজের প্লেটের খাবার তিনজনের মুখে তুলে দিচ্ছে। টেবিলের বিপরীত দিক থেকে শিহাব শায়লার এই মায়াভরা মনটাকে অনেক ভালবাসায় ভরিয়ে দিলো। শিহাব মনে মনে বলে উঠলো, শায়লা তোমাকে আমি ঠিকই চিনেছি।শায়লা আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি। শায়লার হৃদয়ে যেন শিহাবের কথার ঢেউ এসে লাগলো। সেও নীরব ভাষায় চপকে চোখ ফেলে  উত্তর পাঠিয়ে দিলো,আমিও তোমাকে অনেক ভালবাসি শিহাব। দুজনেই মনের অজান্তে এক গভীর  অনুভবে শিহরিত হলো।

বিকেলের আগেই শিহাব মা বাবা ভাবীর কাছ থেকে বিদায় নিতে চাইলো।ভাবী তাদের বিকেলের চা খেয়ে যেতে বললো।শিহাব জানালো,আজ না ভাবী। না হলে আমাদের ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে।শায়লাকে সন্ধ্যার আগে ওদের বাসায় পৌছে দিতে হবে।
ভাবী এবার আর শিহাবকে বলতে ছাড়লো না, কি ব্যাপার শিহাব?  সন্ধ্যা হতে তো এখনো ঢের দেরী? দুজনে আবার মুভি দেখতে যাবে নাকি? 
এ কথায় শায়লার চোখ ভীত হয়ে উঠলো!সিনেমা হলের সেই অন্ধকার পরিবেশ শায়লা
বেশ ভয় পায়।একবার ছোট বেলায় একটি বাজে অভিজ্ঞতা হয়েছিল তার। মুভি দেখার ইচ্ছে তার একেবারেই নেই। 
শিহাব সাথে সাথেই সুমাইয়ার কথা খন্ডন করে বললো,না না, ভাবী তেমন কোন ইচ্ছে নাই।আর মুভি দেখতে গেলে তোমাকেও নিয়ে যাবো।কোন আনন্দই তোমাকে ছাড়া পূর্ণতা পাবে না ভাবী।তোমার কাছেতো আমার ঋণের শেষ নেই।
--থাক খুব হয়েছে,আর ঋণ শোধ করতে হবে না।শায়লা পাশে দাঁড়িয়ে ভাবী  দেবরের মধুর সম্পর্কের কথোপকথন শুনছে।
---তুমি তাড়াতাড়ি  শায়লাকে ঘরে তুলে নাও, তবেই আমরা একসাথে মুভি দেখতে যাবো।
সুমাইয়ার এমন কথায় শায়লা বেশ লজ্জিত হয়ে গেলো।
সেই সকাল থেকে নানান নাটকীয় ঘটনার পর সবশেষে শায়লার আদর পেয়ে আরাফ শায়লার কোলেই ঘুমিয়ে পড়লো। বেশ ধকল গেছে শিশুটির ওপর দিয়ে।আরাফকে রেখে যেতে শায়লার খুব মায়া হচ্ছিল।কিন্তু ঘুমিয়েছে বলেই এখন রেখে যাওয়া সম্ভব।চাচীর বিদায়ক্ষণে সুনায়রা, আরুশ কেঁদে কেটে একাকার।শায়লাকে পেয়ে তারা আজ একটা খেলার সঙ্গী পেয়েছিলো!  
শায়লা সুনায়রা আর আরুশকে অনেক আদর করে, আবার বেড়াতে আসবে, এমনটি কথা দিয়ে সেদিনের মত জিগাতলা থেকে ওরা বিদায় নিলো। শিহাব উবার কল দিলো।সুমাইয়া ওদের গেইট পর্যন্ত এগিয়ে দিলো।
শায়লা সুমাইয়াকে জড়িয়ে ধরে নীরবে যেন  শিহাবকে নিয়ে তার আশা আকাঙ্ক্ষার  কথাই বুঝাতে চাইল।সুমাইয়া জানালো, শায়লা তুমি খুবই ভাগ্যবতী, শিহাবকে তোমার জীবন সঙ্গী করে পেতে যাচ্ছো।ওর মত ভালো  ছেলে আর হয় না। শিহাব চোখের ইশারায় এ কথার সমর্থন জানাতেই তিনজনেই  একসাথে হেসে ফেললো। শায়লা শিহাব উবারে বসলো। সুমাইয়া ঘরে ফিরে গেলো।গলির মোড় পেরিয়ে গাড়িটি মেইন রোডে আসতেই শিহাব শায়লাকে একেবারে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে শায়লার গালে চট করে একটা গভীর চুমু বসিয়ে দিলো। আর শায়লাকেও শিহাবের কাছে আত্মসমর্পণ করতে হলো।কেননা শায়লার শক্তিতে শিহাবকে ছাড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা  ধোপে টিকল না। 
গাড়ি দ্রুত গতিতে এগিয়ে চললো।সিগনালে থামতেই শিহাব নিজেকে শায়লা থেকে ছাড়িয়ে নিলো।বাকী পথটুকু দুজনে নীরবেই
 সময় পার করলো।শায়লার মনের ভেতর নানান ভাবনার উঁকি। শিহাব ভেবে নিলো ব দুজনে একটা জায়গায় বসলে ভালো লাগলে। শিহাব ভেবে নিলো উত্তরায় টেবিল টপ রেস্তোরাঁয় বসে বিকেলের চা খেয়ে নিবে।জায়গাটা শিহাবের খুবই পছন্দের। উবার হাউজ বিল্ডিংয়ে মাস্কাট প্লাজার রোডে ঢুকতেই শিহাব  ড্রাইভারকে  টেবিল টপ রেস্তোরাঁয় থামতে বললো।


চলবে....