উপন্যাস
টানাপোড়েন ৭৯
মিলির মাতৃত্ব
মমতা রায় চৌধুরী
স্কুল থেকে বেরিয়ে টোটোতে উঠতে যাবে, পেছন থেকে রিম্পাদি বলল 'কিরে হনহন করে একাই টোটোতে এসে উঠে পড়লি, আমাকে ডাকলি না?'
রেখা বলল' ও ডাকি নি বুঝি?'
আমার পাশে এসে বসো জায়গা আছে'। বলেই কেমন অন্যমনস্ক হয়ে গেল। আসলে রেখার মনটা খুবই খারাপ। কিছু ভালো লাগছে না। এটা যেন ওর জীবনের একটা ট্রাজেডি। যাকে বেশি ভালোবেসেছে আপন করার চেষ্টা করেছে, তখনই যেন হঠাৎ করে সবাই দূরে সরে গেছে।
রিম্পা দি পাশে এসে বসলো তারপর বলল 'অনিন্দিতার বিয়েতে যাচ্ছিস তো?'
রেখার অন্যমনস্কতার জন্য কথাটা শুনতে পেল না। রিম্পাদি আবার একটু ঝাঁকুনি দিল। রেখা রিম্পদির দিকে তাকিয়ে ম্লান হেসে বলল _কিছু বলছো?'
রিম্পাদি বলল 'তোর কী হয়েছে বল তো ?আমি তো কে একটা কথা বলছি ,তুই শুনতে পাচ্ছিস না?'
রেখা বলল ' হ্যাঁ ,বলো কি বলছো?'
রিম্পাদি বলল' অনিন্দিতার বিয়েতে যাবি তো?'
রেখা বললো' ইচ্ছা আছে, দেখি কি হয় ।সব ইচ্ছে আমার পূর্ণ হয় না।'
টোটোতে ফোন বেজে উঠল রেখার। রিং টোন 'সবাই তো সুখী হতে চায় ...'।ব্যাগ থেকে ফোন হাতরে হাতরে বের করতে গিয়েই ফোনটা কেটে গেল।
আবার রিং হতে শুরু করল 'সবাই তো সুখী হতে চায়..'।
রিম্পাদি বলল 'কে ফোন করেছে রে ?'
রেখা বলল' কে জানে? দেখি ফোনটাকে বের করে।'
রেখা ফোন বের করে দেখলো মনোজের ফোন ।ইশারায় রিম্পাদিকে বোঝাল।
রিম্পাদি একগাল হেসে মজা করে বলল' চোখের পলক হারায়।'
রেখা ফোনটা রিসিভ করে বললো' হ্যাঁ বলো।'
মনোজ বলল 'তুমি কোথায় এখন?'
রেখা বলল 'কেন ?এখন আমি টোটোতে আছি ।স্টেশনের দিকে যাচ্ছি ট্রেন ধরবো।'
মনোজ বলল 'না তাই জিজ্ঞেস করছি।'
রেখা বলল 'সাধারণত তুমি এই সময় ফোন করো না তো,কিছু হয়েছে?'
মনোজকে নিরুত্তর দেখে রেখা আবার জিজ্ঞেস করল 'বলো না কিছু হয়েছে?'
রিম্পাদি রেখার কপালে চিন্তার ভাঁজ দিকে ইশারায় জিজ্ঞেস করল' কি হয়েছে?'
রেখা ইশারায় বোঝালো পরে বলবে।
রেখা আবার জিজ্ঞেস করল 'মিলি আর ওর বাচ্চারা সবাই ঠিক আছে তো?'
মনোজ বলল 'আজ মিলিকে একটা কুকুরে কামড়েছে।'
রেখা বলল' সে কি?কী করে?'
মনোজ বলল 'আমিও জানি না। একবার চিৎকারের আওয়াজ পেয়েছিলাম ,বাইরে বেরিয়ে শুনি দোকানদারা বলছে' মিলিকে কামড়েছে।'
রেখা বলল 'ক্ষ্যাপা কুকুর নাকি?'
মনোজ বলল-'এটাই তো সংশয় আছে। কেউ বলছে পাগলা কুকুর, আবার কেউ বলছে সেরকম কিছু নয়।'
রেখা বলল 'ওর খুব লেগেছে?'
মনোজ বলল হ্যাঁ চোয়ালের দিকে, অনেকটা কেটে গেছে।'
রেখা বলল 'এ বাবা, কি হবে?'
এর মধ্যে টোটো এসে স্টেশনে থামলো। ব্যাগ থেকে কুড়ি টাকার নোট বের করে দিল।
রিম্পাদি বলল' এই তুই দিলি কেন ?আজকে তো আমার দেবার কথা।'
রেখা বলল ' আরে বাবা একজন দিলেই হল।'
রিম্পাদি বলল ' এটা কিন্তু ঠিক করলি না।'
রেখা বলল 'আমার জীবনটাই তো বেঠিক।
গাড়ির এখনো খবর হয় নি না?''
রিম্পাদি বলল 'তাই তো মনে হচ্ছে ।সবাই প্লাটফর্মে ঘোরাঘুরি করছে।'
মনোজ তখনও ফোনটা কাটে নি। রেখা বলল 'হ্যালো'
মনোজ বলল' হ্যাঁ বল শুনতে পাচ্ছি।'
রেখা বলল' মন্টু ডাক্তারকে খবর দিয়েছ?
মনোজ বললে 'হ্যাঁ কথা হয়েছে। উনি আউট অফ স্টেশন।'
রেখা বলল 'তাহলে কি হবে?'
মনোজ বলল 'ফোনে 'কথা হয়েছে?'
রেখা বলল'' কি বললেন উনি চিন্তার কিছু কারণ আছে?'
রেখার চোখ ছল ছল করছে।ব
রিম্পাদি বলছে' কাঁদিস না সব ঠিক হয়ে যাবে।'
মনোজ বলল উনি বললেন যে ভ্যাকসিন দিয়ে রাখলে খুব ভালো হয় ।কারণ বাচ্চারা যেহেতু এখনও মায়ের দুধ খাচ্ছে। তাহলে চিন্তার কোনো কারণ থাকে না।'
রেখা বলল 'আমার মিলিটা কত ভালো মেয়ে ওর দুই দুবার অ্যাক্সিডেন্ট হল আবার এখনও এই রকম। শুধু ওর উপরে কেন এরকম হচ্ছে বলো তো?'
কাঁদতে শুরু করলো এবার রেখা প্ল্যাটফর্মের লোকজন দেখতে লাগলো।
রিম্পাদি বলল' চুপ কর, চুপ কর।
এর মধ্যে ট্রেন ঢুকে গেল।
রিম্পাদি বলল 'চল চল চল ট্রেনে উঠবি।'
রেখা বলল' আমি ট্রেনে উঠে তোমাকে ফোন করছি।'
বাপরে বাপ কৃষ্ণনগর লোকালে যা ভিড় হয়।
রিম্পা দি বললো' এদিক আয় ,এদিক আয়, জায়গা রেখেছি।'
রেখা রিম্পাদির কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। রিম্পাদি নিজে বসে রেখার ব্যাগগুলো নিয়ে বলল ' বস।'
এর মধ্যেই সামনের সিট নিয়ে দুই ভদ্রমহিলা সঙ্গে তুমুল ঝগড়া শুরু হলো। এক ভদ্রমহিলা বলছেন আপনারা ডেইলি প্যাসেঞ্জার করেন বলে সব জায়গা রেখে দেবেন আর আমরা বসতে পারবো না, তা তো হবে না ।আপনাকে এতগুলো জায়গা রাখতে দেবো না।'
রিম্পাদি বলল' দেখলি সোমাদির কান্ডটা প্রতিদিন এরকম করে।'
রেখার মাথায় কিছু ঢুকছে ওর মাথায় শুধু মিলি আর ওর বাচ্চাদের কথাই ঘুরছে।
মহিলা আবার বলছেন আপনি দেখতে পাচ্ছেন না আমার বেবি আছে। আমি শিয়ালদা অব্দি যাব। দাঁড়িয়ে যাবো?'
রিম্পাদি থাকতে না পেরে বলল' সোমাদি একটা জায়গা ছেড়ে দাও না।'
সোমাদি বলল-'এই রিম্পা তুমি এরকম বলবে না তো ?আমি আগে জায়গা রেখেছি, আমি ছাড়বো কেন?'
রিম্পাদি বলল' বাচ্চা নিয়ে আছে না ,ছেড়ে দাও না একটা জায়গা তোমার তো আরো কয়েকটা জায়গা রয়েছে।'
তোড়া ,সহেলি ...ওরা বসবে না?'
রিম্পাদি আর কথা বাড়ালো না ,সোমাদির সঙ্গে পেরে উঠবে না ।
রিম্পাদি শুধু বললো' যা ভালো ,বোঝো করো।'
সোমাদি বলল 'সেটাই তো করছি আগ বাড়িয়ে বার বার তুমি কেন কথা বলতে আসছো?
অন্যযাত্রীরা বলল ' উনি কি খারাপ কথাটা বলেছেন ?দেখছেন তো উনার কোলে বাচ্চা আছে। না কিছুতেই হবে না ।সব একজোট হয়ে বলল 'একটা জায়গা আপনাকে ছাড়তেই হবে।'
কি আর করে বাধ্য হয়ে তখন একটা জায়গা ছাড়তেই হলো।
অন্য যাত্রীরা বলল' আপনি বসুন তো দিদি ওখানে। ভদ্রমহিলা খুব টেটিয়া আছেন। প্রতিদিনই এরকম জায়গা রাখবেন উনি।'
সোমাদি গজ গজ করতে লাগল।
রিম্পাদি রেখাকে ধাক্কা দিয়ে বোঝাতে লাগলো আর মুচকি মুচকি হাসতে লাগল।
রেখা র তখনো চোখে জল।
রেখা আবার ফোন লাগালো মনোজকে।
মনোজের ফোনে রিং হতে লাগলো'আমি তো সুখেই আছি, যখন তুমি জানবে...।'
দুবার রিং হয়ে গেল। ফোন ধরছে না বলে রেখা উদগ্রীব হয়ে উঠল।
রিম্পাদি বলল ' আরে বাবা, দেখ, হয় তো একটু কাজে ব্যস্ত আছে। ঠিক ফোন ধরবে।'
রেখা আবার ফোন করলো'রিং হল 'আমি তো সুখেই আছি..।'
মনোজ হাঁপাতে হাঁপাতে ফোন ধরে বললো 'হ্যাঁ বল ।'
রেখা বলল 'মন্টু দা কী বলেছেন?'
মনোজ বলল' কালকে মন্টুদা আসবেন ভ্যাকসিন দেবেন।'
রেখা বলল 'আর ব্যাথাটা, রক্ত ঝরল সেটার কি হবে?
মনোজ বলল ' আমাদের এখানে ওই স্ট্রিট ডগ কেয়ার করে যারা, আরে আমাদের পাশে থাকে ওর নাম' সন্দেশ 'ওকে বলেছি। ওরা ওদের টিম নিয়ে সন্ধ্যেবেলায় আসবে।'
রেখা বলল 'ও আসবে?'
মনোজ বলল'' হ্যাঁ আসবে ।এসে ওরাও কিছু ট্রিটমেন্ট করে দিয়ে যাবে।''
রেখা বললো 'আমার মিলির জন্য খুব চিন্তা হচ্ছে গো?'
মনোজ বলল 'সে তো হবেই?'আজকে গেটটা খোলা ছিল ওই কুকুরটা নাকি বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেছিল আর মিলি ছিল বাইরে বাচ্চাদের দিকে আসতে দেখে ঘেউ ঘেউ করতে থাকে। তখনই.....।'
রেখা বলল-'কে গেটটা খুলে রাখে কে জানে? যৌথ বাড়ি হলে যা হয়।'
মনোজ বলল 'তা যা বলেছো।'
রেখা বললো 'বাচ্চা গুলো কি করছে?'
মনোজ বলল'বাচ্চাগুলোকে এই তো সাড়ে চারটেতে দুধ রুটি খাওয়ালাম।
মিলির কাছে যাবে বলে ওরা চিৎকার করছে।'
রেখা বলল 'ওদেরকে সামলানো মুশকিল। সারাদিনে মার কাছে যায় নি ছটফট তো করবেই।'
মনোজ বলল 'হ্যাঁ ,কিন্তু এখন ওদেরকে ছাড়া যাবে না মায়ের কাছে।"
রেখা বললো 'ঠিক আছে। আমার মিলিটা কি করছে?'
মনোজ বলল 'এখন ঘুমোচ্ছে'।
ইতিমধ্যেই ট্রেন এসে মদনপুরে থামল।'
রিম্পাদি বলল 'নে আর কথা বলতে হবে না। বাড়ি গিয়ে দেখতে পাবি ।এর পরেই তো কল্যাণী স্টেশন।'
রেখা বললো 'হ্যাঁ গো ,রিম্পাদি কি বলবো তোমায় ,বলো?'
রিম্পাদি বলল' আমাকে কিছু বলতে হবে না। আমি সব বুঝতে পারছি, তোর মনের অবস্থা।'
এরমধ্যেই ট্রেন স্টেশনে থামলো ।রেখা তার আগেই সিট থেকে উঠে গেটের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। ট্রেন থামলে রেখা নামল ট্রেন থেকে। জানলা দিয়ে রিম্পা দিকে হাত নাড়লো ।'
রিম্পাদি বলল 'সাবধানে যাস।'
রেখা বিধানের অটো দেখতে পেয়ে বলল' এই বিধান দাঁড়াও ,দাঁড়াও ,যাব।'
বিধান ব'লল 'ও দিদি তাড়াতাড়ি আসুন বুক হয়ে যাবে।'
হন্তদন্ত হয়ে অটোতে উঠে বসলো। বসার সঙ্গে সঙ্গেই অটো ছেড়ে দিল।
রেখা শুধু ভাবছে' কত তাড়াতাড়ি বাড়িতে পৌঁছাবে বাচ্চাদের দেখবে? মিলিকে দেখবে।'
বিধান বলল' দিদি ,আজকে আপনি খুব চিন্তায় আছেন?হাসি মশকরা করছেন না।সব ঠিক আছে তো?'
রেখা বলল 'এমনি মনটা একটু খারাপ আছে বলে ভালো লাগছে না কথা বলতে ।টায়ার্ড ও আছি তো?'
বিধান বলল 'হ্যাঁ, সে তো ঠিকই ।সারাদিনের ধকল।'
বিধান গেটের কাছে নামিয়ে দিল।
রেখা ভাড়া মিটিয়ে গেটটা খুলল। তারপর কলিং বেলটা বাজাল" জয় গনেশ, জয় গনেশ ,জয় গনেশ দেবা।"
মনোজ দরজা খুললো রেখা তাড়াতাড়ি ঢুকে গিয়ে আগে বাচ্চাদের দেখলো আর বলল আবার মিলি কোথায় আছে?'
মনোজ বলল' মিলিকে এ জায়গায় না রেখে অন্য জায়গায় ওকে শোবার ব্যবস্থা করে দিয়েছি।'
রেখা মিলির কাছে গিয়ে মিলিকে ডাকতেই মিলি ওর যেখানে লেগেছে, সেই জায়গাটা দেখাতে লাগলো ।সত্যিই যে কতটা কাছের ,ভালোবাসার হলে তবে এই উপলব্ধি করা যায় । রেখা অবাক হয়ে গেল । একটা পশু কি করে তার যন্ত্রণার কথা ,সে কিভাবে প্রকাশ করছে।
রেখা মিলির গায়ে হাত বুলাতে লাগল আর বলল' না মা ,তোমার কিচ্ছু হবে না ।তোমার সব কষ্ট চলে যাবে দেখো। মিলির ঐরকম করুণা অবস্থা আর ওর দেখানোর ভঙ্গি দেখে রেখার চোখে জল এসে গেল। রেখা শুধু ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতে লাগল ঈশ্বর যেন কিছু না হয় ওর।ওকে তাড়াতাড়ি সুস্থ করে দিও ।আর যেটা ভয় পাচ্ছি সেটা যেন একদমই না হয়।'
মনোজ রেখার জীবনের পরিপূর্ণতা মিলি আর ওর বাচ্চারা ।তাই মিলিদের কিছু হলে মনোজ রেখা কিছুতেই স্থির থাকতে পারে না আর রেখা তো নয় ই ।রেখার হৃদয়ের শূন্যতা কানায় কানায় পূর্ণ করে দিয়েছে মিলি আর ওর বাচ্চারা। কিছু হলে রেখা র ভেতরটা কুরে কুরে খায়। মিলিতারি সন্তানদের বাঁচাতে আজকে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েছে। একেই বলে মাতৃত্ব।