১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২

কবি জাফর রেজা'র কবিতা




তার গল্পে আমি....
জাফর রেজা 

মন যে কখন কার দরজায় কড়া নাড়ে
কে জানে, 
কতদিন কতরাত হেঁটেছি দু'জন পাশাপাশি, 
আঙ্গিনা জুড়ে জ্যোৎস্নায় স্নান করেছি  বহুবার,
কোনো এক অশুভ রাতে আঙ্গিনার দখল 
নেয় অন্য কেউ,
আমাকে অন্ধ করে 
সে স্বপ্ন খোঁজে অন্য চোখে;
আজ তার গল্পে আমি নেই, 
রাখেনা আমার খবর
হৃদয় খুঁড়ে আমার গল্প দিয়েছে কবর।

কবি রুকসানা রহমান এর কবিতা




রদ্দুরে ভেসে যাবো
রুকসানা রহমান

এভাবে কাছে এসোনা,ওষ্ঠে তিল পড়াতে
তারচেয়ে দেখো আমি দুর থেকে ছুঁয়ে দিতেই
তুমি  হয়ে গেলে, আমার। 

এভাবে কাছে এসোনা, 
আমি আকাশে খুঁজছি একফালি সূর্যঠান
আমি মেঘ হয়ে রদ্দুরে ভেসে যাবো।

এভাবে এসোনা 
নাগরিক পদ্মের মতন  জ্যোৎস্না ভাঙ্গা চাঁদের হাঁটে।
এখানে এখনো কান্নারা গুমরে ওঠে।

আমি এক  বিস্ময়,কেবল তোমারই  বুকের গভীরের কাব্য
তাইতো ভুলে যাই,ব্লাক রোড অরণ্য বিষাদ যাতনা।

তুমি আসবে এক নারীর কাছে, বয়ে যাবে সূর্যের মতন
কখনো আমার আকাশের ঝিলমিলি উন্ষতার নায়ের প্লাবণের রদ্দুর। 

তুমি দ্বিধা, আমি দ্বন্দ্ব , কখনো দূর্বার, তুমি দুরন্ত বাতাস 
আমি  ঝর্ণা , তুমি চন্ঝল জলতরঙ্গের
 স্নানে মগ্ন পথিক। 

এভাবেই কাছে আসবে ঋতুর বৈভবে প্রতিটি শিহরনে  
অমৃতা  তিয়াসীর রোদসীর ঘাটে।

মনি জামান এর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৮




সেদিন গোধূলি সন্ধ্যা ছিলো
( ৮ম পর্ব
মনি জামান 

সৃষ্টি কর্তা যেন আসমার সব চাওয়া গুলো পূর্ণ করে দিয়েছেন,জিকু অফিস থেকে এসে আসমার সব কাজে সাহায্যে করে রান্না থেকে শুরু করে কাপড় ধোয়া পর্যান্ত।কারণ জিকু চাই আসমার যেন কোন রকম কষ্ট না হয়,আসমা আর জিকু দুজনে পরস্পরকে এতোটাই ভালবাসে যে না দেখলে কেউ বুঝতেও পারবে না ভালবাসা কি।
জিকু আর আসমা দুজনে সংসারটাকে স্বর্গে রূপান্তরিত করতে শুরু করলো,দুই বছর এভাবে চলে গেলো বুঝতে পারলো না দুজনের কেউ। আস্তে আস্তে আসমা টের পেলো সে মা হতে যাচ্ছে,আসমার কিছু উপসর্গ দেখা দিয়েছে আজ বমি বমি ভাব আসছে কিছু খেতে পারছে না আর খেতে গেলে এমন হচ্ছে।
জিকু যখন প্রথম জানতে পারে আসমার পেটে তার সন্তানের অস্থিত্ব সেদিন জিকুর আনন্দ আর ধরে না,যখন আসমার পেটের সন্তানের বয়স সাত মাস হলো জিকু তখন আসমাকে নিয়ে কুমিল্লা হাসপাতালে আল্ট্রাসোনো গ্রাম করতে নিয়ে গেলো, ডাক্তার পরিক্ষা করে জিকুকে বলল, আসমার পেটে ছেলে সন্তান এবং সন্তান খুব ভালো আছে।
জিকু এই সংবাদ শুনা মাত্র দৌড়ে মিষ্টির দোকানে গিয়ে মিষ্টি কিনে নিয়ে হাসপাতালে ফিরে এসে ডাক্তার ও নার্সদের মিষ্টি খাওয়াল,ডাক্তার নার্স সবাই খুশি তারা বুঝতে পারলো নতুন দম্পতি নতুন বাবা মা হতে যাচ্ছে।
মিষ্টি খাওয়ানো শেষ করে জিকু আসমাকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরে এলো,আর আসমার জন্য হরেক রকম ফল কিনে এনে ফ্রিজ ভরে ফেললো,আসমা জিকুর এমন পাগলামীতে মাঝে মাঝে রাগ করতো,জিকু বলতো আসমা তোমার জন্য আর আমার সন্তানের জন্য সব করছি তুমি কেন রাগ করছো তুমি ভাল থাকলে আমার সন্তানও ভালো থাকবে।
তাই তোমাকে প্রতিদিন পুষ্টিকর এসব ফল খেতে হবে ইচ্ছে না করলেও বুঝতে পেরেছ,আসমা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিয়ে বললো তুমি এত ভালো কেন,আসমার চোখে আবেগ ভর করলো তার চোখে পানি এলো এটা ভেবে যে,জিকু আসমার জন্য বাড়ি ঘর ছেড়েছে ভালবাসার টানে।
আর জিকু এমন কিছু নেই যা আসমার জন্য করছেনা,রান্না করা ঘরদোর গুছানো আসমাকে খাওয়ানো গোসল দেওয়া সব সব কাজ,আসমা অবাক হয় জিকু পুরুষ ছেলে সে সব কাজ এমন ভাবে করছে দেখলে মনে হয় কোন মেয়ে এই মাত্র সব কাজ করে দিয়ে গেলো।
এভাবে জিকু আসমাকে প্রতিদিন অফিস যাওয়ার আগে সব কাজ গুলো করে আসমাকে সাহায্যে করতে থাকে,অবশেষে আসমার বাচ্চা ডেলিভারির সময় এলো।
আসমার মনটা খুব খারাপ আজ,জিকু আসমাকে জড়িয়ে ধরে আদর করলো আর বলল,পাগলি ভয় পাচ্ছো কেন কোন ভয় নেই আমাদের সাথে আল্লা আছে! আমি আছি কিছুই হবেনা তোমার!জিকু আসমাকে সাথে নিয়ে কুমিল্লা হাসপাতালে এনে ভর্তি করে দিয়ে জিকুর এক বন্ধুর স্ত্রীকে আসমার কাছে রেখে দিয়ে জিকু অপেক্ষা করছে,নার্সরা আসমাকে ডেলিভারি রূমে নিয়ে গেল এক ঘন্টা পর নরমাল ডেলিভারি হলো,ডাক্তার এসে জিকুকে জানালো মা ছেলে দুজনেই সুস্থ্য আছে,জিকু আনন্দে আত্মাহারা হয়ে গেল তার আসমা ভাল আছে সাথে ছেলেও।
আজ জিকু পিতা হয়েছে এ এক অন্য রকম অনুভূতি অন্য রকম ভালো লাগা অন্য রকম গর্ব,আল্লার প্রতি শুকরিয়া জানিয়ে আসমার রূমে গিয়ে আসমা ও ছেলেকে দেখলো আসমা জেগে আছে ক্লান্ত আর পাশে ছেলেটা হাত পা নাড়ছে,জিকু আসমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে আসমার নিমিষেই সব ক্লান্ত মনে হলো দুর হয়ে গেছে,জিকু জীবনে প্রথম সন্তান স্পর্শ করলো এবং ছেলের কপালে চুম্বন করলো জিকুর মনে হল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ সাত রাজার ধন মানিক আজ তার স্ত্রীর কোল জুড়ে আলো ছড়াচ্ছে আজ সে গর্বিত একজন পিতা।
জিকু আসমার পাশে বসে আসমা জানতে চাইলো জিকুর কাছে সে খুশি কিনা,জিকু আসমা কে বলল,আমার জীবনে এত খুশির দিন আর আসেনি আসমা।
শুনে আসমার চোখে পানি এসে গেছে আনন্দে,জিকু আসমার চোখের জল মুছে বলল,পাগলি কাঁদছো কেন,আসমা আজ আবেগে কাঁদছে আজ সে নারীত্ব পেয়েছে,
আজ সে একজন গর্বিত মা হয়েছে তার ভালোবাসার মানুষটিকে তার চাওয়াটা পূর্ণ করতে পেরেছে এটা যে কত আনন্দের সেটা কেউ বুঝুক বা না বুঝক আসমা অনুভব করছে।
জিকু নকিছুক্ষণ ছেলের পাশে বসে ছেলেকে অনেক্ষণ দেখে একটু চুমু দিয়ে বন্ধুর বউকে বলল,ভাবী আর কিছু প্রয়োজন হলে বলেন,ভাবী বলল,দরকার হলে বলবো আর সব প্রয়োজনীয় জিনিষ পত্র সব আছে ভাই।
জিকু ভাবীকে বলল,ভাবী আমি অফিসে যাচ্ছি আপনি আসমার পাশে সবসময় থেকে কখন কি লাগে একটু দেখবেন,আমি আজ অফিস থেকে ছুটি নেবো কাল থেকে আমিও থাকতে পারবো।বলে জিকু ডাক্তাদের সাথে কথা বলে আসমাকে বলল,আমি আসি লক্ষী আমি অফিস থেকে ছুটি নিয়ে বিকালেই ফিরে আসবো।


চলবে...

কবি মাসুদ করিম এর কবিতা




মানুষ হবো কবে
মাসুদ করিম

দড়িতে টান দিলে গলায় 
পড়ে ফাঁস
মুরগি যদি চায়গো হতে 
পারেনা হতে হাস, 
এই জগতে সবি আছে 
মিথ্যার কিছু নাই
আজব জগত আজব মানুষ 
বিশ্বাসের কেও নাই।
ধনে মানে সবাই বড় 
ছোট কেও নাই
আসল বড় বলো তোমরা 
কোথায় গেলে পাই,
নিজকে ভাবি সবার সেরা 
নয়তো আসলে তাই
উপর ওয়ালা দেখে বলেন ভয় 
কি তোদের নাই।
কত আসলে কত গেলো 
জগত সংসারে
কেও কি আর চিরদিন এথায়
থাকতে কি পারে,
জগত টা যে দুই দিনের ই 
ভাবতে যদি পারতাম
খোদার ভয়ে সবাই আমরা
মানুষ যে হতাম।

মমতা রায় চৌধুরীর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১০৪




উপন্যাস 

টানাপোড়েন ১০৪

খোলা জানালায় দখিনা বাতাস

মমতা রায় চৌধুরী


স্কুলে আজকের দিনটা রেখার খুব বাজে কাটলো কি একটা অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি
 করেছিল অনিন্দিতা। ভাবতে লজ্জা লাগছে কিছু টিচার আবার ওকে সাপোর্ট করছেন। 
এভাবে যদি দিনের পর দিন এই ধরনের পরিবেশ সৃষ্টি হয় ,তাহলে স্কুলে কাজ করো খুব কষ্টদায়ক হয়ে যাবে ।মেন্টাল পিস না থাকলে ছাত্রীদের কি সেভাবে কিছু দেওয়া যাবে?
সারা ট্রেনে আসতে আসতে সব ভাবনা মনের ভেতরে মোচড় দিয়ে উঠছিল। ভাবছে আগামীকাল স্কুলে যাবে না। জানলার দিকে মুখ দিয়ে বসে থাকারও  উপায় নেই ,শীতকাল হাওয়া দিচ্ছে ,বাধ্য হয়ে জানালাটা বন্ধ করে দিতে হয়েছে। লেখাটা নিয়েও মাথার ভেতরে নানা কাহিনী চরিত্র ঘুরপাক খাচ্ছে ।কাজেই এই সময় মনটা যদি অস্থিরতায় পরিপূর্ণ থাকে ।লেখাটা ঠিকঠাক আসবে না কিন্তু লিখতে তো হবেই। হঠাৎই ভাবনায় ছেদ টানে '
 রেখা ,এই রেখা, ধ্বনিতে।'
রেখা উৎসুক দৃষ্টিতে এদিক ওদিক তাকাতে থাকে।
অবশেষে দৃষ্টি বিনিময় হলো সামনের দিকের দাঁড়িয়ে থাকা এক যাত্রীর সঙ্গে এতটাই ভিড় হয়েছে যে দাঁড়াতে পারছেন না ,তবুও মুখে কত মিষ্টি হাসি।
রেখা হা করে তাকিয়ে আছে।
 যাত্রী বলছেন' আমাকে চিনতে পারছিস না?'
আমি রুপসার জেঠতুতো দিদি বাণী।
রেখা এভাবে ট্রেনে বাণীদিকে দেখতে পাবে এই ভেবে এতটাই আশ্চর্য হয়েছে ।তারপর ' বানীদি একদম উঠে দাঁড়িয়ে উচ্ছ্বসিত ভাবে বলল রেখা ।
তুমি এদিকে এসো ,আমার সিটে বসবে এসো।'

বাণী বলল' তুই কোথায় গেছিলি স্কুলে?'
রেখা বলল 'হ্যাঁ গো। বাড়ি ফিরছি। তুমি হঠাৎ এদিকে কোথায় গিয়েছিলে?'
বাণী বলল 'আর বলিস না তেহটটো পিসি শাশুড়ির বাড়ি ।পিসিমা নাকি অসুস্থ খুব ।ডেকে পাঠিয়েছিলেন। তাই দেখা করতে 
গেছিলাম ।ফিরছি।'
রেখা বললো 'ফিরছি মানে আজকে আমার বাড়ির কাজ দিয়ে যাবে ,  আর নামবে না? সেটা তো হতে পারে না বানীদি। তোমাকে নামতেই হবে।'
ভিড় ঠেলে ঠেলে এবার রেখার কাছে আসার চেষ্টা করছে ওদিক থেকে অন্য যাত্রীরা বলছেন 'ভিড়একটু কমুক না দিদি ।এত ঠেলা মারলে তো হবে না ।'
' দেখে চলুন' আর একজন যাত্রী বলেছেন পা দিয়ে মাড়িয়ে চলে গেলেন, উফ কি সাংঘাতিক।'
বাণীদি বলল ', সরি ,সরি, সরি।'
এক যাত্রী বললেন 'এই সরিতেই সাতখুন মাপ তাই তো ?যত্তসব।'
বাণীদির কোন কথাই কানে ঢুকলো না ।তারপর আস্তে আস্তে রেখা সামনে এসে হাফ ছেড়ে দাঁড়িয়ে বলল
'না রে ,আজকে নয় ।ওদিকে রুপসার কথা শুনেছিস? রুপসা হসপিটালইজড।
রেখা যেন আকাশ থেকে পড়লো আর আশ্চর্য হয়ে বলল ' সে কিগো? কেন ,কি হয়েছে?'
বাণী বলল_ আর বলিস না ।ওর তো হার্ট 
অ্যাটাক । তবে বেশি জোরালো  নয় ।এখন ঠিক আছে।'
রেখা বলল' ও বাবা, বলো কি?  এই তো জাইবু মারা গেলেন। এর মধ্যে যদি এরকম হয়।'
বাণী বললো'হ্যাঁ ওখানেই যাব। একবার ওকে দেখতে যাব ।বিপাশা গেছে শুনেছি ।তাই একবারে এখান থেকে ওখানে নাববো।'
রেখা বলল' শুনে খারাপ লাগছে গো। কোথায় ভর্তি আছে?'
বাণী বলল 'উডল্যান্ড হসপিটাল।'
রেখা বললো 'ভালো জায়গায় ভর্তি আছে।
বাণী বলল' এখন তো ওরা কলকাতায় শিফট করে গেছে। জানিস রেখা?'
রেখা বললো  'না তো ।তাই ? বাহ খুব ভালো।'
বাণী বলল 'ও তোর বরের অফিসে জয়েন করেছে।'
রেখা অতি আশ্চর্য হয়ে বলল 'ওমা তাই 
বুঝি ?আমাদের রুপসা দিদি! সত্যিই খুব ভালো লাগছে। রুপসা দিদি এবং বিপাশা ওদের তো যথেষ্ট কোয়ালিটি ছিল ।তবে রুপসা দিদি যে নিজেকে কাজের মধ্যে ইনভলভ করেছে ,দেখবে সবকিছু একদম ভালো হবে আর শকটা কাটিয়ে উঠতে পারবে।'
বাণী বলল হ্যাঁ রে ,এটা খুব দরকার ছিল ।ওর মেয়ের একটা ভবিষ্যৎ রয়েছে তো?
রেখা বলল 'বাণী দি রুপসাদির মেয়ের বয়স কত হলো ?নাম কি,?'
বাণী বলল' ওর নাম হচ্ছে নদী ।ডাকনাম। বিপু 'স্রোতস্বিনী' বলে আর ওর ভালো নাম হচ্ছে স্বরূপা। এই তো 18 তে পা দিল।
রেখা বলল' বাহ খুব সুন্দর নাম তো?'
বাণী বলল 'মেয়ের জন্যই তো বরের অফিসে জয়েন করলো। তাছাড়া ওর বরের অফিসের বস খুব ভালো ।উনি প্রস্তাবটা দিয়েছিলেন।'
রেখা বললো 'ভালো তো ।এটা খুবই ভাল
 হয়েছে ।আজকালকার মেয়েদের না সত্যিই স্বাবলম্বী হওয়ার দরকার আছে।'
বাণী বলল 'কিন্তু আমাদের রুপু ভাবতে পারে নি যে, ও অফিস সামলাতে পারবে?'
রেখা বলল' আমাদের রুপসা দিদি এডুকেটেড মেয়ে ,না। হ্যাঁ, সব সময় জাইবুর প্রতি ভরসা রেখে চলেছে তাই? কিন্তু কিছু যে করতে পারবে না এটা কিন্তু কখনও মনে হয়নি?'
বাণী বলল' নারে ওকে গ্রামেতে দেখিস নি। সব সময় একটু ঘরোয়া প্রকৃতির ছিল ।রান্নাবান্না খাওয়া-দাওয়া ,এইসব নিয়েই বেশি ব্যস্ত ছিল?'
রেখা বলল 'বানীদি হ্যাঁ ,সে সব তো ঠিকই আছে  ঘরোয়া মেয়ে ।কিন্তু বাণী দি কোয়ালিটি তো কম ছিল না। তবে প্রয়োজন হয়নি। জাইবু একটা ভালো  জায়গায় ছিল সেরকম দরকারও হয়নি?'
বাণী বলল' হ্যাঁ ,তা অবশ্য ঠিক।'
এক যাত্রী বলল 'একটু সরে দাঁড়ান না দিদি। সেই থেকে  কানের কাছে বকর বকর বকর করে যাচ্ছেন। কানের পোকাগুলোকে জাগিয়ে দিলে।'
বাণীদি হা করে তাকিয়ে রইল যাত্রীর 
দিকে । রেখা বাণীদির দিকে তাকিয়ে আবার হাসল।
বাণীদি হাসলে গালে টোল পড়ে। এত সুন্দর লাগে দেখতে ।চিরকালই এরা এই তিন বোন সব সময় হাসি খুশিতে মেতে ছিল ।কথায় কথায় হাসতো ।রাগ কখনো দেখিনি এদের।
রেখা  বাণীদির দিকে তাকিয়ে  ইগনোর করে যাবার মত একটা ইশারা করলো।'
তারপর বলল এবার তোমাকে বসতেই হবে।

এ ক যাত্রী বললেন বসবেন মানে! আমরা তো দাঁড়িয়ে আছি?
রেখা বললো 'তো দাঁড়িয়ে আছেন, দাঁড়িয়ে থাকুন  আমি তো নেমে যাচ্ছি না ।আমি আমার সিটটা ওনাকে দিচ্ছি ।এটা তো আপনার আপত্তি থাকার কথা নয়?'
যাত্রী আর কিছু বললেন না চুপ হয়ে গেলেন।
বাণীদি বলেন 'উনি যখন বসতে চাইছেন.. কথাটা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই রেখা বলল 'আমি কাউকে দেব না এখন ,যতক্ষণ না আমি নামবো।'
বাণী বলল _ঠিক আছে ,তাহলে দে ।আমি একটু বসি।'
রেখা বলল' এসো, এসো এদিকে। আমার হাত ধরও আস্তে আস্তে।'
বাণীদি এসে রেখার জায়গায় বসল পাশের সহযাত্রীগুলো একটু যেন বিরক্ত হল ।আসলে বানীদি একটু হেলদি তো।'
বাণী দি  বলল পা টা কি যন্ত্রণা করছে
 রে ।টন টন করছে ব্যথায়।'
রেখা বলল' তোমাকে কখন থেকে বলছি তুমি এসো। এখানে একটু বসবে এস'।
বাণী বললো' তা কি করে হয় 
বলো ? তুমিও তো পরিশ্রম করেই এসেছ না ?তোর জায়গাটা আমি সঙ্গে সঙ্গে বসতে পারি বোন?'
রেখা বলল বাণীদিকে  বোন বলছ ও দিকে বসতে পারো না।'
রেখার থুতনিটা একটু টেনে এনে চুম্বন করল।
রেখার স্কুলের যে ঘটনাটা ঘটেছে 
যে ,একটা যন্ত্রণা সব সময় মনের ভিতর কুরে কুরে খাচ্ছিল । বাণীদির সঙ্গে কথা বলে আর শৈশবের সেই দিক কাছে পেয়ে সত্যিই সব ব্যথা , বেদনায়  যেন কেউ মলম লাগিয়ে দিল  নিমিষের মধ্যে যেন সব ঠান্ডা হয়ে গেল  কি শান্তি, কি শান্তি, শান্তি।'
বাণী বলল'রেখা তোর ছেলে মেয়ের খবর কি? মানে তোর কটা ছেলে মেয়ে?
রেখা বলল 'জগৎজুড়ে আমার ছেলে মেয়ে।'
বাণী বলল'ভালো করে ডাক্তার দেখা?'
রেখা বলল'আর সেই বয়স আছে?'
বাণী বলল'হ্যাঁ তুই তো একেবারে বুড়িয়ে গেছিস?'
রেখা হেসে বলল 'তাছাড়া আবার কি।'
বাণী বলল 'বকিস নাতো?'
রেখা তো জানে তার ভুভুক্ষ মাতৃহৃদয়। সেও চায় নারীত্ব পূর্ণতা লাভ করুক কিন্তু সবই কপাল।
তারপরে রেখা  বলল তোমার বলো ,তোমার খবর বল বানীদি?'
বাণী বলল 'এইতো চলছে ।আমার এক ছেলে এক মেয়ে।'.
রেখা বলল 'ও মা তাই?'
বাণী বলল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে আর মেয়ে এ ম, এ ফাইনাল ইয়ার।'
রেখা বলল' ও বাবা কত বড় হয়ে গেছে।'
বাণী হাসলো।
ইতিমধ্যে ট্রেন মদনপুরে এসে গেছে। রেখা বললো তাহলে কিন্তু অন্য দিন আমাদের বাড়িতে আসতেই হবে ।কথা দাও।'
বাণী বলল 'ঠিক আছে তাই হবে।'
ট্রেন এসে কল্যাণী থামল।
রেখা বলল বাণীদি ,আসছি। ভালো থেকো সাবধানে যেও।
ভিড় ঠেলে রেখা কোন স্টেশনে নামলে কে বলবে সকলে আমরা একটা প্যানডামিক সিচুয়েশনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। সাধারণ যাত্রীদের দেখে তা মনে হচ্ছে না।
ট্রেন বেরিয়ে গেল আর রেখা তার  দিকে' যতদূর দেখা যায় তাকিয়েই থাকলো। বাণীদি যেন খোলা জানালা দখিনা বাতাস হয়ে রেখা এক অপ্রীতিকর অবস্থার মধ্যে পড়েছিল ,সেখানে এসে সামাল দিল।'

মমতা রায় চৌধুরীর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১০২





উপন্যাস 

টানাপোড়েন১০২

মন ক্যানভাসের চরিত্র
মমতা রায় চৌধুর



মকর সংক্রান্তির ঠান্ডা হিমেল হাওয়া ঘুরপাক খাচ্ছে চারিদিক। এরই মাঝে কি মনে হলো বারান্দায় ব্যালকনিতে গিয়ে বসলো রেখা রান্নাবান্না কমপ্লিট করেছে। এক চিলতে রোদ এসে পড়েছে চেয়ারটিতে। রেখা গিয়ে বসেছে পিঠটাকে রোদের  দিকে  রেখে ।খোলা  চুলে আলতো চুমু যেন এঁকে দিয়ে যাচ্ছে এক চিলতে রোদ্দুর। রেখা এক প্লাস্টিকের মাঝারি  ঝুড়িতে  মটরশুটি নিয়ে খোসা ছাড়াতে বসলো। মটরশুঁটির খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে কখন যেন চোখ দুটো চেয়ারে বসে বসে ঘুমে ঢুলুনি। 
একবার তো ব্যালেন্স হারিয়ে প্রায় পড়ে যায় যায় অবস্থা  তখনই ধরফরিয়ে উঠে বসে রেখা চারিদিকে একটু দেখে নেয় ,কেউ দেখে ফেলে নি তো।  তারপর নিজেই আপন মনে হেসে ওঠে।
মটরশুঁটির খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে আপন মনে ভাবতে থাকে। ঘটে যাওয়া মন  ক্যানভাসের স্মৃতি।
মনে পড়ে ছোটবেলাকার কথা মা,কাকিমা , জেঠিমারা যখন মটরশুঁটির খোসা ছাড়াতে বসতো, তার অর্ধেক মটরশুটি আমরাই খেয়ে শেষ করে দিতাম।
মা লাঠি  নিয়ে  তেড়ে আসতেন আর বলতেন
,তোদের পেটে কি রাক্ষস ঢুকেছে?'
কাকিমা বলতেন 'ছাড়ো না দিদি, দুটো তো খাবে?'
মা বলতেন 'এই ছোট তোদের এই আশকারাতে ওরা কিন্তু গোল্লায় যাচ্ছে। বিশেষ করে ননী।'
কাকিমা হেসে উড়িয়ে দিতেন ।
আমরা কখনও জেঠিমা, কাকিমা, মায়ের মধ্যে মনোমালিন্য হতে দেখিনি।
যদিও বা কখনো কিছু হয়েছে , সেটা কিন্তু আমরা বুঝতেই পারতাম না। প্রত্যেকে নিজের নিজের তাগিদেই সে সব ভুলে গিয়ে একটা সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করতেন।
রেখাএসব ভাবছে আর একা একা হাসছে।
 হঠাৎ পাশের বাড়ির ছাদের থেকে ডাক শোনা গেল' ও দিদি. ও দিদি .দিদি।'
রেখার শৈশবস্মৃতিতে বাঁধা পড়ে। ও বাড়ির ছাদ থেকে চৈতির মা রেখাকে ডাকছে।
রেখা গলাটা বাড়িয়ে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে বলল ' কি গো দিদি?'
চৈতির মার খুবই ঠাণ্ডা লেগেছে বোঝাই যাচ্ছে ।ছাদেতেও বেশ ভালো করে সোয়েটার ,চাদর, সঙ্গে আবার একটা মাথায় বউ টুপি পরেছে।
বলল ' দিদি, পিঠে করেছেন?
রেখা ঈষৎ হেসে বলল ''না গো 
দিদি ,সেভাবে কিছুই করি নি ।ওই পিঠের সাজ একটু পুড়িয়ে রেখেছি । কয়েকটা আসকে পিঠে করেছিলাম।'
রেখা  জিজ্ঞেস করল  'তুমি করেছ?'
চৈতির মা বলল 'আমি আবার কি করেছি বলুন তো ,আমি একটু দুধ পুলি করেছি।'
রেখা বলল 'বাহ ভালো জিনিস বানিয়েছ।'
চৈতির মা বলল'ওই হয়েছে আর কি?
রেখা বলল 'চৈতি আসে নি?'
চৈতির মা বলল হিমশীতল কন্ঠে"আর বলবেন না দিদি, ওর শাশুড়িমা তো গঙ্গাসাগর মেলায় গেছেন।
রেখা অবাক হয়ে বলল  'সে কি? ওনার না শরীর খারাপ বলছিলে?'
চৈতির মা একটু উৎসুক ভঙ্গিতে বলল'তাহলেই বুঝুন। ছেলে কত বারণ করেছে এই অবস্থায় যেওনা। উনি যেটা ভালো বুঝবেন সেটাই করবেন। কারো কথা থরি না তোয়াক্কা করেন।'
রেখা হেসে বলল 'বুঝতে পারবেন মেলা থেকে এসে  শুধু ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ কর।
চৈতির মা বিরক্তি কন্ঠে বলল ' ওনার আর কি এসে শুয়ে পড়বেন,  যত ঝামেলা আমার মেয়ের।'
রেখা হেসে বলল' এটাই তো মেয়েদের জীবন দিদি। তারপর বলল না এখন যাই দিদি। পরে কথা হবে ।কাজ পড়ে রয়েছে মেলা ।'
চৈতির ছাড়ানো মটরশুঁটির খোসাগুলো একটা ঝুড়িতে নিল আর মটরশুঁটিগুলো একটা ক্যারি ব্যাগে রাখল আর বলল 'হ্যাঁ আমারও কাজ পড়ে  রয়েছে।"
রেখা  মটরশুঁটির ক্যারি ব্যাগ  নিয়ে ফ্রিজে ঢুকিয়ে দিল। আজকে রাত্রির মেনু হবে আলুর পরোটা আর মেথি মালাই। মনোজ যেটা খেতে খুব ভালোবাসে।
এইসব ভাবতে ভাবতেই ফ্রিজ খুলে দেখল  ' ফ্রেশ ক্রিমটা আছে কিনা?'
সবই আছে কিন্তু ফ্রেশ ক্রিমটা তো একদমই অল্প আছে। তারপর মনে মনে ভাবলো না থাকে না থাকুক এখন কাকে পাঠাবো দোকানে? উনার তো আবার কি কারনে মুড অফ হয়ে আছে, কিছুতো বলাও যাবে না। ঘরে দুধ আছে ও দিয়ে চালিয়ে নেব।'
তারপর রেখা মনে মনে ভাবে কেন যে মাঝে মাঝে মনোজ এরকম হয়ে যায় বুঝতে পারিনা। মনে হয় পোকাগুলো নড়েচড়ে ওঠে।হঠাৎই ভাবতে ভাবতে ফোনটা ঘাঁটছে এমন সময় দেখল বেশ কয়েকটা মেসেজ এসে পড়ে
 রয়েছে। রেখা মনোযোগের সাথে মেসেজগুলো পড়ল। দেখল যে কটা মেসেজ এসেছে তারমধ্যে দুটো স্কুলের গ্রুপ থেকে এসেছে, বাকি মেসেজ এসেছে 'সিঁড়ি'পত্রিকার সম্পাদকের কাছ থেকে ।বেশ মজা করে লিখেছেন তো ভদ্রলোক।  মজার ছলে কবিতা 
লিখেছেন ।ভালো লেখেন আবার উনি আমাকে বলেন কিনা আমি লেখিকা ।যাই হোক শুরু করতে বলেছেন 
উপন্যাস লিখতে। সাহস করে কলম ধরবো ।একটা মেসেজ লিখলাম।
 উনি দেখছি সঙ্গে সঙ্গে রেসপন্স
 করলেন ।'সাহস করে তো ধরতেই 
হবে ।আপনার দ্বারা হবে আমি জানি ।আমরা সবাইকে বলি না আপনি চেষ্টা করুন নিশ্চয়ই পারবেন। '
রেখা লিখল'লেখা  তো আমার নেশা আমি ভালোবাসি কিন্তু উপন্যাস?'
ভদ্রলোক লিখলেন 'কেন নয়?'
রেখা লিখল' আমি পারবো?'
ভদ্রলোক লিখলেন 'অবশ্যই পারবেন ।আপনি পারবেন?'
রেখা বলল 'কী করে বুঝলেন আমি পারবো ?আপনি কি জ্যোতিষী?'
 ভদ্রলোক লিখলেন' আমি জ্যোতিষী কিনা জানিনা । তবে আমরা তো বিভিন্ন লেখা নিয়ে নাড়াচাড়া করি ।আপনার ভেতরে একটা শক্তি আছে। আপনি চেষ্টা করলেই সেই শক্তিটা কে আপনি বের করে কাজে লাগাতে পারেন?
রেখা বলল ও তাই বুঝি?
ভদ্রলোক লিখলেন ' আপনার চোখের ভেতরে সেই গভীরতা আমি দেখেছি।
রেখা বলল এত দূরদর্শী?
ভদ্রলোক লিখলেন 'আশা রাখবো আপনি আমার কথা রাখবেন?'
রেখা বলল 'নিশ্চয় চেষ্টা করব ।আপনি যখন এতটা উৎসাহ দিচ্ছেন। আমি চেষ্টা করব ।এটুকু আপনাকে বলতে পারি?'
ভদ্রলোক বললেন' ওটুকুই দিতেই হবে আপনি ওই চেষ্টাটুকুও করুন বাকিটুকু ছেড়ে দিন ।'
আজকের এই শূন্য বারান্দায় এক সময় কত খুনসুটি  হয়েছে আর আজ পুরো 
একা  ।আশেপাশে প্রত্যেকে আছে কিন্তু কোথায় যেন মনের একটা শূন্যতা তৈরি হয়েছে ।জানিনা 
কেন ?উপন্যাসের চরিত্রগুলো তে কিছু কল্পনা আর বাস্তবের রং মিশিয়ে আমি চেষ্টা করব তাকে রূপ দেবার। কলম  ধরে ফেলে প্রথম পর্ব টা আজকে স্টার্ট করব।'
রেখা স্টার্ট করলো উপন্যাসের প্রথম পর্ব।
এরমধ্যে কলিংবেল বাজতে শুরু করেছে।
একটু বিরক্ত হল। তারপর বাধ্য হয়ে দরজা খুলে দিল।
দরজা খুলেই অবাক হয়ে গেল চৈতির মা দাঁড়িয়ে।
একগাল হাসি নিয়ে চৈতির মা বলল 'দিদি ,আমি একটু পিঠে বানিয়েছিলাম। বললাম, না, দুপুর বেলায় ।তাই একটু নিয়ে আসলাম । একটু টেস্ট করবেন।'
রেখা বলল "এসবের কি দরকার ছিল দিদি।'
চৈতির মা বলল'দাদা কোথায় (দেখতে পাচ্ছি না,,?
রেখা বলল 'আছে এদিক ওদিক কোথাও।'
চৈতির মা বলল 'আসি তাহলে দিদি বেলাও পরে এসেছে।'
রেখা মনে মনে ভাবল  একবার শুরু করল
আর থামতেই চাইবে না। তবুও মনে মনে ভাবল এখন তাড়াতাড়ি গেলেই বাঁচি। উপন্যাসটা একটু স্টার্ট করেছি ঠিক তখনই..?
চৈতির মা বেরিয়ে যাবার পর রেখা একমনে লিখতে লাগলো।
রেখা ডুবে গেল  তার লেখায়। এরমধ্যে মনোজ এসে দাঁড়িয়েছে তার পেছনে। হঠাৎ কেশে উঠলো মনোজ। ঠিক তখনই রেখা তাকিয়ে দেখল।
মনোজ বলল' আজকে কি কিছু খাবার হয়েছে?'
রেখার চমক ভাঙ্গে তারপর বলে ' হ্যাঁ'
রেখা বলল দুপুরের খাবার টাইম তো কখন পেরিয়ে গেছে। তোমাকে ডাকাডাকি করতেও ভয় লাগছিল, কখন কি বলে দেবে তার তো ঠিক ঠিকানা নেই। কাজে কাজে ই ...।
মনোজ  বলল'আমাকে খেতে দাও।
 পেটে রাক্ষস ঢুকেছে। এক পাহাড় সমান খিদে।'
রেখা বলল 'এইতো এক্ষুনি দিচ্ছি।'
লেখার বারোটা বাজলো  রেখা মনে মনে বলল। সব সময় তো লেখায় মুড  আসে না। যাও বা এখন একটু মুড আসলো ,তাও অথৈ জলে..।
মনোজ বলে উঠলো ''
কি লিখছো এতো?
রেখা বললো 'আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে উপন্যাস।'
মনোজ  বলল' বাহ বেশ ভাল।'
রেখার ডায়েরিটা রেখে রান্নাঘরের দিকে গেল খাবারের আয়োজন করতে।
মনোজ বলল, অল্প ভাত দেবে?
রেখা বলল 'কেন অল্প কেন?'
মনোজ বলল খিদে নেই?
রেখা বলল ' এতটা বেলা হয়েছে তবু খিদে নেই। অথচ একটু আগে বললে পাহাড় সমান খিদে। আর এখন... তাহলে কি লোহা হজম করেছে নাকি!
মনোজ একগাল হাসল।
রেখা বলল' পিঠে খাবে?'
মনোজ বললো ' দাও ।তুমি আবার কখন পিঠে বানালে?


রেখা খুব উৎসাহিত হয়ে পাতে পিঠে দিয়ে বলল' চৈতির মা করেছে আমি করিনি ।'
মনোজ বলল  "আগে তো বেশ ভালো ভালো পিঠে করে খাওয়াতে আর এখন কি হলো?'
রেখা বললো 'তাহলে মন ক্যানভাসের  পাতা উল্টে দেখতে হবে বুঝলে মশাই।'
তাহলেই দেখবে শুধু পিঠে নয় আরো কত ভালোবাসার স্মৃতি জড়িয়ে আছে।

মমতা রায় চৌধুরী'র ধারাবাহিক উপন্যাস ১০৩ পর্ব



উপন্যাস 

টানাপোড়েন১০৩

মানসিক যন্ত্রণা

মমতা রায় চৌধুরী



রেখা আজ স্কুলে ঢুকে  স্টাফ রুম দেখে মনে হলো যে ঘরে এত শব্দ, এত আলো, আজ সে  ঘড় নিস্তেজ হয়ে গেছে। চেয়ারটা ফাঁকা দেখেই বুকের ভেতর কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো। কি করে বসবে ?সেই ভাবনা ক্রমশ কুরেকুরে খেতে লাগলো। একটা কেমন দম বন্ধ করা পরিবেশ মনে হচ্ছে।
 এর মধ্যে অনিন্দিতা স্কুলে এসেছে । রেখা দেখছে রেখার টেবিল চেয়ারে বসে আছে অনিন্দিতা। রেখা অত্যন্ত স্নেহের সুরে বলল ' অনিন্দিতা পাশের চেয়ার-টেবিলটায় বসবি?
অনিন্দিতা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রেখার দিকে তাকাল তারপর ক্রুদ্ধভাবে বলল 'কেন এখানে বসে আছি তো কি হয়েছে?_
রেখা নিম্নস্বরে বলে' না কিছু হয়নি পাশের চেয়ার-টেবিল ফাঁকা আছে ওখানে বসলে আমার একটু সুবিধা হত?'
অনিন্দিতা ডেসপারেটলি  বলল_ না না এই স্কুলে তো এরকম কোনো নিয়ম নেই যে, সবার জায়গা ফিক্সট?'
রেখা বলল ;'না ,না আমি সে ভাবে বলতে 
চাইনি  ।আমি বলছি, আমার এখানে খাতাপত্র সব আছে তো, এখানটাতে বসে আমার দেখতে সুবিধা হবে ।'
অনিন্দিতা একগুয়ে মনভাবে বলল _আমিও তো খাতা দেখবো।'
রেখা বলল _' কেন মিছে মিছি এত কথা বাড়াচ্ছিস?'
অনিন্দিতা ঝগড়ার মুডে বলল_ কথা তো আমি বাড়াচ্ছি না তুমি বাড়াচ্ছ রেখা দি।'
রেখা বলল' স্কুলে এসে ঝগড়া করতে একদমই ভালো লাগে না আর তাছাড়া আমার মনে হচ্ছে তুই গায়ে পড়ে ঝগড়া করছিস?'
অনিন্দিতা বলল' আমরা প্রত্যেকেই কিন্তু জানি আমরা কে কোথা থেকে এসেছি। তাই ঝগড়া করব এরকম মানসিকতা আমার তৈরি
 হয়নি। তোমার ভেতরে হয়তো এটা আছে। তাই সেটারই প্রকাশ ঘটাচ্ছ।'
রেখা বলল-'কেন অকারণে এত কথা বলছিস?'
অনিন্দিতা বলল-"এটা অকারণ?'
রেখা বলল  "তবে না তো কি?'
অনিন্দিতা বলে 'এবার কিন্তু রেখাদি  তুমি বেশি বাড়াবাড়ি করছ,।'
রেখা বলল _আমি এখানটায় বসি, ন্যাচারেলি সেই কারণেই তোকে বলেছি। আরও তো  ফাঁকা জায়গায় রয়েছে সেখানে বোস না?'
  রেখা অনিন্দিতার মধ্যে একটা হট টপ চলছে অথচ সিনিয়র টিচার যারা ছিলেন তারা কিন্তু কেউ কিছু বললেন না যে এটা ঠিক নয়।
কিছু টিচার আছেন যারা  অনেক হম্বিতম্বি করেন কিন্তু সঠিক কথা বলার ক্ষমতা তাদের নেই। তাই অনিন্দিতাকে তারা ধমক দেন না যে কাজটা মোটেই ঠিক হয়নি।
রেখার খুব রিম্পাদির জন্য মন খারাপ হতে 
লাগল ।আজ রিম্পাদি থাকলে এর প্রতিবাদ করত ।রিম্পাদি থাকাকালীন এরকম কোনো ঘটনা ঘটেনি ।
আজ বড়দিও নেই আর যদি বড়দি থাকতেন তাহলে কোথায় এরকম একটা অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হতো না।
রেখার ঘরখানাকে দেখে তাই মনে হল যেন যে ঘরে এত শব্দ, এত আলো ,এত কলতান, এত আড্ডা, হাসি তামাশা নিমেষে কেমন যেন ঘর খানা খালি খালি মনে হতে লাগল। রেখার মনটা নিস্তেজ হয়ে পড়ল। কন্ঠ বাকরুদ্ধ হলো ,চোখ ছলছল।আরো বেশি মন খারাপ হতে লাগল অনিন্দিতার এই ব্যবহারে ।কেমন যেন সমাধির মত নিস্তব্ধ, নিঃশব্দ ,বধির পরিবেশ মনে হতে লাগল ।শুধু সে একা।একা কি করে এই স্টাফ রুমে থাকবে ?ভাবতেই তার কেমন মনটা হু হু করে উঠলো।
শুধু মনে হতে লাগলো একসময় কি এই ভালোলাগার সুখের অনুভূতিগুলো থাকবে 
না ।নাকি চোখের সামনে না থাকলেও রিম্পাদির অনুভূতিটুকু ,সচেতনাটুকু তার মনের অস্তিত্বে অনুভব করবে। নাকি একেবারেই নতুন ছোঁয়া নতুন আলপনার মত হয়ে যাবে সবকিছু। কেমন যেন একটা বিচ্ছেদের বেদনায় ম্রিয়মান হয়ে পড়ল রেখা।
অনেকক্ষণ নিজের টেবিল চেয়ারের কাছে দাঁড়িয়ে থেকে যখন অনিন্দিতা উঠলো না ।তখন নিজে থেকেই সরে গেল ।যাবার আগে শুধু বললো 'কাজটা তুই ঠিক করলি না অনিন্দিতা।'
অনিন্দিতা বলল 'কোনটা ঠিক , বেঠিক তোমার কাছ থেকে শিখব না রেখাদি ।দরকার হলে তুমি যেভাবে কথা বলছো ,তাতে আমার মনে হয় তোমার শিক্ষা, রুচি বোধের কোথাও বোধহয় কমতি আছে।'
রেখার মাথাটা কেমন হঠাৎই গরম হয়ে
 গেল । আর জিজ্ঞাসু কন্ঠে বলল 'আমার শিক্ষা, রুচিবোধ? কেন রে ,আমি কি এমন শিক্ষা হীনতা,রুচিহীনতার পরিচয় দিলাম?'
অনিন্দিতা বলল _কেন এই বসা নিয়ে যেসব রুচিহীন কথা তুমি বলছো ,আমাকে সরে যেতে বলছ, এটা কি তার যথেষ্ট প্রমাণ নয়?'
রেখা বললো 'তুই এসব কি কথা বলছিস? এই জায়গাটায় আমি বসি, তাই তোকে বলেছি।'
অনিন্দিতা বললো 'এখানে তো কারো জায়গা ফিক্সট নয়।'
রেখা বললো 'আমরা প্রত্যেকে জানি কারোরই জায়গা ফিক্সট নয় ।তবুও আমরা যখন এখানে এসেছি ,একটা কাজ করছি ,প্রত্যেকেরই একটা নির্দিষ্ট জায়গা আছে, সেখানে সে নির্দিষ্ট দিনে বসবে ,সেখানে তার ব্যাগটা রাখবে, সে সেখানে কাজগুলো করবে। নইলে তো উদ্দেশ্যহীন যাযাবরদের মতো ঘুরে বেড়াতে হবে আজ এক জায়গায় কাল অমুক জায়গায়।
অনিন্দিতা বলল 'এটা তোমার ভুল ধারণা । আমার এই আজকে যদি জায়গাটা ভালো লাগে তাহলে কি আমি বসবো না ?তুমি কি আপত্তি করতে পারো ?এটা তো কারো কেনা জায়গা নয় বল?'
রেখা বলল_ আমি একবারও বলিনি যে কারো কেনা জায়গা ।আমি তোকে বোঝাতে চাইছি কেউ তো আর সারাদিন ধরে যাযাবরের মতো ঘুরে বেড়াবে না ।একটা নির্দিষ্ট জায়গা থাকলে সে তার নির্দিষ্ট জায়গায় এসে তার ব্যাগটা রাখবে, সেখানে কাজ করবে বসে। শান্তিতে কাজ করতে বসে একটা মনের প্রশান্তি।'
অনিন্দিতা বলল 'কাজ করতে জানলে প্রশান্তি এমনি ফিরে পাবে রেখাদি ।জায়গা নিয়ে কোনো প্রশান্তির কথা তুমি বলো না? জায়গাটা কোন ম্যাটার করে না।'
রেখা বললো 'তুই কি আজকে শুধুমাত্র আমার সঙ্গে অকারণে কথাগুলো শোনাবি বলে এরকম ব্যবহার করছিস?'
অনিন্দিতা বললো 'তোমার কি তাই মনে হচ্ছে আমার কি কোন খেয়ে কাজ নেই। আমি তোমার সঙ্গে যেচে পড়ে এই সমস্ত কাজগুলো করতে 
যাব ।বরঞ্চ তুমি আমার সঙ্গে এরকম ব্যবহার করছ?'
রেখা বলল 'দেখ আমি সেরকম কোন কিছুই করতে চাইছি না ।আমি তোকে শুধু সেই ব্যাপারটাই বোঝাতে চাইছিলাম। তোর  একটা জায়গায় এত দিন বসে এসেছিস ,কেউ কি গিয়ে তোর জায়গায় বসেছে ভাই এইভাবে কথা বলেছে? হ্যাঁ এটা হতে পারে ক্ষণিকের জন্য হয়তো বসেছে আবার তুই গেলে নিশ্চয়ই সেখান থেকে উঠে এসেছে। এরকম তো হয়।'
অনিন্দিতার রেখার এই সমস্ত কান্ড-কারখানা দেখে কেউ কিন্তু কোন প্রতিবাদ করছে 
না ।প্রত্যেকেই নিজের মনে বিষয়গুলো উপভোগ করছে । কাওকে  তো  দেখে বোঝা গেল যে পুরোটাই অনিন্দিতাকে সাপোর্ট করছে কিন্তু 
কেন ? কেন এমন করছে? রেখা তো এরকম চায়না ।প্রত্যেককে ভালোবেসে, প্রত্যেকের সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে চায়। তাহলে কেন তার সঙ্গে এরকম হচ্ছে?'
রেখা মনে মনে ভাবছে' কাউকে পছন্দ না করে ভালোবাসা যায় কিন্তু এটা কি হচ্ছে অনিন্দিতাকেও ভালোবাসে। আজকে অনিন্দিতার ব্যবহার রেখাকে বুকের ভিতর শুল বিঁধিয়ে
 দিচ্ছে ।সমস্ত মনটা কেমন যেন বেদনায় দগ্ধ হচ্ছে ।যেন মনে হচ্ছে  উঠোনে নর্দমা থেকে একটা শিরশিরে শীত আর দুর্গন্ধ আছে।

রেখা তবুও তার সুবাস ছড়িয়ে দিতে চায় অনিন্দিতার ভেতরে ।
তাই মিষ্টি সুরে রিকোয়েস্ট করল ' তাহলে তুই সত্যিই এখানে বসবি? তুই তোর জায়গায় যাবি না?'
অনিন্দিতা বলল' তুমি কি পাগল? আমার মনে হয় তোমার কোন মেন্টালি সমস্যা হচ্ছে, আর না হলে তোমার কোন সাইকো সমস্যা হচ্ছে? তুমি এক কাজ করো আজকে বাড়ি গিয়ে দাদাকে বলে তোমাকে একজন সাইক্রেটিস ডাক্তার কাছে নিয়ে যেতে।'
রেখা বলল _কেন রে আমি কেন সাইকো ডাক্তার দেখাতে যাব?'
অনিন্দিতা বলল_ তোমার ব্যবহার সেটা বলে দিচ্ছে।'
রেখা বলল' ঠিক আছে তোর যখন একান্ত এই জায়গাটাই পছন্দ তুই এখানে বোস। আমি বরং অন্য জায়গায় গিয়ে বসি।_
অনিন্দিতা এমন তাচ্ছিলভাবে রেখার দিকে তাকাল  সকলে উপস্থিত সহকর্মীরা হেসে উঠলো।"
রেখা মনে মনে ভাবল_ কাদের দেখছে? দীর্ঘদিনের চাকরিজীবনে এরাই তার 
সহকর্মী ।একজন সিনিয়র টিচার কে একজন জুনিয়র টিচার অপমান করছে আর এরা তার সাথে তাল মিলিয়ে হয় চুপ করে থাকছে, চুপ করে তার সাপোর্ট করছে । নয়তো প্রকাশ্যেই হেসে উঠছে ।এর থেকে অপমান আর কি হতে 
পারে ?রেখা  নিতে পারছে না ।রেখা সত্যিই  কাজের জায়গাটা মনে হচ্ছে আস্তে আস্তে মানসিক দিক থেকে শান্তির বিষয়টা উড়ে চলে যাচ্ছে।'
একসময় ভেবেছিল রেখা যে শেষ পর্যন্ত হয়তো অনিন্দিতার মত বদলাবে  একটা ক্ষীণ আশা তার মনের ভেতরে ছিল। তাই সে শেষবারের মত আরেকবার অনিন্দিতাকে বলেছিল কিন্তু যখন টের পেল না এই আশা লালন করা তার ব্যর্থ হয়েছে ।চোখের পাতা দুটো তাই জ্বালা করে উঠলো ।এত নীচ, এত স্বার্থপর কেউ হতে
 পারে? মনে মনে একটা পরিমাণ হীন অভিমান উদ্বেল হয়ে উঠলো ,যেন মনে হচ্ছে জায়গাটা নেবার জন্য বা বসার জন্য নয় ,এই যে কুরুচিকর কথাবার্তাগুলো বলল ।সেই বলার জন্যই তার  মনের ভেতরে খুব কষ্ট হচ্ছে।  কোন কারণ
 নেই ।তবুও কেমন যেন মনে হয়েছিল একবার গিয়ে অন্তত অনুরোধ করে যদি বলে, যদি জায়গাটা ছেড়ে দেয় ।কিন্তু সেটা হলো না। রেখা তারপর মনে মনে ভাবতে লাগল 'ছি : একটা জায়গার জন্য এরকম কাজ ,এত কথা 
কাটাকাটি ?কি দরকার ?সত্যিই তো তাই কেউ কি জায়গা সঙ্গে করে এনেছে নাকি বা নিয়ে যাবে নাকি?কারো জায়গা নির্দিষ্ট নয় । প্রত্যেকে জায়গায় একটা নির্দিষ্ট করে নিয়েছে। তাই কথাটা তো একদম ঠিক বলেছে। সুতরাং এটাকে মেনে নেয়াই উচিত  সমস্ত সম্পর্কের নিবিড়তা, সমস্ত পরিচয় গভীরতার দিকটা আজকাল মনে হচ্ছে যেন কেমন যেন অন্ধকার। মনের দেয়া সেখানে কেউ ঝুলিয়ে দিয়েছে তালা।  তাই আঘাতের মুহূর্তটিকে রেখা কিছুটা ভেঙে পড়েছিল ।যেন মুষ্টিযুদ্ধে মুখ থুবরে পড়ে যাওয়ার মত ।তাই শুধু দৈহিক যন্ত্রণা নয় ,একটা মানসিক অপমানবোধ ও তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেরিয়ে ছিল ।যেন কুকুর তাড়া করেছিল।

শামীমা আহমেদ এর ধারাবাহিক উপন্যাস ৫৮




শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত 
(পর্ব ৫৮)
শামীমা আহমেদ 

রীতিমতো একটা ঝড় মোকাবেলা করে শিহাব আর সুমাইয়া মায়ের ঘরে গেলো।তখনো  আরাফ সুমাইয়ার কাঁধে।  মাথা গুঁজে দিয়ে একেবারে সুমাইয়ার বুকে গা লেপ্টে দিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে। ভীষণ ভয় পেয়েছে সে! শিহাবকেও বেশ বিধ্বস্ত লাগছে। সকালবেলা যেমন সুন্দর ফুরফুরে মেজাজে শায়লাকে নিয়ে এসেছিল এখন  কেমন যেন অগোছালো লাগছে। শিহাব  শায়লারকে  নিজের সবটা জানাতে   চোখে মুখে আকুতি নিয়ে শায়লার দিকে তাকিয়ে রইল।শিহাবকে দেখে  শায়লা এক অজানা আশংকায় অস্থির হয়ে উঠলো! শায়লার চোখের জিজ্ঞাস্যও শিহাবের চোখে ধরা পড়েছে। সে শায়লাকে নিয়ে মায়ের ঘরের সাথের খোলা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো।
শায়লাকে সব জানাতে হবে।শিহাব কিছুই লুকাবে না। একেবারে অপ্রত্যাশিতভাবে আরাফ আর রিশতিনাকে নিয়ে আজ যা ঘটে গেলো শায়লার তা জেনে রাখা উচিত।
শিহাব শায়লার হাত ধরে সব খুলে বললো।
শিহাব একে একে তার যুক্তি পালটা যুক্তি দিয়ে রিশতিনার সাথে সব কথোপকথনের শেষটা পর্যন্ত বলে গেলো।শায়লা খুবই অবাক হলো, পাশের ঘরে বসে সে কিছুই টের পেলোনা!   
শায়লা বুঝে নিলো রিশতিনা তার প্রাপ্যটাই চাইতে এসেছে।তবে অনেক দেরি হয়ে গেছে। তার সাথে শিহাব আজ অনেকটাই জড়িয়ে গেছে।যার দুঃখ ভুলাতে শায়লা শিহাবের
আপন হলো, যার দুঃখ ভুলতে শিহাব শায়লাকে আপন করে নিলো আজ ঘটনার দৃশ্যে তারই উপস্থিতি!
শায়লা শিহাবের মনের অবস্থা বুঝতে পারলো।সে শিহাবকে শান্ত করতে চাইলো। খুবই সহজ করে বললো, আমি হলেও এটাই করতাম শিহাব।রিশতিনা কোন ভুল করেনি। তবে ঐ মূহুর্তে  ভেবে চিন্তে তুমি যা সিদ্ধান্ত নিয়েছো সেটাই মেনে নাও। চলো, তোমাকে মায়ের কাছে নিয়ে যাই।তার কাছে গেলে তোমরা ভালো লাগবে।শিহাব শায়লার মাঝে, শায়লার কথার মাঝে সান্ত্বনা খুঁজে পেলো।
শায়লার চোখে চোখ রেখে আশ্বাস আর ভরসার সাড়া পেলো।
ঘরে সুমাইয়ার কোল থেকে আরাফ দাদুর কোলে ঝঁপিয়ে পড়লো।মনে হলো কোন ভয়ংকর কিছু দেখেছে সে, তাইতো দাদুর কাছে আশ্রয় নিতে চাইছে। আরাফকে কাছে নিয়ে দাদু কান্নায় ভেঙে পড়লো। এই কান্না, একটি শিশু তার আপন মায়ের আদর বঞ্চিত হওয়ার,এই কান্না এক দরদী মায়ের নিজ সন্তানকে ফিরে না পাওয়ার, একজন স্ত্রী তার স্বামীর ভালোবাসা হারিয়ে যাওয়ার,নিজের ছেলের জীবন এলোমেলো হয়ে যাওয়ায়।
মা হয়ে খুবই কষ্ট এইসব মেনে নেয়া।সুমাইয়া তার শ্বাশুড়িকে শান্ত করার চেষ্টা করছে।সুমাইয়াও বারবার শাড়ীর আচলে চোখ মুছছে। তার বিয়ের পরে শিহাবকে সে কলেজ পড়ুয়া পেয়েছে। এতোটা গোছানো আর সুন্দর আচার ব্যবহারের শান্ত ছেলেটির জীবনে যে এত ঝড় বয়ে যাবে তাই বা কে জানতো! 
শায়লা শিহাব মায়ের ঘরে ঢুকলো।শায়লা এই প্রথম আরাফকে দেখলো। মানে দাদুর কোলে জাপ্টে ধরা আরাফকে। মুখটা এখনো দেখা হয়নি। শায়লা ভেবে নিলো, যে করেই হউক আরাফকে আপন করতে হবে।আজ সকালে ওর জীবনে যা ঘটে গেলো  একটা  শিশুর জন্য সেটা খুবই শকিং। 
শিহাব আরাফকে সহজ করার জন্য বাবা বাবা বলে ডাকতেই আরাফের সাড়া মিললো। সে বাবার দিকে তাকালো  কিন্তু তার পাশে শায়লার মুখটা চেনা না অচেনা ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। তার বাবার ঘরে সকালে দেখা মুখটা যে বলেছে, সে তার মা, এই কি সেই জন? শিশুটির চোখে প্রশ্ন খেকে যাচ্ছে। শায়লা তার চোখের ভাষায়  আরাফকে কাছে ডাকছে। আরাফ একবার শিহাব  আর একবার শায়লাকে দেখছে। শিহাব হাত বাড়িয়ে কাছে নিতে চাইলে এক ঝাঁপ দিয়ে  বাবার কোলে উঠে গেলো। শায়লা শিহাবের কাছে একটু ঘেঁষে দাঁড়াতেই আরাফের চোখ যেন বিস্ময়ে বিস্ফারিত!  কেন সে তার বাবার কাছে ঘেঁষে দাড়াচ্ছে? বাবাতো সকালে মায়ের সাথে অনেক রাগ হয়েছে।আরাফের ভীত চোখ আর ভেতরে বয়ে যাওয়া নানান প্রশ্ন ঘরের সবাই বুঝতে পারছে।দাদু কেন কাঁদছে এটাও তার জিজ্ঞাসা।  সব মিলিয়ে সে যেন একটা প্রশ্নের সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে।  শিহাব আরাফকে ভীষণভাবে আঁকড়ে ধরে রইল। কিন্তু খোল চোখে পিটপিট করে তাকিয়ে শায়লাকে দেখছে। শায়লা যেন বুঝেও না বুঝার মত করে এই প্রথম  আড়চোখে আরাফের মুখটা দেখে নিলো।কী ভীষণ মিষ্টি  মুখখানা। মুখের গঠন শিহাবের সাথে খুব একটা মিলছে না।বুঝা গেলো সে মায়ের মতই হয়েছে। শায়লা কল্পনায় রিশতিনার মুখটা ভেবে নিলো। তখনই নিজের ভেতরে কিছুটা অপরাধবোধ কাজ করলো। পরক্ষণেই তার চোখের দিকে আরাফের দৃষ্টি পড়তেই আরাফ তাকে চেনার চেষ্টা করছে।

তিনতলা থেকে সুনায়রা আর আরুশ  সরাসরি দাদুর ঘরে চলে এলো। সবার মাঝে একটা থমথমে ভাব দেখে ওরা প্রথমে একটু থমকে গেলো।শিহাবের কোল থেকে   আরাফ ওদের দেখে একটু স্বাভাবিক হলো।
ঘরে একজন নতুন অতিথি দেখেচসুনায়্রা আর আরুশ একটু  সিঁটিয়ে গেলো। সিমাইয়া ওদের সাথে শায়লাকে  কি  নামে পরিচয় করাবে তা বুঝে উঠতে পারছিল না। শিহাবই বাচ্চাদের সাথে শায়লার পরিচয় করিয়ে দিলো। 
শিহাব জানালো,উনি হচ্ছেন শায়লা,উনি  তোমাদের নতুন চাচী হবেন।তবে  তোমরা এখনই চাচী ডাকতে পারো। শায়লা চাচী।এই কথায় সবার সেই থমথমে ভাবটা কেটে গেলো।সবার মুখে হাসি ফুটলো।আজ সকাল থেকে যা,একেবারে উধাও হয়ে গিয়েছিল।

শিহাব এবার আরাফকেও একটু সহজ করে নেয়ার চেষ্টা করলো।  আরাফের মুখের দিকে জানালো, আরাফ এইটা তোমার মা। শায়লা মা। যাও, বাবা মায়ের কাছে যাও। মা তোমাকে অনেক আদর করবে। শিহাব আরাফকে শায়লার কাছে দিতে চাইলো। শায়লাও হাত বাড়িয়ে আরাফকে কাছে নিতে চাইল।আরাফ কিছুটাক্ষণ নিশ্চুপ থেকে চাচীমা বলে সুমাইয়ার দিকে হাত বাড়ালো।  চাচীমা, আরাফকে এই ডাকটি তার দাদুই শিখিয়েছে। মা ডাকটি যেন সে ডাকতে পারে।মুরুব্বিরা অনেককিছুই আগাম বুঝতে পারে।তিনি আগেই ভেবে রেখেছিলেন,আরাফের মা যেহেতু বেঁচে আছে কোন না কোনদিন  সন্তানের খোঁজে আসবেই। তখন নিজের মাকে মা ডাকলেও চাচী ডাকটি থেকে যাবে।আর যেভাবে মায়ের আদরে সুমাইয়া আরাফকে বড় করেছে মা ডাক তারও প্রাপ্য।

সুনায়রা আর আরুশ কিছুক্ষণ শাআকে অবজার্ভ করে হাত এগিয়ে নতুন চাচীর হাত ধরলো।শায়লাও ওদের কাছে টেনে নিয়ে আদর করলো।  সুনায়রা বললো, চলো চাচী আমদের সাথে ক্যারাম খেলবে। বলেই শায়লাকে টেনে দাদুর রুম থেকে নিয়ে যেতে চাইলো। শায়লাও ওদের সাথে পা বাড়ালো।আরাফ তখনো, সুমাইয়ার কোলে।চোখ গোল গোল করে শায়লার চলে যাওয়া দেখছে। সুমাইয়াও ওদের সাথে আগালো।দিনের সব রান্নাবান্না পড়ে আছে। 
সুনায়রা আর আরুশ  দাদুর ফ্ল্যাটের ড্রয়িং রুমে ক্যারাম খেলার প্রস্তুতি নিলো।সুমাইয়া আরাফকে সেখানে মেশাতে চাইলেও সম্ভব হলোনা।সে চাচীমার কোলেই বেশ আছে। সুমাইয়া আরাফকে নিয়েই তিনতলায় চলে গেলো। বাচ্চারা শায়লাকে নিয়ে খেলায় মেতে উঠলো। ওরা ভুলেই গেলো, এটা তাদের চাচী।খেলার আনন্দে শায়লা খুব দ্রুতই অনেক বন্ধু হয়ে ওদের সাথে মিশে গেলো।

মায়ের বিছানাত শিহাব মাকে শুইয়ে দিলো। মায়ের পাশে বসে মায়ের মাথায় হাত বুলাতে লাগলো। জানতে চাইলো, শায়লাকে তোমার কেমন লাগলো মা।
মা জানালেন, খুব ভাল লেগেছে বাবা।খুবই মায়াকাড়া মুখটা। আরাফকে যেন মায়ের আদরে রাখে এটাই চাওয়া।আমি আর কয়দিন? বড় বৌমা আর কতদিন দেখবে? তার নিজের সন্তানরা বড় হয়েছে। এসব বলে মা  কাঁদতেই শিহাব তাকে  তাকে সান্ত্বনা দিলো।দেখে নিও মা, শায়লা কেমন করে তোমাদের সবাইকে আপন করে নেয়।আর আরাফের মা হয়ে আরাফেরও যত্ন নেয়।ও খুব ভালো  একটা মেয়ে, মা। আরাফকে মায়ের অভাব বুঝতে বুঝতেই দিবেনা।
মা অস্ফুটস্বরে বলে উঠলেন,  আল্লাহ যেন তাই করেন।


চলবে....

০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২

মমতা রায় চৌধুরী'র ধারাবাহিক উপন্যাস ১০১






উপন্যাস 

টানাপোড়েন ১০১

বুনোঝড়

মমতা রায় চৌধুরী


রেখার বেখেয়ালী মনে উঠেছে অতীতের ঢেউ সেসব ঢেউয়ের উচ্ছ্বাসে  কখন যে ভোর হয়ে গেল বুঝতেই পারে নি। জানলার ফাঁক দিয়ে সূর্যের কিরণ তেরচাভাবে ভাবে এসে পড়েছে। চমক ভাঙ্গে।
অন্যদিকে  তুলি ,পাইলট এত জোরে চেঁচাচ্ছ যে আর বিছানায় শরীরটাকে রাখতে পারল না। কান খাড়া করে শুনল। ওদের আওয়াজটা কি ধরনের আওয়াজ অনুধাবন করার চেষ্টা করলো ।এই আওয়াজ এর মধ্যে দিয়ে বোঝা যায় ওরা কি চাইছে, কি করছে? এখনকার আওয়াজ এর মধ্যে পরস্পর পরস্পরের প্রতি একটা আক্রমণাত্মক মনোভাব প্রকাশ পেল ।
রেখা ভাবে 'এরা তো খুব সুন্দর মিলেমিশে থাকে। তবে মাঝে মাঝে এতটা রেগে যায় কেন, কে জানে? '
রেখা উঠে পরল দরজাটা খুলেই দেখতে পেল  মনোজের ঘরে আলো জ্বলছে ।
ওদিকে যেতে গিয়েও মিলি ,তুলি ,পাইলটদের চিৎকারে ,আগে সেদিকটায় গিয়ে ধমক দেয়' তুলি ,পাইলট এত গলার আওয়াজ কেনো? 
একটু চুপ করে গেল। তারপর প্রত্যেকে যেন কিছু বলতে চাইল ।পরস্পর পরস্পরের অভিযোগ জানাতে শুরু করলো । রেখা গ্রিলের ফাঁক দিয়ে হাত দিয়ে প্রত্যেকের মাথায় আদর করে
 দিল ।তারপর চলে আসলো  ।
রেখা দ্রুত ছুটল বাথরুমের দিকে। এত জোরে বাথরুম পেয়েছে বলার অপেক্ষা রাখে না।
বাথরুম থেকে একেবারে প্রাতঃক্রিয়া ও  অর্ধস্নান সেরে ফ্রেশ হয়ে গোপালকে তুলল ,গোপালের ভোগ নিবেদন করলো।
গোপালের কাছে প্রণাম করে প্রার্থনা করল'   'হে ঈশ্বর সকলকে ভাল রেখো। সারাদিনটা যেন ভালো যায়।'
আজ কাজের অত তাড়া নেই। নূতন কাজের মাসি লেগেছে। অবশেষে সুমিতাকে বিদায় করা গেছে। মাসি বয়স্ক হলেও গুছিয়ে কাজ করে।
 সুমিতার মতো ফাঁকিবাজ নয়। অথচ প্রথম দিন যখন এই মাসিকে কাজে নিয়ে আসে মনোজ, রেখা তখন একটু বিরক্ত হয়েছিলো। মাসির সামনে কিছু বলে নি ঠিকই।
 কিন্তু পরে বলেছিল বাজখেকো গলায় 'সুমিতাকে নিয়ে এত ভুগলাম আবার নিয়ে এসেছ এই বয়স্ক মাসিকে।ভালো লাগে না ছাই।'
 মুখ গম্ভীর করে রেখা চলে এসেছিলো নিজের ঘরে।
পরে মনোজ এসে  নিজেকে দেখিয়ে আশ্বাস দিয়ে বলেছিল' আমার উপর বিশ্বাস রাখ ,আমার
 উপর । এ মাসি সুমিতার মত হবে না।'তারপর রেখার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিল।'
মাঝে মাঝে মনোজের রোমান্টিক আবেগে রেখা ভেসে যেতে চায় কিন্তু আবার মাঝে মাঝে ওর মাথায় কি যে ঘুনপোকা ধরে কে জানে?
রেখা আজ বুঝতে পারে ' মনোজ ঠিক কথাই বলেছিল । এ মাসি সত্যিই ভালো।'
সুমিতা থাকলে এতক্ষণ বসে বসে ভাবার কোন স্কোপ ছিল? বাপরে বাপ সারাক্ষণ টেনশন আর টেনশন ।সকাল থেকে উঠে নাকানি-চোবানি খেতে হতো।
  ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে সাতটা বাজে আপন মনে বলে উঠল' এ বাবা এত বেলা হয়ে গেছে মাসি আসার সময় হয়ে গেছে ।'
রান্নাঘরের দিকে গেল মাসির জন্য চা করতে হবে, নিজেদের জন্যও করতে হবে।  জলটা কাপ মেপে মেপে প্যানে দিল ফোটাতে , সঙ্গে আদা গোলমরিচ, লবঙ্গ ,তুলসী পাতা দিয়ে দিল একটু থেঁতো করে। গ্যাসের অন্য চুলায় দুধ গরম করতে বসিয়ে দিল , আটার লেচি কেটে রুটি বানিয়ে বাচ্চাগুলোকে খাওয়াতে গেল। যাওয়ার সময় মনোজের ঘরে একবার উঁকি দিল। আর মনে মনে বলল' একি রে বাবা টেবিলের কা'ছে মাথা রেখে ঘুমোচ্ছে, কি ব্যাপার ?কি হল? তারপর ভাবলো "না যাই একবার বাচ্চাগুলোকে খাইয়ে এসে ঘরে ঢুকে দেখি তিনি কি করছেন?'
বাচ্চাগুলো খাবার খাইয়ে এসে ওদের থালাগুলো বেসিনে  রেখে, চা নিয়ে ঢুকলো মনোজের ঘরে।
কাছে গিয়ে মনোজকে ধাক্কা দিয়ে বলল ' কি ব্যাপার এভাবে ঘুমাচ্ছ কেন ?সারারাত কি এভাবে ঘুমিয়েছো?'
মনোজ ঝাঁঝালো কন্ঠে বলল 'কেন আমি তো ঘরে কাজ করতে এসেছি ,ঘুমাবো কেন সারারাত এখানে বসে?'
মনোজের কথা শুনে রেখা হতভম্ব হয়ে গেল  কি বলতে চাইলও আর কি মানে হয়ে গেল।
মনে হল যেন চোর ধরা পড়ে গেছে তাই সাফাই গাইছে।
রেখা শুধু বলল 'আমি এভাবে বলতে চাই নি, তুমি যেভাবে বলছো?
মনোজ বললো' সকাল সকাল এত জ্ঞান দিওনা।'
রেখা ও কেমন যেন একটু রেগে গেল বলল' এই তুমি এভাবে কথা বলছ কেন ?আমি কি এমন বলেছি তোমায়?'
মনোজ হঠাৎই বলে উঠলো 'অসভ্য মেয়ে মানুষ।'
রেখার পা থেকে মাথা পর্যন্ত কথাটি শুনে গা ঘিনঘিন করে উঠলো। আর বলল "তোমার মাথা ঠিক নেই  ।কাকে, কি কথা বলতে হয়, সেটা তুমি শেখো নি।'
মনোজ বলল'' না না এখন তোমার কাছ থেকে শিখব ,এটা তোমার ক্লাস রুম নয়।'
রেখা বলল 'তুমি আমাকে কি ভাবো বলতো?'
মনোজ বলল' কি ভাবি সেটা তো বলেই দিলাম।'
রেখা আর  নিতে পারল না। 
বলল 'আমি এভাবে কথা শুনতে অভ্যস্ত নই  আমাকে এভাবে বলবে না।'
মনোজ বলল" সেটা তুমি যা ভালো বোঝো তাই করবে।"
আর কোন কথা বাড়ালো না শুধু বলল 'ছি: তুমি আমার স্বামী হয়ে এসব কথা বলছো ছি: ছি: 
ছি :।
রেখা ভাবছে' কি এমন সে করেছে যার জন্য মনোজ এ ভাবে বলল।'
তাছাড়া কাজের মাসি এসে যাবে । এসময় ওর কাছে না থাকাই ভালো ।আরো কি ছাইপাশ বলে দেবে তার ঠিক-ঠিকানা নেই। আজকাল এরকমই ব্যবহার করছে। কালকেই তো শাশুড়ি মার ওখান থেকে ঘুরে আসল। ওখান থেকে কিছু কি হয়েছে?
আজও সেই পৌষ সংক্রান্তি। আজই ঘটেছিল রেখার জীবনে আর এক দাগী অধ্যায়। 

আজ আবার পৌষ সংক্রান্তি  আগের দিন অনেক নিয়ম-কানুন ছিল ,সেগুলো করেছে  আজও রয়েছে কিছু নিয়ম। তবুও মনে থেকে যায় সে কলঙ্কিত জীবনের কাহিনী।
মনে পড়ে মকর সংক্রান্তির আগের দিন সকাল থেকেই" রেখার শাশুড়ি মা নানা কারণে ঝগড়া করার ইস্যু খুঁজছিলেন। হঠাৎই দোতলা থেকে এসে যখন নিজের রুমে তিন তলায় ঢুকে যাবেন তখন রাঁধুনিকে শুনিয়ে বলছেন  'আমার দুয়ারের সামনে কেন এত নোংরা ,এত জল। পরেরদিন মাসি আসুক 
কাজে ,জিজ্ঞেস করবো 'ঘর সামনে মুছেনি আদবে কথাগুলো যে রেখাকে শুনিয়ে বলা রেখা সেটা বুঝতে পারে কিন্তু রেখা মানতে পারে না যে ,একটা কাজের মেয়ে সে গরীব হতে পারে কিন্তু তারও একটা মূল্যবোধ তার আত্মসম্মান আছে ।কারণ সে তো কাজে ফাঁকি দেয়  নি ।সে ভালোমতোই করে গেছে কিন্তু যেহেতু ওটা ফ্রন্ট প্যাসেজ তাই যাতায়াতের সময় পায়ে পায়ে  জলময় হয়েছে হয়তো  সে দোষটা কিন্তু কাজের মাসির নয় ।তাই যখন শাশুড়ি মা ওইসব কথা বললেন, তখন রেখা চুপ করে থাকতে পারে নি।
' রেখা তখন রাঁধুনিকে লক্ষ্য করে বলেছে 'কোথায় কি নোংরা আছে দেখি।l আমি মুছে দিচ্ছি '
 রাধুনি  বলল '' হয়তো ভুলে গেছে.
 তখন রেখা বলল না মাসি কিন্তু কাজে ফাঁকি দেয় না। মাসি ঠিকঠাকই মুছে গেছে, পায়ে  পাই হয়তো জল জল হয়েছে ।যাই হোক সেই অবস্থায় তুই ব্যাপারটা থেমে গেল কিন্তু তুষের আগুন জ্বলে উঠল ঠিক সন্ধ্যেবেলায়। ঠিক সন্ধে বলা যায় না ।রাত আটটা নাগাদ রেখার শরীরটা ভাল ছিল না । মেয়েলি প্রবলেম থাকার জন্য শুভ কোন জিনিসে করতে পারবে না ।কিন্তু নিয়মকানুনগুলো করতে হবে ।ওদিকে শাশুড়ি মা কিন্তু কোন নিয়ম-কানুন এর ধার ধারে না অথচ লোকের কাছে তিনি বলেন এ বাড়িতে যে বউ এসেছে কোন নিয়ম কানুন সে করে না ।ফলে আগে যে মেয়েটি কাজ করত হঠাৎ সে দেখা করতে আসে। বিয়ে হয়ে গেছে শ্বশুরবাড়ি থেকে এসেছে বাপের বাড়িতে ।রেখার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেলো ,সে তো ভেবেছিল যে পাড়াতুতো ভাইপো এসেছিল চালের গুড়ি দিতে আর নতুন পিঠার সাজ দিতে ,যাতে পিঠে করা হয় ।সে পিঠের সাজ পোড়াতেই হবে ,না হলে সারা বছর পিঠে করা যাব না ।পিঠে খাওয়া যাবে না ,এটা নিয়ম। তাছাড়া অনেক কিছু নিয়ম আছে পিঠে করে সেগুলো করতে হয়। আলপনা দিতে হয় লক্ষ্মী মায়ের আরাধনা করতে হয়। কাজের মেয়ে কৃষ্ণা যখন আসে তখন রেখা বলে কৃষ্ণা একটা কাজ করে দেবে গো? কৃষ্ণা বলল কি কাজ বৌদি?
রেখা বলল ' আজকে তুমি আমাকে একটু আলপনা দিয়ে যাবে আমিতো ছুতে পারব না মোমবাতি জ্বালাতে হবে ধান ,দূর্বা ,সিঁদুর দিতে হবে। ছাদে গিয়ে আলপনা দিয়ে সাজিয়ে পিঠে, খড়, দূর্বা সিঁদুর দিয়ে মা লক্ষ্মীর আরধনা করতে হবে।
আর ঘরে ঘরে একটু আলপনা দিয়ে দিতে হবে।
কৃষ্ণা বলল ' এ আবার কি কঠিন কাজ নিশ্চয়ই করে দেবো। বৌদি  আমাকে একটু দেখিয়ে দিও ।'
রেখা বলল' হ্যাঁ ,সে তো দেখিয়ে দেব আমি শুধু ছুঁতে পারব না ।সেইজন্য বলা। আর তাছাড়া ভাইপো আছে তোমাকে সাহায্য করবে।
যেমনি বলা তেমনি কাজ। ওরা ঠিক যথারীতি আলপনা দিয়ে সব নিয়ম রীতি সব করে দিয়ে গেল শাখ বাজিয়ে দিয়ে গেল। ওরা যেতে না যেতেই মনোজ যখন ঘরে আসলো ,একটা কি কাজে  মনোজকে ডেকে আমার শাশুড়ি মা বললেন 'দেখো আমার দুয়োরের সামনে দেখো কি অবস্থা ?দরজার থেকে বেশ খানিকটা দূরেই একটা চালের জায়গা সেটা কে ওরা সরিয়ে রেখেছিল   ।দেখে যা কি সব কাণ্ড। তখন মনোজ বলেছিল ' তোমার দরজার কাছে তো নেই। বেশ খানিকটা তো দূরেই 
আছে ।তাতে কি অসুবিধা হচ্ছে তোমার? যদি অসুবিধা হয় এটা যে রেখেছে তাকে বল সরিয়ে দিতে।
শাশুড়ি মা বলেন 'বাবা ব'লে মরবো নাকি ?এতে আগুন জ্বলে যাবে।'
মনোজ বলে 'তুমি এসব কি কথা বলছো মা ,আগুন জ্বলবে কেন?'
মা বললেন _তুই জানিস না বাড়িতে কি সব কাণ্ড করে বেড়ায় তোর বউ?'
রেখা ঘর থেকে সব শুনতে পাচ্ছে কিন্তু কিছু বলছে না।
যখন আবার ঐ একই কথা রিপিট করে যাচ্ছে এ বাড়িতে টেকা দায় হয়ে দাঁড়াবে ।
ঠিক তখনই রেখা গিয়ে বলে ' 'কি সমস্যা হয়েছে আপনার। এটা তো আপনার কোন সমস্যা করছে না, আর এইখানে জায়গা কোথায় বলুন ?কোথায় 
রাখবো ?সেই নিয়ে কি ভাষl শব্দ ব্যবহার করল ভাবতে অবাক লাগছে । বলল 'অসভ্য ঘরের মেয়ে বাড়িতে এসে হার মাস  জালিয়ে ,পুড়িয়ে, খাক করে দিল।  অলক্ষীও
বলল । লক্ষ্মীর আরাধনা হচ্ছে ঠিক, ঐদিনই রেখাকে  কিভাবে নানা কটু কথায় হেনস্থা করতে লাগল ।
তখন রেখা বলেছিল একটা কথা আপনি এভাবে অসভ্য মহিলা অসভ্য মহিলা বলবেন না খারাপ লাগে শুনতে ।এটা ঘুরিয়ে যদি আপনাকে বলা হয়।
 এই কথা নিয়ে শুরু হয়ে গেল অশান্তি ।ননদকে ফোন করে কাঁদতে কাঁদতে এত চিৎকার করে বলছেন। পাড়ার লোকও শুনতে পাচ্ছে আর তারপর শুরু হয়েছে রেখার নামে নানা ধরনের আজেবাজে কথা ।ভেবেই পেল না যে, সে কি কাজটা 
করেছে ?সে তো বাড়ির মঙ্গলের জন্য এসব করেছে।
 সে তখন বলল  'ঠিক আছে আমি মুছে দিচ্ছি সব ।তাতে তো আপনার শান্তি হবে ।আপনার বয়স হয়েছে এভাবে উত্তেজিত হবেন না। দরজা দিয়ে আসতে  যাচ্ছে এমন সময়জোরে দরজা ধাক্কা মারলো শাশুড়িমা। ভাগ্যিস রেখা হাত সরিয়ে নিয়েছিল। সরিয়ে না নিলে রেখার হাত কেটে বাদ হয়ে যেত।
মনোজ প্রচন্ড অশান্তি শুরু করল রেখার সাথে ।
রেখাভেবে পায় না যে তার দোষটা কোথায়? সে কি 
করেছে ?আসলে রেখার জীবনের প্রাপ্তি এটা নয় ।রেখা ভাবে সে চূড়ান্ত ভুল করেছে এই পরিবারে বিয়ে করে এসে। তার মনের প্রশান্তির সে কখনো খোঁজ পায় নি ।যখন স্বামীর কাছ থেকে একটু ভালোবাসা পেতে শুরু করেছে ।ঠিক তখনই দেখা গেছে কোন না কোন  কারনে মনোজের বুনোরাগ হঠাৎ করে এসে হাজির হয়ে সবকিছু লন্ডভন্ড করে দিয়েছে ।রেখার জীবনে আজও ঠিক তাই 
হলো ।রেখার দু-চোখে শুধু জল গড়িয়ে পড়তে লাগল।

কবি শিবনাথ মণ্ডল এর কবিতা




শিক্ষার অবদান
 শিবনাথ মণ্ডল


ওই দেখ মা ছেলে মেয়ে
যাচ্ছে বিদ‍্যালয়ে
শ্রেণী কক্ষে ঢুকবে সবাই 
জাতীয় সঙ্গীত  গেয়ে।
মাগো আমি স্কুলে যাব
দাওনা ভর্তিকরে
ছুটি হলেই তোমার কোলে
আসবো আমি ফিরে।
আমি যখন বাড়ি ফিরব
ব‍্যাগটি কাঁধে করে
তুমি তখন দাঁড়িয়ে থেকো
ওই রাস্তার ধারে।
লেখাপড়ার বিকল্প নেই মা
এই বিশ্বের মাঝে
ছোটো থেকে বড় হওয়ার
একটায় সুযোগ আছে।
মা বলে সোনাছেলে আমার
দারুণ শিক্ষা দিলে
সব মায়েদের কোলে যেন
আসে এমন ছেলে।।

কবি পারভীন শীলা'র কবিতা




আজও খুঁজে ফিরি 
পারভীন শীলা 

এখনো এইখানে অনেক কিছু আছে তুমি ছাড়া।
রৌদ্রছায়া_নীলাভ আকাশ_মস্ত বড়ো ময়দান, 
ফলবতী বৃক্ষ_উঁচু পাহাড়_সুউচ্চ মিনার-মন্দির,
রাত্রি -দিন_ চিন্তার আবেগ_ স্বপ্নের সোপান_ সব আছে_শুধু তুমি নেই!
তবুও তোমাকেই যেন খুঁজে ফিরি মিলনেই।

কত সাম্রাজ্য ভেঙে গেছে
কত উত্থান-পতন হয়েছে সমাজের
কত নীল-নীলান্ঞ্জনা এসেছে সবুজের মাঠে
কত পানকৌড়ি পড়েছে বিলের ধারে
আবার ফিরে গেছে দেহ নিয়ে তারা
প্রেম বিরহ তখনও ছিলো এখনো আছে ঢের,
তারপরও তোমাকেই যেন খুঁজে ফিরি 
আমি-আমরা_এই রৌদ্রছায়ার উপর ফের।

কবি নীলাঞ্জন কুমার এর কবিতা




জেল্লা জমক 

নীলাঞ্জন কুমার 


দেখে শুনে তন্ময় আছি জেল্লা জমকে, 
কোথা থেকে চিত্রকাব্য হয়ে যায় ।
তাকে নিয়ে পণ্য করে অসহ্য সময় । 
তুমি আমি তো তাতেই মশগুল ।


সুন্দর-ই মুখ্য । বাকি সব হাস্যকর ।
হিসেবী উচ্চারণে  তখন হাজারো ওলটপালট ।


জমকালো সবকিছু শুধু চোখে । ক্ষণিকের ।

শামীমা আহমেদ এর ধারাবাহিক উপন্যাস ৫৭





শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত 
(পর্ব ৫৭)
শামীমা আহমেদ 

আরাফের ক্রমাগত বাবা বাবা  ডাকেও শিহাবএকেবারেই নিরুত্তর ও নির্জীব হয়ে রইল।রিশতিনা একদৃষ্টে শিহাবের দিকে তাকিয়ে রইল।শিহাব দেখতে আগেরমত তেমনি সুন্দর আছে। আজ প্রায় চার বছর পর সে শিহাবকে দেখছে।এর মাঝে কোনদিনও আর এক মূহুর্তের জন্য তাদের দেখা বা কথা হয়নি।রিশতিনার চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় কান্না নেমে আসছে। 
বাবা বাবা ডেকে ডেকে  আরাফ একটু একটু করে বিছানার কিনারায়  চলে এলো। যে কোন মুহুর্তে সে একটা দূর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলবে।এই দৃশ্যে  শিহাব যেন  হুশে ফিরে এলো।শিহাব দৌড়ে গিয়ে আরাফকে বুকে জড়িয়ে নিলো।
প্রচন্ড ভয় পেয়েছে সে! আরাফ বাবার বুকে একেবারে খাঁমচে ধরে মিশে রইল। শিহাব যেন প্রাণ ফিরে পেলো।সারাটা সপ্তাহ সে ছেলেটাকে না দেখে থাকে। এমনকি ফোনেও কথা কম বলে। আরাফের মুখে বাবা ডাক শুনলে সে নিযেকে স্থির রাখতে পারেনা। আর মা হয়ে চার চারটি বছর পর আজ সন্তানকে দেখতে আসা? মায়ের অধিকার নিয়ে কথা বলা। যেখানে আবার  আরেকজনের সাথে  নতুন সংসার করছে
সেখানে আরাফকে ছেলের দাবী নিয়ে কেন আসা? আর স্বামীর প্রতি কি এমন দ্বায়িত্ব সে দেখিয়েছে। সে লন্ডনে যেতে না চাইলে কেউ কি তাকে জোর করে নিতে পারতো ?  শিহাবের ভেতরে এতদিনের যত ক্ষোভ রাগ আর অভিমান একসাথে হয়ে রিশতিনার প্রতি তা ঘৃণা হয়ে বেরিয়ে এলো।
রিশতিনা চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে শিহাবের
খুব কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।  শিহাব তা বুঝতে পেরে এক ঝটকায় দূরে সরে গেলো। আর বেশ স্পষ্ট করে  বলতে থাকলো,না আরাফ আমার সন্তান।শুধু আমার সন্তান। তুমি ওর কেউ না।আমি আরাফের বাবা।
রিশতিনা বলে চললো, শিহাব তুমি আমার সম্পর্কে ভুল জেনেছো।আমি কাউকে বিয়ে করিনি।বাবা শত চেষ্টা করেও আমাকে দ্বিতীয় বিয়ে করাতে পারেনি। আমি বাবাকে শুধু পড়াশুনার দোহাই দিয়ে বিয়ে  ঠেকিয়েছি।
তাদের নজরদারীর ভিতরেও আমি শুধুই তোমার কথাই ভেবেছি।
রিশতিনার কোন কথাই শিহাব যেন শুনছে না।বিশ্বাস করতে চাইছে না। রিশতিনা অবিরল ধারায় কেঁদেই চলেছে।
বলেই চলেছে, শিহাব তোমাকে আমি একদিনের জন্যও ভুলিনি। তোমার আমার জীবনে যা ঘটেছে তা আমার বাবার জন্যই হয়েছে।আজতো সে  আর বেঁচে নেই। তাইতো আমার সংসারে আমি ফিরে এসেছি।
রিশতিনার সাথে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনা শিহাবকে তিলে তিলে কষ্ট  দিয়েছে।  কত কত রাত সে একা একা কেঁদেছে। ছোট্ট শিশুটি মেয়ের দুধ বঞ্চিত হয়েছে।বন্ধুবান্ধব, আত্মীয় স্বজনদের কাছে তাদের পরিবারকে ছোট হতে হয়েছে।তবুও সেইসব দুঃসহ স্মৃতি নিয়েই সে একরকম মৃতপ্রায় জীবন কাটিয়েছে।সে আর সেইসব দুঃসহ স্মৃতিতে  ফিরে যেতে চায় না। রিশতিনার পারিবারিক মর্যাদা  তাদের চেয়ে অনেক উচ্চে।তার বাবা ব্যারিস্টার ছিল।ভীষণ  অহংকারী  এবং ক্ষমতার দাপুটে ব্যক্তি বারংবার শিহাবদের পরিবারকে অপমান করেছে। শিহাব ভেবে নিলো,রিশতিনাকেও তাদের সেই পারিবারিক  অবস্থানেই থাকতে হবে।শিহাব আর পিছনে ফিরে তাকাতে চায় না। বাবা মাকে এই শেষ বয়সে সে আর আহত করতে চায়না।
শিহাবের জীবন আজ অন্য ধারায় বয়ে গেছে।তার জীবনে শায়লা এসেছে। শায়লাই হবে আরাফের মা।শিহাব রিশতিনাকে ফিরে যেতে বললো।  
রিশতিনা তুমি তোমার মৃত বাবার ইচ্ছে পূরণ করে তার আত্মার শান্তি দাও। তোমাদের পরিবারে ফিরে যাও।
---আর আমার জীবনের শান্তি?রিশতিনার পালটা প্রশ্ন।
সে তুমি তোমার মত করে খুঁজে নাও।বারবার তুমি আমার জীবনটাকে এলোমেলো করে দিও না। আমি জীবনে খুব গোছানো মানুষ  ।তুমি  বারবার তা তছনছ করোনা।
রিশতিনাকে হারিয়ে শিহাব যতটা কাতর ছিল শায়লাকে পেয়ে আজ যেন ততটাই দৃঢ় হয়েছে।কিছুতেই সে আর পিছু ফিরবে না। রিশতিনাকেও  সে আর কোন বাঁধনে বাঁধবে  না।
রিশতিনা শিহাবের হাত ধরতে চাইলে শিহাব তা হতে দিলো না। রিশতিনা ভীষণ অবাক হয়ে শিহাবের দিকে তাকালো।
টেবিলের উপর রাখা রিশতিনার হ্যান্ডব্যাগে মোবাইল বেজেই যাচ্ছে। রিশতিনা তা রিসিভ করছে না। শিহাবের কাছে তার কোন আকুতিই যেন খাটছে না।
রিশতিনা এই ভেবে ভীষণ অবাক হচ্ছে এমন করে শিহাব তাকে ভুলে গেছে!সরিয়ে দিতে চাইছে! অনেক আশা নিয়ে সে আজ এসেছিল। 
শিহাব তার অবস্থানে স্থির রইল। সে এখন বেশ বুঝতে পারছে কেন বাড়িতে প্রতিটা মানুষ এমন থমথমে ভাব নিয়ে ছিল।ভাবী এত আতংকিত ছিল।
রিশতিনা ফোনের দিকে এগিয়ে গেলো।
হ্যান্ডব্যাগটির পাশে আজো শিহাব আর রিশতিনার বিয়ের দিনের ছবিটির ফটোফ্রেম রাখা।  রিশতিনা ফ্রেমটি হাতে তুলে নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লো। সেই দিনের সেই আবেগের মূহুর্তের ছবিটি আজ কতটাইনা মিথ্যা হয়ে গেলো।শিহাব অনেক বদলে গেছে।আর ভাবলো,যাবেই তো আমি তো তাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। 
রিশতিনা ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করলো।রিশতিনার মায়ের ফোন।মেয়েকে বাসায় না পেয়ে ফোনে খোঁজ করছেন।রিশতিনার অভিব্যক্তিতে বুঝা গেলো ওপাশ থেকে মায়ের  বেশ বকাঝকাই হচ্ছে। রিশতিনা চুপ করে সবটা শুনে নিলো। শুধু বললো, আচ্ছা। 
রিশতিনা এখন ভেবে নিলো , রোমেল ভাইয়ার কাছে তাহলে যা শুনেছে সেটাই ঠিক। শিহাব এখন অন্য একজনকে ভালোবাসে। রোমেল ভাইয়ার এমন খবরের সত্যতা পেতেই রিশতিনার ছুটে আসা।তবে সে কোনদিনই ভাবেনি শিহাব তাকে ফিরিয়ে দিবে। সন্তান রেখে কত মায়েরাইতো আজকাল চাকরীর জন্য,উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে যায়, তাতে কি সন্তানের অধিকার হারায়? তবে রিশতিনার যাওয়াটাতো সেরকম সহজ কিছু ছিল না। অমন দুধের শিশুকে সে ছেড়ে গেছে এটাতো তার বিরাট অন্যায় হয়েছে। রিশতিনার সব ক্ষোভ গিয়ে পড়ে তার বাবার উপর।এখন মাও তাকে রেহাই দিচ্ছে না। রিশতিনা এটাও ভাবে শিহাব যদি তাকে সেদিন জোর করে ছিনিয়ে আনতো, তবে তো আজ তাদের জীবন অন্যরকম হতো। 
আরাফ ভীষণ ভয় পেয়েছে।! যদিও অনেক খেলনা পেয়ে আর রিশতিনেকে মা জেনে সে খুব খুশি হয়েছিলো কিন্তু হঠাৎ করে অজানা একজন মানুষ এসেছে  যাকে মা ডাকতে হয়েছে আবার  তার সাথে বাবার ঝগড়াও হচ্ছে! এসব ভেবে আরাফ ভয়ে একেবারে শক্ত হয়ে বাবার পিঠে পড়ে আছে। সে এখন তার চাচী আর দাদীর কাছে যেতে চাইছে।সে ভাবছে, এতদিনতো তাদের কাছে আমি ভালোই ছিলাম।শিশুমন কখনোই বাবামায়ের কলহ মেনে নিতে পারে না।বাবা মায়ের মাঝে বৈরীভাবে সন্তানেরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে।
শিহাবের ভাবী সুমাইয়া উপরে চলে এলো। আজ সকালে হঠাৎই রিশতিনার আগমনে সেও ভীষণ চমকে গেছে! ওদিকে শিহাব আসতে চাইছে শায়লাকে নিয়ে, সে আগেই বুঝেছিল এমন একটা  পরিস্থিতি হতে পারে।সুমাইয়া দরজায় আসতেই আরাফ বাবার কোল থেকে তার দিকে হাত বাড়িয়ে যেতে চাইছে। বুঝ হওয়ার পর থেকে আরাফ যাকে মা বলে জেনে এসেছে সে তো সুমাইয়াই।সুমাইয়ারও আরাফের জন্য বুকটা খাঁ খাঁ করছে। সে দ্রুত গিয়ে শিহাবের কাছ থেকে আরাফকে রীতিমতো ছিনিয়ে নিলো। আরাফ সুমাইয়ার কোলে গিয়ে শুধু দাদীর ঘর দেখাচ্ছে। সে দাদু দাদু বলছে।সুমাইয়া শিহাবের কাছে জানতে চাইলো, শিহাব তুমি কি সিদ্ধান্ত নিয়েছো? সন্তান তোমাদের। আমিতো নিয়ে যেতে পারি না।

এবার, রিশতিনা এগিয়ে এলো, বেশ অপরাধীর মত বললো, ভাবী,মা হয়েও আমি নিজ সন্তানকে ফেলে গেছি।কেন কোন কার্যকারণে, কার চাপে সবই আপনাদের জানা। আর আজ যখন সব পিছে ফেলে আবার আমি তোমাদের কাছে ছুটে এলাম, তোমরা আমাকে ফিরিয়ে দিলে।ভালোই হলো।আমার নিজের দোষ আমি কাটিয়ে গেলাম। আমার সন্তানের নাম আরাফ,,সেটাও আমার অজানা ছিল,আজ জানলাম। তুমিই ওকে মায়ের আদরে বড় করেছো।আমার স্বামীর প্রতিও আমি দায়িত্ব পালন করিনি,কোন অধিকারেই আমি তোমাদের কাছে গ্রহনযোগ্য নই।আর যার কাছে অধিকার ছিল সেও বদলে গেছে। সে আজ অন্য কারো হয়ে গেছে। আমার যা হারাবার তা হারিয়ে গেছে। আমার বাবা 
আর মায়ের ইচ্ছা পূরনেই আমার জীবনকে উৎসর্গ করে যাবো। তবে মনে এতদিন এটাই শান্তি ছিল যে, ভাবী, তুমি আরাফকে মায়ের আদরে বড় করছো। তবে  আজ অন্য কেউ আরাফের মা হতে চাইছে তাই খুবউ উৎকন্ঠা নিয়ে  যাচ্ছি। অন্য একজন কেউ কি  আরাফের সত্যিকারের মা হয়ে উঠতে পারবে? তবে মনে হচ্ছে তার মনে অনেক শক্তি নয়তো কেমন করে সে শিহাবের মন থেকে আমাকে একেবারে মুছে দিয়েছে।
ভাবী তোমরা ভালো থেকো।আমার ছেলে বড় হয়ে নিশ্চয়ই কোন একদিন তার জন্মদাত্রী মায়ের খোঁজ করবে আর নাড়ীর টানে তার কাছে পৌঁছে যাবে। কথাগুলো বলেই, রিশতিনা হ্যান্ডব্যাগটি হাতে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। যাবার আগে আরাফকে ছুয়ে দেখতে চাইলেও তা যেন ভবিষ্যতের জন্যই জমা রাখলো। চোখে মুখে একটা সোনালী দিনের স্বপ্ন নিয়ে রিশতিনা ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। আরাফ  ছোট্ট ভীত পাখির ছানার মত চাচীর বুকে একেবারে যেন মিশে রইল।
সুমাইয়া শিহাবের পিঠে হাত রাখল।শিহাব ঝরঝর করে কেঁদে ফেললো। শিহাব এতক্ষন যা করেছে সবই এতদিনের জমানো রাগ অভিমানেরই বহিঃপ্রকাশ!  রিশতিনাকে শিহাব কতটা ভালোবাসতো সেতো ভাবীর চেয়ে বেশি কেউ জানতো না। সুমাইয়ারও চোখ ভিজে উঠলো।শিহাব তার দেবর হলেও সে তাকে একেবারে নিজের ভাইয়ের মতই দেখে। রিশতিনাকে নিয়ে শিহাবের এমন কোন কথা সুমাইয়াকে বলেনি তা হয়নি।
সুমাইয়া বেশ বুঝতে পারলো শিহাব কতটা কষ্টে দিনে দিনে এমন পাথর হয়েছে। যেভাবেই হউক শিহাব নিজে থেকে একটা সিদ্ধান্তে এসেছে এটাতেই সুমাইয়ার স্বস্তি! সে শিহাব আর আরাফকে তার শ্বাশুড়ির ঘরে এগিয়ে নিলো। শিহাব বুঝতে পারছে না, সে কি কাজটি ঠিক করলো কিনা? রিশতিনার জন্য তার ভেতরে দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। শিহাব ধীর পায়ে সুমাইয়াকে অনুসরণ করে মায়ের ঘরের দিকে পা বাড়ালো।
যদিও শিহাবের মা বেশ শক্ত করে শায়লার হাতটি ধরে ছিলো  তবুও  অনেকক্ষন শিহাবের দেখা না পেয়ে শায়লা বারবার ভীত হরিণীর মত দরজার দিকে চোখ ফেলছিল।
চলবে.....