২৬ এপ্রিল ২০২২

শামীমা আহমেদ এর ধারাবাহিক পর্ব একশত তম সম্পন্ন হয়ে শেষ হল।





(কবি ও লেখক শামীমা আহমেদ এর ধারাবাহিক পর্ব একশত তম সম্পন্ন হয়ে শেষ হল।  লেখিকাকে সম্মান জানাই স্বপ্নসিঁড়ি সাহিত্য পত্রিকার পক্ষ থেকে । আপনার আগামীদিন কুশল কামনা করি । অজস্ৰ পাঠক আপনার লেখার অনুগ্রাহী হয়ে উঠুক । 
আবারও স্বপ্নসিঁড়ি পত্রিকা আপনার লেখার আশায় রইলো । 
ভালোবাসাসহ সম্পাদক দেবব্রত সরকার ।)




শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত 
( শেষ পর্ব ) 

শামীমা আহমেদ 




শায়লাকে তার বাইকে নিয়ে শিহাব  ঝিগাতলার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলেও কিছুদূর গিয়ে সে তার সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আনলো। সে একটু নিজের বাসায় যাওয়ার প্রয়োজন অনুভব করলো। বাইকের পেছনে বসা শায়লার কাছে শিহাব আজ এক নতুন পৃথিবী হয়ে ধরা দিলো। শায়লা তার মনের ভাবনায় রঙিন স্বপ্নে বিভোর হয়ে রইল। সে বারবার শিহাবের পিঠের উপর আলতো করে নিজেকে ছুঁয়ে দিচ্ছিল আর ডান হাত দিয়ে বেশ শক্ত করে শিহাবকে জড়িয়ে ধরে তার সাথে বেঁধে রাখলো। শায়লার মনে হলো, যেন সে আকাশে সাদা মেঘের মত হালকা হয়ে উড়ছে। শিহাব উত্তরা থেকে  বেরুনোর আগেই সিদ্ধান্ত পালটে নিয়ে বাইক ঘুরিয়ে তার বাসার দিকে এগুলো। শায়লা অবাক হলো! শিহাবের মাথায় হেলমেট থাকায় কথা বলাও সম্ভব হচ্ছিল না। শায়লা শিহাবের কথা বলার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো।বাইক শিহাবের বাসার গেটে থামতেই শায়লা বুঝতে পারলো শিহাব হয়তো কোন বিশেষ  প্রয়োজনে বাসায় এসেছে। শিহাব উচ্চরবে হর্ণ দিতেই কেয়ারটেকার বিল্লাল মেইন গেট খুলে দিলো। বিল্লাল বেশ অবাক দৃষ্টিতেই তাকিয়ে রইল। এই ভর দুপুরে তার স্যার কোথা থেকে এলো, গত রাতে যেভাবে বেরিয়ে গিয়েছিল ! সেতো ভেবেছিল কোন খারাপ খবর কিন্তু এখন দেখছে পিছনে লাল শাড়িতে একজন মহিলা আবার স্যার চকচকা নতুন পাঞ্জাবি পরা। নিশ্চয়ই কোন ঘটনা ঘটেছে।সে শিহাবের কাছ থেকে কথা শোনার জন্য উন্মুখ হয়ে রইল। শিহাব বাইকের স্টার্ট থামাতেই শায়লা নেমে তার পাশে দাঁড়ালো। শিহাব বিল্লালের চোখ দেখে বেশ বুঝতে পারছে তার মনের ভেতর অনেক জিজ্ঞাসা। সে তার কৌতুহল নিবৃত্ত করতে স্পষ্ট করে  জানালো,বিল্লাল, এ হচ্ছে তোমার ম্যাডাম, মানে আমার বিয়ে করা বউ। গতকাল আমাদের বিয়ে হয়েছে। বিল্লাল হয়তো রিশতিনার সাথে মিলাতে চাইছে কিন্তু তার খটকা লাগছে। তার কাছে এবার বিষয়টি পরিষ্কার হলো। তাহলে এই ম্যাডামের  জন্যই বিদেশী ম্যাডামকে স্যার ফিরায়া দিছে। বিল্লাল দুয়ে দুয়ে চার মিলে যাওয়াতে এবার শান্ত হলো। সে শায়লাকে সালাম দিয়ে তার হাতে শিহাবের ফ্ল্যাটের চাবি দিয়ে বললো,তাইলে এখন থাইকা এই চাবি আপনার কাছেই থাকবো নয়া ম্যাডাম।শায়লাকে সে লিফটের দিকে এগিয়ে নিলো। শিহাবও এগিয়ে গেলো। বিল্লাল আশ্চর্যান্বিত হয়ে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। ওরা দুজনে লিফটে উঠে, শিহাব বাটন চার'এ প্রেস করলো।দুজনে খুব কাছাকাছি এসে দাঁড়ালো। শিহাব শায়লাকে হাতের বাঁধনে জড়িয়ে নিলো।লিফটের ভেতরের আয়নায় দুজন দুজনকে দেখছিল। শায়লা শিহাবের কাঁধে মাথা রাখলো।  শিহাবের মুখে হাসির ঝিলিক ভেসে উঠলো!  সে শায়লাকে মৃদু টানে আরো শক্ত করে বেঁধে নিলো। এবার দুজনে হাতের বাঁধনে দুজনকে স্পর্শ করে নিলো। কিছুটা ক্ষণের এই স্পর্শ  যেন আরো গভীরের বন্ধনে বেঁধে নিলো। কত পাওয়া না পাওয়ার দ্বিধা দ্বন্দ্বের  আজ অবসান হলো।দুজনে দুজনকে নিবিড় ভাবে জড়িয়ে নিলো। চার তলায় লিফট থামতেই দুজন বেরিয়ে  এলো। শিহাব শায়লাকে ইশারায়  তার  নিজের হাতে ঘরের চাবি দিয়ে শিহাবের ফ্ল্যাটের দরজার তালা খোলার জন্য বুঝালো। শায়লা ভেতরে এক  অভাবনীয়  আনন্দে শিহাবের বুকে মুখ লুকালো। শিহাব শায়লার  মুখ তুলে চোখের ভাষায়  এই ঘরের অধিকার বুঝিয়ে দিলো। শায়লা চাবি  দিয়ে লক খুলতে লাগলো। শিহাব বিষয়টি খুব আনন্দ নিয়ে দেখছিল।শায়লা আজ তার নিজের হাতে ফ্ল্যাটের তালা খুলছে! শিহাবের কাছে তা যেন এক অনন্য প্রাপ্তি। কোনদিন এই ব্যাপারটি  আসলেই সত্য হবে শিহাব তা কল্পনাও  করতে পারেনি, তা শুধু স্বপ্নই দেখেছে। শায়লা দরজা খুলে শিহাবকে ভেতরে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানাতেই শিহাব  মুখে হাসি ছড়িয়ে নিজের ঘরে প্রবেশ করলো। অনেক দিনের চেনা ঘরে আজ তার অন্যরূপে প্রবেশ ! আজ আর  ঘরে সে  একাকী  নয়।আজ সাথে শায়লা আছে। আর সে  আজীবনের জন্য থাকবে। শিহাব ঘরে ঢুকতেই শায়লা দরজা লাগিয়ে ফিরলো। শিহাব ড্রইংরুম পেরিয়ে বেড রুমে ঢুকে শায়লাকে ভেতরে ডাকলো। শায়লা শিহাবের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো, শিহাব শায়লার দিকে তাকিয়ে বললো, শায়লা তুমি জানোনা গতকাল সন্ধ্যা থেকে রাত অব্দি কি এক অনিশ্চয়তার মধ্যে কেটেছে। সব শেষে  তোমাকে পাওয়া আমার জীবনের সব দুঃখকে ভুলিয়ে দিয়েছে। আমি তোমাকে পেয়ে ভীষণ সুখী হতে চাই,ভীষণ। আমাদের বাকি জীবনে থাকবে শুধু হাসি আনন্দের ছড়াছড়ি। আমাদের মাঝে থাকবে না কোন দুঃখবোধ আর ভুল বুঝাবুঝি। শায়লা শিহাবকে আশ্বস্ত করলো,তুমি নিশ্চিন্ত থাকো শিহাব, আমি তোমার বাকী জীবন সুখ আর ভালোবাসার রঙে রাঙিয়ে দিবো। শিহাব শায়লাকে কাছে টেনে নিতেই শায়লা বলে উঠলো, তবে আরেকটা খুবই জরুরি কথা ভুলে গেলে চলবে না শিহাব। শিহাবের চোখে জিজ্ঞাস্য ভেসে উঠলো! জরুরি  কি কথা ? আমার কোন ভুল হলো ? শায়লা এবার শিহাবের দিকে রাগত চোখে তাকালো।
কেন ? আরাফের কথা। আরাফকে আমাদের কাছে নিয়ে আসতে হবে। সে কথা ভুলে গেলে ? 
শিহাব একেবারে থমকে গেলো। আরাফের প্রতি বরাবরই শায়লার এমন মায়াভরা ভালোবাসা শিহাবকে অনেকটাই নিশ্চিন্ত করে। শায়লা আবার বলে উঠলো, জানো শিহাব, আরাফকে আমার ভীষণ কাছে পেতে ইচ্ছে করে।কেমন মায়াকাড়া মুখটা ! আরাফের কথায় শিহাবের ভেতরে চঞ্চলতা খেলে গেলো। সে শায়লাকে বললো, আরে নাহ,তা ভুলবো কেন ? তাহলে চলো,আজই আরাফকে নিয়ে আসি। শায়লা মাথা ঝুঁকিয়ে তাতে সায় দিলো। কিন্তু আরাফের জন্য কিছু কেনাকাটা করতে হবে। আরাফের জন্য আমি নিজে হাতে ঘর সাজাবো। শায়লার কথায় শিহাবের ভেতরে শায়লার প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ অনুভুত হলো।
তবে এখন একটা আব্দার আছে !  
শায়লা চমকে উঠলো !  এখন আবার কি আবদার ? শিহাবের চোখের দৃষ্টিতে দুষ্টুমির আভাস। এবার শায়লা নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চাইছে। শিহাব তাকে বেশ শক্ত করে ধরে বললো,আরে, অন্য কি ভাবছো তুমি! এখন ওসব কিছু চাই না, সেটা আজ রাতের জন্য তোলা থাকবে। আমার নিজের ঘরে তোমার আমার প্রথম বাসর, সেটা কি এমন বর্ণহীন হবে। সেটার জন্য অন্যরকম প্রস্তুতি নিতে হবে। এখন আপাতত আমি তোমার হাতের ছোঁয়ায় এক কাপ চায়ের স্বাদ নিতে চাইছি। আর বাকীটা তোলা থাকবে রাতের জন্য।
উহ ! এই কথা ! শায়লা যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো। তক্ষুনি তার মনের অর্ধেক অংশ রান্নাঘরের দিকে ছুটে গেলো। মেয়েরা বোধহয় এমনি হয়।স্বামীর কোন চাওয়া পুরণ করতে এক নিমেষে জাদু করে তা হাজির করতে চায়।
শায়লা রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেলো। দরজায় কলিংবেল বেজে উঠলো।  শিহাব উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলো।
দরজায় কেয়ারটেকার দারোয়ান দাঁড়িয়ে হাতে একটা পোস্টাল প্যাকেট। শিহাবকে দেখিয়ে বললো, স্যার এইমাত্র এইটা আসলো।আপনি বাসায় আছেন তাই নিয়া আসলাম। শিহাব প্যাকেটটি গ্রহন করলেও  বিল্লালের কাচুমাচু মুখে দাঁড়িয়ে থাকায় শিহাব  তার হাতে একটা একশত টাকার নোট  দিলো। কিছু কিনে খেয়ো, বলতেই বিল্লালের মুখে বিশাল এক হাসি খেলে গেলো ! তবে শিহাব বেশ চিন্তিত মুখে প্যাকেটটি হাতে নিয়ে উলটে পালটে দেখতে লাগলো। দ্রুতই তা খুলে ফেললো। ভেতরের  কাগজ খুলতেই শিহাব ভীষণ চমকে উঠলো !  
রিশতিনা শিহাবকে ডিভোর্স লেটার পাঠিয়েছে।এবং লিখেছে খুবই আরজেন্ট ! তবে কি গতরাতে রোমেলের কলের কথাগুলো সত্য ছিলো।রিশতিনা ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে তারপর সুইসাইড  করেছে ? যদিও শিহাবও এমনটিই ভাবছিলো। কাল পরশুর মধ্যেই রিশতিনাকে ডিভোর্স দেয়ার প্রসেস শুরু করবে। ভালোই  হলো রিশতিনাই  তা করে দিলো। হঠাৎই  প্যাকেট টি থেকে একটা পোস্টাল কার্ড বেরিয়ে এলো। শিহাব দেখলো সেখানে টেমস নদীও নদী তীরের সুন্দর প্রকৃতির দৃশ্য।  শিহাব  অপরদিকে তা উল্টাতেই রিশতিনার বাংলা হাতের লেখায় কিছু লেখা দেখতে পেলো। শিহাব ড্রইং রুমের সোফায়  বসলো। কার্ডটি হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করলো, কার্ডটিতে আজ থেকে পাঁচদিন আগের তারিখ দেয়া। তবে কি শায়লা এখনো দেশে ? এখানে থেকে ডিভোর্স প্রক্রিয়া চালাচ্ছে ! সম্ভবত রোমেল তাকে সব্রকম সহায়তা করছে। শিহাব কার্ডটি পড়তে লাগলো, শিহাব,তোমাদের নতুন জীবনের জন্য অভিনন্দন জানাই।তুমি তোমার মনের মত কাউকে খুঁজে পেয়ে তাকে জীবন সঙ্গী করতে যাচ্ছো এতে আমি যত কষ্টই পাইনা কেনো তবুও আমি আনন্দিত। তোমাকে আমি সুখী করতে পারিনি কিন্তু অন্য কারো মাঝে তুমি সুখ খুঁজে পেয়েছো, এটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া। শুধু অনুরোধ আমার সন্তান, আমার রিয়াজকে তোমরা বাবামায়ের পূর্ণ স্নেহ দিয়ে বড় করবে। আমি দূর থেকে এতেই পূর্ণ হবো।
ডিভোর্স পেপারে দ্রুতই সাইন করে দিও। এরপর আমার ভিন্ন জীবনের শুরু,আর তা হতে পারে নতুন অন্য কারো সাথে অথবা অনন্ত জীবনে মহাকালের দিকে। তোমরা ভালো থেকো।রিশতিনা।
শিহাব বেশ কয়েকবার লেখাগুলো পড়লো।রিশতিনার জন্য মনটা কেঁদে উঠলো। তবে সে নিরুপায়।আর পিছনে গিরতে চায় না সে।তবে হ্যাঁ,রিশতিনার রিয়াজ,শিহাবের আরাফ আজ শায়লার সবচেয়ে আগ্রহের একজন। সেটা নিশ্চিত করে বলতে পারি। শিহাব কার্ডটি প্যাকেটে ঢুকিয়ে নিয়ে বেড রুমে চলে এলো। সে ওয়ারড্রোবের উপরে তা রেখে বারান্দায় গিয়ে বসলো। শিহাব গভীর ভাবনায় রিশতিনার অতীত স্মৃতিতে হারিয়ে গেলো। 
শিহাবের রান্নাঘরের বিশাল জানালাটি শায়লার ভীষণ পছন্দের। সেদিকে তাকিয়ে আকাশে মেঘের ওড়াওড়ি দেখতে দেখতে শায়লা উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।শায়লার তার মায়ের কথা খুব মনে পড়তে লাগলো। শায়লার চোখ অজান্তেই জলে ভরে উঠলো। 
সে ভাবলো, কল করে মায়ের সাথে  কথা বলবে।নিশ্চয়ই তার জন্য খুব  কান্নাকাটি করছে। শায়লা নিজেকে সামলে নিলো।সে   চা বানানোর জন্য  চুলার দিকে এগিয়ে গেলো।কেটলিতে চায়ের পানি বসিয়ে ট্রেতে দুটো চায়ের কাপ সাজয়ে নিলো। ফুটন্ত পানিতে সামান্য  চিনি দিয়ে শায়লা টিব্যাগ পাশেই দেখতে পেলো। দুই কাপে দুটো টি ব্যাগ রেখে শায়লা গুড়া দুধের খোঁজে কিচেন ক্যাবিনেট খুলতেই তা সামনেই পেয়ে গেলো। শায়লা  তা নামিয়ে নিয়ে একটা চায়ের চামচ হাতে নিলো।  ফুতন্ত পানি টিব্যাগের কাপে ঢেলে নিয়ে শায়লা গুড়া দুধের কৌটা খুলতেই বেশ চমকে গেলো !  একটা গোলাপী রঙের কাগজ সেখানে ভাজ করে রাখা। শায়লা ভীষণ অবাক হলো ! সে কাগজটি দ্রুতই বের করে ভাঁজ খুলে নিলো। ভেতরে বেশ সুন্দর হাতের লেখায় একটা চিরকুট!  এবং তা শায়লাকে সম্বোধন করেই লেখা ! শায়লার চোখ বিস্ময়ে বিস্ফারিত হলো। সে গোগ্রাসে লেখাটি
পড়তে লাগলো। শায়লা, আমি রিশতিনা। লেখাটি পেয়ে হয়তো অবাক হচ্ছেন।এখানে এইভাবে পেয়ে। আপনাকে পেতে আমি আর কোন পথ খুঁজে পেলাম না।তাই এভাবে। আর শিহাবে চা খুব পছন্দের, আমি জানি, আপনাকে যখন চা বানাতে বলবে তখন এটা দেখতে পাবেন। সেদিন  জিগাতলার বাসায় আপনার উপস্থিতি আমি বুঝতে পেরেছি আর রোমেল ভাইয়ার কাছ থেকে আপনার নামটি জেনেছি। আপনাকে পেয়ে শিহাবের মন থেকে আমার নামটা মুছে গেছে,সে আমাকে ভুলে গেছে, আর এতেই আমি বুঝে নিয়েছি আপনার ভালোবাসার শক্তি আমার চেয়েও বেশী।তাই তো আমি নিশ্চিন্ত হলাম।তবে আপনাদের কাছে আমার রিয়াজ, মানে আপনাদের আরাফকে রেখে গেলাম।শুধু অনুরোধ রইল, রিয়াজকে মায়ের আদর স্নেহ ভালোবাসায় বড় করবেন। আমি যেখানেই থাকি আমি এতেই সুখ খুঁজে পাবো।আপনাদের নতুন জীবনের জন্য অভিনন্দন রইল।
শায়লা চিঠিটা পড়ে কিচ্ছুক্ষণ  একেবারে নীরব,নিথর  নির্বাক হয়ে রইল। নিজেকে অপরাধী ভাবতে লাগলো।আরাফকে তার মায়ের সংস্পর্শ থেকে বঞ্চিত করলো। পরক্ষণেই সে ভাবলো, কিন্তু সেওতো আরাফকে ভালোবাসে।আরাফের কথা মনে পড়তেই তার শিহাবের কথা মনে পড়লো !  তার চায়ের কথা খেয়াল হলো। শায়লা চিঠিটি ক্যাবিনেটের ড্রয়ারের ভিতর রেখে চায়ের ট্রে নিয়ে  ঘরে গিয়ে শিহাবকে খুঁজতে লাগলো। শিহাবকে ঘরে না পেয়ে সে বারান্দায় এগিয়ে যেতেই দেখলো,শিহাব বেশ বিষন্ন মুখে বারান্দায় বসে আছে। শায়লা চায়ের ট্রে টেবিলে রেখে, শিহাবের কাছে জানতে চাইলো,তার কিছু হয়েছে কিনা ? 
শিহাব গভীর ভাবনা থেকে এ জগতে ফিরে এলো। শায়লা তার হাতে চায়ের কাপ তুলে দিতেই  শিহাব শায়লার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইল।যেন বোবা কান্নায় ভেতরে কিছু একটা বয়ে যাচ্ছে। শায়লা বুঝতে পারছে না, তার ভেতরেও কেন এমন একই অনুভুতি বয়ে যাচ্ছে। সে শিহাবের মাথায় হাত বুলিয়ে অস্ফুট স্বরে জানতে চাইলো, তোমার কি হয়েছে ?  আমাকে কি বলা যায় ? তুমি কিছু একটা নিয়ে কষ্ট পাচ্ছো। এবার শিহাব শায়লার কাছে তার মনের আবেগের কথাকতা যেন উগড়ে দিলো। শায়লা,  রিশতিনা অনুরোধ করেছে আমরা দুজন যেন আরাফকে বাবা মায়ের আদরে বড় করে তুলি। তাতেই সে সুখী হবে।
শায়লা বেশ অবাক হলো ! এ কথা শিহাব কিভাবে জানলো ? তবে কি শিহাব তার চিঠির কথা জানে ? তবুও শায়লা শিহাবের কাছে জানতে চাইলো, এ কথা কখন বলেছে ? সে কি এখন কল করেছিলো ? 
না, সে আমাকে ডিভোর্স লেটার পাঠিয়েছে আর তোমার আমার নতুন জীবনের জন্য অভিনন্দন জানিয়েছে। 
শায়লা শিহাবের খুব  ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ালো।শিহাবের মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে শান্ত করলো। তুমি ভেবোনা, আরাফ আমার কাছে  সন্তান হয়েই থাকবে। চা খেয়ে চলো, স্মরা আরাফকে আজই আমাদের কাছে নিয়ে আসি। আজ আমরা রাতে একসাথে বাইরে খাবো।আরাফকে নিয়ে সারাদিন ঘিরে বেড়াবো। আরাফকে অনেক খেলনা কিনে দিবো। নতুন পোশাক কিনে দিবো। শায়লার কথাগুলোতে শিহাব যেন প্রাণ ফিরে পেলো।তার চোখ সুখ স্বপ্নে চকচক কতে উঠলো!  সে শায়লার বুকের মাঝে নিজেকে  আড়াল করে নিলো।আরাফের মত সেও একজন শিশু হয়ে শায়লার মাঝে আশ্রয় খুঁজছে।
শায়লা চায়ের ট্রে রান্নাঘরে রেখে ক্যাবিনেটের ড্র‍্যার খুলে চিরকুটটিকে বলে এলো, রিশতিনা তোমার রিয়াজ, আজ থেকে আমারও রিয়াজ হয়ে, এক মূল্যবান  মানিক রতনের আদরে থাকবে। 
শিহাব নবশক্তি নিয়ে বারান্দা থেকে ঘরে ঢুকতেই ওয়ারড্রোবের উপরে রাখা প্যাকেটটির দিকে তাকিয়ে, মনে গভীরে ভেবে নিলো, রিশতিনা আরাফকে নিয়ে তুমি একেবারেই ভেবোনা। শায়লা ওর জন্য চিরকাল মা হয়েই থাকবে। 
রান্নাঘর থেকে শায়লা বেরিয়ে এসে শিহাবকে ওয়ারড্রোবের কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শিহাবকে স্বাভাবিক কর‍্যে বলে উঠলো, তুমি কিন্তু এখন সেই মেরুন রঙের শার্টটি পড়বে।
শিহাবও নিজেকে ভাবনা থেকে সরিয়ে এনে বললো, আমরা এখন আর বাইক নিয়ে বেরুচ্ছি না। আমরা উবারে যাবো। আসার সময় আরাফ থাকবে আমাদের সাথে।তার কত জিনিসপত্র আনতে হবে।
শায়লা শিহাবের দিকে এগিয়ে গিয়ে হাত ধরতেই শিহাব এক টানে শায়লাকে তার বুকের মাঝে মিশিয়ে নিলো।





                                            (সমাপ্ত)
                                            ধন্যবাদ

মমতা রায় চৌধুরী ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৬৩




LOVE

কবি আমির হাসান মিলন এর কবিতা "নীল ইচ্ছে"




নীল ইচ্ছে

আমির হাসান মিলন 


কোন আলো কি এসেছিলো এখানে 
বিষণ্ণতার কুৎসিত অন্ধকার মাড়িয়ে ? 

জানি উত্তর পাবো না , 
হয়তো ইচ্ছে করেই বলবে না! 

চোখে আমার লাল রক্তের উদ্ভাস, 
আজ বুকের ভিতর অহরহ ভাঙ্গনের আওয়াজ   
যা কিছু বাঁচার প্রেরণা যোগাতো আমায় , 
সব কিছু বিলুপ্ত হবার পথে 
গলে গলে যাচ্ছে  নর্দমার দিকে। 

আজ নয়তো কাল মৃত্যু ধীরে ধীরে পাথরের মতো 
পর্বতের উঁচু শৃঙ্গ হতে গড়িয়ে পড়বে নিচে  
নৈশব্দের যাঁতাকলে মিশে যাবে জীবনের সব কোলাহল। 

তুমি জানলে না নীলাঞ্জনা , 
ওরাই কেঁদে-সেধে এই পরিণতি চেয়েছিলো।

কবি নাহিদা আক্তার রুনা এর কবিতা  "আমাকে পেয়েছিলো কেউ"





আমাকে পেয়েছিলো কেউ
নাহিদা আক্তার রুনা 



আমাকে পেয়েছিলো কেউ 
খুব করে পেয়েছিল বহুদিন, 
তোমার মতোই বলেছিল কেউ
রাতের পেঁচার ডাকে 
জ্বলে উঠা তারার সাক্ষীতে,
হাত দুটো ধরেছিলো কেউ।
ট্রেনের হুইসেল বেজে উঠা ক্ষণ
সাক্ষী ছিলো ঝরাপাতার বন,
সাক্ষী ছিলো পৌষালী চাঁদের মায়া 
ঝাউগাছের পা ছোঁয়া ছায়া,
খুব করে উড়েছিলো আলো
ঝিঁঝি পোকারা গান গেয়ে গেলে
বুকের সেতার বাজে এলোমেলো,
সবুজ ঘাসের বিছানো গালিচায়
আমাকে পেয়েছিলো কেউ।
খুব করে পেয়েছিলো বহুরাত
তোমার মতোই ভাঙা সুরে, 
ঢেউয়ের মতোন পা চুমে দিয়ে
সমুদ্রের বুকে ডেকেছিলো কেউ।
অতঃপর দিগন্তের ওপার থেকে
কে নিলো তারে ডেকে,
পড়ে রইলো পৌষালি চাঁদ 
আর ভাঙা কিছু রাত,
পড়ে রইলো ঝরা পাতা ঝিঁঝিঁর ডাক
ট্রেনের সেই হুইসেল,বুকের সেতার।
তোমারই মতো বলেছিল কেউ 
আমৃত্যু আকাশের বুকে নীলের মতো
ধরে রাখার প্রতিজ্ঞা যতো,
প্রতিজ্ঞারা উড়ে গেছে পাখি হয়ে 
সুরভিত ক্ষণ পেরিয়ে।
সে কথা তুমি বলোনা আর 
এখনো চোখে সমুদ্রের ঢেউ,
আমাকে পেয়েছিলো কেউ
বহুদিন বহুরাত।

কবি রাজেশ কবিরাজ এর কবিতা "দুঃখও "




দুঃখও
রাজেশ কবিরাজ

আমি সব সময় দুঃখকে আপন ভেবেই 
ঠাঁই দিয়ে রেখেছি মনের আসনে,
এখন দেখি দুঃখ ও আমাকে পর ভেবে 
ফাঁকি দিয়ে চলে যাচ্ছে অনেক দূরে !
আমি সেই একা আগের মতই -
নিজের সাথে কথা বলি আপন মনে ।
আসলেই আমার তো আপন বলে
কোন প্রিয় মানুষ ছিল না কোনদিন,
যে তারা দুঃখ দেবে আমাকে অতি যত্নে !
আমার বিপদে ছুটে আসবে তারা,
আমাকে বলবে কি হয়েছে তোমার ?
ভালোবেসে আমাকে নেবে বুকে টেনে !
আমার একটা পরিপূর্ণ দিন কাটে বোবার মত,
নিঃশব্দে  রাত পার হয়, হৃদয়ে 
জমে থাকা হাজার কষ্ট বরফের মতো বুকের ক্ষত ;
প্রকাশ করতে পারিনা সবার সামনে ।
সেই সহজ অধিকার আমার নেই ,  তাই 
তাকে অতি যত্নে লুকিয়ে রেখেছি খুব গোপনে ।