একান্ত মনেই লিখে চলেছেন লেখক। তার নিত্যদিনের আসা যাওয়া ঘটনার কিছু স্মৃতি কিছু কল্পনার মোচড়ে লিখছেন ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন "।
'টানাপোড়েন' (৩৮)
ফিকে স্মৃতি
রেখা ভেবেছিল আজকের সন্ধ্যাটা বেশ ভালোই কাটবে । মনোজ বেশ ভাল ই ছিল ,মাঝখান থেকে ফোনটা এসে যাওয়াতে কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেল। ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে রেখা টেবিলে বসলো একগাল হাসি নিয়ে, হাসিটা রেখা জোর করেই হাসছে মনোজের মুডটাকে ঠিক করার জন্য।
রেখা বলল ' কফিটা খুব টেস্ট হয়েছে। না ।তুমি ন্যাচারালি কফি ভালো বানাও। কি গো খাও? এত কি ভাবছো বল তো?'
মনোজের হঠাৎ যেন রেখার কথায় চমক ভাঙলো তারপর বলল 'হ্যাঁ, কি বলছো,?'
রেখা কফির দিকে তাকিয়ে ইশারায় কফিটা খেতে বলল।
মনোজ বলল 'তুমি স্টেশনে গেছিলে কেন?'
রেখা বলল 'আর ব'লো না। কালকে খাতা জমা দিতে হবে এ,ই জন্যই তো।'
মনোজ বলল 'একদিনের মধ্যে খাতা জমা?'জিজ্ঞাসু নেত্রে তাকিয়ে রইল রেখার দিকে'।
রেখা বলল 'আরে পর্ষদ নির্দেশিত ডেট দেওয়া হয়েছে। তো ,বড়দিরও কিছু করার নেই। ভাগ্যিস রিম্পাদি খাতাগুলো নিয়ে এসেছে। না হলে কি করতাম বল আমি?'
মনোজ বলল 'ঠিক কথা রিম্পাদির মতো একজন কলিগ তুমি পেয়েছো। তুমি ভাগ্যবতী।'
রেখা বলল 'আমি তো ১00 বার স্বীকার করি সে কথা রিম্পাদিও তো চলে যাবে ।এই তো কবে দেখো হুট করে ...।'
মনোজ বলল ' রিম্পাদি চলে গেলে ওরকম হিতাকাঙ্খী তুমি পাবে না তোমার স্কুলে।'
রেখা বলল 'আমি ও ট্রানস্ফার নেব জানো তো?আশেপাশের স্কুলগুলো দেখি ভ্যাকান্সি আছে কিনা? কি বল তুমি?'
মনোজ বলল ' হ্যাঁ, সে তো দেখতেই হবে।'
মনোজ কফি খেতে খেতে মাঝে মাঝে অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছে। ফোনটা আপন মনে ঘেটে যাচ্ছে।
রেখা বলল ' কি গো কি ভাবছো এত? এত ভেবো না ।দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে।'
মনোজ বলল 'বলছো?'
রেখা বলল 'হ্যাঁ, গো ।যদি মনের দিক থেকে সৎ থাকো ,তোমার কেউ কিছু করতে পারবে না। ঝামেলা হয় তো তোমাকে একটু পোয়াতে হবে।'
এরমধ্যেই মনোজের ফোনটা বেজে উঠল 'ক্রিং ক্রিং ক্রিং'
মনোজ বিরক্তিভরে বলল ' আবার সেই ফোন।'
একটু রেগে আর বিরক্তিভরে বলল ' হ্যালো'।
অপরপক্ষ বললো ' কি ব্যাপার ।আজকে অনেকক্ষণ ফোনটা সুইচড অফ করে রেখেছিলে কেন?'
মনোজ বলল 'তা আমি প্রয়োজন মনে করলে আমার ফোনের সুইচড অফ করতেই পারি ।তাতে কারো পারমিশন নিতে হবে নাকি?'
অপরপক্ষ বলল 'তা নিতে হবে বৈকি? তুমি যখন তখন তোমার ফোনের সুইচড অফ করে রাখবে । আর আমি যোগাযোগ করতে পারব না ।তা তো হবে না।'
মনোজ বলল 'কে তুমি ?আমার জীবনে এতটা দখলদারি করতে এসেছ?'
অপরপক্ষ বলল 'সেটা তুমি ভালো করেই জানো।'
মনোজ বলল 'জানি বলেই তো বলছি।'
রেখা বলল ' কে ফোন করেছে গো তোমায়।'
অপরপক্ষ বললো 'ও পাশে বউ বুঝি? এইজন্য তোমার এতটা গলাবাজি তাই না?'
মনোজ বলল 'সে তো ঠিকই। সে তো আমার বউ ।আমার জীবনের সমস্ত কিছুতে তার অধিকার। এটা আবার বলার অপেক্ষা রাখে না কি?'
অপরপক্ষ বলল 'এই দ্যাখো, আমি অত কিছু জানতে চাই না ।কি ভাবলে সেটা তুমি আগে আমাকে জানাও।
মনোজ বললো ' দ্যাখো তিথি ,তুমি আমাকে ব্ল্যাকমেইল করতে পারো না।'
তিথি বলল 'একশোবার পারি। তুমি আমার সাথে যে অন্যায়টা করেছ তার জন্য পারি।'
মনোজ বলল 'অন্যায়! আমি তোমার সাথে কি অন্যায় করেছি?'
তিথি বললো 'তুমি জানো না? তুমি কি অন্যায় করেছো?'
মনোজ বলল 'একথা অনেকবার হয়ে গেছে। আমি তোমার সাথে কোন অন্যায় করি নি ।বরং তুমি আমার সাথে অন্যায় করেছো ।আর এত বছর পর ফিরে এসে তুমি আমার জীবন টাকে বিপর্যস্ত করতে চাইছ?'
তিথি বলল 'সে তো ঠিকই ।আমি নিজে বিপর্যস্ত হবো আর তুমি সুখে সংসার করবে ।সেটা তো হবে না।'
রেখা কথাগুলো শুনছে।
তারপর রেখা বলল 'কে ভদ্রমহিলা এত গলাবাজি করছে তোমার সাথে? আমার কখনো এরকম গলাবাজি করার সাহস হয় নি।'
মনোজ বলল ' রেখা তুমি ভেতরে যাও। তোমার খাতা চেক করার ব্যাপার আছে। আমি ব্যাপারটা বুঝে নিচ্ছি। তোমাকে এই নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা করতে হবে না।'
রেখা বলল 'কিন্তু তুমি এত উত্তেজিত হয়ে যেও না। শান্তভাবে কথা বলে মেটাও।'বলেই ভেতরে চলে গেল রেখা।
মনোজ বলল 'কেন তুমি আমার জীবনে এসে আমার সমস্ত কিছু ওলট-পালট করতে চাইছে তিথি?'
তুমি তো বিয়ে করে চলে গেলে। আজ কেন হঠাৎ তুমি আবার ফিরে আসলে ?'
তিথি বলল 'কি ব্যাপার এত মোলায়েমভাবে এখন কথা বলছ ।তোমার বউ বুঝি নেই পাশে।'
মনোজ বলল 'না নেই। ও স্কুল টিচার। ওর খাতা চেক করার আছে ।ওকে আমি ভেতরে যেতে বললাম।'
তিথি বলল 'ও তোমার বউ স্কুল টিচার? সেই জন্যই বুঝি তুমি আমাকে এত নেগলেট করছো?'
মনোজ বলল 'আমি তোমাকে নেগলেক্ট করছি না তোমার জন্য আমার সহানুভূতি হয়। কিন্তু তোমার জীবনে কি কোন ক্রাইসিসএসেছে যার জন্য তুমি..?
রেখা বলল-আমার ক্রাইসিস তুমি। তুমি আসলেই আমার সব সমস্যার সমাধান।
মনোজ বলল 'তোমার স্বামীর কি খবর?'
তিথি বলল 'কোন স্বামী ?কিসের স্বামী?'
মনোজ বলল 'তুমি তো বিদেশে চলে গেছিলে বিয়ে করে।'
তিথি বলল' ' আমি কোন বিয়ে টিয়ে করি নি। আমি তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাই।'
মনোজ কথাটা শুনে মনে মনে একটু ভাবলো ।তারপর ভাবলো যদি ওকে কাছে পেয়ে বোঝানো যায়। তাহলে হয়তো সমস্যার সমাধান হতে পারে ।দেখা করলে কি আর ক্ষতি?
তিথি বলল 'দেখা করবে তুমি আমার সাথে?'
মনোজ বলল ' ঠিক আছে ।কোথায় বলো ?'
তিথি বললো 'ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস?বা ন্যাশনাল লাইব্রেরী?'
মনোজ বলল 'ন্যাশনাল লাইব্রেরী?'
তিথি বললো 'ওকে ।তাহলে আগামীকাল সাড়ে ১০ টায়।'
মনোজ ফোনটা রেখে ভাবছে কথা তো দিলাম।চলে যাওয়াটা কি ঠিক? যেতে তো হবেই ।না হলে যেভাবে ফোনে আমাকে জ্বালাচ্ছে । দেখা করে এর থেকে আর...? ভাবতে ভাবতেই রেখার ঘরে ঢুকে ঢুকল।
মনোজ দেখছে রেখা খাতা দেখতে দেখতে পেতে শুয়ে পড়েছে। আলতো করে পেনটা হাত থেকে নিয়ে রেখে দিল টেবিলে। তারপর রেখার মাথায় হাত বুলাতে লাগল।
রেখা হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে মনোজকে দেখে হকচকিয়ে যায়। উঠে বসতে যায় তখন মনোজ বলে'তুমি খুব ক্লান্ত না? আর একটু ঘুমাবে?'
রেখা বলল 'না, ঘুমালে চলবে না। খাতাগুলো শেষ করতে হবে। আর বলল মিলিদের খাবারের দেরী হয়ে গেলো ।খেয়েছো গো?'
মনোজ বলল 'তাই তো? আমারো তো খেয়াল হয় নি ।চিৎকার করে নি তো?'
রেখা বলল'না না না আমি যাই দেখি কি হলো?' বলেই তাড়াতাড়ি ছুটলো মিলির দিকে।
মনোজ বলল 'আমিও তোমার সঙ্গে যাচ্ছি। চলো।'
দুজনেই ছুটলো। রেখা মিলি মিলি করে ডাকলো কিন্তু মিলির কোন সাড়া নেই। কাছে গিয়ে দেখে মিলে শুয়ে আছে ।রেখা গায়ে হাত দিয়ে দেখে প্রচন্ড জ্বর। সঙ্গে সঙ্গে মনোজকে বললো 'দেখো দেখো মিলির গা কত গরম? '
মনোজ ও মিলির গায়ে হাত দিয়ে দেখল ঠিকই। প্রচন্ড গরম। বাচ্চারা পাশে শুয়ে দুধ খাচ্ছে।
মনোজ পশু ডাক্তারকে ফোন করল' হ্যালো'।
অপরপক্ষ বলল ' হ্যাঁ ,বলুন।'
মনোজ বলল 'আপনি তো জানেন আমাদের স্ট্রীট ডগ আছে ,ওর নাম হচ্ছে মিলি । ওর প্রচন্ড জ্বর কি ওষুধ দেয়া যায় বলুন তো? ও কিন্তু মা হয়েছে।'
ডাক্তারবাবু বললেন 'ওকে প্যারাসিটামল খাইয়ে দিন আর তার সাথে ডাইজিন খাইয়ে দিন।'
মনোজ বলল 'ওকে।'
ডাক্তারবাবু বললেন 'কালকে কেমন থাকে আমাকে একটু জানাবেন কেমন?'
মনোজ বলল ' নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই। অনেক ধন্যবাদ।'
রেখা বলল ,.'আমার মিলি ঠিক হয়ে যাবে গো? বলেই কাঁদতে শুরু করল।
মনোজ বলল ' হ্যাঁ, ঠিক হয়ে যাবে। দেখো না আমি এক্ষুনি পিন্টুদের দোকান থেকে ওষুধ নিয়ে আসছি।
তুমি খাবারের সঙ্গে গুঁড়ো করে ওটা খাইয়ে দেবে।'
রেখা বলল ' ঠিক আছে। তুমি যাও আমি ওয়েট করছি।'
মনোজ বলল ' আমি এক্ষুনি আসছি।'
রেখা বাচ্চাগুলোকে আদর করতে লাগল সঙ্গে মিলিকেউ। ও যেন কেমন অসহায় ভাবে রেখার দিকে তাকিয়ে আছে, আর মাঝে মাঝে মাঝে কাঁদছে।
এরমধ্যে মনোজ ওষুধ নিয়ে আসলো। রেখা খাবারের সঙ্গে গুঁড়ো করে খেতে দিল কিন্তু খাবার খেল না ।তখন রেখা বলল ' যাও মিষ্টি নিয়ে আসো ।ও মিষ্টি খেতে খুব ভালোবাসে ।মিষ্টির সঙ্গে ওষুধ খাওয়াতে হবে। '
মনোজ সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গেল মিষ্টির দোকানে । মিষ্টি কিনে এনে রেখার হাতে দিল। রেখা মিষ্টির সঙ্গে গুড়িয়ে খাওয়ালো ।
তারপর রেখা নিজের রুমে চলে এসে চটপট যে কটা খাতা বাকি ছিল, দেখতে শুরু করলো।
মনেজ ও চলে গেল পাশের ড্রইংরুমে আর ভাবতে লাগলো সেই কলেজ লাইফের কথা। সবাই মিলে এক্সকারশনে গেছিল। কাশ্মীরের আপেল গার্ডেন , ডাললেক(শিকারা) ,আরুভ্যালি,চন্দনওয়ারী.... অসাধারণ আর অসাধারণ পাহাড়, বরফ ,প্রকৃতি যেটা ভূস্বর্গ বলে খ্যাত সেখানে তিথির সঙ্গে একাত্ম হয়েছিল।
কাব্য করে মনোজ কথা বলেছিল ' কোথায় ভাসিয়ে নিয়ে যাবে বিদেশিনী ,চলে যাব তোমা সাথে ,বাঁধবো ঘর খানি। '
এলোমেলো ভাবনা চলেছিল তখন ।যদিও মনোজ সেই ভাবনাটাকে স্থিতিশীল করতে চেয়েছিল কিন্তু তিথি...?
আজ তিথি ফিরে আসলেও....।
আজ তার বিস্তর ফারাক। সেই স্মৃতি তাকে মনে করালেও স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকা সম্ভব নয় বাস্তব বড় কঠিন।