টানাপোড়েন৯০
খেয়ালী নদী
মমতা রায় চৌধুরী
ঘুম ভাঙার পর অনেকক্ষণ বিছানায় শুয়ে ছিল রুপসা। আজকাল এভাবেই বেশ কিছুক্ষণ চোখ বুজে শুয়ে নিজেকে একটু আবিষ্কার করার চেষ্টা করে। কেমন যেন সব এলোমেলো হয়ে গেল কিছুই মাথায় ঢুকতে চায় না ।কোথাও কিছু ফাঁকা আছে কিনা সেই মন পাখিটাকে ধরে নিয়ে কল্পনায় নিজেকে তৈরী করার চেষ্টা করছিল।
হঠাৎই ভেতরের ঘরে ফোনটা বেজে ওঠে। বাজতে বাজতে কেটে গেলো ।আবার বাজতে শুরু করলো। বেজেই চলেছে। একটু বিরক্তই হলো এত সকালে কে ফোন করেছে! শব্দটা ক্রমশ তীক্ষ্ণ হচ্ছে ।ফোনটা তুলছে না কেউ। ঝর্ণা কোথায় গেল? বিরক্তি নিয়ে রুপসা বিছানা থেকে উঠে বসল। নিজের অজান্তেই দেয়াল ঘড়িটার দিকে গেল ।ঘড়িতে তখন ৬.১০। ঝরনাটা তাহলে কোথায় গেল? ও কি কোন কাজে বাইরে গেছে? ওদিকে নদীও ফোন ধরছে না।'
হাউসকোটটা গায়ে চাপিয়ে বিরস মুখে ফোনটা তুলে বলল 'হ্যালো।'
ও প্রান্ত মুহূর্তের জন্য নীরব। তারপর বলল'আমি সমুদ্র বলছি।'
রুপসা বলল' ও তো এখনও ঘুম থেকে ওঠে নি।
কিছু প্রয়োজন আছে?'
সমুদ্র নদীর বন্ধু। বেশ কয়েকবার বাড়িতে এসেছে। খারাপ লাগেনি। ছেলেটি সহজ-সরল। সব সময় চেষ্টা করে নদীকে হাসি খুশিতে রাখার।
অথচ আগে নদী ছিল কতটা প্রাণবন্ত, উচ্ছল ছিল তার তরঙ্গ।
সজীব মারা যাবার পর থেকে যেন কেমন হয়ে গেছে। ছাইচাপা আগুন যেন। শুধু গুমড়ে গুমড়ে থাকে।
সমুদ্র বলল' না বলছিলাম..?'
রুপসা বলল' আমি তো সেটাই জানতে চাইছি, কি বলতে চাইছো,?'
সমুদ্র যেন মাথা চুলকে বলল' না মানে আন্টি ,কথাটা ওকে ...।'
রুপসা বললো ' বুঝেছি কথাটা আমাকে বলবে না তাই তো?'
সমুদ্র নিরুত্তর।
রুপসা বলল 'ঠিক আছে। আমি চেষ্টা করছি ওকে ঘুম থেকে ডেকে দেবার। যদি ওঠে ভালো ।না উঠলে তো আমার কিছু করার নেই বাবা।'
সমুদ্র হেসে বলল 'ঠিক আছে আন্টি।'
রুপসার স্বামী মারা যাবার পর স্বামীর বস কোম্পানিতে জয়েন করতে বলেছেন। তাই স্বাভাবিকভাবেই নদীকে তেমনভাবে সময় দিতে পারে না।
মেয়েটা কেমন যেন একগুঁয়ে জেদি হয়ে যাচ্ছে।
একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে পা বাড়ালো নদীর ঘরের দিকে। প্যাসেজ টপকে নদীর ঘরের ভেজানো দরজাটা আস্তে করে ঠেলল।
ঘরে ঢুকে রূপসা নদীর ঘরের বিশৃঙ্খলা অবস্থা দেখে চমকে ওঠে। এ কি করেছে বৃষ্টি !ঘরটার বই ,খাতা ,পেন, সব খাটের ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখে দিয়েছে। টেডি বিয়ারটা মুখ থুবরে পড়ে আছে।
হঠাৎ দেখলে মনে হবে ঘরটা যেন কেউ তছনছ করে দিয়ে গেছে। রূপসার ত্রস্ত চোখ নির্জন ঘরটায় কয়েকবার পাক খেলেl
ছোটবেলা থেকেই নদীর সখ ছিল প্রিয় খুব কাছের মানুষদের ছবি টানিয়ে রাখা। রুপসা প্রভাতী আলো জানলার কাঁচ লাগানো ঝোলা ভারী পর্দা দুটোর থেকে বেরিয়ে এসেছে। আর মন কেমন করা স্মৃতিগুলো যেন আঁকড়ে ধরছে।
তারপর কাছে গিয়ে নদীর গায়ে হাত দিয়ে ডাকতে শুরু করলো। নদী ,নদী, নদী ওঠো তোমার ফোন এসেছে?'
নদী চোখ দুটো বোজা অবস্থাতেই বলল' কার ফোন? '
রুপসা বলল'একটি ছেলের কন্ঠ। নাম সমুদ্র।'
নদী ঘুমের ঘোরে বললো ''ওকে একঘন্টা পরে আসতে বল'।
রুপসা অগত্যা সমুদ্রের ফোনটাটা ধরে আস্তে করে বলল। ও তোমাকে পরে ফোন করতে বলl
লো কিন্তু..?'
সমুদ্র বলল' আন্টি ,আপনি ওকে বলবেন খুবই দরকার।'
রুপসা শুধু' হুম বলে নদীর ঘরের দিকে পা বাড়ায় কিন্তু আশ্চর্য সেখানে গিয়ে নদীকে দেখতে না পেয়ে একটু আশ্চর্য হয়ে যায়।রুপসা গেস করলো 'নদী ছাদে গেছে'।কারণ ওর মন ঠিক করার একটি মাত্র জায়গা হচ্ছে ছাদ। আজ কাল নদী যেন একটু খেয়ালী হয়ে গেছে।'
রুপসাও তরতর করে সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেল ছাদে তারপর আরষ্ট গলায় ডাকলো' নদী তোমার ফোন ।'
সমুদ্র শুনতে পেল ।
রুপসা ছাদে উঠে দেখতে পেল রুপসা আলসেতে ভর দিয়ে আচ্ছন্নের মতো তাকিয়ে আছে। ক্ষণিকের জন্য রুপসা নদীকে দেখে ভয় পেয়ে গেছিল ।
রুপসা আরষ্ট গলায় বলল 'নদী তোমার ফোন।'
নদী যেন শুনতে পেল না।
রুপসা আবার ডাকল।
এবার নদীকে ধাক্কা দিয়ে রুপসা বলল 'তোমার ফোন আছে?'
কিন্তু নদী যখন রূপসার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল তখন তাকে দেখে মনে হয়েছিল একটা ভাবলেশহীন কিছুটা উদাস দৃষ্টি।
রূপসার ভেতরটা কেমন হু হু করে উঠলো। কি হয়ে গেল তার মেয়েটার ।কেমন একটা উদাসী বাউল মন তার ভেতরটাকে দেখে আঁতকে উঠল।'
শুধু রূপসার কথাতে এবার নদী একটু ফিরে তাকালো।
রুপসা বললো 'সমুদ্র ফোন করেছিল?'
নদী তখনও একদৃষ্টিতে রূপসার দিকে তাকিয়ে। যে নাম শুনলে নদী যেন চঞ্চল অস্থির হয়ে ওঠে একটা কেমন যেন বিদ্যুৎ খেলে যায় তার শরীরের ভেতরে আজ এমন কি হলো?'
তারপর নদী কোন কথা না বলে তরতর করে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল।
রুপসা তার মেয়ের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো আর মনে মনে ভাবতে লাগল আজ যা কিছু হচ্ছে তার অবর্তমানে কিছুতেই তার মেয়েটাকে সে সময় দিতে পারছে
না ।একদিকে তার কাজের জায়গা অন্যদিকে বাড়িতে মেয়ে। কি করবে সে জীবনে বেঁচে থাকার জন্য তার কর্ম দরকার আজ যদি সজীব থাকতো ,তাহলে তাকে এগুলো চিন্তা করতে হতো না। সজীব চলে যাবার পর থেকেই সব কিছুই যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
'কি করবে রুপসা?'
নদী যখন সিঁড়ি দিয়ে নামছিলো পেছন থেকে দেখে রুপসাকে নিজেই চমকে ওঠে ।তার মেয়েটা খুব সুন্দর হয়েছে।গোলাপী আভা তার শরীরে ,মাথা ভরা চুল । টানা টানা চোখ, কালো চোখের পাতা। স্লিম।
ছোটবেলায় নদীকে নিয়ে কতজনা কত কথা বলতো নদীর পিসি ঠাম্মা বলতো রূপসার ডুবলিকেট ।কেউ কেউ বলতেন নদী হবে ওর বাবার মত দেখতে। এত ছোট অবস্থাতেও যে চেহারা বোঝা যায় এটা ভাবা কঠিন কিন্তু তার শ্বশুরবাড়ির লোকজনে এমনই বলতেন।
তিল তিল করে বড় হওয়া নদী আজ ১৭+
নদী তখন বাথরুমে রুপসা যখন নদীর ঘরে ঢুকলো নদী বাথরুম থেকে বেরিয়ে নিষ্পলক রূপসার দিকে তাকিয়ে ছিল যেন মনে হচ্ছে কিছুটা জরিপ করছে মাকে।।
রুপসাও প্রস্তুত মেয়ে এতক্ষণ তাকে লক্ষ্য করছিল।
রুপসা বলল 'সমুদ্রের সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে?'
নদী র গলার স্বরে পরিস্কার ঝাঁঝ রয়েছে ।আজকাল মাঝে মাঝে মুখ করে ওঠে ।ভালোভাবে কথা বলতেই চায় না।
নদী বলল 'তোমার সময় আছে ,সেসব শোনার?'
রুপসা সকাল সকাল আর কথা বাড়ায় না।
এর মধ্যেই দেখতে পায় ঝরনা চলে যাচ্ছে পাশ দিয়ে। রুপসা সমস্ত রাগ ঝরনার ওপর গিয়ে পরলো ।তবুও নিজেকে কিছুটা শান্ত রেখে ডাকলো ঝরনা ঝরনা ঝরনা।
ঝর্ণা বললো 'কিছু বলছ বৌদি?'
রুপসা বললো' কোথায় গেছিলে তুমি না জানিয়ে?'
ঝর্ণা বললো আসলে বলে বেরোবার সে সময় ছিল না।
রুপসা বললো' কোথায় গিয়েছিলে?'
ঝর্ণা বললো' বাজারে গিয়েছিলাম? তোমাকে কদিন ধরেই তো বলছি বাজার নেই। তুমি এত ব্যস্ত..। তাই আজ একটু সময় পেলাম বলে বাজার করে নিয়ে আসলাম।'
রূপসার কথা বাড়ালো না ।ঠিকই তো বাজার না হলে রান্না হবে কি?'
রুপসা বলল' কি এনেছে বাজার থেকে?'
ঝরনা বলল'কাতলা মাছ, চিকেন, সঙ্গে কিছু সবজি।'
রুপসা বললো আর কিছু আনো নি? দুধ গোবিন্দভোগ চাল কাজু কিসমিস ,খেজুরের গুড়?'
ঝর্ণা বললো ' এনেছি তো বৌদি?'
রুপসা বলল
ঠিক করেছ যাও তাড়াতাড়ি নাস্তা রেডি করো। আমি বেরোবো।'
ঝর্ণা বললো বেশি সময় লাগবে না বৌদি তাড়াতাড়ি করে নিচ্ছি। তোমমায় কি আজকে টিফিনে ভাত দিয়ে দেবো?'
রুপসা বলল 'না না না ।তুমি আমায় হযlএকটু ভারী করে নাস্তা টা দাও টিফিনে আজকে আমি এখানে খাব না ।আমি বাইরে লাঞ্চ করে নেব।
নদী সবকিছু শুনতে পাচ্ছিলো আজকাল মা একটু ঘনঘন বাইরে লাঞ্চ করে , ও জানলা দিয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। মনে হচ্ছিল বৃষ্টির চোখে মুখে যেন বিষণ্ণতার ছাপ ।জানলা দিয়েছে এই কর্ম ব্যস্ততাকে দেখছিল । ও অনেকদিন হলো তারা গ্রাম থেকে শহরে এসেছে ।যবে থেকে মা কোম্পানিতে জয়েন করেছে আজকে শুধু নদী ভাবছে তার জীবনটা অন্যরকম হতে পারত আজকে তার বাপি বেঁচে থাকলে চারিদিকে রোদ্দুরে ভেসে থাকতে পারতো আজকে একটা বিশেষ দিন সেটা কি মা একদম ভুলেই গেল? ও কিছুই বলল না আজকে কি তার জীবনে নতুন একটা নীল আকাশ আসতে পারত না?
এর মাঝে বাইরে থেকে আওয়াজ পাওয়া গেল যে মায়ের ঘর থেকে একটা ফোনের আওয়াজ আসছে ।একবার ফোন হয়ে কেটে গেল ঝর্ণা বাইরে থেকে বলে গেল বৌদি তোমার ফোন বাজছে রুপসা মেয়ের দিকে তাকিয়ে তারপর বলল হ্যাঁ যাচ্ছি বেরিয়ে গিয়ে সামনের বারান্দার আটকে গিয়ে নিজের ঘরে ঢুকলো ঢুকে দেখছে ফোন করেছে তাদের কোম্পানির বস অরিন্দম ভদ্র। আজকাল বেশিরভাগ দিনই বস ফোন করেন ।রুপসা ভাবতে থাকে কেন কোন কারণ না থাকলেও তার স্যার ফোন করেন ভাবতে ভাবতেই ফোনটা রিসিভ করল বলল' হ্যালো'।
অপরপ্রান্ত থেকে উত্তর আসলো আজকে তোমার কথাটা মনে আছে তো?
রুপসা বলল হ্যাঁ স্যার?
ঠিক আছে তাহলে নির্দিষ্ট টাইমে অফিসে পৌঁছে যেও।তোমার জন্য কি গাড়ি পাঠাবো?'
রুপসা বলল 'না ,না, না আমি ঠিক চলে যেতে পারব।'
এরপর ফোনটা কেটে গেল। রুপসা ভাবতে থাকে সে কি কোন রাজনীতিতে জড়িয়ে যাচ্ছে নাকি সে ভাবতে পারছে না ?তবে অফিসের বস তার প্রতি কিছুটা দুর্বল তা বোঝা যায়। আজকাল বেশ তার কথাবার্তা বা ব্যবহারে ধরা পড়ে তাকে টিকিয়ে রাখতে হলে তাকে তো তার সঙ্গে ভালোভাবে কথা বলতেই হবে ।মফস্বল থেকে আসা রুপসা কতটা বদলে গেছে নিজেই মাঝে মাঝে ভাবে এই সেই রুপসা যে একদিন ভালো করে মানুষের সঙ্গে কথা বলতে ভয় পেত ।গ্রামের মানুষ এক রকম সহজ সরল তাদের সঙ্গে হেসে খেলে কাটিয়ে দিতে পারতো কিন্তু সজীব যেন চলে যাবার পর তাকে সবকিছু শিখিয়ে দিয়ে গেল ।এতটাই আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পথ দেখিয়ে দিয়ে গেল শেষ পর্যন্ত তার জীবনটা কোন দিকে যাবে? খড়কুটোর মতো ভেসে যাবে না তো ? তার সংসার তার মেয়েকে নিয়ে সে ঠিক রাখতে পারবে? এই টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়েই আজকাল বেশিরভাগ সময়ে তাকে চিন্তাগ্রস্থ করে তোলে।
মধ্য শীতের ভোরে বারবার তার বিশেষ দিনের স্মৃতিটা ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা করছিল নদী। নদীর জলের গভীরতা মাপার চেষ্টা করছিল। কিন্তু তার মনে হয়েছে এই নদীতে যেন পাক জমে যাচ্ছে।