১৩ ডিসেম্বর ২০২১

মমতা রায় চৌধুরী /৬৮





উপন্যাস 

টানাপোড়েন ৬৮
সামাজিক ব্যাধির বলি

মমতা রায় চৌধুরী



                       তকাল স্কুল থেকে ফিরে এতোটাই ট্রায়াড লাগছিল রেখার যে ভালো করে ভেন্দুদের বাড়ির খবরটা নিতে পারে নি, চৈতির মার কাছ থেকে। আসলে এতদিন পর স্কুল আর এত চাপ ছিল। আবার বাড়িতে এসে মনোজের দেখভাল, মিলি তার বাচ্চাদের দেখভাল ,সঙ্গে বাড়ির কাজ কম্ম ।কাজের মেয়েটা তো কাজে আসছে না। আজ ছুটির দিন তাই কাজ করতে করতেই মনে মনে ভাবছিল আমরা মেয়েরা কতটা স্বাধীনতা লাভ করেছি। সমাজ বদলায়। বিজ্ঞানের অভিষেক হয়। বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠিত হয় বিজ্ঞানের বিজয় অধিকার। মানুষ ছুটে চলে গ্রহ গ্রহান্তরে ।তবু প্রদীপের তলাতেই অন্ধকার ঘন হয়। অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে অনগ্রসরতার কালিমাও বেড়ে চলে ।সমাজে উপেক্ষিত হয় নারীর মর্যাদা। তাই একবিংশ শতাব্দিতেও নারীকে আগুনে পুড়িয়ে মারা হয় ।আজও লক্ষ লক্ষ নারীর স্বপ্ন অকালে শেষ হয়ে যায়। পুরুষ শাসিত সমাজের অবহেলায়, অবজ্ঞায় এখনো হাজার হাজার শিশু কন্যার জীবন অন্ধকারে ই। আজ ও নারী লাঞ্ছনার শেষ হয় না। হয়তো  মেয়েরা বহু ক্ষেত্রে অধিকার ছিনিয়ে নিচ্ছে।কিন্তু তারপরেও সমাজের কাছে অবস্থিত সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয় ।কিছু ক্ষেত্রে কটাক্ষ বিড়ম্বনা। রাজা রামমোহন রায় ,ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো মহান  মনীষীদের ‌দয়ায় আজ নারীরা সমাজে কিছুটা নিজের জায়গা করে নিতে পেরেছে ,শিক্ষার আলোতে আসতে পেরেছে। এটুকুই আশার কথা ।কিন্তু সামাজিক ব্যাধি এখনো নির্মূল হয় নি।
ভেন্দুর বউ কি তাহলে সেই ব্যাধির বলি হলো?
এসব ভাবতে ভাবতেই মিলিদের খাবারগুলো রেডি করে ওদের দিয়ে এসে মনোজকে ব্রেকফাস্টটা টেবিলে দিচ্ছে।
এরমধ্যে মনোজ ব্রেকফাস্ট টেবিলে এসে বসলো এবং বলল ' কি ব্যাপার? আজ কি বানিয়েছো?'
রেখা বলল 'বেশি কিছু বানাই নি ।আসলে একটু স্বাদটা চেঞ্জ করার জন্য মেথি মালাই আর রুটি করেছি।'
মনোজ বলল  'বাহ'
রেখা বলল 'দেখি আজকে তুমি কটা রুটি খাও?'
মনোজ বলল দেখবে আজকে আমি অনেক রুটি খাব?
রেখা হাসতে হাসতে বলল 'আমি তো জানি  মশাই তোমার দৌড়টা কত দূর?'
মনোজ বলল'রেখা তুমি কিন্তু আমাকে শরীর খারাপের পর থেকেই খাবার ব্যাপারে আন্ডারএস্টিমেট করছো? কিন্তু ভীষণ রেগে যাচ্ছি।
রেখা বলল বারে তো তুমি তো প্রমান করবে আমার ধারণাটাকে ভাঙার দায়িত্ব তোমারি ।'একটু মুচকি হেসে মনোজের দিকে তাকালো।
মনোজ বলল 'ঠিক আছে  আজ আমি প্রমাণ দেবো।'
রেখা বলল-'তোমার কিন্তু টাইম স্টার্ট হল।
এবার মনোজ হেসে ফেললো।
অ সময়ে পাশের বাড়ির চৈতির মা ডাকছে ' ও দিদি ,দিদি ,ও দিদি?'
রেখা জানলার নীল পর্দাটা সরিয়ে গলা বাড়িয়ে বলল 'কিছু বলছ?।'
চৈতির মা বললো ও দিদি সেই গত দিনের সেই কেসটা গো?
রেখা বলল ভে'ন্দুদের বাড়ির?'
চৈতির মা মাথা নেড়ে বলল 'হ্যাঁ দিদি।
রেখা বলল' পুলিশ এসেছিল?'
চৈতির মা বললো 'কি জানি ,কি হয়েছে ?তবে তো শোনা যাচ্ছে মেয়ের বাবা এসেছিল?'
রেখা বলল' ও মা তাই বুঝি ?তারপর কি হলো?'
চৈতির মা বলল 'কি আর হবে ?গরিব বাবা হলে যা হয়?'
রেখা বলল 'ওর  তো টাকার অঙ্কে  পেরে উঠবে না।'
চৈতির মা বললো 'ওরা তো সবকিছুকে টাকা খাইয়ে রেখেছে। থানা বল আর যাই বল?'
রেখা বললো 'সত্যিই একটা মেয়ে তার জীবন দিয়ে দিল?'
চৈতির মা বলল 'অথচ সমাজে তার মূল্য নেই।'
রেখা বলল' তবে এক্ষেত্রে মেয়ের বাবা যদি কেসটা করে ।তাহলে কিন্তু অনেক কিছু হতে পারে?'
চৈতির মা সংশয়ের সঙ্গে বলল' কেস অবধি যেতে পারবে ?'
রেখা বলল' সেটাই আসল কথা।'
চৈতির মা বলল' কেন বললাম বলুন তো?'
রেখা বলল 'কেন?'
চৈতির মা বলল' 'কেস ডিসমিস হয়ে গেছে।'
রেখা বলল 'কি বলছ?'
চৈতির মা বললো 'ঠিকই বলছি দিদি।'
রেখা বলল 'কিছু শুনতে পেয়েছো?'
চৈতির মা বলল'মেয়ের বাবা কে টাকা দিয়ে মুখ বন্ধ করা হয়েছে?'
রেখা আশ্চর্য  হয়ে বলল 'কী?'
চৈতির মা বলল মেয়ের বাবাকে বসানো হয়েছিল ওদের সাথে।'
রেখা বলল 'তাই নাকি?'
চৈতির মা বিষন্নভাবে বলল'তবে আর বলছি কি?'
রেখা বলল' কী হয়েছে সেটা বলো তো?'
চৈতির মা বলল'গরিব বাবা 100000 টাকা চেয়েছিল?'
রেখা বলল বা দারুন ইন্টারেস্টিং ব্যাপার তো?
চৈতির মা বলল 'শুনুন'।
রেখা বলল 'হ্যাঁ ‌তারপর?'
চৈতির মা বলল 'ছেলের বাড়ির পক্ষ থেকে 50 হাজার টাকা দেবে বলেছে।'
রেখা বললল 'মেয়ের বাবা ,রাজি হয়ে গেল?'
চৈতির মা বলল 'হবে না অভাবের সংসার?'
রেখা বলল মেয়ের  বোন আছে নাকি?
চৈতির মা বলল' হ্যাঁ, সে ও তো বিবাহযোগ্যা শুনেছি।'
রেখা বলল 'তাহলে তো কিছু করার নেই।'
চৈতির মা বললো' আমার ও  খুব ভয় হয় ,জানেন দিদি?'
রেখা বললো 'কেন তোমার আবার কি জন্য ভয়?'
চৈতির মা বলল' 'আমার মেয়েটাকে নিয়ে?''
এর মধ্যেই মনোজ আবার ডাকতে শুরু করল' রেখা রেখা, রেখা বলে।'
রেখা বলল 'যাচ্ছি একটু পরে।'
চৈতির মা বলল 'দাদা বোধহয় আপনাকে ডাকছে ?কিছু দরকার?'
রেখা বলল ' জানেন তো দিদি ভেবে অবাক লাগছে একটা মেয়ের প্রাণের মূল্য মাত্র 50000 টাকা?'
চৈতির মা বলল 'সেই থেকে তো আমিও দ্বন্দ্বে পড়ে আছি।'
রেখা বলল 'কন্যাসন্তান দরিদ্র পিতা মাতার কাছে এখনো বোঝা স্বরুপ গো?'
চৈতির মা বলল 'একদমই তাই?'
রেখা বলল'এজন্য শিশুকন্যাদের সামনে যথার্থ শিক্ষার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা দরকার?'
চৈতির মা বলল 'সমস্যার সমাধানের কি এটাই রাস্তা?'
রেখা বলল অবশ্যই শিক্ষায় মনের অন্ধকার দূর করতে পারে ।পারে অন্ধ ধারণার অচলায়তন ভাঙতে?'
চৈতির মা বলল 'এই মেয়েটি তো বিএ পাশ ছিল গো?'
রেখা বলল 'বলতে চাইছো ,মেয়েটিতো শিক্ষা পেয়েছে তাই তো?'
চৈতির মা  মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো 'হ্যাঁ।'
রেখা বলল 'শিক্ষা তো মেয়েটি কাজে লাগাতে পারলো না?'
চৈতির মা'বললে একদম ঠিক!'
রেখা বলল' মেয়েটির মরার কি দরকার ছিল? বাপের বাড়ি চলে যেতে পারত?'
চৈতির মা বলল' আদপে মেয়েটি মরেছে ,না ওকে মারা হয়েছে ।সেটাই তো রহস্যজনক।'
রেখা বলল অথচ জগতে বহু নারী প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছে না।'
চৈতির মা বলল 'সে তো জানি। '
রেখা বলল'খুব খারাপ হয়ে গেল'।
চৈতির মা বলল'তাহলে দিদি আমাদের এই কন্যারা কি এভাবেই সমাজে লাঞ্ছনার শিকার হয়ে যাবে?'
রেখা বলল'যেদিন সমাজের প্রতিটি পিতা-মাতা বুঝবে তাদের শিশুকন্যারা ভবিষ্যতে জায়া জননী তাদের এ জন্য যথার্থ শিক্ষার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে স্বাবলম্বী করা।'
চৈতির মা বলল 'সবক্ষেত্রে তো সবার সেই আর্থিক বল থাকে না?'
রেখা বলল 'সেটাই তো হয়ে গেছে সব থেকে বেশি দুর্ভাগ্যজনক।'
চৈতির মা বলল আমার মেয়েটাকে যদি তাড়াতাড়ি বিয়ে না দিতাম তাহলে বোধহয় ভাল হত।'
রেখা বলল 'তখন তো কতোবার বারন করেছিলাম শুনলে না?'
চৈতির মা বলল হ্যাঁ দিদি আমরা ছাপোষা মানুষ ভাবলাম ভালো ছেলে দিয়ে দিই।'
রেখা বলল এখানেই তোর ম্যাক্সিমাম বাবা-মা ভুল করেন।
কন্যা সন্তানকে উপযুক্ত করে গড়ে তোলার জন্য পিতামাতাকে উদ্যোগী ভূমিকা নিতে হবে তার সঙ্গে সঙ্গে অবশ্য রাষ্ট্রের ও  দায়বদ্ধতা রয়েছে।'
চৈতির মা বলল 'হ্যাঁ এখন তো আমাদের পশ্চিমবঙ্গ সরকার মেয়েদের জন্য নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছন।'
রেখা বললে অবশ্যই এটাতো পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একটি মহতী উদ্যোগ কন্যাশ্রী প্রকল্প সারা বিশ্বে সমাদৃত হয়েছে এটা কন্যাশ্রী প্রকল্পের সাহায্য নিয়ে মেয়েরা পড়াশোনা করে স্বাবলম্বী হতে পারে নিজের ভবিস্যত নিজে করবে।
চৈতির মা বলল একদম ঠিক বলেছেন দিদি।
মনোজ আবারো ডাকতে লাগল রেখা রেখা
রেখা বলল যাই..ই.ই।
সঙ্গে সঙ্গে এটাও বললো নারীদেরকেও 
আপন ভাগ্য জয় করার অধিকার দিতে হবে।
চৈতির মা বলল'পরে এই নিয়ে কথা বলব দিদি।'
রেখা বলল' চৈতি কে নিয়ে ভাবছো?'
চৈতির মার চোখে জল আর মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো।
চৈতির মা বলল' তবে আমি হলে না 50000 টাকায় আমার মেয়ের মূল্য চুকিয়ে দিতাম না। আমি লড়তাম। 
রেখা বলল 'প্রতি ঘরে ঘরে কন্যা সন্তানের পিতা-মাতার এরকম মানসিকতা তৈরি করা উচিত।
ঠিক আছে দিদি অত ভেবো না পরে এসো একদিন বাড়িতে তা হবে।'
চৈতির মা ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালো।
রেখা বলল 'কবির ভাষাতেই বলতে ইচ্ছে করছে-
'বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।'
এটা সবাইকে মেনে চলতে হবে। নারী শুধু যে বিকিকিনি সহজ পণ্য নয় এটা সমাজের প্রতিটি স্তরের বুঝতে হবে।

রাবেয়া পারভীন /শেষ পর্ব





স্মৃতির জানালায়
(শেষ পর্ব)
রাবেয়া পারভীন

স্যারের শোবার  ঘরের দড়জার সামনে গিয়ে  দড়োজায়  টোকা দিল  মাহতাব। ভিতর থেকে স্যার আওয়াজ  দিলেন -
-  কে ?  ভিতরে  এসো !  
মাহতাব ভিতরে ঢুকল। খালাম্মা  খাটের  উপর  মশারী খাটাচ্ছিলেন । খাটের পাশে চেয়ারে  বসে  স্যার  পান  চিবুচ্ছিলেন। মাহতাবকে  দেখে খাট থেকে নেমে এলেন খালাম্মা । মাহতাবকে জিজ্ঞেস  করলেন
- কি বল্লো  শবনম ?
এই দুটি সরল পিতা মাতার  সাথে  না সূচক কথাটা বলতে  ইচ্ছা  করছিলো না তার । তারপরেও  ভয়ে ভয়ে বলল
- এই  বিয়েতে  শবনমের  মত নেই  খালাম্মা
স্যার  খুব অবাক হয়ে  বল্লেন  
- কেন  কি হয়েছে ?
মুখ ভার  করে খালাম্মা উত্তর  দিলেন
- কি  জানি কেন  শবনমের  খুব মন  খারাপ। ঠিক করে  ভাতও  খেল না তাই  মাহতাবকে  পাঠিয়েছিলাম  ওর মত জানতে। এখন  বলছে  বিয়েতে  ওর মত নেই।
স্যার  মাথা  নীচু করে  করে কি যেন  ভাবলেন  তারপর বললেন
- আচ্ছা  ঠিক আছে  এখন  ঘুমাতে যাও, কাল সকালে  দেখা যাবে কি ব্যাপার। যাও মাহতাব  গেস্ট রুমে বিছানা করা আছে , শুয়ে পড়োগে।
স্যারের ঘর থেকে বেরিয়ে  শবনমের ঘরের সামনে দিয়ে  যাবার সময়  দেখল  শবনম  আলো নিভিয়ে  ঘরের দরোজা  বন্ধ  করে   দিয়েছে।

সে সব অনেক পুরনো কথা তবু  কোন কথাই ভুলে যাননি তিনি। মনের আয়নায়   বন্দী হয়ে আছে সব।  শবনমকে  তিনি নিজোর করে পাননি কিন্তু তাঁর জীবনের  সফলতার  পিছনে  শবনমের  অবদান  অনেক।  সেই সেদিনের  সাধারণ  মাহতাবকে  আজকের  এই  অসাধারণ  মাহতাব সাহেবে পরিনত করেছে। শবনমকে  না পাওয়ার  তীব্র দহন  তাকে পথ চলার গতি দিয়েছে।
-স্যার  আসবো ?
মেনেজারের  ডাকে  চমক ভাংলো  মাহতাব সাহেবের। এতক্ষনে  তিনি টের পেলেন তাঁর দুই চোখ অশ্রুসজল  হয়ে  উঠেছে। মেনেজারের  দিকে তাকিয়ে লজ্জা  পেলেন  তিনি। পকেট থেকে রুমাল বের  করে  তারাতারি  চোখ মুছলেন। মাথা  নেড়ে  মেনেজারকে  ভিতরে আসতে  সম্মতি  জানালেন।  ভিতরে  এসে  বড় সাহেবের  সামনে  জরুরী কিছু ফাইল মেলে দিতে দিতে  আড়চোখে  সাহেবের দিকে  তাকালো মেনেজার। নরম গলায় প্রশ্ন করল
- স্যার। আপনার  কি শরীর খারাপ ?
ফাইল দেখতে দেখতে মেনেজারের প্রশ্নের  উত্তরে মাথা ঝাঁকালেন  তিনি।
- তাহলে  ফাইলগুলু  আজকে থাক  স্যার। কালকে  বরং দেখলেই চলবে।
- না না  আজকেই দেখব। আপনি বরং আমাকে একগ্লাস  পানি দিন।
পানি  খেয়ে,  ফাইলগুলি  দেখে  মেনেজারের হাতে ফিরিয়ে দিয়ে চোখ বুজলেন। মনে হলো ঘন্টা  দুয়েক ঘুৃমাতে পারলে ভালো  হতো।


চলবে...

শান্তা কামালী/৩৯ তম পর্ব 





বনফুল
৩৯ তম পর্ব 
শান্তা কামালী

পলাশ ফিরে এসে জুঁই য়ের পাশে চেয়ার টেনে বসলো। রুমাল বের করে ঘাম মুছে জুঁই কে বললো। অনেক গুলো জায়গা থেকে ই অফার পেলাম। আমার ভালো লেগেছে  মাল্টা ইউনিভার্সিটি অফ বিজনেস ম্যানেজমেন্ট মাস্টার্স ডিগ্রি কোর্সের অফার টা।কিন্তু.... প্রবলেম একটা আছে। 
কি প্রবলেম, বলো...।জুঁই জানতে চায়।
সেটা পরে বলছি,আগে তো তোমার ইচ্ছে টা জানতে হবে। 
আমার ইচ্ছে মানে? 
মানে বিদেশে পড়তে যেতে দেবে কি-না? তোমার মন খারাপ হবে কি-না? তারপর তো অন্য কথা। 
অফ কোর্স তুমি বিদেশে পড়তে যাবে,আমার আব্বু তাই চায়।তুমি তোমার ক্যারিয়ার তৈরী করে দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে, আমিও চাই।
আর তোমার মন খারাপ? 
সেটা তো হবেই,কি আর করা যাবে, নিয়ে তো যেতে পারবে না।আমাদের তো এখনো.... 
না থাক সেই সব চিন্তা। আমাকে দিনে ছ'বার করে ফোন দেবে,আর সেটা অবশ্যই ভিডিও কল।
পলাশ হা হা করে হেসে ওঠে। জুঁই বলে হাসছো,তুমি বুঝতে পারছো না, তুমি কতো দূরে থাকবে, আর আমার কি চিন্তা হবে না ? 
 হবে তো,কিন্তু তাহলে ক্লাস কখন করবো,আর স্টাডিজ টাইম কতটা পাবো,সেটা ভাবো।তারচেয়ে বরং সারারাত ভিডিও কলে গল্প করবো, আর.... 
হ্যাঁ, তারপর সারাদিন শরীর খারাপ নিয়ে বিছানায়, পড়াশোনা শিকেয় তুলে দেবে।আসল কথা বলো,প্রবলেম টা কি? আর মাল্টা দেশ টা কোথায় ?

সালমা খান





নিশুতি রাত 
 

নৈশ্য আগুনে বিপর্যস্ত নগরী বসে আছে ছায়া শরীরের খুঁটি ধরে অনন্ত কাল।
কুয়াশা মাখা শীতের রাতে আগুন তাপের মিঠে ছোঁয়ায়,
ফিনফিনে শীতল হাওয়ার শান্ত দোসর ধরে ধরে আমার শহরে শীত এলিয়ে পড়েছে বুকের ভিতর থরে থরে এখন  বৃদ্ধ ,
টুপটাপ ঝরে পড়ে শিশির ফোঁটা
কার হাতে নোয়ায় খসে পড়ে ধূমকেতুর লেজ।
 শব্দে গাঁথা হয় অপরুপ মোহনকথা,
আমার প্রেমিকার বুকে আমার হাতের ছাপ 
যন্ত্রনার শব্দ হয় না ,ইচ্ছে হলেই ছুঁতে পারি না কাঁশফুল, 
শুধু জানালায় তাকিয়ে আছি 
শুধু একটা অনুভব বয়ে চলা ব্যাগভর্তি মন কেমন ,
শীতের নিশুতি শহরটা এখন কেমন ?
হঠাৎ দমকা হাওয়ায় নিভল আগুন।
ঝড়ের সাথে অশনি সংকেত
অকম্মাৎ হেমন্তের টর্নেডোতে তছনছ
উড়ে গেছে হেম শিমুল তুলার মতো।
অপ্রস্তুত হলো গত বর্ষার ফসলি জমি বুক।
সবুজবর্ণের নৈসর্গিক শহর ঝিরিঝিরি , 
যন্ত্রনায় সবুজ পাতাদের করুন নৃত্য ,
টুপটাপ শিশির ভেজায় নরম ডালে হিমে কাতর।
শুকনো গাছের পাতাগুলো বেদনা নিয়ে এলোপাথারি উড়ে যাচ্ছে  ,
শুকনো রাস্তায় লাইটপোস্টে লুটিয়ে পড়েছে অদৃশ্যে। 
মিহি জোছনায় পরী কি সুন্দর করে  ডানা খুলে নাচতো।
বরফপাথর গলে জামা পড়া পরীরা  এখন শোভাবর্ধন করছে নীলিমায়,
ধুলোয় জড়ানো পাখির পালকে এখন  কয়েকটি মুক্ত দানা।
যুবুথবু হয়ে মুখ লুকিযে থাকা পাখিটি শিরিষ গাছের গর্তে থেকে বেরিয়ে এলো ,
যে কুয়াশাচাদর উষ্ণতা ছড়ায় 
তাতে,কেবল আগাছাগুলো নিঁড়ানি পড়ে।
সারল্য বসে থেকে প্রহর গুনে গুনে 
পায়ে পায়ে হাঁটে দিন কোন এক বরষার ভরসায়
নিয়তি আবার প্রতিশ্রুতিতে পরিনিত হবে উর্বর মৃত্তিকায়
বিপন্ন দিন মুখপাত্রে একাকার হবে রুপান্তরে।
জোয়ারে রৌদ্রের আভায় অজস্র কবিতা নব্যতা ছড়াবে হলদে রেশমে। তবুও ব্রহ্মচারী শিশির ফোঁটা নৈঃশব্দে ধোঁয়াসা আঁধারে জানালার কাঁচে লেগে থাকা, 
ধূসরিত ধুলোয় মুখচুম্বন করে সবার অলৈক্ষ্যে ।

শামীমা আহমেদ/পর্ব ৩০




শায়লা শিহাব কথন
অলিখিত শর্ত 
(পর্ব ৩০)
শামীমা আহমেদ 

চোখে মুখে একরাশ কষ্টবোধ আর থমথমে একটা ভাব নিয়ে শায়লা শিহাব দুজনে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে এলো। যেমন পাশাপাশি হেঁটে দুজনে ঢুকেছিল এখন ঠিক  সেভাবেই বেরিয়ে এলো। মাঝের সময়টাতে যেন দুজনার মনে বয়ে গেলো এক টর্নেডো ঝড়। সে ঝড়ে লন্ডভন্ড হয়ে গেলো শিহাবকে ভেবে শায়লার শত যত্নে গড়া স্বপ্নবাগান। শায়লার ভেতরে যেন এক বিশাল পাহাড় ধ্বস হয়ে গেছে। আর শিহাবও অনুচ্চারিত এক  বোবা পাহাড়। ভেতরে শত ব্যথা কষ্টের বোঝা নিয়েও অটল অজেয় পর্বত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে যেন। শায়লা দাঁড়ালো,  শিহাব পার্কিং থেকে হেলমেট পড়ে বাইক নিয়ে এগিয়ে এলো। শায়লা স্থির হয়ে এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইল। শায়লা এই ভেবে ভীষণ  অবাক হচ্ছে যে কত সহজ করেই শিহাব সবকিছুর ইতি টেনে দিলো। শায়লা তার  জীবনের জন্য এটা বুঝে নিলো যে, আমরা যেখানে স্বপ্নতোরণ সাজাই আসলে সেটা শুধুই একটা কল্পনার ভাবাবেগ।বাস্তবতার সাথে  তা  একেবারেই বৈশাদৃশ্য। শিহাব বাইক থেকে নেমে শায়লাকে এক ঝলক দৃষ্টি দিয়ে লুকিয়ে দেখে নিলো। পরক্ষনেই নিজেকে স্বাভাবিক করে বললো,, চলো তোমাকে নর্থ টাওয়ারে নামিয়ে দিচ্ছি।তোমারতো কেনাকাটা বাকী। কিন্তু শায়লার ভেতরে যেন কোন কথাই প্রবেশ করছে না। শিহাব এবার একটু জোর দিয়েই বললো, শায়লা চলো তোমাকে নামিয়ে দেই।
এবার শায়লার মুখ ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো, না, আমি আজ আর কেনাকাটায় যাবো না।আমার ভাল লাগছে না শিহাব।শিহাব বুঝতে পারলো তার কথাগুলো শায়লাকে বেশ আহত করেছে।তবে এভাবে না বললে সময় বয়ে যাচ্ছিল দুজনেই ভুল করবার পথে হাঁটছিলাম। শিহাব রিকশার জন্য এগিয়ে গেলো।শায়লা তার পিছু পিছু হেঁটে চললো। শায়লা জানেনা কেন শিহাব সামনে এলে সে নিজেকে এতটা গুটিয়ে নেয়! কেন সহজ সাবলীলতায় কথা বলতে পারে না। শায়লার ভেতরে ভেতরে শুধু জমানো কথার স্তুপ।এই রিকশাতো সে নিজেই করে নিতে পারতো  কিন্তু কেন শিহাবের উপর এত নির্ভরতা। শিহাবের ইঙ্গিতে শায়লা সেই  রিকশাতেই উঠে গেলো।
শায়লা মেইন রোডের বাঁক নিতেই এতক্ষণে শিহাবের বাইকের আওয়াজ পাওয়া গেলো।তবে কি শিহাব এতক্ষন দাঁড়িয়ে ছিল,দাঁড়িয়ে শায়লার রিকশাটা যতদূর দেখ যায় তা দেখছিল।
শিহাব বাইকে স্টার্ট  দিল। মনটাকে বদলে নিয়ে একটা কাজের উদ্দেশ্যে  গুলশানের দিকে এগিয়ে চললো।পুরুষদের বোধহয় এমনি হতে হয়।লৌহ কঠিন মন।যেখানে  মৃতের বাড়ি থেকে ফিরেও আবার কথার বরখেলাপ না করে কোন উৎসব আনন্দেও যোগ দিতে হয়।তাইতো যেখানে ভালবাসা অংকুরিত হয়েছিল নিমিষেই তা ধুম্রকাঠির মত পিষে ফেলে সব নিশানা মুছে ফেলতে পারলো শিহাব।
শায়লার  রিকশা এগিয়ে চললো।শায়লার অনুভুতিতে নিজেকে নিঃসাড় ভাবছে।সে কোথায়?  বা সে কোথায় যাচ্ছে কিছুই খেয়ালে নেই। হঠাৎ ভাঙা রাস্তায় রিকশার এক ঝাঁকুনিতে শায়লা  নিজের মাঝে ফিরে এলো। রিকশাকে নির্দেশনা দিয়ে এগিয়ে নিলো।বাড়ির দরজায় ভাড়া মিটিয়ে দোতলায় উঠে এলো।
শায়লা কেনাকাটা থেকে এত দ্রুত ফিরে আসাতে মা বেশ অবাক হলো।সাধারণত এ ক'দিন  সন্ধ্যা ছুঁইছুঁই করে শায়লা বাসায় ফিরেছে। শায়লা কোন কথা না বলে মায়ের ঘরে শপিংগুলো রেখে নিজের রুমে চলে এলো। দরজা লক করে বিছানায় বসলো।শায়লার কাছে পৃথিবীটা আজ মিথ্যা লাগছে।মনে মনে  এই পৃথিবীকে সে তিরস্কার করছে।
সে যেন শায়লার সুখ সহ্য করতে পারছে না তাইতো একঝাঁপি দুঃখ আজ তার উপর ঢেলে দিয়েছে। শায়লা ব্যাগ থেকে মোবাইলটা বের করে নিলো। শিহাবের প্রোফাইলে গিয়ে ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল। নানান কথা স্মৃতি বিস্মৃতি হয়ে আসতে লাগলো। এতটা কাছে এসেও হঠাৎ  অচেনা হয়ে যেন পাড় ভাঙনে শায়লার সব কিছু তলিয়ে গেলো। বানভাসি মানুষের মত স্রোতের তোরে ভেসে গেলো যত চাওয়াপাওয়া ইচ্ছার অনুভুতিগুলি। শায়লার চোখ থেকে অবিরল ধারায় জল পড়তে লাগল। শায়লার একে একে মনে পড়তে লাগলো শিহাবের সাথে পরিচয়ের সেই প্রথম দিনের কথা। কিভাবে এত দ্রুত সময়ে দুজনের মনের এতটা মিলে এতটা কাছাকাছি হওয়া! 

শিহাব গুলশানে গিয়ে একজন অপেক্ষমান ব্যক্তির সাথে একটা রেস্টুরেন্টে বসে ব্যবসায়িক কথাগুলো সেরে নিলো।খুব একটা বেশি সময় সেখানে বসা গেলো না। শিহাব দ্রুতই কথা শেষ করলো। লোকটি বুঝতে পারছে না যেখানে শিহাবের ব্যবসায়িক স্বার্থের জন্য এই দেখা হওয়া সেখানে তার যেন কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। শিহাব সেখানে বেশীক্ষন থাকতে অস্বস্তিবোধ করছিল।
শিহাবের পাশের টেবিলে বুঝাই যাচ্ছিল গুলশান এলাকার ধনীর ঘরের কন্যা 
ভীষণ স্মার্ট গেট আপে মোবাইল স্ক্রল করছে কফিতে চুমুক দিচ্ছে আর শিহাবের দিকে তাকিয়ে আছে।শিহাবকে আজ সেইরকম 
সুন্দর লাগছিল ।  মেয়েটির তাকিয়ে থাকায় দোষ ধরা যাবে না।শিহাব তার সানগ্লাস চোখে মেয়েটির গতিবিধি সব খেয়াল করছিল। শিহাব লোকটির সাথে কথা শেষ করে হ্যান্ড শেক করে বেরিয়ে এলো। হেলমেট পরে নিয়ে বাইকে স্টার্ট দিল। শিহাবের মনের ভেতর ভিন্ন এক অনুভুতির মিশ্রন । বাইক গুলশান দুই নম্বর  গোলচক্কর ক্রস করে বনানীর দিকে এগিয়ে উত্তরার পথে এগুচ্ছে । শিহাবের অনুভুতিতে মনে হচ্ছে শায়লা তার পেছনে বসা। শিহাব সামনের লুকিং মিররে তাকাতেই শায়লার হাসিমাখা মুখটা দেখে চমকে উঠল!



চলবে...

রুকসানা রহমান





আমাকে  সাথে নাও


অরুমিতা,
আমি এসেছি,সবকিছু ছেড়ে তোমার কাছে ফিরে
কেমন সারপ্রাইজ দিলাম বলোতো ?
নয়টি মাসের অপেক্ষা পিছিয়ে যাবে,রুকু থেকে সেজদায়।
তোমার অবিশ্রান্ত ভেঁজা চোখ বন্ধ কেন লাজে ?

এই ওঠোনা চোখতো খোলো,ও অনেক অভিমান ?
জানি তোমার নিঃসঙ্গ জীবনে ভালোবাসার স্বপ্নে
বিভোর রেখেছি, স্বপ্ন আমিও দেখেছি কেবল
সময় দিতে দেখা করতে ও পারিনি,কেবল দুজনায়
ছিলাম একই আমি-তুমি, বিধাতার উপহার ।
দেশকে বাচাঁবো বলে যুদ্ধ  করতে যেয়ে দুরত্ব বেড়েছিলো, তুমিই ছিলে আমার অনুপ্রেরনা
মনের আড়াল তো হয়নি কখনো।
ভেবেছিলে নয়টিমাস পর যখন পাক শয়তানদের
থেকে কেড়ে নিয়ে বিজয়ের 
উঠবেনা,বেশ এবার বুকে তুলে নিয়ে ঘুম ভাঙাবো
একি !
তোমার,দেহটা এতো শীতল কেন?এভাবে কেন ঘুমাচ্ছো,জাগো,তাকাও দেখো আমি এসেছি। 
অরুমিতা
কথা বলো,আমি সত্যি ভাবিনি,বুঝিনি কাজের ব্যস্তটায়,সময় দিতে না পারার জন্য,এতোকষ্ট নিয়ে
দগ্ধশীতল শান্তচূড়ায় বসে অপেক্ষার প্রহর কেবলই
গুনেছো।
তবে কি,আমি ভালোবাসার ব্যর্থতার অভিশাপ বহনকারী, আর তুমি সব সার্থকতা নিয়ে গভীর
মৌনতায় ডুবে থাকবে।

আমরা দুজনায় একই সত্তার ছিলাম প্রণয়ের সৌরভে,হয়তো সময়ের আবরণে গর্বিতমন তুমি আছো, থাকেবে ভেবে কাজকে প্রাধান্য দিতে যেয়ে
অবহেলা করেছি ভেবেছো ?

দেখো অরু,দেখোনা তোমায় বুকে জড়িয়ে চক্ষের জলে তরজমা করছি নতুন জীবনের আয়াত।
তুমিহীন শূণ্যতা,বেঁচে থেকেও মৃত্যুসম আমি...

আমি,যে তোমার ভালোবাসার আর্কষণে বন্দি,
সব স্বপ্ন তোমার চন্ঝলতার আঁচলের ছায়াথেকে
ডুবে যাবে সমস্ত পৃথিবী।

অরুমিতা,
দেখো,দেখোনা অরু,
তোমার পছন্দের রয়েল,ব্লু শাড়ির আঁচল জুড়ে কবিতা
লিখেছি নিজ হাতে,খোঁপায় পড়াবো বেলি,ফুলের মালা,কন্ঠে ফুলের হার,কানে ঝুমকো,ঐ-চরণ যুগল
 রাঙাবো আলতায়।
 ওঠোনা,প্লিজ ওঠো !

এখন আমার হাতে,হাত রেখে যাবে তোমার,সেই
প্রিয় নদীটির  কাছে,আমার কাঁধে মাথা রেখে দেখবে
সূর্য ডোবার পালা।

এখনো যায়নি ফুরিয়ে,স্মৃতিময় সময়গুলো,স্বপ্নের
বাসনার ভিতর প্রকৃতির ললাটে হয়নি লেখা,
প্রেমের গল্পকথা।

তুমিতো আমার তৃষ্ণাতুর প্রেয়সী, যার,সুরভিত দেহের
ভাঁজে, ভাঁজে বুনেছিলাম কত যে কাব্যের ঝংকার।
কেন, কেন তুমি আজ গভীর ঘুমে,অচেতন ?
আমার,জীবন থমকে দিয়ে দুরে সরে,গেলে
ভুলের আগুনের দীর্ঘ লেলিহান স্রোতে ভাসিয়ে ?

 সত্যিই তুমি আর কোনদিন জাগবেনা অরু
এ তুমি কেমন তুমি বলোতো...?
বেশ আমিও এভাবে তোমাকে বুকে জড়িয়ে বসে,থাকবো,কারসাধ্য আছে কেড়ে নেবে
যতক্ষন আমার দেহে প্রাণ আছে।
প্লিজ অরু
আমাকে সাথে নাও, তোমার সাজানে প্রণয়ের নান্দনিক সেই অনন্তের ঘরে...
সাথে নাও প্রিয়তমা,আমাকে সাথে নাও...

১২ ডিসেম্বর ২০২১

সানি সরকার 







শিকড়ে জলের শব্দ 



প্রেমের মানুষটির জন্যে এই বুকে পুঁতেছি
চন্দন গাছ 

মাটির গন্ধ পাখির কুজন 
প্রতিনিয়ত নড়াচ্ছে পাতাগুলি ডালগুলি 

প্রেমের মানুষটির জন্যে একটি মন্দির 
বানিয়েছি এই বুকের মধ্যিখানে 
সেখানে সে থাকেন 
আমাদের ঈশ্বর থাকেন 

আমাদের ঈশ্বর, প্রেমের মানুষটি, আমাদের ইরা ও আমি 
শীতের চাদর খুলে ফেলে দেখছি 
কতগুলি অগোছালো মানুষের অট্টহাসি ও মিছরির ছুরি 

এইসব ছোঁয় না ইদানীং 
শোনো সোনা, যাঁরা মাটির ওপর পা রেখে 
এই ব্রহ্মাণ্ডের গতিবিধি দেখেন 
তাঁদের মুখ বাঁধা থাকবে শক্ত রুমালে 
তাঁদের চোখ খোলা থাকবে, হাসবে, কিন্তু 
চোখ দু'টি হাসতে হাসতে সূর্যের মতো জ্বলবে 

আর 
আমার প্রেমের মানুষটি কান পেতে শিখে নেবে 
শিকড়ে জলের শব্দ শোনার সহজ সুত্র 

সোমা বিশ্বাস





ভালোবাসা থেকে যায়...
(কথোপকথন, মুঠোফোনেএকটি ছেলে ও মেয়ে)

হ্যালো... কেমন আছো?
তুমি!? হঠাৎ?
না, আজ খুব ইচ্ছে হচ্ছিল কথা বলতে..
তাই-অনেকদিন পর মনে পড়লো!
না ,তা ঠিক নয়-
তবে?
আসলে ক'দিন ধরে খুব মন কেমন করছে..
সেজন্য ছ' বছর দীর্ঘ বিরতি?
তুমি তো ভুল বুঝেছিলে সেদিন...
আমি! এখনোও আমি?
না মানে আমার রাগও আছে ভুলে থাকার কারণ!
তা হঠাৎ ফোন করলে কেন?
তোমার কী কথা বলতে কোন অসুবিধা আছে?
আমার অসুবিধা, সুবিধায় তোমার কি কিছু এসে যায়?
আমি না হয় রাগী, তোমার অভিমান তো এখনও তীব্র!
আমার রাগও আমি, অভিমানীও আমি, তুমি কে?
আমি কেউ না?
হঠাৎ ফোনের কারণটা জানতে পারলে ভালো লাগতো...
না, মানে আমি ভালো নেই!
ও...
কিছু বলবে না?
যা করেছ সবই তো নিজের জেদ আর ইচ্ছায়..
আমার কিছু বলার নেই!
কিচ্ছু বলার নেই?
না...!
তুমি মন থেকে বলছো?
আমার মনের খোঁজ তুমি কি কখনো রেখেছো; যে আজ বলছো?
তুমিও তো আমার খোঁজ রাখোনি!
আমি ফোনটা রাখছি, কোন...
শোনো একটু কথা বলো, কথা শেষ হয়নি-
আমরা আগের মতো বন্ধু হতে পারি না?
না, আমার কোনো ইচ্ছে নেই, আর থাকলেও তোমার সঙ্গে না।
পারবে এতটা নিষ্ঠুর হতে?
আমিতো নিষ্ঠুর ই তুমি জানো না?
আমি... আমি তোমায় খুব...
আমি তোমায় মিস করি না, রাখছি-
শোনো ,তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে;
আমার করছে না ,তুমি ভালো থেকো।
এতটা এড়িয়ে যাচ্ছো লক্ষীটি দোহাই তোমার..
আমার সময় নষ্ট হচ্ছে ফোনটা রাখছি-
তুমি এখনো আমায় ভালোবাসো নিজে কষ্ট পাচ্ছ তাও..!
কষ্ট ?কিসের কষ্ট আমি দিব্যি আছি-
অনুভূতিহীন, ভালবাসাহীন যন্ত্রমানবের মত!
তোমার মন জুড়ে এখন ও তো আমি..
আমার মন জুড়ে..
থামো, সব মিথ্যা, তোমার মত সুবিধা ভোগী;
সুখ বিলাসীর এসব আজ মানায় না!
আমি.. আমি ভুল করেছি, একটা সুযোগ?
না..! আমি তোমাকে ছাড়া ভালোই আছি;
আমি, আমার ভালোবাসা সব আমার মত ...!

মমতা রায়চৌধুরী /৬৭






উপন্যাস

 টানাপোড়েন ৬৭
চিন্তার ভাঁজ 
মমতা রায়চৌধুরী



                    টানা বৃষ্টিতে প্রাণ হাঁপিয়ে উঠেছে, আজকের সোনা ঝরা রোদ বেরিয়েছে। রেখা সকালে উঠেই ঘরের জানলাটা খুলে দিয়েছে ,সেই সোনা ঝরা আলো জানলা দিয়ে এসে উঁকি মারছে। মনোজ দুচোখ ডলতে ডলতে হঠাৎই জানালা দিয়ে আসা আলোর দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে 'অ্যাই ,রেখা। আজ আকাশে নির্মল রোদ উঠেছে ।
মনোজ গান শুরু করল' ও আকাশ সোনা সোনা,  এ মাটি সবুজ ,সবুজ। নূতন রঙের ছোঁয়ায় হৃদয় রেঙেছে,আলোর জোয়ারে খুশির বাঁধ ভেঙেছে।'
রেখা গান শুনে ঘরে ঢুকতেই মনোজ রেখাকে জড়িয়ে ধরল।
 রেখা বললো 'কি হচ্ছে ?এগুলো কি হচ্ছে ?আমি বুঝতে পারছি না। '
মনোজ বলল 'প্লিজ, চুপ করো ।এই কদিনে হাঁপিয়ে উঠেছি ।একটু শরীর ঠিক হয়েছে ।কোথায় একটু ওয়েদার ভালো থাকবে ,সে নয়।'
 রেখা মজা করে বলল''তাতে কি হয়েছে ?মেঘলা ওয়েদারতে তো অনেক বেশি কাছাকাছি আসা যায় ।মনোজ রেখার চোখে তাকিয়ে মাথা নাড়ালো আর বলল 'হ্যাঁ ,তুমি ঠিকই বলেছ ।কিন্তু তা হলেও অসময়ে এটা একদমই ভালো লাগে না ।দেখো কালকে যখন আমার হৃদয় তোমাকে চাইছিল কাছে পেতে ।তুমি কালকে স্কুলে চলে গেলে ,তার মানেটা কি হলো? সেই তো আমাকে একাকী থাকতে হলো। তার থেকে যদি একটু ওয়েদারটা ভালো থাকতো ,তাহলে আমিও একটু বাড়ির বাইরে না ,এদিক ওদিক ঘুরাঘুরি করতে পারতাম বলো? আমরা তো পুরুষ মানুষ। আমরা এক জায়গায় বসে থাকতে পারি না। বন্ধু-বান্ধবও ছাড়া  ।'
রেখা বলল 'খুব বুঝলুম মহাশয় ।ঠিক আছে ।এবার ছাড়ো আমাকে ব্রেকফাস্ট বানাতে দাও ।'
তখনও রেখার হাতে আটা লেগে আছে।
রেখা চলে যাচ্ছে মনোজ তখন আবার ডাকে 'অ্যাই রেখা এই শোনো না।'
রেখা কৌতুহলী হয়ে বলল 'আবার কি হলো ?'
মনোজ আমতা আমতা করে বলল 'না ,বলছিলাম মানে সুমিতাকে কবে থেকে আসতে বলবে?'
রেখা বলল ' দাঁড়াও ।এই তো ভাবছি দুদিন পরে ফোন করবো?'
 তারপর রেখা রান্নাঘরের দিকে চলে   যেতে গিয়ে আবার একটু পেছন ফিরে বলল'পার্থর খবর কি বল তো ?'
মনোজ বলল 'কোন পার্থ ?'
রেখা বলে' এই মশকরা করো না তো ।আরে আমাদের প্রতিবেশী পার্থ ভাই? '
মনোজ বলল 'হ্যাঁ ,ঠিক বলেছ তো ।ওর তো খবর নেয়া হয় নি । দাঁড়াও আমি একটু ফোন করি ।'
রেখা বলল '  তুমি ফোন করো আমি বরং রান্নাঘরে কাজগুলো করি ।শুনতে পাচ্ছ না বাচ্চাগুলোর চিৎকার?'
মনোজ  বলল 'না, ওদের খেতে দেয়ার ব্যবস্থা করো।'
মনোজ ফোন করল পার্থকে। রিং হয়ে গেল ।আবার ফোন করল'ফোসকে গেলে এমন ছেলে আর পাবে না তাই তো বলি ও সুন্দরী আমায় ছেড়ে যেও না...।'
মনোজ রিং টোন শুনে  মাথা নাড়তে লাগল আর ভাবতে লাগলো 'বাবা পার্থ ,বেশ মজার রিং টোন লাগিয়েছে তো ।'
ফোন ধরলেন এক ভদ্রমহিলা'হ্যালো'।
মনোজ বলল 'কে মাসিমা বলছেন?'
সুনীতা দেবী বললেন'হ্যাঁ বলছি আপনি কি বলছেন?'
মনোজ বলল 'আমাকে চিনতে পারছেন না? আমি মনোজ বলছি পাশের বাড়ির।'
সুনীতা দেবী বলেন 'ও তুমি? কেমন আছো বাবা?'
মনোজ বলল' এখন আমি ভালো আছি ।আপনারা সবাই ভাল আছেন?'
সুনীতা দেবী বলেন' আমরা ঠিকই আছি কিন্তু পার্থর একটু শরীরটা খারাপ বাবা।'
মনোজ বলল 'কি হয়েছে পার্থর? ওই জন্য ভাবছি পার্থ ফোন করছে না কেন?'
সুনীতা দেবী বলেন' ওর জ্বর এসেছে বাবা। আজ তিন দিন হল?'
মনোজ কেমন একটু শিউরে উঠলো ।কি জানি বাবা মনোজের  সংস্পর্শে থাকা থেকে কি পার্থর জ্বরটা  এল?ভয়ে ভয়ে বলল' কিছু টেস্ট করিয়েছেন?'
সুনীতা দেবী বললেন 'না, বাবা ।ডাক্তার দেখানো হয়েছে।ডাক্তারবাবু বলেছেন' চারদিন পর যদি জ্বর না কমে তাহলে টেস্ট করাতে বলেছেন?'
মনোজ বলল 'পার্থকে কি একটু ফোনটা দেয়া যাবে মাসিমা?'
সুনীতা দেবী বলেন 'এভাবে  বলছো কেন?একটু ধর ওই ঘরে যাচ্ছি গিয়ে ফোনটা দিচ্ছি।'
সুনীতাদেবী ডাকছেন 'পার্থ, পার্থ , বাবা পার্থ ।'
পার্থ কম্বল সরিয়ে নিয়ে মুখ বের করে বলল' কী মা?'
সুনীতা দেবী বলেন 'মনোজ ফোন করেছে বাবা?'
পার্থ হাত বাড়িয়ে বলল' দাও ফোনটা।
সুনীতা দেবী ছেলের পাশে গিয়ে মাথায় হাত বোলাতে থাকেন, তারপর টেম্পারেচার দেখতে থাকেন।
পার্থ বলল 'হ্যালো ,মনোজ দা কেমন আছো?'
মনোজ বলল 'আমি তো ভালো আছি । কিন্তু পার্থর জ্বর।এখন টেনশন হচ্ছে , তুমি আমার সঙ্গে থাকার জন্য আবার কিছু না হয়ে যায়?'
পার্থ বলল 'দাদা, এসব কথা কেউ বলে নাকি? মানুষ হয়ে মানুষের পাশে থাকবো না ?বিপদের দিনে তাই কখোনো হয়?'
মনোজ বলল' সব ঠিক আছে। তবুও নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছে জানো তো?'
পার্থ বলল' দেখবেন ,আমার কিছুই হবে না ।আমার আজকের মধ্যে জ্বর কমে যাবে। '
মনোজ বলে 'তাই যেন হয় ভাই।'
পার্থ বলল'তাই হবে , তুমি অত টেনশন নিও  শরীরের দিকে নজর দাও।'
মনোজ বলল 'আমাকে নিয়ে ভাবিস না ভাই ।এবার নিজের শরীরের দিকে একটু নজর দে।আমি তোকে দেখতে যেতাম এই মুহূর্তে যাওয়াটা ঠিক হবে না।'
পার্থ বলল' না ,না দাদা। আপনি পুরোপুরি আগে সুস্থ হন।'
মনোজ বলল" আমি না গেলেও মাঝে মাঝে ফোন করে খবর নেব।'
পার্থ বলল 'ঠিক আছে ,তাই করবেন।'
 মনোজ বলল 'ঠাকুর করে তোর যেন আজকেই টেম্পারেচার নেমে যায় ।ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করব। নইলে যে নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না ভাই।'
পার্থ বলল' দাদা ,আপনি খামোখা নিজের প্রতি দোষারোপ করছেন ।'
এরইমধ্যে রেখা এসে কথাগুলো শুনতে থাকে তারপরে বলে 'কি হয়েছে পার্থর?'
মনোজ বলে 'পার্থর জ্বর হয়েছে?'
রেখা তড়িঘড়ি করে মনোজকে বলে 'ফোনটা আমাকে দাও তো?'
রেখা বলল' পার্থ ,পার্থ ভাই?'
পার্থ বলল' হ্যাঁ ,বৌদি বলুন?'
রেখা বলল 'তোমার জ্বর হয়েছে ,আজ কদিন হলো ?'
পার্থ বলল '৩দিন ।দাদার টেনশন শুরু হয়েছে ।আচ্ছা বলুন তো তার ওপর নিজের ওপর দোষারোপ করছেন?'
রেখা বলল 'হ্যাঁ, সেটা তো করারই কথা ভাই ।কদিন আগেই তোমার দাদা যে মহামারী রোগ থেকে রক্ষা পেলেন?'
পার্থ খুব হেসে বললো 'বৌদি দেখবেন আমার কিছু হয় নি ।আজকে ই আমার জ্বর কমে যাবে। দেখুন না ?ঈশ্বরে বিশ্বাস রাখুন।'
রেখা বলল 'সেটা তো একশো বার ভাই। আর ওটাই তো চাই।'
পার্থ বলল 'আচ্ছা, বৌদি বলুন তো ?আজকে যদি আমি বাড়ি না থাকতাম, আমার মায়ের যদি কিছু হতো ,কোনো অসুবিধা হতো ?আপনারা কি আমাদের পাশে থাকতেন না?'
রেখা বললো 'এটা আবার কি কথা বলছ ভাই ।আমরা পাশে থাকব না?'
পার্থ বলল 'তাহলে ভাবুন আজকে আমার জ্বর যদি না কমে , সেইজন্য দাদা নিজেকে ,নিজের প্রতি দোষারোপ করবে ?তাই কখনো হয়?'
রেখা বললো' হ্যাঁ। তোমার দাদা দেখো ,মনমরা হয়ে বসে আছে। আজকে একটু প্রাণ খুলে হেসে গান ধরেছিল জানো তো, ভাই?'
পার্থ বলল' দাদা যদি মনমরা হয়ে বসে থাকে তাহলে আমি কি শিখবো? তার থেকে দাদাকে গান গাইতে বলুন আমি একটু শুনি।'
সুনিতা দেবী বললেন 'কি হয়েছে রে বাবা পার্থ ?কে কথা বলছে বৌমা?'
সুনীতা মাসিমা সত্যিই অমায়িক ভদ্রমহিলা। সবসময় মা-বাবা করে কথা বলেন আর এত সুন্দর ব্যবহার ।নিজের শ্বশুরবাড়ির পরিবার থেকেও পায় নি।'
সুনিতা দেবী বললেন 'বাবা পার্থ ফোনটা আমার কাছে...।'
পার্থ বলল 'মা, একটু এদিকে এসো ।হাত বাড়াও।'
সুনিতা দেবী বলেন 'এই যাই বাবা ।দাও ফোনটা আমাকে ।আচ্ছা শোনো তোমার কিন্তু এরপরে খাবার টাইম আছে। বৌমার সঙ্গে একটু কথা বলে নিই। তারপর তোমার খাবার দেব ।লক্ষ্মী ছেলের মত খেয়ে নেবে কিন্তু।'
সুনিতা দেবী বললেন' বৌমা, কেমন আছো মা তোমরা?'
রেখা বলল 'আমরা তো ভালো আছি মাসিমা কিন্তু..?"
সুমিতা দেবী বলেন' ও সব নিয়ে একদম ভেবো না তো ।শরীর থাকলে শরীর খারাপ হবে ।তার জন্য ট্রিটমেন্টের ব্যবস্থা করতে হবে ,খাওয়া -দাওয়া ঠিকঠাক করতে হবে, যা যা ডাক্তার বলেন। সেগুলো মেনে চলতে হবে ।আমি কিন্তু ভয় পাচ্ছি না ।তোমরাই ভয় পাইয়ে দিচ্ছ আমাদেরকে।'
রেখা হেসে বলল 'হ্যাঁ ,মাসীমা ।আপনার মত মনের জোর সবার তো হয় না। তবে আপনার কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে।'
সুনিতা দেবী বললেন 'দেখি কালকে তো ডাক্তার ওকে টেস্ট করতে বলেছেন ।আশা রাখি  আজকেই জ্বর কমে যাবে। এরমধ্যেই সুনীতা দেবীকে কেউ যেন বলছেন 'ও কাকিমা ,ও কাকিমা...।'
সুমিতা দেবী রেখাকে বললেন 'বৌমা তুমি একটু ধর মা ।দেখি আমার ওই কাজের মেয়েটা কি বলতে চায়? গলাটা বাড়িয়ে-'কি বলছিস রে পেঁচি।'
পেঁচি বলল 'আমি কাল থেকে কাজে আসব না?'
সুনিতা দেবী বলেন 'কেন কাজে আসবি না কেন? তোর কি হয়েছে?'
কাজের মেয়েটি চুপ করে আছে। তারপর সুনীতা দেবী আবার বলেন কি হলো বলছিস না কাজে আসবি না কেন ?কোথাও যাবি?'
পেঁচি বললো 'না ,দাদার জ্বর এসেছে না । আমি কাজে আসব না।'
সুনিতা দেবী বলেন' দাদার জ্বর এসেছে তো তোর কি ?তোর তো আর জ্বর আসে নি ?'
পেঁচি বলল 'না ,না ,এখন করোনার সময়।'
সুনীতা দেবী বলেন'ওই জন্য কাজে আসবি না? তবে আসিস না ।তোমার বাড়িতে যদি তোমাদের কারোর জ্বর হয় ,তখন তুমি কি করবে?'
কাজের মেয়েটির চুপ করে আছে দেখে , সুনীতা দেবী বলেন 'ঠিক আছে মা ,তোমায় কাজে আসতে হবে না ।তোমার দাদার জ্বর সারুক। তারপর তুমি কাজে এসো ,কেমন?'
পেঁচি বলল'কাকিমা আমাকে ভুল বুঝলে হবে না ।আমি কিন্তু..?'
সুনীতা দেবী বলেন 'না মা, ভুল বুঝবো কেন ?সাবধানতা অবলম্বন। ভালো কথা।'
কাজের মেয়েটি চলে যাবার পর রেখাকে বললো কথা শুনলে বৌমা ?ওরা আমাদের থেকে কত সচেতন। বাহ এটা কিন্তু ভাল দিক কি বল?'
রেখা হাসতে হাসতে বলল' হ্যাঁ, কাকিমা। আমার যে কাজ করে সুমিতা ।ও তো এমনি কাজে কামাই ।তারপর ওর যখন এই করোনা পজিটিভ হল তারপর থেকে ওকে আমরা নিজের থেকেই ছুটি দিয়ে দিয়েছি ।আজ অব্দি এখনো ডাকি নি।'
সুনিতা দেবী বললেন 'তা বেশ করেছ। ভালো থেকো মা ।এসো তোমরা। বাবুর আবার খাবার টাইম হয়ে গেল তো ফোনটা এখন রাখি মা?'
রেখা বলল-হ্যাঁ ,মাসিমা রাখুন।'
রেখা মনোজের দিকে তাকিয়ে আছে তারপর বলল 'কি হল তোমার? তুমি এমন  হয়ে গেলে কেন ?এই সোনা ঝরা রোদে  গান গেয়ে উঠল' ও আকাশ সোনা সোনা ...।আজকে আমার সোনার মনে অন্ধকার কেন?'
মনোজ শূন্য দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলে 'কেন বুঝতে পারছ না ?ভীষণ ভয় লাগছে আমার ।আজ সোনা রোদও মনের অন্ধকার দূর করতে পারবে না।'
মনোজের এসব নেগেটিভ কথাবার্তা শুনে রেখার ও চিন্তার ভাঁজ পরল।

মোঃ হা‌বিবুর রহমান/৬ষ্ঠ পর্ব





ইউএন মিশ‌নে হাই‌তি‌তে গমন 
( ৬ষ্ঠ পর্ব ) 
মোঃ হা‌বিবুর রহমান

বিশ্রা‌মের জন্য য‌থেষ্ট প্রস্তু‌তি নি‌য়ে‌ছিলাম ঠিকই‌ কিন্তু চোখ যেন কাঠ হ‌'য়ে গি‌য়ে‌ছি‌লে‌া তাই শুধুমাত্র ‌চোখ বন্ধ ক‌'রে নি‌জের মন‌কে বুঝ দেওয়া আর‌কি! মানু‌ষের কোন কোন সময় এরকম সময় আ‌সে বিছানার কথা ম‌নে মনে চিন্তা ক'র‌লেই ব‌ু‌ঝি ঘুমা‌নোর আ‌গেই ঘুম এ‌সে যায় কিন্তু বিছানায় যে‌য়ে ঘুম‌তো আ‌সেই না এমন‌কি জ্ঞানীগুণী ব্য‌ক্তি‌দের পরামর্শ অনুসরণ ক‌রে ১০০ থে‌কে উ‌ল্টোগু‌ণে ০ (শুন্য) পর্যন্ত ম‌নে ম‌নে বার বার গুনতে-গুনতে মু‌খে ফেণা তোলার পরও কোনক্র‌মেই ঘ‌ুম আ‌সেনা; কো‌নো কে‌ানো সময় ঘুম যেন এ‌কেবা‌রে নির্বাস‌নে যায় কিংবা ছয় মা‌সের জন্য ব্যা‌ঙের মত একবা‌রে শীত‌নিদ্রায় চ‌'লে যায়। ঠিক যেন এমন‌টিই হ‌'য়ে‌ছি‌লো সে‌দিন আমার। 

এরই ম‌ধ্যে আবার বঙ্গ‌দে‌শে ক‌য়েকঘণ্টা আ‌গে ফে‌লে আসা অ‌তি আপনজন‌দের ম‌লিন অবয়বগু‌লো ম‌নের গভী‌রে বার বার ছায়াসদৃশ আ‌বির্ভূত হ‌'য়ে অস্পষ্ট ছ‌বির মত ম‌নের ম‌ণি‌কোঠায় এ‌সে ঘন ঘন কড়া নাড়‌ছি‌লো আর সা‌থে সা‌থে মনটা বিষা‌দে ভ‌'রে উঠ‌ছি‌লো। তখন সেই মুহূর্তে শুধু কেবলই ম‌নে হ‌'চ্ছিল আহা‌রে! টাকা-ক‌ড়ি তুই আমার কা‌ছে অতি তুচ্ছ আর অ‌তি নগণ্য!

বার বার কেবলই ম‌নে হ‌'চ্ছিল আহা! য‌দি আপনজন‌দের সা‌থে কথা ব‌'লে অন্ততঃ একবার হ্যা‌লো ব'ল‌তে পারতাম তাহ'লে কতই না ভা‌লো হ‌তো! কিন্তু সে স্বপ্ন তখন বাস্ত‌বে যে রুপ নে‌বে না তা জে‌নেও যেন শুধুমাত্র কল্পনার জগতটাই তখন উপ‌ভোগ করার নেশায় ধ‌'রে‌ছি‌লো। যোগা‌যো‌গের বিড়ম্বটা আমার প‌রের ধা‌পে ম‌া‌র্কিন নেভী প্র‌শিক্ষণ কেন্দ্র, ক্যাম্প সা‌ন্টিয়া‌গোর বাস্তবতায় চিত্রা‌য়িত করার সু‌যোগ পা‌বো, ইনশাল্লাহ। 

যাক, অ‌নেক দর্শন বিষয়ক কথাবার্তা হ‌লো কিন্তু এখনও তো আসল কথার একটা শব্দও শব্দ‌ায়িত হয়‌নি; এম‌নি‌তেই আজ আমার এক শ্র‌দ্ধেয়া ফেইস বুক বন্ধুর মন্ত‌ব্যে ক‌লিজাটা ঝাজরা ও ক্ষত-‌বিক্ষত হ‌'য়ে গে‌ছে, আ‌মি না‌কি বেশী কথা ব‌লি, তাই আর না বাবা, ন্যাড়া বেল তলায় একবারই যায় কিন্তু স্বভাব‌ কি অ‌তি সহ‌জে পাল্টায়?

‌এরই ম‌ধ্যে এরকম আ‌বোলতা‌বোল ভাব‌তে ভাব‌তে কখন‌ যে প্রায় তিন ঘণ্টা পার ক‌'রে ফে‌লেছি তা এ‌কেবা‌রেই টের পায়‌নি। আবার মা‌র্কিনী সা‌র্জেন্ট সা‌হেব এ‌সে বাংলা‌দে‌শের মি‌লিটারী সম্বন্ধে বা‌জে মন্তব্য ক'র‌বে ভে‌বে এ‌কেবা‌রে ত‌ড়িঘ‌ড়ি ক‌'রেই নি‌জে‌কে মি‌লিটারী সা‌জে সা‌জি‌য়ে নিলাম। 

হা, এই‌তো মা‌র্কিনী ওস্তাদ বু‌ঝি এ‌সে গে‌ছে, এখনই যেন তার সেই তিন-চার লাইন গদবাঁধা ইংরেজী শু‌নি‌য়ে দি‌য়ে আমা‌দের‌কে ধন্য ক'র‌বে। হা, এইমাত্র ক‌লিং বেল বে‌জে উঠ‌লো, একই ভ‌ঙ্গিমায় বাপধনের মু‌খে তোতা পা‌খির বু‌লি উচ্চা‌রিত হ‌লো; 

"Sir, I think you have enjoyed your rest hour, I am sorry sir, this is the time you need to hurriedly go to Honolulu International Air Port. Sir, please get down to the ground floor, your bus is ready, board on to the bus and soon we will move to airport, kindly do hurry up as the time is very short".

একজন সা‌র্জেন্ট টোকাই ক'র‌বে বাংলা‌দেশী অ‌ফিসার‌দের? ম‌ান-সন্মান আর ইজ্জ্ব‌তের ভ‌য়ে তাই আমরা সব লে‌ভে‌লের অ‌ফিসাররাই খুবই সি‌রিয়াস, তার ‌সে সু‌যোগ পাওয়া থেকে তা‌কে বেশ ক‌য়েকবারই ই‌তিপূ‌র্বে ব‌ঞ্চিত ক‌'রেছি, এবারেও তা‌কে ব‌ুঝি‌য়ে দি‌য়ে‌ছি ‌যে, বঙ্গীয় ‌মি‌লিটারী অ‌ফিসাররা কত স‌চেতন আর দা‌য়িত্বশীল, আর এজন্যই বু‌ঝি সে‌দিন বাংলা‌দে‌শের নাম‌টি তারই মা‌ধ্যমে অন্যান্য মা‌র্কিনীদের‌কে একটা অত্যন্ত প‌রিষ্কার ধারণা দি‌তে পে‌রে‌ছিল যা হয়ত তারা তা‌দের জীবদ্দশায় আজীবন ধারণ ক'র‌বে। 

যা‌হোক, নিজ কামরা থে‌কে নে‌মে সবাই বা‌সে উঠা মাত্রই যেন চাল‌কের কেরাম‌তি‌তে একেবা‌রে ভোঁ-‌দৌঁড় ‌দি‌য়ে মুহূর্তের ম‌ধ্যেই বিমানবন্দ‌রে পৌ‌ঁছে গেলাম। অতঃপর সেই মা‌র্কিনী সি-৫, আকা‌শ প‌থের রাজা ই‌তোম‌ধ্যেই তার প্রাথ‌মিক ওয়ার্মাপ শেষ ক‌'রে শেষ দৌঁড় দেওয়ার অ‌পেক্ষায় শুধুমাত্র নিয়ন্ত্রণ ক‌ক্ষের আ‌দে‌শের অ‌পেক্ষায় যেন প্রহর গুণছে। 

দা‌য়িত্বপ্রাপ্ত পূ‌র্বের সেই বাংলাদেশী সা‌র্জেন্ট ই‌তোম‌ধ্যে আমা‌দের সবুজ রং‌য়ের পাস‌পোর্টগুলো এক এক ক‌'রে হা‌তের ভিতর আবার গু‌জে দিয়ে বললো, "স্যার, এখন থে‌কে ঠিক আনুমা‌নিক এগার ঘন্টা পর পোর্টোরি‌কো আন্তর্জাতিক এয়ার পো‌র্টে ল্যান্ড করার ‌ঠিক পূর্বমূহু‌র্তে আ‌মি আপনা‌দের কাছ থেকে একইভা‌বে এটা সংগ্রহ ক'রে নেবো। ই‌মি‌গ্রেশ‌নের জন্য এটার প্র‌য়োজন হ‌বে, ততক্ষণ এটা আপনা‌দের কা‌ছেই সয‌ত্নে নিজ হেফাজ‌তে রাখুন"। 

এরই ম‌ধ্যে পাইলট অ‌তি সু‌কৌশ‌লে জায়ান্ট আকাশযানটি কোনরকম ঝুটঝা‌মেল‌া ব্যতীতই রানওয়ের মাঝামা‌ঝি মাঝারী গ‌তি‌তে নি‌য়ে আস‌তে সমর্থ হ‌'য়ে‌ছেন। আ‌স্তে আ‌স্তে যে গ‌তি বাড়‌ছে তা প্লেন‌টির দৌড়ের ব্যস্ততা দে‌খেই অনুমান ক'র‌তে পার‌ছিলাম। 

হা, আকা‌শে উ‌ঠে গে‌ছি, এ‌কেবা‌রে হনুলুলুর ঠিক মাথার উপর দি‌য়ে উড়াল দি‌য়ে‌ছি। দোওয়া-দরূদ প‌ড়ে আল্লাহপা‌কের না‌মে আকাশপ‌থে পথ চলা শুরু হ‌লো অজানা-অ‌চেনা পোর্টোরি‌কো মা‌র্কিনী অঙ্গরাজ্যের অ‌ভিমু‌খে। রেস্ট-‌রি‌ফিট পূর্ণমাত্রায় হওয়ায় আমা‌দের মনটাতে বেশ ফুরফু‌রে ভাব বজায় থাকায় তখন পর্যন্ত আকাশ ভ্রমণটা বেশ মজাই লাগ‌ছি‌লো।

এরই ম‌ধ্যে অ‌নেকটা হঠাৎ ক'রেই বু‌ঝি সূ‌র্যি মামা অত্যন্ত রহস্যজনকভা‌বে সবাই‌কে একরকম ফা‌ঁকি দি‌য়ে লোকচক্ষ‌ুর অন্তরা‌লে নিরু‌দ্দেশ হ‌'য়ে গে‌লো। তাই সূ‌র্যি মামার এরূপ নিঃশব্দ প্রস্হা‌নে আমরা সবাই এ মুহূর্তে যেন চরমভা‌বে ব্য‌থিত, বিমর্ষ ও হতবম্ভ হ‌য়ে গেলাম। 

চল‌বে............

শামীমা আহমেদ/পর্ব ২৯





শায়লা শিহাব কথন
অলিখিত শর্ত (পর্ব ২৯)
শামীমা আহমেদ 

উল্কা গতিতে,প্রায় এক নিমেষেই  রেস্টুরেন্ট "থাই এমারেল্ড" এর সামনে এসে শিহাব বাইক থামালো।আর বাইক থামতেই শায়লা ব্যাকসিট থেকে নেমে  হাতের শপিং ব্যাগগুলো আর শাড়ি ঠিক করে নিলো। শায়লা তার হ্যান্ডব্যাগ ও শাড়ির কুচিগুলো ঠিকঠাক করে নিচ্ছিল। শায়লা  বুঝতে পারছে না কেন এভাবে সব কিছু হচ্ছে।
তবে সব ভাবনা সে শিহাবের উপর ছেড়ে দিলো।জীবনের কোন একটা সময়ে সাহসী হয়ে উঠতে হয় আর সেটাই থাকে জীবনের  টার্নিং পয়েন্ট। শিহাব বাইকটি পার্ক করে শায়লার দিকে তাকালো। শিহাব একমনে তাকিয়ে রইল।  শায়লাকে আজ অন্যরকম সুন্দর লাগছে।
যদিও এভাবে দৃষ্টি  দিয়ে সে কোনদিনই দেখেনি।
বরাবরই একজন ভদ্র মহিলাকে  যেভাবে সম্মান জানাতে হয় সেটাই করেছে শিহাব। তবে আজ শাড়িটির রঙটায় শায়লাকে খুব মানিয়েছে।লিপস্টিকও বেশ মিলিয়ে দেয়া।  সাইড ব্যাগটি গোল্ডেন রঙের রোদের আলোয় চকচক করছে।বাহাতে কালো বেল্টের ঘড়িটাই যেন হাতের অলংকার হয়ে আছে।শিহাব এগিয়ে এলো। শায়লা পরবর্তী নির্দেশনার অপেক্ষায়। শিহাব রেস্টুরেন্টে ঢুকলো। শায়লা আজ শিহাবের পাশাপাশি হেঁটেই এগিয়ে গেলো। একটা অধিকার জন্মালেই কেবল পাশাপাশি হাঁটা যায়।

ঢোকার দরজায় অভ্যর্থনায় স্বাগতম জানানো হলো। ভেতরের স্পট লাইটগুলোতে একটা মায়াবী পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। শিহাব শায়লা রেস্টুরেন্টের মাঝামাঝি একটি টেবিল ফাঁকা পেয়ে এগিয়ে গেলো। মৃদু আলো আঁধারিতে সবার চাপা স্বরে কথা বলা আর ওয়েটারদের ব্যস্ততায় চলাচল। একেবারে লাঞ্চের পিক টাইম চলছে।শিহাব শায়লাকে বসতে অনুরোধ জানালো। যেহেতু শিহাব আজ হোস্ট তাই তাকেই কাজটি করতে হবে। আচার ব্যবহারে শিহাব বেশ মার্জিত। শায়লা এ ক'দিনের পরিচয়ে সেটা বেশ বুঝেছে। অভিনয় দু'একদিন করা যায়।কিন্তু যেটা যার মজ্জাগত সেটা আপনিতেই বেরিয়ে আসে। শায়লা শিহাব মুখোমুখি বসলো।শায়লার  ভেতরে একটু  ইতস্তত  ভাব এলেও পরক্ষণেই পরিবেশের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিলো। তার প্রতি শিহাবের
যতখানি আস্থায় আজ তারা এখানে  এসেছে তার প্রতিদানে শিহাবের সম্মান রক্ষা করাও তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
ওয়েটার এগিয়ে এলো। শিহাব মেনু চার্ট দেখে নিজের জন্য একটা থাই স্যুপ আর কোক অর্ডার করলো আর শায়লা কিছু বলার আগেই শিহাব শায়লার জন্য একটা ফুল কোর্স লাঞ্চ অর্ডার দিলো।শায়লা চোখের ভাষায় বাধা দিতে চাইলেও শিহাবের দৃঢ়তার কাছে নীরব রইল।
শিহাব শায়লাকে জানালো আজ সকালে বেশ নাস্তা করা হয়েছে।ইন ফ্যাক্ট একেবারেই ক্ষুধা নেই।তবুও লাঞ্চ টাইম  কিছু খাচ্ছি।তবে তুমিতো শপিং করে ক্লান্ত আরো সময় হয়তো বাইরে থাকবে।একটু ভরপেট কিছু খেয়ে নাও। আর তাছাড়া,বলেই শিহাব একটু থামল।শায়লা শোনার জন্য আগ্রহী হয়ে উঠলো।শিহাব বুঝতে পেরে কথা এগিয়ে নিলো। তাছাড়া আজ আমরা বেশ কিছুক্ষণ সময় এখানে বসবো। তোমাকে  আমার কিছু কথা বলার আছে শায়লা।তোমার খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে আমরা কথা বলবো। শায়লা ভেতরে শংকিত হয়ে উঠলো! কি বলতে চাইছে শিহাব? সে কি কোন সিদ্ধান্তে আসতে চাইছে, সেকি তবে রিশতিনার শূন্যতাটিতে আমাকে ভাবছে। শায়লার ভেতরে অস্থিরতা উঁকি দিচ্ছে।
শিহাব তাকে আশ্বস্ত করলো,না,না, তেমন ভয়ের কিছু নয়। তোমার আমার এই চলমান সম্পর্কটা ভালভাবে বুঝে নিতে।
শায়লা এবার কথা বলে উঠলো! কি রকম?
দেখো শায়লা, বর্তমান যুগে মোবাইলের কারণেই তোমার আমার পরিচয়।আর সময়ের সাথে আমরা একসাথে চলছি দেখা হচ্ছে কথা বলছি।কথায় কথায়া আমরা আমাদের নিজেদের জানিয়েছি, পরিবারকে চিনিয়েছি, সময়ে ব্যক্তিগত বিষয়গুলোও কেউই লুকাইনি। তবে,তুমি আমি কেউই অনুভুতিহীন নই। দুজনার মনের ভেতর নানান ভাবনার উঁকি দিতেই পারে। আমি তা অস্বীকার করিনা।কেননা যার যেখানে শূন্যতা সে সেটা সবসময়ই চাইবে পূর্ণ  করতে।আমরা সবাই ভালোবাসার কাঙাল।তোমার আমার অতীতে যা ঘটে গেছে তা আমাদের দুজনারই নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। কিন্তু সেটাকে অস্বীকারও করা যাবে না। তাছাড়া তুমিও একটা বন্ধনে আবদ্ধ।কানাডায় একজন তোমার অপেক্ষায়। পরিচয়ে শুরুতেই বলেছিলাম আমার প্রতি 
অন্য কিছু চাওয়া পাওয়ার আশা করা যাবে না। সম্পর্কটি বন্ধুত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। বিশ্বাস করবে কিনা জানিনা তুমি ছাড়া আর কোন মেয়ের সাথে আমি কথা বলি না।
শায়লা একমনে সব শুনে যাচ্ছিল।শিহাব কি বলতে চাইছে শায়লা বুঝলেও সে শেষটা শোনার অপেক্ষায়। 
শিহাব বলেই চলেছে, তবে তোমাকেও যে আমি কোন দূর্বল মূহুর্তে কাছে পেতে চাইনি মিথ্যে করে সেটা বলবো না। আর যখনই নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাচ্ছিল আমি খুব বুঝতে পারলাম তোমাকে আমি নিজের করে পেতে চাইছি। আর  ভেতরেও তাই নানান ইচ্ছারা ডালপালা মেলছে। একজন পুরুষ হয়ে এই একাকী জীবনে কাউকে পেতে চাওয়া   নিশ্চয়ই দোষের কিছু নয়।ঠিক তখনই আমি ভেবে নিলাম,নাহ, ভাবনাটা ঠিক হচ্ছে না। নিজেকে থামাতে হবে। তবে চলার শুরু হতে হয়তো সময় লাগে কিন্তু একবার তা চলতে শুরু করলে আটকানো কঠিন হয়ে পড়ে।

টেবিলে খাবার চলে এলো। শায়লার আর কিছুই ভালো লাগছে না। সে বেশ বুঝতে পারলো শিহাব কি বলতে চাচ্ছে।শিহাব বেশ গুছিয়েই সব বলেছে। ছেলেরাতো  কতভাবেই মেয়েদের সাথে মিথ্যে ভালবাসার অভিনয় করে আনন্দ ফুর্তিতে সময় কাটায়।তারপর আরেকজনকে পেলে তাকে ছেড়ে  যায়।কিন্তু শিহাব কখনোই তাকে সেভাবে,,, 
এই যে আজো এত সুন্দর করে, সুন্দর  একটা পরিবেশে এনে সব গুছিয়ে বলছে, শায়লা ভাবছে এ সম্মানটাইবা কয়জন দেখায়!  
তবে এই যে দুজনের আকুলতায় একই সময়ে একই অনুভব হওয়া সেখানেতো 
দুজন একই সাড়া পেয়েছি।কেন তবে সেটা হলো।কেন তবে শিহাবের যে রাতে প্রচন্ড  জ্বর এলো শায়লার তার কাছে ছুটে  যেতে ইচ্ছে হলো।কেন তবে একটা অজানা অচেনা মানুষ এত দ্রুত আপন হয়ে গেলো। কেন সে শিহ্যবের উপস্থিতি টের পায়,কেন দুজনের মান অভিমানে অভিযোগ করা,,
কথাগুলো শায়লার ভেতরে তোলপাড় করছে।
কিন্তু ওপ্রান্তে শিহাব যে থামছে না, সে বলেই চলেছে,,
শায়লা,আমাদের পথ ভিন্ন তবুও মনের যে আকুলতায় আমরা কাছে এসেছি সেটা মিথ্যে নয় আর কোনদিন তুমি বা আমি সেটা অস্বীকার করতে পারবো না।তবে সেটা এখানে এ পর্যন্তই থামাতে হবে শায়লা। আমরা শুধু খুব ভালো বন্ধু হয়েই থাকবো।
চাওয়া পাওয়ার ধাপ থেকে একটি ধাপ দূরে থাকবো। তবে পরিচয়টা থাকুক আজীবন। 
শায়লা গভীর ভাবনায় ডুবে আছে।
শায়লা তুমি কিছু খাচ্ছ না। সব ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। শায়লা খেয়াল করলো টেবিলে স্যুপ সার্ভ করা হয়েছে। শিহাব হাত আগাতেই শায়লা স্যুপের কমন বাটি থেকে শিহাবের বাটিতে ক' চামচ স্যুপ তুলে দিলো সাথে নিজের জন্যও নিলো।শিহাব এক দৃষ্টে শায়লার দিকে তাকিয়ে রইল। শায়লার চোখ জলে ভরা।  তবুও মুখে হাসি ধরে রাখার চেষ্টা।শিহাব বেশ বুঝতে পারছে শায়লার ভেতরে কি চলছে। শিহাব ভুলেই গেছে সে কোথায় বসে আছে।কল্পনায় সে শায়লাকে তার বাসার ডাইনিং এ ভাবছে।


চলবে....

শান্তা কামালী/৩৮ তম পর্ব 





বনফুল
( ৩৮ তম পর্ব ) 
শান্তা কামালী

ঠিক এভাবেই জুঁইয়ের ট্রিটমেন্ট চলছে.... কখনো সকালে কখনো বিকালে নিরবচ্ছিন্ন মমতা মাখানো পলাশের  হাতের ছোঁয়ায় রুগী দ্রুত আরোগ্যের পথে। 

এই আসা-যাওয়ায় জুঁই পলাশের সম্পর্ক আরো গভীরতায় পরিণত হয়েছে।
শুধু গভীরতা নয়,জুঁই য়ের মন যে চায় আরো নিবিড়তা;
পলাশ বলে, এখন নয়।তোলা থাক ওড়না ঢাকা রেশমি চুড়ির বাক্সে সেদিনের অপেক্ষায়। 
জুঁই য়ের ঠোঁট দুটো কাঁপে অভিমানে। পলাশ ওর হাতের আঙুলগুলো টেনে দেয়,কব্জিতে চুড়ি গুলো নাড়াচাড়া করে রিনঝিন শব্দ করে মন ভোলায়।
 এদিকে জুঁইয়ের বাবা-মা দুজনেই বুঝলেন এর চেয়ে ভালো ছেলে খুঁজে বের করা তাদের পক্ষে সম্ভব হতো না। 
মেয়ের পছন্দের উপর তাদের  নির্ভরতা  ক্রমশ বেড়ে গেলো।
 
প্রতিদিন সকালে এসে জুঁইয়ের নাস্তা,ঔষধ খাওয়ানো থেকে শুরু করে সবরকম দায়-দায়িত্ব পলাশই পালন করছে। 
একসপ্তাহ পরে একদিন সৈকতের ফোন। পলাশ ওকে সমস্ত ঘটনা জানায়।জুঁইয়ের অসুস্থতার খবর পায় অহনাও। কয়েক দিন পরে  অহনা পাগলের মতো ছুটে এলো,ঘড়িতে তখন এগারোটা 
বাজে।এসে নিচে ড্রয়িং রুমে আন্টি আঙ্কেলের সাথে দেখা, অহনা বললো জুঁইয়ে এই অবস্থা আমি আগে জানতে পারিনি। সৈকত আমাকে কয়েকদিন আগে জানাতেই মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেলো। মনোয়ারা বেগম বললেন, মা জুঁইয়ের এই অবস্থায় মাথায় আসেনি কাউকে খবর দেবার কথা।  আজ দশদিনের উপরে আমি রান্না ঘরে যাই না ময়না যা পারছে তাই রান্না করে টেবিলে দিচ্ছে....। 
পলাশ ছেলেটা এতো খাটাখাটুনি করছে ওর জন্য যে ভালো কিছু রান্না করে টেবিলে দেবো সেটা ও পারছি না। 
অহনা বললো স্যরি আন্টি, আঙ্কেল, আমি উপরে যাচ্ছি। জুঁই য়ের আব্বু বললেন, হুম যাও।
 দ্রুত উপরে উঠে এলো অহনা। জুঁই শুয়ে আছে, পলাশ চেয়ারে বসে আছে। অহনা জুঁইয়ের কাছে গিয়ে, জুঁইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো জুঁই তোর এই অবস্থা আমি একবার জানতেও পারিনি! তাও দুদিন আগে সৈকত ফোন করে বললো.... 
পলাশ অহনাকে দেখে বললো তুমি এসেছো ভাল হয়েছে, তুমি জুঁইয়ের কাছে থাকো। আমার কিছু কাজ আছে, ওগুলো সেরে বিকালে আসবো, তোমরা গল্প করো। আর দুপুরে খাওয়ার পরে ঔষধ আছে খাইয়ে দিও, এই বলে পলাশ বেড়িয়ে গেল।

 আরো দু'চারটে ভার্সিটিতে এ্যাপ্লাই করার বাকি ছিলো, আজ যখন অনেকটা সময় পেলাম কাজগুলো আজই করে নিই। 
পলাশের কাজ শেষ করে বাসায় ফিরতে চারটা বেজে গেল। দ্রুত শাওয়ার শেষ করে, তাড়াহুড়ো করে খেয়ে বেরোলো। 
দুই বান্ধবীর অনেক কথা জমা ছিলো একে অপরকে বলে হালকা হলো।
পলাশ পাঁচটায় জুঁইয়ের বাসায় পৌঁছোতেই অহনা নিজের বাড়ি চলে গেলো।

রাবেয়া পারভীন /১১তম পর্ব)





স্মৃতির জানালায় 
(১১তম পর্ব)
রাবেয়া পারভীন 



                              বুকের ভিতরটা দারুনভাবে তোলপাড় করে  উঠল মাহতাবের। দম বন্ধ হয়ে আসতে চাইছে।  দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে  ফেলল  সে।  মনে  হলো শবনমের  দৃষ্টি  থেকে নিজেকে  আড়াল করতে পারলেই যেন  বাঁচে। এবার  ঝাঁঝালো  কন্ঠে  শবনম  আবার বলল
- চুপ করে আছো কেন ?  জবাব দাও।
মাহতাবের  দুই  চোখ ভরে গেল  পানিতে। কি জবাব  দেবে  সে  শবনমের  প্রশ্নের। ওর  প্রশ্নের  উত্তর  দেবার মত কোন জবাব সে খুঁজে  পেলনা। হাত দিয়ে মুখ ঢাকা অবস্থায়  সে টের পেল  শবনম  তাঁর  খুব  কাছে  এসে দাঁড়িয়োছে। মাহতাবের  মাথায়  একটা  হাত  রাখল  সে। এই অল্প  একটু স্পর্শ , শবনমের  পদ্মকলির মত আংগুল  ছুঁয়ে আছে  মাহতাবের  চুল। ওর শারা শরীর  থর থর করে কেঁপে  উঠল। শরীরোর প্রতিটা লোম খাড়া হয়ে গেছে। মনে হচ্ছিলো সে  খাট থেকে নীচে পরে  যাচ্ছে । শুধুমাত্র। মাথায় হাত রেখেই  মাহতাবের  পুরো অবস্থাটা  টের  পেল  শবনম।  আস্তে আস্তে  বলল
- কেন এত ভীতু  তুমি ?  নিজের জিনিস সাহস করে চাইতে পারোনা ?
ফুপিয়ে কেঁদে উঠল  মাহতাব।  ডানে বায়ে মাথা দুলিয়ে বলল  
- না শবনম না, সে সাহস আমার নেই।
- কেন নেই ?  নিজের  জিনিস  অন্যে নিয়ে গেলেও নেই ?  
- না তোমাকে চাইবার যোগ্যতা  আমার নেই
- আমার দিকে তাকাও মাহতাব , তাকিয়ে বলো  আমাকে চাওনা ?
মুখ থেকে হাত সড়িয়ে করুন দৃস্টিতে  শবনমের দিকে তাকালো মাহতাব। শবনম তার ডান হাত প্রসারিত  করে দিল  মাহতাবের সামনে। বলল
- ওদের দেয়া এই আংটি  তুমি হাত থেকে  খুলে দাও,  তারপর আব্বার সামনে  গিয়ে বল, তুমি আমাকে চাও।
বিস্ময়ভরা চোখে শবনমের  মুখের দিকে তাকিয়ে রইল মাহতাব।  শবনমের  চোখে  কোন দ্বিধা নেই  কোন মলিনতা নেই।  তার সিদ্ধান্তে  সে একেবারে  অটুট।  কিন্তু  যে স্যারর তাকে  নিজের ছেলের মত ভালোবাসেন, তাকে বিশ্বাস  করে  নিজের  মেয়ের  সাথে  মিশতে  দিয়েছেন  সেই  দেবতুল্য  মানুষটির কাছে গিয়ে  সে  কি করে এই অন্যায়  আবদার  করবে ?  না না  এটা সে মরে গেলেও পারবেনা । সে অসহায়ের মত শবনমের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। আবার তাগিদ দিল শবনম।
- কৈ  খোলো  আংটি !  
- না শবনম  আমি এটা  পারবোনা।
- তুমি তো  আমাকে  ভালোবাস তাহলে কেন পারবেনা ? সত্যি  করে বলো  তুমি আমাকে ভালো বাসোনা ?
-অস্বীকার  করলে মিথ্যা বলা হবে
-তাহলে ?  
-তবুও। আমি পারবোনা।
- তবে  আমার এতদিনের  ভালোবাসা কি ভুল ?  আমি কি আমার প্রানের  অর্ঘ  ভুল মানুষকে  সমর্পণ  করেছি ?
- হয়তো ।
মাহতাবের  কথায় একটা  দীর্ঘশ্বাস  ছাড়ল শবনম  তারপর  নিজেই নিজের হাতের আংটি  খুলে ছুঁড়ে  দিল  টেবিলের  উপর। তারপর বল্ল
ঠিক আছে তোমাকে কিছু বলতে  হবেনা  আমিই আম্মাকে বলব  যা বলার ।
মাহতাব  বলল
- কিন্তু  খালাম্মা যে  আমাকে তোমার কাছে পাঠিয়েছিলেন  তোমার মতামত জানার  জন্য !  
- ওহ্ হো তাই নাকি  তাহলে যাও  গিয়ে বলো  এ বিয়েতে  আমার  মত নেই।
- এসব কি তুমি  ভেবে চিন্তে বলছো ?
- অনেক আগেই৷ ভেবেছি  আর ভাবতে পারবোনা।
দ্বীর্ঘশ্বাস ফেলে  শবনমের ঘর থেকে বেরিয়ে  খালাম্মার  ঘরের  দিকে গেল  মাহতাব। রাগে দুঃখে  ওর চলে যাওয়া  পথের দিকে  চেয়ে রইল শবনম।



 চলবে....