১৬ এপ্রিল ২০২২

মমতা রায় চৌধুরী এর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৫৫





উপন্যাস 

টানাপোড়েন১৫৫
প্রাপ্তি
মমতা রায় চৌধুরী



মনের ভেতরে তখন রেখার চলছে তোলপাড় "কিভাবে দেখবে, কি বেশে দেখবে ,কেমন আছে
 ও ?ভালো আছে তো তার স্বপ্নের স্বপ্নীল?" বসে থাকতে থাকতেই প্রচণ্ড ঘাম দিচ্ছে শরীরে। 
মনোজ এসে বলল 'এই দেখো ছবি তুলেছি।'
তখন আর কোন কিছু রেখার  ভাল লাগছে না ।
"দেখ না ছবিগুলো দেখো?'
রেখা এমনভাবে মনোজের দিকে তাকালো। মনোজ ঘাবড়ে গিয়ে বলল
'তোমার এত ঘাম হচ্ছে কেন? শরীর খারাপ লাগছে? ঠিক আছো তুমি?'
রুমালটা ব্যাগ থেকে  রেখা হাতরে হাতরে বের করল।
"প্রেসার বাড়ে নি তো?'
"কে জানে?'
ইতিমধ্যে আয়োজকরা অনুষ্ঠান সূচি ঘোষণা করছেন।
মনোজ কাছেপিঠের আয়োজকদের দু একজনকে ডেকে বলল 'ঠান্ডা জল দিন না।'
একজন এগিয়ে এসে বললেন 'কি হয়েছে ম্যাডাম? ঠিক আছেন?'
অন্য একজন কথা বলছিলেন' আশা' পত্রিকার সম্পাদক কে এসে বললেন সাহিত্যিক স্বপ্নীল স্যার হঠাৎই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাই উনি আজ আসতে পারবেন না বলে দুঃখ প্রকাশ করেছেন উনার সেক্রেটারি।'
'রেখার কানে কথাটা যেতেই রেখা যেন আরো অস্থির হয়ে উঠলো।'
মাথাটা বন বন করে ঘুরতে লাগলো। পায়ের তলার মাটি সরে যেতে লাগলো।
'কি হলো স্বপ্নীলের?
খুব বেশি বাড়াবাড়ি হয়নি তো? কি করে জানতে পারবে সব ঘটনা?'
একটা চাপা উত্তেজনা কাজ করছিল 
রেখার ।আগে থেকেই ভেবেছিল আজকে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবে বলে। কিভাবে দেখবে? কিভাবে কথা শুরু করবে ?আদৌ কোনো কথা হবে কিনা আবার এর মধ্যে  অন্য ঘটনা। আর পারছি না?"
'কি পারছো না ?কি কষ্ট হচ্ছে বলো?'
'আশা' পত্রিকার সম্পাদক বলেন আজকের দিনটা আদপেও মনে হচ্ছে ভালো নয়।'
উদ্যোক্তাদের আরেকজন সম্পাদক মহাশয় কে সান্তনা দিলেন, বললেন
',না, না দাদা এরকম ভাবছেন কেন ? এরকম হতেই পারে এক্সিডেন্টলি।
দেখুন না আবার লেখিকা রেখা, তিনিও তো অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
'হ্যাঁ ওনাকে একটু ভেতরে গিয়ে খোঁজ নিয়ে আসুন তো?'
হ্যাঁ যাচ্ছি দাদা। একদম ঘাবড়াবেন না অন্য সাহিত্যিকরা এসে গেছেন।
দর্শকদের কাছে সাহিত্যিক স্বপনীলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে নিন আর উনার সুস্থতা কামনা করুন।'
"একদম ঠিক বলেছেন।
অনুষ্ঠান তো শুরু করতেই হবে না দাদা?'
"একদমই তাই।'
'ঠিক আছে, আমি যাচ্ছি। ওদিকে ম্যাডামের খবর নিচ্ছি আর আপনি এদিকে এনাউন্স করুন।'
সম্পাদক মহাশয় এনাউন্স শুরু করে দিলেন উনাদের বার্ষিক সম্মেলন । এইদিনেইপত্রিকার যাত্রা শুরু হয়েছিল  গুটিগুটি পায়ে। আজকে এই পত্রিকা এগিয়ে চলেছে সমস্ত সাহিত্য পিপাসু পাঠকদের মনের চাহিদা মিটিয়ে।
কিন্তু যে সমস্ত সাহিত্যিকদের নিয়ে আজকের এই চাঁদের হাট বসার কথা ছিল এই অনুষ্ঠানকে আরো উজ্জ্বল করে তোলার মূলে যারা ছিলেন তাদের মধ্যে সাহিত্যিক স্বপ্নীল আসতে পারেন নি উনি হঠাৎই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন ।সেজন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করছি এবং উনার সুস্থতা কামনা করছি।
প্রথমে আজকের অনুষ্ঠানে অতিথিবরণের মধ্যে দিয়ে সম্বর্ধনা অনুষ্ঠান শুরু হবে।
যাদের পেয়েছি তারা হলেন সাহিত্যিক রেখা চৌধুরী ,সাহিত্যিক অয়ন চক্রবর্তী,সাহিত্যিক, দেবার্ঘ্য পাল।'
এই বলে অনুষ্ঠান সূচনা শুরু করলেন সম্পাদক মহাশয়।
সাহিত্যিকদের  বরণ হয়ে গেলে লেখিকা রেখা চৌধুরীকে কিছু বলার জন্য অনুরোধ করলেন।
রেখার নাম ঘোষণা হতেই যেন ভেতরে ভেতরে আরো পাল পিটিশন বেড়ে গেল।
সাহিত্যিক রেখা চৌধুরী বেশ কয়েকটি উপন্যাস কাব্য ,গল্প ,আজকের সাহিত্য জগতে সাড়া ফেলে দিয়েছেন। উনি আটপৌরে মধ্যবিত্ত সমাজ জীবনের জীবনধারা নিয়ে লিখছেন । উনার জনপ্রিয় কবিতাটি যার জন্য ''আশা' পত্রিকা আরো একধাপ এগিয়ে গেছে, তার নাম হচ্ছে 'আশায়  বুক বাঁধি '।দৈনন্দিন মানুষের জীবনের ঘটনা সেগুলো ছাপ ফেলে যাচ্ছে।
কবিতাটি উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে।  লেখিকাকে একরাশ শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
রেখা হল ভর্তি অগণের দর্শনের  মাঝখানে
স্মারক সম্মান, ও ফুলেল শুভেচ্ছা এতটাই আপ্লুত অভিভূত যে আজকে লেখিকার মুখে ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। তবুও যে যা জিজ্ঞাসা করেছে,তার যথাযোগ্য উত্তর দেবার চেষ্টা করেছে।
আগামীতে আরো ভালো কিছু দর্শকদের জন্য পাঠকদের জন্য উপহার দিতে পারবে সেই প্রতিশ্রুতি ও দিয়েছে।
সংবাদমাধ্যম ক্যামেরার সামনে আজকে রেখা কে একটু সত্যি নার্ভাস মনে হয়েছিল।
একরাশ ভালোবাসা আর শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন হৃদয় ভর্তির টাটকা অক্সিজেন নিয়ে বাড়ি ফিরছেরেখা।
মাঝে রিম্পাদির অনুরোধকে উপেক্ষা করতে পারল না। স্টেজ থেকে নেমে রিম্পাদিকে জড়িয়ে ধরে আরো বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে উঠেছিল রিম্পা দি রেখা কে বলেছিল' আমি জানতাম তোর এরকম দিন আসবে  তুই যদি আরো অনেক আগে থেকেই চেষ্টা করলে সাহিত্যাকাশে বোধহয় আরো আগেই প্রতিষ্ঠিত হতে পারতিস।'
রেখা রিম্পাদির বুকে মাথা রেখে সম্মতি জানায়।
রিম্পা দি যেন রেখার এক নিরাপদ ভালোলাগার আশ্রয়, যেখানে নির্দ্বিধায় সবকিছু ভরসা করা যায়।
মনোজ বললো 'হয়েছে তোমাদের? দিদি বোনের সোহাগ ভালবাসা।'
রিম্পা দির চোখে জল, রেখার চোখে আনন্দ অশ্রু।
রিম্পা দি বললো ' আর দেরি করা না, তোদের আবার ফিরতে হবে ।চল খেয়ে নিবি।'
রেখা বলল' এখানে অনেক কিছু খাইয়েছে।'
'আমি জানি কি খাইয়েছে। ভাত তো খাস নি।'
মনোজ রিম্পা দির  বাড়ি এই প্রথম আসলো রেখা যদিও  আগে এসেছে।
"বাববা রিম্পা দি যা খাবার আয়োজন করেছে এলাহি ব্যাপার।"
মনোজ বলেছেন' কি করেছেন দিদি আপনি?'
কি করেছি ভাই?'
'পোলাও, সাদা ভাত, কাতলা মাছের কালিয়া, মটন, চাটনি, পাপড়, মিষ্টি, দই, আর কি চাই এ তো বিয়ে বাড়ির খাওয়া দাওয়া?'
রেখা বললো 'মেয়ের বিয়েতে কি আমরা কিছু খাব না নাকি গো?'
রিম্পা দি হেসে বলল 'সে কবে খাবে, সে ততদিনে হজম হয়ে যাবে। তাছাড়া আজকালকার মেয়ে কি করবে বাবা মায়ের ইচ্ছেতে বিয়ে । না নিজে পছন্দ করে বিয়ে করবে? জানাবে কি ,জানাবে
 না ।সেটাও তো অনেকটা নির্ভর করছে না?'
মনোজ  বলল' আমাদের মেয়ে ওরকম নয়।'
রিম্পা দি বলল' তুমি ওকে চেনো?'
রেখা বললো "ভাগ্যিস ও নেই কাছে।'
"হ্যাঁ তাইতো ওকে তো দেখতে পাচ্ছি না 
দিদি ?'মনোজ বললো।
'আজকে ওর একটা এক্সাম আছে কোচিং সেন্টারে ।সেখানে গেছে।'
মনোজ বলল 'ওর গিফটা দিয়েছো।'
জিভ কেটে বলে 'ভাগ্যিস মনে করালে, ভুলেই গেছি?'
রিম্পা দি বলল' কি রে?'
'ও চকলেট খেতে ভালোবাসে তো ওর জন্য ক্যাডবেরি সেলিব্রেশন আছে। ওকে দিয়ে দিও। সঙ্গে সঙ্গে ব্যাগ থেকে বের করে রিম্পা দির হাতে দিল  রেখা।'
রিম্পাদি বলে' ও কি এখন ছোট আছে?  এসব কেন করিস?'
মনোজ ,রেখা দুজনই বলল' ও আমাদের কাছে ছোটই আছে ।তাছাড়া  আমরা কি দেব, না দেব তুমি এ ব্যাপারে একটা কথাও বলবে না।'
রিম্পা দি বললো, সেই তো যা জেদি হয়ে যাচ্ছে না ,যদি থাকতিস কাছে বুঝতে পারতিস?'
'এসময়টা একটু হবে জানো রিম্পা দি' রেখা বলল।
মনোজ বলল হ্যাঁ, এডোলেসন পিরিয়ড চলছে তো।'
রেখা বলে 'এই সময় ওর কিছু জিনিসকে যেমন সাপোর্ট করতে হবে। আবার কিছু জিনিস কে ওকে ভালো করে বুঝিয়ে বলতে হবে ।সব সময় বকাঝকা করো না। ওর সাইকোলজিটা বুঝে চলবে।'
"সেই চিন্তাতেই তো সব সময় থাকি রে।'
মনোজ বললো 'আমি উঠতে পারছি না এত খাইয়ে দিলেন রিম্পা দি ।এবার কি করে যাব বলুন তো?"
রিম্পা দি বলল' যাবার কি দরকার একটা দুটো দিন তো থাকতে পারো দিদির বাড়িতে?'
মনোজ বললো 'সেতো পারি কিন্তু আমার বাড়িতে যে আবার কিছু সৈন্য আছে, তাদের দেখভাল তাদের খাওয়া দাওয়া এসবের জন্য তো কোথাও যেতে পারি না ।গেলেও থাকা যায় না।'
সেদিন ওর কাকার বাড়িতে এত করে থাকতে বলল তাও থাকতে পারলাম না ,শুধু ওদের জন্য।
রিম্পা দি বললো' তোরা কিন্তু মায়ার বাঁধনে পড়ে আছিস।'

মনোজ   বলল 'একবারও মাসিকে ফোন করেছো'?
রেখা জিভ কেটে বলল 'একদম ভুলে গেছি গো সরি ,সরি।'
এক্ষুনি করছি, রেখা তাড়াতাড়ি হাত ধুয়ে ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে মাসিকে ফোন লাগালো।
রিং হয়ে যাচ্ছে। মাসি এসে ফোনটা রিসিভ করে বলল" হ্যালো'।
মাসি," কি করছো?'
"এইতো কাজগুলো একটু গোছাচ্ছি গো বৌমা.।'
"বাচ্চাগুলো সব খেয়েছে?'
"হ্যাঁ খেয়েছে '।
'কি করছে ওরা?"
'ওরা এখন ঘুমোচ্ছে?'
তুমি খেয়েছ?
হ্যাঁ খেয়েছি।
'তোমরা কখন বেরোবে?'
'এইতো এক্ষুনি বেরোবো।'
"ঠিক আছে রাখছি।'
 ফোনটা রেখে রিম্পা দিকে বলল' এখন বেরিয়ে পড়তে হবে আর দেরি করলে হবে না।'
রিম্পা দি বললো' হ্যাঁ আর কি বলবো বল ?একটা দিন এসে থাকলে তাও হয়। তোরা হুটোপাটি করে আসিস আবার হুটোপাটি করে যাস।।'
"হ্যাঁ, অন্যদিন আসবো গো তোমরা যেও।
"আবার কবে দেখা হবে কে জানে ?'রিম্পা দি বললো।
"রেখা বললো ' খুব শিগগিরই দেখা হবে আমাদের কেন বলছে এরকম কথা?'
রেখা মনোজ রিম্পাদিকে হাত মেরে বিদায় জানালো। গাড়ি স্টার্ট করলো ।গাড়ি ছুটে চলেছে নিজের নিশানায়।
রেখার বুক জুড়ে তখন শুধুই প্রাপ্তির সম্মাননার আনন্দের উচ্ছ্বাস।

শামীমা আহমেদ এর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৯১




ধারাবাহিক উপন্যাস 


শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত (পর্ব ৯১)
শামীমা আহমেদ 

বুবলীর কথা শুনে রাহাত বুঝে নিলো হয়তো  সবকিছু একটা সমাধানের দিকে যাচ্ছে। তবে   সে এখন খুব বুঝতে পারছে শিহাব ভাইয়ার সাথে তার এমনটা করা উচিত হইনি।শায়লা আপু আর শিহাব ভাইয়া তো তাকে সবই জানিয়েছিল। তখনই নোমান সাহেবকে রাহাতের ম্যানেজ করা উচিত ছিল। ছোট ভাই হয়ে আপুর জন্য এই কাজটি সে করেনি। আজ ঘটনাচক্রে এমন পরিস্থিতিতে পড়ে রাহাত ভীষণ লজ্জায় পড়ে গেছে।  তার ভেতরে অপরাধবোধ কাজ করছে। কেমন করে সে শিহাব ভাইয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়াবে। রাহাত ভাবলো,তার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। আর শায়লা আপুকে তা জানাতে হবে। শিহাব ভাইয়াকে সসন্মানে এই বাসায় আনতে হবে। শায়লা আপু শিহাব ভাইয়াকে বলে যেন  এই বিষয়টি সহজ করে দেয়। এখন রাহাতের সব ক্ষোভ গিয়ে পড়ছে রুহি খালার উপর। তার কথা শুনেই সবকিছু এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। সেতো সবসময়ই আপুর প্রতি কৃতজ্ঞ ছিল। আপুর সুখী হওয়াটাই যেখানে মূখ্য সেখানে অন্য কারো দ্বারা প্রভাবিত হওয়া ঠিক হয়নি। তাছাড়া আপুর পুরো বিয়ের বিষয়টিই এক বিরাট ভুল ছিল। অনভিজ্ঞ রাহাত তা একেবারেই বুঝে উঠতে পারেনি। সবাই যা বুঝিয়েছে তাই মেনে নিয়েছে।রাহাত ভাবলো,অন্তত বিয়ে সংক্রান্ত ব্যাপারে এরপর থেকে সে খুব বুঝে শুনে চলবে। 
বুবলী  সারাটাক্ষন শায়লাকে প্রবোধ দিচ্ছে।
কিভাবে বিষয়টিকে একটা সুষ্ঠু সমাধানে আনা যায় তার একটা উপায় খুঁজছে।
আর শায়লা আপুর জন্য যেন শায়লার মা মানে তার ফুফু যেন দুশ্চিন্তা না করে তা বারবার বুঝাতে চেষ্টা  করছে। তবে এত বড় একটা আঘাত শায়লাকে নিশ্চুপ করে দিয়েছে। শিহাবের প্রতি তার আকুলতা থাকলেও এখন কিভাবে তা শিহাবকে সব জানাবে ? যেখানে শিহাব বারবার রাহাতকে বুঝিয়েছে। রাহাত কেবলি উল্টো স্রোতে বয়ে চলছিল।
শায়লা ঘড়িতে সময় দেখে নিলো।সন্ধ্যা ছয়টা। নিশ্চয়ই  আরাফ এতক্ষণে একটু সুস্থ হয়েছে।পরিবারের সবাই নিশ্চয়ই ওকে ঘিরে আছে। তাহলে কেমন করে সে আরাফের অবস্থা  জানবে ? তবুও শায়লা ভাবলো, আরাফের অবস্থা জানতে একটা মেসেজ দিয়ে রাখি।
শায়লা মোবাইল হাতে নিতেই  রাহাত মায়ের ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ালো। সে কিছু একটা বলতে চাইছে। কিন্তু শায়লার চোখে চোখ ফেলতে চাইছে না। বুবলী দরজার কাছে এগিয়ে গেলো, কিছু বলবে রাহাত ভাইয়া ? 
হ্যাঁ,মানে আমি আপুর সাথে একটু কথা বলতে চাইছিলাম।
শায়লা বুঝে নিলো সে কি বলতে চাইছে। এ ব্যাপারে সে নিজেকে বেশ শক্ত করে রাখলো। বুবলী পরিস্থিতিটা বুঝতে পারলো। সে বুঝতে পারলো, ভাইবোনের এই শীতল সম্পর্কের বরফ গলতে না দিলে সবদিকে আরো ঝামেলা হয়ে যাবে। বুবলী তাই সমাধানের জন্য এগিয়ে গেলো। সে শায়লাকে বুঝাতে লাগলো, আপু,মানুষ মাত্রই ভুল করে। তুমি রাহাত ভাইয়ার ভুলের জন্য ক্ষমা করে দাও। 
ভুল ? শায়লার মধ্যে যেন বারুদ স্ফুলিঙ্গের মত বিস্ফোরণ ঘটলো ! যদিও সে নিজের ভেতরেই তার সবটুকু রেখে দিল আর মনে মনে ভাবলো,যারা নিজেদের স্বার্থে
অন্যের কথায় প্রভাবিত হয় তারা ভুল করে না। আর যারা কথা দিয়ে কথা রাখেনা তারা যে অন্যের সুখ চায় না সেটা স্পষ্ট। 
শায়লার এমন অভিব্যক্তিতে  রাহাত যেন চুপসে গেলো। সে তার নিজের ঘরে গিয়ে ভাবনায় ডুবে রইল।

বিকেল সন্ধ্যা নাগাদ সুমাইয়া তার দুই সন্তান সুনায়রা আর আরুশকে নিয়ে হাসপাতালে এলো। সাথে  আরাফের খেলনাপাতি আর অনেক নাস্তার ব্যাগপত্র। রুবিনা আর  শিহাবের কথা ভেবে সুমাইয়া সব গুছিয়ে এনেছে। আসলে  সুমাইয়া চাইছে যতভাবে শিহাবকে আটকে রাখা যায় আর রুবিনার সাথে একটা বোঝাপড়া করিয়ে নেয়া যায়।
যদিও ওরা দুজনেই দুজনের মনোভাব বুঝে নিয়েছে। কিন্তু সুমাইয়া সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যেন এবার শিহাব যেন একটা সিদ্ধান্তে  আসে।তার পক্ষে নিজের সংসার, শ্বশুর শাশুড়ী, নিজের সন্তানদের দেখাশুনা  করা আরাফের খেয়াল রাখা খুবই হেকটিক হয়ে যাচ্ছিল। নিজের মামাতো বোন এক বাড়িতে এলে আরাফকে নিয়ে আর ভাবতে হতো না। 
আরাফের কেবিনে ঢুকতেই সুনায়রা আর আরুশকে দেখে আরাফ একেবারে সুস্থ হয়ে  বিছানায় উঠে বসলো। তারা খেলনা দিয়ে খেলার আনন্দে মেতে উঠলো ! 

বুবলী শায়লাকে একটু স্বাভাবিক করতে মায়ের ঘর থেকে  শায়লাকে তার নিজের রুমে নিয়ে এলো। প্রায় দুইদিন পর শায়লা নিজের ঘরে ঢুকল। ঘরে ঢুকে শায়লা চারিদিকে তাকিয়ে দেখলো ঘরটি পরিপাটি করে গোছানো হয়েছে। খাটের পাশে সুন্দর একটি সাইড টেবিলে একটি ল্যাম্প শেড,সুন্দর কারুকাজের একটি ফুলদানীতে এক গোছা রজনীগন্ধা সুবাস ছড়াচ্ছে। জানালায় নতুন পর্দা,বিছানায় মখমলি চাদর। ড্রেসিং টেবিলে নানান প্রসাধনীতে সাজানো। শায়লা বেশ অবাক হলো,কবে এসব তৈরি করা হলো ? রাহাত তাহলে এই বিয়ের জন্য ভালোই প্রস্তুতি নিয়েছে। শায়লা বুঝলো, রাহাত এখন কেনাকাটায় বেশ এক্সপার্ট হয়েছে ? কিন্তু একটা সময় সব কিছুর জন্য তার কাছেই আবদার থাকতো।  শায়লা দেখলো,নতুন বরের জন্য বিয়ের যাবতীয় কেনাকাটা এই ঘরেই রাখা হয়েছে ।  শায়লার হলুদ সাজের সবকিছু শুধু সময়ের জন্য অপেক্ষায় ছিল।নোমান সাহেব  এলে হয়তো এতক্ষনে তাকে হলুদ সাজে সাজতে  হতো। শায়লার শিহাবের কথা খুব মনে পড়ছে।  জানালা দিয়ে বাড়ির লাইটিং দেখা যাচ্ছে।লাল নীল হলুদ নানা রঙের  ছোট ছোট বাতি জ্বলছে আর নিভছে। ছাদে হলুদের স্টেজ বানানো হচ্ছে। একটু পর এই ঘর সাজানো হবে। রাহাতের এমনি পরিকল্পনার কথা সে শুনেছে। সব দেখে শায়লা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। ভাগ্য তাকে নিয়ে বেশ খেলছে ! তবে এতে রাহাতের প্রতি তার সব অভিযোগ জমা হলো।  বুবলী ঘরের দরজা লাগিয়ে দিলো।বাড়িতে এখনো বিয়ে বাড়ির লোকজন বর্তমান। তারা কিছুই বুঝতে পারছে না কি ঘটতে যাচ্ছে। 
শায়লা যেন শিহাবকে সব ঘটনা খুলে বলে বুবলী ইনিয়ে বিনিয়ে একথাটাই বুঝাতে চাইছে। কিন্তু শায়লা এ ব্যাপারে  একদম অনড় হয়ে আছে। তবে হ্যাঁ, শিহাব যদি স্বেচ্ছায় তার খবর জানতে চায় তবে সে আর কিছুই লুকাবে  না।শায়লা শিহাবকে খুব ভালো করেই জানে। কিন্তু বেশ অনেকক্ষন  হলো, শিহাব তার সাথে কোন  যোগাযোগে নাই। হয়তো সে আমাকে নিয়ে এদিকের অন্যরকম আয়োজনের কথা ভাবছে। শায়লার নিজের কাছে নিজেকে খুব বোঝা মনে হলো।
সুনায়রা, আরুশ আর আরাফ রাত নয়টা পর্যন্ত খেলায় ডুবে রইল।সুমাইয়া, শিহাব আর রুবিনা নানান গল্পে মেতে রইল। গল্পের  বেশীর  ভাগই ছিল আরাফ আর আরাফের সারাদিনের নানান কর্মকাণ্ড, সুন্দর সুন্দর কথা,দুষ্টুমি এইসব নিয়ে। রাত হয়ে যাওয়াতে সুমাইয়া বাচ্চাদের নিয়ে বাসায় ফিরতে চাইলো। আর রুবিনাকে বড় বোনের নির্দেশ রেখে গেলো, সে যেন আজ রাতটা আরাফের সাথেই থাকে। শিহাব যা বুঝার তা বুঝে নিলো। কিন্তু ভাবীর এত পরিকল্পনা  যে তার কাছে ধোপে টিকবে না সেটা আর ভাবীকে বুঝতে দেয়া হলো না। 
বাসার দারোয়ান চাচাকে দিয়ে তোমাদের আর আরাফের  খাবার পাঠিয়ে দিবো। তোমরা আরাফকে যত্ন করে খাইয়ে দিও। আর তোমরাও খেয়ে নিও। সারারাত দুজন গল্প করে কাটিয়ে দিও। হাসপাতাল ছাড়ার আগে সুমাইয়া শিহাবকে এমনি আদেশ রেখে গেলো। রুবিনা এতে সম্মতি দিলেও শিহাব নিরুত্তর রইল। 
শিহাবের নিরুত্তরে তার এতে সম্মতি আছে রুবিনা যেন এমনটি না ভাবে তাই শিহাব রুবিনকে স্পষ্ট করেই জানালো, রুবিনা,
আপনি আমার সন্তানের জন্য অনেকখানি ভেবেছেন, অনেক সময় দিচ্ছেন। আমি আপনার এই ঋণ যদি কখনো শোধরাবার সুযোগ হয় তা করবো। না হয় আজীবন  ঋণী থাকবো। যদি আপনার ক্ষমা মেলে তা আমার সৌভাগ্য ভেবে নিবো। কিন্তু আপনি আর ভাবী যা ভাবছেন তা কোনদিন হবার নয়।আপনি মিছে কোন স্বপ্ন দেখুন তা আমি চাইনা। শুধু অনুরোধ আজ রাতটা আপনি আরাফের সাথে থাকুন। কারণ আমি একজনের অপেক্ষায় আছি। সেও আমার পথপানে চেয়ে আছে। আমাকে তার কাছে ফিরতে  হবে। আমি আজ খুব সকালে বাসা থেকে বের হয়েছি। আমাকে বাসায় ফিরতে  হবে। সারাদিন এক পোষাকে আছি। তাছাড়া মোবাইলেও একেবারেই চার্জ নেই। আমি সকালেই আবার চলে আসব। আমার মাকে কল দিয়ে আসতে বলছি।আপনার সাথে থাকবে। আশা করি আপনি আমাকে  ভুল বুঝবেন না। রুবিনা একেবারে নিষ্প্রাণ হয়ে বসে রইল। শিহাব মাকে কল করে, আরাফকে আদর দিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে এলো। আরাফ রুবি আন্টিকে পেয়ে  বাবাকে হাসিমুখে বিদায় জানালো। 
বেরুনোর আগে শিহাব মনে মনে ভেবে নিলো শায়লাকে পেতে যে করেই হউক শেষ চেষ্টাটি সে করবে। হাসপাতালের ঘড়িতে তখন রাত সাড়ে নয়টা বাজছে। শিহাব উত্তরার উদ্দেশ্য বাইকে স্টার্ট দিলো।


চলবে...

কবি নওশাদ আলম এর কবিতা "জ্ঞান-ভিখারি"




জ্ঞান-ভিখারি 
নওশাদ আলম

ভিখারির থালা হাতে নিয়ে ঘুরবো জ্ঞানীর তরে,
জ্ঞান-ভিক্ষা চাইবো ভুবনে, জ্ঞানীজনদের ঘরে।
লাজ-লজ্জা বিসর্জন দিবো মনের অন্তিম তটে,
সহানুভূতির ভিক্ষাগুলো ভরে নিবো নিজ ঘটে।

জ্ঞানের আবাদ করে চাষী, সাবলম্বী হবে জাতি,
আঁধারের হৃৎপিণ্ড চিবা'ত জ্ঞানের জ্বলন্ত বাতি।
রাষ্ট্রের সম্মান পুনরুদ্ধারে, অতন্দ্র প্রহরী হবো,
হৃৎপাত্রে সমীরণ জমিয়ে জ্ঞানীর সন্ধানে যাবো।

জ্ঞানের ক্ষুধায় উন্মাদ যে, চলে এসো এই দলে,
একমুঠো জ্ঞান চাইবো ভিক্ষা কতই'না কৌশলে।
আত্মতৃপ্তির আকাঙ্ক্ষাতে উঠিনি'ত মেতে আমি,
জ্ঞানশূন্যের হাতে স্বাধিকা হয়েছে বড় আসামি।

সঞ্চিত সব জ্ঞানের স্তুপ, বিলাবো দেশের মাঝে,
অজ্ঞের ঘটে জ্ঞান ঢুকাবো লাগাব উত্তম কাজে।
অপছন্দ পরিচ্ছদ অংশ ,হোক না সবার কাছে,
জ্ঞান উপার্জন চালু রাখি, ঘুরে জ্ঞানীদের পাছে।
 
জন্মভূমির আপদকালে, ভাসাবো সাহায্য তরী,
জ্ঞান-ভিখারি হয়ে জগতে যাযাবরে নেই জুড়ি।
জ্ঞান তৃষ্ণানায় কাতর হয়ে, পথে পথে যায় ঘুরে,
জ্ঞানের থালাটা হস্তে নিয়ে যাবো যে অচীনপুরে।