গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

২৯ সেপ্টেম্বর ২০২১

মমতা রায়চৌধুরী'র ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন"১৫

একান্ত মনেই লিখে চলেছেন লেখক।  তার নিত্যদিনের  আসা  যাওয়া ঘটনার কিছু স্মৃতি কিছু কল্পনার মোচড়ে লিখছেন ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন "। 




                       টানাপোড়েন (১৫)

                                 সুখের মাঝে চোরা দুঃখ


সারা রাস্তা রেখা শুধুমাত্র সোমদত্তার কার্যকলাপ নিয়ে ভেবে আসছিল, আরো ভেবে একসার হচ্ছিল পার্থ এমন কি করেছে ,যার জন্য তাদের সাত বছরের সংসার ভেঙে চুরমার হয়ে গেল, তাসের ঘরের মতো। মেয়েরা তো সবকিছু মানিয়ে নেয়। সোমদত্তা অন্তত ছেলেটির কথা চিন্তা করে তো পারতো ,সংসার টিকিয়ে রাখতে। পার্থর চোখের জল দেখে তো মনে হচ্ছে না ,যে পার্থর ভেতরে এমন কিছু অপরাধবোধ আছে; যার জন্য সোমদত্তা ওকে ছেড়ে দিচ্ছে। ওর চোখের অভিব্যক্তি দেখে তো বোঝা যাচ্ছে সোমদত্তাকে  কতটা ভালবাসে। চোখ বুজে এই ভাবনাগুলোই রেখাকে কুকুর তাড়া করে বেড়াচ্ছিল। মনোজ রেখাকে আলতো করে ধাক্কা দিয়ে বলল  'রেখা নাও নেমে পড়ো  ।বাড়ি এসে গেছ।'
 রেখা বলল  'ও এসে গেছি ।চলো।'
মনোজ বলল ''তুমি যাও। তোমাকে আজ খাবার করতে হবে না ।আমি হোম ডেলিভারি অর্ডার দিচ্ছি ।এসে দিয়ে যাবে। কি খাবে বল? বিরিয়ানি অর্ডার দেব?
রেখা বলল 'আমি কিছু জানি না। যা ভালো বোঝো তাই করো। '
মনোজ বলল  তুমি  বিরিয়ানি খেতে ভালোবাসো তো। তাই দুটো মটন বিরিয়ানি অর্ডার দিয়ে দিলাম সোনা। আর শোনো কোন ঘরের কাজ এখন তোমায় করতে হবে না। কালকে আমি ছুটি  নিয়ে পুটুর বাড়িতে যাব ‌। ও যদি কাজে না আসে তাহলে, অন্য ব্যবস্থা করে আসব ।ঠিক আছে। তুমি একটু ফ্রেশ হয়ে পারলে একবার রিম্পাদিকে ফোন করে নাও ।এতবার করে ফোন করেছে তো ,খারাপ দেখায়।'
রেখা মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।'সত্যি মনোজ খুব কেয়ারি।এজন্যই তো কখনো রেখা অন্য কোন কিছু ভাবতে পারে নি ।জীবনে তো তার কম প্রপোজাল আসে নি ।কি বিয়ের আগে, কি পরে। হ্যাঁ মনোজের ভেতরেও কিছু নেগেটিভ গুন আছে কিন্তু ওর যা পজিটিভ গুন আছে তাতে সব ঢাকা পড়ে যায়। আর তাছাড়া এটাই তো জীবনে বড় জিনিস যে মানিয়ে নেওয়া।'এত অবসাদ এত ক্লান্তি তার পরেও মনোজের দিকে হেসে তাকিয়ে রেখা ঘরে ঢুকে গেল।
মনোজ পার্থকে ডেকে বলল ' কত দিতে হবে?'
পার্থ বলল ' আপনি তো জানেন দাদা। দিন না ।আপনাদের সঙ্গে কোন অসুবিধা হয়েছে কোন ব্যাপারে।'
মনোজ হেসে বলল 'আচ্ছা ,ঠিক আছে। রাখ । বলে ভাড়া মিটিয়ে দেয় ।
পার্থ হেসে বলে ' দাদা ,বৌদির কোন অসুবিধা হয় নি তো রাস্তায় ?আসলে নতুন ড্রাইভার ছিল তো আর বৌদি বরাবর হাদুর গাড়িতে যাতায়াত করেছে ।ফলে বৌদি একটু ভয় পাচ্ছিল ।'
মনোজ ব্যাঘ্র ভাবে বলল 'না, না ।কোন অসুবিধা হয় নি ।খুব ভালো ড্রাইভার।ঠিক আছে অনেক উপকার করেছ পার্থ ভাই।'
পার্থ বলল 'না ঠিক আছে দাদা ।এটা তো আমাদের ডিউটি।'
মনোজ পার্থর হাতে হাত রেখে বলল 'ঠিক আছে পার্থ ।অন্য সময় এসো। আমি একটু ফ্রেশ হয়ে নিই কেমন।তোমার কিন্তু চা পাওনা রইল।'
পার্থ হেসে বলল 'ঠিক আছে দাদা ।আসুন।'
মনোজ  ঘরে ঢুকেই রেখা ,রেখা ‌‌..খা.আ..আ ডাকতে লাগল।
বাথরুম থেকে রেখা সাড়া দিলো  'কি বলছ..? '
মনোজ বলল 'ও আচ্ছা ,ঠিক আছে ।আজকে স্পেশাল কফিটা আমি বানাবো তোমাকে করতে হবে না।'
রেখা বলল ' কেন তুমিও তো টায়ার্ড না? '
মনোজ বলল 'ঠিক আছে। আজকে আমি করি না ? আজ কফি খেতে খেতে গল্প করবো ।মনে হচ্ছে যেন তোমার সঙ্গে বসে গল্প করি।'
রেখা বাথরুম থেকেই সাড়া দিলো ' ঠিক আছে।'ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে রেখা টাওয়াল দিয়ে চুল মুছতে মুছতে এসে বলল 'তুমি ফ্রেশ হয়ে নাও ।আমি সন্ধ্যেটা দিয়ে দিই।'
মনোজ   বললো  'ওকে ম্যাম। জো হুকুম (চিবুক ধরে)। 
রেখা হেসে ফেলল আর বলল 'যাও যাও যাও।'
মনোজ বাথরুমে ঢুকতে গিয়ে আবার ফিরে এসে বলল  ' একটা কথা বলবো রেখা ?'
রেখা বলল 'হ্যাঁ ।বলো না ,কি বলবে?
মনোজ'বলল 'তুমি কখনও সমুর মতো বলবে না তো ,আমাকে ছেড়ে দেবে? '
রেখা অবাক ও জিজ্ঞাসু কন্ঠে বলল 'এমনি মন মেজাজ ভালো নেই ।তার মধ্যে তুমি অলক্ষুনে কথা কেন বলছ? '
মনোজ বলল  'না  চিন্তা হয়।'
 রেখা বললো  'যদি তাই হয়। তুমি নতুন করে নিজের জীবনটাকে সাজাবে ।তুমি অন্যের জন্য কেন নিজের জীবনটাকে স্যাক্রিফাইস করবে?'
মনোজ  কেমন অবাক হয়ে যায়। সে ভাবতে পারে নি এ ধরনের কোনো কথা শুনবে। বলে-' না ,না ,রেখা ।আমার জীবনে একজন ই  রেখাপাত করেছে ।সেটা তুমি ভালোই জানো। আমার মাথায় হাত রেখে বলো কখনো এসব কথা বলবে না । একদম কাছে গিয়ে মনোজ রেখার হাত দুটি ধরে হাঁটুগেড়ে মিনতি জানায়।'
রেখা বলল  'বাহ রে ,আমি কোথায় বলতে গেলাম। তুমি বললে, তাই বললাম। আর আমাকে কি পাগলা কুকুরে কামড়েছে? '
মনোজ বলে 'আসলে সমাজ ,পরিস্থিতি, সময়,মন, মানুষকে কোথায় কখন নিয়ে যায় কে বলতে পারে বল রেখা ? আরও বলল যে  সমুর কথা কখনো ভাবতে পেরেছ?'
রেখা একটু রেগে গিয়ে বলল  'ওর মতো বাজে মেয়ের কথা  ছাড়ো।নিজের বোন বলে নয় ,সত্যিই চিরকাল এমন কি  আমার সঙ্গে হিংসে করে এসেছে। কাকু কাকিমা আমাকে একটু ভালবাসত বলে। যাও আমার সন্ধ্যে দিতে দেরি হয়ে যাবে। তুমিও ফ্রেশ হয়ে নাও।' সদ্য স্নান করে রেখার চুলে তখনো জলটা লেগে রয়েছে ।একটা অসাধারণ তৃপ্তি, স্নিগ্ধ ভাব ওর মুখে মুখে চলে যাওয়ার সময় জলের ছিটে মনোজের  চোখে মুখে ছড়িয়ে গেল । এখনো যেন আগের মতো পাগল হয়ে যায়।আর যতবার দেখে ততবার রেখাকে মনে হয় যেন , ওকে নতুন করে আবিষ্কার করে।এই দুটো দিন বাড়িতে না থাকার জন্য যেন মনে হচ্ছে কত যুগ রেখাকে দেখে নি ।কেন হয় যে ওর এরকম তার সে জানে না ,ভাবতে ভাবতে মনোজ বাথরুমে চলে যায়। ফ্রেস হয়ে বেড়িয়ে ব্ল্যাক কফি করে নিয়ে আসে ।তখন রেখা ঠাকুর ঘর‌ থেকে সদ্য পুজো করে বেরিয়েছে ।ওকে হাত দুটো ধরে সোফায় বসিয়ে দিয়ে  কাপটা সামনে ধরে।'
রেখা কেমন যেন ফুরফুরে হয়ে উঠল ক্ষণিকের জন্য ।এই কফির গন্ধে যেন মাথা ধরা ছেড়ে গেল সে‌ thanks জানাল।
 মনোজ  বলল ' এত ফরমালিটি কেন?'তখন হেসে বলে না না না সরি লটস অফ লাভ। ক্ষণিকের জন্য যেন কেমন হয়ে গেল রেখাকে দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে বুকের কাছে টেনে নিল বলল  এই ভালোবাসা থাকুক নিরন্তর তোমার আমার জন্য ,বলে গাল দুটো টিপে দিল আর নাকে নাক ঘষে দিল। রেখাও যেন কেমন হয়ে গেল ও  যে অবসাদ, ক্লান্তি ,অনুভব করছিল এক নিমিষে মনোজ সবকিছু যেন দূরে সরিয়ে দিল। মনোজ  রেখাকে আদর করে বারবার ডাকতে লাগলো আর চুম্বনে চুম্বনে ভরিয়ে দিল। মনোজ যেন অনুভব করে রেখার পা গরম হয়ে উঠছে ,হাত উষ্ণ।মনোজের ভেতরে যেন আরো ব্যাকুলতা বেড়ে যায়। তার শুধু মনে হয় সে রেখাকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চায় সুখের সাগরে। যেখানে তারা দুজন সাঁতার কাটবে। এমনি সময়ে আবার ফোন বেজে ওঠে। ফোনটা রিসিভ করতেই ভেসে আসে রিম্পাদির গলা'রেখা তুই ঠিক আছিস?
'হ্যাঁ রিম্পাদি 'রেখা বলে।
রিম্পাদি বলে ' যাক তাও ভাল। কি করছিলি ?তার আগে কতবার তোকে ফোন করেছি। তুই তো জানিস তোর গলা শুনতে না পারলে আমার ভালো লাগে না।
সত্যিই যে বিষাদ যে দুশ্চিন্তা তার মনকে  গ্রাস করেছিল ।সেজন্যেই সে রিম্পাদির ফোনটা রিসিভ করে নি।।এখন যেন সে একটা আলাদা সুখ অনুভব করছে সেই মানুষটির জন্য। তার স্বামী মনোজ সেই পারে রেখাকে আদরে যত্নে সোহাগে তাকে ভরিয়ে দিতে।
 রিম্পা দি আবার বলে কিরে তুই বেশি কথা বলছিস না? 
রেখা অনুভব করে আর জন্মে রিম্পাদি যেন রেখার দিদি ছিল। তা না হলে এই আত্মিক সম্পর্ক কখনো গড়ে উঠত না। তাই রিম্পা দি  চলে যাওয়ার ঘটনাটা তাকে সুখের মাঝেও বড্ড পীড়া দেয়। রেখার জীবনের সুখ দীর্ঘস্থায়ী হয় নি। সর্বদাই তার ভয় যাকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে উঠতে থাকতে চেয়েছে, তারা সবাই তাকে ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে। এখন চলে যাবে রিম্পা দি। ভাবতেই রেখার চোখে জল চলে আসলো সে চোখ মুছে নিল তারপর বলল  'তোমাকে পরে সব বলব।
রিম্পাদি ।ঠিক আছে ভালো থাকিস ফোন রাখছি।
বুক জোড়ায় অশান্ত অন্ধ সংগ্রাম যেন রেখাকে কুরে কুরে খেতে লাগলো। রেখা ডাইনিং টেবিলে এসে বসলো এতক্ষণ ধরে তার যে কান্নার বাদ চেপে রেখেছিল সেই বাঁধ ভেঙে যেন কান্না ছিটকে বেরিয়ে আসতে চাইছে টেবিলে মাথা রেখে সে প্রায় কেঁদে উঠলো। ওদিকে মনোজ এসে রেখাকে বলল ' কি হয়েছে রেখা? তুমি আমার সঙ্গে শেয়ার করো।রেখা উঠে গিয়ে জানলার কাছে দাঁড়িয়ে যতটুকু আকাশ দেখা যায় সেটুকু দেখার চেষ্টা করছিল তার মনে হয়েছিল আজকের আকাশে যেন দীপ্তিময়ী নয়। রেখার চোখ ভিজে ।হঠাৎ মনোজ এসে তাকে কাছে টেনে নিল ।রেখা ঝাঁপিয়ে পড়ে মনোজের বুকের উপর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে ।সোমদত্তাকে নিয়ে যে ঝড় উঠেছে সেই ঝড়ে এক পশলা বৃষ্টি কি পার্থর জীবনটাকে ভিজিয়ে দেবে? রুক্ষ শুষ্ক প্রাণ কি আবার সজীব  হয়ে উঠবে? আশেপাশের যারা আছে. তারা কি সেই আনন্দযজ্ঞে সামিল হতে পারবে?তার সুখের মাঝে চোরা দুঃখ কি এভাবেই থেকে যাবে?





       অলঙ্করণ : সানি সরকার 


ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন"১৫ ক্রমশ

রাবেয়া পারভীন এর ধারাবাহিক ছোট গল্প "কালো ক্যনভাস" ৩য় পর্ব

  নতুন  ধারাবাহিক "ক্যানভাস "
লেখাটি পড়ুন এবং অন্যদের  পড়তে সহযোগিতা করুন  লেখককের মনের অন্দরমহলে জমে থাকা শব্দগুচ্ছ একত্রিত হয়েই জন্ম এই লেখার আপনাদের মূল্যবান কমেন্টে লেখককে  লিখতে সহযোগিতা করবে।  





কাল ক্যানভাস / (৩য় পর্ব)

 
                                     নীলার মনে হচ্ছিল  পায়ের নীচে মাটি  দুলছে। এই সেই লোকটা, নীলা ঠিক চিনে ফেলেছে। চেহারাটা একটুও বদলায়নি।  শুধু মোটা হয়েছে আর কপালের  দু পাশে চুলে পাক ধরেছে। চোখে মোটা ফ্রেমের  চশমা।  অধ্যক্ষ সাহেব পরিচয় দিলেন।
- ইনি  জনাব ইশতিয়াক  আহমেদ,  রসায়ন পড়ান।
নীলার তীর্যক দৃস্টির সামনে বিব্রত বোধ করলেন ইশতিয়াক সাহেব। থতমত খেয়ে বললেন,
- আপনি বসুন নীলা।
নীলা  পাথরের মূর্তির মত দাঁড়িয়ে রইল। খুব অবাক হয়েছেন অন্যান্য  শিক্ষকেরা  একে অপরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করলেন। নীলার  ডানদিকের চেয়ারে বসা  অধ্যাপিকা নাজনীন আক্তার  তিনি হাত ধরে টান দিয়ে নীলাকে চেয়ারে বসিয়ে দিলেন।
-বসুন তো  এখানে।  আপনার কি শরীরটা খারাপ ? ইশ্ !  ঘেমে  গেছেন দেখছি।
তারপর তিনি উচ্চকন্ঠে  পিয়ন কে ডাকলেন
- এই তাজুল। একগ্লাস পানি নিয়ে এস।
পিয়ন পানি নিয়ে এলে গ্লাসটা  নীলার ঠোঁটের কাছে তুলে ধরল  নাজনীন।
- এই নিন  পানিটা  খেয়ে নিন।
গ্লাসটা হাতে নিয়ে ঢক ঢক  করে এক চুমুকেই সবটুকু পানি খেয়ে নিল নীলা। তারপর নাজনীনের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল
- সরি মেডাম।
প্রত্যুত্তরে  নাজনীনও হাসলেন
- ঠিক আছে ন তো ?
হ্যাঁ সূচক  মাথা ঝাঁকালো নীলা।
- যাক বাঁচালেন , খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। প্রথম দিনেই এই অবস্থা । এবার বলুন তো  ভয় পেয়েছেন  কেন ?   
নীলার মন থেকে অস্বস্তি  তখনো দুর হচ্ছিল না। 
  


      অলঙ্করণ : সানি সরকার 

                                                                                                                               চলবে ...।

জাফর রেজা'র ছোট গল্প "ক্ষণিক বসন্ত "৫

     
স্বমহিমায় লিখে চলেছেন নতুন ধারাবাহিক লেখক জাফর রেজার ছোট গল্প "ক্ষণিক বসন্ত " 
মতামত দিন  আপনাদের  একটি  কমেন্ট লেখকের ১০০ লেখার  সমান মূল্যবান। 



                  ক্ষণিক বসন্ত 
                                                                                  ৫ম   পর্ব 


                ফোনের শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো, বুলার ফোন। 
বললাম আমিই কল দিতাম ভাবলাম আপনি হয়তো ব্যাস্ত তাই আর দেইনি।
-- তেমন ব্যাস্ত না, রান্না শেষ করে  দেশে মায়ের সাথে কথা বলছিলাম, আপনার ঘুমের প্রয়োজন তাই কল । এখন কেমন লাগছে ? 
-- আগের চেয়ে অনেক ভালো।
-- সকালে অফিসে যাবার সময় দেখে যাব। খাবার সব সাজিয়ে রেখেছি শুধু ওভেনে গরম করে নেবেন। খাওয়ার পর সাইড টেবিলে যে ট্যাবলেট রেখে এসেছি সেটা খাবেন তারপর দুধ। 
-- বুলা এতো অত্যাচার কেন ? 
-- হেসে বললো, অত্যাচার!   অত্যাচার তো এখনো শুরু হয়নি। আর কোন কথা নয় এবার খেতে যান, বুলা ফোন রাখলো না, কিছুক্ষন চুপ থেকে বললো একটা প্রশ্ন করি ? 
-- করুন।
-- আপনার শরীর যে এতো খারাপ 
আমাকে জানাননি কেন ? 
- কাউকে কষ্ট দিতে আমার ভালো লাগে না বুলা,
অনেকটা অভিমানী কণ্ঠে বল,  আমি কে, আমি কি অন্য কেউ।
বুলা আপনি রাগ করেছেন ? 
-জানিনা, মনে রাখবেন এখন থেকে আর এলোমেলো জীবন নয়, আমি আপনার জীবনটা গুছিয়ে দেবো, জানেন গতরাতে খুব চিন্তা হচ্ছিল, লোকটা গেলো কোথায়, একটা কলও করলো না, জানিনা কখন যে চোখে জল এসে পরেছিল। অনেক হয়েছে এবার ঘুমান, সকালে কি খাবেন       
..বুলা আপনার কষ্ট করে আসার দরকার নেই, আমি কিছু একটা খেয়ে নেব।
__ আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করেছি কি খাবেন।
__ কিছু একটা হলেই হলো। 

বুলা এলো ওর সহজাত স্নিগ্ধতা নিয়ে, কপালে হাত রাখল, বলল__ জ্বর নেই। এখন ঝটপট খেয়ে নিন আমার অফিসে যেতে হবে, ও হ্যা টিকেট কেটেছেন ? 
__ এখনো কাটিনি, তবে সিট বুকিং হয়ে গেছে, কেন বুলা ?
__ আপনি কয়েকদিন দেশের থেকে ঘুরে আসুন, ভাল লাগবে।
__ বুলা আমি কাল অফিসে যাব।
বুলা মিনতি ভরা গলায় বলল কাল না গিয়ে পরশু গেলে হয়না।
আমি ওর দিকে তাকিয়ে ছিলাম, ও ব্যাস্ত ছিল আমার খাবার নিয়ে, হায়রে মমতাময়ী নারী।
__আমি চললাম, বিকালে এসে শরীর মুছে দেব।
বুলা চলে গেল। 

একটু দেরি করেই বুলা এল।
দরজা খুলে যাকে দেখলাম সে আমার পরিচিত বুলা নয়, এ অন্য এক বুলা। এই প্রথম ওকে আমি শাড়ি  পড়া  দেখলাম, সাধারণ শাড়ি,  সামান্য সাজ। আমার মনে হল যে আমার সামনে দাঁড়িয়ে সে আমার সমস্ত সত্বাকে, অনুভুতিকে অবশ করে দিয়েছে, পৃথিবীর সব রূপ  নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল__ অফিস থেকে বাসায় গিয়েছিলাম, স্নান সেরে এলাম, আজ একটু বেশি সময় থাকব।
আমি তখনো ওকে মুগ্ধ চোখে দেখছিলাম, বললাম __ আপনি শাড়ি  পড়েন না কেন ?
__ হেসে বলল, এখানে এতো ঠান্ডায় শাড়ি পড়ে কি চলা করা যায়।
__ বুলা আপনার সাথে আমার আরও আগে দেখা হলনা কেন।
__ আবারো হাসি, আগে দেখা হলে কি হত ?
__ কি হত জানিনা, তবে জীবনটাকে নিয়ে অন্য ভাবে চিন্তা করতে পারতাম।
আমার পাশে এসে বসল, বললো ভাবার সময় শেষ হয়ে যায়নি জীবন আপনি যখন থেকে শুরু করবেন, তখন থেকেই শুরু হবে, মনে করুন অন্য আর একটি নতুন জীবন শুরু হয়ে গেছে।
বুলা কফি নিয়ে এল।
ও বেশ কিচ্ছুক্ষণ চুপ করে রইলো।
__ কবে যাচ্ছেন ? 

দেশে যাবার দিন বারন করা সত্তেও বুলা এয়ারপোর্টে এলো। বোডিং পাস নিয়ে বললাম__ ভাল থাকবেন।
_ শরীরের উপড় অত্যাচার করবেন না, কবে আসবেন ? 
আমি চার সপ্তাহের জন্য যাচ্ছি, মনে হয় থাকতে পারবনা, ওর একা সামলাতে অসুবিধা হবে ( আমার পার্টনারের কথা বললাম)।
বুলা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল।
__ আপনি হঠাৎ  চুপ হয়ে গেলেন কেন।
__ কিছুনা এমনিই।
__ না, বুলা কিছু একটা হয়েছে, আমাকে কি বলা যায়না ?
বুলা মাথা নিচু করে বলল__ শুধু কি ব্যাবসার জন্যই তারাতাড়ি  আসতে হবে ?
আমি হেসে ফেললাম__ না শুধু ব্যাবসার জন্য নয়, অন্য কারণ আছে, আর সেটাই বেশী জরুরী।
__ কি কারন।
__ এই প্রশ্নের উত্তর আপনার কাছেই আছে, নিজেকে নিজে প্রশ্ন করুন উত্তর পেয়ে যাবেন।
বুলা আমাকে এখন যেতে হবে, শেষ কল করা হয়ে গেছে, আমি যাই। 



          অলঙ্করণ : সানি সরকার 

                                                                                                                                                চলবে....

২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১

জাফর রেজা'র ছোট গল্প "ক্ষণিক বসন্ত " ৪

স্বমহিমায় লিখে চলেছেন নতুন ধারাবাহিক লেখক জাফর রেজার ছোট গল্প "ক্ষণিক বসন্ত " 
মতামত দিন  আপনাদের  একটি  কমেন্ট লেখকের ১০০ লেখার  সমান মূল্যবান। 




                   ক্ষণিক বসন্ত 
                                                                               ৪ র্থ পর্ব 

                                   কিছু ফল আর কি কি জানিনা এনে টেবিলে রাখল। আমার পাশে বসে বলল আমি বিকাল পর্যন্ত আছি, এখন কিছু খাবেন তারপর কোন কথা নয় শান্ত ছেলের মত ঘুম। বললাম আপনি কি করবেন, বললো আমার অনেক কাজ আছে, কি কাজ জানতে চাইলে বললোএমন মানুযের পাল্লায়ই পরেছি যে অপরের জন্য কাজ তৈরি করে রাখে। বুলা এত জঞ্জাল আপনি একা পরিস্কার করতে পারবেন না, আমি কালকের মধ্যে সুস্থ হয়ে যাব, তারপর একসাথে মিলে সব গুছিয়ে নেব। বুলা কিছু না বলে রান্না ঘরে গিয়ে আপেল আংগুর নিয়ে আমার পাশে বসল। সব গুলো খেতে হবে। খেতে ইচ্ছা করছিলনা তবুও যতটা পারলাম খেলাম। কপালে হাত দিয়ে বলল আমি হাত বুলিয়ে দিচ্ছি এবার ঘুমান। এমনেতেই আমার খুব দুর্বল  লাগছিল,  কখন ঘুমিয়ে পরেছি জানিনা। 
লম্বা ঘুম দিয়ে উঠলাম। 

এটা কি আমার ঘর, এই দেশে এতো পরিপাটি সাজানো ঘরে আমি কখনো ছিলাম না, সাইড টেবিলে নতুন ফুলদানিতে অনেক তাজা ফুল সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা।
বুলা আপনি এসব করলেন কখন, হেসে বললো আজ থেকে আর এলোমেলো ভাবে থাকা চলবে না, আমি প্রতি সপ্তাহে এসে ঘর গুছিয়ে দিয়ে যাবো, এবার উঠুন ওয়াশ রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসুন, আমি খাবার দিচ্ছি।
জিজ্ঞেস করলাম মন্টু কি উঠেছে ? 
উনি কাজে চলে গেছেন তবে যাবার আগে যা বলে গেছেন তাতে আপনার শাস্তি পাওনা রইলো। আপনি কি কখন ওনার রুমে গিয়েছেন? 
-- কেন যাবনা 
ওনার রুমটা কি আপনি দেখেছেন কেমন পরিপাটি করে সাজানো।  

বুলার কথার উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম--- আপনি খাননি ? ---না কেনো ? 
--- এখন কয়টা বাজে, ৫ টা আপনি এতক্ষণ না খেয়ে আছেন ! 
বুলা হাসলো কিছু বললো না।
ওর জন্য মনের কোথায় যেন কিছু একটা অনুভব করলাম, ডাকলাম --- বুলা,  উত্তর নেই, আবার ডাকলাম বুলা --- এবারও উত্তর নেই শুধু মুখ তুলে তাকালো, বললো এখন আমাকে যেতে হবে, কাল আপনার কাজে যাওয়া চলবে না, আমি অফিস থেকে  বিকালে চলে আসবো। বুলা চলে গেল। আমি একা ঘরে পরে রইলা।   

বুলা কে যে আমার গতানুগতিক জীবনধারা এলোমেলো করে দিলো, নিজেকে এতো শূন্য মনে হচ্ছে কেন ? এমন অনেক ভাবনার জালে জড়িয়ে কখন যে ঘুমিয়ে পরেছি জানিনা। 



ধারাবাহিক "ছোট গল্প " ক্রমশ 
     

রাবেয়া পারভীন এর ধারাবাহিক ছোট গল্প "কালো ক্যনভাস" ২

  নতুন  ধারাবাহিক "ক্যানভাস "
লেখাটি পড়ুন এবং অন্যদের  পড়তে সহযোগিতা করুন  লেখককের মনের অন্দরমহলে জমে থাকা শব্দগুচ্ছ একত্রিত হয়েই জন্ম এই লেখার আপনাদের মূল্যবান কমেন্টে লেখককে  লিখতে সহযোগিতা করবে।    





কালো ক্যানভাস 
 
                                                 (২ম পর্ব) 



                                         নীলার দিকে তাকিয়ে মন ভরে গেল জালাল সাহেবের। বিগত দিনগুলিতে  কত কষ্টই না করেছে মেয়েটা। সব বাঁধা বিপত্তি পেরিয়ে এই পর্যন্ত যে আসতে পেরেছে সে জন্য  তিনি  মনে মনে আল্লার কাছে শুকরিয়া জানালেন।
- কৈ আব্বু  তুমি তো বল্লেনা  আমাকে কেমন লাগছে ?  
হেসে মেয়ের দিকে তাকালেন  জালাল সাহেব
-খুব সুন্দর লাগছে,  আমার মা বলে কথা । আমার মা পৃথীবির সেরা সুন্দরী।
- আব্বু !  বাড়িয়ে বলছো কেন ?
-দুর কেন বাড়িয়ে বলব, যা সত্যি  তাই বলেছি। বাবা মেয়ে দুজলেই  হো হো করে হেসে উঠল। মেয়েকে কলেজ গেটে নামিয়ে দিয়ে  জালাল সাহেব  চলে গেলেন। 
নীলা এসে অধ্যক্ষের  রুমে ঢুকল
-আসবো স্যার।?  
-আসুন নীলা ।  বসুন। 
সালাম দিয়ে  অধ্যক্ষের  সামনে  বসলো নীলা।
কুশল  বিনিময়ের পর  অধ্যক্ষ  নীলাকে সাথে নিয়ে  টিচারদের কমনরুমে এলেন।  বড় গোলটেবিল ঘিরে বসে আছেন সব শিক্ষকেরা। সবার দিকে চোখ বুলিয়ে নিয়ে অধ্যক্ষ সাহেব  বল্লেন 
-সবাই  আছেন  দেখছি, ইনি  নীলা  চৌধুরী, আপনাদের নুতন সহকর্মী । আজকেই জয়েন করেছেন। দেখতে  ছোট কিন্তু  বিসিএসে  খুব ভালো রেজাল্ট করেছেন।
সবাই  একসাথে নীলার দিকে তাকালো । নীলাও চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সবাইকে দেখছিলো। হঠাৎ  একজনের  মুখের  উপর  দৃস্টি  এসে আটকে গেল  তাঁর। এক মুহূর্তের  জন্য সারা শরীরে কাঁটা  দিয়ে উঠল । কে উনি ?  কে ?


                                                                                         চলবে...

মমতা রায়চৌধুরী'র ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন"১৪

একান্ত মনেই লিখে চলেছেন লেখক।  তার নিত্যদিনের  আসা  যাওয়া ঘটনার কিছু স্মৃতি কিছু কল্পনার মোচড়ে লিখছেন ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন "।  





                                              টানাপোড়েন (১৪)

                                                                     দংশন

                                   সারা রাত রেখা দু 'চোখের পাতা এক করতে পারে নি। এরইমধ্যে ফোনটা বেজে চলেছে। রেখা ক্লান্ত শরীর ,তন্দ্রাচ্ছন্ন চোখে ফোনটা কোনরকমে ধরল এবং বলল'হ্যালো'।
ওপার থেকে সোমদত্তার কন্ঠে ভেসে এলো'দিদি, পার্থকে হসপিটালে নিয়ে যাচ্ছি । কেন কি হয়েছে ওর? হ্যালো হ্যালো।  ফোনটা কেটে দিলো ?'
এবার রেখা কি করবে? এ দিকে মনোজও ‌ বাড়িতে নেই ।সঙ্গে সঙ্গে মনস্থ করলো , মনোজকে ফোন করবে। ভেবে রিং করল।ফোনটা ওপার থেকে রিসিভ করে বলল ' হ্যালো কি হয়েছে বল?'
রেখা বলল  'কি করে জানলে কি হয়েছে?
মনোজ বলল  'এত সকালে তো তুমি ফোন করবে না তোমার তো কাজে থাকার কথা।'
রেখা বলল ' ঠিকই ধরেছো পার্থকে হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ।এখন আমার কি করা উচিত ।এখন এই মুহূর্তে আমি ট্রেন তো পাবো না।
মনোজ বলল 'পার্থ! কোন পার্থর কথা বলছো?
রেখা এবার একটু রাগ আর বিরক্তির স্বরে বলল পার্থ ।পার্থকে চেনো না ।আমার ভগ্নিপতি।
মনোজ বলে ' যা কিছু মনে করো না। আসলে আমি ভেবেছি পাশের বাড়ির ওই পার্থ। কেন কি হয়েছে ওর?'
রেখা বলল  ' কি হয়েছে সেটা তো জানি না ।গতরাত্রে সোমদত্তা ফোন করেছিল ।তাতে‌ ও যা বলেছিল ,ওর নাকি পার্থর সাথে থাকা সম্ভব হচ্ছে না ।আমি ওকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি কিন্তু আজকের মধ্যেই এই ঘটনা ভাবতে পারো?'
মনোজ বলল  'হ্যাঁ যাও ।তবে  কাকু কাকিমাকে এই মুহূর্তে কিছু বলার দরকার নেই। বয়স হয়েছে তো ?একে তো ছেলেটা অমানুষ ।সে তো মা বাবার খোঁজ খবরই রাখে না ।আবার এইদিকে মেয়েটারও এই অবস্থা ।ঠিক আছে ।আমি দেখছি। আমি পাশের বাড়ির পার্থকে বলে দিচ্ছি ।ও গাড়ি করে দিচ্ছে। তুমি বেরিয়ে যাও।'
রেখা বলল  'বাবান কেমন আছে?'
মনোজ বলল  'আগের থেকে ভালো আছে। বিপদের ঝুঁকি নেই ।এ যাত্রায় বেঁচে গেল।'
রেখা বলল 'যাক, তবু একটু আশার কথা শোনালে।'
মনোজ বলল 'ঠিক আছে তুমি তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও ।পুটু এসেছে?'
রেখা বলল   'না, কত জ্বালা হয়েছে বলো দিকি নি?'
মনোজ বলল  'ঠিক আছে। আমি বাড়ি যাই । তারপরে ওর বাড়িতে যাবো । খোঁজ খবর নেব ।না হলে অন্য লোকের ব্যবস্থা করতে হবে ।এখন তুমি মাথা ঠান্ডা করে ,যেখানে যাচ্ছ ,সেখানে যাও ।আমি এদিক দিয়ে বেরিয়ে যাব।'
রেখা শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল  'কি হবে? ঠিক আছে আমি রেডি হয়ে নিচ্ছি।'
এরই মধ্যে গাড়ি এসে হাজির।বাইরে থেকে কয়েকবার বৌদি বৌদি করে ডাকার আওয়াজ।
রেখা জানলার পর্দা সরিয়ে জিজ্ঞেস করল কে?ও পার্থ।
পার্থ বলল   'নুতন ড্রাইভার কিছু সমস্যা হলে ব'লো।'
রেখা বলল  'কেন হাদুর কি হলো? এমনিতেই অসুবিধার মধ্যে আছি, আবার যদি কিছু গন্ডগোল হয়।'
পার্থ বলল  'না ,বৌদি চিন্তা ক'রো না ।এমনিতে ও পাকা ড্রাইভার। সেরকম হলে আমাকে একটু ফোন করে নিও।ঠিক আছে। গড়িয়া স্টেশনের কাছে সোমদত্তাদের  বাড়ি যাবে তো ?অনেকদিন আগে একবার গিয়েছিলাম ।আমিই নিয়ে গেছিলাম। ওর হাজব্যান্ড খুব ভালো মানুষ ।তাই না বৌদি? '
রেখা শুধু এক কথায় ' হ্যাঁ ,বলে সম্মতি জানালো।'
গাড়িতে উঠতে যাবে এমন সময় চৈতির মা বলল  'দিদি কোথাও বেরোচ্ছ? কারো কি কিছু হলো? রেখা শুধু বলল  'হ্যাঁ একটু বেরোচ্ছি ।'
চৈতির মা বলল  'ঠিক আছে সাবধানে।'
রেখা ভাবছে চৈতির মার একটু বেশি বেশি সব ব্যাপারে ।কোথায় যাবো ?কি করবো? সর্বক্ষণ যেন একটা নজর । বাবা রে কি বেয়াক্কেল মেয়ে । সোমদত্তা কে ফোন করে যাচ্ছি ।ফোনই ধরছে না ।কি মেয়ে জানে না ,যে চিন্তা হয়। ভাবতে-ভাবতে যাচ্ছে এমন সময় মনোজ ফোন করল   'কত দূরে আছে ।'
রেখা বলল 'এইতো প্রায় ঢুকবো ঢুকবো।'
 মনেজ বলল  'সে পৌঁছে গেছে।'
 রেখা বলল  'বাবা ,তুমি পৌঁছে গেছো ।ওদিকে কি ব্যাপার বুঝছ?পার্থ ঠিক আছে ?'
মনোজ বলল  ,'আরে পার্থ অব্দি পৌঁছাতে পেরেছি ?কোথায় বাড়িতে আসলাম -দেখি কেউ নেই । সমুকে ফোন করলাম ও ঠিকানা দিলে, সেখানে যাচ্ছি ।আমি তোমাকে টেক্সট করে দিচ্ছি। তুমি সেই ঠিকানায়  পৌঁছে যেয়ো কেমন,?'
 রেখা বলল  'ঠিক আছে। নির্দিষ্ট হসপিটালে গিয়ে পৌঁছালো ।সোমদত্তা আর ঐ ছেলেটাকে দেখতে পেল ।মাথা গরম হয়ে গেল কিন্তু মাথাটা ঠান্ডা রাখে। 
রেখা বলে  'পার্থ কেমন আছে রে? '
সোমদত্তা বলল  'যাও না দেখে এসো। 
রেখা বলল   'আমি তোকে জিজ্ঞেস করছি ,একটা কথা সোজা করে উত্তর দিতে পারিস না?'
সোমদত্তা বলল ' কি ভুল বলেছি ।তুমি যাও না নিজেই দেখতে পাবে ।আমার বলার চেয়ে নিজের চোখে দেখা টা অনেক বেশি বাস্তব বলে মনে হবে না? '
রেখা কথা না বাড়িয়ে সোজা ঢুকে গেল নির্দিষ্ট কেবিনে । দেখে মনোজ বসে আছে। 
রেখা  বলল  'কেন এমন করেছিলে?'
 পার্থর চোখে জল ।একটু হেসে কথা বলার চেষ্টা করছিল ,।
তখন মনোজ বলল  'এখন এসব কথা থাক।'
রেখা শুধু বললো  'সব ঠিক হয়ে যাবে।'
পার্থ ভরসার চোখে রেখার দিকে তাকিয়ে থাকলো।
রেখার ও  চোখ ফেটে জল আসছিল।
মনোজ বলল ‌' তোমরা একটু কথা বল আমি একটু বাইরে থেকে আসছি।'
ফিরে এসে মনোজ ইশারায় রেখাকে যা বলল তাতে মোটেই প্রীতিকর ঘটনা কিছু ঘটছে না।যেভাবে সমু
ছেলেটার সঙ্গে ঢলে আছে, তাতে আমার ভীষণ বিরক্তি লাগলো ।ও পুরো নির্লজ্জ হয়ে গেছে, ওর স্বামী যেখানে ভর্তি।'রেখার কথাগুলো শুনে কান গরম হয়ে উঠলো এবং সঙ্গে সঙ্গে বাইরে বেরিয়ে আসলো।
এসে যা দেখল ,তাতে রেখা মাথা ঠান্ডা রেখে বলল' 
'যা না তুই পার্থর কাছে। কাছে গিয়ে একটু বোস।'
সোমদত্তা বলল  'যা বলার তো তোমাকে গতকালকে দিদি বলেই দিয়েছি ।ওর সঙ্গে আমার পক্ষে থাকা সম্ভব নয়।'
রেখা বলল 'তোর কোথায় সমস্যা? তোদের ক্রাইসিস টা কি? কেন? সেগুলো আমাদেরকে বল। আমরা চেষ্টা করে দেখি। তাছাড়া পাবলো ছোট ওর একটা ভবিষ্যৎ আছে। নিজের সুবিধার জন্য তুই এত বড় সিদ্ধান্ত নিতে পারিস?'কথা বলতে বলতেই দেখতে পেল ছেলেটা হাঁ করে সমস্ত কথাগুলো যেন গিলছে।
রেখা তার দৃষ্টি দিয়ে যেন ছেলেটিকে ভস্ম করতে চাইল ।বুঝিয়ে দিতে চাইল ।এখানে থাকাটা তার অনুচিত।
ছেলেটি বুঝতে পেরে সোমদত্তাকে বলল'তোমরা কথা বলো ।তোমাদের ফ্যামিলি মেম্বাররা আছে। এখানে থাকাটা আমার ঠিক নয়।'
সোমদত্তা রেখার দিকে' বিরক্তি ও জিজ্ঞাসা চোখে তাকিয়ে ছেলেটাকে বলল  'এখানে কেউ ফ্যামিলি মেম্বার নেই ।আমার যা বলার আমি শাশুড়ি মাকে বলে দিয়েছি।'
ছেলেটি একটু মুচকি হেসে পাশেই বসে রইল।
এত অসহ্য লাগছিল। রেখা শুধু বলেছিল  তুই এতটা নির্লজ্জ, বেহায়া ।আমি কখনো কল্পনা করতে পারি‌ নি যে আমাদের ফ্যামিলিতে এইরকম একটা কালচারের মেয়ে আছে? কাকু কাকিমা কতটা কষ্ট পাবে একবারও ভাবলি না ।ছোট্ট পাবলো নিষ্পাপ ওর কথা ও একবার ভাবছিস না।'
সোমদত্তা বলল 'দেখো দিদি আমি বাবা তোমার মত অত ভ্যালুজ ,মরালিটি বুঝি না। যা করতে মন চায় না আমার কাছে সেটাই অন্যায় ।কারণ মন ই  আমার কাছে গড ।আমার কাছে নীতি-টিতির কোন মূল্য নেই।'
কথাগুলোতে যেন রেখার মাথা বনবন করে ঘুরতে লাগল ।তার বুকে সজোরে এসে যেন ধাক্কা মারলো ।সে ধাক্কা তার কলেজ জীবনে সিদ্ধার্থ র প্রপোজ করার ধাক্কার চেয়ে অনেক বেশি। রেখাকে টানতে টানতে মনোজ নিয়ে আসলো আবার ভেতরে। আর মনোজ বলতে লাগলো  'পৃথিবী মনে হচ্ছে অনেক নিচে নেমে গেছে, নাকি পৃথিবীর মানুষগুলো অনেক নিচে নেমে গেছে ,।সবকিছু যেন ভেঙেচুরে দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে। মনোজ  বলল  'পার্থর সঙ্গে দেখা করে ,চলো বাড়ি ফিরতে হবে। তোমার অনেক ধকল গেছে। পার্থকে বিদায় জানিয়ে যখন রেখা ও মনোজ বেরিয়ে গাড়িতে বসলো ।তখন রেখার মনে হল সে যে পার্থকে কথাগুলো বলল সবকিছুই মেকি। আদৌ সেগুলো  বাস্তবায়িত হবে না। গাড়িতে বসার পর ফোন বেজেই যাচ্ছে। মনোজ ফোনটা দেখে বলল রিম্পাদি ফোন করছে ,রিসিভ করো। রেখা ঘাড় নেড়ে অসম্মতি জানালো। সে শুধু ভাবতে লাগলো কাকু কাকিমা কিভাবে নেবে ব্যাপারটা,? তাছাড়া ওইটুকু বাচ্চার কি রকম রিয়াকশন হতে পারে ?একবারও ভাবার চেষ্টা করল না ।রেখার ভেতরে যেন এই দংশন ক্ষতের আকার নিল। ছেলেটার বউ বাচ্চা আছে। ও কি সুখের সাগরে ভাসতে চলেছে কে জানে?


ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন"১৪ ক্রমশ

২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১

মমতা রায়চৌধুরী'র ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন"১৩





                                         টানাপোড়েন ( ১৩)

                                                         সমস্যা


সন্ধ্যে থেকে এত টানা বৃষ্টি চারিদিকে কিছু দেখা যাচ্ছে না ।ট্রেনে আসার সময় রেখা দেখতে পেয়েছিল জল থৈ থৈ করছে ।মাঠ সাদা হয়ে গেছে।ট্রেন থেকে নামার সময় রিম্পাদি দরজার কাছে এগিয়ে এসে লাগেজটা নিয়ে বললো  'সাবধানে যাবি ।তোর তো আবার একটুতেই ঠান্ডা লাগার ধাত আছে।'
রেখা শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানায় আর মলিন হাসে বলল ,'তুমিও সাবধানে যেও। '
ট্রেনটা ছেড়ে দিল যতক্ষণ পর্যন্ত দেখা গেল রেখাকে তাকিয়ে থাকল রিম্পাদি ।রেখার অবস্থাও একই হাত নেড়ে নেড়ে।'ট্রেন বেরিয়ে গেলে দেখি অটোর খোঁজে গেল। কিন্তু কাছেপিঠে কোথাও একটা অটো পাওয়া গেল না ।একটু এগিয়ে গিয়ে অটোয়ালাকে জিজ্ঞেস করল  'যাবেন?'
অটোওয়ালা  'কোথায়? (বিরক্তি ভরে)ভেতর থেকে গলাটা বাড়িয়ে।'
রিম্পা কথা না বলে সরাসরি অটোতে উঠে পড়ল, আর বলল   'বুদ্ধ পার্ক।'
 অটোওয়ালা বলল 'আমি যাবো, কি যাবো না ,না বলে আপনি উঠে পড়লেন দিদি।'
রেখা বলল  'দেখতেই তো পাচ্ছেন ভিজে গেছি দাদা।চলুন না। (অনুরোধের সুরে)।
অটোওয়ালা বলল 'একজনকে নিয়ে যাওয়া যায় দিদি ,বৃষ্টি বাদলের দিনে?'
রেখা বলল  'হ্যাঁ ।সেটা বুঝতে পারছি। ঠিক আছে ।আমি একটু ধরে দেব, চলুন।'
অটোয়ালা বলল ।'কিছু মনে করবেন না দিদি ,বুঝতেই পারছেন  (খুশিতে ডগমগভাব।)ঠিক আছে আপনাকে নিয়ে যাচ্ছি (হেসে হেসে)। '
রেখা অটোতে বসে সাত-পাঁচ ভাবতে লাগল- মনোজ একটা ফোন ও করল না ,।কী হলো, কে জানে ?ভাবতে ভাবতে নিজেই একটা ফোন করলো। পুক পুক করে আওয়াজ হয়েই যাচ্ছে। এরমধ্যে অটো বাড়ির কাছে নামিয়ে দিল। রেখা নেমে ঘরে ঢুকলো ।
পাশের বাড়ি চৈতালির মা বলল 'দিদি ,একদম তুমি ভিজে গেছো গো ।বৃষ্টিটা যা দিচ্ছে।কালকে রাত্রে দাদা আসে নি, না?কোথায় গেছে? '
রেখা বলল 'ওই তো আগের দিন বললাম না যে ছোট পিসি শাশুড়ির বাড়িতে গেছে ।ওখান থেকে অফিস করে বাড়ী ফিরবে।'
চৈতালির মা বলল ' ও আচ্ছা আচ্ছা'। 
রেখা বলল 'ঠিক আছে দিদি, আমি একটু চেঞ্জ করে নি, হ্যাঁ, পরে কথা বলব।'
চৈতির মা বলল ' না না না দিদি আপনি যান। কোন অসুবিধা হলে বলবেন।'
রেখা ঘার নাড়িয়ে সম্মতি জানালো। কি বিরক্তি লাগছে পুটুটার কি হলো, কে জানে?'
বাথরুম থেকে বেরিয়ে ফোনটাতে দেখে বেশ কয়েকটি মিস কল। চেক করে দেখে, সোমদত্তার ফোন। রেখা একটু চিন্তিত হয়ে গেল আর ভাবলো  হঠাৎ করে সোমদত্তা এতদিন পর ফোন করলো? কাকু কাকিমার কিছু হলো? সেদিন বিপাশা বলেছিল একবার ঘুরে আসতে কিন্তু যাওয়া হয়ে ওঠে  নি। পরপর ঝামেলা লেগেই রয়েছে। এক কাপ কফি করে ফোনটা করল। দুবার রিং হয়ে গেল। ওপার থেকে কন্ঠ ভেসে এলো 'হ্যালো'।
রেখা বলল 'সমু আমি দিদি বলছি। সবাই ঠিক আছিস তো? পাবলো সোনা কেমন আছে?'
সোমদত্তা বলল 'পাবলো ঠিক আছে। আমি ঠিক নেই দিদি। আমি ও বাড়িতে যাবো ।তুই একটু মা-বাবার সঙ্গে কথা বলবি ।আমি ওখানে থাকবো।'
রেখা বলল 'যা না ঘুরে আয়। বলার কি আছে? কাকু কাকিমার ভালো লাগবে। কদিন গিয়ে থাকবি ওখানে।'
সোমদত্তা বলল 'আমি বরাবরের মতো যেতে চাইছি'।
রেখা অবাক হয়ে বলল 'মানে! কি আবোল তাবোল বকছিস? তোর গড়িয়ার বাড়িটা কি হবে? আর পার্থ ,ও কি করবে?'
এবার সোমদত্তা একটু চুপ করে থেকে বলল'আমি ওর সঙ্গে থাকতে পারবো না।'
রেখা অবাক হয়ে বলল 'কি বলছিস সমু থাকতে পারবি না ,মানে ,এটাই তো তোর আসল বাড়ি আর এই বুড়ো বয়সে এসে কাকু কাকিমাকে এখন মনে কষ্ট দিবি? কি এমন হয়েছে ?চল আমরা সবাই মিলে বসে একটা সমাধান কর‌ব। তোর সমস্যাটা কি?'
সোমদত্তা বলল  'দেখ দিদি ,সবাই তো আর মনোজ দা নয়।"
কথাটা যেন রেখাকে খোঁচা দিয়ে বললো।
রেখা বলল  'নদীর এপার কহে  ছাড়িয়া নিঃশ্বাস/ও -পারেতে সর্ব সুখ আমার বিশ্বাস।
'সোমদত্তা বলল,তোকে যা বললাম ,তুই সেটা আমার জন্য কর।'এর মধ্যেই পাবলো মায়ের কাছে এসে বায়না করছে 'আমি মাসিমনির সঙ্গে কথা বলব'। বলেই ফোনটা কেড়ে নিতে গেছে ,তখন সোমদত্তা রেগে গিয়ে বলল ' আঃপাবলো আমাকে কথা বলতে দাও।'শুনছে না বলে কষে এক চড় বসিয়ে দিল। 
রেখা স্পষ্ট শুনতে পেল। দিয়ে ফোনটা কেটে গেল।
রেখা মনে মনে ভাবছে  'সোমুর এত রাগ তো ছিল না ।কেমন বদলে গেছে ।ছেলেটাকে মারছে। কি এমন হয়েছে ওর?'ভেবে কফিতে চুমুক লাগাতে গিয়ে দেখে একদম ঠান্ডা জল হয়ে গেছে। এরই মধ্যে আবার ফোন।
রেখা ভাবল আবার সোমু ফোন  করল? ফোনটা রিসিভ করতে গিয়ে দেখে মনোজের ফোন। ফোনটা ধরেই রেখা বলল কি ব্যাপার বল তো ?এতটা রাত হয়ে গেল ,তুমি ফিরছ না কেন? বৃষ্টির জন্য আটকে গেছো। হ্যালো হ্যালো.. ও কি কিছু শুনতে পাচ্ছে না? এবার মনোজ টেক্সট করল। রেখা ,আজ ছোট পিসির বাড়িতে একটা মহা ঝামেলা হয়ে গেছে। এখন হসপিটালে আছি। জানি না আজকে বাড়িতে ফিরতে পারব কিনা?
রেখা লিখলো কি হয়েছে? ছোট পিসির কিছু সমস্যা হয়েছে?
মনোজ লিখলো 'বাবান..
কি হয়েছে ?রেখা বলল।
বাবান সুইসাইড এটেম করতে গেছিল।
রেখার যেন সব তালগোল পাকিয়ে যেতে লাগলো।
বাবান কেন সুইসাইড করতে গেল।
ওদিক থেকে মনোজ লিখল 'দুই ভাইয়ের মধ্যে গন্ডগোল।'
রেখা ভাবল 'ছোট পিসেমশাই মারা যাবার পর ছোট পিসি এমনিতেই ভেঙে পড়েছে।এবার ছেলেগুলোর মধ্যে যদি এরকম সমস্যা তৈরি হয় ।তাহলে তো ছোট পিসি সেটা মেনে নিতে পারবে না। মনোজ লিখল  'পরে গিয়ে সাক্ষাতে সব বলবো। তুমি নিজের যত্ন নিও ।গুড নাইট।'
রেখা ও গুড নাইট লিখল।
কিন্তু রেখা ভাবল আদপে রাত্রিটা কি ভালো যাবে?
যত দিন যাচ্ছে মানুষ যেন তত ধৈর্য  হারিয়ে ফেলছে ।হাজারো সমস্যা মানুষকে গ্রাস করছে 
কেউ ভালো নেই ।কেউ ভালো থাকার চেষ্টা করছে না। এদিকে বৃষ্টির রাত যেন রেখাকে গ্রাস করতে আসছে। আর ভাবছে বাবান যেন সুস্থ হয়ে যায় আর সোমদত্তা কি শেষ পর্যন্ত তার পুরনো প্রেমকে আঁকড়ে ধরতে চাইছে? তাতে কি ওর লাভবান হবে? কেন এই পাগলামীটা করছে ? আসলে প্রথম প্রেম তো ভোলা কষ্ট।





ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন"১৩ ক্রমশ

জাফর রেজা'র ছোট গল্প "ক্ষণিক বসন্ত "৩

স্বমহিমায় লিখে চলেছেন নতুন ধারাবাহিক লেখক জাফর রেজার ছোট গল্প "ক্ষণিক বসন্ত " 
মতামত দিন  আপনাদের  একটি  কমেন্ট লেখকের ১০০ লেখার  সমান মূল্যবান। 




                ক্ষণিক বসন্ত 
                                                                          ৩য় পর্ব 
 

কয়েকদিন যাবত প্রচন্ড ঠান্ডা পরছে, তাপমাত্রা হিমাংকের নিচে, এর মধ্যে আবার আমার গাড়ি খারাপ,  গ্যারেজে পরে আছে তাই অনেকটা পথ হেঁটে  বাসে উঠতে হয়।
কপালে নরম হাতের স্পর্শে  ঘুম ভাংল, দেখলাম বুলা আমার পাশে বসে, ওর একটি হাত আমার কপালে, আপনি কখন এলেন,  দরজা খুলে দিল কে ? 
-মন্টু ভাই। মন্টু  আজ কাজে যায়নি। মন্টুকে একটু ডাকবেন। না,  ওনাকে ডাকার প্রয়জন নেই উনি ঘুমাচ্ছে। বুলা আজ কি বার, সোমবার, আপনি কাজে যাবেন না, অফিসে বলে দিয়েছি আজ আসবনা, কেনো ? 
বুলা বেশ অভিমান নিয়েই বললো আপনি কেমন মানুয,  আজ ৩ দিন আপনি জ্বরে পড়ে আছেন, আমাকে একটা খবর দিলেন না। আপনার মোবাইল অফ, আমি যে কতবার কল দিয়েছি , শেষে দেখতে এলাম আমাকে না বলেই চলে গেলেন কিনা, ফোনে না পেয়ে আমি যে কি ছটফট করেছি, আপনি এমন কেন ?  বুলা আপনাকে দেখে আমার খুব ভাল লাগছে, মনে হয় অনেকটা ভাল হয়ে গেছি। থাক আর কিছু বলতে হবেনা, মন্টু ভাই বলেছেন ডাক্তার দেখান নি, উনি কিছু এন্টিবায়োটিক এনে দিয়েছে, তাই চলছে। হ্যাঁ তাতেই কাজ হয়েছে। বুলা বেশ রাগত স্বরে বলল আপনি কি ডাক্তার, কিছু বললাম না, বুলা আরও রাগত ভাবে বলল হাসবেন না,  আমি হাসির কিছু বলিনি। বুলা বাথ রুমে গিয়ে বালতিতে পানি নিয়ে এল।  আপনি উপর হোন, জিজ্ঞেস করলাম কি করবেন,  বলল কথা বলবেন না যা বলছি তাই করুন। আমার মাথা ভাল করে ধুইয়ে দিল, ভিজে টাওয়াল দিয়ে মুখ হাত পা মুছে দিল, আমি শুধু দেখলাম মেয়েরা প্রয়োজনে কত তারাতারি মায়ের ভুমিকা নিতে পারে। আমার খুব অস্বস্তি লাগছিল, বললাম বুলা কি কারণে
অফিসে যাবেন না তা কি ওদের জানিয়েছেন, অফিসে যাবনা মিনে করে ঘর থেকে বের হইনি, আপনি হারিয়ে গেলেন কিনা দেখতে এসে দেখি আপনার ঘরই শুধু অগোছালো নয় আপনি মানুষটাও অগোছালো , অফিসে বলে দিয়েছি হাসপাতালে এক বন্ধুকে দেখতে যাবো। আমি একটু বাইরে যাচ্ছি, ফিরে আসছি কিছুক্ষনের মধ্যে, আমি না আসা পর্যন্ত  চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকুন,  ঘরের চাবিটা নিয়ে গেলাম। বুলা চলে গেল।  এই প্রথম কারও জন্য আমি প্রতিক্ষায় রইলাম। আমার প্রতিক্ষার অবসান করে বুলা এল। 

চলবে...

রাবেয়া পারভীন এর ধারাবাহিক ছোট গল্প "কালো ক্যনভাস"


 আজ থেকে শুরু  হলো নতুন  ধারাবাহিক "ক্যানভাস "
লেখাটি পড়ুন এবং অন্যদের  পড়তে সহযোগিতা করুন  লেখককের মনের অন্দরমহলে জমে থাকা শব্দগুচ্ছ একত্রিত হয়েই জন্ম এই লেখার আপনাদের মূল্যবান কমেন্টে লেখককে  লিখতে সহযোগিতা করবে।    




কালো ক্যানভাস 
 
                                                 (১ম পর্ব) 

                                       নীলার  মনটা খুব ফুরফুরে  হয়ে আছে। আজকে সে একটা সরকারী কলেজে  প্রভাষক হিসেবে যোগ দেবে। বেশ সময় নিয়ে শাড়ী বাছাই করছিলো । প্রথম দিন কোন শাড়ীটা পরবে। খুব সাধারণ কিন্তু ব্যক্তিত্বপূর্ণ  হতে হবে। শেষ পর্যন্ত হালকা নীল  চওড়া রুপালী পাড়ের একটা শাড়ী বেছে নিল সে। সাথে সাদা রংগের একটা ব্লাউজ । চোখে  কাজল ঠোটে  হালকা গোলাপী  লিপষ্টিক।  সাজগোজ শেষ হবার পর নিজেকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আয়নায় দেখল কয়েকবার। মুচকি হেসে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচাল নীলা।
" কি মাস্টারনী  কেমন লাগছে ? " তারপর জোরে হেসে উঠল। নীলার মা  চা নিয়ে এলেন মেয়ের  জন্য। হাসির শব্দে  জিজ্ঞাসু চোখে  মেয়ের দিকে তাকালেন, " কিরে!  নীলা একা একা হাসছিস কেন ? 
মায়ের দিকে চেয়ে  মায়ের হাতথেকে চায়ের কাপটা নিয়ে ড্রেসিং টেবিলের উপরে রেখে হাত বাড়িয়ে মাকে বুকে জরিয়ে ধরে একটা ঘুরপাক খেল।
-আমার খুব আনন্দ লাগছে মা  তাই হাসছি । আজকে মনে হচ্ছে  আমিও পারি। পারব  পুরুষদের  পাশাপাশি তাঁদের সমমর্যাদার কাজ করতে।
ততক্ষনে মায়ের চোখেও চিক চিক  করছে আনন্দাশ্রু।
মেয়ের মাথায়  হাত বুলিয়ে দিয়ে  মেয়ের কপালে চুমু খেলেন।
- আমার লক্ষি মেয়ে,  অবশ্যই  পারবি। নে এবার চা টা খেয়ে  রওনা হ।  তোর আব্বু  গাড়ী  নিয়ে বসে আছেন  তোকে কলেজে নামিয়ে দিয়ে যাবেন।
- এইতো যাচ্ছি  মা দোয়া করো। 
সেন্ডেল পায়ে গলিয়ে , বাইরে বেরিয়ে এলো নীলা। আব্বু অনেকক্ষন। ধরে  অপেক্ষা  করছিলেন
- সরি  আব্বু তোমাকে দেরি করিয়ে দিলাম। দেখতো আব্বু আমাকে কেমন লাগছে ?  
মেয়ের  আনন্দ দেখে খুব ভালো লাগলো  জালাল সাহেবের। সেই ছোট্ট নীলা  তার আদরের মেয়ে আজকে কলেজের লেকচারার। হয়েছে। বাবা হিসেবে  তাঁর বুক গর্বে ভরে উঠল। 

                                                                                                                                         চলবে...

২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১

মমতা রায়চৌধুরী'র ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন"১২

অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করবার মতো আকর্ষণীয়  মমতা রায়চৌধুরী'র ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন" পড়ুন ও অপরকে পড়তে সহযোগিতা করুন 




                     টানাপোড়েন (পর্ব ১২)

                               কষ্ট


                                   সারারাত রেখা দু'চোখের পাতা এক করতে পারে নি। ভোরের দিকে একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন এসেছে। ঠিক তখনই ফোনে একটা ম্যাসেজ ঢুকলো,। সেই আওয়াজে ফোনটা সঙ্গে সঙ্গে বালিশের কাছ থেকে তুলে নিয়ে দেখল। গ্রুপে মেসেজ ঢুকেছে। চোখটা রোগরে নিয়ে  দেখল। আরে সাংঘাতিক ব্যাপার।
একদিক আনন্দের দিন  -এই কারণেই 26 শে সেপ্টেম্বর 'বাংলা গদ্য সাহিত্যের জনক এবং নারী শিক্ষার মূল কান্ডারী ,বিধবা বিবাহ প্রবর্তনের ঋত্বিক পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় 'এর জন্মদিন । তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের জন্য বিদ্যালয় এর তরফ থেকে ক্ষুদ্র আয়োজনের দায়িত্ব রেখার উপর পড়েছে। অন্যদিকে আরেকটি মেসেজ ঢুকেছে রিম্পদির ট্রান্সফারের রেকমেন্ডেশন এর।কালচারাল ফাংশন এর দায়িত্ব রেখার উপর বরাবরের জন্য পড়ে ,সঙ্গে রিম্পাদি ,পায়েল ,অনুরাধা সকলে সহযোগিতা করে। রিম্পাদির সঙ্গে রেখার জীবনটা এতটাই জড়িয়ে আছে যে ,‌রেখা এই মেসেজটা মন থেকে মানতে পারছে না। ভীষণ কষ্ট হচ্ছে ।তবুও ভাবছে রিম্পাদি এতদূর যাতায়াত করে ট্রান্সফার এর প্রয়োজন আছে ।কিন্তু রিম্পাদিকে যে এত সব কথা শেয়ার করে ,কখনো কখনো রেখার জীবনের পরামর্শদাত্রী হয়ে উঠেছে। সেখানে রেখা ভাবতেই পারছে না রিম্পাদি আর রেখার পাশের চেয়ারে বসবে না আর কখনও আদর করে গিয়ে বলবে না  'আয় তোর মাথাটা টিপে দি ,চা খা ফ্রেশ লাগবে,কখনো বলবে না তোর মনটা কি খারাপ ?আমাকে বল দেখ জলের মতো সব সহজ করে দেবো। জীবনের ঘটে যাওয়া দিনটির কথা গত রাতে যেভাবে মনে অনুরণন তুলেছিল।আজকে স্মরণ করতে পারছে না ।আজ তার হৃদয়ে বিদ্যালয়ে কিভাবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের দায়িত্বটা যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে পালন করবে ,সেই দিকটার প্রতি তার ধ্যান ।অন্যদিকে রিম্পাদির‌ চলে যাবার মেসেজ তার জীবনে এনেছে এক দুঃসহনীয় কষ্ট ।রেখা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না ,তার কি করা উচিত ?রেখা আজকের সকালে কোন কাজে মন দিতে পারল না । রিম্পাদিকে ফোনে মেসেজ করতে পারলো না। রেখা সকাল থেকে কোনো রকমে যেটুকু কাজ না করলে নয় ,সেটুকু করে নিয়ে তাড়াতাড়ি স্কুলের জন্য বেরিয়ে গেল । ওদিকে কাজের মেয়েটির খবর নেওয়া সম্ভব হয় নি। স্কুলে গিয়ে রিম্পাদি দেখছে গেটের কাছে একগাল হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু সেই হাসির ভেতরে ছিল মলিনতা ,ছেড়ে চলে যাওয়ার কষ্ট । আসলে এতদিন ধরে তো একটা আত্মিক বন্ধনে আবদ্ধ ছিল । রেখা রিম্পাদিকে দেখার পর গেটেই জড়িয়ে ধরল ,ছাত্রীরা কোথায় ? সেদিকে কোথাও তার নজর নেই আর ঝর ঝর করে চোখ থেকে জল পড়তে লাগল ।রিম্পাদিও কেঁদে ফেলল। 
রিম্পাদি বললো  'দেখ ,যেতে তো আমাকে হতোই ।মেয়েটাকে একটু সময় দিতে পারি না ।তোর দাদাও অফিসে চলে যায় ।আমি সারাটা সময় এখানে পড়ে থাকি ।মেয়েটাএখন উঁচু ক্লাসে উঠছে বুঝতেই পারছিস ।কিন্তু এত দ্রুত যে ট্রানস্ফারটা হবে এটা আমিও কল্পনা করতে পারি নি । দীর্ঘদিনের এই বিদ্যালয়ে কাজ করা (তাকে), অন্যান্য কলিগ এবং এবং স্নেহের ছাত্রীরা, সঙ্গে তোকে ছেড়ে যাবার কষ্ট ,যন্ত্রণা প্রতিক্ষণে  অনুভব করছি ।এই বিদ্যালয়ের বিভিন্ন কালচারাল অনুষ্ঠান ,ক্লাস,বিভিন্ন ধরনের কম্পিটিটিভ পরীক্ষার ডিউটি দেয়া , টিফিন আওয়ার্স, অফ টাইম,তার ফাঁকে দুজনার গল্পগুজব ,কখনো এই ফাঁকেই আধ ঘন্টা সময়ের জন্য ব্রেক, বেরিয়ে পড়া,মারকেটিং ,কত মজা, আড্ডা ,সাংসারিক নানা দুঃখকষ্ট শেয়ার ।নতুন স্কুলে গিয়ে মানিয়ে নিতে একটু অসুবিধা হবে ।কিন্তু রেখা তোকে আমি বলি মনের টানটা কোনদিনও শেষ হবে না ।মনের মন্দিরে এই টান সব সময চিরভাস্বর হয়ে থাকবে ।আর পারিবারিক বন্ধন তো আমাদের তৈরি হয়েই গেছে । মাঝে মাঝে আমার বাড়িতে চলে আসবি ।আমিও তোর বাড়িতে আসব ।শত ব্যস্ততায় অন্তত একদিন যেন আমরা পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে কথা বলা ,অন্তত মেসেজ করে জানা-এই ব্যাপারগুলো যেন আমরা রাখতে পারি ।এটা ধরে রাখিস। নে, চোখের জল মোছ।চল আজকে আমাদের নারী শিক্ষার অগ্রগতির ঋত্বিক ,আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের অনুষ্ঠান খুব সুন্দরভাবে পালন করি ।
রেখা বলল,'আমি আজকে কিভাবে সঞ্চালনা করব রিম্পাদি ।আমার কন্ঠ বাকরুদ্ধ, চক্ষু অশ্রুসিক্ত ,হৃদয় বেদনায় ভারাক্রান্ত ,বলো আমি কি করবো?
আমি বড়দিকে বলবো আজকের অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করতে পারবো না।'
রিম্পা দি বলল  'রেখা কখনো এরকম কাজ করতে পারে না। যে মহান আদর্শ পুরুষের জন্য আজকে আমরা এই শিক্ষার আলোতে আসতে পেরেছি এবং আমাদের কর্ম জীবনে আমরা স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছি, পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে একটা আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পেরেছি ,সবই ওনার জন্য ।তাই আমার মত একজন ক্ষুদ্র নারীর জন্য আজকের দিনটাকে অবহেলা করতে পারিস না ।রেখা চল তোকে নতুন উদ্যমে আজকের অনুষ্ঠান খুব সুন্দরভাবে পরিচালনা করতে হবে। আমি তোর পাশে আছি। রেখাকে রিম্পাদি নিয়ে স্টাফরুমে আসলে ,বড়দি বললেন  'মেইল চেক করতে গিয়ে এই কথাই ভাবছিলেন।কী আর করবে।আসা যাওয়া এটাই তো নিয়ম। তারপর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন স্টেডি হ ও ।' 
এরপর রেখাও অনুষ্ঠানের কাজ করতে গিয়ে দেখে অর্ধেক কাজ গুছিয়ে রেখেছে রিম্পিদি।বিদ্যাসাগর মহাশয় এর প্রতিকৃতি ভালো করে সাজান ,বাকি কাজগুলো রিম্পাদি আগেই করে রেখেছে ।আর যে দায়িত্বটুকু ছিল সেটুকু রেখা বুঝে নিয়ে তাড়াতাড়ি অনুষ্ঠান শুরু করে দিলো ।বড়দিকে প্রথমে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের প্রতিকৃতিতে মাল্যদান এর মধ্যে দিয়ে অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা এবং আগুনের পরশমণি গান দিয়ে উদ্বোধনী সংগীতে এই মহতী দিনের তাৎপর্যকে সামনে রেখে পরবর্তী অনুষ্ঠানটি ধাপে ধাপে এগিয়ে নিয়ে যেতে শুরু করল ।এরপর প্রতিটি শ্রেণীর থেকে এবং শিক্ষিকাদের পক্ষ থেকে পুষ্পার্ঘ্য ,মাল্যদানের মধ্যে দিয়ে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন হলো ,তারপর বক্তৃতা ,গান এবং বিদ্যাসাগরের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য একটা ক্ষুদ্র কুইজের অনুষ্ঠান করা হয়েছিল ।বিদ্যাসাগরের জীবনকে কেন্দ্র করে নানা প্রশ্নোত্তর ছাত্রীদের উদ্দেশ্যে রাখা হয়েছিল এবং পুরস্কারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল ।সমগ্র অনুষ্ঠানটি শেষ হয়ে যাবার পর রেখা আবার কান্নায় ভেঙে পড়ে ।
বড়দি আসলেন ও স্নেহের সুরে বললেন  
'রেখা কাঁদছো কেন ? রিম্পার খুব দরকার ছিল ।এটা তোমাকে বুঝতে হবে ।'
রিম্পাদি বলল  'আমিও তো সে কথাই বলছি দিদি। দূরে সরে গেলেই কি আমরা মন থেকে মুছে যেতে পারি ?তা তো নয় ।আমরা তো পারিবারিক এক মিষ্টি বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে গেছি ।আমরা নিশ্চয়ই পরস্পর পরস্পরের প্রতি সে দায়িত্ব পালন করব ।
রেখা বলছে  'বড়দি আমার মন মেজাজ ভালো নেই ।আমি কিছু ভাবতে পারছি না  ।'
বড়দি বললেন  'দেখো ,তোমাকেও একদিন হয়তো ট্রানস্ফার নিতে হবে? 
এতদিন তুমি ভাবো নি ।এবার ব্যাপারটা নিয়ে ভাবো ।কারণ দেখো তোমার প্রথম ইস্যুটা মিসক্যারেজ হয়ে গেছে ,এতদূর যাতায়াত এটা তো একটা তোমার জীবনে বড় বাঁধা তাই না ?তুমিও এবার ভাবো।'
 সত্যিই রেখা এতদিন ভেবে দেখে নি । মনোজ অনেকবার রেখাকে এটা বোঝাতে চেয়েছে। এমন কি টিপ্পনী পর্যন্ত কেটেছে , 'তুমি কার মোহে এতদূর যাতায়াত করো? '
আসলে রিম্পাদি সঙ্গে এতটা মনের মিল খুঁজে পেয়েছিল। কখনো ভাবতে পারে নি ।রিম্পাদি যখন চলে যাচ্ছে ,এবার হয়তো রেখাও করবে এপ্লাই। যদি পাওয়া যায় কাছেপিঠে। কিন্তু সেই নতুন জায়গায় ,নতুন পরিবেশে নতুন করে সকলকে মানিয়ে নেয়া কি সম্ভব? রিম্পাদি শুধু স্কুলের কলিগ নয় ,একজন পরামর্শদাত্রী, দিদি, বন্ধু । অনুষ্ঠান শেষ করে রেখা স্টাফ রুমে  মাথা নিচু করে বসে থাকল। শুধু মনে হচ্ছে সে সম্পূর্ণ একা ।উত্তাল সমুদ্রে কম্পাস বিহীন যেন একটা দিকভ্রান্ত জাহাজ, সামনে যেন ডুবো পাহাড়।
রিম্পাদি হিম গলায় এসে বলল 'তুই কি পাগল হয়ে গেলি? আমি কি বিদেশ চলে যাচ্ছি?'
রেখা জলভরা চোখে আর ভারাক্রান্ত কন্ঠে বলল  'তা হয়তো নয় কিন্তু আমার থেকে অনেক দূরে চলে যাচ্ছ ।ইচ্ছে করলেও আর প্রতিদিনকার মতো আমি তোমাকে স্পর্শ করতে পারবো না ।তোমার বুকে মাথা রেখে হিম শীতল ছায়ায়  শ্বাস নিতে পারব না। স্নেহের হাত ‌দুটিকে মাথায় রেখে আমাকে কে আশ্বাস যোগাবে বলো?-বলেই হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলো আর রিম্পাদিকে কাছে টেনে বললো ' তুমি আমার বুকের কাছে কান পেতে শোনো ,দেখো কি রকম কষ্টের ধুকপুকুনি।'


ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন"১২ ক্রমশ

জাফর রেজা'র ছোট গল্প "ক্ষণিক বসন্ত " ২য় পর্ব

আজ  থেকে শুরু হলো নতুন ধারাবাহিক লেখক জাফর রেজার ছোট গল্প "ক্ষণিক বসন্ত " 



ক্ষণিক বসন্ত
                                ২য় পর্ব 



                                হয়তো পারবো। বাসার ঠিকানা দিয়ে বললাম আপনি কাল সকাল ৯ টায় আমার বাসায় চলে আসুন, একসাথে বের হব। ৯ টার একটু আগেই বুলা চলে এল। ঘরে ঠুকেই আমার আগোছালো রুম দেখে বলল আপনি এভাবে থাকেন কিভাবে? বললাম অভ্যাস হয়ে গেছে, তাছারা আমার কোন অসুবিধা হয়না। বুলা কিছু না বলে আমার ঘর গুছাতে লেগে গেল, আমার দেখা ছাড়া আর কিছু করার ছিলনা। আমি বললাম বুলা দেরি হয়ে যাবে চলুন বের হওয়া যাক, আমার কথার উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞেস করল, আপনার অন্যরুমে কেহ থাকেনা? বললাম থাকে আমার বন্ধু, আজ ওর রাতের সিফটে ডিওটি, তাই ঘুমাচ্ছে। আমি মন্টুর দরজায় ধাক্কা দিতেই সারা দিল, বললাম উঠে আয় একজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেই, বুলার যদিও আপত্তি ছিল ওর ঘুম ভাঙাতে। পরিচয়ের পালা শেষে আমি রান্না ঘরে গেলাম কফি বানাতে। কয়েকদিন কেটে গেলো।
আমার বন্ধুর ট্রাভেল এজেন্সিতে বুলার কাজ হয়ে গেছে , সাপ্তাহিক বেতন ১৫০ পাউন্ড। আমার ভাল লাগলো যাক এখন ও ভালো ভাবে চলতে পারবে। বুলা ত দারুন খুশি। বলল চলুন আপনাকে কফি খাওয়াবো, বুলা আমার দেরি হয়ে গেছে আমাকে যেতে হবে, অন্য আরেকদিন আপনার কফি খাব। বুলা কাজ করছে,  বন্ধুর কাছে জানলাম ওর কাজে বন্ধু আমার খুশি। প্রতি রাতে বুলা কল করে, কেটে যাচ্ছে সময়, এগিয়ে যাচ্ছে দিন। সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলিতে আমরা চলে যাই বিভিন্ন জায়গায়, তবে ওর সবচেয়ে পছন্দের জায়গা টেমসের তীর।  একদিন টেমসের পারে হাটছি হঠাৎ  করেই ও বলল এই যে আমরা আজ এই নদীর তীরে  হাটছি।  আমাদের এই একসাথে পথ চলার সাক্ষী  কে জানেন, বললাম না জানিনা, বলল এই যে সীমাহীন আকাশ দেখছেন আর এই নদী , আমরা চিরদিন থাকবনা কিন্ত ওরা থাকবে, ওরাই সাক্ষী  হয়ে থাকবে আমাদের এই পথ চলার। দিন যায় মাস যায় সময় এগিয়ে যায়।  আমার মধ্যে কি যেন কাজ করে, আমি বুলার কলের জন্য অপেক্ষা করি, ওর সাথে দেখা হবার দিন অপেক্ষার প্রহর গুনতে থাকি।  মনের কোথায় যেন কি একটা অনুভব করি। একদিন গিয়েছিলাম হাইড পার্কে। সেদিন জানলাম ও বাঁশি  বাজাতে পারে, বাঁশি  ওর খুব প্রিয়, কিন্ত এখানে এসে বাজাতে পারছেনা, বললাম - বুলা,  বাশি এখানে পাওয়া যায় তবে অনেক দাম। আমি ২/১ সপ্তাহের মধ্যে দেশে যাবো আসার সময় আপনার জন্য বাঁশি  নিয়ে আসবো বুলা অবাক হয়ে বললো আপনি দেশে যাবেন, আমাকে বলেননি তো ! বললাম এই যে বললাম। ও হয়তো কষ্ট  পেয়েছে, বললাম আসলে এখনো টিকেট কেনা হয়নি, তাই বলিনি, ভেবেছি টিকেট নেবার পর বলবো। কতদিন থাকবেন? ৪ সপ্তাহ। ঠিক ৪ সপ্তাহ তো ? বললাম হ্যাঁ । দেখুন ৪ সপ্তাহের বেশি হলে আমি কিন্ত রাগ করবো , বুলে অনেকটা অভিমানী কণ্ঠে  বললো আমি এই ৪ সপ্তাহ থাকবো কিভাবে,  বললাম কাজের মধ্যে সময় কেটে যাবে, তাছাড়া আমিতো দেশ থেকে কল করবো । ও কিছু বললো না।  হটাৎ  করেই ওর সহজাত হাসি খুশি মুখটা মলিন হয়ে গেল। আমারা চুপচাপ হাটছিলাম, হঠাৎ  করেই আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, আচ্ছা এই যে সমাজ, সমাজ ব্যাবস্থা এইসব তো আমাদেরই গড়া  না কি?  বললাম হ্যাঁ । তবে সমাজ কেন মানুযের সুন্দর স্বপ্নে বাধা হয়ে দাড়ায়। কি উত্তর দেব ওর প্রশ্নের, বললাম চলুন ফেরা যাক। ধরা গলায় বললো আরেকটু থাকিনা।


ধারাবাহিক "ছোট গল্প " ক্রমশ 

২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১

মমতা রায়চৌধুরী'র ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন"১১

অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করবার মতো আকর্ষণীয়  মমতা রায়চৌধুরী'র ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন" পড়ুন ও অপরকে পড়তে সহযোগিতা করুন  । 



                                              টানাপোড়েন (১১)

                                                                   অস্পষ্ট ধ্বনি


রেখার বৃষ্টি ভেজা রাতে একটা দুশ্চিন্তা তো মনকে গ্রাস করেইছিল। কিন্তু হঠাৎই পাশের বাড়ির ছেলেটার আবার গলা পেল  'রিমঝিম গিরে শাওন।সুলাগ সুলাগ যা এ মন।.. মরসুম মে ...।'গানটা কেমন মাদকতা এনে দিল রেখার শরীরে ও মনে। রেখা আস্তে করে জানলাটা খুলে বাইরের পরিবেশটা দেখার চেষ্টা করল। বৃষ্টির ছাট এসে চোখে মুখে পড়ছে।রেখা হাতটা জানলা দিয়ে বার করলো কি অসাধারণ একটা অনুভূতি রেখাকে নিয়ে গেল ছয় বছর আগের জীবনে। অনেক পুরুষ তার জীবনে এসেছে। সেভাবে কারো ডাকে সাড়া দিতে পারে নি। কি বিয়ের আগে ,কি বিয়ের পরে। ঘটনাটা বিয়ের পরে ঘটেছে। সবেমাত্র স্বামীকে ছেড়ে স্কুল-কলিগদের সঙ্গে কাটিয়ে এসেছে বিষ্ণুপুর ।বিষ্ণুপুর এর ঐতিহাসিক ঘরানায় আর সঙ্গে মুকুটমণিপুরে গিয়ে বসন্ত মরসুমে লাল পলাশের সমারোহ ,আদিবাসীদের আনাগোনা। নির্জন বনানীতে কয়েকবার তো বসেই পড়ল রেখা । লাল পলাশ ফুলগুলোকে হাতে তুলে চোখেমুখে মাখছে , রিম্পা দি ও পায়েল বলল ' কিরে তোর কি নতুন করে প্রেম এসেছে? দাঁড়া মনোজদাকে বলছি
 ফোন করে।


     অলঙ্করণ: সোমাশ্রী সাহা

রেখা বলল  'আমার বয়েই গেছে, আমরা সবাই রাজা এই রাজার রাজত্বে, বলেই নাচতে শুরু করলো। ব্ল্যাক জিন্স আর গোলাপি গেঞ্জিতে কি অসাধারণই নাকি লাগছিল? এটা অন্যান্যরা বলেছিল। তিন-চারদিন হইহুল্লোড় করে ওখানে কাটিয়েছিল ।জীবনে এই প্রথম একাকী কোথাও যাওয়া পরিবারের সদস্য ছাড়া। কিন্তু সেখানে গিয়ে একটা গলায় কাঁটা বিঁধে ছিল সেটা হল বোর্ডের খাতা । এই ব্যাপারটা নিয়ে বেশি কিছু বলতে চাইছে না রেখা ,মনেও করতে চাইছে না। তবুও মনে পড়ে। ওখান থেকে ফিরে আসার পর সেই খাতার জন্যই ঘটেছিল তার জীবনে এক স্মরণীয় ঘটনা। ফেরার  একদিন পরে হেড এক্সামিনারের বাড়িতে খাতা জমা দিতে যেতে হবে ।এমনিতেই বাড়ি থেকে বেরোতে লেট হয়ে গেছে। ট্রেন পায়নি ।শেষ পর্যন্ত ভাবল ব্রেক করে করে বাসে যাবে। নির্দিষ্ট টাইম এ বাসস্টপে এসে বাস না পেয়ে সে ভাবল বাইপাস থেকে বাস ধরবে। কিন্তু সেখানে যেতে হলেও একটা অবলম্বন দরকার ওই সময় সে দিশেহারা হয়ে গেছিল।এমন সময় একটি ছেলে বাইক করে যাচ্ছে ,অনেকক্ষণ ধরেই রেখাকে ফলো করছিল। প্রথম দিকে একটু বিরক্তি লেগেছিল। তারপর দাঁড়িয়ে রেখা এদিক ওদিক তাকাচ্ছে কিসে যাবে? 
তখনই কাছে এসে ছেলেটি বলল ' আপনি কি লিফট চাইছেন?
রেখা কোন কথার উত্তর দিল না। এমন সময় ফোন আসলো 'হ্যালো'
ফোনের ওপার থেকে প্রশ্ন এলো'আপনি কখন খাতাগুলো নিয়ে আসবেন?'
হাঁ স্যার, একটু দেরী হবে আমি ঠিক পৌঁছে যাব।
সে তো আসবেন আমাদের তো একটা সময় আছে কোথাও না কোথাও সিডিউল করা থাকে।
রেখা বলল 'স্যার এ বারটা ক্ষমা করে দিন।
ছেলেটি তখন নির্লজ্জের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে আর মিটমিট করে হাসছে। 
আবার কাছে আসলো এবং হেসে এসে বলল 'ম্যাডাম আপনি স্কুল টিচার? দেখুন আমি কিন্তু আপনার উপকারই করতে চেয়েছি। ফোনে বলছিলেন  খাতার ব্যাপারে আপনার লেট হয়ে যাচ্ছে, তাই..?
তখন রেখা মনে মনে ভাবল তাই তো লিফট  নিলে কি অসুবিধা আছে? এবার একটু হেসেই রেখা বলল  ' হ্যাঁ। আসলে আমার হেড এক্সামিনারের বাড়িতে যেতে হবে।'
ছেলেটি আবার হেসে বলল  'সে জন্যই তো বলছি চলুন ,আপনাকে লিফট দিচ্ছি।'
রেখার একটু কিন্তু কিন্তু ছিল কিন্তু অপারগ হয়েই শেষ পর্যন্ত চেপে পড়ল বাইকে। এই বাইকে চাপা  যে পরবর্তীকালে তার কাল হবে কে জানত?
  ছেলেটি জিজ্ঞাসু কন্ঠে বলল ' কোথায় যাবেন?
রেখা বলল 'আপনি আমাকে বাইপাসে নামিয়ে দিলেই হবে। '
তারপর ছেলেটি নিজেই যেচে নিজের পরিচয় দিতে লাগলো। আমি একটি ব্যাংকে চাকরি করি। আমার নাম সমীরন। 
বয়স খুব বেশি নয়।কথাবার্তা বেশ ভালই লাগলো রেখার।
শেষে ছেলেটি  জিজ্ঞেস করল ' ম্যাম আপনার নাম?'
 রেখা কিছুতেই নামটা বলতে চাইছিল না কিন্তু পরবর্তীকালে ভাবল এতটা উপকার করল নামটুকু বললে কি এমন হয়ে যাবে? 
তখন সে বলল  'আমি রেখা ।
এবার ছেলেটি হঠাৎ করেই গাড়িটা এমন ব্রেক কষলো রেখা ছিটকে ওর গায়ে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সামলে নিল। 
ছেলেটি বলল  ' আমাকে ধরে বসুন না। হাতে লাগেজ আছে?'
রেখা বলল 'না না আমি ঠিক আছি।'
এরপর ছেলেটি জিজ্ঞাসা করল 'আপনার কি নতুন বিয়ে হয়েছে?'
রেখা এ প্রশ্নের কোন উত্তর দিলে না।
আবার ছেলেটি প্রশ্ন করল  'আপনার বাচ্চাকাচ্চা আছে?'
রেখা ভাবছিল কি অদ্ভুত ব্যাপার লিফট দিয়েছে বলে তাকে এত কিছু বলতে হবে নাকি ?
আবারো রেখা চুপ।
এবার ছেলেটি বলল  'কেন আমাকে বললে কি আপনার কোন অসুবিধা আছে?'
এবার রেখা বলল  'হ্যাঁ ।সে তো আছেই। হঠাৎ আপনি গায়েপড়ে এতগুলো কথা জিজ্ঞেস করছেন কেন?
ছেলেটি বলল  'ম্যাম রেগে যাচ্ছেন? ঠিক আছে আপনাকে বলতে হবে না।'কথা বলতে বলতেই বাইপাসে এসে গেল। 
রেখা বলল  'ঠিক আছে আপনি এখানে নামিয়ে দিন। নেমে একটা থ্যাংকস জানাল। 
ছেলেটি কিন্তু বাইকটা নিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে থাকলো। রেখা এবার বারবার ঘড়ি দেখছে ।বাসের টাইম? বাইপাসের ধারে থাকা লোকজনকে জিজ্ঞেস করল দূরপাল্লার গাড়ি কি বেরিয়ে গেছে, বহরমপুর যাওয়ার?
অচেনা ব্যক্তি বললেন এই তো একটু আগেই গেল আপনার আসার মিনিট দুয়েক আগে। এবার রেখা ভারি চাপে পড়ে গেল। ছেলেটি কিন্তু তখনও মিটিমিটি হাসছে। পাশে অনেক যুবক-যুবতী এমন গায়ে পড়ে সাথে গায়ে লেপ্টে দাঁড়িয়ে আছে কেমন অসহ্য লাগছিল। পাশে এক পেঁপে বিক্রেতা পেঁপে নেবে নেবেন বলে হাঁকছে। পাশে  এক আখের রস বিক্রেতাকে ছেলেটি বলল  'দু গ্লাস আখের রস দিন।'একটি গ্লাস নিজের হাতে অপরটি রেখার  কাছে এগিয়ে ধরল। বলল 'এই নিন আখের রস খান। চিন্তায় আছেন তো? রিল্যাক্স করুন।'
রেখা খাবে কি খাবে না দোটানায় পড়ল। ছেলেটি এমন ভাবে হাতের কাছে এনে দাঁড়িয়েছে ,না করতে পারছে না ।শেষ পর্যন্ত অনিচ্ছাকৃতভাবে নিতে হলো গ্লাসটি। তারপর টাকা মেটানোর সময় রেখা নিজের থেকেই দেখল এটা তার ভদ্রতায় লাগে ।তাই বলল দামটা রেখাই দেবে। 
ছেলেটি বলল  'কেন আমি তো আপনাকে অফার করেছি ।দামটা আমি দেব। '
রেখা বলল  'না আমি দেবো।'
শেষে ছেলেটি বলল  'ঠিক আছে ।আবার যদি কখনো দেখা হয় ,তখন আপনি আমাকে খাওয়াবেন ওটা due থাক। রেখাকে হার মানতে হলো।
 ছেলেটি বলল  _ম্যাডাম এখন কি করবেন?
রেখা একটু চিন্তিত মুখে বলল ' হ্যাঁ, তাই তো ভাবছি।'
ছেলেটি ভরসার সঙ্গে বলল  'নিজেকে দেখিয়ে আমি আছি। '
এবার রেখা সত্যি সত্যি হেসে ফেললো। ভাবলে ঠিকই তো ,তার জীবনে যেন উদ্ধারি দূত হয়ে এসেছে। ছেলেটি বলল  'চলুন আপনাকে পৌঁছে দেবো আপনার হেড এক্সামিনারের বাড়িতে।'
রেখা বলল 'আপনি কেন যাবেন আমার জন্য।'
ছেলেটি বলল 'সেটা তো বলতে পারি না। তবে কেমন যেন মনে হলো আপনার উপকারটা করি।'
এবারে রেখা হেসে বলল  ' ঠিক আছে চলুন। থ্যাঙ্ক ইউ।'
ছেলেটি বলল  'থ্যাঙ্কস কিসের জন্য? আগে আপনাকে পৌঁছে দিই ।তারপরে না হয় থ্যাংকস জানাবেন।'
রেখা বলল  'ঠিক আছে। আপনার সঙ্গে আমি কথায় পেরে উঠব না ।চলুন।'
যেতে যেতে হঠাৎ বৃষ্টি ।রেখা!তো ভিজে একাকার হয়ে গেছে। ছেলেটি বলল আপনার তো খাতা আছে। কি হবে ।এদিকে তো ভিজে গেছেন। কিছু মনে করবেন না ম্যাম একটা কথা বলব?
রেখা বলল  'হ্যাঁ বলুন না?
বলছি আমার কাছে রেনকোট আছে কিন্তু আমি তো গায়ে দিলাম না ।কারন আপনি ভিজে যাচ্ছেন।আমি কি করে গায়ে দিই বলুন? তারচেয়ে রেনকোটটা দিয়ে আপনার ওই খাতাগুলোকে গার্ড করুন। বলেই নিজের থেকে খাতাগুলো আমার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে রেনকোট দিয়ে মুড়িয়ে দিলে। আর বললে এবার ও কি আমাকে ভয় করছে?'
রেখা একদম ঝাঁসির  রানীর মত উত্তর দিল। ভয় ,ভয় পাবো কেন ?আপনি বাঘ, না ভাল্লুক?
ছেলেটি উত্তর দিলো হেসে 'আমিও তো সেটাই জানি আমি বাঘ না ,ভাল্লুক নয়। তবে আপনার সঙ্গে আজকের এই দীর্ঘ সময়ের  রাস্তাটা আমার সারা জীবন মনে থাকবে ।'
রেখা বলল  'কেন আপনি কখনো এরকম কাউকে নিয়ে বাইকে চাপান নি?'
ছেলেটি বলল্য' হ্যাঁ মিথ্যে বলব না ।চাপিয়েছি কিন্তু আপনার সঙ্গে একটা আমার অন্যরকম অনুভুতি হলো ।জানি না কেন হল, এ প্রশ্নের কোন ব্যাখ্যা নেই। বলতে বলতেই গন্তব্য স্থানে এসে গেল। 
রেখা বলল  'এখানেই নামিয়ে দিন।'
 ছেলেটি বলল 'একটা সত্যি কথা বলবো?'
 রেখা জিজ্ঞাসু নেত্রে তাকালো।
আপনাকে আমার ভীষণ ভালো লেগেছে।
রেখা তো অবাক হয়ে গেল ,একটু হেসে চলে গেল।
ছেলেটি পিছু ডাকলো শুনুন? বলেই একটা ভিজিটিং কার্ড রেখার হাতে ধরিয়ে দিল। রেখা আবার উৎসুক ভরে তাকিয়ে । 
ছেলেটি বলল  'রাখুন কখনো যদি প্রয়োজন লাগে।'
রেখা মনে মনে ভাবল, আর কি প্রয়োজনে লাগবে আর তোমার সঙ্গে আমার দেখা হচ্ছে না চাঁদ।'
রেখা একটা থ্যাঙ্কস জানিয়ে চলে গেল।
 কিন্তু পরবর্তী ক্ষেত্রে তার জীবনে ছেলেটি কিভাবে জায়গা করে নিয়েছিল ।সেটা ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ করে ফোনের আওয়াজে রেখা ফিরে আসলো তার আসল জায়গায়।
ফোনটা রিসিভ করল '
হ্যালো'।
মনোজ বলল  'এই রেখা আজকে আমি ফিরতে পারবো না ।তোমাকে কিছুতেই ফোনে পাচ্ছিলাম না।'
এদিকে একটা ঘটনা ঘটে গেছে। রাত হয়ে গেছে কালকে অফিস করে একেবারে বাড়ি ফিরব। তারপর বলব।'
রেখা বলল ' ঠিক আছে।'
অন্য সময় হলে মনোজকে রাগ দেখাত ,অভিমান করতো ।কিন্তু আজকে তার সেই মন কোন কথাই বলল না। সে যেন আজকে একাকী থাকতে চাইছে আর পুরনো স্মৃতিগুলো রোমন্থন করতে চাইছে। আজ তার ঘুম আসবে না বোধ হয় ।মাথার ভেতর সহস্র ধুনি যেন কেউ জ্বালিয়ে দিয়েছে ।শরীরের ভেতরে রন্ধে রন্ধে যেন অসহ্য জ্বালা। অন্ধকার বৃষ্টির রাত তাকে টেনে নিয়ে যেতে চাইছে ছয় বছর আগে ঘটে যাওয়া দিনগুলোতে। আবার ফোনটা বেজে উঠলো, হ্যালো।
কিন্তু বৃষ্টির শব্দ আর ফোনের লাইনের ডিস্টার্ব এর জন্য কিছু বোঝা যাচ্ছে না। অস্পষ্ট ধ্বনি গুলো যেন তার কাছে নুতন করে স্পষ্ট হতে চাইছে।

ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন"১১ ক্রমশ

জাফর রেজা'র ছোট গল্প "ক্ষণিক বসন্ত "

আজ  থেকে শুরু হলো নতুন ধারাবাহিক লেখক জাফর রেজার ছোট গল্প "ক্ষণিক বসন্ত " 




ক্ষণিক বসন্ত


( ১ ম পর্ব ) 

                       সারাদিন গুড়িগুড়ি বৃষ্টির পর, এখন যেন আকাশ ভেঙে পরেছে। এয়ারপোর্টে কিছু কাজ ছিল, কাজ শেষ করতে একটু রাত হয়ে গিয়েছিল। বাসায় ফিরছি, বৃষ্টির  জন্য গাড়ি আস্তে চালাচ্ছিলাম।
লন্ডনের ফাকা রাস্তা বৃষ্টির জন্য মনে হয় আরও ফাকা হয়ে গেছে।
হটাৎ চোখে পরলো বাস ষ্টপে একটি মেয়ে হাত তুলে লিফট চাইছে। দ্বিধা দন্ধ নিয়ে গাড়ি থামালাম, আমি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই মেয়েটি জিজ্ঞেস করলো আপনি কোন দিকে যাবেন, কোথায় যাব বলতেই সে বললো তার বাসাও ঐ দিকেই, বাসের জন্য অনেক্ষন অপেক্ষা করছে কিন্তু বাস পাচ্ছেনা, এখন আমি যদি দয়া করে তাকে লিফট দেই খুব উপকার হয়। দরজা খুলে দিয়ে বললাম উঠুন।
মেয়েটির দিকে তাকালাম, সম্ভবত বাংলাদেশী অথবা ভারতীয় হবে। আলাপচারিতায় জানলাম উনি ভারতের জলপাইগুড়ির মেয়ে, এখানে পড়ালেখা করতে এসেছে। দেশ থেকে যা শুনে এসেছে এখন দেখছে তার সাথে কোন মিলই নেই। এখানে থাকার মতো মুটামুটি একটি জায়গাও নেই, এক রুমে ওরা ৪ জন থাকে।  একটা চাকুরীও যোগার করতে পারেনি। ওর কথা শেষ হতে হতে তার বাসার সামনে এসে পরলাম। 

           ওর বাসার সামনে নামিয়ে দিলাম, নামার আগে বলল ধন্যবাদ, আমার সেল নাম্বারটি চেয়ে নিল। ওর বাসা আমার বাসা থেকে দুরে নয় মাত্র ৫ মিনিটের ড্রাইভ। কেটে গেল দুটো দিন। বিকালে অফিসে হিসাব মিলাচ্ছি এমন সময় অপরিচিত নাম্বার থেকে কল, রিসিভ করলাম, অপরিচিত মেয়েলি কন্ঠ, নাম জানতে চাইলাম, বলল, বুলা বলছি, সেই রাতে যে লিফট দিয়েছিলেন, মনে নেই, জিজ্ঞেস করলাম কেমন আছেন, বলল ভাল নেই আমাদের কি একটু দেখা হতে পারে?  বললাম কোথায়, বলল হোয়াইয়চ্যাপলে একটা কফি সপ আছে ওখানে চলে আসুন ঠিক ৬ টায়, বললাম ঠিক আছে। কফি সপের সামনে গিয়ে দেখি বুলা দাড়িয়ে আছে, জিজ্ঞেস করলাম দাড়িয়ে কেন ভিতরে বসলেই পারতেন, বলল,  কোন অসুবিধা হচ্ছেনা,   বললাম চলুন ভিতরে গিয়ে বসি। দুজনে মুখোমুখি বসলাম। জিজ্ঞেস করলাম কফির সাথে কি খাবেন? বললো শুধু কফি। বুলা ভারতের জলপাইগুরির মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে , বাবা সরকারি চাকুরীজীবি মা গৃহিনি দুই ভাই বোন, ভাই ওর ছোট, কলেজে পরে। বাবার জমানো টাকা আর কিছু ধার দেনা করে স্টুলন্ড ভিসায় লন্ডন এসেছে। লন্ডনে এক রুমে ও আর তিন মেয়ে থাকে। বুলা একটি পার্টটাইম  কাজ করে, সাপ্তাহিক বেতন খুবই সামান্য যা দিয়ে ওকে হিমসিম খেতে হয়। ওর কথা শোনার পর কিছুক্ষণ চুপ থাকলাম,  বুলা বললো কিছু বলছেন না যে, আমি বললাম এখানে মোটামুটি ভাবে চলতে গেলে আপনাকে পড়ালেখা ছাড়তে হবে,  আমার কথায় আপনি যদি আঘাত পেয়ে থাকেন তবুও এটাই বাস্তবতা। কারন আপনি না দিতে পারবেন টিউশন ফি না পারবেন ঘর ভাড়া আর খাওয়া ও যায়ায়ত খরচ তো আছেই।  বুলা অনেক্ষন চুপ করে থেকে বলল এখন আপনই বলুন আমার কি করা উচিৎ। পড়া লেখা যে চালিয়ে যেতে পারবেন না তা তো অবশ্যই বুজতে পারছেন, এখন কি করে এই দেশে  একটু ভালভাবে থাকা যায় সেই চেস্টাই করা উচিৎ।  বুলা আবারও অনেক্ষন চুপ করে রইল তারপর মুখ তুলে আমার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল,  পড়া লেখা চালিয়ে যেতে পারবনা তা জানি।


        
    অলঙ্করণ : প্রীতি দেব

                              বুলার দিকে তাকালাম, সাধারণ এক বাঙালী মেয়ে, কিন্তু মুখখানি যেনো ভোরের সূর্যের মতো, মায়াবী চোখ দুটোতে যেনো নতুন দিনের ইশারা।
ভাবলাম এই মেয়ে যার ঘরে যাবে, তার ঘর আলোয় ভরে যাবে।
বললাম, এখন কি করবেন ঠিক করেছেন ? আবারো কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো, কি আর করবো একটা ফুল টাইম কাজ নেবো, তারপর দেখি।
আমরা দুজনেই চুপ করে রইলাম। নিরবতা ভেঙে বুলা জিজ্ঞেস করলো, আপনি কোথায় থাকেন?  বললাম আপনার কাছাকাছি।
জিজ্ঞেস করলাম, এখানে আপনার আত্মীয়স্বজন বা পরিচিত কেউ নেই ? বললো, আছে দূরসম্পর্কের এক পিসি যোগাযোগ নেই।
জিজ্ঞেস করলাম উনি জানেন আপনি লন্ডন আছেন ?
বললো, তা জানেন।
বুলা চলুন উঠা যাক।
রাতে শোবার আয়োজন করছিলাম এমন সময় বুলার কল, জিজ্ঞেস করলো শুয়ে পরেছেন, বিরক্ত করলাম না তো ?
বললাম, না এখনো শুইনি, শোবার আয়োজন করছিলাম, বুলা আপনি বলুন।
--- একটি কথা বলবো কিছু মনে করবেন না তো ?
--- বুলা আপনি বলুন।
বুলা খুব অসহায় কণ্ঠে বললো, আপনি কি আমাকে একটা কাজ যোগার করে দিতে পারবেন ?  যাতে মোটামুটি ভাবে চলতে পারবো । 



ক্রমশ

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১

মমতা রায়চৌধুরী'র উপন্যাস "টানাপোড়েন"১০

অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করবার মতো আকর্ষণীয়  মমতা রায়চৌধুরী'র ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন" পড়ুন ও অপরকে পড়তে সহযোগিতা করুন  ।




                        টানাপোড়েন (পর্ব ১০)
                                         
                                        দুশ্চিন্তা



                                                   রেখা ভেবেই  রেখেছিল আজ অলস ছুটির দুপুর, মনোজ ব্যারাকপুরে ছোট পিসি শাশুড়ির বাড়ি যাবে।সারা দুপর শুধু ঘুম আর ঘুম। সকাল সকাল কাজ গুছিয়ে নিয়েছে। পুটু রবিবার আসবে না ।সারা নির্জন দুপুরে রেখার শুধু ঘুম আর ঘুম।একটা ম্যাগাজিন ওল্টাতে ওল্টাতে কখন যে ঘুমিয়ে  পড়েছে। হঠাৎ কাকিমা কাকিমা বলে চিৎকার,ঘুম জড়ানো চোখে কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করলো। হ্যাঁ, রেখাকেই তো ডাকছে। বৃষ্টি পড়ছে ছাদে জামাকাপড় ভিজে যাচ্ছে। তাকিয়ে দেখে পাশের বাড়ির চৈতালি। ওর সাথে চোখাচোখি হতেই বলল  'কখন থেকে ডাকছি কাকিমা।'
আরে তুই কবে এসেছিস?
জানতেই পারি‌ নি তুই এসেছিস।
চৈতালি বলল  'পাঁচ ছয় দিন হবে। আসলে তুমি স্কুল নিয়ে এ‌ত ব্যস্ত। বেরিয়ে যাও সেই সকাল সকাল। এ দিকে ঢোকো অনেক দেরীতে। ভেবেছিলাম আজ দুপুর বেলায় আসব। তারপর তোমার কোন সাড়া শব্দ পেলাম না। ভাবলাম ছুটির দিন হয়তো তোমার কাজ আ‌ছে ‌।পরে সন্ধ্যের দিকে আসবো।
 রেখা বলল  'দাঁড়া চৈতি ।-বলেইছুটে গিয়ে জামাকাপড় নামিয়ে নিয়ে আসল। কিন্তু একটু ভিজে গেল। চৈতালি তখনো দেখে জানলার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। 
রেখা জিজ্ঞেস করল  'তুই কি একবারে চলে আসলি। শ্বশুরবাড়িতে শাশুড়ি মা সাধ খাইয়ে দিয়েছে?
চৈতালি  চুপ করে আছে ।তোর ক মাস হল। ১0 এ পা দিলি না? আসলে জানলার ধারে দাঁড়িয়ে আছে ।ওকে বোঝাই যাচ্ছিল না। শেষে কাঁদতে শুরু করল।
 কান্নার আওয়াজে ওর মা ছুটে আসলো। ওর মা বলল  'আর ব'ল না দিদি বাচ্চাটা তো নষ্ট হয়ে গেছে।'
রেখা অবাক ব্যাগ্রভাবে  বলল "কি করে?
চৈতির মা বলল  "আমাদের পোড়া কপাল। মাসে মাসে যে ডাক্তার দেখানোর কথা ,ইনজেকশন নেওয়ার কথা সেগুলো শ্বশুরবাড়িতে কোন ব্যবস্থাই করে নি।'
রেখা অবাক হয়ে বলল,'সে কি? ওর শাশুড়ি মা তো ভালো। তাহলে এরকম কাজ করলেন কেন?
চৈতির মা বলল  'আমরাও তো ভালোই জানতাম । এখন দেখুন তার মুখোশটা বেরিয়ে এসেছে। ওরা চায় না ওর সন্তান হোক।'
রেখা বলল  'এ আবার কি কথা?'
চৈতির মা বলল ' কি আর বলব দুঃখের কথা দিদি। ওর ননদের বাচ্চা আছে ,তাই বলছে আর বাচ্চা নিয়ে কি হবে?বাচ্চাটা নষ্ট হয়ে গেছে ,ওর শাশুড়িমার কোনো হেলদোল নেই। বরং ওকে বলেছে তুমি বাবার বাড়িতে যেতে চাইলে চলে যাও ।এরপরে আর যেতে পারবে না। যেতে হলে আজই যেতে হবে। তখনো ওর ঐ রকম ব্লিডিং হচ্ছে ।মনের অবস্থাটা ভাবো দিদি।মেয়ে ফোন করাতে আমরা গিয়ে নিয়ে আসলাম।'
রেখা চিন্তিতভাবে বলল  ' আর ওর বর। সেও চায় না?'
চৈতির মা বলল  'একটা ছেলে ,মায়ের কথায় ওঠে বসে...বলেই চুপ করে গেল।'
রেখা বলল 'তাই বলে নিজের সন্তানের সঙ্গে কম্প্রোমাইজ?
চৈতির মা বলল "মেয়েকে তখনই বলেছিলাম নিয়ে আসি। ও রাজি হয়নি। ভেবেছিলো বাবা-মায়ের সংসারে টানাটানি। নুন আনতে পান্তা ফুরায়।আবার গিয়ে খরচ বাড়াবো? এই ভাবনাটা ওর কাল হলো।'
চৈতি তো কেঁদেই চলেছে।
রেখা মনের কষ্টটা অনুভব করে বলল ' কাঁদিস না ?গাছ থাকলে ফল ধরবে। তুই আগে সুস্থ হ।
চৈতির মা বলল  'আমরা শোনামাত্রই দিদি নিয়ে চলে এসেছি। ভালো করে ডাক্তার দেখিয়ে ,তারপরে ছাড়বো।
এতক্ষণ পর চৈতালি বলল 'মা বাবা ।মা বাবাই হয় ,কাকিমা।
রেখা ব‌লল  তুই তো বলেছিলি তোর শাশুড়ি মা খুব ভালো।
 চৈতির মা বলল 'বিয়ের পর কটা মাস ভালই ছিল। কিন্তু এখন পুরো অন্য রকম। ওকে এই অবস্থাতেও সব কাজ করিয়েছে ।ছেলের সামনে কিন্তু করায় নি ।ছেলে অফিসে চলে গেলেই সব কাজ ওকে দিয়ে করানো হতো। অথচ ডাক্তার ওকে বেড রেস্টে থাকতে বলেছিলেন।একথাগুলো মেয়ে আমাদেরকে জানায় নি। জানলে তো তখনই নিয়ে আসতাম।  এত বড় ক্ষতি তো আর হতে পারত না।'বলেই কাঁদতে লাগল।
রেখা বলল  'যা হবার তো হয়েই গেছে। এবার থেকে সাবধানে। ডাক্তারের কথামত চলবি।'
চৈতির মা বলল  'আমিও বলেছি ডাক্তার ক'মাস পর বাচ্চা নেওয়ার কথা বলেছেন। তখন  বাচ্চা পেটে আসলে আমাদেরকে জানাতে, আমরা তোকে গিয়ে নিয়ে আসবো। আমাদের সাংসারিক অনটনের কথা তোকে ভাবতে হবে না।'
রেখা বলল  'একদমই ঠিক কথা দিদি। এই চৈতি মন খারাপ করিস না আসিস হ্যাঁ বাড়িতে।'
চৈতির মা বলল  'সব সময় মন খারাপ করে বসে থাকে। ওই দেখো বকবক করেই যাচ্ছি।এদিকে তোমার সব জামাকাপড় ভিজে গেছে না গো। অনেকক্ষণ থেকেই ডাকছি আসলে ঘুমিয়ে পড়েছিলে তো।
রেখা বলল 'হ্যাঁ কি করে যে এত ঘুমিয়ে পড়লাম।'
চৈতির মা বলল  'পুটু কাজে আসে নি তো আজকে?'
রেখা বলল   'সে‌  তো আজ কদিন থেকেই আসছে না।'
চৈতির মা বলল ্'আজকে দেখলাম অটো করে যেতে'
একটু অন্যমনস্ক ভাবে যাচ্ছিল ।চোখে-মুখে চিন্তার ছাপ ছিল। আর কিছু জিজ্ঞেস করলাম না ।তখন আমি চৈতিকে নিয়ে আসছি ডাক্তারের কাছ থেকে।'
এ বাবা তাহলে কি হবে ?রেখা বলল ।ও কি কালকেও কাজে আসবে না? কালকে তো আমাকে স্কুলে যেতেই হবে ।আমার স্কুলের এক দিদিমনির ফেয়ারওয়েল আছে। না গেলে কি হবে বলো তো দিদি ।এতদিনের কলিগ ওরা আমার বাড়ির সমস্যার কথা বুঝবে না। ভারী চিন্তায় পড়ে গেলাম।
'ক'দিন হলো আসছে না 'চৈতির মা বলল।
রেখা বলল 'এই তো আজ ৫ দিন হল।কি জানি ভাইরাল ফিভার হলো কিনা? যাইহোক একটা তো খবর পাঠাবে দিদি। জানে তো আমাকে বেরোতে হয়।
চৈতির মা বলল ' কাজের লোকগুলোই এ রকম জানো তো।'
রেখা বলল  'আমরা ওদের ছাড়া চলতে পারব না। সে দুর্বল জায়গাটুকু ওরা বুঝে গেছে। কিন্তু ও যদি খবর না পাঠায় আমাকে তো অন্য লোক দেখতেই হবে।'
চৈতির মা বলল   'হ্যাঁ তা তো ঠিকই। এখন ওদের আবার ইউনিয়ন হয়েছে। ওদের এত বাড়বাড়ন্ত।একটা ফোন করে দেখতে পারো।
রেখার চোখে মুখে একটা দুশ্চিন্তার ছাপ, কাহা তক সম্ভব। রাত ৮ টায় বাড়ি ফিরে...? বাবা ,এদিকে বৃষ্টির ধোঁয়া ছুটছে। ক দিনের নিম্নচাপ..?
কাকিমা কাকু কোথায়? চৈতি বলল।
হ্যাঁ ,তাই তো একটা খবর তো নেওয়া হয় নি ।কি মরণ ঘুম আমার এসেছিল। আর বলিস না ছোট পিসি শাশুড়ির বাড়িতে গেছে। ওখানে কি হয়েছে কে জানে? দেখি একটা ফোন করি। তুই কোন দুশ্চিন্তা করবি না চৈতি। দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে। '
চৈতি বলে  'সেই আশাতেই তো আছি  কাকিমা।
রেখা আশ্বাস দিয়ে বলে 'ঠিক আছে রে ।ঐদিকের জানলাগুলো দিই নি। জানলাগুলো লাগিয়ে দিই  বুঝেছিস? পরে সময় করে আমার ছুটির দিন দেখে আসবি -বলেই হাতের জামা কাপড়গুলো নিয়ে টেবিলে রাখল ।আর হন্তদন্ত হয়ে জানলা লাগাতে লাগলো। ওদিকে ঝড়ো হাওয়ায় দরাম দরাম করে জানলাগুলো আওয়াজ হচ্ছে। পাশের বাড়ি ছেলেটার রোমান্টিক  গান লাগিয়েছে দেখো ।'এই মেঘলা দিনে একলা ।ঘরে থাকে না তো মন'। বাপরে বাপ ঘরে থাকার কি দরকার, বেরিয়ে গেলেই হয়। নির্ঘাত প্রেমে পড়েছে। যাক গে‌ বাবা ,যে পড়েছে পড়ুক ।আমি বরং
 মনোজকে একটা ফোন করি। রিং করলো কিন্তু ফোনের লাইনের কি অবস্থা?পুক  পুক্ করে আওয়াজ নেটের এত সমস্যা..? ধুত্তেরি ফোন ছেড়ে দিয়ে সন্ধ্যাবাতি দেবার জোগাড় করতে লাগলো। যা বৃষ্টির হাল ট্রেন বন্ধ না হয়ে যায়। দুশ্চিন্তায় পড়ল রেখা।
এবার কি করবে রেখা? টিভিটা খুল্লো অন্যমনস্ক ভাবে। খবরে দেখাচ্ছ আপাতত ট্রেন চলাচল বন্ধ আছে ।স্বাভাবিক পরিস্থিতি হলে ট্রেন আবার চালু হবে। যা বৃষ্টির অবস্থা, মনে হচ্ছে সমুদ্র এসে গ্রাস করবে। এখন রেখা কী করবে ,ভেবে ভেবে গা দিয়ে দরদর করে ঘাম ঝরছে।




ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন"১০ ক্রমশ

২০ সেপ্টেম্বর ২০২১

রেহানা বীথি 'র গল্প


 জাল


এটুকু থাক। 

রেখে দিলাম ছেঁড়া পৃষ্ঠার এই অংশটুকু। ওটুকুতে জমা আছে অন্তিম রহস্যের গন্ধ। 

যে মধ্যাহ্ন থেকে বেরিয়ে এসেছিল মাকড়সার জাল, জালে জালে রহস্য বুনে থুতনিতে ভর দিয়ে বড় ভাবনায় পড়ে গেছে সে। 

আমি জানতে চাইনি, 'এত ভাবনা কেন?'

ভাবুক। মাঝে মাঝে ভাবনার প্রয়োজন আছে। ভাবনার ভাবে মন উদাস হয়। 

উদার হয়। 


    অলঙ্করণ : প্রীতি দেব


নিজের অস্তিত্ব জানান দিতে আমাদের যত আয়োজন, ছেঁড়া পৃষ্ঠার তা নেই। ওর অক্ষরের রহস্যময়তা উৎসুক করে আমাদের; এই প্রাপ্তি সম্পর্কেও নেই কোনও মস্তিষ্কবেদনা। একটি গোটা পৃষ্ঠা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আনন্দে মাতোয়ারা কিনা  জানি না, তবে কখনও কখনও বিচ্ছিন্ন হওয়ার মধ্যেও আনন্দের অনুষঙ্গ থাকে। কে জানে, এই আনন্দ তাকে আলোড়িত করেছে কিনা! হয়তো করেছে, হয়তো করেনি। রহস্যের আবরণে থাক না কিছু বার্তা।

উদঘাটনে মরিয়া কেন হতে হবে?

মমতা রায়চৌধুরী'র উপন্যাস "টানাপোড়েন" ৬

অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করবার মতো আকর্ষণীয়  মমতা রায়চৌধুরী'র ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন" পড়ুন ও অপরকে পড়তে সহযোগিতা করুন  ।



 

                       উপন্যাস-টানাপোড়েন (পর্ব-৬)

                                                     দ্বিধা


আজকাল বুম্বা বেশ চুপচাপ হয়ে গেছে।  স্বতঃস্ফূর্তভাব পরবর্তী লক্ষ্য করা যায় না। আগে খাবার টেবিলে বসে অনর্গল দাদু ঠাকুমার সাথে যেত। আমি তোমার সেই রূপকথার গল্পটা বল না রাজকন্যাকে পাতালপুরীতে নিয়ে গেল দৈত্যরা এসে.. তারপর? ঠাম্মি হেসে বলেন"না দাদু ভাই, আর গল্প নয় এখন তোমার পড়ার সময় তাড়াতাড়ি খেয়ে ওঠো। পড়ার পরে তোমাকে গল্প শোনাবো কেমন?

বুম্বা ''ঠিক আছে ঠাম্মি  ।তাহলে কিন্তু দুটো গল্প? বলেই তাড়াতাড়ি খেয়ে উঠে ,পড়তে বসে যায়।

 খাবার টেবিলে বসে ঠাকুরমা দাদু নাতির এই সম্পর্ক বৌমা মানতে পারে না। ভাবে তার ছেলের মাথাটা চিবোচ্ছে এই বুড়ো বুড়ি।কাজেই কি করে এদের হাত থেকে তার ছেলেকে রক্ষা করা যায় তার প্লান আটতে থাকন। ছেলে সুধাময় বাড়ি ফেরার সঙ্গে সঙ্গে ছেলের কান ভারি করা হয়। মাঝেমধ্যেই ছেলে-বৌমার মধ্যে কটা কথা কাটাকাটি হয়। একদিন তো বৌমার কথাতেই স্পষ্ট হলো বুম্বা ,এরপর তো তোমাকে খাবার টেবিলে একা একাই খাবার অভ্যাস করতে হবে তখন কোথায় গল্প পাবে ?

বুম্বা, ঠাকুমা -দাদুর দিকে তাকিয়ে । সুরূপা লক্ষ্য করেই আমল না দিয়ে বলে  'নাও ।অত বায়না করো না।'

প্রভাদেবী বলেন 'কি এমন বায়না করে দাদুভাই ।দু' একটা গল্প শুনতে চায় ।

 বৌমা 'হ্যাঁ আপনারা ওই আস্কারা দিয়ে দিয়েই ওর মাথাটা খাচ্ছেন।'

প্রভাদেবী আর কোন কথা বাড়ান না। 

সদানন্দ বাবু নিজের স্ত্রী প্রভাদেবীকে বলেন  'ছাড়ো না, ওদের সন্তান। ওরা যেভাবে মানুষ করতে চায় করতে দাও। 

মাঝেমধ্যেই নাতি বুম্বা পড়ার ফাঁকে ঠাকুমা- দাদুর ঘরে ঢুকে পড়ে ।এসেই ঠাকুমার গলা জড়িয়ে ধরে ।ছোট ছোট দুই হাত ধরে যখন গলা জড়িয়ে ধরে প্রভাদেবীর ।প্রভাদেবী যেন স্বর্গ সুখ পান। প্রভাদেবী আদরের সুরে সঙ্গে বলেন ' কি দাদুভাই। কি মতলব তোমার'?

বুম্বা -কানের কাছে এসে বলে( আবদার করে) 'ঠাম্মি আমাকে কিন্তু তিলের নাড়ু খাওয়াবে? '

প্রভাদেবী 'এই কথা ।খাওয়াবো দাদুভাই'। 

দরজার কাছে একটু তাকিয়ে থেকে আবার ছুটে এসে ঠাম্মিকে বলে -'মাকে কিন্তু ব'লো না।'

প্রভাদেবী মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়। 

তখনি ছুটে চলে যায় পড়ার ঘরে। সেদিন তো হাতেনাতে ধরা পড়ে গেছে বুম্বা ।কি মারটাই না মারলে ওর মা। 

প্রভাদেবী ছুটে এসে বলেন-'বৌমা এত মারছো কেন?'

বৌমা বলেন-'দেখুন আমার ছেলেকে শাসন করার সময় আপনি এখানে আসবেন না। একেতেই আপনাদের আশকারাতে আমার ছেলের মাথাটা যাচ্ছে।'

প্রভাদেবী ঘরে চলে আসেন‌ চোখের জল ফেলেন।

সদানন্দ বাবু প্রভাদেবীর কাছে এসে তাঁকে সান্ত্বনা দেন আর বলেন আজকাল দিন পাল্টে গেছে প্রভা ।আজকাল বয়জ্যেষ্ঠদের মতামতের কোনো প্রয়োজন নেই এদের। ওদের ছেলে যেভাবে মানুষ করতে চায় ওদের করতে দাও। কষ্ট পেওনা। 

সুধাময় বাড়িতে আসলেই শুরু হল তুমুল ঝগড়া। শেষ পর্যন্ত সুধাময়কে স্ত্রীর কাছে হার মানতে হলো। ওদের ফ্ল্যাট কেনাই ছিল। শুধু মাত্র সুধাময়ের মনে একটা দ্বিধা তৈরি হয়েছিল ,বাবা -মাকে রেখে কি করে ফ্ল্যাটে যাবে? কিন্তু ছেলের কথা ভেবে আজকে তাকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতেই হলো। তাই মা -বাবার রুমে এসে জানিয়ে দিয়ে গেল আগামী ৭দিনের মধ্যে তারা কলকাতার ফ্ল্যাটে শিফট করছে। 

প্রভাদেবী বলেন  'হ্যাঁ তোদের সন্তানকে সঠিকভাবে মানুষ করবি ,তোদের তো ফ্ল্যাটে যেতেই হবে। তবে একটা অনুরোধ বাবা । নাতিকে আমাদের কাছে মাঝে মাঝে নিয়ে আসিস। 

সুধাময় বলে "ঠিক আছে মা।"

এত তাড়াতাড়ি মা বা-বা মেনে নেবেন ,সুধাময়এর ও কল্পনার অতীত ছিল। সুধাময় এর আর কোন বাঁধা রইলো না। শেষ পর্যন্ত সুরূপার জয় হলো। 

কিন্তুএখানে এসেই সেই সমস্যাটা আরো বেশি করে দেখা দিল। ছেলে বুম্বা দিনকে দিন মনমরা হয়ে যাচ্ছে। লেখা পড়ায়  মন নেই। সুধাময় একদিন ছুটির দিন দেখে বাবা-মায়ের কাছে ছেলেকে নিয়ে আসলো। কিন্তু সুরূপা আসলো না। আগে থেকে বলেই রেখেছিল সুধাময় মাকে ফোন করে। তাই ছেলে নাতির পছন্দমত সব খাবার বানিয়েছিলেন প্রভাদেবী। বুম্বা ঠাকুমা দাদুর কাছে এসে আগের মত সতেজ হয়ে উঠলো। এরমধ্যে সুধাময়ের মনের  মেয়ে মোমবাতি এসেছে বলে দু'জনে উঠোনে খেলতে নেমে গেল। আর ঠাম্মির কাছ থেকে তিলের নাড়ু নিয়ে খুশিতে ডগোমগো হলো। বুম্বার আনন্দ যেন দ্বিগুন বেড়ে গেল।সুধাময় ভাবতে লাগলো এ বাড়িতে এসে বুম্বাকে আগের মত দেখতে পেয়ে সুধাময় খুব খুশি  হল। কিন্তু মা -বাবাকে মুখ ফুটে বলতে পারল না। ফিরে যাবার সময় বুম্বার সে কি কান্না। শুধু বাবাকে বলতে লাগলো ' বাপি ঠাম্মি দাদুকে নিয়ে চল না কলকাতার ফ্ল্যাটে? সুধাময় ছেলেকে সান্তনা দেবার জন্য বলল পরের বার এসে নিয়ে যাবো ।আসলে সুধাময় এর ভেতরে দ্বিধা তৈরি হয়েছে ।সেটা যে তৈরি করেছে তার স্ত্রী সুরূপা। যদি কলকাতার ফ্ল্যাটে তার বাবা-মাকে নিয়ে আসে তাহলে সুরূপা সঙ্গে সুধাময়ের তুমুল ঝগড়া হবে। তার বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকতে চায় না। সুধাময় সে কথাটা তার বাবা-মাকে খুলে বলতে পারে নি ।তাই ঠিক করেছে এবার থেকে একটু কম আসবে মা-বাবার কাছে। যাবার সময় যতদূর দেখা যায় বুম্বা দূর থেকে তাকিয়ে থাকে তার ঠাকুমা দাদুর দিকে। দাদু ঠাকুমা হাত নেড়ে নেড়ে বলতে থাকে দাদুভাই পরের রবিবার এসো। আমি তোমার জন্য তিলের নাড়ু আর নতুন একটা গল্প বলবো। বুম্বা খুশি হয়ে চলে যায়। এবার বাড়িতে গিয়ে ভালো করে পড়াশোনা করতে থাকে আর দিন গুনতে থাকে রবিবারের। শনিবার দিন রাত থেকে ওর ভেতরে উত্তেজনা দাদু -ঠাকুমার কাছে যাবে বলে। কিন্তু পরের দিন রবিবার যাবার সময় হলেও যখন তার বাবা তাকে নিয়ে যায় না ।এমনকি ও ঠাকু মা ফোন করলেও যখন ফোন ধরতে দেয়া হয় না ।তখন সে অঝোরে কাঁদতে থাকে। সুরূপা এসে ছেলেকে ভালো করে ধমকায় আর বলে এবার থেকে আর তোমার ওখানে যাওয়া হবেনা। তোমায় শুধু পড়াশোনা করতে হবে ভালো করে এই কথাটা মাথায় নিয়ে নাও। ভালো স্কুলে ভর্তি হয়েছ। বুম্বা জানে এটা কিসের ভালো স্কুল যেখানে দাদু ঠাকুমা কে নিয়ে কোন কথাই কেউ বলে না। ও যদি কারো কাছে সে গল্প করতে চাই তারাও সেটা শুনতে চায় না। তারা মোবাইলের নানা গেমস গুলোর কথা নিয়ে আলোচনা করতে থাকে। এরমধ্যে বুম্বা জানে তাদের ফেলে আসা গ্রামের ঠাকুমার গায়ের গন্ধ ঠাকুমার হাতের তৈরি নাড়ুর অসাধারণ স্বাদ ।ঠাকুমা -দাদুর বলা গল্প সমস্ত যেন নগন্য বলে মনে হয় শহরের পড়ুয়াদের কাছে। শহরের দামি দামি রেস্তোরাঁর খাবার এর কাছে বুম্বার ঠাকুমার নগণ্য তিলের নাড়ুর মূল্য কিসের?বুম্বার ভেতরে যে ওলট পালট হচ্ছে। তার ভেতরে যে কতটা কষ্ট হচ্ছে সে খবর রাখার প্রয়োজন করে নি কেউ ।এমন কি ওর বাবা-মা ও। আজকে বুম্বা নিজের ভেতরে গুমড়ে গুমড়ে ওঠা কষ্টটাকে চাপা দেওয়ার জন্য। সে ভেবে পায়না শহরের মানুষগুলো এত নিষ্ঠুর কেন। এই শহর যেমন সবুজহীন, এমনি মানুষগুলো নিষ্ঠুর। সে ফিরে পেতে চায় তারা গ্রামবাংলার সবুজ গাছপালার স্পর্শ বেড়ে ওঠা গ্রামের  জয় -নিতাইদের সহজ-সরল সান্নিধ্য, ফিরে পেতে চায় ঠাকুমা দাদুর স্নেহ ভরা দুটি শীতল হাতের স্পর্শ। তাই একদিন স্কুল ছুটির শেষে সে নিজেই বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয় ফেরার সময় পার্কের কাছে একটি পুকুরে ধারে এসে চুপ করে দাঁড়িয়ে পড়ে অনেকক্ষণ ধরে চিন্তা করতে থাকে তারপর হাতে একটা নুড়ি তুলে নিয়ে ছুড়ে মারে জলে। সে ভাবতে থাকে সে যে চুপিচুপি মশারি সরিয়ে তার ঠাকুমার কাছে গিয়ে শুয়ে পড়তো তারপর তার ঠাকুমা তাকে কাছে টেনে ফিসফিস করে বলতো দাদুভাই আজকে কি মতলবে বোম্বা তাকে জড়িয়ে ধরে কত কথাই না বলতো আজকে তার ঠাকুমার গায়ের আশ্চর্য সুন্দর গন্ধ তার কল্পনায় একবুক নিঃশ্বাসে টেনে নিল তার ভেতরের যে কষ্ট সেই কষ্টটা সে কাউকে বাড়িতে গিয়ে শেয়ার করতে পারে না। মা তো শুনতেই চায় না কোনো কথা। সে ভেবে পায়না তার ঠাকুমা দাদু কলকাতার ফ্ল্যাটে আসলে তাদের কি এমন অসুবিধা হতে পারে সে ভেবে ভেবে অস্থির হয়ে যায় এখানে তার না আছে সঙ্গী সাথী, সে কিছুতেই এই পরিবেশে খাপ খাওয়াতে পারছে না।


মাঝে মাঝেই তার মা ঠাকুমা দাদু সম্পর্কে নানারকম মিথ্যে কথা বলে তার মনটাকে বিষিয়ে দেবার চেষ্টা করেছে তার মনে দ্বিধা তৈরি করতে বাধ্য করছে তার শিশুমন সেটা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না।



ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন"৬ ক্রমশ