২৫ এপ্রিল ২০২২

মমতা রায়চৌধুরীর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৬২




উপন্যাস 


টানাপোড়েন  ১৬২

আবার ভ্যাকসিন

মমতা রায়চৌধুরী




"অ্যাই শুভ্রা'
বড়দিকে হঠাৎ  স্টাফ রুমে চলে 
এসেছেন ।অনেকে বলাবলি করছে ।
নীলা বললো
', বড়দি কিছু বলবেন?'
'রেখাকে খুঁজছিলাম ।রেখা কোথায় জানো?'
'রেখা তো ক্লাসে গেল?'
'ও আচ্ছা।'
বড়দি যেতে গিয়ে আবার ফিরে এসে বললেন 'ক্লাস থেকে আসলে আমার সঙ্গে দেখা করতে ব"ল তো?'
'ঠিক আছে বড়দি।'
এর মধ্যে নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগল বড়দি চলে যাওয়ার সঙ্গে 
সঙ্গে । শুরু হয়ে গেল পিএনপিসি।বাববা "রেখাকে যেন চোখে হারান বড়দি।"
কথা বলতে বলতেই রেখা ক্লাস করে  ঢুকল স্টাফরুমে। তারপর হ্যান্ড ওয়াশ দিয়ে হাত ধুয়ে নিজে টেবিলের কাছে এসে দাঁড়িয়ে বললো 'বাপরে কি গরম পড়েছে ।তার মধ্যে আজকে উপরের রুমে কোন ফ্যান ঘুরছে না ।মেয়েরা অস্থির হয়ে পড়ছে।'
এরমধ্যে নীলাদি বলল ', হ্যাঁ, একদম ঠিক বলেছ  আমার দিকটাও  বোধহয় গন্ডগোল হয়েছে। ফ্যান চলছিল না।'
এরমধ্যে শুভ্রা বললো 'রেখা তোমাকে বড়দি ডেকেছেন।'
"যাই একটু পরে  ।কেমন যেন অস্থির অস্থির লাগছে গরমে।'
রেখা নিজের চেয়ারটায় বসলো ,বোতল থেকে ঢকঢক করে জল খেলো।
এরমধ্যে পঞ্চমী দি  এসে খবর দিল'রেখা দি বড়দি আপনাকে ডেকেছেন।'
"হ্যাঁ তুমি বল ,যাচ্ছি একটু পরে।"
"আচ্ছা।"
প্রজেক্ট খাতাগুলো দেখতে হবে ।এডুকেশন এর প্রজেক্ট খাতা পড়ে রয়েছে।
এরমধ্যে সন্ধ্যা দি আবার আসলো 'রেখাদি বড়দি আপনাকে ডেকেছেন।'
"বাপরে বাপ ,বললাম একটু পরে যাচ্ছি। তো আর সহ্য হচ্ছে না ।ঠিক আছে , চলো ,যাচ্ছি।'
"আচ্ছা বলেই সন্ধ্যাদি চলে গেল ।সন্ধ্যাদি চলে যাওয়ার সময় বেশ লম্বা চুলের বেণী দুলিয়ে দুলকি চালে চলে গেল।
রেখা উঠে বড়দির ঘরের কাছে গেল।
তারপর বলল" আসবো বড়দি দিদি?"
"এই রেখা তোমাকে আমার খুব দরকার।"
রেখা একগাল হেসে বলল "আমাকে দরকার?"
বড়দি হেসে বললেন "তোমাকে কখন থেকে খুঁজছি জানো! তোমাকে ভীষণ দরকার।"
"হ্যাঁ বলুন।"
রেখাকে খুব করে অনুরোধ করলেন।
জানি তুমি পরপর ভ্যাকসিন এর কাজগুলো করেছো ,তবুও তোমাকেই বলছি অনিন্দিতার কাজটা একটু করে দেবে?'
রেখা বড়দি কিছু বললে , না করতে পারে না। তাই বলল কেউ যদি করার না থাকে তাহলে তো করতেই হবে।'
বড়দি একগাল হেসে বললেন' আমি জানি তুমি না করবে না  কিন্তু দেখো আমি এবার তোমাকে বলতাম ই  না ।উপায় নেই,  তাই বললাম।'
"ঠিক আছে ,বড়দি চিন্তা করবেন না।"
বড়দি হেসে আবার বললেন' না ,না ,তুমি যেখানে বলেছে চিন্তা করবেন না ,সেখানে আমার চিন্তা কেন থাকবে ?আমি তো তোমার উপর অনেক ভরসা করি।"
'আপনি ভরসা করেন , বিশ্বাস করেন আমি যেন সেই ভরসার মর্যাদা রাখতে পারি দিদি।'
"তুমি এভাবে কথা ব'লো না ,তুমি নিশ্চয়ই পারবে।'
রেখা  বললো '' ঠিক আছে দিদি ,করে দেবো।'
'আচ্ছা রেখা তোমাকে একটা কথা বলি, তোমাকে সব কাজ করতে হবে না  যা কুপন রেডি করা ,নাম রেজিস্টার করা আজকেই শুভ্রা আর নীলা করে রাখবে ।কালকে শুধু তুমি এসে মেয়েদের নাম গুলো এন্ট্রি করে নেবে কোন মেয়েরা ভ্যাকসিন নিলোনা সেইগুলোকে নোট করবে, আর তাদের কে ফোন করে জানবে কেমন?'
'Ok দিদি। কিন্তু…?'
'আবার কিন্তু কেন রেখা, কিছু বলবে?'
বড়দি উৎসুকভরে  তাকিয়ে রইলেন রেখার দিকে' কিছু শুনবেন বলে। 
'মানে নীলাদি আর শুভ্রাকে এ কথাটা কে বলবে?'
', না, না তোমাকে কিছু বলতে হবে না ।আমি এক্ষুনি ডেকে বলে দিচ্ছি।'
বড়দি সঙ্গে সঙ্গে কলিং বেল বাজিয়ে সন্ধ্যাদিকে ডাকলেন।
সন্ধ্যাদি তার সেই দুলকি চালে বেণী দুলিয়ে এসে হাজির বড়দির কাছে।
'শোনো সন্ধ্যা, তুমি এক্ষুনি নীলা আর শুভ্রা কে ডেকে দাও।'
'আচ্ছা দিদি।'
'রেখা যাও তুমি গিয়ে বস স্টাফ রুমে।'
সন্ধ্যা দি স্টাফ রুমে এসে নীলাকে বলল 'দিদি আপনাদের দুজনকে বড়দি ডাকছেন। এক্ষুনি আসবেন।'
নীলা, শুভ্রা দুজনে একসঙ্গে বলল 'ঠিক আছে যাচ্ছি, তুমি যাও।'
নীলা ,শুভ্রা দুজনের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল ।এর মধ্যে রেখা এসে নিজের জায়গায় বসল।
যারা সমস্ত কিছুর জন্য দায়ী রেখা তাই
 যাবার সময় রেখাকে টিপ্পনীকেটে দিয়ে বেরিয়ে গেল।' চল যাই, আবার আমাদের কি জন্য ডেকে পাঠিয়েছেন দেখি। সবার তো রাজ ভাগ্য হয় না।'
কথাগুলো ব্যঙ্গ করে বলে দিয়ে দুজনে হাত ধরাধরি করে বড়দির ঘরের দিকে এগুলো।
'আসবো দিদি?'
বড়দি শুভ্রা ,নীলার দিকে তাকিয়ে বললেন' 'এসো।'
"আমাদেরকে ডেকেছেন?"
বড়দি ফাইলে মুখ গুঁজে রেখে বললেন' হ্যাঁ ডেকেছি। আগামীকাল ভ্যাকসিন আছে, তোমরা জানো। আর অনিন্দিতা এবসেন্ট থাকবে তাই অনিন্দিতার কাজগুলো তোমাদের দুজনকে করে দিতে হবে ।আজকের মধ্যেই কমপ্লিট করতে হবে।'
শুভ্রা আর নীলা দুজনেই একসঙ্গে বললো' কি কাজ দিদি।"
"তেমন কিছু নয় শুভ্রা যে ক্লাসের ক্লাস টিচার, সেই মেয়েদের নামগুলো সব তুলে নেবে আলাদা একটা খাতায় ।তারপর আর একজন কুপন কাটবে ।যাও যাও কুইক কাজ করো।'
নীলা আর শুভ্রা বড়দির ঘর থেকে বেরিয়ে এসে স্টাফ রুমে এসে কি গজ গজ করতে 
লাগল ।রেখাকে শুনিয়ে বলতে লাগলো' বললাম না ,আমাদের এত রাজ ভাগ্য নয়।'
'একদম ঠিক বলেছ নীলা দি।'
অনিন্দিতা মুখে যে কথাগুলো বলে ,খারাপ বলে না।
আসলে ওর মুখের সামনে বলে দেয় তো, তাই সহ্য হয় না।'
'তার মানে কাউকে  কাজটা করার জন্য বলেছিলেন বড়দি ,সে অজুহাত দেখিয়ে কেটে পড়েছে ।আমরা তো সেটা পারি না।'
শুভ্র বলল 'একদম ঠিক বলেছ।'
রেখা সব শুনে হজম করতে লাগল ।আসলে রেখার কিছু জবাব দিতে ইচ্ছে করলো 
না ।জবাবদিহি করলে নানা কথা উঠে আসবে সারাটা দিন মেজাজ বিগড়ে থাকবে। তারচেয়ে ওরা যা পারে বলে যাক। কিছু কিছু সময় চুপ করে থাকাই যুদ্ধে রণনীতি জেতার একটা কৌশল।
নীলা বললো 'শুভ্রা চল  অ্যাটেনডেন্স খাতাটা খুঁজি।"
"আমরা কেন খুঁজবো?'
নীলাদিঅবাক হয়ে বলল,' তাহলে?'
'সপ্তমীদিকে ডেকে খাতাটা খোঁজার কথা বলি।'

নীলা দি  বলল 'একদম ঠিক বলেছিস শুভ্রা।'
শুভ্রা উঠে গিয়ে সন্ধ্যা দিকে খোঁজ করতে গেল। দেখলো মিড ডে মিলের ঘরে। শুভ্রা সেখানে গিয়ে বলল' সন্ধ্যা দি ,ক্লাস এইট এর অ্যাটেনডেন্স খাতাটা খুঁজে আমাদেরকে দাও এক্ষুনি। আমরা লিখব।'
সন্ধ্যা দি বলে' ঠিক আছে আপনারা যান। আমি খুঁজে নিয়ে  আপনাদের কাছে দিয়ে আসছি।"
শুভ্রা আরবললো সোনার সঙ্গে চটি খাতা দেবে আর কিছু লুজ শিট ও দেবে।'

"আচ্ছা আচ্ছা দিয়ে আসব।"
শুভ্রা এসে নিজের জায়গায় বসল।
নীলাদি বলল কিরে পেলি খাতা,?"
"বলেছি।'
কথা শেষ না হতেই সন্ধ্যা দি এসে বলল খাতাগুলো দিয়ে এইযে দিদি খাতা রইল আর এই যে কয়েকটা লুজ শিট "
নীলা বলল 'তুই কি করবি কুপন কাটাবি, না নাম লিখবি?'
শুভ্রা বললো "যেটা বল।"
নীলা বললো'তাহলে তুই নাম লেখ।'
শুভ্রা বললো 'ওকে।'
নীলা বলল" কার কাজ কে করে?'
শুভ্রা বললো আমরা হচ্ছি শ্রমজীবী মানুষ খাটতে তো হবেই।'
"যারা অভিজাত্ত তাদেরকে তারা এসব কাজ করতে হবে না।"
রেখার মাথাটা ধরেছে তাই মাথা নিচু করে টেবিলে মাথা রেখে বসে আছে আর সব শুনছে ।
এরমধ্যে রেখার ফোন বেজে উঠলো।
রেখা ফোনটা রিসিভ করে বলল' হ্যালো।'
'হ্যাঁ ম্যাডাম,' আশা 'পত্রিকা থেকে বলছিলাম।'
"হ্যাঁ ,হ্যাঁ বলুন।'
আমরা আপনার একটা সাক্ষাৎকার নিতে চাই কালকে কি একবার সময় হবে?
রেখা বলল' না না কালকে একদমই সময় হবে না।'
ঠিক আছে তাহলে আপনি একটা আমাদের সময় দিন।
 "আপনারা রবিবার আসুন '।
ওকে।
ফোনটা কেটে দিয়ে রেখা ভাবতে লাগলো আশা পত্রিকার থেকে আসবে, রবিবারে কি কি অ্যারেঞ্জ করবে?"
"ঠিক আছে বাড়ি যাই। এ ব্যাপারে মনোজের সাথে কথা বলতে হবে।'
এসব ভাবতে ভাবতেই ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল এখনো সময় আছে কিছুক্ষণ লেখা যাবে।
বরং রেখা  লেখাটা লিখতে থাকুক….।
"বন্ধুত্ব বেঁচে থাক গভীর শ্রদ্ধায় পরস্পর পরস্পরের প্রতি বিশ্বস্ততায় আর  ভালোবাসায়।*"

শামীমা আহমেদ এর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৯৯





ধারাবাহিক উপন্যাস 

শায়লা শিহাব কথন 

অলিখিত শর্ত (পর্ব ৯৯)

শামীমা আহমেদ 




এক ম্যারাথন সময় পেরিয়ে শায়লা ও শিহাবের মধুময় রাত কাটলো। সূর্যের আলোর টানে শায়লার আগে ঘুম ভাঙলো। ঘুম থেকে জেগেই সে চারপাশে তাকিয়ে এখন বেলা ঠিক কয়টা বাজছে তা  বুঝতে চেষ্টা করলো। মনে হচ্ছে অজানা কোন দ্বীপে রাত্রিযাপন শেষে তার ঘুম ভাঙলো। শায়লার চোখ পড়লো,দেখলো, এখনো বেডসাইড টেবিলে ল্যাম্পটি জ্বলছে। শায়লা তড়িঘড়ি করে বিছানা থেকে নামতে চাইলো।কিন্তু কিছু একটায় সে আটকে গেলো। শায়লা দেখলো ঘুমন্ত শিহাব তার দু'বাহুতে শায়লাকে বেঁধে রেখেছে। সেদিকে তাকাতেই তার শিহাবের কথা মনে হলো! 
তাইতো ! শিহাবতো গতকাল রাতে এই বাসাতেই ছিল।শায়লার একে একে গতরাতের সবকিছু মনে পড়তে লাগলো। শিহাব তখনো অতল ঘুমে একেবারে কাদা হয়ে আছে । শায়লা খুব আলতো করে একে একে  শিহাবের দুবাহুর বন্ধন ছাড়িয়ে  বিছানা থেকে নেমে এলো।নিজের পরনের পোশাক গুছিয়ে নিয়ে জানালার পর্দা সরিয়ে দিনের সময়টা বুঝতে চেষ্টা করলো।বাইরে বেশ উজ্জ্বল সূর্যালোকে সবদিক একেবারে ঝকঝকে স্বচ্ছতায় ফুটে আছে। মানুষের স্বাভাবিক চলাচলে শায়লা বুঝে নিলো বেশ অনেক আগেই সকাল হয়েছে। সে ল্যাম্পটি নিভিয়ে ঘরের বাতি জ্বালিয়ে দেয়াল ঘড়িতে দৃষ্টি দিতেই একেবারে চমকে উঠলো!  দুপুর বারোটার ঘন্টার কাঁটা একটার দিকে চলমান। শায়লা দ্রুত ওয়াশরুমের প্রস্তুতি নিলো।ফিরে এসেই সে শিহাবকে জাগাবে। বেচারা আরেকটু ঘুমিয়ে নিক।শিহাবের কথা মনে হতেই শায়লা বিছানার দিকে এগিয়ে গেলো। ঘি রঙা পাঞ্জাবিতে ঘুমন্ত শিহাবের মায়াভরা মুখটার দিকে শায়লা অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। মনে হলো অনেক প্রচন্ড এক যুদ্ধের ধকল কাটিয়ে রাজ্যবীর জয়ের আনন্দে গভীর ঘুমে ডুবে আছে। শায়লার মনে পড়ে গেলো শিহাবের সাথে পরিচয়ের   প্রথমদিনের ক্ষণটি।নেভি ব্লু জিন্স শার্টে একখন্ড সাদা মেঘের মত চাঁদ মুখের উঁকি! বাইক থেকে নেমে আসতে প্রতি পদধাপে সেদিন শায়লা ভীষণ ভালোলাগায়
আছন্ন হয়ে গিয়েছিলো।দিনে দিনে বাড়তে বাড়তে শায়লাকে তা পূর্ণ গ্রাস করে নেয়। তার অমায়িক ব্যবহার আর শায়লার প্রতি অমন সুন্দর ভদ্রতা বজায় রেখে চলা শায়লাকে তার প্রতি এক দুর্নিবার আকর্ষণে টেনে নিয়েছিল। একটু একটু করে তাতে  ভালোবাসার জন্ম নেয়। আজ সেই শিহাব তার এতটা কাছে এতটা আপন হয়ে  ধর দিয়েছে।শায়লা নিজেকে একজন সুখী মানুষ ভেবে নিলো। আস্তে আস্তে খুব সন্তর্পণে  সে শিহাবের মুখের দিকে এগিয়ে গিয়ে কপালে আলতো করে তার ঠোঁট ছুয়ে দিল। এক অপার্থিব ভালো লাগা তার অন্তরের গভীরে গিয়ে জায়গা করে নিলো। শায়লা শিহাবকে না জাগিয়ে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে যেতে হঠাৎ করে শিহাব চোখ মেলে তাকালো। শায়লা ভীষণ লজ্জা পেয়ে  গেলো। শিহাবের দুষ্ট চোখ শায়লাকে আরো কাছে চাইলে তাতে শায়লার সম্মতি না মেলায় শিহাব চট করে এক গাঢ় চুম্বনে শায়লাকে দখল করে নেয়।শায়লা শিকারীরজালে আটকে যাওয়া নিরীহ এক শশ শাবকের ন্যায় আত্মসমর্পণ করে নিলো। সময়ের বয়ে চলায় শিহাব স্বেচ্ছায় তার বাঁধন ছুটিয়ে শায়লাকে মুক্ত করলে তবেই শায়লা নিজের অবস্থানে ফিরে এলো। শায়লা  আর পিছনে না তাকিয়ে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেলো। সে বেশ অনেকটা সময় নিয়ে শাওয়ারের জলধারার নিচে দাঁড়িয়ে রইল।পানির ঝর্ণাধারায় তার সারা দেহে  শিহাবের স্পর্শের শিহরন বয়ে গেলো।  অনেকটাক্ষণ সে চোখ  বন্ধ করে তা অবগাহনের সুখ শুষে নিলো।এক অনন্য সুখানুভূতিতে ডুবে বুঝে নিলো ভালোবাসা পাওয়ার ক্ষণগুলো জীবনের সময়ের তুলনায় খুবই ক্ষনিকের। কেন তা সারাটা জীবনের প্রতিটি ক্ষন জুড়ে থাকে না ? কেন জীবনের সব অপ্রাপ্তিকে সরিয়ে বারবার একই আনন্দে বিভোর হওয়া যায় না। শায়লার দীর্ঘ সময় ওয়াশরুমে থাকায় শিহাবের খুব একা একা বোধ হতে লাগলো। সে বিছানা ছেড়ে ওয়াশরুমের দরজায় নক করতেই শায়লার খেয়াল হলো অনেক সময় ধরেই সে নানান ভাবনায় ডুবে আছে।শিহাবকে একা রেখে এসে।সে সব গুছিয়ে দ্রুতই বেরিয়ে এলো।বাইরে শিহাব তার মোবাইল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।রিং হচ্ছে। শায়লা তাকিয়ে দেখলো,বুবলীর কল। সে কল রিসিভ করতেই শিহাব ওয়াশরুমে ঢুকে গেলো। বুবলীর  আক্রমণাত্মক  কথায় শায়লা একেবারে কুপোকাত হয়ে গেলো।শায়লা বুঝতে পারে না কখন বুবলী এতটা দক্ষ একজন বক্তা হয়ে উঠলো। সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের ছাত্রী এরা। যেমন স্পষ্টভাষী তেমনি প্রতিবাদী।
তোমাদের আজ কি ঘুম ভাঙবে ? নাকি একসাথে দুইদিন ঘুমাবে ? 
বুবলীর এমন প্রশ্নে শায়লা কি উত্তর দিবে কিছুই খুঁজে পেলো না।আসলে শায়লার তো খুব অল্প বয়সেই  জীবন সংগ্রাম শুরু হয়ে যায়। মন খুলে কথা বলা বা নিজের অধিকার আদায়ের কথা বলার মত সুযোগ তার হয়ে উঠেনি।তাইতো বুবলীকে পরাস্ত করা হয়ে উঠে না। এইতো,এখুনি বেরুচ্ছি,শায়লা শুধু এটুকুই বলতে পারলো।
শিহাব ভাইয়া কোথায় ? তার জন্য কি নাস্তা হবে জানিও। তোমরা দ্রুত এসে নাস্তা করো।একটু পরতো লাঞ্চের সময় হয়ে যাবে। আপু, তোমার জন্য ঐ কেনাকাটার মাঝে নতুন শাড়ি আছে সেটা পরে নিও। আপাতত শিহাব ভাইয়ার জন্য কিছু নতুন পোশাক আনা হয়েছে। রাহাত ভাইয়া কেনাকাটা করে এনেছে। দরজা খোল আমি নিয়ে আসছি। 
কথাগুলো বলেই  বুবলী কল রেখে দিলো।শায়লা তার শাড়িটি খুজতে লাগলো।শিহাব ওয়াশরুম থেকে টাওয়েল চাইতেই শায়লা অপ্রস্তুত হয়ে গেলো। সে এখন কি করবে ? শিহাব মুখ বাড়িয়ে বললো,শায়লা তোমার চুলে বাধা টাওয়েলই আমার চলবে ওতে যে তোমার চুলের ঘ্রাণ আছে সেটাই মেখে নিবো। শায়লা ভেবে পায়না শিহাব কবে এত রোমান্টিক কথা শিখল ? কই আগেতো এমনটি শুনিনি। শায়লা এগিয়ে গিয়ে টাওয়েল দিতেই সে ফিসফিস করে বললো, শায়লা তোমাকে পেয়ে আমার নিজেকে খুব সুখী মানুষ মনে হচ্ছে।তুমি কখনোই আমাকে ছেড়ে যেওনা। শায়লার চোখ জলে ভরে উঠলো। শায়লার প্রতি বারবার শিহাবের এই একই আকুতি। আমায় ছেড়ে যেওনা। আমায় ছেড়ে যেওনা।তার জীবন থেকে আচমকা  রিশতিনার চলে যাওয়া শিহাবের মনে হারানোর ভয় ঢুকে গেছে। বুবলী দরজায় নক করে  ভিতরে না ঢুকেই সে শিহাবের পোশাক, টাওয়েল দিয়ে গেলো। শায়লার  ভেজা চুল থেকে তখনো পানি ঝরছে। আর তাতে  বুবলীর মুচকি হাসি যেন শায়লার ভেতরে ভীষণ  এক টিপ্পনী কেটে গেলো! উফ! মেয়েটাকে নিয়ে আর পারা যাচ্ছে না।শীঘ্রই এটাকে জামাই বাড়ি পাঠাতে হবে। শিহাব বেরিয়ে এসে তার নতুন পোশাক  দেখে অবাক হলো! শায়লা জানালো,রাহাত সকালে কিনে এনেছে । গাঢ় সবুজ রংয়ের সিল্কের পাঞ্জাবী আর আদ্দি কাপড়ের চোস্ত পায়জামা আর নতুন চটি স্যান্ডেলে নতুন জামাই সাজে শিহাবকে দারুণ লাগছে। শায়লা মুগ্ধ হয়ে তা দেখছিলো। শিহাব আয়নায় নিজেকে দেখে নিলো।বাহ! রাহাততো ঠিক মাপেই সব কিনেছে। শিহাব মনে মনে ভেবে নিলো, এখন তার উপরেও কিছু দ্বায়িত্ব বর্তে গেলো। শায়লা ইট রঙা কমলা শাড়ি খুব পরিপাটি করে পরে নিলো। সাথে হালকা জুয়েলারী। দরজায় বুবলীর ক্রমাগত কড়া নাড়ার শব্দে শায়লা  শিহাব বুঝে নিলো তাদের দ্রুত বেরুতে হবে। নিশ্চয়ই  সবাই অপেক্ষায়।  
দুজন বেরিয়ে আসতেই বুবলী এগিয়ে এলো। রাহাত ও বুবলী দুজনকে ড্রইং রুমে নিয়ে বাসালো। সেখানে কাজী সাহেবকে বিয়ে পড়ানোর জন্য আগে থেকেই বসিয়ে রাখা হয়েছে। সেখানে শায়লার মা, নিচ তলার রুহি খালার স্বামী আর বাড়ির অন্যান্য মুরুব্বিদের উপস্থিতিতে শায়লা ও শিহাবের বিয়ে পড়ানো হলো।  সবাই মিষ্টি মুখ করে নব দম্পতির জন্য দোয়া করতেই শায়লার মা লায়লা খানম কান্নায় ভেঙে পড়লেন। শিহাব শায়লার মায়ের কাছে এসে দাঁড়িয়ে তাকে বিনীতভাবে জানালো, মা আপনি কাঁদবেন না। শায়লা  আর আমার জীবনে সবকিছু একটু অন্যভাবে ঘটলো। কারো কারো জীবনের চলা এভাবেই লেখা থাকে। সবকিছু প্রথাগত নিয়মে হয় না। আপনি দুঃখ করবেন না। আমাদের জন্য দোয়া করবেন। শায়লাকে আপনারা আমার হাতে তুলে দিয়েছেন,আমার জীবনের সঙ্গী করেছেন, আপনাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।কেননা শায়লার মত একজন মেয়েকে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।আর শায়লার কাছে থেকে আমার ছোট্ট আরাফ তার মায়ের  আদর পাবে এর চেয়ে স্বর্গীয় সুখ আর কিছু নেই।  শিহাব শায়লার মাকে সালাম করলো,মা শিহাবের মাথায় হাত দিয়ে তাকে আশীর্বাদ জানালো।
শিহাবের ছেলে আরাফের কথা শুনে আত্মীয় স্বজনের  মাথায় যেন বাজ ভেঙে পড়লো ! ও তাহলে এই ছেলে আগে থেকে বিবাহিত ছিল আবার ছেলেও আছে ! সবার কোথায় যেন আনন্দ আবেগের ছন্দ পতন হলো। রাহাত আর বুবলী বিষয়টি টের পেয়ে শায়লা আর শিহাবকে সেখান থেকে সরিয়ে ডাইনিং এ নিয়ে এলো। ওরা চারজন একসাথে বসে নাস্তা করে নিলো।  নাস্তা শেষে  শিহাব শায়লার মায়ের কাছে শায়লাকে তাদের ঝিগাতলার বাসায় নিয়ে যাওয়ার জন্য অনুমতি চাইলো। আর আজই সে আরাফকে সেখান থেকে নিয়ে আসবে আর ওরা তিনজন  আজ থেকেই শিহাবের বাসায় থাকবে।তাদের নতুন জীবনের জন্য শিহাব সবার কাছে দোয়া চাইল। শিহাব সবার কাছে কিছুই লুকাবে না। সে কখনোই আরাফকে বাদ দিয়ে তার জীবন ভাববে না। শিহাব চাইছে শায়লার  স্বজনেরা আজই আরাফের কথা জানবে এবং আরাফ এই বাড়িতে যাতায়াতের জন্য সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ থাকবে। আর সবকিছুই যে শায়লার সম্মতিতে হয়েছে শায়লাও সেটা স্বজনদের কাছে পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিলো। 
বাড়ির মুরুব্বিরা আরাফের ব্যাপারে  শায়লা আর শিহাবের এমন দৃঢ় মনোভাবে আর কিছু বলবার সাহস পেলো না।  সবার জীবন সহজ সরল গতিতে চলে না,কারো কারো জীবনের গতিপথ নানান চড়াই উৎরাই পেরিয়ে তবেই মোহনার ঠিকানা খুঁজে পায়,এমনি কথা বলে শিহাব সবাইকে এটাই বুঝিয়ে তাদের মনে জমা হওয়া প্রশ্নের সমাধান করে দিলো। শিহাবের অমায়িক ব্যবহার আর সশ্রদ্ধ আচরণে আত্মীয় স্বজনেরা বিমুগ্ধ হয়ে তাদের আশীর্বাদ জানাতে লাগলো। সবকিছু দেখে রুহি খালা লজ্জায় যেন নিজেকে লুকাতে চাইছে। বিষয়টি শায়লার দৃষ্টি এড়ায়নি। শায়লা নিজে থেকে এগিয়ে গিয়ে রুহি খালাকে সালাম করে তার দোয়া চাইতেই রুহি খালা তার ভুলের জন্য কান্না করে দিলেন।কিন্তু শায়লা ভেবে নিলো শত হলেও তিনি  তাদের পরিবারের একজন শুভাকাঙ্ক্ষী।

কবি আছিয়া হক এর কবিতা "তীব্র শীতের একটা রাত কিনতে চাই "






তীব্র শীতের একটা রাত কিনতে চাই 

আছিয়া হক  
(তিথি)


আমি কুয়াশায় মুড়ানো তীব্র শীতের একটা রাত
চড়া দামে কিনতে চাই পৌষ মাঘের কাছ হতে,
নবান্নের সুখ ঢোলে পড়ে হৃদয়ে স্বপ্ন উদিত হয়
বিষাদের স্বপ্ন ঢেউ তোলে বুকে তোমাকে পেতে।

কামনার দৃষ্টি ভরা দহন গুলো কান পেতে শুনি
তোমার কণ্ঠের সুর ভোরের পাখিদের গানে গানে,
সুরের তালে মাতাল করে দেয় জুড়ায় মন প্রাণ
নুড়ে পড়ি স্বপ্নের প্রান্তরে পাওয়া আত্মভিমানে।

বাসনা গুলো হারিয়ে গেছে সীমানার দুর দিগন্তে
অদৃশ্য মায়াজাল প্রেম জাগায় আঁখি মিলনে,
আলোর জ্যোতি খোঁজে জোসনা ছড়ানো চাঁদ
মেঘের রঙের পাগলামি দেখে কাঁদে নির্জনে।

প্রেমের আবেদন জানায় সন্ধাকাশের উজ্জ্বল তারা 
অকাল মৃত্যু হয়েছে যে প্রেমের ঝরা ফুলো তলে,
প্রথম প্রেম আলোড়ন সৃষ্টি করে নবযৌবনা সুখে
ঘন কুয়াশার শিশির কণা ঝরে দু- চোখের জলে।

অনন্ত প্রেম অন্তহীন অবিরাম কেন মনে জাগে
তীব্র শীতের স্নিগ্ধতায় কাঁথা মুড়ি দিয়ে কাঁদে দুখে,
কুয়াশাচ্ছন্ন আঁধারে ছেয়ে আছে মোর আঙিনা
অবেলায় অবহেলায় গল্পকথা হয়ে মনের সুখে।

সৃজন করি সুপ্ত বাসনা পূর্ণতায় নিজেকে বিলাই
অবসরে বেদনারা কড়া নাড়ে মনের জানালায়,
ভোরের কলাফুলের শিশির মেখে উঠবো ফুটে
স্বপ্নচারিনী হয়ে তোমার মনের বনের মোহনায়।

জীবনের সঞ্চিত সমস্ত জমানো সুখ দুঃখ গুলো
হিসেব করিনি, কি পেলাম কি হারালাম এই আমি,
প্রতিদানে দিতে পারিনি তোমার পবিত্র প্রেমের মূল্য
পারবে কি ক্ষমা করে দিতে আমাকে ওগো তুমি।

ইসলাম রবির গদ্য




কবির গান
ইসলাম রবি 

যারা ভিতরের ভাষা প্রকাশ করে না ,,বা ঘটে যাওয়া ঘটনাকে সহজ ও স্বাভাবিক ভাবে নিয়ে লুকিয়ে রেখে অন্য ভাষা , বিষয় প্রকাশ করে আমার মনে হয় তাঁরাই প্রকৃত কবির পথে আছে !

নামের আগে কবি টাইটেল দিলেই কবি হয় না ,,
লাইক কমেন্ট বেশি থাকলেই কবি হয় না ,,
লেখার সাথে আপেল ও গোল আলু  মার্কা  ছবি দিলেই কবি হওয়া যায় না ,, তখন উল্টা ঘটে লেখা বাদ দিয়ে মানুষ আপনার রুপের ওজন করে ... আর সেই বিখ্যাত উক্তি গুলো দেয় .. কপালের টিঁপ সুন্দর , হাতের ছুড়ি সুন্দর ,, শাড়িটা নতুন কিনলেন ? জায়গাটা ভীষণ সুন্দর... তাঁর চেয়ে বেশি সুন্দর আপনি আপু ব্রা ব্রা... ইত্যাদি !
আমার জানা মতে কবিদের লিষ্ট হল গরু ক্ষেত্র এখানে কোন বেদাবেদ বাদে সব রকমের সব বয়সের মানুষ থাকে আর সেই মানুষটা যদি হয় মেয়ে তাহলে আর কোন কথা নেই পুরুষ কবিরা চোখ বন্ধ করে রিকু গ্রহণ করে কারণ এক গবেষণায় দেখা গেছে নারী পুরুষ কবিরা বড় লুইচ্ছা এরা জাত বেদ মানে না এরা বয়সের তোয়াক্কা করে না !
এদের প্রায় সকলের নিজেদের একটা একটা গ্রুপ থাকবেই আর সে কারণেই এরা গ্রুপে মহা বীর মহারানী আর নিজেদের দেয়ালে রাস্তার ফকির ! 
আর হ্যা ফেইজবুকের অধিক নারী পুরুষ কবিরা জানেনা কোন লেখায় লাইক দেওয়া যায় কোন লেখায় কমেন্ট করা যায় ও আর এদের মেসেঞ্জারেও একটা করে গ্রুপ প্যানেল থাকবেই আর দিন নাই রাত নাই এদের বকর বকর চলতেই থাকবে কে কার প্রেমে পড়ছে কে কার ছেড়ে দিয়েছে আর শুভ সকাল রাত হাই হ্যালো ভুলেও কখনো বাদ যাবে না ..কথা সত্য আমরা এদেরকেই কবি বলে জানি আর গ্রুপ থেকে প্রতি সপ্তাহে একখানা কবিতার জন্য মেডেল ও সনদ থাকে বর্তমানে এরাই আমাদের এক শ্রেনীর কবি বড় বড় লেখদের সাথে একখানা ছবি তুললেই আপনিও বড় কবির সনদ পেয়ে গেলেন কবি ..! 
আরও একটা কথা না বললেই নয় অনেক আগে থেকেই খেয়াল করছি পুরুষ থেকে মহিলারা এখন বেশি হচ্ছে কারণ কি জানেন ? কারণ প্রকাশনা পুরুষদের লাইন নাই টাকার জন্য অথচ মহিলাদের কোন টাকা লাগে না বই বের করতে তাই বলতেই হয় প্রকাশানারা নারীর পূজারী ! এই জাতী ভাল লেখা দেখে না নারীর শরীর দেখে যা খুবি লজ্জা জনক !






(লেখকের ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা ! স্বপ্নসিঁড়ি সাহিত্য  পত্রিকা প্রকাশক । প্রতিটি লেখকের লেখার আইনানুগভাবে দায়িত্ব নিতে দায়বদ্ধ নয় ।)

২৪ এপ্রিল ২০২২

কবি ডালিয়া মুখার্জী এর কবিতা "ইচ্ছে গুলো এলোমেলো"




ইচ্ছে গুলো এলোমেলো 
ডালিয়া মুখার্জী


আজ আবার কবিতা লিখতে ইচ্ছে হয়,
ইচ্ছে হয় নতুন করে বাঁচতে, 
ইচ্ছে হয় আবার মেঘ পাহাড়ের ঘন কুয়াশা তে মিশে যেতে,
ইচ্ছে হয় পৃথিবীর গন্ধটা বুক ভরে নিতে,
ইচ্ছে হয় শিমুল বনের রাঙা রাস্তা ধরে হাঁটতে,
ইচ্ছে হয় বৃষ্টির প্রতিটি ফোটতে নিজেকে ভিজিয়ে নিতে
ইচ্ছে হয় পাহাড়ের সূর্যাস্ত দেখতে,
শেষ বিকেলে ঘরে ফিরে যাওয়া পাখিদের কলকলানি শুনতে,
ইচ্ছে হয় একভাবে বয়ে যাওয়া পাহাড়ি নদীর গান শুনতে
ইচ্ছে হয় নীল আকাশে রাতের ধ্রুব তারা দেখতে,
বসন্তের হাতছানিতে নিজেকে খুজে নিতে।

মমতা রায়চৌধুরী এর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৬১




উপন্যাস 


টানাপোড়েন ১৬১
অনিন্দিতার বাচ্চা
মমতা রায়চৌধুরী

ও বাপরে বাপ আমি কিছুতেই পারছিনা।
কি হলো? হলো টা কি? আর আমার মান্থলি টিকিট কার্ড পাচ্ছি না।
দেখ ওখানে আছে তোমার যে ভুলোমন।
তুমি কি ব্যাক চেঞ্জ করেছিলে?
'হ্যাঁ করেছিলাম। তাতেও নেই।'
নেই মানে টা কি ?
মনোজ তাড়াতাড়ি খাবার খেয়ে বেসিনে হাত ধুয়ে ঘরে গিয়ে ড্রয়ার টা খুলল। ভালো করে জিনিসপত্র সরিয়ে সরিয়ে দেখলো, তারপর বললো "এই দেখো ,বলেই কার্ডটা রেখার  কাছে নিয়ে গিয়ে দেখালো।'
রেখা বলল 'আশ্চর্য আমি তো ড্রয়ার টাও খুঁজলাম।'
"ঠিক আছে, চলো ট্রেন পাবে না কিন্তু
 এর পর ।আমি তোমাকে ড্রপ করে দিচ্ছি।'
"তোমার লেট হয়ে যাবে না।"
"না,না, আমার পরের  ট্রেনে গেলেও হবে আজকে।"
Ok
"ঠিক আছে তুমি গাড়িটা বের করো আমি দরজা লাগিয়ে আসছি।"
মনোজ গাড়ি বের করতে করতে চিৎকার করে বলল" আসার সময় বিস্কিট নিয়ে এসো, না হলে কিন্তু ছাড়া পাবে না ওদের কাছ থেকে।". 
রেখা হাতে করে বিস্কিট এনে আগে বাচ্চাগুলোকে দিল, মিলিকেও দিল।"
তারপর মনোজ রেখাকে  নিয়ে গাড়ি করে স্টেশন এর উদ্দেশ্যে রওনা দিলো।
পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির খবর হয়ে গেল রেখা তাড়াতাড়ি ওভারব্রিজ অতিক্রম করে ট্রেন ধরার জন্য ছুটলো।
মনোজ বললো 'সাবধানে।'
রেখা বললো' তুমিও সাবধানে যেও।'
ওভারব্রিজ অতিক্রম করার সঙ্গে সঙ্গেই ট্রেন ঢুকে গেল। রেখা  ট্রেনে উঠে বসলো। সে ভেবেই নিল
জায়গা পেলে ঘুমোতে ঘুমোতে একেবারে কৃষ্ণনগর জংশন।
অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে জায়গা না পেলেও কিছু দুরে গিয়ে জায়গা পেল। রেখা সঙ্গে সঙ্গে চোখ বুজলো।
গাড়ি কৃষ্ণনগর জংশন এর পৌঁছালে ঘুম ভাঙলো তারপর রেখা টোটো ধরে স্কুলে পৌঁছালো।
অ্যাটেনডেন্স  দিতে গিয়ে রেখা দেখল "বড়দি মুচকি মুচকি হাসছেন।"
রেখা ভাবল "তার ড্রেসে কি কিছু অবিন্যস্ত ভাব ধরা পড়েছে ?"
বড়দি সেটা বুঝতে পেরে বললেন' না ,না ,আমি হাসছি ।তুমি দেখছি নির্দিষ্ট টাইমেই এসে পৌঁছে গেছে এইজন্য।"
রেখা বলল "ও আচ্ছা ।না ,দিদি কি করবো খামোকা লেট করে ।আমার যদি সত্যিই খুব অসুবিধে থাকতো, তাহলে নয় ঠিক ছিল।
ইচ্ছে করে শুধু সুবিধা নেব বোলে দেরি করে আসব, সেই মানসিকতা আমার নেই।'
বড়দি বললেন "আমি জানি তা হলেও যেহেতু কালকে অত রাত্রে ফিরেছো তো ,তাই তোমাকে বলেছিলাম।এজন্যই তো তোমাকে এত ভালো লাগে।'
রেখা বলল' আপনি আমাকে স্নেহ করেন তাই।"
এরপর বড়দি একটু চিন্তার মধ্যে ঢুকে গেলেন।
রেখা বলল 'ও বড়দি কিছু সমস্যা?'
বড়দি রেখার দিকে তাকিয়ে বললেন' কিছু বলছো?'
'না মানে আপনি চুপ করে গেলেন তো তাই।"
বড়দি বললেন "ভাবছি কাল থেকে আবার ভ্যাকসিন শুরু হয়ে যাচ্ছে।'
"এবার কাদের বড়দি?'
"ওই যে 12 থেকে 15 বছর বয়সের মধ্যে।"
"ও আচ্ছা, আচ্ছা।'
"কিন্তু দেখো অনিন্দিতা তো ক্লাস এইট এর ক্লাস টিচার । ও তো আসছেই না।
"ওকে তো অ্যাটেনডেন্স শিট তৈরি করতে হবে। কুপন তৈরি করতে হবে।এই কাজগুলো তো করতে হবে।"
"ওর ছেলের খবর কি দিদি?"
ওই তো ফোন করেছিল বলল" দিদি, আমরা এসএসকেএম হসপিটাল এ নিওনেটোলজি বিভাগে দেখাচ্ছি।"
"ও আচ্ছা তারমানে কতগুলো  টেস্ট হবে তো?'
'হ্যাঁ ,সেরকমই তো বললো।"
"প্রথম দিন নাকি জেনারেল স্টাডিজ হয়েছে বাচ্চার ।অবশ্য বাবা -মার ও কাউন্সেলিং হচ্ছে।
গতকাল নাকি বাচ্চার সেন্স এর উপর ও টেস্ট হয়েছে।'
"ও বাবা তাই?"
এখনো ও কে  কিছুদিন বাড়িতে থাকতে হবে। ও সিসিএল এর জন্য অ্যাপ্লিকেশনও দিয়েছে।
ও তাই বুঝি?"
"এখন বাচ্চার কি কিছু ইমপ্রুভ বুঝতে পারছে?"
"ওই তো ,ও যেটা বলেছে যে ,এটা আপনাদের দোষ । এরকম হয়েছে আপনাদের জন্যই। বাচ্চা এমনি সুস্থ স্বাভাবিক আছে কিন্তু কথা বলার শুরুতে যে কোশ্চেনগুলো বাচ্চার ভেতরে লক্ষ্য করা যায় সেগুলো ও করেছিল কিনা ?"
"তখন ওরা নাকি বলেছে মানে?'
*মানে বাচ্চা কোন কিছুর মধ্যে ইনভলভ হয়ে ইন্টারেকশন করতে চেয়েছে কিনা মা-বাবার সঙ্গে?"
তখন অনিন্দিতা আর ওর বর নাকি দুজন দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল।
তারপর বলেছিল যে ওর একটা ভিডিও করে রেখেছে এসবের।
বাবুরা নাকি একটু কৌতূহলী হয়েছিলেন। অনীনদিতা বলেছে ও যে ভিডিও করে রেখেছিল 
সেগুলো ফোনের থেকে দেখায়। বাচ্চা কোন বয়সে ও ঝাঁটা নিয়ে ঝাঁট দিতে গেছে। মানে ও সময় বাচ্চা ইন্টারেকশন করতে 
চেয়েছে বাবা-মায়ের সাথে ।কিন্তু সে সময় মা-বাবা তাকে গুরুত্ব দেয় নি ।'
মা-বাবা ও কর্ম ব্যস্ত মানুষ ছেলের গুরুত্ব বুঝতে পারেনি শুধু খাওয়ানো ,ঘুমপাড়ানো ছাড়া।'
ডাক্তারবাবুরা বলছেন তাই হেলদি হয়েছে ঠিকই কিন্তু বাচ্চার এই গ্রোথ টা ঠিক হয়নি।
তখন নাকি অনিন্দিতা এরা খুব চিন্তিত হয়ে পড়ে।
তখন ডাক্তার বাবু বলেছেন চিন্তার কোন কারণ নেই একটু দেরি হয়েছে কিন্তু খুব দেরি হয়নি এখন ধৈর্য ধরে বাচ্চার সঙ্গে লেগে থাকতে হবে।
ডাক্তারবাবুরা যেগুলো বলছে সেগুলো ভালো করে ফলো করতে হবে।
কিরকম দিদি?
আরো জিজ্ঞেস করেছেন ডাক্তারবাবুরা যে "মোবাইল নিয়ে বসে থাকে কিনা বাচ্চা?
'অনিন্দিতা বলেছে "হ্যাঁ মোবাইল ছাড়া খাবে না তাছাড়া মোবাইলটা ইচ্ছে করে বাচ্চাকে এক সময় ওরাই দিয়েছে কাজের সুবিধার্থে।'
ডাক্তারবাবুরা বলেছেন মোবাইলে একদম দেয়া যাবেনা বাচ্চাকে তাতে সে যতই কান্নাকাটি করুক বা খাবার দেওয়া না খাক।
রেখা বলল 'কী সাংঘাতিক?'
তারপর ডাক্তারবাবুরা বলেছেন ও আগে যে খেলনা গুলো দিয়ে খেলত সেগুলো একটাও দেয়া যাবে না ।ডাক্তারবাবুরা যে সমস্ত খেলনার কথা বলবেন শুধু সেইগুলোকে কিনে দেয়া হবে আর ওর সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে কথা বলতে হবে ।মানে নিজেরাই কথা বলতে হবে নিজেরাই উত্তর দিতে হবে এবং ওটা দেখে দেখেই  ও শিখবে।'
কি অদ্ভুত ব্যাপার হলো দিদি দেখুন যে বাচ্চার স্বাভাবিক ছন্দে সমস্ত কিছু শিখতে চেষ্টা করছিল সেটা কে ওরা গুরুত্বই দেয় নি।
বড়দি বললেন 'আসলে সত্যি সত্যিই মা বাবারাই কিন্তু বাচ্চার ভালো করতে গিয়ে কখন যে খারাপ করে ফেলেন সেটা বুঝতেও পারেন না।
একেবারে স্লো পয়জন' এর মত কাজ করে।
যাই হোক ওর বাচ্চা দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুক এই কামনাই করি।
ঠিক বলেছ রেখা।

সেজন্য একটু চিন্তিত আছি ওর কাজগুলো কাউকে না তো কাউকে করতেই হবে।
আপনি এত চিন্তা করছেন কেন আমি তো আছি তো?
সে আমি জানি রেখা কিন্তু তবুও ভাবছি আবার sযদি ওয়ার্কশপ হয় তাতেও তো তোমাকেই যেতে চলো রেখার লাইনের জন্য ধার করা সবাইকে চলো রেখার লাইনের জন্য মেয়েদের সঠিক ভাবে দাঁড় করিয়ে দাও হবে।

তাই এই ক্ষেত্রে আমি তোমাকে একটু ছাড় দিতে চাইছি।
আর কোন টিচার ফাঁকা পাওয়া যায়।
গান তুই যদি না পাওয়া যায় তখন তো তোমাকে পাঠাতেই হবে।
আর অনিন্দিতাকে যেহেতু কিছুদিন বাচ্চার টেক কেয়ার করতে হবে তাই ভাবছি ওঁকে কিছুদিন সি সি এল দিয়ে দিতে হবে।
দেখো পেয়ার লাইনের ঘন্টা পড়তে চলেছে কজন টিচার পেয়ার লাইনে দাঁড়ায়।
"এজন্যই কঠোর নিয়ম জারি করতে 
 রেখা বলল ঠিক তাই একজন দুজনের জন্যে বাকি সবার উপর করতে এসে পড়ে।
 মেয়েদের লাইন করে দাঁড় করিয়ে সবার কাছে গিয়ে দেখতে হবে স্কুল ইউনিফর্ম পড়েছে কিনা?
ওকে দিদি।
"আর দেখো না আজকে টিচার লেট করে আসলে লেট মার্ক খাইয়ে দেবো আমি।"
মেয়েরা সব জাতীয় সঙ্গীত শুরু করো।
তারপর যে যার রুমে চলে যাও
রেখার মাথার মধ্যে সারাক্ষণ অনিন্দিতা আর ওর বাচ্চার কথাই ঘুরপাক খেতে লাগল।
লেখার একটা প্রিয় গান মনে পড়ে গেল
"যার কথা ভাসে মেঘলা বাতাসে ,তবু সে দূরে থাক ,সে কথা মানে না…। "গানটা বার বার মনে পড়ছে রেখার। অনিন্দিতা সঙ্গে মনের দূরত্ব অনেকটাই বেড়েছে কিন্তু তবুও অনিন্দিতা আর ওর বাচ্চার ভালো হোক সেটাই চায় বরাবর।

শামীমা আহমেদ এর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৯৮





ধারাবাহিক উপন্যাস

 
শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত (পর্ব ৯৮)
শামীমা আহমেদ 



শিহাব খুবই ঠান্ডা মাথায় একমনে রোমেলের কথাগুলো  শুনে নিলো। সে বুঝতে পারছে না এর মাঝে কতটা সত্যতা আছে বা আদৌ তা সত্য কিনা। বেশ কিছুদিন যাবৎ রোমেল শিহাবকে ভীষণভাবে  অনুসরণ করছে আর রিশতিনারকে নানান বুদ্ধি পরামর্শ  দিয়ে যাচ্ছে।  সে খুবই চেষ্টায় ছিল তার আর রিশতিনার দুরত্বটা মিটিয়ে দিতে  কিন্তু শিহাব আর রিশতিনার মাঝে যে বোঝাপড়া হয়েছে
তাতো  রোমেলের অজানা ।  রিশতিনা বিনা আপত্তিতেই  চলে গেছে। হ্যাঁ,সে স্বেচ্ছায় এসেছিল কিন্তু নানান পারিপার্শ্বিক কারণে শিহাবের তাকে গ্রহন করা সম্ভব হয়নি। আজ যদি সে  কোন সিদ্ধান্ত নেয় তবে সেটা সে তার নিজ দ্বায়িত্বেই নিবে। এব্যাপারে শিহাব মোটেই উদ্বিগ্ন হলো না। আর হয়েও কোন লাভ হবে না। শায়লার কথা রিশতিনা জেনেছেও। খুব দ্রুতই শিহাব রিশতিনাকে ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দিয়ে শায়লার সাথে বিয়েটা সেরে নিবে। শায়লাকে নিয়ে আজ সে যতদূর এসেছে সেখান থেকে সে আর ফিরে যাবে না। আর এজন্য যা ফেইস করতে হয় নির্বিঘ্নে তা করবে। আর শায়লার  প্রতি তার ভরসাও আছে। সে তাকে কোনদিনই ভুল বুঝবে না।রাহাত আর বুবলী শিহাবের দিকে তাকিয়ে আছে। কি হলো বা ফোনে কি খবর এলো,এই নিয়ে দুজনেই ভীত দৃষ্টিতে শিহাবের দিকে তাকিয়ে। শিহাব নিজের মাঝে ফিরে এলো। সে হঠাৎ  অনুভব করলো শায়লা তার হাত ধরে আছে। শিহাব শায়লার দিকে তাকাতেই শায়লা তার চোখের ভাষায় শিহাবের মনে সাহস সঞ্চার করলো। শিহাব দেখলো, হলুদ শাড়ি আর কাঁচা ফুলের গহনায় শায়লাকে অপূর্ব লাগছে। কাঁচা ফুলের সৌরভের মাদকতায় শিহাব একেবারে বুঁদ হয়ে গেলো। সে শায়লার আরো কাছে ঘেঁষে দাঁড়ালো। শায়লা টের পেলেও নিশ্চুপ রইল।
শিহাব উপরে যাওয়ার জন্য এগুতেই রাহাত আর বুবলীর যেন সকল শংকা কেটে গেলো।
ওরা ফোনের কথা কিছু আর জানতে চাইলো না। শায়লা আর শিহাবকে দুইপাশে দুজন সংগী করে ছাদের দিকে এগিয়ে গেলো। শায়লার চলায় বারবার শিহাবের স্পর্শ শায়লার ভেতরে রক্তের এক উন্মাদনা খেলে গেলো। দুজনে ধীর পায়ে  সিঁড়ি পেরুতে লাগলো। শিহাব বেশ শক্ত করে শায়লার হাত ধরে আছে।এমন অচেনা যায়গায় অচেনা পরিবেশে শুধু শায়লাই ভরসা।
দুজনকে ছাদে নিয়ে স্টেজে বসানো হতেই
শিশু কিশোরদের আনন্দ যেন আর ধরে না। মুরুব্বিরা এমন নায়কের মত জামাইকে দেখে যারপর নাই অত্যাশ্চর্য হয়ে যায়! নিজের মেয়ের বিয়ের জন্য মনে মনে এমন একটা পাত্র পেতেই হবে মনে মনে তা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো। শায়লার মা অসুস্থ বোধ করায় তিনি নিজের ঘরেই রইলেন। তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী  রুহি খালা যত্নের কোন ত্রুটি করছেন না। নিজের ভুলের প্রায়শ্চিত করছেন। একে একে মুরব্বীরা তাদের হলুদ ছুইয়ে দোয়া করে দিলেন। বুবলী আর রাহাত সবাইকে আপ্যায়নে ব্যস্ত হলেন। রাহাত বাবুর্চিদের আজ আর যেতে দেয়নি।এত রাতেও তাদের রান্না প্রস্তুত। এমন মধ্যরাতে এমন একটি আনন্দক্ষণ তাদের জন্য অপেক্ষা  করছে সেটা কেউই জানতো না। সবাই তাই এই আচমকা আনন্দটা একেবারে লুফে নিতে চাইছে। শায়লা আর শিহাবের হলুদ ছুঁইয়ে বুবলী দুজনের মুখে কিছু খাবার তুলে দিলো। শিহাবের মনেই পড়ছে না শেষ কখন সে খাবার খেয়েছে। শায়লারও সারাদিন নানান ঘাত প্রতিঘাতে  একেবারেই খাওয়ার রুচি হারিয়ে ফেলেছিল। বুবলী দেখলো রাহাত স্টেজের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তার অশ্রুসিক্ত চোখ।অবশেষে  সে, আপু আর শিহাব ভাইয়াকে এক করতে পারলো।এতদিন সে ভীষণ অপরাধবোধে ভুগছিল।আজ সব উৎকন্ঠার অবসান হলো।
বেশ অনেক রাত হয়েছে।আনন্দপর্ব আর খানাপিনার পর কেউ আর জেগে  থাকতে চাইছে না। শিশুরাও হুড়োহুড়ি করে বেশ ক্লান্ত। একে একে সবাই নিচে নেমে গেলো। রাহাত এই সুন্দর মূহুর্তের কিছু ছবি তুলে রাখলো।রাহাত দেখলো, ঘি রঙা পাঞ্জাবীতে শিহাবের আরো যেন আভিজাত্য ফুটে উঠেছে। শায়লা আর শিহাবকে  স্টেজ  থেকে নামিয়ে বুবলী তাদের নিচে নিয়ে যেতে চাইলো। 
কিন্তু শিহাব এই খোলা ছাদে শায়লাকে নিয়ে আরো কিছুক্ষন থাকতে চাইলো। তাদের সম্মতি জানাতেই বোনের জন্য রাহাতের কান্না যেন বুক ফেটে বেরিয়ে এলো।  শায়লাও আবেগ আপ্লুত হয়ে ছোট ভাইকে জড়িয়ে ধরলো। রাহাত শুধু একটা কথাই বলছে,আপু,তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও। আজ শায়লা রাহাতের সবকিছু ভুলে স্নেহের পরশে জড়িয়ে নিলো। ভাই বোনের এমন মিলন মূহুর্তে রাহাতকে নিয়ে  শিহাবের মনের সব কষ্ট  অভিমান মুছে গেলো। শিহাব শায়লাকে আর রাহাতকে সান্ত্বনা দিয়ে  ছাড়িয়ে নিয়ে নিজে খুব শক্ত করে শায়লার হাত ধরে নিলো। রাহাত ভেবে নিলো, কাল সকালেই কাজী ডেকে আপু আর শিহাব ভাইয়ার বিয়েটা সেরে নিবে। 
রাহাত আর বুবলী নিচে নেমে  গেলো। সিঁড়িতে বুবলী পিছন থেকে রাহাতের হাত ধরতেই রাহাত বিস্মিত হয়ে চমকে উঠলো!  বুবলীর চোখ জলে ভরা,সে তার হাতের আংটিটা দেখিয়ে রাহাতকে বললো, রাহাত ভাইয়া আমার আঙুলের এই আংটিটা তোমার আমার মাঝে যোজন যোজন ফারাক করে দিলো। রাহাত একেবারেই অপ্রস্তুত হয়ে, কেউ দেখে ফেলবার ভয়ে এক ঝটকায় বুবলীর হাত ছাড়িয়ে দ্রুত তার নিজের ঘরে ঢুকে গেলো। বুবলী সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে একা একা নীরবে চোখের জল ফেললো। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়ে নিচে নেমে এলো।
 ছাদে শিহাব এবার যেন বাধ ভাঙা ভালোবাসায় শায়লাকে জড়িয়ে ধরলো। শায়লাও যেন নিজেকে বিগলিত করে শিহাবের বিশাল বুকে মুখ গুজে দিলো। কাঁচা ফুলের ঘ্রাণ আর নারী দেহের তীব্র টানে বহুদিনের অপ্রাপ্তির চাওয়া যেন সবটা গ্রাস করতে চাইছে। কতটা ক্ষণ এভাবেই রইল। ক্রমশ শিহাবের ভেতর শায়লাকে একান্তে পাওয়ার বাসনা উঁকি দিচ্ছিল। দুজনে এভাবেই মনের যত কষ্ট  হতাশা ছিল সব যেন ধুয়ে মুছে নিলো। শিহাব  বিড়বিড় করে বলে চললো,আজ সারাটা দিন তোমাকে হারানোর আশংকায় প্রতিটা ক্ষণ কি যে এক অস্থিরতায়  কেটেছে।যেন তোমাকে আমি হারিয়ে ফেলেছি এমন দূর্ভাবনা গ্রাস করছিলো। শায়লা এবার মুখ তুলে বললো,না শিহাব,আমি তোমায় রেখে  থেকে কোথাও হারাবো না।আমি আজীবনের জন্য তোমার। 
এভাবেই দুজনে কিছুটা সময় পার করতেই শিহাবের ফোন বেজে উঠলো !  শায়লা  ভীত হয়ে গেলো। আবার কি সেই অনাকাংখিত কল ? শায়লা শিহাবকে এবার খাঁমচে ধরলো। শিহাব পকেট থেকে মোবাইল বের করে  হাতে নিলো। সে স্ক্রিনে  তাকাতেই দেখতে পেল রাহাতের কল।শিহাব দ্রুত রিসিভ করে হ্যালো  বলতেই ওপ্রান্তে নারী কন্ঠ ভেসে এলো। বুবলীর উপদেশ ভেসে এলো। শিহাব ভাইয়া,এতরাতে আপনাদের দুজনের ছাদে থাকা ঠিক হচ্ছে না।আপনাদের গায়ে হলুদ লেগেছে।আপনারা এখন বিয়ের বর কনে। এখন নিজেদের ঘরে চলে আসাই ভালো। শিহাব ভাবলো, মাঝে মাঝে ছোটদের এমন শাসন ভালোই লাগে।
শায়লা  জিজ্ঞাসু চোখের প্রশ্নে শিহাব জানালো, বুবলী আমাদের নিচে নিজেদের রুমে যেতে বলছে।এবার শায়লা লজ্জায় রাঙা  হয়ে গেলো। সিঁড়িতে বুবলীর পায়ের আওয়াজ পাওয়া যেতেই শায়লা শিহাবের থেকে নিজেকে  ছাড়িয়ে নিলো। বুবলী বলে উঠলো, চলো,দুজন নিচে চলো। তোমাদের ঘরে পৌঁছে দিয়ে আমি একটু ঘুমাবো।উফ! সারাদিন দুজনে যা দেখালে না! সিনেমাকেও হার মানায়।বাপরে! এমন কঠিন প্রেম! চলো চলো, আর কোন টেনশন না। চলো,নিচে চলো, আর কতদিন এইভাবে খোলা যায়গায় লুকাছাপা প্রেম করবে ? বলেই বুবলী শায়লাকে একরকম টেনে নিচে নিয়ে  যেতে চাইছে।কিন্তু শায়লার  আড়ষ্টতা যেন কাটছে না। তবে শিহাব একেবারেই যথা আজ্ঞা রুপে দণ্ডায়মান হয়ে রইল যেন, বুবলীর সবকিছু সে একবাক্যে মেনে নিতে রাজী আছে। এবার বুবলীর চোখ গেলো শিহাবের দিকে, সে ঝনঝন করে বলে উঠলো, শিহাব ভাইয়া,আপনাকে দেখে আমার ভীষণ হিংসা হচ্ছে।কেন আপনার সাথে আমার আগে দেখা হলো না।ইস! গ্রেট মিস! কি আর করা! এখন দুলাভাই ডেকে মনকে সান্ত্বনা দিতে হবে। শায়লা লাজুকতায় নুইয়ে যাচ্ছে যেন।
শিহাব  বললো, তাতে কি ? দুঃখ করোনা।তোমরা দুই বোন আমাকে ভাগাভাগি করে নিতে পারো। বুবলী রীতিমতো মাথা চাপড়ে বললো,মাত্থা খারাপ।শায়লা আপু আমাকে মেরেই ফেলবে।না বাবা, যার অধিকার,শুধু সেই থাকুক।আমি এমনিতেই ভালো আছি।
শিহাবের এখন মনটা খুবই ভালো লাগছে।
বুবলী তার হাতের আংটি দেখিয়ে বললো, এই যে একজন বুকিং দিয়ে রেখেছে।আপনি চাইলেও নো ভ্যাকেন্সি,বলেই বুবলী খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো।  বুবলীর দুষ্টুমিটা শিহাব বেশ উপভোগ  করছে। 
এবার শায়লা  একপ্রকার হ্যাচকা টানে দুজনকে নিচে নিয়ে এলো। শায়লার ঘরের সামনে এসে বুবলী শায়লার উদ্দেশ্য বললো,কই শায়লা আপু,তোমার অতিথিকে তুমি নিজেই ঘরে নাও। আমি আর তোমাদের মাঝে থাকতে চাইছি না। বুবলী দরজা খুলে দিতেই শায়লা ঘরে ঢুকলো।  এই ঘরে শায়লা শিহাবকে মনে মনে অনেকদিন কাছে চেয়েছে। আজ তা সত্য হলো।শায়লার কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না স্বপ্ন এভাবে সত্যি হতে পারে!  শায়লা দেখলো তার পুরো খাট কাঁচা ফুল দিয়ে ঢেকে রাখা।যেন একটা ফুলের ঘর বানিয়ে রাখা।এরই মাঝে তবে বুবলী আর রাহাত এই কাজ করিয়েছে।শায়লার অনেক পুরনো অভ্যাস ঘরে ঢুকেই দেয়াল ঘড়িতে চোখ রাখা।সে অবাক হলো,রাত চারটা বাজছে" ভোর হতে আর বেশ্য দেরি নেই। সে  শিহাবকে হাত ধরে ঘরে নিয়ে বিছানায় এনে বসালো। শায়লার আজ নিজের ঘর নিজেরই অচেনা লাগছে। ঘর ভরা বিয়ের কেনাকাটা, শায়লার বিয়ের শাড়ি, নতুন জামাইয়ের জন্য শেরওয়ানী,পাগড়ি,নাগরা, সব পরিপাটি করে গোছানো।  শিহাব এক টানে শায়লাকে কাছে টেনে নিলো। শায়লা দেখলো,বুবলী টেবিলে অনেক খাবার রেখে গেছে। এত্তটুকু মেয়ে কিভাবে যে এত সব গুছিয়ে করছে ! আজ বুবলী না হলে,এত সুন্দর একটা স্বর্গীয় আয়োজন রাহাতের পক্ষে একা কোনদিনই সম্ভব হতো না। ভাবতেই হঠাৎ  দরজায় নক করা শব্দে দুজনে বিছিন্ন হয়ে গেলো। বাইরে থেকে বুবলী বলে উঠলো, এই তোমরাতো ঘরের দরজা লাগাতেই ভুলে গেছো। বলেই তার সেকি খিলখিলিয়ে হাসি! এবার শায়লা  বড় বোনের রূপে এগিয়ে এলো,দুষ্ট কোথাকার! বাইরে দাঁড়িয়ে সব দেখছে! বুবলীর দুষ্টুমি ভরা প্রতি উত্তরে বলে উঠলো, আমার বয়েই গেছে! তোমরা দরজা খোলা রাখছো,আমি তা দেখিয়ে দিলাম,আর আমি পারছি না।এবার গেলাম।এ কথা বলে চলে যেতেই শায়লা এগিয়ে এসে দরজা লাগিয়ে দিলো।  এবার আর শিহাব নিজেকে শান্ত খোকা বাবু করে ধরে রাখলো না। চট করে উঠে  এসে শায়লাকে একটানে বিছানায় নিয়ে এলো। শায়লা আর নিজেকে শাসনে না রেখে শিহাবের কাছে নিজেকে সঁপে দিলো। টেবিল ল্যাম্পের আলো আঁধারিতে এক মোহময় পরিবেশ তৈরি হলো।খাটের চারদিকে গোলাপ বেস্টিত আবরণে  চমৎকার সুঘ্রাণে দুজনে ডুবে রইলো। অনন্তকালের তৃষ্ণার  আজ পিপাসা মিটবে। কাল সকালের এক নতুন ভোরে হবে আগামীর  স্বপ্ন বুনন।পিছনে পড়ে থাকবে দুজনে দুজনাকে  পাওয়া না পাওয়ার সেই দোলাচলে ডুবে থাকার ইতিহাস। আজ  শিহাব তার নিজেরই আরোপিত অলিখিত শর্ত নিজেই ভেঙে চিরদিনের জন্য শায়লাকে আপন করে পেলো।


চলবে...

কবি মোঃ ইসমাঈল এর কবিতা "অন্তিম গন্তব্য"




অন্তিম গন্তব্য
মোঃ ইসমাঈল 

রুহ পাখি উড়ি-উড়ি
একদিন জমাবে ঠিক আকাশ পাড়ি।
এই ধরনী নয়তো কারোর জন্য চিরস্থায়ী ঠিকানা
চিরস্থায়ী থাকার জায়গা হলো কেবল মাটির বিছানা। 

নাহি থাকতে পারবে আর এই ধরনীতে
চলে যেতে হবে ঐ নির্জন ঘর কবরেতে।
নতুন জায়গা নতুন যাত্রা নতুন বিছানা
উপরেতে থাকবে দেওয়া বাশের সামিয়ানা।

থাকবে পরে একা আর নিবে না কেউ খবর
এরই নাম জীবনের অন্তিম গন্তব্য কবর। 
আসবে ফেরেশতা করবে প্রশ্ন যদি হয় নসিব ভালো 
তবে কবর এবং আখিরাত জীবনে জ্বলবে সুখের আলো।

কবি শিবনাথ মণ্ডল এর কবিতা "নারীর নেই বাড়ি"




নারীর নেই বাড়ি

শিবনাথ মণ্ডল


এই জগতে নারী পুরুষ
এখন সমান সমান
খাতা কলমে তাইতো আজ
দিয়েছে তার প্রমান।
বিয়ের আগে মেয়েরা সব
থাকে বাপের বাড়ি
বিয়ের পরে নারীদের ঠাঁই
হয় শ্বশুর বাড়ি।
নারী ছাড়া এই দুনিয়া 
হয় যে অন্ধকার
নারীর কোথায় নিজের বাড়ি 
তাই খুঁজি বার বার।
মেয়েরাতো মা  বোন  স্ত্রী হয়
গৃহের লক্ষীরুপা নারী
এত গুন থাকতেও নারীর
নেউকো নিজের বাড়ি।।

২৩ এপ্রিল ২০২২

মমতা রায় চৌধুরীর ধারাবাহিক উপন্যাস ১৬০





উপন্যাস 


টানাপোড়েন ১৬০
নানা রকম
মমতা রায় চৌধুরী



আজ এতটাই ট্রায়াড ছিল রেখা যে বিছানায় শুতে না শুতেই ঘুমিয়ে পড়ল। মনোজ ড্রইংরুমে বসে খেলা দেখছিল টিভিতে। তারপর যখন ও শোবার ঘরে আসলো দেখল রেখা নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে ভোস ভোস করে। মনোজ আপন মনে বলল আমাকে বলে আমি নাকি নাক ডাকি। আর আজ যে ম্যাডাম নাক ডাকছে তার প্রমান রাখতেই হবে। বলেই ফোনটা নিয়ে ভিডিও করলো।
তারপর রেখাকে ডাকলো 'কি গো এত নাক ডেকে ঘুমোচ্ছ?"
কোনো আওয়াজ  না পেয়ে  রেখাকে ধাক্কা মারলো।" কিগো এত নাক ডাখছ কেন? তুমি  নাকি ঘুমানোর সময় নাক ডাক না?"
রেখা অবাক হয়ে তাকিয়ে ঘুমের ঘোরে বলল "বেশি বাজে ব'কো না তো? আমি নাক ডাকি না তোমার মত।"
মনোজ  খুব জোরে হো হো হো করে হেসে উঠলো কিন্তু তাতেও রেখার কোনো হেলদোল নেই ।তখন ও ঘুমিয়ে যাচ্ছে ,সঙ্গে নাক ডাকছে।
মনোজ বলল "আজকে আর কিছু বলছি না । ঘুমাচ্ছে ঘুমাক।যেদিন আবার তাকে (মনোজকে) বলবে, এই ভিডিওটা দেখাবে। এটাই মনোজের ব্রম্ভাস্ত্র।"
মনোজও সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ল।
রেখা আজকে এতটাই ঘুমিয়েছে যে মাসি আসার আগেই ঘুম ভেঙে গেল। ঘুম থেকে উঠে পরলো। বেশ ঝরঝরে মনে হচ্ছে শরীরটা। চনমনে মন। রেখা সকাল সকাল প্রাতঃক্রিয়া সেরে, ফ্রেশ হয়ে গোপালভোগকে ভোগ চাপিয়ে রান্নাঘরে ঢুকলো।
চায়ের জল গ্যাসের চুলায় বসাতে না বসাতে কলিং বেলের আওয়াজ,"ওম জয় মা লক্ষী মাতা…।"
রেখা তাড়াতাড়ি গিয়ে দরজাটা খুলল"দেখল মাসি নয় মাসির বৌমা এসেছে। কি ব্যাপার তুমি ?মাসি কোথায়?"
কাজের ব্যাপারে মাসির বৌমার চেয়ে মাসি অনেক বেশি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন।
মাসির বৌমা বলল "মায়ের খুব জ্বর কাজে আসতে পারবেনা তাই বলতে আসলাম।"
ওমা তাই বুঝি? কখন থেকে?"
"রাত থেকে।"
"ওষুধ খাওয়াও নি মাসিকে?'

"হ্যাঁ ওষুধের দোকান থেকে বলে নেয়া হয়েছে"।
"ঠিক আছে দেখো। মাসি কেমন থাকে আমাকে খবর দিও।"
"আচ্ছা।"
রেখা দেখল মাসির বৌমার চোখ মুখ শুকিয়ে যায়। সত্যিই তো তাই। গরীবের সংসার নুন আনতে পান্তা ফুরায়। তারমধ্যে স্বামী অকেজো হয়ে পড়ে আছে। শাশুড়িমার রোজগারে সংসার চলছে। বাড়িতে এতগুলো প্রানী।
রেখা মাসির বৌমার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল খানিকক্ষণ। তারপর হঠাৎ মনে হল এই যা কিছু টাকা দিয়ে দিলে হতো? যাক চলে যখন গেছে পরের দিন আসলে ,দিয়ে দেবে'। প্রান্তিক খেটে খাওয়া মানুষগুলোর কথা ভাবতে ভাবতে রেখার মনে হলে অনেক কাজ পড়ে আছে।
না যাই গিয়ে কাজে হাত লাগাই।'
এর মধ্যেই মিলি আর  তার বাচ্চাগুলো এসে রেখার চারপাশে ঘুরঘুর করতে লাগল আর ওদের ভাষায় কিছু বলতে লাগলো। রেখা ওদেরকে ধরে একটু আদর করলো তারপর ভাবলো যা প্রতিদিন মাসিকে বলা হয় বিস্কিট দিতে। আজ তো আর মাসি আসবে না।তাই রেখা  বিস্কুট দিলো।
ভাগ্যিস আজকে তাড়াতাড়ি ঘুম ভেঙেছে নইলে যে কি হতো?'
রান্নাঘরে গিয়ে চটপটএকদিকে মিলিদের জন্য খাবার বসাল ,অন্যদিকে নিজেদের, সিমে দিয়ে বাকি কাজগুলো করতে লাগলো।
কাজ শেষে একবার   ঘরে গিয়ে মনোজকে ডাকলো"কিগো আজকে কি ঘুম ভাঙবে না কি ?
মনোজ ঘুমের জড়তা নিয়ে বলল" হ্যাঁ ,উঠব না কেন?"
" উঠছো না কেনো তাহলে ? ওঠো,।
আমার কিন্তু অত সময় নেই ডাকার। চা রেখে গেলাম খেয়ে নিও।"
আজ আবার মাসি আসবে না।'
 মনোজের কানে কথাটা যেতে লাফিয়ে উঠল" হ্যাঁ
সে কি কথা?কি  হয়েছে?'
"মাসীর শরীর খারাপ। জ্বর এসেছে।'
তুমি যদি তাড়াতাড়ি না উঠ, আমি খাবার দাবার গুছিয়ে দিতে পারব না ।আমার নিজের স্কুল আছে।"
"অ্যাই না ,না আমি উঠে পড়ছি।"
"ঠিক আছে। তাড়াতাড়ি করো।'
এরমধ্যে আবার কলিং বেলের আওয়াজ "ওম জয় মা লক্ষী মাতা…।"
রেখা বলল "দরজাটা খোলো"।
মনোজ সিগারেট ধরিয়ে ছুটল বাথরুমের দিকে।
রেখা বুঝল নির্ঘাত বড় বাথরুম পেয়েছে।
অগত্যা রেখাতেই দরজা খুলতে হলো?
দরজা খুলে রেখা তো অবাক 'একি পার্থ এ সময়? 
এই জানো তো আমার লজ্জার শেষ নেই। সেদিন থেকে তোমার ইলিশ মাছের দাম আর পাটশাকের দাম দেয়া হয়নি।"
পার্থ বলল "সে সব পরে হবে ।আগে বলো তো দাদা কোথায়'?"
"ও তো  বাথরুমে ঢুকলো।"
"ও ও ও"
"কেন কিছু হয়েছে
ভেতরে এসে বসো।'
'হ্যাঁ হয়েছে ,মানে দাদাকে বলা হয়েছিল না ,সেই ডাক্তারের ঠিকানা টা দেওয়ার জন্য।"
বৌদি তো এখন ভেঙে পড়ছে আস্তে আস্তে।'
'কেন ভেঙে পড়ার কি আছে সব ঠিক হয়ে যাবে। 'ভয় পেয়েছে হয়তো কোন কারনে। বাচ্চা তো?
"সব আমরা বুঝতে পারছি বৌদি । কিন্তুযে বাচ্চা এত কথা বলে, এখন আস্তে আস্তে কথা বলছে না।"
"ওমা সেকি গো ?"
"হ্যাঁ,তবে আর বলছি কি?"
এমনিতেই সারা বাড়ি ও মাথায় করে রাখে দেখেছো তো ?আমাদেরকে কাকু কাকু বলে অস্থির করে রাখত আর সেই বাচ্চা যদি এখন কথা না বলে ,কেমন খারাপ লাগে বলো?'
"হ্যাঁ ,সে তো একটা চিন্তার ব্যাপারই বটে।"
"দাদা ,বৌদি তো দুজনারি প্রায় মাথা খারাপের মত অবস্থা।"
'তো ,হবেই না? মা বাবা তো?'
রেখা বললো "একটু ওয়েট করো ।আমি ওকে তাড়া দিই। বলি পার্থ এসেছে ।তবে তাড়াতাড়ি বের হবে।"
পার্থ একটু  ম্লান হাসলো।
রেখে আস্তে আস্তে বাথরুমের দিকে এগোলো তারপর বাথরুমের দরজায় কড়া নেড়ে বলল" কি গো একটু তাড়াতাড়ি করো?'
মনোজ ভেতর থেকে জলের কল টা খুলেছে , তার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। তারই মধ্যে বলল কেন আমাকে বাথরুমে ঢুকতে দেখলেই তাড়া দাও কেন?"
"দিচ্ছে কি আর সাধে পার্থ এসেছে চিৎকার করে বলল।"
"কে এসেছে.এ.এ ."মনোজ ভেতর থেকে বলল।
*"পার্থ।"
"ও আচ্ছা, বেরোচ্ছি।”
মনোজ ভেজা টাওয়ালটা জড়িয়ে এসে বলল " কি হয়েছে পার্থ ?"
আরে দাদা ওই ডাক্তারের ফোন নম্বর টা।
"এ বাবা ,আমার তো ফোন করা হয়নি।'
'ঠিক আছে, তুমি বসো ,আমি এক্ষুনি ফোন করছি।"
মনোজ সুরঞ্জনকে ফোন করল। রিং হয়ে গেল ধরল না আবার ফোন করল। এবার রিং হতেই অপরপ্রান্ত থেকে বলল ''হ্যালো"
"এই আমি মনোজ বলছি'।
"হ্যাঁ বল কেমন আছিস সবাই?"
"ভালো আছি ।তোরা!?'
"হ্যাঁ ভালোই আছি।"
"বলছি তোর একটা হেল্প লাগবে?"
"কি বল না?'
বলছি একটা বাচ্চার কাউন্সেলিং করাবে । ভালো ডাক্তারের নাম বলতো আর তার ফোন নম্বর ঠিকানা।"
 ডক্টর রাধাকান্ত দেব। কন্টাক্ট নম্বর########২৩৬৪
"অসংখ্য ধন্যবাদ রে।'
"বাবা, এর জন্য ধন্যবাদ   কবে থেকে এত ফরমালিটি শিখেছিস?'
মনোজ হো , হো,হো করে হেসে উঠলো।
"না রে খুব উপকার হলো"।
"কার জন্য দরকার?'
আরে না ,না আমাদের পাশের বাড়ির পার্থর ভাইপোর জন্য.
"ও ঠিক আছে ।সবাই ভালো 
থাকিস ।ছাড়ছি রে?"
"হ্যাঁ, হ্যাঁ রাখ।"
পার্থকে ফোন নম্বরটা দিয়ে দিল আর বলল' যোগাযোগ করে নিতে তাড়াতাড়ি।'
পার্থ মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
ইতিমধ্যে রেখা পার্থর সামনে এক কাপ চা বিস্কিট এনে হাজির করল।
পার্থ এসে বলল 'বৌদি আবার চায়না হাজির করলেন।'
রেখা বলল "তা বললে তো হবে না ।তুমি প্রতিদিনই এড়িয়ে চলে যাচ্ছ।"
"আচ্ছা, দিন।'
মনোজ ঘর থেকে ড্রেস পরতে পরতে বলল' রেখা ,আমার ব্রেকফাস্ট রেডি করো।'
"রেডি করা আছে ।
তাড়াতাড়ি এসো।"
পার্থ বলল'বৌদি আসছি আমি  ।অন্য সময় হলে আরেকটু থাকতাম।'
"ঠিক আছে এসো ভাই আর কি বলব। যাও তাড়াতাড়ি গিয়ে কন্টাক নম্বরে যোগাযোগ করো।'
'বৌদি দরজাটা লাগিয়ে দিন।'
"ঠিক আছে যাচ্ছি।'
"তোমার হল?"রেখা দরজা বন্ধ করতে যেতে গিয়ে তাড়া দিল 
'আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারা….।'
ড্রেস পরছে আর মনোজ গান করছে।
'ঠিক আছে ,তোমার গান করা শেষ হলে এসে খেয়ে নিও আমি গিয়ে তৈরি হচ্ছি।'
মানুষ তাড়াতাড়ি রুম থেকে বেরিয়ে টাই বাঁধতে বাঁধতে এসে বলল' এই না,না, না, খাবার দিয়ে যাও।'
"তুমি দেখছো যে আমি নানা রকম কাজে ব্যস্ত থাকি এতকিছু করার পর এবার নিজেকে তো তৈরি হতে হবে বল ,এত বায়না করলে তো হয় না?'"
'আরে বাবা রাগ করছ কেন? তোমার নিজের হাতে যত্ন করে বেড়ে দেওয়া  খাবার না খেলে আমার পেট ভরে না জান না ?"

শামীমা আহমেদ এর ধারাবাহিক উপন্যাস ৯৭




ধারাবাহিক উপন্যাস 


শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত (পর্ব ৯৭)
শামীমা আহমেদ 



শায়লার বিয়ের উদ্দেশ্যে বিয়ে বাড়িতে আগত আত্মীয়স্বজনেরা ভীষণ  একটা ভ্যাবাচ্যাকা পরিস্থিতিতে পড়ে গেলো। এত রাতে এমন একটা খবরে তারা বুঝে উঠতে পারছে না কি ঘটতে যাচ্ছে! তারা বুঝতে পারছে না আজ দুপুরে কানাডা থেকে নতুন জামাই আসবে না জানালো কিন্তু  আবার কিভাবে সে এতো রাতে চলে এলো! তবে কি আগের খবরটা ভুল ছিল? নাকি ফ্লাইটের কোন ঝামেলা হয়েছিল। মুরুব্বিরা নানান প্রশ্নে বুবলীকে জর্জরিত করতে লাগল। বুবলী ভাবলো এইসকল প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে এখন তার রাত কাবার হয়ে যাবে। এর মাঝে যে কত ক্লাইমেক্স আর টানাপোড়েন গিয়েছে তা শুধু বুবলীই জানে। তবে এখন সে নিজের করণীয় কাজে মনযোগী হলো।  সে একটা দ্বিধার মধ্যে পড়ে গেলো। এখন সে কোনদিকে যাবে ? এদিকে শায়লা আপু শিহাব ভাইয়ার জন্য  নিজেকে আলুথালু বেশে ভাবলেশহীন হয়ে একেবারে আশাহীন হয়ে গিয়েছিল। এখন তার মনে আবার আশার আলো জাগাতে হবে। তাকে নতুন করে বাঁচবার পথে আগ্রহী করে তুলতে হবে।
তাকে হলুদের সাজে সাজাতে হবে। আবার ওদিকে নিচে শিহাব ভাইয়া দাঁড়িয়ে আছেন।এইমাত্র রাহাত তাকে নিয়ে আসতে নেমে গেলো। উপরের চেঁচামেচিতে সে শিহাবকে নিচে রেখেই চলে এসেছিল। বাচ্চাদের পাওনা আদায়ের পর সবাই আনন্দে হৈচৈ করে উপরে উঠে এসেছে। বুবলী শায়লাকে আর একা না রেখে তার মায়ের ঘরে বসিয়ে রেখে গেলো।  শিহাবকে রিসিভ করতে  ঘরের ফুলদানি থেকে একগোছা রজনীগন্ধা নিয়ে দ্রুত  সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতেই সে দেখতে পেলো শিহাব মেইন গেট পেরিয়ে বাসায় ঢুকেছে। রাহাত শিহাবের বাইকটি বাসার গ্যারাজে রাখছে। বুবলী  সামনাসামনি শিহাবকে দেখে কিছুটাক্ষন থমকে দাঁড়িয়ে রইল। এমন একজন হ্যান্ডসাম মানুষ তার সামনে দাঁড়িয়ে!  বুবলী  তার চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না।জাস্ট সিম্পলি শার্ট প্যান্ট পরা তবুও যেন মনে হচ্ছে একজন স্মার্ট হিরো! শিহাব এগিয়ে আসতেই বুবলী নিজেকে সামলে নিয়ে হাতের একগোছা রজনীগন্ধা শিহাবের হাতে তুলে দিলো। শিহাব ফুলের গোছা গ্রহণ করে
বুবলীকে ধন্যবাদ জানালো। বুবলী যেন কন্ঠস্বর শুনে আরো ফিদা হয়ে গেলো।তার মনে শায়লা আপুকে একটু একটু হিংসা হতে লাগল। সে ভাবতে লাগলো, ইস! কী দারুণ একজন হাজবেন্ড পেতে যাচ্ছে শায়লা আপু! সাথে সাথে বুবলীর নোমান সাহেবের কথা মনে হলো।তার মনে বেশ রাগ হতে লাগলো রাহাতের জন্য।কেন অমন একজন বয়সী মানুষের সাথে শায়লা আপুকে বিয়ে দেয়া হয়েছিল ! যাক, এবার তো সব ঝামেলা মিটেছে। বুবলী শিহাবকে উপরে যাওয়ার জন্য বললো। শিহাব চোখে সম্মতি জানালো। রাহাত বুবলীকে,আমার কাজিন, বলে  শিহাবের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো।  এবার সামনে বুবলী  আর পিছনে রাহাত যেন গার্ড অফ অনার দিয়ে শিহাবকে উপরে নিয়ে যাচ্ছে।দোতলায় উঠতেই দরজার সামনে অতিথিদের ভীড়। নতুন জামাইকে এক নজর দেখার জন্য চাচী খালা মামীরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।  তাদের চোখে মুখে বিস্ময়!  অনেকেরই কোথায় যেন একটা খটকা লাগছে। আগে তারা কানাডার জামাইকে যেমন দেখেছে এবার যেন তার চেয়ে বয়স অনেক কমে গেছে ? তাদের  বিস্মিত চোখ ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইছে যেন! দিন দিন মানুষের বয়স কি বাড়ে না কমে ? এ আবার অন্য কেউ আসেনিতো ? অতিথিদের এমন আচরণে, এমন ঘোলাটে  পরিস্থিতিতে শিহাব ভীষণ লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করেই উপরে উঠে এলো। বুবলী সবাইকে আশ্বস্ত করতে লাগলো,এটাই শায়লা আপুর আসল হাজবেন্ড। তার নাম মিস্টার শিহাব। রাস্তায় জ্যামের কারণে, আমাদের বাসায় পৌঁছুতে একটু রাত হয়ে গেছে। বলেই বুবলী চট করে শিহাবের হাত ধরে অতিদ্রুত অতিথিদের কবল থেকে রক্ষা করতে শিহাবকে এক টানে ড্রইংরুমে নিয়ে বসালো।রাহাত তাকে অনুসরণ করে ভেতরে গিয়ে শিহাবের পাশে বসলো।বুবলীর কথায় স্বজনেরা খুব একটা সহজ হলো না। তাদের মনে চোখে মুখে একটা কিন্তু রয়েই গেলো। 
বুবলী সবাইকে জানালো, একটু পরে শায়লা আপু আর শিহাব ভাইয়ার গায়ে হলুদ হবে। সবাই তৈরি হয়ে নাও।শায়লা আপুর হলুদের জন্য যে যেমন পোশাক এনেছিলে পরে নাও আর ছাদে গিয়ে  তোমাদের গান নাচ প্র‍্যাকটিস করে নাও আর মুরুব্বিরা আপনারাও তৈরি হয়ে নেন।আপুকে হলুদ ছোঁয়াতে হবে। এ কথায় সবার মাঝে আনন্দের ঢেউ বয়ে গেলো! ভীষণ এক চটপটে মেয়ে বুবলী। যেমন তার বুদ্ধিমত্তা তেমনি সে করিৎকর্মা!  এক সাথে সবদিক সামাল দেয়ার অনন্য এক দক্ষতা তার। একই সাথে সে সবদিক ম্যানেজ করে চলছে। এবার এক দৌড়ে সে কিচেনে ঢুকে গেলো।চট করে দুই কাপ চা বানিয়ে ট্রে সাজিয়ে  নিয়ে ড্রইংরুমে নিয়ে  এলো। রাহাত তখনো শিহাব ভাইয়ার হাত ধরে বসে আছে।যেন নীরবে এখনো সে শিহাবের কাছে ক্ষমা চাইছে। শিহাব লজ্জাবনত হয়ে মাথা নিচু করেই বসে আছে। বুবলী দুজনকে সহজ করতে চায়ের ট্রে নিয়ে হাজির হলো।দুজনার হাতে চায়ের কাপ এগিয়ে দিতে চাইলে শিহাব আগে পানি খেতে চাইলো। বুবলী ফিক করে হেসে দিলো ! কি ? টেনশনে কি গলা শুকিয়ে গেছে ? গলা ভিজিয়ে নিতে হবে ? বুবলীর দুষ্টুমিতে শিহাবের মুখে লজ্জায় লাল আভা ফুটে উঠছে! বুবলী  শিহাবকে আর ঘাটালো না।তাকে পানির গ্লাস এগিয়ে দিতেই শিহাব প্রায় এক নিঃশ্বাসে গ্লাসের পানিটা শেষ করলো।সবকিছু দেখে রাহাত ভাবলো, আহা,বেচারা,আপুকে পাওয়ার জন্য কতইনা ঝামেলা পোহালো। সে শিহাবকে চায়ের কাপ এগিয়ে দিলো। তবে শিহাবের টেনশন দূর করতে  এখন একটা বেনসন স্টিকের অভাব ফিল করছে। একটা দুটো টান দিলে মাথাটা হালকা হতো।কিন্তু এ অবস্থায়  তা একেবারেই সম্ভব না।খুবই অনিচ্ছায় সে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে চায়ের কাপে ঠোঁট ছোঁয়ালো।  বুবলী ইতিমধ্যে শায়লার কাছে গিয়ে হাজির ! সেখানে এক নদী ভাবাবেগে যেন কান্নার সাগর বইছে।শায়লার মা,মানে বুবলীর ফুপু মেয়ের এই অকস্মাৎ জীবনের মোড় ঘুরে যাওয়াতে অতি উচ্ছ্বাসে হত বিহ্বল হয়ে পড়েছেন।বিয়ে নিয়ে মেয়ের জীবনের উত্থান পতনে তিনি যেন আর কোন সমাধান খুঁজে পাচ্ছিলেন না। কেবলমাত্র সৃষ্টিকর্তার কাছেই তিনি এই বিপদ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজেছিলেন।বিধাতাও সদয় হয়ে যেন তার কথা শুনেছেন।তাইতো আজ শিহাবের মত এমন  রাজপুত্রের মত ছেলে তার মেয়ের জীবনসঙ্গী হবে। শায়লাও যেন তার আবেগ ধরে রাখতে পারছে না।একদিকে শিহাবের আগমনে সে আনন্দে দিশাহারা অন্যদিকে আবার শিহাবকে হারানোর ভয় ! বুবলী নানান কথায় মা মেয়ের এই যুগলবন্দী কান্না থামালো। বুবলী বললো, আপু,শিহাব ভাইয়া তোমাকে নিয়ে যাবার জন্য এসেছেন।ঐতো,ড্রইংরুমে বসে আছেন।তোমাকে এখুনি হলুদের সাজে তৈরি হতে হবে। বুবলীর এঘর ওঘর দৌড়াদৌড়ি বেড়ে গেলো। মায়ের ঘরের দরজা লাগিয়ে
সে খুব দ্রুতই  শায়লাকে ফুলের গহনা আর শাড়ি পরিয়ে দিলো। শায়লা একেবারে  নিশ্চুপ হয়ে রইল।তার ভেতরে অপার এক আনন্দ কিন্তু সারাদিনের উৎকন্ঠার মিশেলে কেমন যেন মিশ্র অনুভব ! শায়লাকে ফুলের গহনা আর হলুদ শাড়িতে যেন অপরূপা লাগছিল।
আজ সকালের পার্লারের সেই ফ্রেশনেশটাতে শায়লার  সৌন্দর্য যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। শায়লার মা অবিরল ধারায় কেঁদেই যাচ্ছেন। এযে আনন্দাশ্রু তা বুঝতে বুবলীর আর বাকী রইল না। এবার বুবলী ছুটলো ড্রইংরুমের দিকে। শিহাব ভাইয়াকেও  একটু তৈরি করতে হবে। কিন্তু এখন কেমন করে তা সম্ভব।তার জন্যতো কিছুই কেনাকাটা হয়নি। শিহাবের দিকে চোখ পড়তেই বুবলী যারপরনাই মুগ্ধতায় ডুবে গেলো! সেতো খেয়ালই করেনি সিম্পল একটা নেভিব্লু চেক শার্টে এত রাতেও শিহাব যেন সাদা খইয়ের মত ফুটে আছে! এই রুমে আসার উদ্দেশ্যই সে ভুলে গিয়েছে যেন! রাহাত যেন তাকে চেতনায় আনলো, কি হলো বুবলী ? আপুকে রেডী করেছো ? তাহলে চলো ছাদে হলুদের স্টেজে আপুকে নিয়ে যাও আমি শিহাব ভাইয়াকে নিয়ে আসছি। বুবলী যেন চেতনায় এলো! সে বলে উঠলো কিন্তু শিহাব ভাইয়াকেতো নতুন কিছু পরাতে হবে। রাহাত বুঝতে পারছে না কি করবে। বুবলী দুরদর্শিতার কাছে রাহাত যেন বারবার পরাজিত হচ্ছে।বুবলী রাহাতকে টেনে শায়লার ঘরে নিয়ে এলো। বিয়ের এত্ত এত্ত শপিংগুলো কি এমনিই থাকবে ? এক্ষুনি এখান থেকে সিল্কের ঘি রঙা পাঞ্জাবীটা শিহাব ভাইয়াকে পরিয়ে দাও আর হলুদের সবকিছু ছাদে পাঠিয়ে দাও।রাহাত ছোঁ মেরে পাঞ্জাবিটা নিয়ে গেলো আর শিহাবকে তা পরার জন্য অনুরোধ করতেই শিহাব তা পরে নিলো। শিহাব ভাবলো, এমনিতেই এই পরিবারটি আজ সারাদিন নানান দুশ্চিন্তার মাঝ দিয়ে গেছে। যার জন্য সেও অনেকটা দায়ী। এখন যদি তার সবকিছুতে একটু সম্মতি আর সহযোগিতা  ওদের আনন্দ দেয় শিহাব তা সানন্দেই গ্রহন করবে। রাহাত  ড্রইংরুম থেকে বেরিয়ে এলো।শিহাব পাঞ্জাবিটা পরে নিলো।
তাকে ভীষণ অবাক করে দিয়ে পাঞ্জাবিটা চমৎকারভাবে তার গায়ে ফিট হয়ে গেলো! রাহাত ভেতরে ঢুকেই আশ্চর্য হয়ে গেলো। পাঞ্জাবিটা সে নিজে কিনেছে কিন্তু তখন ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি এটা শিহাবের জন্যই যেন বানানো হয়েছে! আর ঘি রংএ শিহাব ভাইয়াকেতো খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছে না। বুবলী  ওদের দরজায় নক করে জানান দিলো যে আমরা তৈরি, তোমরা তৈরি তো ? এত রাতেও শিশুদের চোখে মুখে আনন্দের ঝিলিক বয়ে যাচ্ছে।সবাই যার যার মত তৈরি  হয়ে নিয়েছে। মুরুব্বিরাও কম যায় না! তাদের সাজগোযে সবারই বয়স অর্ধেক কমে গেছে ! আর এই পরিবর্তিত রূপে কেউ যেন কাউকে চিনতে পারছে না। সবাই সবাইকে দেখে অবাক  হচ্ছে আর সারা বাড়িতে হাসির বন্যা বয়ে যাচ্ছে। কিশোরী মেয়েদের মেকাপ বক্সের আজ অর্ধেকটাই যেন খালি হয়ে গেছে। কিশোর ছেলেগুলো ওদের পিছনে লেগেই আছে। নানান টিপ্পনীতে ওদের অতীষ্ঠ করে তুলছে। কিছুতেই ওদের পিছু ছাড়ছে না। এই মাঝ রাতে সারা বাড়িতে বিয়েবাড়ির আমেজ ফুটে উঠেছে ! সারাদিনের প্রচন্ড খরার পরে যেন মধ্যরাতে মুষলধারায় বৃষ্টি নেমেছে আর সেই প্লাবনে সারা বাড়িতে আনন্দের জোয়ার  বয়ে যাচ্ছে ! হতাশাগ্রস্ত অতিথিরা যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে।সবাই ব্যতিব্যস্ত হয়ে ছাদের দিকে চলছে। বুবলী এবার শায়লাকে তার মায়ের ঘরের দরজায় আনতেই রাহাত শিহাবকে ড্রইংরুমের দরজায় এনে দাঁড় করালো। মূহুর্তেই খুবই আশ্চর্যজনক ব্যাপার  ঘটে গেলো।  দুজনেই মুখোমুখি ঘরের, মুখোমুখি দরজায় দাঁড়িয়ে। যা এক অবিশ্বাস্য ঘটনা ! দুজনেই দুজনকে দেখে চমকে গেলো ! দুজনার চোখে রাজ্যের ভালোলাগা,ভালোবাসা, অভিমান প্রশ্ন জিজ্ঞাস্য অবশেষে এতটা কাছে আসার আনন্দে যেন বাকহীন হয়ে পড়েছে। রাহাত আর বুবলী  দুজনে যেন এই চার চোখের মহামিলনের সাক্ষী হয়ে রইল।শিহাব শায়লার  হলুদ শাড়িতে আর ফুলের সাজে দেখে মুগ্ধতায় আছন্ন হয়ে গেলো। সে থমকে দাঁড়িয়ে রইল। শায়লা ও অবাক দৃষ্টিতে শিহাবকে দেখছে। সে আজ পর্যন্ত শিহাবকে পাঞ্জাবিতে দেখেনি।ঘি রঙা পাঞ্জাবিতে শিহাবকে খুঁজে  পাওয়াই ভার! কেমন করে এমন হলো ? শায়লার চোখে বিস্ময় মিশ্রিত প্রশ্ন ! কেমন করে এই পোশাক তারই হলো ! রাহাত আর বুবলী  অপলক দৃষ্টিতে দুজনের দিকে তাকিয়ে রইল। হঠাৎই  সেই গেট ধরার দলনেতা কিশোরীটির আগমনে ওদের ধ্যান ভাঙলো।  
কি হলো তোমরা কখন উপরে আসবে ? আমরা তোমাদের নাচ গান দেখাবো।বলেই মেয়েটি শিহাবের হাত ধরে টানতে লাগলো। এবার রাহাত আর বুবলী  ওদের নিয়ে গুটি গুটি পায়ে ছাদের সিঁড়ির দিকে আগালো। শায়লা  আর শিহাব এখন এক সুতা পরিমাণের ব্যবধানে দাঁড়িয়ে। দুজন যেন দুজনার স্পর্শ  পাচ্ছে,দুজন যেন দুজনার ঘ্রাণ শুষে  নিচ্ছে। শিহাবের  সংস্পর্শে শায়লার ভেতরে যেন গরম জলের নহর বয়ে গেলো আর শিহাবের ভেতরে যেন ভুমিধ্বসে বিরাট এক গহবর তৈরি হলো! দুজনের মনে একই ভাবনা, আজ থেকেই কি তবে আমরা দুজন দুজনে খুব নিবিড় করে পাবো!এতদিনের কষ্টের কি আজ অবসান হবে? পিছনে রাহাত আর বুবলী দাঁড়িয়ে। ওদেরও ইচ্ছে করছে ঠিক এই সময়টা অনন্তকাল ধরে চলুক।দুজনার ভেতরের নির্বাক কথা চলুক আজীবন। অথচ পরক্ষণেই এই নীরবতা কে খানখান করে ভেঙে দিয়ে  শিহাবের মোবাইল বেজে উঠলো ! এত রাতে কার ফোন ? শিহাবের মন অজানা আশংকায় কেঁপে উঠলো! আরাফ বা মায়ের কিছু হয়নি তো ! সে  মোবাইলে তাকাতেই দেখতে পেলো,  বন্ধু  রোমেলের কল! এত রাতে রোমেল। কেন কল করলো ? শিহাব কল রিসিভ করতেই,রোমেলের উত্তেজিত  কন্ঠস্বর! শিহাব, আমার কাজিন, তোমার সন্তানের মা  রিশতিনা একটু আগে  লন্ডনে  ওর বাসায় অনেক ঘুমের ওষুধ খেয়ে সুইসাইড  করেছে। তোমার প্রতি অভিমানে সে এই কাজ করেছে। যদি ওর কিছু একটা হয়ে যায় তবে এর জন্য তুমিই দায়ী থাকবে। আমি তোমাকে  ছাড়বো না।পুলিশকে  সব জানাবো। বলেই শিহাবের কোন উত্তর না শুনেই সে খট করে কলটা কেটে দিলো। ওপ্রান্তে কি খবর এলো! রাহাত আর  বুবলী যেন থমকে গেলো। শিহাব স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে  রইল। শায়লা শিহাবের মুখের অভিব্যক্তি দেখে তার কাছে খুব ঘনিষ্ঠ  হয়ে শক্ত করে তার হাতটা  ধরে চোখের ভাষায়  কিছু একটা সান্ত্বনা দিতে চাইলো।


চলবে....

Kjh

LOVE

কবি শরিফুর রহমান এর কবিতা "জীবন - তরী"





জীবন-তরী 
শরিফুর রহমান


এ জীবন-তরী কত করেছে আপন
ভালোবাসা কত প্রেম উছল-যৌবন, 
একে একে শুষে নিলো উতল-মৌবন
বেলা শেষে ধোঁয়াশায় বিরহ যাপন।

নিয়তির ছেঁড়া পালে নাবিক আশায়
জীবনের তরীখানি সাগরে ভাসায়,
বিষাদের বায়ু তেড়ে অকুলে শাসায় 
তবু দূরে আশা-দ্বীপ তরীকে হাসায়।

বড় বড় ঢেউগুলো ভেঙে পরে বুকে
শত ঘায়ে তরী তবু ঢেউ দেয় রুখে,
ধীরে ধীরে পঁচে কাঠ; ফুটো গলে ঢুকে
জলে ভরে তরী; তবু চলে হাসি মুখে।

গোধূলির পানে সাঁঝ দু-হাত বাড়ায়,
তরীখানি ভেসে ভেসে অকূলে হারায়।