২৬ আগস্ট ২০২১

স্ত্রী কি শুধুই একজন স্ত্রী,




স্ত্রী কি শুধুই একজন স্ত্রী

( প্রবন্ধ )  মোঃ হা‌বিবুর রহমান



এ যেন এক অপূর্ব লীলা‌খেলা সৃ‌ষ্টিকর্তার। কোথাকার এক ছে‌লে আর কোথাকার এক মে‌য়ে জোড়া দি‌য়ে গ‌ড়ে‌ছে সংসার। হ‌'য়ে গে‌ছে যেন দুজ‌নে দুজনার। এ সম্পর্ক বা বন্ধন স‌ত্যিই মধুর ও স্বর্গীয়ও ব‌টে।


পশু পা‌খি‌দের সংসার আনুষ্ঠা‌নিকভা‌বে খুব একটা দৃশ্যমান না হ‌লেও কিন্তু সৃ‌ষ্টির সেরা জীব না‌মে খ্যাত মানু‌ষদের স্বামী-স্ত্রীদের ম‌ধ্যে এই সম্পর্ক বা স্বর্গীয় বন্ধনটি সারা বি‌শ্বেই ‌কিন্তু কম‌বেশী চালু বা বিদ্যমান আ‌ছে।


আল্লাহ্পা‌কের কি এক অপূর্ব ম‌হিমায় এই বন্ধন‌টি টি‌কে থা‌কে একটানা বছ‌রের পর বছর, যু‌গের পর যুগ এমন‌কি আজীবন ও একদম আমৃত্যু পর্যন্ত। ‌


কি যেন এক অদ্ভূত আর অভূতপূর্ব এক মায়া আর মো‌হে দু‌টি ভিন্ন আর বিপরীত লি‌ঙ্গের স্বত্মা‌ধিকারী মানব-মানবী জু‌টি ক‌'রে ঘর বেঁধে সুন্দর সংসার সাজায়।


আর অতঃপর তা‌দের উভ‌য়ের রক্ত দ্বারা সন্তান-সন্তানা‌দি ক‌লিজার টুকরার মত অ‌তি আদ‌রের পরম ধন জন্ম গ্রহ‌ণের পরপরই তা‌দের সম্প‌র্কের সেতুবন্ধন আরও দৃঢ় থে‌কে দৃঢ়তর হ‌য়। সৃ‌ষ্টিকর্তার এই দেওয়া বিধান স‌ত্যিই অপূর্ব! 


অথচ, প‌রের ঘ‌রের মে‌য়ে এ‌সে‌ছে সম্পূর্ণ অ‌চেনা এক ঘ‌রের প‌রের ছে‌লের সা‌থে মা‌নিক জোড় সৃ‌ষ্টির ল‌ক্ষ্যে। তাই এই বি‌য়ে নামক সামা‌জিক স্বীকৃ‌তি‌টি দু‌টি ঘ‌রের প‌র ও অ‌চেনা দু‌টি ছে‌লে আর মে‌য়ে একাত্ম হ‌'য়ে সৃ‌ষ্টি ক‌রে‌ছে যেন মহাআপ‌নের এক অদ্ভূত দৃষ্টান্ত।


একদম পর ও দুজন অ‌চেনা মানব-মানবীর আপ‌নজ‌নে প‌রিণত হবার এ যেন স্রষ্টার দেওয়া বিশ্বজনীন এক মহাকৌশল। স্বামী ও স্ত্রীর র‌ক্তের ভাগাভা‌গি‌তে ক‌লিজার টুকরো সন্তা‌নের জ‌ন্ম লা‌ভের পর থে‌কেই যেন তাদের দুআত্মা একাত্মায় রূপ নেয়। 


প্র‌তি‌টি সুখ, প্র‌তি‌টি দুঃখ ও বেদনা ‌যেন সমানভা‌বে উপ‌ভোগ কিংবা সহ্য ক‌রে দুজ‌নেই একই উপল‌ব্ধি নি‌য়ে। 


এ‌যেন বিধাতার এক অ‌মোঘ অ‌ভিপ্রায় যা বু‌ঝি বাস্ত‌বে কার্যকরী করা হয় অ‌চেনা দুই প‌রের ঘর থে‌কে আসা দুই মানব-মানবীর ম‌ধ্যে বি‌য়ে নামক প্রচ‌লিত সামা‌জিক ও ধর্মীয় রী‌তিনী‌তি অনুযায়ী চু‌ক্তির মাধ্য‌মে। 


পর পরই এ কথা‌টি য‌থেষ্ট সত্য কিন্তু এটাও সত্য যে স্বামী-স্ত্রীর ম‌ধ্যে বিবাহ বন্ধ‌নের পর এই থি‌য়ো‌রি‌টি কেন যেন একদমই অ‌কে‌জো হ‌য়ে যায় কিংবা কোন কোন ক্ষে‌ত্রে কেন যেন এ‌কেবা‌রেই দূর্বল আর ফি‌কে হ‌'য়ে যায়। 


সন্তান-সন্তানা‌দির জনক জননী হবার পর প্রকৃ‌তির অ‌মোঘ নিয়‌মেই তারা স্বামী-স্ত্রী দুজ‌নেই‌ যেন অ‌চেনা দু‌টি পৃথক প‌রিবার থে‌কে আসা স‌ত্বেও এক‌বারে পর থে‌‌কে পরমাত্মীয়‌তে প‌রিণত হ‌য়ে যায়। আর তখনই বু‌ঝি স্ত্রী আর পর থা‌কে না, হ‌য়ে যায় একবা‌রে রক্তীয় বা অ‌তি আপন স্বজন। 


প্রকৃ‌তির নিয়‌মেই একটা প‌রিবা‌রের সব মে‌য়েরা চ‌লে‌ যায় প‌রের ঘ‌রে, ছে‌লেরা বি‌য়ে ক‌রে প‌রের সংসার থে‌কে বউ নি‌য়ে আ‌সে আর বা‌ড়ির কর্তা, গৃ‌হিণী, বাপ ও মা তো এক সময় ব‌য়োঃবৃদ্ধ হ'য়ে হাপানী কাশানী‌তে প‌ড়ে। তাই ছে‌লেরা স্বভাবতই নি‌জের স্ত্রী-সন্তানা‌দি নি‌য়ে বহলত‌বিব‌তে পু‌রোদ‌মেই সংসার শুরু ক‌রে।


আর তখ‌নই বু‌ঝি প‌রের ঘ‌রের মে‌য়ে‌টি প‌রিবা‌রের কত্রী হ‌'য়ে সংসা‌রের হাল ধ‌রে। এই এক‌টি জাগায় অ‌ন্য প‌রিবার থে‌কে আসা প‌রের মে‌য়ে‌টি আর ‌মো‌টেই আর পর থা‌কেনা বরং হ‌'য়ে যায় আপ‌নের চে‌য়েও আপন। 


তা‌কে ছাড়া স্বামী ‌বেচারা কোন সিদ্ধান্ত নেবার মান‌সিক সাহসও পায়না। যৌথ প‌রিবার হ‌'লে তো বা‌ড়ির বৌ‌টিই শ্বশুর-শ্বাশুড়ী থে‌কে শুরু ক‌'রে পুরো প‌রিবা‌রের সবার উপরই কর্তৃত্ব কর‌তে থা‌কে আর এটা তখন সম‌য়ের দাবী হি‌সে‌বেই চরমভা‌বে অনুভূত হয়।


পৃ‌থিবীর সব‌চে‌য়ে সুন্দর সম্পর্ক হ‌লো স্বামী স্ত্রীর মধুর দাম্পত্য সম্পর্ক। আর এই সম্পর্ক গ‌ড়ে উঠার একটাই কারণ হ‌লো-স্বয়ং‌ক্রিয়ভা‌বে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটা গ‌ড়ে উ‌ঠে আপ‌নের চে‌য়ে আপন। স্বামী য‌দি ই‌জ্ঞিন হয় তাহ‌লে স্ত্রী অবশ্যই হ‌বে ঐ গা‌ড়ির চে‌সিস। 


এখা‌নে গা‌ড়ি‌টি একটা সংসা‌রের রূপক অ‌র্থে ব্যবহৃত হ‌য়ে‌ছে। সুতরাং, সব কথার মোদ্দা কথা হ‌লো স্ত্রী প‌রের ঘ‌রের একজন মে‌য়ে হ‌লেও সে আস‌লে পর নয়, বরং সে পরমাত্মীয় ও অ‌তি নিকটজন। 


আর এজন‌্যই হয়তবা স্ত্রী‌কে অর্ধাঙ্গিনী হি‌সে‌বে আখ‌্যা‌য়িত করা হ‌য়ে‌ছে।

মিতা নুর



 এক টুকরো নিশ্চুপ পাথর

                      

কি সুখ পেলে তুমি এমন করে...?

আমি যে প্রতি মুহূর্তে পুড়ে ছাই হচ্ছি তোমার জন্য, 

তবুও কোনোদিন তোমাকে অভিশাপ দেবোনা। 

আমার প্রাণের ঘরে যে আগুন তুমি  জ্বালিয়ে দিলে! 

ঐ আগুনে পুড়ে ছারখার হচ্ছে আমার কলিজা,

যে কলিজায় তোমায় রেখেছি.....! 


আমার খুব  ইচ্ছে ছিল ! 

তোমার আমার  স্বপ্নে  ঘেরা সংসার হবে, 

সেখানে থাকবে ভালোবাসা পরিপূর্ণ... 

আমার অধিক বিলাসিতার  ইচ্ছে ছিলো না,  

ছিলো না টাকা পয়সার লোভ,

আমি চেয়েছিলাম ভালোবেসে সুখী হতে।


আজ সব আবেগের  কৌটা বন্ধ ঘরে  আটক হলো, 

ভালোবাসা   জানালা দিয়ে পালিয়ে গেল, 

আজ নিজেকে মনে হচ্ছে.... 

যেন হাজারো অভিযোগের ভীড়ে,আমি'

এক টুকরো নিশ্চুপ পাথর !!

উম্মে হাবীবা আফরোজা




প্রতীপদর্শিনী



নির্ভরতার আশ্রয়ে, 

বিভীষিকাময় তপ্ত হৃদয়ে,

সভ্যতার শৃঙ্খলে, বিমূর্ত এক নাম "নারী"


ধ্বংসস্তপের মিছিলে, 

ছেঁড়া মানচিত্রের বীরাঙ্গনা বেশে,

কখনো তমু,কখনো বা নুসরাতের পাঁজর ভাঙ্গা আর্তনাদে

অভিমানি এক প্রতিচ্ছবির নাম " নারী"


প্রত্যাখানের বিষাদ অনুরাগে,

ব্যাকরণের জটিল সমীকরণে,

হত্যাযজ্ঞের তান্ডবলীলায়, ঘাত-প্রতিঘাতের

বিচূর্ণ এক নাম "নারী"


অসীম ব্যবধানে, সংকটের কংক্রিটে,

মূমুর্ষু শহরের নাগরিক কোলাহলে,


পুতুলরুপী আলোকসজ্জার নাম "নারী"।


মিথ্যামায়াজালের গার্হস্থ্যনীতিতে,

অবহেলিত কঙ্কাল মূর্তি

অবয়বের আরেক নাম"নারী। 


তীব্র দহনে দগ্ধ হয়েও যে জ্বলে উঠেছো দীপ্ত আহ্বানে,

পুষ্পিত ভালোবাসায় সিক্ত ও ত্যাগের মহীমায় আলোকিত করেছো এই জগৎ সংসার,,,,

সেই হলো মহীয়সী এক নারী।


সমস্ত ব্যবধান  ভোলে আজ

প্রজন্ম হোক সমতার,অধিকার পাক সমস্ত প্রতীপদর্শিনী।

নাসিমা জোহা চৌধুরী


উৎকণ্ঠা 

 

প্রিয়তম,

মরুগোলাপ পামিরা পাঁপড়িশূন্য হয়ে — 

মরাডালে লটকে আছে, 

প্রজাপতিরা আজ পামিরা বিমুখ! 

তুমিও কি পামিরার ভাগ্যবরন করতে যাচ্ছো?


পামিরার পাখিরা ফেরেনি আর ;

তুমিও কি পাখিশূন্য হতে যাচ্ছো? 


বাজপাখি উড়ছে চক্রাকারে —

সোল্লাসে মেতে ওঠে শকুন, শেয়াল। 


বিহ্বল চিত্তে দিকবিদিক ছুটা হরিণশাবকের মতো ;

তুমিও কি কেবল হারাচ্ছো পথ?


প্রিয়তম, 

'সময় গেলেে সাধন হয় না '

মাসুদ করিম




ইতি 


  আর নয় অপেক্ষা

নয় পথ চেয়ে থাকা,

        আর নয় ভালোবাসা

        নয় মিছে স্বপ্ন দেখা।

আর নয় প্রেমের কথা

নয় কোন মিছে আশা।

        আর নয় রাত জাগা

        নয় নিরবে অশ্রু ঝরা,

আর নয় কবিতা

নয় কোন গান শুনা।

        আর নয় কাছে আশা

        নয় আর ছবি আঁকা,

ইতি টানলাম আজি

হলাম শুন্য সব ঝেড়ে।

        মিছে সব প্রেম,

        মিছে ভালোবাসা।

মোহাম্মাদ আবুহোসেন সেখ




গোলাপি মানুষ

  


হে ত্রিভুবনের মানুষ 

ভাবিয়া করছোটা কি!

দাঁড়িয়ে যাও একটু খানি

দাঁড়িয়ে আছো যে ত্রিভুবনে।

ভাববার সময় কি নি,তাকে নিয়ে,

কি অপরাধ এই ত্রিভুবনের!

ভাববার সময় কি নি তাকে নিয়ে?

জীবনকে গড়ে তুলুন

গোলাপের মতো সৌন্দর্য করে।।


মমতা রায় চৌধুরী'র


 

গল্প

'পরশপাথর'

( পবিত্র শিক্ষক দিবস উপলক্ষে লেখা )

আজ দিশার মনটা চৈত্র মাসের মাটির মতো বুকফাটা চৌচির হয়ে গেছে। সে ভাবতে পারে নি তার সাথে এমনটি  হবে। আজকের দিনটা এমনিতেই দিশার কাছে ছিল খুবই স্পেশাল। আজ ৫ ই সেপ্টেম্বর সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণানের জন্মদিন। পবিত্র শিক্ষক দিবস। ভুলবেই বা কি করে? আজ তার জীবনে যা কিছু সবকিছুর মূলে রয়েছে তার সেই প্রাণপ্রিয়া শিক্ষিকার হাত। ছোটবেলায় মাকে হারিয়ে দিশা মাতৃত্বের স্বাদ খুঁজে পেয়েছে তার শিক্ষিকার মধ্যে।

নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়ে তার বাবা মেধাবী মেয়েটির পড়াশোনার জন্য খুবই আগ্রহী কিন্তু যখন ক্লাস ফাইভে পড়ে তখনই তার বাবা মারা যায়। জেঠিমা জ্যাঠামশাই এর দয়া-দাক্ষিণ্যে লাথি-ঝাটা খেয়ে সে বড় হতে থাকে। তাই যেদিন অষ্টম শ্রেণীতে ভর্তির জন্য বিদ্যালয়ে আসে তখন তার কাছে বেশি টাকা ছিল না। জ্যাঠামশাই বলেছিলেন স্কুল কর্তৃপক্ষ যদি কিছু কম করেন তাহলে মেয়েটি পড়াশোনা করতে পারে।  ভর্তি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত শিক্ষিকারা শুনে বললেন -'পুরো টাকা না দিতে পারলে তো ভর্তি নেয়া যাবে না। তাছাড়া আজ বড়দি আসেন নি। তাই ভর্তি নেয়া হবে না। 'কথা শুনে জ্যাঠামশাই বলেন গরিব মানুষ একদিন কাজ না করতে পারলে আমাদের সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।  কাজ কামাই করে ভর্তি করতে... একটু মানবিকতার সঙ্গে দেখলে ভালো হতো।এই কথাবার্তা চলার সময় পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন মন্দিরা দিদিমনি। তিনি ব্যাপারটা শুনে বললেন 'আজই ভর্তি হবে দিশা। টাকার জন্য আপনাকে চিন্তা করতে হবে না ।আমি দেবো টাকা'। মন্দিরা দিদিমনির কথায় দিশার জ্যাঠামশাই ভর্তি প্রক্রিয়া চলাকালীন দিদিমণিদের কাছে গেলে ,তারা বললেন আজকে ভর্তি নেয়া যাবে না  আজকে সময়  শেষ।' অনেক অনুরোধ করা সত্ত্বেও ভর্তি করানো গেল না। তখন দিশা কাঁদতে লাগলো। কিন্তু চোখের জলে দিদিমণিদের মন গলল না। পরের দিন ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু হলে দেখা গেল দিশা ভর্তি হতে আসে নি। তাতে কিন্তু অন্য দিদিমণিদের কোনো হেলদোল নেই।মন্দিরা দিদিমণি  সঙ্গে সঙ্গে তার বাড়িতে গেলেন। সেখানে গিয়ে দেখেন অসুস্থ। প্রচন্ড জ্বর। আর সেই দিনই ছিল লাস্ট ভর্তি প্রক্রিয়া। দিশা তখন মন্দিরা দিদিমণিকে দেখে কেঁদে কেঁদে বলতে লাগল সে কি আর পড়াশোনা করতে পারবে না? মন্দিরা দিদিমণি  আশ্বাস দিলেন নিশ্চয়ই পারবে। লেখাপড়ার প্রতি যার এত আগ্রহ, তাকে কি কখনো দমিয়ে রাখা যায়? আমি তোমার ভর্তির ব্যবস্থা করব। যথারীতি ভর্তি হয়ে গেল। ক্লাস শুরু হয়ে গেল। মন্দিরা মাঝে মাঝে দেরি করে আসতো। এবার সেটা যেন নিয়মে দাঁড়িয়ে গেল। এর জন্য তাকে শাস্তি পেতে হতো। কিন্তু ক্লাসটিচার তার মনের খবর কখনো নেন নি। তার এই মনোভাবের জন্য অন্যান্য ছাত্রীরা তাকে নিয়ে হাসাহাসি করত ,বিদ্রুপ করত। সে সবসময় ক্লাসে ভয়ে ভয়ে থাকত। কেউ তার সঙ্গে কোনো কথা বলত না, নোট শেয়ার করত না। এমনিতেই স্কুলটি ছিল বড়লোক শ্রেণীর মেয়েদের জন্য।স্বাভাবিকভাবেই মেয়েটির রেজাল্টের জন্য সেই বিদ্যালযয়ে স্থান পেয়েছিল। কিন্তু মনের কথাগুলো কখনো কারও সঙ্গে শেয়ার করতে পারত না। এরই মধ্যে ক্লাস টিচার চেঞ্জ হয়ে মন্দিরা দিদিমনি হলেন। দিশার চোখে খুশির বিজলি খেলে গেল। ক্লাস শেষে দিশার কাছ থেকে দিশার দেরি করে আসার সমস্ত খবর জানলেন যে বাড়ির সমস্ত কাজ করে তাকে আসতে হয়। মন্দিরা দিদিমনি ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন ।কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এও বললেন -'বিদ্যালয়ের তো একটা নিয়ম আছে তোমাকে কিন্তু এই টাইমের মধ্যে ঢুকতে হবে ,সেটা খেয়াল রেখো। আর পড়াশোনা কিন্তু ঠিক করে করতে হবে ।তোমার উপর আমার অনেক আস্থা আছে।তবে তুমি কোন কিছু গোপন করবে না ।তোমার যা কিছু মনে আসে তুমি আমার সঙ্গে শেয়ার ক'রো। প্রথমে মন্দিরা দিদিমণিকে গম্ভীর ,রাশভারী বলেই মনে হতো। কিন্তু তাঁর মনের ভেতরে যে একটা খুব সুন্দর স্নেহমাখা হৃদয় আছে ,সেটা দিশা মন্দিরা দিদিমণির সঙ্গে মিশেই বুঝতে পেরেছিল। ইতিমধ্যে বিদ্যালয়ের শিক্ষক দিবস উপলক্ষে নানা রকম অনুষ্ঠানের আয়োজন হচ্ছে।তাদের ক্লাস থেকেও অংশগ্রহণের জন্য বেছে বেছে নাম নেয়া হয়েছে কিন্তু দিশা হাত তুললেও তাকে নেয়া হয়নি ।আসলে তারা ভাবতেই পারে নি যে ,দিশার ভেতরে কোনো সম্ভাবনা থাকতে পারে। অন্যরা টিপ্পনী কাটে -তুই কি করবি রে ,তোর ভেতরে কি এমন আছে, না পারিস আঁকতে , না পারিস গান করতে? দিশা শুধু চোখের জল ফেলে।অবশেষে শিক্ষক দিবসের দিন নিজের হাতে একটা সুন্দর কবিতা আর ছবি তার প্রিয় দিদিমনিকে উপহার দিল। প্রত্যেকের সুন্দর সুন্দর উপহারের মাঝে তার উপহারটা অত জমকালো নয় ।তাই সে একটু ইতস্তত করছিল। কিন্তু মন্দির দিদিমণি সাহস করে তাকে বললেন -'তুমি কি কিছু বলতে চাও'? মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়। তখন সে নিজের হাতে লেখা কবিতা আর একটা ছবি দিদিমণিকে দেয়। কবিতার ভিতর এত সুন্দর ছন্দ আর ভাব নিয়ে তার দিদিমণিকে সম্মানপ্রদর্শন করেছে ,প্রত্যেকে দেখে অবাক হয়ে গেছে। ঐদিন মন্দিরা দিদিমনি দুটো বই তাকে উপহার দিলেন আশীর্বাদ হিসেবে।এরপর আসলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ বার্ষিক পরীক্ষার ফল ঘোষণা ।তাতে দেখা গেল দিশা প্রথম স্থান অধিকার করেছে স্বাভাবিকভাবেই আস্তে আস্তে সে নিজের জায়গাটা বুঝিয়ে দিতে  পারল। আর এটা সম্ভব হয়েছে তার মন্দিরা দিদিমনির জন্য। যখন সে ১২ক্লাস পরীক্ষা দেয়, তখন মন্দিরা দিদিমণি বলেছিলেন কোন প্রলোভনে পা দেবে না ,তোমাকে আত্মনির্ভরশীল হতেই হবে ।আমি রবি ঠাকুরের আর স্বামী বিবেকানন্দের যে দুটো বই তোমাকে দিয়েছিলাম। যত দুঃখ, বাধা-বিঘ্ন আসুক না কেন ,এই বই দুটো তোমাকে সাহস যোগাবে। আর তুমি তোমার লেখা ছেড়ো না ।তোমার ভেতরে একটা অন্য প্রতিভা লুকিয়ে আছে।তারপর যতবার শিক্ষক দিবস  এসেছে ততবার শিক্ষিকার পরম আশীর্বাদ স্বরূপ বই দুটি তার চোখের সামনে রেখে তাকে শ্রদ্ধা জানিয়েছে। এরপর সে নিজেও একজন শিক্ষিকা হয়েছে ,বিয়ে হয়েছে, ঘর-সংসার হয়েছে। কিন্তু সংসারের যাঁতাকলে তার লেখনি সত্তা হারিয়ে যেতে বসেছে। সারাদিন স্কুলে পরিশ্রম করে এসে বাড়িতে তাকে খাটতে হতো হাড়ভাঙ্গা খাটুনি। তার অন্যান্য জায়েরা সব বড়লোক বাড়ির মেয়ে ।তাই তাদের সমাদর হয়েছে ।কিন্তু দিশা গরীব ঘরের মেয়ে তার সম্বল শুধু তার চাকরিটুকু ।তারা ভালোবেসে বিয়ে করেছে। তাই বড়লোক বাড়িতে এসে জায়গা পেয়েছে। নইলে নাকি আরো সুন্দর মেয়ে এবাড়ির ছোট ছেলের বউ হতে পারত। এরকম টিপ্পনী তাকে মাঝেমাঝে শুনতে হয়। কিন্তু তাই বলে বইপোকা দিশা কখনো ভাবতে পারিনি তার সঙ্গে এরকম একটা ঘটতে পারে। আগামীকাল শিক্ষক দিবস ।তাই ছুটির দিন রবিবার হওয়াতে সে তার শিক্ষিকার বই দুটি আলমারি থেকে বের করে আর একবার স্নেহ স্পর্শ পেতে চায় আর মনের দিক থেকে আরো একবার আত্মবিশ্বাস খুঁজে পাবার চেষ্টা করে। কিন্তু কি সর্বনাশ বইগুলোকে উইপোকা কেটে দিয়েছে। তার জীবনে অনেক ঝড় বয়ে গেছে কিন্তু এই ঝড় যেন তার অস্তিত্বকে কেড়ে নিতে চেয়েছে। কিন্তু সে বুঝে উঠতে পারে না তার ঘরে উইপোকাটা আসলো কি করে? পরে অবশ্য বই খুঁজতে খুঁজতে দেখতে পায়, একটা অজানা বই । এই বইটা তো সে রাখেনি তার আলমারিতে।সেই বইয়ের ভেতরে ছিল উইপোকা আর তা থেকেই তার সমস্ত বইগুলোকে কেটেছে। এবং এর পেছনে তার জায়েদের হাত সে কথাও সে জানতে পেরেছে। সে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে। সে তো কিছু চায় নি ।এবাড়িতে তো সবকিছু মুখ বুঝে সহ্য করছে। যদিও তার স্বামী বলেছিল তারা আলাদা হয়ে যাবে। কিন্তু দিশা সেটা চায়নি। সে ভেবেছিল এ বাড়িতে এসে সে নতুন করে তার শাশুড়ি মাকে মা হিসেবে পাবে। আর জায়েদের ভালোবাসা সে পাবে। সেই জন্য সে হেরে যেতে চায়নি। কারণ তার শিক্ষিকা বারবার বলেছেন জীবন থেকে পালিয়ে গিয়ে কোন কিছুর সমাধান করা যায় না। সব সময় সংগ্রাম করে টিকে থাকতে হয়। ধৈর্য ধরতে হয়। সারাদিন দিশা কিছু খাবার খায়নি।  অন্য জায়েরা টিপ্পনী কাটছে, সামান্য বইয়ের জন্য কেঁদে একদম ভাসাচ্ছে, না জানি কি জীবনে ঘটে গেছে। তার স্বামী তাকে বোঝানোর চেষ্টা করছে আবার সে তাকে দুটো বই কিনে এনে দেবে।কিন্তু কোনো কিছুতেই সে সান্ত্বনা খুঁজে পাচ্ছে না। বই হয়তো পাবে কিন্তু সেই পরম আশীর্বাদ স্নেহের পরশ সে কোথায় পাবে? যে পরশ পাথরে হাত দিলে সব কিছুই সোনা হয়ে যায়।পরের দিন ৫ ই সেপ্টেম্বর সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণাণ এবং তার প্রিয় শিক্ষিকা মন্দিরা দিদিমনির ছবির সামনে জলভরা চোখে পুষ্প অর্পণ করে আর বলে সে যেন সবকিছু কাটিয়ে উঠতে পারে। সেই শক্তি যেন ফিরে পায়। ইতিমধ্যেই পোস্টম্যান এসে একটি পার্সেল দিয়ে যায়। পার্সেলটা খুলতেই দেখতে পায় তার সেই প্রিয় দিদিমণি দুটো বই পাঠিয়েছেন। শিক্ষক দিবসে এইরকম একটি পাওনা সমস্ত দুঃখ কষ্ট ভুলিয়ে দিল এবং সে পরম আদরে বুকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো । আর আজকের দিনে যেন তার সেই পরম শ্রদ্ধেয়া দিদিমণির সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করলো ।বইয়ে লেখা ছিল -'স্নেহের দিশা, এই বই দুটো যখন তোমার হাতে যাবে ,হয়তো আমি তখন তোমার থেকে অনেক দূরে থাকবো ।কিন্তু আমার আশীর্বাদ তোমার সঙ্গে সব সময় থাকবে, ভালো থেকো।' দিশা পুরোনো ডায়েরি খুলে ফোন নম্বরটা খুঁজে তাতে রিং করল। ফোনের ওপার থেকে অজানা একটি কন্ঠস্বর ভেসে এলো ' উনি অসুস্থ,ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত ।হসপিটালাইজড। 'দিশা দেরি না করে হসপিটালের ঠিকানা যোগাড় করে দিদিমণিকে দেখতে গেলে ভিজিটিং আওার শেষ হয়ে যাওয়াতে সে দিন দেখা হয় না। পরের দিন ভিজিটিং আওয়ার শেষ হবার  ১৫মিনিট আগে পৌঁছে গেল দিশা। সঙ্গে কিছু সুন্দর রজনীগন্ধার ফুল । দিদিমনির খুব প্রিয় ছিল।সেখানে পৌঁছাতে শোনা গেল যে দিদিমণি নীরবে, নিঃশব্দে ভরা নদী থেকে নৌকা খুলে যেমন যায়, ঠিক তেমনি ভাবে জীবন পারাপারের তির অতিক্রম করে পৌঁছে গেছেন অমৃতলোকে। ১০ নম্বর বেডের দিকে তাকিয়ে দিশা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলো আর ভাবতে থাকলো হয়তো এরকম করে একদিন তাকে চলে যেতে হবে।একজন নার্স এসে তার চেতনা ফেরায় ,বললেন -'আপনি কি কেউ হন? ভালোই করেছেন মৃতের পাশে প্রথম আপনিই ফুল রেখেছেন। সেভাবে তো কেউ আর শেষের দিকে দেখতে আসতেন না বাড়ি থেকে। একজনার নাম বার করে বলছিলেন দিশা দিশা..। আপনি দিশা?' আমি ওনার ছাত্রী। ও আচ্ছা। একজন শিক্ষিকা এতটা ছাত্রীদরদী হতে পারেন । উনার মুখ থেকে বারবার শুনেছি। এবার দিশা যেন  দিশাহারা হচ্ছে। এভাবে আর কজন দিশা কে বুঝতে পারবে? যার পরশে সব কিছুই সোনা হয়ে যায়। কতদিন সে না খেয়ে থেকেছে, আর ঠিক সেই সময় দিদিমণি এসে তাকে তার বাড়িতে নিয়ে গিয়ে খাইয়েছেন। দিদিমণি কি অন্তর্যামী ছিলেন, তার সমস্ত দুঃখ কষ্টের কথা কিভাবে বুঝবেন আর সঙ্গে সঙ্গে তার কাছে হাজির হয়ে যেতেন?আজ আর ভাবতে পারছে না দিশা। পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে তার মনে হলো। কাকে আঁকড়ে ধরে বেড়ে উঠবে দিশা। কে এমন করে তাকে আগলে রাখবেন। অথচ এই দিদিমনির সংকটময় অবস্থায় সে একটিবারও তার কাছে থাকতে পারে নি ।এটা তার জীবনের সব থেকে কষ্টের আর দুর্ভাগ্যের। দিদিমণি অবিবাহিত ছিলেন শেষ জীবনটা নিঃসঙ্গতার মধ্যে দিয়ে কেটেছে, এটা ভেবেই সে ডুকরে ডুকরে কেঁদে উঠল।আর ভাবলো হয়তো একদিন তারও পাশে প্রাণহীন বালিশের নিচে এরকমই কেউ অজানা ,অচেনা পুষ্পস্তবক রেখে যাবে। দিদিমণিকে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়ে সে বাড়ি ফিরে আসলো। তার জন্য অপেক্ষা করছিল তার কচিকাঁচা শিক্ষার্থীরা। তারা তাদের প্রিয় দিদিমণিকে শিক্ষক দিবসের শ্রদ্ধা ,ভালোবাসা উজার করে দিল। তবুও দিদিমনির চোখের জল দেখে কচিকাঁচাদের মধ্যে একজন বলে উঠল -'আপনি কাঁদছেন?'তাকে জড়িয়ে ধরে মন্দিরা বলল -'আমার পরশপাথর হারিয়ে গেল।'