উপন্যাস
টানাপোড়েন১০৬
আলোর বিচ্ছুরণ
মমতা রায় চৌধুরী
আজ রেখা যতই ক্লান্ত-অবসন্ন থাকুক না কেন ও দৃঢ় প্রতিজ্ঞ আজকের উপন্যাসের একটি এপিসোড শেষ করতেই হবে। তাই ফ্রেশ হয়ে মিলি, তুলি ,পাইলটদেরকে খাবার খাইয়ে রাধা গোবিন্দের পুজো করে বসে পড়ল নিজের রুমে একটা পেন আর ডায়েরি নিয়ে। বাস্তবতা আর কল্পনার মিশেল দিয়ে মনের ক্যানভাসে চরিত্রগুলো সাজিয়ে তাদের মুখে ভাষা দিতে লাগলো। বেশ খানিকটা লেখার পর হঠাৎ মনে হল আগামি কালকে স্কুলে যাবে না একবার বড়দির গ্রুপে এটা জানিয়ে দি।
রেখা লিখল 'বড়দি আগামীকাল আমি স্কুলে যেতে পারবো না ,আমার বিশেষ অসুবিধা থাকার দরুন।'
এবার সেই 'সিড়ি'পত্রিকার সম্পাদককে একটা মেসেজ পাঠাল "গতকালের পর্ব টা ঠিকঠাক ছিল তো?,'
সঙ্গে সঙ্গে উত্তর আসলো'অসম্ভব সাড়া পেয়েছি ম্যাডাম ।আপনি শুধু লিখে যান।'
রেখা মেসেজ করল' থ্যাংক ইউ সো মাচ।'
সম্পাদক লিখলেন 'থ্যাংকস তো আমি আপনাকে জানাবো।'
রেখা বলল' কেন?'
এইযে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের লেখা পাঠকরা পড়তে পারছে সেজন্য। শুধু আলো আর আলোর দিকে এগিয়ে যান।
রেখা জানে অন্ধকারটাই আদিম পৃথিবীর আসল রং ,আলোটা শুধুমাত্র একটা কৃত্রিমতা ছাড়া আর কিছু নয় ,উপরের একটা স্তর। সব জায়গায় পৌঁছায় না। তবে আলোর বিচ্ছুরণ ঘটাতেই হবে।
রেখা হেসে মেসেজ পাঠাল ' পুরো কৃতিত্ব আপনার।'
সম্পাদক লিখলেন' যাই বলুন না কেন? আপনার লেখার হাত আছে তাই?'
রেখা চুপ করে থাকলো এবং হাসি চিহ্ন দিয়ে মেসেজ পাঠালো।
সম্পাদক বললেন' এটা কিন্তু ধারাবাহিকভাবে আপনাকে লিখতে হবে । একদিনও বাদ গেলে চলবে না ।আজকের পর্ব টা লিখছেন তো?'
রেখা লিখে পাঠালো' হ্যাঁ লিখছি,।'
সম্পাদক বললেন 'ঠিক আছে আর ডিস্টার্ব করবো না আপনি লিখুন।'
রেখা হাসির চিহ্ন দিয়ে পাঠাল।
এর মধ্যেই রেখার ফোন বেজে উঠলো। রিং হচ্ছে 'তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম...।'
সবেমাত্র কলমটা দিয়ে ডাইয়েরির পাতায় লিখছে আর অমনি ফোন। একটু বিরক্ত হলো।
' ভালো লাগে না বাবা, যখন তখন ফোন। এই সময় আবার কে ফোন করল ?'
দুবার ফোন বেজে যাবার পর বাধ্য হয়ে রেখা লেখা ছেড়ে উঠলো ফোনটা রিসিভ করল ।
বলল '
অপরপ্রান্ত থেকে বললেন' কে রেখা?'
রেখা বলল 'হ্যাঁ বলছি, আপনি কে বলছেন?'
অপরপ্রান্ত থেকে ভারী গলায় বললেন' আমি বড়দি বলছি'।
রেখা একটু আশ্চর্য হল হঠাৎ বড়দি কেনো ফোন করলেন? মনে মনে ভাবল ।তারপর বলল
' হ্যাঁ বলুন দিদি।'
বড়দি বললেন' কালকে তুমি স্কুলে আসবে না গ্রুপে লিখেছ, ওই জন্যে তোমাকে ফোনটা করলাম।'
রেখা বললো 'হ্যাঁ দিদি, কালকে আমি যেতে পারব না।'
বড়দি বললেন' কালকে তোমাকে আসতেই
হবে ।রেখা তুমি না আসলে তো এই কাজটা করা যাবে না।
রেখা বলল' কিন্তু দিদি আমার অসুবিধা আছে।'
বড়দি বললেন 'একটু কষ্ট করো রেখা আমার কথাটা রাখো তুমি। তোমাকে তো কোন কাজ দিয়ে আমি নিরাশ হইনি। এটা স্কুলের স্বার্থে করো রেখা।'
রেখার মনটা একটু নরম প্রকৃতির । ভালোবেসে কথা বললে মনটা গলে যায় ।
তাই বললো ' কি করতে হবে দিদি আমাকে?'
বড়দি বললেন 'কালকে তোমাকে একটু হসপিটালে যেতে হবে ।আমাদের মেয়েদের ভ্যাকসিন আছে হসপিটাল থেকে দেয়া হবে।'
রেখা বললো "কোন ক্লাস দিদি?'
বড়দি বলেন' কালকে দেয়া হবে নতুন নাইনদের।'
রেখা বলল 'কিন্তু দিদি, নাইনের ক্লাস টিচারকে দিলেই তো ভালো হতো?'
বড়দি বললেন 'সেটা আমি জানি কিন্তু গত দিনের ভ্যাকসিন নিয়ে যে গন্ডগোলটা হয়েছে তাই আমি রিক্স নিতে চাই না।'
রেখা বলল' হ্যাঁ আমি শুনেছি যদিও।'
বড়দি বললেন 'স্কুলে তো অনেকেই হম্বিতম্বি
করে ।কাজের বেলায় নেই কেউ।'
রেখা বলল 'কে দায়িত্ব ছিলেন সেদিন?'
বড়দি বললেন 'কে আবার যিনি নিজেকে সবজান্তা মনে করেন অনিন্দিতা?'
রেখা চুপ করে থাকল আর নামটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই মনের ভেতরটা কেমন যেন একটা অসহ্য জ্বলুনি হতে শুরু করল।
বড়দি বললেন 'এবার তুমি আমার কথাটা রাখো রেখা ।স্কুলের স্বার্থটা একটু দেখো।'
রেখা বলল' ঠিক আছে দিদি যাব। আমিও চাই ,যে প্রতিবন্ধকতার মধ্যে দিয়ে আমরা সকলে যাচ্ছি তাকে পেছনে ফেলে আলোর দিকে এগিয়ে যেতে ।
বড় দি বললেন' ঠিকই বলেছ, আমরা প্রত্যেকেই সেই আলোর সন্ধানী।'
বড়দি ভেবেছিলেন যে রেখা হয়তো আজকে কিছু কথা বলবে অনিন্দিতার ব্যাপারটা নিয়ে কিন্তু রেখা কিছুই জানালো না।
বড়দি মনে মনে আরো ভাবতে লাগল সত্যিই রেখার ভেতরে এত কোয়ালিটি রয়েছে সবাইকে নিয়ে ,ভালোবেসে চলতে চায়, কাজ দিলে কোনো কাজে না
নেই। হ্যাঁ, অনেক সময় সত্য কথাটা মুখের উপর বলে দেয় বটে। কিন্তু ওর ভেতরে কোনো কারচুপি
নেই ।সারল্যে ভরা, সততা দিয়ে গড়া। মুখটা দেখলেই মনে হয় কেমন স্নিগ্ধও
পবিত্রতায় ভরা।
কালকে যে অত বড় একটা কান্ড স্কুলে হয়েছে , ওর মনের ভেতরে কত টানাপোড়েন চলেছে।আমার কানে যে কথাটাএসেছে ভাবলাম রেখা ব্যাপারটা বলবে ।কিন্তু বলল না।
একেই বলে শিক্ষা।
কৃতিত্ব কখনো চাপা থাকেনা ,তা ফুটে বেরোবেই আলোয় আলোয় ভরে যাবে চারিদিক।
বড়দি বললেন 'তুমি আমাকে চিন্তামুক্ত করলে।'
রেখা বলল 'ও বড়দি কালকে কি তাহলে আমি সরাসরি হসপিটালে চলে যাব।'
বড়দি বললেন 'হ্যাঁ তুমি সরাসরি হসপিটালে চলে যেও।'
রেখা বলল 'কিন্তু দিদি নামগুলো তো লাগবে আমার।'
বড়দি বললেন' হ্যাঁ তাও তো ব্যাপার রয়েছে একটা ।নাম টা মিলাতে হবে
তো ?যারা আসবে না তাদেরকে আবার ফোন করে ডাকতে হবে। তারপর কতগুলো ভ্যাকসিন হলো সেই রিপোর্ট পাঠাতে হবে।'
রেখা বলল' হ্যাঁ সেজন্যই তো।'
বড়দি বললেন' কোন টেনশন করো না আমি গ্রুপে তোমাকে পোটাল থেকে একটা কপি পাঠাচ্ছি ।ওটা আপাতত রাখো ।তারপর স্কুল থেকে হসপিটাল এর দূরত্ব বেশি নয় ।দরকার হলে আমি কাউকে পাঠিয়ে ওই কপিটা আবার তোমাকে পাঠিয়ে দেবো কেমন?'
রেখা বলল' হ্যাঁ ,ঠিক আছে দিদি। আর বলল দিদি…
বড়দি বললেন কিছু বলবে?
রেখা বলল' আমার সঙ্গে কি আর কেউ থাকবে?'
বড়দি হেসে বললেন 'তুমি কাকে চাইছো বলো ?তোমাকে কাকে দিলে তোমার সুবিধা হবে?,'
রেখা বলল' হ্যাঁ দিলে তো সুবিধা হত?'
বড়দি বললেন 'তুমি বলো কাকে দেব ?তবে আমি একটা কথা বলি রেখা ।আমার মনে হয় অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট হয়। তুমি এ কাজটা একাই করতে পারবে এবং খুব ভালোভাবে করতে পারবে আমার সেই বিশ্বাস তোমার প্রতি আছে।
রেখা বলল 'ঠিক আছে দিদি।'
বড়দি বললেন'তার পরেও যদি তোমার মনে হয় যে তুমি কাউকে নিতে চাইছ? তাহলে তুমি বলো কাকে দিলে তোমার সুবিধা?'
রেখা বলল' ঠিক আছে দিদি ,ছাড়ুন আমি একাই যাব।'
বড়দি বললেন 'তোমার কোন অসুবিধা হবে না। যদি মনে হয় ওখানে গিয়ে কোনো অসুবিধার সম্মুখিন হচ্ছ! তুমি আমাকে ফোন ক'রো দরকার হলে আমি যাব।'
রেখা হেসে বলল' ঠিক আছে দিদি ,তাই হবে'।
বড়দি বললেন 'তোমার লেখা কি রকম চলছে?
তুমিতো উপন্যাস লিখছো ?
রেখা হাসল আর একটু অবাক হয়ে বললো' আপনি কি করে জানলেন দিদি?'
বড়দি বললেন'আকাশে চাঁদ উঠলে তার স্নিগ্ধ আলো ছড়িয়ে পড়বে না?'
রেখা বলল'ওই একটু আধটু লিখছি দিদি ,ভালো লাগে।'
বড়দি বললেন'
কথাসাহিত্যের আসরে তোমার উপন্যাসের একটা পর্ব পড়লাম ।'
রেখা উৎসাহিত হয়ে বলল'ও তাই বুঝি দিদি?'
বড়দি বললেন'
ভালো লাগছে তোমার লেখার গতি কিন্তু থামিও না ।লিখে যাও আমি তোমাকে আশীর্বাদ করছি ।একদিন তুমি সাহিত্যের ইতিহাসে জায়গা করে নেবে।'
রেখা গদগদ কন্ঠে বলল' বড়দি আপনি আশীর্বাদ করুন ,আমি যেন ভালোভাবে লিখতে পারি ।লেখনি শক্তি টা যেন আমার থেকে হারিয়ে না যায়। লেখার মধ্যেই এখন আমি নিজেকে আনন্দে রাখার উপকরণ খুঁজে পাই।'
বড়দি বললেন 'সবসময় তোমার উপরে আশীর্বাদ আছে ।ঠিক আছে ,ভালো থেকো
কেমন ।আর কালকে যথার্থ সময়ে পৌঁছে যেও ,ঠিক আছে।'
রেখা বলল 'ঠিক আছে দিদি।'
রেখা ফোনটা রেখে আবার লিখতে বসল। আজ বড়দিও আমার উপন্যাস পড়ছেন। খুবই ভালো লাগছে আর বেশ অনুপ্রাণিত হচ্ছি।
আর মনে মনে ভাবছে কবে কাগজে কাগজে তার নাম ছড়িয়ে পড়বে। আসন্ন সুখের কল্পনাতে যেন রেখার মুখখানি টস টস করছে।