১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১

সানি সরকার


কুহক যখন তোমাকে গ্রাস করছে তোমার অজান্তেই 



ভোরের গোধূলিকে বলো, ভালো আছ? 

ভোরের গোধূলি জানে, প্রতিটি মুহূর্ত… 

কেন যে ভুলে যাও 

শুধু ভালো থাকার জন্যে ভালো থাকা না! 


এই যে দশ দিক তার চারপাশে 

তুমি যে সেখান থেকে অসংখ্যবার গন্ধ নিচ্ছ 

এবং মনে করছ, বুকের ভেতরের পাখিটি বুঝি মুক্ত হয়ে গেল… 

কিন্তু না! 


যে বৃক্ষের নিচে শ্বাস নিচ্ছ ইদানীং 

যে যে বৃক্ষ তোমাকে পথের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ দিল 

তাঁরা হাসলেন খুব, না প্রাণ না, 

মনে মনে হাততালি দিতে দিতেই 

ক'য়েক পাক চক্কর কেটে নিলেন দ্রুত-ই 

কারণ নির্মাণ সফল হয়েছে  


আমি তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ, কারণ 

ওঁরা একেকজন সফল চলচ্চিত্র নির্মাতা… 

একজন মানুষকে প্রতিটি ক্রিয়েটর 

কখনও রাক্ষস কিংবা ঝোলার বেড়াল বানাতে পারেন 

এখানে মনে রাখা উচিৎ, ওঁর কাজই হল নির্মাণ করা 

তা মিথ্যে হোক বা সত্যি 


এখানে বলে রাখা ভালো, যদি সিনেমার ভাষায় দ্যাখো, তবে 

এই জগৎ-সংসারে পর্দার আড়ালের মানুষটিকে কেউ চেনেন না 

ওঁরা ইচ্ছে মতো প্রতিটি চরিত্রের একেকটি নাম 

            ও ট্যাটু এঁকে দেন 


এইখানে তুমি যদি সাধক-শিল্পীটি হও 

যে কোনও গন্ধ শোঁকার পরে একশ আটবার না  

সত্যি ও মিথ্যের জ্যামিতিটি সমাধান করতে 

ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে সচেতনভাবে তুমি মাত্র ষাট পাক ঘুরবে 


এখন তোমার সামনে শান্ত-স্থির কেদারা ও বিজ্ঞাপনের হাতছানি 

এবার তোমার নাভিকুণ্ডলীর কাছে জিজ্ঞেস করো, 

আসলে তুমি কেমন আছ এবং ভবিষ্যতে কেমন থাকতে চাইছ 

কারণ ভোরের গোধূলির কাছে কখনও মিথ্যে বলতে নেই 

একজন সত্যিকারের মানুষ, নিজেকে কখনও 

মিথ্যে করেও মিথ্যে বলতে পারেন না


সালমা খান


নাগেশ্বর বৃক্ষ 


পুরোনো দীঘির জলে কবে কার নাগেশ্বর বৃক্ষ ছায়া দেখে তার প্রিয় হারানো,

আমারি মতো সেও ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে প্রতিক্ষার পথ চেয়ে ।

অদূরে হয়ে ফিরছে এই যে পথ,

আরো শতবর্ষ ছিলো হেঁটে যাবার,

ধীরলয়ে যেমন হেঁটে যাবার

ভেবেছি একদিন তোমার হাতপাশে আমারি হাত রেখে ছন্দবদ্ধ হবে সকল বৈরাগ্যপনা ,

সে স্বপ্নাতুর অভিলাষ ফিকে হয়ে গেলে আমার আর ভালো লাগে না।

ডাক দিয়েছি,তুমি পৌঁছে গেছো মৌনি ধাপে

আমিও হালকা ওমের মতো চৌহদ্দি ছাড়লাম,

নেমে গেলাম জলের মতো।

 পথে পথে শামুকের খোল,পাথরের তীক্ষ্ণ ঢেলা বুঝতে কি পারো ,

ঢালুর অংশের আধভাঙা ফাটলে প্রত্নজীব শ্যাওলা?

পুজো নিয়ে তোমার মোহগ্রস্ত ঘুম এখনো ভাঙেনি

ভাবছো আমজনতা খেয়ে নেবে সংক্রামিত প্রসাদ বাতিল নিরামিষের গরাস!

রোজ সকালে আয়না তুলে ধরি মুখ ,

স্মৃতির কৌটা খুলে কপালে আঁকি লাল বৃত্তের সুখ।

কি নিদারুণ ভাবে আমার সিঁথির সিঁদুরে টকটকে রোদ্দুর গুড়ো

লেপ্টে দিলে যা আমার কপাল বেয়ে 

নেমে এলো মৃত্যু ,

আমি মৃত্যুর জন্য নৈশব্দিক একটা কবিতা লিখবো।

এক লক্ষ জোনাকির নিমন্ত্রণ দেবো সেদিন

ঝিঝি  পোকারা গুনগুন করে গান ধরবে মৃত্যুর সময় 

ঝিরি ঝিরি বাতাস বইতে থাকবে,

ক্রন্দন ভরা বাতাসের তীব্রতায় চুলগুলো এলোমেলো হয়ে মুখে ছড়িয়ে পড়বে

হলুদ শাড়ি পড়ে থাকবো সেদিন

কপালে টিপ আঁকবো,কাজল দেবো গাঢ় করে,যখন চোখ দুটো চিরতরে বন্ধ  হয়ে যাবে।

জলের কাছে নিমন্ত্রণ পাঠাবো ,

জলের ফোঁটায় সারা মুখে ছড়িয়ে পড়বে।

তখন কান্নার শব্দকে দেব ছুটি

অন্ধকার রাত ব্যাথিত হয়ে দেখবে আমার শেষযাত্রা।

সীমাহীন রুপান্তর তুমি

মালবিকার চোখে চোখ পড়ে না।

তুমি অন্ধ পথে থৈ থৈ, 

চোখ আছে তবুও চোখের মনি নেই।

মাসুদ করিম


চঞ্চল হরিনী


সেই মেয়েটি থাকে সদা

হাঁসি খুসি মনে,

সারা পাড়া মাতিয়ে রাখে

সোহাগ ভরা মনে।

পাড়ার সবাই দশ্যি বলে

যেন চঞ্চল হরিনী,

দুষ্টমিতে বেজায় পটু তবুও

সবারি আদরিনী।

মা বলেন ডেকে খুকি সোনা

এবার ঘরে আয়,

মায়ের পানে মুখ বাঁকিয়ে দুষ্ট

মেয়ে দৌড়ে পালায়।

সারা বেলা দৌড়ে বেড়ায় খুকি

চঞ্চল হরিনীর মত,

আমের ঢালে জামের ঢালে

করে দুষ্টমি আছে যত।

বাবা ডেকে বলেন মাগো নেমে

এবার বাড়ি যাও,

খুকী এবার দুষ্টমিতে বায়না ধরে

বাবা আমটি পেড়ে দাও।

বাবা হেসে বলেন মাগো এবার বেলা হলো শেষ,

খুকী এবার মুখ ঘুরিয়ে বসল বেঁকে

রাগ করেছে বেশ।


গোলাম কিবরিয়া ( শরীফ)


দেহ


পড়ন্ত বিকেলে রৌদ্রের বুকে 

ঘুমিয়ে পড়িছে দেহ,

অনামিকা নড়ে, স্মৃতি মনে পড়ে-

বাঁচাবে আমারে কেহ? 


দৃশ্যপট 


বৃদ্ধ আসিলো জমির অফিসে -

সাথে আছে ওয়ারিশ, 

ভাগ বাটোয়ারা, হয়ে গেছে সব,

স্বাক্ষরে কুর্নিশ। 


সকলের মুখে প্রাপ্তির হাসি -

আশার মশাল জ্বলে, 

বৃদ্ধের মুখে বিদায়ের গান -

হৃদয়ে স্মৃতির থলে। 


জমি আপনার? নাম কি যে তবে? 

দিয়াছেন সজ্ঞানে? 

সাব রেজিস্ট্রার - পরখ করিতে, 

তাকায় তাহার পানে। 


আরে সাহেব -


জমিতো আমার , ভাবিতে ভাবিতে -

জীবন করেছি পার ;

জীবনের কূলে এসে দেখি আজ -

নেই সাথে কিছু আর। 


স্বাক্ষর হলো, টিপসই ও দিলো, 

লুকায় চোখের জ্বলে, 

"আজ থেকে আর, রইলো না তার  -

কিছুই নিজের বলে। "


যাক বাঁচা গেলো, মনে মনে ভাবে -

তুষ্টিতে থাক সবে, 

এখন তো আর বলবেনা কেউ -

"বাবা" যে মরবে কবে? 


বছর দুয়েক পর -


বাবার হইলো ভীষন অসুখ -

সারিবেনা কোনও ভাবে ;

ডাক্তার বলে, বিদেশ গমনে -

বোধ হয় কাজ হবে। 


এই বার সবে, চোখাচোখি করে, 

এই ক্ষনে কি যে করে ! 

"তাহার তো ঢের হয়েছে বয়স -

এমনিতে যাবে মরে। "


"বিদেশ যাইতে প্রচুর খরচ -

জমি বেচে দেব পুরো? 

কি লাভ আছে! যতদিন বাঁচে -

বাড়িতে থাকুক বুড়ো। "


অবশেষে বাবা বুঝিতে পারিলো -

চোখে  ক্লান্তির ছোঁয়া, 

তবু দুই হাত, তুলে সারা রাত ;

করিলো সবারে দোয়া। 


মুয়াজ্জিনের  মধুর ধ্বনিতে 

প্রতিদিন বাবা জাগে, 

আজ তো জাগেনি বাবার দেহটা, 

নিথর হয়েছে আাগে। 


গোধুলিতে এসে  হিসেব  মিলায় -

দুপুরের রোদে কত কষ্ট ;

এখানেই জিতে গেলো বসুধার রং, 

শেষমেষ আঁধার প্রকোষ্ঠ।


সাহানারা সেখ(টুম্পা)


সম্পর্ক 


এ রমণী কোন রমণী?

নিজেকে জননী বলে,করে দাবি!

অন্য স্বামীতে আসক্ত হয়ে,

অবৈধ সম্পর্কে করে মাতামাতি।

ধিক্কার দি সেই তনয়কে ও

যে অন্নের ভেলাতে ভাসে।

এমন করে এই সংসারে

নাশহীন হয়ে নেমে আসে।

ক্ষমার যোগ্য নয়তো তারা

সমাজ কুলসিত করার কারিগর।

চক্ষুর ওই কালো পর্দা অন্নে খোলার চেয়ে 

নিজে খুলে ফ‍্যাল।

অন্ধকার সংসার থেকে,আলোর জগতে বিরাজ কর।


এস, আলম


কাশফুলে  স্মৃতি দোলে 


    কাশফুলে আজ হারিয়ে যাবো
    থাকবে না আর ছায়া, 
    কাঁদিসনে কেউ আমার ব্যথায় 
    রাখবে স্মৃতির মায়া । 

    আসবো আবার শরৎ এলে  
    যৌবনা কাশফুলে, 
    দেখবে সেথায় মেঘের ভেলায় 
    মনের আগল খুলে । 

    আসবে সুজন দেখবে স্বজন 
    নদীর কূলে গেলে, 
    বেতাল স্রোতে ভাসিয়ে যাবো 
    দেখিবে দুচোখ মেলে । 

    আমায় ক'জন করবে সোহাগ 
    ভালোবাসার সাথে, 
    ক'জন আবার মায়ায় বেঁধে 
    রাখবে প্রেমের হাতে । 

    দেখবে যখন কাঁদবে গগন 
    করবে স্মৃতি স্মরণ, 
    শরতকালে বদল দিনে 
    আবার হবে মরণ । 


 

১২ সেপ্টেম্বর ২০২১

দুর্গাদাস মিদ্যা


 


আবার কবিতা 


কবিতার কথা যতবার ভাবি ততবার  শব্দেরা ছুটি পেতে চায়। 

মাঝে  মাঝে মুষড়ে পড়ে হতাশায়। 

 দিন নেই রাত নেই 

এখন তখন নেই 

কবিরা শব্দ নিয়ে কাটা  ছেঁড়া করে

তারপর কবিতা রচনায় বাহবা কুড়ায়। 

পালা পার্বণ নেই 

 সময় অসময় নেই 

সাদা পাতা শুধু ভরায় আমাদের রক্ত মাংসে

ভালো কবিতা লেখা হলে

 কবির পকেটে সম্মান উঠে আসে। 

আইরিন মনীষা


অসময়ে এলে তুমি


দুই যুগ পরে কেন এলে তুমি
জবাব কি দিবে তুমি আমার জানা নেই,
অসময়ের এক সারথী হয়ে ঝরাপাতার কাছে তুমি
কেনই বা আসলে বৃষ্টি ভেজা এই সন্ধ্যা গগনে? 

আমার সমস্ত আশা আকাঙখা দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে
গিয়েছিলে ফিরে তুমি একদিন এমনই এক সন্ধ্যায়,
আমার স্বপ্ন গুলো ভেঙে খান খান হয়েছিলো
প্রচণ্ড বেগে ঢেউয়ের তাণ্ডব বয়ে গিয়েছিলো সুকুমার মনে। 

অনেকদিন পক্ষাঘাত গ্রস্থ হয়ে পড়েছিলাম বিছানায়
অশ্রু গড়িয়ে পড়তে পড়তে এক সময় দৃষ্টি শক্তি হারিয়ে ফেলি,
খাওয়া দাওয়া ভুলে গিয়েছিলাম বলে শরীরটাও জীর্ণ শীর্ণ 
এক বিষাক্ত অতীতের সাক্ষী হয়ে এখনো বেঁচে আছি।

তুমি তো ঘর সংসার সবই করলে মনের খেয়ালে
আর সুখেই ত ছিলে আমি যতটুকু জেনেছি, 
কিন্তু আজ হঠাৎ কি মনে হলো তোমার 
আমার কাছে চলে এলে উদভ্রান্তের মত হয়ে?

তবে কি তুমি অনুশোচনার অনলে পুড়ে ছারখার হয়ে 
আমার কাছে শুধু ক্ষমা প্রার্থনা করতে এসেছো??
তা বেশ তাও দিলান তোমাকে কারণ এর,চেয়ে বেশি কিছু নেই
যা আমি তোমাকে দিয়ে একটু প্রশান্তির ছোঁয়া দিতে পারব।

কোথায় ছিলো তোমার প্রতিশ্রুতি সেদিন 
যেদিন আমার স্বপ্ন সাধ ধূলিস্যাৎ করে চলে গিয়েছিলে? 
তাইতো হয়নি আমার আর সংসার দুটা আত্মার মিলনে
তবে হ্যাঁ এখন এতিমদের নিয়ে ভালোই আছি আমি আমার মতই।


 

মমতা রায়চৌধুরী'র গল্প "আলো"




আলো


                    ষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী নিযুক্তা বরাবরই চুপচাপ স্বভাবের। কারো সাথে কোন কথা বলে না। শ্রেণী শিক্ষিকা রেজিনা বেশ কিছুদিন ধরেই নজর রাখছেন। অনেক কথা বলানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু একদম চুপ। একদিন ক্লাস শেষে মেয়েটিকে ডেকে অনেকক্ষণ মাথায় হাত দিয়ে আদর করলেন। আর বললেন -'আজকে কি দিয়ে ভাত খেয়ে এসে ছিলে ?মা ভালো রান্না করেছিল? মেয়েটি এই কথা শুনে চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে আর হাউ হাউ করে কেঁদে ওঠে।  রেজিনা আরো কাছে টেনে নেন। তখন সে বলে 'আমার মা নেই। বাড়িতে সৎ মা। ঠিকমতো খেয়ে আসতে পারি না।' তখন দিদিমণি বললেন-' মিড ডে মিল খাচ্ছ তো'? ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানায়।ওই টুকুই আমার পেটে থাকে।। বাড়িতে গিয়ে কি করো? সমস্ত কাজ আমাকে দিয়ে করানো হয়। আমার একটা ছোট ভাই আছে ,।তাই যেটুকু মা খাবার দেন ওটুকু আমার ভাইকেই আমি দিয়ে দি। এজন্য আমি পড়া করে আসতে পারি না দিদিমণি। কিন্তু আমার ইচ্ছে হয় আমি সবকিছুতে অংশগ্রহণ করি। আমি আঁকতে খুব পছন্দ করি। রেজিনা জিজ্ঞেস করেন-
                      
                                    'তুমি আঁকতে পারো।' আপনি। দেখবেন? দেখি দেখি। রেজিনা অবাক হয়ে যায় ।এ তো রেজিনার ছবি। তুমি এতো ভালো আঁক। তুমি কি কারোর কাছে আঁকা শিখতে?ছোটবেলায় মা শিখিয়েছিলেন কিন্তু এখন আর আঁকার কোন জিনিস হাতের কাছে নেই আর সময়ও পাইনা। ঠিক আছে শোনো এবার স্কুলে কোন আঁকার প্রতিযোগিতা হলে তাতে তুমি দেবে। কিন্তু দিদিমণি ওদের সাথে তো আমি অত ভালো করে আঁকতে পারবো না, তুমি যা পারো তাই আঁকবে। মেয়েটি খুব উৎসাহিত হয় ।এরপর আস্তে আস্তে মেয়েটির লেখাপড়ায়  মনোযোগী হয় আর ছুটি শেষে দিদিমণির সঙ্গে তার সমস্ত কথা শেয়ার করে। দেখতে দেখতে সমস্ত দেশ এক অতিমারি সংকটের মধ্যে পড়ে। ফলে স্কুল-কলেজ সমস্ত কিছু বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে রেজিনা নিযুক্তাকে নিয়ে ভাবতে বসে। কি খাচ্ছে মেয়েটি ,কে জানে ।এই মোচড় রোজিনাকে তিলে তিলে খায। সে আর ভাবতে পারে না। আজ যদি রেজিনার মেয়েটা বেঁচে থাকত তাহলে নিযুক্তার বয়সী হত। রেজিনার মরা গাঙে নতুন করে জোয়ার আসে।এ কদিনেই মেয়ে টি রেজিনার মনে অনেক গভীরে জায়গা করে নিয়েছে। তাই তার কাছে যে ক্লাস রেজিস্টার এর খাতার কপি ছিল তা খুলে বসে। কিন্তু রেজিনা দেখে তাতে রোল নম্বর আছে কিন্তু কোন ফোন নম্বর নেই। আরেকটু নেড়েচেড়ে দেখেন ঠিকানা আছে।
                             
                                রোজিনা একটু হতাশ হয় এই পরিস্থিতিতে ফোন নম্বরটা পেলে খুব ভালো হতো ।কিন্তু বাড়ি যাওয়া কি ঠিক হবে? মনের ভেতরে যে খচখচানি শুরু হয়েছে তাই সাতপাঁচ না ভেবে নিজেই স্কুটি করে তার বাড়ি পৌঁছে যান। সেখানে গিয়ে দেখেন মেয়েটি বাসন মাজছে আর মা দাওয়ায় বসে ভাত খাচ্ছে। ছোট ভাই নিযুক্তার পাশে বসে আছে। নিযুক্তার জন্য কিছু বিস্কিট ,ফল ,লজেন্স নিয়ে গেছিলেন। বাড়িতে দিদিমণি আসাতে ওর সৎ মা একটু অবাক হয়ে যায় এবং নিজের সাফাই গাইতে থাকে। তার নিজের প্রচন্ড জ্বর তাই মেয়েটি নিজের থেকেই বাসন মাজছে। রেজিনার বুঝতে কিছু বাকি থাকে না। কিন্তু রেজিনা  দিদিমণিকে দেখে নিযুক্তার মুখে এক অমলিন হাসি। সমস্ত অন্ধকার তার মুখ থেকে সরে যায়। সে দিদিমণিকে এসে জড়িয়ে ধরে। দিদিমণি বলেন " এ তোমার ভাই -বলেই তাকে কোলে তুলে নেন। তুমি লেখাপড়া ঠিকঠাক করছো তো? হ্যাঁ দিদিমনি। কিন্তু তোমার তো ফোন নেই ।তাই তুমি জানতেও পারছ না স্কুলের সমস্ত বিষয়।জান তো এবছর আমাদের একটা ভার্চুয়াল রবীন্দ্র জয়ন্তী উৎসব পালিত হচ্ছে। মানে ফোনেতেই তোমাদের সমস্ত অনুষ্ঠান হবে ।তাই যে যা পারে নিজের সাধ্যমত কবিগুরুকে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করবে। আর তুমি তো আঁকো  ভালো । তাই তুমিও এতে অংশগ্রহণ করবে। দিদিমণি ,আমি কি করে ছবি পাঠাবো? ঠিক আছে তোমাদের বাড়িতে কি একটাও ফোন ..বলেই তার মায়ের দিকে তাকাল। হ্যাঁ ,আছে তো? আসলে স্কুলে দেয়া হয় নি। আমাকে দিয়ে দিন , আমি গ্রুপে এড করে দেবো। ওকে একটু একটু অনলাইনের ক্লাসগুলোতে ফোনটা দেবেন তারপরে নিয়ে নেবেন। ঠিক আছে দিদিমণি। রেজিনা এইটুকু আশ্বস্ত পেয়ে চলে যান। তারপর যথারীতি আসলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ তাতে তার আঁকা পাঠানো হয়। স্কুলের তরফ থেকে যে গুলোকে বাছাই করা হয় এবংএফ বি তে পোস্ট করা হয়। কিন্তু তাতে নিযুক্তার  কোন ছবি সিলেক্ট হয় না। রেজিনা দিদিমণি আশাহত না হয়ে নিজের ফেসবুক একাউন্টে নিযুক্তার ছবি দিয়ে কবিগুরুর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন করলেন। আর ক্যাপশন করলেন রবির আলোয় সকলেই আলোকিত হোক । আলোকের এই ঝর্ণাধারায় ধুইয়ে দাও, মনের কোণের সব দীনতা মলিনতা ,ধুইয়ে দাও।'প্রথম দিন স্কুলের প্রোগ্রামের ছবি যখন এফ বি তে পোস্ট হয়। তাতে নিজের ছবি দেখতে না পেয়ে সে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে । নিযুক্তার  সৎ মা রেজিনা দিদিমণিকে ফোন করে এবং বলে তার মেয়ে আজ পাঁচদিন ধরে জ্বর, শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে। রেজিনা সঙ্গে সঙ্গে ছুটে যান নিযুক্তার বাড়িতে।  বাড়িতে নিযুক্তা দিদিমণিকে দেখে খুব খুশি হয় আর বলে সে আঁকতে পারে না , সে কিছুই করতে পারবে না কিন্তু রেজিনা ফেসবুকে যখন তার আঁকার ছবি দেখালেন। জ্বরের ঘোরে যেভাবে সে বক ছিল। নিজের হাতে আঁকা ছবি দেখে সে অত্যন্ত আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে। সে বলে আমি পারবো দিদিমণি আমিও কিছু করতে পারব তার দুচোখ বেয়ে জল ঝরতে থাকে। রেজিনা বলেন, ' তুমি খুব পারবে, তুমি অনেক বড় হবে"। আমি সেরে উঠব তো দিদিমণি, বলেই দিদিমণিকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। সে আসলে করোনা আক্রান্ত কিন্তু দিদিমণি নিজের দায়িত্বে নিযুক্তাকে হসপিটালে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করেন ,তার পাশে থাকেন এবং সে আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে ওঠে। তারপর সে বলে আপনি আমার কাছে গুরুমা আপনার আলো আমার জীবনে পড়েছে ,আমি আর অন্ধকারে থাকবো না। আমি খুব ভাল করে লেখাপড়া করব। তখন দিদিমণি বললেন ' আসলে আমাদের মনের অন্ধকার যিনি দূর করেন, আমাদের অন্তরে সর্বদা প্রজ্জ্বলিত রয়েছেন। তিনি হলেন ঈশ্বর আর আমাদের গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। উনি পথ দেখিয়েছেন। মনে রেখো শুধু লেখাপড়া করলেই হবে না ।একজন ভালো মানুষ তৈরি হতে গেলে ন্যায়পরাযণতা, সততা, সৎ চরিত্র গঠন,গুরুজনদের প্রতি শ্রদ্ধা, আর্তজনের সেবা এই সমস্ত নৈতিক গুণগুলো থাকতে হবে। তাহলেই তুমি প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠবে। তবেই তোমার ভেতরে প্রকৃত আলোর প্রকাশ ঘটবে। সেই স্বচ্ছ আলোতেই ঘুচে যাবে সমস্ত মনের কালিমা। নিযুক্তা এত ভারী ভারী কথা বুঝতে পারলো না বটে ,তবে সে বলল আমি পারবো দিদিমণি সেই আলোকে আলোকিত হতে। রেজিনা নিযুক্তাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠলেন -এ কান্না সুখের কান্না। রেজিনা জানেন বাস্তব কঠিন তাই নিজেকেও সংখ্যালঘু শিক্ষিকা বলে তাকে কম অপমানিত হতে হয়নি। কিন্তু সর্বদা আলোর দিশা দেখিয়েছেন ওই একজনই।

কংকা চৌধুরী ( ইংল্যান্ড )


 ইচ্ছেডানার ইচ্ছে


আমার ও খুব ইচ্ছে করে 

ইচ্ছে মতো কিছু লিখতে

লিখার ছলে পাঠকের কাছে

মনের না বলা কথা লিখতে।


আমার ও খুব ইচ্ছে করে

ইট - পাথরের দেয়াল ছেড়ে

সেই- স্নিগ্ধ গ্রামে চলে যেতে

ক্ষেতের আলপথে এলোপাথারি হাঁটতে।


আমার ও খুব ইচ্ছে করে 

কাল বোশেখির ঝড়ো হাওয়ায়

কাঁচা - পাকা আম কুড়াতে

মনের সুখে শৈশবের সাথীদের সাথে।


আমার ও খুব ইচ্ছে করে

বৃষ্টি ভেজা বিকেল বেলায় 

খোলা চুলে দখিনা বারান্দায়

গরম কফির আমেজে বসতে।


আমার ও খুব ইচ্ছে করে

গোধূলীর শেষে নীড়ে ফেরা 

রঙ বে রঙের পাখি হতে

দূর থেকে দূরে- উড়ে যেতে।


আমার ও খুব ইচ্ছে করে

জ্যোৎস্না ভরা চাঁদনী রাতে

নদীর জলে নাওে বসতে

চুপটি করে নদীর কথা শুনতে।


আমার ও খুব ইচ্ছে করে 

অদ্ভুত সব বায়না ধরতে

মনের যত কথা -যতন করে

ডাইরির পাতায় লিখে রাখতে।

এন,এন,মুন

 



ভালোবাসার আখ্যানলিপি


ওগো আমার গোপন প্রিয়ে
কোন লগ্নে হারালো হিয়ে।
স্বপ্নে আস, স্বপ্নে যাও
ধরা ছোঁয়ার বাইরে রও।
তুমি আমি অহর্নিশি 
অসীমতটে আছি মিশি।
লক্ষ চোখের অন্তরালে
আবীরছোঁয়া তেপান্তরে, 
এই যে তুমি, এই যে আমি
মুগ্ধনয়ন, নিস্বান যামী,
তোমার আমার রুদ্ধ বাণী
তুমিও জানো, আমিও জানি।
শুক্লাম্বরী তিথি জুড়ে
তুমি আমি সংগোপনে, 
নিতুই ভিড়াই সাঁঝ পেরুলে
অপেক্ষারই তরী খানি।
কৃষ্ণপক্ষের দিন গুলিতে
তোমার আমার হৃদয় ভাঙ্গে।
সেই তো আবার আশায় থাকি
আসবে কবে শুক্লাপক্ষী
 ফেলবে ছায়া হৃদয় পটে,
কইবো কথা মৌনব্রতে।
আমরা কি আর সত্যি জানি,
তোমার আমার ভাগ্যলিপি!
আমার বুকের নীলাম্বরে
তোমার শুভ্র ছায়া পড়ে,
মুখোমুখি তুমি আমি
মহাকালে মিশে আছি।


হা‌বিবুর রহমান হা‌বিব


আ‌লিঙ্গন


নদী ও নারীর অবাধ যৌনতা,

ঝি‌রি ঝি‌রি বৃ‌ষ্টি‌তে মিল‌নের আ‌লিঙ্গন।

মাছ ধরা নৌকা গু‌লো তখন বহু দূর ,

জ‌লের নী‌চে প্রবাল,

সে এক বি‌চিত্র রঙ্গীন মিলন মেলা।

নিশাচর পা‌খিরা উ‌ড়ে বেড়ায়,

জোৎস্না  অথবা অন্ধকার আকা‌শে।

চৈ‌ত্রের খরদ্বা‌হে পিপাসার্থ চাতক পা‌খি।

ব‌্যার্থ মিল‌নের কু‌মি‌ড়ের কান্না,

অবাস্তব স্বপ্ন গু‌লো ব‌য়ে চ‌লে,

খর‌স্রোতা বহতা নদীর মা‌ঝে।

শি‌শির পরা ঘা‌সে প্রজাপ‌তি,

নবরা‌গে উদ্ভা‌সিত পরাগ রেনু‌তে,

বাতা‌সে পরাগ শি‌শির ভেজা,

প্রজাপ‌তি মিল‌নের কথা ব‌লে ।


১১ সেপ্টেম্বর ২০২১

মোঃ হা‌বিবুর রহমান এর লেখা ''সহধ‌র্মিণীর হুঁ‌শিয়ারী বার্তা'' (৩য় পর্ব)

ঘরের ভিতর থেকে কবি ধরেছেন দৃশ্যকথা গদ্যের ভাষায় ধারাবাহিক ভাবেই প্রকাশিত হয়ে চলেছে তাঁর অসাধারন সৃষ্টি। লিখতে সহোযোগিতা করুন লাইক ও কমেন্ট করে । পত্রিকার পক্ষ থেকে সকল পাঠক পাঠিকা লেখক লেখিকা সকলের জন্য রইলো অনন্ত শুভেচ্ছা



সহধ‌র্মিণীর হুঁ‌শিয়ারী বার্তা 
(য় পর্ব)


রবীন্দ্রবলয়ের জা‌লে আট‌কে পড়ার ভয় এখন অ‌নেকটাই কা‌টি‌য়ে উ‌ঠে‌ছি। তাই প্রতি‌দিনই দুএক কলম কিছু না কিছু লেখার চেষ্টা ক‌রে যা‌চ্ছি। কোন কোন দিন কোন বিষয় বস্তু নির্বাচন না ক‌রেই লিখ‌তে শুরু ক‌রে দেই। আবার কোন কোন দিন ই‌চ্ছেমত যে‌কোন এক‌টি বিষয়‌ বা নি‌র্দিষ্ট একটা শব্দ‌কে পুঁ‌জি ক‌রেই লেখা শুরু ক‌রি। 

সহধ‌র্মিণী আমার প্রতি‌টি লেখার বি‌শ্লেষণ ও মূল‌্যায়ন ক‌রতঃ খাবার টে‌বি‌লে তাঁর মূল‌্যবান মন্তব‌্য আওড়াতে কোন‌দিনই ভু‌লেন না। এভা‌বেই লেখনীর কাজ‌টি এ‌গি‌য়ে চ‌লে‌ছে। অন‌্যদি‌কে শুভাকাঙ্খীগণ ও আপনজন ছাড়াও ‌প্রিয় ফেইসবুক বন্ধুরা আমা‌কে সদা উৎসা‌হ যু‌গি‌য়ে যা‌চ্ছেন ও অনুপ্রা‌ণিত ক‌রে চ‌লে‌ছেন তা‌দের অসাধারণ আর চমৎকার মন্তব‌্য আর মতামত জা‌নি‌য়ে।

ক‌্যা‌ডেট ক‌লে‌জে পড়াকালীন সম‌য়ে বন্ধু সাইদুলকে দে‌খে‌ছি এসএস‌সি বোর্ড পরীক্ষার সময়ও ক‌বিতা লিখ‌তে। অা‌মি দে‌খে অবাক হতাম তার এ দুঃসাহ‌সিকতা দে‌খে। মা‌ঝে মা‌ঝে ক্লাশ চলাকালীন সম‌য়ে তা‌কে দেখতাম অন‌্যমনস্ক হ‌য়ে শিক্ষ‌কের কথায় ম‌নো‌যোগ হা‌রি‌য়ে আ‌র্টিকেল লিখ‌তে। বন্ধু সাইদুল অত‌্যন্ত ভ‌াল মা‌পের একজন লেখক। বর্তমা‌নে সে কানাডায় থা‌কে এবং সেখান থে‌কেও নিয়‌মিত সা‌হিত‌্য চর্চা জারী রে‌খে‌ছে।

নিত‌্য সংঘ‌টিত জীবনধর্মী ও সামা‌জিক বিষয়া‌দির উপর লিখ‌তে আ‌মি স্বাচ্ছন্দ‌বোধ ক‌রি। সামা‌জিক রী‌তিনী‌তিতে ‌বি‌ভেদ, সদা দ্বন্দ্ব ও বৈষ‌্যমতাকে নি‌য়ে মানব দর্শনের দৃ‌ষ্টি‌তে সেগু‌লি‌কে লেখনীর মাধ‌্যমে তু‌লে ধর‌তে আনন্দবোধ ক‌রি।

ধর্মীয় আ‌ঙ্গি‌কেও কিছু বক্তব‌্য লেখনীর মাধ‌্যমে প্রকাশ করার চেষ্টা অব‌্যাহত আ‌ছে। যে লেখনী‌তে আ‌ছে দিক নি‌র্দেশনা, সমাজ গড়ার উপ‌দেশ, মানু‌ষের ম‌ধ্যে সামা‌জিক দূরত্ব ঘোচনার উপায় এমন শিক্ষামূলক ও উপ‌দেশধর্মী লেখনীর মাধ‌্যমে মানুষ‌কে উজ্জী‌বিত করার ল‌ক্ষ্যে এমন মহৎ কাজ‌টি কর‌তে নিঃস‌ন্দে‌হে খুবই ভাল লা‌গে আর দারুন আনন্দ‌বোধ ক‌রি। 

সহধ‌র্মিণী মা‌ঝে মা‌ঝেই আজও বেশ খোঁচা দি‌য়েই কথা ব‌লেন আমার লেখাকে কেন্দ্র ক‌রে। তি‌নি একজন অত‌্যন্ত ধর্মপরায়ণ নারী আর তাই ধর্মীয় আ‌ঙ্গি‌কে লেখা‌কে তি‌নি সদা অ‌ধিক প্রাধান‌্য দি‌য়ে থা‌কেন। মা‌ঝে মা‌ঝে তি‌নি মন্তব‌্য ক‌রে ব‌লে বসেন "তোমার এ লেখা প‌ড়ে কয়জন মানুষইবা সৎপ‌থে আস‌বে আর কয়জনইবা তোমার লেখার বক্তব‌্য অনুযায়ী উপ‌দেশ মে‌নে চ‌লে তদানুযায়ী জীবনিপাত কর‌বেন? সমা‌জের সিংহভাগ মানুষের যখন পদস্খলন ঘ‌টে‌ছে তখন তোমার এ লেখা দি‌য়ে কি পু‌রো সমাজ‌ তথা জা‌তি‌কে একাই ঠিক ক‌রে ফেলতে পার‌বে ? এমন অ‌নেক প্রশ্নবা‌নে তিনি প্রায়শই আমা‌কে কু‌পোকাত ক‌রে ফেল‌তে উদ‌্যত হন। আ‌মি তাঁ‌কে এই ব‌লে বুঝি‌য়ে তাৎক্ষ‌ণিকভা‌বে শান্ত ক‌রি যে, দে‌খো বিন্দু বিন্দু জলকণা মি‌লেই তো সাগর অত‌লের সৃ‌ষ্টি হয়।











ধারাবাহিক ৩য়  কিস্তি