০৭ নভেম্বর ২০২১

কবি সুবর্ণ রায় এর কবিতা




পেরিয়ে এসো 
  

ভেঙে যাক সব রেখার বাধা,এসো পেরিয়ে 
ছড়িয়ে পড়ুক আকাশজুড়ে মুগ্ধ কাতরতা
সর্বনাশের মাঝে ফের দাঁড়িয়ে দু'জনে
ছুঁয়ে দিই আজ একে অপরের ঠোঁটের নীরবতা

সাবানা পারভিন





আগ্নেয়গিরি


একশ ওয়াটের বাল্বটি 

নিজেকে সূর্যের পরিচয় দিয়ে চুপ করিয়ে দিয়েছিল

মাটির সমস্ত প্রতিবাদের ভাষা ।

তারপর সমস্ত শক্তি হারিয়ে মৃত্তিকা

তলিয়ে যায় গভীর ঘুমের দেশে।

তারপর ক্ষমতার দম্ভে 

একশ ওয়াটের বাল্ব 

ভূ-বক্ষে পদাঘাত করতে করতে

একে একে হাসিল করছিল

মত্ত পৃথিবীর যাবতীয় উল্লাস।



কিন্তু এত সহজেও সব শেষ হয় না।

একটু একটু করে মৃত মৃত্তিকার

বুকের ভিতর পলি জমতে থাকে আগুনের।

জমতে-জমতে, জমতে-জমতে

ভিতরে ভিতরে ফুটতে থাকা লাভাদের বিদ্রোহ নিয়ে

একদিন সে জীবন্ত আগ্নেয়গিরি হয়ে ওঠে।





তানভীর আজীমি ( এথেন্স, গ্রিস )




একটি ফুল ও আমি 


আমি একদিন ফুলকে জিজ্ঞাসা করলাম
বলতো তুমি এতো সুন্দর কেন ??
ফুল হেসে বললো সবাই আমাকে পছন্দ করে তাই
আমি কারো প্রথম প্রেমের সাক্ষী 
কারো মন মন্দিরে মালা বদলের অকুলতা 
মধ্যবয়সী প্রণয়ের আলিঙ্গনের সাগরে ভেসে যাওয়া অনুভূতি
আমি কারো বাসর শয্যার মনোরোম সুগন্ধ
কেউ পড়ে গলায়,কেউ সাজায় কবরে,
কেউ আবার অভিমানে পিষে দেয় নির্মম আঘাতে।
আমি হয়তো বিচিত্র সুন্দর  
তাই আমাকে বিচিত্র ভাবে ব্যাবহার করো। 

ফুল আমাকে কানে কানে জিজ্ঞাসা করে !! 
আচ্ছা তুমি কি আমাকে পছন্দ করো 
আমি নির্দ্বিধায় উত্তর দিলাম হেসে 
তোমাকে পছন্দ করি বলেইতো ছুঁয়েদেই আমার নরম ঠোঁটে 
তোমাকে পছন্দ করি বলেইতো সাজাই প্রেয়সীর খোঁপায় পরম আনন্দে 
তোমাকে পছন্দ করি বলেইতো বেঁধেদেই আঁচলের অলিন্দে 
তোমাকে পছন্দ করি বলেইতো তোমায় পেতে চাই বাসরে 
প্রিয় মানুষটি যখন এসে কাছে আলিঙ্গন করে নিবিড়ে 
তোমার সুভাসে মুখরিত হয় মনের বাগান
এক অনাবিল সুখের সাগরে আমি ভেসে যায় স্বর্গীয় অনুভূতি নিয়ে।

ফুল অভিমান করে কাছে এসে বলে !!
তুমি কবি,
তুমি আমায় নিয়ে সাজাও কবিতার বাসর
জগতে অজস্র রুপে তুমি অনুভব করো আমায়
দিলরুবা পৃথিবীর প্রীতিটি উৎসবে আমায় সাজাও ভক্তি করে
মন্দিরে, মসজিদে, মাজারে, প্রতিমার গলায়, শহীদমিনারে,
আমার রুপ ও সুগন্ধে মুখরিত হয় চারিপাশ
প্রণয় শেষে আমি পড়ে রই অবহেলায় ত্তঁচলাকুড়ে  
এই কি তোমাদের ভালোবাসা, ভক্তি, তোমাদের সম্মান। 
আমি শুধুই তোমাদের প্রয়োজন, প্রিয় নই।

অবশেষ !! মুখ মলিন করে  
শেষ ফুলটিও ঝরে পড়ে ছুপটি করে নীরবে 
অফুরন্ত গ্লানি নিয়ে বুকের গভীরে 
আমি নির্বাক হয়ে ফিরে আসি দুফোঁটা অশ্রু চোখে
নির্দয় মানুষের ভুবনে, গোধূলির গোপন ধূসরে
নির্মম বাস্তবতার এই পান্থশালায়।

সজল কুমার মাইতি




মানসী



পূজোয় তারে দেখেছিলেম নানা রঙের সাজে
কোথাও সে বাদ্যি বাজায় কোথাও ব্যস্ত কাজে।
কখনো সে অঞ্জলি দেয় কখনো সাজে সিধে
রাতের বেলায় ধুনুচি নাচে ঘামে নেয়ে ভিজে।
সকাল বেলায় আগমনীর সুরে সবায় করে মাতাল 
পংক্তি ভোজের দুপুরেতে সবার খেতে খেতে বিকাল।
সিঁদুর মাখা মুখে তোমায় লাগে যে দেবী
বিসর্জনের পরও থাকবে তোমার স্মৃতির ছবি।
সুখ দুঃখ থাকে সবার থাকবে তাও জানি
তারই মাঝে আনন্দরে করি কেবল টানাটানি

কবি বিকাশ সরকার আলোউৎসবে এবং আমরা দুইজন

ভালোবাসা থেকে প্রেম 

দেবব্রত সরকার 

(আজ দ্বিতীয় কিস্তি) 

                                               লোউৎসবে সকলে যখন বাজি ফাটাচ্ছে তখন কবির কাছে আমরা দুইজন মানে সঙ্গে কবি বন্ধু তথা সাংবাদিক সানি সরকারকে নিয়ে কবিতা গল্প সাহিত্যে আলোর ঝলক দিয়ে গেলেন কবি।  কবি বিকাশ সরকার একজন প্রাণের মানুষ পাঠকের কাছে।  সবুজ মন নিয়ে হৃদয়ে নাড়া দেয়। তাঁর নিজস্ব অনুভূতিকে লেখার মধ্যে এমন ভাবে প্রয়োগ করেন যে , যে কোন পাঠকই ভেবে নিতে পারেন তার জীবনের কথা উল্লেখ করছেন।  কবিতার বই পড়তে পড়তে কালী পুজোর পরদিন সানি আমার ঘরে হাও হাও করে কেঁদে উঠল।  আমি তাকে কোন ভাবেই থামাতে পারিনা।  সানি বলল তোতন বলতো কি করে লেখেন বিকাশ দা ? আমি নির্বাক হয়ে চেয়ে থাকলাম।  সানি চোখের জল মুছতে মুছতে বাইরে ঘরে গিয়ে বসল আমার সঙ্গে তারপর বিকাশদাকে নিয়ে চলল আলোচনা কেটে গেল সারারাত।  কবির গল্প উপন্যাস ও কবিতা নিয়ে কি ভাবে যে রাত কেটে গেল জানতে পারিনি। সকালের পাখি ডাকতেই ব্যাগ কাঁধে কবির বই হাতে ট্যাক্সিতে গিয়ে বসলাম দুইজনে।  রওনা দিলাম শিয়ালদহ রেলস্টেশন এর দিকে। 

                                     
                            কবি বিকাশ সরকার কাব্যমায়ায় বুনে ঘর, কেউ নেই তার পরপর 
  

এটাই সত্য যে তিনি এই সময়ের অন্যতম এই বাংলা সাহিত্যের স্বনামধন্য কবি। কবি বিকাশ সরকারের কবিতায় মাটির ঘ্রাণ লক্ষ্য করা যায়।  কবি বিকাশ সরকারকে নিয়ে কবি কুমার অজিত দত্ত একটি নামি  সোশ্যাল মিডিয়ায় উল্লেখ করেছেন  যে, "ঈশ্বররেরা বিকাশ সরকারের কবিতা শোনে আর মুগ্ধ হয় পড়তে পড়তে , আমরাও সজনে -সবুজ হয়ে যায় , ধানক্ষেতে শুয়ে থাকি , আমরা আজ প্রকৃতি দারিদ্র হলাম ..." গৌহাটির কবি মুন চক্রবতী সেখানেই লিখেছিলেন-"লেখনীতে অনুভূতি জাগ্রত "কবি কৃষ্ণ প্রিয় ভট্টাচার্য ওখানেই উল্লেখ করেছেন -"বিকাশের কবিতা ক্রমশ বিকাশের মতোই বিকশিত "। কবি অনুপ আচার্য উল্লেখ করেছেন যে, মন ভরিয়ে দেওয়া মাটির গন্ধমাখা কবিতা।  
  

                                চায়ের দোকানে সেল্ফি 
                               চুপচাপ কবিকে দেখেছি 


 কবিকে নিয়ে কবি তুষার ভট্টাচার্য বলেছেন -"কবি বিকাশ সরকারের কবিতায় রয়েছে মাটির ঘ্রাণ।  জীবনানন্দর উত্তরসূরী প্রতিভাবান এই খানিকটা অনালোচিতই রয়ে গেলেন এটা ভীষণ আক্ষেপের। " 

                                               
                                           কবি বিকাশ সরকারের সঙ্গে আমি

 

                                     কবি বিকাশ সরকারের সঙ্গে কবি সানি সরকার 



জীবন কুড়ানো কথার যাদুতে ভরা কবিতার কবি , জীবন সংগ্রামের এক ফুটন্ত ভাতশিকারের কবি, কবি  বিকাশ সরকার তাঁকে শ্রদ্ধা ও প্রণাম। 
তাঁর ছন্দ হৃদয়ে দোলা দেয় আমার আমার করে কান । তাঁর দর্শন প্রতিটি শব্দে রহস্য মাখানো বোধ। 
উঠে আসে প্রতিটি নিয়তি মায়া । কবিতায় চুঁইয়ে পড়ে গ্রাম্য ভ্রাম্য প্রকৃতি । তাঁর  লেখার পিরামিড প্রেমে আমি হয়ে উঠি "বিষাদ বালক"। কবি আপনাকে অসংখ্যবার জানাই হার্দিক শ্রদ্ধা। আরো লিখুন আরো কবিতা চাই আমার এই বাংলা ভাষা। দু হাত খুলে আমাদের উজাড় করুন আপনার অনন্ত প্রেম। অপেক্ষায় আমরা আরো নতুন শব্দ বোধের আশায় ... 


                                                                                                                                    

মমতা রায়চৌধুরী'র ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন" ৩৮

কান্ত মনেই লিখে চলেছেন লেখক।  তার নিত্যদিনের  আসা  যাওয়া ঘটনার কিছু স্মৃতি কিছু কল্পনার মোচড়ে লিখছেন ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন "






'টানাপোড়েন' (৩৮)

          ফিকে স্মৃতি



                                                         রেখা ভেবেছিল আজকের সন্ধ্যাটা বেশ ভালোই কাটবে । মনোজ বেশ  ভাল ই ছিল ,মাঝখান থেকে ফোনটা এসে যাওয়াতে কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেল। ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে রেখা টেবিলে বসলো একগাল হাসি নিয়ে, হাসিটা রেখা জোর করেই হাসছে মনোজের মুডটাকে ঠিক করার জন্য।
 রেখা বলল  ' কফিটা খুব টেস্ট হয়েছে। না ।তুমি ন্যাচারালি কফি ভালো বানাও। কি গো খাও? এত কি ভাবছো বল তো?'
মনোজের হঠাৎ যেন রেখার কথায় চমক ভাঙলো তারপর বলল  'হ্যাঁ, কি বলছো,?'
রেখা কফির দিকে তাকিয়ে ইশারায় কফিটা খেতে বলল।
মনোজ বলল 'তুমি স্টেশনে গেছিলে কেন?'
রেখা বলল  'আর ব'লো না। কালকে খাতা জমা দিতে হবে এ,ই জন্যই তো।'
মনোজ  বলল  'একদিনের মধ্যে খাতা জমা?'জিজ্ঞাসু নেত্রে তাকিয়ে রইল রেখার দিকে'।
রেখা বলল  'আরে পর্ষদ নির্দেশিত ডেট দেওয়া হয়েছে। তো ,বড়দিরও কিছু করার নেই। ভাগ্যিস রিম্পাদি খাতাগুলো নিয়ে এসেছে। না হলে কি করতাম বল আমি?'
মনোজ বলল  'ঠিক কথা রিম্পাদির মতো একজন কলিগ তুমি পেয়েছো। তুমি ভাগ্যবতী।'
রেখা বলল  'আমি তো ১00 বার স্বীকার করি সে কথা রিম্পাদিও তো চলে যাবে ।এই তো কবে দেখো হুট করে ...।'
মনোজ বলল ' রিম্পাদি চলে গেলে ওরকম হিতাকাঙ্খী তুমি পাবে না তোমার স্কুলে।'
রেখা বলল 'আমি ও  ট্রানস্ফার নেব জানো তো?আশেপাশের স্কুলগুলো দেখি ভ্যাকান্সি আছে কিনা? কি বল তুমি?'
মনোজ বলল ' হ্যাঁ, সে তো দেখতেই হবে।'
মনোজ কফি খেতে খেতে মাঝে মাঝে অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছে। ফোনটা আপন মনে ঘেটে যাচ্ছে।
রেখা বলল ' কি গো কি ভাবছো এত? এত ভেবো না ।দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে।'
মনোজ বলল  'বলছো?'
রেখা বলল  'হ্যাঁ, গো ।যদি মনের দিক থেকে সৎ থাকো ,তোমার কেউ কিছু করতে পারবে না। ঝামেলা হয় তো তোমাকে একটু  পোয়াতে হবে।'
এরমধ্যেই মনোজের ফোনটা বেজে উঠল  'ক্রিং ক্রিং ক্রিং'
মনোজ বিরক্তিভরে বলল ' আবার সেই ফোন।'
একটু রেগে আর বিরক্তিভরে বলল ' হ্যালো'।
অপরপক্ষ বললো ' কি ব্যাপার ।আজকে অনেকক্ষণ ফোনটা সুইচড অফ করে রেখেছিলে কেন?'
মনোজ বলল  'তা আমি প্রয়োজন মনে করলে আমার ফোনের সুইচড অফ করতেই পারি ।তাতে কারো পারমিশন নিতে হবে নাকি?'
অপরপক্ষ বলল  'তা নিতে হবে বৈকি? তুমি যখন তখন তোমার ফোনের সুইচড অফ করে রাখবে । আর আমি যোগাযোগ করতে পারব না ।তা তো হবে না।'
মনোজ বলল  'কে তুমি ?আমার জীবনে এতটা দখলদারি করতে এসেছ?'
অপরপক্ষ বলল  'সেটা তুমি ভালো করেই জানো।'
মনোজ বলল  'জানি বলেই তো বলছি।'
রেখা বলল ' কে ফোন করেছে গো তোমায়।'
অপরপক্ষ বললো  'ও পাশে বউ বুঝি? এইজন্য তোমার এতটা গলাবাজি তাই না?'
মনোজ বলল  'সে তো ঠিকই। সে তো আমার বউ ।আমার জীবনের সমস্ত কিছুতে তার অধিকার। এটা আবার বলার অপেক্ষা রাখে না কি?'
অপরপক্ষ বলল  'এই দ্যাখো, আমি অত কিছু জানতে চাই না ।কি ভাবলে সেটা তুমি আগে আমাকে জানাও।
মনোজ বললো ' দ্যাখো তিথি ,তুমি আমাকে ব্ল্যাকমেইল করতে পারো না।'
তিথি বলল  'একশোবার পারি। তুমি আমার সাথে যে অন্যায়টা করেছ তার জন্য পারি।'
মনোজ বলল  'অন্যায়! আমি তোমার সাথে কি অন্যায় করেছি?'
তিথি বললো  'তুমি জানো না? তুমি কি অন্যায় করেছো?'
মনোজ বলল 'একথা অনেকবার হয়ে গেছে। আমি তোমার সাথে কোন অন্যায় করি নি ।বরং তুমি আমার সাথে অন্যায় করেছো ।আর এত বছর পর ফিরে এসে তুমি আমার জীবন টাকে বিপর্যস্ত করতে চাইছ?'
তিথি বলল  'সে তো ঠিকই ।আমি নিজে বিপর্যস্ত হবো আর তুমি সুখে সংসার করবে ।সেটা তো হবে না।'
রেখা কথাগুলো শুনছে।
তারপর রেখা বলল  'কে ভদ্রমহিলা এত গলাবাজি করছে তোমার সাথে? আমার কখনো এরকম গলাবাজি করার সাহস হয় নি।'
মনোজ বলল ' রেখা তুমি ভেতরে যাও। তোমার খাতা চেক করার ব্যাপার আছে। আমি ব্যাপারটা বুঝে নিচ্ছি। তোমাকে এই নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা করতে হবে না।'
রেখা বলল 'কিন্তু তুমি এত উত্তেজিত হয়ে যেও না।  শান্তভাবে কথা বলে মেটাও।'বলেই ভেতরে চলে গেল রেখা।
মনোজ বলল 'কেন তুমি আমার জীবনে এসে আমার সমস্ত কিছু ওলট-পালট করতে চাইছে তিথি?'
তুমি তো বিয়ে করে চলে গেলে। আজ কেন হঠাৎ তুমি আবার ফিরে আসলে ?'
তিথি বলল 'কি ব্যাপার এত মোলায়েমভাবে এখন কথা বলছ ।তোমার বউ বুঝি নেই পাশে।'
মনোজ বলল 'না নেই। ও স্কুল টিচার। ওর খাতা চেক করার আছে ।ওকে আমি ভেতরে যেতে বললাম।'
তিথি বলল 'ও তোমার বউ স্কুল টিচার? সেই জন্যই বুঝি তুমি আমাকে এত নেগলেট করছো?'
মনোজ বলল 'আমি তোমাকে নেগলেক্ট করছি না তোমার জন্য আমার সহানুভূতি হয়। কিন্তু তোমার জীবনে কি কোন ক্রাইসিসএসেছে যার জন্য তুমি..?
রেখা বলল-আমার ক্রাইসিস তুমি। তুমি আসলেই আমার সব সমস্যার সমাধান।
মনোজ  বলল  'তোমার স্বামীর কি খবর?'
তিথি বলল  'কোন স্বামী ?কিসের স্বামী?'
মনোজ বলল  'তুমি তো বিদেশে চলে গেছিলে বিয়ে করে।'
তিথি বলল' ' আমি কোন বিয়ে টিয়ে করি নি। আমি তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাই।'
মনোজ কথাটা শুনে মনে মনে একটু ভাবলো ।তারপর ভাবলো যদি ওকে কাছে পেয়ে বোঝানো যায়। তাহলে হয়তো সমস্যার সমাধান হতে পারে ।দেখা করলে কি আর ক্ষতি?
তিথি বলল  'দেখা করবে তুমি আমার সাথে?'
মনোজ বলল ' ঠিক আছে ।কোথায় বলো ?'
 তিথি বললো  'ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস?বা ন্যাশনাল লাইব্রেরী?'
মনোজ বলল  'ন্যাশনাল লাইব্রেরী?'
তিথি বললো  'ওকে ।তাহলে আগামীকাল সাড়ে ১০ টায়।'
মনোজ ফোনটা রেখে ভাবছে কথা তো দিলাম।চলে যাওয়াটা কি ঠিক? যেতে তো হবেই ।না হলে যেভাবে ফোনে আমাকে জ্বালাচ্ছে । দেখা করে এর থেকে  আর...?   ভাবতে ভাবতেই রেখার ঘরে ঢুকে ঢুকল।
মনোজ দেখছে রেখা খাতা দেখতে দেখতে পেতে শুয়ে পড়েছে। আলতো করে পেনটা হাত থেকে নিয়ে রেখে দিল টেবিলে। তারপর রেখার মাথায় হাত বুলাতে লাগল।
রেখা হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে মনোজকে দেখে হকচকিয়ে যায়। উঠে বসতে যায় তখন মনোজ বলে'তুমি খুব ক্লান্ত না? আর একটু ঘুমাবে?'
রেখা বলল  'না, ঘুমালে চলবে না। খাতাগুলো শেষ করতে হবে। আর বলল  মিলিদের খাবারের দেরী হয়ে গেলো ।খেয়েছো গো?'
মনোজ বলল  'তাই তো? আমারো তো খেয়াল হয় নি ।চিৎকার করে নি তো?'
রেখা বলল'না না না আমি যাই দেখি কি হলো?' বলেই তাড়াতাড়ি ছুটলো মিলির দিকে।
মনোজ বলল  'আমিও তোমার সঙ্গে যাচ্ছি। চলো।'
দুজনেই ছুটলো। রেখা মিলি মিলি করে ডাকলো কিন্তু মিলির কোন সাড়া নেই। কাছে গিয়ে দেখে মিলে শুয়ে আছে ।রেখা গায়ে হাত দিয়ে দেখে প্রচন্ড জ্বর। সঙ্গে সঙ্গে মনোজকে বললো  'দেখো দেখো মিলির গা কত গরম? '
মনোজ ও  মিলির গায়ে হাত দিয়ে দেখল ঠিকই। প্রচন্ড গরম। বাচ্চারা পাশে শুয়ে দুধ খাচ্ছে।
মনোজ পশু ডাক্তারকে ফোন করল' হ্যালো'।
অপরপক্ষ বলল ' হ্যাঁ ,বলুন।'
মনোজ বলল  'আপনি তো জানেন আমাদের  স্ট্রীট ডগ আছে ,ওর নাম হচ্ছে মিলি । ওর প্রচন্ড জ্বর কি ওষুধ দেয়া যায় বলুন তো? ও কিন্তু  মা হয়েছে।'
ডাক্তারবাবু   বললেন 'ওকে প্যারাসিটামল খাইয়ে দিন আর তার সাথে ডাইজিন খাইয়ে দিন।'
মনোজ বলল  'ওকে।'
ডাক্তারবাবু বললেন  'কালকে কেমন থাকে আমাকে একটু জানাবেন কেমন?'
মনোজ বলল ' নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই। অনেক ধন্যবাদ।'
রেখা বলল  ,.'আমার মিলি ঠিক হয়ে যাবে গো?  বলেই কাঁদতে শুরু করল।
মনোজ বলল ' হ্যাঁ, ঠিক হয়ে যাবে। দেখো না আমি এক্ষুনি পিন্টুদের দোকান থেকে ওষুধ নিয়ে আসছি।
তুমি খাবারের সঙ্গে গুঁড়ো করে ওটা খাইয়ে দেবে।'
রেখা বলল ' ঠিক আছে। তুমি যাও আমি ওয়েট করছি।'
মনোজ বলল ' আমি এক্ষুনি আসছি।'
রেখা বাচ্চাগুলোকে আদর করতে লাগল সঙ্গে মিলিকেউ। ও যেন কেমন অসহায় ভাবে রেখার দিকে তাকিয়ে আছে, আর মাঝে মাঝে মাঝে কাঁদছে।
এরমধ্যে মনোজ ওষুধ নিয়ে আসলো। রেখা খাবারের সঙ্গে গুঁড়ো করে খেতে দিল কিন্তু খাবার খেল না ।তখন রেখা বলল ' যাও মিষ্টি নিয়ে আসো ।ও মিষ্টি খেতে খুব ভালোবাসে ।মিষ্টির সঙ্গে ওষুধ খাওয়াতে হবে। '
মনোজ সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গেল মিষ্টির দোকানে । মিষ্টি কিনে এনে রেখার হাতে দিল। রেখা মিষ্টির সঙ্গে গুড়িয়ে খাওয়ালো ।
তারপর রেখা নিজের রুমে চলে এসে চটপট  যে কটা খাতা বাকি ছিল, দেখতে শুরু করলো।
মনেজ ও  চলে গেল পাশের ড্রইংরুমে আর ভাবতে লাগলো সেই কলেজ লাইফের কথা। সবাই মিলে এক্সকারশনে গেছিল। কাশ্মীরের আপেল গার্ডেন , ডাললেক(শিকারা) ,আরুভ্যালি,চন্দনওয়ারী.... অসাধারণ আর  অসাধারণ পাহাড়, বরফ ,প্রকৃতি যেটা ভূস্বর্গ বলে খ্যাত সেখানে তিথির সঙ্গে একাত্ম হয়েছিল। 
কাব্য করে মনোজ কথা বলেছিল ' কোথায় ভাসিয়ে নিয়ে যাবে বিদেশিনী ,চলে যাব তোমা সাথে ,বাঁধবো ঘর খানি। '
এলোমেলো ভাবনা চলেছিল তখন ।যদিও মনোজ সেই ভাবনাটাকে স্থিতিশীল করতে চেয়েছিল কিন্তু তিথি...?
আজ তিথি ফিরে আসলেও....।
আজ তার বিস্তর ফারাক। সেই স্মৃতি তাকে মনে করালেও স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়  বাস্তব বড় কঠিন।

শামীমা আহমেদ এর ধারাবাহিক গল্প "অলিখিত শর্ত"১০



শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত 
                                              (পর্ব ১০)
   শামীমা আহমেদ 



                                          ছুটির দিনের সকাল। রাস্তা বেশ ফাঁকাই ছিল।শিহাব এক ঘন্টায় ঝিগাতলায় তাদের নিজেদের বাড়িতে পৌছে গেলো।মাঝে পেট্রোল পাম্প থেকে বাইকে তেল নেয়া। পথে আর কোথাও থামল না। মা অপেক্ষায় আছে তাই আর দেরি করতে মন চাইছে না।সারা সপ্তাহ ফোনে কথা হয়, ভিডিও কলে কথা হয়, দেখা হয়।তবুও মাকে ছুঁয়ে না দেখলে সত্যিকারভাবে মায়ের কাছে যাওয়া হয় না। যতই ভিডিও কলে দেখা হউক।অবশ্য শিহাবের বাবা এ ব্যাপারটায় এখনো অভ্যস্ত হয়ে উঠেনি। শুধু পাশে বসে সবকিছু শোনে।শিহাবের বাবামায়ের কাছে অর্থাৎ দাদাদাদীর কাছে বড় হচ্ছে শিহাবের একমাত্র সন্তান  তিন বছর বয়সী  ছেলে আরাফ। সেও তার বাবার জন্য নাস্তা নিয়ে অপেক্ষায় থাকে। শিহাবের বাইকের আওয়াজ শুনলেই দৌড়ে বারান্দায় চলে আসে।
শিহাবদের ঝিগাতলার এই চারতলা বাড়িটি  ওদের নিজেদের । তিন আর  চারতলায় এক ইউনিট করে হলেও বাকীগুলি দুই ইউনিটে করা।আর সবই ভাড়া দিয়ে রাখা।তা প্রায় পনের বছর হয়ে এলো বাড়িটার। শিহাবের বাবা আমেরিকায় থাকতেই বাড়ির কাজে  হাত দেয়া। শিহাবের বড় ভাই শাহেদ তখন কলেজে পড়ছে আর শিহাব ক্লাস নাইনে।  একটা ছোট্ট দুইরুমের টিনের ঘর তোলা ছিল। নিজের এই জায়গাটায় ফ্যামিলি রেখে আমেরিকায় গিয়েছিলেন আজহার সাহেব,মানে শিহাবের বাবা। তারপর একেবারে বাড়ির কাজ শেষ হওয়া অব্দি বাইরে থেকে টাকা পাঠিয়েছেন। শিহাবের বড় মামা দেখভাল করে বাড়িটি করে দিয়েছেন।বাঙালি সমাজে বড়ভাইদের বোধ হয়  বোনদের জন্য এমন দায়িত্ব পালন করা অবশ্য কর্তব্য হয়ে যায়।  যদি ভায়েরা বিষয়টি সেভাবে দেখে।শিহাবের বাবা এরপরেও বহু বছর  বিদেশে কাটিয়ে বাড়ির লোন চুকিয়ে দেশে ফিরেন।এখন অবসর জীবন যাপন করছেন। খুবই গোছানো মানুষ তিনি। চোখে মুখে দেহে প্রকৃত বয়সের ছাপ পড়েনি মোটেও।নিজের দিকে ভীষণ খেয়াল।বিদেশ জীবন একা কাটিয়েছেন তাই নিজেকে স্বাবলম্বী করে তুলেছেন। স্ত্রীকে বেশি যন্ত্রণা করেন না। দীর্ঘদিন বিদেশে থাকা পুরুষরা স্ত্রীদের বেশ সম্মানের চোখেই দেখে।তারা বুঝতে পারে, কত কঠিন ছিল তার একার জীবনে দুই সন্তানকে মানুষ করা।
এখন শিহাবের ছেলে আরাফকে নিয়ে তাদের সময় কাটে। বড় ছেলে শাহেদের পরিবার, তাদের এক ছেলে আর এক মেয়ে নিয়ে তিনতলায় থাকছে। 
ওরা নিয়মিত যোগাযোগে আছে। শিহাবের ভাবী সুমাইয়া বেশ চমৎকার একটি মেয়ে।
উচ্চশিক্ষা নিয়েও ঘরকন্যা আর সন্তান লালনপালনে  সাংসারিক জীবনটাকে এনজয় করছে। এ ব্যাপারে কোন অভিযোগ নেই।শ্বশুর শাশুড়ী আরাফের  যত্নআত্তিতেও সবসময় হাসিমুখ। শিহাবের বড় ভাই শাহেদ যেমন গম্ভীর, তেমনি মৃদুভাষী। যিনি একটানা বিভিন্ন প্রাইভেট ব্যাংকে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে এখন একটি বিদেশি ব্যাংকের এমডির পদে আছেন।
শিহাব বাইক বাড়িতে ঢুকিয়ে রুহুল আমিন চাচার সাথে কুশলাদি বিনিময় করলেন। রুহুল আমিন আজ প্রায় পনের বছর যাবৎ এই বাড়ির কেয়ারটেকার সাথে দারোয়ানের দায়িত্বও পালন করছে। বাড়ির গ্যারেজের পিছনে তাকে সপরিবারে থাকতে দেয়া হয়েছে। শিহাব চারতলায় উঠে গেলো।দরজা খোলাই ছিল।অবশ্য এই ফ্ল্যাটের দরজা খোলাই থাকে। সারাদিন শাহেদের দুই ছেলেমেয়ে সুনায়রা ও আরুশের দাদার বাড়িতে যাতায়াত। এই তিন নাতিনাত্নি নিয়ে শিহাবের বাবামায়ের বেশ সুন্দর সময় কাটে।তবে  শিহাব আর আরাফের চিন্তা তাদের মাঝে মাঝে অস্থির করে তোলে। শিহাব সেটা বেশ ভালো করেই জানে। তাইতো ছুটির দিনে আর দেরি করেনা একেবারে। আরাফ দৌড়ে এসে বাবার কোলে উঠল! বাবার গলা জড়িয়ে ধরলো। শিহাব  আরাফকে শক্ত করে বুকের সাথে মিশিয়ে নিল। আদরে আদরে দুটো গাল ভরিয়ে ফেললো। বাবা ছেলের এমন মধুর মিলনে, মায়ের উপস্থিতি হলো না কোনদিন, কী দূর্ভাগ্য নিয়ে জন্মেছে!
শিহাবের মায়ের  একদিকে যেমন ছেলেকে কাছে পাওয়ার আনন্দ, অন্যদিকে মায়ের আদর বঞ্চিত ছোট্ট ছেলে আরাফের জন্য বুকটা হু হু করে উঠে। চোখ জলে ভরে যায়। শিহাবের বাবা আজহার সাহেব এইসব আবেগী ব্যাপারস্যাপার বেশ শক্তভাবেই সামাল দিতে পারে।ঠিক তার বড় ছেলেটিও এমনি আবেগহীন, মৃদুভাষী  আর গুছানো, প্ল্যানড লাইফে দিন কাটান।শিহাব আরাফকে নিয়ে মায়ের পাশে বসলো।মা ছেলের কান্নার দৃশ্যে আরাফ অবাক হয়ে দেখছিল। মিনিট দশেক পরিবেশটা বেশ ভারী হয়ে উঠল।আরাফের জন্য আনা খেলনাগুলো শিহাব মায়ের হাতে দিলেন। তিনতলা থেকে ভাবী চলে এলেন। শিহাবকে বললেন, নাসতা খাবে এসো।মা বাবা আরাফকে নিয়ে টেবিলে বসো। ভাবি তিনতলায় থাকলেও এই ঘরের সব প্রয়োজনই বুঝে। বড় ছেলে শাহেদকে নিয়ে মা বাবার কখনোই কিছু ভাবতে হয়নি।
বউওটাও আল্লাহ তেমনি মিলিয়ে দিয়েছেন।পরিবেশের সাথে নিজেকে খুব সহজেই মিলিয়ে নিতে পারে। কিন্তু শাহেদ ভীষন প্র‍্যাক্টিক্যাল মানুষ। ঠিক বাবা আজহারুল ইসলামের মতনই।
শিহাব তার ভাবীর কাছে জানতে চাইল সুনায়রা, আরুশ ওরা কোথায়? ওদের পাঠিয়ে দাও একসাথে নাস্তা করি। তুমিও বসো।অনেকদিন গল্প করি না। সুমাইয়া তার  হাতের মোবাইলে শাহেদকে কল দিতেই শাহেদ বাচ্চাদের পাঠিয়ে দিল। চাচ্চুকে পেয়ে তারা দারুণ খুশি!তারপর তারা আরাফের এই গল্প সেই গল্পে সারাদিন মেতে রইল। ওদের কাছে আরাফ একটা জ্যান্ত পুতুল! সেই জন্মের একমাস পর থেকেই ওরা বড়ভাইবোনের মত অভিভাবক। আরাফের মা কেন নেই সে প্রশ্ন ওরা করে না। এইটুকু জীবনে ওদের চাচার সবকিছুই ওরা প্রায় বুঝেছে। যদিও একজন ক্লাস এইটে আরেকজন ক্লাস ফাইভে পড়ছে। কিন্তু ওরা বুঝে আরাফের মা কাছে নেই আর কোনদিন আসবেও না।  
সুমাইয়া এখানেই সব খাবার পাঠিয়ে দিলো।সুমাইয়া খুব করেই জানে সুনায়রা আর আরুশ আজ আর তারা বাসায় যাচ্ছে না।নাস্তা শেষে ওরা আরাফের খেলনা নিয়ে খেলার  আনন্দে মেতে উঠল!
আজ এই চারতলার ফ্ল্যাটে রিশতিনাকে নিয়ে শিহাবের দিনগুলি অন্যরকম হতে পারতো!আর সেসব ভাবলেই শিহাব  বেশ নস্টালজিক হয়ে পড়ে,,,



                                                                                                           চলবে....

সাফিয়া খন্দকার রেখা এর গল্প

নিলয়ের বয়স তখন বিয়াল্লিশ আর প্রথমা মাত্র অনার্স প্রথম বর্ষে একুশ কিংবা বাইশ বছরের এক সুন্দরী যাকে দেখলেই যে কোন যুবকের মাথা ঘুরে যায়।  প্রথমার বাবার অফিসের কম্পিউটার অপারেটর নিলয়ের যাতায়াত ছিলো মোবিন সাহাবের বাড়িতে কারণ তার পি এর কাজও নিলয়কেই করতে হোত।


সে এক আশ্চর্য  লাশের চরিত্র  


হেমন্তের এই সময়টা নতুন চালের গন্ধে যেমন বাতাস ভারি হয় ঠিক তেমন ভারি হয়ে ওঠে প্রথমার মনের শরীর।   কতগুলো বছর অথচ কিছুই মুছে যায়না ভেতর ভেতরে কি ভয়ঙ্কর চিৎকার!  শরীর গুলিয়ে বমি আসতে চায়, বিছানা ছেড়ে অন্ধকার ঘরেই আস্তে আস্তে বেশিনের কলের কাছে এসে মুখে জলের ঝাপটা দেয়।  নিলয় গভীর ঘুমে থাকলেও পাশের ঘর থেকে শাশুড়ী মা ঠিক টের পেয়ে উঠে আসেন 
তুমি একজন ভালো ডাক্তার দেখাওতো বৌমা
আজকাল প্রায়শই দেখি তোমার বমি হয় ঠিকঠাক ঘুম হয়না, নিশ্চয়ই আমার ছেলেটা ঘুমিয়ে থাকে কিছুই জানেনা 
কথাগুলো বলছেন আর প্রথমার পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন রওশন বেগম।  
মা আপনি রাতে ঘুমান না একদম? 
ঘুমিয়ে ছিলাম তোমার বমি করার শব্দ পেলাম, 
সরি মা
আরে সরি বলার কি আছে
তুমি কিন্ত অবশ্যই ডাক্তারের কাছে যাবে কাল, আর আজকাল তো ঘরেই টেস্ট করার কি সব বের হয়েছে নিজেওতো করতে পারো।
প্রথমা জানে শাশুড়ী মা ধরেই নিয়েছেন অন্য কিছু,
কিন্ত ও তো জানে নভেম্বর এলেই ও কেন সিক হয়ে যায়,
দশটা বছর অথচ ক্ষতের উপরে এতোটুকুও প্রলেপ পড়েনি।
প্রথমার শরীরে কেমন শীত লাগছে কয়েক মিনিটের মধ্যেই ওর শরীরে পৌষের ঠান্ডার মতো কাঁপন শুরু হতে লাগলো, পায়ের কাছ থেকে কাথাটা টেনে নিজের শরীরে দিলেও শীত কমছে না, নিলয়কে ডাকছে কিন্ত কোন শব্দ বের হচ্ছেনা প্রথমার মনে হোল ওর শ্বাসকষ্ট হচ্ছে,  নিলয়কে ডাকছে কতক্ষণ তারপর আর কিছু মনে নেই ওর..... 

প্রথমার স্বামী নিলয় নিতান্তই ভদ্র এবং গো - বেচারা টাইপের মানুষ দশ বছর আগে যখন প্রথমাকে বিয়ে করে তখন সেই ঘটনা ছিলো একটি সিনেমার গল্পের মতো নিলয়ের বয়স তখন বিয়াল্লিশ আর প্রথমা মাত্র অনার্স প্রথম বর্ষে একুশ কিংবা বাইশ বছরের এক সুন্দরী যাকে দেখলেই যে কোন যুবকের মাথা ঘুরে যায়।  প্রথমার বাবার অফিসের কম্পিউটার অপারেটর নিলয়ের যাতায়াত ছিলো মোবিন সাহাবের বাড়িতে কারণ তার পি এর কাজও নিলয়কেই করতে হোত। মা ছোট বোন আর নিলয়কে নিয়ে তিন জনার সংসারে কোন বৌ নিয়ে আসতে পারেনি নিলয়ের মা শত চেষ্টা করেও কি এক অজ্ঞাত কারণে নিলয় বিয়ের নাম শুনতেই চাইতো না সেই মানুষ বিয়াল্লিশ বছর বয়সে যখন বসের মেয়েকে ঘরে এনে বললো মা দেখো আমি কিচ্ছু জানিনা কিভাবে কি হলো। 
নিলয়ের মনে হয়েছে বাবার প্রতি প্রতিশোধ নিতে এই কাজ করেছে প্রথমা রাগ কমে গেলেই ও চলে যাবে কিন্ত নিলয়ের ধারণা ভুল প্রমাণ করে দশ বছর এখনও একসাথে আছে ওরা।  

নিলয়ের মনে আছে মোমিন সাহেব যেদিন মেরিনা আপুকে বিয়ে করে ঘরে নিয়ে গেলেন তার চব্বিশ ঘন্টার মধ্যেই প্রথমার মা স্ট্রোক করে কয়েক ঘন্টার মধ্যেই মরে গেলেন  প্রথমা একটুও কাঁদেনি সেদিন।  মেরিনা মোমিন স্যারের এসিস্ট্যান্ট হিসেবে জয়েন করেছে মাত্র আট মাস।  খুব স্বাভাবিক ছিলো  একুশ বছরের মেরিনাকে নিয়ে যখন ঘরে ঢুকে পরিচয় করিয়ে দিলেন মোমিন সাহেব 
" এই যে তোমাদের ছোট মা,
তোমার মা অসুস্থ থাকেন বেশির ভাগ সময় এজন্যই তাকে নিয়ে এলাম আমার সেবা করবে, তোমাদের যত্ন নেবে"
তুলি বুলি জমজ দুই বোনের বয়স তখন তেরো ওরা দুজন দৌড়ে মায়ের ঘরে ঢুকে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিয়েছে কতক্ষণ সে দরজা বন্ধ ছিলো মনে নেই।  প্রথমা মেরিনার কাছে এসে আস্তে করে প্রশ্ন করেছিলো 
তোমার বয়স কতো ছোট মা?
সদ্য বিবাহিত লাল বেনারসি মোড়ানো মেয়েটি জবাব দিয়েছিলো একুশ... আমার বয়স কত জানেন ছোট মা?
মেরিনা মাথা নেড়ে না বলেছিলো,
আমি আপনার সিনিয়র আমার বাইশ
তারপর সব দ্রুত ঘটে গেলো 
প্রথমার মায়ের মৃত্যুর তিন দিনের শেষে নিলয়েকে অফিসের ডেস্ক থেকে কাজী অফিসে নিয়ে গেলো প্রথমা।
তুলি বাসা থেকে বেড়িয়ে সেই যে কোথায় গেছে আজও কেউ জানেনা বুলি মেঝ মামার সংসারে থাকে সেই থেকে মামীর কোন সন্তান নেই ওকে বেশ আদোর করেই রেখেছেন তারা।
নিলয় জানে নভেম্বরের তিন তারিখ থেকে পুরোটা মাস প্রথমাকে এইসব ঘটনা বেশি করে জাপটে থাকে।  পাঁচ বছর পড়ে এক সন্ধ্যায় নিলয় যখন জানালো মোমিন সাহেব অফিসে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন হাসপাতালে অক্সিজেন দেয়া ডাক্তার বলেছেন অবস্থা ভালো না, 
নিলয়ের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে প্রথমা বলেছিলো..
পাঁচ বছর আগের লাশের নতুন করে আবার কিসের মৃত্যু!! 

মেরিনার ঘরে সাত বছরের এক ছেলে আছে মোমিন সাহেবের। বারবার ফোন করে সেই ছেলে প্রথমাকে কি আদুরে গলায় ডাকে... বড় বুবু
আমাকে দেখে যাও মা তোমাকে কিছু বলতে চায়।  প্রথমা শুনতে পায় পাশে কেউ শিখিয়ে দিচ্ছে কথাগুলো, 
প্রথমার কি যেনো হয় দশ বছর পর সে সেই বাড়িটার দিকে ছুটছে যেখানে তার বাইশটি বছর কেটেছে  যেখানে তুলি হারিয়ে গেছে যে বাড়িতে মা মরে গেছে দশ বছর আগে প্রতিদিন অফিস ফেরত বাবার জন্য ওরা অপেক্ষা করতো তিন বোন বাবা গরম গরম নাস্তা নিয়ে ঘরে ফিরতো দূর থেকে প্রথমা বলে চিৎকার করতো...
বাড়ির অদূরে এসে প্রথমার পা চলতে চায়না , কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলো মনে নেই হঠাৎ প্রথমার মনে হোল দু পাশ থেকে দুটো হাত তাকে ধরে আছে, ছোট্ট একটা হাত টানছে চেনা ঘরটার দিকে.. আর বলছে তুমি বড় বুবু আমি তোমাকে চিনেছি , 
প্রথমা তাকিয়ে দেখলো হুবহু বাবার ছেলেবেলার চেহারার একটা ছোট্ট হাত টেনে নিয়ে যাচ্ছে তাকে 
মেরিনাকে বেস বয়স্ক লাগছে
স্বামী মরে গেলে বুঝি মেয়েরা বয়সের আগেই বুড়িয়ে যায়!
মেরিনা একটি বড় খাম এনে প্রথমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো 
আমার যাওয়ার কোন জায়গা নেই মামার ঘরে মানুষ হয়েছি মামা আপনার বাবার বন্ধু ছিলেন তিনিই চাকরি দিলেন বিয়ে দিলেন।  আপনার বাবা আপনার কথা খুব বলতেন এই বাড়ি অফিসের টাকা পয়সা সব আপনার নামে করে দেয়া...
ছোট্ট হাতটা তখন প্রথমার চোখ মুছিয়ে দিয়ে প্রশ্ন করছে 
বড় বুবু তুমি কি আমাদের তাড়িয়ে দেবে এ বাড়ি থেকে! 
প্রথমা ফাইল না খুলেই মেরিনার হাতে দিয়ে বেরিয়ে আসে ঘর থেকে ছোট্ট হাতটা আবার টানছে.. 
প্রথমা মেরিনার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলে আগামী সপ্তাহে উকিল নিয়ে আসবো সব ভাইয়ের নামে করে দেবো,  মেরিনার কান্নার মুখটা একদম মায়ের মতো লাগছে আজ প্রথমার কাছে....

লেখক শান্তা কামালী'র ধারাবাহিক উপন্যাস "বনফুল" ১৯

চোখ রাখুন স্বপ্নসিঁড়ি সাহিত্য পত্রিকার পাতায় লেখক শান্তা কামালী'র  নতুন ধারাবাহিক  উপন্যাস "বনফুল" 





বনফুল
                   ( ১৯ তম পর্ব ) 



                                            জুঁই উপরে উঠে হাত পা ছেড়ে শুয়ে পড়ল,ঘড়িতে তখন তিনটে বাজে। ফোনটা হাতে নিয়ে পলাশকে ফোন দিল, ওপাশ থেকে পলাশের কণ্ঠে বললো কেমন আছো জুঁই ? স্যরি জুঁই আমি আর তোমাকে ফোন দিতে পারিনি! এপাশ থেকে জুঁই বললো its Okay আমি তো দিচ্ছি, মোট কথা একজন দিলেই হলো।
আমিও ব্যস্ত ছিলাম তাইতো তোমাকে ফোন দিতে পারিনি, এখন বল তোমার বন্ধু কেমন আছেন?  
হুমমম ভালো আছে, এতক্ষণ পর্যন্ত তোমার গল্পই হচ্ছিল..... 
জুঁই হাহাহা হাহাহা হাহাহা  হেসে উঠলো! আমায় নিয়ে আবার গল্প করার কি আছে, আমি সাদামাটা একটা মেয়ে মাত্র,আমি তো ক্লিওপেট্রা নই। আচ্ছা তোমাদের বন্ধুত্বের গল্পে ভাগ বসাতে চাই না, কালকে ঠিক সময়ে চলে এসো। ফোন রাখছি বাই বাই বলে জুঁই ফোন কেটে দিলো। কিছুক্ষণ চুপ করে শুতেই ঘুমিয়ে পড়েছে জুঁই। পাঁচটায় জুঁয়ের ঘুম ভাঙ্গলো, হাতমুখ ধুয়ে নিচে নেমে আসতেই ময়না জিজ্ঞেস করলো আপামনি আপনাকে চা দেবো না কফি?  
জুঁই বললো কফি দাও সাথে হালকা কিছু স্ন্যাকস দিও।
আজ জুঁয়ের মা ভীষণ ব্যস্ত কালকে বাসায় মেহমান আসবে, তাই আজ থেকে সব কিছু গুছিয়ে রাখছে, যেন সকালে নাস্তার পরই একে একে সব রান্না করে নিতে পারেন।
আজ জুঁই বাবা-মায়ের সঙ্গে চুটিয়ে গল্প করলো রাত দশটা পর্যন্ত, তারপর ময়না টেবিলে খাবার পরিবেশন করেছে। বাবা-মা মেয়েতে ডিনার শেষ করে। গুডনাইট বলে জুঁই  উপড়ে উঠে এলো। 
দাঁত ব্রাস করে ফ্রেস হয়ে জুঁই শুতে যাওয়ার আগে নিজেকে একবার আয়নায় দেখে নিলো।তারপর ভাবলো কালকে কি ড্রেস পরবে।কোন বডি স্প্রে টা পলাশ কে বেশী আকর্ষণ করবে,এইসব ভাবতে ভাবতে একটা চুড়িদার ওড়না, ইনার গার্মেন্টস সবকিছু গুছিয়ে রাখলো।পড়ার টেবিলে একটা ফটো ফ্রেমে নিজের একটা হাল্কা পোশাক পরা ছবি লাগিয়ে বসিয়ে দিলো।আবারও আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বিনুনি দুটো পেছন থেকে সামনে এনে বুকের দুপাশে দুলিয়ে দিয়ে নিজেকে দেখে নিজেই হেসে ফেললো। প্রতিবিম্ব কে যেন নিজেই প্রশ্ন করলো",উঁ এইটুকু মেয়ে আবার প্রেম করে"।ঠোঁটের ওপর হাল্কা করে ময়েশ্চারাইজার লাগিয়ে মুখটা এঁকিয়ে বেঁকিয়ে নিজেকে মুগ্ধ হয়ে দেখছিলো,এমন সময় 
 পলাশ একটা গুড নাইট মেসেজ পাঠালো।ফোনটা হাতে নিয়ে পলাশ কে ফোন দিয়ে জিজ্ঞাসা করলো,তোমার বন্ধু কি ঘুমিয়েছে, না-কি এখনো আমাকে নিয়েই.....। পলাশ বললো, এতোক্ষণে ঘুমিয়েছে বলেই তো শুভ রাত্রি জানাতে দেরি হয়ে গেলো।
একটা মিষ্টি হাসির মৃদু শব্দ শুনিয়ে পলাশ কে শুভ রাত্রি জানিয়ে জুঁই ঘুমাতে গেল।


                                                                                                চলবে....

রুকসানা রহমান এর ধারাবাহিক উপন্যাস "উদাসী মেঘের ডানায়"২৩

চলছে নতুন  ধারাবাহিক  উপন্যাস "উদাসী মেঘের ডানায়
লেখাটি পড়ুন এবং অন্যদের  পড়তে সহযোগিতা করুন  লেখককের মনের অন্দরমহলে জমে থাকা শব্দগুচ্ছ একত্রিত হয়েই জন্ম  লেখার। 
আপনাদের মূল্যবান কমেন্টে লেখককে  লিখতে সহযোগিতা করবে। 




উদাসী মেঘের ডানায় 
                                                  (পর্ব ২৩)


                                                 মিয়া,সোজা যেয়ে উঠলো তৃষ্ণার বাসায়,তৃষ্ণার মা অবাক কন্ঠে বললো- কি হয়েছে তোমার সুটকেস ব্যাগ নিয়ে কোথাও যাবে মা?
সামিয়া - না, খালা কয়টা দিন আমাকে থাকতে দিন।
তারপর চলে যাবো বাসা ঠিক করে, দিবেন থাকতে?
- ওমা সেকি কথা থাকতে দিবোনা মানে এসো পাগলি
মেয়ে কোথাকার,এতো ক্লান্ত দেখাচ্ছে কেন কিছু খাওনি, তৃষ্ণা কোথায়?
সামিয়া- খালা আমি অফিস থেকে অনেক আগে চলে
এসেছি একটা জরুরী কাজ ছিলো সেটা শেষ করে
এসেছি তৃষ্ণা চলে আসবে হয়তো কাছাকাছি চলে
এসছে।
- যাও হাতমুখ ধুয়ে ঐরুমে যাও আমি খাবার রেডি করি।
সামিয়া- তৃষ্ণা আসুক, আমি বরং একটু বিশ্রাম নেই।
এইবলে গেষ্টরুমে চলে গেলো।
তৃষ্ণা বাসায় এসেই মার কাছে সব শুনে সামিয়ার রুমে এসে দেখে সামিয়া শুয়ে আছে।
ওর মাথায় হাত রাখতেই সামিয়া চোখ খুলে উঠে বসে
তৃষ্ণা কে জড়িয়ে ধরে কাদঁতে কাদঁতে বললো -
পারলাম নারে সংসারটা টিকিয়ে রাখতে আমি হেরে গেলাম ভালোবাসার কাছে।
তৃষ্ণা- কেন কি হয়েছে খুলে বলো।
সামিয়া- আমি বাধ্য হলাম আর অপমান,অপবাদ নিতে পারলামনা তাই ডিভোর্স দিয়ে তোর কাছই ছুটে
এলাম,কয়টা দিন থাকি তারপর চলে যাবো।
তৃষ্ণা- অনেক সহ্য করেছো আর কতো, খালা তোমার
ভাাই বোনেরা জানে।
সামিয়া- না বলিনি,আর ভাইয়ের বাসায় গেলে আবার
জোর করে পাঠিয়ে দিবে, মাকে আমার জন্য কথা শুনতে হবে।বোনের কষ্টে ওদের কষ্ট হয়না, ওদের মান-সন্মান অনেক বেশি, তাইতো তোর কাছেই এলাম।
তৃষ্ণা- এসেছ যখন তখন এখানেই থাকবে বাড়ি ভাড়া
নিতে হবেনা আমাাদের কতরুম খালি পড়ে আছে
তাছাড়া আমাকে তো তুমি ছোট বোনের মতন আদর করো, কাজেই আমার কথাই শুনতে হবে।
সামিয়ার মা দরজায় দাঁড়িয়ে সব শুনে সামিয়ার কাছে
এসে বুকে জড়িয়ে ধরে বললো- আজ থেকে আমার
দুটো মেয়ে,তৃষ্ণা অফিসের কাপড় চেন্জ করে হাতমুখ
ধুয়ে আায় দুজন ডাইনিং এ কিছু খেয়ে নাও তারপর
গল্প করো।এই বলে উনি বেরিয়ে গেলো।


                                                                                      চলবে...