উপন্যাস
টানাপোড়েন ১৮২
এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা
মমতা রায়চৌধুরী
হেড এক্সামিনারের কাছে খাতা জমা দিয়ে সদ্য লু'তে ঝলসানো শরীরটাকে মনোজ ও রেখা টেনে টেনে বাড়িতে এনেছে। দরজাটা খুলতে যাবে ঠিক তখনই রেখার ফোনটা বেজে উঠলো। ব্যাগ হাতরে ফোনটা বের করবে সে মানসিকতাও নেই। অন্যদিকে দীর্ঘক্ষন মনোজ ও রেখাকে দেখতে না পেয়ে আদরের বাচ্চারা ঘিরে ধরেছে। রেখা জানতো বাড়ি ফিরে ওদের আদর-ভালোবাসা কে উপেক্ষা করে কখনোই ভেতরে যাওয়া সম্ভব নয় শুধু তাই নয় ওদের ভালোবাসার পরশ রেখাও মনে প্রানে মেখে নিতে চায় তাইতো ওদের জন্য
কিছু উপহার হিসেবে খাবার দেয়া র জন্য বিস্কুট কিনে এনেছিল। প্রথমে ওদেরকে আদর করে তারপর বিস্কিটগুলো খাইয়ে রেখা ভেতরে
ঢোকে। তখন ও ফোন বেজে যাচ্ছে।
মনোজ তো তার আগেই ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হতে গেছে।
ততক্ষণ রেখা ড্রইংরুমের সোফার উপর নিজের গা টাকে এলিয়ে দিয়েছে। মনোজ এসে দেখছে রেখা চোখ বুজে আছে আর ঠিক তার পায়ের কাছে তুতু বসে আছে।
মনোজ বলল" কি গো? ওঠো যাও ফ্রেশ হয়ে এসো।"
রেখা বলল " হ্যাঁ ,যাবো,। একটু না বসেই ফ্রেস হয়ে চলে এলে,ঘামটা বসে গেছে না ,একটু শুকিয়ে নিয়ে যেতে পারতে। এই ঠান্ডা গরম থেকেই তো শরীর খারাপ হবে।"
"আর পারছিলাম না জানো তো। এখন একটু আরাম লাগছে।*
"চা হবে নাকি?"
"এখনও আমি ফ্রেস হতে পারলাম না, আর চা .?"
"ঠিক আছে ফ্রেশ হয়ে এসো তারপর চা খাব''।
"হ্যাঁ যাই। না হলে তো দেরি হয়ে যাবে। সন্ধ্যে বাতি জ্বালতে হবে, গোপালকে ভোগ চাপাতে হবে। কম কাজ আছে বাকি বলো ?তোমরা তো পুরুষ মানুষ বলেই খালাস।"
মনোজ ঘাড় নেড়ে বলল "তা স্বীকার করি।
তাহলে তো মনে হচ্ছে আজকে চাটা আমাকেই বানাতে হবে ,কি বলো?"
রেখা হেসে বলল
"তা মন্দ হয় না। তুমি তো আগে করতে।আজকে না হয় সেই আগের মত বানাও।"
"ঠিক আছে, তাই হবে।"
রেখা সবেমাত্র বাথরুমে ঢুকেছে আবার রেখার ফোন বেজে উঠেছে।
মনোজ ফোনটা ধরল না ভাবলো রেখা এসে ধরবে কিন্তু না আবার রিং হতে শুরু করল ফোনের এত আর্তনাদ যার জন্য মনোজকে ফোনটা খুলে দেখতেই হলো কে করেছে?
দেখলো ফোনের কলার টিউনে ভেসে আসছে সম্পাদকের নাম।
মনোজ বুঝল ব্যাপারটা বেশ গুরুতর তাই ফোনটা নিয়ে গিয়ে রেখাকে ডাকলো "রেখা, রেখা, রেখা।"
রেখা তখন বাথরুমে কল ছেড়ে দিয়েছে জোরে আওয়াজ হচ্ছে কলের জল পড়ার আর মনের সুখে তখন নিজেকে স্নিগ্ধ করছে, শীতল করছে।"
তাই ওই আওয়াজ তার কান অব্দি পৌঁছালো না
মনোজ এবার বাথরুমের দরজায় গিয়ে কড়া নাড়লো। তখন রেখা সাড়া দিল' কি বলছ?'
"তোমার ফোন বেজে যাচ্ছে কখন থেকে।'
রেখা জলের কল টা একটু বন্ধ করে বলল। *বাজুক গে ফোন।"
মনোজ তখন বলল 'সম্পাদক করেছেনl।'
রেখা বলল "কে করেছেন?"
মনোজ বলল "সম্পাদক মহাশয়।"
"ও আচ্ছা।"
"আমি বাথরুম থেকে বেরিয়ে ফোন করে নেব।'
"ঠিক আছে তাই হবে "
রেখা একটু পরে বাথরুম থেকে বের হল। তারপর বলল "আর ফোন বেজে ছিল গো?"
"আর একবার বেজে ছিল।'
"ফোনটা দাও তো আমি একবার ফোন করে নিই"।
মনোজ টেবিলের কাছ থেকে ফোনটা দিলো।
রেখার চুলে তখনো ভেজা টাওয়াল জড়ানো। সদ্য স্নান করে ওঠা রেখাকে কি অপূর্ব ,স্নিগ্ধ লাগছে। দু-এক ফোঁটা করে জল কপাল চুইয়ে গাল এসে পড়ছে। রেখা আপন মনে কথা বলে যাচ্ছে আর মনোজ মুগ্ধ হয়ে দেখছে। মনোজ নিজেকে আর সংযত রাখতে পারল না।
মনোজ পিছন থেকে গিয়ে রেখাকে আলিঙ্গনে আবদ্ধ করল । কথা বলতে বলতে হঠাৎ থেমে গিয়ে মনোজের দিকে তাকিয়ে রইল আর ইশারায় বোঝালো ব্যাপারটা কি?"
মনোজ রেখার কপালে হালকা উষ্ণ টীকা এঁকে দিল।
মনোজকে ইশারায় রেখা বলল" কথা বলতে দাও।
আবার সেই পুরোনো রোগ চারা দিয়ে উঠেছে না?"
মনোজ বলল
অনেকদিনের রক্ত থেকেই যায় সহজে ছাড়তে চায় না ।'
হেসে বলল "কিন্তু আমি তো এখন কথা বলছি বল?"
কথা বলতে তোমাকে কে বারণ করেছে?'
রেখা জানে মনোজের পাগলামির হাত থেকে সহজে নিস্তার নেই বরং এ দিকে ফোকাস না রেখে ফোনে মনা সংযোগ করাই ভালো।"
ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে বললেন " কি ব্যাপার ম্যাডাম চুপ করে আছেন?
রেখা বললেন "না ,না চুপ কোথায় বলুন না?'
এতগুলো কথা বললাম 'আপনি শুধু হ্যাঁ , নাতে
ছেড়ে দিলেন।"
"হ্যাঁ বলুন।'
বলছি এদুদিন তো লেখা পাঠান নি কেন?"
রেখা বলল "আসলে একটু ব্যস্ত ছিলাম, প্রচুর চাপ ছিল।"
"না ম্যাডাম ,আপনার কাছ থেকে এরকম প্রত্যাশা করি নি।"
"আপনার ভেতরে যে শিল্প সত্তা আছে সেটাকে বাঁচিয়ে রাখুন।
স্বপ্নকে সওয়ারি করেই গন্তব্যে পৌঁছান।"
"হ্যাঁ ,দাদা লিখব।
আপনি প্রতিমুহূর্তে আমাকে যেভাবে এনকারেজ করেন সত্যিই আমি খুবই খুশি।'
"আপনি শুধু সাদা ক্যানভাসে শুধু শব্দ আর শব্দের খেলাঘর বানান।"
"হ্যাঁ ,দাদা আমি চেষ্টা করব।"
"আমি জানি আপনি যখন কথা দিয়েছেন ,আপনি তা করবেন এটুকু বিশ্বাস আমাদের আছে আপনার ওপর ।আর সব থেকে বড় কথা পাঠকরা আপনাকে চাইছে ।পাঠকদের মতামতকে অবশ্যই আপনি গুরুত্ব দেবেন।"
রেখা বলল "পাঠকরা আমার সম্পদ ,লেখার অনুপ্রেরণা ।তাদের কথা তো আমাকে মাথায় রাখতেই হবে দাদা।"
"হ্যাঁ, চাহিদা যেমন রয়েছে তেমনি যোগান ও ঠিকঠাক তো দিতে হবে নাকি?"
"হ্যাঁ ,সে তো ঠিক কথাই।"
" তখন অনেকবার ফোন করেছিলাম ধরেন নি কেন ?"
"ওই যে বললাম না একটু খাতার চাপ ছিল। খাতা জমা দিতে গেছিলাম ।বাইকে ছিলাম তো তাই।'
' ও, আচ্ছা আচ্ছা বুঝলাম।"
"এরকম কিছু একটা ব্যাপার ঘটেছে আন্দাজ করতে পারি নি ।"
"ঠিক আছে ,এখন রাখছি তাহলে ।
আচ্ছা আরেকটা কথা আপনি যেমন উপন্যাস লিখছেন লিখুন। তার সঙ্গে সঙ্গে রবীন্দ্র জন্ম জয়ন্তীতে কবিতা, গল্পগুলোও লিখুন ,আর সেটা কিন্তু সম্পন্ন করতে হবে ।এটা মাথায় রাখবেন।'
রেখা হেসে বলল
"ওকে ,দাদা।"
"ঠিক আছে রাখছি শুভ সন্ধ্যা।"
ফোনটা রাখতে রাখতে রেখা বলল" তুমি কি করছো বল তো ,?এটা কি এই সময় আদর সোহাগ করার সময় বলো।"
"তুমি রাগ করলে সরি।"
"তা নয়। কথা বলছি বলো, এই সময়….।"
"ঠিক আছে নাও ,তোমাকে ছেড়ে দিলাম।"
শুধু শুধু রাগ করছ কিন্তু তুমি । একটু বোঝার চেষ্টা করো।"
"হ্যাঁ ,তুমি ঠিকই বলেছ আমারই ভুল হয়েছে ।এর জন্য এক্সট্রিমলি সরি।"
রেখা আর ঘাটালো না। রেখা জানে লেবু বেশি রগলালে তেতো হয়ে যায়।"
"আমি ওপরে গেলাম গোপালকে ভোগ চাপাতে তুমি কি চা বানাবে?"
মনোজ কোনো কথায় সাড়া দিলো না, আপন মনে রিমোট দিয়ে টিভি চ্যানেল ঘুরাতে লাগলো।
রেখা উত্তর না পেয়ে গেল সন্ধ্যা বাতি জ্বালে গোপালকে ভোগ চাপাতে।
এরমধ্যে রেখা আওয়াজ পেল নিচে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লেগে গেছে। রেখা তাড়াতাড়ি শাকিব ফুল দিয়ে কাঁসার ঘণ্টা বাজিয়ে নিচে আসলো।
এসে দেখছে পাইলট এসেছে আর দুটো সেটা সহ্য করতে না পেরে টয়লেটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দাঁত-মুখ খিচিয়ে। আর মনোজ সেটাকে এনজয় করছে ।
রেখা সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বললো চেঁচিয়ে "তুতু এরকম দুষ্টুমি ক'রো না। রেখার কথা শুনে
তত আরো বেশি হিংস্র হয়ে উঠল। রেখা পাইলটকে গিয়ে আদর করলো কিন্তু সেটা কিছুতেই সহ্য করতে পারছে না। তখন পাইলটকে রেখা বললো "পাইলট ,চলো তুমি বাইরে চলো।"
তুতু তো। তেড়ে তেড়ে আসছে। অবশেষে রেখা তুতুকে আটকালো।
অবশেষে রেখা মনোজকে বলল" যাও না , পাইলটকে গেটের বাইরে বের করে দিয়ে আসো।"
রেখা কথাটা বলার পরই মনে মনে খুব পাইলটের জন্য কষ্ট হল ।এমন করুণ দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল বেচারা, কিন্তু কিছু করারও নেই।"
এ এক ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা।
রেখা তখনো খেয়াল করল তুতুর তখনও মাথা গরম। লেখা খুব ভালো করে তোর মাথায় সারা গায়ে হাত বোলাতে লাগলো ।অবশেষে শান্ত হলো। রেখা মনে মনে ভাবল এদের মধ্যেও কি টানাপোড়েন চলে। কে জানে?"