২৫ নভেম্বর ২০২০

আইরিন মণীষা



বিরহী কথন

চিত্ত্ব মননে গেঁথেছি যারে

হারিয়ে ফেলেছি আমি তারে,

বিরহী মননে স্মৃতি ভাসে

যেখানে তোমার মুখটি আসে। 


কাটে না প্রহর আমার আজ

তোমাকে হারিয়ে পড়লো বাজ,

এখনো তোমাতেই আমার বাস

পারিনা ভুলতে স্মৃতির রাশ। 


তোমারি বিরহে মননের ঢেউ

দেখে না কষ্ট তোমাদের কেউ,

স্মৃতির পালকে পরশ দিই

তোমাকেই যেন খুঁজে নিই।।

শান্তিব্রত চট্টোপাধ্যায়



বারোটা বেজে যায় 

ঘড়িতে এখন বেলা বারোটা প্রায় 

ধর্মতলা স্ট্রীট পেরোতে পেরোতে

যন্ত্র এবং জন্তুর চিল চিৎকার।

ট্রাম গুমটির কোণ ঘেঁষে  

দুটো জীবন্ত লাশ বাড়িয়ে চলেছে   

পাওনা দেনার তুমুল উত্তেজনা।  

শহিদ মিনারের দিক থেকে

তীরবেগে উড়ে আসা প্রায় দুষ্প্রাপ্য  

এক দাঁড়কাকের মুখ থেকে 

হঠাৎ খসে যায় টুকরো গতকাল।   

পুলিশবুথের ঠিক পেছন কোণ ঘেঁষে   

মধুমেহ জর্জরিত এক মুতুবাবুর      

অদ্ভুত পোজে চেন খুলতে খুলতে  

সে কি চলকে ওঠা তৃপ্তির হাসি !  


নষ্ট জলের নর্দমায় গড়িয়ে ঘড়ির কাঁটা   

গুটি গুটি পায়ে রাত বারোটার দিকে;    

চৌরঙ্গী পার্কস্ট্রীট জীবনদীপের চক্রব্যুহে 

অনবরত ঠোকাঠুকি খেতে খেতে 

এইবার নিশ্চিন্তে চুকে বুকে যাবে  

ক্লান্ত দিনলিপির ধূসরিত কোলাজ।

দুপায়ের ফাঁকে লবণাক্ত কোলভাগ  

চিড়বিড়িয়ে ছটফট করে উঠে    

খুঁজতে থাকে নখের আয়েশি নখরা!

মেচেতা ভরা পালিশে তা দিয়ে    

হেসে ওঠে খসখসে শিফন কিন্নরী।  

শেষ হর্ণের তালে তালমিলিয়ে উছলে ওঠে    

চিরচিহ্নিত বিস্ময়বোধক অব্যয়েরা।  

সোনালী তরলের মৌতাতে গা ভাসিয়ে      

বীরপুঙ্গবের বোতাম খোলা পৌরুষ 

উন্মত্ত জন্তুর আক্রোশে ঝাঁপিয়ে    

মাত্রাহীন সন্ত্রাসে ডুবে যেতে থাকে      

কল্লোলিনীর গভীর উন্মুক্ত গহ্বরে।  


এভাবেই কি তবে বারোটা বেজে যায়!

সঞ্জীবকুমার দে



বোঝে কিছু ?

দুধে–ভাতে বেশ, তবু

মিউ মিউ মিউ !

রামাশিস রেগে টং –

রোতি হ্যাঁয় কিউ ?


দিনে ঘুম, চুপচাপ,

রাতে ঘেউ ঘেউ !

রোজই ঢোকে এপাড়ায়

অচেনা কি কেউ ?


কারণে বা অকারণে

টি টি টি !

এতদিনে সহবত

শিখলি না, ছিঃ !


পুসি-কেলো-চন্দনা

হেসে মরে – ইস্ !

অ্যাপস্, মেইল, বোঝে না তো

কিছু – রামাশিস !


পাহারা তো কচু দেয়,

রাতে টেনে ঘুম !

কর্তাকে ছবি সেন্ড –

দিয়ে রাখলুম !

হাবিবুর রহমান হাবিব



চোরকাঁটা 

মেঘহীন সাদা আকাশ পরন্ত দুপুর 

ধূ ধূ সাদা মাঠের পরে,

তোমার ধূপছায়া শাড়ির পারে

চোর কাঁটাতে বিঁধিয়ে দিলাম মন। 

আমার এই টূকরো কথা আর হাসি

পড়বে মনে ফিরবে যখন ঘরে। 

খুঁজতে থাকবে একটি একটি করে

ওগুলো চোর কাঁটা নয় স্মৃতির কাঁটা, 

বিধঁবে বুকে কখনো সুখের ব্যথায়

কখনো বা ব্যথার সুখে স্মৃতির পরে।

শঙ্খ সাদা জোৎস্না রাত

সে তো যেন রাত নয়

মনে হবে চাঁদে লেখেছে গ্রহণ। 

অমন করে বলোনা আর যাই

বলো ওগো আসি

বিদায়ের নীরব ব্যথায় মুখে থাক হাসি।

তোমার ঐ দু চোখ থেকে যদি মুক্ত ঝরে, 

ব্যথার স্মৃতির ঝিনুকে নয়

রেখো তুমি তাকে ধরে হৃদয়ে মুক্ত করে।

নূরুজ্জামান হালিম



উজবুকের রবিবার 

আজ রবিবার।

কত রবিবার হয়েছে গত,

কত রবিবার আসবে আবার

সে এমন কী আর!

রবিবার গুলো আজ যাচ্ছেতাই।


এমনি কোন এক রবিবারে 

বর্ষা ছিল, 

সেই বর্ষাকে ছুতো করে 

জলে যেন না ভিজে শরীর 

সে অধম সাহসে 

গিয়েছি তোমার বাড়ি।


তুমি ইউনিফর্ম পরে বসে আছো জানালার ধারে,

বৃষ্টি সারলে পরে বেরুবে স্কুলের পথে।

সহসা আমাকে দেখে 

চমকে উঠলে তুমি

যেন সর্বনাশ হয়ে গেছে আজ!

বললে,"এত্তো সাহস?"

তোমার মামনি এসে বলল,

"এরকম ভিজেছো বাবা!

মাথা মুছে নাও, 

তোমরা যা এলোমেলো। "


মায়ের কথায় --

তুমি হয়ে উঠলে নারী 

তাওয়েলের বদলে,

 ওড়নাতেই মুছে দিলে মাথা।

চোখে চোখ রেখে লজ্জায় লাল তুমি বললে,"উজবুক!

বৃষ্টিতে ভিজা তোমার  ছুতো। "

তারপর আচমকায়একটা চুমু। 


ধরার আগেই পালিয়ে ছিলে সেদিন 

ভেবেছিলাম  মাঘ যদি আসে-

রবিবার আসবেনা?

তারপর, প্রেম আরও পবিত্র হলো, 

আরও আরও এলোমেলো হলাম,

কেন জানি-

 সেরকম রবিবার আর এলো না।


তোমরা হঠাৎ চলে গেলে অষ্ট্রেলিয়ায়,

ফিরলে না আর।

তারপর কত কত রবিবার  

এলো গেলো,

বৃষ্টিও এসেছে 

কখনো কখনো বার মিলিয়ে।

তবুও, তোমার বিয়ের খবর এল,

তোমার বিখ্যাত হবার খবর, 

দেশে বিদেশে ঘুরে বেড়াবার খবর,

এখন নাকি তোমার দেশ ও বিদেশ 

ঘর আর আঙিনা।


আজ তুমি ঢাকায় আসছো,

আজও রবিবার, 

কত কত রবিবার আসে-

কেন যেন সেই রবিবার 

কিছুতেই আর আসে না।

প্রবীর বেপারী



অভিপ্রায় 

 খুঁজেছি যারে জনম ধরে

কোথায় আমি পাবো তাহারে?

আছে  কি সে এই চরাচরে?


পাই যদি তাহার যুগল চরণ 

বক্ষ মাঝে করিব ধারণ,

কোথায় আছে সেই মহাজন 

ভেবে ভেবে  রজনী কাটে।


না পাই যদি তাহার দেখা

মোর এ জনম যে হবে বৃথা,

বোঝে না কেউ মনের ব্যাথা

আশায় আশায় চলছি সর্বক্ষণ। 


যেন কৃপা করে শ্যাম দয়াময় 

এসেছি আমি যার করুণায়,

অধমের এই শেষ অভিপ্রায়।

মনি জামান




প্রিয়তমা

প্রিয়তমা!যদি তোমার মন বলে,কবি ডাকছে তোমায়।

তবে একটি কবিতা লিখ আমার স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য।

যদি শরৎ কে কাঁদতে দেখ,তবে ভেবে নিও কবি অনেক কষ্ট পেয়েছে,কারণ তুমি কবিতা লিখনি তাই।

প্রিয়তমা!যদি কখনো প্রজন্মের মিছিলের ডাক শোন,

তবে সেদিন মিছিলে যোগ দিও তুমি।

যদি মা বলে ডাকে তোমায় ওরা,

তবে একুশের চেতনার গল্পটা 

শুনিয়ে দিও ওদের।

যদি ভূমিষ্ট জারজদের স্বাধীনতার 

বিকৃতির ইতিহাস লিখতে দেখ,

তবে আর একটি মুক্তি যুদ্ধের 

ডাক দিও শাহাবাগে।

প্রিয়তমা!যদি এ যুদ্ধে শহীদ হই,

তবে প্রজন্মের এ যুদ্ধের একটি গল্প লিখ অনুজদের জন্য।

যদি আর না ফিরি কখনো,তবে শহীদ বেদীতে তুমি নিজ হাতে একটি গোলাপ দিও সেদিন।

প্রিয়তমা!যদি তোমার ছেলেরা 

তোমার কথা না শোনে,তবে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের বজ্র কণ্ঠের স্বাধীনতার ভাষণটি শুনিয়ে দিও ওদের।

প্রিয়তমা!আমার বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে হলেও,প্রজন্মের জন্য একটি স্বাধীন নির্ভেজাল 

দেশ রেখে যাব।

তোমার সন্তানদের দেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ করো,কারণ তিরিশ লক্ষ 

শহীদের রক্তে ভেজা এ মাটি।

২৪ নভেম্বর ২০২০

শুভ্র ব্যানার্জি


শীত

শীতের দ্বীপে বৃষ্টি এলে লেপের পাশে ছাতা

তিলক কামোদ মধ্যরাতে মলহারেতে গাঁথা।

খুব কুয়াশা যেমন মেঘ নকল করে ফোটে

আগুন জ্বেলে রাখার কাঠ বৃষ্টি নিলো ঠোঁটে।

বিকেলবেলা ক্রিকেট পিচে কাদার চোরাবালি

ছুটির দিনে চেয়ারে জল পার্কে বেঞ্চ খালি

এমন দিনে খিচুড়ি আর চপের স্বাদ ভালো।

একটি মেয়ে কাউকে ভেবে মেট্রো ফস্কালো।

কবি মিশ্র



পরকীয়া

আমার প্রতি দিনের অভ‍্যাস

সকালে গরম চায়ের সঙ্গে

সাদা কাপের প্রেম-

অব‍্যক্ত চেয়ারে কিছুটা হেলান দিয়ে

খবরের কাগজের সঙ্গে যেমন চোখের প্রেম,

কেমন যেন একটা আত্মিক যোগ...


অমলিন জানলাও চায় আমার আদর খেতে

বুলবুলি এসে জানান দেয় টোকা দিয়ে...


আমি যখন থাকি না, ওরা কি আমায় অনুভব করে?

দরজার পর্দা, খাওয়ার টেবিল, রান্নার গ‍্যাস,

ওরা যে আমার প্রতি দিনের অভ‍্যাস...


সব অলসতা কাটাতে সুবিন‍্যস্ত‍ বিছানা,

সমস্ত রাগ, অভিমান, কান্নার একমাত্র সাক্ষী,

আমার আদরের বালিশ, পাশবালিশ

ওরা কেমন আছে আমায় ছাড়া ??


ওরা কেউ চলমান নয়- 

যেখানে থাকি, সেখানেই সখ‍্যতা হয়, 

আলাদা আলাদা ভাবে


ওরা কেউ প্রতিবাদ করে না

নেই কোন হিংসা, দ্বেষ, অভিযোগ

আমার সব অত‍্যাচার সহ‍্য করে...

ওরাই আমার প্রকৃত বন্ধু

আমার পরকীয়া...

জৈদুল সেখ



জ্বলন্ত শূন্যতা

লোহায় গড়া রেলিং, বড়ো ইমারত

নিঃশব্দ ক্ষুধার্ত জ্বালায় মাথানত

অবুঝ শিশুটি বার বার ডাকে

ভালোবাসার বিশ্বাসে চাদরে মাথা ঢাকে

জ্যান্ত লাশের অজ্ঞাত শিশুর এ প্রহেলিকা

পৃথিবীর বুকে যেন আঁচড় মেরে বলে

        তোমরা কী কেউ দেখছো জ্বলন্ত শূন্যতা!


আম্ফানের অন্ধকারে আয়নার সামনে দেখি

চিরনিদ্রায় শায়িত মা, চাদরে মুখ লুকানো শিশুর চাঁদ

মায়ের স্নেহের পরশে, নিথর দেহের কানে

শিশুটি বার বার বলে মা মা মা .....


একবিংশ শতাব্দীর ক্ষুধার্ত শহিদের ভারতবর্ষ

মানুষের জন্য কেবলই উপহাস, লাঞ্চনা আর বঞ্চনা! 

দহন জ্বালায় জ্বলছি জ্বলব! প্রতিবাদ করব না? 

ক্ষমা করে দিও এ ভারতবর্ষ আমার না!

শুভমিতা বিশ্বাস



দুটো হাত 

 অসুখের ভেতর যে দুটো হাত

 ডালপালার মতো ছড়িয়ে থাকে

 সেই দুটো হাতেই আমি কোটি কোটি অসুখ চাই 

সেই দুটো হাতেই মাথা নীচু করি 

শ্রেষ্ঠ আশ্রয়ের জন্য


সেই দুটো হাতেই সব অসুখের ওষুধ পাওয়া সম্ভব

মোঃ রুহুল আমীন



আমরা মধ্যবিত্ত

ধোপা কাচানো শার্ট গায়ে

কালি করা স্যান্ডেল পায়ে

চশমাটা তুলে ঐ কপালে, 

কিন্তু আসল কথাটি যাবেনা

বলা, আমরা মধ্যবিত্ত বলে।


করতে হবে বাজার ঘাট

মানিব্যাগটা গড়ের মাঠ

গিন্নির ফর্দ নিলাম তুলে, 

কিন্তু সত্য কথাটি পারিনা

বলতে, আমি মধ্যবিত্ত বলে।


চাল ডাল আর নুন তেল

দাম বাড়ে সকাল বিকেল

দু'চোখ ভেজে তপ্ত জলে,

তবু খাটি কথাটি পারিনা 

বলতে, আমি মধ্যবিত্ত বলে।


সহধর্মীনি করে প্যান প্যান

ছেলে মেয়েদের ঘ্যান ঘ্যান 

পড়ে গেছি মহা গ্যাঁড়াকলে, 

তবুও মুখ বুঁজে সব সইতে 

হয়, আমরা মধ্যবিত্ত বলে। 


মাস গেলে পাইনা বেতন

ব্যবসাটাও শিকেয় এখন

আল্লাহ জানে ক্যামনে চলে, 

এ কথাও কাউকে পারিনা 

বলতে, আমি মধ্যবিত্ত বলে।

কাজী জুবাইদা


বারান্দার ফুলেরা

আমার ফুলেরা পাতাতে পাতাতে 

লিখছে কি গান কথাতে কথাতে

ভাবছে কি কিছু রাখছে মাথাতে?

মন তা ধরতে পারে না!

          তারা স্বপ্নে দুলে

          দুলায় স্বপন।


করেনা মিথ্যে বীজের বপন 

         আমার মতো ব্যাথাতে,

ওরা আমার ও ধার ধারে না

         আমি দেখি বা না দেখি

ভালো বাসি কি না বাসি

       তাতে কিছু তো যায় আসে না,

       ওরা নিজের মতো নিজেই হাসে

আমার হাসিতে হাসে না


আমি শুধু ভাবি,

         ওরা কি আমায়

সত্যিই ভালো বাসে না?

আমি কেন তবে ওদের মতো 

দিন রাত্তির পেরিয়ে যতো,

         ভুল শুদ্ধের ঠিকানা ভুলে

ওদের সাথেই বাঁচি না?


ওরা ইচ্ছে হলে ফুল ফোটাতে

       ইচ্ছে হলেই হুল ফোটাতে জানে,

আমার মতো কারো মুখ তো যাচে না।


ওরা বারান্দার এক কোণে 

       রইছে আপন মনে

ওরা জন্মাবধি বারোমাস

       তবু জমে না দীর্ঘশ্বাস 

করে না তো অভিযোগ 

       নাই কোনো মনোরোগ

নাই নিকট নেই দূর 

নাই তাল নাই সুর

      তবে শুধু নাচে গিয়ে

      বাতাসে মৃদঙ্গ বাজায়,

আমি ওদের মতো নই,

      তাই নীরব হয়ে রই। 

অকারণে কল কল

ওটা মানুষেরই ছল

      সে বোঝেনা, 

      তবু বোঝাতে চায়

তাই নাচে, তাই গায়

      এটা সভ্যতার ভরং।


আমি ঐ ফুলের দিকে চাই,

      অন্তরে বাহিরে হেরে যাই,

      আমার ভিতরে বাহিরে ছাই

শুধুই পোড়া গন্ধ পাই,

      সেই আগুনে পুড়ে অরণ্য 

      লাগে যেন দাবানল

লোভের কীটে কাটলে অমন

      পুড়বে অনর্গল।