উপন্যাস
টানাপোড়েন১৫২
সাধ জাগে বারবার দেখি
মমতা রায় চৌধুরী
যতবার রেখা দেশের বাড়িতে আসে, আসার সময় থাকে একরাশ উল্লাস ,আনন্দএর অভিব্যক্তি। ঠিক যেমন করে বেলা শেষে পক্ষীরা বাসায় ফিরে তাদের এক বিশেষ তাগিদে একরাশ আনন্দ অভিব্যক্তি নিয়ে রেখারও ঠিক সেরকম। কিন্তু যাবার সময় হলেই বিষন্নতায় মনটা ভরে ওঠে। মনের কোনে যেন অন্ধকার ঘনিয়ে আসে আর ঠিক অন্ধকার ঘনিয়ে আসার আগের মুহূর্ত বিকেলের ম্লান আলো । যেমন গঙ্গাসাগরে ডুবে যাওয়া মৃত মনিয়া পাখির মতো। গ্রামের মানুষের জন্য তো বটেই গাছপালা ,ধুলো ,মাটি , পশুপাখি কিছুই বাদ যায় না। সবকিছুকেই যেন মনে হয় আর একবার স্পর্শ করে দেখতে। প্রতিবার ফিরে আসার সময় শৈশব, কৈশোরের স্মৃতিগুলো মোচড় দিয়ে ওঠে।ঘোষেদের সেই বাঁধানো পুকুর ধারে কত শৈশবের স্মৃতি ,কৈশোরের স্মৃতি জড়িয়ে। দু'চোখ মেলে শুধু তাকিয়ে দেখতে থাকে। আর তাকে স্পর্শ করে দেখে ।হয়তো আগের মতো সেই মানুষজনগুলো আর কাছে নেই। তবুও বিস্তৃতির অন্তরালে সেই স্মৃতিটাকে যেন মনে হয় কতটা আপন।
কাকিমা ,কাকু, ভোলা কাকা , সতী দি সকলকে প্রণাম করে আসার সময় রেখা বলে' তোমরা সবাই ভালো থেকো।'
সবার চোখ ছলছল করে ওঠে।
এই বিদায় কালে রেখার মন যেমন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে রেখাও যেন অনুভব করে গ্রামের প্রতিটি জিনিসই যেন এক বিষন্নতায় ভারাক্রান্ত।
মনোজ বাইক স্টার্ট দেয় সেই সময় কাকিমা বলে 'বুলুদির কাজের সময় আসতে পারিস নি। একবার দেখে গেলে পারতিস?"
'না কাকিমা, যে মানুষটাই নেই সেই মানুষটাকে দেখতে গিয়ে আরও বেশি খারাপ লাগবে শুধু তার ছবি দেখে। তার থেকে ভালো স্মৃতিটুকু থাক না মনে।'
'আর বিপাশা এসেছিল? ওর বর ছাড়া পেয়েছে?' 'হ্যাঁ এসেছিল একবার। ছাড়া পেয়েছে মনে
হয়। সঠিক জানিনা রে।'
"আর ওর দিদি রুপসা?'
'রুপসা আসে নি।'
'মনোজ তাড়া দিলো রেখাকে।.'
দেরি হয়ে যাচ্ছে অন্য আরেক দিন এসে গ্রামের খবর নিও।'
রেখা তবুও কথা বলে যায় 'কাকিমা, বুলু কাকিমার শ্রাদ্ধেতে নীলুদা এসেছিল?'
'হ্যাঁ এসেছিল।'
'নীলুদা এসেছিল শুনেই বুকের ভেতরটা কেমন আনচান করে উঠলো ।কেমন দেখতে হয়েছে এখন কে জানে? আগের মত কি এখনো সেই গ্রামেতে এসে দু'চোখ হারিয়ে যায় কারুর কথা ভেবে। কে জানে?'ভাবতে ভাবতে কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে যায় রেখা।
'ছেলেটি একটু অন্যরকম হয়ে গেছে জানিস।'
মনোজ বিরক্ত হয়ে আবার তাড়া দিল।
রেখার এখনো দু'চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। এবার রেখা সত্যি সত্যি আর একবার কাকিমা কাকু, ভোলা কাকা, যারা যারা ছিল সকলকে প্রণাম করে বাইকে উঠে পড়ল।
কাকিমা 'দুগ্গা দুগ্গা দুগ্গা 'বলে দু হাত জড়ো করে প্রণাম করল।
মনোজ বাইক স্টার্ট দিল।
রেখা মনোজকে ভালো করে ধরে বসলো। যতক্ষণ না প্রিয়জনেরা চোখের আড়াল হয় ততক্ষণ পর্যন্ত তাকিয়ে দেখতে লাগলো।
মনোজকে রেখা বলল 'সামনে উঁচু চাতালটা আর তার পাশে পুকুরটা দেখতে পেলে?'
মনোজ বললো 'খেয়াল করিনি।'
'কেন?'
'ওটাই তো ঘোষেদের পুকুর কত বড়
পুকুর ।তোমার নজরে আসলো না?'
মনোজ তখন জোরে বাইক ছুটিয়েছে তাড়াতাড়ি বাড়ি পৌঁছাতে হবে।
মনোজ বলল 'তুমি আমাকে ধরে বসো, নইলে কখনো বাম্বা টাম্পার পেলে টপকাতে গিয়ে ধাক্কা লেগে তুমি পড়েও যেতে পার।'
রেখা মনোজকে ধরে বসলো আর বারবার ফিরে ফিরে গ্রামের কথাই ভাবতে লাগলো।
"মুছে যাওয়া দিনগুলি আজও মনে পড়ে…..।
মাঝে মাঝে রেখা গুন গুন করে গান গেয়ে ওঠে।
আসলে মনের ভেতরে উপচে পড়েছে গ্রামের স্মৃতি জড়ানো ভিড়। রেখার মনে হয় সকলকে চেঁচিয়ে তার গ্রামের কথা বলে কিন্তু মনোজকে বলার পরেও মনোজের কোন ইন্টারেস্ট না দেখে ভেতরে ভেতরে একটু মুষড়ে পড়ে।
ইতিমধ্যে রেখার ভাবনার ছেদ পড়ে। রেখার ফোন বেজে ওঠে।
কয়েকবার রিং হয়ে বেজে যাবার পরেও রেখা ফোন তোলে না।
মনোজ রেখাকে বলে'নিশ্চয় কোন জরুরী ফোন।
ফোনটা তোলো রেখা।
কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে মনোজ আবার বলে 'রেখা ,। অ্যাই রেখা ঘুমিয়ে পড়লে নাকি?,'
রেখার মন তখন এতটাই ভারাক্রান্ত বুক কান্নায় ভরে উঠেছে কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে।
মনোজ বাইকটা স্টার্ট বন্ধ করে এক জায়গায় দাঁড়ালো 'কি হল তুমি কথা বলছো না?"
"কেন কি বলছ?"
'তোমার ফোন বেজে যাচ্ছে ,।দেখো, কে ফোনটা করলো?'
'কে আবার করবে , নিশ্চয়ই মাসি করেছে।'
'তা হলেও দেখে নাও কেন ফোনটা করছে বারবার করে যাচ্ছে না,,?'
'দাঁড়াও দেখছি।"
'একটা আননোন নম্বর থেকে ফোন এসেছে আর একটা মাসি করেছে।'
প্রথমে মাসিকে ফোনটা করল। একবার রিং হতে না হতেই মাসে ফোনটা ধরে বলল '।
'হ্যাঁ, মাসি ফোন করেছিলে? '
হ্যাঁ বলছি এদিকে তো একটা বিপদ হয়ে গেছে বলতে চাইছিলাম না কিন্তু না বলেও পারলাম না।
কি হয়েছে?
পাইলটের পায়ে লেগেছে।
কি করে?
বাইক ধাক্কা দিয়েছে।
খুব লেগেছে?
খারাপ লাগেনি।
তুমি এক কাজ কর সামনে সঞ্জীবনী মেডিকেল হলে যাও ওখানে গিয়ে তোমার ছেলের নাম করে বলো কাজে এরকম পায়ে লেগেছে, দিয়ে ওরা ওষুধ দেবে। সেটা এ নে ওকে খাইয়ে দাও আর যদি কোন স্প্রে দেয় তাহলে সেটাও নিয়ে নিও।
ছেলে গিয়ে পয়সা মিটিয়ে দেবে।'
"আর বলছি তোমরা এসে খাবে তো?'
রুটি করে রেখে যাবো?'
মনোজ রেখাকে বলল' ও কিছুই খেতে পারবে না আজকে, এত খেয়েছে যে ,পেটটা ঢাক হয়ে আছে।'
'না মাসি তোমাকে কিছু করতে হবে না।'
'কেন তোমরা কিছু খাবে না?'
এখনো অব্দি না খাওয়ার দলেই নাম লিখলাম।
আর দ্বিতীয় ফোনটা তে রিং করাতে ফোনটা রিসিভ করেন এক ভদ্র মহিলা। বলেন "হ্যালো',।
কে বলছেন?
'আমি রিম্পা দি বলছি।'
'কেমন আছো?'
'এই চলছে ।নানান রকম আছি।"
'তোকে একটা খবর দেবার ছিল।
কি?"
আমাদের এখানে একটা পত্রিকা' আশাতে'তোর লেখা সমসাময়িক বিষয় নিয়ে কবিতা হিট হয়েছে।'
'ওরা একটা সংবর্ধনা দিতে চায় তোকে?'
রেখা, খবরটা শোনার পর কি করবে কিছুই ভেবে উঠতে পারছে না ।'
কবে.?
'আগামীকাল দুপুর ১.৩০'
'এই কবিতাটা তো আমি পাঠাইনি।
কিন্তু আমি পাঠিয়ে দিয়েছি, রাগ করিস নি তো?'
আগামীকাল?
রিম্পাদি বলল কেন অসুবিধা আছে?
ঠিক আছে।
তোকে হয়তো ওরা ফোন করবে।
তুই এখন কোথায়?
আমি একটু দেশের বাড়িতে ছিলাম ফিরছি।
'ও আচ্ছা আচ্ছা সাবধানে।'
রেখা বলল 'সামনে ওই জঙ্গলটার কাছে দেখো ফুল ফুটে আছে।'
'এখন তুমি ফুলের কাছে যাবে নাকি?'
'একটু যাই না। কটা ফটো তুলব?'
মনোজ বিরক্ত হয়ে বলে 'তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে হবে সেদিকে তোমার হুশ নেই।'
'কত ঘেটু ফুল।'
রেখা বলল "কয়েকটা ফটো তোলো।"
মনোজ দেখলো না রেখার এই খামখেয়ালিপনা
অসহ্য মনে হলেও মেনে নিতে হবে।
'না হলে আরো দেরী হয়ে যাবে।'
মনোজ বেশ কয়েকটা ফটো তুলল আর বলল তোমার যে কি রুচি ,দুনিয়ায় এত ফুল থাকতে। তুমি জঙ্গলের কাছে ছবি তুললে?'
রেখা খুবই বেদনাহত হল মনোজের কথাগুলো শুনে।
আর বলল'পৃথিবীর সকলের থেকে আলাদা আমি ।নিজেই বুনো তাই বুনো জিনিসের মধ্যে থেকেই তার ঘ্রান নিতে শিখেছি। তোমাদের মত শহুরে সভ্যতার কৃত্রিমমতায় নিজেকে আগাগোড়া জড়িয়ে নিতে পারি নি।'
'আমি তোমাকে ওভাবে বলতে চাইনি।'
রেখা বলে' আমি কিছু মনে করিনি তবে আমার মনের কথাগুলো তোমাকে বলতে চাইলাম। বোঝাতে চাইলাম ।তুমি চেষ্টা করো প্রকৃতির থেকে কিছু নিতে।'
মনোজ বলে' ঠিক আছে এবার হয়েছে তো? না ও ওঠো।'
রেখা বলল "হ্যাঁ চলো।"
রেখা মনে মনে গানের মধ্যে দিয়ে বিদায় জানালো তার গ্রামকে 'একবার সাধ জাগে তোমায় দেখি ,স্মৃতির জানলা খুলে….।'