একান্ত মনেই লিখে চলেছেন লেখক। তার নিত্যদিনের আসা যাওয়া ঘটনার কিছু স্মৃতি কিছু কল্পনার মোচড়ে লিখছেন ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন "।
টানাপোড়েন পর্ব ৩১
বৃষ্টি ভেজা স্বপ্ন
আজ বিজয়া দশমী মনটা এমনি ভারাক্রান্ত। মা চলে যাবে। তবুও মায়ের আগমনী বার্তা নিয়ে সবাইকে হাসিমুখে বিদায় জানাতেই হয়। ড্রইং রুমে এসে শিখা বসে। আজ আনমনে ম্যাগাজিনের পাতা ওল্টাচ্ছে আর মনে মনে একটা এলোমেলো ভাবনা কাজ করে যাচ্ছে ।আজ সেই বিজয়া দশমী মায়ের সামনে দিব্যেন্দু কথা দিয়েছিল। কেন যে বারবার দিব্যেন্দুর ভাবনাটা আসে শিখা ভাবতে চায় না। এমন সময় গুন গুন করে গান' ধরিয়া রাখিয়ো সোহাগে আদরে আমার মুখর পাখি তোমার প্রাসাদপ্রাঙ্গণে .. ভালো বেসে সখী নিভৃতে যতনে ,আমার নামটি লিখো তোমার মনেরও মন্দিরে 'গাইতে গাইতে কল্যাণের প্রবেশ।
কল্যাণ বলল 'সখি কার ভাবনায় ব্যস্ত? মন্দিরে কেউ জায়গা নিয়েছে নাকি?'
শিখা চমকে উঠলো হেসে বলল ' কি যে বলেন না আপনি। গানটা কিন্তু অপূর্ব গাইলেন। মুগ্ধ হয়ে গেলাম।'
কল্যান বলল 'বলছো? ভালো গাইতে পারি?'
এরকম বেস্ট কম্প্লিমেন্ট পেলে খুব ভালো লাগে।
তোমার মনটা কি খারাপ? যদিও এ কথা জিজ্ঞেস করার আমার কোন অধিকার নেই ,।তবুও করলাম এ কদিনের মধ্যে একটা তো সম্পর্ক হয়েছে ,এই বন্ধুত্ব বল যা বল..।'
শিখা বলল 'না ,না আসলে বিজয়াদশমী তো মনটা খুবই খারাপ লাগে ।মা চলে যাবেন আবার কৈলাসে ।আবার ঠিক একটি বছর ধরে মায়ের জন্য অপেক্ষা এর মধ্যে কত কিছুই ঘটে যাবে সেই ভাবনায় একটু..।
কল্যান বলে এটা তো ঠিকই যাওয়া আসাই নিয়ম। তবে মায়ের বিসর্জন,আর আগমনীর পূর্বাভাস আমরা আবার আনন্দে উচ্ছাসে মেতে উঠবো, মায়ের আগমনের আশাতে।'
কল্যান বলল 'তারপর কালকে চলে যাচ্ছি।'
শিখা বলল' আমরাও চলে যাচ্ছি।'
কল্যান বলল 'এই কটা দিন সত্যিই একটু অন্যরকমভাবে কাটল আর তোমার কথা আমার খুব মনে থাকবে শিখা ।ভালো থেকো।'
শিখা বলল 'আমারও স্মরণীয় হয়ে থাকবে দিনগুলি ।আপনিও খুব ভাল থাকবেন।'
কল্যান বলল 'তুমি কিন্তু 'নেট সেট 'পরীক্ষায় ব'সো।
আর কোনো অসুবিধা হলে আমার সঙ্গে যোগাযোগ ক'রো। নম্বরটা নাও ৯৯৮৮৭৭৬৬৫৫
আর তোমার নম্বরটা আমাকে দাও ,যদি কোন আপত্তি না থাকে।
শিখা বলল-না না আপত্তি কিসের? আমি তো আপনার থেকে অনেক কিছু সাজেশন পাবো। নিন নম্বরটা৯৮৬৭৪৩২৫৫১ কিন্তু আপনার ফোন নম্বরটা তো অভিনব সব ডবল ডবল। এরকম কি করে পেলেন?
কল্যান বলল 'পেতে হয় বুঝলে?'
ওদিক থেকে মাধুবৌদি ডাকছে ' শিখা নাস্তা করবি আয়।'
শিখা বলল ' যাই বৌদি ভাই।'(গলাটা বাড়িয়ে)।
মাধু আবার বলল 'কল্যাণকে ডেকে দিস তো।'
শিখা বলল কল্যাণের দিকে তাকিয়ে.' ঠিক আছে।'
কল্যান হেসে উঠলো।
শিখা বলল ' একটা কথা জিজ্ঞেস করবো যদি কিছু মনে না করেন?'
কল্যান বলল 'না না মনে করবো কি? বলো না।
শিখা বলল 'আচ্ছা ,সেদিন আমরা ঘুরে আসার পর মুখ কেন অফ ছিল? আমি কি কোনো খারাপ ব্যবহার করেছি আপনার সঙ্গে?'
কল্যান নিরুত্তর রইল। জানালার কাছে গিয়ে তাকিয়ে রইল দূর পুকুরের দিকে।
শিখা এবার উঠে কল্যাণের কাছে গেল ' আপনি চুপ করে গেলেন ,কিছু বললেন না?'
কল্যান বললো 'কিছু নয়, মাথাটা ধরে ছিল বলে তাই?'
শিখা বললো 'আমার মন বলছে শুধু মাথা ধরা নয় ।আপনার মনটাও কোন কারনে খারাপ ছিল? বলতে না চাইলে জোর করবো না ।কারণ প্রত্যেকের একটা নিজস্বতা থাকে ।সেখানে কারোর ঢোকার অধিকার থাকে না।'
বউদি আবার চিৎকার করে বলছে ' শিখা আয়।'
শিখা বলল 'চলুন কল্যানদা।'
কল্যান বললো ' হ্যাঁ চলো।'
কল্যান আর শিখাকে একসঙ্গে দেখে মাধু বলল'
' কি কল্যান আমার ননদিনীটি কেমন?'
শিখা মনে মনে ভাবল মাঝেমাঝে যে বৌদি, কি বলে না ,লজ্জায় ফেলে দেয়।
কল্যান বলল 'হ্যাঁ মন্দ কি ( শিখার দিকে তাকিয়ে হেসে)।
সরজুও হেসে উঠলো।
শিখা সরজু আর মাধু বৌদিকে দেখে ভাবে এরা সত্যিই ভালো মনের।
সরজু বলল 'শিখা মাকে বরণ করতে যাবো তুমিও কিন্তু যাবে আমাদের সঙ্গে ।তারপর দেখবে আমরা কেমন সিঁদুর খেলি ।একটু সিঁদুর তোমার গালে লাগাবো।'
শিখার গাল তো লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল।বলল 'সিঁদুরখেলা তো বিবাহিতাদের জন্য।'
মাধু বলল 'এবার একটু ছোঁয়া দিয়ে তোকে আমরা আমাদের দলে টানতে চাইছি তো।'
শিখা বলল 'হ্যাঁ সেই আর কি ।আমি লেখাপড়া বিসর্জন দিই আর তোমাদের গ্রুপে নাম লেখাই।'
মাধু বললো 'তোকে লেখাপড়া কে বিসর্জন দিতে বলেছে ?বিয়ের পর কেউ পড়াশোনা করে না?
ঠিক আছে নে মেলা বকতে হবে না ।খেয়ে নিয়ে যা রেডি হ।'
এর মধ্যেই কেমন বিদ্যুৎ চমকাতে শুরু করলো। মাধু বলল-'বৌদি এ কিগো বৃষ্টি হবে নাকি? ভাসান করতে যাব না?'
সরজু বলল ' মেঘ দেখে তুই করিস নে ভয় ।আড়ালে তার সূর্য হাসে। 'আরে ধুত বৃষ্টি আসলে আসবে। আমরা বৃষ্টির মধ্যে ভিজে ভিজেই ভাসান করতে যাব।'
আশীষ বলল ,'এবার কিন্তু মাইক নিয়ে যাওয়া যাবে না সরকারি নির্দেশ আছে। '
সরজু বলল 'তাহলে কি হবে?'
আশীষ বলল 'যখন যেরকম ,তখন সে রকম'। ঠাকুর বোধহয় এরকমই একটা কথা বলেছিলেন না?'
সত্যিই বলতে বলতে ঝমঝম করে বৃষ্টি চলে আসল।
খাওয়া-দাওয়া শেষ করে কল্যান চলে গেল নিজের ঘরে।
শিখা উঠে চলে গেল নিজের রুমে।
হঠাৎই শিখা গান গেয়ে ওঠে ' তোমার কাছে ফাগুন চেয়ে চেয়ে কৃষ্ণচূড়া। তুমি তাই দুহাত ভরে দিলে আগুন উজাড় করে ।সে কি তোমার অহংকার?.. যদি ধরো জেতার বাজি ।আমি হেরে ই যেতে রাজি।'
কল্যাণ ওপরের ঘর থেকে খুব মনোযোগের সঙ্গে গানটি শুনে ভাবলো সত্যিই এবার শিখার প্রেমে পড়ে যাচ্ছে কল্যান। কল্যাণ ও গুনগুন করে উঠলো 'যা পাখি উড়ে যা না ।আজ হারাতে নেই মানা।তুই যা উড়ে...।
মাধু আর সরজু দু'জনে কল্যানের ঘরে ঢুকে বলল ' কী ব্যাপার? আর মুখ টিপে টিপে হাসতে লাগল।'
কল্যান তো চমকে গেল ,।
লজ্জা পেয়ে বলল 'দিদি আর বৌদি তোমরা কি গো একটু কি গান ও গাইতে পারবো না।'
মাধু বলল ' না না গান গাওয়া ভালো।'...পড়লে যেন গানটা বেশি আসে ,তাই না বৌদি?(বৌদির দিকে তাকিয়ে)।
কল্যান বলল 'রং গুলো ফ্যাকাসে হয়ে গেছে।স্বপ্ন ঝরা বকুল।'
সরজু বলল আবার?
মাধু কিছু একটা গেস করল। বৌদিকে ধাক্কা দিল।সরজু ইশারায় বলল 'পরে বলবে।'শোন সবাই নিচে নেমে আয় এখন সিঁদুর খেলা হবে।
কল্যান বলল 'সিঁদুরখেলা তোদের। আমরা গিয়ে কি করবো?'
সরজু বলল 'তোরা দেখবি আর ছবি তুলবি। এরপরই তো ভাসান।'
কল্যান বলল 'বৃষ্টি পরছে তো। '
মাধু বলল 'বৃষ্টিকে মারো গোলি।
সবাই পূজামণ্ডপে গিয়ে হাজির হলো মাকে বরণ শেষে সিঁদুর খেলার পর্ব শুরু হয়ে গেল
মাধু এসে শিখার গালে একটু, কল্যাণের গালে একটু সিঁ দুর লাগিয়ে দিল।
এর পর ভাসানের দিকে চলল সবাই ধ্বনি দিতে দিতে আসছে বছর আবার হবে। জয় মা দুর্গা কি জয়। 'কল্যাণ ও শিখা পাশাপাশি হাঁটতে লাগলো।
কল্যাণ শিখাকে বলল ' বৃষ্টি ভেজা বিকেলে মনে হচ্ছে ফেরারি মন ছেড়ে যাবে কোনো স্মৃতির কোন।হয়তো সময় হয়েছে এখন। এখনো ওড়ার সময় হয়েছে।'
শিখা কল্যাণের মুখের দিকে তাকালো।
কল্যান আর ও বললো 'আজকের বৃষ্টি ভেজা বিকালের স্বপ্ন গোধূলি লগ্নে অনেক কিছু সাক্ষী হয়ে থাকবে।
সেই ডাকে কি তুমি সাড়া দেবে?'
শিখা ভেবে পাচ্ছে না ' কি উত্তর দেবে?'
দিব্যেন্দু কিভাবে ধোঁকা দিল আর নতুন করে কিছু ভাবতে চায় না ।এখন সে শুধু তার নিজের ক্যারিয়ার গড়ার দিকে নজর দিতে চায়। তবু কোথাও যেন কল্যানদার জন্য একটা মনে জায়গা তৈরি হয়েছে। সে জায়গাটা যে কি ?সেটা এখনো বুঝে উঠতে পারছে না। হয়তো তার হাত ধরে এ জীবন নদী চায় পারাপার হতে।
কিন্তু সন্দেহের বীজ মন থেকে পারছে না তাড়াতে ।
ইচ্ছে করে আবার মন ভেসে নতুন কুলে যেতে। আজ যে শূন্যতা সেই শূন্যতা কি সত্যিই পূরণ হবে ?নিঃসঙ্গতা কি সত্যিই কাটবে? নাকি নতুন করে নতুন জোয়ারে ভাসবে ?একটা যেন দোলাচল। অন্ধকারের ভুলে কি পারবে কল্যাণের হাতটা ধরে জীবন নদী পারাপার করতে? একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কল্যাণের দিকে তাকিয়ে একটু ম্লান হাসলো,।
ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন" ৩১ ক্রমশ