০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২

মমতা রায় চৌধুরী'র ধারাবাহিক উপন্যাস ১০১






উপন্যাস 

টানাপোড়েন ১০১

বুনোঝড়

মমতা রায় চৌধুরী


রেখার বেখেয়ালী মনে উঠেছে অতীতের ঢেউ সেসব ঢেউয়ের উচ্ছ্বাসে  কখন যে ভোর হয়ে গেল বুঝতেই পারে নি। জানলার ফাঁক দিয়ে সূর্যের কিরণ তেরচাভাবে ভাবে এসে পড়েছে। চমক ভাঙ্গে।
অন্যদিকে  তুলি ,পাইলট এত জোরে চেঁচাচ্ছ যে আর বিছানায় শরীরটাকে রাখতে পারল না। কান খাড়া করে শুনল। ওদের আওয়াজটা কি ধরনের আওয়াজ অনুধাবন করার চেষ্টা করলো ।এই আওয়াজ এর মধ্যে দিয়ে বোঝা যায় ওরা কি চাইছে, কি করছে? এখনকার আওয়াজ এর মধ্যে পরস্পর পরস্পরের প্রতি একটা আক্রমণাত্মক মনোভাব প্রকাশ পেল ।
রেখা ভাবে 'এরা তো খুব সুন্দর মিলেমিশে থাকে। তবে মাঝে মাঝে এতটা রেগে যায় কেন, কে জানে? '
রেখা উঠে পরল দরজাটা খুলেই দেখতে পেল  মনোজের ঘরে আলো জ্বলছে ।
ওদিকে যেতে গিয়েও মিলি ,তুলি ,পাইলটদের চিৎকারে ,আগে সেদিকটায় গিয়ে ধমক দেয়' তুলি ,পাইলট এত গলার আওয়াজ কেনো? 
একটু চুপ করে গেল। তারপর প্রত্যেকে যেন কিছু বলতে চাইল ।পরস্পর পরস্পরের অভিযোগ জানাতে শুরু করলো । রেখা গ্রিলের ফাঁক দিয়ে হাত দিয়ে প্রত্যেকের মাথায় আদর করে
 দিল ।তারপর চলে আসলো  ।
রেখা দ্রুত ছুটল বাথরুমের দিকে। এত জোরে বাথরুম পেয়েছে বলার অপেক্ষা রাখে না।
বাথরুম থেকে একেবারে প্রাতঃক্রিয়া ও  অর্ধস্নান সেরে ফ্রেশ হয়ে গোপালকে তুলল ,গোপালের ভোগ নিবেদন করলো।
গোপালের কাছে প্রণাম করে প্রার্থনা করল'   'হে ঈশ্বর সকলকে ভাল রেখো। সারাদিনটা যেন ভালো যায়।'
আজ কাজের অত তাড়া নেই। নূতন কাজের মাসি লেগেছে। অবশেষে সুমিতাকে বিদায় করা গেছে। মাসি বয়স্ক হলেও গুছিয়ে কাজ করে।
 সুমিতার মতো ফাঁকিবাজ নয়। অথচ প্রথম দিন যখন এই মাসিকে কাজে নিয়ে আসে মনোজ, রেখা তখন একটু বিরক্ত হয়েছিলো। মাসির সামনে কিছু বলে নি ঠিকই।
 কিন্তু পরে বলেছিল বাজখেকো গলায় 'সুমিতাকে নিয়ে এত ভুগলাম আবার নিয়ে এসেছ এই বয়স্ক মাসিকে।ভালো লাগে না ছাই।'
 মুখ গম্ভীর করে রেখা চলে এসেছিলো নিজের ঘরে।
পরে মনোজ এসে  নিজেকে দেখিয়ে আশ্বাস দিয়ে বলেছিল' আমার উপর বিশ্বাস রাখ ,আমার
 উপর । এ মাসি সুমিতার মত হবে না।'তারপর রেখার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিল।'
মাঝে মাঝে মনোজের রোমান্টিক আবেগে রেখা ভেসে যেতে চায় কিন্তু আবার মাঝে মাঝে ওর মাথায় কি যে ঘুনপোকা ধরে কে জানে?
রেখা আজ বুঝতে পারে ' মনোজ ঠিক কথাই বলেছিল । এ মাসি সত্যিই ভালো।'
সুমিতা থাকলে এতক্ষণ বসে বসে ভাবার কোন স্কোপ ছিল? বাপরে বাপ সারাক্ষণ টেনশন আর টেনশন ।সকাল থেকে উঠে নাকানি-চোবানি খেতে হতো।
  ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে সাতটা বাজে আপন মনে বলে উঠল' এ বাবা এত বেলা হয়ে গেছে মাসি আসার সময় হয়ে গেছে ।'
রান্নাঘরের দিকে গেল মাসির জন্য চা করতে হবে, নিজেদের জন্যও করতে হবে।  জলটা কাপ মেপে মেপে প্যানে দিল ফোটাতে , সঙ্গে আদা গোলমরিচ, লবঙ্গ ,তুলসী পাতা দিয়ে দিল একটু থেঁতো করে। গ্যাসের অন্য চুলায় দুধ গরম করতে বসিয়ে দিল , আটার লেচি কেটে রুটি বানিয়ে বাচ্চাগুলোকে খাওয়াতে গেল। যাওয়ার সময় মনোজের ঘরে একবার উঁকি দিল। আর মনে মনে বলল' একি রে বাবা টেবিলের কা'ছে মাথা রেখে ঘুমোচ্ছে, কি ব্যাপার ?কি হল? তারপর ভাবলো "না যাই একবার বাচ্চাগুলোকে খাইয়ে এসে ঘরে ঢুকে দেখি তিনি কি করছেন?'
বাচ্চাগুলো খাবার খাইয়ে এসে ওদের থালাগুলো বেসিনে  রেখে, চা নিয়ে ঢুকলো মনোজের ঘরে।
কাছে গিয়ে মনোজকে ধাক্কা দিয়ে বলল ' কি ব্যাপার এভাবে ঘুমাচ্ছ কেন ?সারারাত কি এভাবে ঘুমিয়েছো?'
মনোজ ঝাঁঝালো কন্ঠে বলল 'কেন আমি তো ঘরে কাজ করতে এসেছি ,ঘুমাবো কেন সারারাত এখানে বসে?'
মনোজের কথা শুনে রেখা হতভম্ব হয়ে গেল  কি বলতে চাইলও আর কি মানে হয়ে গেল।
মনে হল যেন চোর ধরা পড়ে গেছে তাই সাফাই গাইছে।
রেখা শুধু বলল 'আমি এভাবে বলতে চাই নি, তুমি যেভাবে বলছো?
মনোজ বললো' সকাল সকাল এত জ্ঞান দিওনা।'
রেখা ও কেমন যেন একটু রেগে গেল বলল' এই তুমি এভাবে কথা বলছ কেন ?আমি কি এমন বলেছি তোমায়?'
মনোজ হঠাৎই বলে উঠলো 'অসভ্য মেয়ে মানুষ।'
রেখার পা থেকে মাথা পর্যন্ত কথাটি শুনে গা ঘিনঘিন করে উঠলো। আর বলল "তোমার মাথা ঠিক নেই  ।কাকে, কি কথা বলতে হয়, সেটা তুমি শেখো নি।'
মনোজ বলল'' না না এখন তোমার কাছ থেকে শিখব ,এটা তোমার ক্লাস রুম নয়।'
রেখা বলল 'তুমি আমাকে কি ভাবো বলতো?'
মনোজ বলল' কি ভাবি সেটা তো বলেই দিলাম।'
রেখা আর  নিতে পারল না। 
বলল 'আমি এভাবে কথা শুনতে অভ্যস্ত নই  আমাকে এভাবে বলবে না।'
মনোজ বলল" সেটা তুমি যা ভালো বোঝো তাই করবে।"
আর কোন কথা বাড়ালো না শুধু বলল 'ছি: তুমি আমার স্বামী হয়ে এসব কথা বলছো ছি: ছি: 
ছি :।
রেখা ভাবছে' কি এমন সে করেছে যার জন্য মনোজ এ ভাবে বলল।'
তাছাড়া কাজের মাসি এসে যাবে । এসময় ওর কাছে না থাকাই ভালো ।আরো কি ছাইপাশ বলে দেবে তার ঠিক-ঠিকানা নেই। আজকাল এরকমই ব্যবহার করছে। কালকেই তো শাশুড়ি মার ওখান থেকে ঘুরে আসল। ওখান থেকে কিছু কি হয়েছে?
আজও সেই পৌষ সংক্রান্তি। আজই ঘটেছিল রেখার জীবনে আর এক দাগী অধ্যায়। 

আজ আবার পৌষ সংক্রান্তি  আগের দিন অনেক নিয়ম-কানুন ছিল ,সেগুলো করেছে  আজও রয়েছে কিছু নিয়ম। তবুও মনে থেকে যায় সে কলঙ্কিত জীবনের কাহিনী।
মনে পড়ে মকর সংক্রান্তির আগের দিন সকাল থেকেই" রেখার শাশুড়ি মা নানা কারণে ঝগড়া করার ইস্যু খুঁজছিলেন। হঠাৎই দোতলা থেকে এসে যখন নিজের রুমে তিন তলায় ঢুকে যাবেন তখন রাঁধুনিকে শুনিয়ে বলছেন  'আমার দুয়ারের সামনে কেন এত নোংরা ,এত জল। পরেরদিন মাসি আসুক 
কাজে ,জিজ্ঞেস করবো 'ঘর সামনে মুছেনি আদবে কথাগুলো যে রেখাকে শুনিয়ে বলা রেখা সেটা বুঝতে পারে কিন্তু রেখা মানতে পারে না যে ,একটা কাজের মেয়ে সে গরীব হতে পারে কিন্তু তারও একটা মূল্যবোধ তার আত্মসম্মান আছে ।কারণ সে তো কাজে ফাঁকি দেয়  নি ।সে ভালোমতোই করে গেছে কিন্তু যেহেতু ওটা ফ্রন্ট প্যাসেজ তাই যাতায়াতের সময় পায়ে পায়ে  জলময় হয়েছে হয়তো  সে দোষটা কিন্তু কাজের মাসির নয় ।তাই যখন শাশুড়ি মা ওইসব কথা বললেন, তখন রেখা চুপ করে থাকতে পারে নি।
' রেখা তখন রাঁধুনিকে লক্ষ্য করে বলেছে 'কোথায় কি নোংরা আছে দেখি।l আমি মুছে দিচ্ছি '
 রাধুনি  বলল '' হয়তো ভুলে গেছে.
 তখন রেখা বলল না মাসি কিন্তু কাজে ফাঁকি দেয় না। মাসি ঠিকঠাকই মুছে গেছে, পায়ে  পাই হয়তো জল জল হয়েছে ।যাই হোক সেই অবস্থায় তুই ব্যাপারটা থেমে গেল কিন্তু তুষের আগুন জ্বলে উঠল ঠিক সন্ধ্যেবেলায়। ঠিক সন্ধে বলা যায় না ।রাত আটটা নাগাদ রেখার শরীরটা ভাল ছিল না । মেয়েলি প্রবলেম থাকার জন্য শুভ কোন জিনিসে করতে পারবে না ।কিন্তু নিয়মকানুনগুলো করতে হবে ।ওদিকে শাশুড়ি মা কিন্তু কোন নিয়ম-কানুন এর ধার ধারে না অথচ লোকের কাছে তিনি বলেন এ বাড়িতে যে বউ এসেছে কোন নিয়ম কানুন সে করে না ।ফলে আগে যে মেয়েটি কাজ করত হঠাৎ সে দেখা করতে আসে। বিয়ে হয়ে গেছে শ্বশুরবাড়ি থেকে এসেছে বাপের বাড়িতে ।রেখার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেলো ,সে তো ভেবেছিল যে পাড়াতুতো ভাইপো এসেছিল চালের গুড়ি দিতে আর নতুন পিঠার সাজ দিতে ,যাতে পিঠে করা হয় ।সে পিঠের সাজ পোড়াতেই হবে ,না হলে সারা বছর পিঠে করা যাব না ।পিঠে খাওয়া যাবে না ,এটা নিয়ম। তাছাড়া অনেক কিছু নিয়ম আছে পিঠে করে সেগুলো করতে হয়। আলপনা দিতে হয় লক্ষ্মী মায়ের আরাধনা করতে হয়। কাজের মেয়ে কৃষ্ণা যখন আসে তখন রেখা বলে কৃষ্ণা একটা কাজ করে দেবে গো? কৃষ্ণা বলল কি কাজ বৌদি?
রেখা বলল ' আজকে তুমি আমাকে একটু আলপনা দিয়ে যাবে আমিতো ছুতে পারব না মোমবাতি জ্বালাতে হবে ধান ,দূর্বা ,সিঁদুর দিতে হবে। ছাদে গিয়ে আলপনা দিয়ে সাজিয়ে পিঠে, খড়, দূর্বা সিঁদুর দিয়ে মা লক্ষ্মীর আরধনা করতে হবে।
আর ঘরে ঘরে একটু আলপনা দিয়ে দিতে হবে।
কৃষ্ণা বলল ' এ আবার কি কঠিন কাজ নিশ্চয়ই করে দেবো। বৌদি  আমাকে একটু দেখিয়ে দিও ।'
রেখা বলল' হ্যাঁ ,সে তো দেখিয়ে দেব আমি শুধু ছুঁতে পারব না ।সেইজন্য বলা। আর তাছাড়া ভাইপো আছে তোমাকে সাহায্য করবে।
যেমনি বলা তেমনি কাজ। ওরা ঠিক যথারীতি আলপনা দিয়ে সব নিয়ম রীতি সব করে দিয়ে গেল শাখ বাজিয়ে দিয়ে গেল। ওরা যেতে না যেতেই মনোজ যখন ঘরে আসলো ,একটা কি কাজে  মনোজকে ডেকে আমার শাশুড়ি মা বললেন 'দেখো আমার দুয়োরের সামনে দেখো কি অবস্থা ?দরজার থেকে বেশ খানিকটা দূরেই একটা চালের জায়গা সেটা কে ওরা সরিয়ে রেখেছিল   ।দেখে যা কি সব কাণ্ড। তখন মনোজ বলেছিল ' তোমার দরজার কাছে তো নেই। বেশ খানিকটা তো দূরেই 
আছে ।তাতে কি অসুবিধা হচ্ছে তোমার? যদি অসুবিধা হয় এটা যে রেখেছে তাকে বল সরিয়ে দিতে।
শাশুড়ি মা বলেন 'বাবা ব'লে মরবো নাকি ?এতে আগুন জ্বলে যাবে।'
মনোজ বলে 'তুমি এসব কি কথা বলছো মা ,আগুন জ্বলবে কেন?'
মা বললেন _তুই জানিস না বাড়িতে কি সব কাণ্ড করে বেড়ায় তোর বউ?'
রেখা ঘর থেকে সব শুনতে পাচ্ছে কিন্তু কিছু বলছে না।
যখন আবার ঐ একই কথা রিপিট করে যাচ্ছে এ বাড়িতে টেকা দায় হয়ে দাঁড়াবে ।
ঠিক তখনই রেখা গিয়ে বলে ' 'কি সমস্যা হয়েছে আপনার। এটা তো আপনার কোন সমস্যা করছে না, আর এইখানে জায়গা কোথায় বলুন ?কোথায় 
রাখবো ?সেই নিয়ে কি ভাষl শব্দ ব্যবহার করল ভাবতে অবাক লাগছে । বলল 'অসভ্য ঘরের মেয়ে বাড়িতে এসে হার মাস  জালিয়ে ,পুড়িয়ে, খাক করে দিল।  অলক্ষীও
বলল । লক্ষ্মীর আরাধনা হচ্ছে ঠিক, ঐদিনই রেখাকে  কিভাবে নানা কটু কথায় হেনস্থা করতে লাগল ।
তখন রেখা বলেছিল একটা কথা আপনি এভাবে অসভ্য মহিলা অসভ্য মহিলা বলবেন না খারাপ লাগে শুনতে ।এটা ঘুরিয়ে যদি আপনাকে বলা হয়।
 এই কথা নিয়ে শুরু হয়ে গেল অশান্তি ।ননদকে ফোন করে কাঁদতে কাঁদতে এত চিৎকার করে বলছেন। পাড়ার লোকও শুনতে পাচ্ছে আর তারপর শুরু হয়েছে রেখার নামে নানা ধরনের আজেবাজে কথা ।ভেবেই পেল না যে, সে কি কাজটা 
করেছে ?সে তো বাড়ির মঙ্গলের জন্য এসব করেছে।
 সে তখন বলল  'ঠিক আছে আমি মুছে দিচ্ছি সব ।তাতে তো আপনার শান্তি হবে ।আপনার বয়স হয়েছে এভাবে উত্তেজিত হবেন না। দরজা দিয়ে আসতে  যাচ্ছে এমন সময়জোরে দরজা ধাক্কা মারলো শাশুড়িমা। ভাগ্যিস রেখা হাত সরিয়ে নিয়েছিল। সরিয়ে না নিলে রেখার হাত কেটে বাদ হয়ে যেত।
মনোজ প্রচন্ড অশান্তি শুরু করল রেখার সাথে ।
রেখাভেবে পায় না যে তার দোষটা কোথায়? সে কি 
করেছে ?আসলে রেখার জীবনের প্রাপ্তি এটা নয় ।রেখা ভাবে সে চূড়ান্ত ভুল করেছে এই পরিবারে বিয়ে করে এসে। তার মনের প্রশান্তির সে কখনো খোঁজ পায় নি ।যখন স্বামীর কাছ থেকে একটু ভালোবাসা পেতে শুরু করেছে ।ঠিক তখনই দেখা গেছে কোন না কোন  কারনে মনোজের বুনোরাগ হঠাৎ করে এসে হাজির হয়ে সবকিছু লন্ডভন্ড করে দিয়েছে ।রেখার জীবনে আজও ঠিক তাই 
হলো ।রেখার দু-চোখে শুধু জল গড়িয়ে পড়তে লাগল।

কবি শিবনাথ মণ্ডল এর কবিতা




শিক্ষার অবদান
 শিবনাথ মণ্ডল


ওই দেখ মা ছেলে মেয়ে
যাচ্ছে বিদ‍্যালয়ে
শ্রেণী কক্ষে ঢুকবে সবাই 
জাতীয় সঙ্গীত  গেয়ে।
মাগো আমি স্কুলে যাব
দাওনা ভর্তিকরে
ছুটি হলেই তোমার কোলে
আসবো আমি ফিরে।
আমি যখন বাড়ি ফিরব
ব‍্যাগটি কাঁধে করে
তুমি তখন দাঁড়িয়ে থেকো
ওই রাস্তার ধারে।
লেখাপড়ার বিকল্প নেই মা
এই বিশ্বের মাঝে
ছোটো থেকে বড় হওয়ার
একটায় সুযোগ আছে।
মা বলে সোনাছেলে আমার
দারুণ শিক্ষা দিলে
সব মায়েদের কোলে যেন
আসে এমন ছেলে।।

কবি পারভীন শীলা'র কবিতা




আজও খুঁজে ফিরি 
পারভীন শীলা 

এখনো এইখানে অনেক কিছু আছে তুমি ছাড়া।
রৌদ্রছায়া_নীলাভ আকাশ_মস্ত বড়ো ময়দান, 
ফলবতী বৃক্ষ_উঁচু পাহাড়_সুউচ্চ মিনার-মন্দির,
রাত্রি -দিন_ চিন্তার আবেগ_ স্বপ্নের সোপান_ সব আছে_শুধু তুমি নেই!
তবুও তোমাকেই যেন খুঁজে ফিরি মিলনেই।

কত সাম্রাজ্য ভেঙে গেছে
কত উত্থান-পতন হয়েছে সমাজের
কত নীল-নীলান্ঞ্জনা এসেছে সবুজের মাঠে
কত পানকৌড়ি পড়েছে বিলের ধারে
আবার ফিরে গেছে দেহ নিয়ে তারা
প্রেম বিরহ তখনও ছিলো এখনো আছে ঢের,
তারপরও তোমাকেই যেন খুঁজে ফিরি 
আমি-আমরা_এই রৌদ্রছায়ার উপর ফের।

কবি নীলাঞ্জন কুমার এর কবিতা




জেল্লা জমক 

নীলাঞ্জন কুমার 


দেখে শুনে তন্ময় আছি জেল্লা জমকে, 
কোথা থেকে চিত্রকাব্য হয়ে যায় ।
তাকে নিয়ে পণ্য করে অসহ্য সময় । 
তুমি আমি তো তাতেই মশগুল ।


সুন্দর-ই মুখ্য । বাকি সব হাস্যকর ।
হিসেবী উচ্চারণে  তখন হাজারো ওলটপালট ।


জমকালো সবকিছু শুধু চোখে । ক্ষণিকের ।

শামীমা আহমেদ এর ধারাবাহিক উপন্যাস ৫৭





শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত 
(পর্ব ৫৭)
শামীমা আহমেদ 

আরাফের ক্রমাগত বাবা বাবা  ডাকেও শিহাবএকেবারেই নিরুত্তর ও নির্জীব হয়ে রইল।রিশতিনা একদৃষ্টে শিহাবের দিকে তাকিয়ে রইল।শিহাব দেখতে আগেরমত তেমনি সুন্দর আছে। আজ প্রায় চার বছর পর সে শিহাবকে দেখছে।এর মাঝে কোনদিনও আর এক মূহুর্তের জন্য তাদের দেখা বা কথা হয়নি।রিশতিনার চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় কান্না নেমে আসছে। 
বাবা বাবা ডেকে ডেকে  আরাফ একটু একটু করে বিছানার কিনারায়  চলে এলো। যে কোন মুহুর্তে সে একটা দূর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলবে।এই দৃশ্যে  শিহাব যেন  হুশে ফিরে এলো।শিহাব দৌড়ে গিয়ে আরাফকে বুকে জড়িয়ে নিলো।
প্রচন্ড ভয় পেয়েছে সে! আরাফ বাবার বুকে একেবারে খাঁমচে ধরে মিশে রইল। শিহাব যেন প্রাণ ফিরে পেলো।সারাটা সপ্তাহ সে ছেলেটাকে না দেখে থাকে। এমনকি ফোনেও কথা কম বলে। আরাফের মুখে বাবা ডাক শুনলে সে নিযেকে স্থির রাখতে পারেনা। আর মা হয়ে চার চারটি বছর পর আজ সন্তানকে দেখতে আসা? মায়ের অধিকার নিয়ে কথা বলা। যেখানে আবার  আরেকজনের সাথে  নতুন সংসার করছে
সেখানে আরাফকে ছেলের দাবী নিয়ে কেন আসা? আর স্বামীর প্রতি কি এমন দ্বায়িত্ব সে দেখিয়েছে। সে লন্ডনে যেতে না চাইলে কেউ কি তাকে জোর করে নিতে পারতো ?  শিহাবের ভেতরে এতদিনের যত ক্ষোভ রাগ আর অভিমান একসাথে হয়ে রিশতিনার প্রতি তা ঘৃণা হয়ে বেরিয়ে এলো।
রিশতিনা চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে শিহাবের
খুব কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।  শিহাব তা বুঝতে পেরে এক ঝটকায় দূরে সরে গেলো। আর বেশ স্পষ্ট করে  বলতে থাকলো,না আরাফ আমার সন্তান।শুধু আমার সন্তান। তুমি ওর কেউ না।আমি আরাফের বাবা।
রিশতিনা বলে চললো, শিহাব তুমি আমার সম্পর্কে ভুল জেনেছো।আমি কাউকে বিয়ে করিনি।বাবা শত চেষ্টা করেও আমাকে দ্বিতীয় বিয়ে করাতে পারেনি। আমি বাবাকে শুধু পড়াশুনার দোহাই দিয়ে বিয়ে  ঠেকিয়েছি।
তাদের নজরদারীর ভিতরেও আমি শুধুই তোমার কথাই ভেবেছি।
রিশতিনার কোন কথাই শিহাব যেন শুনছে না।বিশ্বাস করতে চাইছে না। রিশতিনা অবিরল ধারায় কেঁদেই চলেছে।
বলেই চলেছে, শিহাব তোমাকে আমি একদিনের জন্যও ভুলিনি। তোমার আমার জীবনে যা ঘটেছে তা আমার বাবার জন্যই হয়েছে।আজতো সে  আর বেঁচে নেই। তাইতো আমার সংসারে আমি ফিরে এসেছি।
রিশতিনার সাথে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনা শিহাবকে তিলে তিলে কষ্ট  দিয়েছে।  কত কত রাত সে একা একা কেঁদেছে। ছোট্ট শিশুটি মেয়ের দুধ বঞ্চিত হয়েছে।বন্ধুবান্ধব, আত্মীয় স্বজনদের কাছে তাদের পরিবারকে ছোট হতে হয়েছে।তবুও সেইসব দুঃসহ স্মৃতি নিয়েই সে একরকম মৃতপ্রায় জীবন কাটিয়েছে।সে আর সেইসব দুঃসহ স্মৃতিতে  ফিরে যেতে চায় না। রিশতিনার পারিবারিক মর্যাদা  তাদের চেয়ে অনেক উচ্চে।তার বাবা ব্যারিস্টার ছিল।ভীষণ  অহংকারী  এবং ক্ষমতার দাপুটে ব্যক্তি বারংবার শিহাবদের পরিবারকে অপমান করেছে। শিহাব ভেবে নিলো,রিশতিনাকেও তাদের সেই পারিবারিক  অবস্থানেই থাকতে হবে।শিহাব আর পিছনে ফিরে তাকাতে চায় না। বাবা মাকে এই শেষ বয়সে সে আর আহত করতে চায়না।
শিহাবের জীবন আজ অন্য ধারায় বয়ে গেছে।তার জীবনে শায়লা এসেছে। শায়লাই হবে আরাফের মা।শিহাব রিশতিনাকে ফিরে যেতে বললো।  
রিশতিনা তুমি তোমার মৃত বাবার ইচ্ছে পূরণ করে তার আত্মার শান্তি দাও। তোমাদের পরিবারে ফিরে যাও।
---আর আমার জীবনের শান্তি?রিশতিনার পালটা প্রশ্ন।
সে তুমি তোমার মত করে খুঁজে নাও।বারবার তুমি আমার জীবনটাকে এলোমেলো করে দিও না। আমি জীবনে খুব গোছানো মানুষ  ।তুমি  বারবার তা তছনছ করোনা।
রিশতিনাকে হারিয়ে শিহাব যতটা কাতর ছিল শায়লাকে পেয়ে আজ যেন ততটাই দৃঢ় হয়েছে।কিছুতেই সে আর পিছু ফিরবে না। রিশতিনাকেও  সে আর কোন বাঁধনে বাঁধবে  না।
রিশতিনা শিহাবের হাত ধরতে চাইলে শিহাব তা হতে দিলো না। রিশতিনা ভীষণ অবাক হয়ে শিহাবের দিকে তাকালো।
টেবিলের উপর রাখা রিশতিনার হ্যান্ডব্যাগে মোবাইল বেজেই যাচ্ছে। রিশতিনা তা রিসিভ করছে না। শিহাবের কাছে তার কোন আকুতিই যেন খাটছে না।
রিশতিনা এই ভেবে ভীষণ অবাক হচ্ছে এমন করে শিহাব তাকে ভুলে গেছে!সরিয়ে দিতে চাইছে! অনেক আশা নিয়ে সে আজ এসেছিল। 
শিহাব তার অবস্থানে স্থির রইল। সে এখন বেশ বুঝতে পারছে কেন বাড়িতে প্রতিটা মানুষ এমন থমথমে ভাব নিয়ে ছিল।ভাবী এত আতংকিত ছিল।
রিশতিনা ফোনের দিকে এগিয়ে গেলো।
হ্যান্ডব্যাগটির পাশে আজো শিহাব আর রিশতিনার বিয়ের দিনের ছবিটির ফটোফ্রেম রাখা।  রিশতিনা ফ্রেমটি হাতে তুলে নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লো। সেই দিনের সেই আবেগের মূহুর্তের ছবিটি আজ কতটাইনা মিথ্যা হয়ে গেলো।শিহাব অনেক বদলে গেছে।আর ভাবলো,যাবেই তো আমি তো তাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। 
রিশতিনা ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করলো।রিশতিনার মায়ের ফোন।মেয়েকে বাসায় না পেয়ে ফোনে খোঁজ করছেন।রিশতিনার অভিব্যক্তিতে বুঝা গেলো ওপাশ থেকে মায়ের  বেশ বকাঝকাই হচ্ছে। রিশতিনা চুপ করে সবটা শুনে নিলো। শুধু বললো, আচ্ছা। 
রিশতিনা এখন ভেবে নিলো , রোমেল ভাইয়ার কাছে তাহলে যা শুনেছে সেটাই ঠিক। শিহাব এখন অন্য একজনকে ভালোবাসে। রোমেল ভাইয়ার এমন খবরের সত্যতা পেতেই রিশতিনার ছুটে আসা।তবে সে কোনদিনই ভাবেনি শিহাব তাকে ফিরিয়ে দিবে। সন্তান রেখে কত মায়েরাইতো আজকাল চাকরীর জন্য,উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে যায়, তাতে কি সন্তানের অধিকার হারায়? তবে রিশতিনার যাওয়াটাতো সেরকম সহজ কিছু ছিল না। অমন দুধের শিশুকে সে ছেড়ে গেছে এটাতো তার বিরাট অন্যায় হয়েছে। রিশতিনার সব ক্ষোভ গিয়ে পড়ে তার বাবার উপর।এখন মাও তাকে রেহাই দিচ্ছে না। রিশতিনা এটাও ভাবে শিহাব যদি তাকে সেদিন জোর করে ছিনিয়ে আনতো, তবে তো আজ তাদের জীবন অন্যরকম হতো। 
আরাফ ভীষণ ভয় পেয়েছে।! যদিও অনেক খেলনা পেয়ে আর রিশতিনেকে মা জেনে সে খুব খুশি হয়েছিলো কিন্তু হঠাৎ করে অজানা একজন মানুষ এসেছে  যাকে মা ডাকতে হয়েছে আবার  তার সাথে বাবার ঝগড়াও হচ্ছে! এসব ভেবে আরাফ ভয়ে একেবারে শক্ত হয়ে বাবার পিঠে পড়ে আছে। সে এখন তার চাচী আর দাদীর কাছে যেতে চাইছে।সে ভাবছে, এতদিনতো তাদের কাছে আমি ভালোই ছিলাম।শিশুমন কখনোই বাবামায়ের কলহ মেনে নিতে পারে না।বাবা মায়ের মাঝে বৈরীভাবে সন্তানেরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে।
শিহাবের ভাবী সুমাইয়া উপরে চলে এলো। আজ সকালে হঠাৎই রিশতিনার আগমনে সেও ভীষণ চমকে গেছে! ওদিকে শিহাব আসতে চাইছে শায়লাকে নিয়ে, সে আগেই বুঝেছিল এমন একটা  পরিস্থিতি হতে পারে।সুমাইয়া দরজায় আসতেই আরাফ বাবার কোল থেকে তার দিকে হাত বাড়িয়ে যেতে চাইছে। বুঝ হওয়ার পর থেকে আরাফ যাকে মা বলে জেনে এসেছে সে তো সুমাইয়াই।সুমাইয়ারও আরাফের জন্য বুকটা খাঁ খাঁ করছে। সে দ্রুত গিয়ে শিহাবের কাছ থেকে আরাফকে রীতিমতো ছিনিয়ে নিলো। আরাফ সুমাইয়ার কোলে গিয়ে শুধু দাদীর ঘর দেখাচ্ছে। সে দাদু দাদু বলছে।সুমাইয়া শিহাবের কাছে জানতে চাইলো, শিহাব তুমি কি সিদ্ধান্ত নিয়েছো? সন্তান তোমাদের। আমিতো নিয়ে যেতে পারি না।

এবার, রিশতিনা এগিয়ে এলো, বেশ অপরাধীর মত বললো, ভাবী,মা হয়েও আমি নিজ সন্তানকে ফেলে গেছি।কেন কোন কার্যকারণে, কার চাপে সবই আপনাদের জানা। আর আজ যখন সব পিছে ফেলে আবার আমি তোমাদের কাছে ছুটে এলাম, তোমরা আমাকে ফিরিয়ে দিলে।ভালোই হলো।আমার নিজের দোষ আমি কাটিয়ে গেলাম। আমার সন্তানের নাম আরাফ,,সেটাও আমার অজানা ছিল,আজ জানলাম। তুমিই ওকে মায়ের আদরে বড় করেছো।আমার স্বামীর প্রতিও আমি দায়িত্ব পালন করিনি,কোন অধিকারেই আমি তোমাদের কাছে গ্রহনযোগ্য নই।আর যার কাছে অধিকার ছিল সেও বদলে গেছে। সে আজ অন্য কারো হয়ে গেছে। আমার যা হারাবার তা হারিয়ে গেছে। আমার বাবা 
আর মায়ের ইচ্ছা পূরনেই আমার জীবনকে উৎসর্গ করে যাবো। তবে মনে এতদিন এটাই শান্তি ছিল যে, ভাবী, তুমি আরাফকে মায়ের আদরে বড় করছো। তবে  আজ অন্য কেউ আরাফের মা হতে চাইছে তাই খুবউ উৎকন্ঠা নিয়ে  যাচ্ছি। অন্য একজন কেউ কি  আরাফের সত্যিকারের মা হয়ে উঠতে পারবে? তবে মনে হচ্ছে তার মনে অনেক শক্তি নয়তো কেমন করে সে শিহাবের মন থেকে আমাকে একেবারে মুছে দিয়েছে।
ভাবী তোমরা ভালো থেকো।আমার ছেলে বড় হয়ে নিশ্চয়ই কোন একদিন তার জন্মদাত্রী মায়ের খোঁজ করবে আর নাড়ীর টানে তার কাছে পৌঁছে যাবে। কথাগুলো বলেই, রিশতিনা হ্যান্ডব্যাগটি হাতে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। যাবার আগে আরাফকে ছুয়ে দেখতে চাইলেও তা যেন ভবিষ্যতের জন্যই জমা রাখলো। চোখে মুখে একটা সোনালী দিনের স্বপ্ন নিয়ে রিশতিনা ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। আরাফ  ছোট্ট ভীত পাখির ছানার মত চাচীর বুকে একেবারে যেন মিশে রইল।
সুমাইয়া শিহাবের পিঠে হাত রাখল।শিহাব ঝরঝর করে কেঁদে ফেললো। শিহাব এতক্ষন যা করেছে সবই এতদিনের জমানো রাগ অভিমানেরই বহিঃপ্রকাশ!  রিশতিনাকে শিহাব কতটা ভালোবাসতো সেতো ভাবীর চেয়ে বেশি কেউ জানতো না। সুমাইয়ারও চোখ ভিজে উঠলো।শিহাব তার দেবর হলেও সে তাকে একেবারে নিজের ভাইয়ের মতই দেখে। রিশতিনাকে নিয়ে শিহাবের এমন কোন কথা সুমাইয়াকে বলেনি তা হয়নি।
সুমাইয়া বেশ বুঝতে পারলো শিহাব কতটা কষ্টে দিনে দিনে এমন পাথর হয়েছে। যেভাবেই হউক শিহাব নিজে থেকে একটা সিদ্ধান্তে এসেছে এটাতেই সুমাইয়ার স্বস্তি! সে শিহাব আর আরাফকে তার শ্বাশুড়ির ঘরে এগিয়ে নিলো। শিহাব বুঝতে পারছে না, সে কি কাজটি ঠিক করলো কিনা? রিশতিনার জন্য তার ভেতরে দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। শিহাব ধীর পায়ে সুমাইয়াকে অনুসরণ করে মায়ের ঘরের দিকে পা বাড়ালো।
যদিও শিহাবের মা বেশ শক্ত করে শায়লার হাতটি ধরে ছিলো  তবুও  অনেকক্ষন শিহাবের দেখা না পেয়ে শায়লা বারবার ভীত হরিণীর মত দরজার দিকে চোখ ফেলছিল।
চলবে.....

মনি জামান এর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব৭

ধারাবাহিক উপন্যাস




সেদিন গোধূলি সন্ধ্যা ছিলো
( ৭ ম পর্ব ) 
মনি জামান



ভবদা গ্রামের এক দিনমুজুর শওকত আলির তিন মেয়ের ভিতর আসমা সবার বড়,আসমার দুচোখ ভরা ছিল স্বপ্ন আর দশটা মেয়ের মত।আসমার স্বপ্ন সে লেখা পড়া শিখে একদিন অনেক বড় হবে যদিও বাবা শওকত আলি গরীব দিনমজুর একজন কৃষক তবুও আসমা এই স্বপ্নটাই দেখতো রাতদিন।একদিন সে বড় ডাক্তার বা ইঞ্জিয়ার হয়ে বাবা মাকে সাহায্য করবে কারণ আসমা খুব মেধাবী একজন মেয়ে,
ছোট বোন দু'টোকে লেখা পড়া শিখাবে মানুষের মত মানুষ করে গড়ে তুলবে।আসমা মা বাবার বড় সন্তান ওর কোন ভাই  ছিলনা তাই দায়িত্ব বোধটা ওর ভিতর বেশি কাজ করতো।
ভবদা গ্রামের দরিদ্র দিনমজুর শওকত আলি দিনমুজুরের কাজ করতো তারপরও মেয়ের পড়ালেখার খরচের জন্য কখনো কোন সময় কার্পণ্য করেনি,ধার দেনা করে হলেও খরচ ঠিক যোগান দিত।
আসমা যেমন সুন্দরি তেমনি বুদ্ধিমতি সে খুব মেধাবি একজন ছাত্রী ছিলো স্কুলের,মাস্টারা আসমার প্রসংশায় পঞ্চমুখ ছিলো,আসমা এস এস সিতে গোল্ডেন প্লাস পেয়ে পাশ করে ভবদা গ্রামের সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলো,সবাই প্রসংশায় ভাসিয়েছে হতদরিদ্র বাবা শওকত আলিকে।
পাশ করার পর আসমা ভবদা কলেজে আই এ প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছিলো,আসমা দেখতে এতটাই সুন্দরী ছিল যে প্রবাদে আছে গবরে পুষ্প জন্মে ঠিক এমন একটা মেয়ে সে,যেমন রূপ তেমনি গুন আচার আচারণ ও কথাবার্তায় অসাধারণ সদা হাস্যজ্জ্বল।
পাড়ার ছেলেরা আসমাকে খুব বিরক্ত করত আসমা কাউকে শক্ত কথা না বলে তাদের ডেকে সুন্দর করে বুঝিয়ে  পড়ালেখার প্রতি উৎসাহ দিতো এ কারণে আসমা খুব প্রিয় ছিল ভবদা গ্রামের সকল শ্রেণীর সকল মানুষের কাছে।
পাড়ায় কারো বিপদ শুনলে ছুটে যেত এবং সাহার্য করতো,পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে অশিক্ষিত চাচা চাচীদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে ও বাচ্চাদের লেখাপড়ার জন্য পরামর্শ দিতো এ কারণে গ্রামের সবাই আসমাকে খুব ভালোবাসত এবং পরস্পর বলা বলি করতো গোবরে পুষ্প জন্মেছে শওকাত আলির ঘরে,তারা আরো বলতো এমন মেয়ে যদি আমাদের ঘরে জন্ম হত।
আসমা লেখাপড়ার প্রতি এতোটাই মনোযোগী যে একদিনের জন্য হলেও কলেজের ক্লাশ কোনদিন মিস করেনি সে নিয়মিত কলেজ করতো,যে রাস্তা দিয়ে আসমা কলেজে আসা যাওয়া করতো ঐ রাস্তার পাশে করিম সাহেবের তিনতালা বাড়ি,করিম সাহেব ভবদা গ্রামের ঐতিহ্যবাহি নাম করা মানুষ ছিলেন উচ্চ শিক্ষিত অর্থে বৃত্তে শিক্ষা দীক্ষায় সব দিক থেকে সবাই করিম সাহেব ও তার পরিবারকে সম্মান করত।
করিম সাহেবের তিন ছেলে বড় ছেলে আমেরিকা পরবাসি,মেজ ছেলে ব্যাংকে চাকরি করে ঢাকাতে আর ছোট ছেলে জিকু ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে শেষ বর্ষের ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র।আসমা একদিন কলেজে যাবার পথে,করিম সাহেবের ছোট ছেলে জিকুর সাথে আসমার প্রথম দেখা হয়,আসমাকে দেখে জিকু অবাক হয়ে যায় গ্রামে এত সুন্দর মেয়ে,প্রথম দেখাই জিকুর এতটাই ভালো লাগলো যে আসমাকে ডেকে পরিচয় জেনে নিলো।
এর পর থেকে জিকু প্রায় কলেজে যাবার রাস্তায় আসমাকে ডেকে কথা বলতো,কারণ জিকুর খুব পছন্দের মেয়ে ছিল আসমা এভাবে দুজনের পরিচয় আর প্রায় দুজনের মধ্য কথা হত।কথা বলতে বলতে ধীরে ধীরে দুজন দুজনের প্রতি দুর্বল হতে শুরু করলো অতঃপর প্রেমে জড়িয়ে পড়লো।
আসমার খুব ভাল লাগলো জিকুকে কারণ জিকু যেমন সুন্দর তেমনি সুদর্শন আর ভদ্র ছেলে,জিকু ও আসমাকে তার দেখা শ্রেষ্ঠ সুন্দর একটা মেয়ে হিসেবে পছন্দ করলো।প্রেম বোধহয় এমনই যে ধীরে ধীরে আসমার দুচোখে স্বপ্নের প্রজাপতিরা এসে ভিড় করতে শুরু করলো,আসমার ভাবনা চিন্তায় এখন জিকু ছাড়া কিছু ভাবতে পারে না,আসমা মাঝে মাঝে কেমন যেন আনমনা হয়ে যেতো জিকুর ভাবনায়।
এভাবে দিন যায় দিন আসে সময় যেতে শুরু করলো,আসমাকে জিকুর ভালোবাসা এতোটাই আলোড়িত করলো যে ভালো লাগার ভালবাসার মানুষটার সানিধ্য পেতে আসমা ব্যাকুল হয়ে থাকতো,জিকু আসমাকে তার ভালবাসার কথা স্বপ্নের কথা এমন ভাবে বলতো শুনে আসমা মনে মনে আগামীর স্বপ্নে বিভোর হয়ে যেত।জিকু আসমাকে একদিন বিয়ের কথা বলল,আসমাঃ এটা কি কখনো সম্ভব তোমার সাথে আমার বিয়ে,
জিকুঃ কেন সম্ভব নয় আসমা!
আসমাঃ আমার বাবা খুব গরীব মানুষ সেখানে তোমরা কত বড়লোক,তোমার পরিবার কি এ বিয়ে মেনে নেবে?
জিকু আসমাকে নির্ভয় দিয়ে আশ্বাস দিয়ে বললঃ মেনে না নিলে প্রয়োজনে তোমাকে নিয়ে আমি বাড়ি ছাড়বো এবং একটা জব করবো তবুও তোমাকে হারাতে চাইনা আমি,তোমাকে যে আমি অনেক ভালোবাসি।
এই পর্যান্ত বলে নিলয় একটু বিরতি নিয়ে থামলো,
মেবিনঃ তারপর কি হল বলো,
নিলয়ঃ তারপর ভবদা গ্রামের সবাই জেনে গেল আসমা আর জিকুর প্রেমের কথা,
আসমা জিকুর প্রেমের কথা জিকুর পরিবার ও যখন জানতে পারে তখন জিকুকে প্রচণ্ড চাপ দিতে শুরু করলো, জিকুর মা এবং পরিবারের সবাই মিলে তবুুও জিকু অনড় সে আসমাকে ছাড়া অন্য কোন মেয়েকে বিয়ে করবে না।
জিকুর মা খুব অহঙ্কারি আর গরীব বিদ্বেষী লোভী একজন মহিলা ছিলো,সে গরিবের মেয়ে আসমাকে কোন মতে মেনে নিতে রাজি নয়,তাই ছেলে জিকুকে ডেকে সাফ জানিয়ে দিল তুমি যদি ঐ মেয়েকে বিয়ে কর তাহলে তোমার এ বাড়িতে জায়গা হবে না তোমাকে বাড়ি ছাড়তে হবে এবার ভেবে দেখ কি করবে তুমি।
জিকু মায়ের কথা শুনার পর মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল সে চাকরি করবে ছোট চাকরি হলেও তারপর জিকু চাকরি খুঁতে শুরু করলো অবশেষে একটা প্রাইভেট কোম্পানির চাকরি পেলো জিকু পেয়েই চাকরির খবরটা আসমাকে জানালো এবং আসমাকে দেখা করতে বললো।
আসমা জিকুর সাথে দেখা করলো দু'জনে কথা বললো তারপর সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল বিয়ে করবে,জিকু আসমাকে সাথে করে নিয়ে গেলো ভবদা কাজী অফিসে,আগেই সেখানে উপস্থিত ছিল বন্ধু ফিরোজ। 
বন্ধু ফিরোজের সাক্ষী করে তারপর জিকু আসমা দুজনে কবুল পড়ে বিয়ে রেজিস্টার করল কাজী অফিসে বসে।
বিয়ের পর জিকুর বন্ধু সাংবাদিক ফিরোজ
জিকুকে দশহাজার টাকা ধার দিলো,জিকু
টাকা নিয়ে ফিরোজকে বললো আমি আসমাকে নিয়ে কুমিল্লায় যাচ্ছি তুই কাউকে বলিস না আর দরকার পড়লে তোর সাথে যোগাযোগ করবো বলে আসমাকে সাথে নিয়ে কুমিল্লা কর্মস্থলের উদ্দেশ্য রওনা হলো।
জিকু চাকরি পেয়ে কুমিল্লায় আগেই একটা বাসা ভাড়া করে রেখেছিল সেই বাসায় আসমাকে নিয়ে উঠলো,তারপর আনুষঙ্গিক সংসারের জিনিশ পত্র কিনে নতুন জীবন শুরু করল।
জিকু আসমাকে একান্ত স্ত্রী হিসেবে পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করলো,একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালবাসার বন্ধন আসমা আর জিকুকে যেন শক্ত করে বেধে দিল।
জিকু অফিসে যখন যেতো আসমা স্বামী জিকুর জন্য নিজ হাতে দুপুরের খাবার বানিয়ে হটপটে সুন্দর করে গুছিয়ে দিতো,জিকু আসমাকে পেয়ে এতোটাই খুশি ছিলো আসমা জিকুর কলিজাতে রূপান্তরিত হয়ে গেছে,আসমা ছাড়া জিকু কিছুই ভাবতে পারতো না।
জিকুকে পেয়ে আসমার ভালবাসা আজ যেন পূর্ণতা পেয়েছে,স্বপ্ন সুখ গুলো যেন মুঠো মুঠো হাতে এসে যেন ধরা দিয়েছে।
জিকু আসমাকে কতটা ভালবাসে আসমা সেটা আজ মর্মে মর্মে অনুভব করতে পারছে,গরিব বাবার মেয়ে সে কখনো ভাবেনি তার কল্পিত সুখ গুলো একদিন সে এমন করে বাস্তবে স্পর্শ করতে পারবে।
চলবে...

কবি শিল্পা ম্যাক এর কবিতা





একা
শিল্পা ম্যাক

অবশেষে মানুষ জেনেছে
 অনেক ভিড়েও মানুষ একা
কেউ কেউ খুব একা
নিরাকার অন্ধকারের মতো
বিধবার হাহাকারের মতো
দূর আকাশের উড়ন্ত চিলের মতো
অমাবস্যার দ্বিপ্রহরে করুণ সুরে ডাকা কুকুরের কান্নার মতো
ঝুম দুপুরের নির্জনতার মতো
ভরা পূর্ণিমায় উছলে পড়া 
জোছনার মতো
কুয়াশা ভেজা ঘাসের ডগায়
এক বিন্দু শিশিরের মতো
নিঃসঙ্গতায় ছেয়ে থাকা হলদে রঙের 
পড়ন্ত বিকালের মতো
সন্ধ্যা নামার মুখে পশ্চিমের আকাশে
হেলে পড়া ডুবন্ত সূর্যের মতো
ঘোর নিশিতে নিয়ন আলোয় 
ঠায় দাঁড়ানো অসহায় ল্যাম্প পোষ্টের মতো
কেউ কেউ খুব একা
বুকের মধ্যে না বলা কষ্টের মতো 
একলা একা
ভীষণ একা ।

কবি হা‌বিবুর রহমান হা‌বিব'র কবিতা                   




দ্বীপ জ্বে‌লে                                    
হা‌বিবুর রহমান হা‌বিব                       


জীবন যন্ত্রণার আ‌বেশ আমার ছিল ভূবন ভরা,                   
তু‌মি ডে‌কে ছি‌লে আর ডে‌কো না।                                       
চ‌লে যাব বহু দূ‌রে রেখ না স্মৃ‌তি আর,                                      
নি‌ভির আঁধা‌রে একা ফে‌ল না আঁ‌খি জল,                                
চির নেভা দ্বীপ আর জ্বে‌লো না,                                                   
মায়াময় যন্ত্রণার আ‌বেগ আর পর‌শে।                                  
অকার‌ণে বাড়া‌বে জা‌নি তোমার ব‌্যাথার মায়া,                       
দেখা হ‌বে না কোন নি‌ভির প্রান্ত‌রে,                                           
উজ্জল অনন্ত শিখা হৃদয় বৃ‌ন্তে তোমার,                                                   
বেদনার হা‌সির মায়ায় ছলনা রে‌খো না ম‌নে,                      
ফি‌রে চে‌য়েও না পিছু আর।               
জা‌নি ভুল‌তে পার‌বে না জীবন নদীর স্রো‌তে,                          
যে পথ চির‌চেনা গেলাম তা‌রে আজ ভু‌লে।                           
নিঃশ্বা‌সে ভিল না বিষ বিশ্বাস ছিল বহু দূর,                      
তীর বৃদ্ধ জীবন অঙ্কু‌রে আমার ক্ষয়,                                   
সন্ধ‌্যা তারার ম‌তো এ‌সে‌ছিলাম,                                      
নি‌ভে গেলাম রা‌তের আঁধা‌রে,আঁধা‌রে ।

কবি বর্নালী সেনগুপ্ত'র কবিতা




উন্মোচন
 বর্নালী সেনগুপ্ত

উষ্ণতা দিয়ে মাপতে চাও পুরুষ,নারীত্বকে !
বেশ নগ্ন করে দিলাম
তোমার সামনে,
ওই দেখো তোমার জন্মস্থান,মাতৃযোনী।
দেখতে চাও পাহাড় কেমন উঁচু ?
উন্মুক্ত বক্ষে দন্ডায়মান 
তোমার সহোদরা,
দেখো,উপভোগ করো যতখুশি।
কেন নত তোমার মুখ?
যৌনতা পাচ্ছোনা বুঝি সুখ?
নানান বাহনায় হাত দাও ,বাসে ,ট্রেনে,
তবে? কিসের দ্বিধা ?
ধর্ষক না হলে পৌরুষের পরাজয় !
এইখানেই তোমার চিরকালের পরাজয়।
হায়,পুরুষ স্তন দেখলে,
দেখলেনা শিশুর প্রথম আহার !
যোনীকে মাপলে নীল ছবিতে,
তোমার জন্ম ওই গভীরতাতে !
ভুলে যাও কি অনায়াসে !
পুরুষ নামে নির্ভয়াদের ঘৃণা আসে।

কবি সজল কুমার মাইতি'র কবিতা





মায়ের  উষ্ণতা 

সজল কুমার মাইতি



একটি কুকুর 
                 তার চারটি ছানা 
নিত্য নতুন খেলা করে 
                   কেউ করেনা মানা।
মা তাদের আদর করে 
                       বুকের দুধে পালন করে 
হেথা হোথা ঘুরে বেড়ায় 
                     শাসন তাদের নেইকো জানা।
মাঠের কোনে গাছের তলায় 
                      মায়ের বুকে জড়িয়ে সবাই 
শীত গ্রীষ্মের বালাই নেই 
                      ঘুমের দেশে দেয় যে হানা।
সকাল সন্ধে স্বাস্থ্য খোঁজে 
                       মানুষজনের আনাগোনা 
লোভী মানুষ তাদের মাঝে 
                        উধাও করে একেক ছানা।
পাগল মা খুঁজে বেড়ায় 
                       মানুষ দেখলে কামড়ে তাড়ায়
মায়ের বুকে ওম খোঁজে 
                      একটি কেবল কুকুর ছানা।

০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২

মমতা রায় চৌধুরীর' উপন্যাস পার্ব ১০০






উপন্যাস 

টানাপোড়েন১০০
রেখার ইতিকথা
মমতা রায় চৌধুরী


রেখা সারা রাত দু চোখের পাতা এক করতে পারে নি। রিম্পাদি ট্রান্সফার হয়ে যাবার পর স্কুলে যেতে ইচ্ছে করছে না। দীর্ঘদিন পাশাপাশি বসা কত কথাই না  রিম্পাদির সঙ্গে বলেছে। একটা আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। এসবই ভেবে ভেবে রাত গভীর হয়, দু চোখ ক্লান্ত তবুও চোখের পাতা এক হতে চায়না। এক আকাশ বুকে আশা নিয়ে প্রহর কাটে তার।আজকাল মনোজ ও খুব বেশি একটা কথা বলে না। পুরোপুরি জীবনটা কেমন যেন বিবর্ণ হয়ে যেতে বসেছে। বেঁচে থাকার মধ্যে আছে তার লেখা। আজকাল লেখাটাই রেখাকে প্রাণ দেয়। আরে বাবা দেবেই বা না কেন 'সিড়ি'ত্রিকার সম্পাদক রেখাকে তাড়া দিয়ে লেখা আদায় করে নেন। সত্যি লেখায় যেন একটা আলাদা অনুপ্রেরণা খুঁজে পায় রেখা ।
আজকাল মনোজও বেশিরভাগ সময়টা ড্রইংরুমে কাটায়। বলে তো অফিসের চাপ বেড়েছে। রেখা চিরকালই কারোর কোন পার্সোনাল ব্যাপারে মাথা ঘামায় না। মনে পড়ে যায় যখন প্রথম বিয়ে হয়ে এ বাড়িতে  আসে ।রেখার শাশুড়ি মা অবশ্য প্রথম থেকেই রেখাকে পছন্দ ছিল না। শুধুমাত্র ছেলের পছন্দ বলে নাও করতে পারেন নি।  
ননদ সে তো বলেই দিয়েছিল 'কি দরকার ছিল ভাই, তোর অন্য কাস্টে বিয়ে করা? আমাদের কালচারের সঙ্গে মিলাতে পারবে?'
যদিও রেখাকে এই কথাগুলো মনোজই বলেছিল।
বিয়ের পর থেকে রেখা হাড়েহাড়ে বুঝতে পেরেছিল সত্যি অন্য কাস্টে বিয়ে করাটা ঠিক হয়নি।
বিয়ের পর ফুলশয্যার পরের দিন শাশুড়ি মা রেখা কে যেভাবে বলেছিল'কাজের মেয়ে মামুনকে দিয়ে
আজও মনের ক্যানভাসে রং তুলি নিয়ে আঁচড় কেটে যায়। এইতো ফুলশয্যার পরের দিন
রেখা  খুব তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠেছিল। নতুন পরিবেশ, নতুন বাড়ি কেমন যেন একটা সবসময় ভয় ভয় কাজ করছিল। এত বড় জয়েন্ট ফ্যামিলি সকালে উঠতেই হবে। রেখাকে কিন্তু কেউ কিছু বলেই দেয় নি, কি করতে হবে, না করতে হবে। যেন দূরে সরিয়ে রাখার একটা প্রবণতা। কত আশা নিয়ে শ্বশুর বাড়িতে এসেছিল। ফুলশয্যার পরের দিনই বুঝতে পেরেছিল এই আশা আদপেও  বাস্তবায়িত হবে না। তবুও 'বৃথা আশা মরিতে মরিতেও মরে না।'
রেখা ভেবেছিল' সে তো একজন শিক্ষিকা এত বড় একটা পরিবেশে সকলের সঙ্গে মানিয়ে ,স্টুডেন্টদের সঙ্গে বোঝাপড়া করে স্নেহ দিয়ে ভালোবাসা দিয়ে তাদেরকে মানুষ গড়ার কারিগর হতে পারে। তবে,এই সংসার টা বাদ যাবে
 কেন? 'যতই তারা দূরে ঠেলে দিক রেখা ভালোবাসা দিয়ে সকলকে মনের বন্ধনে বেঁধে রাখবে। ভালোবাসায় সব হয়। কিন্তু এই আশা আর কবে বাস্তবায়িত হবে?
বিয়ের পর থেকেই দেখে এসেছিল এ বাড়িতে কাজের মেয়ে সংখ্যা কম নয়। কিন্তু বাস্তবে তার সঙ্গে কি হয়েছে? ফুলশয্যার পরের দিনই তাকে ঝাটা ধরতে হয়েছে।
আজও মনে পড়ে সেই দিনটার কথা
'এতটা বেলা হয়ে যাওয়ার পরেও রেখা যে ঘরে থাকে মানে যে ঘরটাতে থাকতে দেয়া হয়েছে, সেই ঘরে কেউ ঝাট দিতে আসেনি বা ঘর কেউ মুছতে ও আসেনি।'
রেখা একটু অবাক হয়ে গেল নতুন বিয়ে হয়েছে । কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করতেও পারছে 
না ।কেমন একটু সংকোচ বোধ হচ্ছে।
এমন কি কেউ চা খাবার জন্যও  ডাকছেন  না।
মনে দ্বিধা নিয়ে রেখা  বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিজে একটা কোনরকমে ঝাটা খুঁজে পেল সেটা দিয়েই ঘরটাকে ঝাট দিল। এরমধ্যে দেখতে পেল তাদের ঘরটা বিয়ের আগে নুতন করা হয়েছে কিন্তু সেই ঘরের ভেতরে দেওয়াল আলমারিতে সিমেন্ট বালি লেপ্টে আছে। রেখা মনে মনে ভাবছে তাইতো এইগুলোতে এত নোংরা পড়ে আছে কিছুটা পরিষ্কার করে নি।
যেইনা ভাবা অমনি কাজ। একটা ন্যাকড়া জোগাড় করে  মোছামুছি করছে ঠিক সেইসময় কাজের মেয়েটি এসে বলল 'বৌদি কি করছো?'
রেখা বলল 'এইতো ভাই ঘরটা একটু ঝাট দিলাম আর এইগুলো একটু পরিষ্কার করছি।'
মামুন জিজ্ঞাসু কন্ঠে বলল'ও তাই?'
এরপর মামুন দ্রুত ছুটে চলে গেল নিচে।
তখনো জানে না রেখা যে নিচে এত বড় একটা ঘটনা ঘটে গেছে ।রেখাকে নিয়ে সারাবাড়ি তোলপাড় হয়ে গেছে। হঠাৎই একটা কথা কানে আসলো'রেখা র শাশুড়িমা মামুন মেয়েটাকে বলছেন 'এবাড়িতে এসব চলবে না ।এবাড়িতে কিছু সংস্কার আছে। বাসি কাপড়ে কেউ ঘর ঝাট দেবে না বা অন্য কাজ করবে না।  গিয়ে বল ।'
একটু পরেই মামুন বলে মেয়েটি ছুটতে ছুটতে আসে সিঁড়ি দিয়ে। এরপর এক হাত জিভ বের করে হাঁপাতে 
থাকে।  হাঁপাতে হাঁপাতে বলে  'বৌদি তোমাকে বাসি কাপড়ে এই সমস্ত কিছু করা যাবে না।'
রেখা বলল' আমি বাসি কাপড়ে নেই 
গো। আমি কাপড় চেঞ্জ করেছি ফ্রেশ হয়ে।
তারপর রেখা বললো তুমি জানো এই ঘর এই মাসি টা কি মুছতে আসবে গো? মামুন বলল না না মনে হয় কেউ মুছতে আসবেনা জানো বৌদি।
রেখা বলল আমি কি করে জানব ভাই আমিতো বাড়িতে নতুন তাই তোমাকে জিজ্ঞেস করছি।'
মামুন আর কিছু না বলে সরাসরি নিচে চলে যায়।
 একটু পরেই রেখা খেয়াল করে তাদের পাশের ঘরটাতে ওর শাশুড়ি মা থাকে সেই ঘরটা মুছে ওই মাসি বেরিয়ে চলে যাচ্ছে। কিন্তু রেখার ঘর বা রেখার ঘরের সামনের বারান্দা কিছুই মুছলো  না।
অথচ এ বাড়িতে আসার পর শাশুরি মা কিন্তু কিছুই বলে দিলেন না    কি করতে হবে ,না করতে হবে। রেখা তো  নতুন তাকে শিখিয়ে পড়িয়ে নেবে কিছুই বলেনা।
অথচ রেখা যখন নিজের ঘরে নিজে কাজ করতে যাচ্ছে তখনও খুঁত ধরে ধরে বেড়াতে লাগলেন।
যাইহোক একটু পরে আবার সেই মেয়েটি উঠে আসে এবং বলে 'বৌদি তুমি কিন্তু এখন এসব কিছু করতে ব'সো না। '
রেখা বলে' তাহলে কি ঘর এরকমই পড়ে থাকবে?'
মামুন বলে সেটাও আমি বলতে পারব না।'
রেখা স্নান করে নিজেই একা নিচে নেমে গেল।শাশুড়ি মা যে ঘরটা বসেন সেই ঘরে গিয়ে বসলো। ঘরে ঢুকতেই ননদ আর আর শাশুড়ি মা একান্তে কি কথা বলছিলেন , কে জানে? রেখাকে দেখে চুপ করে গেলেন। আর রেখার দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকালেন যেন মনে হল রেখা কত বড় একটা অপরাধ করে ফেলেছে।
এসব ভাবছে হঠাৎই রেখার ফোনে একটি ম্যাসেজ এসেছে'মনের জানালা খুলে রেখে দেখো তাকিয়ে সোনা ঝরা রোদ্দুর উঁকি মারছে তোমায় ডেকে।'সুপ্রভাত
রেখা মেসেজটা পড়ে একটু চমকে যায়' বাহ খুব সুন্দর লেখা তো ?কে পাঠালেন?'
আজকাল বেশ সুন্দর সুন্দর মেসেজ আছে সকালবেলা মনটাই ভালো হয়ে যায় রাত্রির ক্লান্তি ,অবসাদ নিশীথের মতো গভীরতা নিয়ে রেখার মনে দাগ কেটে যায় সকালের ভোরের আলোয় আবার নতুন করে খুঁজে পায় তার নতুন ঠিকানা। ভাবতে ভাবতেই মেসেজটা খোলার পর দেখছে এটা এসেছে পত্রিকার সম্পাদকের কাছ থেকে।
রেখা সত্যিই মনে মনে খুব খুশি হলো। তার মরে যাওয়া ইচ্ছে গুলোর মাঝে যেন বেঁচে ওঠার এক চিলতে রোদ্দুর।
আবার ভাবতে থাকে রেখা সেই অতীতের কথা। শ্বশুর বাড়ির লোকজন বোধহয় মেয়েদের কোনদিন আপন হয় না আপন করতে চাইলেও। রেখার জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা বারবার প্রমাণ করে
 দেয় ।এইতো বিয়ে হয়েছে শীতকালে শ্বশুরবাড়িতে তখন গরম জলের ব্যবস্থা ছিল নিচে। শাশুড়ি মার বাথরুমে। গরম জলে যারা স্নান করবে তাদের ওখান থেকে নিয়ে ই করতে হবে। এটা জানাই ছিল না রেখার।
পরপর কদিন ঠান্ডা জলে স্নান করে ঠান্ডা লেগে যায় রেখার। কি করবে কাকে বলবে? মনোজও  তো কিছু বলছে না। মাসি শাশুড়ি রা সেই বিয়ের আগে এসেছেন তখন অব্দি রয়ে গেছে ন। এখানে ঠান্ডা লাগা দেখে শুক্লা মাসি বললেন'কি করে খা তুমি ঠান্ডা জলে স্নান করো?
রেখা কি বলবে ভেবে না পেয়ে চুপ করে থাকে।
শুক্লা মাসি বলে কেন নিচের থেকে গরম জল নিয়ে আসবে? এ বাড়িতে কাজের লোক অব্দি গরম জল পায় আর তুমি বউ হওয়া সত্ত্বেও গরম জল…?
সন্ধ্যা মাসি বলে' কালকে অবশ্যই গরম জল নিয়ে আসবে কেমন?
এদিকে এমন খিদে পেয়েছে কাউকে কিছু বলতেও পারছে না। এ বাড়িতে নাকি নিয়ম আছে পুরুষদের সবার খাওয়া হবে তারপর মহিলাদের।
রেখা মনে মনে ভাবছিল যদি নিজের বাড়ি হত তাহলে কখন মা খাবার দিয়ে যেত। শুধু জলের বোতল থেকে জল খাচ্ছে।
এমনি করেই দিন কেটে যাচ্ছিল কিন্তু ঝামেলা বেধে গেল। পরেরদিন এত ঠান্ডা জমে যাওয়ার উপক্রম। রেখা ভাবল মাসিরা তো বলেছিল গরম জল নিয়ে আসতে। তাহলে একবার গেলে কেমন হয় নিয়েই আসা যাক।
একটা বালতি নিয়ে নিচে গেল গরম জল আনতে। মামুনকে গিয়ে বলল'কোথায় গরম জল আছে আমাকে একটু ঢেলে দাও তো?'
কথাটা শুনতে পেয়ে শাশুড়ি মা মামুনকে বললেন 'গরম জল সব সময় পাওয়া যাবে না।
এই কথা শোনার পর
রেখা গরম জল নেবার সময় মন চাইছিল না।
শ্বশুরবাড়িতে এরপরও রেখা   নতুনভাবে মেলে ধরার অবকাশ চাইছিল। সে জানে কালো মেঘ সরে গিয়ে নিশ্চিত এক মুঠো রোদ উঠবেই।

মমতা রায়চৌধুরী'র উপন্যাস পর্ব ৯৯



উপন্যাস 

টানাপোড়েন ৯৯
আত্মশুদ্ধি


মমতা রায়চৌধুরী



কতক্ষণ যে মায়ের বুকে মাথা রেখে নদী নিজেকে আবার নতুনভাবে আবিষ্কার করার চেষ্টা করছিলো সে ভুলেই গিয়েছিল সে কথা। হঠাৎই ঝর্ণা মাসির ডাকে চমক ভাঙ্গে। ঝরনা মা মেয়ের এই দৃশ্য দেখে চোখে জল এসে গেছে।
 কত ভুল বুঝাবুঝিই না হলো মা মেয়ের। ঝরনা মনে মনে চেয়েছিল এই মা-মেয়ের ঝামেলা মিটে যাক। ঝরনা  জানে এ যন্ত্রণা ।সন্তান দূরে থাকলে কি যে যন্ত্রনা ।সে প্রতি পলে পলে উপলব্ধি করতে পারে ।তারও একটা অন্য জীবন ছিল। আজ সমস্ত কিছুকে ছাপিয়ে চারিদিকের উদ্দাম কোলাহলের  মধ্যে শুধু নিজের হৃদয়টাকে একটা নির্জন দ্বীপ করে রেখেছে ।একলা নিশুতি রাতের মতো সেই যন্ত্রণাকে চেপে।
ঝরনা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ডাকলো 'মামনি ,মামনি, মামনি চলো আমরা যাই। গাড়ি এসে গেছে। মিস্টার মালহোত্রা সাহেব গাড়ি পাঠিয়েছেন।'
নদী কখন যেন একটা নিশ্চিত নিরাপদ আশ্রয় নিয়েছিল তার মায়ের বুকে ।  চোখ লেগে গেছিল বুঝতেও পারেনি। হঠাৎই চমক ভেঙ্গে গেল। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলো ঝরনার দিকে।
ঝরনা চোখের কাছে হাতটা নাড়িয়ে বলল ' কি হল মামনি, চলো আমরা যাই। কালকে তো আবার আসতে হবে তাই তো? মা তো এখন একটু ভালই আছেন চলো ।'
রুপসা ঝরনাকে বলল' চলে যাচ্ছ?'
ঝরনা রুপসার কাছে গিয়ে দুই হাত ধরে বলল 'এখন যাই বাড়িতে ওদিকটা সামলাতে হবে তাই
 না ?বাড়িটা ফাঁকা ফেলে রেখে এসেছি কালকে আবার আসব ।ঠিক আছে। তুমি কিন্তু সাবধানে বেশি টেনশন করবে না।'
নদী বলল "ঠিক আছে চলো'।
নদী যাবার সময় মায়ের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। সেই দৃষ্টিতে ছিল যেন কত দিনের আশা ,ভরসা, বিশ্বাসের একটা জায়গা।
রুপসা ঝরনা নদীর উদ্দেশ্যে হাত নাড়লো।
নদী আর ঝর্ণাও রূপসাকে  হাত নাড়লো।
নদী কিন্তু বেশি কথা বলে নি মায়ের সঙ্গে ,যেটুকু বলার সেটুকুর মধ্যে বুঝিয়ে দিয়েছে। তার অভিমান, ক্ষোভ,রাগ সমস্ত কিছুই যেন নিমেষের মধ্যে কর্পুরের মত উবে গেছে।
গাড়িতে বসে বসে নদী ভাবছে' সে যে কাজটা করেছে সেটা কি ঠিক করেছে? সে নিজেকে নিয়ে এখন আত্ম সমালোচনা করছে। কেন মিছে মিছে মায়ের সামনে এতটা রাগ করেছে। মায়ের বয়স কত হবে বড়জোর 40 -42,
বাপি মারা গেছে। কিন্তু তার মা যদি নতুন ভাবে বাঁচার চেষ্টা করে সেটা তো দোষের নয়। তবে কি সে অনেক বেশি স্বার্থপর হয়ে উঠেছিল? বাপির জায়গাটা এতটাই সেনসিটিভ হয়তো সে জন্যেই মিস্টার মালহোত্রাকে সহ্য করতে পারে নি।
আর পরিবার পরিবেশটাও যেন সেরকমই তৈরি হয়ে গেছিল। বন্ধুবান্ধব, আশেপাশের লোকজন প্রত্যেকে যেন কেমন একটা কৌতুহলী দৃষ্টি হাসাহাসি, বিদ্রুপ তার মাকে নিয়ে । সে এসব মেনে নিতে পারে নি। বোধহয় তার নৈতিকতায় বেঁধেছিলো।
এইতো আজই হসপিটালে তার বন্ধুদের কথাতেই তাদের অদ্ভুত হাসিতে ধরা পড়ে কত কথা। আজ তো কোন কথায় নদীর গায়ে কোন জ্বালা ধরে নি বা ফোস্কা  পড়ে নি। তবে কেন মিছিমিছি সেসব কথায় নিজের মেজাজটাকে নষ্ট করেছে  । আর মাকে ঠেলে দিয়েছিল অজানার দেশে।'
 থ্যাংকস গড'
 এরকম আর কিছু হতে দিতে চায় না।
 জীবন তো একটাই। এ জীবনে উপভোগের যদি সুযোগ থাকে, মানুষের যদি তার আয়ত্তে থাকে সেটা কেন সে উপভোগ করবে না?'
হঠাৎই ঝরনা মাসি বলল ', মামনি?
নদী বলল কিছু বলছো মাসি?
ঝর্ণা বললো 'এত কি ভাবছো?'
নদী ভাবলেশহীনভাবে ঝরনার দিকে তাকিয়ে হাসল।
ঝর্ণা বললো 'বৌদি ঠিক হয়ে যাবে
দেখো ।কোন চিন্তা ক'রো না। আর তাছাড়া বৌদির বস যেভাবে বিষয়টাকে ট্রাকে ল করলেন ,সত্যিই ওনাকে ধন্যবাদ  দেয়া দরকার।'


ঝরনা কথাটা বলে নদীর প্রতিক্রিয়াটা বোঝার চেষ্টা করতে চাইছিল মুখ দেখে।
নদী ও ঘাড় নাড়লো। পরক্ষণেই গাড়িতে জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল।
ঝর্ণা বললো' মামনি রাতে কি খাবে?'
নদী বলল' কিছু খাব না মাসি?'
ঝর্ণা বললো 'কেন খাবে না মামনি, মায়ের কথা চিন্তা করছো?'
নদী কিছু বলল  'না?
ঝরনা নদীকে কাছে টেনে বললো' মায়ের মত কেউ হবে না ।যতই মাকে ভুল বোঝ না কেন? সন্তানের ভালো-মন্দ মায়ের থেকে আর ভালো কেউ বোঝেনা ।তুমিও যেদিন মা হবে ,তুমি সেদিন বুঝতে পারবে?'
নদী ও বলল' তুমি কি করে বুঝবে ঝরনা মাসি ।তোমার বাচ্চা আছে?'
ঝর্ণা নদীর এই কথাটায় প্রথমদিকে হকচকিয়ে যায় ।তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলে সন্তান থাকুক বা না থাকুক  , এটা উপলব্ধির বিষয়  ।
তারপরই হঠাৎ  ঝরনা নিজের মনে ভাবতে থাকে 'তার মা থাকলে তার বাবা কি পারতো তার সৎ মায়ের কথায় তাকে বিক্রি করে দিতে?'
একসময় লম্বা বেণী দুলিয়ে সে স্কুলে গেছে। আজ তা ইতিহাস। যাদের বর্তমান নেই, তা তো ইতিহাস হয়ে যায়।
গাড়ি এসে থামল নদীদের বাড়ির কাছে।
ড্রাইভার বলল' আপনারা নামুন।'
নদী অন্যমনস্কভাবে জানালা দিয়ে তাকিয়ে। হঠাৎ গেটের আওয়াজে নদী তাকায়  দেখছে ঝরনা মাসিকে গেট খুলে দিয়েছে ড্রাইভার। ঝরনা মাসি নেমে 
পড়ল ।এবার আস্তে আস্তে গাড়ি থেকে নদী নামল।
ড্রাইভার বলল' কালকে কখন যাবেন একবার স্যারকে ফোন করে 
দেবেন ।তাহলে গাড়ি পাঠিয়ে দেবেন?'

ঝরনা নদীর দিকে তাকাল, নদী নির্বাক দৃষ্টিতে ঝরনার দিকে তাকিয়ে ।
ঝরনা ড্রাইভারকে বললো 'ঠিক আছে।'
ড্রাইভার ওকে বলে গাড়ি স্টার্ট 
করল ।গাড়ি বেরিয়ে গেল। নদী আর ঝর্ণা সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে আসার চেষ্টা করল।
ঝরনা তাড়াতাড়ি তালা খুলে ভেতরে ঢুকে গিজার চালিয়ে দিল।
তারপর ভালো করে হ্যান্ড ওয়াশ দিয়ে হাত ধুয়ে নিল।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে নদীকে বলল 'মামনি তুমি এখন আর ওপরে যেও 
না ।একেবারে ফ্রেস হয়ে খেয়ে ওপরে চলে যেও।
নদী বলল 'না ঝরনা মাসি, তোমার লেট হয়ে যাবে। তুমি এখানে ফ্রেশ হয়ে 
নাও ।আমি ওপরে গিয়ে গিজার চালিয়ে নিচ্ছি কেমন?
ঝর্ণা বললো 'কথাটা অবশ্য ঠিক। আমি আগে ফ্রেশ না হলে তো আমি কিছু করতেও পারবো না। ঠিক আছে, তাই হোক।
নদী নিজের রুমে চলে গেল।
ঝরনা ফ্রেশ হয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে বলল' মামনি  পাস্তা বানাবো?'
নদীর ওপর থেকে বলল' আমার কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না মাসি?'
ঝর্ণা বললো 'এভাবে বললে হবে না মামনি। তোমার প্রিয় নাস্তা আমি বানাচ্ছি পাস্তা ,ঠিক আছে?'
নদীর ওপর থেকে ঝুঁকে সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে বলল' ঠিক আছে ,তাই করো।'
ঝরনা ঝটপট পাস্তার জন্য সবজিগুলো গাজর ,বিনস, ক্যাপসিকাম, টমেটো ,বাঁধাকপি সব গুছিয়ে কেটে
 ফেললো ।কাঁচা লঙ্কা ,পেঁয়াজ কুচিয়ে ফেলল ।অন্যদিকে একটা পাত্রে পরিমাণমতো পাস্তা নিয়ে তাকে জল দিয়ে ধুয়ে, ফুটন্ত জলে পাস্তাগুলো দিয়ে দিল । পাস্তা সেদ্ধ হয়ে গেলে জল ঝরিয়ে রেখে দিল। দুটো ডিম ফেটিয়ে নিল। এরপর ননস্টিক প্যানে তেল দিয়ে   ভেজে নিল ।তারপর আস্তে আস্তে  ননস্টিক প্যানে বাটার দিয়ে প্রথমে পেঁয়াজ গুলোকে হালকা করে নেড়ে চেড়ে নিল, এরপর একে একে সবজি গুলো নুন দিয়ে নেড়েচেড়ে নিল, তারপর সামান্য ভাজা ভাজা হলে, চিলি সস, সয়া সস, টমেটো সস দিয়ে দিল ।এরপর পাস্তাগুলো তার ওপর দিয়ে 
দিল ।পরিশেষে ভেজে রাখা কুচো ডিম এড করে ,রেডি করে ফেলল পাস্তা।
ঝরনা মনে মনে খুব খুশী হলো যাক শেষমেষ নদী খেতে রাজি 
হয়েছে  ।এমনিতেও ওর এগ পাস্তা খুবই প্রিয়।
ঝরনা নিচে থেকে ডাকলো "মামনি মামনি মামনি. ই.ই.ই..।'
নদী তখনও শাওয়ার এর নিচে ,কি জানি হিমশীতল রাতে আজকে কেন সে এতটাই উষ্ণ হয়ে উঠেছে। ভাল করে স্নান করছে ।মনে হচ্ছে যেন আজকে তার শুদ্ধিকরণ হচ্ছে। শাওয়ারএর জলে স্নানের সময় ঝরনার গলার আওয়াজটা স্পষ্ট শুনতে পায়নি ।সাওয়ার বন্ধ করার পর আওয়াজটা কানে গেলে, নদী চিৎকার করে বললো 'আমি বাথরুমে আছি মাসি।'
ঝর্ণা বললো ' আচ্ছা ঠিক আছে। তুমি ফ্রেস হয়ে নিচে এসো ,তোমার পাস্তা রেডি।'
নদী ফ্রেস হয়ে বেড়িয়ে মায়ের দেয়া করসুলের হাউসকোটটা পরে নিচে আসলো।
নীল রঙ্গের করসুলের হাউসকোট পরে নদীকে সত্যিই একটা অন্যরকম 
লাগছিল ।ঝরনা তো দেখে অবাক  হয়ে গেছে  হাউসকোটটা কেনার পরে একদিনও নদী গায়ে তোলেনি। আজ সেই হাউসকোট-টাই পরেছে।
ঝর্ণা বললো' তোমায় কি সুন্দর লাগছে মামনি। বৌদির দেওয়া হাউসকোটে।'
নদী শুধু' হাসলো।"
বৌদির কিন্তু চয়েজ আছে। তুমি একদিনও পরো নি বলে ,বৌদি কি কষ্ট টাই না পেয়েছিল। আজকে যদি দেখতো কত খুশিই না হতো।'
নদী জিজ্ঞাসু নেত্রে বলল' তাই  মাসি ?তা এতদিন পরিনি ।আজকে তো 
পরলাম ।ঠিক আছে এসো আমরা দুজন একটা সেলফি তুলি ।মাকে ওটা পরে তুমি দেখিয়ে দিও।
ঝর্ণা বললো "বাহ রে আমার বয়েই
 গেছে ।তোমাদের মা বেটির ব্যাপার 
তোমরা বুঝে নাও। আমি তৃতীয় ব্যক্তি...।
নদী বলল' মাসি তুমি তৃতীয় ব্যক্তি কথাটা মনে রেখো কিন্তু..?
ঝরনা হেসে ফেললো।
নদী বলল' মাসি তুমি খাও। তোমার জন্য কর নি?'
ঝরনা চুপ করে আছে।
নদী বলল ' তা বললে তো হবে না  আমি এতটা পাস্তা খাব না ।তোমাকে খেতেই হবে এখান থেকে। নদী  খানিকটা পাস্তা প্লেটে করে নিয়ে ঝরনার মুখের কাছে গিয়ে বলল" হাঁ করো আগে, হা  
করো ।'
ঝর্ণা বললো' আমি খেয়ে নেব ।'
নদী বললো' না ,না ,না ,আগে আমার হাত থেকে খাও, তারপর অন্য কথা।
ঝর্ণা বললো' বাপরে আমি তোমার সঙ্গে কেন পারব !ঠিক আছে এই হা  করলাম। ঝর্ণা বললো 'দেখতো হাঙ্গর মাছের মত আমি হাঁ করেছি। গোটা মানুষ খেয়ে নিতে পারব না?"
নদী হেসে ফেললো বললো 'তুমি পারোও মাসি।"

৩১ জানুয়ারি ২০২২

কুকুরটা

দেবব্রত সরকার

হালকা শীত। থোকা থোকা কোয়াশার ঝাঁক। মাঝে মাঝে দলা পাকিয়ে ভাসছে। রাস্তায় লোকেদের আনাগোনা কম। ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকাতেই দেখি সাতটা।

তাড়াহুড়ো করে শরীরে জামাটা গলিয়ে ঘরের দরজায় তালা ঝোলাতেই কয়েকটি কুকুরের বাচ্চা সাথে তাদের মা, আমার চারপাশে এসে কুঁ কুঁ, কেউ-কেউ শুরু করে দিয়ে ল্যাজ নাড়ছে। তাদের দিকে অশ্রুপূর্ণ নজর রেখে সোজা হ্যান্ডেল সাইকেলটাই চরে বসি। একশো মিটার দূরত্ব পর্যন্ত কুকুরের বাচ্চাগুলো আমার সাইকেলের পিছন পিছন ছুটে আসে। এটা এখন নিত্য দিনের ঘটনা। বহরমপুর গোরাবাজার নিমতলায় দাঁড়িয়ে ‘অমি’কে একটা ফোন করি। তৎক্ষণাৎ অমি তার মেস ছেড়ে একটি ক্যারিব্যাগ হাতে নিয়ে এগিয়ে আসে।

শীতের সন্ধ্যা। অমি'র গায়ে একটি চাদর। আমি কেবল মাত্র ফুলপ্যান্ট আর একটি কমদামি টেরিভয়েলের জামা পড়েই চলে এসেছি। চারদিকে ঘন অন্ধকার। শীতের কুয়াশার দল আমাদের দু'জনকে আহ্বান করছে ঠোঁটে ঠোঁট মিলতে। লাইটপোস্টের আলোগুলো বেজায় জোর। সদ্য ভেপারের বাল্ব পরিবর্তন করে গেছেন স্থানীয় পুরসভার কর্মী। 

অমি আর আমি দু'জনে গল্প করতে করতে এগিয়ে গিয়ে ভাগীরথীর ধারে ছাতিম গাছের নীচে সান বাঁধানো সিঁড়ির উপর বসি। কিছু মুহূর্ত দুই হৃদয়ের প্রেমালাপ জমে উঠতেই ক্যারিব্যাগটা থেকে একটা টিফিন বাক্স বার করে অমি। অমি'র হাতের তৈরী সব খাবারই আমার খুব ভালো লাগে। ওর নিজের হাতে তৈরী করে আনা চাওমিন দুইজন মিলে গভীর সুখে তৃপ্তির সাথে একে অপরকে খাইয়ে দিই। আস্তে আস্তে অন্ধকার থেকে গোল চাঁদ কুয়াশাশরীর ভেঙে মৃদু আলো বিকিরণ করে। 

ভাগীরথীর পবিত্র জল কলতান তুলে ছোটো বড় মাছ শুশুকদের নড়ে ওঠার দৃশ্য আমাদের মধুর মিলনের চিহ্ন হয়ে উঠছে। অমি'র কোলে মাথা রেখে অনেক দুর গগনের স্বপ্ন দেখি। ছাতিম গাছের পাতার ফাঁক ভেঙ্গে মৃদু জ্যোৎস্নালো এক নব জীবন নিয়ে আমার দিকে ধেয়ে আসে। ভাগীরথীনদীবুকে জলে ডিঙি বেয়ে ফাঁস জাল পেতে কোন এক অচেনা জেলে তার আপন লক্ষে এগিয়ে যাচ্ছে ঝিলমিল জ্যোৎস্না গায়ে।  

অমি, আমাকে হঠাৎ-ই বলে ওঠে তার মা-বাবার কথা, দিদির কথা, এমন কিছু গোপন...কথা যার কারণে তার চোখে জল এসে যায়। টানা সজল চোখে টলটল জল জ্যোৎস্নার আলোয় এক নতুন দিশার চেতনা তৈরী করছে। 
তার কোঁকড়ানো চুলগুলি ঘাড় থেকে ক্রমশই এগিয়ে আসছে আমার চোখে। তার চোখের জল আমার ঠোঁটে এসে পড়ে। হৃদয়ে অদ্ভুত আঘাত এসে ধাক্কা মারে। তর্জনী আঙুল দিয়ে তার চোখের জল মুছে আমার জিভে তুলে নিই । সঙ্গে সঙ্গে সেই কষ্টের মুখে প্রেমহাসি হেসে অমি কি যেন আহ্বান করে আমার কাছ থেকে। হৃদয়ন্তরটা বার বার নড়ে ওঠে। ওর হৃদয়টা কি বলতে চায় তা একান্তে আমার হৃদয়ের গোপনযাদুতে মিশে যায়। অমির চোখ দুটি মুছিয়ে দিয়ে ঘাড়টা কাত করে ঠোঁটে আলতো ঠোঁট দিয়ে স্পর্শ করি। এ যেন শরীরের নবউন্মোচন। নিত্যপ্রবাহে ভেসে ওঠে। কোথায় আকাশ, কোথায় বাতাস, কোথায় মাটি সব যেন ভর শূন্য যাদুতত্ত্বে প্রবেশ করছি। যা কেবলই আনন্দ। মূহুর্তের আনন্দ। সব চাওয়া পাওয়ার থেকে অনেক দুরে। যেখানে কেবল প্রেম খেলা করে। কুয়াশা ছাড়া মেঘ নতুন হয়ে ডেকে আনছে পুষ্পদল। কয়েকশো মাইল দূরের হিমালয় যেন তার ভূষার বর্ষণ করে আহ্বান করছে তার দরবারে। বলছে সু-স্বাগতম প্রেমোদেবমৃতা। নিমিষেই সমস্ত দুঃখ কষ্ট দূরে বহুদুরে মিলিয়ে গেল। সে বলে উঠল-'এ ভাবেই চিরদিন তুমি আমার পাশে থাকবে তো! কখনও আমাকে ধোকা দিয়ে চলে যাবেনা তো তুমি? তোমার জন্য আমি সমস্ত কিছু করতে... পারি। শুধু তুমি যেন আমার থেকে দূরে সরে যেওনা।

এমন সব প্রশ্নের কি উত্তর হয় হে সর্বপ্রেমময় পুরুষ প্রেমী পুরুষ তা সবই তোমাদের জানা। আমি তাকে সেই মুহূর্তে উত্তর করি –‘তুমি যদি না যাও আমি তোমার প্রেম ছেড়ে কখনই যাবো না। বাতাস যেন মধু মন্থন করলো এই যুগলের। খুশি হল প্রকৃতি। নব চেতনায় মুখরিত হল চার দিক। নতুন প্রেমপর্বের সূচনা হল এই চিরাচরিত পৃথিবীর বুকে। যে প্রেমে কোন মোহ নেই কোন ক্ষুধা নেই ঋপুর ধারক, ঋপুর বাহক সেই প্রেমধর্মে অধিকার কেবল অঞ্জলিব্রতপ্রেমিক প্রেমিকার।

ভাগীরথীর জল হতে দলা দলা শিশির ধোয়া ধেয়ে আসে আমাদের দিকে। ওপারে ভেসে ওঠে সাদা আলো। অমির স্বপ্ন সে টিভিতে খবর পড়বে। কোন এক দিন পড়বেই। কিন্তু তার পরিবারে বাঁধা। কারণ বর্ধিষ্ণু পরিবারে বড় হয়েছে মেয়ে। বিয়ে দিতে হবে। আর এই ঘরের মেয়ে কখনই কোনদিন এমন কাজ করবে তা ভাবাই পাপ। সৎ চরিত্রবান মেয়ে সরলতায় মোড়া চুলের ডগা থেকে নোেখ। আর ইচ্ছা যে ইচ্ছা পূরণ করা খুব সহজ হয়। এই ইচ্ছার বিরুদ্ধে সামাজিক কোন আইন এই বাঁধা সৃষ্টি করতে পারেনা। অতএব সে টিভি তে খবর পড়বেই। তা যে কোন ভাবেই হোক । তার জন্য পরিবারে বাবার সঙ্গে নিত্যদিন বচসাও হয়। আমার কপাল বেয়ে তার নরম হাতের আঙুলগুলি স্পর্শ করে ছোট্ট ছোট্ট চুলে। নরম আঙুলের নোখ দিয়ে বিলি কেটে দেয় সেই। ভাগীরথীর জলের দিকে দু'জনে শপথ নেয় যে-যত কষ্টই হউক কেউ কাউকে কোন দিনই ভুল বুঝবোনা। একে অপরকে ছেড়ে কোন দিনও যাবোনা। কখনওই না, কোন দিনও না। তার শরীরে ঢাকা চাদরটি আমার শরীরও ঢেকে নেই। এক চাদরের ভেতর উঠতি যুবক যুবতি। আমার বুকের ভিতর মাথা গুঁজে বিড় বিড় করে কি যেন বলতে থাকে। আর তখনই শরীরের বয়ে চলা রক্তস্রোত ভাগীরথীর বয়ে যাওয়া জলের মত কলতান তোলে। রাস্তার ভেপারের আলো যে ভাবে ধিরে ধিরে হিট তৈরী করে আলো প্রদান করে ঠিক যেন সেভাবেই আমার শরীরে আলো জেগে উঠছে। এখন আমার শরীর সকালের উদিত সূর্যের তেজের মত ক্রমশ বেড়ে চলেছে মধ্যাহ্নে প্রহরে। জানিনা তার কীরূপ অনুভূতি তবে এটুকু বুঝতে পারছি। কোন এক খালি পাত্র খানি জল ঢেলে পূরণ করতে চাই। যেমন ফাঁকা কলসি জল পূর্ণ হলে তার আত্মতৃপ্তি ঘটে। মরা নদীতে জল এলে যেমন খুশীতে ভেসে ওঠে। ফাটা পুকুরগুলি যে ভাবে জল পেলে বেঁচে ওঠে। বারি বর্ষণ হলে ধরা যে তৃপ্তি যে আনন্দ লাভ করে। ভীষণ খরায় তৃষ্ণার্ভ প্রাণের খালি অংশ জল দ্বারা পূর্ণ করে আনন্দ উপভোগ হয়। পূর্ণিমার আলোর মত তার শরীরে জেগে উঠেছে শরীরীবাহার।

চোখে-চোখে, মুখে-মুখে, বুকে বুকে, কিছু ক্ষয়ের জন্য একে অপরের নিবিড় সান্নিধ্য লাভ। দুটি মনে, দুটি প্রাণে, দুটি দেহে, জাগিয়ে তোলে আনন্দহিল্লোল। চোখের তারায় নামে সুখের বিহ্বলতা। শ্বাস প্রশ্বাসে ছড়িয়ে পড়ে পারিজাতের সৌরভ...। দুই ভিন্ন লিঙ্গ ক্রমশই উত্তেজিত হয়ে ওঠে। হঠাৎ দমকা হাওয়ায় শরীরের সমস্ত অঙ্গের বিষ তুলে। শরীরের বয়ে চলা শূন্যবলয়ের ক্ষিপ্ত সমুদ্রের সমস্ত ঢেউ সামলে, অমি কে বলে উঠি-‘এবার আমাদের বিয়েটা সেরে ফেলা উচিৎ। আমি আমার বুকের ওপর থেকে হাত সরিয়ে নেয়।' বলে ওঠে-'আমার পরিবার কিছুতেই মেনে নেবে না!” –চলনা আমরা দুজনে মিলে কিছু একটা উপায় খুঁজে বার করি। এক কাজ করি আমরা দু'জনেই তোমার বাবা-মা কে আমাদের

সম্পর্কের কথা বলি।

-না তা হয়না। বাবা তাহলে আমাকে আর এখানে রাখবেনা।

এক চা ওয়ালা চা...! চা...! করে হাঁক ছাড়তে ছাড়তে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। ভেপারের আলোয় চা-ওয়ালার মুখটা ভেসে উঠতেই তা দেখে চাদরে মুখ ঢাকে অমি। আমি জিজ্ঞাসা করি – “কি হল। চা ওয়ালাকে দেখে এমন করে মুখ ঢাকলে যে?? ফিস্ ফিস্ করে বলে উঠল- এই চা কাকুটা আমাদের বাবাদের অফিসে চা বিক্রি করতে যায়। ও আমাকে ভালো ভাবে চেনে। আর এ ভাবে দেখে ফেললে বাবাকে কাল বলে দেবে।

এভাবে প্রতিদিন কি ভাবে যে নটা বেজে যায় দু'জনে বুঝতেই পারিনা। সেদিনের মত ভাগীরথী, ভাগীরথী ঘেষে বয়ে চলা রাস্তা, ছাতিমগাছ, ভেপারআলো, স্নিগ্ধ বাতাস, মনমুগ্ধ জ্যোৎস্না, ছাতিমজোনাকি, দল বাঁধা কুয়াশাকে বিদায় জানিয়ে উঠে পড়ি। এক হাতে সাইকেল আর এক হাতে অমির হাত পথ চলছি। ওকে ওর মেসে পৌঁছে দিয়ে আমি এগিয়ে যেতে যায়। তখনই ওর গায়ের চাদরটি আমাকে দিয়ে বলে এটা ঠিক ভাবে গায়ে জড়িয়ে তারপর যাও। আর কাল থেকে এভাবে শীতের পোষাক না নিয়ে বেড়বে না। হৃদয় প্রিয়া মানে প্রেয়সীর কথা আমি কি ভাবে ফেলি—“যো আজ্ঞা ম্যাডাম!” ও মেসে চলে যায়। আমি ইন্দ্ৰপ্রস্থে গৌতমের চায়ের দোকান হয়ে ঘরে ফিরি। দরজার কাছে এসে সাইকেল থামিয়ে ঘরের তালা খুলতেই কুকুরের বাচ্চাক’টি তার মাকে সঙ্গে নিয়ে ল্যাজ নাড়তে নাড়তে হাজির। কেউ...কেউ... করতে থাকে । পাচেটে আদর করে। কেউ প্যান্ট কামড়ে আবার কেউবা দু’পা উঠিয়ে দেয় গায়ে। কুঁ... কুঁ...! করতে থাকে। ঘরে ঢুকে বয়াম থেকে কয়েকটি বিস্কুট তাদের ছুঁড়ে দিই তারা মহা আনন্দে, খুশি হয়ে সেগুলি কাড়া কাড়ি করে খাচ্ছে।

এমন ভাবেই দিন কাটে। মাস যায়। অমি'র খবর পড়ার সুযোগও হয়ে যায়। ভুল বোঝাবুঝির কারণে, কাজ কৰ্ম্ম নিয়ে মাঝে মধ্যে মন কষাকষি। ফোনে একাধিক বার বচসাও বাঁধে। ও অফিস থেকে বেড়িয়ে এলে পায়ে পায়ে পথ চলি। একদিন চোয়াপুর সেরিকালচারের ভিতর দিয়ে দু'জনে হাত ধরে আসছি। এমন সময় আবদার করে সরকারী চাকুরীর কথা উল্লেখ করে অমি। আমার মুখ থেকে আনন্দ হাসি দেখে খুশিও হয়। বচসার রেশ থেকে যায়। এভাবেই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মনেরও পরিবর্তন ঘটতে থাকে তার। ফেলে আসা স্মৃতি গুলি অমিকে ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি। ব্যর্থ হই। আমি এখনও বেকার তবুও পূর্ণপ্রেমিকপুরুষ তার জন্য চকলেট কিংবা বিস্কুট, কেক ইত্যাদি নিয়ে যেতে ভুলি না। একদিন অমি বলে ওঠে-“ এসব এনে মায়া সৃষ্টি করবার চেষ্টা করছো!

আকাশ ভেঙে পড়ে মাটিতে। তার কথার ধাক্কায় বুকের পাঁজড় ছেড়ে যায়। খুব কষ্ট পাই, বুঝতে দিইনে। মনে মনে ভাবি আর প্রার্থনা করি হে বিধাতা ওর শুভ হোক। ওর জীবন রঙিন স্বপ্নে ভরে উঠুক, ওর যাতে আনন্দ লাভ হয় ও তাই করুক । ওকে কখনও কষ্টে রেখোনা প্রভু। ওর কষ্ট যদি হয় তাহলে তোমার সাথে আমার হবে। এই সমস্ত কথা ভাবতে ভাবতে ঘরে ফিরি। সেই সমস্ত নিশুতি জাগা কুকুরগুলি আমাকে সঙ্গ দেয়। অঝর অশ্রু আর হৃদকাপা বদ্ধ কন্ঠস্বর আমাকে প্রবল ধাক্কা মারতে থাকে । সেই ধাক্কা খেতে খেতে সাইকেলটা থেকে নেমে ঘরে ঢুকে বয়াম থেকে কয়েকটা বিস্কুট নিয়ে এসে রাস্তায় ছড়িয়ে দিই। তারা মহা উল্লাসে কাড়াকাড়ি করে খেতে থাকে।

হঠাৎ জীবনে ঝড় ওঠে, অমি’র ক্ষোভ অভিমান। সমস্ত প্রতিশ্রুতির কথা ভুলে এখন অন্য পথ দিয়ে হেঁটে যায়। আমার পথ আর ওর পথ এখন আলাদা। ও সরকারী চাকুরীর... খোঁজে...। আর আমি অমির খোঁজে একে অপর দিকে হারিয়ে যায়। দিন কাটে মাস কাটে বছর ঘুরে যায়। অমির আর ফোন আসে না। অমি আর চুলে বিলি কাটেনা। আমি আর সেই আদুরে ভাষা দিয়ে বুকে টানেনা। কিন্তু, সেই কুকুর গুলি এখন যুবক। কয়েকটা কুকুর রোগে ক্ষুধার জ্বালায় মারা গেলেও যে কুকুরটি জীবিত ছিল সে প্রতিদিনই আমার দরজার সামনে সে কেউ... !কেউ...! করে ডাক ছাড়ে আর আমি দরজা খুলে বয়াম থেকে বিস্কুট বার করে দিই। সে উল্লাসে মহাআনন্দে ল্যাজ নাড়তে নাড়তে কুরমুর করে চিবিয়ে যায়...।
@@@@@@@
কুকুরটা @@@