৩১ ডিসেম্বর ২০২১

কবি এরশাদ এর কবিতা




একটি কবিতার আত্মহুতি


তোমার ভালোবাসার চাতক পাখি কি ঘরে ফিরেছে?
অভূতপূর্ব কোন মায়াজাল থেকে
নিজের অস্তিত্বটুকু বিলীন হয়েছে কবে আমার! 
সেই কবে আমি তোমার পথ থেকে
নিজের পথের বাঁক নিয়েছি।

তুমি কি দেখো
আমার চোখ এখন নির্ঘুম থাকে সারাক্ষন
আমি এখন আজন্ম ক্রিতদাস আমার অমানিশার কোঠরে।
মুষ্টিমেয় ভালোবাসার চৌকাঠ পেরিয়ে
আমার উঠোনে এখন
নির্বাসিত পায়রার চাষ।

তুমি এখনও উড়ন্ত বলাকা হে প্রিয় আমার?
আমি তোমাকে অবাধে দিয়েছিলাম আমার আকাশ
এখন আমার নির্মল মেঘ ফুঁড়ে
শূন্য ক্যানভাস শুধু
আমার রংতুলিতে
ধূসর পালক আর মৃত করোটির বিকট হাসি।

শান্তা কামালী/৫৪ পর্ব 




বনফুল
(৫৪ পর্ব ) 
শান্তা কামালী

অলিউর রহমান বাসায় পৌঁছে লাঞ্চ করে, অনেকটা সময় চিন্তা ভাবনা করছেন কি ভাবে কি করা যায়। বিয়ে বলে কথা.... 
মাঝখানে মাত্র দুটো দিন, হঠাৎ করে মাথায় এলো কাবিনের বিষয়টা! সাথে সাথে অলিউর রহমান সাহেব মনিরুজ্জামান সাহেবকে ফোন করে অহনার একাউন্ট নাম্বার দিতে বলেছেন। মনিরুজ্জামান সাহেব বললেন ঠিক আছে কাল সকালে আমি মেসেজ করে অহনার একাউন্ট নাম্বার দিয়ে দেবো। তারপর অলিউর রহমান সাহেব স্ত্রীর রুমে ঢুকে অহনার জন্য করা বাজার গুলো একটা একটা করে দেখালেন , উনি বুঝতে পারছেন আজ রাহেলা খাতুন সুস্থ থাকলে কতো আনন্দ উল্লাস হতো এই বিয়েতে। 
রাগেলা খাতুন সব বাজার-সদায় দেখে খুব খুশি হলেন, স্বামীকে বললেন আমি ও তোমার মতো এতো সুন্দর জিনিস-পত্র কেনাকাটা করতে পারতাম কি না জানিনা। অলিউর রহমান স্ত্রীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন...।
 রাতে খাওয়ার সময় হয়ে গেল, সৈকত মায়ের খাবার নিয়ে আসতেই সৈকতের বাবা বললেন আজ আমি খাওয়াবো তোমার মাকে। 
ডিনার শেষে ঔষধ খাইয়ে শুইয়ে দিলেন অলিউর রহমান সাহেব...। 
ছেলেকে নিয়ে নিজেও ডিনার শেষ করে আপন মনে কিছুটা সময় পায়চারি করছেন দেখে সৈকত বললেন আব্বু তুমি কি কোনো রকম ডিপ্রেশনে আছো? 
সৈকতের বাবা বললেন তুমি বসো বাবা, তোমার সাথে কথা আছে। সৈকত বসলো, ছেলের কাছাকাছি বাবাও বসেছেন,আস্তে আস্তে  অলিউর রহমান সাহেব সৈকতকে উদ্দেশ্য করে বললো বাবা এ-সব কথা আমার  বলার কথা নয়,কিন্তু  আমাদের সিচুয়েশন বাধ্য করেছে...., তুমি শুনেছো কি না আমি জানিনা।তবুও বলছি শোনো, আগামী বৃহস্পতিবারে তোমার বিয়ে ঠিক করেছি অহনার সাথে... তোমার কোনো রকম আপত্তি নেই তো?  
সৈকত বললো, বাবা  তুমি যা ভালো মনে করবে সেইটা আবার ই করবে, আমার কোনো আপত্তি নেই। এই বলে সৈকত নিজের রুমে চলে গেল।
অলিউর রহমান ও নিজেদের রুমে শুতে গেলেন। 

ওদিকে অহনা জুঁইকে ফোন করে ডিটেইলস বললো, সব শুনে জুঁই বললো অহনা ভালোই হলো অন্তত খালাম্মা তোর হাতের যত্ন-আত্তি পাবে। অহনা বললো জুঁই তুই কি বুধবারে আসবি? জুঁই বললো হুমম দেখেছি.... গুডনাইট বলে জুঁই ফোন কেটে দিয়ে জুঁই পলাশকে ফোন করলো, পলাশ বললো জুঁই আজ যে তুমি আমার ফোনের অপেক্ষা না করেই ফোন করলে? আজ তোমাকে একটা খবর দেওয়ার আছে, কি হয়েছে জুঁই? তোমার শরীর ঠিক আছে তো? আমি একদম ফিট্, অহনা সৈকতের বিয়ে আগামী বৃহস্পতিবারে,আন্টির অবস্থা ভালো না তাই তাড়াহুড়ো করে বিয়ে দিচ্ছেন। পলাশ বললো জুঁই আমার দুর্ভাগ্য দুই মাস পরে হলেই আমি থাকতে পারতাম,জুঁই বললো পলাশ তুমি দুঃখ করো না।
তুমি ফিরে এলে আমরা একসাথে পার্টি দেবো,তখন অনেক অনেক আনন্দ করতে পারবো। তারপরই জুঁই গভীর আবেগে আবদার করে বলে, কবে ফিরে আসবে বলো না,মাই সুইটহার্ট। 


চলবে....

রাবেয়া পারভীন/৫মপর্ব




দুরের বাঁশি 
রাবেয়া পারভীন
 (৫মপর্ব)


অনুমতি পাবার পরে কেবিনের ভিতরে এলেন ডাক্তার  সাথে  গায়ত্রী ।  সেই  দাঁত কেলানো হাঁসি।
-বাহ  একদম ভাল হয়ে গেছেন দেখছি। 
-আজকে  আমাকে রিলিজ দিয়ে দিন  ডক্টর।
-বাড়ী  যাবার  জন্য  খুব ব্যাস্ততা দেখছি !  
কপাল কুঁচকে  ডাক্তারের দিকে তাকালো  লাবন্য । 
আবার সেই দাঁত কেলানো হাঁসি
-ঠিক আছে  রিলিজ করে দিচ্ছি। যে ওষুধ  লিখে দিচ্ছি ঠিকমত খাবেন। ঠান্ডা লাগাবেন  না । ও  আর একটা কথা  আপনার কন্টাক্ট  নাম্বারটা  দিয়ে যান  যাতে মাঝে মাঝে আপনার  স্বাস্থ্যের খোঁজ  খবর নিতে পারি।  মনে মনে দাঁত কড়মড় করলো  লাবন্য । মনে মনে  বলল
- নিকুচি  করি নাম্বারের। 
ডাক্তার চলে যাবার পরপরই  শুভকে ফোন করে লাবন্য।
- হ্যালো  শুভ  আজকে আমি হাসপাতাল থেকে  রিলিজ হচ্ছি। 
খুশি হয়ে উত্তর দিল শুভ
- বাহ। খুব ভাল। সুস্থ  হয়ে বাড়ী ফিরে এসো। খুব চিন্তায় ছিলাম  লাবন্য।   এখন  বেশ ভালো লাগছে।
- শুভ  আমি বাড়ী এলে আমাকে তুমি দেখতে আসবে তো ?  
-  হ্যাঁ  অবশ্যই  দেখতে আসবো। আজকে বাসায় এসো আগামীকাল  তোমার  আর আমার  দেখা হবে। 

বাসায় এসে  আনন্দে  আটখানা  হয়ে যায়  লাবন্য।  আগামী কালটা  যে কখন আসবে। উফ্ !  আর তর সইছেনা । পরের  দিন  সময় কাটছেনা  লাবন্যর। কখন বিকেল হবে  শুভ আসবে । শুভ বলেছে পাঁচটার দিকে আসবে । আয়নার  সামনে  দাঁড়িয়ে  একবার ভাবল  খুব সাজবে। গাঢ় করে চোখে কাজল দিবে  গাঢ় রঙে ঠোঁট রাঙ্গাবে  কপালে বড় একটা লাল টিপ পরবে।  কিন্তু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে  ভিষন লজ্জা পেল সে। নাহ্ থাক !  এমনিই ভালো। ভাবনার  দোলাচলে দুলছিল  লাবন্য। এমন সময়  শুভ এলো। সেই চিরসুন্দর  মুখের হাসিটি। লাবন্য দু চোখ ভরে দেখতে লাগলো। লাবন্যকে দুহাতে বুকে জড়িয়ে চুমু  খেল। বলল
- বেশ  লাগছে তোমাকে  একটুও অসুস্থ  মনে হচ্ছেনা 
- সত্যি  বলছো? 
-একদম সত্যি ! 
শুভর দৃষ্টি তখন রোমান্টিক । লাবন্যর কপোলে লালিমা। পাগলের মত লাবন্যকে বুকে জড়িয়ে নিল শুভ।  ওর লোমশ বুকে মুখ লুকিয়ে সুখের আবেশে চোখ বুজে এলো লাবন্যর।,,,,,,

তেষ্টায় গলা শুকিয়ে গিয়েছিল লাবন্যর। ঘুম ভেঙে  ধড়ফড় করে  বিছানায়  উঠে  বসল সে  জানলা  দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখলো  সন্ধা নেমে আসছে। কিন্তু  শুভ কোথায় গেল ?  চিৎকার করে ডাকতে  চাইল, শুভ  তুমি কোথায় ?কোথায় তুমি ?  তবে কি তুমি  মিথ্যে  বলেছিলে আমাকে ?  কেন  বললে ?  তোমার  দেয়া কথা আমার কানে বেজে চলেছে  আমি আসবো  আজকে আমাদের দেখা হবে । ব্যাথিত  চোখে জানলা দিয়ে  বাইরে  তাকিয়ে  রইল লাবন্য। সেই  দুরের বাঁশির সুরটি লাবন্যর  বুকের ভিতরে  করুন হয়ে বেজে চলল।


চলবে....

অলোক কুমার দাস




 বিনয় 



ছিল আমার এক বন্ধু। 
খেলাধুলায় ছিলো দক্ষ। 
কি টেনিস, কি ফুটবল, কি সাঁতার 
আমরা দুজনে সাঁতারে ছিলাম দক্ষ।

হঠাৎ সেদিনটা মনে পড়ে গেল। 
আমাকে বললো “তুই তো গোলকিপার” বল আমি জোরে মারবো,

তুই বুকে ধরতে পারবি না। 
আমি বললাম ‘চ্যালেঞ্জ”। 

বিনয় সুতীব্র জোরে মারলো সর্ট, 
আমি বলটা গ্রীপ করে নিলাম।

বুঝলাম ও অনেক বড়ো হবে। হ্যাঁ ও বড়ো হয়েছিল। মোহনবাগান ক্লাবে খেলেছিল, আজ বিনয় নেই। কিন্তু ওর স্মৃতিটা হৃদয়ে রয়ে গেছে।


শিবনাথ মণ্ডল




কনেটাকে সাজায়ে দে

শিবনাথ মণ্ডল


আজ বাজা মাদল বাজা
কনেটাকে সাজা
বিয়ে বাড়িতে আসবে সবাই 
হবে ভাড়ি মজা।
পাকড়ী মাথায় আসছে বর
চড়ে গরুর গাড়ী
ধামসা মাদল বাজিয়ে তারা
আসছে সারিসারি।
শ‍্যামলা রঙের মেয়ে আমার
নাকে নোলক পরা 
হলুদ শাড়ী অঙ্গে তার
আলতা পায়ে তোঁড়া।
বরের সাথে বর যাত্রী
মাদল বাজায় তালে
হাডিয়ার হাঁড়ি মাথায়
আসছে টলেটলে।
বিয়ে বাড়িতে জুটেছে সবাই 
দুঃখ‍ জ্বালা ভুলে
বরকে সবাই বরণ করে
নাওগো ঘরে তুলে।।

শামীমা আহমেদ /পর্ব ৪৫







শায়লা শিহাব কথন
অলিখিত শর্ত (পর্ব ৪৫)
শামীমা আহমেদ 

পথের দূরত্ব আর যানজট পেরিয়ে শিহাব  বাইকটি জেট বিমানের গতিতে চালিয়ে ওরা প্রায় তিরিশ মিনিটের মধ্যেই পূর্বাচলে পৌছে গেলো। শায়লাকে সাবধানে নামতে বলে খুব সুন্দর একটা যায়গায়  শিহাব বাইকটি থামালো। সামনে একটা বিশাল মাঠ,পাশে জলাশয় আর বড় বড় ঘাস দিয়ে ভরা জায়গাটার চারপাশ  ছোট করে বাউন্ডারী ওয়ালে ঘেরা।নিশ্চয়ই এই প্লট বিক্রয়ের জন্য তৈরি বা ইতিমধ্যে বিক্রয়  হয়ে যাওয়া।  শিহাব সময় নষ্ট না করে কথা বলে উঠলো।
শায়লা,বেশ কিছু জরুরী বিষয় নিয়ে তোমার সাথে কথা বলা প্রয়োজন। তাই এমন কোলাহলমুক্ত একটা যায়গায় এলাম।আমার মনের জমানো কথাগুলো বলতে হলে একা একা আমি এখানে এসে চারপাশের আকাশ বাতাসকে কথাগুলি বলি।ওরা সাক্ষী হয়ে থাকে।আজ তুমিও যা বলবে বলে মনস্থির করেছো এখানে সবকিছু মন খুলে তা বলবে।
শিহাব বলে চললো, জীবনের এক রকম সিদ্ধান্ত নিয়ে আমি এতদিন ছিলাম।আজ তা পালটে ফেলতে চাইছি আর তা কেবলি আমার প্রতি তোমার এতটা ভালবাসার কারণে। আমাকে নিয়ে তোমার এতটা আবেগ আর ভালোলাগায় আমিও তোমাকে নিয়ে ভাবতে শুরু করেছি। আমার জন্য সেদিন তুমি প্রায় মরতে বসেছিলে। এই বিষয়টা আমাকে ভীষণভাবে আহত করেছে। আমিও তোমাকে, তোমার প্রতি, দিনে দিনে অনেকটা নির্ভরতায়  একটু একটু করে বদলে গেছি।
আর তাইতো বাকী জীবনে তোমাকে পাশে পেতে চাইছি,আমিও পাশে থাকতে চাইছি।
শায়লা,রিশতিনা আমার জীবনে ক্ষনিকের জন্য এসেছিল।ভাগ্য বিড়ম্বিত আমরা দুজন।আমাদের জীবন আর এগোয়নি।তবে সে তার স্মৃতিচিহ্ন রেখে গেছে।আরাফ আমার জীবনের এক অমূল্য সম্পদ হয়ে আছে। এখন জীবনের কোন সিদ্ধান্ত নিতে চাইলে আরাফকে ছাড়া আমি কিছু ভাবতে পারি না।
ভীষণ আকুতিভরা দুটি চোখ শায়লার কাছে অনুরোধের দৃষ্টিতে তাকিয়ে।
শায়লা শিহাবের দূর্বল জায়গাটা বুঝতে পারলো। শায়লার দেখা শিহাব একটি অনন্য উচ্চতার মানুষ।তার ভাবনা চিন্তায় ভীষণ স্বচ্ছতা।এমন মানুষটিকে রিশতিনা জীবন সঙ্গী করে নিয়েও নিয়তি তাদের একসাথে চলতে দেয়নি। তাই বলে শিহাব তাকে ভুলে যায়নি।  তাকে ছাড়া জীবন উপভোগ করেনি।যেখানে কত কত পুরুষেরা ঘরে স্ত্রী সন্তান রেখেও আনন্দ ফূর্তি করে বেড়ায়, সেখানে শিহাব আরাফের জন্য নিজেকে সবকিছু থেকে গুটিয়ে রেখেছে। শায়লা শিহাবকে ভীষণভাবে বুঝতে পারে।শিহাবের ভেতরে এক সাগর দুঃখের বাস আর আরাফ সেখানে এক টুকরো আশার ভেলা, বেঁচে থাকার অবলম্বন। 
শায়লার ভেতরেও মাতৃত্বের এক হাহাকার।
স্বামী সন্তান সংসারের তীব্র চাওয়া তার মাঝেও আছে।তার সমবয়সীরা অনেকেই অনেক আগে মা হয়েছে।এমনকি ছোট বোন নায়লাও মা হওয়ার অপেক্ষায়।
আরাফের জন্য শায়লার মনটা হু হু করে উঠলো।  আরাফের অমন মায়াভরা মুখটা ভেসে উঠলো। 
শায়লা শিহাবের খুব কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল, আরেকটু এগিয়ে শিহাবের হাত ধরে  একেবারে নিঃশ্বাসের দূরত্বে দাড়িয়ে শিহাবের চোখে চোখ রেখে শিহাবকে আশ্বস্ত করে বললো, তুমি একেবারেই ভেবো না শিহাব।আমার মনটাকে তো তুমি বুঝেছো, আমার কাছে আরাফ মায়ের আদর ভালবাসা পাবে এ নিয়ে তুমি মোটেও ভাববে না।আরাফ আমাদের সন্তান হয়ে আমাদের সাথেই থাকবে।
আর আমি?শিহাবের এমন প্রশ্নে শায়লা থমকে গেলো, কি বলবে?  একেবারেই সে অপ্রস্তুত হয়ে নির্বাক হয়ে গেলো! কি হলো,বললে না? খানিকবাদে
শায়লা বুঝতেও পারলো না কোথা থেকে হঠাৎ কতগুলো কথা  তার মনে ভীড় করলো।এবার সে চোখেমুখে একরাশ দুষ্টুমি  নিয়ে বলে উঠলো, আর তোমাকে প্রচন্ড গরমের দিনে এক গ্লাস ঠান্ডা লেবুর শরবতের মত ভালবাসবো, খুব শীতের দিনে দুই মগ কফির মত আর ঝুম বর্ষার দিনে খিচুড়ি মাংসের মত আর তোমার খুব একাকীত্বের জীবনে জোড়া শালিক হয়ে ঘর বাঁধবো। কথাগুলো বলে শায়লা শিহাবের বুকে মুখ লুকালো। তার চোখের জলে শিহাবের শার্ট ভিজে গেলো। শিহাব খুব নীরব হয়ে রইল।শায়লার ভেতরের জমাটবাধা কষ্টগুলো কান্নায় বেরিয়ে এসে তা শিহাবের বুকে শার্টের আবরণে আশ্রয় খুঁজে নিক,শিহাব সে ভরসাস্থল থেকে শায়লাকে নিরাশ করলো না।
শায়লা মুখ তুলে বলে উঠলো,
আমিও বন্ধন মুক্ত নই শিহাব।আমিও একটা শর্তে আবদ্ধ হয়ে আছি।আমার জীবনেও যা ঘটে গেছে তা থেকে এখনো আমি মুক্ত নই। আমার জীবনটা আমি পরিবারের উপরই ছেড়ে দিয়েছিলাম।তোমার সাথে হঠাৎ পরিচয়ে সবকিছু ওলোট পালোট করে দিলো। মনে হলো, আমার ঘুমন্ত মনটা জেগে উঠেছে।প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে। নিজের ভেতর নিজের অজান্তেই  তোমাকে নিয়ে এত এত স্বপ্ন বাসা বেঁধেছে।
হ্যাঁ,শায়লা, তোমার কানাডার বিষয়টার একটা সিদ্ধান্তে আসতে হবে।রাহাতের সাথে আমার এ বিষয়ে কথা হয়েছে। আজ তোমার আমার কথার পর রাহাত তোমার ডিভোর্সের ব্যাপারে আগাবে। শায়লা, এখনো সময় আছে,তুমি খুব ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিও।কানাডায় উন্নত বিশ্বের জীবন। আর আমার কাছে, সন্তান,মা বাবা, আমার পরিবারকে নিয়ে তোমার মধ্যবিত্তের জীবন কাটাতে হবে।
শায়লা বাধা দিয়ে বললো, আমি তো উচ্চাভিলাষী বা লোভী নই। মনের সাড়া যেখানে মিলেছে আমি শুধু তার উত্তর দিয়েছি।এটা আমারই পাওনা ছিল। তবে,হ্যাঁ,এতে নোমান সাহেবকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে তবে বিষয়টি উল্টোও তো ঘটতে পারতো।আর কই, এতদিন হয়ে গেলো,যদি সে সত্যই আমাকে চাইতো,তবেতো খুব দ্রুতই সবকিছু করে আমাকে নিয়ে যেতো।সে স্বামীর দায়িত্ব পালন করতো।
না,নোমান সাহেব তোমাকে জোর করতে চাননি।
জোর কেন? ভালবাসার ডাকে,বন্ধনেও তো সে আমার মন জয় করে নিতে পারতো?
সে কেবল তার সন্তানদের জন্য আমাকে চেয়েছে।উন্নত বিশ্বের একটি দেশে আমাকে নিতে চাইছে কেবল সন্তানদের দেখভালের জন্য।এটাতো আমার জীবন হতে পারে না।
শায়লা কথাগুলো বলছিলো আর তার চোখদুটো দৃঢ়তায় স্থির হয়ে ছিল।
শিহাব শায়লারকে কখনো এমন স্পষ্টভাষী হতে দেখেনি।
ঠিক আছে।তুমি রাহাতের সাথে কথা বলে দ্রুতই তাকে ডিভোর্সের কাগজপত্র পাঠিয়ে দাও।আমিও আমার মা ভাবীকে তোমার কথা বলবো।আর আমার বিশ্বাস তারা তোমাকে খুবই আপন করে নিবে।শুধু....
শুধু কী শিহাব?
শুধু একটি দিন তোমাকে আমার ঝিগাতলার বাসায় সারাদিন আরাফের সাথে কাটাতে হবে।যেন ওর সাথে তোমার একটা বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। ভাবী এতদিন আরাফকে দেখেছে,মায়ের আদর দিয়ে এতটা বড় করেছে এবার ভাবীকে এ দায়িত্ব থেকে মুক্ত করতে চাই।
তুমি ভেবোনা শিহাব, আরাফকে ভালোবেসে 
সম্পূর্ণ তোমাকেই আমি জয় করে নিতে চাই কারন আরাফ তোমার জীবনের অংশ,হৃদয়ের স্পন্দন। 
শায়লার কথায় শিহাব অনেকটাই স্থির হলো।আরাফের বিষয়টিতেই এতদিন শিহাবের মন 
দোদুল্যমানতায় ছিল।আজ শায়লা তাকে আশ্বস্ত করাতে সামনে এগুতে আর বাধা রইল না।শিহাবের মায়ের কথা মনে পড়লো।নিশ্চয়ই শায়লাকে মায়ের পছন্দ হবে।আর শায়লাতো পছন্দ করার মতই একটা মেয়ে।
শিহাবকে মা সংসারী দেখতে চায়।আরাফের জন্য বাবা মায়ের আদর নিশ্চিত করতে চায়। মায়ের চাওয়াতো বিফলে যাবে না।
একটা ছোট্ট ছেলে ওদের চারপাশে ঘুরাঘুরি করছিল।শিহাব জানতে চাইল,কিছু বলবে?
স্যার চা, কফি লাগবো।ঐ যে আমাদের চায়ের দোকান।আপনি চাইলে চা,কফি নিয়া আসতে পারি। আর স্যার এই জায়গাটায় খুব বেশীক্ষণ থাইকেন না।সন্ধ্যার আগেই ফিরা যাইয়েন।
শিহাব চোখের ইশারায়  শায়লার অনুমতি নিয়ে কফি আনতে বললো।ছেলেটি এক দৌড়ে ছুটে গেলো কফি আনতে। শিহাব বাইকে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।সহসাই সে শায়লাকে খুব কাছে টেনে নিলো। শায়লা শিহাবের কাঁধে মাথা রাখল। দুটি হাতের বন্ধন চারহাতের বন্ধনে খুব নিবিড় হয়ে রইল।স্পর্শে অনুভবে শায়লা রাঙা হয়ে উঠলো! 
পশ্চিম আকাশে সূর্যাস্তের প্রস্তুতি চলছে।একটু একটু আঁধারের আয়োজন।  আকাশে দল বেঁধে পাখিদের ঘরে ফেরার তাড়া।তাদেরও ঘরে ফিরতে হবে।কিন্তু কারোই মন চাইছে না ফিরে যেতে।দুজনার উষ্ণতার আলিঙ্গনে সময় বয়ে যাচ্ছে।
স্যার কফি আনছি,
ছেলেটির ডাকে শিহাব নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো। শায়লা বেশ বিব্রত হলো।
এনেছো,দাও,বলতেই শায়লা হাত বাড়িয়ে 
কফি কাপ দুটো নিয়ে নিলো।শিহাব দাম চুকিয়ে এক কাপ কফি হাতে নিলো।
এখানেতো এইটুকু ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায় না।চলো,উত্তরায় গিয়ে কোথাও বসে বিকেলের নাস্তা সেরে নিবো।
শায়লা বাধা দিয়ে বললো,না আজ নয়, ফিরতে হবে। সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। আরেকদিন নাস্তা করা যাবে।তাছাড়া মা ফিরে এসে দেখতে না পেলে চিন্তিত হয়ে উঠবে।তোমার ব্যাপারটিতো মাকে এখনো জানানো হয়নি।জানিনা,মা বিষয়টি কিভাবে নিবে।রাহাতই ভরসা।তাকে দিয়েই মাকে ম্যানেজ করাতে হবে।
দুজনেই কথার ফাঁকে কফি শেষ করে নিল।
শিহাব তার প্যান্টর পকেট থেকে একটা ছোট্ট প্যাকেট বের করলো।
শায়লা বেশ অবাক হলো। শিহাব প্যাকেট থেকে একটা সুন্দর চকচকে সোনালী বেশ কারুকাজ করা একটা ব্রেসলেট বের করে শায়লা দেখালো।নিজেই শায়লার ডান হাতটি টেনে নিয়ে ব্রেসলেটটি পরিয়ে দিলো।মূহুর্তের মধ্যে এত কিছু ঘটে গেলো! শায়লা কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না।
আজ সকালে কিনেছি।গুলশান গিয়েছিলাম।সেখান থেকে।আমাদের আজকের এই বিকেল সন্ধ্যাটা স্মরণীয় করে রাখতে তোমায় ভেবে কিনেছি।পছন্দ হয়েছে?
শায়লা হ্যাঁ সূচক ভঙ্গিতে মাথা ঝুকালো।
চলো শায়লা,ফিরতে হবে।খোলা জায়গায় সূর্যাস্তটা স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে।দুজনেই তাকিয়ে দেখছে।আজ এই সূর্যাস্তের পর আগামীকাল ভোরের সূর্যোদয় যেন আমাদের জন্য একটা নতুন জীবন বয়ে আনে।শিহাবের কথায় শায়লার চোখ চকচক করে উঠলো।
শিহাব শায়লাকে শক্ত করে এক গভীর বন্ধনে আঁকড়ে ধরলো।আর এভাবে কতটা সময় চলে গেলো কারোরই তা খেয়ালে রইল না।


 চলবে....

মমতা রায়চৌধুরী/৮২





উপন্যাস 

টানাপোড়েন ৮২

সম্পর্ক

মমতা রায়চৌধুরী


সকালবেলায় শিখার ফোনে মেসেজ এল 'শিশিরভেজা সকালের উষ্ণ ভালোবাসা থাকলো 'সুপ্রভাত।'
শিখা খুব কৌতুহলী হয়ে উঠলো, 'বাব্বা, হঠাৎ করে আমাকে উষ্ণ ভালোবাসার শুভেচ্ছা কে পাঠালো?
এ তো মনে হচ্ছে কল্যানদার কাজ।'
শিখা নিউজ পেপারে চোখ বুলাচ্ছিল ভাবল' সুপ্রভাত জানাতে মেসেজ পাঠাবে, কি পাঠাবে না?'
শেষ পর্যন্ত ভেবেচিন্তে শিখা ঠিক করলএকটা ভদ্রতা বলেও তো কথা আছে।পাঠিয়ে দিল মেসেজ-
'শিশিরভেজা  কোমল হাওয়া,
নরম ঘাসের আলতো ছোঁয়া।
মিষ্টি রোদের নরম আলো,
আঁখি মেলে দেখবে চলো।'
কল্যান অনলাইনে ছিল সঙ্গে সঙ্গে রেসপন্স করলো-
'চুপিসারে মেখে নাও,
অচেনারে জেনে নাও।
উপলব্ধিতে মিশে যাও'
অনুরণনে ঢেউ তোলাও।'
শিখা আবার টেক্সট করে  বলল 'বাহ, দারুন কাব্য করতে জানেন তো?'
কল্যাণ ও টেক্সট করে বলল' তাই বুঝি?
শিখা বলল' তাই না তো কি?'
কল্যাণ  বলল' কাব্যের উপর কাব্য করেছি।'
শিখা বলল' ছাত্র-ছাত্রীরা কিন্তু রোমান্টিক হয়ে যাবে।'
কল্যান বলল' বলছো পারব?'
শিখা দৃঢ়তার সঙ্গে যেন আড়চোখে তাকিয়ে
 বলল 'অফকোর্স পারবেন'।
কল্যাণ বললো 'আশার আলো দেখতে পেলাম।
শিখা একটু অবাক হয়ে বলল  'মানে?'
কল্যাণ বললো  'বুঝে নাও '।
শিখা বলল ' বুঝতে পারলাম না বুঝিয়ে দিন।'
কল্যান বলল 'তাহলে আমার ছাত্রী হতে হবে।'
শিখা এবার মুখ টিপে টিপে হাসতে লাগল।
কল্যান বলল  'খুব হাসা হচ্ছে না?'
শিখা বলল 'বাহ রে, তাহলে কি আমি কাঁদতে বসবো নাকি?'
কল্যান বলল'রুমাল ধরার কেউ থাকবে না?'
শিখা বলল 'আজকে আপনার কলেজ নেই?'
কল্যান বলল' আছে একটু পরে যাব।'
শিখা মনে মনে ভাবছে' কল্যানদার সঙ্গে তার সম্পর্ক টা কি আদপে?'
এরমধ্যেই মাধুরী বৌদি শিখাকে নিচে থেকে ডাকছে শিখা শিখা শিখ.আ.আ.আ।'
শিখা টেক্সট করল 'বৌদি ভাই ডাকছে।'
কল্যান বলল ok
শিখা বলল' যাই বৌদি ভাই।'
শিখা খুব খুশি খুশি মনে তরতর করে নিচে নেমে গেল সিঁড়ি দিয়ে।
বৌদি ভাই শিখাকে দেখে বলল'কি হয়েছে রে তোর?'
শিখা বললো 'কই কিছু না তো?'
বৌদি ভাই বলল 'এত খুশি খুশি লাগছে।'
শিখা হেসে বলল'কী যে বলো না বৌদি ভাই?'
বৃষ্টি বলল' পি মনি পার্কস্ট্রিটে যাবে এক্সমাস উৎসব দেখতে।'
শিখা বলল' বৃষ্টি খুব দুষ্টু হয়ে গেছো তুমি।'
মাধুরী বললো'ও সেই আনন্দে?'
শিখা বলল 'না গো বৌদি ভাই?'
মাধুরী ব্রেকফাস্টে মটর শুটির কচুরি আর আলুর দম প্লেটে দিতে দিতে বলল' তা কার সঙ্গে যাবি?'
শিখা বলল 'না গো বৌদি ভাই বৃষ্টির কথা ছাড়ো তো ,কি শুনতে কি শুনেছে?'
মাধুরী বললো 'তা বেশ যা না, ঘুরে আয়।'
বৃষ্টি বলল'আমিও যাব পি মনি তোমার সঙ্গে।'
মাধুরী বললো' না তোমাকে যেতে হবে না।'
বৃষ্টি এবার খাওয়া বন্ধ করে বলল 'না ,আমি যাব ।না ,আমি যাব।'
মাধুরী এবার ধমক দিয়ে বলল' এত বায়না করবে না।'
বৃষ্টি বলল 'পি মনি যে  যাবে?'
মাধুরী বললো তাহলে একটা প্রশ্নের উত্তর দাও তো বৃষ্টি তুমি বড়, না পিমনি ?'
বৃষ্টি বলল' পি মনি   বড়ো'।
মাধুরী বলল ' তাহলে চুপ করে থাকো। সেরকম হলে তোমার বাবা নিয়ে যাবে।'
বাবার কথা শুনে বৃষ্টির চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
মাধুরী বলল' এবার খাওয়া স্টার্ট করো এবং তাড়াতাড়ি শেষ করো, হোম ওয়ার্ক আছে, করতে হবে।'
শিখাকে বলল, 'আর দুটো নিবি কচুরি?'
শিখা বলল 'না বৌদি ভাই?'
মাধুরী বলল' সে কি রে খেতে ভালবাসিস আর দুটো নে।'
শিখা বলল 'না বৌদিভাই, তুমি আমাকে মোটা করেই ছাড়বে দেখতে পাচ্ছি।'
মাধুরী বলল' তোদের এই এক রোগ জানিস তো ডায়েট ডায়েট।'
শিখা বললো" বৌদিভাই তোমার মতো যদি আমি হতাম না? দেখতে?'
মাধুরী বলল''আর আমার গুণগান গাইতে হবে না?"
শিখা বলল'ও বৌদি ভাই, দাদা ভাই কোথায় গেল?'
মাধুরী বলল-' বাজার আনতে গেছে? কেন কিছু বলবি?'
শিখা বলল' না তেমন কিছু নয় ও বাড়ির রেখা বৌদির কথা জিজ্ঞেস করতাম।
শিখা বলল'তুমি খেলে না বৌদি ভাই?'
মাধুরী বলল 'তোর দাদা আসুক বাজার থেকে।'
শিখা বলল 'আজকে দাদা অফিসে যাবে না?'
মাধুরী ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল 'হ্যাঁ, যাবে তো লেট করছে কেন বল তো?'
শিখা বললো' একবার ফোন করবো দাদাভাইকে।'
মাধুরী বলল" হ্যাঁ কর।'
শিখা ডায়াল করল'******১২৩৪"। রিং হল 'দূরে থাকো ,শুধু আড়াল রাখো, কে তুমি, কে তুমি ,আমায় ডাকো?'শিখা বললো বৌদি ভাই রিং হচ্ছে । 
মাধুরী বলল 'ঠিক আছে দাদা ধরলে জিজ্ঞেস কর কখন আসছে?'
শিখা বলল ''রিং হয়ে গেল ধরল না তো?'ঠিক আছে
আবার করছি। আবার ডায়াল করল। রিং হল 'কেন দূরে থাকো ,শুধু আড়াল রাখো ।কে তুমি ,কে তুমি ,আমায় ডাকো?'
এবার সুরঞ্জন ফোনটা ধরে বলল' হ্যালো'।
শিখা বললো' দাদা ভাই তুমি ফিরছ তো এখন?'
সুরঞ্জন বলল-হ্যাঁ ফিরছি রাস্তায় আছি জ্যামে আটকে ছিলাম।'
শিখা বলল' 'ঠিক আছে সাবধানে এসো। বৌদি ভাই তোমার জন্য ওয়েট করছে।'ফোনটা ছেড়ে দিয়ে শিখা বলল'বৌদি ভাই দাদাভাই রাস্তায় আছে আসছে।'
মাধুরী রান্নাঘরে জলখাবারের বাসন ধুতে ধুতে  বলল "ঠিক আছে শুনতে পেয়েছি।'
শিখা মনে মনে ভাবল' দাদাভাইয বৌদির সম্পর্কটা খুবই সুন্দর ।একে অপরের জন্য কতটা কেয়ার করে। পরিপূরক।সবথেকে বড় কথা পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস।'
শিখা বলল 'বৌদিভাই, দাদাভাই কত সুন্দর রিংটোন লাগিয়েছে শুনেছো? বাবা তোমাদের কি রোমান্টিকতা?'
মাধুরী বললো' বড়দের সঙ্গে ইয়ার্কি মারছিস লজ্জা করছে না?'
শিখা বলল 'আরে আমিও তো বড় হয়ে গেছি।'
বৃষ্টি ওপরের বারান্দা থেকে শুনতে পেয়ে বলল' আমি কবে বড় হব পি মনি?'
মাধুরী বলল 'ওই দেখ, ঠাম্মা কি বলছে? সব কথাতে তোর   অতো কান কেন রে বৃষ্টি ?পড়াতে ধ্যান দাও।'
শিখা লক্ষ্য করলো বৃষ্টির ফর্সা গাল দুটো কেমন রাগে লাল হয়ে গেল।
মাধুরী দিয়ে কাপড়ে হাত মুছতে মুছতে ডাইনিং টেবিলে এসে বলল' জানিস তো বহরমপুর থেকে মেজ পিসি ফোন করেছিল?'
শিখা বললো' মেজ পিসি কেন?'
মাধুরী বলল 'পিসির নাকি শরীর খারাপ। ছেলের বউ নেই ।বেড়াতে গেছে?'
শিখা বলল' তো তুমি কি করবে?'
মাধুরী বলল 'না তোর দাদাকে বলে তাহলে পিসি মাকে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করতাম ।এ সময় তো আর আমি যেতে পারব না ওখানে?
শিখা বলল 'তো। বৌদি ভাই নিজে খেটে খেটে মরছ আবার এখন পিসিকে নিয়ে আসবে আর জানো তো সব সময় তোমার পেছনে পড়ে থাকে। ভাল লাগে না ছাই?'
মাধুরী বললো 'মাথা ঠান্ডা কর শিখা ।তুই এখন  বড় হয়েছিস। তোর বিয়ে-থা হবে সম্পর্কগুলোকে ঠিক রাখতে হয় জানিস তো?'
শিখা বলল' বৌদি ভাই তোমার মতো তো আমি ভালো নই।'
মাধুরী বলল 'কেন রে তুই কি কম ভালো নাকি?'
শিখা বলল' দেখো বৌদি ভাই সব সময় ওই মেজ পিসি তোমার এসে খুঁত ধরতো ।আমার একদম ভালো লাগে না এসব।'
মাধুরী শিখাকে  দুই হাত ধরে কাছে টেনে এনে বলল 'ওরে আমার পাগলি মেয়ে  ,তো কি হয়েছে। বড়রা বলবে না বল?'
শিখা জোরের সঙ্গে বলল ' না বলবে না ?আমার বৌদি ভাইকে বলবে না?'
মাধুরী বলল দেখ' আজকে যদি মা বেঁচে থাকতেন তাহলে  কষ্ট পেতেন না ?আমাকে সব দায়িত্ব দিয়ে গেছেন ।আমাকে তো সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে হবে না?'
শিখা মুখ গোমরা করে বলল 'সব দায়িত্ব যেন তোমার?'
মাধুরী হেসে বললো 'বোকা মেয়ে টা একটা পরিবারে থাকতে গেলে করতে হয় বুঝেছিস? (গালে একটা চুমু খেয়ে )।'
বৃষ্টির উপর থেকে বলল 'পি মনি তুমি ছোট হয়ে গেছো?'
মাধুরী বলল'ওই দেখ ইন সে কথাটা কেমন ঘুরিয়ে বলল বল?'
শিখা উপরের দিকে তাকিয়ে বলল'-আমি এখন ছোট্ট বৃষ্টি হয়ে গেছি।'
বৃষ্টি বলল 'আমি তো বৃষ্টি?'
শিখা বলল' তুই বৃষ্টি আর আমি মেঘ।'
এর মধ্যেই সুরঞ্জন ব্যাগভর্তি বাজার নিয়ে এসে বললো ধরো ধরো ধরো। শিখা ছুটে গিয়ে একটা ব্যাগ নিল।
সুরঞ্জন ব্যাগ রাখতে রাখতে বলল' মাধু আমাকে খাবার দাও তাড়াতাড়ি ।দেরি হয়ে যাচ্ছে।'
মাধুরী তাড়াতাড়ি করে ডাইনিংয়ের প্লেটে কচুরি আর আলুর দম সাজিয়ে ফেলল সঙ্গে একটা রসগোল্লা।
সুরঞ্জন হাত মুখ ভালো করে ধুয়ে এসে খাবার টেবিলে বসে বলল 'wow  কি করেছ?'.
শিখা বলল 'দাদাভাই আলুর দমটা যা হয়েছে না?'
মাধুরী বলল' বহরমপুর থেকে মেজ  পিসি ফোন করেছিল?'
সুরঞ্জন বলল' হ্যাঁ আমাকেও করেছিল। ওই জন্যই তো বাজার খুলে দেখো ইলিশ মাছ আনা হয়েছে।'
শিখা বলল 'দেখলে বৌদি?'
মাধুরী বলল 'আজকে কি  পিসি আসছে?'
সুরঞ্জন বলল' হ্যাঁ ,মনে হয় আজ ছেড়ে দিয়ে যাবে?'
মাধুরীবলল 'সে কথা তো আমাকে বলল না ?তাহলে রান্না করবো তো?'
সুরঞ্জন বলল 'তোমাকে অত ব্যস্ত হতে হবে না। ও 
ঠিক জানিয়ে দেবে ।এখনো ঢের সময় বাকি আছে? বলতে  বলতেই খাবার টেবিল থেকে উঠে পড়ল।
মাধুরী বলল' কি উঠে যাচ্ছ? আর নেবে না তুমি?'
সুরঞ্জন বলল' সময় নেই।'
মাধুরী বলল' তাহলে কি টিফিন ক্যারিয়ারে দিয়ে দেবো?'
শিখা বলল-'হ্যাঁ , হ্যাঁ দিয়ে দাও বৌদি ভাই।''
মাধুরী বলল 'শিখা ,টিফিন বক্সটা দে তো সোনা।'
শিখা টিফিন বক্স এগিয়ে দিল বৌদির কাছে আর বৌদিভাইকে এক দৃষ্টিতে দেখতে লাগল কত নিপুণভাবে সবকিছু সাজিয়ে দিচ্ছে।আর ও ভাবছিলো ওর বৌদিভাইয়ের মতো আর কারোর বৌদি ভাই হবে না। সব সম্পর্কগুলোকে দৃঢ়তার সাথে বেঁধে রাখার চেষ্টা করে। শিখা বৌদিভাইয়ের জন্য প্রাউড ফিল করে।'

কবি সঞ্জয় আচার্য এর কবিতা




৮০র গ্রাম:বিকেল


যুবতী আলপথ হেঁটে আসে অগ্রহায়ণের খামার বাড়িতে
কৃষানীর বাড়া ভাতে ঝুমকো গাঁদার পাশে,

দু’পাড়ের ঝুঁকেপড়া ধানের ছায়ায়
শিশির খাওয়া আগাছাও চায়
বেড়ে ওঠা ঋতুস্রাবে পেটপোরা পুষ্টি
চাতালের ঘুম।

ওদিকের হাত আসনে বুনে রাখা বিগত যৌবনা
আকর্ষ ধরে উঠে যাওয়া বল্লরী বেদনা
কবে যেন ফেলে এসে আবার আজ
                             আত্মলিপি খুঁজে খুঁজে
ফিরে যেতে চায় আটচালা গল্পগাথায়,

দাওয়ায় বসেছে ভেবে দেখি এবং বসেছিল
পাড়াতুতো দুই প্রৌঢ়া বিকেল।



সঞ্জয় আচার্য
20 A/3 শীল লেন, ট্যাংরা
কোলকাতা 700015
9830437268

৩০ ডিসেম্বর ২০২১




অলীক সমীকরণ
সুমী শারমীন

অদ্ভুত এক রঙের মানুষ কাঁদায় বারো মাস
পৌষ ফাগুনী খেলায় মাতে,আমার দীর্ঘস্বাস।

কাছে থেকেও ডাকে না সে , করে অবহেলা
অভিমানের কষ্ট পুষে,হারাই আমার খেলা।

হারতে চাইনা,ছাড়তে চাইনা,নিত্য দিনের মতো
বন্দী পাখির ঝাপটানো ডানা,অন্ধকারের মতো।
 
বুঝবে না জানি,শুধু হয়রানি, তবু্ও আকাশ কাঁদে
ব্যাথার কষ্ট, সুখের আশায়,নিত্যদিনের ফাঁদে।

পারিনা এড়াতে,ছেড়ে যেতে চাই,চেনা পথ ঘাট সব
মনের মাঝেতে বসবাস করে,তারই সব কলরব।
 
হাত রাখতেই সব ভুলে যাই,সেই তো রঙের মানুষ 
সারাটি জীবন কাঁদি তার তরে,উড়াই রঙিন ফানুষ।

মমতা রায়চৌধুরী/ ৮১




উপন্যাস 


টানাপোড়েন ৮১
অনুভূতির উপলব্ধি
মমতা রায়চৌধুরী



সারাটা  শীতের দুপুর   মনে এক অসহ্য যন্ত্রণা ;হ,কষ্ট ।কাকে বলবে রেখা?
মনোজকে বলার মতো নয়। কেন যে নয়, সেটাও বুঝতে পারছে না রেখা।
 কাকিমা (মীনাক্ষী দেবী) যখন বললেন 'রূপসার কথা মানে বিপাশার দিদির কথা ।তখন থেকে শুনেই রেখা ভেতরে ভেতরে যন্ত্রণায় দগ্ধ হচ্ছে। কত কষ্ট করে হারু জেঠু দুই সন্তানকে মানুষ করেছেন ।সে তো চোখের সামনেই সবাই দেখেছে। এত অভাব এর মধ্যেও মেয়ে দুটিকে কখনো কষ্ট দেন নি। যতটুকু সামর্থ্য, সেই অনুযায়ী মেয়েদের যথাযোগ্য পড়াশোনা থেকে শুরু করে সমস্ত কিছু শেখানোর চেষ্টা করেছেন। সুপাত্রস্থ ও করেছেন। রূপসার বর খুব ভালো মানুষ ছিলেন। অথচ তাকেই ভগবান পৃথিবী থেকে সরিয়ে নিলেন।
বিপাশা যতটা কোয়ালিটি সম্পন্ন মেয়ে ছিল বিয়েটা ঠিক তেমন হয় নি ।হয়তো বর ভালো একটা চাকরি করতো এইটাই। মানুষ হিসেবে ভালো নয়। ওর বর‌ও তো প্রতারণার কেসে জেল হাজতে।রেখা কাকিমার কাছ থেকে ঘটনাটি শোনার পর থেকে কেমন যেন হয়ে গেল। কাছের মানুষ, ভালোবাসার মানুষ যদি ছেড়ে চলে যায় ,কেমন হতে পারে সে উপলব্ধি ?রেখা ভাবতে পারে না ।ভয়ে আতঙ্কে রূপসাদির ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা সব যেন ভিড় করতে থাকে রেখার চোখেমুখে।
মনে পড়ে বিপাশাকে ভালোবাসতো রেখাদের পাড়ারই একটি ছেলে। বিপাশা বুঝতে পেরেও সেই ডাকে সাড়া দিতে পারে নি।
ভালোবাসাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। হয়তো এখন কোন এক সন্ধ্যা বেলায় বা গোধূলিলগ্নে বিপাশা ভাবতে থাকে সেই মুহূর্তের কথা ।
আজ ঘুরে ফিরে অলস শীতের দুপুরে মনে পড়ছে কত কথা। একবার একদিন শীতের সময় ঘোষেদের চাষের জমি পাশেই ,সেখানে দল বেঁধে যেত ছোলা শাক, মটরশুটি আর ধনেপাতা তুলতে ।তার জন্য অবশ্য ঘোষ জেঠু তাড়াও দিয়েছেন কিছুদিন ।
তারপর একদিন ঘোষ জেঠু বললেন 'না  হয় খাবি তো দুটো ধনেপাতা নিয়ে যা না ।'
হেসে আরো বলতেন 'কিন্তু বদলে  কুলমাখা আমাকে দিতে হবে ,মনে রাখিস।'
সেদিনের এক বিকেল বেলায় হঠাৎ বিজয়দা পাকড়াও করে বিপাশাকে একেবারে তেজোদীপ্ত ভঙ্গিতে এসে সাইকেল নিয়ে দাঁড়াল পথ আটকে।' যদিও বিপাশার দৃপ্ত ভঙ্গিতে আরষ্ট হয়ে যায় বিজয়দা কি কথা বলতে আসলো ?সব কোথায় যেন আটকে গেল ।
বিজয়দা শেষে বললো' অনেকগুলো কুল আছে নিবি তোরা?'
আমরা কুল নেব কি নেব না ,সে উত্তরের অপেক্ষা না করেই, সব ঢেলে দিয়ে পালিয়ে গেল ।
কিন্তু রেখার স্পষ্ট মনে পড়ে সেদিনের সেই বিজয়দার চাহনিতে ছিল আলাদা একটা মাদকতা ,ভালোবাসার প্রথম অনুভূতি ,উপলব্ধি।
এভাবে কেটে গেছে কত সুন্দর সোনালী মুহূর্ত ।রুপসাদির তো  তুলনা নেই ।যা কিছু আমাদের ভালোলাগা ,খেতে চাওয়া,আবদার সব রূপসদি তার দাবি মেটাত।তাই ভাবতে পারা যাচ্ছে না রুপসাদির জীবনের এই ঘটনা ।মনের দিক থেকেও যতটা ভালো মানুষ ছিল ,তেমনি আন্তরিকতা সম্পন্ন ।না ছিল কোন অহংবোধ ।হারুদার বাড়িতে নতুন কোন কিছু রান্না হলেই এনে হাজির করত। 
রুপসাদি হেসে বলতো 'তোরা একটু টেস্ট করে দেখ।' 'আমরা জানতাম হারুদার বাড়িতে কতটা অভাব কিন্তু ওই সামান্য জিনিসের ভেতরেও যেন কত ভালোবাসার মিশ্রণ ছিল ।'
হারু কাকাও বলতেন হেসে'  প্রাণ চায় অনেক অনেক তোদেরকে খাওয়াতে কিন্তু আমি পারি না। যেটুকু আছে আয় সবাই মিলে ভাগে ভাগ করে খা ।তোরাও তো আমার মেয়ের ই  মতো।'
উফ অসাধারণ চাটনি করত রূপসাদি ক্যাপসিকামের।
সেই ক্যাপসিকামের চাটনি আমি রুপসাদির কাছ থেকে রেসিপি নিয়ে আজকাল বাড়িতে বানাই ।ক্যাপসিকামের চাটনির সেই স্বাদ রূপসাদির মত আসে না। কিন্তু তবুও এর মধ্যে যেন ফিরে পাওয়া যায় সেই কৈশোরবেলার দিনগুলির মিষ্টি মধুর স্মৃতি। 
রেখা ভাবে 'এখন যে আমরা অন্য শ্রাবণের জলে ভিজি ।অন্যভুবনে এখন আমাদের বসবাস।'
হঠাৎই ফোন বেজে ওঠে' একা একা এই বেশ থাকা আলো নেই কোথাও ।সব মেঘে ঢাকা...।'
হঠাৎই  ভাবনায় দোলা লাগে...।'
মনোজ এসে বলে কি গো তোমার ফোন বাজছে তুমি আজ কোন ভাবনায়?'
রেখা বলল 'হ্যাঁ ফোন বাজছে।'
মনোজ বলল 'কার ফোন দেখো । কাকিমার ফোন আসার পর থেকেই তোমার কেমন যেন মুড অফ হয়ে গেল।'
রেখা বলল' হ্যাঁ দেখছি‌'।
মনোজ বলল 'কে ফোন করেছিল?'
রেখা বলল'পত্রিকার সম্পাদক।'
মনোজ বলল 'এ বাবা তোমার লেখার কতদূর কি হলো?''
রেখা বলল'এরমধ্যে পত্রিকার সম্পাদক তাড়া দিয়েছেন লেখা পাঠানোর জন্য।'
মনোজ বলল 'সে তো ঠিকই'। তুমি পাঠিয়ে দাও।'
রেখা বলল' হ্যাঁ কবিতা  ক'টা পাঠাবো।'
মনোজ বলল' আর নতুন করে আরও লেখ।'
রেখা বলল'এতটা ঘেটে আছি না?
কোন কথাই মাথায় আসছে না ।'
মনোজ বললো 'দেখো জীবনে এই দুঃখ ,কষ্ট ,যন্ত্রণা চিরস্থায়ী হয় না ।ওই নিয়ে বেশী নিজেকে হারিয়ে ফেলো না।'
রেখা বলল 'সারাক্ষণ কেমন একটা বিষন্নতা গ্রাস করে আছে মনেপ্রাণে ।কেন কি জন্য তার কৈফিয়ত দিতে পারব না।'
 মনোজ এসে ব্যালকনিতে রেখাকে  দুই 'হাত ধরে চেয়ার থেকে টেনে তোলে । আর বলে 'নতুন করে ভুলে যাওয়া নাম ধরে ডেকো না। হারানো স্বপন চোখে এঁকো না ।'
রেখার উদাসী বাউল  মনটা  কোন সাত সমুদ্র পেরিয়ে অজানা দেশে হারিয়ে যেতে চাইছে ।সেই মনের হদিশ কি পাবে?'
মনোজ  বলল 'কি ব্যাপার গো? তুমি  এখানে এসে বসে বাইরের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছ, কি হয়েছে তোমার?""
রেখা বলল' অন্য কেউ ছিলো ভাবনায়?'
মনোজ বললো 'হ্যাঁ।'
রেখা বললো  'হ্যাঁ, সত্যি। 
মনোজ বলল 'তাই তো ভাবছি।'
রেখা বললো তু'মি ছাড়া আর কেউ থাকতে পারে না?:
মনোজ বলল 'এতদিন তো ,তাই জানতাম।'
রেখা বললো 'দেখো প্রত্যেকেরই কিছু কিছু একান্ত মুহুর্ত থাকে ।নিজস্ব উপলব্ধি অনুভূতি থাকে।'
মনোজ বলল' হ্যাঁ সেটা ঠিক।'
রেখা বলল 'মাঝে মাঝে নিজেকে হারিয়ে যেতে হয় ।আত্মসমালোচনায় ডুবে যেতে হয় ।নিজেকে আবিষ্কার করতে হয়।'
মনোজ বললো 'কিন্তু আজকাল তোমার ভেতরে একটু বেশিই টানাপোড়েন হচ্ছে, আর তুমি আজকে কি রিংটোন লাগিয়েছ। গানটা তুমি চেঞ্জ করো।'
রেখা বলল' তোমাকে আগেই বললাম মনের একান্ত অনুভূতি উপলব্ধিতে আছে।'
মনোজ বলল 'কোথায় শীতের অলস দুপুরে দুজনে কাছাকাছি বসবো, ভালো ভালো কথা বলব ।মিঠে রোদ্দুর গায়ে মাখবো তা নয়?'
রেখা শুধু ম্লান হেসে মনোজের দিকে তাকিয়ে থাকে।

শান্তা কামালী/৫৩ তম পর্ব




বনফুল 
(৫৩ তম পর্ব ) 
শান্তা কামালী

অহনা অনেক্ক্ষণ চিন্তায় বিভোর ছিলো, অহনা ও একটু বেশি সময় দিতে পারতো, কিন্তু অনার্স ফাইনাল পরিক্ষার জন্য পারেনি। সৈকতের মাস্টার্স শেষ পরিক্ষার আগের দিন আন্টির এই অবস্থা... আল্লাহ পাকই ভালো জানেন সৈকতের পরিক্ষা কেমন হলো?
তিন সপ্তাহে'র মধ্যেই রেজাল্ট বেরোবে। 

পরদিন সকালে উঠে নাস্তা খাওয়া শেষ করে রেডি হয়ে বেরিয়ে গেলেন অলিউর রহমান। যাওয়ার আগে স্ত্রী রাহেলা খাতুনের মাথায়  হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন কাপড় কেনাকাটার জন্য যাচ্ছি। রাহেলা খাতুন স্বামীকে হতে দিয়ে ইশারায় বুঝাতে চেষ্টা করলেন যেন সবকিছু ভালো দেখে নেন... । 
অলিউর রহমানও সম্মতি জানালেন। অলিউর রহমান বড় একটা শাড়ির দোকানে ঢুকে লেহেঙ্গা পছন্দ করলেন যার দাম প্রায় পয়তাল্লিশ হাজার টাকা,দ্বিতীয় শাড়ি বার হাজার টাকায়......। 
সবকিছু এভাবেই মিলিয়ে মিশিয়ে  কিনেছেন। 
কেনা কাটা শেষ করে, সৈকতের বড়ো মামার বাসায় গিয়ে বললেন বৃহস্পতিবার সকালে যেন উনি উপস্থিত থাকেন। সৈকতের মা'য়ের ইচ্ছায় সবকিছু হচ্ছে, সঙ্গে করে সৈকতের বড়ো মামানিকে নিয়ে আসার কথা বললেন অলিউর রহমান  সাহেব।তার কারণ খালি বাসায় তো সৈকতের আম্মুকে রেখে যাওয়া যাবে না। বউ বরন করার জন্য ও তো একজন মহিলা দরকার। ছোট শালা আর নিজের দুই ভাইকে ফোনেই সব বুঝিয়ে বলেছেন, যেন বৃহস্পতিবার দিন সকালে সবাই উপস্থিত থাকেন।


চলবে...

রাবেয়া পারভীন/





দুরের বাঁশি 
(৪র্থ পর্ব)  
রাবেয়া পারভীন



-ম্যাম বৃষ্টিতে ভিজছেন কেন? 
 সিস্টারের ডাকে  সম্বিৎ ফিরে  আসে লাবন্যর। শুভর ভাবনায় একদম ডুবে গিয়েছিল সে,  কখন যে ভোরের উদীয়মান সূর্যটা  ডুবে গিয়ে আকাশ মেঘলা হয়ে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়তে  শুরু করেছে টেরই পায়নি। সিস্টারের দিকে তাকিয়ে  অপরাধীর মত একটু হাসে লাবন্য।
তারাতারি  বারান্দা  থেকে  সড়ে এসে কেবিনে ঢুকল। সিস্টার  তোয়ালে দিয়ে ওর চুল মুছে দিতে দিতে বলল
-মেডাম আপনার কিন্তু ঠান্ডার অসুখ । যান ভিজা জামাটা বদলে আসুন  ওষুধ  খেতে হবে। সকালের নাস্তাও তো পড়ে রয়েছে দেখছি।
লজ্জা পেয়ে  লাবন্য  ওয়াশরুমে গেল । কাপড় বদলে এসে  বিছানায় বসল। সিস্টার নাস্তার প্লেট এগিয়ে দিল  তারপর  ঔষধ। মিষ্টি করে হেসে বলল 
-  আপনাকে আজকে অনেক ফ্রেস লাগছে  মেডাম,  একদম ভালো হয়ে গেছেন। ডাক্তার সাহেব  এলে হয়ত আজকে রিলিজ করে দিবে আপনাকে।
নার্স মেয়েটাকে  বেশ ভালো লেগেছে লাবন্যর। ওর সাথে আলাপ করতে ভালো লাগছিলো। ওর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন  করল
 - আচ্ছা সিস্টার  আপনার নাম  কি ?  
- আমার নাম  গায়ত্রী। 
নামটা শুনে  লাবন্য চকিতে একবার মেয়েটির সিঁথির দিকে তাকালো।   সেখানে সিঁদুরের। কোন চিন্হ নেই। মেয়েটির বয়সও কম মনে হচ্ছেনা।  তবে কি বিধবা?   কৌতুহল চেপে রাখতে পারলোনা সে। জিজ্ঞেস করলো  
- সিস্টার। আপনি  এখনো বিয়ে  করেন  নি ?  
মৃদু হেসে  সিস্টার বলল
- না মেডাম। এখনো করিনি।
- কিছু না মনে করলে জানতে পারি কেন।?  
- সে অনেক কথা।
- একটু বলুন না প্লিজ !
সিস্টার হেসে বলল
- আসলে  একজন কে আমি ভালোবাসি । ছোটবেলা থেকেই প্রেম। সে  আমার পিসির  দেবরের  ছেলে।
- তো  আপনাকে উনি ভালোবাসেনা ?  
- হ্যাঁ হ্যাঁ  বাসে তো। বল্লাম না  ছেলেবেলার প্রেম  
- তাহলে  বিয়ে করছেন না কেন ?
- ও তো কলকাতায় থাকে।  আগে ঢাকায় থাকতো আট বছর আগে পিসিরা কলকাতায় চলে গেছে।  তারপর ওখানে যাওয়ার পর  অসিমের মা মারা গেছেন। সংসার চলছিল না তাই  অসিম বিয়ে করে কলকাতারই মেয়ে। এটুকু বলে মাথা নীচুকরে নিজের চোখের জল লুকাতে চেষ্টা করল  গায়ত্রী ।  এপ্রোনের পকেট থেকে  টিস্যু পেপার নিয়ে নিজের চোখ মুছল। তারপর। ক্রস্ত হয়ে বলল
- মেডাম। দশটা বেজে গেছে এখনি ডাক্তার  চলে আসবেন। আমি গেলাম। 
এগিয়ে যচ্ছিলো গায়ত্রী , খপ করে  ওর  ডান হাতটা চেপে ধরল  লাবন্য , ততক্ষনে  ওর চোখও চিক চিক করছিলো। বাস্পরুদ্ধ কন্ঠে বলল
 - সরি সিস্টার !  আমি বুঝতে পারিনি। মাফ করবেন।
একটু হাসতে চেষ্টা করল  গায়ত্রী।
- আরে না,  কিযে বলেন  মেডাম।
সিস্টার বেরিয়ে যাবার পরে  কেন  যেন শব্দ  করে কেঁদে ফেলল লাবন্য ।  ওর কানে বাজতে লাগলো  "সেতো কলকাতায় থাকে "। অসীম নামের ছেলেটি কলকাতায় গিয়ে ভুলে গিয়েছে  গায়ত্রী কে  আর গায়ত্রী  এখানে মনপ্রান  ঢেলে দিয়েছে  রুগ্ন মানুষের সেবায়। কিন্তু ভালোবাসার  প্রদ্বীপটি  ঠিক জ্বালিয়ে রেখেছে বুকের ভিতরে। আপন মনে  নিজেকেই শুধায় লাবন্য  শুভও  কি দুরে কোথাও গেলে তাঁকে ভুলে যাবে?  প্লিজ শুভ কখনো এমন কোরোনা  তাহলে ঠিক মরে যাবো আমি। ঠিক তখনি কেবিনের দরোজায়  টোকা পড়ে
- ভেতরে  আসবো ?


চলবে....

আইরিন মনীষা 





প্রতীক্ষার প্রহর


খুব করে জানতে চাই 
কেমন আছো তুমি,
সেই এক বিকেলে আসি বলে চলে গেলে
হয়নি দেখা আর তোমার সাথে কিংবা কথাও হয়নি। 

বকুল ফুলের মালা গুলো শুকিয়ে গেছে
যেন তোমারই অপেক্ষার প্রহর গুনছে এখনো, 
কতদিন দেখিনি তোমার ডাগর কালো চোখের চাহনি
যেখানে আমি হারিয়ে যেতাম এক অথৈ সমুদ্রে। 

কতদিন হাঁটা হয়নি নদীর তীরে হাত ধরাধিরি করে
দেখা হয়নি শরতের বিকেলের কাঁশফুলের সৌন্দর্য, 
কতদিন যাইনি সমুদ্রের প্রশস্ত বালুকা রাশিতে
দেখিনি ভিজিয়ে নগ্ন পদ যুগল সাগরের নোনা জলে। 

বড় সাধ জাগে আবার ও সেই বৈশাখী মেলা দেখতে
বিরহী প্রহরে আজ মনটা বড়ই উতলা হয়ে আছে, 
সময় যে আর কাটে না একাকী আমার
কবে পাবো তোমার দেখা আবার। 

মনে পড়ে খুব সেদিনের কথা
যখন তুমি আমার দীঘল কালো চুলে সাঁতার কাটতে,
আমার খুব করে পেতে চাই সেই মধুময় ক্ষণ
যখন তুমি আমার পাশে বসে হারানো দিনের গান গাইতে।

আমার বিরহী প্রহরে তুমিই একমাত্র সঙ্গী
যার সাথে বেলা অবেলায় কেটে যায় আমার ক্ষণ,
মিলনের দিগন্তে ভাসবো বলে প্রতীক্ষার প্রহর গুনছি
শুনছ কি তুমি আমার অব্যক্ত কথা গুলো ? 

এসো না আবার দুজন হারিয়ে যাই
সেদিনের কাছে যখন শুধু আমি আর তুমি
একান্ত সান্নিধ্যে না বলা কথার ফুলঝুড়িতে 
খুঁজে পেতাম স্বর্গের আছে যত সুখ। 

এখনো বাতাসে কান পেতে থাকি
তোমার আসার মাহেন্দ্রক্ষণ এর প্রতীক্ষায়,
রাত জেগে বিচরণ করি আমার স্বপ্নিল ভুবনে
যেখানে তুমিই আরাধ্য আমার স্বপ্নের সেই রাজকুমার। 

আমার করি ডোরে থাকা কাকাতুয়া ও আছে 
তোমার পথ পানে চেয়ে, 
তোমার নাম ধরে সে বেশ ডাকে 
আর আমাকে শুধায় তোমার গুনগান। 

আমার বাগানের ফুল গুলো ও প্রহর গুনছে
এই বুঝি তুনি এসে কাননে পদ ধুলি দিলে,
কাননের কুসুম কলি ও যেন নতুন ভোরের প্রতীক্ষায়
তোমার আগমনি বার্তা পেয়ে ফুটবে বলে। 

কাটে না সময় লাগে না ভালো 
তোমার বিহনে কি করে সময় কাটে আমার বলো ?
আর কত কাল অপেক্ষার প্রহর গুনলে 
তুমি আমার মন কাননে প্রস্ফুটিত হবে একান্তে ?

শামীমা আহমেদ /পর্ব ৪৪



শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত 
(পর্ব ৪৪)
শামীমা আহমেদ 


শিহাব আজ অন্য এক শিহাব রূপে নিজেকে তৈরী করে নিচ্ছে।বিগত জীবনের পটভূমি বদলে নেবার মাহেন্দ্রক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে সে। আর পিছুটানে নিজেকে ফেরাবে না স্মৃতিকাতরতায় আবেশিত হয়ে।আজ, এইতো আর কিছুটা  সময় পরই শায়লার সাথে তার দেখা হবে,ভিন্ন ভাবনায়,ভিন্ন আঙ্গিকে, একই পথ রেখায় চলবার অঙ্গীকারে হবে অনেক কথা বিনিময়  হৃদয়ে  ভালবাসা সঞ্চিত রেখে, 
অপ্রাপ্তির তালিকাটিকে ক্ষুদ্র করে দিতে।

যদিও এর আগেও কয়েকবার তাদের দেখা হয়েছে কিন্তু আজকের দেখা হওয়াটায় অন্য এক ধরনের ভাললাগা,অন্য একটি জীবনের শুরুতে নিজেদের এক হওয়া। একটি সুদূরের বোঝাপড়ায় আগামীর স্বপ্নের বাস্তব রূপ দেয়ার আলাপচারিতা। আজ তাই শিহাব এ প্রসঙ্গ ছাড়া  আর কোন কিছুই ভাবনায় আনতে চাইছে না। সে চট করে লাঞ্চ সেরে সব গুছিয়ে নিলো।আজ লেইট লাঞ্চ হলো।শিহাব সকালে গুলশান মেনজ স্যালুনে গিয়েছিল।একটু নিজেকে তৈরি করে নিতে আর কিছু টুকটাক শপিং করার প্রয়োজনে। 
শিহাব আয়নায় নিজেকে দেখছে। আজকের নতুন কেনা শার্টের সাথে প্যান্ট ম্যাচ করিয়ে নিচ্ছে।আজ হলুদাভ ঘি রঙা একটা শার্ট কেনা হয়েছে। শিহাব তাই কফি ব্রাউন একটা প্যান্ট ম্যাচ করিয়ে নিলো। চুলগুলো নিত্যদিনের সজ্জাতেই থাকবে বলে মনস্থির করে নিলো।ঘড়িতে তাকিয়ে সে ঝটপট তৈরি হয়ে গেলো।চকচকে ব্রাউন কালার সু'পেয়ার পায়ে গলিয়ে, ব্রাউন শেডেড রোদচশমাটা পকেটে পুরে নিলো।একরাশ  সুগন্ধি ঢেলে শিহাব বেরিয়ে পড়লো।এখনো প্রায় অনেকটা সময় বাকী শায়লার আসবার। তবুও,, ঐ যে অপেক্ষায় থাকার আনন্দটা নিতে তাই সে দ্রুত ছুটছে!খুব মনে পড়ছে সেই উঠতি বয়সে তরুণীদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টায় নিজেকে রোমিও করে তোলার দিনগুলির কথা! হায়,কি এক পাগল করা সময়ইনা গেছে তখন! শিহাব যেন সেই সময়টাতেই ফিরে গেছে আজ!
এমন অসময়ে ভর দুপুরে স্যার এত সেজেগুজে কোথায় যাচ্ছে,এ ভাবনায় কেয়ারটেকার বেলালের চোখ কপালে উঠেছে! সে  গ্যারাজ খুলে দিয়ে ঠাটা পড়া মানুষের মত দাঁড়িয়ে রইল।
দ্রুতই বাইক নিয়ে শিহাব পার্কের গেটে চলে এলো।পার্কের ঢোকার মুখে একটা বড় গাছের নীচে ছায়াতে বাইক থামিয়ে দাঁড়ালো। পার্কটিকে এখন আর চেনাই যায় না।ভেতরের আগের নকশা ভেঙে আবার নতুন করে গড়া হয়েছে।অনেক গাছপালার সাথে  নানান ধরনের নান্দনিক সজ্জাও দেয়া হয়েছে। এখনো প্রায় দুপুরই বলা চলে।পার্কের দর্শনার্থীর সমাগম হয়নি একেবারে।শুধু গুটিকয়েক স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছেলেমেয়ে জুটি বেঁধে আড়াল হয়ে বসে আছে।শিহাব ভাবলো আসলেই, এই বয়সের প্রেমটা এমনি হয়।যেমন প্রচন্ড আবেগ, তেমনি ধরা পড়ার ভয়!
আজ সে নিজেও  কিছুক্ষন পর এমনি একটি জুটিতে বাঁধতে যাচ্ছে।যেখানে দুজনার চোখে মুখে ভাবনায় থাকবে আগামীর স্বপ্ন।
শিহাব হাতে মোবাইল নিয়ে শায়লাকে কল দিলো।শায়লা এক রিংয়েই কলটা রিসিভ করলো! বুঝাই গেলো কতটা কাঙ্ক্ষিত ছিল এই কলটি।শিহাব হেসে ফেললো শায়লার ছেলেমানুষী দেখে। 
শায়লা তুমি কি তৈরি? 
এখনই চলে এসেছো? আমারতো আরেকটু সময় লাগবে।
কোন সমস্যা নেই।সময় নাও।আমি অপেক্ষা করছি। শায়লা কেবল শাড়ি পরে চোখে আইলাইনারের টানটা দিয়েছে।শায়লার হাত কাঁপছিল। নীল শাড়িটা আজ দিনের আলোয় খুবই সুন্দর দেখাচ্ছে।শায়লা কপালে ছোট্ট একটা কালো টিপ পরে নিলো।মেরুন রঙের লিপস্টিকে ঠোঁট দুটো রাঙিয়ে নিলো।শায়লার মন আজ যেন বাঁধাহীন। কোন কিছুই তাকে বাঁধছে না। খুবই রিল্যাক্স মুডে সে। যদিও সে আজ জীবনের এক কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি। শায়লা সামান্য উচ্চতার একজোড়া কালো জুতা পায়ে পরে নিলো। ড্রেসিং টেবিলে রাখা সুগন্ধি মেখে হাত ব্যাগটি হাতে নিয়ে আয়নায় নিজেকে  দেখে দুবার হাঁটার প্র‍্যাকটিস করে নিলো। নিজেকে দেখে নিজেই অবাক হচ্ছে! আজ অনেকদিন পর শায়লা এভাবে কারো জন্য  সাজলো। কেউ তার জন্য সত্যিকার তেমনিভাবে অপেক্ষায় আছে।
বাসা লক করে শায়লা নিচে নেমে এলো।বাইরে বেশ রোদ।কি আর করা শিহাব যেভাবে চেয়েছে।শিহাবের প্রতি বরাবরই তার এরকম নির্ভরতা।
শিহাব বাইকে বসে অপেক্ষায়  থেকে শায়লার এফবি প্রোফাইলে ঘুরাঘুরি চলছে।সেই প্রথম দিনের পরিচয়ের কথা মনে পড়ছে।মাঝে চলে গেছে অনেকগুলো দিন মাস সময়। কতনা অনুভুতি আবেগ উৎকন্ঠার দিনাতিপাত।সব শেষ করে দিতে চেয়েও আবার সেখান থেকেই নতুন করে শুরু করা।শিহাব তাই ভাবছে  নিয়তি কোথা থেকে কোথা টেনে নেয়! পথে উৎসুক মানুষজন এমন হ্যান্ডসাম লুকের একজনকে দেখে একবার হলেও উঁকি দিচ্ছে।এদিকটায় প্রায়ই নাটকের স্যুটিং হয়।শিহাবকে আবার নাটকের পাত্রপাত্রীই ভাবছে কিনা! অবশ্য ভুল কেন,বাস্তবে লুকটাতো তেমনি! শিহাব সানগ্লাস চোখে সবই খেয়াল করছে।একটা রিকশায় দুইটি টিনএজার মেয়ে বেশ খোলামেলা অভিব্যক্তিতে শিহাবকে ফ্লাইং কিস ছুড়ে দিলো! শিহাব একেবারে চমকে গেলো! হায় ওরা কি বুঝে যে বয়সে আমি ওদের গণ্ডিতে পড়ি না। আজকাল এরা বেশ সাহসী।অনুভুতি প্রকাশ ভীষণ স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড। 
দুইজন গৃহিণী শিহাবের দিকে তাকিয়ে থেকে তা প্রায় আরেকটু হলে গাড়ির সামনেই পড়তে যাচ্ছিল। উচ্চ হর্ণের শব্দে এ যাত্রা বেঁচে গেলো! শিহাব হাসবে না দুঃখ প্রকাশ করবে বুঝতে না পেরে মুখকে পাথর বানিয়ে রাখল।
দূর থেকে  রিকশায় নীল শাড়ি পরা একটি মেয়ে এগিয়ে আসছে।শিহাব এবার সতর্ক হলো। এবার আবার  না জানি কোন অভিজ্ঞতা হয়! আসলে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকাটায় সত্যিই একটু অস্বস্তি লাগছে।নীল শাড়ির রিকশা তার খুব কাছে চলে এসেছে।শিহাব এবার ভাল করে তাকালো।রিকশায় শায়লা বসে আছে।সাগর নীলা শাড়িটিতে যেন নীলাকাশের ছায়া! শায়লাকে অপূর্ব লাগছে! প্রতিবার দেখা হওয়ায় শায়লা কোন না কোনভাবে চিন্তিত থাকতো কিন্তু আজ চোখে মুখে যেন আনন্দ ঠিকরে পড়ছে! 
কি হলো চিনতে পারোনি?
শায়লার প্রশ্নে শিহাবের পলক পড়লো।
রিকশার কাছে এগিয়ে গিয়ে বললো,সত্যিই  তোমাকে আমি চিনতে পারিনি।তোমাকে  অপূর্ব লাগছে! আমি ভাষা হারিয়ে ফেলেছি!
বেচারে রিকশাওয়ালা এদের প্রেমালাপের মধ্য কাবাব মে হাড্ডি হয়ে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছে।আরে,,ভাড়াডা চুকাইয়া দিলেই তো সে পালাইতে পারে! 
শায়লা পার্স থেকে রিকশাভাড়া মিটিয়ে নেমে এলো। খোলা চুল বারবার মুখের উপর  উড়ে উড়ে আসছে আর শায়লা তা সরিয়ে দিচ্ছে।
শিহাবের ভেতরে কি যেন কী ঘটে যাচ্ছে!
শিহাব নিজেকে সামলে নিলো।ভালবাসার অনুভবের শুরুর ক্ষণটা যদি আজীবন  ধরে রাখা যেত! এ এক অপার্থিব  অনুভুতি! শিহাব শায়লাকে বাইকের দিকে এগিয়ে নিলো।কিছু মুরুব্বি গোছের খালাম্মারা সন্দেহ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ফেরিওয়ালা তাদের ডাক থামিয়ে মনে হচ্ছে সুটিং দেখছে! 
সামনের ছয়তালা ভবন থেকে কয়েকজন বারান্দায় এসে স্থির হয়ে আছে,ভাবটা এমন নাটকের শেষটা দেখতে হবে!!
শিহাব বুঝলো চারিদিকে উৎসুক চোখ তাদের ঘিরে ধরেছে,শীঘ্রই লোকালয় ছেড়ে পালাতে হবে! 
শায়লা জানতে চাইল,কেমন লাগলো অপেক্ষা করতে?
হু, খুবই অস্বস্তিকর লাগছিল তবে তুমি আসার পর ভালোলাগাটায় তা ছাপিয়ে গেছে।
তাই, আর আমি যে এমন কত অপেক্ষায় থেকেছি!
হু,আজ সব অপেক্ষার অবসান হবে শায়লা।
আমি তোমাকে সেই ভরসাটাই দেবো যেখানে শুধু পাওয়ার আনন্দটাই থাকবে।শিহাব শায়লার অজান্তেই হাত বাড়িয়ে শায়লার হাত ধরলো।শায়লা চমকে উঠলো!
শিহাব শক্ত করে শায়লার হাত ধরে বললো বাইকে উঠে বসো। শিহাব শায়লার হাত ধরেই বাইকে বসিয়ে শাড়ি গুছিয়ে দিলো।চালকের আসনে নিজে বসে নিলো।পিছনে শায়লার দিকে তাকালো বুঝাতে,আমাকে শক্ত করে ধরে রেখো কিন্তু।সে আর বলতে! অনেক অঘটন ঘটার পর আজ শায়লা, শিহাবকে হারানোর ভয় কাটিয়ে উঠেছে।আর সে ছাড়ছে না। শিহাব হেলমেট পরে লুকিং মিররটা সেট করে বাইকে স্টার্ট দিলো।বাইক চলতে শুরুর মূহুর্তে শায়লা শিহাবের পিঠে আছড়ে পড়লো।শিহরিত ভাললাগায় আবেশিত হলো দুজন।
বাইক ছুটছে তিন'শ ফিটের সেই খোলা যায়গায় যেখানে শিহাবের মন খারাপ থাকলে কখনো একা, কখনোবা বন্ধুদের নিয়ে প্রায়ই চলে আসে।তবে আজকের আসাটা ভিন্ন।আজ সাথে শায়লা আছে। উৎকন্ঠিত শায়লার ভরসাস্থল হয়ে আজ সে শায়লাকে তার ভালোবাসার কথা শোনাবে।


চলবে...

২৯ ডিসেম্বর ২০২১

রুকসানা রহমান





গেঁথেছো সকল মগ্নতা


ভেঁজা রোদের ছায়া ধরে ফিরে যাওয়া ক্লান্ত দুপুরের
রাত্তি কি জানে, মমতা স্পর্শ পাগল খেলার ছায়ার
হৃদয়ে তুমি-আমি মেপে -মেপে পথ চলার ছন্দে
চোখস্মৃতি ভালোবাসার আনাগোনা।

তবে কি আজও সময়ের হাতে হয়তো রাখা হয়নি হাত
শরীরের ভাঁজে আটকে থাকা নীল খাম
জীবন মেপে দেয় অপেক্ষা...

অন্ধকারে শুনি ওষ্ঠের নিপুণ কথার উপচে পড়া ঢেউ
স্নানের বাথটবে বিষাদ নগ্নতায় বকুল ভাসে মোহরাত  জীবনের বুকে অনুভব রাতজাগা স্বপ্নের ঘর।

এভাবেই মাখামাখি হোক হাওয়ার স্পর্শে
নির্ভুল সংলাপে সত্যি - মিথ্যের মিলনের রথে
ফসলের মাঠ ইচ্ছার ব্রতের সাঁকো পেরিয়ে
উল্লাসে মাখামাখি লাঙ্গলের ফলায়
গেঁথেছো সকল মগ্নতা...

রাবেয়া পারভীন/৩য় পর্ব




দুরের বাঁশি 
রাবেয়া পারভীন
(৩য় পর্ব)


সৌন্দর্য  এবং ব্যাক্তিত্ব এই দুয়ের সংমিশ্রণ শুভকে  ভিষন আকর্ষনীয়  করে তুলেছিল  লাবন্যর কাছে । প্রতিটিক্ষন  মনের চোখ দিয়ে খুঁটিয়ে খু্টিয়ে  দেখত  আর মুগ্ধ  হতো। শুভ কথাবার্তায় বেশ সাবলীল। যা বলে খুবি সহজ ভঙ্গিতে। তাই খুব সহজেই  সে বলল কথাটা।  
- লাবন্য  আপনাকে  মিস করছি 
একটু পরেই আবার বলল
- আচ্ছা  আমরা একে অপরকে  তুমি করে বলতে পারিনা ?  
ভেতরে ভেতরে ভিষন  চমকালো  লাবন্য । শুভ কি  তাহলে লাবন্যর  দূর্বলতাটা  টের পেয়ে গেছে ?   নাকি নিজের ভালোলাগার কথা বলছে ?
তবুও   নিজেকে সামলে নিয়ে  লাবন্য  বলে
- কেন  আপনি তে কি সমস্যা ?
- সমস্যা  আছে তো  কেমন জানি দুর দুর মনে হয়। 
এটাই চাইছিল সে  কিন্তু বলতে পারছিলনা । হেসে বলল -ঠিক আছে  তাহলে তুমি হলে   তুমি । লাবন্যর বলার ভঙ্গিতে এবার শুভও হেসে ফেলে। বলে
- একদম। এই কথাটাই বলতে চাইছিলাম ।
তারপর  দুজনেই হাসে।  হঠাৎ  কোথা থেকে যেন একটা সুখের দমকা বাতাস এসে  মাতাল করে দেয় লাবন্যকে। আপন মনে বার বার বলে  
- আমার স্বপ্নের রাজকুমার। আমি তোমাকে পেয়েছি । তোমাকে ভেবে কতরাত  নির্ঘুম কেটেছে আমার। সেই তুমি আজ এলে। লাবন্যর। একটা হাত নিজের হাতের মুঠোয় চেপে ধরে চুমু খায় শুভ। লাবন্যকে  বুকের কাছে টেনে নিয়ে বলে
- এখন থেকে আর কোন রাত তোমাকে একা থাকতে দেবনা আমি। সারাক্ষন ছায়ার মত  তোমার পাশেই থাকবো আর তোমাকে ভালোবাসায় ভরিয়ে দেব।


চলবে...

খাদিজা





প্রেম আমার
 

মহাসাগরের গভীরতার মতো তোমার প্রেমে আমি ডুবতে থাকি-
নিজেকে হারিয়ে ফেলি, 
বসরাই গোলাপের সুগন্ধি আমায় টানে না, 
না গালিবের গজল-
আমি ডুবতে থাকি। 

তোমাকে হারাবার বেদনা যখন অসহনীয় বিষাদের গর্ত, 
যুদ্ধক্ষেত্রে কেটে যাওয়া হাতের মতো।
আকাশের নীলে আমি ভেসে যাই-
ভাসতে থাকি কোন অজানার পানে ;
পরিযায়ী পাখিদের মতো -
নিজেকে হারাই। 

উজল রবির প্রভায় আমি দগ্ধ হই না-
ফসল তোলার পরে খড়কুটো পুড়িয়ে দেবার মতো, 
হৃদয়ের গহীনে থাকা সূর্যটা আমায় পোড়ায় অনুক্ষণ-
আমি মরতে থাকি। 

অতঃপর এক মধুর লগনে তুমি আমার হলে-
সাগরের গভীর হতে তুলে নিলে,
আকাশের নিলীমা হতে খুঁজে নিলে, 
ঠাঁই দিলে প্রেমের দেউলে,
বুকে চেপে ধরে বেলোয়ারি রাগে ভাসালে, 
ওষ্ঠাধর ছুঁয়ে দিলে ভীরু কপোতীর গালে-
বাঁচালে আমায় !

শান্তা কামালী/৫২ পর্ব




বনফুল
(৫২ পর্ব ) 
শান্তা কামালী

মনিরুজ্জামান কিছু দাবিদাওয়া করেননি বলে অলিউর রহমান কিছু দিবেন না তা আবার হয় নাকি!  ওনার একমাত্র ছেলে বলে কথা.... 
অহনাদের বাসায় আসার সময় গাড়িতে আধমন মিষ্টি নিয়ে এসেছেন। অহনাদের বাসায় সামান্য চা নাস্তা খেয়ে বেরিয়ে ড্রাইভারকে বললেন  নিউমার্কেটে যাওয়ার জন্য। মনিরুজ্জামান যতই বলুক কোনো দাবিদাওয়া নেই। সৈকত যে ওনার একমাত্র ছেলে....। অলিউর রহমান বেশ ক'টা দোকান ঘুরে একটা স্বর্ণের সেট পছন্দ করলেন বার বড়ি সামথিং  কার্ড দিলেন... । 
পেমেন্ট বুঝে নিয়ে স্বর্ণ প্যাকেট করে দিলেন দোকানদার। 
অলিউর রহমান সোজা বাসায় চলে আসলেন। সরাসরি স্ত্রী রাহেলা খাতুনের ঘরে ঢুকে প্যাকেট খুলে জিনিস দেখাতেই রাহেলা খাতুন স্বামীর প্রতি খুব খুশি হলেন।কিন্তু দুজনের কেউই এই বিষয় টা কাউকে বললেন না। 
 সৈকত রাতে মাকে খাবার এবং ঔষধ খাইয়ে,বাবাকে নিয়ে  বসে রাতের খাওয়া শেষ করলো।
তারপর  নিজের রুমে এসে মোবাইল হাতে নিয়ে দেখলো অহনা ওকে  তেরো বার ফোন করেছে। সৈকত ফোন ব্যাক করে বললো অহনা তুমি ফোন দিয়েছিলে, কিন্তু আমি..... 
অহনা বললো হুমম আমি বুঝতে পেরেছি, তুমি রুমে ছিলেনা....। 
সৈকত তুমি কি জান আঙ্কেল আজ আমাদের বাসায় এসে আগামী  বৃহস্পতিবার আমাদের বিয়ে ঠিক করে গেছেন?
অহনার মুখে সব শুনে সৈকত আশ্চর্য যায়।বাবা তাকে কিচ্ছু বললেন নি!
সৈকত বললো অহনা এখন ফোন রেখে ঘুমাবো  সকালে উঠে আম্মুকে খাওয়ার আগে পরের ঔষধ গুলো দিতে হয়। তাড়াতাড়ি না ঘুমালে সকালে উঠতে পারি না....
 অহনা আর কোনো কথা না বাড়িয়ে শুধু গুডনাইট বলে ফোন কেটে দিলো।



চলবে...

শামীমা আহমেদ /পর্ব৪৩




শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত (পর্ব৪৩)
শামীমা আহমেদ 



সকালে খুব নীরবেই ভাইবোনের নাস্তা পর্ব শেষ  হলো।তবে রাহাত বেশ বুঝতে পারছে শায়লা তাকে যেন কিছু  বলতে উসখুস করছে। টেবিলে মা আছে তাই শায়লার কথাটা বলা হচ্ছে না। বুঝতে পেরে রাহাত চায়ের মগ হাতে ড্রয়িং রুমে চলে এসে বেশ লাউডে টিভি অন করলো।আর শায়লাকে মোবাইলটা টেবিল থেকে দিয়ে যেতে অনুরোধ করলো।শায়লা নিজের চায়ের মগ ও রাহাতের মোবাইল নিয়ে ড্রয়িং রুমে চলে এলো। সোফায় পাশাপাশি ভাইবোন বসলো।
রাহাতই নীরবতা ভাঙল।
আপু কি কিছু বলতে চাচ্ছো?বলো,কী বলতে চাও?
না মানে 
কী? শিহাব ভাইয়ার কথা কিছু বলবে?
হ্যাঁ,শিহাব বলেছে তোমার আর মায়ের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে রাখতে কিন্তু মাকে কিভাবে বলি?
কোন ব্যাপারে আপু।আমাকে আগে বলো শুনি।
না মানে, শিহাব বলছিল ও ওর পারিবারিক ব্যাপারে আমার সাথে কিছু কথা বলতে চায়, তাই আজ বিকেলে আমাকে একটু  বাইরে কোথায় বেড়াতে নিয়ে যেতে চাচ্ছে।তা,আমি কি যাবো?
হ্যাঁ আপু, অবশ্যই যাবে।তোমাদের এখন বেশি বেশি কথা বলা দেখা করা উচিত।সব ব্যাপারে খোলামেলা কথা বলো।কোন কিছু আড়ালে না রেখে সামনের দিনগুলো কিভাবে সুন্দর হয় সেভাবে আলোচনা করো।
কিন্তু মাকে কিভাবে বলবো?
কোন অসুবিধা নেই আপু।আমারতো জানা থাকলো।আর তাছাড়া আজ বিকেলেতো মা থাকছে না।আমি আর মাতো নায়লার বাসায় যাচ্ছি। মা জানতে পারবে না। তুমি তাড়াতাড়ি ফিরে এসো।
আপু,শোন,
কি বলবে?
আজ আমার দেয়া নতুন শাড়িটা পরে যেও।
খুবই বাধ্য মেয়েটি হয়ে শায়লা মাথা ঝুকিয়ে বললো,ঠিক আছে।
রাহাত খুব সহজেই শায়লাকে শিহাবের সাথে বাইরে যাওয়ার অনুমতি দিয়ে দিলো।শায়লা অবাক হলেও রাহাত নির্বিকার রইল। রাহাত ইতিমধ্যে শিহাব সম্পর্কে  সব ধরনের খোঁজ খবর নিয়েছে।আর তা জানতে চারিদিকে লোক পাঠিয়ে ছিল।শিহাবের বর্তমানের উত্তরার বাসা,উত্তরার অফিস, গাজীপুরের ফ্যাক্টরি, 
জিগাতলার বাসা,বাসায় কে কে থাকে, শিহাব এলাকার কোন বাড়ির মেয়েকে বিয়ে করেছিল, বিয়ে ও তার পরবর্তী জটিলতা,এখন কে কোথায় থাকে,শিহাবদের গ্রামের বাড়ি, শিহাবের চালচলন, বন্ধুবান্ধব কারা,কাদের সাথে চলাফেরা, যাবতীয় সবকিছুর খোঁজ রাহাত নিয়েছে। এটা বোধহয় ভাইদের বিরাট একটা দ্বায়িত্ব থাকে বোন বিয়ে দিতে গেলে।
নায়লার বাসায় নেবার সবকিছু শায়লা গুছিয়ে দিলো। মাকেও তৈরি করে দিলো। দুপুরের পরপরই রাহাত আর মা  সব প্রস্তুতি শেষ করলে রাহাত একটা উবার কল দিলো এবং খুব দ্রুতই তা চলে এলো।
মাকে নিয়ে রাহাত নায়লার বাসার উদ্দেশ্য রওনা দিলো।
শায়লা শিহাবের ফোনের অপেক্ষায় রইল।মোবাইল  হাতে নিয়ে খালি বাসায় এ ঘর ওঘর পায়চারী চলছিল। দুপুর তিনটায়  শিহাবের কল এলো। তক্ষুনি শায়লার মনের ভেতর কী এক ফল্গুধারা বয়ে গেলো! এক নিবিড় অনুভবে মোবাইলটিকে আলতো করে গালে ছুঁয়ে নিলো যেন শিহাবের কন্ঠস্বরের সাথে তার স্পর্শও অনুভব করলো!
শায়লা কি করছো?
এইতো মা আর রাহাত একটু আগে নায়লার বাসায় গেলো। আমি একা। 
উহু, তুমি একা নও। এইতো আমি আছি!
---কই দেখতে পাচ্ছি নাতো!
একটু চোখ বন্ধ করে আমাকে ভেবে নাও।
শায়লা চোখ বন্ধ করতেই সেই যে দুজনে শপিংএ যাওয়ায় শিহাব কালো শার্ট পরা চোখে সানগ্লাস সাঁটা ছিল সেদিনের সেই মুখটি ভেসে উঠলো! মূহুর্তেই শায়লা  অন্য এক ভুবনে হারিয়ে গেলো!
ওপ্রান্তে শিহাব বলেই চলেছে,
জানো শায়লা, আজ নিজেকে অনেক ফ্রেশ করে নিলাম।বাইক চালাতে চালাতে বহুদিন  নিজের দিকে আর খেয়াল দেয়া হয়নি ।একটা নতুন শার্ট কিনলাম।আমার আবার কেনাকাটার বাতিক আছে, বুঝেছো।পরে আবার বিরক্ত হইয়ো না যেনো।
শায়লা হেসে ফেললো!
আজ তোমার সাথে দেখা হবে তাই নিজেকে তোমার মত করে তৈরি করে নিলাম।
---আমি কি কখনো বলেছি তুমি আমার মত হয়ে এসো, তুমিতো সবসময়ই সুন্দর, তোমার পাশেই বরং আমি বেমানান। 
এবার শিহাব বেশ রাগতঃ,কন্ঠে বলে উঠলো, আর কোনদিন এ ধরনের কথা বলবে না।শায়লা তোমার সাথে পরিচয় না হলে জীবনটা আমার আর স্বপ্ন দেখতো না।তোমার সরলতা আমাকে নতুন করে স্বপ্ন দেখিয়েছে।আমার অতীতের কষ্ট মুছে দিয়েছে। জীবনকে উপভোগ করার চেয়ে উপলব্ধিটাই যে বেশি আনন্দের তুমিই সেটা বুঝিয়েছো।
শায়লা নীরবতায় শিহাবকে অনুভব করছে।
শায়লা কিছু বলো!
সারাজীবন  অপ্রাপ্তির শায়লার জীবনে যে এতটা সুখ পাওনা হয়ে ছিল তা শায়লার  নিজেরও জানত না।কোন স্বপ্নের ওপার থেকে শিহাব উড়ে এসে এমন করে তার মনের খাঁচায় বন্দী হবে তা জানা ছিল না।
শায়লা শুধু বললো, শিহাব আমি হয়তো তোমাকেই এতদিন খুঁজেছি। তোমার অপেক্ষাতেই ছিলাম।
শিহাব ছোট্ট করে শুধু বললো,হু,আমি আছি, থাকবো তোমার হয়ে।ঠিক আছে আজ দেখা হচ্ছে।অনেক কথা হবে। তোমার আমার যত না বলা কথা আজ দুজন দুজনেরটা শুনবো।
এখন আমি শাওয়ার নিবো। সামান্য লাঞ্চ করবো। ঠিক সাড়ে চারটায় আমি উত্তরা পার্কের কাছে থাকবো।আর হ্যাঁ,আমি সেখানে পৌঁছে তোমাকে কল দিলে তুমি বাসা থেকে বেরুবে।আমি চাইনা ওখানে তুমি একা একা দাঁড়িয়ে থাকো।
শায়লা আচ্ছা বলতেই শিহাব বলে উঠলো,সবসময় তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করেছো আজ আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করবো।অপেক্ষা করার মাঝে প্রাপ্তির আনন্দটা লুকিয়ে থাকে।আমি আজ অনেকদিন পর সেই আনন্দটা পেতে চাই শায়লা।
শায়লা ওপ্রান্তে সাড়াহীন। শুধু চোখভেজা কান্নার একটা চাপা শব্দে মোবাইল যন্ত্রটি ভারী হয়ে উঠলো।


চলবে...



উপন্যাস 

টানাপোড়েন ৮০

হৃদয়াকাশ

মমতা রায় চৌধুরী


রেখার চোখে শুধু জল আর জল। এ কোন নজর লাগল তার সন্তানদের প্রতি। অবজ্ঞা, অবহেলা উপেক্ষা ছাড়া আর কিছুই জোটে না ওদের ।তাই রেখা ও মনোজ 'ওদেরকে একটা আলাদা জীবন দিতে তার পরিবারের সাথে লড়াই করতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। একটা উটকো ঝামেলা হয়ে গেল কোথা থেকে একটা কুকুর এসে  কামড়ে দিয়ে গেল।
একটু আগে মন্টু ডাক্তার এসেছিল ভ্যাকসিন দিয়ে গেলো ।তবে হ্যাঁ ডাক্তারবাবু খুব ভালো। কি জানি কেন উনি ভ্যাকসিনের কোন টাকাই নিলেন না।
মনোজ যখন বলল 'ডাক্তার বাবু আপনাকে কত দিতে হবে?'
মন্টু ডাক্তার বললেন ' কিছু না।'
মনোজ অবাক হয়ে বলল 'সে কি ডাক্তারবাবু আপনার ভিজিট , ভ্যাকসিনের দাম নেবেন না?'
ডাক্তারবাবু বললেন 'না, না ।আপনারা যে রাস্তার কুকুরগুলোকে এত ভালবাসেন ,রোজ ওদেরকে খেতে দেন ।ওরা তো অনাদরে-অবহেলায় বড় হয়। কে এত ভালবাসে বলুন তো?
মনোজ বলল'ডাক্তারবাবু এদেরকে নিয়ে রোজ আমার পরিবারের ভেতরে অশান্তি, বাইরে রাস্তায় খেতে দিলে অশান্তি ।তবুও আমার স্ত্রী কিন্তু এগুলোকে একদমই গায়ে মাখে না।'
ডাক্তারবাবু বললেন 'ওদেরকে ভালবাসুন ।ওরা আপনাদের জন্য জীবন দিয়ে দেবে। মানুষ বেইমান। এরা নয়।'
মনোজ বলল'তবে আপনি যে কাজটা করলেন ডাক্তারবাবু এটা তো আপনার মহানুভবতার প্রকাশ।'
ডাক্তারবাবু বললেন 'দেখুন ,আমাদের পেশাটাই হচ্ছে সেবার কাজ। কিন্তু পরিবেশ পরিস্থিতি অনুযায়ী আমাদের কেউ মূল্য নিতে হয়। কিন্তু আপনারা আমার চোখ খুলে দিয়েছেন।'
মনোজ বলল 'কিভাবে ডাক্তার বাবু?'
ডাক্তারবাবু বললেন 'এই যে আপনারা যদি ওদের জন্য এত কিছু করতে পারেন? তাহলে আমি সামান্য একটু ওদের জন্য সেবা করতে পারি না?'
মনোজ বলল' সবাই যদি এরকম হত পৃথিবীটা কত সুন্দর হতো।'
ডাক্তারবাবু বললেন' পৃথিবীতে তো সবাই একরকম হবে না ,এরকম দু-চারজন মানুষই তো থাকবেন তাই না?'
মনোজ বলল' হ্যাঁ ,তা অবশ্য ঠিকই বলেছেন আপনি।'
ডাক্তারবাবু বললেন 'আসুন না আমরা যে কজন ই পারি আমরা ওদের জন্য কিছু করি।'
মনোজ বলল 'একদম ডাক্তারবাবু।'
রেখা অবাক হয়ে বলল' ডাক্তারবাবু এরকম বললেন।'
অথচ এই ডাক্তারবাবুর নামে কতজন কত বাজে কথা বলেছেন। ডাক্তারবাবু হচ্ছেন চামার ,চশমখোর । ছিঃ ছিঃ। ভাবতেই কেমন কষ্ট হচ্ছে।
মনোজ বলল 'মানুষকে না সবসময় বাইরে থেকে দেখে বিচার করা যায় না। দেখ না যাকে চশমখোর ,চামার ইত্যাদি বলে অভিহিত করেছেন লোকে ।আজ তার ভেতরটা দেখো  এক মহানুভবতা ।
রেখা বললো' ঠিকই বলেছ।'
মনোজ বললো 'মিলি  এখন কি করছে? ঘুমাচ্ছে?
রেখা বলল 'হ্যাঁ দেখলাম যে ঠাণ্ডায় কাঁপছে। আমি আবার কিছু ওর গায়ে চাপা দিয়ে আসলাম।'
মনোজ  বললো 'দেখো জ্বর-টর যদি আসে তাহলে ওকে আবার একটু ওষুধ খাওয়াতে হবে।'
রেখা বলল "আমাদের মিলিটা দেখো কত বোঝে আমিও ওর কাছে গিয়ে বললাম 'মা তোমার শীত করছে? চোখটা মেলে তাকালো , যেই বললাম শুয়ে পড়ো ,মাথাটা একদম কাত করে দিয়ে শুয়ে পড়ল।'
মনোজ বলল 'জানো আজকে কি কান্ড করেছে?
রেখা বললো ' কি?'
মনোজ বলল  'বাচ্চারা মিলিটাকে যেই দেখতে পেয়েছে ,ওদের তো আটকে রাখা হয়েছে। লিলিটা একবার দেখি এমন চিৎকার শুরু করলো সঙ্গে পাইলট, তুলি ,ওরাও।'
রেখা বলল' লিলি যখন চেঁচায় না, একবার দেখবে  গ্রীলটা ধরে  চিৎকার করবে আবার একবার ভেতরে গিয়ে চিৎকার করবে।'
মনোজ বলল' এবার তুমি চিন্তা মুক্ত হয়েছ রেখা?'
রেখা বলল' হ্যাঁ । ভ্যাকসিন না হলে আমি চিন্তা মুক্ত করতে পারছিলাম না। থ্যাংকস গড।'
মনোজ বলল 'এবার কি এক কাপ ব্ল্যাক কফি পাব ম্যাডাম?
রেখা হেসে বলল 'একশোবার পাবে।'
রেখা রান্নাঘরের দিকে গেল কফি বানাতে এমন সময় ফোন আসলো। রিং হল'আমি তো সুখেই আছি..।'
রেখা রান্নাঘর থেকে কফিটা কাপে ঢালতে ঢালতে বললো 'কি ব্যাপার আজকাল তুমিও রিংটোন চেঞ্জ করছো?'
মনোজ বলল 'বাহ, তুমি করতে পারো ,আমি করতে পারি না?'
রেখা বলল 'অফকোর্স পারো।'
রেখে  হাসতে হাসতে বলল' তো ফোনটা ধরো?'
এর মধ্যে ফোন কেটে গেল।
রেখা রান্নাঘর থেকে দুকাপ কফি নিয়ে এসে ডাইনিং এ টেবিলের ওপরে রাখল মনোজ পাশে সোফাতে বসেছিল। বলল 'এসো এখানে খাবে ?না তোমার কাছে গিয়ে দেবো?'
মনোজ বলল' এখানে এসো।'
রেখা বলল' ইস সসস'।
মনোজ বলল 'একি সোনার আলোয় জীবন ভরিয়ে দিলে বন্ধু। কাছে থেকো, কাছে থেকো।'
রেখা বলল' কি ব্যাপার এত রোমান্টিক?'
সত্যিই মনোজের হৃদয়াকাশ আজ প্রেমেতে ভরপুর।
মনোজ বলল 'সেই কবে থেকে আমি হেঁটে চলেছি পৃথিবীতে। অপেক্ষায় অধীর দু'চোখ কেউ রবে এ পথে ।ভাবি নি কখনো আমি ।তুমি আমার সেই তুমি। 'তোমায় দেখে চোখের পাতায় বড় সুখে সে চোখে জল ভেসে যায়। জলে ভালোবাসি আমি তোমাকে।'
রেখা বলল' ভালো গান গাইছো?
মনোজ বলল 'কেন গানটা ভালো না?'
রেখা বলল 'অফকোর্স ভালো।'
রোমান্টিকতায় যেন রসভঙ্গ হলো।
এরমধ্যে আবার ফোন বেজে উঠলো আমি তো সুখেই আছি।'
রেখা বললে 'এবার ফোনটা ধরো।'
মনোজ ফোনটা রিসিভ করে বলল ' হ্যালো।'
কিরে কি করছিস?
মনোজ বলল 'এই তো ভাই চলে যাচ্ছে।'
সুরঞ্জন বলল ' শরীর ঠিক আছে?'
মনোজ  বলল' হ্যাঁ ,আগের থেকে অনেক বেটার।'
সুরঞ্জন বলল'হ্যাঁ রে, রেখা লিখছে তো নিয়মিত? অসাধারণ লেখে।'
মনোজ বললো' ও  যা চাপের ভেতরে আছে, কি করছে, কে জানে?'
সুরঞ্জন বলল'-শিখা তো ওর  বহুৎ বড় ফ্যান।'
মনোজ বলল' রেখাকে জানিয়ে দেবো।'
ওদিক থেকে মাধু বলল বৃষ্টিকে নিয়ে আসতে হবে ওর ছুটি হয়ে গেছে।
সুরঞ্জন মনোজ এর সাথে ফোন করে কথা বলতে বলতেই বলল হ্যাঁ এই তো যাচ্ছি। আচ্ছা, রাখি রে মনোজ। ভালো থাকিস।'
মনোজ বলল' তুইও ভালো থাকিস আর ফোন করিস মাঝে মাঝে।
 সুরঞ্জন বলল ' ঠিক আছে। তুই ও মাঝে মাঝে ফোন করিস।'
এরমধ্যে রেখার ফোন বেজে উঠলো। মনোজ নিজের ফোন কলটা কেটে ,দেখছে রেখার ফোন বেজে যাচ্ছে ।রেখা ধারেপাশে কোথাও নেই। রিংটোনে গান বাজছে
'তুমি কি এমনি করে থাকবে দূরে ,আমার এ মন মানে না..।'
মনোজ বলল' রেখা ,রেখা ,তোমার ফোন বেজে যাচ্ছে।'
রেখা ছাদের থেকে শুনতে পেয়ে বলল ফোনটা ধরো আমি কম্বলটা রোদে দিতে এসেছি ।ঘরে তো একটু ও রোদ ঢোকে না।'
মনোজ ফোনটা ধরতে গিয়ে ফোনটা কেটে গেল।
আমাদের এখান থেকে নেমে এসে বলল কে ফোন করেছিল?
মনোজ বলল' খেয়াল করি নি।'
রেখা বলল' মিস কল টা দেখো না?'
মনোজ বলল' হ্যাঁ ,দেখছি।'
রেখা বলল 'পেলে ?কে করেছে?'
মনোজ বলল' তোমার কাকিমার ফোন?'
রেখা চিন্তিত ভাবে বলল' কাকিমার?'
মনোজ বললো 'ফোনটা ধরাব?'
রেখা বলল-'হ্যাঁ, ধরাও তো?'
মনোজ নম্বরটা ডায়াল করল।'রিং হয়ে গেল ' কি দিয়ে পূজিব ভগবান তোমায়...।'
মনোজ বলল 'এই নাও ফোন ধরো, রিং হচ্ছে।'
রেখা রিসিভ করে বলল 'হ্যালো'।
কাকিমা বললেন' ভালো আছিস সবাই।'
রেখা বলল'এই আছি।'
রেখার কাকিমা বললেন'ননী, একটা খারাপ খবর আছে রে?'
রেখা বলল'কি খবর?'
কাকিমা বললেন'বিপাসার জামাইবাবু মারা গেলেন।'
রেখা অবাক হয়ে ব্যাঘ্রভাবে বলল 'কিভাবে ?কবে?'
কাকিমা বললেন ' গতকাল। স্ট্রোক।'
রেখা বললো 'কি অবস্থা ভাবো ?এদিকে বিপাশার বর জেলে আছে। ভাবা যাচ্ছে না।'
কাকিমা বললেন' সত্যিই ওদের দুই বোনের কপালটা এতটাই খারাপ যে ,কি হবে? কে জানে?'
রেখা বলল' তোমরা সবাই ভালো আছে তো?'
কাকিমা বললেন 'ওই আছি ।'
রেখা বললো'মানি অর্ডার টা পেয়েছ?'
কাকিমা বললেন 'হ্যাঁ পেয়েছি।'
রেখা বলল'কাকুর ট্রিটমেন্ট করে করাও।'
কাকিমা বললেন 'তুই আমার পেটের মেয়ে নয় তবুও যা..।'
রেখা বলল' ও, তাহলে তুমি আমাকে মেয়ে বলে ভাবো না তাই তো।
কাকিমা বললেন ' না মা এসব বলতে নেই আর ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন।'
ওদিকে মনোজ বলতে লাগলো মিলি একটু খেতে দাও।
রেখা বলল ' হ্যাঁ দিচ্ছি ।'
কাকিমা বললেন   আমি ফোনটা রাখছি পরে কথা হবে ননী। ভালো থাকিস।'
ফোনটা কাটার পর কাকিমা ভাবতে লাগলেন হৃদয়ের টান। রেখা তার নিজের মেয়ে নয় তবুও আজ তার হৃদয়ের অনেকটা জায়গা জুড়ে। তার নিজের মেয়েকে নিয়ে সবসময় টানাপোড়েন।
এদিকে রেখা ভাবতে লাগলো মিলি র যদি কিছু হয়ে যেত, তাহলে রেখার হৃদয়াকাশ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যেত।

২৮ ডিসেম্বর ২০২১

কবি নিপুন দাস এর কবিতা





মোহনায় এসে

মোহনায় এসে ক্লান্ত সে নদী 
ফেলে আসা পথে চায়,
সব পথ আজ শেষ হোলো বুঝি 
সাগরের ঠিকানায়।
কত পথ সে পার হয়ে এল
কত দেশ প্রান্তর,
উদ্দাম স্রোতে ভেঙেছে গড়েছে
 কতই না বালুচর।

আজ নেই তার কূলভাঙা ঢেউ নেই সেই স্রোতধারা,
সময়ের স্রোতে ভেসে গেছে সব
ফিকে সব স্বপ্নরা।
পরিচয় তার ছিল যতটুকু 
মুছে যাবে ক্ষনিকেই 
অপার সাগর, অ থৈ জলেতে
হারাবে সে অচিরেই।
সাগরের বুকে জমা হবে তার
বয়ে আনা জলরাশি,
যা ছিল নিজের, রইবে না আর
সব যাবে ঢেউয়ে ভাসি।
এ কী আনন্দ, না কী বিষাদ
ভাবে সেই স্রোতস্বিনী,
নিজেরে হারায়ে সুখ কিছু আছে। 
দুঃখ বা কতখানি ?
চঞ্চল স্রোতে যারা ছিল সাথী
কে কোথায় আজ তারা! 
মোহনায় এসে শান্ত তটিনী
বোবা কান্নায় সব হারা।
জমেছে বুকেতে নুড়ি আর বালি 
ধীরে তাই পথ চলা,যা গেছে হারায়ে, যা গেছে ফুরায়ে
সকলি থাক শুধু না বলা।

মমতা রায় চৌধুরী/৭৯





উপন্যাস 

টানাপোড়েন ৭৯
মিলির মাতৃত্ব
মমতা রায় চৌধুরী



স্কুল  থেকে বেরিয়ে টোটোতে উঠতে যাবে, পেছন থেকে রিম্পাদি বলল 'কিরে হনহন করে একাই টোটোতে এসে উঠে পড়লি, আমাকে ডাকলি না?'
রেখা বলল' ও ডাকি নি বুঝি?'
আমার পাশে এসে বসো জায়গা আছে'। বলেই কেমন অন্যমনস্ক হয়ে গেল। আসলে রেখার মনটা খুবই খারাপ। কিছু ভালো লাগছে না। এটা যেন ওর জীবনের একটা ট্রাজেডি। যাকে বেশি ভালোবেসেছে আপন করার চেষ্টা করেছে, তখনই যেন হঠাৎ করে সবাই দূরে সরে গেছে।
রিম্পা দি পাশে এসে বসলো তারপর বলল 'অনিন্দিতার বিয়েতে যাচ্ছিস তো?'
রেখার অন্যমনস্কতার জন্য কথাটা শুনতে পেল না। রিম্পাদি আবার একটু ঝাঁকুনি দিল। রেখা রিম্পদির দিকে তাকিয়ে ম্লান হেসে  বলল _কিছু বলছো?'
রিম্পাদি বলল 'তোর কী হয়েছে বল তো ?আমি তো কে একটা কথা বলছি ,তুই শুনতে পাচ্ছিস না?'
রেখা বলল '  হ্যাঁ ,বলো কি বলছো?'
রিম্পাদি বলল' অনিন্দিতার বিয়েতে যাবি তো?'
রেখা বললো' ইচ্ছা আছে, দেখি কি হয় ।সব ইচ্ছে আমার  পূর্ণ হয় না।'
টোটোতে ফোন বেজে উঠল রেখার। রিং টোন 'সবাই তো সুখী হতে চায় ...'।ব্যাগ থেকে ফোন হাতরে হাতরে বের করতে গিয়েই ফোনটা কেটে গেল।
আবার রিং হতে শুরু করল 'সবাই তো সুখী হতে চায়..'। 
রিম্পাদি বলল 'কে ফোন করেছে রে ?'
রেখা বলল' কে জানে? দেখি ফোনটাকে বের করে।'
রেখা ফোন বের করে দেখলো মনোজের ফোন ।ইশারায় রিম্পাদিকে বোঝাল। 
রিম্পাদি একগাল হেসে মজা করে বলল' চোখের পলক হারায়।'
রেখা ফোনটা রিসিভ করে বললো' হ্যাঁ বলো।'
মনোজ  বলল 'তুমি কোথায় এখন?'
রেখা বলল 'কেন ?এখন আমি টোটোতে আছি ।স্টেশনের দিকে যাচ্ছি ট্রেন ধরবো।'
মনোজ বলল 'না তাই জিজ্ঞেস করছি।'
রেখা বলল 'সাধারণত তুমি এই সময় ফোন করো না তো,কিছু হয়েছে?'
মনোজকে নিরুত্তর দেখে রেখা আবার জিজ্ঞেস করল 'বলো না কিছু হয়েছে?'
রিম্পাদি রেখার কপালে চিন্তার ভাঁজ দিকে ইশারায় জিজ্ঞেস করল' কি হয়েছে?'
রেখা ইশারায় বোঝালো পরে বলবে।
 রেখা আবার জিজ্ঞেস করল 'মিলি আর ওর বাচ্চারা সবাই ঠিক আছে তো?'
মনোজ বলল 'আজ মিলিকে একটা কুকুরে কামড়েছে।'
রেখা বলল' সে কি?কী করে?'
মনোজ বলল 'আমিও জানি না। একবার চিৎকারের আওয়াজ পেয়েছিলাম ,বাইরে বেরিয়ে শুনি দোকানদারা বলছে' মিলিকে কামড়েছে।'
রেখা বলল 'ক্ষ্যাপা কুকুর নাকি?'
মনোজ বলল-'এটাই তো সংশয় আছে। কেউ বলছে পাগলা কুকুর, আবার কেউ বলছে সেরকম কিছু নয়।'
রেখা বলল 'ওর খুব লেগেছে?'
মনোজ বলল হ্যাঁ চোয়ালের দিকে, অনেকটা কেটে গেছে।'
রেখা বলল 'এ বাবা, কি হবে?'
এর মধ্যে টোটো এসে স্টেশনে থামলো। ব্যাগ থেকে কুড়ি টাকার নোট বের করে দিল।
রিম্পাদি বলল' এই তুই দিলি কেন ?আজকে তো আমার দেবার কথা।'
রেখা বলল ' আরে বাবা একজন দিলেই হল।'
রিম্পাদি বলল ' এটা কিন্তু ঠিক করলি না।'
রেখা বলল 'আমার জীবনটাই তো বেঠিক।
গাড়ির এখনো খবর হয় নি না?''
রিম্পাদি  বলল 'তাই তো মনে হচ্ছে ।সবাই প্লাটফর্মে ঘোরাঘুরি করছে।'
মনোজ তখনও ফোনটা কাটে নি। রেখা বলল 'হ্যালো'
মনোজ বলল' হ্যাঁ বল শুনতে পাচ্ছি।'
রেখা বলল' মন্টু ডাক্তারকে খবর দিয়েছ?
মনোজ বললে 'হ্যাঁ কথা হয়েছে। উনি আউট অফ স্টেশন।'
রেখা বলল 'তাহলে কি হবে?'
মনোজ বলল 'ফোনে 'কথা হয়েছে?'
রেখা বলল'' কি বললেন উনি চিন্তার কিছু কারণ আছে?'
রেখার চোখ  ছল ছল করছে।ব
রিম্পাদি বলছে' কাঁদিস না সব ঠিক হয়ে যাবে।'
মনোজ বলল উনি বললেন যে ভ্যাকসিন দিয়ে রাখলে খুব ভালো হয় ।কারণ বাচ্চারা যেহেতু এখনও মায়ের দুধ খাচ্ছে। তাহলে চিন্তার কোনো কারণ থাকে না।'
রেখা বলল 'আমার মিলিটা কত ভালো মেয়ে ওর দুই দুবার অ্যাক্সিডেন্ট হল আবার এখনও এই রকম। শুধু  ওর উপরে কেন এরকম হচ্ছে বলো তো?'
কাঁদতে শুরু করলো এবার রেখা প্ল্যাটফর্মের লোকজন দেখতে লাগলো।
রিম্পাদি বলল' চুপ কর, চুপ কর।
এর মধ্যে ট্রেন ঢুকে গেল। 
রিম্পাদি বলল 'চল চল চল ট্রেনে উঠবি।'
রেখা বলল' আমি ট্রেনে উঠে তোমাকে ফোন করছি।'
বাপরে বাপ কৃষ্ণনগর লোকালে যা ভিড় হয়। 
রিম্পা দি বললো' এদিক আয় ,এদিক আয়, জায়গা রেখেছি।'
রেখা রিম্পাদির  কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। রিম্পাদি নিজে বসে রেখার ব্যাগগুলো নিয়ে বলল ' বস।'
এর মধ্যেই সামনের সিট নিয়ে দুই ভদ্রমহিলা সঙ্গে তুমুল ঝগড়া শুরু হলো। এক ভদ্রমহিলা বলছেন আপনারা ডেইলি প্যাসেঞ্জার   করেন বলে সব জায়গা রেখে দেবেন আর আমরা বসতে পারবো না, তা তো হবে না ।আপনাকে  এতগুলো জায়গা রাখতে দেবো না।'
রিম্পাদি বলল' দেখলি সোমাদির কান্ডটা প্রতিদিন এরকম করে।'
রেখার মাথায় কিছু ঢুকছে ওর মাথায় শুধু মিলি আর ওর বাচ্চাদের কথাই ঘুরছে।
মহিলা আবার বলছেন আপনি দেখতে পাচ্ছেন না আমার বেবি আছে। আমি   শিয়ালদা অব্দি যাব। দাঁড়িয়ে যাবো?'
রিম্পাদি থাকতে না পেরে বলল' সোমাদি একটা জায়গা ছেড়ে দাও না।'
সোমাদি বলল-'এই রিম্পা তুমি এরকম বলবে না তো ?আমি আগে জায়গা রেখেছি, আমি ছাড়বো কেন?'
রিম্পাদি বলল'  বাচ্চা নিয়ে আছে না ,ছেড়ে দাও না একটা জায়গা তোমার তো আরো কয়েকটা জায়গা রয়েছে।'
তোড়া ,সহেলি ...ওরা বসবে না?'
রিম্পাদি আর কথা বাড়ালো না ,সোমাদির সঙ্গে পেরে উঠবে না ।
রিম্পাদি শুধু বললো' যা ভালো ,বোঝো করো।'
সোমাদি বলল 'সেটাই তো করছি আগ বাড়িয়ে বার বার তুমি কেন কথা বলতে আসছো?
অন্যযাত্রীরা বলল ' উনি কি খারাপ কথাটা বলেছেন ?দেখছেন তো উনার কোলে বাচ্চা আছে। না কিছুতেই হবে না ।সব একজোট হয়ে বলল 'একটা জায়গা আপনাকে ছাড়তেই হবে।'
কি আর করে বাধ্য হয়ে তখন একটা জায়গা ছাড়তেই হলো।
 অন্য যাত্রীরা বলল' আপনি বসুন তো দিদি ওখানে। ভদ্রমহিলা খুব টেটিয়া আছেন। প্রতিদিনই এরকম জায়গা রাখবেন উনি।'
সোমাদি গজ গজ করতে লাগল।
রিম্পাদি  রেখাকে ধাক্কা দিয়ে বোঝাতে লাগলো আর মুচকি মুচকি হাসতে লাগল।
রেখা র তখনো চোখে জল।
রেখা আবার ফোন লাগালো মনোজকে।
মনোজের ফোনে রিং হতে লাগলো'আমি তো সুখেই আছি, যখন তুমি জানবে...।'
দুবার রিং হয়ে গেল। ফোন ধরছে না বলে রেখা উদগ্রীব হয়ে উঠল। 
রিম্পাদি বলল ' আরে বাবা, দেখ, হয় তো একটু কাজে ব্যস্ত আছে। ঠিক ফোন ধরবে।'
রেখা আবার ফোন করলো'রিং হল 'আমি তো সুখেই আছি..।'
মনোজ হাঁপাতে হাঁপাতে ফোন ধরে বললো 'হ্যাঁ বল ।'
রেখা বলল 'মন্টু দা কী বলেছেন?'
মনোজ বলল'  কালকে মন্টুদা আসবেন ভ্যাকসিন দেবেন।'
রেখা বলল 'আর ব্যাথাটা, রক্ত ঝরল সেটার কি হবে?
মনোজ বলল ' আমাদের এখানে  ওই স্ট্রিট ডগ কেয়ার  করে যারা, আরে আমাদের পাশে  থাকে ওর নাম' সন্দেশ 'ওকে বলেছি। ওরা ওদের টিম নিয়ে সন্ধ্যেবেলায় আসবে।'
রেখা বলল 'ও আসবে?'
মনোজ বলল'' হ্যাঁ আসবে ।এসে ওরাও কিছু ট্রিটমেন্ট করে দিয়ে যাবে।''
রেখা বললো 'আমার মিলির জন্য খুব চিন্তা হচ্ছে গো?'
মনোজ বলল 'সে তো হবেই?'আজকে গেটটা খোলা ছিল ওই কুকুরটা নাকি বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেছিল আর মিলি ছিল বাইরে বাচ্চাদের দিকে আসতে দেখে ঘেউ ঘেউ করতে থাকে। তখনই.....।'
রেখা বলল-'কে গেটটা খুলে রাখে কে জানে? যৌথ বাড়ি হলে যা হয়।'
মনোজ বলল 'তা যা বলেছো।'
রেখা বললো 'বাচ্চা গুলো কি করছে?'
মনোজ বলল'বাচ্চাগুলোকে এই তো সাড়ে চারটেতে দুধ রুটি খাওয়ালাম।
মিলির কাছে যাবে বলে ওরা চিৎকার করছে।'
রেখা বলল 'ওদেরকে সামলানো মুশকিল। সারাদিনে মার কাছে যায় নি ছটফট তো করবেই।'
মনোজ বলল 'হ্যাঁ ,কিন্তু এখন ওদেরকে ছাড়া যাবে না মায়ের কাছে।"
রেখা বললো 'ঠিক আছে। আমার মিলিটা কি করছে?'
মনোজ বলল 'এখন ঘুমোচ্ছে'।
ইতিমধ্যেই ট্রেন এসে মদনপুরে থামল।'
রিম্পাদি বলল 'নে আর কথা বলতে হবে না। বাড়ি  গিয়ে দেখতে পাবি ।এর পরেই তো কল্যাণী স্টেশন।'
রেখা বললো 'হ্যাঁ গো ,রিম্পাদি কি বলবো তোমায় ,বলো?'
রিম্পাদি বলল' আমাকে কিছু বলতে হবে না। আমি সব বুঝতে পারছি, তোর মনের অবস্থা।'
এরমধ্যেই ট্রেন স্টেশনে থামলো ।রেখা তার আগেই সিট  থেকে উঠে গেটের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। ট্রেন থামলে রেখা নামল  ট্রেন থেকে। জানলা দিয়ে রিম্পা দিকে হাত নাড়লো ।'
রিম্পাদি বলল 'সাবধানে যাস।'
রেখা বিধানের অটো দেখতে পেয়ে বলল' এই বিধান দাঁড়াও ,দাঁড়াও ,যাব।'
বিধান ব'লল 'ও দিদি তাড়াতাড়ি আসুন বুক হয়ে যাবে।'
হন্তদন্ত হয়ে অটোতে উঠে বসলো। বসার সঙ্গে সঙ্গেই অটো ছেড়ে দিল।
রেখা শুধু ভাবছে' কত তাড়াতাড়ি বাড়িতে পৌঁছাবে বাচ্চাদের দেখবে? মিলিকে দেখবে।'
বিধান বলল' দিদি ,আজকে আপনি খুব চিন্তায় আছেন?হাসি মশকরা করছেন না।সব ঠিক আছে তো?'
রেখা বলল 'এমনি মনটা একটু খারাপ আছে বলে ভালো লাগছে না কথা বলতে ।টায়ার্ড ও আছি তো?'
বিধান বলল 'হ্যাঁ, সে তো ঠিকই ।সারাদিনের ধকল।'
বিধান গেটের কাছে নামিয়ে দিল।
রেখা ভাড়া মিটিয়ে গেটটা খুলল। তারপর কলিং বেলটা বাজাল" জয় গনেশ, জয় গনেশ ,জয় গনেশ দেবা।"
মনোজ দরজা খুললো রেখা তাড়াতাড়ি ঢুকে গিয়ে আগে বাচ্চাদের দেখলো আর বলল আবার মিলি কোথায় আছে?'
মনোজ বলল' মিলিকে এ জায়গায় না রেখে অন্য জায়গায় ওকে শোবার ব্যবস্থা করে দিয়েছি।'
রেখা মিলির কাছে গিয়ে মিলিকে ডাকতেই মিলি ওর যেখানে লেগেছে, সেই জায়গাটা দেখাতে লাগলো ।সত্যিই যে কতটা কাছের ,ভালোবাসার হলে তবে এই উপলব্ধি করা যায় । রেখা অবাক হয়ে গেল । একটা পশু কি করে তার যন্ত্রণার কথা ,সে কিভাবে প্রকাশ করছে।
রেখা মিলির গায়ে হাত বুলাতে লাগল আর বলল' না মা ,তোমার কিচ্ছু হবে না ।তোমার সব কষ্ট চলে যাবে দেখো। মিলির ঐরকম করুণা অবস্থা আর ওর  দেখানোর ভঙ্গি দেখে রেখার চোখে জল এসে গেল। রেখা শুধু ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতে লাগল ঈশ্বর যেন কিছু না হয় ওর।ওকে তাড়াতাড়ি সুস্থ করে দিও ।আর যেটা ভয় পাচ্ছি সেটা যেন একদমই না হয়।'
মনোজ রেখার জীবনের পরিপূর্ণতা মিলি আর ওর বাচ্চারা ।তাই মিলিদের কিছু হলে মনোজ রেখা কিছুতেই স্থির থাকতে পারে না ‌আর রেখা তো নয় ই ।রেখার হৃদয়ের শূন্যতা  কানায় কানায় পূর্ণ করে দিয়েছে মিলি আর ওর বাচ্চারা। কিছু হলে রেখা র ভেতরটা কুরে কুরে খায়। মিলিতারি সন্তানদের বাঁচাতে আজকে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েছে। একেই বলে মাতৃত্ব।

শামীমা আহমেদ/পর্ব ৪২




শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত (পর্ব ৪২)
শামীমা আহমেদ 



বেশ কয়েকদিন হলো শায়লা আবার  সেই আগের মতই কর্মচঞ্চলতায় ফিরে গেছে।সেই অনিশ্চয়তার দিনগুলির অবসান হয়েছে।এখন সে  নিয়মিত ফুল গাছগুলোতে পানি দিচ্ছে। খাঁচায় পোষা পাখিগুলোকে গান শোনাচ্ছে।রাতে ঘুমুতে যাওয়া আগে নিজের বেশ যত্ন নিচ্ছে। ভোরে ঘুম থেকে উঠে মায়ের জন্য অপেক্ষা করছে। নাস্তার আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে উঠছে।মায়ের সাথে টুকটাক কথায় কথায় তার অসুস্থতার সময়ে সংসারের যে বেহাল দশা হয়েছিল তা জানছে।শায়লা নিজেও বুঝে উঠতে পারছে না শিহাবের জন্য কেন সে এতটা উতলা হয়ে উঠেছিল! সে কথা ভাবলে কেমন একটা লজ্জাবোধও  কাজ করে। শিহাবতো তাকে আগেই সতর্ক করেছিল যেন দুজনার মাঝে কোন চাওয়া পাওয়ার ইচ্ছেরা উঁকি না দেয়। শায়লা নিজেকে নিজেই চিনতে পারছে না।নাহ! এভাবে কারো ইচ্ছার বাইরে তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা তার ঠিক হয়নি।কিন্তু আজকাল শিহাবের ফোনালাপ, মেসেজ কেমন যেন অন্যকিছুর আভাস দিচ্ছে।কেমন যেন একটা বন্ধনের আলাপন। তবে কি শিহাব নিজের  প্রতিজ্ঞা ভেঙে তার প্রতি দয়া দেখাচ্ছে।যদি সেদিন মরেই যেতাম তবে তো সে-ই দায়ী থাকতো শায়লার এই মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার জন্য।তাই কি তার এতটা উদ্বেগ উৎকন্ঠা! কিন্তু শিহাবকে সে যতখানি জেনেছে সে কখনো শায়লাকে কোন ব্যাপারে দয়া দেখানো বা মিথ্যে কোন আশ্বাস দিয়ে কিছু প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষার সম্ভাবনা দেখায়নি। শিহাবের কথার কখনো ভিন্ন অর্থ হয়নি।সে যা বলেছে সবই খুবই পরিষ্কার  এবং সরাসরি বলেছে। তার প্রকাশভঙ্গীর কখনো দুটো মানে হয়নি। কখনো অলীক স্বপ্ন দেখিয়ে মিথ্যে জাল বুনেনি। চারিদিকে প্রেমিক প্রেমিকাদের অস্থিরতা আর প্রতারনায় যেখানে প্রেম ভালবাসাটা আজ একটা নিত্য দিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু শিহাবের মাঝে তেমন কোন ছলনা বা কপট কিছু তো শায়লা দেখেনি।নিজের জীবন, ভালবাসা, স্ত্রী, সন্তান সব কথাইতো সে অকপটে জানিয়েছে।তার প্রতি আস্থা রেখেছে।সব কথা শায়লাকে জানিয়ে মনকে ভারমুক্ত করেছে।সেও তো তবে তাকে একটা ভরসাস্থল ভেবেছে।
এই ভেজালের ভীড়ে শিহাবের মত শুদ্ধতা, তাই তো শায়লার মনকে এতটাই দখল করে নিয়েছে।শায়লার সরল মনে এমন একজন মানুষের সাথে পরিচয়।আর এ জন্যই শায়লা শিহাবের প্রতি এতটা নির্ভরতায় ডুবেছে।
শায়লা এখন আর পিছে ফিরে তাকাতে চায়না।সে তার মনের গহীনের ডাক শুনেছে। আর তাতে শিহাবেও সাড়া মিলেছে।শায়লা সব পিছুটান  উপেক্ষা করে সে, শিহাব,হ্যাঁ,শিহাবকেই সে তার জীবন সঙ্গী করে পেতে চায়।
রাত প্রায় সাড়ে নয়টার দিকে রাহাত অফিস থেকে বাসায় ফিরলো।হাতে  দুটো আড়ংএর ব্যাগে  দুটো শাড়ি নিয়ে।রাহাত নিজের ঘরে না গিয়ে শায়লার রুমে নক করে মায়ের ঘরে গেলো। মা দোয়ার বই পড়ছিলেন।রাহাতকে দেখে থামলেন। রাহাত ব্যাগ দুটো বিছানায় রাখল।শায়লা ততক্ষনে মায়ের রুমে চলে এসেছে। মা আর শায়লার হাতে শাড়ি দুটো তুলে দিলো। দুজনেই ভীষণ অবাক হলো! যদিও দুজনেই বলে উঠলো কেন এখন শাড়ি? কী দরকার ছিল? যদিও শাড়ি উপহার পেলে কোন বাঙালি  মেয়ে ভেতরে আনন্দিত হবে না তা কিছুতেই হতে পারে না। রাহাত জানতে চাইল, শাড়ি পছন্দ হয়েছে? দুজনেই মাথা ঝুকালো। কেবল শায়লাই বলে উঠলো, আমার খুব পছন্দ হয়েছে ভাইয়া।আর মায়েদের তো সেই একটাই কথা কেন এত টাকা নষ্ট করছো?তবে এসব কথায় রাহাত একেবারেই  কান দেয় না। অন্য রসংণংে গিয়ে রাহাত 
শুধু বললো, আপু আজ কী রান্না করেছ? খুব খিদে পেয়েছে, শিগগীর খেতে দাও।এ কথা বলেই রাহাত নিজের রুমে ফ্রেশ হতে চলে গেলো। শায়লা মায়ের শাড়িটা আলমারীতে তুলে রাখল আর তার শাড়িটি নিয়ে ঘরে চলে এলো। ঘরে এসে শাড়িটি খুলে নিজের পরনে একটু জড়িয়ে নিয়ে  আয়নায় নিজেকে দেখে নিলো। খুব উজ্জ্বল একটা নীল রঙ! শিহাবের পছন্দের রঙ। শায়লা কল্পনায় শাড়িটি পরে একঝলক শিহাবকে ভেবে নিলো।পরক্ষণেই রাহাতের কথা মনে পড়তেই দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে গেলো।রান্নাঘরে গিয়ে ডাইনিং এ খাবারের আয়োজনে ব্যস্ত হলো।মাকেও ডেকে নিলো। চলে আসো মা আজ আমরা একসাথে খাবার খেয়ে নেই।মেয়েকে স্বাভাবিকতায় ফিরতে দেখে মা আল্লাহর দরবারে হাজারবার শুকরিয়া জানাচ্ছে। 
রাহাত ফ্রেশ হয়ে ডাইনিং এ এসে চেয়ারে বসে পড়লো।খুব গোপনে আপুর গতিবিধি  দেখতে লাগলো।যাক! আপু আবার আগের মত হাস্যমুখে ফিরে এসেছে।
তিনজনই একসাথে খেতে বসলো।খাওয়ার এক পর্যায়ে রাহাত মাকে বললো,কাল আমার অফিস ছুটি।সপ্তাহের মাঝে ছুটি? মা অবাক হলো! রাহাত জানালো কাল  সারাদেশেই একটা সরকারী ছুটির জন্য ছুটি থাকছে। তাই চলো কাল দুপুরের পর তুমি আর আমি নায়লাকে দেখে আসি।  মূর্শেদকেও পাওয়া যাবে।শায়লা আপন মনে খাবার খাচ্ছে।আপু,তুমিও চলো কাল আমাদের সাথে,শায়লার মনযোগ আকর্ষণ করতে রাহাত বললো।

কোথায়?
বুঝা গেলো,রাহাতের কোন কথাই শায়লা শোনেনি।আর কেন যে এত উন্মনা সেতো আর রাহাতের চেয়ে ভালো কেউ জানে না।
রাহাত জানালো,নায়লার বাসায়।
নায়লার বাসায় যেতে  শায়লা বরাবরই একটু
নিম রাজী থাকে। 
না তোমরা ঘুরে আসো। আমি পরে একদিন যাবো।
রাহাত এব্যাপারে আর বেশী পিড়াপীড়ি করলো না।আপুর এখন একটু একা বা নিরিবিলি সময় প্রয়োজন। নিজের সাথে বা শিহাব ভাইয়ার সাথে বোঝাপড়াটা করে নিতে।
ঠিকাছে আপু,তুমি মাকে তৈরি করে দিও।আর নায়লার জিনিসপত্রগুলো গুছিয়ে দিও।
শায়লা মাথা ঝুকিয়ে সম্মতি দিলো।খাবার শেষ করে যে যার রুমে চলে গেলো।
শায়লার মনে আজ অন্যরকম এক উন্মাদনা।রাহাতের এনে দেয়া নতুন শাড়িটি যেন আরো তাতে বেশি আনন্দ যোগ করলো!বারবার আয়নায় নিজেকে আর শাড়িটিকে দেখছে।
আচ্ছা শিহাবের কি শাড়িটা পছন্দ হবে?সেই যে সেদিন শিহাব বলছিল,একদিন দূরে কোথায় বেড়াতে নিয়ে যাবে তবে সেই দিনই এই শাড়িটা পরবে।এমনটি ভাবতে ভাবতেই  শিহাবের কল এলো।
আজ কেমন আছো শায়লা?
আচ্ছা আমি কি  এখনো অসুস্থ নাকি? 
না,তবুও যে ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে।
বেশ করেছি।আমাকেও তো তুমি কম আতংক দাওনি।
শায়লা আমার সেদিনের কথাগুলোকে তুমি ভুল ভাবে নিয়েছ।
আমি এ ধরনের কথার জন্য সেদিন প্রস্তুত ছিলাম না।
আমি তোমার ভালো চেয়েছি,তাই বলেছি।
তাহলে আমাকে বুঝতে তুমি ভুল করেছো শিহাব।
শিহাব আর সেই দিনে,পিছনের দিকে যেতে চাইল না।
শিহাব কথার পরিবেশ পালটে নিলো।
আচ্ছা শায়লা তুমি কি কাল ফ্রি আছো?আজ বাসায় তোমার মা আর রাহাতের অনুমতি নিয়ে রেখো।কাল বিকেলে আমি তোমাকে নিয়ে একটু ঘুরতে বেরুবো।কাল আমার অফিস বন্ধ।একটু সময় পাওয়া গেলো।
তুমি অসুস্থতা থেকে উঠেছো,তোমাকে একটু  খোলা জায়গায় নিয়ে যাবো।
শায়লা বললো কিন্তু ছুটির দিনে তোমার বাবা মা আরাফতো অপেক্ষায় থাকে।
হ্যাঁ,তা থাকে।তবে ওদের শুক্রবারে দেখতে যাবো।এখন আরাফ বাসায় নেই।ভাবীর সাথে ভাবীর বাবার বাড়ি বেড়াতে গিয়েছে।আরাফ ওটাকেই ওর নানাবাড়ি মনে করে।
যদিও  আমাদের বাসার একই রোডে ওর দাদা আর নানাবাড়ি কিন্তু আমরা আজো তা জানাই নি। শায়লা, এ প্রসঙ্গে কাল কিছু কথা তোমায় বলবো।তুমি  মানসিক প্রস্তুতি রেখো।আর হ্যাঁ,সকালে একটু নিজেকে ফ্রেশ করায় ব্যস্ত থাকবো।কল করে না পেলে আবার টেনশন করোনা।আমি লাঞ্চের পরে তোমার সাথে যোগাযোগ করবো। এখন ঘুমিয়ে পড়ো।রাত জেগোনা।আমিও এই একটা মুভি দেখে এখুনি ঘুমিয়ে পড়বো।বাই।
শায়লা নিঃশব্দের গভীরতায় শিহাবকে অনুভব করে নিলো।কী এক মায়ার টানে শিহাবকে খুব কাছের একজন মানুষ মনে হতে লাগল।

চলবে….