২৫ মার্চ ২০২২

কবি তাহেরা আফরোজ এর কবিতা "শূন্যপুরে"




শূণ্যপুরে 
তাহেরা আফরোজ

নদীর মতো কুলু কুলু শব্দে বয়ে যায় 
প্রেম নাকি বিষাদ বুঝতে পারি না 
কেবল শূন্যতা টের পাই 
যতদূর দৃষ্টির সীমানা, ততোদূর বিস্তৃত শূণ্যতা।
পূর্ণতা দেবার প্রতিজ্ঞায় অবিচল থাকা যে মানুষ 
সেও শূণ্যপুরে টেনে নেয় আমাকে, 
আমার করতলে ফোঁটা সব পদ্ম 
হাওয়ায় উড়ে যায় 
আমি তাকে ধরতে চাই না 
আমি তাকে ধরতে যাই না।

কবি সুপর্ণা চ‍্যাটার্জ্জীর কবিতা




হঠাৎ ভালোলাগা 
সুপর্ণা চ‍্যাটার্জ্জী



কেমন করে হঠাৎ যেন ভালো লেগে গেল
সবকিছুকে।
ভালো লেগে গেল
দূরের সবুজ ও নীল দিগন্তকে।
ভালো লেগে গেল 
বৈশাখ ও  জৈষ্ঠ‍্যের ঝোড়ো হাওয়া 
আর মেঘলা আকাশকে।
কেন জানিনা 
খুব ইচ্ছে করে হাওয়ার সাথে ছুটে চলি
ক্ষেতের পারের আল ধরে।
কে যেন শুধালো কেমনকরে লাগল ভালো?
বলব নাগো সেই কথাটি,
সে যে আমার গোপন ঘরের আসল চাবি কাঠি।
ঐটুকু মোর সম্বল,
কেউ নিওনা কেড়ে 
যা আছে মোর করনীয় 
করব আমি সবার তরে।

কবি গোলাম কবির এর কবিতা





হাসির রাণীকে নিয়ে কবিতা 

   গোলাম কবির


   ফেসবুকে আমার একজন খুব কাছের
   দিদিমণি আছেন, তিনি প্রায়ই লিখেন - 
  " একদিন হারিয়ে যাবো এই অভিনয়ের
   শহর ছেড়ে! " কথাটা ভীষণ সত্যি!
  কিন্তু কিরকম সাবলীল ভাবে লিখেন 
  কথা গুলো ভাবতে অবাক লাগে! 
  এতো হাসিখুশি মেয়ের এই লিখা পড়ে 
  হৃদয় আদ্র হয় প্রায়শই, অথচ তাকে 
   আমি নাম দিয়েছি " হাসির রাণী "!  
  মাঝেমধ্যে ভাবি কি এমন দুঃখ আছে
  ওর যা সকলের কাছেই লুকিয়ে রাখে
  অথচ কী সুন্দর করে মজার মজার 
  পোস্ট দিতেই থাকে অবিরাম! 
  মানুষের মুখ এখনো পড়তে পারলাম না
  ভালো করে, কেউ কি পারে! 
  একটা মানুষ কী সুন্দর হাসে, সংসার করে, 
  কবিতা লিখে, মানুষকে হাসিয়ে মাতিয়ে 
  রাখে অথচ ঝিনুকের মতো নিজের
  ভিতরের কষ্টকে লুকিয়ে রাখে সযতনে, 
  তখন আমারও বলতে ইচ্ছে করে - 
  সত্যিই সেলুকাস, কি বিচিত্র এই দেশ 
  এবং দেশের মানুষ গুলো!

( কবিতাটি কবি বৈশাখী দাস ঝিলিক দিদিমণি কে উৎসর্গ করলাম)

কবি সেলিম সেখ এর কবিতা




যুদ্ধ নয় শান্তি চাই
 সেলিম সেখ

বইয়ের পাতায় পড়েছি মোরা 
যুদ্ধের সেই কথা,
স্বচক্ষে আজ দেখছে বিশ্ব
যুদ্ধের ওই ভয়াবহতা। 

মাথার ওপর উড়ছে বোমারু
পায়না জনমানব ঠাঁই, 
যুদ্ধের ওই রক্ত খেলায়
তাদের অনেক মজা চাই? 

করতে যুদ্ধ মোকাবেলা
নিয়েছে হাতে অস্ত্র, 
ভুখা পেটে চলছে তারা
পরনে ছিন্ন বস্ত্র।

দেশ বাঁচানোর তাগিদে
বেঁধেছে মাথায় কাফন, 
যদি যায় প্রাণটা চলে
হয় যেন তাতে দাফন।

স্কুল-কলেজ বৈদ্যশালা
করেছে লুটোপুটি ধুলায়, 
নতুন সূর্য দেখবে বলে
মনকে সদা ভোলায়। 

যেথা যাই আঁখি মোর
দেখে শুধু শব, 
মাটিতে শিশু নর-নারী
থামে না মোর ক্ষোভ। 

মানুষ হোক শান্তিপ্রিয়
ফিরুক আবার শান্তি, 
পৃথিবী হোক মানবপ্রেমী
কাটুক সকলের ভ্রান্তি। 

থামুক যুদ্ধ ফিরুক শান্তি
করি মিনতি প্রভু, 
এমন দৃশ্য দু নয়নে
চাইনা দেখতে কভু।

শামীমা আহমেদ এর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৭৬





ধারাবাহিক উপন্যাস 


শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত (পর্ব ৭৬)
শামীমা আহমেদ 

বারান্দায় বসে কাপের চা শেষ করে সিগারেট ফিল্টার এস্ট্রেতে গুজে দিয়ে শিহাব অফিসে যাওয়ার তাড়নায় উঠে দাঁড়ালো। ভেবে নিলো দ্রুত শাওয়ার সেরে বেরিয়ে যেতে হবে। বারান্দায় শুকাতে দেয়া নীল তোয়ালেটি খুঁজতেই দেখা গেলো রিশতিনা টাওয়েল হাতে নিয়ে অপেক্ষা করছে। শিহাব একটু চমকেই গেলো ! তবুও নিজেকে সংযত করে এক হেচকা টানে টাওয়েল নিয়ে বেশ বড় বড় পা ফেলে হেঁটে ওয়াশরুমে ঢুকল। রিশতিনা নির্বিকার দৃষ্টিতে শিহাবের দিকে তাকিয়ে রইল।ভাবলো, এই মানুষটা একসময় তারই ছিলো। সে নিজেও  কতটাই না আপন ছিল তার। দুজন দুজনার জন্য সেকি অনুভুতি আবেগের প্রকাশ ছিল।মনে হতো পৃথিবীর আর সব কিছুই তুচ্ছ।রিশতিনার বিয়ের দিনটির কথা ভীষণভাবে মনে পড়তে লাগলো। সেদিন ছিল অক্টোবর মাসের আঠারো তারিখ।দুজনে সকাল দশটায় শিহাবের এক সিনিয়র ভাই এবং বন্ধু নাঈম ভাইয়ের বাসায় যায়।তখন শিহাবকে  খুবই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত লাগছিল। সেখানে সামান্য নাস্তা সেরে সবাই কিভাবে কি করা যায়বতার আলোচনা চলছিল। রিশতিনার মনে আছে সেদিন সে  নীল শাড়ি পরেছিল আর শিহাব কালো শার্ট আর ক্রীম কালারের প্যান্ট পরেছিল।চোখে সানগ্লাস সেঁটে দুপুরে যখন কাজী অফিসের জন্য বেরুলো রিশতিনা অবাক হয়ে শিহাবের দিকে তাকিয়ে ছিল।রিশতিনা মুগ্ধ হয়ে শুধু শিহাবকেই দেখছিল!  শিহাবের কয়েকজন বন্ধুকে সাক্ষী করে   বিয়ে পড়ানো হয়। যদিও শিহাব এভাবে বিয়েটা করতে চায়নি কিন্তু রিশতিনার প্রবল চাওয়াকে বাস্তবরূপ দিতেই শিহাব রাজি হয়েছিল। রিশতিনা একদিকে যেমন বাবামায়ের প্রচন্ড শাসনে দমবন্ধ করা পরিস্থিতি থেকে বেরুতে চাইছিল আরেকদিকে ছিল ভীষণভাবে শিহাবকে হারানোর ভয়। তাইতো তার এত তাড়া ছিল। বিয়ে সেরে গুটিগুটি পায়ে দুজনে শিহাবদের বাড়িতে প্রবেশ করে।শিহাবের মা ভাবী সবাই তাকে সহজভাবে গ্রহন করলেও তাদের সবার চোখে মুখে ছিল এক চাপা ভীতি আর আতংক ! যে কোন মূহুর্তে রিশতিনার বাবার প্রবেশ ঘটতে পারে,ঘটতে পারে যে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা। ভাবী খুব অল্প সময় পেলেও ওদের বাসর ঘরটি ফুলে ফুলে খুব সুন্দর করে সাজিয়েছিল।সারাটা রাত রজনীগন্ধা আর বেলির ঘ্রাণে দুজনের সে এক মাতোয়ারা রাত কেটেছে ! এরপর রাত গভীরে কিছুটা সময় দুজন বারান্দায় নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থেকে একরাতে যতখানি সুখ শুষে নেয়া যায় তাতে পূর্ণ করেছে আর যখন ভোর ঘনিয়ে আসে রিশতিনা শিহাবের বুকে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ে। 
এসব  ভাবতে গিয়ে রিশতিনার চোখে জল ভরে গেলো। অথচ সে এখন শিহাবের বিছানায় একাকী বসে আছে। কাল রাতে একাকী রাত কাটিয়েছে।আর এজন্য শিহাবের মনে এতটুকু দুঃখবোধ নেই। এভাবেই শিহাব নিজেকে দূরে সরিয়ে নিলো ? রিশতিনার মনের ভেতর একটাই প্রশ্ন, কোথায় হারিয়ে গেলো সেই সুন্দর মায়াবী রাত ? বিবাহিত জীবনের দুইটি মাস যেন চোখের পলকে ফুরিয়ে গেছে ! কেমন করে শিহাব এতখানি বদলে গেলো ? সেতো শিহাবের অপেক্ষায় ছিলো কিন্তু শিহাব কেন তারজন্য অপেক্ষা করলো না।কেন তার জায়গায় অন্য আরেকজনকে মনে ঠাঁই দিলো। হঠাৎ ওয়াশরুম খোলার শব্দে রিশতিনা তাকাতেই শিহাবের দিকে চোখ আটকে গেলো। ভেজা শরীরে শিহাবের গায়ে বিন্দু বিন্দু জলকণা, ধবধবে সাদা শরীরে মনে হচ্ছে মুক্তোদানা বসানো ! নিচের অংশে আকাশনীলা টাওয়েল জড়ানো। রিশতিনার চোখে চোখ পড়তেই শিহাব একটু লজ্জিত হলো।এভাবে বেরিয়ে একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলো।হয়তো সে রিশতিনার কথা ভুলেই গিয়েছিল। রিশতিনা পরিবেশটা স্বাভাবিক করতে বিছানা ছেড়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো। নিচে রাস্তায় গাড়ি চলাচল দেখতে লাগলো। শিহাবকে নিজের স্বাধীনমত তৈরি হতে রিশতিনা দূরত্ব নিলো।যদিও বিয়ের পরের দুটি মাস রিশতিনা শিহাবের বাইরে যেতে হলে শার্ট প্যান্ট ম্যাচিং করে গুছিয়ে দিতো। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ছেলেমেয়েরা একটু এডভান্স এসব ব্যাপারে বেশ স্মার্টই থাকে।
শিহাব নিজের মত তৈরি হয়ে নিলো। এখন বেরুতে হবে।হাতে মোবাইল, বাইকের চাবি, হেলমেট সানগ্লাস নিয়ে ঘরের চাবি হাতে নিতেই রিশতিনার কথা খেয়াল হলো। সে বারান্দার দিকে এগিয়ে গেলো,রিশতিনাকে কোন নামে সম্বোধন না করে বললো, আমি যাচ্ছি।  ঘরের চাবিটা টেবিলে রইল। তুমি যাওয়ার সময়  লক করে চাবিটা কেয়ারটেকার বিল্লালের কাছে রেখে যেও। কথাটা শুনে রিশতিনার বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে গেলো, চোখ জলে ভরে উঠলো। 
তবে কি শিহাব চাইছে না যে সে এখানে আর থাকুক।এখনো কি তাকে ক্ষমা করা যায়না ? 
শিহাব আবার বলে উঠলো, আমি যাচ্ছি।
রিশতিনা এবার পিছনে ফিরলো এবং যারপরনাই অত্যাশ্চর্য হয়ে গেলো।শিহাব আজো সেই বিয়ের দিনের কম্বিনেশনের শার্ট প্যান্ট পরা! কালো শার্ট আর ক্রীম প্যান্ট!
শিহাব পিছনে আর না তাকিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে লিফট কল দিলো। মনে মনে ভেবে নিলো, রাতে শায়লার সাথে ভালোভাবে কথা বলা হয়নি। অফিসে গিয়ে কল দিতে হবে।
দরজা খোলাই রইল।রিশতিনা অচেনা এক শিহাবের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে পাথরের মূর্তির মত দাঁড়িয়ে রইল। 


চলবে...

২৪ মার্চ ২০২২

কবি মহুয়া চক্রবর্তীর কবিতা




পরিচয় 
মহুয়া চক্রবর্তী

আমি কে কিবা আমার পরিচয়
 সারাজীবন ভেবেই মরলাম 
কি আছে আমার বিষয়-আশয়।
এই মানবজমি জ্ঞানের অভাবে 
অজ্ঞানেতেই রয়ে গেল
তিল তিল করে এবার 
যাবার সময় যে ঘনিয়ে এলো।
 
যতই আমি আমার আমিকে 
খুঁজে  মরি শত মানুষের ভিড়ে
ততোই আজ একাকিত্ত এসে
ভিড় করে আমার মনের ঘরে।
    
আমি যেন এক আঁধারের পথে 
হেটে চলেছি বহুকাল ধরে
আজ আর কেউ সঙ্গী নেই আমার হাতদুটো ধরবার।

নিজের অহং ত্যাগ করো একটি বার ভাবো
টাকা-পয়সার রূপের ছটা কিছুইতো স্থায়ী নয়
একদিন এই মানব দেহ মাটিতেই বিলীন হয়।

মানুষ হয়ে এই পৃথিবীতে জন্মেছিলেম আমি
আজ মান আর হুশ ভুলে
আমার আমি'তে মত্ত হয়েছি আমি।

জ্ঞানের প্রদীপ জ্বালো এবার
নিজের মনের মাঝে,
প্রভুর নাম স্মরণ করো
ও মন তুমি সকাল সাঁঝে।
তবেই তুমি হবে পার এই ভবসিন্ধু হতে
এক টুকরো সাদা কাপড় ছাড়া
কিছুই যে যাবেনা তোমার সাথে।

কবি নওশাদ আলম এর কবিতা





দুর্বৃত্তের কবলে জিম্মি
নওশাদ আলম 

দুর্বৃত্তের কবলে জিম্মি স্বাধিকার স্বাধীনতা,
স্বাধীনতা চিপে খাচ্ছে রক্ত ভুলেগিয়ে জাতিপ্রথা।
রুচিটা তাদের কত নিকৃষ্ট ভাবলে আসবে ঘৃণা,
হারামের থালা চেটেপুটে খায় সেই মনুষ্যহীনা।
জনগণ কাঁদে ভাগ্য লুকিয়ে স্বাধীনতা কিনে দামে,
নাভিশ্বাস ছাড়ে দিনমজুররা, শরীর ভেজায় ঘামে।
নির্ঘুম রাতে হতাশায় ডোবে স্বাধীনতা আনে যারা,
তাঁদের স্বপ্ন করছে হত্যা পেলো কোথা' আস্কারা?
মুক্তির রাহে জীবন দিয়েছে অজস্র বীরসেনা,
তাঁদের রক্তে হোলি খেলে যায় সম্মান করে ফেনা।
যেদিকেই দেখি সেদিকেই শুধু দুর্বৃত্তের ছায়া,
অফিস কাছারি জিম্মি করছে দলীয় সব বেহায়া।
খোলা ময়দানে চাঁদা তোলে দেখো দুর্বৃত্তের দলে,
পুলিশের সাথে খাতির জমিয়ে লেনাদেনা তলেতলে।
চার্দিকে ওই সাঙ্গপাঙ্গ জিম্মি করেছে ধরা,
অগ্নি উত্তাপ পড়ছে ভীষণ স্বাধিকার মাঠে খরা।
দুর্বৃত্তের হিংস্র কবলে রবো কতোকাল আর?
নেংটি ইঁদুরে মানচিত্র কেটে করলো যে সাবাড়।
দুর্বৃত্তের মদদ যোগাচ্ছে বড় মগডালে বসে,
নিজের দেশকে ধ্বংস করছে মেলে না অঙ্ক কষে।
সোনালি স্বপ্ন ঝিমিয়ে পড়েছে অন্তিম সূর্যের মত,
খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে সততাকে মেরে নেশার বতলে রত।
অবশানের ঐ পেখম গজাবে কখন বাংলাদেশে?
দুর্বৃত্তের প্রাচীর মাড়িয়ে উড়বো পাখির বেশে।

শামীমা আহমেদ ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৭৫




ধারাবাহিক উপন্যাস 


শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত (পর্ব ৭৫)
শামীমা আহমেদ 

,,খুবই কৌতুহলবশত রিশতিনা শায়লার কলটি রিসিভ করে দ্রুতই বারান্দায় চলে গেলো।যে কোন মূহুর্তে শিহাবের ঘুম ভেঙে যেতে পারে। তখন ব্যাপারটা অন্যরকম হয়ে যেতে পারে। যদিও শায়লাকে নিয়ে শিহাবের কোন রাখঢাক নেই। আর শিহাব বরাবরই এমন। সবকিছুতে তার স্বচ্ছতা থাকে।কিন্তু রিশতিনারও কিছু বলবার আছে । তবে কলটি ধরে রিশতিনা নীরব রইল।ওপ্রান্ত থেকে শায়লার কন্ঠ ভেসে এলো। খুবই আবেগী আদুরে গলায় সে শিহাবকে ডেকে যাচ্ছিল।এ প্রান্ত থেকে কোন সাড়া না পাওয়াতে এরপরের কন্ঠস্বরে বেশ উৎকন্ঠা ঝরে পড়লো। শিহাব ঘুম ভাঙালাম নাকি ? শিহাব তুমি কেমন আছো ? ভালো তো ? কি হয়েছে ?  রাতে ভালো ঘুম হয়েছে তো ? তোমাকে খুব দেখতে মন চাইছে।রাতে ঠিকমত খাবার খেয়েছিলে তো ?
এবার রিশতিনা যেন তার জবাব খুঁজে পেলো। 
বেশ স্পষ্ট কন্ঠেই উত্তর দিলো,হ্যাঁ,রাতে ঠিকমত খেয়েছে। আর আমি নিজ হাতে তাকে বেড়ে খাইয়েছি।
এ প্রান্তে নারী কন্ঠ ! শায়লার কাছে তা যে অত্যাশ্চর্য কিছু ! তাও আবার এত  সাত সকালে ? আবার জানালো,রাতে সে নিজে হাতে খাবার খাইয়েছে।তবে সে কে ? বাসায় কোন অতিথি এসেছে নাকি ? কই,শিহাব রাতেতো কিছু বললো না।শায়লা নিজেকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে জানতে চাইলো, আপনি কে বলছেন ?
রিশতিনা যেন নিজের পরিচয়টা শক্তভাবে দেয়ার একটা সুযোগ খুঁজে পেলো,সে দৃঢ় কন্ঠে বললো, আমি রিশতিনা। শিহাবের স্ত্রী। গতকাল আমি এসেছি। এখনো আছি।এবং বাকী জীবন থাকবো।
কথাগুলোতে শায়লা নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলো না। তার মাথা ঘুরছিল। পায়ের নিচের মাটি সরে যাচ্ছিল। এমনিতেই সে নানান যোগ বিয়োগে একেবারে অসহায় বোধ করছিল। শুধু শিহাবের ভালবাসাকে শক্তি করে মনের দিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছিল।
শায়লা ভেবে নিলো, রিশতিনা তবে রাতেও শিহাবের সাথে ছিল ? তাইকি রাতে শিহাব ক্লান্তির কথা বলে তার সাথে কথা কমিয়ে দিয়েছিল। দ্রুত ফোন রাখতে চাইছিল ?
শায়লা আর কিছুই ভাবতে পারছে না। তবে শিহাবের মুখ থেকে তার সবকিছু শুনতে হবে। হতে পারে অন্য কেউ রিশতিনা সেজে তাকে ধোকা দিচ্ছে।কিন্তু এত সকালে শিহাবের ঘরে একজন নারীর উপস্থিতি !  তবে সেই বা কে ? 
শায়লা রিশতিনাকে সরাসরি প্রশ্ন করলো, শিহাব কোথায় ?  মোবাইলটা ওর হাতে দিন।আমি কথা বললো।
রিশতিনার মনে শিহাবের প্রতি তার অধিকারটা যেন বেশি মাত্রায় ছাপিয়ে গেলো, সে মিথ্যে করে বললো, এইতো শিহাব আমার পাশেই ঘুমিয়ে।কাল আমরা অনেক রাত পর্যন্ত জেগে ছিলাম। তাই শিহাব এখন অঘোরে ঘুমাচ্ছে।
শায়লার বুঝতে আর কিছু বাকী রইল না। তবে সে রিশতিনাকে গ্রহণ করেছে ? তাহলে কেন রাতে তাকে জানালো না। রিশতিনাকে নিয়ে তারতো কোন দ্বিমত নেই। রিশতিনা তার স্ত্রী। যে কোন সময়ই তাদের মান অভিমান ভাঙতে পারে।ভুল বুঝাবুঝির অবসান হতে পারে। তাদের একটা সন্তান আছে।তাই আবার তারা এক হতে পারে। কিন্তু পরক্ষণেই  সময়ের সাথে সাথে শিহাবের প্রতি তার যে বিশ্বাস জন্মেছে,শিহাবের কাছ থেকে যে আশ্বাস মিলেছে, গতরাতেও যে শায়লাকে চলে আসতে বলেছে,তাকে তৃতীয় কারো কথায় কিভাবে অবিশ্বাস করবে ? শিহাবের সাথে তার কথাবলা ভীষণ প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ালো।শিহাবের মুখ জবানীতে সব শুনে শায়লা নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিবে।
বেশ অনেকটা সময় দুই প্রান্তে দুজন পিনপতন নীরবতায় শিহাবের প্রতি দুজনার ভালোবাসার গভীরতা যাচাই করে নিচ্ছিল।
শায়লা কথা বলে উঠল,ঠিক আছে। শিহাব ঘুম থেকে জাগলে আমাকে কল করতে বলবেন। জানাবেন, মায়া কল দিয়েছিল।আর তাতেই সে বুঝে নিবে।
মায়া ? কিন্তু কলেতো আপনার নাম শায়লা দেখতে পেলাম!
হ্যাঁ, সেটাও আমারই নাম।তবে শিহাব আমাকে ভালোবেসে মায়া নামে ডাকে।
আজ যেন রিশতিনার কথার জেদ চেপে বসেছে।সে শায়লাকে কথার পৃষ্ঠে কথা দিয়ে ঘায়েল করতে চাইছে।
সে শায়লাকে স্মরণ করিয়ে দিলো, জানেন তো মায়া জিনিসটা ক্ষণিকের। কিছুদিনই তার রেশ থাকে।আর যাদের মনে খুব দ্রুত মায়া জন্মায় আবার খুব দ্রুতই তাদের সে মায়া কেটে যায়।
শায়লা রিশতিনার কথাগুলো আর নিতে পারছিলো না। শুধু জানালো, ঠিক আছে আপনার বলতে হবে না।আমিই পরে আবার কল করবো।
ফোন কেটে দিয়ে শায়লা কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো! তার মনে হলো, বিশাল জলরাশির উত্তাল সাগরে তার ডিঙ্গি নাওখানি এখুনি ডুবে যাবে! আর সে বাঁচবার আকুতিতে শিহাব, শিহাব বলে চিৎকার করে যাচ্ছে।
ফোনে কথা বলা শেষ করে রিশতিনা খুবই নীরবে পদধাপে ঘরে চলে এলো।নাহ! শিহাব জাগেনি।ঠিক আগের মতই ঘুমাচ্ছে। রিশতিনা কলটি ডিলিট করে মোবাইলটা শিহাবের পাশে সেন্টার টেবিলটায় রেখে দিলো।
রিশতিনা বুঝে নিলো, এভাবেই একটু একটু করে আগাতে হবে।শিহাবের মন থেকে মেয়েটির নাম মুছে ফেলতে হবে। গতরাতে শিহাবের করা অপমানে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও এখন তার সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আনলো।শিহাব যত অপমান আর যতই চলে যাওয়ার কথা বলুক,রিশতিনা তার অধিকার ছাড়বে না। কিছুক্ষন পর রোমেল ভাইয়াকে কল দিয়ে সব আপডেট জানাবে।আর এরপর করণীয় কি তার গাইডলাইন নিবে।
রিশতিনা শিহাবের বেড রুমে চলে এসে ঘুমের ভান করে পড়ে রইল।
বেশ বেলা করেই শিহাবের ঘুম ভাঙল।ঘুম থেকে জেগে নিজেকে সোফায় দেখতে পেয়ে একে একে রাতের সব ঘটনা মনে পড়তে লাগল।বাসায় রিশতিনার উপস্থিতির কথা মনে পড়তেই সে এক ঝটকায় সোফায় উঠে বসলো। টেবিল থেকে মোবাইল নিয়ে অনলাইন হলো। নাহ! ধায়লার কোন কল বা মেসেজ নেই। শিহাব উঠে দাঁড়ালো। এক কাপ চায়ের তেস্টা সেই গতকাল রাত থেকে।
শিহাব বেডরুমের দিকে তাকালো।বিছানা খালি পড়ে আছে। তবে কি রিশতিনা চলে গেছে? শিহাব চিন্তিত হলো।এই সাত সকালে মেয়েটি কোথায় বেরিয়ে গেলো ? বহুদিন দেশের বাইরে থাকা সে কি আর দেশের অবস্থা বুঝবে ? এদেশে যে সিএনজি ওয়ালারাও মেয়েদের উপর সুযোগ নেয়।  শিহাব বেশ চিন্তিত হয়ে উঠে দাঁড়ালো। কোথায় যাবে মেয়েটি?মায়ের সাথেও সম্পর্ক ছিন্ন করে এসেছে। শিহাব মনে মনে  নিজেকে একটু দোষারোপ করলো।কালরাতে রিশতিনাকে বেশ কিছু কড়া কথা শুনিয়েছে। কি জানি আবার কিছু ঘটিয়ে বসে কিনা ? হায়, তাহলেতো সবার আগে সে-ই ফেসে যাবে। শিহাব দ্রুত মেইন দরজায় এগিয়ে গেলো।নাহ! ভেতর থেকে দেয়া ছিটকিনি তেমনি আছে! উফ! শিহাব যেন একটু নিশ্চিন্ত হলো। সে কিচেনের দিকে এগুতে পিছন ঘুরতেই দেখতে পেলো, এক কাপ চা হাতে নিয়ে রিশতিনা দাঁড়িয়ে আছে। শিহাব রিশতিনাকে কাপটি টেবিলে রাখতে বললো।সে নিজে হাতে তা গ্রহন করলো না।রিশতিনার প্রতি তার অবহেলাটা বুঝাতেই যেন শিহাব দূরত্ব রাখছে। শিহাব চায়ের কাপ আর সিগারেটের প্যাকেট,লাইটার নিয়ে বেডরুমের দিকে এগুলো। ভেবে নিলো,গিজারটা অন করে বারান্দায় বসে চা আর ধুম্র পান চলবে। তবে, রিশতিনাকে যতটা এড়িয়ে চলা যায়, তার সে চেষ্টাটাই থাকবে। গিজার সুইচে হাত দিতেই সেটা আগে থেকেই অন হয়ে আছে! শিহাব রিশতিনার দিকে তাকালো।তবে কি কাল রাতে থেকেই অন হয়ে আছে না সকালে রিশতিনা অন করেছে?
রিশতিনা চোখের ভাষায় সেটাই বুঝিয়ে দিতে চাইল।শিহাব বারান্দায় এগিয়ে গেলো।
 শিহাব মোবাইলের গ্যালারিতে থাকা  শায়লার মেরুন রঙের শাড়ি পরা  সেই পড়ন্ত বিকেলে সূর্যের মিষ্টি আভায় উজ্জ্বল  ছবিটির দিকে নিবিষ্ট মনে তাকিয়ে রইল।
 রিশতিনা  কোন কথা না বলে খুবই  নীরবে শিহাবের পিছনে এসে দাঁড়ালো।


চলবে....

২৩ মার্চ ২০২২

কবি সুচিতা সরকার এর কবিতা





অন্বেষণ
সুচিতা সরকার 

লক্ষ্যহীন এলোমেলো রাস্তায়,  
আগেও হেঁটেছি বহুবার।
কখনও চৌরাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে,
দীর্ঘ অপেক্ষা করেছি একটা সূর্যোদয়ের।
কখনও আবার হাতড়েছি অন্ধকার গলির বাঁক, 
কিছু নীল জোনাকিদের খোঁজে।
নিকষ কালো নিশিপথ আলো করতে,
শরীরটাতে আগুন দিয়েছি বার বার। 

না! পারিনি আমি।
আলোর অভিমুখ খুঁজতে ব্যর্থ হয়েছি প্রতিবার।
গাঢ়ত্ব বাড়িয়ে আঁধার ধেয়ে এসেছে আরও কাছে। 

তবুও ছাইয়ের স্তূপে দাঁড়িয়ে আজও স্বপ্ন দেখি,
একটা নীলপদ্ম শুধু আমার হবে।

কবি তাহেরা আফরোজ এর কবিতা




মানুষ 
তাহেরা আফরোজ

মানুষের ভীড়ে গিয়েছি অনেক, মানুষ দেখেছি 
বারবার বিভ্রান্ত হয়েছি, 
কে যে কাছের আর কে যে দূরের 
এই হিসাব অংকের চেয়েও জটিল 
যেমন জটিল জঞ্জাল শহরের বৈদ্যুতিক তার। 

মানুষ ভালো লাগে না 
মানুষের মুখোশ ক্রমান্বয়ে খসে খসে পড়ে চোখের সামনে 
কার দোষ বলো ? 
আমার কি দৃষ্টি বিভ্রম হয়েছে ইদানিং ? 
চোখের তীক্ষ্ণ চাহনিতে যে চুম্বকীয় শক্তি ছিল 
সেও নষ্ট হয়ে গেছে আজকাল 
চোখের আলোয় একটা আলোকিত মুখের মূর্তি গড়েছিলাম 
সেই মূর্তিও গুড়িয়ে গেছে 
অথবা আছাড় দিয়ে গুড়ো করে ফেলেছি। 
একটা আলোকিত মুখের সন্ধানে বিজ্ঞাপন দিব 
একটি আলোকিত মুখের সন্ধানে নেমেছি আবার 
একদম নিখাঁদ গড়া মূর্তির সন্ধানে নেমেছি।

কবি সঞ্জয় কুমার বণিক এর কবিতা




প্রতিক্ষা
সঞ্জয় কুমার বণিক

একটি ব্যাংকের প্রতিক্ষা রিমিটেন্স,আমানত 
একজন ধনাট্যের যে কোন উপায়ে ধন সংগ্রহ
ছিনতাইকারীর  প্রতিক্ষা কি উপায়ে বেকায়দায় ফেলে ধন ছিনতাই।
ঘুষখোরের  ফাইল ঠেকিয়ে অর্থ আদায়-
একজন সার্থপরের চিন্তা কি ভাবে ভাল মানুষকে ফাঁসিয়ে নিজের সার্থ আদায়।
একজন হিংসুটের  চিন্তা নিজের নাককেটে
পরের যাত্রা ভংগ করার
একজন শুভাকাঙ্খীর চিন্তা সমাজকে সু্ন্দর পরিচ্ছন্ন করে গড়ে তোলবার।
একজন অনাহারীর চিন্তা দুমুঠো ভাত যদি কেউ সেদে দেয়।
একটি নির্বোধ প্রানির প্রতিক্ষা রেষ্টুডেন্টের ভিতর থেকে কেউ  ছুড়ে দেবে একটু খাবার অথবা দুএকটা হাড় ।
একজন লেখক বা চিন্তাশীলের প্রতিক্ষা কখন এ বিষয়গুলো মানুষের বিবেক সত্যিকারের মানুষ হতে নাড়া দিবে-
প্রতিক্ষা শুধু আমার নয় সবার।

মমতা রায় চৌধুরীর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৪০




উপন্যাস 

টানাপোড়েন ১৪০
এক নারীর পত্র
মমতা রায় চৌধুরী



১১,৩.২২ রাত্রি ২২.৩৮
রেখার জীবনটা তিতিবিরক্ত হয়ে গেল। ক'দিন ধরে রেখা লিখে উঠতে পারছে না ,বাড়িতে এত চাপ। স্কুলের চাপ তো রয়েছেই। কিন্তু তার মধ্যেও লেখা থেমে থাকে নি । এখন এ কি অবস্থা হল বাড়িতে যদি সব সময় একটা খণ্ডযুদ্ধ চলতে থাকে , সব সময় মনের ভেতরে টানাপোড়েন নিয়ে কি করে পেরে উঠবে? এবার মনে হচ্ছে কয়েক দিনের জন্য ওকে নিজের দেশের বাড়িতে গিয়ে থাকতে হবে। এ কথা ভাবতে ভাবতেই হঠাৎই একটা ফোন আসে।রিং হতে থাকে। ফোনের আর্তনাদে তড়িঘড়ি এসে ফোনটা রিসিভ করে বলল"হ্যালো'।
"কি ম্যাডাম লেখা কতদূর?"
"ও আপনি?'
কেন ভূত দেখার মত দেখলেন?
না ,তা ঠিক নয়।
আর হ্যাঁ 
"বেশ কয়েকদিন আমরা লেখা পাচ্ছিনা?"
রেখা একটু চুপ করে থাকে।
আপনার কি কোন সমস্যা হচ্ছে?
রেখা মনে মনে ভাবে নিজের সমস্যা নিজের কাছে রাখাই ভালো ।চার দেয়ালের বাইরে গেলে সেটা সমস্যা থাকে কোথায়? তাছাড়া তার সমস্যার সমাধান নিজেকেই করতে হবে।
অন্যের কাছ থেকে হয়তো কোনো সমালোচিত হতে হবে, নয়তো সহানুভূতি দৃষ্টিতে দেখবে।
"ম্যাডাম?"
"না ,না ,না কোন সমস্যা নেই।'
Ok
সামনে নারী দিবস ।বিশ্ব নারী দিবসে কিন্তু লেখা দিতেই হবে।কবিতা হোক, গল্প হোক, যাইহোক ওটা কিন্তু আলাদাই পাঠাতে হবে আর এটা যেমন লিখছেন ধারাবাহিক লিখতে থাকুন।
Ok
"ভালো থাকবেন।'
"আপনিও ভালো থাকবেন।'
ফোনটা রাখার পর ভাবতে লাগলো।
নারী দিবস, বিশ্ব নারী দিবস। যেখানে প্রতিনিয়ত ক্ষুন্ন হয় নারীর মর্যাদা। প্রতিনিয়ত বেআব্রু হয়, নারী ।যেখানে প্রতিনিয়ত পণ্যে পরিণত হয়
 নারী । যেখানে পবিত্র শিশু পর্যন্ত ধর্ষিত হয়,যেখানে বঞ্চিত, নিপীড়িত শোষিত, পদদলিত  নারী ।সেখানে বিশ্ব নারী দিবস হাস্যকর মনে হয়। শুধু কি তাই নারীকে বঞ্চিত হতে হয় এখনো শিক্ষা-দীক্ষা থেকে। যেখানে নারী তার আপন সগৌরব অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়? যে নারী গৃহের সৌন্দর্য ও শান্তির চির উৎস কেন সেই নারীর জীবনে নেমে আসে অকালমৃত্যুর অভিশাপ! কেন নারী পরিণত হয় বিকিকিনির সহজ পণ্যে? কেন নির্মম, নিষ্ঠুর কোন সামাজিক প্রথা যুগে যুগে নারী জীবনকেই অশ্রুময়ী করে? কেন নিরুপমা দের আজও চিতা জ্বলছে?নারী যে তিমিরে সেই তিমিরেই।
তাই '"বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর অর্ধেক তার করিয়াছে নারী ,অর্ধেক তার নর।" তবে কেন নারীর এরূপ দশা?
'নারীর আপন ভাগ্য জয় করিবার কেন নাহি দিবে অধিকার' এই বার্তা কবে সত্য হবে?
কিছু নারী তো অবশ্যই শিক্ষার আলোকে এসে
তারা দেখিয়ে দিয়েছে তারা পুরুষের সমকক্ষ তারাও পারে শিক্ষিকা ,ডাক্তার ,নার্স , পুলিশ, ইঞ্জিনিয়ার ইত্যাদি ইত্যাদি নিজ নিজ  ক্ষেত্রে আসীন হতে ।
নিজেকে দিয়ে ভালই বুঝতে পারছি। উচ্চশিক্ষিতা, চাকুরিরতা তার পরেও কিভাবে শ্বশুরবাড়িতে লাঞ্ছিতা, নির্যাতিতা।
 এ নির্যাতন না যায় কাউকে বলা না ,যায় সহ্য করা। অথচ একটি গ্রাম্য অশিক্ষিত নারী ও বোধ হয় এরথেকে অনেক বেটার আছে।
আজ উপন্যাসের একটা পর্বে বিশ্ব নারী দিবসের উপর লেখা লিখব। আজকে একটা পত্র লিখব অভিযোগ পত্র । না ঠিক অভিযোগ পত্র নয় নারীর ভেতরের শক্তি যখন জাগ্রত হয় তখন তার উপলব্ধির স্ফুরণ তাই নিয়ে।

প্রিয়তম,
শুরুতেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি প্রিয়তম বলে তোমাকে সম্মোধন করে ।আসলে আজ একযুগ হলো প্রায় এই নামে তোমাকে সম্বোধন করে আসছি। মানুষ তো অভ্যাসের দাস ।তাই।
আমি আজ তোমার প্রিয়তমা নই। আজ আমি একজন নারী হিসেবে তোমার কাছে কতগুলো প্রশ্ন রাখছি। এতদিন আমি চুপ করেছিলাম দেখি তাতে তোমাদের কোন ভাবান্তর হয় কিনা?
না ,তোমাদের বোধোদয় হবে না ।আসলে তোমাদের বোধবুদ্ধির ঊর্ধ্বে গিয়ে শিকড় চলে গেছে মাটির অনেক অনেক গভীরে । তাই তাকে সমূলে উৎপাটিত না করলে কখনোই নিজের দিকে তোমরা ফিরে তাকাবে না।
তুমি হয়তো ভাববে যে ,আজ আমার কি
 হলো ? আজ তোমাদের বাড়ির ছোট বউ এর একি হাল ! আশ্চর্য হচ্ছো না?মনে হচ্ছে না কথাবার্তাতে কেমন  অসংলগ্নতা। যাই বলো না কেন? আজ কিন্তু আমি একটু অসংলগ্ন ই হয়েছি।এবার ভাবতে বসেছ,আজ সকল গণ্ডি পেরতে কে এমন করে বুকে সাহস জোগালো, তোমাদের পুরুষশাসিত সমাজের বাইরে গিয়ে নিজেকে দেখার?তোমাদের হয়তো তাই মনে হবে যে ,একে যা বলেছি এ তাই করেছে। বিচার করার এত ক্ষমতা তো এবারের ছোট বৌ এর ছিল না মনে হতো যেন বোধবুদ্ধিহীন একটা জড়পদার্থ তাই না? এতোকাল তোমরা যা বলতে
তাই করে এসেছি । মুখে কোনও রা কাটি নি। আপ্রাণ চেষ্টা করেছি তোমাদের মন পাবার ।চেষ্টা করেছি কিন্তু পাইনি । আসলে বোধহয় আমারও ভেতরে একটা রক্ষণশীলতার বীজ বোপিত হয়েছিল। তাই মন কাজ 
করছিল মা-বাবার দেখানো আদর্শে বিশ্বাসী হয়ে শ্বশুরবাড়িতে সবার কথাটাকেই মান্যতা দিয়ে আসার। তাই নিজের পরিশ্রম হলেও কষ্ট হলেও, বুকে পাথর চাপা দিয়ে হাসিমুখে চেষ্টা করেছি  সব কাজ একা হাতে করতে। অবশ্য আমার কাজ দেখে তোমরা উপরে হয়তো প্রশংসা করো নি কিন্তু ভেতরে ভেতরে প্রশংসা করেছ, যার জন্য কাজের মেয়ে টুনিকে ছাড়িয়ে দিয়েছ। তোমরা ভেবেছো আমি বোধহয় এসব কিছুই বুঝতে পারিনি। এতটা বোকা কিন্তু আমি নই। সব বুঝতে পেরেছি কিন্তু আমি কিছু বলিনি ।ওই যে শ্বশুরবাড়িতে পা দেবার আগে মা শিখিয়েছিল জীবনটাতে শুধু এড জাস্ট শুধু অ্যাডজাস্ট করে যাবি। তাহলে দেখবি সব থেকে বেশি ভালো থাকবি  ।তাই করার চেষ্টা করেছি কিন্তু আমি আমার মায়ের উদ্দেশ্যে বলছি তোমরা অ্যাডজাস্ট করতে করতে তোমরা তৃণের থেকেও বেশি নরম হওয়াতে তোমাদেরকে পা দিয়ে দলিয়ে , মাড়িয়ে চলে গেছে সবাই। তাই পারলাম না। শেষ পর্যন্ত পারলাম না । কেন বলো তো ? ছোটবেলায়  আমাদের পূর্ব বাংলা থেকে উদ্বাস্তু এক জেঠিমা এসেছিলেন আমাদের বাড়িতে কাজ করতে। দেশভাগের যন্ত্রণা জেঠিমাকে কুরে কুরে খেত। যে দেশকে আপনার করে ভেবেছিল আর তার নিজের রইল না অঝোরে শুধু চোখের জল ফেলতেন। ও দেশের ঐশ্বর্য ফেলে এসে এদেশে ঝিয়ের কাজ করতে হত।কাজ করতে বলতেন প্রায়ই  'মাইয়া হইয়া জন্মাইছ  ব্যাটাছালের পায়ের তলায় থাকইতে অইবো। যতই চেষ্টা কইরো না ক্যান উপুরে কিন্তুক কুনো দিনই উঠবার পাইরবে না । আবার কখনো কখনো বলতেন 'মাইয়া গো জীবন অইতাছে উদ্বাস্তুর জীবন ,যেহানেই যাউক হেইখানে হগল সময় উদ্বাস্তুর মত জীবন কাটাইতে অয়। মাইয়া মানুষের আবার আসল ঠিকানা কি। হগল সময় কারোর না কারোর অধীনে থাকইতে অয়। 'আসলে বাবা আমাকে খুব ভালোবাসতো ,মাও ভালোবাসতো ।মেয়ে মানুষের এই আদর পরিবারের বাকিরা কেউ মেনে নিতে চাইনি ।সেই আদরেই বোধ হয় আমার ভেতরে একটা স্পষ্ট বাদী মনোভাব গড়ে উঠেছিল। যখন কোন কিছুর প্রতিবাদ করতাম তখন জেঠিমা আবার বলতেন ও 'মাইয়া তুমারে কয়ডা কথা কই। মাইয়া হইয়া এত জেদ রাইহ না। কপালের তাইলে কিন্তু অনেক কষ্ট।'
'ছোটবেলায় তখন শুধু ভাবতাম জেঠিমা কি যে বলে সবারই দুটো হাত দুটো পা । তাহলে সব সময় পুরুষ মানুষ যা বলবে তাই মেনে নিতে হবে এটা আমি কিছুতেই মানতে পারব না। প্রতিবাদ করব। তাই দেখতাম আমার ঠাকুমা যখন মায়ের সাথে দুর্ব্যবহার করতেন মা কিন্তু চুপ করে থাক তো। মাকে কতদিন চোখের জল ফেলতে দেখেছি। যখন ঠাকুমাকে মায়ের পক্ষ নিয়ে কোনো কথা বলতাম ঠাকুরমা বলতো 
'এই মাইয়া ঘর করতি পাইরবো না। প্রতিদিনই শ্বশুর বাড়ি থেইকে লোক আইসবো। মাইয়ারে শিক্ষা-দীক্ষা 
দাও । এর তো লাজ-লজ্জা কিছুই নাই। পোলা মানুষের মত সারাদিনে টো টো টো কইরা ঘুইরা বেড়ায়।ঘরের কিছু কাজকর্ম শিখাইতে তো পাইরো?'
 মা কিন্তু চুপ করে থাকতো। মা পরে ভেতরে গিয়ে আমাকে আদর করে বলতো' এসব কথা বলিস না ঝাঁসির রানী' আর কাছে টেনে খুব আদর করত।'
আজ তাই সেই ছোট্টবেলার শক্তিটাকে আবার কাজে লাগাচ্ছি।
দেখলাম আমার ভেতরে যে  শক্তি আছে যার দ্বারা আমিও  প্রতিহত করতে
 পারি ।তাই আজ বাকশক্তির সাহায্যে সেটাকে লেখনি হিসেবে ব্যবহার করলাম আজ তাই প্রতিবাদ করছি।
এর ফল কি হবে আমি জানি।আর আমার ও বাড়ীতে ঢোকা হবে না । আজ যেন সেই জেঠিমার কথাটাই সত্যি হলো "মেয়ে মানুষের জীবন উদ্বাস্তুর মতোই।"আমি জানি আজকের পর থেকে আর তোমাদের বাড়িতে আমার জায়গা হবে না।আমি আমার নিজের আইডেনটিটি  তৈরি করে নিয়েছি । তুমি  খুব অবাক হচ্ছো না? বাবা, আমি এত কথা গুছিয়ে লিখতে পারলাম?আমি জানি তুমি মনে মনে হাসবে। পরে বলি একটা প্রশ্ন তোমার মনে জেগেছে তো ,সেই আইডেন্টিটি  কি? প্রথমে বলি আমি একজন নারী। নারীর ভেতর রয়েছে সেই শক্তি, দেবী দুর্গার রূপ। অসুর দলনী দেবী দুর্গা। নারীর একদিকে রয়েছে অসাধারণ ধৈর্য শক্তি কিন্তু ধৈর্যের অনেক পরীক্ষা দিলাম এই সংসারে,মন তোমাদের জুগিয়ে উঠতে পারলাম না ।আর সম্ভব নয়। তাই আমি এবার 
নিজেকে আবিস্কার করার নেশায় মেতেছি।
' জানো ,তুমি তো জানো আমি আগাগোড়াই নিরীহ অবলা জীবগুলোর প্রতি একটু ভালোবাসা সহানুভূতি দেখাই। এবার ওদেরকে নিয়ে কাজ করব ।তোমরা যে এত কিছু করেছ আমার সাথে তার পরেও বেঁচে থাকার তাগিদ পেয়েছি কোথা থেকে জানতে চাও ?ওই ছোট্ট ছোট্ট স্ট্রীট ডগ  ওদেরকে ভালোবেসে ।এখন দেখলাম মানব জীবন তো একটাই বার বার  পাব না এই জীবন।হয়তো অন্য রূপে আসব। এই জীবনে তুচ্ছাতিতুচ্ছ সাংসারিক কাজ কর্মে নিজেকে নিয়োজিত করে নাই বা ছোট করলাম। এবার আমি সেবার ব্রতে নিজেকে উৎসর্গ 
করলাম ।জানো ,কারা আমার দিকে হাতটা বাড়িয়েছে? এইরকম অনেক অনেক অসহায় নারীরা একত্রিত হয়েছে এই 'নারী শক্তিতে।' কবি শঙ্খ ঘোষের কবিতা টা মনে পরে তোমার
' আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি'। আমরা এখন 'আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি' কেমন অবাক লাগছে না ?এ বাবা এ বাড়ির ছোট বউ । আজ মুখ খুলেছে ভাবছো। জানি বড় পিসিমা গুটিকয়েক গালমন্দ দিচ্ছে আর আমার শাশুড়ি মা হেসে মিছরির ছুরি শানিয়ে তোমাদের বাড়ির ছোট বউ এর বুকে বসাচ্ছেন।
আর কি কথাই না তোমাকে শোনাচ্ছেন
 বলো ?'বলেছিলাম এ রকম মেয়েকে বিয়ে করিস না '।
যদিও পাত্রী তোমাদের অভিভাবকরাই দেখতে গিয়েছিলেন সঙ্গে তুমি গিয়েছিলে ।এক দেখাতেই তোমার পছন্দ হয়ে গেছিলো। সেদিন যে তুমি আমার ভিতরে কি দেখেছিলে  কে জানে! তুমি আজকে ভাবছো তো কি শান্ত ভাবলেশহীন একখানা মুখ আজকে তার ভেতরে প্রতিবাদী সত্তা আমিও না খুব অবাক হচ্ছি ।তবে আমি তোমাকে কোনো দোষারোপ করছি না ।আমি জানি তুমি মায়ের ন্যাওটা  ।যতই তুমি তোমার স্ত্রীকে ভালোবাসার চেষ্টা ক'রো না কেন মায়ের কথার উপরে তুমি উঠতে পারবে ?না, না ,না  আমি কিন্তু একবারও বলছিনা তুমি মায়ের অবাধ্য হও কিন্তু সব থেকে খারাপ লাগে কি জানো? আসলে একটা মেয়ে সে তো তার সর্বস্ব ছেড়ে একটা নতুন পরিবারে আসে। সবাই কে  মানিয়ে নেবার চেষ্টা করে তার সঙ্গে যদি পরিবারের অন্য সবাই যাই করুক না কেন অর্থাৎখারাপ ব্যবহার করুক কিন্তু স্বামী যদি তার সঙ্গ দেয় তাহলে কিন্তু এত কষ্ট লাগে না। না আমার কোন কষ্ট নেই। আমি জানি তুমি চেষ্টা করলে হয়তো প্রতিবাদ করতে পারতে কিন্তু তুমি চেষ্টাই করোনি। শুধু কষ্ট হয় কোথায় জানো ?তোমার জন্য ।আমি তোমাকে ভালবেসেছিলাম । তুমি আমাকে ভালোবেসেছো হয়তো?কিন্তু তুমি বেঁধে রাখতে পারলে না। এজন্য আমার খুব কষ্ট হয় ।আমিও পারলাম না 
জানো ?চিরদিন নিজের নারী সত্তার অবমাননা আমি আর দেখতে পারলাম না । প্রতিনিয়ত কি শুনেছি তোমাদের বাড়িতে বলতো '
বাচ্চা না হওয়ার যন্ত্রনা  ,বাজা মেয়ে ছেলে  ।কিন্তু সত্যি করে বলো তো সত্যি কি আমার কোন দোষ ছিল তাতে ?ওই ব্যাপারটা নিয়ে আমি আর নাড়াচাড়া করতে চাই না। আমি বাজা মেয়ে মানুষ হয়েও কিন্তু কতগুলো অবলা জীব এর মা হয়েছিলাম ।বাড়ির সামনে দেখো নি আমার সন্তানদের?কি সুন্দর আর ওদের কাছে আমি মা হয়ে গেলাম।ওদের  ভালোবাসা মায়ের প্রতি সন্তানের বিশ্বাস ভালোবাসা উজাড় করে দিত ওরা। তোমাদের বাড়িতে ছিলাম আমি এই তৃপ্তি নিয়ে। তাই না পাওয়ার বেদনা আর আমাকে কুরে কুরে খেতো না। যদিও এর জন্য লড়াই করে নিতে হয়েছে ।আজকে যদিও বা আমি থাকতে 
পারতাম ।পারলাম না ।কেন বলতো? সত্যি কথাটা তোমাকে জানাচ্ছি 'তিন্নিকে যেদিন তোমরা মেরে ছিলে।সেদিন তোমাদের ক্ষমা করতে পারিনি।
তোমাকে চিঠি লিখতে গিয়ে আমার বুকের ভেতরটা বারে বারে দুমড়ে-মুচড়ে গিয়েছিল।
 তার থেকেও সাংঘাতিক অন্ধকার বিষণ্ণতার দিন ছিল সেদিন ,যেদিন তোমরা আবারো তিন্নিকে মারলে  আমার উপর রাগ করে।  আমি ওদেরকে আদর করে খাবার খাওয়াতে গেছি কিন্তু সে তোমরা খেতে পর্যন্ত দিতে দিলে না। অমানুসিক কাজটা করেছিলে। সেদিন আমি কিছুই করতে পারলাম না। যদি কিছু করার ক্ষমতা না থাকে তোমাদের বাড়িতে থেকে কি লাভ বল তো ?তাই চলে এলাম। হ্যাঁ ,জানি অনেক রাগ অভিমান তোমাদের থাকবে। যাই থাকুক সেটুকুই আমার জন্য প্রাপ্য ।সেটা মাথায় তুলে নিলাম। তবে তুমি বলেছিলে একদিন ক্যান্ডেল ডিনার করাবে সেখানে শুধু তুমি আর আমি আর ক্যান্ডেল দুজন দুজনার দিকে ওই রকম একটা মায়াবী পরিবেশে তাকিয়ে থাকব পরস্পর পরস্পরকে আপন করে নেবো ,সে অতৃপ্তি আমার থেকে গেল। সে থাক কত আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণ থেকে যায় ।সে নিয়ে আর আফসোস করি না।

আজ আমি নারী এই প্রথম যেন অনুভব করলাম।তাই আমার ভেতরে রয়েছে সেই 
শক্তি । মাতৃশক্তির জয়জয়কার হোক। আমি তার অংশীদার  ।তাই আজ নিজেকে প্রমাণ করার জন্যই বেরিয়ে পড়লাম, পারলে আমাকে ক্ষমা কোরো ।ভালো থেকো ।
তবে অবশ্যই আমি তোমাকে  বলব আমার জন্য যদি তোমার কোথাও একটু সফট কর্নার থেকে থাকে, আমাকে ভুলে গিয়ে তুমি নতুন করে জীবন শুরু ক'রো ।আমি তো বারবার তোমাদের বাড়িতে এটাই শুনে এসেছি আমি আসার পর থেকে নাকি তোমাদের সংসারের সব থেকে বেশি অশান্তি শুরু হয়েছে। অশান্তি যদি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। তাহলে তো শুধু শান্তি আর শান্তি। তোমার ওই হাসি মুখটা দেখতে চাই আর তোমাদের সংসারে যারা তোমার শুভাকাঙ্ক্ষী প্রত্যেকের মুখে হাসি টুকু থাক। 
ওই দেখো শুধু নিজের কথাই বলে যাচ্ছি তোমার কথা কিছু বলবো মাথা থেকেই চলে যাচ্ছে।
শোনো ,তোমার মাঝে মাঝে গ্যাসের প্রবলেম হয় তুমি কিন্তু ঠিক সময়ে খাওয়া-দাওয়া টা করো আর পারলে জলের পরিমাণটা একটু বেশি খেয়ো।
আরেকটা কথা তোমার দিদি বারবার বলত না তোমার দিদির দুঃসম্পর্কের কি রকম ননদ হয় সে নাকি খুব ভাল মেয়ে। এখনো তোমার জন্য ওয়েট করছে। এবার তুমি তাকে গ্রহণ করে ধন্য হও।
শোনো ,তোমার রাত্রিতে অন্ধকারে ভয় লাগে আমি জানি। তাই ব্যালকনির আলোটা জ্বেলে রেখো আর মাঝে মাঝে উঠে তোমার জল খাওয়ার অভ্যাস আছে ।জলের বোতলটা কাছে রেখো।
চিন্তা নেই আইনগতভাবেই তোমাকে ছাড়পত্র দেব। কাগজপত্র রেডি করে আমাকে পাঠিয়ে দিও আমার ঠিকানা তোমাকে আমি দিয়ে দেবো।
এটাই বেশ ভাল হল ।তোমার পক্ষে ও 
ভালো ।আমার পক্ষেও ভালো ।তোমার পরিবারের পক্ষে ও ভালো ।তবে আমার পরিবারের পক্ষে ভাল কিনা জানিনা ।আমার পরিবার বলতে আর কে আছে বল তো ?মা, বাবা সে তো কবেই তারা পর করে দিয়ে চলে গেছে না ফেরার দেশে। মামা মামি তারা তো বরং খুশী হবে ।এত কথা তো তাদের আর শুনতে হবে না ,আর তাছাড়া তাদের আপদ বিদায় হয়েছে। কি ভালো নাম 
না ?তোমাদের বাড়িতে ,মামার বাড়িতে ও আপদ। আজ আর এ সব আমার মনে দাগ কাটে 
না ।জানো ,আগে খুব কষ্ট পেতাম ।কত চোখের জল ফেলেছি। সারারাত হয়তো ঘুমোতে পারিনি কিন্তু তুমি কিন্তু দিব্যি নাক ডেকে ঘুমিয়ে আছো একবারও খোঁজ নাওনি।
আজ আমি মুক্ত ।মুক্তবিহঙ্গ নীল আকাশে ওড়ার পালা। তাই নিজেকে উৎসর্গ করলাম 'নারী শক্তি দুর্গা' তে। ওদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে এরকম অসহায় বিপন্ন নারীদের নিয়ে কাজ করা এবং তাদের 
সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে দিলাম ওদের মত এরকম একটি ভাল কাজের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে নিজেকে খুবই ধন্য মনে হচ্ছে। অন্তত কারোর জন্য তো কিছু করতে পারব? জানি এই নিয়ে তোমাদের বাড়িতে বিদ্রূপের ঝড় উঠবে। সে উঠুক একটা জিনিস তো থাকতেই হবে। তোমাদের মধ্যে না হয় আমি বিদ্রূপ সমালোচনা ঘৃণার পাত্র হয়ে চিরজীবী হয়ে থাকলাম।আর একটা কথা ,যদি কখনো তিন্নি ফিরে আসে। ওকে আর আঘাত ক'রো না। আমি তো তোমাদের বাড়ি ছেড়ে দিচ্ছি
পারলে ওকে আমার নাম করে একটু খেতে দিও।
তবে এইটুকু আমার দাবি যদি মান্যতা দাও,
 দেবে ।না দিলে আর কি করবো? তবে জেঠিমা আমিও উদ্বাস্তু জীবন কাটিয়ে উঠব। এতদিন গলিপথে ঘোরাফেরা করেছি এবার সঠিক রাস্তায় চলবো।
আবার বলি ভালো থেকো, নতুন ভোর কুয়াশার চাদর সরিয়ে তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। সোনালী রোদ্দুর,স্বর্ণালী সন্ধ্যা বার বার ফিরে আসুক তোমার জীবনে। শুরু হোক নতুন জীবন।

ইতি 
তোমার 
কোন এক সময়ের পরিচিতা
৮.৩.২২

কবি সুব্রত চক্রবর্ত্তীর কবিতা




এক মুঠো শান্ত রোদ
সুব্রত চক্রবর্ত্তী

সাত সমুদ্র যদি ডুবে যায় 
অনন্ত শূন্যের গর্ভে --
নিঃসীমে যদি মিলায়ে যায় 
নগর, প্রান্তর, গিরি ;
নিঃশ্বাসের সকল বায়ু
যদি শুষে নেয় ক্রুদ্ধ সূর্যতাপ।
সীমাহীন মহাকাশে সীমাহীন সকল রাত্রি শেষে  একবার দাঁড়াও এসে পৃথিবীর প্রান্তদেশে।

একবার আকাশটাকে দেখো ,
একবার আরশিতে দেখো নিজের হৃদয়
 ভেসে ওঠে কারো মুখ ?
যুদ্ধ চাও ? ধ্বংস চাও যে ধ্বংস তোমার আমার ?

রণোন্মাদ  যুদ্ধবাজের দল ---
তোমাদের আকাশেও তো চাঁদ ওঠে ,
মাটির সবুজে খায় চুমো।
তোমাদের বাগানেও তো ফুল ফোটে। 
শুনেছ কি ঝরা ফুলের পাঁপড়িদের আর্তনাদ ?

চেয়ে দেখো একবার.... 
তোমার সন্তানদের মুখের দিকে !
চেয়ে দেখো --- ওরাও তো 
বাঁচার ঠিকানা খুঁজতে চায় ।
বারুদের ধোঁয়া মেঘ ফুঁড়ে  উড়তে চায়।
ধরতে চায়... 
একমুঠো আলোর আকাশ।
একমুঠো শান্ত রোদ।