১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২

মমতা রায় চৌধুরী'র ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১০৫





উপন্যাস 


টানাপোড়েন ১০৫

তুমি রবে নীরবে

মমতা রায় চৌধুরী



স্টেশনে বেশ খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল কিকারনে দাঁড়িয়েছিল ,কেন দাঁড়িয়ে ছিল, তা জানেনা। একটা এলোমেলো ভাবনা বেখেয়ালি মনে ঘুরপাক খেতে শুরু করেছে। কজন ডেইলি প্যাসেঞ্জার এ ভাবে বসে থাকতে দেখে একটু অদ্ভুত ভাবে তাকালো বটে । রেখা খেয়াল করে নি তা নয় কিন্তু উঠলো না। সারাদিনে স্কুলে ঘটে যাওয়া ঘটনা আবার যেন ডানা মেলেছে । বাণীদি তার মাঝে যেন একরাশ টাটকা  অক্সিজেন হয়ে এসেছিল। বাড়িতে গিয়েই বা কি করবে সেই তো একাকীত্ব। তবুও মিলি, তুলি, পাইলট আছে বলে বাড়ি এখনও বাড়ি আছে। আজকাল দেরি হলেও মনোজ ফোন করে খবর নেয় না ।প্রয়োজন পড়ে না ।দৈনন্দিন জীবনের সামান্য চাওয়া-পাওয়াটুকু,  প্রত্যাশাটুকু যেন ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। তবুও বাচ্চা গুলোর কথা মনে হওয়াতে রেখা উঠে পরল 
তাড়াতাড়ি ।এবার অটো স্ট্যান্ডের দিকে এগোলো একজন অটোওয়ালা বলল ' ও দিদি, আপনি এত কি ভাবছিলেন ?আপনি যে অটোতে যান, সে কতবার আপনাকে ডাকল। আপনি শুনতেই পেলেন না ।'
রেখা বলল 'ও তাই বুঝি খেয়াল করিনি।'
 ওরা বলল' হ্যাঁ আমরাও  সেটাই ভাবছিলাম আপনি একমনে কী যেন একটা চিন্তা 
করছিলেন।'
 রেখা বলল' ঠিক আছে, তুমি যাবে
 তো ?'
অটোওয়ালা বলল' হ্যাঁ যাবো ,বসুন বসুন। বলেই এক যাত্রীকে বললেন 'দাদা ,আপনি একটু এদিকে সরে আসুন, দিদিকে বসতে দিন।
হঠাৎই ফোনের আওয়াজ''তুমি রবে নীরবে...। রিংটোন বেজে উঠলো।
পাশের ভদ্রলোক নিজের ব্যাগ হাতরাতে শুরু করলেন ।তারপর ফোন খুলে দেখছেন না নিজের না ।তখন তিনি বলেন 'দিদি বোধহয় আপনার ফোন বাজছে দেখুন।'
রেখা কতটা বেখেয়ালি হয়ে গেছে নিজের ব্যাগে ফোন বাজছে তবু হুশ নেই ।
তারপর বললো' ও থ্যাংকস। দাঁড়ান দেখছি। খুলে দেখছে মিসকল হয়ে পড়ে আছে রিম্পাদির।'
রেখা মনে মনে ভাবল অনেকদিন পর রিম্পাদি ফোন করলো। অবশ্য আমারও করা হয়ে ওঠেনি নানা কারণে।
রেখা ফোন লাগালো রিম্পাদিকে । রিং হচ্ছে এবার বলল হ্যালো'।
রেখা বলল 'ফোন করেছিলে রিম্পা দি?'
রিম্পা দি বলল 'হ্যাঁ। আর আমিও এইখানে এসে নানা কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম, তোকে ফোন করা হয়ে ওঠেনি রাগ করিস নি তো?'
রেখা বলল 'রাগ ,অভিমান, ভালোলাগা ,ভালোবাসা ,এগুলো আপেক্ষিক মনে হচ্ছে আজকাল জানো তো?'
রিম্পা দি বলল'তোর কি হয়েছে রে?'
রেখা বলল'কই কিছু নাতো?'
রিম্পা দি বলল 'বললেই হলো, কিছু হয়নি ।আমি তোকে চিনি না, জানি 
না ?কিছু তো একটা হয়েছে তুই আমার কাছে আড়াল করছিস।'
রেখা চুপ করে রইলো।
রিম্পাদি বলল' আমি কিন্তু প্রত্যাশা করেছিলাম তুই একবার ফোন করবি।
আমার প্রত্যাশা ভালো লাগার বিষয়গুলো কিন্তু হারিয়ে যায়নি জানিস তো।'
রেখা বলল' সবাই তো তোমার মত নয়।'
রিম্পা দি বলল 'তুই যদি বলতে না চাস আমি জোর করব না আর এখন তো আমি তোর কাছেও নেই যে আমি তোকে জোর খাটিয়ে জিজ্ঞেস করবো। তবে কি জানিস তো মনটা একটু হালকা করতে পারতিস ।মনে হচ্ছে আমি ট্রানস্ফার নিয়ে এসে অনেকটাই তোর কাছ থেকে দূরে সরে এসেছি।'
রেখা বললো 'রাগ করো না রিম্পা দি।'
রিম্পাদি বলল 'রাগ করব কেন
 বল ? আমি বুঝতে পারছি তো'র কিছু একটা হয়েছে তুই' বলতে চাইছিস না তা কি বলবো বল?'
রেখার চোখের জল পড়তে 
লাগল। গলার স্বর বেদনাক্রান্ত ।
রিম্পাদি বলল' কি হয়েছে বল না?'
রেখা বলল 'আমার সাথেই কেনো এরকম হয় বলতে পারো রিম্পা দি।'
রিম্পাদি বলল' স্কুলে কিছু হয়েছে না রে?'
অনিন্দিতার সঙ্গে কিছু ঝামেলা হয়নি তো তোর?'
রেখা ভাবছে কি করে বুঝতে পারে রিম্পা দি।
রিম্পাদি বলল 'কিরে কথা বলছিস না?'
রেখা বলল' তুমি যা ভেবেছ ঠিকই।_
রেখা স্কুলের ঘটনা সব রিম্পা দি কে বলল।
রিম্পা দি বলল সাংঘাতিক 
কান্ড ।সেকি রে সিনিয়র জুনিয়রের কোন মান মর্যাদা থাকবে না ।কি হচ্ছে এসব আর ওর এত বড় স্পর্ধা?. বড়দি কোথায় ছিল?
রেখা বললো 'বড়দি আজকে আসেন নি। তুমি চলে যাওয়াতে এমনিতেই আমার মনটা খুব খারাপ ছিল ।তারপর এইসব কান্ড ।আমার না স্কুলে যেতে একদমই ভালো লাগছেনা।
রিম্পা দি বলল 'সেই তো তুই এক কাজ কর তুইও কাছেপিঠে চলে আয় এবার। স্কুলকে ভালোবেসে থেকে গেলি এত বছর ।নিজের সংসারের প্রতি একটু ধ্যান দে।'
রিম্পা দি বলল তোকে  একটা খারাপ খবর দেবার আছে?
রেখা বলল'আবার খারাপ খবর?
রিম্পা দি বলল' এটা না দিলেই নয় ,.তোর একজন প্রিয় রাইটার তিনি তো চলে গেলেন না ফেরার দেশে।'
রেখা বলল 'জানো তো আজকে স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে অনেকক্ষণ একা একা বসে ছিলাম মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে গেছিল শুধু স্কুলের ঘটনাটা জন্যই নয়, এমনিতেও মনটা যেন কেমন আমার হয়ে গেল বুঝতে পারলাম না অনেকক্ষণ ছিলাম বসে।
রিম্পা দি বলল ', হ্যাঁ, সেই জন্যই তো এখন তুই ফিরছিস ,আমি একটু অবাক হলাম।
রেখা বললো ,'কি বলবে বলো?
এরমধ্যে অটোওয়ালা বলল দিদি এসে গেছেন।
রেখা বলল' হ্যাঁ এই তো নাম  দিয়ে ব্যাগ থেকে টাকা বের করে ভাড়া মিটিয়ে দিল।
রিম্পা দি বলল 'নারায়ন দেবনাথ অমর্ত্য লোকে যাত্রা করেছেন।
কথা বলতে বলতেই রেখা এসে গেটের কাছে পৌঁছালো।
রেখা বলল'কি খবর শোনালে  তুমি'।
রিম্পা দি বলল 'খবরটা শুনে আমারও খুব খারাপ লেগেছে রে।'
রেখা বলল 'আমাদের শৈশবের সুতো ছিঁড়ে গেল গো।'
রিম্পা দি বলল'একদম ঠিক কথা বলেছিস।'
রেখা বলল মাল্টিপ্লেক্সহীন, নেটফ্লেক্সহীন , ইউটিউবহীন শৈশবের একমাত্র দুনিয়া ছিল যার হাতে ,তিনি আজ না ফেরার দেশে। নন্টে ফন্টে হাঁদা ভোঁদা,বাটুল অসাধারণ সব চরিত্র যার হাতে উঠে এসেছিল তিনিই নারায়ন দেবনাথ।
রিম্পা দি বলল একদম ঠিক বলেছিস আমাদের সময়কার ছোটবেলায় নন্টে ফন্টে পড়েনি এমন কেউ ছিলনা ।হাঁদা ভোঁদা পড়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়তাম আমরা।
রেখা বললো' আমাদেরকে অনাথ করে দিয়ে তিনি চলে গেলেন।'
রেখা কথা বলতে বলতে গেটের কাছে চলে আসলো কলিং বেল বাজালো। কিন্তু কোন সাড়া নেই।
রিম্পা দি বললো ভালো থাকিস এখন রাখছি পরে কথা হবে ।
রেখা আবার কলিং বেল বাজালো। মনোজ  বেরিয়ে এসে দরজা খুলে দিল।
রেখা ব্যাগটা নামিয়ে বাথরুমে গেল ফ্রেস হতে ।তখনো ভাবছে বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে পড়ন্ত বিকেলে চোখে পড়তো যেমন আকাশে উড়ে যাচ্ছে পাখিদের 
ঝাঁক ।।ছোট্ট বেলায় শুধু মনে হতো কোন দেশের বাসিন্দা? ওদের জন্য তো কোনো কাঁটাতার নেই, ওদের পাসপোর্ট লাগে 
না ।এই যে  কল্পনার পাহাড় ছোটবেলাতেই যে অপার বিস্ময় কৌতুহল সেই দিনগুলো আজ হারিয়ে যাচ্ছে । তবুও সাহিত্যিক নারায়ণ দেব বেঁচে থাকলে হয়তো আরো অনেক কিছু এরকম আমরা শৈশবের দিনগুলো নতুন করে ফিরে পেতাম।
এখন সে তো তাঁর অসাধারণ সৃষ্টির মধ্যে আমরা বেঁচে থাকব শৈশবের দিনগুলো কে নিয়ে।
চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে।
মনোজ  বললো কি ব্যাপার? তোমার চোখ-মুখ এরকম লাগছে কেন?
রেখা কোন উত্তর করছে না বলে আবারো একই কথা জিজ্ঞেস করল।
তখন রেখা বলল শৈশবের দিনগুলোকে মনের কোন গহীন গাঙে রেখেছি সেগুলোকেই ক্লান্ত চোখে মুখে খুঁজে পাবার চেষ্টা করছি ।
মনোজ কথার অর্থ কিছুই বুঝতে পারলো না। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।
আর বলল তুমি লেখিকা বলে আজকাল অনেক কিছুই তুমি অন্য ভাবে ব্যক্ত করো।
কিন্তু আমরা সাধারন মানুষ আমাদেরকে সেই ভাষাতেই বোঝাতে হবে।
রেখা বলল 'চা খেয়েছ, না খাবে?
মনোজ বলল' না খাইনি।'
রেখা গুন গুন করে গান গাইতে গাইতে গেল রান্নাঘরে দিকে গেল 'তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম….।'

কবি জাবেদ আহমেদ এর কবিতা




অনুভব
জাবেদ আহমেদ

হৃদয় ছোঁয়া কিছু ছবিতে
ভক্তি প্রেম আবেগ বিবেক
জড়িয়ে যায়।
অথচ কখনো চায়ের টেবিলে 
বসা হয়নি! 
কিছু ছবি হৃদয় কোণে খুটি 
খড়খুড়ে র নিলয় তৈয়ার করে
যাহা শুধু কল্পনার বুনন মাত্র,
তবুও নিদারুন অনুভূতির লালন বুকে
অনন্য যাতনার পোষ,
আজ বসন্তে বড় ইচ্ছে ইশ ছবিটি বাস্তব হলে
কিছু খুনসুটি হতো আর কি'বা হতো, 
প্রেম হৃদয়ে প্রদীপ ঝলমল করতো,
কাজল ভরা চোখ আদুল চোখে টক্কর হতো।
বিষন্নতার নগরে আনন্দে আগমন হতো হলুদ লালে বসন্তী হাওয়া বয়তো। ইশ্

মনি জামান এর ধারাবাহিক উপন্যাস ৯ পর্ব





ধারাবাহিক উপন্যাস


সেদিন গোধূলি সন্ধ্যা ছিল
( ৯ ম পর্ব ) 
মনি জামান

অফিস থেকে জিকু ছুটি নিয়েছে এক সপ্তাহের জন্য,ছুটি নিয়েই জিকু হাসপাতালে স্ত্রী আসমার কাছে চলে এসেছে,জিকুকে দেখে আসমা জানতে চাইলো ছেলের নাম কি ঠিক করেছো,
জিকুঃ নয়ন,বলেই আসমার কাছে জিকু জানতে চাইলো এ নাম কি তোমার পছন্দ হয় কিনা বলো?আসমা মাথা নেড়ে সম্মতি দিয়ে বলল হ্যাঁ সুন্দর নাম পছন্দ হয়েছে আমার,আসমা স্বামী জিকুর কোন পছন্দে আজ পর্যান্ত না বলেনি।
আসমাঃ জানো আজ যদি নয়নের দাদি আমাদের সাথে থাকতো তাহলে কতো খুশি হত উনি,
জিকুঃ হ্যাঁ সত্যি মা আজ থাকলে খুব খুশি হতো যেহেতু আমার আর দুভাইয়ের কোন ছেলে সন্তান নেই,দুই ভাইয়ের তিন মেয়ে,বড় ভাইয়ের দুটো,মেজ ভাইয়ের এক মেয়ে।পারিববারিক বিষয় নিয়ে আসমা আর জিকুর যখন কথা বলছে তখন জিকুর বাল্য বন্ধু সাংবাদিক ফিরোজ এসেছে হাসপাতালে জিকুর সন্তানকে দেখতে, জিকু ফিরোজকে দেখে বলল,কিরে কখন এলি!ফিরোজকে দেখে জিকু খুব খুশি হলো এবং বলল,ফিরোজ তুই যখন বাড়ি যাবি তখন মাকে বলিস আমাদের ছেলে হয়েছে এই খবরটা অবশ্যই মাকে দিবি,আর আমার শশুর ও শাশুড়িকেও খরবটা জানাস।
ফিরোজঃ মাথা নেড়ে বলল চিন্তা করিসনে দোস্ত কাকি মাকে আমি অবশ্যই এই খুশির খবরটা জানিয়ে তারপর তোর শ্বশুর শ্বাশুড়িকে দিয়ে আসবো।তারপর ফিরোজ আর জিকু গল্পে মেতে উঠলো বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রায় ঘন্টাখানেক হবে,
ফিরোজঃ ঘড়ি দেখে জিকুকে বলল,আরে দোস্ত অনেক বেজে গেছে খেয়াল করিনি,ওহঃ আমার অনেক কাজ পড়ে আছে অনেক সময় কাটালাম তোদের সাথে যাক তোর ছেলেও মাশাল্লা সুন্দর হয়েছে এবার আমাকে যেতে হবে।
জিকুঃ এখন না গেলে কি নয় একটু পরে যা,এলি তো কিছুক্ষণ আগে আজ আমাদের সাথে না হয় থেকে যা।
ফিরোজঃ নারে দোস্ত অনেক কাজ পড়ে আছে আজ যেতে হবে আমি সময় করে আবার এসে তোদের দেখে যাবো,আর সেদিন থেকে যাবো ওহ ভালো কথা কোন কিছুর দরকার পড়লে আমাকে অবশ্যই জানাস বলে ফিরোজ আসমাকে বলল ভাবি আসি তাহলে।
আসমাঃ ঠিক আছে ভাই তবে কথা দিলেন কিন্তু সময় করে আবার আসবেন,ফিরোজ হো হো করে হেসে উঠে বলল,কখন কথা দিলাম ভাবি।
আসমাঃ ফান করলাম তবে আসবেন কিন্তু
ভাই,বিপদে আপাদে সবসময় পাশে আছেন বলে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি,
ফিরোজঃধুর কি বলেন ভাবি,জিকু আমার ছোট বেলার বন্ধু আর বন্ধু তো বন্ধুর জন্য সব করে নইলে বন্ধু কেন।
ফিরোজ ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ির পথে রওনা হলো,আসমা আজ এত খুশি যে জিকু এবং তার পরিবারকে একটা ছেলে সন্তান উপহার দিতে পেরেছে,আসমা আজ নারীত্বকে নিয়ে গর্ব অনুভব করছে।আজ আসমার মা বাবার কথা ও খুব মনে পড়ছে,আসমা ভাবছে কতদিন হয় মা বাবাকে দেখেনি,খুব মিস করছে আসমা 
ফিরোজ ভাই বাড়ি গিয়ে খবরটা দিলে কত যে খুশি হবে বাবা মা এটা ভেবে আজ আসমার মনটা কেমন যেন আনমনা হয়ে গেলো।
করিম সাহেবের তিন ছেলের মধ্যে জিকুর প্রথম ছেলে সন্তান নয়ন,জিকুর আর দুই ভাইয়ের কোন ছেলে সন্তান হয়নি।
তাই জিকুর মায়ের খুব আফসোস তার দুই ছেলের কোন পুত্র সন্তান নেই তাই,
জিকুর ছেলে নয়ন করিম সাহেব পরিবারের প্রথম ছেলে সন্তান,আজ হাসপাতাল থেকে আসমাকে ছাড় করবে জিকু।এই পাঁচটাদিন আসমা হাসপাতালে আজ আসমা ও নয়নকে বাসায় নিয়ে যাবে জিকু,আসমা এখন অনেক সুস্থ্য হয়ে উঠেছে ডাক্তারের সাথে কথা বলে জিকু সব টাকা পয়সা পরিশোধ করে একটি প্রাইভেট কার ডেকে এনে আসমা এবং ছেলে কে গাড়িতেে তুলে নিজেই উঠে বসলো,গাড়ি বাসার পথে রওনা হলো,আজ জিকুর কি যে ভালো লাগছে সে একজন পিতা হয়েছে। পরিবারের অমতে ভালোবেসে গরিব ঘরের মেয়ে আসমাকে বিয়ে করে পরিবার ছাড়া হয়েছে তবুও জিকুর কোন কষ্ট নেই দুঃখ নেই,জিকু স্রষ্টার কাছে মনে মনে প্রার্থনা করলো আসমা ও তার ছেলে নয়নের জন্য আল্লাহ যেন ওর ছেলে ও স্ত্রীকে ভালো রাখেন।জিকু আসমাকে কখনো কষ্টে রাখেনি আর রাখবেও না, জিকুর যত কষ্টই হোক না কেন জিকু ভালোবাসার মুল্যায়ন করতে জানে,এসব কথা ভাবতে ভাবতে ওদের গাড়ি বাসার সামনে এসে দাঁড়ালো।
ড্রাইভারঃ স্যার এসে গেছি,
জিকুঃ হ্যাঁ ভাই আপনি একটু সাহার্য করুন আমাদের নামতে,ড্রাইভার ওদের সব জিনিষ পত্র গাড়ি থেকে নামিয়ে বাসায় উঠিয়ে দিয়ে ভাড়ার টাকা নিয়ে চলে গেলো।
বাসায় এসে আসমা ঘর দোর দেখলো সব অপরিষ্কার,কেমন যেন নোংরা নোংরা লাগছে, আসমা পরিস্কার করার জন্য প্রস্তুত হলো আসমার হাতে ঝাড়ু দেখে
জিকুঃ আসমা তুমি এখনো পুরোপুরিভাবে সুস্থ নও কি করছো এসব, তুমি চিন্তা করনা রেষ্ট নাও আর নয়ন কে রাখো আমি সব পরিস্কার করছি বলে আসমার হাত থেকে ঝাড়ু নিয়ে পরিস্কার করার জন্য রেডি হলো।
আসমাঃ জিকুর হাতটা ধরে বলল,একটা কথা বলবো,জিকুঃ বলো কি বলবে,আসমাঃ জিকুর হাতে একটা চুম্বন দিয়ে বলল,লোকে কি বলবে, 
জিকুঃ কে কি বলবে সেটা আমাদের বিষয় নয়,লোকে কি আমাদের খেতে দেয় না পরতে দেয়,যে তাদের কথা শুনতে হবে।
আসমাঃতুমি এত ভালো কেন,তুমি কি বলতো,জিকু আসমার কপালে চুম্বন দিয়ে বলল,তুমি যে আমার ভুবন যে।
কথাটি শুনেই আসমার দুচোখ অশ্রুতে ভরে গেলো,আজ এ অশ্রু দুঃখের নয় এ অশ্রু ভালবাসার,এ অশ্রু আনন্দের কারণ জিকু আসমাকে কতটা ভালবাসে আসমা
সেটা আজ মর্মে মর্মে অনুভব করতে পারছে, জিকুর প্রতিটা কাজে আসমা বুঝতে পারে।আজ আসমার নারী জীবন স্বার্থক কারণ জিকুর মত একজন সহজ সরল মনের স্বামী পেয়ে,আসমা আল্লার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে দোয়া করলো স্বামী জিকুর জন্য,যেন দুজনের ভালোবাসা আর সুখ গুলো অটুট রাখে।জিকু সব কাজ শেষ করে আসমাকে বলল,গোসল করার জন্য আসমা ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে গোসলের জন্য তৈরি হলো, জিকু আসমাকে ধরে ওয়াশ রূমে নিয়ে গোসল করিয়ে দিয়ে রূমে এনে কাপড় পরিয়ে দিয়ে নিজে গোসল করলো।
তারপর জিকু আসমাকে বলল,দুপুরের খাবার তো রান্না হলো না আজ এক কাজ করি আমি যায় হোটেল থেকে খাবার নিয়ে আসি বলে বের হয়ে গেলো,জিকু হোটেল থেকে খাবার নিয়ে বাসায় এলো,আজ দুপুরে ওদের রান্না হয়নি কারণ অনেক পরিশ্রান্ত জিকু,নইলে জিকু রান্না করতো। ঘরের সব কাজ আজ একা করতে সময় গেছে তাই রান্নাও হয়নি,হোটেল থেকে আনা খাবার আসমা আর জিকু দুপরে খেয়ে ক্লান্ত শরীর নিয়ে জিকু আর আসমা শুয়ে পড়লো,তারপর পরস্পর দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরলো আজ কতদিন দুজন পৃথক হয়ে থেকেছে,
আসমাঃ হেসে বলল এই কি করছ তুমি,
জিকুঃ আসমাকে বলল,জান আজ কত  দিন বা কত কাল মনে হয় তোমার স্পর্শ পাইনি আমি তাই জড়িয়ে ধরেছি,
আসমাঃ তুমি খুব দুষ্ট হয়েছো জান আমার শরীর ভালো না,কেন কষ্ট বাড়াও!
জিকুঃ বাড়ুক সমস্যা নেই শুধু তোমায় ভালোবাসি,আসমা এবার জিকুকে খুব করে কাছে আরো কাছে টেনে নিয়ে পাগলের মত চুম্বন করলো,মাথায় চুলের ভিতর হাত বুলিয়ে আদর করলো মনে হলো কতকাল আসমাও জিকুকে একান্তে এভাবে কাছে পাইনি।তারপর দুজন দুজনকে পরস্পর জড়িয়ে ধরে গল্প করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়লো জানে না ওরা।


চলবে.....

শামীমা আহমেদ এর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৫৯




শায়লা শিহাব কথন
অলিখিত শর্ত 
(পর্ব ৫৯)
শামীমা আহমেদ 


 


                                                          সুনায়রা আর আরুশের সাথে  শায়লার ক্যারাম খেলা বেশ জমে উঠেছে! শায়লার আদর কাড়া কথায় মাঝে মাঝেই সুনায়রা আর আরুশ আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠছে।ওরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠেছে!
মা ঘুমিয়ে পড়ায় শিহাব মায়ের ঘর থেকে বেরিয়ে  ওদের এই আনন্দঘন সময় দূর থেকে দেখছিল। অনেকদিন পর এই বাড়িতে শিহাব একটু প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারছে আর এর জন্য শায়লার কাছে তার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। খেলার ফাঁকে হঠাৎ শায়লা চোখ তুলতেই শিহাবকে দেখতে পায়।শায়লার মুখটি খুশিতে ঝলমল করে উঠলো! শিহাব চোখের ভাষায় শায়লার প্রতি একরাশ ভালবাসার প্রকাশ দেখালো। শায়লা এক লাজুক হাসিতে তা গ্রহন করে নিয়ে আবার খেলায় মেতে উঠলো। শিহাব ড্রইং রুমের সোফায় বসে মোবাইল  চেকিং এ ব্যস্ত হলো।
একটু পরেই আরাফ তার দাদার কোল দখল করে চারতলায় চলে এলো। শিহাব বাবার সাথে দেখা হওয়ায় সালাম জানিয়ে বাবার শরীরের খোঁজখবর নিয়ে পরিবেশটা শায়লার জন্য সহজ করে দিলো। শায়লা উঠে দাঁড়ালো। শিহাব তার বাবার সাথে শায়লার পরিচয় করিয়ে দিলো। শায়লার সালামের উত্তর দিয়ে তিনি ঘরের দিকে যেতে চাইতেই, আরাফ শায়লার সাথে আরুশ ও সুনায়রার এত আনন্দিত ভাব দেখে সেও খেলার লোভ 
সামলাতে পারল না। খুব দ্রুতই  সে দাদার কোল থেকে নেমে এলো। আরুশের পাশে বসে খেলার সঙ্গী হতে চাইল। শায়লা আরাফকে তার কাছে ডাকলেও  আরাফ আরুশের সাথে বসে রইল। মাঝে মাঝে চোরাচাহনীতে শায়লাকে দেখছে। শিহাব কাছে এসে আরাফের মাথায় হাত বুলিয়ে, খুবই আদুরী গলায় বললো,যাও বাবা, ঐটা তোমার আম্মু। আরাফ এবার যেন শায়লার দিয়ে স্থির দৃষ্টিতে তাকালো। শায়লা হাত বাড়িয়ে আরাফ বলে একটা মায়াভরা ডাক দিতেই আরাফ গুটিগুটি পায়ে শায়লার দিকে এগিয়ে গেলো। সুনায়রা বললো, যাও ভাইয়া এইটাতো তোমার আম্মু হয়। এবার আরাফ পুরোপুরিই কনভিন্সড হলো। শায়লার কাছে যেতেই শায়লা তাকে আদরে জড়িয়ে ধরে কোলে বসিয়ে নিলো।আরাফের মুখে এক স্বর্গীয় হাসি! শায়লাও যেন দুঃসাধ্য কিছু জয় করার আনন্দে শিহরিত হয়ে উঠলো!  শিহাবের চোখ আনন্দাশ্রু তে ভরে গেলো। এখন শায়লা যেন তার জীবনের পূর্ণতা এনে দিলো। ধীরে ধীরে  শায়লা আর আরাফ ঘনিষ্ঠ হয়ে গেলো। শায়লা আরাফকে বুকে জড়িয়ে নিলো। শায়লার বুকের ভিতরেও যেন কত কত যুগের সন্তান তৃষায় শুকিয়ে,শুস্ক মরু সাহারা হয়ে ছিল। এমন নরম নরম শিশুর হাত পায়ের ছোঁয়াতে শায়লার ভেতরে মাতৃত্বের নহর বয়ে গেলো। মা আর সন্তানের এমন মিলন দৃশ্য  শিহাবকে একবারে  নির্বাক করে দিলো।
দুপুরের  রান্না শেষ করে সুমাইয়া উপরে চলে এলো। ভাবী আজ ভীষণ ব্যস্ত।শায়লা ভাবীকে আজ কোন সাহায্যই করতে না পারায় তার দুঃখ প্রকাশ করতেই সুমাইয়া বলে উঠলো,না না  আজ তুমি  বাচ্চাদের সাথে থাকবে
দেখোনা তোমাকে পেয়ে ওরা কত খুশি হয়েছে।কতদিন পর ওরা চাচী পেলো! আরাফও তো দেখছি তোমার কাছে যাচ্ছে।
শায়লা অর্জনের হাসিতে বুঝিয়ে দিলো,হ্যাঁ ভাবী আমি আরুশের মন জয় করতে পেরেছি।সে আমার কাছে এসেছে। আমি এরপর একটু রকটু করে ওর সাথে বন্ধুত্বটা গড়ে তুললেই ও একেবারে আমার কাছে চলে আসতে চাইবে। যদিও কথাটায় সুমাইয়া আরাফকে হারানোর বেদনায় কষ্ট পেল, তবুও সে চায়, আরাফ বাবা মায়ের সাথে থাকুক।তার নিজের পরিবার সে চিনুক।
সুমাইয়া রান্না করা  সব খাবার চারতলা শ্বাশুড়ির ফ্ল্যাটে নিয়ে এলো।  সবাই একসাথে মিলে ডাইনিং টেবিলে খাবার খেতে বসলো।শায়লার কোলে আরাফ আর দুই পাশে সুনায়রা আর আরুশ বসেছে।চাচী তাদের খাবার তুলে দিচ্ছে। যদিও খুবই চেনা খাবার কিন্তু আজ চাচীর যত্নের বেড়ে  খাওয়ানোতে তারা আনন্দে আপ্লুত হয়ে যাচ্ছে। শায়লা নিজের প্লেটের খাবার থেকে কোলে বসা আরাফের মুখে একটু একটু করেচতুলে দিচ্ছে।
এই দৃশ্য দেখে সুমাইয়া বলে উঠলো, শায়লা তুমি বাচ্চাগুলোর মায়া বাড়াচ্ছো।তুমি আজ চলে গেলে ওরাতো খুব কষ্ট  পাবে।
এ কথার জবাবে মা বলে উঠলেন,শায়লা তুমি মাঝে মাঝেই আসবে।এই বুড়ো বাবা মাকেও দেখে যাবে।
শায়লা মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মতি জানালো।শিহাব বুঝে নিলো শায়লাকে ঘরে তুলতে বেশি দেরি করা যাবে না। ইতিমধ্যেই  সে এই পরিবারের সবাইকে আপন করে নিয়েছে।শায়লা তার নিজের প্লেটের খাবার তিনজনের মুখে তুলে দিচ্ছে। টেবিলের বিপরীত দিক থেকে শিহাব শায়লার এই মায়াভরা মনটাকে অনেক ভালবাসায় ভরিয়ে দিলো। শিহাব মনে মনে বলে উঠলো, শায়লা তোমাকে আমি ঠিকই চিনেছি।শায়লা আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি। শায়লার হৃদয়ে যেন শিহাবের কথার ঢেউ এসে লাগলো। সেও নীরব ভাষায় চপকে চোখ ফেলে  উত্তর পাঠিয়ে দিলো,আমিও তোমাকে অনেক ভালবাসি শিহাব। দুজনেই মনের অজান্তে এক গভীর  অনুভবে শিহরিত হলো।

বিকেলের আগেই শিহাব মা বাবা ভাবীর কাছ থেকে বিদায় নিতে চাইলো।ভাবী তাদের বিকেলের চা খেয়ে যেতে বললো।শিহাব জানালো,আজ না ভাবী। না হলে আমাদের ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে।শায়লাকে সন্ধ্যার আগে ওদের বাসায় পৌছে দিতে হবে।
ভাবী এবার আর শিহাবকে বলতে ছাড়লো না, কি ব্যাপার শিহাব?  সন্ধ্যা হতে তো এখনো ঢের দেরী? দুজনে আবার মুভি দেখতে যাবে নাকি? 
এ কথায় শায়লার চোখ ভীত হয়ে উঠলো!সিনেমা হলের সেই অন্ধকার পরিবেশ শায়লা
বেশ ভয় পায়।একবার ছোট বেলায় একটি বাজে অভিজ্ঞতা হয়েছিল তার। মুভি দেখার ইচ্ছে তার একেবারেই নেই। 
শিহাব সাথে সাথেই সুমাইয়ার কথা খন্ডন করে বললো,না না, ভাবী তেমন কোন ইচ্ছে নাই।আর মুভি দেখতে গেলে তোমাকেও নিয়ে যাবো।কোন আনন্দই তোমাকে ছাড়া পূর্ণতা পাবে না ভাবী।তোমার কাছেতো আমার ঋণের শেষ নেই।
--থাক খুব হয়েছে,আর ঋণ শোধ করতে হবে না।শায়লা পাশে দাঁড়িয়ে ভাবী  দেবরের মধুর সম্পর্কের কথোপকথন শুনছে।
---তুমি তাড়াতাড়ি  শায়লাকে ঘরে তুলে নাও, তবেই আমরা একসাথে মুভি দেখতে যাবো।
সুমাইয়ার এমন কথায় শায়লা বেশ লজ্জিত হয়ে গেলো।
সেই সকাল থেকে নানান নাটকীয় ঘটনার পর সবশেষে শায়লার আদর পেয়ে আরাফ শায়লার কোলেই ঘুমিয়ে পড়লো। বেশ ধকল গেছে শিশুটির ওপর দিয়ে।আরাফকে রেখে যেতে শায়লার খুব মায়া হচ্ছিল।কিন্তু ঘুমিয়েছে বলেই এখন রেখে যাওয়া সম্ভব।চাচীর বিদায়ক্ষণে সুনায়রা, আরুশ কেঁদে কেটে একাকার।শায়লাকে পেয়ে তারা আজ একটা খেলার সঙ্গী পেয়েছিলো!  
শায়লা সুনায়রা আর আরুশকে অনেক আদর করে, আবার বেড়াতে আসবে, এমনটি কথা দিয়ে সেদিনের মত জিগাতলা থেকে ওরা বিদায় নিলো। শিহাব উবার কল দিলো।সুমাইয়া ওদের গেইট পর্যন্ত এগিয়ে দিলো।
শায়লা সুমাইয়াকে জড়িয়ে ধরে নীরবে যেন  শিহাবকে নিয়ে তার আশা আকাঙ্ক্ষার  কথাই বুঝাতে চাইল।সুমাইয়া জানালো, শায়লা তুমি খুবই ভাগ্যবতী, শিহাবকে তোমার জীবন সঙ্গী করে পেতে যাচ্ছো।ওর মত ভালো  ছেলে আর হয় না। শিহাব চোখের ইশারায় এ কথার সমর্থন জানাতেই তিনজনেই  একসাথে হেসে ফেললো। শায়লা শিহাব উবারে বসলো। সুমাইয়া ঘরে ফিরে গেলো।গলির মোড় পেরিয়ে গাড়িটি মেইন রোডে আসতেই শিহাব শায়লাকে একেবারে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে শায়লার গালে চট করে একটা গভীর চুমু বসিয়ে দিলো। আর শায়লাকেও শিহাবের কাছে আত্মসমর্পণ করতে হলো।কেননা শায়লার শক্তিতে শিহাবকে ছাড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা  ধোপে টিকল না। 
গাড়ি দ্রুত গতিতে এগিয়ে চললো।সিগনালে থামতেই শিহাব নিজেকে শায়লা থেকে ছাড়িয়ে নিলো।বাকী পথটুকু দুজনে নীরবেই
 সময় পার করলো।শায়লার মনের ভেতর নানান ভাবনার উঁকি। শিহাব ভেবে নিলো ব দুজনে একটা জায়গায় বসলে ভালো লাগলে। শিহাব ভেবে নিলো উত্তরায় টেবিল টপ রেস্তোরাঁয় বসে বিকেলের চা খেয়ে নিবে।জায়গাটা শিহাবের খুবই পছন্দের। উবার হাউজ বিল্ডিংয়ে মাস্কাট প্লাজার রোডে ঢুকতেই শিহাব  ড্রাইভারকে  টেবিল টপ রেস্তোরাঁয় থামতে বললো।


চলবে....

১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২২

কবি শ্রীমতী সুপর্ণা চট্টোপাধ্যায়ে'র কবিতা






যাওয়া আর আসা


এ ধরায় অবিরাম চলে 
যাওয়া আর আসা।
কে কার খোঁজ রাখে,
কার গেল,কে কি হারালো,
কাকেইবা রেখে গেল,
কার কাছে?
আর যে চলে যায় 
তার জন‍্য কি সবাই কাঁদে?
সবাই করে হায় হায়?
আর যে পড়ে রয় তার কথা কেউকি ভাবে?
হয়তো ভাবে অন্তর্যামী।
শুধু পড়ে রয় সুখ দুঃখের স্মৃতিখানি।
তাঁর কর্ম,তার ব‍্যস্তজীবনের তিক্ততা,
অর্থ উপার্জনের উপায়,
পরিবারের সব কটি মুখে অন্ন যোগানোর দায়,
সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের মোড়কে মুড়ে রাখার দায়,
যখন কেবল একারই ঘাড়ে,
তখন নিজের অস্তিত্বকে খুঁজে না পেয়ে এক চরম অবসাদের স্বীকার আচমকাই।
আর তার পরেই রোগভোগ 
বিছানায় মুখ থুবরে পড়া, 
শেষে পরিবারের কাছে এক বোঝা,
হারিয়ে যায় বেঁচে থাকার সবকটি ইচ্ছা।
কিন্তু এর জন‍্য দায়ী কে?
নিজ বুদ্ধির অভাব?
নিজেকে ভালো না বাসা?
পারিবারিক অবহেলা?
গোপন অভিমান?
না কি কঠিন ত‍্যাগ?
দেখতে দেখতে চলে আসে যাওয়ার সময়।
হয়তো এরই মাঝে নবাগতোর আবির্ভাব ভুলিয়ে দেয় সব শোক।


১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২

কবি জাফর রেজা'র কবিতা




তার গল্পে আমি....
জাফর রেজা 

মন যে কখন কার দরজায় কড়া নাড়ে
কে জানে, 
কতদিন কতরাত হেঁটেছি দু'জন পাশাপাশি, 
আঙ্গিনা জুড়ে জ্যোৎস্নায় স্নান করেছি  বহুবার,
কোনো এক অশুভ রাতে আঙ্গিনার দখল 
নেয় অন্য কেউ,
আমাকে অন্ধ করে 
সে স্বপ্ন খোঁজে অন্য চোখে;
আজ তার গল্পে আমি নেই, 
রাখেনা আমার খবর
হৃদয় খুঁড়ে আমার গল্প দিয়েছে কবর।

কবি রুকসানা রহমান এর কবিতা




রদ্দুরে ভেসে যাবো
রুকসানা রহমান

এভাবে কাছে এসোনা,ওষ্ঠে তিল পড়াতে
তারচেয়ে দেখো আমি দুর থেকে ছুঁয়ে দিতেই
তুমি  হয়ে গেলে, আমার। 

এভাবে কাছে এসোনা, 
আমি আকাশে খুঁজছি একফালি সূর্যঠান
আমি মেঘ হয়ে রদ্দুরে ভেসে যাবো।

এভাবে এসোনা 
নাগরিক পদ্মের মতন  জ্যোৎস্না ভাঙ্গা চাঁদের হাঁটে।
এখানে এখনো কান্নারা গুমরে ওঠে।

আমি এক  বিস্ময়,কেবল তোমারই  বুকের গভীরের কাব্য
তাইতো ভুলে যাই,ব্লাক রোড অরণ্য বিষাদ যাতনা।

তুমি আসবে এক নারীর কাছে, বয়ে যাবে সূর্যের মতন
কখনো আমার আকাশের ঝিলমিলি উন্ষতার নায়ের প্লাবণের রদ্দুর। 

তুমি দ্বিধা, আমি দ্বন্দ্ব , কখনো দূর্বার, তুমি দুরন্ত বাতাস 
আমি  ঝর্ণা , তুমি চন্ঝল জলতরঙ্গের
 স্নানে মগ্ন পথিক। 

এভাবেই কাছে আসবে ঋতুর বৈভবে প্রতিটি শিহরনে  
অমৃতা  তিয়াসীর রোদসীর ঘাটে।

মনি জামান এর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৮




সেদিন গোধূলি সন্ধ্যা ছিলো
( ৮ম পর্ব
মনি জামান 

সৃষ্টি কর্তা যেন আসমার সব চাওয়া গুলো পূর্ণ করে দিয়েছেন,জিকু অফিস থেকে এসে আসমার সব কাজে সাহায্যে করে রান্না থেকে শুরু করে কাপড় ধোয়া পর্যান্ত।কারণ জিকু চাই আসমার যেন কোন রকম কষ্ট না হয়,আসমা আর জিকু দুজনে পরস্পরকে এতোটাই ভালবাসে যে না দেখলে কেউ বুঝতেও পারবে না ভালবাসা কি।
জিকু আর আসমা দুজনে সংসারটাকে স্বর্গে রূপান্তরিত করতে শুরু করলো,দুই বছর এভাবে চলে গেলো বুঝতে পারলো না দুজনের কেউ। আস্তে আস্তে আসমা টের পেলো সে মা হতে যাচ্ছে,আসমার কিছু উপসর্গ দেখা দিয়েছে আজ বমি বমি ভাব আসছে কিছু খেতে পারছে না আর খেতে গেলে এমন হচ্ছে।
জিকু যখন প্রথম জানতে পারে আসমার পেটে তার সন্তানের অস্থিত্ব সেদিন জিকুর আনন্দ আর ধরে না,যখন আসমার পেটের সন্তানের বয়স সাত মাস হলো জিকু তখন আসমাকে নিয়ে কুমিল্লা হাসপাতালে আল্ট্রাসোনো গ্রাম করতে নিয়ে গেলো, ডাক্তার পরিক্ষা করে জিকুকে বলল, আসমার পেটে ছেলে সন্তান এবং সন্তান খুব ভালো আছে।
জিকু এই সংবাদ শুনা মাত্র দৌড়ে মিষ্টির দোকানে গিয়ে মিষ্টি কিনে নিয়ে হাসপাতালে ফিরে এসে ডাক্তার ও নার্সদের মিষ্টি খাওয়াল,ডাক্তার নার্স সবাই খুশি তারা বুঝতে পারলো নতুন দম্পতি নতুন বাবা মা হতে যাচ্ছে।
মিষ্টি খাওয়ানো শেষ করে জিকু আসমাকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরে এলো,আর আসমার জন্য হরেক রকম ফল কিনে এনে ফ্রিজ ভরে ফেললো,আসমা জিকুর এমন পাগলামীতে মাঝে মাঝে রাগ করতো,জিকু বলতো আসমা তোমার জন্য আর আমার সন্তানের জন্য সব করছি তুমি কেন রাগ করছো তুমি ভাল থাকলে আমার সন্তানও ভালো থাকবে।
তাই তোমাকে প্রতিদিন পুষ্টিকর এসব ফল খেতে হবে ইচ্ছে না করলেও বুঝতে পেরেছ,আসমা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিয়ে বললো তুমি এত ভালো কেন,আসমার চোখে আবেগ ভর করলো তার চোখে পানি এলো এটা ভেবে যে,জিকু আসমার জন্য বাড়ি ঘর ছেড়েছে ভালবাসার টানে।
আর জিকু এমন কিছু নেই যা আসমার জন্য করছেনা,রান্না করা ঘরদোর গুছানো আসমাকে খাওয়ানো গোসল দেওয়া সব সব কাজ,আসমা অবাক হয় জিকু পুরুষ ছেলে সে সব কাজ এমন ভাবে করছে দেখলে মনে হয় কোন মেয়ে এই মাত্র সব কাজ করে দিয়ে গেলো।
এভাবে জিকু আসমাকে প্রতিদিন অফিস যাওয়ার আগে সব কাজ গুলো করে আসমাকে সাহায্যে করতে থাকে,অবশেষে আসমার বাচ্চা ডেলিভারির সময় এলো।
আসমার মনটা খুব খারাপ আজ,জিকু আসমাকে জড়িয়ে ধরে আদর করলো আর বলল,পাগলি ভয় পাচ্ছো কেন কোন ভয় নেই আমাদের সাথে আল্লা আছে! আমি আছি কিছুই হবেনা তোমার!জিকু আসমাকে সাথে নিয়ে কুমিল্লা হাসপাতালে এনে ভর্তি করে দিয়ে জিকুর এক বন্ধুর স্ত্রীকে আসমার কাছে রেখে দিয়ে জিকু অপেক্ষা করছে,নার্সরা আসমাকে ডেলিভারি রূমে নিয়ে গেল এক ঘন্টা পর নরমাল ডেলিভারি হলো,ডাক্তার এসে জিকুকে জানালো মা ছেলে দুজনেই সুস্থ্য আছে,জিকু আনন্দে আত্মাহারা হয়ে গেল তার আসমা ভাল আছে সাথে ছেলেও।
আজ জিকু পিতা হয়েছে এ এক অন্য রকম অনুভূতি অন্য রকম ভালো লাগা অন্য রকম গর্ব,আল্লার প্রতি শুকরিয়া জানিয়ে আসমার রূমে গিয়ে আসমা ও ছেলেকে দেখলো আসমা জেগে আছে ক্লান্ত আর পাশে ছেলেটা হাত পা নাড়ছে,জিকু আসমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে আসমার নিমিষেই সব ক্লান্ত মনে হলো দুর হয়ে গেছে,জিকু জীবনে প্রথম সন্তান স্পর্শ করলো এবং ছেলের কপালে চুম্বন করলো জিকুর মনে হল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ সাত রাজার ধন মানিক আজ তার স্ত্রীর কোল জুড়ে আলো ছড়াচ্ছে আজ সে গর্বিত একজন পিতা।
জিকু আসমার পাশে বসে আসমা জানতে চাইলো জিকুর কাছে সে খুশি কিনা,জিকু আসমা কে বলল,আমার জীবনে এত খুশির দিন আর আসেনি আসমা।
শুনে আসমার চোখে পানি এসে গেছে আনন্দে,জিকু আসমার চোখের জল মুছে বলল,পাগলি কাঁদছো কেন,আসমা আজ আবেগে কাঁদছে আজ সে নারীত্ব পেয়েছে,
আজ সে একজন গর্বিত মা হয়েছে তার ভালোবাসার মানুষটিকে তার চাওয়াটা পূর্ণ করতে পেরেছে এটা যে কত আনন্দের সেটা কেউ বুঝুক বা না বুঝক আসমা অনুভব করছে।
জিকু নকিছুক্ষণ ছেলের পাশে বসে ছেলেকে অনেক্ষণ দেখে একটু চুমু দিয়ে বন্ধুর বউকে বলল,ভাবী আর কিছু প্রয়োজন হলে বলেন,ভাবী বলল,দরকার হলে বলবো আর সব প্রয়োজনীয় জিনিষ পত্র সব আছে ভাই।
জিকু ভাবীকে বলল,ভাবী আমি অফিসে যাচ্ছি আপনি আসমার পাশে সবসময় থেকে কখন কি লাগে একটু দেখবেন,আমি আজ অফিস থেকে ছুটি নেবো কাল থেকে আমিও থাকতে পারবো।বলে জিকু ডাক্তাদের সাথে কথা বলে আসমাকে বলল,আমি আসি লক্ষী আমি অফিস থেকে ছুটি নিয়ে বিকালেই ফিরে আসবো।


চলবে...

কবি মাসুদ করিম এর কবিতা




মানুষ হবো কবে
মাসুদ করিম

দড়িতে টান দিলে গলায় 
পড়ে ফাঁস
মুরগি যদি চায়গো হতে 
পারেনা হতে হাস, 
এই জগতে সবি আছে 
মিথ্যার কিছু নাই
আজব জগত আজব মানুষ 
বিশ্বাসের কেও নাই।
ধনে মানে সবাই বড় 
ছোট কেও নাই
আসল বড় বলো তোমরা 
কোথায় গেলে পাই,
নিজকে ভাবি সবার সেরা 
নয়তো আসলে তাই
উপর ওয়ালা দেখে বলেন ভয় 
কি তোদের নাই।
কত আসলে কত গেলো 
জগত সংসারে
কেও কি আর চিরদিন এথায়
থাকতে কি পারে,
জগত টা যে দুই দিনের ই 
ভাবতে যদি পারতাম
খোদার ভয়ে সবাই আমরা
মানুষ যে হতাম।

মমতা রায় চৌধুরীর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১০৪




উপন্যাস 

টানাপোড়েন ১০৪

খোলা জানালায় দখিনা বাতাস

মমতা রায় চৌধুরী


স্কুলে আজকের দিনটা রেখার খুব বাজে কাটলো কি একটা অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি
 করেছিল অনিন্দিতা। ভাবতে লজ্জা লাগছে কিছু টিচার আবার ওকে সাপোর্ট করছেন। 
এভাবে যদি দিনের পর দিন এই ধরনের পরিবেশ সৃষ্টি হয় ,তাহলে স্কুলে কাজ করো খুব কষ্টদায়ক হয়ে যাবে ।মেন্টাল পিস না থাকলে ছাত্রীদের কি সেভাবে কিছু দেওয়া যাবে?
সারা ট্রেনে আসতে আসতে সব ভাবনা মনের ভেতরে মোচড় দিয়ে উঠছিল। ভাবছে আগামীকাল স্কুলে যাবে না। জানলার দিকে মুখ দিয়ে বসে থাকারও  উপায় নেই ,শীতকাল হাওয়া দিচ্ছে ,বাধ্য হয়ে জানালাটা বন্ধ করে দিতে হয়েছে। লেখাটা নিয়েও মাথার ভেতরে নানা কাহিনী চরিত্র ঘুরপাক খাচ্ছে ।কাজেই এই সময় মনটা যদি অস্থিরতায় পরিপূর্ণ থাকে ।লেখাটা ঠিকঠাক আসবে না কিন্তু লিখতে তো হবেই। হঠাৎই ভাবনায় ছেদ টানে '
 রেখা ,এই রেখা, ধ্বনিতে।'
রেখা উৎসুক দৃষ্টিতে এদিক ওদিক তাকাতে থাকে।
অবশেষে দৃষ্টি বিনিময় হলো সামনের দিকের দাঁড়িয়ে থাকা এক যাত্রীর সঙ্গে এতটাই ভিড় হয়েছে যে দাঁড়াতে পারছেন না ,তবুও মুখে কত মিষ্টি হাসি।
রেখা হা করে তাকিয়ে আছে।
 যাত্রী বলছেন' আমাকে চিনতে পারছিস না?'
আমি রুপসার জেঠতুতো দিদি বাণী।
রেখা এভাবে ট্রেনে বাণীদিকে দেখতে পাবে এই ভেবে এতটাই আশ্চর্য হয়েছে ।তারপর ' বানীদি একদম উঠে দাঁড়িয়ে উচ্ছ্বসিত ভাবে বলল রেখা ।
তুমি এদিকে এসো ,আমার সিটে বসবে এসো।'

বাণী বলল' তুই কোথায় গেছিলি স্কুলে?'
রেখা বলল 'হ্যাঁ গো। বাড়ি ফিরছি। তুমি হঠাৎ এদিকে কোথায় গিয়েছিলে?'
বাণী বলল 'আর বলিস না তেহটটো পিসি শাশুড়ির বাড়ি ।পিসিমা নাকি অসুস্থ খুব ।ডেকে পাঠিয়েছিলেন। তাই দেখা করতে 
গেছিলাম ।ফিরছি।'
রেখা বললো 'ফিরছি মানে আজকে আমার বাড়ির কাজ দিয়ে যাবে ,  আর নামবে না? সেটা তো হতে পারে না বানীদি। তোমাকে নামতেই হবে।'
ভিড় ঠেলে ঠেলে এবার রেখার কাছে আসার চেষ্টা করছে ওদিক থেকে অন্য যাত্রীরা বলছেন 'ভিড়একটু কমুক না দিদি ।এত ঠেলা মারলে তো হবে না ।'
' দেখে চলুন' আর একজন যাত্রী বলেছেন পা দিয়ে মাড়িয়ে চলে গেলেন, উফ কি সাংঘাতিক।'
বাণীদি বলল ', সরি ,সরি, সরি।'
এক যাত্রী বললেন 'এই সরিতেই সাতখুন মাপ তাই তো ?যত্তসব।'
বাণীদির কোন কথাই কানে ঢুকলো না ।তারপর আস্তে আস্তে রেখা সামনে এসে হাফ ছেড়ে দাঁড়িয়ে বলল
'না রে ,আজকে নয় ।ওদিকে রুপসার কথা শুনেছিস? রুপসা হসপিটালইজড।
রেখা যেন আকাশ থেকে পড়লো আর আশ্চর্য হয়ে বলল ' সে কিগো? কেন ,কি হয়েছে?'
বাণী বলল_ আর বলিস না ।ওর তো হার্ট 
অ্যাটাক । তবে বেশি জোরালো  নয় ।এখন ঠিক আছে।'
রেখা বলল' ও বাবা, বলো কি?  এই তো জাইবু মারা গেলেন। এর মধ্যে যদি এরকম হয়।'
বাণী বললো'হ্যাঁ ওখানেই যাব। একবার ওকে দেখতে যাব ।বিপাশা গেছে শুনেছি ।তাই একবারে এখান থেকে ওখানে নাববো।'
রেখা বলল' শুনে খারাপ লাগছে গো। কোথায় ভর্তি আছে?'
বাণী বলল 'উডল্যান্ড হসপিটাল।'
রেখা বললো 'ভালো জায়গায় ভর্তি আছে।
বাণী বলল' এখন তো ওরা কলকাতায় শিফট করে গেছে। জানিস রেখা?'
রেখা বললো  'না তো ।তাই ? বাহ খুব ভালো।'
বাণী বলল 'ও তোর বরের অফিসে জয়েন করেছে।'
রেখা অতি আশ্চর্য হয়ে বলল 'ওমা তাই 
বুঝি ?আমাদের রুপসা দিদি! সত্যিই খুব ভালো লাগছে। রুপসা দিদি এবং বিপাশা ওদের তো যথেষ্ট কোয়ালিটি ছিল ।তবে রুপসা দিদি যে নিজেকে কাজের মধ্যে ইনভলভ করেছে ,দেখবে সবকিছু একদম ভালো হবে আর শকটা কাটিয়ে উঠতে পারবে।'
বাণী বলল হ্যাঁ রে ,এটা খুব দরকার ছিল ।ওর মেয়ের একটা ভবিষ্যৎ রয়েছে তো?
রেখা বলল 'বাণী দি রুপসাদির মেয়ের বয়স কত হলো ?নাম কি,?'
বাণী বলল' ওর নাম হচ্ছে নদী ।ডাকনাম। বিপু 'স্রোতস্বিনী' বলে আর ওর ভালো নাম হচ্ছে স্বরূপা। এই তো 18 তে পা দিল।
রেখা বলল' বাহ খুব সুন্দর নাম তো?'
বাণী বলল 'মেয়ের জন্যই তো বরের অফিসে জয়েন করলো। তাছাড়া ওর বরের অফিসের বস খুব ভালো ।উনি প্রস্তাবটা দিয়েছিলেন।'
রেখা বললো 'ভালো তো ।এটা খুবই ভাল
 হয়েছে ।আজকালকার মেয়েদের না সত্যিই স্বাবলম্বী হওয়ার দরকার আছে।'
বাণী বলল 'কিন্তু আমাদের রুপু ভাবতে পারে নি যে, ও অফিস সামলাতে পারবে?'
রেখা বলল' আমাদের রুপসা দিদি এডুকেটেড মেয়ে ,না। হ্যাঁ, সব সময় জাইবুর প্রতি ভরসা রেখে চলেছে তাই? কিন্তু কিছু যে করতে পারবে না এটা কিন্তু কখনও মনে হয়নি?'
বাণী বলল' নারে ওকে গ্রামেতে দেখিস নি। সব সময় একটু ঘরোয়া প্রকৃতির ছিল ।রান্নাবান্না খাওয়া-দাওয়া ,এইসব নিয়েই বেশি ব্যস্ত ছিল?'
রেখা বলল 'বানীদি হ্যাঁ ,সে সব তো ঠিকই আছে  ঘরোয়া মেয়ে ।কিন্তু বাণী দি কোয়ালিটি তো কম ছিল না। তবে প্রয়োজন হয়নি। জাইবু একটা ভালো  জায়গায় ছিল সেরকম দরকারও হয়নি?'
বাণী বলল' হ্যাঁ ,তা অবশ্য ঠিক।'
এক যাত্রী বলল 'একটু সরে দাঁড়ান না দিদি। সেই থেকে  কানের কাছে বকর বকর বকর করে যাচ্ছেন। কানের পোকাগুলোকে জাগিয়ে দিলে।'
বাণীদি হা করে তাকিয়ে রইল যাত্রীর 
দিকে । রেখা বাণীদির দিকে তাকিয়ে আবার হাসল।
বাণীদি হাসলে গালে টোল পড়ে। এত সুন্দর লাগে দেখতে ।চিরকালই এরা এই তিন বোন সব সময় হাসি খুশিতে মেতে ছিল ।কথায় কথায় হাসতো ।রাগ কখনো দেখিনি এদের।
রেখা  বাণীদির দিকে তাকিয়ে  ইগনোর করে যাবার মত একটা ইশারা করলো।'
তারপর বলল এবার তোমাকে বসতেই হবে।

এ ক যাত্রী বললেন বসবেন মানে! আমরা তো দাঁড়িয়ে আছি?
রেখা বললো 'তো দাঁড়িয়ে আছেন, দাঁড়িয়ে থাকুন  আমি তো নেমে যাচ্ছি না ।আমি আমার সিটটা ওনাকে দিচ্ছি ।এটা তো আপনার আপত্তি থাকার কথা নয়?'
যাত্রী আর কিছু বললেন না চুপ হয়ে গেলেন।
বাণীদি বলেন 'উনি যখন বসতে চাইছেন.. কথাটা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই রেখা বলল 'আমি কাউকে দেব না এখন ,যতক্ষণ না আমি নামবো।'
বাণী বলল _ঠিক আছে ,তাহলে দে ।আমি একটু বসি।'
রেখা বলল' এসো, এসো এদিকে। আমার হাত ধরও আস্তে আস্তে।'
বাণীদি এসে রেখার জায়গায় বসল পাশের সহযাত্রীগুলো একটু যেন বিরক্ত হল ।আসলে বানীদি একটু হেলদি তো।'
বাণী দি  বলল পা টা কি যন্ত্রণা করছে
 রে ।টন টন করছে ব্যথায়।'
রেখা বলল' তোমাকে কখন থেকে বলছি তুমি এসো। এখানে একটু বসবে এস'।
বাণী বললো' তা কি করে হয় 
বলো ? তুমিও তো পরিশ্রম করেই এসেছ না ?তোর জায়গাটা আমি সঙ্গে সঙ্গে বসতে পারি বোন?'
রেখা বলল বাণীদিকে  বোন বলছ ও দিকে বসতে পারো না।'
রেখার থুতনিটা একটু টেনে এনে চুম্বন করল।
রেখার স্কুলের যে ঘটনাটা ঘটেছে 
যে ,একটা যন্ত্রণা সব সময় মনের ভিতর কুরে কুরে খাচ্ছিল । বাণীদির সঙ্গে কথা বলে আর শৈশবের সেই দিক কাছে পেয়ে সত্যিই সব ব্যথা , বেদনায়  যেন কেউ মলম লাগিয়ে দিল  নিমিষের মধ্যে যেন সব ঠান্ডা হয়ে গেল  কি শান্তি, কি শান্তি, শান্তি।'
বাণী বলল'রেখা তোর ছেলে মেয়ের খবর কি? মানে তোর কটা ছেলে মেয়ে?
রেখা বলল 'জগৎজুড়ে আমার ছেলে মেয়ে।'
বাণী বলল'ভালো করে ডাক্তার দেখা?'
রেখা বলল'আর সেই বয়স আছে?'
বাণী বলল'হ্যাঁ তুই তো একেবারে বুড়িয়ে গেছিস?'
রেখা হেসে বলল 'তাছাড়া আবার কি।'
বাণী বলল 'বকিস নাতো?'
রেখা তো জানে তার ভুভুক্ষ মাতৃহৃদয়। সেও চায় নারীত্ব পূর্ণতা লাভ করুক কিন্তু সবই কপাল।
তারপরে রেখা  বলল তোমার বলো ,তোমার খবর বল বানীদি?'
বাণী বলল 'এইতো চলছে ।আমার এক ছেলে এক মেয়ে।'.
রেখা বলল 'ও মা তাই?'
বাণী বলল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে আর মেয়ে এ ম, এ ফাইনাল ইয়ার।'
রেখা বলল' ও বাবা কত বড় হয়ে গেছে।'
বাণী হাসলো।
ইতিমধ্যে ট্রেন মদনপুরে এসে গেছে। রেখা বললো তাহলে কিন্তু অন্য দিন আমাদের বাড়িতে আসতেই হবে ।কথা দাও।'
বাণী বলল 'ঠিক আছে তাই হবে।'
ট্রেন এসে কল্যাণী থামল।
রেখা বলল বাণীদি ,আসছি। ভালো থেকো সাবধানে যেও।
ভিড় ঠেলে রেখা কোন স্টেশনে নামলে কে বলবে সকলে আমরা একটা প্যানডামিক সিচুয়েশনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। সাধারণ যাত্রীদের দেখে তা মনে হচ্ছে না।
ট্রেন বেরিয়ে গেল আর রেখা তার  দিকে' যতদূর দেখা যায় তাকিয়েই থাকলো। বাণীদি যেন খোলা জানালা দখিনা বাতাস হয়ে রেখা এক অপ্রীতিকর অবস্থার মধ্যে পড়েছিল ,সেখানে এসে সামাল দিল।'

মমতা রায় চৌধুরীর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১০২





উপন্যাস 

টানাপোড়েন১০২

মন ক্যানভাসের চরিত্র
মমতা রায় চৌধুর



মকর সংক্রান্তির ঠান্ডা হিমেল হাওয়া ঘুরপাক খাচ্ছে চারিদিক। এরই মাঝে কি মনে হলো বারান্দায় ব্যালকনিতে গিয়ে বসলো রেখা রান্নাবান্না কমপ্লিট করেছে। এক চিলতে রোদ এসে পড়েছে চেয়ারটিতে। রেখা গিয়ে বসেছে পিঠটাকে রোদের  দিকে  রেখে ।খোলা  চুলে আলতো চুমু যেন এঁকে দিয়ে যাচ্ছে এক চিলতে রোদ্দুর। রেখা এক প্লাস্টিকের মাঝারি  ঝুড়িতে  মটরশুটি নিয়ে খোসা ছাড়াতে বসলো। মটরশুঁটির খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে কখন যেন চোখ দুটো চেয়ারে বসে বসে ঘুমে ঢুলুনি। 
একবার তো ব্যালেন্স হারিয়ে প্রায় পড়ে যায় যায় অবস্থা  তখনই ধরফরিয়ে উঠে বসে রেখা চারিদিকে একটু দেখে নেয় ,কেউ দেখে ফেলে নি তো।  তারপর নিজেই আপন মনে হেসে ওঠে।
মটরশুঁটির খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে আপন মনে ভাবতে থাকে। ঘটে যাওয়া মন  ক্যানভাসের স্মৃতি।
মনে পড়ে ছোটবেলাকার কথা মা,কাকিমা , জেঠিমারা যখন মটরশুঁটির খোসা ছাড়াতে বসতো, তার অর্ধেক মটরশুটি আমরাই খেয়ে শেষ করে দিতাম।
মা লাঠি  নিয়ে  তেড়ে আসতেন আর বলতেন
,তোদের পেটে কি রাক্ষস ঢুকেছে?'
কাকিমা বলতেন 'ছাড়ো না দিদি, দুটো তো খাবে?'
মা বলতেন 'এই ছোট তোদের এই আশকারাতে ওরা কিন্তু গোল্লায় যাচ্ছে। বিশেষ করে ননী।'
কাকিমা হেসে উড়িয়ে দিতেন ।
আমরা কখনও জেঠিমা, কাকিমা, মায়ের মধ্যে মনোমালিন্য হতে দেখিনি।
যদিও বা কখনো কিছু হয়েছে , সেটা কিন্তু আমরা বুঝতেই পারতাম না। প্রত্যেকে নিজের নিজের তাগিদেই সে সব ভুলে গিয়ে একটা সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করতেন।
রেখাএসব ভাবছে আর একা একা হাসছে।
 হঠাৎ পাশের বাড়ির ছাদের থেকে ডাক শোনা গেল' ও দিদি. ও দিদি .দিদি।'
রেখার শৈশবস্মৃতিতে বাঁধা পড়ে। ও বাড়ির ছাদ থেকে চৈতির মা রেখাকে ডাকছে।
রেখা গলাটা বাড়িয়ে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে বলল ' কি গো দিদি?'
চৈতির মার খুবই ঠাণ্ডা লেগেছে বোঝাই যাচ্ছে ।ছাদেতেও বেশ ভালো করে সোয়েটার ,চাদর, সঙ্গে আবার একটা মাথায় বউ টুপি পরেছে।
বলল ' দিদি, পিঠে করেছেন?
রেখা ঈষৎ হেসে বলল ''না গো 
দিদি ,সেভাবে কিছুই করি নি ।ওই পিঠের সাজ একটু পুড়িয়ে রেখেছি । কয়েকটা আসকে পিঠে করেছিলাম।'
রেখা  জিজ্ঞেস করল  'তুমি করেছ?'
চৈতির মা বলল 'আমি আবার কি করেছি বলুন তো ,আমি একটু দুধ পুলি করেছি।'
রেখা বলল 'বাহ ভালো জিনিস বানিয়েছ।'
চৈতির মা বলল'ওই হয়েছে আর কি?
রেখা বলল 'চৈতি আসে নি?'
চৈতির মা বলল হিমশীতল কন্ঠে"আর বলবেন না দিদি, ওর শাশুড়িমা তো গঙ্গাসাগর মেলায় গেছেন।
রেখা অবাক হয়ে বলল  'সে কি? ওনার না শরীর খারাপ বলছিলে?'
চৈতির মা একটু উৎসুক ভঙ্গিতে বলল'তাহলেই বুঝুন। ছেলে কত বারণ করেছে এই অবস্থায় যেওনা। উনি যেটা ভালো বুঝবেন সেটাই করবেন। কারো কথা থরি না তোয়াক্কা করেন।'
রেখা হেসে বলল 'বুঝতে পারবেন মেলা থেকে এসে  শুধু ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ কর।
চৈতির মা বিরক্তি কন্ঠে বলল ' ওনার আর কি এসে শুয়ে পড়বেন,  যত ঝামেলা আমার মেয়ের।'
রেখা হেসে বলল' এটাই তো মেয়েদের জীবন দিদি। তারপর বলল না এখন যাই দিদি। পরে কথা হবে ।কাজ পড়ে রয়েছে মেলা ।'
চৈতির ছাড়ানো মটরশুঁটির খোসাগুলো একটা ঝুড়িতে নিল আর মটরশুঁটিগুলো একটা ক্যারি ব্যাগে রাখল আর বলল 'হ্যাঁ আমারও কাজ পড়ে  রয়েছে।"
রেখা  মটরশুঁটির ক্যারি ব্যাগ  নিয়ে ফ্রিজে ঢুকিয়ে দিল। আজকে রাত্রির মেনু হবে আলুর পরোটা আর মেথি মালাই। মনোজ যেটা খেতে খুব ভালোবাসে।
এইসব ভাবতে ভাবতেই ফ্রিজ খুলে দেখল  ' ফ্রেশ ক্রিমটা আছে কিনা?'
সবই আছে কিন্তু ফ্রেশ ক্রিমটা তো একদমই অল্প আছে। তারপর মনে মনে ভাবলো না থাকে না থাকুক এখন কাকে পাঠাবো দোকানে? উনার তো আবার কি কারনে মুড অফ হয়ে আছে, কিছুতো বলাও যাবে না। ঘরে দুধ আছে ও দিয়ে চালিয়ে নেব।'
তারপর রেখা মনে মনে ভাবে কেন যে মাঝে মাঝে মনোজ এরকম হয়ে যায় বুঝতে পারিনা। মনে হয় পোকাগুলো নড়েচড়ে ওঠে।হঠাৎই ভাবতে ভাবতে ফোনটা ঘাঁটছে এমন সময় দেখল বেশ কয়েকটা মেসেজ এসে পড়ে
 রয়েছে। রেখা মনোযোগের সাথে মেসেজগুলো পড়ল। দেখল যে কটা মেসেজ এসেছে তারমধ্যে দুটো স্কুলের গ্রুপ থেকে এসেছে, বাকি মেসেজ এসেছে 'সিঁড়ি'পত্রিকার সম্পাদকের কাছ থেকে ।বেশ মজা করে লিখেছেন তো ভদ্রলোক।  মজার ছলে কবিতা 
লিখেছেন ।ভালো লেখেন আবার উনি আমাকে বলেন কিনা আমি লেখিকা ।যাই হোক শুরু করতে বলেছেন 
উপন্যাস লিখতে। সাহস করে কলম ধরবো ।একটা মেসেজ লিখলাম।
 উনি দেখছি সঙ্গে সঙ্গে রেসপন্স
 করলেন ।'সাহস করে তো ধরতেই 
হবে ।আপনার দ্বারা হবে আমি জানি ।আমরা সবাইকে বলি না আপনি চেষ্টা করুন নিশ্চয়ই পারবেন। '
রেখা লিখল'লেখা  তো আমার নেশা আমি ভালোবাসি কিন্তু উপন্যাস?'
ভদ্রলোক লিখলেন 'কেন নয়?'
রেখা লিখল' আমি পারবো?'
ভদ্রলোক লিখলেন 'অবশ্যই পারবেন ।আপনি পারবেন?'
রেখা বলল 'কী করে বুঝলেন আমি পারবো ?আপনি কি জ্যোতিষী?'
 ভদ্রলোক লিখলেন' আমি জ্যোতিষী কিনা জানিনা । তবে আমরা তো বিভিন্ন লেখা নিয়ে নাড়াচাড়া করি ।আপনার ভেতরে একটা শক্তি আছে। আপনি চেষ্টা করলেই সেই শক্তিটা কে আপনি বের করে কাজে লাগাতে পারেন?
রেখা বলল ও তাই বুঝি?
ভদ্রলোক লিখলেন ' আপনার চোখের ভেতরে সেই গভীরতা আমি দেখেছি।
রেখা বলল এত দূরদর্শী?
ভদ্রলোক লিখলেন 'আশা রাখবো আপনি আমার কথা রাখবেন?'
রেখা বলল 'নিশ্চয় চেষ্টা করব ।আপনি যখন এতটা উৎসাহ দিচ্ছেন। আমি চেষ্টা করব ।এটুকু আপনাকে বলতে পারি?'
ভদ্রলোক বললেন' ওটুকুই দিতেই হবে আপনি ওই চেষ্টাটুকুও করুন বাকিটুকু ছেড়ে দিন ।'
আজকের এই শূন্য বারান্দায় এক সময় কত খুনসুটি  হয়েছে আর আজ পুরো 
একা  ।আশেপাশে প্রত্যেকে আছে কিন্তু কোথায় যেন মনের একটা শূন্যতা তৈরি হয়েছে ।জানিনা 
কেন ?উপন্যাসের চরিত্রগুলো তে কিছু কল্পনা আর বাস্তবের রং মিশিয়ে আমি চেষ্টা করব তাকে রূপ দেবার। কলম  ধরে ফেলে প্রথম পর্ব টা আজকে স্টার্ট করব।'
রেখা স্টার্ট করলো উপন্যাসের প্রথম পর্ব।
এরমধ্যে কলিংবেল বাজতে শুরু করেছে।
একটু বিরক্ত হল। তারপর বাধ্য হয়ে দরজা খুলে দিল।
দরজা খুলেই অবাক হয়ে গেল চৈতির মা দাঁড়িয়ে।
একগাল হাসি নিয়ে চৈতির মা বলল 'দিদি ,আমি একটু পিঠে বানিয়েছিলাম। বললাম, না, দুপুর বেলায় ।তাই একটু নিয়ে আসলাম । একটু টেস্ট করবেন।'
রেখা বলল "এসবের কি দরকার ছিল দিদি।'
চৈতির মা বলল'দাদা কোথায় (দেখতে পাচ্ছি না,,?
রেখা বলল 'আছে এদিক ওদিক কোথাও।'
চৈতির মা বলল 'আসি তাহলে দিদি বেলাও পরে এসেছে।'
রেখা মনে মনে ভাবল  একবার শুরু করল
আর থামতেই চাইবে না। তবুও মনে মনে ভাবল এখন তাড়াতাড়ি গেলেই বাঁচি। উপন্যাসটা একটু স্টার্ট করেছি ঠিক তখনই..?
চৈতির মা বেরিয়ে যাবার পর রেখা একমনে লিখতে লাগলো।
রেখা ডুবে গেল  তার লেখায়। এরমধ্যে মনোজ এসে দাঁড়িয়েছে তার পেছনে। হঠাৎ কেশে উঠলো মনোজ। ঠিক তখনই রেখা তাকিয়ে দেখল।
মনোজ বলল' আজকে কি কিছু খাবার হয়েছে?'
রেখার চমক ভাঙ্গে তারপর বলে ' হ্যাঁ'
রেখা বলল দুপুরের খাবার টাইম তো কখন পেরিয়ে গেছে। তোমাকে ডাকাডাকি করতেও ভয় লাগছিল, কখন কি বলে দেবে তার তো ঠিক ঠিকানা নেই। কাজে কাজে ই ...।
মনোজ  বলল'আমাকে খেতে দাও।
 পেটে রাক্ষস ঢুকেছে। এক পাহাড় সমান খিদে।'
রেখা বলল 'এইতো এক্ষুনি দিচ্ছি।'
লেখার বারোটা বাজলো  রেখা মনে মনে বলল। সব সময় তো লেখায় মুড  আসে না। যাও বা এখন একটু মুড আসলো ,তাও অথৈ জলে..।
মনোজ বলে উঠলো ''
কি লিখছো এতো?
রেখা বললো 'আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে উপন্যাস।'
মনোজ  বলল' বাহ বেশ ভাল।'
রেখার ডায়েরিটা রেখে রান্নাঘরের দিকে গেল খাবারের আয়োজন করতে।
মনোজ বলল, অল্প ভাত দেবে?
রেখা বলল 'কেন অল্প কেন?'
মনোজ বলল খিদে নেই?
রেখা বলল ' এতটা বেলা হয়েছে তবু খিদে নেই। অথচ একটু আগে বললে পাহাড় সমান খিদে। আর এখন... তাহলে কি লোহা হজম করেছে নাকি!
মনোজ একগাল হাসল।
রেখা বলল' পিঠে খাবে?'
মনোজ বললো ' দাও ।তুমি আবার কখন পিঠে বানালে?


রেখা খুব উৎসাহিত হয়ে পাতে পিঠে দিয়ে বলল' চৈতির মা করেছে আমি করিনি ।'
মনোজ বলল  "আগে তো বেশ ভালো ভালো পিঠে করে খাওয়াতে আর এখন কি হলো?'
রেখা বললো 'তাহলে মন ক্যানভাসের  পাতা উল্টে দেখতে হবে বুঝলে মশাই।'
তাহলেই দেখবে শুধু পিঠে নয় আরো কত ভালোবাসার স্মৃতি জড়িয়ে আছে।

মমতা রায় চৌধুরী'র ধারাবাহিক উপন্যাস ১০৩ পর্ব



উপন্যাস 

টানাপোড়েন১০৩

মানসিক যন্ত্রণা

মমতা রায় চৌধুরী



রেখা আজ স্কুলে ঢুকে  স্টাফ রুম দেখে মনে হলো যে ঘরে এত শব্দ, এত আলো, আজ সে  ঘড় নিস্তেজ হয়ে গেছে। চেয়ারটা ফাঁকা দেখেই বুকের ভেতর কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো। কি করে বসবে ?সেই ভাবনা ক্রমশ কুরেকুরে খেতে লাগলো। একটা কেমন দম বন্ধ করা পরিবেশ মনে হচ্ছে।
 এর মধ্যে অনিন্দিতা স্কুলে এসেছে । রেখা দেখছে রেখার টেবিল চেয়ারে বসে আছে অনিন্দিতা। রেখা অত্যন্ত স্নেহের সুরে বলল ' অনিন্দিতা পাশের চেয়ার-টেবিলটায় বসবি?
অনিন্দিতা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রেখার দিকে তাকাল তারপর ক্রুদ্ধভাবে বলল 'কেন এখানে বসে আছি তো কি হয়েছে?_
রেখা নিম্নস্বরে বলে' না কিছু হয়নি পাশের চেয়ার-টেবিল ফাঁকা আছে ওখানে বসলে আমার একটু সুবিধা হত?'
অনিন্দিতা ডেসপারেটলি  বলল_ না না এই স্কুলে তো এরকম কোনো নিয়ম নেই যে, সবার জায়গা ফিক্সট?'
রেখা বলল ;'না ,না আমি সে ভাবে বলতে 
চাইনি  ।আমি বলছি, আমার এখানে খাতাপত্র সব আছে তো, এখানটাতে বসে আমার দেখতে সুবিধা হবে ।'
অনিন্দিতা একগুয়ে মনভাবে বলল _আমিও তো খাতা দেখবো।'
রেখা বলল _' কেন মিছে মিছি এত কথা বাড়াচ্ছিস?'
অনিন্দিতা ঝগড়ার মুডে বলল_ কথা তো আমি বাড়াচ্ছি না তুমি বাড়াচ্ছ রেখা দি।'
রেখা বলল' স্কুলে এসে ঝগড়া করতে একদমই ভালো লাগে না আর তাছাড়া আমার মনে হচ্ছে তুই গায়ে পড়ে ঝগড়া করছিস?'
অনিন্দিতা বলল' আমরা প্রত্যেকেই কিন্তু জানি আমরা কে কোথা থেকে এসেছি। তাই ঝগড়া করব এরকম মানসিকতা আমার তৈরি
 হয়নি। তোমার ভেতরে হয়তো এটা আছে। তাই সেটারই প্রকাশ ঘটাচ্ছ।'
রেখা বলল-'কেন অকারণে এত কথা বলছিস?'
অনিন্দিতা বলল-"এটা অকারণ?'
রেখা বলল  "তবে না তো কি?'
অনিন্দিতা বলে 'এবার কিন্তু রেখাদি  তুমি বেশি বাড়াবাড়ি করছ,।'
রেখা বলল _আমি এখানটায় বসি, ন্যাচারেলি সেই কারণেই তোকে বলেছি। আরও তো  ফাঁকা জায়গায় রয়েছে সেখানে বোস না?'
  রেখা অনিন্দিতার মধ্যে একটা হট টপ চলছে অথচ সিনিয়র টিচার যারা ছিলেন তারা কিন্তু কেউ কিছু বললেন না যে এটা ঠিক নয়।
কিছু টিচার আছেন যারা  অনেক হম্বিতম্বি করেন কিন্তু সঠিক কথা বলার ক্ষমতা তাদের নেই। তাই অনিন্দিতাকে তারা ধমক দেন না যে কাজটা মোটেই ঠিক হয়নি।
রেখার খুব রিম্পাদির জন্য মন খারাপ হতে 
লাগল ।আজ রিম্পাদি থাকলে এর প্রতিবাদ করত ।রিম্পাদি থাকাকালীন এরকম কোনো ঘটনা ঘটেনি ।
আজ বড়দিও নেই আর যদি বড়দি থাকতেন তাহলে কোথায় এরকম একটা অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হতো না।
রেখার ঘরখানাকে দেখে তাই মনে হল যেন যে ঘরে এত শব্দ, এত আলো ,এত কলতান, এত আড্ডা, হাসি তামাশা নিমেষে কেমন যেন ঘর খানা খালি খালি মনে হতে লাগল। রেখার মনটা নিস্তেজ হয়ে পড়ল। কন্ঠ বাকরুদ্ধ হলো ,চোখ ছলছল।আরো বেশি মন খারাপ হতে লাগল অনিন্দিতার এই ব্যবহারে ।কেমন যেন সমাধির মত নিস্তব্ধ, নিঃশব্দ ,বধির পরিবেশ মনে হতে লাগল ।শুধু সে একা।একা কি করে এই স্টাফ রুমে থাকবে ?ভাবতেই তার কেমন মনটা হু হু করে উঠলো।
শুধু মনে হতে লাগলো একসময় কি এই ভালোলাগার সুখের অনুভূতিগুলো থাকবে 
না ।নাকি চোখের সামনে না থাকলেও রিম্পাদির অনুভূতিটুকু ,সচেতনাটুকু তার মনের অস্তিত্বে অনুভব করবে। নাকি একেবারেই নতুন ছোঁয়া নতুন আলপনার মত হয়ে যাবে সবকিছু। কেমন যেন একটা বিচ্ছেদের বেদনায় ম্রিয়মান হয়ে পড়ল রেখা।
অনেকক্ষণ নিজের টেবিল চেয়ারের কাছে দাঁড়িয়ে থেকে যখন অনিন্দিতা উঠলো না ।তখন নিজে থেকেই সরে গেল ।যাবার আগে শুধু বললো 'কাজটা তুই ঠিক করলি না অনিন্দিতা।'
অনিন্দিতা বলল 'কোনটা ঠিক , বেঠিক তোমার কাছ থেকে শিখব না রেখাদি ।দরকার হলে তুমি যেভাবে কথা বলছো ,তাতে আমার মনে হয় তোমার শিক্ষা, রুচি বোধের কোথাও বোধহয় কমতি আছে।'
রেখার মাথাটা কেমন হঠাৎই গরম হয়ে
 গেল । আর জিজ্ঞাসু কন্ঠে বলল 'আমার শিক্ষা, রুচিবোধ? কেন রে ,আমি কি এমন শিক্ষা হীনতা,রুচিহীনতার পরিচয় দিলাম?'
অনিন্দিতা বলল _কেন এই বসা নিয়ে যেসব রুচিহীন কথা তুমি বলছো ,আমাকে সরে যেতে বলছ, এটা কি তার যথেষ্ট প্রমাণ নয়?'
রেখা বললো 'তুই এসব কি কথা বলছিস? এই জায়গাটায় আমি বসি, তাই তোকে বলেছি।'
অনিন্দিতা বললো 'এখানে তো কারো জায়গা ফিক্সট নয়।'
রেখা বললো 'আমরা প্রত্যেকে জানি কারোরই জায়গা ফিক্সট নয় ।তবুও আমরা যখন এখানে এসেছি ,একটা কাজ করছি ,প্রত্যেকেরই একটা নির্দিষ্ট জায়গা আছে, সেখানে সে নির্দিষ্ট দিনে বসবে ,সেখানে তার ব্যাগটা রাখবে, সে সেখানে কাজগুলো করবে। নইলে তো উদ্দেশ্যহীন যাযাবরদের মতো ঘুরে বেড়াতে হবে আজ এক জায়গায় কাল অমুক জায়গায়।
অনিন্দিতা বলল 'এটা তোমার ভুল ধারণা । আমার এই আজকে যদি জায়গাটা ভালো লাগে তাহলে কি আমি বসবো না ?তুমি কি আপত্তি করতে পারো ?এটা তো কারো কেনা জায়গা নয় বল?'
রেখা বলল_ আমি একবারও বলিনি যে কারো কেনা জায়গা ।আমি তোকে বোঝাতে চাইছি কেউ তো আর সারাদিন ধরে যাযাবরের মতো ঘুরে বেড়াবে না ।একটা নির্দিষ্ট জায়গা থাকলে সে তার নির্দিষ্ট জায়গায় এসে তার ব্যাগটা রাখবে, সেখানে কাজ করবে বসে। শান্তিতে কাজ করতে বসে একটা মনের প্রশান্তি।'
অনিন্দিতা বলল 'কাজ করতে জানলে প্রশান্তি এমনি ফিরে পাবে রেখাদি ।জায়গা নিয়ে কোনো প্রশান্তির কথা তুমি বলো না? জায়গাটা কোন ম্যাটার করে না।'
রেখা বললো 'তুই কি আজকে শুধুমাত্র আমার সঙ্গে অকারণে কথাগুলো শোনাবি বলে এরকম ব্যবহার করছিস?'
অনিন্দিতা বললো 'তোমার কি তাই মনে হচ্ছে আমার কি কোন খেয়ে কাজ নেই। আমি তোমার সঙ্গে যেচে পড়ে এই সমস্ত কাজগুলো করতে 
যাব ।বরঞ্চ তুমি আমার সঙ্গে এরকম ব্যবহার করছ?'
রেখা বলল 'দেখ আমি সেরকম কোন কিছুই করতে চাইছি না ।আমি তোকে শুধু সেই ব্যাপারটাই বোঝাতে চাইছিলাম। তোর  একটা জায়গায় এত দিন বসে এসেছিস ,কেউ কি গিয়ে তোর জায়গায় বসেছে ভাই এইভাবে কথা বলেছে? হ্যাঁ এটা হতে পারে ক্ষণিকের জন্য হয়তো বসেছে আবার তুই গেলে নিশ্চয়ই সেখান থেকে উঠে এসেছে। এরকম তো হয়।'
অনিন্দিতার রেখার এই সমস্ত কান্ড-কারখানা দেখে কেউ কিন্তু কোন প্রতিবাদ করছে 
না ।প্রত্যেকেই নিজের মনে বিষয়গুলো উপভোগ করছে । কাওকে  তো  দেখে বোঝা গেল যে পুরোটাই অনিন্দিতাকে সাপোর্ট করছে কিন্তু 
কেন ? কেন এমন করছে? রেখা তো এরকম চায়না ।প্রত্যেককে ভালোবেসে, প্রত্যেকের সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে চায়। তাহলে কেন তার সঙ্গে এরকম হচ্ছে?'
রেখা মনে মনে ভাবছে' কাউকে পছন্দ না করে ভালোবাসা যায় কিন্তু এটা কি হচ্ছে অনিন্দিতাকেও ভালোবাসে। আজকে অনিন্দিতার ব্যবহার রেখাকে বুকের ভিতর শুল বিঁধিয়ে
 দিচ্ছে ।সমস্ত মনটা কেমন যেন বেদনায় দগ্ধ হচ্ছে ।যেন মনে হচ্ছে  উঠোনে নর্দমা থেকে একটা শিরশিরে শীত আর দুর্গন্ধ আছে।

রেখা তবুও তার সুবাস ছড়িয়ে দিতে চায় অনিন্দিতার ভেতরে ।
তাই মিষ্টি সুরে রিকোয়েস্ট করল ' তাহলে তুই সত্যিই এখানে বসবি? তুই তোর জায়গায় যাবি না?'
অনিন্দিতা বলল' তুমি কি পাগল? আমার মনে হয় তোমার কোন মেন্টালি সমস্যা হচ্ছে, আর না হলে তোমার কোন সাইকো সমস্যা হচ্ছে? তুমি এক কাজ করো আজকে বাড়ি গিয়ে দাদাকে বলে তোমাকে একজন সাইক্রেটিস ডাক্তার কাছে নিয়ে যেতে।'
রেখা বলল _কেন রে আমি কেন সাইকো ডাক্তার দেখাতে যাব?'
অনিন্দিতা বলল_ তোমার ব্যবহার সেটা বলে দিচ্ছে।'
রেখা বলল' ঠিক আছে তোর যখন একান্ত এই জায়গাটাই পছন্দ তুই এখানে বোস। আমি বরং অন্য জায়গায় গিয়ে বসি।_
অনিন্দিতা এমন তাচ্ছিলভাবে রেখার দিকে তাকাল  সকলে উপস্থিত সহকর্মীরা হেসে উঠলো।"
রেখা মনে মনে ভাবল_ কাদের দেখছে? দীর্ঘদিনের চাকরিজীবনে এরাই তার 
সহকর্মী ।একজন সিনিয়র টিচার কে একজন জুনিয়র টিচার অপমান করছে আর এরা তার সাথে তাল মিলিয়ে হয় চুপ করে থাকছে, চুপ করে তার সাপোর্ট করছে । নয়তো প্রকাশ্যেই হেসে উঠছে ।এর থেকে অপমান আর কি হতে 
পারে ?রেখা  নিতে পারছে না ।রেখা সত্যিই  কাজের জায়গাটা মনে হচ্ছে আস্তে আস্তে মানসিক দিক থেকে শান্তির বিষয়টা উড়ে চলে যাচ্ছে।'
একসময় ভেবেছিল রেখা যে শেষ পর্যন্ত হয়তো অনিন্দিতার মত বদলাবে  একটা ক্ষীণ আশা তার মনের ভেতরে ছিল। তাই সে শেষবারের মত আরেকবার অনিন্দিতাকে বলেছিল কিন্তু যখন টের পেল না এই আশা লালন করা তার ব্যর্থ হয়েছে ।চোখের পাতা দুটো তাই জ্বালা করে উঠলো ।এত নীচ, এত স্বার্থপর কেউ হতে
 পারে? মনে মনে একটা পরিমাণ হীন অভিমান উদ্বেল হয়ে উঠলো ,যেন মনে হচ্ছে জায়গাটা নেবার জন্য বা বসার জন্য নয় ,এই যে কুরুচিকর কথাবার্তাগুলো বলল ।সেই বলার জন্যই তার  মনের ভেতরে খুব কষ্ট হচ্ছে।  কোন কারণ
 নেই ।তবুও কেমন যেন মনে হয়েছিল একবার গিয়ে অন্তত অনুরোধ করে যদি বলে, যদি জায়গাটা ছেড়ে দেয় ।কিন্তু সেটা হলো না। রেখা তারপর মনে মনে ভাবতে লাগল 'ছি : একটা জায়গার জন্য এরকম কাজ ,এত কথা 
কাটাকাটি ?কি দরকার ?সত্যিই তো তাই কেউ কি জায়গা সঙ্গে করে এনেছে নাকি বা নিয়ে যাবে নাকি?কারো জায়গা নির্দিষ্ট নয় । প্রত্যেকে জায়গায় একটা নির্দিষ্ট করে নিয়েছে। তাই কথাটা তো একদম ঠিক বলেছে। সুতরাং এটাকে মেনে নেয়াই উচিত  সমস্ত সম্পর্কের নিবিড়তা, সমস্ত পরিচয় গভীরতার দিকটা আজকাল মনে হচ্ছে যেন কেমন যেন অন্ধকার। মনের দেয়া সেখানে কেউ ঝুলিয়ে দিয়েছে তালা।  তাই আঘাতের মুহূর্তটিকে রেখা কিছুটা ভেঙে পড়েছিল ।যেন মুষ্টিযুদ্ধে মুখ থুবরে পড়ে যাওয়ার মত ।তাই শুধু দৈহিক যন্ত্রণা নয় ,একটা মানসিক অপমানবোধ ও তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেরিয়ে ছিল ।যেন কুকুর তাড়া করেছিল।

শামীমা আহমেদ এর ধারাবাহিক উপন্যাস ৫৮




শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত 
(পর্ব ৫৮)
শামীমা আহমেদ 

রীতিমতো একটা ঝড় মোকাবেলা করে শিহাব আর সুমাইয়া মায়ের ঘরে গেলো।তখনো  আরাফ সুমাইয়ার কাঁধে।  মাথা গুঁজে দিয়ে একেবারে সুমাইয়ার বুকে গা লেপ্টে দিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে। ভীষণ ভয় পেয়েছে সে! শিহাবকেও বেশ বিধ্বস্ত লাগছে। সকালবেলা যেমন সুন্দর ফুরফুরে মেজাজে শায়লাকে নিয়ে এসেছিল এখন  কেমন যেন অগোছালো লাগছে। শিহাব  শায়লারকে  নিজের সবটা জানাতে   চোখে মুখে আকুতি নিয়ে শায়লার দিকে তাকিয়ে রইল।শিহাবকে দেখে  শায়লা এক অজানা আশংকায় অস্থির হয়ে উঠলো! শায়লার চোখের জিজ্ঞাস্যও শিহাবের চোখে ধরা পড়েছে। সে শায়লাকে নিয়ে মায়ের ঘরের সাথের খোলা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো।
শায়লাকে সব জানাতে হবে।শিহাব কিছুই লুকাবে না। একেবারে অপ্রত্যাশিতভাবে আরাফ আর রিশতিনাকে নিয়ে আজ যা ঘটে গেলো শায়লার তা জেনে রাখা উচিত।
শিহাব শায়লার হাত ধরে সব খুলে বললো।
শিহাব একে একে তার যুক্তি পালটা যুক্তি দিয়ে রিশতিনার সাথে সব কথোপকথনের শেষটা পর্যন্ত বলে গেলো।শায়লা খুবই অবাক হলো, পাশের ঘরে বসে সে কিছুই টের পেলোনা!   
শায়লা বুঝে নিলো রিশতিনা তার প্রাপ্যটাই চাইতে এসেছে।তবে অনেক দেরি হয়ে গেছে। তার সাথে শিহাব আজ অনেকটাই জড়িয়ে গেছে।যার দুঃখ ভুলাতে শায়লা শিহাবের
আপন হলো, যার দুঃখ ভুলতে শিহাব শায়লাকে আপন করে নিলো আজ ঘটনার দৃশ্যে তারই উপস্থিতি!
শায়লা শিহাবের মনের অবস্থা বুঝতে পারলো।সে শিহাবকে শান্ত করতে চাইলো। খুবই সহজ করে বললো, আমি হলেও এটাই করতাম শিহাব।রিশতিনা কোন ভুল করেনি। তবে ঐ মূহুর্তে  ভেবে চিন্তে তুমি যা সিদ্ধান্ত নিয়েছো সেটাই মেনে নাও। চলো, তোমাকে মায়ের কাছে নিয়ে যাই।তার কাছে গেলে তোমরা ভালো লাগবে।শিহাব শায়লার মাঝে, শায়লার কথার মাঝে সান্ত্বনা খুঁজে পেলো।
শায়লার চোখে চোখ রেখে আশ্বাস আর ভরসার সাড়া পেলো।
ঘরে সুমাইয়ার কোল থেকে আরাফ দাদুর কোলে ঝঁপিয়ে পড়লো।মনে হলো কোন ভয়ংকর কিছু দেখেছে সে, তাইতো দাদুর কাছে আশ্রয় নিতে চাইছে। আরাফকে কাছে নিয়ে দাদু কান্নায় ভেঙে পড়লো। এই কান্না, একটি শিশু তার আপন মায়ের আদর বঞ্চিত হওয়ার,এই কান্না এক দরদী মায়ের নিজ সন্তানকে ফিরে না পাওয়ার, একজন স্ত্রী তার স্বামীর ভালোবাসা হারিয়ে যাওয়ার,নিজের ছেলের জীবন এলোমেলো হয়ে যাওয়ায়।
মা হয়ে খুবই কষ্ট এইসব মেনে নেয়া।সুমাইয়া তার শ্বাশুড়িকে শান্ত করার চেষ্টা করছে।সুমাইয়াও বারবার শাড়ীর আচলে চোখ মুছছে। তার বিয়ের পরে শিহাবকে সে কলেজ পড়ুয়া পেয়েছে। এতোটা গোছানো আর সুন্দর আচার ব্যবহারের শান্ত ছেলেটির জীবনে যে এত ঝড় বয়ে যাবে তাই বা কে জানতো! 
শায়লা শিহাব মায়ের ঘরে ঢুকলো।শায়লা এই প্রথম আরাফকে দেখলো। মানে দাদুর কোলে জাপ্টে ধরা আরাফকে। মুখটা এখনো দেখা হয়নি। শায়লা ভেবে নিলো, যে করেই হউক আরাফকে আপন করতে হবে।আজ সকালে ওর জীবনে যা ঘটে গেলো  একটা  শিশুর জন্য সেটা খুবই শকিং। 
শিহাব আরাফকে সহজ করার জন্য বাবা বাবা বলে ডাকতেই আরাফের সাড়া মিললো। সে বাবার দিকে তাকালো  কিন্তু তার পাশে শায়লার মুখটা চেনা না অচেনা ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। তার বাবার ঘরে সকালে দেখা মুখটা যে বলেছে, সে তার মা, এই কি সেই জন? শিশুটির চোখে প্রশ্ন খেকে যাচ্ছে। শায়লা তার চোখের ভাষায়  আরাফকে কাছে ডাকছে। আরাফ একবার শিহাব  আর একবার শায়লাকে দেখছে। শিহাব হাত বাড়িয়ে কাছে নিতে চাইলে এক ঝাঁপ দিয়ে  বাবার কোলে উঠে গেলো। শায়লা শিহাবের কাছে একটু ঘেঁষে দাঁড়াতেই আরাফের চোখ যেন বিস্ময়ে বিস্ফারিত!  কেন সে তার বাবার কাছে ঘেঁষে দাড়াচ্ছে? বাবাতো সকালে মায়ের সাথে অনেক রাগ হয়েছে।আরাফের ভীত চোখ আর ভেতরে বয়ে যাওয়া নানান প্রশ্ন ঘরের সবাই বুঝতে পারছে।দাদু কেন কাঁদছে এটাও তার জিজ্ঞাসা।  সব মিলিয়ে সে যেন একটা প্রশ্নের সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে।  শিহাব আরাফকে ভীষণভাবে আঁকড়ে ধরে রইল। কিন্তু খোল চোখে পিটপিট করে তাকিয়ে শায়লাকে দেখছে। শায়লা যেন বুঝেও না বুঝার মত করে এই প্রথম  আড়চোখে আরাফের মুখটা দেখে নিলো।কী ভীষণ মিষ্টি  মুখখানা। মুখের গঠন শিহাবের সাথে খুব একটা মিলছে না।বুঝা গেলো সে মায়ের মতই হয়েছে। শায়লা কল্পনায় রিশতিনার মুখটা ভেবে নিলো। তখনই নিজের ভেতরে কিছুটা অপরাধবোধ কাজ করলো। পরক্ষণেই তার চোখের দিকে আরাফের দৃষ্টি পড়তেই আরাফ তাকে চেনার চেষ্টা করছে।

তিনতলা থেকে সুনায়রা আর আরুশ  সরাসরি দাদুর ঘরে চলে এলো। সবার মাঝে একটা থমথমে ভাব দেখে ওরা প্রথমে একটু থমকে গেলো।শিহাবের কোল থেকে   আরাফ ওদের দেখে একটু স্বাভাবিক হলো।
ঘরে একজন নতুন অতিথি দেখেচসুনায়্রা আর আরুশ একটু  সিঁটিয়ে গেলো। সিমাইয়া ওদের সাথে শায়লাকে  কি  নামে পরিচয় করাবে তা বুঝে উঠতে পারছিল না। শিহাবই বাচ্চাদের সাথে শায়লার পরিচয় করিয়ে দিলো। 
শিহাব জানালো,উনি হচ্ছেন শায়লা,উনি  তোমাদের নতুন চাচী হবেন।তবে  তোমরা এখনই চাচী ডাকতে পারো। শায়লা চাচী।এই কথায় সবার সেই থমথমে ভাবটা কেটে গেলো।সবার মুখে হাসি ফুটলো।আজ সকাল থেকে যা,একেবারে উধাও হয়ে গিয়েছিল।

শিহাব এবার আরাফকেও একটু সহজ করে নেয়ার চেষ্টা করলো।  আরাফের মুখের দিকে জানালো, আরাফ এইটা তোমার মা। শায়লা মা। যাও, বাবা মায়ের কাছে যাও। মা তোমাকে অনেক আদর করবে। শিহাব আরাফকে শায়লার কাছে দিতে চাইলো। শায়লাও হাত বাড়িয়ে আরাফকে কাছে নিতে চাইল।আরাফ কিছুটাক্ষণ নিশ্চুপ থেকে চাচীমা বলে সুমাইয়ার দিকে হাত বাড়ালো।  চাচীমা, আরাফকে এই ডাকটি তার দাদুই শিখিয়েছে। মা ডাকটি যেন সে ডাকতে পারে।মুরুব্বিরা অনেককিছুই আগাম বুঝতে পারে।তিনি আগেই ভেবে রেখেছিলেন,আরাফের মা যেহেতু বেঁচে আছে কোন না কোনদিন  সন্তানের খোঁজে আসবেই। তখন নিজের মাকে মা ডাকলেও চাচী ডাকটি থেকে যাবে।আর যেভাবে মায়ের আদরে সুমাইয়া আরাফকে বড় করেছে মা ডাক তারও প্রাপ্য।

সুনায়রা আর আরুশ কিছুক্ষণ শাআকে অবজার্ভ করে হাত এগিয়ে নতুন চাচীর হাত ধরলো।শায়লাও ওদের কাছে টেনে নিয়ে আদর করলো।  সুনায়রা বললো, চলো চাচী আমদের সাথে ক্যারাম খেলবে। বলেই শায়লাকে টেনে দাদুর রুম থেকে নিয়ে যেতে চাইলো। শায়লাও ওদের সাথে পা বাড়ালো।আরাফ তখনো, সুমাইয়ার কোলে।চোখ গোল গোল করে শায়লার চলে যাওয়া দেখছে। সুমাইয়াও ওদের সাথে আগালো।দিনের সব রান্নাবান্না পড়ে আছে। 
সুনায়রা আর আরুশ  দাদুর ফ্ল্যাটের ড্রয়িং রুমে ক্যারাম খেলার প্রস্তুতি নিলো।সুমাইয়া আরাফকে সেখানে মেশাতে চাইলেও সম্ভব হলোনা।সে চাচীমার কোলেই বেশ আছে। সুমাইয়া আরাফকে নিয়েই তিনতলায় চলে গেলো। বাচ্চারা শায়লাকে নিয়ে খেলায় মেতে উঠলো। ওরা ভুলেই গেলো, এটা তাদের চাচী।খেলার আনন্দে শায়লা খুব দ্রুতই অনেক বন্ধু হয়ে ওদের সাথে মিশে গেলো।

মায়ের বিছানাত শিহাব মাকে শুইয়ে দিলো। মায়ের পাশে বসে মায়ের মাথায় হাত বুলাতে লাগলো। জানতে চাইলো, শায়লাকে তোমার কেমন লাগলো মা।
মা জানালেন, খুব ভাল লেগেছে বাবা।খুবই মায়াকাড়া মুখটা। আরাফকে যেন মায়ের আদরে রাখে এটাই চাওয়া।আমি আর কয়দিন? বড় বৌমা আর কতদিন দেখবে? তার নিজের সন্তানরা বড় হয়েছে। এসব বলে মা  কাঁদতেই শিহাব তাকে  তাকে সান্ত্বনা দিলো।দেখে নিও মা, শায়লা কেমন করে তোমাদের সবাইকে আপন করে নেয়।আর আরাফের মা হয়ে আরাফেরও যত্ন নেয়।ও খুব ভালো  একটা মেয়ে, মা। আরাফকে মায়ের অভাব বুঝতে বুঝতেই দিবেনা।
মা অস্ফুটস্বরে বলে উঠলেন,  আল্লাহ যেন তাই করেন।


চলবে....