যৌবনোত্তীর্ণ_ একজন_ মানুষের_ স্বপ্ন
আমার কৈশোরে একবার একটা প্রসব দৃশ্য দেখেছিলাম--
তারপর--
তার পর--
পঞ্চাশটি বছর-- পাঁচ দশক-- পার।
তার পর, ওই সুস্থ শিশুটি ইথিওপিয়া, রুয়ান্ডা, উগান্ডা--
কখনও ইরিত্রিয়া, সোমালিয়াসহ কত কত--
দুর্ভিক্ষপীড়িত দেশে হেঁটেছে,
জীর্ণশীর্ণ দেহ, কৃশ মুখাবয়ব নিয়ে--
একটা আকাশ সমস্ত পৃথিবীঘিরে--
একটা সূর্য পৃথিবীর প্রাণ--
একটা চাঁদ রাত্রি-প্রদীপ--
কত কত ঝরনা, হ্রদ, মালভূমি, নদী আর সমুদ্র--
তৃণ-লতাগুল্ম গাছ-বৃক্ষ, কত কত উদ্ভিদ--
কত কত প্রাণ দৃশ্যমান, কতক কতক অদৃশ্য--
শিশুটির যৌবনোত্তীর্ণ সময়েও দেখা পেলো না--
সত্য সুন্দর আর প্রকৃতিজ একটা স্বর্ণালী-বদ্বীপ--
স্বচ্ছতার দেখা পেলো না-- না মানুষে, না শাসনে, না প্রকৃতিতে,
হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত এক যাযাবর জীবন তার--
মাথায় জমেছে বেদনার পাহাড়, হিমালয়ের চেয়েও ভার।
একদিন জিওগ্রাফিক টিভি চ্যানেলে চোখ পড়লো--
আহা! কত কত সুন্দর সুন্দর দেশ। কত কত নান্দনিক প্রাকৃতিক দৃশ্য,
হরেকরকম পশুপাখি, ডালিমের রসের মত টলটলে নদী আর সমুদ্রের পানি,
পাহাড় পর্বত আর জলপ্রবাতের উচ্ছল ছুটাছুটি--
জলীয়বাষ্পের খেলা, চারদিকে আনন্দ উচ্ছ্বাসের মেলা--
যেখানে মানুষ মানুষকে করে না অবহেলা।
হা করে তাকিয়ে আছে-- অবাক বিস্ময় জাগে তার মনে,
ভাবে, এমন মনোরম দেশ, এমন সুষমামণ্ডিত পরিবেশ--
তুলনা করি কোন দেশের সনে?
ক্ষণে ক্ষণে রোমাঞ্চিত হয়, কোথায় যেন বারবার হারায়,
উদাস চোখে আকাশ দেখে, দেখে হাজার পাখির মেলা,
যেদিকে যায় চোখ, মলিন হয় মুখ বিষাদ বেদনায়,
বুঝতে পারে না-- ভেতর থেকে কে যেন দুচোখে অশ্রু ঢেলে যায়,
কাঁদে খুব করে, অজস্র অশ্রু ধারায়, খেই হারায়--
উল্টো হয়ে সূর্যওঠার দিকে মুখ করে দাঁড়ায়--
ওই যৌবনোত্তীর্ণ মানুষটি আর একবার প্রসব দৃশ্য দেখিবার চায়--
হে_ প্রিয়_ স্বদেশ
এত ভার বয়ে চলতে পারো, পারো না--
কতিপয় সন্তানের ভার বয়ে যেতে। হে মুগ্ধ জন্মভূমি!
জননী তুমি, তুমি স্বর্গসম! এমন অসম দৃষ্টি তোমার,
দুচোখা তুমি, হৃদয় খণ্ডিত, ভালোবাসা খণ্ডিত। বঞ্চিত হয় গর্ভের সন্তান।
কত বোঝা বয়ে চলো, ওই কজন সন্তানের বোঝা পারো না বইতে?
ওরা তো অলস নয়। কাজ চায়। সকালের নাস্তায় একটুকরো রুটি চায়,
না ডিম, না কলা, না বাটার, না মাংসা কিংবা ঘি-ভাজা পরোটা--
স্রেফ নুনপান্তা, উপরন্তু একটা পেঁয়াজ আর একটা কাঁচালঙ্কা!
মায়ের শীর্ণদেহ দেখো, ব্রা নেই, জামা নেই, নেই পেটিকোট,
মাথায় না-তেল, মুখে না- কসমেটিকস, ঠোঁটে না-লিপিস্টিক--
শুধু তাঁতবুনা একটা বারোহাত কাপড়, পায়ে নেই জুতা-সেন্ডেল,
বাবাকে দেখেছ? রোদবৃষ্টি ঝড়বাদলায়ও ঘানি টানে কলুর বলদের মত,
তার গায়ে না আছে গেঞ্জি, না পাঞ্জাবি বা জামা, পায়ে না আছে জুতা-সেন্ডল--
কদাচিৎ সরিষার তেল মাখে শীতের আগ্রাসনে,
একটা কমদামি লুঙ্গি আর একটা গামছা-- যেন তোমার বুকে পরগাছা।
হে স্বদেশ! বিদেশ করে যদি সন্তান খোঁজে জীবনের ঠিকানা,
তবে তুমি কী কানা মা? বলো স্বাধীন জন্মভূমি সোনার বাংলা!
বুঝো কী জন্মভূমি! মা-বাবার রিক্তেরবেদন, দিনরাত্রির কাঁদন রোদন?
যার সন্তান ভূমধ্যসাগরে স্বপ্ন ডুবায়ে মরে, ওই ঘরে জ্বলে কী কূপির বাতি?
কিংবা বিদেশের কারাগারে পঁচে মরে, কে ফেরায় তারে, কে তারে ভাবে?
হে স্বদেশ, বুঝো না সন্তানের খেদ, দুঃখকষ্ট আর বিদ্বেষ।
রক্তের বিনিময়ে পাওয়া স্বদেশ-- আর কত মা-বাবার রক্তক্ষরণ?
বুকে টেনে নাও হে প্রিয় স্বদেশ-- বোঝাকে বানাও দেশগড়ার হাতিয়ার,
ভালোবাসার বন্ধনে সবাই মিলি গড়ি তুলি সোনার বাংলাদেশ।
প্রভাতী -- সুর
নিশুতিরাতের একটা সুর--
যে সুর ভেসে আসে মহাজাগতিক তরঙ্গে তরঙ্গে,
মাটিতে কান পেতে শুনি আরেক সুর,
বৃক্ষ লতায়পাতায় আর তৃণে অন্যরকম সুর,
চাঁদ আলাদা করে সুর তুলে জোছনার বাঁশিতে,
নদী একরকম, সমুদ্র আরেকরকম-- দিশেহারা মন ব্যাকুল--
রাতজাগা পাখিদের ডানায় জেগে রয় রাত--
তখন তোমার ভায়োলিনের সুর ভেসে আসে,
বিভ্রান্তিকর সময় আমার-- কোন্ সুরে মগ্ন হব-- দ্বিধায় পড়ে যাই।
সবকটি সুরে বিরহ, কেবলই দীর্ঘশ্বাসের ঝাঁঝালো মনোবেদনা,
আর সবসুর মিলেমিশে কেমন পাগল পাগল লাগছে নিজেকে,
চোখ বুজে রইলাম। নিজকে বললাম-- সুস্থির হও।
কিন্তু অস্থিরতা বাড়ছেই কেবল--
কারণ, ভায়োলিনের সুর আমাকে বেশি কষ্ট দেয়।
তোমার এই বিরহের সুর শুনতে আসিনি, ক্ষমা করো--
সানাই কিংবা ভায়োলিনে ছুঁয়ে-থাকা হৃদয়ে ঝরনার জলতরঙ্গ নেই,
যদি পারো একটা প্রভাতসংগীতের সুর ধরো।
ভোরের পবিত্র সুরে ফিরে পেতে চাই নতুন জীবন।
বহুরাত গেছে অনিদ্রা আর শোকে, রোদনে, বেদনে।
কেবল ভোরের ওই দোয়েলের শিস আর ভালোবাসার ঠোঁট বেজে ওঠুক জাহান্নামী-রাত শেষে। ৪/১১/২১
চোখ_ আর_ সমুদ্র_ জমজ
চোখের জলে সমু্দ্র--নাকি সমুদ্রের জলে চোখের জন্ম--
এ নিয়ে অনেকবার কথা বলেছ-- নিরুত্তর থেকেছি।
এর একটা জবাব চেয়ে চলেছ দীর্ঘদিন যাবত, যদিও প্রসঙ্গটি এড়িয়ে যাই--
টেনে ধরো বারবার, ভাবছি কী জবাব তার, কি-ই-বা বলি-- অন্য প্রসঙ্গে যাই।
রেহাই নাই। উত্তর চাই-ই চাই তার। মুখ করি ভার, তবুও
নাছোড়বান্দা, এবার সে নিজে নিজে বললো-- সমুদ্র আর চোখ জমজ ভাই।
রেহাই পেলাম। বললাম-- প্রমাণ দাও। হেসে ওঠলো--
বললো-- যখন হাসি তখন দেখবে আমার চোখে জল, আবার কাঁদলেও জল--
দুরকম চোখের জলের স্বাদ নেবে, তারপর সমুদ্রের জল চাখবে,
দেখবে তিনরকম জলের স্বাদ এক। নোনা স্বাদ।
মেনে নিলাম-- এখন বলো-- কী বুঝাতে চাও--
জবাব-- মানুষ আর সমুদ্র জমজ। একগর্ভে জন্ম।
অদ্ভুত কথা। বললাম-- আরেকটু ব্যাখ্যা করো।
ধরো, সমুদ্র জন্ম থেকেই দুঃখী, তাই গোঙায় দিনরাত্রি, আর
মানুষও জন্মের পর থেকে দুঃখী, হয় সম্পদে, নয় তো মনোতাপে--
তার ব্যাখ্যার বিপরীতে আমার কোনও যুক্তি বা প্রমাণ নেই--
নীরব হলাম, মৌন হলাম, একান্ত নিমগ্নতায় নিজ জীবন ভাবলাম,
সেসাথে যুদ্ধের ইতিহাস, উদ্বাস্তু জীবন, বুভুক্ষু মানুষ, রাষ্ট্রের দুর্বৃত্তায়ন -- ইত্যাদি
আমাকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরলো। নতজানু হয়ে পড়ে রইলাম।
সে-ও নতজানু হয়ে আমাকে জড়িয়ে নিলো বেশ পবিত্র আলিঙ্গনে--
আমরা কাঁদছি-- দুজনই দুজনার অশ্রুধারায় জিহ্বা রেখে নোনা স্বাদ পেলাম--
দুজন হাঁটি হাঁটি পা পা করে সমুদ্রজলে নেমে এক আঁজলা জল মুখে নিয়ে দ্বৈতকণ্ঠে বললাম---
জীবন মানেই নোনা স্বাদ-- তারপরও জীবন মধুময়--
নোনার মাঝেও সৃষ্টিধারা বেঁচে রয়-- নোনাজলেই ভ্রুণের আশ্রয়--
নতুবা, আমাদের অস্তিত্বই বা কোথায়! চোখ আর সমুদ্রজলের সঙ্গমেই প্রাণের পরিচয়।