উপন্যাস
টানাপোড়েন ৮৩
আবেগ স্নাত সকাল
মমতা রায় চৌধুরী
রেখা একটু মনের জোর পাচ্ছে মিলিকে নিয়ে। আজকে মিলি আন্টি র্্যাব ভ্যাকসিনজ কমপ্লিট হল।
আগামীকাল অনিন্দিতার বিয়ে মনে মনে ভাবছে রেখা 'যাবে কি ?যাবে না? অনিন্দিতা মুখ ফুটে কিছুই বলল না । যাওয়া উচিত কিনা? স্কুল তরফে নেমন্তন্ন হয়েছে। তবুও এতটা ক্লোজ ছিল ..।
নাকি ব্যস্ত থাকার জন্য করতে পারে নি। কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না ।নাকি মনোজের করোনা হওয়ার জন্য করে নি। এতগুলো প্রশ্ন ভিড় করছে।
রিম্পাদিকে একটা ফোন করবে? 'রিম্পাদিকে একটা ফোন করেই ফেলি। রিম্পাদিকে ডায়াল করলো নম্বর। রিং হল। রিংটোন বেজে উঠল'তুমি নির্মল কর, মঙ্গল করে,মলিন মর্ম মুছায়ে..।'
রিং হয়ে কেটে গেল। রেখা মনে মনে ভাবল' কিন্তু গানটা এত সুন্দর সকাল বেলায় মনটা ভাল হয়ে গেল। আবার 'ডায়াল করল'তুমি নির্মল কর, মঙ্গল করে মলিন মর্ম মুছায়ে..'।
রিম্পাদি ফোন ধরে বলল ' হ্যালো'।
রেখা বলল'হাঁপাচ্ছ কেন?'
রিম্পাদি বলল ' আর বলিস না ফোনটার রিং শুনতে পেলাম ।মেয়েটাকে বললাম ফোনটা ধরতে তার তো নড়তে-চড়তে ১৮মাসে বছর । ফোন কেটে গেল।'
রেখা বলল 'ওই জন্য তুমি ছুটছিলে নাকি?'
রিম্পাদি বলল 'তাছাড়া আবার কি?'
রেখা বলল' কালকে যাচ্ছ অনিন্দিতার বিয়েতে?'
রিম্পাদি বলল 'হ্যাঁ তুইও তো যাচ্ছিস।'
রেখা বলল 'ডিসিশন নিতে পারছি না গো।'
রিম্পাদি বলল 'কেন মনোজের শরীরটা কি আবার খারাপ করেছে ?নাকি বাচ্চাগুলো বা মিলির জন্য যেতে চাইছিস না?'
রেখা বলল 'না ,ও ঠিক আছে। তবে বাচ্চাগুলো আর মিলির জন্য তো একটু অসুবিধা আছেই । তাছাড়া আর একটা অন্য কারণও আছে।'
রিম্পাদি বলল'কি বলো তো?'
রেখা বলল 'অনিন্দিতা একবারও বললো না।'
রিম্পাদি বলল 'ও তুই সেই ধরে বসে আছিস। সবাইকে কি ও বলেছে, বল তো?
রেখা বলল 'সেটাই তো ভাবছি?'
ওদিক থেকে টুস্কাই এর গলা শোনা গেল মা ,মা.আ.আ...
রেখা বলল' দেখো সবার অবস্থা তো এক নয়। আমি তো ভয় পাচ্ছি....।
রিম্পাদি বলল' ও বুঝেছি সেই এক কথা।'
রেখা বলল 'সেই জন্য তো ডিসিশান নিতে পারছি না।'
আবার টুস্কাই এর গলা শোনা গেল মা মা.আ.আ.
রিম্পাদি একটি বিরক্তির স্বরে বলল' ওই দেখ কেমন ডাকছে দেখ। কি হলো?'
টুস্কাই বলল 'বাপি ডাকছে ।'
রিম্পাদি বলল' কেন?'
রেখা বললো 'ঠিক আছে। তুমি যাও। দেখো দাদা কিছু চাইছে বোধহয়?'
রিম্পাদি বলল 'শোন আমি বলছি তোকে কিন্তু যেতেই হবে কাল ।তোর সাথে এই স্কুলে থাকাকালীন আমার এই লাস্ট বিয়েতে যাওয়া।ok'
রেখা বলল 'ঠিক আছে দেখছি।'
রিম্পাদি বলল' ঠিক আছে ।টা টা কালকে দেখা হবে।'
ফোনটা ছেড়ে রেখা ভাবছে কালকে গিয়ে দেখি কি হয়।
রেখা ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলার পর এবার মনোজের ঘরের দিকে গেল ।গিয়ে দেখে মনোজ তখনও শুয়ে আছে। রেখা গোলাপি সার্টিনের পর্দাটা সরিয়ে দিয়ে জানালাটা খুলে দিল। সূর্যের আলো এসে পড়ল ঠিক বিছানার উপর। রেখা খাটের পাশে বসে মনোজের মাথায় ,কপালে হাত বুলাতে বুলাতে ভাবছে 'শরীর খারাপ করেছে ?তা দেখার জন্য কপালটা থেকে তাপ নেবার চেষ্টা করল।দেখল না ঠিকই আছে। তারপর মনোজকে আস্তে আস্তে ডাকলো 'কি হলো, উঠবে না?'
মনোজ এক ঝটকায় রেখাকে বুকের কাছে এনে বলল 'না উঠবো না।'
রেখা বলল' একি করছো?'
মনোজ বলল' কি আবার করলাম। নিজের বৌটাকে একটু আদর করছি।'
রেখা বলল 'এই জন্য তুমি ঘাপটি মেরে শুয়ে ছিলে না ?'জানতে এখন আমি তোমার ঘরে ঢুকবো?
মনোজ বলল' হ্যাঁ বাবু সেই জন্যেই।'
রেখা বলল' ঠিক আছে। এবার তো ওঠো। কফি, না চা খাবে?'
মনোজ বলল' চা খাব।'
রেখা বললো 'ঠিকআছে ।উঠে পড়ো ।আমি চা নিয়ে আসছি।'
রেখা চা করতে যাচ্ছে মনোজের বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে ।মনোজ আবার রেখাকে হাত ধরে নিজের বুকের কাছে আনলো। রেখা মনোজের দিকে তাকিয়ে বলল ' কি? কি হলো?'
মনোজ শুধু হেসে বলল 'কিছু না তোমাকে দেখছি।'
রেখা বলল 'বাহ রে আমাকে দেখ নি?'
মনোজ বলল 'শীতের শিশিরস্নাত সকালবেলায় তোমার এই মিষ্টি মুখটা দেখার অপেক্ষায় ছিলাম ,থাকবো ।'
মনোজ রেখার চুলে হাত বুলাতে বুলাতে বলল'
'চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য..
পাখির নীড়ের মত চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।'
রেখা বলল'
'সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন
সন্ধ্যা আসে ডানার; রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;
পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পান্ডুলিপি করে আয়োজন
তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল
সব পাখি ঘরে আসে-সব নদী-ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন;
থাকে শুধু অন্ধকার মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।'
মনোজ উঠে বসে রেখাকে জড়িয়ে ধরে বলে -'সেই তুমি আমার বনলতা সেন।'
রেখা বলল 'নাও কাব্য ছাড়ো। ভালোই এখন কাব্য করতে শিখে গেছ ,হ্যাঁ।'
মনোজ বললো 'দেখো এই আমাদের যান্ত্রিক জীবনে এই টুকুই তো প্রশান্তির কথা বলো?এই যে দেনাপাওনা লেনদেন সবশেষে একমাত্র প্রেম ই বাঁচিয়ে রাখতে পারে। আমাদের নতুন জীবনবোধ তৈরি করতে পারে।'
মনোজ বলল' আর একটা কবিতা বলো না রেখা, শুনি। তোমার কন্ঠে ওই কবিতাটি শুনতে খুব ভাল লাগে।
রেখা বললো 'কোনটা?'
মনোজ বলল 'ভুলে গেলে কতবার শুনিয়েছ আমাকে ওই কবিতাটা কবি জীবনানন্দ দাশের..
রেখা বলল 'অন্ধকার' কবিতা।
মনোজ বলল 'এগজ্যাক্টলি।'
রেখা বলল'
ধানসিড়ি নদীর কিনারে আমি শুয়েছিলাম -পউষের রাতে -
কোনদিন জাগবো না আমি-কোনদিন জাগবো না আর-
মনোজ বলল ,'কী অপূর্ব কন্ঠ তোমার? কি সুন্দর বললে।'
রেখা বলল 'তুমি সবসময় এই কবিতাগুলো কেন শুনতে চাও।'
মনোজ বলল কবি জীবনানন্দ দাশ রাত্রির অন্ধকারের মধ্যে আশ্রয় চাইতেন ।ভোরের আলোর অস্তিত্বের প্রতি তার কোন টান ছিল না।
রেখা বলল ' সংঘর্ষ ভরা এই পৃথিবীতে সংকট মুক্তির পথ হিসেবে তিনি পরাবাস্তবতার জগতকে বেছে নিতে চেয়েছিলেন।
মনোজ বলল 'জানো আমারও মাঝে মাঝে এই কথাই মনে হয়।'
রেখা বলল 'ছাড়ো কাব্য । আমি এবার চা টা ঝটপট নিয়ে আসছি।চা খেয়ে ,উঠে পড়ো।'
রেখা রান্নাঘরের দিকে গেল ঠিক সেই মুহূর্তে ফোন বাজতে শুরু করলো'কাটছে দিন ,সৃষ্টিহীন, বৃষ্টি আসে না। গান হারা ভাবনারা স্বপ্নে ভাসে না...।'
রেখা বলল 'কার ফোন বাজছে গো?'
মনোজ বলল 'আমার ফোন।'
রেখা জিজ্ঞাসু কন্ঠে বলল 'বাব্বা কি ব্যাপার,
আজকাল এরকম রিংটোন লাগাচ্ছ?'
মানুষ শুধু বলে ইচ্ছে হয় ভাবনা গুলো ভাসিয়ে দিও এই ভেলায়। তারপর হাসতে হাসতেমনোজ ফোনটা রিসিভ করে বলল 'হ্যালো'।
পার্থ ফোন ধরে বলল' আমি পার্থ বলছি।'
মনোজ বলল 'বল'।
পার্থ বলল' বৌদিকে একটু মায়ের কাছে পাঠিয়ে দিও তো?'
মনোজ বলল কখন?
পার্থ বলল 'বৌদির সময় করে আসতে ব'লো।
মনোজ বলল 'ঠিক আছে।',।
এর মধ্যে রেখা চা নিয়ে এসে বলল' কার ফোন গো?'
মনোজ বললো' পার্থর ফোন ।তোমাকে একবার যেতে বলল ওদের বাড়িতে।'
রেখা বলল 'কেন?'
মনোজ বলল'' সেটা আমাকে বলেছে থোড়ি।'
রেখা বলল' কখন যেতে বলেছে?'
মনোজ বলল' তোমার সময় মতো'।
রেখা হাসতে লাগলো হো হো হো করে।
মনোজ বলল 'হাসলে কেন?'
রেখা বলল 'পরে বলব।'
মনোজ বলল 'ওই দেখো তোমার ছানাপোনা চেঁচাচ্ছে।'
রেখা বলল 'লিলির গলাটা শুধু শোনো। এখন ওর কাছে না যাবে ততক্ষণ চেঁচিয়ে যাবে।
'মনোজ বলল 'তাহলে তো আর তোমার কবিতা শোনা হলো না?'
রেখা বললো যাবার আগে তাহলে কবির ভাষায় বলি-
'একদা এমনই বাদলশেষের রাতে-
মনে হয় যেন শত জনমের আগে-
সে এসে সহসা হাত রেখেছিল হাতে,
চেয়েছিল মুখে সহজিয়া অনুরাগে'।(সুধীন্দ্রনাথ দত্তের শাশ্বতী)।
মনোজ বলল' দারুন দারুন।'
মনোজ আরো বললো জানো তো রেখা আমি আজীবন প্রতীক্ষা করব শুধু তোমার জন্যই ।যতই প্রতিবন্ধকতা আসুক তবু তোমার আসার পথ চেয়ে প্রলয়ের পথ অকাতরে ছেড়ে দিতে পারব।'
রেখা বলল শাশ্বতী কবিতাটি তো এক গভীর ভালোবাসার কবিতা।
মনোজ বলল বৃষ্টিস্নাত এক রাতে যদি এইরকম কবিতা আর তোমার নিবিড় সান্নিধ্য থাকে তাহলে সব কিছুকেই আমি জয় করতে পারি।
'