মোবাইলে টাইম পাশ, সম্বৃদ্ধ উল্লাস সাহিত্য হাসি ঠাট্টা খুনসুটি বিন্দাস পড়তে হবে নইলে মিস করতেই হবে। মোবাইল +91 9531601335 (হোয়াটসঅ্যাপ) email : d.sarkar.wt@gmail.com
৩০ নভেম্বর ২০২১
কবি শুভমিতা বিশ্বাস এর কবিতা
সে কি জানে?
শুভমিতা বিশ্বাস
ঘর ভর্তি লোকের মাঝেও
যার দিকে তাকালে,
নিমেষেই অভিমান বুঝতে পারি
তাকে আমি নিজের প্রতিটা অঙ্গ ভাবি।
সে কাদলে মনে হয়, পৃথিবীর সব নদীর জল
আমার বুকে এসে ধাক্কা মারছে
আর সে হাসলে,
স্বর্গের চেয়েও ওপরে উঠে যাই আমি!
বাজার,দোকান,রাস্তায় একটু একা হলেই
তার ভাবনা আমার ভিতর রিনঝিন করে ঝরে যায়...
তার শূন্যতাকে, আমি এক মুহুর্ত বইতে পারিনা
সে কি জানে?
মমতা রায়চৌধুরী'র ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন" ৫৮
একান্ত মনেই লিখে চলেছেন লেখক। তার নিত্যদিনের আসা যাওয়া ঘটনার কিছু স্মৃতি কিছু কথা নিয়ে কল্পনার মোচড়ে লিখছেন ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন " চলবে...
টানাপোড়েন (৫৮)
পরিষ্কার স্থানে পাবে মুক্ত ঘ্রান
রেখা আজ শীতের সকালের প্রথম আলোর স্পর্শ সারা শরীরে মেখে নিল। শ্বশুরবাড়িতে ব্যস্ততায় সূর্যের প্রথম আলোর স্পর্শ মাখার সুযোগই হয় না। আজ রেখা ভীষণ খুশি। মনের গভীরে এত খুশির মাঝে শুধুই উঁকি - নীল সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে ইচ্ছে করছে, সারা মনটাকে নীল নীলাভ করে নিতে।
এমন সময় শুনতে পেল ভোলা কাকা চেঁচিয়ে বলছে'ছোট বৌদি, ছোট বৌদি ,আজকে আমাদের গ্রামে না চাঁদের হাট বসেছে?'
কাকিমা বললেন 'কেন রে কি হয়েছে? কোথায় বসেছে?'
ভোলা কাকা বলল 'আরে বাবা, আমাদের মিলনের দোকানে।'
কাকিমা অবাক হয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে খুন্তি হাতে বললেন 'কার দোকান ?মিলনের দোকান!'
ভোলা বললো ' তাহলে আর কি বলছি তোমায়?'
ছাদ থেকে তরতর করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে রেখা সব শুনছে।
কাকিমা বললেন 'কেন রে মিলন কি করেছে?'
রেখা মনে মনে ভাবল এই ভোলা কাকা হচ্ছে এবিপি আনন্দের রিপোর্টার ।সব খবর আগে ভোলা কাকার কাছে।
ভোলা কাকা বলল 'মিলনের চায়ের দোকান আছে না?'
কাকিমা বললেন'' হ্যাঁ ,,আমাদের মিলন তো খুব ভালো ছেলে। চায়ের দোকান আছে ,কি হয়েছে তাতে?'
ভোলা কাকা বলল 'কি হয়নি বলো?'
কাকিমা বললেন ' সেই থেকে হেঁয়ালি করে যাচ্ছিস বাবা , আমার রাজ্যের কাজ পড়ে রয়েছে ।এবার বল তো কি হয়েছে?'
ভোলা বলল 'ছোট বৌদি, একটু চা হবে গো?'
কাকিমা বললেন 'খুব হবে ।একটু বোস।'
কাকিমা রান্নাঘরে ঢুকে ফ্লাক্স থেকে চা কাপে ঢেলে ভোলাকে দিলেন।
ভোলা কাকা গরম চা পেয়ে খুব খুশি হলেন, আর সঙ্গে সঙ্গে একটু চুমুক দিয়ে বলল ' ছোট বৌদির হাতে চা না খেলে সারাটা দিন কেমন যেন লাগে।'
কাকিমা বললেন 'তা তো বুঝলাম ।কালকে ওই যে সকাল বেলা বেরিয়ে গেলি ,বাজার-টাজার করে দিয়ে ।তোর যে খাবার রাখা ছিল ,সেটা কি মাথায় ছিল ?'
ভোলা কাকা জিভ কেটে বলল' আমি কান ধরছি ছোট বৌদি ।আমার ভুল হয়ে গেছে।'
কাকিমা বললেন 'খুব হয়েছে। এবার বল তো সারাটা দিন কোথায় ছিলিস?'
ভোলা কাকা বলল' আরে ওই পাশের গ্রামে গিয়েছিলাম মাছ ধরতে।'
কাকিমা বললেন' সে কি রে ?তা কতগুলো মাছ পেয়েছিস বাবা।'
ভোলা কাকা বলল মাথা চুলকে 'কই আর পেলাম ।সারাটা দিনই শুধু এমনি ছিপ ফেলে কেটে গেল।'
কাকিমা বললেন' সে তো হবেই ।তুই আবার কবে থেকে মাছ ধরার পোকা হয়ে গেলি বল তো?'
ভোলা কাকা হে হে হে করে হেসে উঠলো।
আর বলল' তবে বৌদি চা না খেয়ে তো আর আমি বেরোয় নি ।চা টা কিন্তু সুপার ছোটবৌদি ।তোমার হাতে।'
কাকিমা বললেন 'নে হয়েছে ভোলা আর প্রশংসা করতে হবে না এবার আসল কথাটা খুলে বল তো?'
ভোলা বলল ' আরে বাবা, বলার জন্যই তো আমি আসলাম ।রোসো,রোসো।'
ভোলা কাকা বলল ''আমাদের মিলন চায়ের দোকানের সঙ্গে সঙ্গে আর কি কাজ করে সেটা তো জানো?'
কাকিমা বললেন 'হ্যাঁ ও তো নিজের দোকানের সামনে ছাড়াও নিয়মিত চারিদিক পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার গুরুদায়িত্ব নিজের ঘাড়ে তুলে নিয়েছে।'
ভোলা কাকা বলল 'হ্যাঁ ,সেই জন্যই তো সাড়া ফেলে দিয়েছে চারিদিকে।'
রেখা যেন কেমন একটা মজার বিষয় পেল ও বসে পড়ল বিষয়টা শোনার জন্য।
কাকিমা বলল 'হ্যাঁ ,তাতে কি হয়েছে বল?'
ভোলা কাকা বলল 'একটা নতুন বুদ্ধি খাটিয়েছে তাতে দেখা গেছে ওর চায়ের দোকানে যারা আড্ডা দিতে আসেন,সেখানকার চা খেতে আসা মানুষের হাতে তুলে দিয়েছে একটি করে পরিচ্ছন্নতার স্টিকার লাগানো কাপে গরম চা।
কাকিমা বললেন 'বলিস কি রে?'
ওদিকে ঘর থেকে কাকু শুনছেন ।শুনে বললেন ' কি বলছিস রে?'
ভোলা কাকা ঘরে ঢুকে একটু গলা বাড়িয়ে বলল ,' হ্যাঁ গো দাদা। এতেই তো সাড়া পড়ে গেছে চারিদিকে।'
রেখা বলল ' তারপর কি হলো সেটা বলো?'
ভোলা কাকা বলল 'স্টিকারে কি লেখা ছিল জানো?'
কাকু কাকিমা সবাই বললেন ,' কি করে জানবো সেটাই তো জানার চেষ্টা করছি?'
ভোলা বলল প্রত্যেকের হাতে তুলে দেওয়া চায়ের কাপে যে স্টিকার লাগানো ছিল তাতে লেখা ছিল পরিষ্কার রাখলে স্থান ,তবেই পাবে মুক্ত ঘ্রাণ।'
রেখা বলল ' কি সুন্দর শব্দচয়ন গো?'
কাকিমা বললেন' হ্যাঁ, হারুদা মারা যাবার পর আর তো পড়াশোনাটা বেশি দূর চালাতে পারে নি ।কিন্তু ওর উচ্চমাধ্যমিক পাস এবং ফায়ার এন্ড সেফটি ট্রেনিং কোর্স করা আছে।'
রেখা বলল' বাহ শুনতেও কত ভাল লাগে। এটা আমাদের গ্রামের গর্ব।'
ভোলা কাকা' তারপর ওই শোনো কি হয়েছে?'
মা বললেন বল?
ভোলা বলল আজকে যেন চায়ের দোকানের আড্ডায় দেখা গেল বিভিন্ন ক্ষেত্রের মানুষজনদের।
কাকিমা বললেন যেমন-
ভোলা কাকা বলল 'এই কলেজে পড়ান তাদের কি বলে?
রেখা বলল ' অধ্যাপক বা প্রফেসর।'
ভোলা কাকা বলল 'একদম ঠিক মামনি।'
এছাড়া কবি ,তারপরে হচ্ছে শিক্ষক সঞ্চালক এরকম গুণীজনের সমাবেশ।
রেখা বলল 'কি অবাক কান্ড তাহলে তো মিলনদার নাম অনেক দূর পর্যন্ত চলে যাবে গো?'
কাকিমা বলল ' হ্যাঁ, ঠিক তাই।
রেখা বলল' এই কাজগুলো কখন করে?'
ভোলা কাকা বলল 'সকাল-বিকেল বা রাতে নিজের দোকানের কাজের শেষে।
রেখা বলল 'পুরো বাজার সংলগ্ন এলাকা পরিষ্কার কর
ভোলা কাকা বলল ' তাহলে আর কি বলছি তোমাদের?'
রেখা বলল ,' এটা তো একদম অভিনব ব্যাপার'
ভোলা কাকা মাথা নেড়ে বলল 'আরো বলেছে সামনে যে শুভ নববর্ষ আছে ,সেই নববর্ষের দিন এইভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মধ্যে দিয়ে স্বচ্ছতার বার্তা সকলের উদ্দেশ্যে দিতে চাইছে।'
রেখা বলল ও অধ্যাপক কবি কোথাকার?'
ভোলা কাকা বলল 'আরে বাবা ,আমাদের মিলনের নাম অনেক দূর অব্দি ছড়িয়েছে ।তাই তারা শহর থেকে এসেছেন মিলনের কাজ স্বচক্ষে দেখার জন্য।'
কাকিমা বললেন ,'একজন সামান্য চা বিক্রেতা সে যদি চা বিতরণ করার মধ্যে দিয়ে স্বচ্ছতার বার্তা দিয়ে আনন্দ অনুভব করতে পারে ,তাহলে প্রত্যেকের উচিত সেই প্রচেষ্টা চালানো।'
রেখা বলল' এই মিলনদার জন্য আমাদের এই গ্রামের নাম কিন্তু অনেক দূরে পর্যন্ত ছড়িয়ে যাবে।'
কাকিমা বললেন ,'সবার প্রচেষ্টা যদি এরকম থাকত ?তাহলে সুন্দর হয়ে উঠত আমাদের এই পৃথিবী।'
রেখা বলল 'সারা পৃথিবীর মানুষ যদি শোনে এবং সবাই যদি সচেষ্ট হয় পৃথিবীকে সুস্থ রাখার জন্য অর্থাৎমিলনদার মতোই যদি সকল এগিয়ে আসে তাহলে পৃথিবী এভাবে অশান্ত হয়ে উঠবে না ,শান্ত হবে।
কাকীমা বললেন ' একদম ঠিক বলেছিস ননী?
রেখা বলল ' নচিকেতার এই গানটা মনে পড়ে কাকিমা'?
কাকিমা বললেন 'কোন গানটা বল তো?'
রেখা বলল 'একদিন ঝড় থেমে যাবে... পৃথিবী আবার শান্ত হবে।
কাকিমা বললেন ' একদম ঠিক বলেছিস। হ্যাঁ গানটা শুনেছি।'
এর ভেতর জুড়েই শুভ চেতনা আসত তো?'
কাকু বললেন 'বৃথা আশা মরিতে মরিতেও মরে না'
এই আশাতেই বুক বাঁধি আমরা সকলে।''
কাকিমা বললেন 'মিলনের জন্য গর্ববোধ হচ্ছে।'
কাকু বললেন 'একদিন আমাদের এই গ্রামের নাম উজ্জ্বল হয়ে থাকবে সকলের স্মৃতি কোঠায়'।
মমতা রায়চৌধুরী। ৬০
একান্ত মনেই লিখে চলেছেন লেখক। তার নিত্যদিনের আসা যাওয়া ঘটনার কিছু স্মৃতি কিছু কথা নিয়ে কল্পনার মোচড়ে লিখছেন ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন " চলবে...
মমতা রায়চৌধুরী'র ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন"
টানাপোড়েন ৬০
চিন্তামুক্ত
আজ সকাল থেকেই শরীরটা কেমন ম্যাচম্যাচ করছে মনোজের। মাথা তুলতে কষ্ট হচ্ছে। আজ রেখা যদি পাশে থাকতো? আজ খুব রেখার কথা মনে হচ্ছে। বাপের বাড়ী গেছে বলে আমাকে ভুলেই গেল। হঠাৎই ফোন বেজে ওঠে। মনোজের ইচ্ছে করছে না ফোনটা তুলতে। আবার ফোন বেজে উঠল।
এবার মনোজ বিরক্তির সঙ্গে ফোনটা রিসিভ করে বলল 'হ্যালো'।
অপরপ্রান্ত থেকে কণ্ঠ ভেসে আসলো ' কি করছো?'
মনোজ বুঝতে পারল রেখার গলা নয়, কিছুক্ষন চুপ করে থাকলো। শরীরটা ভালো নেই বকবক করতে আর ইচ্ছে করছে না। শণি যেন মনোজের পেছন ছাড়ছে না।
অপরপ্রান্ত থেকে আবার বলল'কি ব্যাপার উত্তর দিচ্ছ না যে?'
মনোজ বললো ' কি উত্তর দেব?'
তিথি বলল 'যা জিজ্ঞেস করলাম।'
মনোজ বললো 'শুয়ে আছি।'
তিথি বলল' কি ব্যাপার অফিস যাও নি।'
মনোজ বলল 'না'।
তিথি বলল 'যাক ,তাহলে একটু মন খুলে কথা বলতে পারবো। নইলে তো শুধু কাজের দোহাই।'
মনোজ বললো 'আমার কথা বলার মানসিকতা নেই।'
তিথি বলল' কেন তোমার পাশে বউ আছে বুঝি?'
মনোজ বলল' তা আমার যখন বউ আছে। সে তো থাকবে , এটাই স্বাভাবিক নয় কি? এক প্রশ্ন কেন রোজ করো?'
তিথি বিরক্তির সঙ্গে বলল' বৌ এর কথা বললে তোমার গায়ের এত ফোসকা পড়ে কেন বল তো?'
মনোজ বলল' তোমাকে হাজার বার বলেছি যে রেখা সম্পর্কে তুমি কোন কথা বলবে না। তোমার মুখে মানায় না।'
তিথি বলল 'তাহলে এবার আমার কথা বলি?'
মনোজ বলল 'আমি তো তোমাকে বললাম, আমার কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।'
তিথি বলল 'তা বললে তো হবে না।তুমি রোজ আমাকে এভোয়েড করবে ?এটা তো আমি মেনে নিতে পারব না।'
মনোজ বলল 'এই তুমি আমার সঙ্গে এভাবে কথা বলবে না। তোমার সাথে আমার কোন লেনাদেনা নেই।'
তিথি বলল' তাই নাকি?'
মনোজ বললো' হ্যাঁ,তাই।'
তিথি বলল'কেন তুমি রেগে যাচ্ছ বল তো?
রাগার মতো তো আমি কিছু বলি নি।'
মনোজ বলল' তুমি যখন কথা বলো ,তখন রাগার মতই কথা বলো।'
তিথি বলল'তাহলে তোমার কাছে কিছু পার্সেল যাবে তখনই বুঝতে পারবে?'
মনোজ বললো 'পারসেল??'
তিথি বলতো 'আমাদের কিছু ঘনিষ্ঠ মু'হূর্তের?'
মনোজ বলল 'ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে কবে..?
তিথি বলল 'তুমি যদি আমার কথা মত চলো ।তাহলে আমি এসব কিছুই করবো না।'
মনোজ এবার একটু ভয় পেয়ে গেল তবে কি কলেজ লাইফে এক্সকার্শন এর সেই ফটোগুলো..
মনোজ একটু নরম হয়ে বলল 'দেখ তিথি নতুন করে তুমি আমার জীবনে আর কোন ঝামেলা বাধিয়ো না ।আমি যখন সংসারী হয়েছি ।তুমি তোমার মত সেটেল হবে না কেন ?তুমি আমার পেছনে কেন পড়ে আছ বলো?'
তিথি বললো 'এখন তো বেশ মিষ্টি মিষ্টি করে বলছো?
এমনি তে আজকে আমার শরীরটা খুব খারাপ আমি অফিস যেতে পারি নি। আমার বকবক করতে ভালো লাগছে না।
তিথি বলল'' বেশ আমি আজকে ফোনটা রাখছি?'
মনোজ যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। কি মাছের কাঁটা যে ফুটল কিছুতেই বেরোচ্ছে না ।এ যে কি যন্ত্রণা ?কাকে বোঝাবো? (মনে মনে ভাবতে লাগল।)
ফোনটা কেটে কেটে দেওয়ার পর আবার রেখার কথাই ভাবতে লাগলো। গতকাল কতবার রেখাকে ফোন করা হয়েছে ফোনই ধরল না। ওকি এখানকার কথা সব ভুলে গেল। মিলিদের নিয়ে এত ভাবে অথচ ওদের খোঁজ টা পর্যন্ত নেওয়ার সময় নেই।
এর মধ্যেই মিলিদের আওয়াজ পাওয়া গেল চিৎকার করছে খাবার জন্য।
যাক তবুও আজ সুমিতা কাজে এসেছিল ওকে দিয়ে ওদের খাবারটা করিয়ে নেওয় হয়েছে ।তাই নিশ্চিন্ত ।ভোরবেলা টুংটাং করে ফোনটির আওয়াজে মাথাটা ধরেছিল। মাথা তোলা যাচ্ছিল না ।
এখন যে ভাবেই হোক উঠে ওদেরকে খাবার দিতে হবে অবলা জীব ওরা তো বুঝবে না?
মনোজ আস্তে আস্তে উঠলো। তারপর বাচ্চাদের জন্য দুধ রুটি ভালো করে মেখে খেতে দিল।
অন্যদিকে রেখা বাড়িতে ফিরে কাকিমাকে জিজ্ঞেস করলঃ' কার ফোন এসেছিল গো কাকিমা?'
কাকিমা তখন রান্নাঘরে মাংস কষাচ্ছিল। পেঁয়াজ রসুন আদা ও মসলার ভালো গন্ধ বেরিয়েছে। কড়াইতে খুন্তির টুং টা্্ আওয়াজ হতে লাগল।
রেখা রান্না ঘরে উঁকি দিয়ে বলল 'ও কাকিমা, এত জরুরি তলব করেছিলে কেন ভোলা কাকাকে দিয়ে?'
কাকিমা বললেন 'আরে তোর কতবার ফোন এসেছে জানিস?'
রেখা বলল' কে করেছিলো ফোন?'
কাকিমা বললেন 'তা তো দেখি নি?'
কাকিমা বললেন 'সকাল থেকে ফোন দেখার কি আমার সুযোগ আছে বল?'
এর মধ্যে বেসিনের জলের কোলটা ছেড়ে দিয়েছে তো হোস হোস শব্দে জল বেরোচ্ছে। রেখা রান্নাঘরে ঢুকে কাকিমাকে বললো' কি ভালো গন্ধ বেরোচ্ছে কাকিমা ।একটু ঘ্রাণ যেন ভেতরে নিয়ে নিল। গন্ধেই অর্ধভোজন।
কাকিমা বললেন 'তোর জন্য একটু কষা মাংস তুলে রাখলাম খাবি?'
রেখা খুব খুশি হয়ে বলল 'তাই বুঝি? দাও দাও দাও আমার জিভ থেকে জল পড়ছে টস টস করে।'
কাকিমা বললেন 'আমি জানি তো?'
রেখা বলল 'তুমি এতজনের কথা মাথায় রাখ কাকিমা ?আই অ্যাম প্রাউড অফ ইউ।'
রেখা কষা মাংসের বাটিটা তুলে নিয়ে খুব মিস করেছি বলতে লাগলো। আর বলল' কাকিমা সত্যিই যেমনি সুন্দর তুমি রান্নাও করো, তেমনি তোমার সুন্দর ব্যবহার।'
কাকিমা গ্যাসটা সিম করে দিয়ে বলল' ,আমি ওদিকে যাচ্ছি। ননী তুই রান্না ঘরে আছিস তো?'
রেখা বলল 'তুমি না থাকলে আমি রান্না ঘরে একা একা থাকবো ?আমার ভালো লাগবে না।'
রেখা বেশ আয়েশ করে কষা মাংসটা খেতে লাগলো।
কাকিমা বললেন' ননী কার ফোন এসেছিল একটু দেখে নেে।'
রেখা খেতে খেতে বলল' হ্যাঁ দেখে নিচ্ছি। একটু হুঁশ হাস শব্দ করে বলল ও কাকিমা তোমার হাতে জাদু আছে।'
কাকিমা বললেন "কিরে ঝাল হয়েছে?'
রেখা বলল 'না ,না ,না । বোধহয় একটু ওই চেরা কাঁচালঙ্কা মুখে লেগেছে।'
কাকিমা একটু চিন্তিত ভাবে বললেন 'তাই বল ঝাল হলে তো তোর কাকু খেতে পারবে না।'
রেখা মুখটা ধুয়ে এসে দোপাট্টায় হাত মুছতে মুছতে বলল ' দেখি কে ফোন করল?'
রেখা ঘরে গিয়ে ফোন খুঁজতে লাগল। যেখানে ফোনটা ছিলো ,সেখানে না পেয়ে ঘর থেকে বলল 'কাকিমা ,কাকিমা। ও কাকিমা?'
কাকিমা গেটের ধারে দাঁড়িয়ে কার সঙ্গে কথা বলছিলেন ,ওখান থেকে উত্তর দিলেন' কি হলো রে ননী?"
রেখা বলল বাইরে বেরিয়ে এসে' ও কাকিমা ফোনটা কোথায়?'
কাকিমা বললেন' না ওই দেখ ভোলাকে বলেছিলাম ফোনটা ধরতে। না ধরে ফোনটা কোথায় রেখে গেছে ,দাঁড়া দেখছি।'
কাকিমা ঘরে এসে এদিক ওদিক ঘুরে ফোন পেলেন ফ্রিজের উপর।
কাকিমা বললেন 'এই দেখ ভোলার কাজ, ব্যাটাকে যা বলব তার উল্টো কাজ করবে জানিস?'
রেখা ফোনটা বের করে দেখছে স্কুল থেকে বড়দির ফোন, রিম্পাদির ফোন, মনোজের ফোন।
রেখা ভাবল বড়দিকে ফোন করা যাবে না ।ফোন করলেই কিছু-না-কিছু কাজের কথা বলবেন।
তার চেয়ে মনোজ ও রিম্পা দি কে ফোন করা যাক।
রেখা প্রথমে ফোন করল মনোজকে। মনোজের ফোনে রিং হয়ে যাচ্ছে। ফোন তুলছে না কেন? আবার ফোন করল। এবারও রিং হয়ে কেটে গেল। এবার খুব চিন্তা হচ্ছে রেখার। মনোজ কোন অসুবিধায় নেই তো? ঠিক আছে তো? ছি ছি ছি ছি কাল থেকে মনোজের কোন খবর নি। এটা একদম ঠিক কাজ হয় নি। এখানে এসেছে কি হলো বুঝে উঠতে পারছে না রেখা।'
আবার ফোন করল রেখা। এবার মনোজ ফোন তুলে কাতর কন্ঠে বলল 'হ্যালো'
রেখা বলল'কি হয়েছে তোমার? এভাবে কথা বলছ কেন?
মনোজ কিছুক্ষন চুপ করে থাকলো ।একটু অভিমান মনের ভেতরে দানা বেঁধেছে।
রেখা আবার বলল 'কি গো ,কি হয়েছে তোমার?
ঠিক আছ তুমি? শরীর খারাপ?'
মনোজের মনে মনে খুব রাগ হল। কালকে এতবার ফোন করা হল ফোন ধরল না ।আর এখন জিজ্ঞেস করছে কী হয়েছে তোমার? কিন্তু কথাটা চেপে রেখে বলল' হ্যাঁ, জ্বর এসেছে। প্রচন্ড মাথা যন্ত্রণা।'
রেখা বলল 'ডাক্তার কাকুকে ফোন করেছিলে? ওষুধ খেয়েছো?'
মনোজ বলল 'হ্যাঁ, খেলাম।'
রেখা বলল'কিন্তু তোমার পাশে তো এখন একজনকে থাকার দরকার। চৈতির মা কে বলবো?'
মনোজ বলল 'না, না।'
রেখা বললো 'তাহলে কি করে হবে বলো ?রাত্রে জ্বর বাড়লে তখন কি করবে?'
মনোজ বলল' কিচ্ছু হবে না।'
রেখা বললো 'তাহলে পার্থকে ফোন করি ,।ও থাকুক এসে।'
মনোজ আবার বলল 'ওসব কিছু লাগবে না রেখা?'
রেখা বললো 'তাহলে কি লাগবে তোমার?'
মনোজ বলল 'তুমি?''
রেখা বলল'এই ইয়ার্কি মেরো না তো?'
মনোজ বললো 'ও আমার কথা তোমার ইয়ার্কি মনে হচ্ছে ।ঠিক আছে। তাহলে চুপ করলাম।'
রেখা বলল' শোনো তোমার এখন মাথা কাজ করছে না ।আমি পার্থকে ফোন করে দিচ্ছি।'
মনোজ বলল 'তুমি কি আসবে না ?ওখানেই থাকবে?'
রেখা বলল 'বা রে ,তুমি গাড়ি পাঠাবে ।তারপর তো যাবো?'
মনোজ বলল''এখন গাড়ি পাঠাবো?'
রেখা বলল 'পাগল নাকি ?তুমি এখন গাড়ি পাঠাবে ।আমি কখন ফিরব?
শোনো কিছু খেয়েছো?'
মনোজ বলল'খেতে ভালো লাগছে না।'
রেখা বলল 'আমি পার্থকে ফোন করে দিচ্ছি। ও কিছু খাবার নিয়ে যাবে।'
রেখা ফোন কেটে দিয়ে পার্থর ফোন নম্বর*৫৬৭৮ ডায়াল করলো।
পার্থ ফোন ধরে বলল' হ্যালো'।
রেখা বলল 'আমি রেখা বৌদি বলছি।'
পার্থ সোফায় হেলান দিয়ে বসেছিল ,হঠাৎ তড়িৎ করে উঠে পড়ে বলল'বৌদি বলুন?'
রেখা বলল 'হ্যাঁ, বলছি ভাই ,আজকে একটু তোমার দাদার কাছে গিয়ে থাকতে পারবে ? যদি তোমার কোন অসুবিধা না থাকে?'
পার্থ বলল 'না সেরকম কোনো অসুবিধে নেই ।কেন কি হয়েছে বৌদি?'
রেখা বললো' আসলে ওর খুব জ্বর এসেছে ।একজন থাকা দরকার?'
পার্থ বলল 'না ,না ,না ।আপনি চিন্তা করবেন না ।আমি যাব।'
রেখা বলল 'অসংখ্য ধন্যবাদ ভাই।'
পার্থ বলল 'না 'না ,বৌদি ।এভাবে কেন বলছেন ?আমরা তো প্রতিবেশী পাশাপাশি থাকি ।এটুকু না করলে হয়?'
রেখা বলল'আর একটা কাজ দেবো?'
পার্থ বলল 'বলুন?'
রেখা বলল 'একটু দাদার জন্য তরকা রুটি নিয়ে যেও।জ্বরের মধ্যে এটা খেতে খুব ভালোবাসে?'
পার্থ বলল 'আপনি কোন চিন্তা করবেন না বৌদি ।আমি রাত্রিতে আপনাকে পরে ফোন করে জানাবো ,কেমন আছে দাদা ।কেমন?'
রেখা বললো 'তুমি আমাকে চিন্তামুক্ত করলে ভাই ।ভালো থেকো।'
পার্থ বলল 'আপনিও ভালো থাকবেন বৌদি।'
ফোন কাটার পর কাকিমা বললেন' কি হয়েছে রে? জামাইয়ের কিছু হয়েছে?'
রেখা বলল' ওর খুব জ্বর কাকিমা?'
কাকিমা বললেন''খুব চিন্তার ব্যাপার রে ।একা বাড়িতে থাকে?'
রেখা বলল ''না, পাশের পার্থকে বললাম থাকতে?'
কাকিমা বললেন 'বেশ করেছিস ,।তাহলে একটু চিন্তা মুক্ত হওয়া গেল।'
মমতা রায়চৌধুরী ৫৯
একান্ত মনেই লিখে চলেছেন লেখক। তার নিত্যদিনের আসা যাওয়া ঘটনার কিছু স্মৃতি কিছু কথা নিয়ে কল্পনার মোচড়ে লিখছেন ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন " চলবে...
মমতা রায়চৌধুরী'র ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন"
টানাপোড়েন (৫৯)
স্মৃতিমেদুর দিন
গোধূলি বেলায় নদীর ধারে চারিদিকে সবুজের সমাহার ম্লান সূর্যের আলো জলের উপর পড়ে নানা রকম চিত্র অংকিত হচ্ছে ।আপন মনে রেখা চলে গেল সেই নদীর ধারে ।যেখানে শৈশব, বাল্য ,কৈশোর কেটেছে সেই স্মৃতিমেদুর জায়গায় গিয়ে বসেছে আজ রেখা। কত না বলা কথা রয়ে গেছে মনের অজান্তে। আজ বলতে ইচ্ছে করছে আকাশ বাতাস নদীকে সাক্ষী রেখে । নদীর ধারে বসে আপন মনে পাদুটোকে জলে ডুবিয়ে দিয়ে জলকেলি করতে করতে ভাবছিল ভুল করেছে বর্তমানের কথা বর্তমানে বলতে হয় ।কালকে বললে তার কোন মূল্য থাকে না ।শোনার লোকও থাকে না। মনের গভীরে শুধু থেকে যাবে প্রিয় মানুষকে বলার না বলা কথা।
পরক্ষণে রেখা ভাবছেন কেন এসব ভাবছে রেখা।
স্বামীর সংসার জীবনে ভালোই আছে। তবে তার মনে কি কোন ক্রাইসিস রয়েছে ,যার জন্য আজ বারবার তার শৈশব বিজড়িত গ্রামে এসে পুরনো দিনের কথা বেশি করে মনকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে।
হঠাৎই মনে পড়ে গেল নীলদার কথা। নীলদা বলেছিল
'কি রে ননী নদীর ধারে একা বসে পা দুটোকে জলে ডুবিয়ে কার কথা ভাবছিস?
অমনি রেখা সেদিন বলেছিল' কার কথা আবার ভাববো ?'
নীল দা বলেছিল 'ও তাই বুঝি? তাই তুই একা একা এখানে এসে বসেছিস?'
রেখা বলেছিল' কেন জায়গাটা কি শুধু তুমি একাই এসে বসতে পারো?'
নীলদা বলেছিল' তুই এখন তো বড় হচ্ছিস। যেখানে সেখানে একা একা যাবি কেন? ওয়েট কর কাকিমাকে গিয়ে সব বলছি।'
কতবার এভাবে নীলদা রেখাকে রাগিয়ে দিত। কখনো কখনো রেখা ভয় পেয়ে চুপ হয়ে যেত। কারণ রেখার মা এ ব্যাপারে ভীষণ কড়া ছিলেন। শুধুমাত্র কাকিমা 'জেঠিমা, জেঠুদের আদর,আহ্লাদ দেবার জন্য মা বেশি কিছু বলতে পারতেন না।
যখন রেখা ফুঁপিয়েকেঁদে উঠত।
ঠিক তখনই নীলদা গিয়ে বলতো 'পাগলি কোথাকার। 'আমি কাকিমাকে গিয়ে বলব তোর কথা? কি সুন্দর আমরা দুজন এখানে এসে গল্প করব। নদীতে ঢিল ছুড়ে কাগজের নৌকা ভাসিয়ে দিয়ে দেখতেই থাকব। কত ভালো লাগে বল।'
রেখা তখন বলতো 'তুমি আমার সাথে দুষ্টুমি করছিলে?' বলেই নীলদার পিঠের উপর দু চার ঘা মারতো।
নীলদাও তারিয়ে তারিয়ে মার খাওয়াটা উপভোগ করত।
রেখা গাল ফুলিয়ে বলতো 'তোমার সাথে আর কথা বলবো না?'
নীলদা অমনি পকেট থেকে নারকেলের নাড়ু বা তিলের নাড়ু বের করে বলতো ' কাল এগুলো পাবি না।'
রেখা এই নাড়ু খেতে খুব ভীষণ ভালোবাসতো।
তখনই বলতো 'নীলদা, না না না তুমি আমাকে ওই গুলো দাও।'
নীলদা বলতো 'তাহলে বল কথা বন্ধ করবি না তো?'
রেখা ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাত।
আজ কত বছর হয়ে গেছে নীলদার সাথে কোন যোগাযোগ নেই ।কিন্তু মন থেকে তাকে কিছুতেই সরিয়ে দিতে পারে নি রেখা। মনের কোনে যেন কোথায় আলাদা একটা সফট কর্নার তৈরি করে রেখেছে।তাই আজ ঘুরে ফিরে শুধু নীলদার কথাই মনে হচ্ছে ।
এমন সময় ভোলা কাকা এসে ছুটতে ছুটতে এসে চেঁচিয়ে বলল 'মামনি তুমি এখানে বসে আছো , ওদিকে তোমার বাড়িতে ডাক পড়েছে।
রেখার হঠাৎই চমক ভেঙ্গে বলল ' আমায় কেন গো ?ভোলা কাকা।'
ভোলা কাকা বলল ' জানি না তো মামনি।'
রেখা বলল 'একটুখানি যে এসে বসব নিরিবিলিতে সে উপায়ও নেই ।'
কাকা বলল 'তুমি আজকে ফোন নিয়ে আসো নি?'
রেখা বলল'ফোন আনলে ফোনের আওয়াজে বিরক্ত লাগে।আজ শুধু নিজেকেই জানার জন্য এখানে এসে বসেছি।'
ভোলা কাকা বলল' তোমায় অনেক বার ফোন বেজেছে ।এই জন্যই ছোট বৌদি তোমার কাছে পাঠালো।'
রেখা বলল 'কে ফোন করেছে?'
ভোলা কাকা বলল ' সে তো বলতে পারব না মামনি।'
রেখা বলল 'ঠিক আছে ।যাচ্ছি।'
ভোলা কাকা বললেন 'না তোমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে বলেছে ।চলো।'
রেখা বলল 'আমি কি ছোট বাচ্চা নাকি আমি কি যেতে পারবো না ভোলা কাকা?'
ভোলা কাকা বলল 'ছোট বৌদির নির্দেশ আমি তোমাকে ছেড়ে যেতে পারবো না। আমার সাথে চলো।'
রেখা আবার চলে গেল সেই বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায়।
একদিন চারিদিকে অন্ধকার আর মাতাল বৃষ্টি ।নীল বৃষ্টিতে ভিজে গেছে। কয়েকদিনের জন্য গিয়েছিল বেড়াতে । বেড়াতে বলাটা ঠিক হবে না। একটা কাজে গেছিল। ৪-৫ দিন দেখা হয় নি রেখার সাথে। তাই বৃষ্টিতে ভিজে যখন রেখার কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল ।গ্রামের রাস্তায় অসম্ভব পিচ্ছিল রাস্তা ছিল ।তার ওপর কাদা ।অনবরত পা ,মাথা দিয়ে টপটপ করে জল পরছিল । গায়ের পোষাক ভিজে একাকার। ভিজে জামা কাপড়ে একটু শীত শীত করছিল। বাজারের কতগুলো ঘর বৃষ্টির ছাঁট ঢুকবে বলে একটু করে নামানো ছিল ।বাজারের লোক নেই। দু একজন লোক ছিল। তাদের মধ্যে কেউ বিড়ি বাঁধছিল ,কেউ রাখি করছিল।কেউ হিসেব করছিল। এসব পার করে হঠাৎ করে এসে হাজির হয়েছিল রেখাদের বাড়িতে।
দরজার কাছে এগিয়ে ডাকছিল 'কাকিমা ,কাকিমা?'
রেখার মা সাড়া দিয়ে বলেছিল 'কি হয়েছে নীল?'
নীল নিরুত্তর দেখে গেটের দরজা টা খুলে ভেতরে আসতে বলে রেখার মা।
নীল ভিজে একশা হয়ে গেছে ।এক্ষুনি ওর চেঞ্জ করার দরকার জামাকাপড় ।
সেদিন অবশ্য রেখার মা কিছু বলেন নি কারণ নীলের মা বাড়িতে ছিলেন না।
রেখা পাশের ঘরে ছিল হঠাৎ এই নীলের গলার আওয়াজ শুনতে পেয়ে ভেতরে ভেতরে একটা ধুকপুকানি শুরু হয়েছিল।
কতদিন যেন নীলকে দেখেনি প্রায় একযুগ সমান হবে। আসলে নীল এসেছিল রেখাকে দেখার জন্য।
এই কদিনের অনুপস্থিতিতে রেখা কতটা চেঞ্জ হয়েছে রেখা কেমন দেখতে হয়েছে সেইসব ভাবনায় মশগুল ছিল।
তাই রেখা যখন দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়ে, নীল এক ফাঁকে এসে রেখাকে দেখে নিয়েছিল ।ইশারায় কথা বলেছিল। বৃষ্টির সন্ধ্যায় আর মায়াবী আলোয় রেখার টুকটুকে ফর্সা গাল দুটো লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠেছিল।
আসলে এই কদিনে একদিন ও নীলকে দেখতে পায় নি ।তাই তার মনের ভেতরে ক্ষোভ দানা বেঁধেছিল খুব। কিন্তু নীলকে দেখার পর রেখার মন প্রাণ বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস আর একরাশ অভিমান এসে গ্রাস করে।
খুব রাগ হয়েছিল নীল এর উপর কিন্তু রেখা প্রকাশ করতে পারে নি।
উল্টে নীল যখন রেখাকে বলেছিল তাকে কখনো মিস করে কিনা ? রেখা নিরুত্তর ছিল। এরইমধ্যে রেখার মা নীলকে হাঁকডাক করতে থাকে বলেন ' নীল
নীল খাবে এসো?'
নীল বলেছিল :না ,কাকিমা খাব না?'
রেখার মা বলেছিল 'কেন?'
নীল বলেছিল ' বাড়িতে গিয়ে খাব।'
রেখার মা একটু অবাক হয়ে বলেছিলেন'দিদি বাড়িতে নেই। তাই বলে আমরা কি বানের জলে ভেসে গিয়েছি।'
মিলার কোন কথা বাড়াতে পারে নি।
হঠাৎই নীল রেখাকে একটা শাখের আঙটি উপহার দিয়ে বলেছিল 'এই ননী আংটিটা পড়বি।'
সেই আংটি আজও সে রেখে দিয়েছে।
এইসব ভাবনার মাঝে হঠাৎ ভোলা কাকা এসে বলল 'মামনি হল তোমার? কি এত ভাবছো বলতো ?'
রেখা বলল 'কিছু নয় তো কাকা,,।
ভোলা কাকা বলল 'তাহলে বাড়ি চলো ।ওদিকে ছোট বৌদি ডেকে ডেকে হয়রান হয়ে গেল।'
রেখা বলল ' আসলে কাকা শৈশব ,বাল্যে কাটানো স্মৃতি কিছুতেই ভুলতে পারছি না ।তাই বারবার সেই চেনা জায়গা গুলোতে এসে বসছি।'
স্মৃতিমেদুর দিনগুলি আজও যেন কাছে ডাকে। আজ যেন রেখার একলা আকাশ থমকে গেছে রাতের স্রোতে ভেসে। এ যেন ক্লান্ত মন খুঁজেছে যখন ঘরের কোণ ,তখন যেন সে হাতছানি দিয়ে ডেকেছে।রেখার একলা আকাশ চাঁদ চিনেছে যেন তার কাছে এসে ই ।
মমতা রায়চৌধুরী। ৫৭
একান্ত মনেই লিখে চলেছেন লেখক। তার নিত্যদিনের আসা যাওয়া ঘটনার কিছু স্মৃতি কিছু কথা নিয়ে কল্পনার মোচড়ে লিখছেন ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন " চলবে...
মমতা রায়চৌধুরী'র ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন"
টানাপোড়েন (৫৭)
'জিহুড়'
বাপরে বাপ আজকের বিকেলটা যা কাটলো। রেখা কিছুতেই ভুলতে পারবে না। মনের ক্যানভাসে সারাজীবনে আঁচড় কেটে যাবে। বাড়িতে ফিরে এসে কাকুর কাছে বসে বসে রেখা এসবই ভাবছিল।
হঠাৎই কাকু বললেন 'কি রে ননী ? আজকে তো তোর গ্রাম ঘোরা হল না।'
রেখা বলল 'দূর কাকু, তুমি ছাড়ো তো ।আজকে কাকিমা যে কাজটা করেছে ,সত্যিই প্রশংসনীয়। স্যালুট জানাই কাকিমাকে?'
কাকু বললেন 'কেন রে ,তোর কাকিমা কি করেছে এমন?'
রেখা বললো ' কি করে নি সেটা বলো?'
কাকু বললেন 'তাহলে বল শুনি?'
রেখা বলল ' ডিটেলসে বলব না ।শুধু এইটুকু জানো কাকিমার মতো নারী যদি এইরকম গ্রামে আরো দুজন চারজন থাকে বা প্রতি বাড়িতে থাকে তাহলে কিন্তু সেখানে অন্যায় কাজ কিছুতেই হতে পারবে না ।মানবিকতার চরম বিকাশ ঘটবে, মনুষ্যত্ব অপমৃত্যুর হাত থেকে বাঁচবে?'
কাকু বললেন 'বাপরে বাপ ।কিন্তু খুব ভারী ভারী কথা শোনাচ্ছিস?'
রেখা বললো 'সেটাই জানো।'
কাকু বললেন 'মীনাক্ষী সহজ-সরল। প্রতিবাদী হয়ে উঠলো কবে?'
রেখা বলল 'আজকে যদি কাকু তুমি যেতে পারতে, বুলু জেঠিমাকে মনে হচ্ছে তার ছেলে, ছেলের বউ তাকে মানসিক রোগী করে রেখেছে। আজকে তা হাতেনাতে প্রমাণ হয়েছে ।সেই দুঃসাধ্য কাজটা কে করেছে জানো? ঝাঁসির রানী কাকিমা?'
কাকিমা রান্নাঘর থেকে বললেন' নে অনেক হয়েছে ।আর তার বর্ণনা করতে হবে না।'
রেখা বলল 'এটা বর্ণনা করার মতোই বিষয় কাকিমা।'
রান্নাঘর থেকে কাকিমা গরম কফি আর ফুলকপির পাকোড়া নিয়ে এসে হাজির । বললেন'সন্ধ্যেবেলায় কফি খেয়েএকটু গরম করে নাও।'
কাকু মজা করে বললেন 'আজকে তুমি কি খেয়ে গেছিলে?'
কাকিমা বললেন ' হ্যাঁ রে ,ননী।তোর কাকু আবার কি কথা বলে? কি খেয়েছি ?তোমরা যা খেয়েছ আমিও তাই খেয়েছি।'
কাকু বললেন 'না ,তাই বলছি।'
কাকিমা বললেন' কেন বললে?'
রেখা বলল 'থামো ,থামো ।তোমরা নিজেদের মধ্যে আর কথা বাড়িয়ো না।'
কাকিমা বললেন' যাই বলিস ননী। আমার কিন্তু মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল রে।'
রেখা বলল'কেন কাকিমা?'
কাকিমা বললেন 'আজকে তোকে ঘোরানোর কথা ছিল গ্রামটা। পারলাম না ।কে জানত কপালে এরকম একটা দুর্ঘটনা ঘটবে?'
রেখা বলল' এটা কে দুর্ঘটনা ব'লো না কাকিমা। যে কাজটা তুমি করেছ ,যদি সেটা না করতে পারতে সেটাই দুর্ঘটনা হতো।'
কাকিমা বললেন,'সত্যিই বুলুদিকে দেখে আমি না নিজেকে স্থির রাখতে পারলাম না ।কোথা থেকে যে আমার মনে এত বল এসে গেল ,এত আমি শক্তি কোথায় পেলাম ,ঈশ্বর জানেন? (দুই হাত কপালে ঠেকালেন)
কাকু বললেন 'তোমার ভেতরে ঐ শক্তিটা ছিলো সুপ্ত অবস্থায় ।অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সেটা সক্রিয় হয়ে উঠেছে।'
রেখা বলল, আচ্ছা কাকিমা বুলু জেঠিমার বাবার বাড়ি কোথায় ছিল যেন?'
কাকিমা বললেন 'পুরুলিয়ায় ।কেন রে হঠাৎ করে জিজ্ঞেস করছিস?'
রেখা বলল,ছোটবেলায বুলু জেঠিমার কাছে গল্প শুনতাম ।পুরুলিয়ায় সে একটা কি উৎসব আছে না?ওখানকার লৌকিক উৎসব, আরে ছাই নামটা ভুলে গেছি।'
কাকিমা বললেন 'হ্যাঁরে ওখানকার শস্যকেন্দ্রিক মা লক্ষ্মীর পুজো।
রেখা বলল একদম ঠিক বলেছ। কিন্তু নামটা যেন কি?
কাকু বললেন 'জিহুড়'উৎসব।
রেখা ও কাকিমা দুজনেই বলে উঠলো হ্যাঁ হ্যাঁ একদম ঠিক।
কাকু বললেন' কি রে ননী ।আমার স্মৃতিশক্তিটা কতটা প্রখর বল?'
রেখা বলল 'তা আর বলতে?
এবারে বায়না ধরল'কাকিমা ও কাকিমা উৎসব সম্পর্কে বলো না একটু ।ছোটবেলায় অনেক শুনেছিলাম বুলু জেঠিমার কাছে। আবার জানতে ইচ্ছে করছে।
কাকিমা বললেন ' আরে বাবা বললাম না, ওটা 'শস্যকেন্দ্রিক মা লক্ষ্মীর পুজো।'
রেখা বলল 'সে তো বুঝলাম ।এই প্রসঙ্গে ওদের একটা লৌকিক কাহিনী আছে ,সেটা বল।'
কাকিমা কফিতে চুমুক দিলেন তারপর বললেন কথিত আছে গর্ভবতী মহিলাকে যেমন প্রসবের আগে সন্তান মায়ের মঙ্গল কামনায় ৭মাস কি ৯মাস সময়ে সাধ খাওয়ানো হয়,...,।
কথা শেষ না হতেই কাকু বললেন' তেমনি জিহুড় হলো লক্ষ্মী দেবীর সাধ ভাত। তাই তো মীনাক্ষী?'
কাকিমা বললেন 'হ্যাঁ একদম তাই।'
রেখা বললো-তারপর?
কাকিমা বললেন 'এই সময় আমন ধান পাকতে শুরু করে ।তাই ফসল যাতে ভালো হয় সেই উদ্দেশ্যেই পূজার সূচনা।'
কাকু বললেন 'এই সময় পুজোয় গ্রামের মহিলা ও পুরুষরা প্রত্যেকে অংশগ্রহণ করে। তবে..?
রেখা বলল 'তবে আবার কি?'
এমন সময় রেখার ফোন বেজে ওঠে।'দুর্গে ,দুর্গে ,দুর্গতিনাশিনী মহিষাসুরমর্দিনী'।
রেখা বলল 'তারপর!'
কাকিমা বললেন 'সমস্ত পুজোটি কিন্তু পুরুষদের দ্বারা সম্পন্ন হয়। '
রেখা বলল 'কি অবাক কান্ড! মেয়েরা কি করে আর পুরোহিতের ই বা কি কাজ?'
কাকিমা বললেন 'এদের পুরোহিত লাগে না। মহিলারা মায়ের প্রসাদ তৈরীর কাজ করেন।'
কাকু বললেন 'সাধারণত পরিবারের কোনো পুরুষ স্নান করে নুতন বা শুদ্ধ বস্ত্র পরে চাষের জমিতে যান ।তার সঙ্গে অবশ্য পূজোর জিনিসপত্র নিয়ে যান আরেকজন।'
রেখা বলল 'সেখানে গিয়ে কি করে?'
কাকিমা বললেন,'আমাদের ননী তো একদম ছোট্ট বাচ্চা হয়ে গেল গো?'
কাকু বললেন 'ও তো আমাদের বাচ্চাই ।যত বড়ই হোক না কেন? ওরা আমাদের সন্তান।ওরা তো ছোটই থাকবে না?'
কাকিমা বলেন 'তা অবশ্য ঠিকই বলেছ।'
রেখা বল 'তারপরে বল?'
কাকু বললেন 'ধানের জমিতে মায়ের উদ্দেশ্যে পুজো দেয়া হয়।'
কাকিমা বললেন 'এই সময় ধানের জমিতে মায়ের উদ্দেশে ধূপ জ্বেলে মন্ত্র পাঠ হয় তারপর আতপ চাল ,ঘি ,সিঁদুর ৭বি ৯ রকমের সবজি মিষ্টি পুজোর উপকরণ হিসেবে নিবেদন করা হয়।'
আবার রেখার ফোন বেজে উঠলো। কাকিমা বল,,ফোনটা ধর।'
রেখা বলল 'এই সময় আর ফোন ধরতে ইচ্ছে করছে না'। ফোনের ভাবনা থেকে দূরে থাকতে চাইছি'ভুলিবো ভাবনা পেছনে চাবো না...?'
কাকু বললেন ' গা না গানটা ঠিক করে।'
রেখা বলল' না ,না, না ।এখন পুরুলিয়ার উৎসব।
কাকিমা বললেন 'জরুরী ফোন ও তো হতে পারে?'
রেখা বলল " তারপর বলো তো তুমি?'
কাকু বললেন' তারপর সেই জমিতে পুজোর পর প্রসাদ একটা পিতলের পাত্রে মেশানো হয়।'
রেখা বলল" দারুন ব্যাপার তো?'
কাকিমা বললেন "এই পুজোকে কেন্দ্র করে ওখানকার গ্রাম বাংলার মানুষ আহ্লাদে মেতে ওঠে।'
রেখা বললো এটা যেন কোন সময় হয়?
কাকু বলে ওই তো আমন ধান যখন পাকতে শুরু করে। অক্টোবর মাসের দিকে হয়।'
রেখা বলল 'ছোটবেলায় বুলু জেঠিমাকে দেখতাম নীলু দা ,লাল দা ওদেরকে সঙ্গে করে নিয়ে চলে যেতেন বাবার বাড়িতে। একবার ওই জিহুড় উৎসবে যাই।
কাকিমা বললেন' কখনো তো বলিস নি একথা?'
রেখা বলল 'মায়ের ভয়েতে বলি নি।'
রেখা বলল 'ও বুলু জেঠিমা কি আর আগের মত না?'
কাকিমা বললেন দেখ এখন দিনকাল পাল্টেছে বাবা-মা মারা গেছে বাবা-মা না থাকলে ছেলেমেয়েদের কদর কোথায় বল তাছাড়া বুলাদির সংসারের দায়-দায়িত্ব বেড়েছিল যাওয়াটা খুব কমই হত।
কাকু মজা করে বললেন ' কেন আমাদের ননী কি আবার যেতে চায় নাকি?'
রেখা বলল'বুলু জেঠিমা যদি সুস্থ হয়ে ওঠেন, কখনও যদি সময় হয়, তখন উৎসবের সময় যাবার ইচ্ছে থাকল।'
কাকিমার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন আমরা সবাই মিলে এই প্রার্থনাই করতে পারি বুলুদি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠুন।
কাকু বললেন 'বুলু বৌদি সত্যি এত সৌখিন আর এত আন্তরিক কেউ একবার বাড়িতে গেলে তাকে কিছু না খাইয়ে কিছুতেই ছাড়তে নারাজ,। বলে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
কাকিমা বললেন' এর শেষ দেখে ছাড়বো ।জানিস ননী?চোখের সামনে এই মানুষটাকে তিলে তিলে এইভাবে মরে যেতে দেখতে পাচ্ছি না।'
রেখা বলল একদম ঠিক বলেছ।
কাকিমা বলল ,দেখেছিস লাল আর ওর বউ কত্ত বড় শয়তান ।নীলকে জানিয়েছে কি না ব্যাপারটা বলাতেই কেমন পাশ কাটিয়ে গেল।'
রেখা মাথা নেড়ে বলল 'হ্যাঁ ঠিক বলেছিস?'
কাকিমা বললেন' না হলে নীল আমাদের ঐরকম ছেলেই নয় ।ও মা অন্তপ্রাণ ছিল ?
আর সেই ছেলে আজ কতদিন হলো বাড়িতে আসে না ।বিদেশ বিভূঁইয়ে আছে কি করছে কে জানে?,'
মমতা রায়চৌধুরী'র ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন" ৫৬
একান্ত মনেই লিখে চলেছেন লেখক। তার নিত্যদিনের আসা যাওয়া ঘটনার কিছু স্মৃতি কিছু কথা নিয়ে কল্পনার মোচড়ে লিখছেন ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন " চলবে...
টানাপোড়েন (৫৬)
মানবিকতা
মীনাক্ষী কাকিমার রণরঙ্গিনী মূর্তি দেখে রেখা আশ্চর্য হয়ে গেছে। কাকিমার ভেতরে রেখা শুধুই অপার স্নেহ ভালোবাসা আর ক্ষমার এক মহা সমুদ্র দেখতে পেয়েছে ,সেখানে যে প্রতিবাদী, মারমুখী মূর্তি লুকিয়ে থাকতে পারে ?আজকের লালদার হাত থেকে বুলু জেঠিমাকে বাঁচানোর এরকম সহৃদয়তার, মানবিকতা র প্রকাশ ।সত্যিই প্রশংসনীয়।
কি আশ্চর্যের ব্যাপার কাকিমা বুলু জেঠিমাকে যা বলছে তাই শুনছে। একটু খাবার নিয়ে কাকিমা বলু জেঠিমার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে কাছে গিয়ে বললেন''আমার লক্ষী দিদি 'এই খাবারটুকু একটু খেয়ে নাও।'বুলু জেঠিমা কি করুন দৃষ্টিতে কাকিমার দিকে তাকালেন ।তারপর মাথা নেড়ে না করতে লাগলেন।কাকিমা বললেন' কেন তোমার খিদে পায় নি?'বুলু জেঠিমা মাথা নিচু করে থাকলেন।
কাকিমা আবার বললেন 'তোমার খিদে পেয়েছে একটু খাও।'বুলু জেঠিমার ভাব ভঙ্গিতে মনে হল খিদে পেয়েছে ।কিন্তু সাহস পাচ্ছেন না খেতে।একবার এদিক একবার ওদিক তাকাচ্ছেন।
রেখা ভাবল 'তবে কি বলু জেঠিমাকে এভাবে না খাইয়ে রাখা হয় এবং তাকে পাগল করে দেবার একটা প্রচেষ্টা চলছে।'
কাকিমাও নাছোড়বান্দা কাকিমা বললেন ' তুমি খাও কেউ কিচ্ছু বলবে না। আমরা আছি।'
ওদিকে লালদা আর লালদার বউ দু'জনার মুখটা দেখলে মনে হচ্ছে তারা খুবই বিরক্ত। তারা মোটেই সন্তুষ্টি লাভ করছে না।ওদেরকে কাকিমা থোরাই তোয়াক্কা করছে।কাকিমা নিজে হাতে করে বুলু জেঠিমাকে খাওয়াতে লাগলেন।খাওয়ার শেষে বুলু জেঠিমা কাকিমার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল।প্রতিবেশীরা গেটের বাইরে থেকে বলছে 'দেখলেন দিদি ,বা কেউ বলছেন দেখলেন বৌদি ।মানুষটা কতটা শান্ত। কিভাবে খাওয়ার পর ঘুমিয়ে পড়তে চাইছে। ,'এখন তো মনে হচ্ছে এসব কিছু এরা নিজেরাই বানিয়েছে। এজন্যেই এরা কাউকে বাড়ির ভেতরে ঢুকতে দেয় না। বাড়ির সমস্ত কিছু জানা হয়ে যাবে বলে।
কাকিমা বললেন 'এই বাড়ির সাথে আমাদের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক আর আজকের প্রজন্মের এরা কি জানে? আমরা প্রত্যেকে এক হয়ে এর প্রতিবাদে সামিল হব। দেখি কি করে ছেলে আর ছেলের বউ?'
প্রতিবেশীদের মধ্যে মধু কাকা আর মালতি জেঠিমা বললেন 'একদম ঠিক এর একটা হেস্তনেস্ত হওয়া দরকার।
'কাকিমা বললেন' আপনারা সবাই আমার সঙ্গে আছেন তো?'সকল প্রতিবেশী হাত তুলে বললেন 'আমরা আছি ।আমরা এই গ্রামে এরকম অন্যায় কাজ হতে দেব না।'
কাকিমা বললেন 'আপনাদের কাছ থেকে আমার এটুকুই চাওয়ার ছিল।'এরপর কাকিমা বললেন লাল দাদাকে উদ্দেশ্য করে 'লাল কোন ডাক্তারকে দিয়ে দিদির চিকিৎসা করাচ্ছো?'
লালদা যেন শুনেও না শোনার ভান করছে।
কাকিমা আবার চিৎকার করে জিজ্ঞেস করলেন ' লাল ,লাল ।আমি তোমার সঙ্গে কথা বলছি। তার উত্তর দাও।কোন ডাক্তারকে দেখাচ্ছ?'
লাল বললো 'ডাক্তার ঘোষ কে'।
কাকিমা বললেন 'ডাক্তার ঘোষ?কেন তোমরা তো বললে যে দিদির মাথায় সমস্যা হয়েছে ।তাহলে ডাক্তার ঘোষকে দেখাচ্ছ কেন?উনি কি কি ওষুধ দিয়েছেন সে সবগুলো আমাদের কাছে ফেলো।'
লাল বলল 'ইদানিং ওষুধ বন্ধ আছে কাকিমা?'
কাকিমা বললেন ' তাহলে আগের ওষুধগুলো কি খাইয়েছো ?তার তো প্রেসক্রিপশনে আছে নিশ্চয়ই ?সেগুলো কোথায়?'
লাল এর বউ বলল 'কাকিমা ওষুধের প্রেসক্রিপশন মা ছিঁড়ে ফেলেছে।'
কাকিমা সব বুঝতে পারলেন এর ভেতরে একটা যোগ সাজস আছে।কাকিমা বললেন ' ঠিক আছে ।তুমি এবার দিদিকে যে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে আমাকে সঙ্গে নেবে'।
লাল চুপ করে রইলো।
কাকিমা আবার বললেন 'শুনতে পাচ্ছ তো? এবার বলো দিদির কোন ঘরটা শোয়?'
লালের বৌ পরী বলল 'শেষের ঘরটায়।'
কাকিমা অবাক হয়ে বললেন ' সে কি কথা !বুলুদির ঘর তো ওটা নয়?'পরী বলল 'এখন মাকে ওখানেই রাখা হয়।'
কাকিমা বললেন 'কেন ডাক্তার ওখানে রাখতে বলেছেন?'পরী চুপ করে থেকে আমতা আমতা করে বলল ' না মানে ,মায়ের এরকম অবস্থা...।
কাকিমা বললেন 'বৌমা তোমরা তো এবাড়িতে ক'দিন হলো এসেছো ?আমাদের সাথে এই পরিবারের একটা নাড়ীর সম্পর্ক।'এতক্ষণ পর লাল বললো 'আমরা জানি কাকিমা।'
কাকিমা বললেন ' সবই যখন জান, তাহলে এভাবে আর বলূদির সঙ্গে ব্যাবহারটা করো না। আমাদের খুব খারাপ লাগে।'পরী বলল 'কাকিমা সব সময় আপনি আমাদের দোষারোপ করে যাচ্ছেন ।আমরা কি করেছি?'কাকিমা পরীর দিকে এমনভাবে তাকালেন তাতে মনে হলো যে তিনি চোখেতেই মারণ বানটা মারলেন।কাকিমা বললেন ''কথাগুলো ঠিক করে ব'লো বৌমা।'
রেখা কাকিমাকে যত দেখছে, তত অবাক হয়ে যাচ্ছে সহজ-সরল ,সাদাসিধে,আমার কাকিমারএইরূপ।'রেখা মনে মনে বলল 'কাকিমা ইউ আর গ্রেট।'পরী বলল'আসলে কাকিমা, মায়ের ওই দিকটায় সুবিধে ওই জন্যই?'.
কাকিমা বললেন' আর বুলুদির ঘরটায় বুঝি তোমরা আছো?'পরী, লাল মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো।
কাকিমা বললেন 'আচ্ছা ,একটা কথা বল তো নীলকে তোমরা জানিয়েছ সব ।'
লাল বললো 'দাদাকে জানাবো সেরকম তো ঠিকানা আমাদের কাছে নেই ।'
কাকিমা বললেন 'সে কী ?কোনো ঠিকানা তোমাদের দেয় নি?'আবারও লাল মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইলো।ষকাকিমা বললেন ঠিক আছে লাল এবার একটা কাজ করো তো তোমরা। আমার মনে হয় বুলুদিকে তার ঘর টাতে রাখাই ভালো ।যদি সত্যিই তার মাথার কোন সমস্যা হয়ে থাকে, নিজের ঘরটাতে অন্তত শান্তিতে কিছুদিন বাস করুক কেমন?'লাল ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালো।।কাকিমা বললেন তা বেশ । মধুরা তাহলে আমরা আজকে ওখানেই শুয়ে দি কেমন?পরী বলল 'আজকে শোয়াবেন কাকিমা? সব বিছানাপত্র মায়ের ওখানে আছে।(হাত দিয়ে দেখালো)
কাকিমা বললেন 'তো কি হয়েছে ।তোমাদের ঘরে বুঝি বিছানাপত্র নেই?পরী বললো না মানে..।
কাকিমা বললেন ' ও বুঝতে পেরেছি ,।ওই বিছানায় বুলুদিকে শোয়ানো যাবে না তাই তো?'পরী তখনও চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো।কাকিমা বললেন 'চিন্তা নেই ।তোমাদের বিছানাটা নামিয়ে নাও ।আমরা বাকি কয়েকজন লোককে দিয়ে বুলুদির বিছানা'টাই নিয়ে নিচ্ছি। তাহলে তো কোনো অসুবিধা নেই?পরী দেখল বেকায়দায় পড়ে গেছে তখন বলল ঠিক আছে কাকিমা যেটা ভালো বোঝেন।কাকিমা বললেন 'এই তো বাবা এই যে কথাগুলো বললে খুব ভালো লাগলো ।এভাবেই কথা বলবে বড়দের সাথে কেমন?''
রেখা ভাবল 'কাকিমা কি করছে ?একের পর এক রান করে যাচ্ছে অফ কাকিমা তুমিতো সেঞ্চুরি করে ফেলবে।এবার কাকিমা বাইরের মধু , পরান কাকা আর আমাদের ভোলা কাকাকে ডাকলেন।
মধু ,পরান ,ভোলা তোমরা . একটু এদিকে এসো তো বুলুদির স্টোর রুম থেকে যা বিছানাপত্র আছে একটু একটু এনে দাওনা?মধু পরান এবং ভোলা সঙ্গে সঙ্গে বলল " হ্যাঁ ,এই বৌদি যাচ্ছি আমরা নিয়ে আসছি।
মধু কাকা পরান কাকা আর ভোলা কাকা সবাই মিলে সেই বিছানাপত্র নিয়ে আসলো বুলু জেঠিমার ঘরে।
কাকিমা বললেন এই বিছানায় কি নোংরা হয়ে আছে বিছানায় শোয়া যাবেনা ভোলা এগুলো রোদ খাওয়াতে হবে। রাখো রাখো ওখানেই রাখো।"
কাকিমা এবার লাল পরীর দিকে তাকিয়ে বললেন "আর কোনো বিছানা নেই।"লাল পরীর দিকে তাকিয়ে ইশারায় কি যেন বলল।পরী বলল 'হ্যাঁ আছে আসলে ওই বিছানা তো লোকজন আসলে লাগবে?
কাকিমা বললেন হ্যাঁগো বৌমা কথা বলতে ঠোঁটে একটুও বাধে না বলো তোমার জীবন সবসময় সরস্বতী মা ভর করে আছেন তাইনা?
পরী বলল কেন কাকিমা আমি কি এমন বলেছি?
সেইতো কি আর এমন বলেছ কবে কবে লোক আসবে তার জন্য বিছানাপত্র তুমি যত্ন করে রেখেছো আর বাড়ির যে মানুষটি গৃহলক্ষী তার বিছানা নেই সেদিকে তোমার ধ্যান নেই।
পরী বলল না মানে ওই বিছানায় চালককে শুতে দেয়া যাবে?কাকিমা বললেন কেন গো এমন কি হয়েছে যে বুলু দিকে ছোঁয়া পর্যন্ত যাবে না তার বিছানাপত্র স্পর্শ করা যাবে না কি হয়েছে গো?পরী চুপ করে রইলো।কি মাল আলীর দিকে তাকিয়ে বলল লাল কোন ঘরে বিছানা আছে বল এদের দিয়ে আনিয়ে নিই।
লাল অপরের ঘরটাকে ইঙ্গিত করল।
পরী লাল এর দিকে কটমট করে তাকিয়ে তাকালো আর বললো কাকি মা ওই ঘরটা আমার বাবার বাড়ির লোকজন আসলে ওই বিছানাপত্র লাগে ওই বিছানাপত্র তো আমি দিতে পারবো না।
কাকিমা বললেন 'তা বেশ আর আর কোন ঘরে বিছানা আছে বলো এ বাড়িতে তো রুম অনেকগুলো।
পড়ি তখন ও চুপ।লাল বলল কাকিমা তাহলে পাশের ঘরটা থেকে বিছানায় গুলো নিতে পারো।
কাকিমা বললেন ঠিক আছে ভোলা মধু পরান তোমরা যাও বিছানাটা একটু নিয়ে সরে বিছানাটা বাইরে একটা সাইট করে রাখো কালকে ভোলা এসে রোদে দেবে। ভোলা ,মধু, পরান বলল 'চল ,চল ,চল । যাই গিয়ে নিয়ে আসি।'কাকিমা লাল আর পরীর দিকে তাকিয়ে বললেন 'দেখো বৌমা ।কালকে ভোলাকে পাঠাবো। ওকে যেন আবার কোন বাঁধা দিও না ।(জনতার দিকে তাকিয়ে)এই যে এরা সবাই কিন্তু সাক্ষী রইল কেমন ।
বাইরের সব লোকজন বলল হ্যাঁ হ্যাঁ আমরা সব শুনে নিলাম।
কাকা বলেন তা বেশ। এর মধ্যে মধু পরান ভোলা বিছানাপত্র নিয়ে আসলো। বলল
বৌদি কোথায় রাখবো।
মা বললেন রাখবে কি গো ভালো করে পেতে দাও।
মধু পরান ভোলা সকলেই বলে ঠিক আছে।
কাকিমা বললেন এবার মোদিকে নিয়ে গিয়ে শোয়াবো।ইতিমধ্যে বুলু জেঠিমার একটু ঘুম ঘুম এসেছে কি শান্ত স্নিগ্ধ লাগছে বুলু জেঠিমাকে কাকিমার কোলে যেন একটা আলাদা শান্তির আশ্রয় পেয়েছে ন।বুলু জেঠিমাকে ধরে শোয়ানো হলো বুলু জেঠিমা তখনো কাকিমার আঁচলটা ধরে। বুলু জেঠিমা কেমন অসহায় ভাবে একবার কাকিমার দিকে তাকালেন।কাকিমা বুলু জেঠিমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন কোন ভয় নেই দিদি আমরা সবাই তোমার পাশে আছি।অনেকদিন পর বুলু জেঠিমার ঘর দেখে কাকিমা চোখ দুটো ছল ছল করে উঠলো জেঠিমা এত সৌখিন ছিলেন তার ঘরে সমস্তকিছুই চেঞ্জ করে দেয়া হয়েছে।এর মধ্যেই ফোন বেজে উঠলো দুর্গে দুর্গে দুর্গতিনাশিনী মহিষাসুরমর্দিনী।
কাকিমা বললেন উনি তোর ফোন বাজছে মা ধর তো?
উনি বললেন হ্যাঁ এইতো ধরছি।রেখা ফোনটা বের করে রিসিভ করে বলল ' হ্যালো'।ওদিক থেকে কাকার স্বর ভেসে আসলো বললেন 'কি রে ননী?'
রেখা বলল হ্যাঁ কাকা কি হয়েছে?
কাকা বললেন না কিছু হয়নি সন্ধ্যে হয়ে গেলো তোরা কেউ এখনো ফিরলি না কতদূরে গেছিস?
রেখা এবার কাকিমার মুখের দিকে তাকাল আর ইশারায় বললো' কি বলবে?'কাকিমা ইশারায় বুঝিয়ে দিলো এক্ষুণি যাবে।রেখা বলল 'এই তো এক্ষুনি যাচ্ছি।'কাকা বলল 'ঠিক আছে।'কাকিমা লাল আর পরীর দিকে তাকিয়ে বললেন' দেখো কত শান্তভাবে শুয়ে আছে দিদি। তোমরা ওর দিকে একটু খেয়াল রেখো দেখবে এমনি সুস্থ হয়ে যাবে।এবার থেকে আমরা প্রতিদিন পালা করে কেউ না কেউ এসে দেখে যাবো ঠিক আছে ।তাতে তোমাদের কোন সমস্যা নেই তো?মধু কাকা বলে উঠলো সমস্যা থাকলে শুনবে কে?কাকিমা বললেন' তোমরা শুনে নিলে তো বৌমা ?তাহলে প্রত্যেকে একবার করে এবার খবর নিতে আসবে ঠিক আছে।কাকিমা বললেন চলো চলো এবার আমরা সবাই আসি।সবাই গেট দিয়ে বেরোনোর সময় কাকিমার নামে ধন্য ধন্য করতে লাগলেন।পরী বলল নিজের ঘর সামলাতে পারেন না পরের ঘরে..।কথাটা তখনও জীবে আটকে আছে কাকিমা পেছনে ফিরে পরীর দিকে এমন ভাবে তাকালেন তাতে আর কথা বলার কোনো সাহস হলো না।এরপর ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে এগিয়ে চলল রেখা এবং অন্যান্যরা।কাকিমা রেখাকে বললেন 'হ্যাঁ রে ননী কিছু মনে করিস না ।আজকে তোকে ঘোরানো গেল না।রেখা বলুন না কাকিমা গ্রাম তো আমি ঘুরতে পারবো অন্য দিন যখন আবার আসব কিন্তু বুলু জেঠিমার যেটুকু পাওয়ার দরকার ছিল আজকের দিনে সেই টুকুর ব্যবস্থা করে দিয়ে তুমি যে কি ভালো কাজ করলে ,কাকিমা কি বলে বোঝাবো।'কাকিমা বললেন ' হ্যাঁ রে মনের ভিতরে খুব কষ্ট হয় জানিস তো কাছের মানুষদের এরকম কষ্ট পেতে দেখলে মেনে নিতে পারলাম না ।হয়তো কিছু আপত্তিকর কথা বলেছি না?
রেখা বললো 'না কোনো আপত্তিকর কথা বল নি 'একদম যথার্থ কাজ করেছো।'
রেখা কাকিমাকে জড়িয়ে ধরে বলল' কাকিমা আমি গর্ববোধ করছি যে তুমি আমার কাকিমা ।তোমার ভেতরে এইযে মনুষ্যত্ববোধ ,মানবিকতা এখনো জেগে আছে ।এইরকম একটা কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও তুমি নিজেকে ধরে রেখেছো আজ তো আমরা জানি দাদা বা বোন তোমাদের সাথে কি ব্যবহারটা করেতারপরেও নিজেকে এভাবে ধরে রেখেছো অন্যের মুখাপেক্ষী করে না রেখে সব সময় নিজের প্রচেষ্টায় এখনো তোমাদের যে আত্মবিশ্বাস এর জন্য স্যালুট জানাই ।তবে কাকিমা একটা কথাই বলবো যদি কখনো কোনো কিছুর জন্য তোমাদের আমার প্রয়োজন হয় আমাকে অবশ্যই জানিও। আমি কিন্তু তোমাদের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেব।কাকিমা বললেন রেখাকে কাছে টেনে ' হ্যাঁ রে ননী ,আমি কি আর জানি না তোর মানসিকতা কেমন? তুই আমাকে বলে বোঝাবি মা?'কাকিমা আরো বললেন 'ননী, পারলে সারা জীবন অসহায় মানুষ ,শুধু অসহায় মানুষ নয়, জীবজন্তুর পাশেও এভাবেই পাশে থাকিস ।মনুষ্যত্বের অপমৃত্যু হতে দিস না রে মা ,ঈশ্বর তোর ভালো করুন।'
২৯ নভেম্বর ২০২১
কবি আমিনা তাবাসসুম এর কবিতা
একটা পাখির জন্য এই রাত
একটা পাখির জন্য এই রাত
এই মাত্র হুইসেল বাজিয়ে যে বাসটি বেরিয়ে গেল
অন্ধ দাঁড়কাক, অর্ধমৃত কাচের সিঁদুর
আর নোংরা গলির খানাখন্দে পড়ে থাকা
পানের পিক তার তোয়াক্কা করে না
আসলে সব আলো কুরেকুরে
অন্ধকার গিলতে থাকে
আর প্রতিটা অন্ধকারের গভীরে
সকাল বিকেল সন্ধ্যে
নিয়ম করে ফুঁসে ওঠে
চিরন্তন দোজখ।
উম্মে হাবীবা আফরোজা
রক্তিম সূর্যের দেশ
ধরেত্রির বুকে বিশ্ব মানচিত্রে আঁকা স্বাধীন এই দেশ,
আমার প্রিয় বাংলাদেশ।
উন্নত শির লক্ষ প্রাণের স্মৃতিসৌধের স্বাধীন এই দেশ,
আমার প্রিয় বাংলাদেশ।
বীর শহিদের আত্মত্যাগের শহিত মিনারের স্মৃতিস্তম্ভের এই দেশ,
আমার প্রিয় বাংলাদেশ।
অমুর একুশ,৭১-এর ফাগুন রাঙা ফুল শিমুলের, শাপলা ঝিলের সজ্জিত এই দেশ,
আমার প্রিয় বাংলাদেশ।
ইলশে মজা পান্তা ভাতের,
বর্ষবরণ হাল খাতার,
নবান্ন উৎসবের এই দেশ,
আমার প্রিয় বাংলাদেশ।
মুক্ত বাতাসে উড়ন্ত লাল সবুজ পতাকার এই দেশ,
আমার প্রিয় বাংলাদেশ।
ময়ুর পঙ্খী হাওয়ার পাল তোলার নৌকার নদীর দেশ,
আমার প্রিয় বাংলাদেশ।
দোয়েলের মুখে মিষ্টি সুরের গানের এই দেশ,
আমার প্রিয় বাংলাদেশ।
পূব আকাশে উদিত রক্তিম সূর্যের উজ্জ্বল রঙের এই দেশ,
আমার প্রিয় স্বাধীন বাংলাদেশ।
শামরুজ জবা
দীর্ঘশ্বাস
পড়ে আছে আকাশ একা
সীমানাহীন অন্ধকার,
নীরব-নিথর মাটির বুকে
শব্দবিহীন হাহাকার।
ব্যথার ফাঁদে বন্দিনী চাঁদ
বুকের ভাঁজে দীর্ঘশ্বাস,
সবুজ ঘিরে ফুল- ফসলে
কুহেলিকার উপহাস।
ঝরছে পাতা শাখা থেকে
কেউ রাখে সেই খবর,
কত হাসি চোখের পাতায়
কান্না জলে দেয় কবর।
এই পৃথিবী চলছে শুধুই
স্বার্থবাদের ব্যঞ্জনায়,
মহাকালটা সাঁতার কাটে
রক্ত নদীর মোহনায়।
যাচ্ছে তবু কালের চাকায়
সময় ছুটে ঊর্ধ্বশ্বাস,
নিঃসঙ্গতায় বুকের ভেতর
আমার জমে দীর্ঘশ্বাস।
মমতা রায়চৌধুরী'র ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন" ৫৫
একান্ত মনেই লিখে চলেছেন লেখক। তার নিত্যদিনের আসা যাওয়া ঘটনার কিছু স্মৃতি কিছু কথা নিয়ে কল্পনার মোচড়ে লিখছেন ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন " চলবে...
টানাপোড়েন (৫৫)
সমানুভূতি
'আ.আ.আ. মেরে ফেলল'-পাশের বুলু জেঠিমাদের বাড়ি থেকে চিৎকারটা আসছে। রেখা ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল। হন্তদন্ত হয়ে ছাদ থেকে নেমে এসে ডাকতে শুরু করলো, 'কাকিমা, কাকিমা ও কাকিমা?'
কাকিমা রান্নাঘর থেকে গলা বাড়িয়ে বলল 'কি হল রে ননী।'
রেখা বলল 'তুমি এখনো রান্নাঘরে?'
কাকিমা বললেন 'আর বলিস না সাড়ে তিনটে বাজে। এখনো তো লক্ষী আসলো না?'
রেখা বলল'তাই বলে তুমি এখন বাসন মাজতে বসবে?'
কাকিমা বললেন'না মেজে উপায় আছে? সকাল হোলেই তো বাসনের দরকার হবে।'
রেখা বলল ' তাহলে তুমি আমাকে বলতে পারতে?'
কাকিমা বললেন'না ননী ,তোরা শ্বশুর বাড়িতে কত কাজ করিস। বাপের বাড়িতে এসে একটু রেস্ট নিবি না।'
রেখা বলল 'যদি মেয়েরা বড় হয়ে মায়েদের কাজেই না লাগে ,তাহলে কি ভালো দেখায়?'
কাকিমা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে চিবুক ধরে আদর করে বললেন 'লক্ষী মেয়ে কত সুন্দর ভাবনা। বুকের মধ্যে টেনে নিলেন।'
রেখা বলল ' কাকিমা ,আমি না তোমার মধ্যে আমার মায়ের গন্ধ পাচ্ছি।'
দু চোখ বেয়ে জল পড়তে লাগলো।
কাকিমা ওর চোখের জল মুছে দিতে দিতে বললেন ' ভাবনা কিসের মা ।আমরা তো এখনো বেঁচে আছি।'
রেখা বলল 'কাকিমা, যখন বাড়িতে একা থাকি তখন খুব মায়ের কথা মনে হয়। অনেক অনেক দেখতে ইচ্ছে করে মা কে। মায়ের সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে।'
কাকিমা বললেন 'সে তো করবেই মা ।তোমার জন্মদাত্রী ।তার জন্য তো তোমার কষ্ট হবেই।'
কাকু ঘর থেকে বললেন 'তোমাদের রান্না খাওয়া দাওয়া হলো। এবার তো ননীকে নিয়ে বেরোবে একটু।'
কাকিমা বললেন 'হ্যাঁ বেরোবো। আর বোলো না একটু দেরি হয়ে গেল। লক্ষ্মী কাজে আসে নি।'
কাকু উদগ্রীব হয়ে বললেন ' লক্ষী কামাই বেশি করে না ।করলেও তোমাকে বলে যায়। আজকে তাহলে কি কিছু হল?'
কাকিমা বললেন 'কে জানে আমিও তো সেটাই ভাবছি।'
রেখা বলল 'কাকিমা তোমাকে যে কথাটা বলার জন্য ছুটে এসেছিলাম ।'
কাকিমা বললেন ' কি কথা রে?'
রেখা বলল 'বলছি তুমি কোন চিৎকারের আওয়াজ শুনতে পেয়েছো ?'
কাকিমা বললেন'হইচইয়ের আওয়াজ একটা কানে আসলো বটে কিন্তু আমি অতটা আমল দিই নি জানিস ননী ?তখন আমার রান্নাঘরেই ধ্যান ছিল।'
'রেখা বলল 'ওই আওয়াজটার কথাই বলছি ।আমি তো ছাদে ছিলাম ।স্পষ্ট আসছিল আওয়াজটা।'
কাকিমা বললেন 'তোর কি মনে হয় কোন দিক থেকে আসছিল আওয়াজটা।'
রেখা বলল 'বুলু জেঠিমাদের বাড়ি থেকে।'
কাকিমা বললেন 'কি রকম আওয়াজ বল তো?'
রেখা বললো 'মনে হচ্ছিল যেন অসহায় ভাবে কোন আর্তনাদ।'
কাকিমা বললেন 'সে কিরে?'
রেখা বলল 'হ্যাঁ ,কাকিমা'।
কাকিমা বললেন 'ড্যাম সিওর গাধাটা ঠিক দিদিকে..?'
রেখা বলল 'কে গো কাকিমা? কার কথা বলছো?'
কাকিমা বললেন ' আজ যদি ওরা দিদিকে কেউ কিছু করেছে ,আমার হাত থেকে ওরা পার পাবে না। এটা দিনকে দিন আর সহ্য করা যাচ্ছে না।'
রেখা বলল 'কেন কাকিমা ওরা কি করে বুলু জেঠিমাকে?'
কাকিমা বললেন 'ভেবেছিলাম কথাটা তোকে বলব না ।কষ্ট পাবি।এখন দেখি বলতেই হচ্ছে।'
রেখা বললো 'কি কথা?'
কাকিমা বললেন ' সে অনেক কথা মা।বুলুদি, উনি মানসিক ভারসাম্য হারান নি। অনেক মেন্টাল টর্চার করা হয়েছে রে।'
রেখা বলল "সেকি কথা কাকিমা?'
কাকিমা বললেন 'এই ছোট ছেলে আর ছোট ছেলের বউটা যে কি ধুরন্ধর ,কি বলবো তোকে?'
রেখা বলল 'তাই?'
কাকিমা বললেন 'হ্যাঁ ,রে মা ।আমার তো মনে হয় নীলাঞ্জন এর সঙ্গে ওরা এমন কিছু করেছে ,যার জন্য নীলাঞ্জন বাড়িতে আসে না।'
রেখা বললেন 'কেন এরকম করেছে?'
কাকিমা বলছেন ' সবই সম্পত্তি বুঝেছিস?'
দাদা মারা গেলেন এইসব চিন্তা করতে করতে।
এখন বুলুদিকে এরা পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে চাইছে।'
কাকিমা বললেন 'আচ্ছা, চল মা ।তোকে একটু ঘুরিয়ে নিয়ে আসি ,।জেঠিমাকে দেখবি বলছিলি?'
রেখা বললো 'চলো কাকিমা।'
কাকিমা কাকুকে উদ্দেশ্য করে বললেন ' কি গো একটু খেয়াল রেখো ।আমি দরজা লক করে দিয়ে যাচ্ছি ।তোমার কাছে একটা চাবি আছে না ,ওটা রেখো তোমার কাছে। একটু ননীকে নিয়ে ঘুরে আসি।'
কাকু বললেন' 'সেই ভালো।'
কাকিমা বললেন ' চল রে ননী'।
গেট লক করে বেরোতে যাচ্ছেন ,ঠিক সেসময় ভোলা হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বলল 'ছোট বৌদি ছোট বৌদি?'
কাকিমা পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখেন' ভোলা।
কাকিমা বললেন 'কিরে ভোলা এত হাঁফাচ্ছিস কেন ?কি হয়েছে?'
ভোলা বলল 'বুলু বৌদিদের বাড়ি থেকে প্রচন্ড আওয়াজ আসছে ।কাউকে ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছে না ।মনে হচ্ছে বুলু বৌদিকে মারছে।'
রেখা তো একে বারে অবাক হয়ে গেল।
কাকিমা একটু রেগে গিয়ে বললেন 'চল তো দেখি ?ওদের কিছু না বলে বলে ,ওদের বড্ডো বাড় বেড়েছে।'
কাকিমা দ্রুতবেগে হাঁটতে লাগলেন সঙ্গে ভোলা এবং রেখা ও।
কাকিমা গেটের কাছে গিয়ে থমকে গেল ।গেট লক করা। বাধ্য হয়ে তখন কাকিমা লালের উদ্দেশ্যে চেঁচাতে লাগলেন।
কাকিমা ঊর্ধ্বস্বরে চিৎকার করে ডাকতে লাগলেন 'লাল ,লাল গেট খোল।'
এতক্ষণ চিৎকার-চেঁচামেচিতে গেটের কাছে লোক জড়ো হয়ে গেছে।
ঘরের থেকে আওয়াজ আসলো 'কাকিমা, মা আজকে বড্ড বাড়াবাড়ি করছে ।তাই গেট খুলছি না।'
কাকিমা বললেন 'ঠিক আছে। দরজা খোলো আমরা ভিতরে ঢুকবো'।
অলরেডি গেটের সামনে প্রচুর লোকের ভিড় জমে গেছে।
পরী এসে গেট খুলে দিল। কাকিমা দ্রুতগতিতে ভেতরে ঢুকলেন।
কাকিমা ভেতরে ঢুকেই লালকে বললেন'কি হয়েছে এত চিৎকার করছে কেন বুলু দি।'
বুলু জেঠিমা ভয়ে ভয়ে কাকিমার পেছনে এসে দাঁড়ান।
লাল (লালমোহন) বলল 'রোজ রোজই পাগলামি দেখতে আর ভাল লাগছে না।'
কাকিমা বললেন 'বুলুদি তো এরকম ছিল না। তোমরা দিদিকে এরকম অবস্থায় এনেছো। এখন বলছ রোজ রোজ পাগলামি?'
লালের হাতে একটা লাঠি ছিল । কাকিমা লালের হাত থেকে লাঠিটা নিয়ে বললেন 'এবার তোমার পিঠে পড়বে লাঠি।'
বুলু জেঠিমা হাততালি দিয়ে বললেন 'বেশ হবে। বেশ হবে।'
রেখার চোখে যেন ঝিলিক খেলে গেল।
মীনাক্ষী কাকিমা বললেন'ভালো করে তোমার মায়ের টিটমেন্ট করাও আর একটা কথা শুনে রাখ ।এরপর যদি আবার কখনো এই দিদির গায়ে হাত তুলতে দেখি বা শুনি ।তাহলে কিন্তু আমরা আইনের দ্বারস্থ হবো।"
প্রতিবেশিদের সকলের দিকে তাকিয়ে বললেন ' কি আপনারা সবাই সাক্ষী দেবেন তো?'
সকলে উচ্চস্বরে বলে উঠলেন 'হ্যাঁ ,হ্যাঁ ,দেবো দেবো।'
মীনাক্ষী কাকিমা বললেন ' আগে গ্রামে শাসন ছিল ।মুরুব্বীরা ছিলেন গ্রামে বিচার হতো ।এখন সে সব উঠে যাচ্ছে বলে ,আজকের প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা সব ভুলে যাচ্ছে ।তাই যা খুশি তাই করে বেড়াচ্ছে। কিন্তু এটা কিছুতেই হতে দেয়া যায় না'।
মাঝখান থেকে লাল এর বউ পরী বলে উঠলো 'এটা তো আমাদের পারিবারিক ব্যাপার। আপনারা এর ভিতরে ঢুকছেন কেন?'
মীনাক্ষী কাকিমা বললেন 'ঢোকার দরকার হতো না ,পরিবারের মধ্যেই ব্যাপারটা সীমাবদ্ধ রাখলে। হঠাৎ হঠাৎ এত চিৎকার করছেন দিদি কি কারণে ?সেগুলো প্রতিবেশী হিসেবে আমাদেরও দেখা উচিত?
আর প্রতিবেশী হিসেবে সেই কাজটাই করার চেষ্টা করছি।'
অন্যান্য প্রতিবেশীরা বললেন 'একদম ঠিক। একদম ঠিক । না হলে সব অনাচার বেড়ে যাবে।'
মীনাক্ষী কাকিমা আরো বললেন ' শোনো লাল। তোমার দাদা নীলকে সব ব্যাপারে জানিয়েছ তো ,নাকি সে ধোঁয়াশার মধ্যেই আছে?'
লাল চুপ করে রইলো।
কাকিমার এই মারমুখীমূর্তি একদিকে যেমন মরিয়া অন্যদিকে মারিয়া ও বটে -এই মহামারী রূপ রেখার চোখে প্রথম।
যেন কাকিমার মধ্যে সেই দুর্গতিনাশিনী দুর্গা মায়ের মূর্তি প্রত্যক্ষ করল।
কাকিমা তো ভালই কিন্তু কাকিমার ভেতরে প্রতিবেশীদের প্রতি সহানুভূতি ,সমানুভূতি -এটা দেখে রেখার গর্বে বুক ভরে উঠলো আর ভাবল সে এই পরিবারে মেয়ে। এঁদের জন্য শ্রদ্ধায় মাথা নত করতে ইচ্ছে করলো। রেখার মনে বারবার সেই গানটি অনুরণিত হতে লাগল' দুর্গে ,দুর্গে ,দুর্গতিনাশিনী ।মহিষাসুরমর্দিনী...?'
এপার ওপার ইছামতী
এবারের পত্রিকা সংখ্যাটি ২০২১ বৈশাখ ও শারদ যুগ্ম সংখ্যা। কবি শঙখ ঘোষ সম্পর্কিত অজস্র প্রবন্ধ এবং গল্প কবিতা আনমনে পর্যায়ের লেখায় সমৃদ্ধ। অনুষ্ঠান টিও অত্যন্ত মনোজ্ঞ ছিলো। মুখ্য সম্পাদক শ্রীমতী চৈতালী ব্রহ্মের উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে কবিতাপাঠ আবৃত্তি গানে ভরে উঠেছিলো এই সন্ধ্যাটি।
পত্রিকাটি এরপর পাওয়া যাবে ধ্যানবিন্দু কলেজ স্ট্রীটে। এছাড়া এই ফোন নম্বরে ফোন করলে কলকাতা ও কলকাতার বাইরে কুরিয়ার ও হবে।
আইরিন মনীষা
নিঃসঙ্গতা
আজ কতদিন হয়ে গেলো
একাকীত্বের সাথে আমার নির্লিপ্ত বসবাস
যেখানে ধুসর বিবর্ণ আকাশের হাতছানি
এভাবেই বেদনায় আশাহত অন্যায্য সহবাস।
রঙ্ধনুর সাত রঙ আজ বড়ই ফিকে
যেখানে আর রাঙেনা আমার অধরা স্বপ্নের পালক,
একসাথে পথ চলার সেই আকাঙখিত আশার প্রতীক্ষায়
নিঃসঙ্গতার পথ চলায় আমিই আমার চালক।
নগ্ন পায়ে শিশিরের সাথে স্পর্শ
যেখানে ছিলে তোমার অবাধ বিচরণ,
বিমুগ্ধ নয়নে আমার হাত দুটি ধরে হাঁটতে
শিহরণে যেথায় তোমাতেই চাইতাম বাঁচতে।
বাদল দিনের রিমঝিম ছান্দিক বারিধারায়
কি দারুণ এক সুখানুভুতি হাতছানি দিতো,
যেথায় আমার আরাধ্য হারানো দিনের গান
বাজতো গ্রামোফোনে যেথায় আমার মন কেড়ে নিতো।
বসন্তের মাতাল সমীরণে সেই উদ্দীপনা
এখনো আমায় কাছে টানে একান্ত একাকীত্বে
ভুলা কি যায় তারে মধুময় স্মৃতি মাখা ক্ষণ
আমার নিঃসঙ্গতার সঙ্গী তব বিরহী বিস্মৃতির সম্ভিতে।
লেখক শান্তা কামালী'র ধারাবাহিক উপন্যাস "বনফুল"৩২
চোখ রাখুন স্বপ্নসিঁড়ি সাহিত্য পত্রিকার পাতায় লেখক শান্তা কামালী'র নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস "বনফুল"
বনফুল
৩২ পর্ব
জুঁই বাসায় ফিরে হাত মুখ ধুয়ে বাবা-মায়ের সাথে ঘন্টা খানেক বসে কথাবার্তা বললো।
ওয়াজেদ সাহেব মেয়ের খুশি দেখে ভিতরে ভিতরে নিজেও খুব খুশি হলেন । ঘড়িতে দশটা বাজতেই জুঁই ময়নাকে ডেকে বললো খাবার পরিবেশন কর।ময়না ওভেনে সব খাবার গরম করে পরিবেশন করে বললো আপা, খালাম্মা খালুকে নিয়ে টেবিলে আসেন।বাবা-মার সঙ্গে খাওয়া শেষ করে গুডনাইট বলে জুঁই উপরে উঠে গেলো।
নিজের কিছু কাজকর্ম সেরে পলাশকে ফোন করলো জুঁই। ওপাশ থেকে পলাশ বললো আই মিস ইউ..... জুঁই।
সেম টু ইউ...বলে জুঁই বললো আজ আর বেশি কথা বলবো না, ঘুমাবো....।
আমি ফোন না দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লে তুমি চিন্তা করতে তাই ভাবলাম ফোন দিয়ে ঘুমাতে যাই।
পলাশ বললো থ্যাংকস জুঁই, গুডনাইট।
জুঁই ও বললো গুডনাইট।
ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছে সৈকত। সব বন্ধু বান্ধবরা এসে ভীড় করে মিষ্টি এবং অন্যান খাবার খেয়ে যে যার বাড়িতে চলে গেলো। বাড়িতে মেহমানরা থাকার কারনে সৈকত আর ফোন দিতে পারেনি অহনাকে। ভীড় কমার সাথে সাথেই সৈকত নিজেন রুমে ঢুকে অহনাকে ফোন দিলো। স্যরি অহনা, অনেকটা সময় ব্যস্ত থাকায় তোমাকে ফোন দিতে পারিনি।এইমাত্র বন্ধু বান্ধবরা গেছে, তাই তোমাকে ফোন দিতে পারছি।
অহনা বললো স্যরি বলার কিছু নেই।
সৈকত বললো দ্যাটস লাইকে এ গুডগার্ল।
অহনা বললো সারাদিন তোমার উপর অনেক ধকল গেছে এখন ঘুমাও। কালকে কথা হবে , গুডনাইট।
সৈকতেও গুডনাইট বলে ফোন কাটলো।
চলবে....
শামীমা আহমেদ
শায়লা-শিহাব কথন
অলিখিত শর্ত
(পর্ব ২২)
শামীমা আহমেদ
শায়লার সাথে পরিচয়ের পর থেকেই শিহাবের মনে কেমন যেন একটা পরিবর্তন হয়ে যায়।কোলাহল হৈ চৈ বন্ধু আড্ডা পার্টি কিছুতেই আর ভাললাগাটা আসেনা। নীরবতাই বেশি উপভোগ করে। কেমন যেন সঙ্গীহীন জীবনে একাকীত্বের কষ্টটা পেয়ে বসেছে।একটা না পাওয়া বোধের অনুভুতি সারাক্ষন ভেতরে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। শিহাব বুঝতে পারছে না কেন এমন হচ্ছে।হঠাৎ করে শায়লা যেন তার হৃদয়ের শান্ত দীঘিতে কিসের আলোড়ন তুলে দিলো! ঘুমন্ত মনটাকে জাগিয়ে তুললো। সে তো ছিল একরকম।সব স্মৃতি ঢেকে রেখে স্বাভাবিক জীবনে চলছিল। কিন্তু আজকাল ইচ্ছে অনিচ্ছেগুলোও মনের অনুমতির কাছে ঘুরপাক খেতে থাকে।কতদিনের অভ্যস্ত জীবনযাপনে কেমন যেন পাল্টে যাওয়ার হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। দিনরাত্রি অন্যরকম একটাভাবনায় ডুবে থাকা। যেখানে বারবার শায়লার মুখটাই ভেসে উঠে!
ঘুরে ফিরে শায়লার কথাগুলোই কানে বাজে। রিশতিনার সাথে হাতে গোনা কিছু দিনের জীবনযাপন। রিশতিনার সবটুকু বুঝে উঠার আগেই সে হারিয়ে যায়।তারপর বহুদিন আর কোন মেয়েই তার ভাবনায় আসেনি।জীবনের উপর এমন ঝড় বয়ে যাবে তা কখনো শিহাব ভাবেনি।মা, ভাবীর শত চেষ্টাও তার মনকে ভুলাতে পারেনি।কিন্তু শায়লার মত এমন সহজ সরল অচেনা একটি মেয়ে কেমন করে এতটা ভাবনার গভীরে চলে এলো? সে প্রশ্ন শিহাব নিজেকে বারবার করেও তার কোন উত্তর পায় না।তবে কি কেউ কারো শুন্যতাটা পূরণ করতে পারে? তবে কি শায়লাকে রিশতিনার জায়গায় ভাববে শিহাব?শায়লা কি রিশতিনার ভিন্নরূপে এসেছে?
শিহাবের এলোমেলো ভাবনায় আজ মনটা অস্থিরতায়।আজ আর অফিসে যেতে মন চাইছে না আর তেমন কোন জরুরী কাজও রেখে আসেনি।যদিও প্রতিক্ষণই যোগাযোগে থাকতে হচ্ছে। শিহাব অফিস এসিস্ট্যান্টকে কল দিয়ে জানিয়ে দিলো সে আজ অফিসে যাচ্ছে না। কোন জরুরী প্রয়োজন হলে যেন কল করে। তাছাড়া বাইকটারও একটি সারভিসিং দরকার।কমতো ডিউটি দিচ্ছে না।আজ দুপুরের পরে বেরিয়ে ওয়ার্কশপে দিয়ে আসবে।আর বিকেলটা বন্ধুদের সাথে কাটিয়ে দিবে।মাঝে মাঝে রুটিনের বাইরে যেতে শিহাবের ভালোই লাগে।তবে এটা মনে হয় সবার জন্যই প্রয়োজন।
শিহাব চায়ের কাপ হাতে বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। বারান্দার টবে বেশ ফুল ফুটেছে! একেবারেই খেয়াল করা হয়নি।সেই সকালে বেরিয়ে গিয়ে রাতে ফেরা।সে খুব শখ করে টবের গাছগুলো লাগিয়েছে। শিহাব চারতলায় সিঙ্গেল ফ্ল্যাটে থাকে।উপরে বা পাশেও আর কোন ভাড়াটিয়া নেই।বেশ নিরিবিলি থাকা যায়।অবশ্য এগুলো দেখেই বাসাটা তার ভালো লেগে যায়।
মোবাইলটা ঘরে বিছানায় ছিল।হঠাৎ মোবাইলের রিং টোন কানে এলো। শিহাব ঘরে এসে মোবাইল হাতে তুলে নিলো। শায়লার কল। শায়লাকেই ভাবছিল এতক্ষন।তবে ভাবনার শায়লা একরকম আর বাস্তবে অন্যরকম।কারন ভাবনায় শায়লাকে শিহাব অনেকখানি ভেবে নিয়েছে, বাস্তবের শায়লার তা অজানা।
কেমন আছেন?
শায়লার প্রশ্নে শিহাব সঠিক করে বলতে পারছে না আসলে সে কেমন আছে।শায়লার ভাবনায় কতখানি ডুবে আছে।
এইতো ভালো আছি।
অফিসে কখন এলেন?
শিহাব দেখলো দুপুর একটা বাজছে।শায়লাকে জানালো, নাহ! আজ অফিসে যাইনি।
কেন শরীরটা খারাপ করেছে কি? শায়লার উদ্বিগ্নতায় জিজ্ঞাসা।
না না তেমন কিছু না।আজ তেমন একটা কাজ নেই।তাছাড়া মাঝে মাঝে একা থাকতে ভালোই লাগে।কিছু বলবেন?
না, সকাল থেকে কোন মেসেজ পাইনি, তাই ভাবলাম কেমন আছেন জেনে নেই।
শিহাবের জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে,এই জানতে চাওয়াটা কি এমনিতেই নাকি আমাকে ভাবনাটা মন থেকে চাওয়া।অবশ্য তা আর জানা হয়না।
শিহাব বলে উঠলো, আপনি আর আমি একদিন কোন একটা খোলা জায়গায় ঘুরতে যাবো।আপনার কোন আপত্তি নেইতো?
শায়লা প্রায়ই একটা স্বপ্ন দেখে।খুব দূরে খোলা একটা যায়গায় সে আর একটি ছেলে হাঁটছে।স্বপ্নে শায়লার খুব চেষ্টা থাকতে সে মুখটি দেখবার।কিন্তু তা কখনোই স্পস্ট হয়না।তবে কি সেখানে শিহাবই থাকে?
কি হলো বললেন না? যাবেন একদিন ঐ খোলা যায়গাটায়।যেখানে আমি একা একা প্রায়ই যাই।
শায়লা আনমনা হয়ে যায়।কল্পনায় বহু দূর চলে যায়। সে আর শিহাব হাত ধরে একটা ছোট্ট নদীর তীরে দুজনে বসে আছে।নদীটার পানি তীর ছুইছুই করছে। মাঝে মাঝে শায়লা শিহাবের কাঁধে মাথা রাখছে। শিহাব তার চমৎকার কন্ঠে একটা গানের কলি গাইছে।কিন্তু ঘুম ভেঙে শায়লা আর কখনোই সেই গানটির কতজা মনে করতে পারে না।কাজের ফাঁকে কিংবা অবসরে খুব চেষ্টা থাকে গানটি স্মরণে আনবার।
শিহাবের ডাকে শায়লার সম্বিৎ ফিরে এলো।আর কিছু না ভেবেই বলে উঠল, হ্যাঁ হ্যাঁ অবশ্যই যাবো। কবে যাবেন বলেন?
আমি জানাবো। আপনার মায়ের অনুমুতি নিয়ে রাখবেন।আর সেদিন আমি আপনাকে আমার জীবনের সব কথা খুলে বলবো।
যদি চোখে জল ধরে রাখতে পারেন তবে বুঝবো আপনি খুব কঠিন মনের একজন মানুষ। আর যদি আমার দিকটা ভাবেন তবে দেখবেন কেমন করে একটা মানুষের সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়েও বেঁচে থাকতে হয়।
শায়লা কথাগুলো শুনছিল আর এক অজানা আশংকায় চিন্তিত হয়ে উঠছিল।মনে মনে বলে উঠলো, না শিহাব আমি তোমার কোন অতীত শুনতে চাইনা।অতীতের তুমিটা অন্যকারো হয়েছিলে কিন্তু বর্তমানের এই তুমিটাকেই আমার ভালো লাগে। এই তুমিটাই আমার কাঙ্খিত।
শায়লা চোখ বন্ধ করে শিহাবের মুখটা ভেবে নিল।
শিহাব ওপ্রান্তে শায়লার সাড়া পাওয়ার অপেক্ষায়।
চলবে....
রাবেয়া পারভীন
স্মৃতির জানালায়
(৫ম পর্ব)
মেয়েটি উচ্চকন্ঠে ডাকল,
- বাবলু এই বাবলু
ডাক শুনে একটি আট নয় বছরের ছেলে এসে ঘরে ঢুকল।ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বোঝা গেল ছেলেটি মেয়েটির ভাই। কাছে এসে ছেলেটি মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করল
- কেন ডেকেছো আপা ?
- কাজেম কো বলো আমাদের কে চা নাস্তা দিতে।
-আচ্ছা
বলে বলে ছেলেটি বেরিয়ে গেল। মাহতাবের দিকে তাকিয়ে মেয়েটি বলল
- আব্বা এলে যে আপনার কথা বলব, আপনার নামটাই তো জানা হলোনা।
আবার ঢোক গিলে মাহতাব
-আমার নাম মাহতাব উদ্দীন।
- আমার নাম শবনম। আপনি কোথায় থাকেন ?
-বকসীবাজার মেসে থাকি।
-গ্রাম থেকে এসেছেন বুঝি ?
-হ্যাঁ
- কে কে আছেন বাড়ীতে ?
- বাবা আর দুই বোন।
-আর মা ?
- মা নেই , অনেক আগেই আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।
বলতে গিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো মাহতাবের। এতক্ষনে তাঁর মনে হলো বুকও বুঝি শুকিয়ে যাচ্ছে। আস্তে করে বলল
-আমাকে এক গ্লাস পানি দিবেন ?
- এক্ষুনি আনছি।
শবনম উঠে পানি আনতে গেল এবং ফিরে এলো কাজের ছেলেটিকে সাথে নিয়ে। ছেলেটির হাতে নাস্তার ট্রে। শবনম ট্রে টা নিজের হাতে নিয়ে মাহতাবের সামনে টি টেবলের উপর রাখলো। কাজেম কে বলল
- কাজেম তুই শিপলু বাবলু কে ডেকে নিয়ে আয়
মাহতাব পানির গ্লাস নিয়ে ঢকঢক করে পানি খেল। শবনমের সাবলীল ব্যাবহার তার ভয় কমিয়ে দিচ্ছিল। সে স্বাভাবিক হয়ে বসে শবনমের হাত থেকে সেমাই এর প্লেট নিয়ে খেতে লাগল। দুটি ছেলে এসে ঘরে ঢুকল, একজনকে আগেই দেখেছিলেন বাবলু, পাশের জন সম্ভবত শিপলু। বয়স তের চৌদ্দ হবে। শবনম পরিচয় করিয়ে দিল
- এরা আমার ছোট দুই ভাই শিপলু আর বাবলু। শিপলু ইনি তোমাদের একজন ভাইয়া, আব্বার ছাত্র।
ছেলেগুলি মাহতাবকে ছালাম দিয়ে নাস্তা খাওয়ায় মনোযোগ দিল। এখন মাহতাবের আর মনেই হলোনা এই বাড়ীতে সে প্রথম এসেছে। মনে হচ্ছে এদের অনেকদিন ধরে চেনে। কত যেন আপন। চা খাওয়া শেষ হলে সেদিনের মত উঠে পড়ল মাহতাব। শবনমের কাছে বিদায় নিল। বলল
- আমি তাহলে আজকে যাই, স্যাররকে বলবেন
-ঠিক আছে যান, আবার আসবেন। অনেক ব্যক্তিগত প্রশ্ন করে ফেলেছি কিছু মনে করবেন না।
মৃদু হেসে বাসা থেকে বেরিয়ে এলো মাহতাব। রাস্তায় হাটতে হাটতে মনে হলো এতোক্ষন ধরে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি যেন বাস্তব নয় স্বপ্ন। কিছুক্ষন আগে দেখা মেয়েটিকে সে কি সত্যিই দেখেছে? নিজের গায়ে চিমটি কাটলো সে। তারপর নিশ্চিত হলো স্বপ্ন নয় এতোক্ষন যা ঘটেছে সব সত্যি। তারপর কতদিন পেরিয়ে গেছে কখন যে শবনমের সাথে তার বন্ধুত্ব হয়ে গেছে গিয়েছিলো বুঝতেই পারেনি।
চলবে.....
২৮ নভেম্বর ২০২১
মমতা রায়চৌধুরী'র ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন" ৫৪
একান্ত মনেই লিখে চলেছেন লেখক। তার নিত্যদিনের আসা যাওয়া ঘটনার কিছু স্মৃতি কিছু কথা নিয়ে কল্পনার মোচড়ে লিখছেন ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন " চলবে...
টানাপোড়েন (৫৪)
মনজানলা
বৃষ্টিটা কমাতে একটু হাঁফ ছেড়ে যেন রেখা বাঁচল। অথচ এই বৃষ্টির জন্য এক সময় আকুলি- বিকুলি করতো। এখনো মাঝে মাঝে মন আনচান করে।অনেকদিন পর গ্রামে এসে এই বৃষ্টি যেন সবকিছু মেচাকার করে দিচ্ছে। মনে পড়ে একবার বৃষ্টির সময় ঘোষদের বাড়িতে দুর্গাপুজোর পাশাপাশি দুই বোনের পুজো হত মানে কোজাগরী পূর্ণিমায় লক্ষ্মী পূজোর সঙ্গে সঙ্গে সরস্বতীর ও বন্দনা হ'ত । ছেলে মেয়েদের ভিড় জমত। এ রকমই একবার সরস্বতী পূজার অঞ্জলি দিতে ঘোষ বাড়িতে গেছিলো রেখা।সেখানে অন্যান্য ছেলেদের মতো নীলুও গেছিল। নীলু তো যাবেই ,যেখানে রেখা গেছে।
বাড়ি ফেরার সময় হঠাৎই বৃষ্টি ।বড় আমগাছটার নিচে আশ্রয় নিয়েছিল দু'জনা। সেদিন যেন মনে হচ্ছিল বৃষ্টিটা না থামলেই ভালো হয়।
নীলু বলেছিল ' হ্যাঁ ,রে ।তুই তো ভিজে গেছিস? তোর ঠান্ডা লেগে যাবে। এক কাজ কর তুই আমার শার্ট টা নে।'
রেখা বলল'কেন তাহলে তো তুমি ভিজে যাবে?'
নীলু বলেছিল'আমরা পুরুষ মানুষ আমাদের ঠান্ডা সহ্য হয়। আর তোর তো আবার ঠান্ডার ধাত আছে?'
দু'দিন পরে স্কুলে যেতে পারবি না।'
রেখা বলল 'স্কুলে যেতে পারব না, তাতে তোমার কি?'
নীলু বলল ' তার মানে?'
রেখা বলল 'তার মানে আবার কি ?আমি বাড়িতে রেস্ট নেবো।'
নীলু বলল ' তোর প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসগুলো কে করবে শুনি?'
রেখা বলল 'সে তোমাকে অত ভাবতে হবে না।'
নীলু বলল 'না ,আমি ভাববো না ।তো কে ভাবতে শুনি ?আমি তোর ভালো বন্ধু হই না?'
রেখা বলল 'হ্যাঁ ,তা ঠিকই বলেছ?
নীল বলল "আমি যেটা বলছি তোর ভালোর জন্যই বলছি। তোকে পড়াশোনা করে বড় হতে হবে।'
রেখা বলল 'আর তুমি?'
নীল বলল'আমাকেও বড় হতে হবে। পড়াশোনাতে নিজেকে সব সময় নিয়োজিত করতে হবে। কিন্তু একটা সমস্যা আমার হয়?'
রীতা বলল 'কী?'
নীল বলল 'তোকে দেখার'
এমন সময় আরও ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি শুরু হল, সঙ্গে বিদ্যুৎ চমকাতে লাগলো। হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকানোতে রেখা ভয় পেয়ে গেল। আর ভয়েতে নীলুদাকে জড়িয়ে ধরল। নীলুও কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছিলো।
নীলু বলেছিল' ননী তুই ভয় পাচ্ছিস? ভয় পাস না ।আমি আছি তো?
রেখা ও যেন পরম একটা আশ্রয় পেয়েছিল নীলুর বুকে।
একটু যখন বৃষ্টি কমতে শুরু করল ।তখন নীলু বলল 'চল বাড়ি চল।'
রেখা বলল 'আজকে বাড়িতে গেলে মা বকবে?'
নীলু বলল ' কেন রে?'
রেখা বলল 'অনেকটা দেরি হয়ে গেছে তো?'
নীলু বলল 'বকবে না ছাই, আমি যাবো তোর সাথে কাকিমাকে গিয়ে ...।'রেখা নীলুর কথা শেষ করতে না
দিয়েই বলল ' তোমার সাহস কতদূর আছে ,আমার জানা আছে ।মায়ের সামনে গিয়ে তোতলাতে থাকো।'
নীলু বলল ' হ্যাঁ রে ।কাকিমাকে দেখলে ভয় লাগে।'
রেখা বলল ' আমার মা কি বাঘ? না ভাল্লুক? যে তোমার ভয় লাগে ।খেয়ে ফেলবে?'
নীলু বললো ' না ,কাকিমার ভেতরে এমন একটা জিনিস আছে,কি আছে ,জানি না ।কাকিমার সামনে কথা বলতে সাহস হয় না। সামনে গেলেই কেমন সবকিছু গুলিয়ে যায়।'
রেখা বলল 'ওরে আমার বীরপুরুষ রে ,অনেক হয়েছে ।যাই ,আমি বাড়িতে গিয়ে বকাটা শুনি।'
নীলু বলল ' চল ,চল, চল তাড়াতাড়ি বাড়ি চল।'
সেদিন বাড়িতে পৌঁছানোর পর রেখাকে অনেক বকুনি খেতে হয়েছে।
বাড়িতে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে রেখার মা বললেন 'এতক্ষণ কোথায় ছিলে?'
রেখা বলল 'ঘোষ জেঠুদের বাড়ি।'
রেখার মা বললেন 'তাহলে ভিজলে কি করে?'
রেখা বলল 'এই তো আসার সময় বৃষ্টিটা পেলাম।'
রেখার মা বললেন 'বৃষ্টির মধ্যে আসলে কেন ঘোষ দাদাদের বাড়ি থাকতে ?আমরা গিয়ে নিয়ে আসতাম।'
রেখা চুপ করে দাঁড়িয়েছিল।
রেখার মা আরো বললেন 'এখন বড় হচ্ছো ।যেখানে সেখানে একা একা যাবে না। দরকার হলে আমরা তোমাকে নিয়ে যাব।'
রেখার মা বললেন 'পার্বতী দি কিছু পাঠায় নি প্রসাদ?'
রেখা জানে এখানে মিথ্যে কথা বলা যাবে না ।আদতে পার্বতী জেঠিমা প্রসাদ নিয়ে আসার কথা বলেছিলেন ।কিন্তু আমি ভুলে গেছি।'
রেখার মা বলল " কিরে উত্তর দিচ্ছিস না?'
রেখা বলল ' নিয়ে আসতে বলেছিলেন কিন্তু আমি তাড়াহুড়োয় বেরিয়ে চলে এসেছি।'
রেখার মা বললেন ' হ্যাঁ, সে তো ঠিকই ।যেগুলো কাজের মধ্যে পড়ে ,সেগুলো তুমি ভুলে যাও। আর যেগুলো অকাজ সেগুলো করে ঘুরে বেড়াও।'
রেখা বলল 'হ্যাঁ ,সত্যি বলছি।'
রেখার মা বললেন 'ওরে ,আমার সত্যিবাদী যুধিষ্ঠির '।
রেখা যখন রুমের দিকে যাচ্ছে তখন ওর মা বললেন 'শোন ।বলছি এবার আলপনাটা কেমন হয়েছে রে?'
রেখাও খুব গদগদ ভাবে এসে মাকে বললো' খুব সুন্দর হয়েছে মা।'
রেখার মা বললেন 'প্রায় ২০০ বছরের পুরানো পুজো,।দুর্গাপূজা যেমন হয় তেমনি আবার এই দুই বোনের পুজো হয় সাড়ম্বরের সাথে।'
রেখা বলল' ও মা দুটো ঘট বাঁধা হয় কেন?'
রেখার মা বলল ' দুটো পুজো ,তো দুটো ঘট হবে না?'
রেখার মা বললেন 'ভোগ খেয়েছিস তো?'
রেখা বলল 'হ্যাঁ মা।'
রেখার মা বলল 'কি কি ভোগ দিয়েছেন রে?'
রেখা বললো ' ওই তো মা ।প্রতিবার যা দেয়া হয় ফলমূল ,লুচি ,সুজি সবকিছুই।'
রেখার মা বলল 'হ্যাঁ রে। বিদেশ থেকে ঝুমুরা এসেছে?'
রেখা বলল 'হ্যাঁ ।মনে হয় ।প্রচুর লোকজন তো?'
রেখার মা বলল ' 'ঠিক আছে। যাও গিয়ে আগে চেঞ্জ করো।
ঠান্ডা লেগে যাবে।'
রেখা বলল 'হ্যাঁ মা।'
আজ সবই স্মৃতি।
আবার সেই ছাদে উঠে চারিদিকটা দেখতে লাগলো ।ওই তো আমবাগান দেখা যাচ্ছে।
রেখা ছাদে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দুচোখ ভরে গ্রামটা একটু দেখে নিচ্ছে। এমন সময় কাকিমা এসে বললেন
''কি করছিস ননী?'
রেখা বলল 'আচ্ছা কাকিমা। ঘোষজেঠুদের আগের মতো সাড়ম্বরে পূজা হয় ,ওই দুই বোনের পুজো'?
কাকিমা বললেন 'আগের মত আশেপাশের গ্রামের মানুষদের আর সেরকম নেমন্তন্ন করা হয় না ,আর্থিক অসঙ্গতির জন্য।'
রেখা বলল 'ও তাই বুঝি?'
কাকিমা বললেন 'আগে যে খিচুড়ি প্রসাদ খাওয়ানো হতো এখন সেটা দাঁড়িয়েছে শুধু প্রসাদ বিতরণে।'
রেখা বলল 'আচ্ছা কাকিমা এখনো কি গো জেঠুদের সেই পুকুরেই প্রতিমা বিসর্জন হয়?'
কাকিমা বললেন ' তোর সব মনে আছে? হ্যাঁ এখনো সেই পুকুরেই হয়।'
কাকিমা বললেন 'চল ,চল, ননী ।খেয়ে নিবি।
বিকেলে তো বেরোবো তোকে নিয়ে?'
রেখা বেরোনোর আনন্দে বললো 'চলো ,চলো 'কাকিমা।
রেখার মন এখন শ্রাবণ মাসের ভরা নদী ।টুইটুম্বুর করছে স্মৃতির ভান্ডার। মন জানলায় বারবার উঁকি দিচ্ছে।
তাই পুরনো স্মৃতিকে আরেকবার ঝালাই করে নিতে চাইছে।
রেখা বলল 'কাকিমা বুলু জেঠিমার আর খবর পেলে।'
কাকিমা বললেন 'না রে , ভোলা এসে তো কিছু খবর দেয় নি।,'
রেখা বলল' ও'।
কাকিমা বললেন'বেশ ,চিন্তার ব্যাপার হয়ে দাঁড়ালো।'
রেখা বলল ' আচ্ছা কাকিমা ,নীলুদা কি একদমই আসে না?'
কাকিমা বললেন "এখন কেন আসে না সেটাই বুঝতে পারি না। ওদের কিছু একটা হয়েছে ভাইয়ে-ভাইয়ের।'
কাকিমা কথাটা বলেই নিচে চলে গেল খাবার বাড়তে সঙ্গে রেখা কেউ বলে গেল তাড়াতাড়ি নামতে।
রেখা শুধু মনে মনে ভাবছে আর কি কোনদিনই নীলু দার সঙ্গে দেখা হবে না?
রেখার আরো ভাবছে 'নীলুদার সেই কথাগুলো কোথায় গেল? একবারও কি আমার কথা মনে পড়ে? নাকি বিদেশে গিয়ে মেমসাহেব দেখে সবকিছুই ভুলে গেছে। অথচ রেখা কেন ভুলতে পারে না। রেখার আজ যেন 'পল পল দিল কে পাস তুম রেহতি হো', আঁচড় কাটছে হৃদয়ের ক্যানভাসে।
লেখক শান্তা কামালী'র ধারাবাহিক উপন্যাস "বনফুল"৩১
চোখ রাখুন স্বপ্নসিঁড়ি সাহিত্য পত্রিকার পাতায় লেখক শান্তা কামালী'র নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস "বনফুল"
বনফুল
( ৩১ তম পর্ব )
জুঁই পলাশ শহর থেকে একটু দুরে আশুলিয়ায়.... অনেক নিরিবিলি দেখে একটা গাছের নিজে বসলো ।
জুঁই বললো তোমাকে ছাড়া কীভাবে এতো দিন থাকব জানিনা, পলাশ বললো জুঁই এতো কোথায় মাত্র দুই বছর! জুঁই বললো তোমাকে ছাড়া একেক দিন মনে হয় একেকটা বছর.......! পলাশ জুঁইয়ে হাত ধরে বললো জুঁই তুমি এখনি এতো চিন্তা করছো কেন? আমরা প্রতিদিন ফোনে কথা বলবো তো নাকি! তবুও জুঁইয়ের দুচোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পরছে....
পলাশ আস্তে করে জুঁইয়ের মাথা বুকে ধরে চোখের পানি পলাশের হাত দিয়ে মুছে দিয়ে বললো জুঁই তুমি যদি এতো অবুঝ হও তাহলে আমি এদেশের কোনো ভার্সিটি থেকে এমবিএ করে নেব,তোমাকে কোনো রকম কষ্ট দিতে পারবো না। পলাশের মুখে এমন কথা শুনে জুঁই নিজেকে স্বাভাবিক করে নিলো, কি যে বলো আমার কোনো কষ্ট হবে তুমি বিদেশ থেকেই এমবিএ করবে, তুমিইত বললে প্রতিদিন আমরা ফোনে কথা বলবো.... পলাশ বললো হে বলবো তো। জুঁই পলাশের বুকে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে বসে আছে পলাশও জুঁইয়ের সুগন্ধি চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে......
পলাশ বললো জুঁই কষ্ট কি তোমার একার হবে, আমার তোমাকে ছেড়ে থাকতে কষ্ট হবে না? জুঁই মুখে কিছু না বলে মাথা নেড়ে সুমতি জানালো হ্যাঁ। পাশ দিয়ে বাদাম ওয়ালা ডেকে যাচ্ছে বাদাম লাগবে বাদাম..... পলাশ ইশারায় বাদাম ওয়ালাকে ডাকলো, জুঁই ঠিকঠাক হয়ে বসলো। পলাশ ত্রিশ টাকার বাদাম নিলো,বাদাম ওয়ালা চলে যেতেই পলাশ বাদামের খোসা ছাড়িয়ে জুঁইয়ের হতে দিচ্ছে... জুঁই বাদাম খাচ্ছে আর পলাশে দিকে নিবিড় চোখে তাকাচ্ছে...... পলাশ প্রশ্ন করলো এমন করে কি দেখছো?
জুঁই উত্তর দিলো তোমায় দেখছি।
এতে সদস্যতা:
পোস্টগুলি (Atom)