৩১ মার্চ ২০২২

কবি শর্মিষ্ঠা দাস এর কবিতা "হিসেব"




হিসেব 
শর্মিষ্ঠা দাস

হিসেব মিলছে না
কিছুতেই না
উত্তরের জায়গাগুলো দুর্বোধ্য কিছু কালির আঁচড়ে ভর্তি
ঘুনপোকারা কাটছে সময় ...
পাতার গায়ে লেগে থাকা শেষ জলের বিন্দুর খসে পড়া,
মনে করিয়ে দেয় 
আঁকড়ে ধরার চেষ্টা শুধুই বাহ্যিক 
কবরে শোয়ানো ফুল আজ অনেকদিন হল রঙ হারিয়েছে
জীবিতরাও আজ কফিনবন্দী করেছে সব সূক্ষ্ম অনুভূতি গুলোকে 
জীবন বড় ক্লান্ত 
মৃত্যুর শীতলতা তাই বড়ই কাছের
আশ্লেষে একটা চুম্বন এনে দিক সেই পরমপ্রাপ্তি ।।
  
                                                          
             

কবি আতিয়ার এর কবিতা অগ্রপথিক




অগ্রপথিক
আতিয়ার রহমান 

ছলনার সাথে রাখি বন্ধনে
হারিয়ে স্বর্গকুল
সৃষ্টির সাথী হয়ে এলে নারী 
ফোটাতে মানব ফুল।

অধর ওষ্ঠে মধুর পেয়ালা
বক্ষে দোদুল দিশ
মোহ-ঝর্ণনার প্রেমের জোয়ারে 
ভাসাও অহর্নিশ। 

মমতা শ্রেষ্ঠা স্বপ্নের ভোর 
রোদ্র করোজ্জল
রাতের আঁধারে চন্দ্রকলায়
স্নিগ্ধ নীলোৎপল। 
 
উসর মরুতে ঝরা নির্ঝর,
করুণা নিধির ছায়া
জননী জায়ার বহুরূপী রূপ
শ্যামল মাটির মায়া।

নর-বিদ্বেষী নও নারীবাদী 
নও বিপনন প্রতীক 
তোমার শুভ্র আঁচল তলায়
ঘুমায় অগ্রপথিক।

৩০ মার্চ ২০২২

আইরিন মনীষা'র কবিতা "রিক্তের বেদন"




রিক্তের বেদন
আইরিন মনীষা 

বড়  অভিমানী মেয়ে আমি
অল্প শোকে কাতর
হারানো প্রেমের বিরহে আজি
হয়েছি আমি পাথর।

হাজারো স্বপ্নের পসরা নিয়ে
করেছিনু বুনন কাব্য
সেই কাব্যটির প্রতিটি পাতায়
আমার দুঃখের নাট্য। 

বাড়ি গাড়ি টাকা পয়সা
ছিলোনা কিছুই চাওয়া
সুখে দুঃখে থাকবো দুজন
হলোনা তাও পাওয়া। 

বিনা দোষে ছাড়লে আমায়
বাঁধলে অন্যে ঘর,
আমার যতো আবেগ অনুভুতি
করলে তুমি পর। 

সময় যেন ঘনিয়ে এলো 
ডাকছে আমার রব
মরণের পরে মাটির ঘরে
ফিরবো হয়ে শব।

নাসিমা মিশু এর কবিতা "কুর্নিশ"




কুর্নিশ 
নাসিমা মিশু

কুর্নিশ মহাশয়- বাপ জী,ভাই, দাদা গুরুজন, 
বড় বড় শিক্ষিত, অধিপতি, কর্তা ব্যক্তিগন
আপনাদের কুর্নিশ ।
ছোট আমি ,অতি ছোট্ট দীন হীন, 
জরাজীর্ণ সব হীন; 
কেনো ই বা এই দুর্দশা! 
কুর্নিশে হাত জোড় ঠিক ; 
মাথা মোর ণত নহে, দেখো দুচোখ বাড়িয়ে ।
চেয়ে দেখো ভালো করে, মোর আঁখির তীব্রতা 
প্রখর দীপ্তিময় নয় কী ?
মোর দু'নয়নে উপছে উঠেছে তোমাদের কীর্তি ।
দুর্নীতি, ঘুষ, সুদ, দৌড়াত্ব,দাপট... 
ডুবে গেছো তোমরা ।
টাকা আর টাকা  হায়!কেড়ে নিয়েছে তোমাদের বোধ ।
শুধু কী তাই ?
দেখছি পড়ছি শুনছি পবিত্র সংসদ কলুষিত হলো হায়
মানব পাচার ঘৃণ্য মানুষ নামের দানবের পদচারণায় ।

এক মা পারে কী ! এমন লোভী দানবদের থাবা থেকে আমাদের রক্ষা করতে... 

আমি, আমরা বলি থামো এবার ;হাত যবে উঠিয়েছি,
কুর্নিশটা দাও করতে ভক্তি ভরে বিনম্র বিশ্বাসে ।
একটু হলেও দাও পরিচয় তোমাদের শ্রেষ্ঠত্বের ।
শিক্ষা, ধর্ম, বর্ন নির্বিশেষে পরিবার সব তো করেছো কলুষিত! 
এবার থামাও তোমাদের নির্লজ্জতা, 
কুর্নিশটা নাও সৎ, সত্য ও সততার সাথে ।
আর কত চাও?
শুনছি, পড়ছি বিদেশে ব্যাংক নাকি পেট ফুলে ফেঁপে হয়ে উঠেছে কলাগাছ তোমাদের টাকায় ।
পত্র পত্রিকায় বড় বড় হরফে একজনের বাণীতে চোখ মোর কপালে- 
বেতন দিতে হলে ছয় মাস পড়ে ছাপাতে হতে হবে টাকা 
বেসামাল মদ খোর যতটা না বেসামাল মদ্যপ পানে,
তারচেয়ে ও অধিক বেসামাল লজ্জার মাথা খাওয়া তোমাদের কর্ম ।
এখনও আছে সময়- 
কুর্নিশ কুর্নিশে বলছি দয়া করো, আমাদের বাঁচতে দাও।
তোমাদের ধৃষ্টতা, আমাদের অক্ষম অপারগতার একদিন হবে শেষ- 
একথা জেনো নিশ্চিত ।
এপার ওপার কোনো পাড়ে না হলেও, হবে হবে পরপারে হবে।
কুর্নিশ বাপজী ভাই জী, আবার ও বলছি- 
শোনো শোনো দেশ জননীর কথা- 
জননীর সাথে সততার দৃষ্টান্তে হাত মিলিয়ে দেশটাকে করো রক্ষা ।
শোনো শোনো বলি-
মরে গেলে পচে যাবে 
মাটির সাথে মিশে যাবে মাটি তৈরি দেহ 
থেকে যাবে কর্ম কীর্তি, কর্মের দায়।

কুর্নিশ কুর্নিশ তোমাদের কুর্নিশ বিনম্র শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসে ।

ভালো থেকো তোমরা, ভালো থাকতে দিও আমাদেরকে এই মিনতি আর্জিত কুর্নিশে তোমাদের কাছে মোর ।

শামীমা আহমেদ এর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৮০




ধারাবাহিক উপন্যাস 


শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত (পর্ব ৮০)
শামীমা আহমেদ 

শায়লা এবার উঠতে হবে,চলো। দুপুরের খাবারের সময় অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে।সাড়ে তিনটা বাজতে চলেছে।চলো,কোথাও কিছু খেয়ে নেই। শিহাব শায়লাকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বললেও শায়লা যেন একটা ঘোরের মধ্যে ছিল। শিহাবের কথায় স্বাভাবিকে এলো। অস্ফুট স্বরে বললো,হ্যাঁ, চলো, তবে খাওয়ার জন্য অন্য কোথাও নয়।এখানে কিছু খাবারের দোকান আছে, সেখানে বসে কিছু খেয়ে নেই। শিহাব একমত হলো।দুজনেই উঠে দাঁড়ালো।শিহাব চোখের ভাষায় যেন শায়লাকে আবার সব কিছু মনে করিয়ে দিচ্ছে। আর তাতে শায়লার অকপটে উত্তর,তুমি ভেবোনা। আজ আর আমি বাসায় ফিরছিনা। জীবন আজ থেকে অন্যরকম হবে।
দুজনে এখানেই একটা রেস্টুরেন্টে বিফ বার্গার আর কোল্ড ড্রিংকস দিয়ে লাঞ্চ সেরে নিলো। শিহাব শায়লাকে নিয়ে ভাবছে। এখন কি তবে শায়লাকে অফিসে নিয়ে যাবে নাকি ওর নিজের ফ্ল্যাটে  রেখে আসবে?কিন্তু বাসায় শায়লা একা একা কি করবে ? শিহাবের আজ অফিসে বেশ কিছু জরুরী কাজ আছে।অফিস থেকে বেরুতে  রাত হয়ে যাবে।এতক্ষন শায়লাকে অফিসে বসিয়ে রাখাও খুব একটা ভালো দেখাবে না। কি করা যায় ? ভাবতেই শায়লা শিহাবের মুখভঙ্গি যেন পড়ে নিলো।শিহাব কি নিয়ে চিন্তিত জানতে চাইলো। 
তুমি কি আমাকে নিয়ে বিব্রত বোধ করছো শিহাব ? 
একেবারেই না, তুমি আমার সাথে চলো, আমরা একসাথেই থাকবো। কাজ শেষ করে একসাথেই বাসায় ফিরবো।
কথাটা বলেই শিহাবের মন আনন্দে নেচে উঠলো!  শায়লাকে আজ সে আপন করে পেতে যাচ্ছে। শিহাবের সেই রবীন্দ্র সংগীতটির কথা মনে পড়ছে... ন্যায় অন্যায় জানিনে জানিনে জানিনে শুধু তোমারে জানি, তোমারে জানি,ওগো নন্দিনী। 
শায়লা হাত বাড়িয়ে দিলো। শিহাব হাত এগিয়ে শায়লাকে ধরলো। শিহাব দেখলো শায়লার হাতে তার দেয়া সেই ব্রেসলেটটা ! শিহাব খুবই পুলকিত হলো! দুজনে দ্রুত হেঁটে  বাইকের দিকে এগিয়ে গেলো। শিহাব বাইকে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগলো, শায়লা আজ আমার বাসায় গেলে ওর জন্যতো কিছু পোশাক প্রয়োজন। কিন্তু কখন যে বেরুবো ? 
শায়লা শিহাবের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলো, কি ভাবছো ?
এইতো,ভাবছি তোমার জন্য কিছু পোশাক কেনা দরকার কিন্তু,,, 
শিহাবকে থামিয়ে শায়লা বললো, কোন কিছু প্রয়োজন নেই। আমি তোমার টি শার্ট আর ট্রাউজার পরে থাকবো। শিহাব যেন একটা উপায় খুঁজে পেয়ে স্বস্তি পেলো।
শিহাব বাইক স্টার্ট দিলো।শায়লা পিছনে বসতেই আর এক মূহুর্তও দেরি না, শিহাবের পংখীরাজ বাইক যেন উড়ে চললো। 
শিহাবের অফিসে ঢুকতে প্রায় পাঁচটা হয়ে গেলো। শিহাব শায়লাকে তার অফিস রুমে রাখা ঐপাশের সোফায় বসতে বললো। শায়লা শিহাবের কথামতো সোফায় চুপটি করে বসে রইল। সে বুঝতে পারছে, বাসায় এখন কি পরিস্থিতি হতে পারে। 
শায়লা এখনো বাসায় ফেরেনি। বিষয়টি রুহি খালা খুব একটা ভালো ভাবে নিচ্ছে না। সে শায়লার মাকে নানান আক্রমনাত্মক কথা শোনাচ্ছেন। আজ আর বড় বোনের মত সম্মান করে কোন কথা বলছে না। সে একেবারে হিংস্র বাঘিনীর মত ক্ষেপে আছে। সে  রাহাতকে কল করে শায়লার বাসায় না ফেরার কথা জানালো, শায়লা এখনো বাসায় ফেরেনি রাহাত। আজ ওকে একা বাইরে যেতে দেওয়া ঠিক হয়নি।
রাহাত ভীষণ অবাক হলো! ঘড়িতে সময় বিকেল পাঁচটা।সেই দুপুর বারোটায় বেরিয়েছে।  রাহাত শায়লাকে কল দিলো। শিহাবের অফিস রুমে সোফায় ক্লান্তিতে  শায়লার চোখ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। রাহাতের কলে সে জাগলো। ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করে রাহাতের কল দেখে কিভাবে তা মোকাবেলা করবে একটু ভেবে নিলো।
ওপ্রান্তে রাহাতের উৎকন্ঠিত জিজ্ঞাসা, 
আপু তুমি এখনো বাসায় ফেরোনি, অনেক বেলা হয়েছে। তাড়াতাড়ি বাসায় এসো।
শায়লা রাহাতকে জানালো, আজ আমি আর বাসায় ফিরে যাচ্ছিনা রাহাত। আমি শিহাবের সাথে আছি। বাকী জীবন শিহাবের সাথেই কাটিয়ে দিবো।
শায়লার এমন কথায় রাহাত ভীষণ অবাক হয়ে গেলো।সাথে মান সম্মানের কথা ভেবে চিন্তিত হয়ে পড়লো। তবু্ও শায়লাকে মানাতে
সে বললো, না আপু এটাতো কথা ছিল না।তুমি কাজের জন্য বাইরে গিয়েছো। কাজ শেষ করে তোমাকে বাসায় ফিরে আসতে হবে।
না, আমি ফিরবো না। আমি শিহাবের সাথেই থাকবো। আর যদি পারো,নোমান সাহেবকে দেশে আসতে নিষেধ করে দাও।আমি তার সাথে কোথাও যাবো না।
শায়লার এমন কথা শুনে রাহাতের আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেলো। এমন কথা রুহি খালা বলেছিল, সে শোনেনি। সে বুঝতে পারেনি, আপু যে এভাবে বদলে যাবে ! রাহাত তাকে যতই বাসায় ফিরে যাওয়ার অনুরোধ করছে, শায়লা ততটাই  শক্ত হয়ে যাচ্ছে। যেন শিহাবের কাছে নিজেকে সঁপে দিচ্ছে। রাহাত আর কোন দিক বুঝতে না পেরে কল কেটে দিলো।নিজের বোকামির খেসারত নিজেকেই দিতে হচ্ছে।
ওপাশ থেকে শিহাব সবই শুনছিল।শায়লা বেশ দৃঢ়ভাবেই রাহাতকে ফিরিয়ে দিলো।
তাহলে শায়লাকে নিয়ে তার বাসাতেই ফিরতে হবে। শিহাব জানালো, শায়লা আমার কাজ গুছাতে রাত আটটা বেজে যাবে। তুমি অপেক্ষা করতে পারবে না ? শায়লা বললো,খুব পারবো। বাসার কথা মনে হতেই বাসার  চাবির কথা মনে হলো। সে কেয়ারটেকার বিল্লালকে কল দিয়ে বাসার কথা জানতে চাইলো, বিল্লাল আমার ফ্ল্যাটের চাবি তোমার কাছে নিয়েছো ?
না ছার, ঘরে তো সেই বিদেশি ম্যাডাম। এইতো অর্ডার দিয়া পিজা নাস্তা আনাইলো।আমি উপরে গিয়া দিয়া আসলাম ।ম্যাডাম আমারে বখশিশ দিলো। আমি নিতে চাই নাই ছার,কিন্তু  জোর কইরা দিলো।
উফ! বিল্লালের মুখ যেন রেলগাড়ির মত চলছে। শিহাব তাকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দিলো। 
শিহাব বুঝতে পারছে না, রিশতিনা কেনো এখনো যায়নি। সে তাকে সেই সকালেই চলে যাওয়ার কথা বলে এসেছিলো। কেন সে যায়নি ? সে কি বুঝতে পারছে না, তার সাথে আমি আর জীবন এগিয়ে নিতে চাইছি না।
সন্ধ্যা হয়ে আসছে। একটু পরে রাত হয়ে যাবে। এখন তাকে  যেতে বলা মানে অন্য বিপদ ডেকে আনা। শিহাব কি করবে তা গভীর ভাবে ভেবে  নিলো।শায়লাকে নিয়ে তবে আজ রাতে কোন হোটেলেই উঠতে হবে।কাল সকালে বন্ধু রোমেলকে ডেকে রিশতিনাকে বিদায় জানাতে হবে। 
শায়লা শিহাবের জন্য অপেক্ষায় সোফায় একেবারে ভাবলেশহীনভাবে বসে আছে।যেন সবকিছু তার শিহাবের উপরে ছেড়ে দেয়া। আজ শিহাব যেখানে নিয়ে যাবে শায়লা নির্দ্বিধায়  সেখানেই যাবে। শিহাব সোফায় এসে শায়লার পাশে বসলো। শায়লার হাত ধরে বললো, শায়লা আমার একেবারেই বিশ্বাস হচ্ছে না, তুমি যে পুরোপুরি আমার হয়ে গেছো।
তোমাকে আপন করে পেতে যাচ্ছি। তুমি আজীবন আমার হয়েই থেকো।
শায়লা শিহাবের কাঁধে মাথা রেখে বললো, শিহাব আমি সারাজীবন শুধু দিয়েই গেছি।তুমি আমাকে আমার নিজের করে নিযের জন্য নিজের ভালোবাসার মানুষকে কেমন করে কাছে নিতে হয় সেটা শিখিয়েছো। শিহাব আমি তোমার মাঝেই সব নির্ভরতা খুঁজি।তোমার কাছেই সবটুকুর আবদার যাচি। তোমাতেই বিলীন হওয়ার জন্য নিজেকে উজার করে দিতে জানি। শিহাব তুমি আমায় গ্রহন করো। আমার আমিটাকে তোমার করে নাও আর তোমাকে পাওয়ার পূর্ণ সুখে আমাকে ভরিয়ে নিতে দাও।
ঠিক আছে শায়লা, তোমার চাওয়াই আমার কাছে শিরোধার্য। তবে আমার বাসায় এখনো রিশতিনা আছে।তাকে বলেছিলাম চলে যেতে কিন্তু সে এখনো আছে। আমি চাইনা তোমরা দুজন মুখোমুখি হও।এতে আরো ঝামেলা বাড়বে।তাই আমরা আজ উত্তরায় আমার এক কাজিনের হোটেলে থাকবো। যদি  তোমার কোন আপত্তি না থাকে।
শায়লার স্পষ্ট উত্তর,আপত্তির কিছু নেই। তুমি সাথে থাকলে এই পুরো পৃথিবীটাই আমার।
ঠিক আছে উঠো।গুছিয়ে নাও। চলো বের হবো।শিহাব সব গুছিয়ে কবিরকে অফিস লক করে দিতে বললো।
শায়লা আর শিহাব সবদিক ভেবে নিয়ে, সব কিছুকে উপেক্ষা করে নতুন জীবনের সন্ধানে একটা নতুন স্বপ্ন নিয়ে পদধাপে দরজার কাছে এগিয়ে গেলো। দুজনার মুখে বিজয়ীর হাসি।
হঠাৎই শায়লার মোবাইল মেজেজ রিং বেজে উঠলো। শায়লা হাতে ধরা মোবাইল মেসেজে চোখ রাখতেই ভীষণ অবাক হলো! ছোট বোন নায়লার  ম্যাসেজ।
আপু, মা বাসায় স্ট্রোক করেছে। রুহি খালা আমাকে জানালো। রাহাত ভাইয়া অফিসে।মাকে দ্রুত হসপিটালে নিতে হবে। আমি এম্বুলেন্স কল করেছি।তুমি আমাদের মাকে বাঁচাও আপু, দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাও।
শায়লার নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না!"


চলবে....

মমতা রায় চৌধুরী ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৪৪




উপন্যাস 

টানাপোড়েন ১৪৪
পাল তুলেছে খুশির হাওয়া
মমতা রায় চৌধুরী



মনোজ চোখ বুঝে আছে কিন্তু মন বোঝেনি। আজকে অফিস যেতে ভালো লাগছে না। সকাল থেকেই মেজাজটা কেমন খাটটা হয়ে গেছে। রেখার উপর অকারনে চিৎকার ,চেঁচামেচি করলো। সারাদিন এর রেশ থেকে যাবে। রেখার হিম শীতল উত্তরটা অনেকটা ট্রেনে অন্যমনস্ক যাত্রী বসে থাকলে হঠাৎ করে হুইসেল বেজে গেলে যেরকম হয়, ঠিক সে রকম জোরে ধাক্কা দেয়ার মত।
এদিকে সুরোদের বাড়িতে সত্যিই যাওয়ার দরকার যা ক্ষেপে আছে রেখা। সত্যিই তো, ওর তো কোন দোষ ছিল না।। আমার যে মাথাটা কেন মাঝে মাঝে এরকম হয় নিজেই বুঝে উঠতে পারছি না। এক্ষুনি স্কুলে বেরিয়ে যাবে ।একবার বলব গিয়ে।
রেখা তখন স্কুলের জন্য রেডি হচ্ছে ।
মনোজ দরজায় নক করল। রেখা শাড়ির কুচি ঠিক করতে করতে আড় চোখে  তাকিয়ে দেখল মনোজ কিছু বলল না। তারপর পিনাপটা ঠিকঠাক করে নিয়ে ড্রেসিং টেবিলের কাছে গিয়ে চুলটা আচড়ে ক্লেচার লাগিয়ে নিল, সিঁদুর পরে নিল।
 তখন ও মনোজ দাঁড়িয়ে দরজার কাছে ।মনোজ একটু হালকা কেশে নিল মনোজের অস্তিত্বটাকে বোঝানোর জন্য ।
রেখা সবকিছু দেখেও না দেখার ভান করছে।
মনোজ খেয়াল করল রেখা মোটামুটি রেডি হয়ে গেছে ।এখন ব্যাগ পত্র গুছিয়ে বেরোনোর চিন্তা ঠিক তখনই মনোজ বলল' রেখা সকালে তোমার সঙ্গে ওই রকম ব্যবহার করাটা আমার ঠিক হয়নি। তার জন্য সরি।'
রেখা কোন সাড়া দিচ্ছে না। এবার রেখা ব্যাগে র চেনটা বন্ধ করে চশমাটা পরে নিল। এবার বেরোতে যাবে দরজা আগলে দাঁড়ালো 
মনোজ । হচ্ছেটা কি ?কি হল? তুমি সাড়া দিচ্ছ না ?
তখনও রেখা কিছু বলছে না।
 মনোজ বলল' তুমি উত্তর না দিয়ে কোথাও যেতে পারবে না ।
'তখন রেখা বলল 'আমি তো তোমাকে কিছু বলিনি। তুমি বলেছ আমি শুনে নিলাম। তুমি সরি বললে আমি শুনে নিলাম'।
তুমি কিছু বলবে না?
' কি বলবো বলব? আমার কথা তুমি শোনো ?না বোঝো বোঝার চেষ্টা করো?
 ঠিক আছে সরো বেরোতে হবে, স্কুলে যেতে না হলে দেরি হয়ে যাবে ট্রেন পাব না।'
'আজকে তোমার স্কুলে যাওয়া হবে না বলে হাত দুটো ধরল রেখার।'
'কি করছো তুমি? আমি রেডি হয়ে গেছি স্কুলে যাব না তাই কখনো হয় নাকি?'
কোন কাজ বাকি আছে কি?'
'তোমার সঙ্গে আমার কতগুলো কথা আছে।'
রেখা মনে মনে ভাবলে এই জন্যই মনে হচ্ছে রেখার ঘরে এসেছে।
'কি কথা?'
'আগে বলো রাগ করোনি?'
'আজকাল আমার না কোন কিছুতে কিছু এসে যায় না ।আমি জানি রাগ করে তো কোন লাভ নেই। কার ওপর রাগ করবো বলো তো? যে রাগের গুরুত্ব বোঝেনা ।মান অভিমানের গুরুত্ব বোঝেনা ।তার সঙ্গে ?আমি এই বেশ ভালো আছি জানো তো?'
 মনোজ কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না।
'ঠিক আছে তুমি এবারকার মত আমাকে ক্ষমা করে দাও।'
'আমি তো তোমার প্রতি রাগই করি নি। ক্ষমা করার প্রশ্নটা কোথা থেকে আসছে?'
Ok
তাহলে এস এখানে বসো। হাত দুটো ধরে রেখাকে   সোফাতে  বসালো। মনোজও তার পাশে বসলো।
তারপর রেখাকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে আসলো।
রেখা যেন কেমন হয়ে গেল ।সবকিছু যেন ভুলে গেল ।ও যেন একটা নিশ্চিত আশ্রয় খুঁজছিল নিজের ভেতরের যে ক্লান্তি কষ্ট সেগুলোকে ঝেড়ে মুছে ফেলে দেবার জন্য।
মনোজ  বলল' রাগ কমেছে?'
রেখা মনে মনে ভাবছে আসলে মেয়েরা এরকমই স্বামীর একটু ভালোবাসা আদর পেলে সবকিছু গলে যায়।
রেখা বলল 'দরজা খোলা আছে।'
'আমি কি পর নারীর সঙ্গে পরকীয়া করছি নাকি?
'আমার নিজের বউয়ের সাথে প্রেম করছি।'
'বাপরে বীরপুরুষ?'
'ওই দেখো মা?'
বলতেই মনো জ   রেখাকে নিজের বুক থেকে সরিয়ে দিল।
রেখা খিল খিল করে হেসে উঠলো
'ও তুমি আমার সাথে দুষ্টু দুষ্টু করলে?'
এইবার রেখা কে পুরো জাপটে ধরে মনোজের ঠোটটা স্পর্শ করালো রেখার ঠোঁটে।  ভালোবাসায় ভরিয়ে দিতে লাগলো ।রেখা ও যেন কেমন পাগলের মতো হয়ে যেতে লাগলো।
এরকম চলেছে কতক্ষণ নিজেদের হিসেব নেই তারপর হঠাৎ শান্ত স্নিগ্ধতায় ভরে গিয়ে রেখা বলল' সত্যিই আজকে স্কুলে যাওয়া হলো না। তুমি যে কি করো না মাঝে মাঝে।'
'আমি কি করেছি গো?'
মনোজের বুকে দুই  চার দুমদুম করে কিল দিয়ে বলল 'আমি জানি না।'
"এবার জরুরী কথা শোনো?"
"স্কুলে যখন যাওয়া হলই না, বলো শুনি?'
মনোজের কাঁধে মাথা রেখে বলল।
'বলছি সুরোদের বাড়িতে যেতে হবে তো  নাকি?'
রেখা বললো 'এই যা ,হ্যাঁ, কবে যেন?
' আরে কালকে বিয়ে তো?'
'কবে যেতে চাইছ?'
'আজকে যাবে?'
রেখা বলল' কিন্তু বাচ্চা গুলো?'
'সে আমি চৈতির মা কে বা সেন্টুদাকে বলে 
দেব ।
'আর মাসি আসবে তো?'
'মাসিকে  তাহলে ফোন করতে হবে?'
এক্ষুনি ফোন করে কনফার্ম হয়ে নাও।'
রেখা বলল ''ok
রেখা সঙ্গে সঙ্গে ফোন লাগালো ।রিং হতে না হতেই মাসির বৌমা ফোন ধরল।
বলল "হ্যালো'।
'বলছি মাসির শরীর কেমন আছে গো?'
'আগের থেকে ভালো আছে।'
'বলছি কালকে কাজে আসতে পারবে কিনা একটু বলতে পারবে?'
মাসির বৌমা ,মাসিকে ফোনটা দিল তারপর বলল "তোমার শরীর কেমন?'
ওই আছি।
'কি হয়েছে বৌমা?'
"ও বৌমা।'
 ফোন করেছি কাজে আসতে পারবে কিনা…?

"তুমি কি বলছ কালকে আসতে পারবে?'
দেখি?
'ও মাসি দেখি বললে হবে না। কালকে থাকবো না ।তুমি আসলে আমার খুব উপকার হয়। বাচ্চা গুলোর ভাতগুলো করে দিতে পারতে। ওরা কি খাবে না হলে বলো সারাদিন?'
'ঠিক আছে যাবো।'
'তোমাকে ডাক্তার কি বলেছেন?'
'পেশার লো ছিল বৌমা?
আর কি কি যেন বলল?
"যাক ওষুধ দিয়েছেন তো?'
"হ্যাঁ ,বৌমা দিয়েছে।"
'আচ্ছা মাসি তুমি রেস্ট নাও  
তাহলে ।কালকে এসো ।আসলে আমার খুব সুবিধে হয়। আসলে ওরই বন্ধুর বোনের বিয়ে তো যেতে হবে। আজকেই বেরোবো। আজকে আমি রান্নাবান্না করে রেখেই যাবো। কালকে বিয়ে বাড়ি আছে।'
'কালকে তোমরা ফিরতে পারবে?'
'ধরে রাখো ফিরতে পারবো না।'
'আচ্ছা ঠিক আছে বৌমা, চিন্তা করো
 না। তোমার যে দুদিন মনে হয় তুমি কাটাও । বাচ্চা গুলোকে নিয়ে তোমাকে চিন্তা করতে হবে না। আমি খাইয়ে দাইয়ে  ঠিকই  দেবো।'
'তুমি তো জানো কোথায় কি থাকে ওদের মাংস রাখা থাকবে তুমি ভাত মাংস ওদের করে দিও আর তুমি তোমার খাবারগুলো করে নিও এখান থেকে। পারলে থেকে যেয়ো।'
'আমি থাকবো !তোমার শাশুড়ি মা…?
শাশুড়ি মায়েদের ও তো নেমন্তন্ন ।গেলে ভালো, যদি না যায় তাতে কি হয়েছে তোমার তো থাকার ঘর আলাদা আছে মাসি। তোমার অসুবিধা কি তোমাদের ছেলে সব বলে দিয়ে যাবে মাকে ।তোমার কোন অসুবিধা হবে না।।
'আচ্ছা বৌমা।'
মনোজ আনন্দে উল্লাসে বলে' উঠলো হুর রে.রে ।
'ঠিক আছে শান্তি এবার।'
মনোজ হাত দুটো নিয়ে নিজের গালে আলতো করে স্পর্শ করছে ।
 তারপর বলল 'বুকে হাত দিয়ে দেখো শান্তি।'
'দেখো কতদিন আমাদের যাওয়া হয় না কোথাও চলো একটু মজা করেই আসি নাকি?
'যাও দেখো মা দিদিরা যাবে কিনা বল ওদের।'
'তুমি গুছিয়ে নাও তাহলে আজকে আমরা সন্ধ্যার ট্রেনটা ধরছি।'
Ok
'সন্ধ্যার ট্রেন ধরবে কেন তার আগেই চল না? "
"হ্যাঁ তার আগে বলে চলে যাব ।দেখি এবার মা দিদিরা কি আবার বলে?'
'আমি চিনি গো চিনি তোমারে ওগো বিদেশিনী…।'গান গাইতে গাইতে মনোজ চলে গেল রেখার শাশুড়ি মায়ের ঘরে।
রেখা সব গোছ-গাছ করে নিতে থাকলো।
ওয়ারড্রব টা খুলে শাড়ি সিলেট করতে থাকলো কোনটা পড়বে ।মনোজের ব্লেজার টা নিয়ে নিল ওর ব্লেজারের কালারটা হচ্ছে পিংক ।তাহলে রেখা কি  ভাইলেট কালারের ওপালাটা পরবে নাকি চাঁদনী বেনারসি টা পড়বে? রেখা
এই ভাবছে। 
'অন্যদিকে মনোজ তার মাকে বললো মা তাড়াতাড়ি গোছগাছ করে নাও ।দিদি গোছগাছ করে নাও। বিয়ে বাড়িতে যাব।'
মা দিদি দুজনে সমস্বরে  বলে উঠল 'কার বিয়েতে?'
'কেন সেদিন বলল না? সুরোর বোনের বিয়ে, শিখা ।তুমি ভুলে গেলে?'
 মনোজের মা মেয়ের দিকে তাকালো।
মনামী  বলল 'কিন্তু আমি কি করে  যাই  ভাই ?আমি তো ভালো শাড়িই আনি নি।'
'শাড়ির সমস্যা হলে তুই রেখার শাড়ি পরবি?'
'রেখার শাড়ি পড়বো?'বলেই কেমন একটু বাঁকা হাসি হাসলো।
"কেন না পড়ার কি আছে?"
', না না আমি ওর শাড়ি পরবো না।'
"তাহলে কি করবি যাবি না তো?'
'না আমি যাব না।।"
মনোজের মায়ের যাবার ইচ্ছে ছিল মেয়ের না যাওয়ার জন্য বলল "তাহলে আমি কি করে যাব বল?'
তোমার না যাবার কি আছে মা?
দিদি বাড়ি থাকবে।'
'নারে ও একা থাকবে। থাক, তোরাই ঘুরে আয় আমরা দুজন বাড়ি থাকি।'
'দেখো যেটা ভালো বোঝো ।আমি আর কি বলবো।'
মনামী বলল'কুকুরের বাচ্চা ওদেরকে কে খেতে দেবে?'
'প্রথমে দিদি তোকে একটা কথা বলি কুকুর বলে সম্বোধন করিস না। ওদেরকে কিন্তু আমরা কন্যাস্নেহে  লালন পালন করছি। ওদের তো নাম আছে। নাম বললেই তো যথেষ্ট।'
মনামী একটু ভেঞ্চি কেটে বলল' বাববা এত গায়ে লাগছে কুকুরকে কুকুর বলবো না?'
কুকুরকে কুকুর বলবি না কেন কিন্তু যেখানে আমরা ওদের নাম রেখেছি ওই নামে ডাকলে কি অসুবিধা আছে
 দিদি ?সব সময় এত নেগেটিভ কথা বলিস কেন?'
'ওই নিয়ে তোদের ভাবতে হবে না সে ব্যবস্থা আমরা করেই যাব। মাসি 
থাকবে ।মাসি রান্নাবান্না করবে খাওয়াবে দাওয়াবে।'
মনামী বলল 'ও আচ্ছা'।
আর একটা কথা বলি মা দিদি তোমাদের দুজনকেই। মাসির সঙ্গে কিন্তু খিট খিট করবে না ।মাসি কিন্তু খুবই ভালো মনের মানুষ। দেখো কোন ঝগড়া টগরা বাঁধিয়ে দিও না।'
মনামী বলল 'কেন রে ভাই ,আমরা কি ঝগড়া করি?'
'আমি সে কথা বলছি না।'
'কথায় কথা বাড়বে তোদেরকে যেটুকু বলার ছিল বললাম।'
'মাসিও কিন্তু এখানেই খাবে।'।
'ও মা মাসির রান্না কে করবে রে ভাই?'
এটা তোদের করতে হবে না তোদেরটা তোরা রান্না করে খাস ।মাসিকে বলা আছে মাসি নিজে করে নেবে।'
মনোযের মা আর দিদি দুজনেই পরস্পর পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকলো।
মনোজ কথাগুলো বলেই ঘরে গেল সব জিনিস গোছগাছ ঠিকঠাক হয়েছে কিনা দেখতে ।
কেমন যেন একটা উন্মত্ত ফূর্তি কাজ করছে ।প্রচন্ড একটা সেলিব্রেশন করার মোক্ষম উপায় পেয়েছে ।সেই সেলিব্রেশনটা হবে শিখার বিয়েকে উপলক্ষ করে ।অনেকদিন পর রেখা আর মনোজ যেন আবার পরস্পর পরস্পরের কাছাকাছি হতে চলেছে। এই ভাবেই বোধহয় মানুষের জীবনে কোন পালা পার্বণকে কেন্দ্র করে একত্রিত হবার একটা প্রচেষ্টা চলে ।কত ঝড় বয়ে গেছে ওদের দুজনের মধ্যে । আজ যেন প্রবল ভাবে ভালোলাগার জোর নাড়া দিতে লাগলো। এত দিনের যে তীব্র বিষ ফুল ঝরে পড়েছিল মনোজের হৃদয়ে আজকে সেই গন্ধটাকা ক্রমশ অসহ্য মনে হচ্ছে। সেই বিষ ফুলের ছেয়ে যাওয়া অস্তিত্বকে তার গন্ধটা কে নাকে রুমাল চাপা দেবার মত একটা প্রচেষ্টা চলছে। কিন্তু তাতেই কি সেই গন্ধ বিলুপ্ত হবে? এইসব ভাবনায় যেতে চায় না মনোজ আজ হৃদয়ে খুশির পাল
 তুলেছে তাই হারিয়ে যেতে চায় অনেক দূরে।।।

শিবনাথ মণ্ডল এর কবিতা "মদের   জগৎ"






মদের   জগৎ
শিবনাথ মণ্ডল



ধন‍্য,ধন‍্য মদ তুমি
তোমার কেন বদনাম
চিরকাল মাতালের
বাঁচাও তুমি প্রাণ।
মদ খায়না এ জগতে
ক'জন মানুষ আছে
মদ খাওয়ার কত গুণ
মাতাল শুধু বোঝে।
পূজোবাড়ি বিয়েবাড়ি 
মদের সম্মান কত
দেশিমদ বিলাতিমদ
নাম আছে যত।
রাস্তা দিয়ে কত মাতাল
টলতে টলতে চলে
মুখে আসা কথা গুলো
আপন মনে বলে।
মদের মধ‍্যে কি'যে যাদু
ধরলে ছাড়েনা
সংসারে অশান্তি বাড়ায়
শান্তি থাকেনা।
ছেলে বুড়ো সবাই এখন
মদকে ভালোবাসে 
বারোমাসে তেরপাব্বন
আছে প্রতিমাসে।।

Yhg6

LOVE

২৯ মার্চ ২০২২

শামীমা আহমেদ এর ধারাবাহিক



ধারাবাহিক উপন্যাস 

শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত (পর্ব ৭৯)
শামীমা আহমেদ 

শিহাবের অফিস এসিস্ট্যান্ট কবির অফিস রুমের বাইরেই ছিল। শিহাব কবিরকে ডেকে জানিয়ে দিলো, আমি আর শায়লা  ম্যাডাম একটু বাইরে যাচ্ছি। আমি আবার অফিসে ফিরবো। তুমি লাঞ্চ করে রেস্ট  নিয়ে নিও।
কবির সব নির্দেশনা মন দিয়ে শুনে নিলো। শিহাব শায়লাকে নিয়ে বেরুতে যেতেই শায়লা কিছু একটা বলতে উদ্যত হলো। শিহাব তা শুনবার জন্য থামলো।শায়লার কাছে জানতে চাইলো,শায়লা কিছু বলবে ?
শায়লা হ্যাঁ সূচক অভিব্যক্তি দিয়ে জানালো,  একটু রাহাতকে জানিয়ে যেতে হবে।আসলে আমি খুব অল্প সময়ের  কথা বলে বাইরে এসেছি।রাহাতের সাথে একটু কথা বলতে হবে।
শিহাব  তৎক্ষণাৎ তা মেনে নিলো এবং বললো, অবশ্যই, এখুনি কল করে জানিয়ে দাও।
কিন্তু শায়লা চাইছে শিহাব নিজেই যেন তা জানায়। শিহাব খুব সহজেই তা মেনে নিলো। নিজের মোবাইল বের করে রাহাতকে কল করলো। 
হয়তো  রাহাত বিজি ছিলো। দুবার কল করাতে রাহাত তা রিসিভ করলো। ভেতরে ভেতরে রাহাত একটু ভয়ই পেলো। কি জানি কি শুনবে! কেন শিহাবের কল !
শিহাব বেশ স্পষ্ট করেই বললো, রাহাত, তোমার আপুকে নিয়ে আমি একটু বাইরে যাচ্ছি।আমাদের কিছু জরুরী কথা আছে।
তোমার আপুর ফিরতে একটু সময় লাগবে।
রাহাতের আর কিছুই বলার থাকলো না।শিহাবকে রাহাত এমনিতেই খুব পছন্দ করে।কিন্তু সিচুয়েশন আজ অন্যরকম হওয়াতে আপুর এই সম্পর্কটা মেনে নেয়া গেলো  না। এর জন্য রাহাতের মনে ও যথেষ্ট খারাপ লাগে। কিন্তু সবার সামনে তা প্রকাশ করা যায় না।
শায়লা শিহাব লিফটে নিচে নেমে এলো।আশেপাশের অফিস থেকে সবার উৎসুক দৃষ্টি। শিহাবের সাথে শায়লাকে দেখে তারা বুঝে নিলো কিছু ক্ষন আগে আসা মেয়েটি তাহলে কার সাথে দেখা করতে এসেছিলো। 
শায়লা বাইকে উঠে বসতেই শিহাব বাইক স্টার্ট দিলো।ফ্রন্ট মিররে শায়লাকে এক ঝলক দেখে নিতেই দুজনার চোখ পড়লো। শায়লার অনুমতি নিয়ে শিহাব বেশ জোরে হর্ণ তুলে জনবহুল  মার্কেট এরিয়া ছেড়ে গেলো। 
শিহাব এক টানে বাইক চালিয়ে 
দিয়াবাড়ির দিকে এগিয়ে গেলো। একটা খোলামেলা জায়গায় বাইক থামালো। বাইক একপাশে  পার্ক করে একটা গাছের ছায়াযুক্ত উঁচু জায়গায় দুজনে বসলো। সামনে পিছনে মানুষের চলাচল স্বাভাবিকভাবে হলেও  এই ভরদুপুরে তুলনামূলক লোকজন কমই দেখা যাচ্ছে।
শিহাব কথা বলতে শুরু করলো।
শায়লা আমি রিশতিনার ব্যাপারে কিছু বলার জন্য এখানে আসতে চাইলাম।কিন্তু তুমি ইতিমধ্যেই  জেনেছো যে রিশতিনা এখন আমার ফ্ল্যাটে আছে। তবে আমি তাকে আজ চলে যেতে বলেছি। ক'দিন  আগে তার বাবা মারা গেছে। এখন শুধু তার মা আছে।যদিও  সে বলছে সে মায়ের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে আমার কাছে একেবারে চলে এসেছে।কিন্তু আমি নিশ্চিত, কদিন পরই ওর মা লোক পাঠিয়ে আবার মেয়েকে  নিয়ে যাবে। আমি তাই নিরাপদ দূরত্বে থাকতে চাইছি। তোমার মনে নানান ভাবনা আসতে পারে।শিহাব শায়লার হাত ধরে জানালো, তুমি নিশ্চিত থেকো রিশতিনাকে নিয়ে আমি আর আগাতে চাই না। আইন আদালত পুলিশ র‍্যাব ওদের হাতের মুঠোয়। ওর পরিবার আমাকে নানানভাবে বিরক্ত করবে।আমি সেসব ঝামেলায় আর যেতে চাইনা। রিশতিনার বয়স কম। সে চাইলে আবার নতুন করে তার জীবন সাজাতে পারে। তাদের মত উন্নত জীবনের কাউকে সে বেছে নিতে পারে। সে উন্নত জীবনে অভ্যস্ত। আমাকে  ঝোঁকের মাথায় বিয়ে করা। আর এই বিয়ে পরবর্তীতে আমাদের সন্তানের জন্ম আর ঐটুকু দুধের শিশুকে মা থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আমাদের কাছে তাচ্ছিল্য ভরে ছুড়ে দেয়া।অন্তত এই কারণটিতে আমি আর কোনদিন ঐ পরিবারের সাথে যুক্ত হবো না। রিশতিনাকে নিয়ে বারবার আমার পরিবারের কাছে আমি বিব্রত হয়েছি। কিন্তু আমি এবার স্বস্তি চাই। আমি এবার শান্তি চাই। আমার সন্তান যেন সুস্থ পরিবেশে বড় হতে পারে।
শায়লার দিকে তাকিয়ে শিহাব  আরো বলেই চলেছে, শায়লা আমি তোমাকে আমার বাকী জীবনে সঙ্গী করে পেতে চাই।তোমাকে পেয়ে আমার আবার নতুন করে বাঁচবার, সংসার সাজাবার ইচ্ছে জেগেছে। আরাফ তোমাকে আপন করে নিয়েছে। তুমি, আমি আর আরাফ একসাথে থাকবো। আমাকে ভালোবেসে তুমি 
কি আমার সাথে থেকে যেতে পারোনা ? খুব শক্ত করে শায়লার হাত ধরে শিহাব শায়লাকে এ দেশে থেকে যেতে অনুরোধ করে যাচ্ছে। একজন অচেনা মানুষের সাথে তুমি তোমার জীবন শুরু করতে পারো না। শায়লা  শুধু অধিকার দিয়ে কেউ কাউকে গ্রহন করতে পারে না যদিনা তাতে ভালবাসা থাকে।তুমি  এতদিনেও যাকে ভালবাসতে পারোনি তার সাথে কিভাবে বসবাস করবে ? শায়লা আমার নিঃসঙ্গ জীবনে তোমায় আমি সঙ্গী করে নিতে চাইছি। শিহাবের ভেতরে যে এত আবেগী অনুনয় জমে আছে শায়লা তা ভেবে অবাক হচ্ছে।
শিহাবের কথায় শায়লা নীরব শ্রোতা হয়ে সব শুনছিলো। সে বুঝতে পারছে না সে কি করবে? কিভাবে সে শিহাবকে বুঝাবে তাকে ছেড়ে যাওয়ার কোনো ইচ্ছেই তার নেই।একেবারেই সে অনিচ্ছুক হয়ে পারিবারিক সব  আয়োজনকে মেনে নিচ্ছে। শায়লা শিহাবের কাঁধে মাথা রাখলো। চলাচল করা লোকজন আড়চোখে ওদের দেখে নিচ্ছে।
যদিও এতে দুজন  ভ্রুক্ষেপহীন হয়েই কথা চালিয়ে যাচ্ছে।দুজন দুজনার মাঝে যেন তন্ময় হয়ে আছে। 
শিহাব শায়লার কাছ থেকে কিছু শুনতে চাইছে। শায়লার ভেতরে অনেক কথা জমলেও তা বলা হচ্ছে না।  সে বলতে পারছে না, শিহাব তোমার মত একই ভাবনা চাওয়া আমার মনেও। মনে মনে  শায়লা আজ আর ঘরে ফিরে যেতে চাইছে না। আর মাত্র একদিন  পরেই কানাডা থেকে নোমান সাহেব আসবেন আর শায়লা আজ বাসায় ফিরে গেলে আর কোনোদিন শিহাবের কাছে ফেরা হবে না। কিন্তু শিহাবতো তার সম্পূর্ণ অন্তর আর স্বত্বা জুড়ে।শায়লা শিহাবের শার্ট আকড়ে ধরলো।ফিসফিস করে বললো, তোমাকে ছেড়ে আমি কোথাও যাবো না শিহাব। আমি কানাডা যাবো না। আমি তোমার কাছেই থাকতে চাই।বলেই শায়লা ঝরঝর করে কেঁদে দিলো।শিহাব কথাগুলো খুব স্পষ্টই শুনতে পেলো। শিহাবের যেন শায়লার প্রতি আস্থা ফিরে পেলো। সে শায়লাকে এক ঝাঁকুনি দিয়ে বললো, তবে আজ তুমি আমার সাথে চলো। আজ আর তোমার বাসায় ফিরে যেও না!
শায়লা মনস্থির করে নিলো আজ আর সে বাসায় ফিরে যাবে না। আজকে সাহসী সিদ্ধান্ত না নিলে সারাজীবন এর জন্য পস্তাতে হবে। যার সাথে মনের কোন বন্ধন নেই শুধু তার সন্তান প্রতিপালনের জন্য এখন শায়লাকে কানাডায় নিয়ে যেতে চাইছে, সেখানে তো তাহলে কোন সংসার হবে না। শুধুই দ্বায়িত্ব পালন করা। শায়লার মনের ভেতর বিদ্রোহ করে উঠলো। সে শিহাবকে আরো নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরলো। শিহাবের শরীর থেকে অপূর্ব মিষ্টি পারফিউমের ঘ্রাণে শায়লা বিমোহিত হয়ে গেলো! সে চোখ বন্ধ করে শিহাবের সবটা ঘ্রাণ শুষে নিলো।


চলবে....

কবি মনি জামান এর কবিতা "মুক্তির আহবান "




মুক্তির আহবান 
মনি জামান

একটা কষ্ট সদ্য ফোটা মেয়েটার
শরীরটা আবৃত্ত করে,
থমকে দাঁড়ায় সময় বোঝে না পুরুষ 
প্রেম কি।
কখনো জানতে চাইনা বুঝতে চাইনা
মেয়েটার মন,
শকুন চোখ গুরু দক্ষীণা দাও।
চঞ্চল ঝর্ণাকলম মেয়েটার 
সংসার ভাঙ্গে,
নিরব অভিমানে ভঙ্গুর সূর্যটা হয় 
আলোহীন।
ফুঁসে ওঠে ঘৃণা কম্পিত বুক, 
হৃদপিণ্ডে ফোঁটে বঞ্চনার রক্ত 
গোলাপ,
জীবন হিসেব চুকায় বিবাহ নির্যাতনে,
নিরবে ঝরে নারী মুক্তির আহ্বান!!

কবি শাহীন রহমান এর কবিতা "শত জনমের সাধ"




শত জনমের সাধ
শাহীন রহমান

"সজল নয়ন ভিজিলো সখা,তোমার প্রণয় পরশ পেয়ে, 
দূরের বনে হাজারো পাপিয়া,মধুর সুরে উঠিলো গেয়ে। 
প্রিয়তমোহে তব ছোঁয়াতে,ভরিয়া উঠিলো ফুলের বীথি,
বিরহীনি বঁধু কাঁকই টানিয়া,বাঁধিয়া নিলো আপন সিথী।

বাসরে দোসর হও হে সখা,দোঁহে মিলিবো একই সাথে, 
উঠোনে পাতা কুসুম মাদুর,মেঘলা মেদুর শাওন রাতে। 
হিমেল চাদরে আদর মাখিয়ে,গাহিব দুজন প্রণয় গীতি
হংসমিথুন আদরে সোহাগে,যেমন করিয়া জানাই প্রীতি। 
 
শত জনমের বাসনা টুকু,বাসরে সাজুক ফুলের সাজে,
বেনারসিতে ঘোমটা জড়িয়ে,থাকিব বসে গভীর লাজে।
হারানো সাথী খুঁজে ফেরে জোড়,হারিয়েছে কোন বাঁকে, 
বিরহীনি কোন বেজোড় পাখি,গান গাইবে কদম শাখে।

শত জনমের কামনা আমার, পুরোন হবে গো জানি, 
বনে ফুটিবে কদম,হাসিবে কেয়া,সাজাবে বাসর খানি।
দূরে লক্ষীপ্যাঁচার ডাক শুনে আজ শিহরিত হবো প্রিয়, 
ভালোবেসে স্বামী গভীর আবেশে, বক্ষে টানিয়া নিও।

২৭ মার্চ ২০২২

কবি শহিদ মিয়া বাহার এর কবিতা "কবির কারাদন্ড"




কবির কারাদন্ড
শহিদ মিয়া বাহার

আপনি কবি ?
কবিতা লিখেন ? 
তাহলে আপনি কিছুই করেন না
না উৎপাদন, না উন্নয়ন
 রাত্রি খনন করে কেবল কবিতার শৈল-তরঙ্গে ডুবিয়ে রাখেন শব্দকূপের জল , তীব্র বোধের প্রনালীতে
কোন উলম্ব ভুমিকা নেই আপনার জিডিপির ডাটা শিট জুড়ে;
স্বত:সিদ্ধ অথবা প্রামানিক
কোন শহর কিংবা রাষ্ট্রের !
এক শুন‍্য থেকে অন‍্য এক শুন‍্যের গোলকে 
আটকে আছে আপনার নিজস্ব জিডিপি !

স্ফিত লিষ্ট নিয়ে আপনি বাজারে যান
ওখানে আগুনের ভস্ম ওড়ে
ওড়ে পরিশ্রম, বাষ্পীভূত  ঘামের সাথে !
ফিরে আসেন অর্ধভরাট থলের নমিত হাহাকার নিয়ে  
বগলের পেশিতে গোঙ্গানো অবসাদ
আপনার যে যুবক সন্তান একদিন জড়োয়া দু:খগুলো ছুঁড়ে দেয়েছিল কর্ণফুলির ঘাটে  
তার খোঁচা খোঁচা দাড়ির ভাঁজে এখন পুড়ছে
শুকিয়ে যাওয়া দীর্ঘশ্বাসের মাঠ !
কারন আপনি কবি
আপনি কবিতা লেখেন!

কবি-আপনি খুনি
কলমের ট্রিগার টিপে টিপে  রাত ভর খুন করেন স্ত্রীর চন্দ্রতোয়া আফ্রোদিতি আকাশ
দিবালোকে পুরনো আলমিরার জমানো অলংকার,   
কাঁঠালিচাপার ঘ্রাণ
আর লাউডুগির মত বেড়ে ওঠা ফ্রেমবাধা তেল-নুনের পাললিক সংসার !
আপনার কারাদন্ড আপনিই লিখেন কবি
যাবতজ্জ্বীবন কবিতার শেলে শেলে নিমগ্ন কারাগার 
কারন আপনি কবি !

দেয়ালের পলেস্তরায় পারমানেন্ট উপহাস সিলিংফ‍্যানের মত ঝুলে আছে 
এবং ঝুলে আছে আপনার জামার আস্তিনে
তবু আপনি কবিতা লেখেন
কারন আপনি কবি  
কবিদের উপহাস মানতে নেই!

ধূলোর স্তর থেকে নেমে আসে শিশার প্রলেপ 
রাতের নিকোটিনে ঝলসে গ‍্যাছে ফুসফুস,
ধমণীতে রক্তের বাঁধ, হৃদপিন্ডের বিদ্রোহ, আড়শোলা খেয়ে নিচ্ছে থ‍্যালাসেমিয়া শরীর, ধ‍্যানিত মগজ!
কোন এয়ার এম্বুলেন্স নেই অবশিষ্ট  আপনার প্রতীক্ষায় 
সবগুলো রানওয়ে ভিআইপিদের দখলে
কোন হাসপাতাল নেই, ডাক্তার নেই, ব‍্যাস্ত বৈমানিক নেই,কারো দায়ভার নেই আপনাকে সারাবার
কারন আপনি কবি !

কষ্টের পাহাড়ে পাথর চেপে আপনি মরে যাচ্ছেন কবি !
মরে যান---
কবিদের এভাবেই মরে যেতে হয়--
কারন আপনি কবিতা লিখেন 
আর কিছুই করেন না
না উৎপাদন,না উন্নয়ন
 কিছুই না
কিচ্ছু না!

মমতা রায় চৌধুরীর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৪৩




উপন্যাস 


টানাপোড়েন ১৪৩
ব্যস্ততা
মমতা রায় চৌধুরী ১৪৩
১৬.৩.২২ রাত্রি ৯.৩৫

মাধুর কাজের চাপে নাজেহাল অবস্থা। ফুল পিসি তো চেঁচিয়ে মাথা খারাপ করে দিল।
'আরে শিখার আইবুড়ো কখন হবে কোথায় হবে আইবুড়োভাত?'
'এজন্যই বলেছিলাম আমাদের বাড়িতে যেতে, সেও গেল না মেয়ে।'
ও মাধু, মাধু উ .উ .উ
মাধু, আজকে খাওয়াবে কে ওকে?'
'ওদিকে সুরঞ্জন ডাকছে, আরে পার্লারের লোক কখন আসতে বলব,ওরা জানতে চাইছে? মাধু , মাধু .উ.উ.উ'
' তুমি আবার চিৎকার করছো কেন?'
ওদিক থেকে বৃষ্টি বলছে
'মাম মাম পিমনি ডাকছে।'
তবু একগাল মিষ্টি হাসি হেসে বলল' হ্যাঁ যাই।'
এ বাড়িতে মাধুরী ছাড়া সবকিছুই অচল।
সুরঞ্জনের কাছে যেতেই ওদিক থেকে আবার শিখা ডাকছে' বৌদিভাই ,বৌদিভাই, বৌদি ভাই।
'হ্যাঁ ,বল শুনছি।'
'দোতালার ব্যালকনি থেকে  শিখা, ভুরু কুঁচকে বলল' তুমি কাছে আসলে তবেই বলবো। জোরে চেঁচিয়ে বলবো না।'
মাধু হেসে বলল' এখনও গোপন কথা আমার সঙ্গে?'
এখন তো বোঝাপড়ার লোক হয়েছে ।'
 পা মেঝেতে ঘষতে ঘষতে শিখা বলল 'বৌদি ভাই তুমি তো জানো আমি কতটা তোমার উপর ডিপেন্ডেন্ট। কিছু জিনিস আছে তোমাকে ছাড়া কাউকে শেয়ার করতে পারব না বৌদি ভাই।'
'তা বেশ আসছি '।
মাধুরী ছুটলো দোতলার দিকে ।তরতর করে সিঁড়ি দিয়ে উঠছে ।
অন্যদিকে ফুল পিসিমা বলছে, 'বললি না বউ কটার সময় হচ্ছে আইবুড়ো ভাত কার বাড়িতে খাবে ও,.'।
মাধু আবার নেমে এসে ফুল পিসিমার কাছে এসে বলল
'ওই তো ঠাকুরপুকুর মেজো মাসির বাড়িতে।'
'ও আচ্ছা।'
'এখনো তো মেজদি আসলো না।'
'সবাই আসবে ফুলপিসি। চিন্তা ক'রো না।'
ওদিকে সুরঞ্জন ফোন করল মনোজকে।
ফোন বেজে চলেছে।
তখন রেখার সাথে মনোজের চলছে তর্ক।
উত্তপ্ত পরিবেশ।
রেখা বলছে' আমি কি এমন করলাম যে তুমি সাত সকালে আমার সঙ্গে এরকম কথা বলছ।'

'কি এমন করলে মানে? তুমি নিজে জানো না?'
'না ,সত্যিই আমি জানি না। তাহলে আমাকে তো বুঝিয়ে দিতে হবে আমার ভুলটা কোথায়?'
'ও তাহলে তোমাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হবে তাই তো?'
'আমার ছোটলোকের মতো ঝগড়া করতে ভালো লাগছে না। তোমার যা বলার তুমি বলে 
যাও ।আমি আর কিছু বলতে পারছি না।'
'কি আমার কথাগুলো তোমার ছোটলোকের মতো শোনাচ্ছে?'
রেখা কোন কথা বলে না ।আপন মনে কাজ করে যাচ্ছে। ওদিকে স্কুলে যেতে হবে ।খামোখা ঝগড়া করে সময় নষ্ট করে কোন লাভ নেই।এমনিতেই সময়ের বড্ড অভাব। খুব তাড়াতাড়ি কাজ করতে লাগলো।
ওদিকে রেখার শাশুড়ি মা আর ননদ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে দুজনে খুব হাসাহাসি করছে। রেখা, এক পলক তাকিয়ে দেখে ননদ শাশুড়ি মাকে রেখার দিকে হাত তুলে দেখিয়ে বলছে
' ঠিক হয়েছে ,ঠিক হয়েছে ।এতদিনে ভাই মুখের ওপর সঠিক কথা বলেছে। খুব তেজ চাকরি করে বলে।'
রেখা বুঝে পায় না যে কি আর চায় 
ওরা ?আজকে অন্য সংসারে বিয়ে হলে  এই পরিণতি হতো কিনা জানি না ।কপালটা  তো আর ফেলে দেয়া যায় না ।নইলে সারাক্ষণ রেখা চেষ্টা করে সংসারের যতটুকু কাজকর্ম করা যায়,  স্কুল করছে। তারপর আর কি চায়? ভেবেই পায় না এদের সন্তুষ্টি কিসে?

'আজকে মাসি কাজে আসলো না কেন? আজকেও মাসিকে ছুটি দিয়েছো?'
রেখা কোন জবাব দেয় না।।
'মা দিদিকে দেখেছো বলে   ছুটি দিয়েছ?'
মাঝে মাঝে মনোজ এমন খোঁচা দিয়ে কথা বলে না গা টা পুরো রি  রি রি করে জ্বলতে থাকে।
রেখা বলল 'মা দিদিকে দেখেছি মানে? কি বলতে চাইছো তুমি?'
'যা বলতে চাইছি ,তুমি ঠিক শুনেছো। বলতে চাইছি মা দিদিকে দিয়ে কাজ করাতে চাইছে?'
রেখা মনোজের কথা শুনে অবাক হয়ে যায় এ   কোন মনোজকে দেখছে।
'তুমি ঠিকই যদি বুঝে থাকো । তাহলে কাজগুলো কে করে তুমি দেখতে পাও না?'
'হ্যাঁ ,দেখতে পাই তো।সকালে যেটুকু কাজ করে রেখে   যাও । বাকি সারাদিনের কাজগুলো কে করে?'
'সারাদিনে কি কাজ থাকে আর?'
'স্কুল থেকে এসে আমি বাসন মাজছি, সারাদিনের খাবার বাসরগুলো তো জমিয়ে রেখে দেয়া হয়। আমার জন্য।'
'আর রান্না?'
'আমার যেটুকু সামর্থ্য আমি সেটুকু করে যাচ্ছি তার বাইরে তো আমি আর করতে পারবো 
না ।তাহলে তো আমাকে স্কুল বাদ দিয়ে  ঘরে বসে থাকতে হয়।
আর আমি সেটা কিছুতেই পারব না।'
'মাসির খুব শরীর খারাপ। শরীর খারাপ নিয়ে মাসিকে আমি কাজে আসতে বলবো ?তোমাদের দরকার হয় গিয়ে বলে আসো ,যাও ।আমি পারবো না বলতে।'
মনোজ চুপ করে যায় । মনোজ জানে রেখা তো এরকম করার মেয়ে নয়। শুধু শুধু মা দিদির কথার উস্কানিতে এতগুলো কথা রেখাকে 
বলল ।বলা বোধহয় ঠিক হলো না।।'
রেখা ঝটপট কাজ করে নিয়ে জলখাবার বানিয়ে ফেললো, দুটো তরকারিও করে ফেলল। তারপর মিলি তার বাচ্চাদের খাবার দিয়ে আর বাইরে রাস্তার কালী ও তার (বাচ্চাকুকুরগুলোকে)ও খাবার দিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেল।
মনোজ যেন কথাগুলো বলে কেমন যেন একটা আত্মগ্লানিতে  ভুগতে লাগলো। রেখাকে কথাগুলো বলাটা ঠিক হলো না।।
এরমধ্যে ফোন বেজেই যাচ্ছে, এতক্ষণ দুজনের মধ্যে এত তর্ক হচ্ছিল যে ফোনের প্রতি ধ্যান দিতে পারেনি। এখন ফোনটা রিসিভ করল মনোজ বললো 'হ্যালো।'
'আমি সুরো বলছি হাঁদা।'
"হ্যাঁ বল।'
'বল মানে ?তোরা এখনো বসে আছিস? তোরা আসবি না, নাকি শিখার বিয়েতে?'
"হ্যাঁ যাবো তো।'
মনোজ ভাবছে 'বলে তো ফেললাম সুরোকে কিন্তু
'কি বলবে সুরঞ্জনকে? একটু আগে রেখার সাথে যা উত্তপ্ত কথাবার্তা হলো, তাতে রেখা কি রাজি হবে যাওয়ার জন্য?'
"আর রেখা কোথায় বলতো ?রেখাকে দে না ফোনটা?'
"ওতো বাথরুম আছে।'
মনোজের কথায় কেমন যেন একটা , নিরুৎসাহ ভাব প্রকাশ পেল ।সুরঞ্জন ভাবতে লাগলো "কিছু কি হয়েছে?'
'তা তোরা কখন বের হচ্ছিস?'

"আজকে মনে হয় হবে না ।বিয়ের দিন যাব।'
"মানে কি বলছিস ?বিয়ের দিন আসবি?"
'রাগ করিস না বন্ধু, জানিস তো আমাদের কতগুলো বাচ্চা আছে ওদেরকে খাওয়ানো দাওয়ানো এসব তো করাতে হয় ।দুদিন আগে গিয়ে কোন লাভ নেই ,এতে ওদেরই অসুবিধা হবে।"
সুরঞ্জন বলল' তোরা না আসলে বিয়ে বাড়ির আড্ডাটা কি করে জমবে বলতো?'
"যা ভালো বুঝিস কর আমার আর কিছু বলার নেই।"
এরপর ফোনটা কেটে দিলো।
ফোনটা কাটার পর মাধুরী লক্ষ্য করল সুরঞ্জনকে কেমন নিরুৎসাহ দেখাচ্ছে।
মাধু আর  ঘাঁটালো না সুরঞ্জনকে ।প্রচুর কাজ পড়ে রয়েছে।
ওদিকে ডিজাইনার ব্লাউজ বানাতে 
দিয়েছিল ।শিখার ও আছে। অন্যদিকে মাধুরও আছে, তা দিতে এসেছে। তারা ডাকাডাকি করছে।
ফুল পিসি চিৎকার করছে ও মাধু কে ডাকছে দেখো।
"হ্যাঁ যাই ।যাই পিসিমা।'
ওদিকে ক্যাটারিং এর ছেলেরা ডাকছে, জলখাবার হয়ে গেছে।
মাধু গেটের কাছে যেতে যেতে বলল' ফুল পিসিমা, আপনারা সবাই আসুন জলখাবারটা খেয়ে নিন।'
'রানী বৌদিরা কোথায় গেল ওনাদের কেউ একটু জানিয়ে দিন না পিসিমা।'
গেটের কাছে যেতেই দেখা হয়ে গেল  মেজ পিসিদের সঙ্গে।
"ও মাধু ,বাপরে বাপ কি ট্রেনে ভিড় !কি ট্রেনে ভিড় !তোমায় কি বলি?'
পিসিমা আপনারা যান উপরে ।নিজে নিজে রুমে গিয়ে লাগেজ গুলো রাখুন আমি মনা কে পাঠিয়ে দিচ্ছি।'
'মনা মনা, মেজ পিসিরা এসেছে ওনাদের লাগেজ গুলো একটু উপরে নিয়ে যাও।'
'হ্যাঁ ,যাই বৌদি।'
'ও বাবা তিনুটা কত বড় হয়েছে  পিসি?'
জবা ভালো আছো তোমরা? জিবেশ কোথায়? ''ওই তো দাদার সঙ্গে কথা বলছে।''
'যাও যাও তোমরা রুমে গিয়ে একটু রেস্ট নাও তারপর ফ্রেশ হয়ে জলখাবারটা খেয়ে নাও।'
'তোমরা এসেছো কি ভালো যে লাগছে।'
জবা বললো 'তোমার বাবার বাড়ির লোক আসেনি?'
'না ,না । ও জানো না শিখার তো আমার দাদা শালার সঙ্গে বিয়ে হচ্ছে। ওরা তো ওখানে ব্যস্ত।'
'ও তাই বুঝি?'
এতসব লোকজনের মাঝে শিখা ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে দেখছে ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চারা ঘেটু ঘেটু করে ওরা শ্লোক আওড়াছে আর পয়সা আদায় করছে।।
শৈশবের স্মৃতিগুলো বড় বেদনাদায়ক সেই শৈশবকে হাজারো বার ফিরে পেতে চাইলেও পাওয়া যায় না। তবুও সেই শৈশবটা বেঁচে থাকে এই ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের মধ্যে কিছু পালা পার্বণের মধ্যে।শিখা মনে মনে এটা ভাবল। আর ওরা সেই ঘেটু গান করতে করতে চলে যাচ্ছে। ওটা উপর থেকে দেখতে লাগলো। একবার মনে হলো শিখা ডাকে। গেট পেরিয়ে যখন যাচ্ছে তখন ডেকেই ফেলল 'এই শোন, শোন ,তোরা এদিক আয়।'
বাচ্চারা এদিক ওদিক তাকিয়ে হঠাৎ ওপরের দিকে তাকাল । তখন শিখা ওদেরকে ইশারায় ডাকলো ওরা খুব খুশি হল। 
বলল' আমাদের কিছু দেবে?'
"হ্যাঁ ,দেবো তো  ।আয়।'
আসলে আজকে তোমাদের বাড়ি কি আছে? বিয়ে নাকি গো? তোমার বিয়ে?'
'তোরা আয় না।'
বাচ্চারা খুশি হয়ে এসে উঠোনে দাঁড়ালো। শিখা তর তর করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছে ,সেই সময় ফুল পিসিমার চোখে পড়াতে বলল
' আরে তুই কোথায় যাচ্ছিস ?এই অবস্থাতে কোথাও যাবি না একা একা।'
একটু থমকে দাঁড়ালো 
শিখা বললো 'সামনে গেটের কাছে যাচ্ছি।।
কোথাও যাওয়া হবে না ।'
।এ কিরে কি অবাধ্য মেয়ে তুই কথা শুনবি না
এবার কি করে বাচ্চাগুলো গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আছে, কত আশা করে ডেকেছে। কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না।।'
মাধুরী ভাড়ার ঘরের দিকে যাচ্ছিল। তখন বলল 'ও বৌদি ভাই ও বৌদি ভাই শোনো না?'
'এখন না শিখা, একটু পরে আমার অনেক কাজ পড়ে রয়েছে।।
'না তুমি এখনই আসো, খুব দরকার।'
"বায়না করিস না শিখা হেসে বলল।'
'আমি তো যেতে পারছি না তাই তো তোমাকে ডাকছি। ওদিকে থানার বড়বাবু বসে আছে।'(ফুল পিসিমা)।
মাধু বলল' কি যে বলিস না মাঝে মাঝে?
বল কি হয়েছে?
ঘেটু গান করতে করতে যাচ্ছিল ওদেরকে ডেকেছি আমি ওপর থেকে ওদেরকে কিছু টাকা দিতে হবে আমি যাচ্ছিলাম ফুল পিসিমা আমাকে বারণ করল।।
গাল ফুলিয়ে শিখা বলল।
ও আচ্ছা ঠিক আছে আমি দিয়ে দিচ্ছি মাথায় হাত বুলিয়ে দিল মাধুরী শিখার।

মাধুরী গিয়ে ছেলেগুলোকে একশটা টাকা ধরিয়ে দিল।
ছেলেগুলো এত খুশি হল মাধুকে প্রণাম করতে আসলো, বললো না বাবা ,তোমরা ঘেটু নিয়ে আছো, থাক তোমরা এসো।
বাচ্চারা বলল 'তোমরা খুব ভালো, কাকিমা।'
মাধু বাচ্চাগুলোকে কাছে টেনে একটু আদর করে গালটা টিপে দিল।
শিখা সব উপর থেকে দেখতে পেল আর বলল মনে মনে এজন্যই আমার বৌদি ভাই সব থেকে ভালো।'
'তোমাদেরকে খুব মিস করবো 
বৌদি ভাই ।বিশেষত মা মারা যাবার পর থেকে তুমি যেভাবে আমাদেরকে আগলে রেখেছো 
তুমি ।ভালো থেকো বৌদি ভাই সব সময়। আর চোখের কোনে জল এসে জমা হলো।'
বৃষ্টি এসে বলল' পি মনি তুমি কাঁদছো?'
'কাঁদছো কেন পি মনি?'
বৃষ্টিকে জড়িয়ে ধরে আরো কেঁদে উঠলো শিখা।
অন্যদিকে মাধু বৌদি সকলকে নির্দেশ দিতে থাকলো ।সব আওয়াজ শোনা যাচ্ছে ।'যাও ফুল পিসি ,মেজ পিসি বাকি যারা যারা আছেন সকলকে ডেকে নিয়ে আসো নাস্তা করে নিক। তারপর তুমিও খেয়ে নিও কেমন ?তারপর যেমন যেমন বলেছি লাগেজ গুলো সব সাজিয়ে রেখেছো তো মনা সব?
 ঘাড় নেড়ে বলল 'হ্যাঁ সব ঠিকঠাক করে রাখছি'।
মেজ পিসি, ফুল পিসি সকলে গল্প করছে সেই হাসির ছটাও বেরিয়ে আসছে থেকে থেকে ।শুধু শিখাই পারছে না আনন্দ করতে ।কেন ?কি জানি মনটা কিসে ভারাক্রান্ত হয়ে গেছে সে নিজেই বলতে পারবে না।'
বিয়ে বাড়ির এত ব্যস্ততায় তার বৌদি ভাইয়ের যে কতটা কষ্ট হচ্ছে একার উপরে এত চাপ বৌদি ভাই ছাড়া এ সংসারটা সত্যিই অচল।
অন্যদিকে থেকে থেকে সানাইয়ের শব্দ কানে ভেসে আসছে।