story লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
story লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

১৩ ডিসেম্বর ২০২০

সোহেল রানা'র গল্প

বিষাদ 

(উৎসর্গ—আজাদ সেখ কে)

            

            

মামুদ পাগল হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। “পরনে ছিল নোংরা ও ছেঁড়া জামা -প্যান্ট, চুলগুলো বড়ো বড়ো উসকোখুসকো, দাড়ি ও গোঁফ গুলো বড়ো হয়ে কিছুটা মুখে ঢুকে পড়ে।“ কখনো কখনো মদের বোতলে জল খায়,পরে থাকা সিগারেট গুলো নিয়ে খেলা করে। মামুদের মা  মামুদকে অনেক খোঁজাখুঁজির পর রাস্তার পাশে মোড়ের দিকে বসে আনমনে খেলা করছে। এমনকি মনে মনে গান করে-  

  “        পিয়া তোমাকে এখনও ভালোবাসি , 

     তুমি আসবে ফিরে আমার এই বুকে। 

              ভালোবাসি শুধু তোমাকেই। “

মামুদ বাবা তুই এখানে আছিস চল বাড়ি চল। 

হঠাৎ পিয়ার সাথে মামুদের দেখা হয়,মামুদের কাছাকাছি গিয়ে পুরোনো প্রেমিককে চিনতে পেরে তার চোখ দিয়ে অশ্রু সজল নয়নে ঝরতে থাকে।

আপনি মামুদের কে, এই অসহায় পাগল ছেলেটার “মা”। 


             (৩ বছর আগের ঘটনা) 

কীভাবে এই অবস্থা হল, “ওই জঙ্গিপুর কলেজে বেটাকে কত স্বপ্ন নিয়ে ভর্তি করলাম ফিজিক্সে অনার্স কোর্সে। তাঁর সাথে পিয়া নামে একটি মেয়েকে সে খুব ভালোবাসতো। কিন্তু সেই মেয়েটার বিয়ে হয়ে যায় সরকারি চাকুরী করে এক ছেলের সাথে।“

 তারপর থেকে সে মানসিক চাপের, নেশা করতে করতে মদ, গাঁজা, বিড়ি, সিগারেট খেতে শুরু করে আস্তে আস্তে পাগল হয়ে যায়।

পিয়া কাঁদতে কাঁদতে গাড়িতে চড়ে ঘরে চলে যায়। নিজের প্রতি অনুশোচনা করতে থাকে। 

 মামুদ ক্লাস একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয় বিড়লা হাইস্কুলে। সে মেধাবী ছাত্র, এমনকি স্কুলে ক্লাসের টপার। পিতা-রশিদ সেখ ,মাতা- ফিরদৌসী বিবি।  তাদের একমাত্র সন্তান ছিলো মামুদ। তারা গ্ৰাম থেকে শহরে এসেছে। রশিদ সেখ  একজন চাকুরীজীবি। সে  কোম্পানিতে চাকরি করেন। 


ক্লাস করতে করতে পরিচয় হয় পিয়ার সাথে। পিয়া একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে পরে। কেননা সে পরে চান্স পেয়েছে। পিয়া পড়াশোনা ভালো, সে মেধাবী ছাত্রী ছিলেন। মধুমিতা ম্যাম বৈষ্ণব পদাবলী ক্লাস নিচ্ছে। ক্লাসে পিয়া আর মামুদ পাশাপাশি বসে মন দিয়ে ক্লাস করছে। ম্যামের বৈষ্ণব পদাবলীর ক্লাস করার কিছু দিনের পর দুজনের মধ্যে পূর্বরাগ থেকে অনুরাগে পরিনত হয়। 

মামুদ তোমাকে কতদিন বলবো সময়ে এসো, আমি কতক্ষণ তোমার জন্য অপেক্ষা করবো, প্রায় তিন ঘণ্টা থেকে অপেক্ষা করছি। রাস্তার ধারে কিছু বকেটা ছেলের টিটকারি শুনতে হয়। 

আচ্ছা বাবা রাগ করে না, “আমার বাবু-সোনা রাগ করে না, এইতো আমি চলে এসেছি “। 

দাও আমার জন্য কি নিয়ে এসছো,অবশ্যই এনেছি তোমার স্পেশাল খাবার “বাদাম”। তাইতো বাবু তোমাকে আরও বেশি বেশি করে ভালোবাসাটা বেড়ে যায়। 

পিয়া কালকে  রেজাল্ট দিবে, তুমি জানো? 

হ্যাঁ। “আমার খুব ভয় করছে মামুদ, কেন”? 

যদি রেজাল্ট খারাপ হয়ে যায়, তুমি ভালো রেজাল্ট করবে, আল্লাহর উপর ভরসা রাখো। 

( পরের দিন) 

ভালো রেজাল্ট করে দুজনেই ফিজিক্সে অনার্স নিয়ে কলেজে ভর্তি হলো, একসাথে কলেজ-টিউশন যাতায়াত করে। 

মামুদ কালকে  কোনো জায়গা ঘুরতে চলো, কালকে যাবে,

“ হ্যাঁ চলো”, কয়েকদিন পর গেলে ভালো হতো, না আমি কালকেই ঘুরতে যাবো, এমনকি তোমাকে সাথে যেতে হবে। 

“সেখানে গিয়ে কিছু শপিং করবো” ।   “আমার যাওয়া হবে না পিয়া”। 

“আমি বুঝতে পারছি কেন যাবে না”। তোমার কাছে টাকা নাই তারতার জন্যজন্য। 

“আমি থাকতে তোমার কোনো সমস্যা হবে না মামুদ, চলো কালকে তাহলে “। 

অনেক ঘুরাঘুরি করার পর সপিং করে, আসার মূহুর্তে, পিয়ার বাবা দুজনকেই দেখে ফেলে। 

পিয়া তোমাকে বাড়িতে ছেড়ে আসি, চলো। যেতে যেতে মামুদ পিয়া কে বলে, “পিয়া তোমাকে যদি হারিয়ে ফেলি, আমি কিন্তু পাগল হয়ে যাবো”। 

“পিয়া তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারবো না “। 

“ I love you পিয়া,” মামুদ বাড়িতে বিয়ের কথা বলছে, আমি এখন বিয়ে করতে পারবো না,

অনেক ম্যানেজ করছি, এটা মনে হয় পারবো না। পরিবারের চাপে বিয়ে করতে হবে, আমি যতটা পারি ম্যানেজ করবো মামুদ। 

তুমি কাঁদছো মামুদ, এটা মনে হচ্ছে শেষ বাড়ি করে ছেড়ে গেলাম, আর দেখা হবে না পিয়া, আমার মনে হচ্ছে। 

“পাগল কোথাকার কাঁদতে নেই “, মামুদ আমি কিন্তু থামতে পারছি না, আমার কান্না বেরিয়ে আসছে “, প্লিজ মামুদ এখন কান্না করো না, আমার বাড়ির কেউ দেখে নিবে। 

পিয়া আমি কিন্তু কালকে আমার বাবা – মাকে দুজনের সম্পর্কের কথা বলবো। 

“দেখো মামুদ তোমার পরিবার মেনে নিলেও”, “আমার বাবা কিন্তু মানবে না “। 

ঠিক আছে কাল তাহলে দেখা হচ্ছে পিয়া। 

মামুদ বাড়ি গিয়ে একটা ফোন দিবে, তুমি সাবধানে বাড়ি যাও।


(একমাস পর পিয়া সাথে দেখা) 

পিয়া তোমাকে আমি পাগলের মত খুঁজেছি, তোমার বাড়ির সামনে এসে কতদিন ঘুরে গেছি, তোমাকে একটি বারের দেখার জন্য, তোমার ফোনের অপেক্ষায় সবসময় বসে আছি। কবে তুমি একবার ফোন করবে। 

“তোমার কি একবারও দেখার ইচ্ছে করনি”! 

“আর তুমি শাড়ি পড়ে আছো, হাতে নতুন চুড়ি, বা হাতে তোমার কি এটা, আংটি মনে হচ্ছে”। 

“তুমি কি বিয়ে করে নিয়েছো “। 

একটি বারের জন্য আমার কথা শোনো মামুদ, তুমি পাগলের মত করো না,  প্লিজ শোনো মামুদ। 

“সেদিন রাতে আমাকে মা বেধড়ক মার মেরেছে, এমনকি ফোনটাও ভেঙে দিয়েছে, তোমার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তার পরের দিন কলকাতায় চলে জোর করে আমাকে নিয়ে চলে যায় এবং মামার বন্ধুর ছেলের সাথে বিয়ে দিয়ে দেয়”। 

আমি আর কি করবো ভেবে পাচ্ছি না, আর তোমার সাথে যোগাযোগ বন্ধ, না হলে আমি পালিয়ে আসতাম শুধু তোমার জন্য, তোমাকে একটিবার দেখার জন্য, আমার মামুদ কি অবস্থায় আছে, শুধু পরিবারের জন্য তোমাকে হারাতে হলো। 

এমনকি বাবা বলছে “ তুই যদি ওই ছেলেটার সাথে মেলামেশা ও যোগাযোগ করার চেষ্টা করিস , তাহলে আমার মরা মুখ দেখবি “ । 

তখন আমার কিছুই করার ছিল না মামুদ।

 “পরিবারের পছন্দ মতো ছেলেকে বিয়ে করে আমি সুখী আছি, সুখী নাই মামুদ বয়সের চাইতে দ্বিগুণ বয়সের ছেলেকে বিয়ে করে মানসিক প্রশান্তি নেই মামুদ” । 

বাবা- মা শুধু “ সরকারী চাকরিরত “ ছেলের সাথে বিয়ে দিয়েছে, আমার মেয়ে সুখে শান্তিতে থাকবে  এই ভেবে। 

“মামুদ তুমি আমাকে ভুলে যাও, আমার থেকে ভালো মেয়ে পাবে, সে তোমাকে আমার থেকে বেশি কেয়ার করবে”। 

“ভুলে যাও তুমি আমাকে, ভু- লে  যাও”। 

পিয়া তুমি জানো,” তোমাকে ভুলে যাওয়া তো দূরের কথা “। 

“তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারবো না”।“আমি বেকার তাই, তোমার পরিবার আমার ভালোবাসার মূল্য দিলো না, এমনকি তুমিও “

  এরপর থেকে মামুদ সমস্ত নেশা করতে থাকে, মানসিক চাপে পাগল হয়ে যেতে শুরু করে। 

 প্রতিটা বাবা – মায়ের এই সমস্ত ভ্রান্ত ধারণা ভাঙতে হবে, সন্তান কোথায় ভালো থাকবে, কার সাথে ভালো থাকবে এটা কোনো মেয়ের বাবা ভাবে না। ভাবে শুধু সরকারি চাকরি করে, মানে ছেলে ভালো।  বেশিরভাগ মেয়ে  বলে সুখে আছি, কিন্তু তার অন্তরে শুধু কোথায় যেন অশান্তি, অসুখী থেকেও তার সাথে সংসার করে সারাজীবন কাটিয়ে দেয়। 

এই ভাবে পিয়ার কথা ভাবতে ভাবতে দিন যায়, মাস যায়, বছরের পর বছর যায় পিয়ার স্মৃতি নিয়ে পাগল হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে থাকে মামুদ। 

শত শত মামুদ তাঁর ভালোবাসার মানুষটিকে না পেয়ে পাগল হয়ে যায়, কেউ এই পরিস্থিতিতে কোনো মেয়েকে কাছে পেয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে, আর কেউ কাউকে না পেয়ে একাকিত্বের মধ্য দিয়ে নদী ভাঙনের মতো, এক মূহুর্তে সমস্ত কিছু যেন ভেঙে চুরমার করে দেয়, সেরকমই মামুদের জীবনে হয়েছিল। 


০৪/১০/২০২০

২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭

গল্প - কবিরুল ইসলাম কঙ্ক

স্যান্ডেল


স্কুলে ঢুকে যারপরনাই অবাক হলাম। পাকা একবছর পর দিলীপবাবু এসেছেন। অবাক হওয়ার কারণ তার তার দীর্ঘ অনুপস্থিতি নয়। দিলীপবাবুর পায়ে নতুন একজোড়া স্যান্ডেল। উনিশ বছর চাকরিজীবনে তার পায়ে স্যান্ডেল দেখিনি। সিনিয়র শিক্ষকদের কাছে শুনেছি চাকরিতে ঢুকেছিলেন খালি পায়ে। অবসরও নিয়েছেন খালি পায়ে। এমনকি বিয়ে করতেও গিয়েছিলেন খালি পায়ে। কেউই নাকি তাকে কোনোদিন জুতো পরতে দেখেননি।

----- 'কেমন আছেন? অনেকদিন পরে এলেন। ভেতরে আসুন।' দিলীপবাবুকে বললাম। দুবছর হল অবসর নিয়েছেন। দুবছরেই মনে হচ্ছে বয়স অনেক বেড়ে গেছে। কিন্তু হাসিটি তেমনই আছে।  
----- 'ভালো আছি স্যার। পেনসনের কী একটা কাগজ এসেছে। বুঝতে পারছি না। অবশ্য বোঝার কথাও না।' বলে একমুখ হাসলেন।
----- 'বসুন।'
----- 'তাই আপনার কাছে একবার এলুম।' বলে দিলীপবাবু দাঁড়িয়েই থাকলেন। বসার কোনো লক্ষণ দেখালেন না। প্রসঙ্গত বলি দিলীপবাবু ছিলেন স্কুলের চতুর্থশ্রেণির কর্মচারী। নিজেও চতুর্থশ্রেণি পাশ। স্কুলের সব ঘর খোলা এবং বন্ধ করা, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ফাইফরমাশ শোনা ছিল তার কাজ। হাতে থাকত প্রচুর চাবির একটি গোছা। ধুতি ও পাঞ্জাবিসহ নগ্ন পদযুগল। এখন আমি ভারপ্রাপ্ত প্রধানশিক্ষক। দিলীপবাবুর পেনসনের কাগজটা হাতে নিলাম। তেমনকিছু নয়। লাইফ সার্টিফিকেটের সাথে আধার কার্ড এবং আরও কিছু কাগজপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে। দিলীপবাবুর পায়ের দিকে তাকালাম। স্যান্ডেল জোড়া ঘরের বাইরে খুলে রেখে এসেছেন। বললাম, 'জুতো তাহলে পরলেন?' দিলীপবাবু বললেন, 'কী করব স্যার, মারা যাওয়ার আগে বউটা জুতো পরার প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিল।'

হা করে তাকিয়ে থাকলাম। যতদূর জানি জুতো না পরা নিয়ে বউয়ের সাথে তার বিস্তর ঝামেলা হত। দুপক্ষই ছিলেন সমান জেদি এবং একগুঁয়ে।


দিলীপবাবুর পায়ের পাশ দিয়ে চৌকাঠের কাছে একজোড়া স্যান্ডেল দেখা যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে একজোড়া ভালোবাসা।




২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭

গল্প - নির্মলেন্দু কুণ্ডু

সম্পর্ক 

—"কী রোজ রোজ ঐ পাগলটার কাছে যাও,ভালো লাগে না এসব!কতবার বারণ করেছি না!"
—"ও-ও যে আমায় মা বলে ডাকে বাবা,মা হয়ে সন্তানের ডাকে সাড়া না দিই কি করে!"কোনরকমে কান্না গিলে কথাগুলো বলেন নীলিমা দেবী৷

আর পাঁচটা মেয়ের মতো নীলিমা দেবীর যখন বিয়ের কথাবার্তা চলছে,তখন থেকেই সবাই সাবধান করে দিচ্ছিল সাংসারিক নানা ব্যাপারে৷শাশুড়ীর কথা শুনে চলা,স্বামীকে দেবতাজ্ঞান করা,বাড়ির কাজকর্ম মুখ বুজে করে যাওয়া এরকম হরেক উপদেশ আর পরামর্শে বিয়ের আগে থেকেই শ্বশুরবাড়ি সম্বন্ধে একটা অজানা ভীতি কাজ করছিল নীলিমার মনে৷কিন্তু বিয়ের পর নিজেই অবাক হয়ে গেল নীলিমা৷কোথায় শাশুড়ীর দজ্জালপনা!তিনি যে মায়ের থেকেও আপন৷কথায় কথায় বলতেনও,নীলিমাকে এনে উনি ওঁর মেয়ের শখ পূর্ণ করেছেন৷স্বামীটিও দিলদরিয়া মানুষ৷রাশভারী অধ্যাপকের বর্ম পরে থাকলেও স্ত্রীর সাথে রঙ্গ-রসিকতায় কম যেতেন না৷নীলিমাও বুঝতেন,স্বামী তাঁকে প্রচন্ড ভালোবাসেন৷তাঁদের সেই ভালোবাসারই ফসল অনিন্দ্য,ওঁদের ছেলে৷অনিন্দ্য হওয়ার পর আনন্দটা যেন আরও
বেড়ে গিয়েছিল নীলিমার সংসারে৷কিন্তু এত সুখ বোধহয় বিধাতার সহ্য হলনা৷শাশুড়ির মৃত্যুর পারলৌকিক ক্রিয়াকর্ম মিটতে না মিটতেই এক গাড়ী দুর্ঘটনায় স্বামী প্রমথেশবাবুও প্রাণ হারালেন৷সেই থেকে তাঁর পেনশনের কিছু টাকা আর কয়েকটা টিউশনি—এভাবেই বড় করে তুলেছেন নীলিমা দেবী তাঁর ছেলেকে৷কোনদিনও অভাব বুঝতে দেননি৷সাধ্যের বাইরে গিয়েও কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং করিয়েছেন৷ছেলে যখন নামী সংস্থায় চাকরী পেল,গোটা পাড়ায় মিষ্টি বিলিয়েছেন৷

সেই একই পাড়ায় এক বটতলায় হঠাৎই এসে উপস্থিত হয় এক জটাওয়ালা যুবক৷গালের দাড়ি,উস্কোখুস্কো চুল,নোংরা পোশাক দেখে সবাই এক মুহূর্তেই বুঝতে পারে লোকটা রামপাগল৷দুয়েকবার তাড়াবার চেষ্টাও করে,কিন্তু পাগলটা রে-রে করে তেড়ে আসায় সেই চেষ্টায় ক্ষান্ত হয় পাড়ার লোকে৷কয়েকজন অতি-উৎসাহী তখন হাতের কাছে পড়ে থাকা ইঁট ছুঁড়তে থাকে পাগলটাকে লক্ষ্য করে৷মন্দির থেকে ফেরার পথে দৃশ্যটা দেখেই রুখে দাঁড়ান নীলিমা দেবী৷
—"এই কি করছো কি তোমরা?থামো,থামো বলছি!"
—"সরে যান জেঠিমা৷ও একটা পাগল৷এক্ষুনি কিছু একটা ক্ষতি করে দেবে আপনার৷"
—"কে পাগল নয়,বাবা!এই দুনিয়ায় প্রত্যেকেই তার নিজের নিয়মে পাগল৷আর ক্ষতি,রাখে হরি মারে কে!"
নীলিমা দেবীকে পাড়ার ছেলেপুলেরা একটু মান্য করে৷তাই ইঁট ছোঁড়া ছেড়ে আস্তে আস্তে চলে যায় জায়গাটা ছেড়ে৷নীলিমা দেবী এবার পাগলটার দিকে ঘুরে তাকান৷লোকটা এতক্ষণ ভয়ে কুঁকড়ে ছিল৷তিনি এগিয়ে গিয়ে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন—"তুমি কে বাবা?"
পাগলটা বোবা অর্থহীন দৃষ্টিতে নীলিমা দেবীর দিকে তাকায়৷বোধহয় বোঝার চেষ্টা করে ইনি ওর বন্ধু,না শত্রু৷
—"ভয় পেয়ো না,বাবা!আমি তোমায় মারবো না!তোমার খুব খিদে পেয়েছে,না?এই নাও,এই মিষ্টিগুলো খাও৷এখন আমি আসি,কেমন!তুমি কিন্তু কোথাও যেও না!কারো কোন অনিষ্টও করো না৷"
উনি উঠে একটু এগিয়েছেন,হঠাৎ—"মা!"
চমকে ঘুরে তাকালেন নীলিমা দেবী৷আঃ,কতদিন তিনি এ' ডাক শোনেননি৷যে ছেলেকে এত কষ্ট করে মানুষ করলেন,সেও যেন কেমন পাল্টে যাচ্ছে৷আগে অফিস থেকে ফিরে নানা কথা বলতো৷ধীরে ধীরে সেটুকুও বন্ধ হয়ে গেল৷এখন কথা বলতে 'খেতে দাও','দরজা বন্ধ করে দাও' ইত্যাদিতেই সীমাবদ্ধ৷মা ডাকটাও তাই অনেকদিন শোনেননি নীলিমা দেবী৷তাই আজ হঠাৎ এই অপরিচিত পাগলটার মুখে 'মা' ডাক শুনে সেই ফল্গুধারার মতো বয়ে চলা মাতৃত্বস্নেহধারা যেন নতুন গতিমুখ পেল৷সেই থেকে পাগলটাকে রোজ খাবার,অনিন্দ্যর পুরনো জামাকাপড় দিতে লাগলেন৷পাগলটাও কেমন যেন মা-নেওটা হয়ে উঠল ধীরে ধীরে৷পাড়ার অন্য কাউকে কিছু বলে না৷কেউ মারতে বা খোঁচাতে এলে খেঁকিয়ে ওঠে ঠিকই,কিন্তু কখনোই কাউকে মারতে যায়না৷ও অবশ্য মায়ের এই ভালোবাসাটুকু সেই গাছতলায় বসেই উপভোগ করতো৷কখনো নীলিমা দেবীর বাড়ি যায়নি৷নীলিমা দেবীও তা মেনে নিয়েছিলেন৷কারন অনিন্দ্য যখন থেকে পাগলটার কথা জানতে পেরেছিল,তখন থেকে মায়ের সাথে দূরত্বটা যেন আরও বড় হয়ে উঠেছিল৷মায়ের কাজে অসন্তোষও প্রকাশ করতো প্রায়ই,এমনকি গলাবাজিও হত মাঝে মাঝে৷পাড়ার লোকেরাও ওর এরকম ব্যবহারে অবাক হত,কিন্তু নাক গলাতো না৷

হঠাৎ একদিন সকালবেলায় দেখা গেল পাগলটা নীলিমাদেবীর বাড়িতে গিয়ে দরজায় ধাক্কা মারছে৷পাড়ার লোকেরা সেই শব্দে বেরিয়ে এসছে৷অনিন্দ্য তখন অফিসের কাজে বাইরে গেছে৷পাড়ার লোকেরা পাগলটার এরকম আচরণে অবাকই হল,কারন এত দিনে এই প্রথম পাগলটা এরকম করছে৷তাছাড়া নীলিমা দেবীই বা কোথায়!উনিই পাড়ায় সবার আগে ওঠেন৷অথচ এত আওয়াজেও ঘুম ভাঙছে না!পাগলটা প্রতিবেশীদের দেখতে পেয়ে ছুটে গেল ওদের কাছে৷মুখ দিয়ে বিচিত্র আওয়াজ করতে লাগলো,আর বারবার আঙুল দিয়ে নীলিমা দেবীর বাড়ির দিকে দেখাতে লাগলো৷দুয়েকজন কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে গেল সেই বাড়ির দিকে৷নিজেরাও ধাক্কা দিল দরজায়৷কিন্তু শব্দ না পেয়ে অজানা আশঙ্কায় দরজা ভেঙে ঢুকে দেখলো খাটে পড়ে আছে নীলিমা দেবীর নিথর দেহ৷

ছেলেকে খবর পাঠানো হল৷ছেলে বিকেলেই ফিরে এল৷এসেই জিজ্ঞেস করলো—"বডিটা কখন দাহ হবে?আমাকে আবার ফিরতে হবে৷একটা ইমপর্ট্যান্ট মিটিং সারতে হবে!"ছেলের এই মনোভাবে প্রতিবেশীরা যারপরনাই বিস্মিত হল৷পাগলটা কিন্তু তখনও বাইরে বসে অঝোর ধারায় কেঁদেই চলেছে৷

পরের দিন সকালে দেখা গেল সেই বটতলায় পাগলটা মরে পড়ে আছে!