১৯ মার্চ ২০২২

মমতা রায়চৌধুরীর ধারাবাহিক উপন্যাস ১৩৬



উপন্যাস 


টানাপোড়েন ১৩৬
ভয়েস বিভ্রাট

মমতা রায়চৌধুরী


কল্যান সেমিনার শেষ করে কৃষ্ণনগর স্টেশনে যখন আসলো তখন মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়েছে চারিদিকে কিচ্ছু দেখা যাচ্ছেনা। এমন অবস্থায় অটো থেকে নামতে নামতে কিছুটা ভিজেও গেল। ভাবছে  তাই তো গলার এই অবস্থা ।এর মধ্যে যদি আবার ঠান্ডাতে কিছু একটা হয় তাহলে তো দারুণ মুশকিল হয়ে যাবে।
যথারীতি ট্রেন ঢুকে গেল। কল্যান ট্রেনে গিয়ে বসলো।
নির্দিষ্ট টাইম এ ট্রেন ছেড়ে দিল।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল আজকে গিয়ে ডাক্তার দেখাতে পারবে না মনে হচ্ছে কৃষ্ঞনগরেই  ৬. ৪০
অথচ ডাক্তার না দেখালেও নয়। দেখা যাক 'ডাক্তারবাবু তো ৯টা পর্যন্ত থাকবেন বলেছেন?'
মাথাটা ভেজেনি এই রক্ষে। প্যান্টের নিচের অংশ ভিজেছে ।হাতের অংশটুকুও ভিজেছে। ট্রেনে
বসে কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছে। ট্রেনে বসে হাজারো কথা মনে পড়তে লাগলো। মনে পড়ল অনিন্দ্যর কথা। কল্যাণদের চারজনের একটা ভালো বন্ধুত্ব ছিল। তাদের মধ্যে শুধুমাত্র অনিন্দ্য তখন প্রেম করতো। অনিন্দ্য হচ্ছে ওদের প্রেমের দীক্ষাগুরু। অনিন্দ্য আর মনীষা যখন চুটিয়ে প্রেম করছে ।তখন কল্যাণরা দূতের কাজ করতো। সম্ভবত ওদের লায়লা মজনুর প্রেম দেখেই কল্যাণের ভেতরেও একটা প্রেম প্রেম ভাব এসেছিলো। তারই ফলশ্রুতি বোধহয় প্রভা।
আজ আবার কেন ঘুরে ফিরে আসছে প্রভার কথা। এ যেন বৃষ্টি হলেই কল্যাণের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় কাজ করে এন্টেনার মত। কোথায় অনিন্দ্য মনীষার গল্প করছিল সেখানে এসে পাতা জুড়ে নিল কল্যান প্রভার গল্প।
' হ্যাঁ, একদিন এসে হঠাৎ  অনিন্দ্য বলল
'যাই বলিস ভাই ফাইনাল পরীক্ষার হয়ে গেলেই আমরা দুজন পালাচ্ছি।'
কল্যান তো অবাক হয়ে গেল 'বলে কি?
পালাচ্ছি মানে?
তুই তো এখনো নিজের পায়ে দাঁড়ালি না মনীষাকে কি খাওয়াবি?
পরে কিন্তু প্রেম জানলা দিয়ে পালাবে।'
ভুরু কুঁচকে অনিন্দ্য বলেছিল শত্তুর না হলে তো কেউ এরকম কথা বলে ।না তুই আমার নাকি আসল বন্ধু। প্রিয় বন্ধু ।কোথায় আমাকে উৎসাহ দিবি ।সেসব নয়।'
'দেখ ভাই আমি কিন্তু বাস্তবটাই বললাম। আমি প্রকৃত বন্ধু বলে তোর বাস্তব অবস্থাটাকে বুঝিয়ে দেবার চেষ্টা করেছি ।এবার তুই যেটা ভালো বুঝিস?'
তারপর অনিন্দ্য কি একটা ভাবল কিছুক্ষন তারপর বললো' না কথাটা তুই ঠিকই বলেছিস কিন্তু আমার তো একটা সমস্যা হয়ে যাচ্ছে?'
'কিসের সমস্যা?'
'আরে মনীষাকে নিয়ে। ও তো এখনই বলছে বিয়ে করতে হবে,।'
'মানেটা কি? খেপেছে নাকি?'
তখন কল্যাণ বলল ' বুঝতে পারছি ।প্রেমের বাঁধভাঙ্গা উচ্ছ্বাস…
বলেই হাসতে শুরু করলো।
'তুই হাসছিস আমি মরমে মরমে মরছি।'
আচ্ছা, ঠিক আছে  তাহলে বল কি বলবো তোকে?'
'শোন,আমার আর পড়াশোনা হবে না।'
'ঠিক আছে তাহলে কি করতে চাইছিস?'
'আমি আমেদাবাদ চলে যাব।'
'কার ভরসায়?'
'আরে হারুদের একটা গদি আছে। ও বলেছিল ওখানে ব্যবস্থা করে দেবে একটা চাকরি।'
বেশ বোদ্বার মত মাথা নেড়ে কল্যান বলল' তাহলে তো সমস্যা মিটেই গেল।'
কিন্তু কি ট্রাজিক চরিত্র হয়ে গেল অনিন্দ্য।
এসব ভাবনা চিন্তার মাঝেই মনীষার বাবা ট্রানস্ফার নিয়ে চলে গেল দূরে সপরিবারে।
মনের দুঃখে অনিন্দ্য কিছুদিন দাড়ি রাখল, সাই গোলের রেকর্ড শুনল। তারপর এ ম, পরীক্ষা এসে গেল ।পড়ার চাপে সবই ঠিকঠাক হয়ে 
গেল। মজা করে বলেছিল কল্যান হারুকে
অনিন্দ্য আর মনীষার প্রেমের কাহিনী লাস্ট চ্যাপ্টার অনিন্দ্যের দাড়ি রাখা ।আমার মনে হয় আমাদের এই বাকি তিনজনেরো দাড়ি রাখা উচিত ছিল কারণ ওর প্রেমটা তাদের বাকি তিন জনেরও প্রেম।'
হারু তখন মজা করে বলেছিল 'তুইতো বাবা প্রভার সঙ্গে জড়িয়ে গেছিস ।তোর তো জীবনে বসন্ত এসেগেছে কিন্তু আমরা দেখ কি অভাগা আমাদের না জুটলো কোন সুন্দরী গোলাপ।
না নিতে পারলাম তার কোন ঘ্রাণ।'
ট্রেনে যেতে যেতে এইসব কথাই মনে পড়ছিল কিন্তু অনিন্দর মত কল্যাণের প্রেমের পরিসমাপ্তি ঘটল একটা প্রহেলিকার মধ্যে দিয়ে। প্রভার থেকে আর কোনো উত্তর কক্ষনো আশা করেনি ।প্রভা কিভাবে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিল অথচ কল্যাণ তো প্রভাকে মনেপ্রাণে ভালবেসেছিল ।দুরন্ত উচ্ছল নদী যেন ছিল ।কখনো মনে হয়েছে
 ঝরনা ।ঝরনার সঙ্গে হারিয়ে যেতে কল্যাণের কোন আপত্তি ছিল না।
অথচ…. শুধুই অন্তহীন জিজ্ঞাসা রয়ে গেল।'
এরই মধ্যে ট্রেন নির্দিষ্ট স্টেশনে এসে পড়ল।
ফোনটা বার করতে দেখলএরমধ্যেতে কটা মিসকল হয়ে পড়ে রয়েছে। এতটাই ভাবনায় মশগুল ছিল যে সেটা খেয়াল করে উঠতে পারেনি।
ফোনটা খুলে দেখল শিখার বেশ কয়েকটা মিসকল হয়ে যাচ্ছে।
কল্যাণের উচিত ছিল শিখাকে ফোনটা করে দেয়া যে সে ট্রেনে উঠে পড়েছে।
কি করে ইরেস্পন্সাইবেল হলো?
নিজেকে নিজের প্রতি খুব বিরক্ত লাগলো।
তারপর একটা ফোন করলো।
ফোনের রিং হতেই শিখা ফোনটা রিসিভ করে বলল'কি ব্যাপার বলতো?'
কল্যান মনে মনে ভাবল এই শুরু হল অধিকারবোধ এটা তো হতেই হবে তারপর নিজেকে ঠিক রেখে বলল 'সরি এক্সট্রিমলি সরি ডিয়ার।'
'না না সরি কেন বলছো?'
'একবার ও মনে হয়নি চিন্তা হতে পারে?'
'আরে হ্যাঁ ,ভেবেছিলাম তোমাকে ফোন করবো শোনো না এত বৃষ্টি তারপর??'
'তারপর ,তারপর কি হয়েছে?'
'আরে সেরকম কিছু নয়।'
'ভিজে গেছ?'
"একটু ভিজেছি।'
গলাটা যেই দেখলে একটু আওয়াজ বেরোচ্ছে অমনি বৃষ্টিতে ভিজলে?'
'কিছু করার ছিল না গো অটো থেকে নামতে নামতে যেটুকু ভিজেছি।'
সকালে যখন বেরিয়েছি তখন ওয়েদারটা তো ভালই ছিল ।বোঝা গেছে কি বৃষ্টি হবে বল?'
'ঠিক আছে আর তোমাকে কোন কিছু বলতে হবে না।'
'এখন বল কতদুর আছো?'
'আর একটা স্টেশন।তার পরেই নেমে যাব।'
'ঠিক আছে ডাক্তারের এপারমেন্ট নিয়েছো তো?'
'নিয়েছি কিন্তু ডাক্তার থাকবেন কিনা কে জানে?'
'যদিও নটাএখনো বাজে নি।'
'ঠিক আছে ।দেখো কি হয়।
সাবধানে এসো।'
'ওকে'
বাড়িতে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে তোমাকে ফোন করবো।'
শিখা  প্রসন্নতায় একগাল হেসে উঠলো।
কথা বলতে বলতেই স্টেশন এসে গেল। তাড়াতাড়ি নেমে পড়ল  কল্যান। কাঁকিনাড়া থেকে খুব বেশি সময় লাগে না ডাক্তার বাবুর চেম্বারে যেতে। এখনো দশ মিনিট বাকি আছে 9:00 বাজতে। হন্তদন্ত হয়ে ছুটল। হাঁপাতে হাঁপাতে ডাক্তার বাবুর চেম্বারে এসে দেখল ডাক্তার মুখার্জির চেম্বারে ভীষণ ভিড়। যদিও কল্যান সাক্ষাৎ লগ্ন আগেই স্থির করে এসেছে ।তবুও প্রায় ১৫মিনিট হলো স্লিপ জমা দিয়ে বসে আছে কল্যাণএর এখনো ডাকআসেনি। এদিকে সেই বৃষ্টিতে ভেজা চ্যাট চ্যাটে ভাব ভালো লাগছে না বসে থাকতে ডাক্তার বাবুর চেম্বারে অনেকগুলো উইলি ম্যাগাজিন রয়েছে ।সেগুলো উল্টেপাল্টে দেখতে লাগলো। হঠাৎ ম্যাগাজিনে যখন নিজেকে ডুবিয়ে ফেলেছে ঠিক তখনই 'কল্যাণ চৌধুরী কে আছেন ?এখানে ডক্টর কল্যাণ চৌধুরী?'
কল্যান বলল' আমি ।আমি ডক্টর কল্যাণ চৌধুরী।"
'আপনার ডাক এসেছে আপনি চেম্বার এ যান।'
পত্রিকাটি নামিয়ে রেখে নিজের ব্রিফকেস টি সঙ্গে নিয়ে উঠে দাঁড়াল কল্যাণ চৌধুরী।
বাবা প্রায় ঘড়ি দেখে আধ ঘন্টার মতো দেরী করিয়ে দিয়েছেন ডাক্তার বাবু।
চেম্বারে ঢুকে হেসে নমস্কার করল চৌধুরী।
ডাক্তারবাবু নিজের ডান হাতটা কপালে ছুইয়ে বললেন 'বসুন 'চেয়ারটা দেখিয়ে।
"আচ্ছা বলুন আপনার কি সমস্যা?
কি কি অসুবিধা বোধ করছেন? কোথায় কষ্ট হচ্ছে আপনার,?. একটু জোর করে হাসি এনে ডাক্তারবাবু আরো বললেন 'নট টু ওয়ারি'! ডোন্ট বি সো ডিপ্রেসড।'
কল্যাণ আমতা আমতা করে বলল আমার কি ডিফিকাল্ট কিছু হয়েছে?
'ফেটাল তো কিছু হয়নি আপনার?'
তবে আপনার প্রফেশনটা একটু অসুবিধে হতে পারে?
তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই এখন তো অনেক ভালো ভালো চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। মানে অপারেশনের ব্যবস্থা আছে। বিদেশ থেকে যদি করাতে চান করাতে পারেন আপনাদের তো দেশ বিদেশের যাতায়াত আছে বিভিন্ন সেমিনার উপলক্ষে।
এবার একটু ভয় পেয়ে কল্যান বলল' ডাক্তারবাবু আপনি কি বলছেন আমি কি চিরকালের মতো তাহলে আমার কন্ঠস্বর হারাবো?'
আজকাল ভয়েস বক্সটা রিপ্লেস করা কিছুই না। এতে আপনার অনেক কাজ চলে যাবে। সব কথাই বলতে পারবেন ।এটা হচ্ছে উইথ এ সিম্পল এন্ড সাইন্টিফিক ফলস ভয়েস।'
আপনি  স্মকিং করেন?'
কল্যান বলল' হ্যাঁ করি।'
মনে রাখবেন' স্মোকিং ইজ ডেডলি ফর ইউ'।
একটা কড আপনার একেবারেই গেছে এবং অন্যটাও প্রায় অলমোস্ট গন।'
ধোয়ায় ধোয়ায় গলাটার বারোটা বাজিয়ে দিবেন না আর।'
'ডাক্তারবাবু আমি কতদিন পর্যন্ত কথা বলতে পারব না?'
কেবল সপ্তাহে সপ্তাহে সাত দিন গান্ধীজী সপ্তাহে একদিন মৌনব্রত পালন করতেন জানেন তো আপনি ওরকমই করুন তিন সপ্তাহ ঘরে থাকুন চুপচাপ । কমপ্লিটলি গলাটার রেস্ট দিন।'
'তাহলে কি বলছেন আমি কি আর কথা বলতেই পারবোনা। ওটা একেবারেই চলে গেল । আ পার্মানেন্ট লস?'
'কি মুশকিল আমি কি তাই বললাম নাকি ।তিন সপ্তাহ আপনাকে কথা বলতে বারণ করা হলো এরপর অপারেশন টা করিয়ে নেবেন ।কেন অত  অরিড হচ্ছেন।'
এই মুহূর্তে  কিছু ওষুধ দেবেন না?
হ্যাঁ মাক্রাবিন আর ভিটামিন ইনজেকশন দুটো তিন সপ্তাহ এবং স্টেরয়েড অ্যান্টিবায়োটিক টা 10 দিন ঠিক যে ভাবে লিখে দেয়া হয়েছে সেই ভাবে চালিয়ে যান আর ওই যে বললাম ভয়েসকে কমপ্লিটলি রেস্ট দিন।
তিন সপ্তাহ পর আবার আপনার সঙ্গে আমার দেখা হবে।'
কল্যান বলল' থ্যাংক ইউ ডাক্তার'।
এরপর ডাক্তারবাবু আচ্ছা বলে টেবিলের উপরে রাখা ঘণ্টা বাজিয়ে দিয়ে বলেন
' ওয়েলকাম ।নেক্সট।'
ডাক্তারবাবুর ওখান থেকে বেরিয়ে এবার কল্যাণ ভাবল সামনে রেস্টুরেন্ট থেকে কিছু খাবার নিয়ে চলে যেতে হবে বাড়িতে। স্টুডেন্টের দিকে যেতে যেতে ডাক্তারবাবু কতটা অর্থ পিচাশ সেটাই মনে মনে ভাবার চেষ্টা করছিল ভিজিট দেবার সঙ্গে সঙ্গে ঘন্টি বাজিয়ে দিলন আর একটা কথাও শুনতে রাজি হলেন না ডাক্তার বাবু। 
বাপরে কি প্রফেশনাল।
তারপর নিজের ভয়েসটা নিয়ে ভাবনা চিন্তা করতে লাগল এর মধ্যে যদি ঠিক না হয় পরের মাসেই আছে আবার আর একটা সেমিনার। এছাড়া কলেজে ক্লাস রয়েছে।কি হবে কে জানে জীবনে টানাপোড়েন তো রয়েছেই এখন চলে ভয়েজের টানাপোড়েন দেখা যাক ঈশ্বর কি করেন। কতদিন ভয়েস বিভ্রাটে থাকতে হয় কি যেন?

শামীমা আহমেদ এর ধারাবাহিক উপন্যাস




শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত (পর্ব ৭২)
শামীমা আহমেদ 

সারাদিন ফ্যাক্টরির কাজ তদারকির দ্বায়িত্ব  শেষ  করে,দিনশেষে গাজীপুর থেকে রওনা দিয়ে, শিহাবের উত্তরায় ফিরতে রাত প্রায় দশটা হয়ে গেলো। পথিমধ্যে,চন্দ্রা, জিরাবো,আশুলিয়া, আবদুল্লাপুরের ভয়ানক যানজটে প্রায় একঘন্টা বসে থাকা। যদিও চাইলে আশপাশ দিয়ে বাইক চালিয়ে  বেরিয়ে আসা যেতো।কিন্তু শিহাবেরতো ঘরে ফেরার অত তাড়া নেই।কেউতো আর ঘরে তার জন্য অপেক্ষায় নেই।বরং বাইকে বসে উদাস হয়ে আকাশের চাঁদ দেখে কয়েক  স্টিক টেনে নেয়া যায়। আর এর সাথে কয়েককাপ চা, কফি চালান দেয়া হয় ভিতরে ভ্রাম্যমাণ চা, কফি বিক্রেতাদের কাছ থেকে।
যানজট ছাড়তেই শিহাব বাইকের স্পীড বাড়িয়ে সময়টা পুষিয়ে নিলো।
শিহাব বাসার গেটে এসে হর্ণ দিতেই কেয়ারটেকার বিল্লাল গেট খুলে৷ দিলো। বিল্লালের ভয়ার্ত দৃষ্টি! শিহাবের অনুমতি ছাড়া তার বাসায় অতিথি ঢুকেছে। কিভাবে তা ছারকে জানাবে। শিহাব বাইক পার্ক করে হেলমেট খুলতেই বিল্লাল তার কাছে এসে বললো, ছার মাফ কইরা দিয়েন। আপনার অনুমতি ছাড়া একটা কাজ কইরা ফেলছি ছার।
কি করেছো বিল্লাল? শিহাব বেশ নরম সুরেই জানতে চাইলো।
তাই কি এত কল দিচ্ছিলে সকালে?
জ্বী ছার।
তা কি করেছো?
ছার আপনি ঘরে গেলেই দেখতে পারবেন।
ক্লান্ত শিহাব আর কথা বাড়ালো না। বাইকের চাবি হাতে নিয়ে ঘিরের চাবি চাইতেই বিল্লাল বললো, ঘরে অতিথি আছে, তার কাছেই চাবি দিয়া গেছে বুয়া।
এবার শিহাবের মাঝে একটু ভাবনা এলো,,কে হতে পারে যে আমার অনুমতি ছাড়াই আমার ফ্ল্যাটে ঢুকে যায়। শায়লা নয় তো? তবে কি সেদিন এখানে আসাতে  বাসায় কোন ঝামেলা হয়েছে?  সেকি তবে বাসা থেজে রাগ করে চলে এলো হাবের কৌতুহল বেড়ে গেলো।সে  দ্রুত লিফটের দিকে পা বাড়ালো।  শস্যলা কোন বিপদ হলো! লিফট উপরে উঠতেই শিহাব এক ঝটকায় বেরিয়ে দরজার কলিং বেলে আঙুল  দিয়ে বেশ কয়েকবার বিরতি ছাড়াই পুশ করলো। 
রিশতিনাতো এতটাক্ষণ ধরে, সেই সকাল দুপুর রাত কাটিয়ে শিহাবের ফেরার অপেক্ষাতেই উন্মুখ হয়ে ছিল। অলস ভঙ্গিতে টিভির সাউন্ড অফ করে চালিয়ে রেখে সময় পার করছিল।কলিং বেল শুনেই চমকে উঠে ঘর থেকে রক দৌড়ে দরজার কাছে এলো।
দরজা খিলতেই দেখলো শিহাব দাঁড়িয়ে! 
অপরপ্রান্তে শিহাবের জন্য রিশতিনা  বড় একটা বিস্ময়  হয়ে এলো। দুজনেই থমকে দাঁড়িয়ে!  দরজার এপাশ আর ওপাশে।শিহাবের পা যেন আর ঘরের দিকে চলছিলই না।  শিহাবকে কাছে পেয়ে রিশতিনার চোখ জলে ভরে উঠলো। মন চাইছে এখুনি শিহাবের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়তে।যেন খুব ইচ্ছা করছে শিহাব এখুনি যেন হাত বাড়িয়ে তাকে বুকে টেনে নিক।কত জনমের চাওয়া।কত যুগের তৃষ্ণা। 
শিহাব যেন এর কিছুই অনুভব করছে না।তার দুচোখ শুধু শায়লাকে খুঁজছে। সামনের মানুষটা অদৃশ্য হয়ে রইল। রিশতিনা বুঝতে পারছে শিহাবের কাছে সে একেবারেই অপ্রত্যাশিত হয়েছে।তাইতো সে এমন বরফ
কঠিন হয়ে আছে। এই বরফকে গলাতে হবে। শিহাবের ভেতরে তার জন্য ভালবাসার জলধারা বহাতে হবে আর এর জন্য শিহাবের শত অপমান সে সহ্য করবে। শিহাবের মন জয় করে আবার আগের সেই আবেগ অনুভূতি অনুভব ফিরিয়ে আনতে হবে।

রিশতিনা হাত বাড়িয়ে শিহাবের হাত ধরলো।শিহাবের ভেতর তখনো কোন চেতনা ফিরে আসেনি। তার চোখ রিশতিনার দিকে তাকিয়ে পাথর হয়ে আছে। রিশতিনা এক টানে শিহাবকে ঘরে নিয়ে এলো। দরজা লাগিয়ে  শিহাবকে বেড রুমে নিয়ে গেলো।বিছানায় বসিয়ে দুই হাত ধরে জানতে চাইলো,কেমন আছো চাঁদ? ভালোবাসার দিনগুলিতে রিশতিনা শিহাবকে চাঁদ নাম ডাকতো। শিহাব কি সব হচ্ছে  কিছুই বুঝতে পারছে না। সে শুধু শায়লার মুখটিই ভাবছে।
শিহাবের নীরবতায় রিশতিনা বললো,শিহাব তুমি কি ভুলে গেছো, তুমি আমায় কি নামে ডাকতে? আবার সেই নামে ডাকো চাঁদ।আবার সেই নামটিতে ডাকো।বলেই রিশতিনা ঝরঝর করে কেঁদে ফেললো। শিহাবের বুকে মাথা রাখলো।এবার যেন একটু স্বাভাবিকে এলো। একটা মেয়ে তার সামনে তার জন্য কাঁদছে, তার বুকে আছড়ে পড়ছে আর সে এমন স্থির হয়ে বসে আছে? শিহাব কথা বলে উঠলো,  রিশতিনা তুমি কেঁদোনা। বলেই রিশতিনার মুখটা দুই হাতে তুলে ধরলো।
রিশতিনা তখনো চোখ বন্ধ করে অঝোরে কেঁদেই যাচ্ছে।আর বিড়বিড় করে বলছে 
শিহাব তুমি আমাকে ক্ষমা করো। সব ভুলে আমায় গ্রহণ করো। আমি একেবারে তোমার কাছে চলে এসেছি।আমার পরিবারের
সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে এসেছি।
 শিহাব বুঝতে পারছে না এখন সে কি করবে বা তার কি করা উচিত? শায়লাকে সে কি বলবে? শায়লা  যে কোন ভাবেই তার কাছে আসবে।রিশতিনা স্থির হলো।কান্না থামালো।
রিশতিনা বললো, তুমি হাতমুখ  ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে আসো আমি  খাবার দিচ্ছি। আজ জিগাতলা থেকে মা ভাবী অনেক খাবের পাঠিয়েছে। আমি আভেনে গরম করছি।শিহাবের তখন যেন আজ সকালের  সব মনে পড়লো।কেন বিল্লাল এত ফোন দিচ্ছিল তাকে।সে বুঝতে পারছে আজ আর রিশতিনাকে ফেরানোর কোন পথ কি সে পাবে?সে তার স্ত্রীর অধিকার নিয়ে তার কাছে এসেছে।কোন আইন বা ধর্মের দোহাই আজ আর কাজ করবে না। কিন্তু শায়লা যে তার মন প্রাণের অনেকখানি জুড়ে আছে।

রিশতিনা শিহাবের হাত ধরে ওয়াশরুমের দরজার কাছে নিয়ে গেলো।এওতটা পথ বাইক চালিয়ে সারাদিনের শত ঝামেলায় ক্লান শ্রান্ত শিহাব টাওয়েল নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেলো।
রিশতিনা কিচেনের দিকে এগিয়ে গেলো।ফ্রিজ খুলে খাবার বক্স খুলে দেখে নিচ্ছিল কি কি আছে। দুটো প্লেট  হাতে নিয়ে ডাইনিং এ এলো। রিশতিনা বুঝিতে এভাবেই শিহাব ক্লান্ত ঘরে ফেরে আর একাই সব কিছু করে।শিহাবের জন্য তার মনটা হু হু করে  উঠলো। 
হঠাৎই শিহাবের মোবাইল বেজে উঠলো। রিশতিনা ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলো,রাত এগারোটা। এত রাতে কে কল করলো।রিশতিনা এগিয়ে এলো।মোবাইল হাতে নিয়ে দেখলো,মায়া নাম ভেসে উঠেছে আর স্ক্রীনে ভেসে উঠেছে, টানা টানা চোখে মায়াবতী মুখের একটি মেয়ের ছবি যার কপালে ছোট্ট একটা কালো টিপ।রিশতিনার কেন যেন ঐ টিপটাকে একেবারেই সহ্য হলো না।


চলবে.....

কবি আশ্রাফ বাবু




যেখানে দিন রাত চলে
আশ্রাফ বাবু

যে পৃথিবীতে আমাদের বাস তুমি ছিলে চুপচাপ, 
শেষ হয়ে যাইনি আমি আগন্তুক
যেখানে দিনরাত চলে বেচাকেনা।
চেয়ে চেয়ে রত হই প্রার্থনায় - প্রেরণা আর ভালোবাসা, জ্বলছে ভেতর থেকে - রত হই প্রার্থনায়
এই জীবনের আগে মৃত্যু হয়েছে।
 
আরেকটা জীবনে আগুনের তাপে তরুণ হৃদয় 
শুধু আন্দোলিত তপ্ত শোণিত ফুটছে আমার ধমনিতে
আমার অনুভূতিগুলো ভেতরে ভেতরে বেঁধে ফেলেছে,
জন্তুতে পরিণত হয়েছি বিশ্বস্ত প্রাণীর মতো,
যেখানে দিন রাত চলি আর ভুলি
ভেতরে ভেতরে আমি গজরাই।

আমার ভয় ও টান প্রশমিত হবার নয়-আমি প্রাণবন্ত, 
শেষ হয়ে যাইনি এইভাবে আর ভাবতে পারি নি
আর আমি চাই তুমি, ঠাণ্ডা বাতাস খেয়ে বলি।
সুখের চোখে জলে ভেজা দেখেছি স্বপ্নে
কোথায় এলাম সত্যিই এই মোকাম আমার
এই অনন্তদৃষ্টি রেখে,এই জায়গার উপর।

কবি মিতা নূর এর কবিতা





আমায় তুমি খুঁজবে 
মিতা নূর 



তুমি, তোমাকে পেয়েছিলাম শূন্যতার মতো, 
একমুঠো মিথ্যের ঘর আর বিষন্নতার উঠোনে !
তোমাকে পেয়েছিলাম ঘুটঘুটে আঁধারে, 
মুখ মুখথুবড়ে পড়ে থাকা জোনাকির আলোয় !
তোমাকে পেয়েছিলাম  নির্জন নির্ঘুম রাতের, 
অদেখা ভালোবাসার মাঝ পথে,
তুমি,তুমি দাঁড়িয়ে ছিলে একজোড়া বিশ্বস্থ হাত বাড়িয়ে ! 
তোমাকে পেয়েছিলাম আমার কাব্যের মতো,
তোমাকে পেয়ে ভেবেছিলাম..!
আমার জীবনের অস্তিত্বের কোণ জুড়ে,
যেন এক স্বেচ্ছায়  মন খারাপী উড়িয়ে দেওয়া নীল আকাশ তুমি! 
তুমি, তোমার মায়াবী মুখখানা দেখে নিঃশ্বাস ছেড়ে ভেবেছিলাম, 
একজীবনের সমস্ত সুখ বুঝি তোমার ঐ বুকে রাখা, 
নিশ্চিন্তে কাটিয়ে দিতে পারি আরো কিছু সময়!
তুমি,তোমাকে পেয়েছি আজ ঠিকই, কিন্তু- কাছথেকে দেখে মনে হচ্ছে,
ভয়াবহ কালবৈশাখী ঝড়ের মতো, 
এ-ই বুঝি আবার সব লণ্ডভণ্ড হয়ে যাচ্ছে! 
তুমি এসেছো ঠিক, কিন্তু অবেলায়, অবহেলা হাতে নিয়ে, 
তোমার চোখে ভালোবাসা কই? আমি তো খুঁজে পাচ্ছি না! 
হঠাৎ আমার বুকের ভেতরটা যেন ঝরে  
যাওয়া পাতার মতো, 
দুমড়েমুচড়ে ভেঙে যাওয়ার শব্দ পাচ্ছি..?
আমি কী ভুল করে  আবারও চোরাবালিতে পা দিয়েছি?
দৌড়ে আয়নার কাছে গিয়ে নিজেকে  আত্মাসমর্পণ করলাম। 
আয়নায় চোখ পড়তে দেখি, আমার আনন্দ গুলো, 
বিষন্নতা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে একেকটা করে নালিশ জানাচ্ছে। 
কপালের কালো টিপ আত্মচিৎকার   দিয়ে বলছে, 
আর কতকাল এমন করে দুঃখ লুকাবে...?
চোখে দু'টোও সুযোগ পেয়ে, স্যাঁস্যাঁতে হয়ে বলে উঠলো, 
আর কতকাল এমন করে  কাজল টেনে অশ্রু লুকাবে...?
ঠোঁট গুলোও সুযোগ ছাড়েনি একটুও, বলে উঠলো,
ঠোঁটের নীলচে ব্যথা গুলো আর কতকাল, রঙবেরঙে, রঙ মেখে ঢেকে রাখবে..? 
তখন আমি লজ্জায় চৈত্র কাতুরী হয়ে বর্ষা মেঘ খুঁজি, 
বুক ফেটে ভেতর থেকে তুমুল বেগে  বর্ষণ শুরু হয়। 
তুমি, তুমি চোখ মেলে দেখতে পাবে..!
তোমারও মনে পড়বে আমায়, 
কোনো এক পিচঢালা কংক্রিটে, 
যখন প্রচন্ড  হোঁচট খেয়ে পড়বে...!
বর্ষাস্নাত  কোনো বিকেলে আমাকেই তুমি খুঁজবে, 
নিঃসঙ্গতার চাদর, তোমাকে তখন জড়িয়ে ধরবে। 
তখন আমাকেই তোমার ভয়াবহ প্রয়োজন হবে,
হয়তো সেদিন দেখবে আমি নেই, মনে হবে আমিই তোমার,সকল রোগ শোকের সমাধান..!
দুজনের মনে এতো ভালোবাসা ছিল, তবু আজ। 
তবুও জীবনের কোনো মোড়েই আমরা নেই, 
সেইদিন  তুমি হয়তো থাকবে, কোনো টোং দোকানে বসে, 
হাতে নিকোটিন, ঠোঁটে চায়ের কাপ...!
তবুও চুম্বনের আবেশ অনুভব করছো আমায় মনে করে। 
তোমার চোখ দু'টো জলাশয়, কিন্তু খুব কৌশলে চশমার আড়াল ডাকবে। 
তখন আমাকেই তুমি খুঁজবে..!
আর আমাকে  হয়তো শহরের কোনো গোরস্তানে,
মাটি তার বুকে লুকিয়ে রাখবে সবুজ ঘাসের সুগন্ধিতে। 
তখন  মনে  অজান্তেই, মনে পড়বে, তোমার কবিতায় কী, আমি ছিলাম? 
তুমি,সেদিন শেষ বারে হয়তো, আরো একটা কবিতা খুঁজবে। 
আমার নামে লিখা হবে, তুমি, সযত্নে  লিখবে !!

কবি শিবনাথ মণ্ডল এর কবিতা




রঙিন বসন্ত
শিবনাথ মণ্ডল


ভূস্বর্গে বসন্ত এলো
   এলো ঋতু রাজ
গন্ধমাখা ফাগুন হাওয়ায়
    মনে লাগেনা কাজ।
শিমূল ফোটে পলাশ ফোটে
      ফোটে কৃষ্ণচূড়া 
আবির রঙে আকাশ লাল
       রঙিন হলো ধরা।
ফাগুন এলো হোলি এলো 
       এলো কোকিলের সুর
বসন্ত আজ বিরাজিত
          মন হলো ভরপুর।।

১৮ মার্চ ২০২২

কবি মমতা রায়চৌধুরীর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৩৫





উপন্যাস 


টানাপোড়েন ১৩৫
মিষ্টি একটা গন্ধ 
মমতা রায়চৌধুরী

কল্যাণ এলার্ম দিয়ে রেখেছিল যথাসময়ে ঘুম ভাঙলো কিন্তু শরীর মন এতটাই ক্লান্ত ,উঠতে ইচ্ছে করছিল না । তবুও উঠতে তো হবেই। সকালে বিছানায় উঠে বসে দেখছে গলার অবস্থা আরো খারাপ। আজকে কি করে লেকচার টা দেবে ,গভীর সমস্যায় পড়ল।
এরমধ্যে কলিং বেলের আওয়াজ শুরু হলো। এবার পুরোপুরি না উঠে আর পারল না কল্যাণ। নিশ্চয় মাসি এসেছে। আবার কলিংবেল বাজছে।
আড়মোড়া কেটে কল্যান আস্তে আস্তে দরজার দিকে এগোল, তারপর দরজা খুললো।
সত্যি ,সত্যি মাসি এসেছে। 
মাসি বলল 'অনেক রাত্রে ঘুমিয়েছো নাকি?'
কল্যান একটা মস্ত বড় করে হাই তুলল। মাসির সাথে ইশারায় কথা বলল। কল্যাণ ইশারায় বুঝিয়ে দিল গারগিল করার জল দেবার জন্য।
মাসি যথারীতি গিয়ে আগে গারগিল করার জল দিল ।তারপর চা বানালো। তারপর  আনুষঙ্গিক অন্যান্য কাজে হাত দিল।
মাসি জিজ্ঞেস করল 'কি খেয়ে যাবে 
আজকে ?কখন বেরোবে?'
কল্যাণ যা মুখে বলল বুঝানো অসুবিধে হল, তার থেকে আবার কিছু ইশারায় বুঝিয়ে দিল।
মাসি শুধু বললো 'ভাত খাবে তো?'
কল্যাণ মাথা নাড়িয়ে অসম্মতি প্রকাশ করল।
মাসি বললো 'তাহলে কি খাবে?'
'তরকা বানাবো? রুটি খাবে তো?'
কল্যাণ মাথা নাড়লো।
এরমধ্যে কল্যাণের আবার ফোন বাজছে।
ফোনের আর্তনাদে ফোনটা রিসিভ করল বলল¡' হ্যালো'। গরগর আওয়াজ হলো।
'আমি শিখা বলছি।'
'হ্যাঁ বলো। 'আবার গরগর আওয়াজ।
'তোমার গলার অবস্থা তো বুঝতেই পারছি ...।'
'যাচ্ছেতাই।'.
'কিন্তু কি করে তুমি লেকচার দেবে?'
'সেটাই তো ভাবছি।
উপায়ও নেই।'
'ডাক্তার  দেখাবে না?'
'ফিরে এসে দেখাবো।'
'ঠিক আছে  টেক কেয়ার।'
'তুমিও নিজের যত্ন নিও।'
'কখন বেরোবে?'
'এই তো দশটায়।'
''ok'
'ফিরে আমাকে ফোন ক'রো।'
''ok'
ফোনটা কেটে দিলো। সারারাতের অবসন্ন ক্লান্ত মনে একটা বিষণ্ণতার ছাপ ফেলেছিল প্রভা। হঠাৎ করে শিখার ফোনটা আসাতে , সঙ্গে যেন একটা মিষ্টি গন্ধ হৃদয় বীণার চারিদিকে ভরে গেল। মন বেশ চাঙ্গা হয়ে উঠল।
মাসি আর একবার গারগিল করার জল দিয়ে গেল। কল্যাণ ইশারায় মাসির কাছে আর এক কাপ চায়ের বায়না ধরল।
মাসি একগাল হেসে বলল 'দিচ্ছি।'
কল্যাণ একটা বাংলা ম্যাগাজিনে চোখ বুলাচ্ছিল। হঠাৎই চোখ ফ্রেমবন্দি হয়ে যায় সম্পাদকীয় কলমটাতে। অন্যমনে পাতা উল্টাতে উল্টাতে এই সম্পাদকীয় কলমটা পড়ে বলল 
'বাহ ,বেশ ভালো লিখেছেন 
তো ?সেন্সেবল লেখা। যথেষ্ট সংযত আর ঝরঝরে ।সারও আছে ,তাতে আবার ধারও আছে।
মাসি এসে চায়ের কাপটা আবার ধরিয়ে দিল। চা খেতে খেতে লেখালেখির পাতার কবিতাংশে কবি দেবব্রত সরকার, কবি স্বপ্নীল ভট্টাচার্য, কবি রেখা চৌধুরী র কলমে চোখ নিবদ্ধ হয়ে গেল।
বসন্ত সংখ্যায় কবি দেবব্রত সরকার এ কবিতাটা বেশ সুন্দর


'বসন্ত  হাঁত রাই'


"তোমার চোখে রাঙানো ফুল আদরে আদখান,

আমার চোখে লাগলো ছোঁয়া রুপেরই আখ্যান।
তোমার চোখে কামনার ডাকে চুপ সাগরে ডুব,
আমার বুকে কৌতূহলের প্রশ্ন ওঠে খুব।
তোমার চুলে উঠল ভেসে আমার হিয়া চোখ,
তাকিয়ে আছি দেখছে দেখ ইচ্ছে ছবি লোক।
তোমার গালে চুপ্টি করে ঠোঁট  চলে যায় একা,
পায়ের থেকে কপাল জুড়ে চুমুতে আধ ক্ষ্যাপা।
নরম সুরে শরীর ভিজে হারিয়ে গেছে হৃদি,
শরীর এত নরম হলো জানেন নিরবিধি।
কৃষ্ণচূড়ায় রাধার খোঁপা ঢেকেছেএকলাই,
আবির ফুলে মেখেছে মন বসন্ত হাঁতরাই।"
মন ছুঁয়ে গেল কবিতাখানি। আর দেখার সময় নেই এবার ওয়াশ রুমে গিয়ে ফ্রেশ হতে হবে ।তারপর বেরোনো আছে খেয়ে দেয়ে।
ডাইনিং টেবিলে বসে কল্যাণ প্লেটে চামচের আওয়াজ করতে লাগল। মাসি হাসতে হাসতে এসে বলল' একদম বাচ্চা ছেলের মতো হয়ে গেছ।'
ডিস বাজাতে হবে না । এই নাও তোমার খাবার।
ইশারায় বললো 'এতগুলো রুটি?'
মাসি বলল 'এতগুলো! দুটো রুটি খাবে না?
না, না খেয়ে নাও।'
ইশারায় মাসিকে বোঝাতে চাইল কিছু একটা।
মাসি বললো'একটু দাঁড়াও রান্নাঘর থেকে ছুটে নিয়ে আসছি,কাঁচা লঙ্কা ,পেঁয়াজ।'

যতদূর সম্ভব কম কথা বলছে গলার উপর খুব প্রেসার পরছে। তরকা টা দারুন বানিয়েছে মাসি।
হাতের ইশারায় বাহবা দিল মাসিকে।
মাসিও খুব খুশি হলো। আর বলল
'তোমার ভালো লাগলে আমারও ভালো লাগে। রান্না করেও সুখ।'
কল্যান বলল 'আমি সিরিয়াসলি বলছি মাসি তুমি ছোটখাটো একটা দোকান খুলতে পারো, মানে রেস্টুরেন্ট।'
মাসি তো একেবারে প্রসন্নতায় একগাল হেসে বলল 'আমাদের অত টাকা পয়সা কোথায় বাবা।'
কল্যান বলল'-হ্যাঁ আরো কিছু  তোমাকে অবশ্য আধুনিক অনেক রান্না শিখতে হবে।
তবে এটা অবশ্য করতে পারো যদি শুধু ট্রাডিশনাল রান্নায় থাক আবদ্ধ সেটাও করতে পারো।'
ওটা আমার স্বপ্ন হয়েই থাকবে বাবা। মাসি এঁটো বাসন গোছাতে গোছাতে বলল '
'আমাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায়। আমরা কি আর সেই স্বপ্ন দেখতে পারি?'
কল্যান চেয়ারটা টেবিলের একটু ভেতরের দিকে  ঢুকিয়ে দিলো।
 তারপর বলল  বেশিনে হাত ধুতে  ' না মাসি কার কখন স্টার ঘুরে যাবে কেউ কি কিছু বলতে 
পারে ?তবে স্বপ্নটাকে মরতে দিলে তো হবে
 না ।স্বপ্ন তোমাকে দেখতেই হবে।'
মাসি শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
কল্যান নিজের রুমে গিয়ে ড্রেস পড়ে নিল বেরোতে হবে।
'মাসি তোমাকে আর সন্ধ্যেতে আসতে হবে না আমি কখন ফিরবো না ফিরব।'
'তা বেশ।
তাহলে তুমি কি খাবে?'
'আরে এক বেলা তো ,দরকার হলে কিছু কিনে নিয়ে এসে খেয়ে নেবো ।তোমাকে অত ভাবতে হবে না।
কালকে আবার সকাল সকাল চলে এসো কেমন?'
'ঠিক আছে। কি খাবে না খাবে একটা চিন্তা থেকে যাবে।'
"আরে না মাসি, কোন চিন্তা নেই ।আমার মা এখানে নেই তুমি এখন আমার মায়ের মত তাই এত চিন্তা করছ?'
মাসি বেরিয়ে গেল কল্যাণ বেরিয়ে পরলো।
কল্যাণ ট্রেন ধরল কৃষ্ণনগর লোকাল।
কৃষ্ণনগর স্টেশনে নেমে আবার কিছুতে উঠতে হবে। নবদ্বীপ কলেজে পড়েছে। একটা সেমিনার আছে।
ট্রেনে উঠে প্রথমদিকে জায়গা পায়নি ।তারপর ঠিক মদনপুর ছাড়িয়ে জায়গাটা পেল।
ট্রেনে যেতে যেতে ভাবল  মনে মনে কালকে লেখাটা নিয়ে ভাবতে থাকবে কিভাবে উপস্থাপন করবে ?পরিবেশনটা কতটা সুন্দর ভাবে করা যায় এসব আর কি।
তারপর কখন কৃষ্ণনগর স্টেশনে এসে থেমেছে বুঝতেই পারেনি চোখটা লেগে গেছিল।
সবাই যখন হন্তদন্ত হয়ে নামতে শুরু 
করেছে ।তখন নির্মেদ স্মার্ট কল্যাণ নামলো। তারপর হাঁটতে শুরু করল ।যথারীতি অটোওপেয়ে গেল। বাপরে অটোতে যা ভিড়। কিন্তু চাপতেই হলো ।এদিকে টাইমও হয়ে যাচ্ছে।
যথারীতি নবদ্দীপ কলেজে পৌঁছালো ওখানে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্তৃপক্ষ উষ্ণ অভ্যর্থনায় ভরিয়ে তুলল। প্রথমেই ব্রিফকেস খুলে নিজের ল্যাবটপ বের করে চোখ বুলিয়ে নিতে থাকলো। এরইমধ্যে এসে গেল কফি।
কফিটা গলায় বেশ আরাম দিল। কি সুন্দর সুখানুভূতি। একটা  বাতানুকূল ঘরে বসতে দেয়া হয়েছিল। হলঘরটার শীতলতা যেমন নিজের শরীরটাকে প্রশান্তি দিয়েছে তেমনি ভেতরের প্রশান্তি দিয়েছে উষ্ণতায় ভরে কফি।


বিভিন্ন কলেজ থেকে বিভিন্ন লেকচারাররা এসেছেন। গলার জন্য কল্যাণ একটু কেমন যেন ভেতরে ভেতরে একটু দুর্বল হয়ে পড়ছিল।
ঠিকঠাক তথ্য পরিবেশন করতে পারবে কিনা ইন একটা সংশয় ছিল।
গুরুর নাম করে নেমে পড়তেই হলো।
গলার স্বর এর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে নিলো তারপর তার বক্তব্য শুরু করলো।
বক্তব্য শুনে সকলে অভিভূত, আপ্লুত।
প্রত্যেকের ভেতরে যে একটা উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করেছে তাতে কল্যাণও ভেতরে ভেতরে ভীষণভাবে অভিভূত হয়ে গেছিল।
তারপর মনে মনে ঠিক করে নিয়েছিল আজকে ডাক্তার দেখাতেই হবে।  ব্রেক এর সময় ডাক্তারের সাথে কনসাল্ট করে নিয়েছে।
কিন্তু আজকে কি ডাক্তার দেখাতে পারবে কটায় ছাড়া পাবে সেটাই তো বুঝে উঠতে পারছে না দেখা যাক।
এরমধ্যে লাঞ্চ এসে গেছে। লাঞ্চে বিরিয়ানি ,মটন কষা দেয়া হয়েছে। লঞ্চের প্যাকেট খুলে কল্যান
মনে মনে খুব খুশি হয়েছে।
মাঝে টুক করে মনে হল শিখাকে ফোনটা করলে কেমন হয়।
আমার গলাটা জন্য ও চিন্তিত   । ভাবতেই রিসিভ করলো তারপর বললো বলো।
'যেন মনে হল ফোনের অপেক্ষাতেই বসে ছিল 'অনেকটা অধীর আগ্রহে।'
"তোমার প্রোগ্রাম শেষ হয়েছে?"
'না গো ,এখন লাঞ্চ করছি। এখন ব্রেক।'
'ও আচ্ছা তোমার গলার অবস্থা কি?'
'কি মনে হচ্ছে?'
সকালে যে খারাপ অবস্থা ছিল তার থেকে একটু বেটার মনে হচ্ছে ওষুধ খেয়েছো নাকি?
এটা বোধহয়  জানো ,ঈশ্বরের অসীম লীলা ।খুব টেন্সড ছিলাম আ'মি।'
'"তুমি কি করছ?
'তোমার কথাই চিন্তা করছিলাম। ঠিকঠাক গলা কাজ করছে কিনা?'
'তোমার লেকচার হয়ে গেছে?'
"হ্যাঁ ,হয়ে গেছে।'
"তাহলে কখন ফিরবে?'
'সেমিনার শেষ হোক তবে তো?'
'ঠিক আছে টেক কেয়ার।'
'সেম টু ইউ।'
'/অ্যাই শিখা একটা গান শুনিয়ে দাও না খুব ইচ্ছে করছে তোমার কন্ঠে গান শুনতে। প্লিজ।"
"এখন! মাথাটাও গেছে।"
"প্লিজ একটু শুনিয়ে দাও না'
"মান্নাদের একটা গান গাইছি বেশি কিন্তু করবো না?"
"Ok"
"মিষ্টি একটা গন্ধ রয়েছে ঘরটা জুড়ে,... এলোমেলো করে ছড়ানো ছিল যা, কার দুটি হাত সাজিয়ে দিলো তা। চিনি নাকি চিনি না। কাছে না দূরে..।'
ওদিকে কর্তৃপক্ষ কল্যাণকে ডাকলেন
' স্যার আসুন সেমিনার শুরু হয়ে গেছে।'
'হ্যাঁ যাচ্ছি,।' 
"এখন ছাড়ছি কিন্তু মিষ্টি একটা গন্ধ প্রাণের ভেতরে ছড়িয়ে দিলে তুমি।"
শিখা প্রসন্নতায় হো হো করে হেসে উঠলো।

কবি শারমিন সুলতানার কবিতা







জীবন নামক সহজ খাতায়

শারমিন সুলতানা 

চারপাশে এমন অনেক আছে
চরম অভাগা মানুষ, 
মৃত্যু ভয় নেইকো তাদের 
উড়ায় শুধু ফানুস। 

না হয়,"বাবার"চোখের মণি 
হয় যে অভিশপ্ত, 
বোনের দুঃখেও কাঁদেনা মন
হয় বিরক্তের পাত্র।

ভাইয়ের কষ্টের রাখে না খবর
জ্ঞান দিতে সদা ব্যস্ত, 
সত্যনিষ্ঠ তারাই কেবল
সবাই তাদের অধীনস্থ। 

টাকার পেছনে ছুটতে গিয়ে 
হয়নাতো আচরণ সদয়,
ইবাদতেও ঢের ফাঁকিবাজি 
কঠিন হয় যে হৃদয়।

"মা" থেকেও মধুর ডাকটি
ডাকতে জানে না যেই জন,
সব থেকেও ভীষণ গরিব 
বোঝেনা তাদের অবুজ মন।

এমন সুখী নাই-বা হোক
এই জগতের কেউ,
জীবন নামের সহজ খাতায়
থাকে সন্তান বউ।

শামীমা আহমেদ এর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৭০



ধারাবাহিক উপন্যাস

শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত 
(পর্ব ৭০)
শামীমা আহমেদ 


শিহাব, সন্ধ্যে হয়ে এলো। এবার বাসায় ফিরতে হবে, বলেই শায়লা উঠে দাঁড়ালো। 
শিহাব কথাটিতে শতভাগ সম্মতি জানিয়ে সেও উঠে দাঁড়ালো। 
হ্যাঁ,শায়লা চলো তোমাকে এগিয়ে দেই।
যদিও ইচ্ছে করছে জীবনের বাকী সময়টা তোমার সাথেই কাটিয়ে দেই। 
শায়লা আমার আর ভালো লাগছে না তোমাকে ছেড়ে থাকতে? এইতো তুমি চলে গেলে আমার আবার সেই একাকী থাকা।এই দীর্ঘরাত একাকী পাড়ি দেয়া। তোমার জন্য আমি সবসময় অপেক্ষায় থাকবো।
শিহাবের কথায়  শায়লার চোখে জল ভরে এলো। সে এই কথা টিতে সায় দিয়ে শিহাবকেজানালো,আমি সব বাধা পিছনে ফেলে তোমার কাছে আসবো শিহাব। তুমি শুধু আমার অপেক্ষায় থেকো।
শায়লা তার পার্সটা নিয়ে দরজার কাছে এগিয়ে এলো।  শিহাব দরজা খুলে  দেখলো লিফট নিচে নামছে  এবং ভেতরে লোকজনও আছে। তাই এবার দুজনে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলো। কেয়ারটেকার বেলালকে শিহাব একটা রিকশা ডেকে দিতে বললো।শায়লাকে বিদায় জানিয়ে শিহাব বললো, পৌঁছে অবশ্যই  জানিও। বেলালকে কিছু বখশিশ দিয়ে শিহাব ঘরে ফিরে এলো।

বাসার গেটে রিকশা থামতেই শায়লার রুহি খালা আতংকে ধরলো। ভাগ্য সহায়  হলো,খালার ফ্ল্যাটের  দরজা বন্ধ এখন। শায়লা প্রায় নিঃশব্দে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে এলো। 
শায়লা বাসায় পৌঁছে সবার আগে শিহাবকে জানিয়ে দিলো। 
কিছুক্ষণ পর রাহাত অফিস থেকে ফিরলো হাতে মায়ের জন্য কেনা ঔষধের প্যাকেটটি দেখিয়ে রাহাত জানতে চাইলো, আপু তুমি নিজে ওষুধ কিনতে যাওনি? রুহি খালার বাসা থেকে ঔষধ আনতে হলো। তবে তুমিতো বাইরে গিয়েছিলে রুহি খালা ফোনে আমাকে জানালো। 
শায়লা বুঝে নিলো, রুহি খালা তবে রাহাতকে কল দিয়ে সব জানিয়েছে।
রাহাতের কথায় শায়লা নিরুত্তরই রইল।
আপু, তবে কোথায় গিয়েছিলে?
শায়লা ভাবলো, অন্য সময় হলে রাহাত এই প্রশ্নটা করার সাহস দেখাতো না।কিন্তু রুহি খালা রাহাতকে একেবারে বদলে দিয়েছে।
-তবে কি তুমি শিহাব ভাইয়ার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলে। শায়লার উত্তর না নিয়ে রাহাত বেশ বিরক্তির সুরে বললো, আপু এসব একেবারেই ঠিক হচ্ছে না।আর মাত্র কয়েকদিন পর নোমান ভাইয়া আসছেন। এ সময় তোমার শিহাব ভাইয়ার সাথে যোগাযোগটা কমিয়ে দেয়া উচিত।
রাহাতের মুখে এই প্রথম নোমান ভাইয়া নামটা শুনে শায়লা চমকে উঠলো!  এতদিন
ধরে নোমান সাহেবই বলে আসছিল। 
রাহাত বেশ বিরক্তিকর মনোভাব নিয়ে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেলো। মনে হলো শায়লাদের কোন উত্তর শোনার জন্য সে মোটেই আগ্রহী নয়।

রাতে নোমান সাহেবের কল এলে শায়লাকে তার সাথে কথার অভিনয় চালিয়ে যেতে হলো।শায়লাকে নিয়ে তার কতশত ভাবনা!
শায়লা নীরবে তা হজম করে গেলো।

শিহাব আজ একটু তাড়াতাড়ি বিছানায় গেলো। কাল সকালে একটু গাজীপুর ফ্যাক্টরিতে যেতে হবে। কিছু বিদেশি বায়াররা আসবে।ওরা ফ্যাক্টরির যাবতীয় বিষয় দেখে তবে অর্ডার করবে।ওয়ার্কাদের নিরাপত্তা, হেলথ ইসু, স্যানিটেশন, চাইল্ড  কেয়ার,ম্যাটারনিটির ছুটিছাটা,প্রোপার স্যালারি, ওয়ার্কিং টাইম,ওভারটাইম, তার পেমেন্ট যথাযথ কিনা তা খতিয়ে দেখবে। প্রোডাক্ট এর চেয়ে ওদের কাছে এগুলোর প্রায়োরিটি বেশি। আর এসব ওরা  শ্রমিকিদের কাছ থেকে নিজ মুখে শুনবে। ওরা যে একটা ভদ্র জাতি তা এতেই প্রমাণিত হয়।আর আমরা ? জাতিগতভাবেই শ্রমিকদের রক্তচোষা মালিকপক্ষ। শিহাব ভাবলো আমাদের নৈতিক চরিত্রের উন্নতি হওয়া জরুরি দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির চেয়ে।
শিহাব একা বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করে এইসব নানান ভাবনার ডালপালা মেলছিল।
হঠাৎ মোবাইল বেজে উঠলো। শিহাবের ধ্যান ভাঙল। ফোন হাতে তুলে নিতেই দেখলো মায়ের কল। শিহাব উঠে বসলো।
মা কেমন আছো ? জিজ্ঞেস করতেই মায়ের অনুযোগ, কিরে মাকে একেবারে ভুলেই গেছিস। কোন ফোন করিসনা, খোঁজ খবর নিস না,
এইতো মা খুব ব্যস্ততা যাচ্ছে।
বুঝলাম,শায়লা কেমন আছে ? মেয়েটা এসে মায়া বাড়িয়ে গেছে। আরেকদিন নিয়ে আসিস।
আচ্ছা আনবো মা।
কিছু খাবার পাঠিয়েছি।কাল কুরিয়ারে গিয়ে নিয়ে আসিস।
শিহাবের কাল গাজীপুর যেতে হবে। এ কথাতো মাকে বলা যাবে না আর তাছাড়া খাবারও প্রায় শেষ। আনতেই হবে।
ঠিক আছে মা, আমি কাল গিয়ে নিয়ে আসবো।
আরাফ কেমন আছে মা ?
এইতো ভালোই আছে। আলহামদুলিল্লাহ। আজ অনেক খেলেছে ভাই বোনদের সাথে।
ঠিক আছে মা, আমি সময় পেলেই আসবো।
আচ্ছা বাবা ভালো থাকিস।পথঘাটে সাবধানে চলিস।
তুমি দোয়া রেখো মা।আচ্ছা রাখি।আল্লাহ হাফেজ।
শিহাব ঘড়িতে সময় দেখলো।রাত সাড়ে দশটা বাজছে।হ্যাঁ,কবিরকে  কল করা যায়।
শিহাব কবিরকে কল করে কাল কুরিয়ার থেকে খাবারগুলো রিসিভ করে বাসায় ফ্রিজে রেখে যেও।আমার কেয়ারটেকার বেলালের কাছে চাবি থাকে।তুমি তোমার নাম বলে রেখে যেও।
কবির খুবই অনুগতভাবে দ্বায়িত্ব বুঝে নিলো।
সকাল নয়টায় শিহাবের ঘুম ভাঙল। ওয়াশরুম থেকে ফিরে শিহাব বারান্দায় যেতেই গত সন্ধ্যার কফি মগ দুটি শায়লাকে ভীষণভাবে মনে করিয়ে দিলো। শিহাব উদাস ভাবনায় নিচের রোডের গাড়ি চলাচল দেখতে লাগল। ভেবে নিলো তাকেও বেরুতে হবে।শিহাব  শাওয়ার নিয়ে ঝটপট তৈরি হয়ে বের
হয়ে গেলো। কিছুদুর গিয়ে একটা চেনা রেস্টুরেন্টে সকালের নাস্তা সেরে নিয়ে গাজীপুরের উদ্দেশ্য  বাইকের স্পীড বাড়িয়ে ছুটে চললো।
রাহাত নাস্তা সেরে অফিসের জন্য বেরুবে।শায়লাকে জানালো, আপু আমি লাঞ্চের পর বের হয়ে মাকে নিয়ে বাসায় চলে আসবো।
অফিস শেষ করে যেতে গেলে বেশ রাত হয়ে যাবে। বিকেল নাগাদ মা পৌঁছে যাবে বাসায় সেটাই ভাল। রাত করলে আবার কতক্ষণ জ্যামে পড়তে হয় কে জানে ? তুমি এদিকটা গুছিয়ে রেখো।শায়লা আচ্ছা বলে বাসার দরজা লাগিয়ে দিলো। 
শিহাবের অফিস এসিস্ট্যান্ট কবির যাত্রা বাড়ি থেকে বাসে একেবারে উত্তরার হাউজবিল্ডিং এ এসে নামল।নয় নম্বর সেক্টরে সুন্দরবন কুরিয়র গিয়ে শিহাবকে কল করলো।শিহাব বাইক থামিয়ে  কুরিয়ারের লোকদের সাথে কথা বলে  কবিরকে পার্সেলটি দিতে অনুরোধ করলো। কবির খাবারের ব্যাগটি নিয়ে তকশায় শিহাবের বাসা সেক্টর তের এর দিকে এহিয়ে গেলো।এর আগেও বেশ কয়েকবার কবির শিহাবের নানান কাজে এই বাসায় এসেছে।কেয়ার টেকার বিল্লাল তাকে ভালোভাবেই চিনে। বাসায় ঢুকতেই বললো,উপরে যান,সারের বাসায় নিয়া কাম করতাছে,দরজা খোলাই আছে। কবির লিফটে উপরে উঠে গেলো।দরজা খোলাই পেলো। বুয়া ঘর ঝাড়ু দিচ্ছে।কবির খাবারের ব্যাগ থেকে বক্সগুলো বের করে সব ফ্রিজে ঢুকিয়ে রেখে গেলো।নিচে এসে রিকশা নিয়ে অফিসের দিকে এগিয়ে গেলো। এর পরপর
হঠাৎ বাসার গেটে একটা উবার এসে থামলো। গাড়ির ভেতর থেকে একটি মেয়ে বাসার নাম্বার প্লেটের সাথে ঠিকানা মিলিয়ে নিচ্ছল।আর তা মিলে যাওয়াতে উবার  ভাড়া মিটিয়ে মেয়েটি গাড়ি থেকে নামলো। বাসার গেটে উঁকিঝুকি দিচ্ছে। বিল্লাল এগিয়ে গেলো। দেখলো খুবই সুন্দরী  একজন মেয়ে! মনে হচ্ছে বিদেশি। চোখে সানগ্লাস, পায়ে হাইহিল জুতা।খুব সুন্দর পোষাক পরা। হাতে একটা চাক্কাওয়ালা সুটকেস,তার গায়ের রঙ এক্কেবারে বিদেশিদের লাহান,ধবধবা ফসসা। এই সুন্দর মেয়েছেলেকেতো সে কোনদিন দেখে নাই ! তার ভিতরে ভীষণ কৌতুহল হলেও বিল্লাল তার ডিউটিতে ব্যস্ত হলো,ম্যাডাম, কাউরে খুঁজতাছেন ?
মেয়েটি খুব হালকা কন্ঠে বললো,হ্যাঁ,  এটা কি শিহাব সাহেবের বাসা,মানে উনি কি এখানে থাকেন ? 
বিল্লাল বিস্ময়ে যেন নির্বাক হয়ে গেলো। এত সুন্দরী মাইয়া সারকে খুঁজতাছে? অবশ্য সারওতো সুন্দর মানুষ। 
কি ভাবছেন? বলছেন নাতো ?
জ্বী ম্যাডাম,শিহাব সার এই বাসায় থাকেন, চারতলায়।
মেয়েটি লিফটের দিকে এগুতে চাইলে,বিল্লাল বলে উঠলো, সারতো বাসায় নাই,সকালেই বাহির হইয়া গেছে। গাজীপুর গেছে।আমারে বইলা গেছে। তয় সারের ঘর খোলা আছে,বুয়া কাজ করতাছে।
বিল্লালের মুখ দিয়ে কথাটা ফস করে বেরিয়ে গেলো !
তা,আপনি কে ম্যাডাম ? সারের কি হন ?
আমার নাম রিশতিনা।আমি আপনার সারের স্ত্রী।এতদিন বিদেশে ছিলাম।আজ দেখা করতে এসেছি ।
বিল্লাল বেশ অবাক হইল,মনের ভেতর তার প্রশ্ন,তবে কাইল বিকালে যে ম্যাডাম আসলো সে তবে কে ? সারের বউ আছে তাতো কোনদিন জানতাম না ! তয় বউ তার সাথে থাকে না ক্যান ?
আমি একটু তোমার সারের বাসায় যেতে চাই। উনি কোন পাশের ফ্ল্যাটে থাকেন ?
না, না ম্যাডাম,সারের অনুমতি ছাড়া তার বাসায় আপনারে যাইতে দিতে পারিনা।
ঠিক আছে, তোমার স্যারকে কল করে যেনে নাও।আমি অপেক্ষা করছি।
বিল্লাল কল করতে ফোন হাতে নিলো।
রিশতিনা চারপাশে তাকিয়ে দেখছে।শিহাব বহুদিন হলো ঝিগাতলায় আর থাকছে না।ইংল্যান্ডে তার চলে যাওয়ার পরপরই এখানে চলে এসেছে।রিশতিনা মনে মনে তার উত্তরার কাজিন, শিহাবের বন্ধু রোমেল ভাইয়াকে অনেক থ্যাংক্স জানালো। রোমেল ভাইয়া হেল্প না করলে শিহাবের ঠিকানা জানা হতো না। অবশ্য ইংল্যান্ডে থাকতে শিহাবের সব খবর রিশতিনা তার কাছ থেকেই জানতো।
বিল্লাল শিহাবকে কল করেই যাচ্ছে। শিহাব চলন্ত বাইকে তার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে না। এদিকে রিশতিনা উপরে যেতে চাইছে।কি যন্ত্রণায় পড়লো সে ভাবতেই নিচতলার অপুর আম্মু বেরিয়ে এলেন ছেলেকে স্কুল থেকে  নিয়ে আসতে। বিল্লাল এক দৌড়ে তার কাছে ছুটে গেলেন।এ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া সব কিছু গরগর করে ভয় মিশ্রিত কন্ঠে বলে গেলো।
অপুর মাতো সব শুনে চোখ কপালে তুললেন। কি ! শিহাব সাহেব বিবাহিত? তার স্ত্রী আছে। কই কোনদিনতো বলেননি।
রিশতিনা একটা সমাধানের জন্য তার দিকে এগিয়ে গেলো।
প্লিজ হেল্প মি।আই এম মিসেস শিহাব।আই এম হিজ ওয়াইফ।
আপনি তার বউ, তা এইটা আমরা কেমনে বুঝবো ? 
ইয়েস,আই হেভ প্রুফ। শিহাব ইজ মাই হাজবেন্ড।আই হেভ ফটোগ্রাফস অফ আস,ইউ সি,  বলে সে মোবাইল গ্যালারি থেকে ছবি দেখাতে চাইলো। অপুর আম্মু ভাবলো,বিষয়টি কেমন দেখায় ? সে বললো,বিল্লাল তোমার সার রে ফোন দাও, জিজ্ঞেস করো।
শিহাব গাজীপুরে পৌছেই দেখলো বিল্লালের অনেকগুলো কল। শিহাব ভাবলো,কবির কুরিয়রের খাবার রেখে গেছে সেটা জানাতেই  এত কল। উফ ! এ বিল্ললাকে নিয়ে আর পারা যাচ্ছে না।বেশি মাত্রায় ওবিডিয়েন্ট ! 
শিহাব ফোন রিসিভ না করেই ফ্যাক্টরিতে ঢুকে গেলো ম্যানেজার সাহেব এগিয়ে এলেন।অপুর আম্মু অনেকক্ষন অপেক্ষায় থেকে রিশতিনাকে নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে বসালেন।রিশতিনা একে একে তার আর শিহাবের বিয়ের আগের পরের সব ছবি দেখালো। খুব সংক্ষিপ্ত করে নিজেদের দূর্ভাগ্যের কথা বললো। অপুর আম্মু ভাবলেন স্বামী স্ত্রীর মাঝে বোধহয় মান অভিমান চলছে। তিনি রিশতিনাকে চারতলায় শিহাবের ফ্ল্যাটের দরজায় পৌঁছে দিলো। আর তার ছেলেকে স্কুল থেকে আনতে হবে এটা বলে রিশতিনার কাছ থেকে বিদায় নিলো।রিশতিনা কলিং বেল পুশ করলো।তার ভেতরে প্রচন্ড  এক ভাললাগা আবার শিহাবের প্রতি তার পরিবারের এত অন্যায় আচরণের জন্য তার চোখ দুটো জলে ভরে উঠলো। 


চলবে....

কবি সফিক ইসলাম এর কবিতা




আয়নায় অন্যমুখ
সফিক ইসলাম



প্রতিদিন আকাশ থেকে খসে পড়া ঝরা পালক কুড়াই, আর জমিয়ে রাখি
একদিন পাখি হয়ে উড়ে যাবো।
একদিন  বাতাসের কানে কানে বলে যাবো
এ পৃথিবী আমার জন্যে নয়। 

প্রতিদিন অজস্র শিশিরের কণাগুলো চোখের কোণায় জমিয়ে রাখি....
একদিন রাতভর কাঁদবো বলে।
এভাবে নিয়তই ভেঙে ভেঙে টুকরো করি নিজেকে আয়নার কাচের মতো
অথচ প্রতিটি টুকরোতেই আমি  আমাকেই দেখি। 

নিভৃতে যত্ন করে যারা দুঃখ পোষে
অনিয়ম দেখে দেখে যারা বড় হয়
নিয়ম ভাঙার মিছিলে এই চোখ খুঁজে ফিরে
তাদেরই মুষ্টিবদ্ধ হাত। 

আগামীর ভোর কবে হবে বলতে পারো কেউ ?
যে ভোরে ভাঙা আয়নার পারা মুছে স্বচ্ছ কাচ হবে!
প্রতিস্মরিত আলোতে নিজেকে না দেখে 
দেখবো অগনতি মানুষের মুখ।

কবি জাহানারা বুলা'র কবিতা





স্মৃতির হরিণ 
জাহানারা বুলা

আমাদের প্রয়োজন অতিক্রান্ত সেই কবেই
যোগাযোগ অর্থহীন এখন
আমরা ভালো আছি, ভালোই থাকা উচিৎ। 

মৃত্তিকা রুক্ষ হয় না কেবল আষাঢ়ের বৃষ্টি বিহীন
পদ্মা-মেঘনা ফুঁসে ওঠে নির্ধারিত সময়ে ওদের
শরৎ জানান দেয় যদিও আকাশের নীলে
কাশবন থাকে না সবার চৌহদ্দিতে। 

পথের ধারে ঘুমিয়ে রাত কাটে যার
তার কাছে পেলব বিছানা অর্থহীন, অচেনা
আমাদের আকাঙ্ক্ষাও আজ স্মৃতির হরিণ।

কবি বকুল  আশরাফ এর কবিতা





যদি ভালোবাসো 
বকুল  আশরাফ

অপেক্ষায় থাকো বলেই তো ফোনটা ধরো,
আমি তো অপেক্ষায় জড়োসড়ো জুবুথুবু
কাঁথার ভেতর লুকাতে গিয়ে ভিন্নতরো
যেমন লুসাই পাহাড় লুকায় কিছু ঝর্না জল
যে জল বাধাহীন অকুতোভয় ছুটে চলে
মিশে যায় আরো কঠিন কোমল জলে
যেখানে সাগর আর নুনের ঢেউহীন লড়াই,
এ কেমন প্রেমের বড়াই বারবার ধেয়ে আসে
আর মিশে থাকে দুজনার চারপাশে।
ওরা কি সত্যি ভালোবাসে নিমের ডাল!
আয়ুর্বেদ জঞ্জাল যতো আবেগহীন করুণা
আমরা সুনীল-বরুনা যে তিন যুগ অভিমানে
তিনটি বরষ একসাথে কত আয়োজনে
এখন অধিক ভুল করি ! আসলে কি গড়ি !
নাকি নিজেকে ভাঙ্গি আর পোড়াই
শুধু জানি পোড়ালেই ধাতব আর মাটি
শর্তহীনভাবে শংকর নয় হয়ে উঠে খাঁটি
তাইতো ভালবাসার পথ ধরে এখনো পথ হাঁটি।

কবি রাজ রিডার এর কবিতা





চিঠি
রাজ রিডার

চিঠি! চিঠি! চিঠি!
এই অবেলায় ডাক পিয়ন—তাও এই যুগে। আশ্চর্য! 
ভুলে এসেছে নাকি? পিয়নটাও নতুন কেউ মনে হয়। 
আগেরটা কি বেঁচে আছে—তাও জানি না। 
আছে হয়তো। অবসরে গেছে। 
আর সে চিঠি, চিঠি বলে হাঁক দিতো না। 
খুব নরম সুরে বলতো—প্রিয়জনের বার্তা এসেছে
বাহ কি সুন্দর অভিব্যক্তি—প্রিয়জনের বার্তা।
চিঠি! চিঠি! চিঠি!
নিচে মনে হয় কেউ নেই। তাই দরজাটা খুলে দিচ্ছে না। 
নামতেই হবে হয়তো। চশমাটা কই রাখলাম? 
“এত ভুলো মনের না তুমি। তোমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না।“
তুমি দেখো একদিন কিছু না কিছু করবোই। 
“যদি কিছু করতে পারো একটা চিঠি অবশ্যই লিখবো তোমাকে।“
আরেহ মাথাতেই তো আছে। চোখের সাথে সাথে 
মাথাটাও গেল মনে হয়। যেতেই পারে। একই সাথে দুজনের জন্ম। 
মচ! মচ! মচ!
হাড়ের মতো চটি জোড়াও শব্দ করছে। 
“এই নাও নতুন চটি। অন্য কোন স্যান্ডেল নিবো ভাবছিলাম।
কিন্তু তোমার ইমেজের সাথে এই জোড়াই মানায়।“
এসবের কি দরকার ছিলো। এটাই তো বেশ রয়েছে।
“বলেছে তোমাকে। আর এই নাও ডায়েরি। আমাকে নিয়ে
কবিতা লিখো।“
তোমাকে নিয়েই তো লিখি। তুমিই তো আমার মিউজ।
তোমাকে চেতনা দিয়ে নিজেই অচেতন। 
“থাক। অনেক হয়েছে। আর বলতে হবে না।“
এসো কবিতা লিখি। 
“কবিতা! এখন? আমি থাকলে তোমার কবিতা হবে?”
 হবে। দীর্ঘ শ্বাসের সবচেয়ে বড় মহাকাব্য—পয়ারে পয়ারে। 
“কবে লিখেবে?”
আষাঢ়স্য প্রথমে দিবসে। 
“তবে আমিও চিঠি লিখবো পহেলা আষাঢ়ে।“
ছাতাটা যে কই আছে? বৃষ্টি হচ্ছে গত দুই দিন ধরে। 
সুবোল যে সব কোথায় রাখে? আর আজ বাজারে যেয়ে
হতচ্ছাড়া মরে গেছে মনে হয়। 
এই তো! পেয়েছি। 
“তা তো পাবেই। যখনই চেয়েছো তখনই পেয়েছো।
কবে আবার বাধা দিয়েছি আমি।“
অভিমানে ঠাঁসা—এমনকি শরীরের প্রতিটা বাঁধনও।
চৈতন্যের আলোক যাত্রায় বাধা দেয়। 
আজ যেন সিঁড়িটা শেষ হতেই চায় না। 
যেন সসীম থেকে অসীমে যাত্রা করছি। 
—বাবু, আপনার চিঠি এসেছে। 
দাও।
—এখানে একটি সই দেন। 
আচ্ছা, শোন ভাই এখন যাস না। অনেক বৃষ্টি হচ্ছে। 
আর সময় থাকলে একটু চাও খেয়ে যাস। নিচের ঘরে একটু বোস। 
—জি আচ্ছা, দাদা। 
-দাদা, আজ যা বৃষ্টি হচ্ছে না! 
একটু পর পর কী বাজ পড়ছে রে বাবা। 
মরেই যাবো মনে হচ্ছিল। 
আজ কী কিনলি রে? পেলি কিছু ভাল। না ঝড় বৃষ্টি দেখে পালিয়ে এলি। 
-না দাদা। চিংড়ি কিনেছি। আর কিছু তরি তরকারিও।
বেশ। আর ওকে একটু চা খেতে দিস। কর্তব্যপরায়ণ ছেলে।
বড় ভাল লাগলো ওকে দেখে। 
পরিচয়কে ছাপিয়ে যেয়ে যে পরিচয় হয়
তেমনই পরিচিত এই হাতের লেখা। 
“হাতের লেখা তো নই, যেন টাইপ।“
বাবার হাতে শিখেছি জানো। আমার মায়ের
হাতের লেখাও অনেক সুন্দর ছিলো। তবে তোমারটার এই অবস্থা কেন?
“কত মার খেয়েছি, জানো। শুধু হাতের লেখা খারাপ বলে পরীক্ষায়
নম্বরও কম পেতাম।“
আমার সাথে আগে দেখা হলে ঠিক শিখিয়ে দিতাম।
“হুম বলেছে। শিখাতে; তবে অন্য কিছু।“ 
সুবোল, একটু উপরে আয়। 
-দাদা।
ছেলেটা আছে, না চলে গেছে রে? 
-চা-বিস্কুট খাচ্ছে, দাদা। 
এই ঠিকানায় এই ডায়েরিটা পার্সেল করে দিতে বলিস ওকে।
আর কত কি লাগবে দিয়ে দিস। 

“বলেছিলাম লিখবো। মনে আছে তোমার? বহু বছর পর তোমাকে দেখলাম। চায়লেই সম্ভব ছিলো। ইচ্ছে করেই তোমার ছবির মুখোমুখি হইনি, জানো? কিন্তু এই কদিন এত পত্রিকায় আর টিভিতে এসেছো—না দেখে উপায় ছিলো না। শেষ পর্যন্ত এত বড় পুরষ্কারটা পেয়েই গেলে তুমি।“
ঠিকই বলেছো। হারিয়ে সব পেয়েছি।

১৬ মার্চ ২০২২

কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন এর কবিতা




ফুল না ফুটলে কিসের বসন্ত
রেজাউদ্দিন স্টালিন 

ফুল না ফুটলে কিসের বসন্ত 
ফুল ফুটবে
স্তব্ধতার পাতায় দুলবে  সবুজ হাওয়া
কবির অবাধ্য অক্ষরে দিগ্বিদিকের পাল
কোকিল না ডাকলে কিসের বসন্ত
প্রতীক্ষার প্রাণে সাদা মেঘের গুঞ্জন 
হলুদ রাত্রি ফেটে পড়বে পৃথিবীর মুখের ওপর 
নদী এবং সমুদ্র কথা বলবে কানে কানে
চিরবন্ধ্যা জমির ফাটলে জন্ম হবে চাঁদের 
নগরে বন্দরে স্বপ্ন ফেরি করবে মৌমাছিরা
যুদ্ধরত সন্তানের জন্য মায়ের অপ্রতিহত আশীর্বাদ 
তিতুমীরদের প্রতিরোধ যাত্রা শ্বেত শহরে
বিরহে শেয়ার বাজার আর তার ডলার কন্যারা কাঁদুক
ক্রিকেটের কোলাহল আটকে থাক
মোরগবেলায়

পাঠশালার বেঞ্চে কৃষ্ণচূড়া না ফুটলে
কিসের বসন্ত
শিশুর চোখে আত্মাহুতি দিক
বোমারু বিমান

অমঙ্গলের বিপরীতে  প্রতিটি প্রার্থনা সুন্দর 
হত্যার বিরুদ্ধে সব  আর্তনাদ  কবিতা

আগুনের ফুল না ফুটলে  কিসের বসন্ত