উপন্যাস
টানাপোড়েন ১০৪
খোলা জানালায় দখিনা বাতাস
মমতা রায় চৌধুরী
স্কুলে আজকের দিনটা রেখার খুব বাজে কাটলো কি একটা অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি
করেছিল অনিন্দিতা। ভাবতে লজ্জা লাগছে কিছু টিচার আবার ওকে সাপোর্ট করছেন।
এভাবে যদি দিনের পর দিন এই ধরনের পরিবেশ সৃষ্টি হয় ,তাহলে স্কুলে কাজ করো খুব কষ্টদায়ক হয়ে যাবে ।মেন্টাল পিস না থাকলে ছাত্রীদের কি সেভাবে কিছু দেওয়া যাবে?
সারা ট্রেনে আসতে আসতে সব ভাবনা মনের ভেতরে মোচড় দিয়ে উঠছিল। ভাবছে আগামীকাল স্কুলে যাবে না। জানলার দিকে মুখ দিয়ে বসে থাকারও উপায় নেই ,শীতকাল হাওয়া দিচ্ছে ,বাধ্য হয়ে জানালাটা বন্ধ করে দিতে হয়েছে। লেখাটা নিয়েও মাথার ভেতরে নানা কাহিনী চরিত্র ঘুরপাক খাচ্ছে ।কাজেই এই সময় মনটা যদি অস্থিরতায় পরিপূর্ণ থাকে ।লেখাটা ঠিকঠাক আসবে না কিন্তু লিখতে তো হবেই। হঠাৎই ভাবনায় ছেদ টানে '
রেখা ,এই রেখা, ধ্বনিতে।'
রেখা উৎসুক দৃষ্টিতে এদিক ওদিক তাকাতে থাকে।
অবশেষে দৃষ্টি বিনিময় হলো সামনের দিকের দাঁড়িয়ে থাকা এক যাত্রীর সঙ্গে এতটাই ভিড় হয়েছে যে দাঁড়াতে পারছেন না ,তবুও মুখে কত মিষ্টি হাসি।
রেখা হা করে তাকিয়ে আছে।
যাত্রী বলছেন' আমাকে চিনতে পারছিস না?'
আমি রুপসার জেঠতুতো দিদি বাণী।
রেখা এভাবে ট্রেনে বাণীদিকে দেখতে পাবে এই ভেবে এতটাই আশ্চর্য হয়েছে ।তারপর ' বানীদি একদম উঠে দাঁড়িয়ে উচ্ছ্বসিত ভাবে বলল রেখা ।
তুমি এদিকে এসো ,আমার সিটে বসবে এসো।'
বাণী বলল' তুই কোথায় গেছিলি স্কুলে?'
রেখা বলল 'হ্যাঁ গো। বাড়ি ফিরছি। তুমি হঠাৎ এদিকে কোথায় গিয়েছিলে?'
বাণী বলল 'আর বলিস না তেহটটো পিসি শাশুড়ির বাড়ি ।পিসিমা নাকি অসুস্থ খুব ।ডেকে পাঠিয়েছিলেন। তাই দেখা করতে
গেছিলাম ।ফিরছি।'
রেখা বললো 'ফিরছি মানে আজকে আমার বাড়ির কাজ দিয়ে যাবে , আর নামবে না? সেটা তো হতে পারে না বানীদি। তোমাকে নামতেই হবে।'
ভিড় ঠেলে ঠেলে এবার রেখার কাছে আসার চেষ্টা করছে ওদিক থেকে অন্য যাত্রীরা বলছেন 'ভিড়একটু কমুক না দিদি ।এত ঠেলা মারলে তো হবে না ।'
' দেখে চলুন' আর একজন যাত্রী বলেছেন পা দিয়ে মাড়িয়ে চলে গেলেন, উফ কি সাংঘাতিক।'
বাণীদি বলল ', সরি ,সরি, সরি।'
এক যাত্রী বললেন 'এই সরিতেই সাতখুন মাপ তাই তো ?যত্তসব।'
বাণীদির কোন কথাই কানে ঢুকলো না ।তারপর আস্তে আস্তে রেখা সামনে এসে হাফ ছেড়ে দাঁড়িয়ে বলল
'না রে ,আজকে নয় ।ওদিকে রুপসার কথা শুনেছিস? রুপসা হসপিটালইজড।
রেখা যেন আকাশ থেকে পড়লো আর আশ্চর্য হয়ে বলল ' সে কিগো? কেন ,কি হয়েছে?'
বাণী বলল_ আর বলিস না ।ওর তো হার্ট
অ্যাটাক । তবে বেশি জোরালো নয় ।এখন ঠিক আছে।'
রেখা বলল' ও বাবা, বলো কি? এই তো জাইবু মারা গেলেন। এর মধ্যে যদি এরকম হয়।'
বাণী বললো'হ্যাঁ ওখানেই যাব। একবার ওকে দেখতে যাব ।বিপাশা গেছে শুনেছি ।তাই একবারে এখান থেকে ওখানে নাববো।'
রেখা বলল' শুনে খারাপ লাগছে গো। কোথায় ভর্তি আছে?'
বাণী বলল 'উডল্যান্ড হসপিটাল।'
রেখা বললো 'ভালো জায়গায় ভর্তি আছে।
বাণী বলল' এখন তো ওরা কলকাতায় শিফট করে গেছে। জানিস রেখা?'
রেখা বললো 'না তো ।তাই ? বাহ খুব ভালো।'
বাণী বলল 'ও তোর বরের অফিসে জয়েন করেছে।'
রেখা অতি আশ্চর্য হয়ে বলল 'ওমা তাই
বুঝি ?আমাদের রুপসা দিদি! সত্যিই খুব ভালো লাগছে। রুপসা দিদি এবং বিপাশা ওদের তো যথেষ্ট কোয়ালিটি ছিল ।তবে রুপসা দিদি যে নিজেকে কাজের মধ্যে ইনভলভ করেছে ,দেখবে সবকিছু একদম ভালো হবে আর শকটা কাটিয়ে উঠতে পারবে।'
বাণী বলল হ্যাঁ রে ,এটা খুব দরকার ছিল ।ওর মেয়ের একটা ভবিষ্যৎ রয়েছে তো?
রেখা বলল 'বাণী দি রুপসাদির মেয়ের বয়স কত হলো ?নাম কি,?'
বাণী বলল' ওর নাম হচ্ছে নদী ।ডাকনাম। বিপু 'স্রোতস্বিনী' বলে আর ওর ভালো নাম হচ্ছে স্বরূপা। এই তো 18 তে পা দিল।
রেখা বলল' বাহ খুব সুন্দর নাম তো?'
বাণী বলল 'মেয়ের জন্যই তো বরের অফিসে জয়েন করলো। তাছাড়া ওর বরের অফিসের বস খুব ভালো ।উনি প্রস্তাবটা দিয়েছিলেন।'
রেখা বললো 'ভালো তো ।এটা খুবই ভাল
হয়েছে ।আজকালকার মেয়েদের না সত্যিই স্বাবলম্বী হওয়ার দরকার আছে।'
বাণী বলল 'কিন্তু আমাদের রুপু ভাবতে পারে নি যে, ও অফিস সামলাতে পারবে?'
রেখা বলল' আমাদের রুপসা দিদি এডুকেটেড মেয়ে ,না। হ্যাঁ, সব সময় জাইবুর প্রতি ভরসা রেখে চলেছে তাই? কিন্তু কিছু যে করতে পারবে না এটা কিন্তু কখনও মনে হয়নি?'
বাণী বলল' নারে ওকে গ্রামেতে দেখিস নি। সব সময় একটু ঘরোয়া প্রকৃতির ছিল ।রান্নাবান্না খাওয়া-দাওয়া ,এইসব নিয়েই বেশি ব্যস্ত ছিল?'
রেখা বলল 'বানীদি হ্যাঁ ,সে সব তো ঠিকই আছে ঘরোয়া মেয়ে ।কিন্তু বাণী দি কোয়ালিটি তো কম ছিল না। তবে প্রয়োজন হয়নি। জাইবু একটা ভালো জায়গায় ছিল সেরকম দরকারও হয়নি?'
বাণী বলল' হ্যাঁ ,তা অবশ্য ঠিক।'
এক যাত্রী বলল 'একটু সরে দাঁড়ান না দিদি। সেই থেকে কানের কাছে বকর বকর বকর করে যাচ্ছেন। কানের পোকাগুলোকে জাগিয়ে দিলে।'
বাণীদি হা করে তাকিয়ে রইল যাত্রীর
দিকে । রেখা বাণীদির দিকে তাকিয়ে আবার হাসল।
বাণীদি হাসলে গালে টোল পড়ে। এত সুন্দর লাগে দেখতে ।চিরকালই এরা এই তিন বোন সব সময় হাসি খুশিতে মেতে ছিল ।কথায় কথায় হাসতো ।রাগ কখনো দেখিনি এদের।
রেখা বাণীদির দিকে তাকিয়ে ইগনোর করে যাবার মত একটা ইশারা করলো।'
তারপর বলল এবার তোমাকে বসতেই হবে।
এ ক যাত্রী বললেন বসবেন মানে! আমরা তো দাঁড়িয়ে আছি?
রেখা বললো 'তো দাঁড়িয়ে আছেন, দাঁড়িয়ে থাকুন আমি তো নেমে যাচ্ছি না ।আমি আমার সিটটা ওনাকে দিচ্ছি ।এটা তো আপনার আপত্তি থাকার কথা নয়?'
যাত্রী আর কিছু বললেন না চুপ হয়ে গেলেন।
বাণীদি বলেন 'উনি যখন বসতে চাইছেন.. কথাটা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই রেখা বলল 'আমি কাউকে দেব না এখন ,যতক্ষণ না আমি নামবো।'
বাণী বলল _ঠিক আছে ,তাহলে দে ।আমি একটু বসি।'
রেখা বলল' এসো, এসো এদিকে। আমার হাত ধরও আস্তে আস্তে।'
বাণীদি এসে রেখার জায়গায় বসল পাশের সহযাত্রীগুলো একটু যেন বিরক্ত হল ।আসলে বানীদি একটু হেলদি তো।'
বাণী দি বলল পা টা কি যন্ত্রণা করছে
রে ।টন টন করছে ব্যথায়।'
রেখা বলল' তোমাকে কখন থেকে বলছি তুমি এসো। এখানে একটু বসবে এস'।
বাণী বললো' তা কি করে হয়
বলো ? তুমিও তো পরিশ্রম করেই এসেছ না ?তোর জায়গাটা আমি সঙ্গে সঙ্গে বসতে পারি বোন?'
রেখা বলল বাণীদিকে বোন বলছ ও দিকে বসতে পারো না।'
রেখার থুতনিটা একটু টেনে এনে চুম্বন করল।
রেখার স্কুলের যে ঘটনাটা ঘটেছে
যে ,একটা যন্ত্রণা সব সময় মনের ভিতর কুরে কুরে খাচ্ছিল । বাণীদির সঙ্গে কথা বলে আর শৈশবের সেই দিক কাছে পেয়ে সত্যিই সব ব্যথা , বেদনায় যেন কেউ মলম লাগিয়ে দিল নিমিষের মধ্যে যেন সব ঠান্ডা হয়ে গেল কি শান্তি, কি শান্তি, শান্তি।'
বাণী বলল'রেখা তোর ছেলে মেয়ের খবর কি? মানে তোর কটা ছেলে মেয়ে?
রেখা বলল 'জগৎজুড়ে আমার ছেলে মেয়ে।'
বাণী বলল'ভালো করে ডাক্তার দেখা?'
রেখা বলল'আর সেই বয়স আছে?'
বাণী বলল'হ্যাঁ তুই তো একেবারে বুড়িয়ে গেছিস?'
রেখা হেসে বলল 'তাছাড়া আবার কি।'
বাণী বলল 'বকিস নাতো?'
রেখা তো জানে তার ভুভুক্ষ মাতৃহৃদয়। সেও চায় নারীত্ব পূর্ণতা লাভ করুক কিন্তু সবই কপাল।
তারপরে রেখা বলল তোমার বলো ,তোমার খবর বল বানীদি?'
বাণী বলল 'এইতো চলছে ।আমার এক ছেলে এক মেয়ে।'.
রেখা বলল 'ও মা তাই?'
বাণী বলল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে আর মেয়ে এ ম, এ ফাইনাল ইয়ার।'
রেখা বলল' ও বাবা কত বড় হয়ে গেছে।'
বাণী হাসলো।
ইতিমধ্যে ট্রেন মদনপুরে এসে গেছে। রেখা বললো তাহলে কিন্তু অন্য দিন আমাদের বাড়িতে আসতেই হবে ।কথা দাও।'
বাণী বলল 'ঠিক আছে তাই হবে।'
ট্রেন এসে কল্যাণী থামল।
রেখা বলল বাণীদি ,আসছি। ভালো থেকো সাবধানে যেও।
ভিড় ঠেলে রেখা কোন স্টেশনে নামলে কে বলবে সকলে আমরা একটা প্যানডামিক সিচুয়েশনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। সাধারণ যাত্রীদের দেখে তা মনে হচ্ছে না।
ট্রেন বেরিয়ে গেল আর রেখা তার দিকে' যতদূর দেখা যায় তাকিয়েই থাকলো। বাণীদি যেন খোলা জানালা দখিনা বাতাস হয়ে রেখা এক অপ্রীতিকর অবস্থার মধ্যে পড়েছিল ,সেখানে এসে সামাল দিল।'