একান্ত মনেই লিখে চলেছেন লেখক। তার নিত্যদিনের আসা যাওয়া ঘটনার কিছু স্মৃতি কিছু কথা নিয়ে কল্পনার মোচড়ে লিখছেন ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন " চলবে...
টানাপোড়েন ৫২
ভাবনা
সকাল থেকেই মনটা খুবই খারাপ লাগছে। মনের কি দোষ? সব সময় একটা টানাপোড়েন চলতে থাকে। কি সংসারে, কি অফিসে ,কি বন্ধু-বান্ধব সর্বত্র।
ঘুম থেকে উঠে মনোজ এইসবই ভেবে চলেছে।
গতরাত্রে ভালো করে ঘুম হয় নি। সারারাত ফোনে ডিস্টার্ব করেছে তিথি। রেখার সাথে সেভাবে কথা বলা হয় নি।
রেখাটা না থাকলে সংসারটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগে। আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে ফেলল। ঠিক তখনই মিলি আর তার বাচ্চারা চিৎকার করে উঠল। মনোজ তড়িঘড়ি করে ঘড়ি দেখছে ' এই যা খেতেই দেয়া হয় নি।'
সিগারেটটা ফেলে দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ছুটলো। একটা পাত্রে দুধ গরম বসিয়ে দিল। অন্য দিকে মিলির জন্য একটু খাবার বসিয়ে দিল। ঘরেতে ক্রিম ক্রেকার বিস্কিট ছিল, সঙ্গে সঙ্গে ৬বিস্কিট নিল। গরম দুধে বিস্কিটগুলো ফেলে দিল। তারপর একটু হাওয়া করে ঠান্ডা করলো ,ঈষদুষ্ণ গরম অবস্থায় নিয়ে গিয়ে বাচ্চাদের খাওয়ালো। বাচ্চাদের খাওয়াতে খাওয়াতে মেটে সেদ্ধ হয়ে গেল। অন্যদিকে কালকের ফ্রিজের ভাতটা গরম করে নিয়ে তার সাথে মিশিয়ে ভালো করে মেখে এবার মিলিকে খেতে দিল।
খাবার খেয়ে বাচ্চাগুলো কি সুন্দর খেলাধুলা করতে লাগলো আর মিলিও যথারীতি খেয়ে-দেয়ে একটু ঘুরতে বেরিয়ে গেল। ছোট ছোট বাচ্চাদের ,ছোট ছোট পায়ে চলা ,খেলা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে মনোজ দেখলো ।তারপর ওদেরকে একটু আদর করলো। ওদিকে ফোন বাজতে শুরু করেছে। ফোনের আওয়াজ শুনলেই আজকাল মনোজের বুক ধড়ফড় করে ওঠে।
বেশ কয়েকবার রিং হওয়ার পর মনোজ ফোনটা রিসিভ করে বলল' হ্যালো'।
রেখা বলল 'আমি রেখা বলছি।'
মনোজ বলল 'হ্যাঁ, বুঝতে পেরেছি বলো।
রেখা বলল ' তুমি তো আমাকে ভুলেই গেছো? তুমি তো ফোনও করলে না ।আমি ফোন করলাম তাতেও তুমি রিসিভ করলে না।
মনোজ বলল 'ফোন রিসিভ না করলে আর ফোন না করলেই ভুলে যায় বুঝি?'
রেখা চুপ করে আছে।
মনোজ বলল 'তুমি এতদিন পর বাবার বাড়িতে গেছ,তোমাকে ডিস্টার্ব করা কি ঠিক? তুমি একটু স্মৃতিচারণ করো দিনগুলো নিয়ে।'
রেখা বলল শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করো না।'
মনোজ বলল 'কেন আমি আবার কি করলাম?'
রেখা বলল 'সত্যি করে বল তো আমার কথা তোমার মনে পড়েছে, না তুমি অন্য কারো সঙ্গে গল্পে মেতে ছিলে?'9
মনোজ বলল তোমার মনে তো সব সময় ওই রকমই টানাপোড়েন চলতে থাকে।
রেখা বলল 'মোটেই না।'
রেখা বললো 'কি করছিলে এখন?'
মনোজ বলল 'তোমার সঙ্গে গল্প করছি।'
রেখাগবললো 'আরে বাবা আমার সঙ্গে গল্প করার আগে কি করছিলে?'
মনোজ বলল 'মিলি আর ওর বাচ্চাদের খেতে দিচ্ছিলাম।'
রেখা বলল 'ওরা সবাই ঠিক আছে তো?'
মনোজ বলল ,কেন আমার ওপর তোমার বিশ্বাস নেই।'
রেখা বললো 'নাইনটি নাইন পারসেন্ট'।
মনোজ বলল ' এক পারসেন্ট নয় কেন?'
রেখা হেসে বলল ' মাঝে মাঝেই একটা ফোন এসে যে তোমাকে ডিস্টার্ব করে,.?'
মনোজ বলল 'কবে আসবে?'
রেখা বলল 'ভেবেছিলাম আরো দুদিন থেকে যাব।'
মনোজ বললো 'থেকে যাও।'
রেখা বলল " কি করে থাকবো? স্কুল খুলে যাচ্ছে তো?'
মনোজ বললো 'সেটা অবশ্য ঠিক।'
রেখা বলল 'কবে নিতে আসবে?'
মনোজ বলল 'কবে আসবে বলো?'
রেখা বলল '১৫ তারিখ?'
মনোজ বলল 'ঠিক আছে ।আমি পার্থকে বলে গাড়ি পাঠিয়ে দেবো।
তুমি রেডি হয়ে থেকো।'
রেখা বলল 'ok'
মনোজ বলল' কেমন লাগছে ওখানে?'
রেখা বলল 'খুব ভালো লাগছে। এখনো তো গ্রাম ঘুরতে পারি নি ,বৃষ্টি হচ্ছে?'
মনোজ বললো 'আমাকে ছেড়ে তো দিব্যি আছো? অথচ বল তুমি আমাকে ছেড়ে থাকতে পারো না?'
রেখা বলল 'কেন সে কথা কি মিথ্যে বলেছি নাকি?'
মনোজ বলল 'গিয়ে অব্দি তো সে ভাবে ফোনই করলে না?'
রেখা বললো' তুমি যেন কত করেছ?'
মনোজ বলল 'সেই তো ,যত দোষ নন্দ ঘোষ'।
রেখা বলল 'সোমু ফোন করেছিল তোমাকে?'
মনোজ বলল-'হ্যাঁ ,পরে দেখলাম।'
রেখা বলল 'ও আমাকেও ফোন করেছিল?'
মনোজ বলল'কেন কি বলছিল'?
রেখা বলল 'সে অনেক কথা।'
মনোজ বলল 'আজ ওর কোর্টের ডেট ছিল?'
রেখা বলল 'আমাকে তাই বলল? তোমাকে জানাতে ।তুমি যেতে পারবে কিনা?'
মনোজ বলল 'চেয়েছিলাম যেতে কিন্তু কি করে যাব বল? আজ যেতে পারি নি।'
রেখা বলল 'ও এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে ডিভোর্সটা কে নিয়ে...। ওকে ব্যাপারটা নিয়ে বললাম একটু ভাবতে তাই এমন কথা শোনাল আমাকে?'
মনোজ বলল ,'আর তাছাড়া ভালো লাগে না ।জান তো কোর্টে যেভাবে বলা হয় ,ওর তো সে ব্যাপারে কোনো লজ্জা ঘেন্না নেই।'
রেখা বলল 'ফোনেতে যেভাবে নির্লজ্জের মতো বলছিল..।'
মনোজ বলল 'কাকিমা কাকু কিছু বলছিলেন না?'
রেখা বলল ' তা আর বলছিলেন না?'জন খাট
কাকিমা বললেন 'কিরে ননী, জামাই ফোন করেছে?'
রেখা বলল 'হ্যাঁ কাকিমা।'
কাকিমা বললেন 'জামাই কবে আসবে আগে থেকে যেন জানায় ।আমি সেই ভাবে রান্না করবো।'
রেখা বলল 'শুনতে পাচ্ছ তো কাকিমার কথা?'
মনোজ বলল ' আমি তো যাবো না কাকিমাকে বলে দাও।'
রেখা বলল 'কাকিমা ,ও তো আসবে না?'
কাকিমা বললেন আসবে না মানে তোকে তো একা ছাড়বো না?
রেখা বলল ' না কাকিমা, ও গাড়ি পাঠিয়ে দেবে।ওর একটু অসুবিধা আছে?'
কাকিমার কথাটা শুনে মন খারাপ হে গেল আর বললেন' আগেরবারও এসে কিছু খেলো না এবারও যা ভালো বুঝিস তোরা করিস?'±
রেখা বলল 'তুমি এত টেনশন করো না তো? ঠিক আছে ফোনটা ছাড়ছি। মিলি ওর বাচ্চাদের ঠিক সময়ে খেতে দিয়ে দিও আর তুমিও ঠিক সময়ে খাবার খেয়ে নিও।'
মনোজ বললো ok
মনোজ এবার ফোনটা রেখে টানটান হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। কি মনে হতেই আবার উঠে বসল ।বালিশের পাশটা থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে সিগারেট ধরালো ।সে ভেবেছিল একটু ঘুমিয়ে নেবে কিন্তু ঘুম তো আসবে না রাগটা না থিতলে । রেখা কেও কথাটা বলতে পারলাম না। তিথি কেন আমার সঙ্গে এরকম করছে। সিগারেটটা ধরিয়ে জানলার কাছে এসে দাড়ালো হঠাৎই চোখ আটকে গেল মনোজের চৈতিদের বাড়ির দিকে তাকিয়ে। চৈতি কেন বারবার চোখের জল মুছছে? সেদিন রেখা বলছিল চৈতির মা এসেছিল কিছু কথা বলতে? তাহলে কি খুবই সমস্যায় পড়েছে?'
ভাবতে ভাবতে মনোজ সিগিরেটাটা শেষ করল। ইতিমধ্যে দেখতে পেল রোগা একজন ভদ্রলোকে চৈতি দের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসলেন।
কেএই ভদ্রলোক? যে হয় হোক, চৈতিদের চেনা-জানা লোক ছাড়া অন্য কেউ হবে না।'
মনোজের গা টা ম্যাজম্যাজ করছেো ।খুব ভোরে বিছানা ছাড়া তো কোনো দিনের অভ্যাস ছিল না। ছোটবেলায় বাবা-মার কাছে এর জন্য কত বকা শুনেছি
হঠাৎই আকাশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে শিকড় গজিয়েছে বিদ্যুৎ। তার ঝলকানিতে চমকে উঠছে প্রকৃতি।
মনোজ জানলার ধারে দাঁড়িয়ে ভাবছে তাদের দাম্পত্য জীবনের সুখ স্মৃতি কথা।