০৫ মার্চ ২০২২

মমতা রায় চৌধুরীর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১২৩




উপন্যাস 

টানাপোড়েন১২৩
অন্য খামের চিঠি
মমতা রায় চৌধুরী



সারাটা দিন পানকৌড়ির মত টুক করে ডুব দিয়েছিল স্বপ্নীলের মনে। বাড়িতে এসেই সেই ঘোর কাটল।অটো করে  নামতেই বাড়ির সামনে 
টাটা সুমো গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে একটু অবাক হল ' কে এসেছেন বাড়িতে?
সেরকম কেউ হলে তো মনোজ  তাকে ফোন করে জানাত অন্তত।'
বাড়ির সামনে  গেটের কাছে একটু দাঁড়াল কলিংবেলটা বাজাবে ।ভাবতে ভাবতে আর একবার চিন্তা করে নিল' মনোজ কি জানতো?'
'কাকে জিজ্ঞেস করবে?'
'না না কাউকে জিজ্ঞেস করাটা ঠিক হবে না তাহলে ভাববে বাড়ির খবর জানে না  এ নিয়ে অনেকে নিজেরা হাসাহাসি করবে।'৯
তার থেকে নিজের থেকেই ঘরের ভেতরে ঢুকে দেখাই ভাল। সেরকম কেউ হলে তো মনোজ অন্তত জানাতো। মনের দোলাচলতা নিয়ে রেখা গিয়ে কলিং বেল বাজাল। বেশ কয়েকবার বেজে গেলেও কেউ দরজা খুললো না।
রেখা ভাবছে 'সবাই কি এতই ব্যস্ত? নাকি বাড়িতে কিছু হয়েছে?'
তখন আপন মনেই কলাপসিবল গেট টা গিয়ে দেখল না গেটে তালা লাগানো নেই ।নিজে গিয়ে দুই হাত দিয়ে টান দিল। ভেতরের দরজা  ছিল দরজাটায় গিয়ে নক করল। দরজা খুলে গেল 'ব্যাপারটা কি?'
 আশ্চর্য হয়ে  রে খা  ঘরে ঢুকে দেখল  আলো জ্বলছে ,কথার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে ।কারা এসেছে? সন্ধিগ্ধ চিত্তে কাকিমা কাকুরা এসেছে?' 
মনের ভেতরে একটা আলাদা উৎসাহ, উদ্দীপনা যেন কাজ করছে। যাক তাহলে তো ভালোই
 হলো ।হয়তো আমাকে সারপ্রাইজ দেবে ,সে জন্য ভাবতে ভাবতে নিজের ঘরের দিকে গেল।
ও বাবা ঘরে গিয়ে উঁকি মারতেই যেন ভূত দেখার মত দেখল । তাছাড়া কারেন্ট লাগলে যেমন শক খেয়ে যায় ,ঠিক এক ঝটকায় নিজেকে যেন সামলানোর চেষ্টা করল।বুকের ভেতরে যেন হঠাৎ করেই একটা ধুকপুকানি শুরু হয়ে গেল।' কাকে দেখছে?'ও বাবা ননদও  আছে?
শাশুড়ি মা ,ননদ ফুল ফ্যামিলি নিয়ে এসে উপস্থিত।'
রেখা এ কতগুলো মনের ভেতরে রাখল প্রকাশ করলে কি আর রক্ষে আছে?
রেখা তখন ব্যাগটা নামিয়ে শাশুড়ি মাকে প্রণাম করতে গেল।
শাশুড়ি মা দূর থেকেই বললেন 'থাক বাবা আর প্রণাম করতে হবে না। এমনিতে তো একটা খোঁজখবরও নাও না। এখন আর আদিখ্যেতা দেখাতে হবে না।'
রেখা কোন কথা বলল না। চুপচাপ থাকলো তারপর ননদকে প্রণাম করতে গেল ননদ পা  সরিয়ে নিল ।প্র নাম নেব তুমি ভাবলে কি
 করে ?তোমার জন্যই আজকে এই অবস্থা।
আমার মাকে অন্য জায়গায় থাকতে হয় ।তোমার লজ্জা করে না।."
রেখা খুব মনের ভেতর কষ্ট পেল কিন্তু কিছু বললো না ।তখন রেখা বেরিয়ে আসছে। মা কিন্তু এই ঘরেই থাকবে ,কথাটা মাথায় রেখো।
রেখা কিছু বললো না। সোজা চলে আসলো আর মনে মনে ভাবল যে ঘরে মনের মত করে সাজিয়েছে সেই ঘরে আজ তার অস্তিত্ব নেই আর যে কি দেখতে হবে কে জানে থাক যদি ওই ঘরেই তিনি ভাল থাকেন তাই থাকুন।
রেখা কোন কথা না বলে মনের কষ্টটাকে চেপে রেখে মিলিদllll ওদেরকে আদর করে কয়েকটা বিস্কিট রেখা এবার গেল ওয়াশরুমে ফ্রেস হতে।
বাথরুমের জলের কল চালিয়ে দিয়ে রেখা অনেকক্ষণ ধরে স্নান করল মাথাটা যেন কেমন অদ্ভুত ভাবে গরম হয়ে গেছে। কেন গরম হলো প্রেসার বাড়ে নি তো ? এসব কথা মনের ভেতরে তোলপাড় করছে। সেজন্য ভাবতে-ভাবতে রেখা ফ্রেস হয়ে বেড়িয়ে এলো কিন্তু তার তো সমস্ত জামাকাপড় তার ওয়ারড্রব এর মধ্যে
 রয়েছে । বাইরে কিছুটা আছে । তার থেকে একটা পড়ে নেবে মনে মনে ভাবল।
রেখা বসার ঘরে এসে  ড্রেস চেঞ্জ করে ঠাকুর ঘরের দিকে গেল। ঠাকুর ঘরের দিকে যাবার সময় শাশুড়ি মা বললেন'
' আর তোমাকে ঠাকুর ঘরে ঢুকতে হবে
 না ।আজকের দিনটা করে নাও। কাল থেকে আমি ঠাকুরঘরের দায়িত্ব নেব।'
রেখা এখনো কিছু বলল না। শুধু ধৈর্যের পরীক্ষা দিচ্ছে ।ধৈর্য কতটা থাকবে। ধৈর্যের বাঁধ একদিন ভাঙবে। চলন্ত নদীর স্রোতকে যদি বাঁধ দিয়ে তার গতিবেগকে রুদ্ধ করা হয় , বাঁধকে ইট-সিমেন্টের সুরকি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়, তার স্বাভাবিক গতিতে রুদ্ধ করলে সে কত ভয়ঙ্কর হতে পারে, তা কেউ চিন্তাও করতে পারে না। 
রেখা মনে মনে ভাবছে তার ধৈর্যের বাঁধ ও কি এভাবেই ভেঙ্গে গিয়ে একদিন সে তছনছ করে দেবে 
ভাবতে ভাবতে ঠাকুর ঘরের দিকে এগোয়। রাধা মাধব কে খুব সুন্দর করে সাজায়, আরতি করে 
ভোগ নিবেদন করে ।আর মনে মনে শুধু বলে 'ঠাকুর ধৈর্য শক্তি দাও , সহনশীলতা দাও। সকল প্রতিবন্ধকতাকে যেন জয় করতে পারি।'
শাঁখ বাজিয়ে পূজা সমাপ্ত করে ঠাকুর ঘর থেকে বেরিয়ে আসে।
এবার রেখা রান্নাঘরের দিকে যায় চা বানাতে। চা বানিয়ে কিছু ফুলকপির পাকোড়া বানাল। তারপর প্লেটে করে সাজিয়ে শাশুড়ি মার ঘরে যায় দিতে।
শাশুড়ি মা বললেন 'এগুলো বানিয়েছে? তা বেশ করেছো ।এসে তো কিছু সেরকম খাওয়া হয়নি।
ননদ বলল ফুলকপির পাকোড়া বানালে? অন্য কিছু বানালে হ'তো এত গ্যাস ফর্ম করে যাবে।'
রেখা বললো 'আসলে ঘরে তো সেরকম কিছু ছিল না আপনারা আসবেন সেটা তো জানা ছিল না।'
সে কি আমরা আসলে বাজার হবে আমরা না আসলে বাজার হবে না তোমরা কি উপোস করবে নাকি?
রেখা বলল " না ,আমি ঠিক সেইভাবে বলিনি।'
কথা বলতে বলতে ইতিমধ্যে শাশুড়ি মার পকরা খাওয়া হয়ে গেছে।
তিনি বললেন আরেকখানা দেখ ভালো হয়েছে কিচ্ছু হবে না।
রেখা অত্যন্ত আশান্বিত হয়ে সেই কথার পরিপ্রেক্ষিতে ঘাড় নাড়ল। '
তুমি এসব খাচ্ছ মা?
হ্যাঁরে তুইও খা দেখ ভালো হয়েছে।
রেখা কোন কথা না বাড়িয়ে চলে আসে তারপর মনোজের ঘরে দিতে যায়।
মনোজ বলল বাবা আজকে চায়ের সাথে টা টা তো বেশ ভালো বানিয়েছো।
রহস্যটা কি?
রেখার কোন কথার উত্তর দিতে ইচ্ছে করছিল না।
কি হল কথা বলছো না?
কি বলবো?
সে কি কোন কথা নেই?'
কথা হারিয়ে যাচ্ছে।
ও তাই বুঝি?
মা আসবে তো আগে বললে না?
ও বুঝেছি যেন তোমার কথা হারিয়ে গেছে।
মা আসবে কিনা সেতু কত আগে বলেছিল আসবে কবে আসবে সেটা আমাকেও জানায় নি হঠাৎ করেই তো চলে এসেছে।
রেখার মনের ভেতরে যে পাথরটা চাপানো ছিল অভিমান ক্ষোভ সেটা যেন দ্রুত হালকা হতে শুরু করল।
কামনারা কি আমাদের ঘরেই থাকবেন?
হ্যাঁ সেরকমই তো মা বলল কন বাথরুমটা একটু কাছে হবে।
রেখা জানে যে ঘরের এখানে থাকবে সে ঘর থেকেও বাথরুমের দূরত্ব বেশি নয়।
তাহলেও সে মুখে কিছু বলল না কারণ এটা একটা সেনসেটিভ এস এটা নিয়ে কিছু বলতে গেলে উল্টে রেখা কি সবাই দোষারোপ করবে।
তাই এড়িয়ে গেলে।
রাত্রে কি রান্না করবো?
মাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করো না?
মাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করলে আমি রান্না করলে খাবেন তো?
না খেতে ইচ্ছে করলে  কিছু করার নেই।
আমার হয়েছে জ্বালা এই বলেই পেতে পারে দিকে মনোনিবেশ করল।
রেখা কি বলবে।
 রেখা সরাসরি শাশুড়ি মার ঘরে গিয়ে বলল কি রান্না করবো বলুন তো?
ওমা তুমি কি রান্না করবে তা আমি কি করে বলবো?
না আসলে শুনে নিলে ভালো হতো।
আসলে ঘরেবাজার তো সেরকম নেই আপনারা আসবেন আজকে সেটাও জানা ছিল না।
ডাল ঘরে আছে তো?
রেখা ঘাড় নাড়লো।
তাহলে মিক্সড সবজি ডাল করো।
আর কি বাজার আছে একটু বল?
আলু বেগুন ব্রকলি।
ঠিক আছে এক কাজ করো ব্রকলি আর আলুভাজা করো। বেগুন পোড়া করো।
রেখা ঘাড় নেড়ে চলে গেল।
রেখার মনটা আনন্দে নেচে উঠল ।কিছুক্ষণ আগেও মনটায় যে আঁধার ঘনিয়ে এসেছিল ভেবেছিল কখনো কি সেই আঁধার কাটবে?বিষন্নতায় ভরা ছিল তার মনের ভেতরটা। রেখা সব সময় একটা বিয়ের আগে কল্পনা করত শ্বশুর -শাশুড়ি মাকে নিয়ে সুখের সংসার করবে। কিন্তু সে আশা তার পূর্ণ হয়নি শ্বশুর মশাই তার বিয়ে হওয়ার আগেই পরলোকগমন 
করেছেন ।আর শাশুড়ি মা ... না থাক, আজকে আর সেসব কথা সে ভাবতে চায় না ।যদি তার মনটা বদলে গিয়ে থাকে। তাহলে তো সোনায় সোহাগা ।সে রান্না ঘরের দিকে এগোয়  রান্নার জোগাড় করবে বলে। যে ক্লান্তি গ্রাস তাকে গ্রাস করেছিল সেটা অনেকটা কেটে গেছে।  দুচোখে শীতের বাহারি ডাকটিকিট তার কল্পনার রং হৃদয় ছুঁয়ে গেছিল। আলসে রোদের পিয়ন এসেযে খাম  ধরিয়ে দিয়েছিল ,রেখা তা মনের কোণে সযত্নে সেগুলোকে রেখে দিয়ে ।এবার অন্য খামের চিঠি পড়তে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

মমতা রায় চৌধুরীর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১২২




উপন্যাস 

টানাপোড়েন ১২২
তোর উঠোনের  বিশাল অংক, কষতে বারণ

মমতা রায় চৌধুরী




সেদিন ছিল নীল আকাশের গায় কোদালিয়া মেঘ। পড়ন্ত বিকেলের সূর্য যেন তার চলে চাইছে অন্য দেশে। যাবার তাড়া অন্য দেশে মুখ দেখাতে ।তার দেরি হয়ে যাবে যেন মনে হচ্ছিল। তার যাওয়ার তাড়া আছে। এদেশে তখন নামবে আঁধার । আজ রেখার মনেও যে একটু অন্ধকারের ছোঁয়া। বিসর্জনের শেষে মাকে বিদায় জানিয়ে
 ক্লান্ত ,অবসন্ন মন খুঁজে চলেএকটু ভালোবাসা একটু বিশ্বাস ,একটু ভরসার হাত,আশ্রয়। ভাঙ্গা মন নিয়ে ট্রেনে চেপে বসে। কয়েক বছর আগের দিনটা কত ভালো কেটেছে, বার বার মনে পড়ছে, স্বপ্নীল এর সঙ্গে কাটানো স্বর্ণালী মুহূর্ত। তাদের সম্পর্ক কখনো ক্লেদাক্ত তা ছিল না, ছিলনা কোন চাওয়া পাওয়া। জানতো যে চাওয়া পাওয়ার মধ্যে দিয়ে পরিপূর্ণতা দুটি নর-নারীর। সেই চাওয়া-পাওয়া কখনোই তারা পূর্ণতা দিতে পারবে না ।তবুও কেমন একটা আকর্ষণ চুম্বকের মত যেন তাদের আটকে রেখেছিল। সেদিনের সেই বিকেলে বাইকে চেপে কখনো বা তার কবিতা শুনে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিল রেখা ।কখনো বা বাইক থামিয়ে বিস্তীর্ণ সবুজ ধানের ক্ষেতের দিকে তাকিয়ে ভুলে গেছে সময় এর হিসেব। স্বপ্নীল
রেখাকে শুধুমাত্র একবার হাত ছুঁয়ে দেখেছিল রেখা চমকে উঠেছিল। রেখার ভেতরে রক্ত ছলকে উঠতে চাইছিল। স্বপ্নীলের ও হয়তো বা তাই ।কিন্তু তার মাত্রা ছাড়িয়ে যায় নি ।পারদ একটা নির্দিষ্ট হারে উচ্চতা বাড়ালেও থেমে গেছে দুজনে। শুধু হাতে হাত রেখে গেছে তারা ।আর অনবরত তাদের প্রতিটি শ্বাস-পরছিল ঘনঘন। 
স্বপ্নীল আবেগঘন ভাষায় বলেছিল 
' কোনদিনও কি তাকে পরিপূর্ণ ভাবে ছুঁতে পারবে না ।'
রেখা শুধু তাকিয়ে ছিল স্বপ্নীলের দিকে। সেই তাকানোতে ছিল পরম চাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, আর না পাওয়ার একটা কি বেদনা ।
সেটা সে ভাষায় প্রকাশ করতে পারবে না ।রেখার চোখে জল ।স্বপ্নীল তার হাত পেতে তার চোখের জলটা তুলে ধরেছিল আর বলেছিল 
'এটা মূল্যবান এভাবে নষ্ট ক'রো না। '
কথা বলতে বলতে স্বপ্নীলের চোখ জলে ভিজে উঠেছিল ।
'একটা নারীর মন তাকে এতোটা আকর্ষণ করেছে কিন্তু সেই নারীর হৃদয়ের স্রোতে ভেসে যেতে পারছে না। তাকে ছুঁতে পারছে না।'
 দীর্ঘশ্বাস ছেড়েছিল স্বপ্নীল ।
'পুনর্জন্মে বিশ্বাস করো তুমি?'
রেখা একটু মলিন হেসে বলেছিল
' যদি সত্যিই পুনর্জন্ম থাকে…।'
কথা সম্পূর্ণ করতে না দিয়ে স্বপ্নিল বলেছিল 'তাহলে সেই জন্মে সব আশা পূর্ণ হবে।
আমি না হয় এই জীবনে থেকে গেলাম তোমার কাব্যের বিরহের নায়ক হয়েই।'
'কেন এভাবে বলছ ?তোমার জীবনেও কোন নারী আসবে যে তোমাকে ভরিয়ে দেবে অন্য সুখ, অন্য স্বাচ্ছন্দে ,অন্য ভালোবাসায় ।তখন কি তুমি আর রেখাকে মনে করতে পারবে?'
স্বপ্নীল হেসে রেখার হাত দুটোকে ধরে বলেছিলো 'তোমার কি মনে হয় আমি পারবো?'
রেখা বলেছিল' জীবনে অবশ্যই দরকার আছে সবকিছু র।'
স্বপ্নীল বলেছিল 'আমি জানি প্রতিটা দেহের ভেতরে একটা খিদে থাকে। সেই শারীরিক চাহিদা মেটানোর দরকার। সবকিছুরই ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া থাকে।'
রেখা বলছে 'সে জন্যই তো বলছি।'
'কিন্তু আমার মনে হয় আমি পারবো না।
নারী মানে কি বলতো তার তো সবকিছুই আমার জানা। হ্যাঁ ,যে টুকু অজানা ।শুধুমাত্র শারীরিক চাহিদা টুকুনি বৃদ্ধির জন্য কি পেতে হবে?'
আজ তুমি যা বলছ দেখবে যখন তুমি আমার থেকে দূরে সরে যাবে তখন কিন্তু এটা মনে হবে না।'
স্বপ্নীল আবেগ কম্পিত কন্ঠে বলে যাচ্ছে
'জানো মাঝে মাঝে কি মনে হয় যখন তোমার গলাটা শুনতে পাই না ।তখন মনে হয় আমি তোমার থেকে শত শত আলোকবর্ষ দূরে। শুধুমাত্র একটা ফোন কলের জন্য আমি ওয়েট 
করি ।শুধুমাত্র একটু কথা ,তোমার আওয়াজ শোনার জন্য ...তুমি কি উপলব্ধি করতে পারো?'
রেখা হেসে বলে 'জানো তো স্বপ্নীল একেতে তুমি আমার থেকে বয়সে ছোট। তোমার থেকে আমি অনেকটাই বড়। তুমি কোন মোহতে  পড়ে নেই
 তো ?মাঝে মাঝে. আমার বড্ড ভয় হয়।'
স্বপ্নীল বলেছিল' আমার কাব্যের মূল প্রেরণা তুমি
তোমাকে দেখেই আমার না ভেতরে একটা অনুপ্রেরণা পায় ।লেখার রসদ খুঁজে পাই। তুমি আমার কাব্যের মানসপ্রতিমা ।তোমাকে ঘিরেই আমি অবয়ব দি ই।
কিন্তু আমার আগে কি তোমার কোন মেয়েকে ভালো লাগে নি?'
স্বপ্নীল একটু হেসে বলেছিল' হ্যাঁ । মা কে।'
রেখা একটু অবাক হয়ে গেছিল।
কিন্তু জানিনা সেই বসন্তের দিনে তোমার সাথে আমার প্রথম সাক্ষাৎ ।সেদিনের তোমাকে যে দেখেছিলাম ,সেদিনই তোমাকে প্রথম বসন্তের রঙে রাঙিয়ে দিলাম তোমার হৃদয় ।তখন আমি ছুঁতে পারিনি কিন্তু তুমি আমার হৃদয় কে স্পর্শ করে গেছিলে।

স্বপ্নীল গুন গুন করে গান গাইতে থাকলো 'কতবার তোর বাড়ি গিয়ে ফিরে ফিরে এলাম আমার মতে তোর মতোন কেউ নেই 
কতবার তোর জানলা দিয়ে গলে হলুদ খাম
আমার মতে তোর মতন কেউ নেই।
তোর বাড়ির পথে যুক্তির সৈন্য
যতটা লুকিয়েছিল কবিতায়
তারও বেশি ধরা পড়ে যায়।
তোর উঠান জুড়ে বিশাল অংক
কষতে বারণ ছিল তাই
কিছুই বোঝা গেল না প্রায়।
কখনো চটি জামা ছেড়ে এসে রাস্তায় দাড়ায়।
... আমার মতে তোর মতন কেউ নেই।"
কি অসাধারণ গাইল রেখা মন্ত্রমুগ্ধের মত তাকিয়েছিল স্বপ্নীলের দিকে। ক্ষণে ক্ষণে শুধু বিদ্যুত খেলে যাচ্ছিলো শরীরের প্রতিটা রন্ধ্রে। মনে হয়েছিল সত্যি স্বপ্নীল কে  যদি ছুঁয়ে দেখত এত কাছে থেকেও কোথায় যেন একটা কাঁটাতারের বাধা নিজেকে সংযত করে রেখেছে, রাখতে হয়েছে।
চায়নি সে কাঁটাতারের বাধাটাকে পেরিয়ে আসতে মনের ভেতরেই রেখে দিয়েছে ।তার আশা-আকাঙ্ক্ষাগুলো কখনো চেয়েছিল মনে মনে হয় তো একবার সবুজ ঘাসের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে দুজনে পাশাপাশি চোখে চোখ হাতে হাত শুধু এইটুকু আশ।
স্বপ্নীল গান থামিয়ে রেখার চোখের সামনে হাত নেড়ে জানতে চেয়েছে কি হয়েছে কি দেখছ তুমি?
রেখা রেখা ভীষণ লজ্জা পেয়ে গেছিল মাথা নিচু করে নিয়েছিল স্বপ্নীল একটু হেসে ছিল আর বলেছিল আমি জানি তুমি দোলাচলতায়, টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছ।
তোমার ভিতরেও পানকৌড়ির মত করে মাথা তুলে স্বপ্নগুলো ভালোবাসার ঘ্রাণ গুলো পেতে চায় হৃদয়ের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে তাকে অনুভব করতে। 
রেখা বলে কেন তুমি কি আমাকে রেখে তাই বুঝছো?
স্বপ্নীল গভীর মনোযোগের সঙ্গে রেখার দিকে তাকিয়ে বলে তোমার মনের আর মুখের ভেতরের অভিব্যক্তিগুলো জমিন পড়তে পেরে গেছি আঙ্গুল দিয়ে রেখার দিকে তাকিয়ে তার হৃদয়ের দিকে আঙুলটা তাক করে রেখে বলেছিল ওখানে তোমাকে আমি ছুঁয়ে ফেলেছি তুমি যতই অস্বীকার করো না কেন ?একদিন তুমি বুঝতে পারবে আজ তুমি আমার ডাকে সাড়া দিলে না বেশ 
ভালো ।তোমার যতটুকু সঙ্গ ,যতটুকু কথা ,হৃদয় স্পর্শ করেছে এইটুকুনি আমি বেঁচে 
থাকব ।জানিনা কোনদিন তুমি আমার থেকে হারিয়ে যাবে কিনা কিন্তু আমি তোমাকে সারা পৃথিবী জুড়ে খুঁজে বের করবই।
এর মধ্যে কয়েকজন প্যাসেঞ্জার উঠে দাঁড়াতেও দিদি আমার ব্যাগটা দিন আমার ব্যাগটা দিন না।স্টেশন এসে গেছে কল্যাণী স্টেশন ,কল্যাণী স্টেশন এই ছোট বাচ্চাটাকে টেনে তুলল ঘুমিয়ে পড়েছে ।এর ভেতরে নিয়ে আর পারা যায় না এমন সময় হঠাৎই তার ভাবনায় ছন্দপতন ঘটে সে চলে গেছিল ।নস্টালজিক হয়ে গেছিল সে যেন সোদা মাটির গন্ধ পেয়েছে সেই গন্ধটুকু মনেপ্রাণে নিয়ে ধীরে ধীরে সে এগিয়ে আসে ট্রেন থেকে নেমে পড়েন যখন সে হাঁটছে তখনো যেন সে একটা ঘোরের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে আজ দুটো কথা বলার জন্য একটা ভালো মনের সঙ্গী পাবার জন্য মনের ভেতরে কতইনা আকুলি-বিকুলি।
স্বপ্নীল যখন কার চোখের তারা বিন্দুতে চোখ রেখে বলেছিল কিছু বলবে বলো না ,চল না মনের ভেলায় দুজনা ডানা মেলে উড়ে যাই নীল আকাশ,
 নীল আকাশ।
রেখার দু'চোখ জলে ভিজে ওঠে। অটোআলা সামনে এসে দাঁড়ায় 'দিদি ,কোথায় যাচ্ছেন হনহন করে হেঁটে এইতো এখানে দাঁড়িয়ে আসুন বসুন।
রেখা একটু মুলান হেসে বলেছিল 'হ্যাঁ ভাই চলো।'

শামীমা আহমেদ  এর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৬৬




ধারাবাহিক উপন্যাস 

শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত 
(পর্ব ৬৬)
শামীমা আহমেদ 

রাহাত বললো,খালা বিয়ের সময় নোমান সাহেবের যে ছবি দেখিয়েছেন  সেটি তার ইয়াং কালের।যেটা দেখে আমরা রাজী হয়েছি। এটাতো ঠিক হয়নি। খালার কাছে যেন রাহাতের কোন অভিযোগই টিকছে না।খালার তৎক্ষণাৎ উত্তর,
বয়স হইছে তো কি হইছে?  তার কি হাতে পায়ে কোন ডিফেক্ট আছে? পুরুষ মানুষের আবার বয়স কি? সোনার আংটি বাকাও দামী।  সত্তর বছর বয়সেও পুরুষ মানুষ বিয়া করে।তার বেশুমার টাকা।পরে সবইতো শায়লার হইবো। শুধু তার সন্তান দুইটার জন্য তোমাদের কাছে নিচু হইয়া আছে। শায়লার কাছে বাচ্চা দুইটা মা করে নিতে চাইতেছে।মেয়েরা মায়ের জাত।সব সন্তানরেই তারা  আপন করতে পারবো। এবার রাহাত দৃঢ় গলায় বলো,খালা আমরা আইনি সিদ্ধান্তে যাবো। আপা ডিভোর্স নিবে। আমরা শীঘ্রই ডিভোর্স লেটার পাঠাবো।
এই কথা শুনে খালা যেন আৎকে উঠলেন! কি কইলা,আইন আদালত করবা? তোমরা জানো নোমান বাবাজি কত টাকার মালিক? তার সাথে কোট কাচারি লড়ার মত তোমগো কি টাকা আছে? তাছাড়া বাবাজি মাথা ঠান্ডা কইরা শুনো, এইসব করলে মানুষ তোমাদেরই মন্দ কইবো।তাছাড়া  তুমি এখন বড় হইছো ভালো চাকরি বাকরি করো।দুইদিন পর বিয়া শাদি  করবা, নিযের সংসার করবা না বইনের মামলা মোকদ্দমা করবা? নায়লার শ্বশুর বাড়ি , তোমার নতুন  শ্বশুর বাড়িতে কি সম্মান থাকবো? তাছাড়া শায়লার বয়স হইয়া যাইতাছে এইটা কি বুঝ? ছোট বইনের বাচ্চা হইয়া যাইতাছে? মানি,তোমগো পড়াশুনা করাইতে  গিয়া আজ তার এত বয়স হইয়া গেছে আর এই লাইগাইতো টাকা পয়সা আলা ছেলে দেইখা বিয়া দিয়ে দিলাম।বিদেশে থাকবো।কত বড় ভাগ্য!" খালার চোখ দুটো কপালে উঠে গেলো! সব কথাই  ঠিকই বলছেন খালা।
একে একে খালার সব কথাই রাহাত শুনলো। খালাতো কিছু ভুল বলেন নি।শিহাব ভাইয়ার সাথে সম্পর্কটা যদি আর কিছুদিন আগে হতো তবে হয়তো এই বিয়েটা  হতোনা।রাহাত বুঝতে পারছে না।বরাবরই খালা তাদের ভালো চেয়েছেন।সব রকম সাহায্য সহযোগিতা করেছেন।তার কথাগলো তো ফেলনা নয়?
একটু বিরতি নিয়ে খালা আবার বলা শুরু করলেন,এবার যেন সব আক্রোশ শিহাবের উপর গিয়ে পড়লো।
দেখো রাহাত বাবাজি,আর ঐ ছেলেটাইবা কেমন? বিয়া হওয়া একটা মাইয়ারে নিয়া এত সব করতাছে।আমরা তো একটা সমাজে থাকি নাকি? ভাল কইরা তার খোঁজ খবর করো।তার নিশ্চয়ই কোন সমস্যা  আছে নয়তো সবকিছু জাইনাও কেমনে সে শায়লার পিছে ঘুরে।এই সব ছেলেরা দুই নম্বর,দেখো গা আরেক জাগায় আরেকটা বউ আছে।এত বয়স হইছে বিয়া কি আর না করছে? তোমরা তার থিকা ফিরা আসো।হয়তো দেখবা এই রকম চরিত্রের জন্যউ আগের বউ ছাইড়া গেছে।এখন তোমগো বদনাম করতে আসছে।পুরুষ মাইনেস কি কিছু হইবো? কলংক হইবো তোমার বইনের। আর এইখান দিয়ে ঘুরঘুর করলে পাড়ার পুলাপান কিন্তু টের পাইলে হাড্ডি মাংস এক করবো।এলাকায় আমগো একটা মান সম্মান আছে।ভালো কইরা আমার কথাগিলান ভাই বইনে ভাবো।তোমার মা বাসায় নাই,তাই সব খোলামেলা বইলা গেলাম।রাহাত একেবারে চুপ হয়ে রইল। খালার যেন শিহাবকে নিয়ে আরো অনেক বলার আছে, বলে চললো,আরে এইসব পোলারা যায়গায় যায়গায় গিয়া ফস্টিন্সটি কইরা বেড়ায়। দেখো গিয়া নিজের হয়তো সন্তানও আছে। অন্য এলাকার আইসা  ভালো পরিবারের সম্মান হানি করে?দেখো গা এক লগে কয়জন মাইয়ারে ঘুরায়। এরা আজকাল রাত জাইগা জাইগা ঘরের বউঝিগো ডিস্টার্ব করে।  তোমার খালু দুইদিনে এর খোজ খবর সব আইনা দিতে পারে।কিন্তু তোমরা মাইন্ড করবা তাই আমরা চুপচাপ আছি। এরা আবার  নিজেরে অবিবাহিত বইলা পরিচয় দেয়।আরেকদিন যদি এই পোলারে আমি আমগো বাসার কাছে দেখি আমি কিন্তু পুলিশে খবর দিমু।থানার ওসি আমার খালাতো ভাই। তোমগো দিকে চাইয়া আমি এখনো কিছু কই নাই।
ঘরের ভেতরে শায়লা রুহি খালার প্রতিটি কথাই শুনছে আর  সাথে রাহাতের প্রতিবাদ করার চেষ্টা বারবার যে খালার কাছে টিকছে না তাও বুঝতে পারছে।শায়লা জানেনা এখন সে কি করবে?  খালার কথা রাহাতের চোখ খুলে দিলো। যেখানে আবেগ, ভালবাসা  সত্য মিথায়, বিশ্বাস অবিশ্বাসের কোন মূল্য নেই।শায়লার জন্য রাহাতের ভেতরটা কেঁদে উঠলো।আপুর জন্য সে কিছুই করতে পারছে না। আসলে সমালোচকরাই ভুল ত্রুটিগুলো ধরিয়ে দেয়।রুহি খালার বক্তব্য শেষে  রাহাত যেন তার কাছে সারেন্ডার করলো।আড়াল থেকে শায়লা তা বুঝে নিলো, খালার কথায় রাহাত পুরোপুরি  কনভিন্সভ হয়ে গেছে।তাহলে এখন যা করার তার নিজেরই করতে হবে।

চলবে...

কবি সৈয়দ আইরিন পারভীন এর মুক্তগদ্য






নারী তুমি জাগ্রত হও
সৈয়দ আইরিন পারভীন

কেয়ার কর্তৃক পরিচালিত নারীর ক্ষমতায়ন প্রজেক্টে একজন ট্রেনিং অফিসার হিসেবে বেশ কয়েক বছর আমি কাজ করেছিলাম। আমাদের কাজের যে কর্মসূচি ছিল তার মধ্যে ৬২ টা মডিউল ছিল  যার মাধ্যমে কিভাবে একজন নারী তার কাজে-কর্মে শিক্ষায়-দীক্ষায় তার জীবনাচরণ হবে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও স্বাবলম্বী। আর এর ফলশ্রুতিতে একজন নারী হয়ে উঠবে ক্ষমতায়িত।
আসলেই কি নারীরা ক্ষমতায়িত!
বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেকই নারী। দেশের সমগ্র নারী সমাজকে সাথে নিয়েই আমাদের উন্নয়নের পথে হাঁটতে হবে।২০৪১ সালের শিল্পসমৃদ্ধ উন্নত আয়ের দেশে যেতে হলে আমাদেরকে নারী-পুরুষ সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এ দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে নারীর অংশগ্রহণ ব্যাপক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছে।
অসহায় দরিদ্র সুবিধাবঞ্চিত কিংবা কম সুবিধাপ্রাপ্ত নারীসহ সকল নারীদের তথ্যে প্রবেশাধিকার এবং এ বিষয়ক সেবা প্রাপ্ত নিঃসন্দেহে নারীর ক্ষমতায়নকে ত্বরান্বিত করবে।
তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এ "তথ্য আপা"ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তির মাধ্যমে মহিলাদের ক্ষমতায়ন"শীর্ষক একটি প্রকল্প গৃহীত হয়। বিশ্বায়নের যুগে কোন দেশকে এগিয়ে যেতে হলে, কোন জাতিকে উন্নত করতে হলে নারীদের ক্ষমতায়নের যেমন বিকল্প নেই ,তেমনি তথ্যপ্রযুক্তির মত গুরুত্বপূর্ণ খাতে নারীর ব্যাপক অংশগ্রহণের কোন বিকল্প নেই। আধুনিক যুগে তথ্যপ্রযুক্তি হচ্ছে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত।
 সমগ্র বিশ্বের মতো বাংলাদেশ সরকারও ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নারীদের সম্পৃক্ত বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
সরকারের এত ফলপ্রসূ দৃষ্টিভঙ্গির পরেও কি দেশের নারীরা ক্ষমতায়িত হতে পারছে?
আজও অনেক পরিবারে নারীরা শিক্ষিত হলেও চাকুরি করতে পারে না। যদি সংসারের টানাপোড়নের ভিত্তিতে কারো চাকুরি করতে হয় তবে তাকে দৈনিক ১৮ ঘন্টা  সংসারের সব দায়িত্ব ঘানির মতো টেনে নিয়ে যেতে হয়। আর সংসারের সচ্ছলতা থাকলে  দুবেলা ভাত এর বিনিময়ে অবৈতনিক কর্মচারী হিসেবে জীবন যাপন করতে হয়। আমার অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে লিখা এমনও দেখেছি শুধুমাত্র চাকুরি করতে চেয়েছে বিধায় একটি সন্তান নিয়ে একজন ব্যাংক কর্মকর্তা ডিভোর্স হয়েছে।তাই  বলতে চাই নারী শুধু নারী তার আবার ক্ষমতা!
প্রতিটি সংসার এমন একটা ক্ষেত্র যা কিনা ইন্দুরের গ্যারাকল এর মত। সংসারের প্রয়োজন হলে আপনি চাকুরি করতে পারবেন সবকিছু করতে পারবেন কিন্তু আপনার ক্যারিয়ারের প্রয়োজনে নয়।

কবি নিধি আফরিন এর কবিতা




মানুষের স্বরূপ
নিধি আফরিন

জলেই গর্ভপাত হয়েছিলো ফুলের,
আগুনে ঝলসে গিয়েছিলো গাছ,
পাখিরা অন্য আশ্রয় ভালোবেসে,
উড়ে গেছে বহুদূর... 

শিকারী ভালোবাসে পাখি, পাখি ভালোবাসে গাছ, গাছ ভালোবাসে মানুুষ, মানুষ ভালোবাসে না কিছুই....

সময়ের তারাহুড়োয় মুখস্থ সূত্র ভুল হয়ে জীবনের অঙ্ক মিলে না কখনো, 
মরার পরে উপলব্ধি এসেছিলো আমি জন্মাইনি তখনো....

এভাবেই বর্ণ গুলো সেজে থাকে একাধিক প্রয়োজনে,
মানুষ মূলত কাঠ অক্সিজেন তা জানে।

কবি দেবব্রত সরকারের কবিতা



কেনো অন্ধকার হই
দেবব্রত সরকার 


শব্দরা উঠেছিল নাট্যচর্চার সাথে দেখা করতে
আমি মঞ্চের এক কোনে দাঁড়িয়ে আছি
হঠাৎই নিখোঁজ পৃথিবীর আলো 
সিটে বসা দর্শক চিৎকার করে উঠল 
একি হলো তাহলে কি পৃথিবীতে আর আলো আসবে না কোন দিন ।
প্রশ্ন থেকে গেল একা মঞ্চের মধ্যিখানে।
নীরব প্রার্থনা করছি আমি তোমাকে ভালোবাসি বলে
ভাবছি কোথায় আছো 
ঠিক আছো তো 
এই নিখোঁজ পৃথিবীর আলো তাকে স্পর্শ করেনিতো 
চেয়ে দেখি অন্ধকার
প্রেম নেমে এলো 
ডোরাকাটা আমি
আলো আলো আলোচনা
শুনতে শুনতে 
আমি ধীরে ধীরে ধীরে ধীরে 
অন্ধকার হয়ে গেলাম ।

শামীমা আহমেদ এর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৬৫





ধারাবাহিক উপন্যাস

শায়লা শিহাব কথন 

অলিখিত শর্ত 
(পর্ব ৬৫)
শামীমা আহমেদ 

ফোন কলে শিহাবের আসার কথা শুনে শায়লা এক ঝটকায় বিছানায় উঠে বসলো।দেয়াল ঘড়িতে চোখ নিয়ে দেখল সকাল সাতটা বাজতে এখনো  আরো দশ মিনিট বাকী। অর্থাৎ ছয়টা পঞ্চাশ বাজছে। তবে কি শিহাব রাতে ঘুমায়নি? কি ছেলেমানুষী করছে! নিশ্চয়ই সবকিছু নিয়ে টেনশন করছে। শায়লা বুঝতে পারছে না কেন শিহাব এত অধীর হচ্ছে? আমিতো কালই চলে যাচ্ছি না।অনেক করেইতো কাল বুঝালাম তবুও যেন তার ভয় কাটছে না।
শায়লার নিজের দিকে এতক্ষন কোন খেয়ালই ছিল না।আচমকা ঘুম ভাঙলে নিজের অবস্থানটা বুঝতে একটু সময় লেগে যায়। শায়লারও ঠিক তেমনটিই হচ্ছে।সে এখন কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না। খুব দ্রুত বিছানা থেকে নেমে আয়নায় নিজেকে দেখে নিলো।চুলগুলো বেশ এলোমেলো হয়ে আছে।হাত বুলিয়ে তা একটু গুছিয়ে নিলো। রাতে ওড়নাটা যে কোথায় রেখেছে খুঁজে পাচ্ছে না।তাড়ার সময় ঠিক এমনটিই হয়।তাছাড়া  কাল সারাদিন শেষে রাতটা তার খুবই এলোমেলো কেটেছে। ঘরের এদিক ওদিক তাকিয়ে বিছানায় ওড়নাটা দেখতে পেলো।কোন মতে তা গায়ে জড়িয়ে হাতের মুঠোয় মোবাইলটা নিয়ে শায়লা ঘরের দরজা খুললো।ছুটির দিন হওয়াতে রাহাত এখনো ঘুমিয়ে আছে।
শায়লা ডাইনিংয়ের সাথের বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই শিহাবকে দেখতে পেলো।ওদের বাসার মুখোমুখি  'স্বপ্নবাড়ি'টার সামনে বাইক দাঁড় করিয়ে শিহাব বারান্দার দিকে তাকিয়ে আছে।
শায়লাকে দেখতে পেয়ে শিহাবের অভিব্যক্তিতে যেন এক চাতকের দৃষ্টি!শায়লা দেখলো  শিহাব গায়ে একটা ট্র‍্যাকসুট পরা,পায়ে কেডস,একেবারে  জগিং পোশাকে। তবে কি সে মর্নি ওয়াকে বেরিয়েছিলো? কিন্তু কেন তবে আবার বাইক সাথে! কেমন অগোছালো লাগছে তাকে।শায়লা শিহাবকে সবসময় খুবই পরিপাটি পোষাকে দেখেছে।আজ এত ক্যাজুয়াল পোশাক যদিও প্রথমে চেনা যায়নি কিন্তু এর মাঝেও একটা হ্যান্ডসাম লুক ঠিকরে বেরিয়ে আসছে।যদিও চুল  উস্কোখুস্কো আর চোখ দুটো  বেশ ফুলে আছে। শায়লা বুঝতে পারলো সারারাত সে ঘুমায় নি। বেচারা ভীষণ উৎকন্ঠায় ছিল।চোখের ভাষায় যেন কিছু বলতে চাওয়া।
শায়লা কল দিলো।
দুজনে খুব হলে কয়েকগজ দুরত্বে। তবুও কথা বলতে হচ্ছে ফোন কলে।
কি ব্যাপার এত্ত সকালবেলা এভাবে?
শায়লা তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছিল।
কেন?  হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে? 
হ্যাঁ, আমার মনে হচ্ছিল তুমি আজই চলে যাচ্ছো।
শায়লা হেসে উঠলো, বললো পাগল।
হ্যাঁ, শায়লা আমি তোমার জন্য মনে হয় পাগলই হয়ে যাচ্ছি।
কিন্তু এখন এমন করলে কি চলবে?  মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে।
আমরাতো ভালই ছিলাম শায়লা। কানাডার ফোনকল আমাকে টেনশনে ফেলে দিয়েছে।
আমিতো তোমাকে বারবার আস্বস্ত করছি কেন ভরসা পাচ্ছো না?
শায়লা তুমি খুব তাড়াতাড়ি আমার বাসায় চলে আসো।বলো কবে আমি তোমাকে নিতে আসবো?চোখে দেখার দুরত্বে মোবাইলের কল্যাণে দুজনার ভালোই কথা চলছিল।কিন্তু এর মাঝে বাধ সাধলো ঐ বাড়ির দারোয়ান। তাদের মেইন গেট খুলে সে বাইরে এসে এমন অচেনা একজন লোক বাইক নিয়ে দাঁড়ানো। বিষয়টি তার মনে রহস্যের জন্ম দিয়েছে।রহস্যজট খুলতে সে শিয়াবকে দুইবার প্রদক্ষিণ করলো।শিহাব বুঝতে পারলো লোকজন জেগে গেছে এখন চলে যাওয়াটাই উত্তম। দারোয়ানকে দেখে শায়লাও নিজেকে আড়াল করে নিলো।শিহাবের বাইকের স্টার্ট শুনে মোবাইল কল কেটে দিলো। গতকাল রাতটা যতটা অস্থিরতায় কেটেছে আজ সকালটা শিহাব যেন এক অনাবিল আনন্দে ভরিয়ে দিলো। আর এর রেশ ধরে শায়লার সারাটাদিন খুব ভালোই কাটবে। শায়লা ওয়াশরুম গিয়ে ফ্রেস হয়ে সকালের নাস্তা বানানোয় ব্যস্ত হয়ে পড়লো।
রাহাত আর শায়লা নাস্তা সেরে নিলো।দুজনে চায়ের কাপ হাতে ডাইনিং থেকে উঠে এলো।
শায়লা বারান্দায় চলে এলো।রাহাত ড্রইং রুমের দিকে যেতেই দরজায় কলিং বেল বেজে উঠলো। শায়লা অবাক হলো এত সকালে কে হতে পারে? বুয়াতো আরেকটু পরে আসে। রাহাত, কে?  জানতে চাইলে দরজার ওপাশ থেকে সাড়া এলো,তোমগো রুহি খালা।দরজা খোল।
রাহাত দ্রুতই দরজা খুলে দিলো।  রুহি খালা ভাড়াটিয়া হলেও ওদের কাছে খুব সম্মানিত।
শায়লা বুঝতে পেরেই নিজের ঘরে চলে গেলো।নিশ্চয়ই নোমান সাহেবকে নিয়ে কিছু বলতে এসেছে।

রাহাত দরজা খুলতেই খালার প্রবেশ।রাহাত তাকে ড্রইং রুমে বাসাতে চাইলে খালা রাহাতকে ইশারায়  ডাইনিংয়েই বসতে বললো।জানতে চাইল শায়লা কই?রাহাত জানালো আপু ঘরেই আছে।এরপর শুরু হলো খালার লেকচার সেশন।
দেখো বাবা রাহাত,তোমগো ভাইবোনরে আমি কিছু কথা বলতে আসছি তুমরা মন দিয়ে শুনবা।আমি তোমগো মায়ের পেটের বইন খালা না হইলেও আপন খালার মতই তোমগো ভালবাসি।পুরান ঢাকায় আমার বাপের বাড়ি  থাকা সত্বেও  উত্তরায় আসছি আমার মাইয়া দুইটারে ভালো পরিবেশে রাইখা মানুষ করতে।মাইয়া দুইটার বিয়াও দিছি চাইলে এখন আমি চইলা যাইতে পারি কিন্তু যখনই ভাবছি চইলা যামু তখুনি তোমার আব্বা মারা গেলেন।তোমরা তিন ভাই বোন স্কুল কলেজে পড়ো।তোমার মাকে আমি বড় বইনের লাহান শ্রদ্ধা  করি।তার দূর্দিনে তাই তারে ছাইড়া যাই নাই।তোমগো ভালমন্দ আমি ভাড়াটিয়া হইয়াও দেখছি।আজ তোমরা বড় হইছো।তোমগো  বিয়া শাদীও আমি দ্বায়িত্ব মনে করছি।
এবার রাহাত বুঝতে পারলো খালার আগমনের হেতু আর এত কথার কারণ।খালার কথায় এখন পুরান ঢাকা আর শুদ্ধ ভাষায় মতো মিশ্রণ চলে। তবে শুদ্ধ ভাষাই বেশি চলে।সে বলেই চললো,দেখো তোমার বইন যা শুরু করছে তাতে কিন্তু দুইদিন পর পাড়া প্রতিবেশীদের মুখ বন্ধ রাখতে পারবানা।
আজ সকালে তোমার খালু নামাজ পইড়া সকালের হাঁটা সাইরা বাসায় আসতেই দেখে 
শায়লা বারান্দায় দাঁড়ায়া আছে আর সামনের বাসায় হোন্ডা লইয়া হেই পোলাটা দাঁড়ায়া দুইজনে ফোনে কথা কইতাছে।
সক্কাল বেলা বইলা এলাকাবাসী বুঝে নাই।রাহাত কথাটিতে ভীষণ অবাক হলো! আজ সকালের ঘটনা আপুতো কিছু বললো না?
খালার মুখ চলতেই লাগলো,দেখো বাবাজি,গত দেড় বছর নোমান বাবাজি শায়লার একাউন্টে নিয়মিত স্ত্রীর ভরনপোষণের টাকা পাঠাইছে।বিয়ার সময় সে একাউন্ট নাম্বার চাইয়া নিছে। তাইলে বলো সে কি স্বামীর দায়িত্ব পালন করে নাই?তোমার বইন একদিনও তারে ফোন করে নাই।সে ফোন দিলে কথা বলে না ঠিকমত।
এইসব তো সরমের কথা তাদের স্বামী স্ত্রীর ব্যাপার আমরা ক্যান জানুম? 
রাহাত এবার যেন কিছু বলার একটা সুযোগ পেলো,বললো,খালা নোমান সাহেবের দুইটা বাচ্চা আছে বিয়ের সময় এইটা গোপন রেখেছে এটা কি ঠিক হয়েছে? 
রাহাতের কথায় খালা যেন তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো, বাচ্চা আছে তাতে কি হইছে? সেইটা কি আর এইদেশে কেউ জানতাছে? ঐ দেশে পোলাপান একটু বড় হইলেই বাপ মা ছাইড়া যায় আর স্বামীর কাছে গেলে শায়লারও বাচ্চাকাচ্চা হইবো।তহন তারে লইয়া স্বামী সংসার করবো।খালা যেন থামতেই চাইছে না,কত কথা যেন জমে আছে আজ বলেই যাচ্ছে,শায়লার তো বয়স হইয়া যাইতাছিল।আমগো দেশে তিরিশ বছরের মাইয়াগো বিয়া দেয়া এতো সোজা না।এইসব মাইয়ারা বিয়ার বাকি থাকে যদি কোন খুঁত থাকে।
রাহাত যেন এবার একটা যুক্তি খুজে পেলো।বললো,
কিন্তু খালা আপার বয়স হয়েছিল এটা ঠিক কিন্তু আপুরতো কোন খুঁত ছিল না! খালা যেন ক্রোধে ফেটে পড়লো, 
আরে বয়স হইয়া গেছে এইটাইতো বড়  সমস্যা।তোমার ছোট বোন নায়লার বিয়ার বসয় হইয়া গেছিল তাই আর কত দেরী করবা? রাহাত শুধু এই পয়েন্টটাতেই  অনুশোচনায় ভুগে।নায়লার ভালোর জন্য আপুকে আজ এত কিছুর সন্মুখীন হইতে হচ্ছে।
কিন্তু খালা মানুষের তো পছন্দ অপছন্দ থাকতে পারে,,
খালা যেন আজ সব যুক্তি খন্ডন করতেই এসেছেন।সাথে সাথে বলে উঠলেন,তবে কি শায়লার এই পছন্দ আগে থাইকাই ছিল? তাহলে বলো নাই ক্যান? আর না হইলে বিয়ার পর শায়লা ক্যামন কইরা অন্য সম্পর্কে জড়ায়? দেখো বাবা রাহাত তোমার বাবা একজন সম্মানিত মানুষ ছিলেন।এখন এলাকায় মরা বাপের অসম্মান কইরো না। তাছাড়া তোমার মায়ের বয়স হইছে।তার কি এত সব মানার আর ধৈর্য্য হইবো।বেচারী স্বামীহারা হইয়া বহুত কষ্ট করছে।এতকিছুতেও রাহাত যেন কিছুতেই নোমান সাহেবকে মেনে নিতে পারছে না।রাহাত ভাবলো খালা যখন প্রসঙ্গ তুলেছেই তখন বলে ফেলি,,রাহাত বললো,

চলবে,,,

০৪ মার্চ ২০২২

মমতা রায়চৌধুরীর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১২১




উপন্যাস 

টানাপোড়েন ১২১
প্লিজ ভালো থেকো

মমতা রায়চৌধুরী



আজ সকাল সকাল কাজের মাসি 
এসেছে ।মাসিকে বলাই ছিল রেখার স্কুলে প্রচুর দায়িত্ব রয়েছে। মাসি কথা রেখেছে। মাসির আজ কয়েকটি বাড়তি কাজ রয়েছে।
 তাই মাসি জিজ্ঞেস করছে রেখাকে'বৌমা, বৌমা, ও বৌমা।
তখন রেখা শাড়ি পড়ছে । কুচিগুলো ঠিক করতে করতে সেফটিপিনটা মুখে ধরা অবস্থায় বলছে  ' কি মাসি কিছু বলছ?'
দরজার কাছে  মসি এসে বললো' হ্যাঁ বৌমা।'
'কি বলছ?'
'উফ বাপরে বাপ কোনরকম করে কুচিগুলো পিনাপ করে পেডিকোটে ঢুকিয়ে দিল। তারপর চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে বললো 'বলো মাসি ,তাড়াতাড়ি বলো।'
'বাচ্চাগুলোকে কখন কখন খেতে দেব?'
' ওই তো ঠিক ,বারোটা সাড়ে বারোটার মধ্যে দেবে। তারপর ওদিকে সাড়ে তিনটের মধ্যে দেবে খেতে কেমন ।আর তুমিও খাবার খেয়ে নিও।
তোমার কোন অসুবিধা হবে না তো মাসি?'
'না ,বৌমা।'
ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার খুলে হাতরে হাতরে দুল খুঁজছে ।আসলে প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও তাড়াহুড়ো করে রেখে দিচ্ছে।দুলের একটা নির্দিষ্ট জায়গায়  রাখার কথা কিন্তু সেখানে তো নেই। কোথায় রেখেছে সেটা বুঝে উঠতে পারছে না। আমার সেই ঝুমকো কানের দুল টা কোথায় গেল খুঁজে পাচ্ছিনা। আছে এদিক ওদিক কিন্তু এখন কাজের সময় পাবো না আর একটা কথা বলি 
,'মাসি অসুবিধে হলে পাশের বাড়ি পার্থকে ডেকে নিও ,বলে দেবে বা আমাদের এই সামনের দোকানে সেন্টুদা ,ঠিক আছে । তাছাড়া চৈতি, চৈতির মা জানে ব্যাপারটা। তোমার কোন অসুবিধা হবে না ।আর  কোন অসুবিধা হলে, তুমি সঙ্গে সঙ্গে ওদেরকে বলবে। ওরা ফোন করে 
দেবে ,ঠিক আছে ।কোন টেনশন করো না।
 ট্রেনের টাইম হয়ে গেছে মাসি আর বেশি বকতে পারবো না। তুমি দরজা লক করে দাও ।ঠিক আছে?'
'ছেলে কখন খাবে?'
থাকবে না বলেই জানি। অফিস যাবে আজকে আজকে আবার কিসের অফিস কে জানে  বাবা। যাইহোক যখন বলবে ওকে খেতে  দিও আর তুমিও খেয়ে নিও ঠিক আছে ।আসছি ।টা টা।
সঙ্গে সঙ্গেই অটো দেখতে পেল হাতের ইশারায় ওকে দাঁড় করালো। 
অটোআলা কাছে এসে বলল 'বসুন দিদি।
আজকে আপনাদের যেতে হবে দিদি?'
মাঝে মাঝে এত বেশি কৌতূহল দেখালে বিরক্তি লাগে তবু রেখা বলল
' তা যেতে হবে না ।তাহলে পূজোর কাজ গুলো কে করবে?'
'ও আচ্ছা ,আচ্ছা দিদি।'
'ট্রেনের টাইম হয়ে গেছে একটু দ্রুত চালাও।
আমিতো দ্রুত চালাচ্ছি দিদি। আমিও তো ট্রেনটা ধরাবো।আসলে আমি ট্রেনের কিছু প্যাসেঞ্জার পাব আমার ই তো লাভ। '
রেখা আর কথা বাড়ায় না।
একা মনে মনে ভাবছে পুরোহিত যদি এসে যায় কি হবে ওদিকে কে জানে। পঞ্চমীদিকে তো বলা আছে ,কটা মেয়ের রাখা আছে, সব জোগাড় যন্ত্র করে রাখতে। সব ভালই ভালই হয় ।তবেই ভালো। বড়দি কত আশা করে দায়িত্ব দিয়েছেন।'
ট্রেনের খবর হচ্ছে ।স্টেশনে নামিয়ে দিল। ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে রেখা ছুটল। এই ট্রেন মিস করলে চলবে না। 
উফ হাফ লেগে গেল অবশেষে ট্রেন পাওয়া গেল।
ট্রেনে যেতে যেতে মনে পড়ে গেল স্বপ্নিলের কথা আজ ক বছর আগের কথা পাগলের মত চেয়েছিল রেখাকে। সরস্বতী পুজোর দিন স্বপ্নীল ওয়েট করেছিল বাইক নিয়ে।
রেখা বলেছিল তার আসার কোন দরকার নেই কেন শুধু শুধু মিথ্যে মরীচিকার পেছনে ছুটছে। মানুষ তো কোন আশা নিয়েই বাঁচে। স্বপ্নিলের কোন আশাi তো রেখা  পূর্ণ করতে পারবে
 না ।তাহলে?'
আজ অনেকদিন পর আবার মনে পড়ছে। কেন এতদিন পরে আবার স্বপ্নিলের কথা মনে পড়ছে?কোন ছবি ওর কাছে নেই তবুও মনের হৃদয় আকাশে যে ছবি এঁকে রেখেছে। তাকেই যেন বারবার ছুঁতে ইচ্ছে করছে। পেসেঞ্জার এমন ধাক্কা দিলো রেখাকে ।রেখা তো কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্যাসেঞ্জার ট্রেন থামলে ষ্টেশনে নেমে গেল অদ্ভুত ।এইভাবে কেউ ধাক্কা মারে?'
এরপর রেখা জিজ্ঞেস করতে লাগল 'কে ,কোথায় নামবে ।তার মধ্যে একজন বলল'আমি রানাঘাট নামবো।'
', বাবা, তার আগে কি আজকে কোথাও জায়গা পাওয়া যাবে না ।সরস্বতী পূজার দিনেও এত ভিড়?
আর হবেই বা না কেন এটাই তো বাঙালির ভ্যালেন্টাইন্স ডে।
আরো একজন প্যাসেঞ্জার কে জিজ্ঞেস করল আপনি কোথায় নামবেন দিদি। ও দিদি কোথায়?
ভদ্রমহিলা ট্রেনে উঠে বোধহয় একটা সুখনিদ্রা দিচ্ছিলেন ।তাই রেখার কথা থেকে বিরক্তি প্রকাশ হলো কিন্তু মুখে কিছু বললেন না।
'  আমি নামবো পালপাড়া।'
' তাহলে সিটটা আমাকে দেবেন। যেটুকু বসে
যাওয়া যায়।'
তারপরই রেখার ভাবনা চলে যায় অন্য জগতে।
রেখা মনে মনে ভাবলো রাতের আকাশে নিশ্চুপ সাক্ষী আছে ধ্রুবতারা। প্রাণের কাছাকাছি, হৃদয়ের কাছাকাছি যেতে পেরেছিল কি তারা? শুধু সেই জানে মন । হৃদয়ই শুধু জানে। 
  আর স্বপ্নীল ফিরবে না রেখার কাছে।  ভাবতে ভাবতেই পালপাড়া স্টেশনে এসে গেল ।
তিনি বললেন'ও দিদি আপনি বললেন 
বসবেন ।জায়গা নিন।'
রেখা কোন রকমে এগিয়ে আসলো  তারপর নির্দিষ্ট স্টেশন আসার সঙ্গে সঙ্গেই রেখা উঠে পড়ল।
ট্রেন থেকে নেমে রেখা দ্রুত ওভারব্রিজ অতিক্রম করে টোটো ধরল। তারপর স্কুলের গেটের কাছে এসে নামল । টোটো থেকে নামতেই দেখা গেল পঞ্চমীদি গেটের কাছে দাঁড়িয়ে।
' সব ঠিকঠাক হয়েছে তো?'
' কোন চিন্তা করবেন না । সব ঠিকঠাক করে রেখেছি। শুধু যেটুকু আমরা করতে পারবো না সেইটুকু আপনর জন্য রেখেছি।'
' ওকে, ওকে। চলো ,চলো।'
'মেয়েরা আসেনি।'
'ওদের নিয়েই তো করলাম।'
'খুব টেনশন ছিল।' 
 ' আমাকে যখন দায়িত্ব দিয়েছেন দিয়েছেন, পালন করব ই।'
জানি পঞ্চমীদি  শরীর বলেও তো একটা কথা আছে নাকি, বলো?তোমার হাতে তো সব কিছু নেই।'
পঞ্চমী একটু হাসল। হেসে বলল 'চলুন ,চলুন কিছু বাকি আছে ।দেখে নিন।'
রেখা সবকিছু দেখে নিতে নিতেই পুরোহিত মশাই এসে গেলেন ।পুজো হল ।পুজোর পর কয়েকজন সিনিয়র টিচার আসলেন ।তাদের সাথে কথা বলা হলো  ।
স্নিগ্ধাদি বললেন'পুজো হয়ে গেল রেখা?
ভেবেছিলাম অঞ্জলি দেব।
রেখা জিভ কেটে বললো এ বাবা দিদি আমাকে যদি একবার ফোনটা করতেন তাহলে ঠাকুর মশাইকে একটু ওয়েট করতে বলতাম।'
হ্যাঁ কি আর করা যাবে।
আসুন তো ভেতরে আসুন তো দিদি প্রসাদ নিন।
পঞ্চমী সব গুছিয়ে গেছে?
হ্যাঁ দিদি। এইতো মেয়েরাও এসে গেছে।
এই তোরা আয় প্রসাদ নিবি আয়।
দিদি চলুন স্টাফ রুমে চলুন।
 মেয়েদের প্রসাদ বিতরণ করে একটু স্টাফ রুমে গিয়ে বসল এর মধ্যেই ফোন বেজে উঠল।
ব্যস্ত থাকার দরুন ফোনটা রিসিভ করতে পারেনি
এবার ব্যাগ টা খুলে ফোনটা বের করতে যাচ্ছে ঠিক সেই সময়ে পঞ্চমী দি এসে বলল 'ও দিদি ,ফোন টোন পরে ঘাটবেন। আগে একটু প্রসাদ । তারপর জল খান।
'আমি কেন একা খাব? দিদিরা এসেছেন উনাদেরকে দাও ।আর তোমার প্রসাদ টুকুও 
নাও ।
সব মেয়েরা পেয়েছে!
হ্যাঁ , যারা এসেছিল,সবাইকে দিয়েছি ।আরেকটু প্রসাদ দিদিমনিদের জন্য তুলে রাখলাম ।'
'ভালো করেছো?
জোগারের বাসনপত্রগুলো ধুয়ে নি। আবার সন্ধ্যেবেলায় জোগাড় আছে তো?'
'যাও তুমি তোমার কাজগুলো সেরে নাও। এর মধ্যে কোন সিনিয়ার দিদি এসে গেলে আমি দিয়ে দেব।'
স্নিগ্ধা দি   বললেন'রেখা আসছি। এবার রিম্পা কে দেখতে পেলাম না।'
'এ বাবা ,দিদি। জানেন না রিম্পাদি তো টান্সফার হয়ে গেছে।'
অবাক হয়ে বললেন' ওমা কবে? সেকি গো?'
এইতো কিছুদিন আগে।
ও বাড়ির কাছে হলো বুঝি?
হ্যাঁ দিদি।
কবে শুনবো তুমিও চলে গেছো।
তুমি চলে গেলে স্কুল টা একটু অন্যরকম হবে এই যে সব অনুষ্ঠানে থাকো আমাদের এত আপ্যায়ন করো।
না দিদি ,কারোর জন্যই কোনো কিছু ঠেকে থাকে না ।ঠিক চলে যাবে। দেখবেন।'
জানি রেখা কিন্তু আজকাল কৃত্রিমতায় মোড়া আন্তরিকতায় বড্ড বড় অভাব।
'ঠিক আছে রেখা ।আসছি। খুব ভালো 
লাগলো ।ভালো থেকো।'
'হ্যাঁ, দিদি, ভালো থাকবেন আর এইভাবে স্কুলের সাথে যোগাযোগ রাখবেন। আসবেন ।বিদ্যালয়ের পাশে থাকবেন।'
এরপর রেখা ফোনটা ঘেটে দেখতে লাগল, বাড়ি থেকে কোন ফোন এসেছে কিনা?
' না ,কোন ফোন আসেনি। তাহলে মাসি ঠিকঠাক সামলাতে পারছে ,কোন অসুবিধা হয়নি 
একটু সন্ধিগ্ধ চিত্তে' তাহলে ফোনটা করলো কে?একটা আননোন নম্বর থেকে ফোন 
এসেছে  ।বেশ কয়েকবার মিসকল
 হয়েছে ।ফোনটা করবে ,কি করবে না ?এই দোটানায় পড়েছে রেখা।
ভাবতে ভাবতেই ফোন নম্বরটা ডায়াল 
করলো ।  ফোন টা বাজতে শুরু করেছে।
বুকের ভেতরে টিপটিপ করছে কে ফোন ধরবে কে জানে বাবা।
অপরপ্রান্ত থেকে কন্ঠ ভেসে আসলঃ
"হ্যালো
'বলছি এই নম্বর থেকে আমার ফোনে ফোন এসেছিল ।তাই আমি ফোনটা করলাম।
'কে বলছেন?'
তার আগে আপনি বলুন কে বলছেন?'
 গলাটা একটু চেনা চেনা লাগছে।
 তাহলে তো আপনি ধরেই ফেলেছেন।
 ঠিকই ধরেছেন ।বলুন তো কে ?
' ওই তো সিঁড়ি সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক।
'কোথায় আছেন স্কুলে?'
হ্যাঁ, আর সরস্বতী পুজো ,স্কুলে তো থাকতেই হবে?
কিছু বলবেন?
না ,না। ঠিক আছে ।আমি এমনি ফোন করেছিলাম।
ও আচ্ছা।
একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?
'ও শিওর, বলুন।'
আপনার কোন ফুল পছন্দ?
রেখা ভেতরে একটা অদম্য কৌতূহল সৃষ্টি হলো হঠাৎ ফুলের কথা জিজ্ঞেস করছেন কেন আপন মনে ভাবল।
কি ম্যাডাম উত্তর দিচ্ছেন না।
সাধারণত যে ফুল পছন্দ আমারও সেই ফুল পছন্দ।
ম্যাক্সিমামই তো বলে গোলাপ।
রেখা হো , হো, হো,করে হাসতে লাগলো।
হাসলে হবে না ম্যাডাম বলুন না ,দরকার আছে।
স্বর্ণচাঁপা।
'এটাই জানার ছিল।
তারপর বললেন ঠিক আছে ম্যাডাম রাখছি আপনি পুজো ভাল করে কাটান।'
স্বর্ণচাঁপার প্রসঙ্গে রেখার মন চলে গেল বর্ষার সেই দিনগুলোতে বর্ষায় কি করে এই স্বর্ণচাঁপা ফুল গুলোকে স্বপ্নীল তার জন্য নৈবেদ্য সাজিয়েছিল খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল রেখা এগুলো কোথায় পেলে তাতে স্বপ্নীল বলেছিল তুমি খুশি হয়েছো একরাশ মুগ্ধতা আর চোখে মুখে সেই প্রশ্ন বুঝিয়ে দিয়েছিল সে কতটা খুশি এতটাই মুগ্ধ হয়েছিল যে অনেকক্ষণ সে কথা বলতে ভুলে গেছিল সে ভেবেছিল কোথা থেকে ফুলগুলো তার জন্য এনেছে সে ?সে পরম আদরে আদরে চাপা ফুলগুলোকে তার মুঠোয় ভরে নিয়ে গভীরভাবে তার ঘ্রাণ নিতে থাকলো  সেই সুগন্ধ যেন তার হৃদয়ের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পরলো। আবার রেখা  মৃদু স্বরে বলেছিল 'এত সুন্দর উপহার সে কখনো জীবনে পায়নি।'
কেন বারবার এই সম্পাদকের কথায় পুরনো দিনগুলো স্মৃতিতে ভিড় করে ফিরে আসে। আবার যেন তার মনে হলো কেউ যেন তার বসন্তের দরজায় নতুন করে নাড়া দিচ্ছে কিন্তু কে তার ছবিও তো কখনো সে দেখেনি অনেক কথাতে মিল খুঁজে পায়।
মনে পড়ে সেই গান 'কেন এতদিন পরে আজ তোমায় মনে পড়ে।
আমি কাঁদি নতুন করে সে তোমার ছবি ধরে।
আমার লাগছে যে অসহায় ... আমার হয়না ছোঁয়া তোমায় স্বপ্ন কেনার দরে।'
সত্যি তাই একবার সরস্বতী পুজোর সময় না জানিয়ে কেমন স্কুল গেটে এসে দাঁড়িয়েছিল স্কুল থেকে বেরোনোর সময় হঠাৎ করে তার বাইক এসে সামনে দাঁড়ায় কেমন হকচকিয়ে গেছিল রেখায় দিশেহারা হয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে যখন বলেছিল কেন তুমি এখানে এসেছ ,,?তখন স্বপ্নীল বলেছিল আর যদি তুমি আমার বাইকে না যাও তাহলে কিন্তু আমি এখানে দাঁড়িয়ে 
থাকবো ?বাধ্য হয়ে রেখাকে বাইকে চাপতে হয়েছিল ।সেদিনের সেই যাত্রাপথ কতটা সুন্দর ছিল। একমাত্র রেখাই জানে আর স্বপ্নীল 
জানে ।সেখানে ছিল না কোনো মলিনতা। একরাশ বিশ্বাস,.....।
শুধু এখন ভেবে কষ্ট লাগে জানি তুমি আর ফিরবে না ।নিভে যাওয়া দ্বীপ আর জ্বালবে না শুধু প্রতি নিঃশ্বাসে কষ্ট  আমি না হয় আমার মত থাকলাম ।শুধু নিজে ভালো থেকো ।অনেক ভালো থেকো আর নিজের খেয়াল রেখো ।প্লিজ নিজের খেয়াল রেখো।'

মমতা রায়চৌধুরীর ধারাবাহিক পর্ব ১২০




উপন্যাস 

টানাপোড়েন ১২০
অনুসন্ধিৎসু
মমতা রায়চৌধুরী।



উফ কাজের চাপে আর মাথা তুলতে পারছে না রেখা ।স্কুলের কাজগুলো বাড়ি বয়ে  নিয়ে চলে এসেছে। না এনেই বা কি করবে? প্যানডেমিক সিচুয়েশনে তো মেয়ের সংখ্যা বেশি নেই,  যদিও স্কুল টা খুলে দিয়েছে  ।ম্যাগাজিনের প্রকাশের গুরু দায়িত্ব তার ওপর পড়েছে । সময় বেশী নেই তাই লেখাগুলো কারেকশন করতে  এবার দিদিমণিদের হাত লাগাতে হচ্ছে ,সেগুলিকে ফ্রেশ করে লেখার জন্য। তারপর চারিদিকে কাটিং এর কাজ আছে ,কাটিং এর কাজ করতো রিম্পা দি, 
তার তুলনা নেই।  খুব মিস করছে। তবে অনুরাধাদির হাতের লেখা খুব ভালো। অনুরাধাদি বলেছেন " চিন্তা ক'রো না  তুমি কিছুটা লেখ তারপর আমাকে দিও ।আমি করে দেব।'
এরপর বিদ্যালয় সাজানো। নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছে। শরীরটাও বেশি ভালো যাচ্ছে না । ভালো থাকলে এরকম কষ্ট হয়না। এরমধ্যে বাচ্চাগুলো আবার অসুস্থ হয়েছে।  পারা যায়?
না গিয়ে দেখি ,কিছু খায় কিনা? এতক্ষণ ঘাড় গুঁজে লেখাগুলোকে কারেকশন করা
 হলো । মাথাটা তুলে একবার দরজার দিকে তাকিয়ে ভাবল 'আজকে তো চেঁচাল না ।'দেখি তো কি করছে ?
রেখা বাচ্চাগুলোর কাছে গেল ।কাছে গিয়ে ওদের  টেনে টেনে তুলতে হচ্ছে ,শুয়েই আছে।
ওমা একি পাইলট তুই বমি করছ?
কি বাবা এসব কি বেরোচ্ছে বমি দিয়ে, কি 
খেয়েছ ?এগুলো কি? এত ভালো জিনিস তোমাদের খাওয়ানো হয় , তারপরেও হিজিবিজি কাঠের গুঁড়ো, ইটের গুঁড়ো ,এগুলো কোথায় পেয়েছ? পুরনো দেয়ালটাকে নিচের অংশটুকু
 খু ড়ছ ,তারপর খেয়েছ?'
একরাশ বিরক্তি আর দুর্ভাবনা নিয়ে রেখা বলল
'তোমাদের খেতে দেয়া হয় না তো।'
কি বলবে? ওরা কি আর রেখার ভাষা বুঝতে পারছে? শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে আর মাঝে মাঝে রেখার গালদুটোকে এসে আদর করে দিচ্ছে।'
একটা উৎকণ্ঠা আর দুর্ভাবনা নিয়ে ভাবলো আবার ডাক্তার বাবুকে কল করতে হবে।
মনোজকে  ব্যাপারটা খুলে বলি।
রেখা দ্রুতগতিতে মনোজের ঘরে ঢুকলো।
দরজায় নক করল ।'কিছু বলবে?'
'হ্যাঁ বাচ্চাগুলোর ব্যাপারে কথা ছিল?
'কি হয়েছে?'
'দুপুরবেলা তুমি খেয়াল করো নি বাচ্চাগুলো খেয়েছি কিনা?'
"না দুপুর বেলায় ওরা তো খায় নি।'
আমি এখন গেলাম গিয়ে দেখছি তিনজন শুয়ে আছে ।ওদেরকে ধরে ধরে তোলা হলো  আসলো কাছে। পাইলট বমি করল।'
মনোজ আশ্চর্য হয়ে বলল ' কি বমি করেছে?'
'তবে আর বলছি কি সবথেকে আশ্চর্য লাগছে বমির সাথে কি বেরোচ্ছে জানো?'
 মনোজ হাঁ করে রেখার উত্তরের অপেক্ষায় থাকলো।
বমির সাথে ইটের গুঁড়ো ,কাঠের গুঁড়ো এসব বেরোচ্ছে।
'ওরা এসব পেল কোথায়?'
তোমাদের পুরনো বাড়ি না ,পুরনো দেয়ালের কিছুটা অংশ বেরিয়ে আছে আর তার সঙ্গে মেজেটার অবস্থাও ওই। ওখান থেকেই।'
'না এদের নিয়ে তো আর পারা যাচ্ছে না।
এত ভাল ভাল খাবার খাওয়ানো
 হচ্ছে ।তারপরেও এই।'
রেখাও চিন্তিত মুখে মনোজের কথাবার্তা শুনতে লাগলো। তারপর মনোজ বলল 'হ্যাঁ দেখি ডাক্তার বাবুকে কল করি।'
"আমি তো সেই জন্যই বলতে আসলাম।'
মনোজ একটু চিন্তিত ভাবে বলল'তবে এখন তো ডাক্তার বাবুকে ফোন করলেও পাওয়া যাবে না। একটু পরে ছাড়া।'
তাহলে এক কাজ করি এর আগের বারে ডাক্তারবাবু যে ওষুধগুলো দিয়েছিলেন সেগুলোই ওদের খাইয়ে দি একটু করে কি বল?'
"হ্যাঁ সেই ভালো সেটাই করো আপাতত।'
রেখা বিন্দুমাত্র দেরি না করে তাড়াতাড়ি ছুটে গেল ঘরে ওদের যে ওষুধের ডিব্বা আছে তার থেকে দেখলো কি কি ওষুধ আছে বেঁচে আছে ওষুধের শিশি টা ভালো করে নাড়ালো।
Rantac syrup হাতে নিয়ে মনোজ কে উদ্দেশ্য করে বলল 
'তাড়াতাড়ি এসো তুমি ।ধরবে। না হলে খাওয়ানো যাবে না।'
মনোজ বলল ', চলো, চলো, চলো, যাচ্ছি।'
যেতে যেতে রেখা শুনতে পেল কাকে যেন বলছে 'এসে পরে কল ব্যাক করছি।'
কার সাথে এত কথা বলে কে জানে অথচ ঘরের লোকের সঙ্গে কথা বলার সময় নেই। আজকাল আমার দিকে ঠিক করে তাকায়ও না। কপালে যেটুকু নিয়ে এসেছি সেটুকুই তো…।
মনোজ বললো' কই ওষুধ টা  কই? ভালো করে ঝাকিয়ে  নাও।'
রেখা ওষুধ টা ভালো করে ঝাঁকাতে শুরু করলো এরমধ্যে মনোজ বাচ্চাগুলোর কাছে গিয়ে বললো
' কই আমার পাই লট, আমাদের তুলি সোনা ,কই ? সবাই সব এক এক করে বেরিয়ে আসলো ।একটা বড় হাই তুলল।
একটা একটা করে ধরলো'রেখা ওষুধ খাইয়ে দিল।
খাওয়ানোর শেষে প্রত্যেককে দুজনে মিলে আদর করল ।তারপর  মনোজ বললো 'দেখা যাক কি হয়  রাত্রিবেলায় ফোন করবো ডাক্তারবাবুকে।'
রেখা বাথরূমে গিয়ে ভাল করে হাত পরিষ্কার করল । কিছুটা চোখেমুখে ঠান্ডা জল দিল কিন্তু বাথরুম থেকে জলের শব্দের সঙ্গে সঙ্গে তার কাছে ফোনের শব্দটাও শোনা যাচ্ছে । 
রেখা বেরিয়ে এসে হাতমুখ ধুয়ে মুছে নিতে নিতে একবার ভাবলো' কি যে হচ্ছে বুঝতে পারছে না সে। সারাদিন গেল এভাবেই। একটু ক্লান্তি লাগছে কিন্তু না চা খেতেই হবে। এই সময়টা কফি হলে খুব ভালো হতো। প্রতিবার শীতের মরসুমে খুব ভালো করে কফি খায় ।ভাবতে লাগল আগে স্কুল থেকে ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই ও (মনোজ)কফি করে 
ফেলত ।দুজনের জমানো কথা যেন সেই কফি টেবিলে বসেই শেয়ার
 করত ।কোথায় গেল সেই সোনালী দিনগুলো। একটা দীর্ঘশ্বাস  ফেলে নিয়ে নিজেই গেল রান্না ঘরে। তারপর গ্যাসের চুলায় প্যানে চায়ের জল বসিয়ে 
দিল ।ভাবছিল কফি করবে কিন্তু দেখল কফি নেই ।যাই হোক গ্যাসের চুলায় প্যানেতে জল গরম হতেই দুধ দিয়ে দিল, কি করবে চা ই খাবে ।যা হবে, হবে। ভালো করে জল ফুটলে ফোটানো দুধ ভালো করে মেশালো, চা পাতা 
দিল ।রেখার যেন কেমন পাগল পাগল মনে হতে লাগলো। খুব সুন্দর গন্ধ বেরোচ্ছে চা পাতাটা  থেকে ।নতুন এনেছে আপনমনে বললো।
নিজের কাপে চা ঢাললো , মনোজের জন্য  কাপে ঢেলে, কাপ দুটো নিয়ে মনোজের ঘরের দিকে গেল।একদম ভালো লাগছে না। একটু মুখরোচক কিছু খেতে ইচ্ছে করছে। চানাচুর নিল। মনোজ ঘরে গিয়ে চা টা নামিয়ে বলল '
' চা ।বিস্কিট খাবে তো?'
মনোজ তখন ফোনে কার সঙ্গে কথা বলছিল । 
' চায়ের সঙ্গে বিস্কুট নেবে ।'
'দাও একটা  '।
'বেশ খোশ মেজাজে গল্প করছে ।কে ফোন করেছে মনোজকে ?'
কার সাথে কথা বলছে।তাচ্ছিল্যের স্বরে আপন মনে বলল' বলুক গে যার সাথে খুশি। '
ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে শুনতে পেল হাসির শব্দের সঙ্গে বিয়ে 
শব্দটা ।রেখা ভাবতে লাগল কার বিয়ে?
 এত হাসিখুশি নিজের টেবিলে বসে চা খাচ্ছে আর পেপারটা উল্টাচ্ছে।'
'বাহ ,আবার লেখা বেরিয়েছে 
স্বপ্নীলের ।অসাধারণ ।কি দারুন লিখেছে। এত ভালো লাগছে, মনটা ভাল হয়ে গেল। এক চুমুক চা খেয়ে, বাকি স্বপ্নিলের লেখায় নিজেকে ডুবিয়ে দিল।চা ঠান্ডা হয়ে গেল। ক্লান্তি দূরে চলে গেল। যেমন ছন্দ ,তেমনি বাস্তবতা, কি অসাধারণ ভাবে ফুটে উঠেছে।
হঠাৎই মনোজের গলা পাওয়া গেল 'রেখা ,রেখা ,রেখা. আ. আ. আ...।
মনোজ একদম বাইরে বেরিয়ে এসে চিৎকার করে বলল 'কার ভাবনায় মগ্ন বলো তো তুমি ?তোমাকে কখন থেকে ডাকছি ,পাড়ার লোক বোধহয় এবার ছুটে আসবে আমার ডাক শুনে।
রেখা একেবারে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো বলল  হ্যাঁ, কি বলছো ?বলো?'
সুরোফোন করেছিল ? আবার আজকে  ফোন কেটে দিল ।তুমি এত বেয়াক্কেল হয়ে যাচ্ছ কেন বলতো? কোন কান্ডজ্ঞান নেই ।কি হচ্ছে এসব। কি জানি বাবা।
মনোজ মেজাজ দেখিয়ে আবার ঘরে চলে গেল।
ভাবলো তাইতো সে এতটাই মগ্ন হয়ে পড়েছিল, আনমনে চায়ের কাপে চুমুক দিতে গিয়ে দেখল  'ওরে বাপরে কি ঠান্ডা হয়ে গেছে ।সত্যিই রেখার খুবই ভুল হয়ে গেছে। কি জন্য ফোন করছে কে জানে?'
রেখা একটু ভয়ে ভয়ে আর উদ্বিগ্নচিত্তে মনোজের ঘরে গেল ।দেখে মনে হচ্ছে এক মনে ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে বসে কি যেন মাঝে মাঝে টাইপ করে যাচ্ছে। রেখার উপস্থিতি টের পেলো কিনা বোঝা যাচ্ছে না। এর মধ্যেই একটা টিকটিকি ধপ করে পড়ল নিচে ।দুজনার মাঝে যেন দুজন দুজনের উপস্থিতিটাকে স্মরণ করিয়ে দিল । মনোজ রেখার দিকে তাকিয়ে বলল' কি ব্যাপার তুমি এখানে?'
না মানে সুরোদা কেন ফোন করেছিল সেটাই জানার জন্য এসেছি।
কোন কথার উত্তর দিল না ল্যাপটপে টাইপ করেই যাচ্ছে।।
 খুবই কি দরকার?
মনোজ বলল' দু দুবার এরকম হল। তুমি এমন ভাব দেখাও যেন সারা রাজ্যের কাজ তুমি শুধু একাই করো। অন্য কেউ করে না। '
'তুমি এভাবে কেন আমার সঙ্গে কথা বলছ ?'
তুমি প্রায়ই আজকাল আমার সঙ্গে এভাবে কথা বলো।
 কেন ?কেন বলতো?'
'কেন তুমি বোঝনা ?কেন কথা
 বলি ?'
রেখাএকটু ভেতরে ভেতরে ফুসছে '
বলল 'না আমি বুঝিনা  ।তাই তো তোমাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করছি। বলো কি জন্য?'
'তুমি কি আমার সঙ্গে ঝগড়া করার মুড নিয়ে এসছে এখানে ।তাহলে সরি এখন তোমার সঙ্গে ঝগড়া করার আমার কোন মুড নেই।'
Ok
রেখা আবার চলে আসলো।
কাপ  খুব যত্নে রেখে দিল ।তারপর ভাবল একটু নিজের বিছানায় গিয়ে ঘুমিয়ে নেবে ।এতগুলো কথা  ভেবে ভেতরে ভেতরে খুব কষ্ট হচ্ছে।
কিন্তু রাত্রে খাবার  তো তৈরি করতে হবে আগের মত মনোজর মন ভালো থাকলে আমার এত কাজ অসুবিধার কথা জানলে ও বলত' থাক কিছু করতে হবে না  ।আমি হোটেল থেকে নিয়ে আসছি কিন্তু আজকাল সেটাও করে না।
কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। রান্নাঘরে গিয়ে ফ্রিজ থেকে আটা বের করে গোটা চারেক রুটি করে ফেলল ।আর রুটির সঙ্গে খাবার জন্য ব্রকলি ফ্রাই বানিয়ে ফেলল।  আর একটা করে ডিম সেদ্ধ।
বাচ্চাগুলোর জন্য অল্প করে খাবার নিয়ে গেল খাওয়াতে। অল্প পরিমাণে খেলো। হাতে ওদের এঁটো থালাটা নিয়ে রাখতে যাবে তখনই কলিংবেলের আওয়াজ ''জয় গনেশ,' জয় গনেশ , জয় গনেশ দেবা'। 
রান্না ঘর রেখা বলে উঠল ' এখন আবার কে আসল?'
এবার মনোজই  গিয়ে দরজা খুলল।
এ কি পার্থ, এই সময়?
'এসো ,এসো ,ভেতরে এসো ।
রেখা দেখ,  পার্থ এসেছে। '
হাতের  এঁটো থালা নামিয়ে
'আরে পার্থ ভাই , এই সময়?
সব ঠিক তো,?
"হ্যাঁ এমনি সব ঠিক আছে  একটা কথা বলার জন্য আসলাম বৌদি।"
 রেখা
উৎসুক ভাবে মনোজের মুখের দিকে তাকাল ,সঙ্গে সঙ্গে পার্থর মুখের দিকেও।
সে রকম ব্যাপার কিছু নয় বৌদি।'
'মা একবার আপনাকে যেতে বলেছে।'
'কেন কিছু ব্যাপার আছে?'
পার্থ হেসে বলল 'সেটা আপনি মায়ের কাছ থেকেই শুনে নেবেন। এটাই বলার জন্য এসেছিলাম । অবশ্যই কিন্তু যাবেন কেমন।'
পার্থ চলে যাবার পর রেখা ভাবতে লাগলো 'আজকের পার্থ র চোখ মুখে ফুটে উঠেছে দুশ্চিন্তামুক্ত এক অনাবিল ভালোবাসার মুক্ত আকাশ।'এতদিনের টানাপোড়েন কি তবে শেষ হলো? ভাবতে ভাবতেই রেখা র হৃদয়ে থেকে গেল একরাশ কৌতূহল ।
অনুসন্ধিৎসু মন রহস্যের সাগরে ডুব দিল।

কবি সানি সরকার এর কবিতা "খাঁচার বাইরেটা যেমন"




খাঁচার বাইরেটা যেমন

সানি সরকার



স্বপ্নে এত গোলাপ ফুটেছে বাগানে 
ওই শীতের গোলাপ 

খাঁচার বাইরেটায় এত হাসি, আনন্দ... 

মায়া-ডাক এমনি, ঘূর্ণির মতন 
ভেতরে তোলপাড়... 

কিন্তু ঘুর্ণির সময়কাল নির্দিষ্ট 

সূর্যের থেকে প্রকৃত আলো 
আর কিছু নেই,লক্ষ্য করো 
ঈশ্বর হাসছেন,একইভাবে সর্বত্র 

মোঃ ইসমাঈল এর কবিতা





রীতি
মোঃ ইসমাঈল 

আহা কতই না সুন্দর দেখতে ফুল
চোখ আসে জুড়িয়ে হয়ে যায় ব্যাকুল। 
যখনই নাকে আসে ফুলের ঘ্রাণ
পরম শান্তিতে জুড়ায় এ মন ও প্রাণ। 

মৌমাছিরা ফুল থেকে করে মধু আহরণ
তোমারই মনের গহিনে আমি করিবো বিচরণ।
ফুল ফুটে বসন্তের ঋতুতে
আমি হারিয়ে যাবো কেবল শুধু তোমাতে।

ফুল ফুটে ফল ধরিয়ে যায় সে ঝড়ে
মানুষ অভিনয়ের মাঝে যায় যে মরে।
অবশেষে হয়ে যায় ফুলের ইতি
অপরদিকে মানুষের বেঁচে থাকে শুধুই স্মৃতি।

এম এ শোয়েব দুলাল এর কবিতা




নদীও ভালোবাসা
এম এ শোয়েব দুলাল

নদীকে ভালোবেসে
নদীর কাছে এসো
নদীর মতো আপন করে
আমাকে ভালোবাসো।

নদীর জলে দেখবো শুধু
উতাল পাতাল ঢেউ
তুমি থাকবে আমি থাকবো
থাকবে না আর কেউ।

হেসে হেসে কথা বলে
হবো দিশেহারা
আমাদের দেখে হাসবে শুধু
আকাশের তারা।

কথা গুলো গুছিয়ে রাখো
সময়ের জালে
তোমার আমার ভালোবাসা
হবে মহাকালে।

মনি জামান এর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৫




ধারাবাহিক উপন্যাস
সেদিন গোধূলি সন্ধ্যা ছিল
( ১৫ তম পর্ব ) 
মনি জামান

রাত্রি শেষে ভোরের আলো ফুটলো ফজরের আযান ধ্বনিতে মুখর চারিদিক,মোমেনা বেগম ভোরে পাড়ার লোকজন ডাকলো তার আর যেন তর সইছে না,চারি দিক যত ফর্সা হচ্ছে ততো দলে দলে পাড়ার সবাই হাজির হচ্ছে মোমেনা বেগমের বাড়ি মনে হয় আজ কোন মহাযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হবে।
আজ দুশ্চরিত্রা আসমার বিচার হবে মানুষের ভিতর উৎসাহের কমতি নেই,সবাই এসে হাজির হয়েছে,ঘর থেকে আসমাকে বের করে আনা হলো,পাড়ার গণ্যমান্য ব্যাক্তিরা এসে সবাই উপস্তিত হলো,আসমা এক পাশে মুখ নীচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
মোমেনা বেগম বললেন,আপনরা সবাই উপস্তিত আছেন এই মেয়ে আমার বংশে চুনকালি মাখিয়েছে,আজ বিচার আপনাদের উপর ছেড়ে দিলাম আপনাদের মতামত বলুন কি শাস্তি দেওয়া যায়।
আসমা যে অপরাধ করেছে সে নিয়ে এক জন মন্তব্য করলো যেহেতু আসমা চরিত্রহীন খারাপ একটা বাজে মেয়ে,সে হাতে নাতে ধরা পড়েছে তাই তার শাস্তি হওয়া উচিত তার শাস্তি হোক মুখে চুন কালি মাখিয়ে এ গ্রাম থেকে বের করে দেওয়া।
কেউ বলছে এমন বিচার হোক যাতে ভবিষ্যতে কেউ আর এমন অপরাধ এই গ্রামে আর না করে,কেউ বলছে মাথার চুল কেটে গলায় জুতার মালা পরানো হোক।আসমা জানে আজ তার কথা কেউ বিশ্বাস করবে না তাই নির্বাক দাঁড়িয়ে আছে,সারা রাত ঘুম হয়নি শরীর ভিষণ ক্লান্ত লাগছে বাকরুদ্ধ সে।
একজন বলল,আসামির কাছে কিছু জিজ্ঞেস করা হোক সে দোষী না নির্দোষী,
তারও তো কিছু বলার থাকতে পারে
সবাই সমস্বরে বলে উঠলো হ্যাঁ আসামি কিছু বলুক,প্রশ্ন করা হলো আসমাকে যে ঘটনা ঘটেছে তা নিয়ে তোমার কিছু বলার থাকলে বলতে পারো,আসমা কিছুই বললো না,আসমা নিরবে সমস্ত অপরাধ আজ নিজের কাধে তুলে নিয়েছে,কারণ সে জানে আজ তার কথা কেউ শুনবেনা ,জীবনে কি চেয়েছিল আর কি পেতে যাচ্ছে সে।
আজ তার রাজকুমার জিকুর উপর খুব অভিমান আসমার,কেন সে তাকে ছেড়ে চলে গেল,বিচারে সিদ্ধান্ত হল আসমার মাথার চুল কেটে গলায় জুতার মালা পরিয়ে সমস্ত গ্রাম ঘুরানো হবে,ঘুরানো শেষে এ গ্রাম ছাড়া করে দেওয়া হবে তাকে।
মোমেনা বেগম হুকুম করলো আসমার মাথার চুল কাটার জন্য,একজন এগিয়ে এসে আসমার মাথার চুল কাটতে শুরু করলো,কোন প্রতিবাদ করলো না আজ আসমা। এ নির্মম ভাগ্য পরিহাস মেনে নেওয়া ছাড়া তার কিছুই করার নেই তার আজ সে জঘন্য যড়যন্ত্রের স্বীকার তাই নিরবে বসে রইলো চুপচাপ চোখে জল ঝরছে অঝোরে,আজ এ নিষ্ঠুর পৃথিবীর প্রতি আসমার আর কোন অভিযোগ নেই,জিবনের সব চাওয়া পাওয়া আর কষ্ট গুলো সব নিজের কাছে জমা রেখেছে কারো কাছে প্রকাশ করলো না।
আজ ছেলে নয়নকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে আসমার,কিন্তু আসমা জানে তাকে দেখতে দেওয়া হবেনা তাই ইচ্ছেটা গোপনই রেখে দিল।আসমাকে সব চুল কেটে নেড়া করা হলো তারপর গলায় জুতার মালা পরানো হলো মুখে চুন কালিও মাখাতে মোমেনা বেগম ভুল করলো না।
আসমাকে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরানো হলো
পাড়ার মানুষেরা ছিঃ ছিঃ বলে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে, দলে দলে ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা আনন্দ উল্লাস করে ইট পাটকেল ছুড়ে মারছে আসমাকে,আর বলছে পাগলি পাগলি করে পিছু পিছু চিৎকার করছে,পাড়ার এক ছেলে ফিরোজকে সংবাদ দিল আসমার এই বিচারের নির্মম ঘটনার কথা।
ফিরোজ শুনে ছুটলো মোমেনা বেগমের বাড়ি,এসে যা দেখলো তা কোন মানুষ করতে পারে ফিরোজের জানা ছিলো না,ফিরোজ দেখতে পেলো অনেক লোকজন আসমাকে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে ফিরোজ লোকজনকে বলল,আপনারা আইন হাতে এভাবে তুলে নিতে পারেন না,সবাই বাড়ি চলে যান প্রশাসন আছে আসমা অপরাধী হলে তারা বিচার করবে।
ফিরোজের কথা শুনে সবাই মনে মনে একটু ভয় পেয়ে যার যার বাড়ির দিকে চলে গেলো,ফিরোজের দু'চোখে পানি আবেগ তাড়িত কন্ঠে বলল,ভাবি আমাকে কেন একটি বার খবর দিলেননা।আসমা নির্বাক কিছু বললো না,আজ আসমার কিছুই নেই সে সর্বহারা সে বোবা হয়ে গেছে।
ফিরোজ আসমাকে বলল,ভাবি চলেন আমার বাড়ি বলে আসমাকে সাথে নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হলো,সবাই বলতে শুরু করলো দেখ দেখ ফিরোজ ঐ মাগীর সাথে,কেউ বলল জানি জানি বলে সবাই হাসা হাসি করলো।
ফিরোজ শুনেও না শুনার ভান করে আসমাকে সাথে নিয়ে বাড়ি পথে হাঁটা শুরু করলো।বিকালে ফিরোজ বলল,ভাবি আজ থেকে আপনি আমার বাড়িতে থাকবেন,আমি বাজারে যাচ্ছি গিয়ে ডাক্তার পাঠাচ্ছি বলেই ফিরোজ তার ছোট বোন জান্নাতকে ডেকে বলল,ভাবির কাছে থাকিস কোথাও যাসনা যেন, বলে ফিরোজ চলে গেলো ভবদা বাজারে,হাট থেকে আসমার জন্য শাড়ি ব্লাউজ ঔষধ আর কিছু ফল কিনে নিয়ে ফিরোজ বাসায় এলো।
রাত নামলো আসমা জান্নাতকে বলল,বোন একটা কলম আর একটা কাগজ দেবে আমাকে,জান্নাত বলল,কেন দেবনা ভাবি আমি এনে দিচ্ছি,একটু পর জান্নাত কাগজ আর কলম এনে দিলো আসমাকে।গভীর রাত মনের কষ্টে আসমা লিখলো
-------
কষ্ট তুই একটু অপেক্ষা কর,
আজ রাত ভর সমুদ্র উত্তাল 
হয়নি।
স্রোতম্বী নদী হয়তো মোহনা 
খুঁজে পায়নি,সমুদ্রের ঠিকানা।
গাঙচিল উড়ে উড়ুক কষ্টেরা 
খুরে খায় খাক।
তবুও একটু অপেক্ষা কর,পূর্ণ 
একটি পূর্ণিমা উদিত হোক আজ।
ভোরের আলো ফুঁটলে না হয় 
সলিল সমাধির একটি গল্প 
লিখিস।
উত্তাল সমুদ্রে ভেসে যাওয়া 
একটি মৃত লাশের। 

লিখা শেষ হলে আসমার দু'চোখ ভেঙ্গে অঝোর ধারায় যেন বৃষ্টি পড়তে শুরু করলো,আসমা ভাবছে এ পৃথিবীতে তার আর কেউ আপন রইলো না।সন্তান থেকেও নেই,মা বাবার বাড়ি এ কলঙ্কিত মুখ নিয়ে আসমা আর কখনো ফিরে যাবে না।তার রাজকুমার জিকুর কাছেই ফিরে যাবে সে,আসমা সারা রাত ঘুমালোনা মনে হয় ঘুম ও তার শত্রু হয়ে গেছে।
ভোরের আলো ফুটলো আসমা চোখ বুজে শুয়ে আছে,আস্তে আস্তে বেলা বাড়ছে। সকাল আটটায় ফিরোজ আজ ঢাকায় যাবে,আসমাকে ডাকলো ভাবি নাস্তা খেয়ে নেন।আসমা উঠে ফ্রেস হয়ে নাস্তার টেবিলে এসে বসলো,জান্নাত ফিরোজ আর আসমাকে নাস্তা দিল,নাস্তা খাওয়া শেষে আসমা ফিরোজকে বলল,একটা কথা রাখবে ভাই,ফিরোজ বলল, কি কথা বলেন ভাবি।
আসমা বলল,আমার একটা ডায়রি আছে অনেক লেখা একসময় তোমার দৈনিকে ছাপাবে ভাই বলে ফিরোজের হাতে রাতের লেখাটাও দিয়ে বলল তোমার কাগজে দিও।ফিরোজ বলল,ঠিক আছে ভাবি কাল আপনার এই লেখাটা দৈনিক ভবদা সাহিত্য পাতায় প্রকাশ হবে,আমি আজ ঢাকায় যাচ্ছি একটু কাজে কাল সকালে ফিরবো, কোন কিছুর দরকার হলে জান্নাতকে বলবেন,বলেই ফিরোজ ব্যাগ পত্র নিয়ে বেরিয়ে গেলো।
আসমা সারারাত ঘুমালো না জীবনে কি চেয়েছিলো আর কি পেলো,ভাবছে আজ কলঙ্কিনী সে এ মুখ এই সমাজে কি করে দেখাবে।সমাজের এই ঘৃণ্য যড় যন্ত্রের কাছে আজ পরাজিত সে।


চলবে....