উপন্যাস
টানাপোড়েন১৫৫
প্রাপ্তি
মমতা রায় চৌধুরী
মনের ভেতরে তখন রেখার চলছে তোলপাড় "কিভাবে দেখবে, কি বেশে দেখবে ,কেমন আছে
ও ?ভালো আছে তো তার স্বপ্নের স্বপ্নীল?" বসে থাকতে থাকতেই প্রচণ্ড ঘাম দিচ্ছে শরীরে।
মনোজ এসে বলল 'এই দেখো ছবি তুলেছি।'
তখন আর কোন কিছু রেখার ভাল লাগছে না ।
"দেখ না ছবিগুলো দেখো?'
রেখা এমনভাবে মনোজের দিকে তাকালো। মনোজ ঘাবড়ে গিয়ে বলল
'তোমার এত ঘাম হচ্ছে কেন? শরীর খারাপ লাগছে? ঠিক আছো তুমি?'
রুমালটা ব্যাগ থেকে রেখা হাতরে হাতরে বের করল।
"প্রেসার বাড়ে নি তো?'
"কে জানে?'
ইতিমধ্যে আয়োজকরা অনুষ্ঠান সূচি ঘোষণা করছেন।
মনোজ কাছেপিঠের আয়োজকদের দু একজনকে ডেকে বলল 'ঠান্ডা জল দিন না।'
একজন এগিয়ে এসে বললেন 'কি হয়েছে ম্যাডাম? ঠিক আছেন?'
অন্য একজন কথা বলছিলেন' আশা' পত্রিকার সম্পাদক কে এসে বললেন সাহিত্যিক স্বপ্নীল স্যার হঠাৎই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাই উনি আজ আসতে পারবেন না বলে দুঃখ প্রকাশ করেছেন উনার সেক্রেটারি।'
'রেখার কানে কথাটা যেতেই রেখা যেন আরো অস্থির হয়ে উঠলো।'
মাথাটা বন বন করে ঘুরতে লাগলো। পায়ের তলার মাটি সরে যেতে লাগলো।
'কি হলো স্বপ্নীলের?
খুব বেশি বাড়াবাড়ি হয়নি তো? কি করে জানতে পারবে সব ঘটনা?'
একটা চাপা উত্তেজনা কাজ করছিল
রেখার ।আগে থেকেই ভেবেছিল আজকে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবে বলে। কিভাবে দেখবে? কিভাবে কথা শুরু করবে ?আদৌ কোনো কথা হবে কিনা আবার এর মধ্যে অন্য ঘটনা। আর পারছি না?"
'কি পারছো না ?কি কষ্ট হচ্ছে বলো?'
'আশা' পত্রিকার সম্পাদক বলেন আজকের দিনটা আদপেও মনে হচ্ছে ভালো নয়।'
উদ্যোক্তাদের আরেকজন সম্পাদক মহাশয় কে সান্তনা দিলেন, বললেন
',না, না দাদা এরকম ভাবছেন কেন ? এরকম হতেই পারে এক্সিডেন্টলি।
দেখুন না আবার লেখিকা রেখা, তিনিও তো অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
'হ্যাঁ ওনাকে একটু ভেতরে গিয়ে খোঁজ নিয়ে আসুন তো?'
হ্যাঁ যাচ্ছি দাদা। একদম ঘাবড়াবেন না অন্য সাহিত্যিকরা এসে গেছেন।
দর্শকদের কাছে সাহিত্যিক স্বপনীলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে নিন আর উনার সুস্থতা কামনা করুন।'
"একদম ঠিক বলেছেন।
অনুষ্ঠান তো শুরু করতেই হবে না দাদা?'
"একদমই তাই।'
'ঠিক আছে, আমি যাচ্ছি। ওদিকে ম্যাডামের খবর নিচ্ছি আর আপনি এদিকে এনাউন্স করুন।'
সম্পাদক মহাশয় এনাউন্স শুরু করে দিলেন উনাদের বার্ষিক সম্মেলন । এইদিনেইপত্রিকার যাত্রা শুরু হয়েছিল গুটিগুটি পায়ে। আজকে এই পত্রিকা এগিয়ে চলেছে সমস্ত সাহিত্য পিপাসু পাঠকদের মনের চাহিদা মিটিয়ে।
কিন্তু যে সমস্ত সাহিত্যিকদের নিয়ে আজকের এই চাঁদের হাট বসার কথা ছিল এই অনুষ্ঠানকে আরো উজ্জ্বল করে তোলার মূলে যারা ছিলেন তাদের মধ্যে সাহিত্যিক স্বপ্নীল আসতে পারেন নি উনি হঠাৎই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন ।সেজন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করছি এবং উনার সুস্থতা কামনা করছি।
প্রথমে আজকের অনুষ্ঠানে অতিথিবরণের মধ্যে দিয়ে সম্বর্ধনা অনুষ্ঠান শুরু হবে।
যাদের পেয়েছি তারা হলেন সাহিত্যিক রেখা চৌধুরী ,সাহিত্যিক অয়ন চক্রবর্তী,সাহিত্যিক, দেবার্ঘ্য পাল।'
এই বলে অনুষ্ঠান সূচনা শুরু করলেন সম্পাদক মহাশয়।
সাহিত্যিকদের বরণ হয়ে গেলে লেখিকা রেখা চৌধুরীকে কিছু বলার জন্য অনুরোধ করলেন।
রেখার নাম ঘোষণা হতেই যেন ভেতরে ভেতরে আরো পাল পিটিশন বেড়ে গেল।
সাহিত্যিক রেখা চৌধুরী বেশ কয়েকটি উপন্যাস কাব্য ,গল্প ,আজকের সাহিত্য জগতে সাড়া ফেলে দিয়েছেন। উনি আটপৌরে মধ্যবিত্ত সমাজ জীবনের জীবনধারা নিয়ে লিখছেন । উনার জনপ্রিয় কবিতাটি যার জন্য ''আশা' পত্রিকা আরো একধাপ এগিয়ে গেছে, তার নাম হচ্ছে 'আশায় বুক বাঁধি '।দৈনন্দিন মানুষের জীবনের ঘটনা সেগুলো ছাপ ফেলে যাচ্ছে।
কবিতাটি উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। লেখিকাকে একরাশ শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
রেখা হল ভর্তি অগণের দর্শনের মাঝখানে
স্মারক সম্মান, ও ফুলেল শুভেচ্ছা এতটাই আপ্লুত অভিভূত যে আজকে লেখিকার মুখে ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। তবুও যে যা জিজ্ঞাসা করেছে,তার যথাযোগ্য উত্তর দেবার চেষ্টা করেছে।
আগামীতে আরো ভালো কিছু দর্শকদের জন্য পাঠকদের জন্য উপহার দিতে পারবে সেই প্রতিশ্রুতি ও দিয়েছে।
সংবাদমাধ্যম ক্যামেরার সামনে আজকে রেখা কে একটু সত্যি নার্ভাস মনে হয়েছিল।
একরাশ ভালোবাসা আর শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন হৃদয় ভর্তির টাটকা অক্সিজেন নিয়ে বাড়ি ফিরছেরেখা।
মাঝে রিম্পাদির অনুরোধকে উপেক্ষা করতে পারল না। স্টেজ থেকে নেমে রিম্পাদিকে জড়িয়ে ধরে আরো বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে উঠেছিল রিম্পা দি রেখা কে বলেছিল' আমি জানতাম তোর এরকম দিন আসবে তুই যদি আরো অনেক আগে থেকেই চেষ্টা করলে সাহিত্যাকাশে বোধহয় আরো আগেই প্রতিষ্ঠিত হতে পারতিস।'
রেখা রিম্পাদির বুকে মাথা রেখে সম্মতি জানায়।
রিম্পা দি যেন রেখার এক নিরাপদ ভালোলাগার আশ্রয়, যেখানে নির্দ্বিধায় সবকিছু ভরসা করা যায়।
মনোজ বললো 'হয়েছে তোমাদের? দিদি বোনের সোহাগ ভালবাসা।'
রিম্পা দির চোখে জল, রেখার চোখে আনন্দ অশ্রু।
রিম্পা দি বললো ' আর দেরি করা না, তোদের আবার ফিরতে হবে ।চল খেয়ে নিবি।'
রেখা বলল' এখানে অনেক কিছু খাইয়েছে।'
'আমি জানি কি খাইয়েছে। ভাত তো খাস নি।'
মনোজ রিম্পা দির বাড়ি এই প্রথম আসলো রেখা যদিও আগে এসেছে।
"বাববা রিম্পা দি যা খাবার আয়োজন করেছে এলাহি ব্যাপার।"
মনোজ বলেছেন' কি করেছেন দিদি আপনি?'
কি করেছি ভাই?'
'পোলাও, সাদা ভাত, কাতলা মাছের কালিয়া, মটন, চাটনি, পাপড়, মিষ্টি, দই, আর কি চাই এ তো বিয়ে বাড়ির খাওয়া দাওয়া?'
রেখা বললো 'মেয়ের বিয়েতে কি আমরা কিছু খাব না নাকি গো?'
রিম্পা দি হেসে বলল 'সে কবে খাবে, সে ততদিনে হজম হয়ে যাবে। তাছাড়া আজকালকার মেয়ে কি করবে বাবা মায়ের ইচ্ছেতে বিয়ে । না নিজে পছন্দ করে বিয়ে করবে? জানাবে কি ,জানাবে
না ।সেটাও তো অনেকটা নির্ভর করছে না?'
মনোজ বলল' আমাদের মেয়ে ওরকম নয়।'
রিম্পা দি বলল' তুমি ওকে চেনো?'
রেখা বললো "ভাগ্যিস ও নেই কাছে।'
"হ্যাঁ তাইতো ওকে তো দেখতে পাচ্ছি না
দিদি ?'মনোজ বললো।
'আজকে ওর একটা এক্সাম আছে কোচিং সেন্টারে ।সেখানে গেছে।'
মনোজ বলল 'ওর গিফটা দিয়েছো।'
জিভ কেটে বলে 'ভাগ্যিস মনে করালে, ভুলেই গেছি?'
রিম্পা দি বলল' কি রে?'
'ও চকলেট খেতে ভালোবাসে তো ওর জন্য ক্যাডবেরি সেলিব্রেশন আছে। ওকে দিয়ে দিও। সঙ্গে সঙ্গে ব্যাগ থেকে বের করে রিম্পা দির হাতে দিল রেখা।'
রিম্পাদি বলে' ও কি এখন ছোট আছে? এসব কেন করিস?'
মনোজ ,রেখা দুজনই বলল' ও আমাদের কাছে ছোটই আছে ।তাছাড়া আমরা কি দেব, না দেব তুমি এ ব্যাপারে একটা কথাও বলবে না।'
রিম্পা দি বললো, সেই তো যা জেদি হয়ে যাচ্ছে না ,যদি থাকতিস কাছে বুঝতে পারতিস?'
'এসময়টা একটু হবে জানো রিম্পা দি' রেখা বলল।
মনোজ বলল হ্যাঁ, এডোলেসন পিরিয়ড চলছে তো।'
রেখা বলে 'এই সময় ওর কিছু জিনিসকে যেমন সাপোর্ট করতে হবে। আবার কিছু জিনিস কে ওকে ভালো করে বুঝিয়ে বলতে হবে ।সব সময় বকাঝকা করো না। ওর সাইকোলজিটা বুঝে চলবে।'
"সেই চিন্তাতেই তো সব সময় থাকি রে।'
মনোজ বললো 'আমি উঠতে পারছি না এত খাইয়ে দিলেন রিম্পা দি ।এবার কি করে যাব বলুন তো?"
রিম্পা দি বলল' যাবার কি দরকার একটা দুটো দিন তো থাকতে পারো দিদির বাড়িতে?'
মনোজ বললো 'সেতো পারি কিন্তু আমার বাড়িতে যে আবার কিছু সৈন্য আছে, তাদের দেখভাল তাদের খাওয়া দাওয়া এসবের জন্য তো কোথাও যেতে পারি না ।গেলেও থাকা যায় না।'
সেদিন ওর কাকার বাড়িতে এত করে থাকতে বলল তাও থাকতে পারলাম না ,শুধু ওদের জন্য।
রিম্পা দি বললো' তোরা কিন্তু মায়ার বাঁধনে পড়ে আছিস।'
মনোজ বলল 'একবারও মাসিকে ফোন করেছো'?
রেখা জিভ কেটে বলল 'একদম ভুলে গেছি গো সরি ,সরি।'
এক্ষুনি করছি, রেখা তাড়াতাড়ি হাত ধুয়ে ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে মাসিকে ফোন লাগালো।
রিং হয়ে যাচ্ছে। মাসি এসে ফোনটা রিসিভ করে বলল" হ্যালো'।
মাসি," কি করছো?'
"এইতো কাজগুলো একটু গোছাচ্ছি গো বৌমা.।'
"বাচ্চাগুলো সব খেয়েছে?'
"হ্যাঁ খেয়েছে '।
'কি করছে ওরা?"
'ওরা এখন ঘুমোচ্ছে?'
তুমি খেয়েছ?
হ্যাঁ খেয়েছি।
'তোমরা কখন বেরোবে?'
'এইতো এক্ষুনি বেরোবো।'
"ঠিক আছে রাখছি।'
ফোনটা রেখে রিম্পা দিকে বলল' এখন বেরিয়ে পড়তে হবে আর দেরি করলে হবে না।'
রিম্পা দি বললো' হ্যাঁ আর কি বলবো বল ?একটা দিন এসে থাকলে তাও হয়। তোরা হুটোপাটি করে আসিস আবার হুটোপাটি করে যাস।।'
"হ্যাঁ, অন্যদিন আসবো গো তোমরা যেও।
"আবার কবে দেখা হবে কে জানে ?'রিম্পা দি বললো।
"রেখা বললো ' খুব শিগগিরই দেখা হবে আমাদের কেন বলছে এরকম কথা?'
রেখা মনোজ রিম্পাদিকে হাত মেরে বিদায় জানালো। গাড়ি স্টার্ট করলো ।গাড়ি ছুটে চলেছে নিজের নিশানায়।
রেখার বুক জুড়ে তখন শুধুই প্রাপ্তির সম্মাননার আনন্দের উচ্ছ্বাস।