১২ এপ্রিল ২০২২

শামীমা আহমেদ এর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৮৭




ধারাবাহিক উপন্যাস 


শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত (পর্ব ৮৭)
শামীমা আহমেদ 

শিহাব,তোমাকে আমি কথাগুলো ওভাবে বলতে চাইনি। আরাফের জন্য তখন আমার মাথা ঠিক ছিল না।আমার কথায় তুমি কিছু মনে করোনা।
শিহাব হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।কথাগুলো তার পেছন থেকে ভেসে আসলে শিহাব পিছন ফিরে তাকালো। পিছনে সুমাইয়া দাঁড়িয়ে। 
সুমাইয়া কখন এসেছে শিহাব তা টের পায়নি। শিহাব একটু বিরতি নিয়ে বললো,
না ভাবী, আমি কিছু মনে করিনি। তুমিতো ঠিকই বলেছো। আরাফের জন্য এখন মায়ের সান্নিধ্য ভীষণ প্রয়োজন। 
আচ্ছা শিহাব একটা কথা জানতে চাইতে পারি ? আবার অন্য কিছু ভেবোনা।
না না,, অবশ্যই জানতে চাইবে ভাবী।
সেদিন যে শায়লা মেয়েটিকে নিয়ে এলে,তা প্রায় দুইমাস হতে চললো। তার ব্যাপারে তুমি কি  সিদ্ধান্ত নিলে ?মেয়েটিকে তো ভালোই লাগলো। আরাফের সাথে খুব অল্প সময়ে বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। আমরা তো ভাবছিলাম তুমি সহসাই কিছু বলবে। 
শিহাব ভাবলো সব না হলেও কিছুটাতো ভাবীকে বলা যায়।
ভাবী শায়লার বিষয়টি নিয়ে আমি খুব জটিলতার মধ্যে আছি। যদিও শায়লার দিক থেকে আমার প্রতি পূর্ণ ভালোবাসা আছে।
কেন কি হয়েছে ? সে কি আর তোমার সাথে সম্পর্কে নেই ? নাকি তুমি বিবাহিত বলে  ওর পরিবার রাজী হচ্ছেনা? আমি কি কোন কথা বলবো ওদের সাথে ?
না না ভাবী, তার দরকার হবে না।
তাহলে কি দরকার আর জটিলতায় গিয়ে।এমনিতেই নানান ঝামেলা বয়ে গেছে তোমার জীবনে। এবার আমরা দেখে শুনে একজনকে আরাফের মা করে আনি।
শিহাব এর কোন উত্তর দিতে পারলো না।শায়লাও যে বিবাহিতা,আর  তা দেড় বছর  হয় বিয়ে হয়েছে। শায়লার বিয়ের পর তার সাথে পরিচয় সম্পর্ক, ঘনিষ্ঠতা  তা ভাবীকে  কিভাবে বলবে। সেতো  আজই চেয়েছিল শায়লাকে নিয়ে আসতে।শায়লাও রাজী ছিল কিন্তু আরাফের দূর্ঘটনা সব পালটে দিল। তাছাড়া আজই তার স্বামী কানাডা  থেকে দেশে  আসছে। দশদিন থাকবে, ফেরার সময় শায়লাকে তার সাথে করে নিয়ে যাবে। এমনও হতে পারে আজই আজীবনের জন্য শায়লার সাথে তার সম্পর্কের ইতি ঘটতে যাচ্ছে।যদিও শায়লা কে পাওয়ার জন্য সে সব রকম চেষ্টা করেও কোন কূল করতে পারছে না।তবে এইসব  কথা কিভাবে ভাবীকে বলবে। যদিও ভাবী খুবই আপনজন কিন্তু শায়্যলাকে নিয়ে তাদের মনে আশা জাগিয়ে কেমন করে সে স্বপ্ন ভঙ্গ করবে।
শিহাবের নীরবতায় সুমাইয়া বুঝে নিলো শিহাব আর শায়লা আরাফের বাবা মা হতে পারছে না। তবেতো রিশতিনাকে ফিরিয়ে দেয়া শিহাবের উচিত হয়নি।
তবে কেন রিশতিনাকে ফেরালে ? সুমাইয়ার কঠোর জিজ্ঞাসা।আরাফের সত্যিকারের মা তো রিশতিনাই। সেতো এসেছিল সন্তানের কাছে। তাকে তার সংসার ফিরিয়ে দিতে পারতে।
শিহাব  এবার বেশ স্পষ্টভাষী হলো। ভাবী,দয়া করে  রিশতিনার অংশটি ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করো। আরাফের জন্য মা দরকার আমি মা এনে দিলেইতো হয়।
এবার সুমাইয়া, একটু সাহস সঞ্চয় করে কথাটা বলেই ফেললো, তাহলে শিহাব আমার মামাতো বোন রুবিনা তোমাকে খুব পছন্দ করে।খবর দিলে সে এখুনি চলে আসবে। যদি তুমি তাকে গ্রহন করো। রুবিনা খুবই ভালো একটা মেয়ে।মাঝে মাঝেই আমাদের বাসায় আসে।সারাদিন আরাফের সাথে থাকে।ওর যত্ন নেয়। 
আরাফের জন্মের পর থেকে আজ অবধি ভাবীই আরাফকে আদর যত্নে বড় করছে। ভাবীর এমন চাওয়াকেতো তার সম্মান জানানো উচিত আর যেখানে আরাফের 
আজ এই অবস্থায় জ্ঞান ফিরলে সে মাকেই খুঁজবে।
ভাবী, শায়লার সাথে আমার একটা আন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়েছে।এখন হুট করে অন্য কাউকে বিয়ে করা সম্ভব না। সবদিক মেলাতে আমার আরেকটু সময় লাগবে।
শিহাবের কথায় সুমাইয়া বেশ হতাশ হয়ে কেবিনে ফিরে গেলো। 
শিহাব শায়লার কোন মেসেজ পাচ্ছে না। কি জানি কি হচ্ছে ওদিকে।শিহাব আর কিছু ভাবতে পারছে না। তার ভীষণ অসহায় লাগছে।প্রতিটি দিন সকাল হলেই সে ভাবে আজই শায়লা আমার কাছে চলে আসবে।আশায় আশায় বুক বেঁধে বারবার তা নিরাশায় ডুব দিচ্ছে।
কেবিন থেকে মা বেরিয়ে এলেন।শিহাব মায়ের দিকে এগিয়ে গেলো।  
বাবা, দুপুর হয়েছে। বাসা থাকে কিছু খেয়ে আয়। সুমাইয়া তো সকাল থেকে এখানেই।
বাসায় বুয়া সব রান্নাবান্না করেছে।যা, চারটা মুখে দিয়ে আয়।আরাফ এখনো ঘুমাচ্ছে। কখন যে জাগবে ?  জেগেইতো তোকে খুজবে।
তুমি কি খেয়েছো মা ? 
না, তা কেমন করে। আমি আর বৌমা তো এখানেই।বাসায় বাচ্চাগুলো মায়ের জন্য না খেয়ে আছে।
তাহলে বরং তোমরা বাসায় গিয়ে খেয়ে আবার আসো। আমি এখানে ক্যান্টিনে কিছু খেয়ে নিবো।
না তা কেন? বাসায় কত খাবার।আমি আর বৌমা গিয়ে তোর জন্য খাবার পাঠিয়ে দিচ্ছি।
না মা  শুধু ঝামেলা করোনা।
সুমাইয়া তৈরি  হয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে এলো। শিহাবকে উদ্দেশ্য করে বললো, আরাফ বেশ ঘুমাচ্ছে। ওর স্যালাইন চলছে।
আমি আর মা বাসায় যাচ্ছি। তোমার খাবার নিয়ে আবার আসছি। তুমি আরাফের কাছে ওর পাশেই থেকো।
মা আর সুমাইয়া বেরিয়ে  গেলো। শিহাব কেবিনে ঢুকে গেলো। আরাফের দিকে তাকাতেই অজান্তেই চোখ জলে ভরে গেলো। 
আহা,বাচ্চাটাকে রেখে আমি কিভাবে এতটা দুরে থাকি। 
ডাক্তার ভিজিটে এলেন। সব রকম রিপোর্ট দেখে জানালেন।নাহ, মাথের ভেতরে কোন ইনজুরি নেই। আজ রাতটা হস্পিটালে থাকুন।  ঘুম ভাঙলে বাচ্চার মা বাবা আপনারা কাছে থাকুন। বাচ্চা যেন উত্তেজিত না হয়।কাল দুপুর নাগাদ চলে যেতে পারবেন। নিয়মিত অষুধগুলো খাওয়াবেন। সেলাইটা আস্তে আস্তে শুকিয়ে যাবে। এক সপ্তাহ পর  আবার দেখিয়ে নিতে যাবেন।
ডাক্তারের কথায় শিহাব একটু নিশ্চিন্ত হলো।
সে চেয়ার নিয়ে আরাফের খুব কাছে বসে রইল। তার খেয়াল হলো, অনেকক্ষন শায়লার সাথে কথা হচ্ছে না।
সে শায়লাকে মেসেজ পাঠালো, কি করছো ?
তৎক্ষনাৎ শায়লার রিপ্লাই চলে এলো, এইতো সবাই এয়ারপোর্টে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে আছে,এক্ষুনি যাবে তাই দেখছি।
তুমি যাবে না অতিথিকে রিসিভ করতে ? 
তোমার কি মনে হচ্ছে? আমি যাবো ?
কি জানি শায়লা, আমি কিছু বুঝতে পারছিনা।তোমার ফেলে আমি কত দূরে চলে
এলাম।জানিনা তোমাকে ফিরে পাবো কিনা।
এভাবে বলো না শিহাব।আরাফ অসুস্থ। এখন ওর দিকে খেয়াল দাও। 
শায়লা আমি বোধহয় তোমায় হারিয়ে ফেলছি।
কখনোই না।কোনদিনই  না। আমি তোমার জন্য অপেক্ষায় থাকবো।
আচ্ছা রাখছি।কেউ এসেছে দরজায়।
আচ্ছা।ভালো থেকো।

শিহাব উঠে গিয়ে দরজা খুলতেই  ভীষণ  অবাক হলো! একজন  খুবই সুন্দরী মহিলা জানতে চাচ্ছেন,এটাই তো তিনশ চার ননবর কেবিন তাইনা ?
শিহাব বেশ  অবাক হলো? কে উনি? এই কেবিনে এলেন! 
আচ্ছা এখানে পেশেন্ট কি আরাফ, ছোট্ট শিশুটি ? 
শিহাবের আশ্চর্য  হওয়ার মাত্রা আরো বেড়ে গেলো!বললো,হ্যাঁ, আরাফ, আমার ছেলে।কিন্তু আপনি কে ?
আমি রুবিনা। আরাফের চাচী সুমাইয়ার মামাতো বোন। আমি প্রায়ই আরাফকে দেখতে আসি। ওর সাথে খেলা করি।কিন্তু আজ এসে শুনলাম আরাফ হসপিটালে। শুনেই তাই ছুটে এলাম ওকে দেখতে।
শিহাব এবার উনাকে চিনতে পারলেন।হ্যাঁ,তাইতো,অনেক আগে একবার ভাবীর বাসায় দেখা হয়ে ছিলো। ভাবীর অনেক ধনী বড় মামার একমাত্র মেয়ে। যার  জাকজমকপূর্ণ বিয়ের তিনদিন পর ডিভোর্স  হয়ে যায়। মেয়েটি খুব কোমল স্বভাবের।স্বামীর পরকীয়া সম্পর্ক মেনে নিতে পারেনি।আজ দুপুরে ভাবী যার কথা বলছিলেন।
রুবিনা হাতে খাবেরের ব্যাগ দেখিয়ে বললো,
আমি আরাফকে দেখতে আসবো  শুনে সুমাইয়া আপু আমার সাথে আপনার জন্য খাবার পাঠিয়ে দিলেন।
আপনি ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নিন।আমি আরাফের খেয়াল রাখছি।
শিহাবের বুঝতে কষ্ট  হলো না যে, ভাবী এটা ইচ্ছে করেই করেছে। যেন রুবিনার প্রতি শিহাব আগ্রহী হয়ে উঠে তারই চেষ্টা। 
এক কেবিনের ভেতর একজন অপরিচিত মহিলার সাথে সময় কাটাতে শিহাব ইতস্ততবোধ করছিল। শিহাব আড় চোখে  দেখেলো, রুবিনা তার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে।শিহাব বেশ অস্বস্তিবোধ করতে লাগলো।
আপনি ফ্রেশ হয়ে আসুন, আমি টেবিলে খাবার সাজিয়ে দিচ্ছি।
শিহাবের শায়লার কথা খু মনে হতে লাগলো।তবে কি শায়লাও এভাবে নোমান সাহেবকে খাবার সাজিয়ে দিচ্ছে ? 
আজ সকালে শায়লাকে  রেখে এসে সে বিরাট একটি ভুল করেছে। আর এজন্য সে নিজেকেই নিজে বারবার  ধিক্কার দিতে লাগলো।


চলবে....

কবি মোঃ শাহিনূর রহমান শাহীন এর কবিতা "আমি সৃষ্টির স্রষ্টা"




আমি সৃষ্টির স্রষ্টা
মোঃ শাহিনূর রহমান শাহীন 

আমি মৃত্যু -আমি জীবন দাতা,
আমি মূল -আমি সবার পিতা ? 
তোমরা সবাই আমার সন্তান, 
তোমাদের জন্যে আমার প্রেমের অনুভব -
তোমরা করেছ কী সত্যের সন্ধান ? 
আদম কে আমি করেছি সৃষ্টি, 
দিয়েছি জ্ঞান বিজ্ঞান সভ্যতা কৃষ্টি ! 
কত শিল্প - বিকল্প কত কী, 
এত পেয়ে আদম অবাধ্য - বন্য 
আমাকে দিতে চায় ধোঁকা ফাঁকি ? 
আমি সবার মাঝে - জীবন হয়ে, 
ক্কলবে বন্ধু কে সাথে নিয়ে ! 
প্রেমে বিভোর হয়ে - খেলি খেলা, 
আমি সত্য জাত আমি ছিফাত
বলো " লা ইলাহা ইল্লাল্লা! 
আমি সৃষ্টি করি আমি স্রষ্টা, 
আমি নতুন জীবনের স্বপ্ন ভ্রষ্টা! 
স্বীকার করো বা অস্বীকার, 
আমি জীবন মৃত্যু হয়ে -
দেহে জীবন্ত আছি সবার ?

কবি শরিফুর রহমান এর কবিতা "শরিফুর রহমান"




প্রয়োজন 
শরিফুর রহমান 

সত্যি বলছি; আমার চেয়ে
আমার প্রয়োজন গুলো তোমাকে
বড্ড ভালোবাসে।
তাঁরা তোমাকে আদর করে; বুকে টানে,
দু-হাত দিয়ে হৃদয় ছানে,
একটুখানি আড়াল হলে তুমি
অস্থির-চোখে জল আসে, 
ওঁরা... ওঁরা তোমাকে বড্ড ভালোবাসে।

আর; বাসবেই না কেন... বলো ?
আমার বুকের পাঁজরভাঙা
কষ্ট-পাথরগুলো-
ছড়ানো ছিটানো দুঃখগুলো-
না পাওয়ার শত-বেদনাগুলো-
কেমন করে বুকে তুলে আলতো ঝেড়ে 
গুছিয়ে রাখো নিপুণ ভাবে-
মিষ্টি হেসে যতন করে তোমার পাশে,
তাই তো ওঁরা তোমাকে; বড্ড ভালোবাসে।

প্রয়োজন গুলো আমার-
বৃত্তের মতো সাজিয়ে রেখেছে আমাকে, 
আমাকে ঘিরেই তো ওঁরা-
ওঁদের মাঝেই আমি।
তাহলে কি এই আমি টাই সবচেয়ে বেশি  
তোমাকে ভালোবাসি ?

১১ এপ্রিল ২০২২

মমতা রায় চৌধুরীর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৫০




লেখকের এই ধারাবাহিকতাকে কুর্নিশ জানাই । স্বপ্নসিঁড় সাহিত্য পত্রিকা'র পক্ষ হতে আপনাকে হার্দিক অভিনন্দন । ১৫০ তম দিন ।


উপন্যাস 


টানাপোড়েন ১৫০
টান
মমতা রায় চৌধুরী

রেখার হঠাৎ করেই ঘুম ভেঙে যায় কোনরকমে হাত ঘড়িটা হাতরে হাতরে নিয়ে টাইম টা দেখে সাড়ে চারটে বাজে । মনে মনে ভাবছে, মনোজকে কি ডাকবে? না ,ডেকেও কোন লাভ নেই। ওর ঘুম হচ্ছে কুম্ভ কর্ণের ঘুম। অসময়ের ডাকে আরো কাজের ব্যাঘাত ঘটবে। বরং ও একটু ঘুমোক তারপরে নয় ডাকব। এই বলে রেখাও পাশ ফিরে শুয়ে পড়ে। হঠাৎ কলিংবেলের আওয়াজ" জয় গনেশ, জয় গনেশ, জয় গনেশ দেবা।
রেখার কানে আওয়াজটা গেল কিন্তু গুরুত্ব দিলো না তারপর আবার কলিং বেল বেজে ওঠে, জয় গনেশ জয় গনেশ জয় গনেশ দেবা ।প্রথমে রেখা ভাবছিল স্বপ্ন দেখছে। পরে চোখ মেলে তাকিয়ে দেখে , কান খাড়া করে শুনছে, না এ তো বাস্তব স্বপ্ন নয়   ।এ বাবা মাসি এসে গেছে। কত বেলা হয়ে গেছে ।মনোজকে ধাক্কা দিয়ে দু চারটে কিল মেরে দিল। মনোজ তো বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল' কি করছো তুমি?'
"কি করছি মানে ?তোমার জন্য আজকে আমার দেরি হয়ে গেছে?'
'মানে?'
"মানে মাসি এসে গেছে, এখনো রেডি হতে পারলাম না। কখন যাবো বলো?'
"যাবে তো?'
" কোথায়?'
"মানে? তুমি সব ভুলে গেছো?'
"আমাকে ঘুমোতে দাও রেখা, কানের কাছে বাজ খাই গলায় এত চিৎকার করো না তো, ভালো লাগছে না বিরক্ত করো না। বলেই ভোস ভোস  করে নাক ডাকতে শুরু করল।
"আমি পাগল হয়ে যাবো তো লোকটাকে নিয়ে। এ বাবা নিজেই সব ভুলে গেছে। কি ,কোথায়, কখন কিভাবে যাবে?"
বকবক করতে করতে রেখা গিয়ে দরজাটা খুললো।
মাসি বলল" কিগো বৌমা? আজ দেরি করলে এতো?"
"আর বোলো না মাসি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।"
"তা বেশ করেছিলে।"
দরজাটা বন্ধ করতে করতে রেখা বললো" মাসি তুমি একটু তাড়াতাড়ি কাজগুলো সেরে নাও আজকে এক জায়গায় বেরোবো?"
'কোথায় যাবে?'
"আমার দেশের বাড়িতে কাকু কাকিমার কাছে।"
"ও তাই বুঝি যাও ঘুরে এসো।"
"কিন্তু..
"আর কিন্তু কিন্তু করো না তো তোমার বাচ্চাদের নিয়ে তো আর চিন্তা নেই, আমি আছি তো।'
"সে তো আমি জানি  মাসি ।'
" তাহলে আবার কিন্তু কিন্তু করছ কেন?'
"যার সাথে যাব তারই তো এখনো ঘুম ভাঙ্গলো না।"
"যাও গিয়ে তাড়াতাড়ি ছেলেকে তোলো।
"একটু সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ো।'
রেখাও খুব খুশি হল। মাসি নিজের থেকেই বলাতে রেখা চলে গেল নাচতে নাচতে মনোজের কাছে মনোজকে ডাকল "কিগো ওঠো, যাবে তো !না যাবে না?"
হুঁ
*মানে যাবে না?"
"কখন বললাম আমি?"
"তাহলে।"
"যাব তো।"
রেখা কথা না বাড়িয়ে তাড়াতাড়ি রান্না ঘরের দিকে ছোটে মাসির জন্য এবং নিজেদের জন্য চায়ের জল বসিয়ে দেয় অন্যদিকে ফ্রিজ থেকে ময়দা বের করে পরোটার লেচি কাটতে শুরু করে পরোটা বাজবে বলে  অন্যদিকে ক্যাপসিকাম আলু ভাজার সবজি কেটে নেয়। চা হয়ে গেলে মাসিকে ডেকে চা-বিস্কিট দেয়।
তারপর রেখা বলে 'মাসি তুমি পরোটা এখানে খাবে তো ?"
মাসির চা খেতে খেতে চুপ করে থাকে কোন জবাবই দেয় না।
রেখা সমস্তটা বুঝতে পারে মাসির সংসারে অভাব নিজের খাবারের ভাগটা যদি নাতি নাতনিদের দিতে পারে তাহলে অনেকটা সাশ্রয় হয় ।সেজন্যই কোন কথার উত্তর দেয়নি। রেখা বলল,' ঠিক আছে ।তুমি এখানে দুটো খাও আর দুটো নিয়ে যাবে।'
মাসিnখুব খুশি হলো ।তারপর বলল "আমি তাড়াতাড়ি কাজগুলো গুছিয়ে নিচ্ছি তারপর বাড়ি যাই ।'
রেখা বলল" হ্যাঁ বাড়িতে কি কি জিনিস আনার আছে সেটা নিয়ে চলে এসো।"
"মাসি বাচ্চাগুলোর খাবারটা একটু দিয়ে যাও না।"
মাসি বলল' হ্যাঁ  দাও আমি খাবারটা দিয়ে যাচ্ছি। 'তাহলে তুমি এদিকে তাড়াতাড়ি রেডি হতে পারবে।'
রেখা খুব খুশি হল এবং আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে শাড়ি পরে নিল।।
মনোজ ঘর থেকে বলল' তুমি রেডি হয়ে গেছো?'
রেখা বললো হ্যাঁ।
বলেই মনোজের কাছে  এসে দাঁড়ালো। 
মনোজ আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করে বলল' তুমি শাড়ি পড়ে যাবে?'
রেখা বলল' মানে? শাড়ি পড়েই তো যাব।:
"তুমি শাড়িটা খুলে সালোয়ার কামিজ করে নাও।"
"কেন?"
"আরে বাবা সালোয়ার কামিজ করে বাইকে গেলে সুবিধে বেশি।"
রেখা অভিযোগের সুরে বলে' তাহলে তুমি আগে বলনি কেন?"
"তুমি তো দেখতে পাচ্ছ কতটা ব্যস্ত থাকি।'
মনোজ রেখাকে কাছে ডেকে বলল" তোমাকে শাড়ি পড়ে খুব সুন্দর লাগে, এত সৌন্দর্য তুমি কাকে দেখাবে,।"
রেখা গাল ফুলিয়ে বলল" তার মানে আমাকে সালোয়ার কামিজের ভালো লাগেনা?*
"আমি আবার সেটা কখন বললাম।'
'ঠিক আছে ,ঠিক আছে ।আমি যাচ্ছি চেঞ্জ করে নিচ্ছি।"
* বৌমা আমি যাচ্ছি।'
রেখা বললো" হ্যাঁ, মাসি, যাচ্ছি বলতে নেই। এসো তাড়াতাড়ি এসো।'
মনোজ বলল'আমার চা টা দিয়ে যাও।,'
রেখা বললো "ফ্লাক্সে আছে একটু ঢেলে নাও না।"
চা খেয়ে মনোজ ওয়াশরুমে গেল।
এরমধ্যে আবার কলিং বেল বেজে উঠলো ।রেখা ,বললো "এখন আবার কে আসলো উফ কি জ্বালা।"
রেখা দরজা খুলতে গিয়ে দেখে মাসি
"ও মাসি তুমি এসে গেছ।"
মাসি যাও আমি রান্না ঘরে কিছু খাবার রাখা আছে আগে খেয়ে নাও। আর শোনো তরকারি করা আছে তুমি তোমার মত করে ভাত করে নিও কেমন।'
আর্ ঠিক সময়ে তুমি আমার ওই বাচ্চাদেরকে খেতে দিও ।ওদেরকেখেতে দেওয়ার পর দেখবে আরো কিছু বাচ্চা আসে ওপার ও পাড়া থেকে ওদেরকেও দিও।
ঠিক আছে
ওদেরকে কি বাইরে ছেড়ে দিয়েছো?
হ্যাঁ মাসি, ওরা আর ভিতরে থাকতে চাইছিল না।
শুধু শুধু আরও ভেতরে রেখে কি করব বাইরেটা থাকবে আর গ্যারেজের দরজাটা খোলা থাকবে সারাদিন ওখানে এসে শুতে পারবে।
ভালোই করেছো।
আসলে এতদিন রেখেছিলাম তো বাচ্চাগুলো নিরাপত্তার কথা ভেবে আর রাখা যাবে না।
তোমরা কখন বেরোবে তাড়াতাড়ি বেরোও।
হ্যাঁ মাসি।
মনোজ ঘর থেকে বলল আমার প্যান্ট জামাটা কোথায় রেখেছো?
দেখনা, বের করে নিতে পারো না একটু।
মনোজ ঘর থেকে বলল 'তুমি তো জানো…।!
"দেখো সোফার উপরে রেখেছি।'
রেখা মাসি কে বলল" মাসি ফ্রিজ থেকে ইলিশ মাছটা আছে ওটা প্যাকেট কর আমরা যাবার সময় আমাকে দেবে ওটা হাতে।।
মনোজ রেডি হয়ে বলল "আমি কিন্তু রেডি ।নাও চলো চলো তাড়াতাড়ি বেরোও।'
"হ্যাঁ, তুমি এগোও, আমি আসছি।"
মনোজ বাইরে থেকে হাঁক দিল 'তোমার হেলমেটটা নিয়ে আসবে।'
"ঠিক আছে।"
রেখা গিয়ে বাইকে বসলো।
 মাসি এসে বলল "এই নাও ব্যাগটা ,মাছের ব্যাগটা নাও।"
বাইক স্টার্ট করলো
রেখা হঠাৎ হাসির দিকে তাকালো, তখন বলল মনোজকে ওয়েট ওয়েট ওয়েট।
"কি হলো?"
রেখা বাইক থেকে নেমে মাসির কাছে এসে বললো " মাসি তুমি ঘামছো কেন?'
"বোধহয় তাড়াহুড়ো করেছি তো এইজন্য।"
'না ,না তোমার তো প্রেসার আছে তুমি  ওষুধ খেয়েছো তো?'
"মাসি চুপ করে আছে।'
বুঝতে পেরেছি তুমি ওষুধ খাও নি।
মাসি বললো 'আসলে ওষুধটা শেষ হয়ে গেছে "কিনতে পারিনি গো বৌমা।'
"ঠিক আছে  আমি পার্থকে বলে দিচ্ছি ও ওষুধ এনে দেবে ।তুমি কি ওষুধ খাও মনে করতে পারবে?
"আরে আমি তো তোমাদের এই যে সামনের দোকান সঞ্জীবনী ওখান থেকে ওষুধ কেনেও না ওখানে গিয়ে বললেই উনারা জানেন আমি কি ওষুধ খাই।"
'ঠিক আছে, আমি পার্থকে বলে দেব কোন চিন্তা করো না আর এই যে ছোট ফোনটা রেখে গেলাম আমরা প্রয়োজনে ফোন করে নেব আর তোমার যদি এমনি কোন অসুবিধা হয় তাহলে পার্থ আছে সামনে সেন্টুদা আছে পাশের বাড়ির চৈতীর মা আছে ঠিক আছে কোন টেনশন করো না।
না গো বৌমা তোমরা সাবধানে এসো।
ঠিক আছে তাহলে আসছি।
মনোজ গাড়ি স্টার্ট করলে রেখা পেছনে বসে।
 মাসি বলতে থাকে "দুগ্গা দুগ্গা দুগ্গা।"
রেখা ভাবতে থাকে সত্যিই ঈশ্বরের অশেষ করুনা মাসির মত একজন বিশ্বস্ত লোককে রেখার কাছে পাঠিয়েছে। আর কত আন্তরিকতার সঙ্গে সবকিছু করে, যেন আপনার জন।
মনোজ কিছুদূর যাবার পরে এমন জোরে ব্রেক কষে রেখা আরেকটু হলে পড়েই যেত ।মনোজকে জড়িয়ে ধরে।।
"মনোজ হো হো হো করে হাসতে থাকে এই জন্যই তো ব্রেকটা কষে।'
"যেন মনে হচ্ছিল পরের বউকে নিয়ে বাইকে যাচ্ছি।'
রেখা বলল" মানে?'
"হ্যাঁ সেরকমই তো তুমি এত দূরে বসে আছো বাইকে বসেছি কোথায় আমাকে জড়িয়ে ধরবে চালানোর সময় একটা গতি আসে আমার।"
রেখা বলে "কি করে জড়িয়ে ধরবো সামনে ব্যাগ আছে ব্যাগটাইতো বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।"
মনোজ বলে "দেখো, যদি মনের ইচ্ছে থাকে কোন বাধাই কিন্তু বাগ মানে না।'
রেখা মনোজকে জড়িয়ে ধরে বসলো আর মনোজ গান গাইতে থাকলো "এই পথ যদি শেষ না হয় তবে কেমন হতো তুমি বলতো….?"
এভাবে বাইক শহর ছাড়িয়ে ক্রমশ গ্রামের দিকে রেখাদের নির্মল  গ্রাম গাছ-গাছালি পুকুর দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ পেরিয়ে ,পঞ্চা কাকাদের বাড়ি, বুলু কাকিমা দের বাড়ি ছাড়িয়ে নিজের ভিটে বাড়ির গেটের কাছে এসে দাঁড় করালো।
গেটটা ভেজানোই ছিল।
এ কাজটি করে খুলতে গিয়ে আওয়াজ পেল কাকিমা রান্নাঘরে কিছু একটা করছে আর এদিকে ভোলা কাকার সাথে বকবক বকবক করছে।
হ্যাঁ রে ভোলা, দিনকে দিন তোর বয়স কমছে না 
বাড়ছে তোর এখনো খাবার টাইম হলো না?'
'এইতো ছোট বৌদি হয়ে গেছে যাচ্ছি।"
হ্যাঁ রে ভোলা গেটে আওয়াজ হলো না?
, রাশুর মা আসলো।
আরে ,মামনি!
কাকিমা বলল তুই কি জীবনেও শোধরাবি না এখন কত বয়স।'
"কেন আমি আবার কি করলাম?'
রাখাল আর বাঘের গল্প শুনেছিস?
রাখাল রোজ গরু চরাতে যেত আর বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করতো। আর প্রত্যেকে আওয়াজ শুনে ছুটে আসলে হো হো  করে হাসত।
দিন সত্যি কারে যখন বাঘে ধরল তখন চেঁচানো সত্বেও কেউ আসেনি। তাকে বাঁচানোর জন্য।
রেখা চুপি চুপি রান্নাঘরের কাছে গিয়ে বলল  কাকিমা।
রেখা কিছুক্ষণ পর আবার ডাকতে থাকে কাকিমা।
পিছন ফিরে তাকাতেই কাকিমা আনন্দ উল্লাসে বলে ওঠে তুই?
"কিগো ব্যাগটা নিয়ে এসো।"
রেখা বলল "যাচ্ছি।"
"আর হাতে ওটা কি?"
 ইলিশ মাছ আছে।
"কাকু খেতে চেয়েছিল না।"
ভোলা নিয়ে যা তোর দাদার কাছে ওদেরকে।।
দেখো কারা এসেছে।
কাকু বলল "কে ননী?'
আয় আয় আয় আমার বুকে আয় মা।
ভোলা দেখ কি টান।'
কাকিমা বলল' ইলিশ মাছ এনেছে।'
তাই মা আমার কবে থেকে গঙ্গার ইলিশ খেতে ইচ্ছে করেছিল রে মা।"
"তুই একাই এসেছিস? মা গাড়ি এসেছে?"
"না না তোমাদের জামাই এসেছে বাইকে এসেছি।
কিগো এদিকে এসো।"
মনোজ এসে কাকাকে প্রণাম করলো।।
কাকিমা বলল "আমি ওদিকে যাই।রান্নাবান্না গুলো করি।'
হ্যাঁরে, রাশুর মা আসলো?
ভোলা বলল "খেয়াল করিনি আসলে তো দেখা করতো।"'
রেখা বলল 'রাশুর মা টা কে? কাকিমা । নতুন কাজের লোক।"
"তোর মনে আছে কিনা জানিনা আমাদের বাড়িতে বাংলাদেশ থেকে উদ্বাস্তু হয়ে সাবিত্রী কাজ করতে এসেছিল তোর মনে আছে?'
রেখা বললো মানে সাবিত্রী জেঠিমা যে বাঙ্গাল ভাষায় কথা বলতো আর ঠাকুমাও বাঙ্গাল ভাষায় কথা বলতো।'
একদম ঠিক ।তোরা তখন খুব ছোট ছিলিস।
তোর তো স্মৃতিশক্তি বেশ ভালো।
হ্যাঁ, ওই সাবিত্রির সঙ্গে ওর মেয়ে আসত। নাম সতী।'
"এই সতী হলো রাশুর মা।'
"ও তাই বুঝি?'
এসে হাতে পায়ে জড়িয়ে ধরেছে একটু আশ্রয়ের জন্য আমাদেরও তো এই হাল তারপরেও দেখলাম যে থাক কাজকর্ম করবে একটু খাবে?'
রেখা বলল ঠিকই করেছ।'
'
তবে জানিস তো ননী, আমি সতীকে বলেছি আমাদের গ্রামে আশেপাশে বাড়িগুলোতেও কাজ করে দেবে। তাতে ওর হাত খরচাটা আসবে।
ইতিমধ্যেই গেট দিয়ে ঢুকতে ঢুকতে বকবক করতে করতে আসছে কি  দ্যাশ আসইলাম। দয়া মায়া নাই।"
ভোলা বলল" ছোট বৌদি এসে গেছে।
রেখার কাকিমা বলল সতী এসে গেছো ?
কি কমু এই দ্যাশ মানুষ বাস করে।
কি হয়েছে সত্যি?
আরে পাশের বাড়ির কাম করি বউডারে কইলাম একটু জল খাবার দাও
কথা হুইনা আকাশ থেইকে পইড়লাম।
কয় কি জল খাবার দিবার কথা তো হয় নাই।
কাকিমা বলল'ঠিক তুমি আজকে খাবারই খাওনি।"
"ননী দেখ তো কি কি আছে ঘরে দে তো ওকে খেতে। "
রেখা ঘরে গিয়ে মুড়ি আর রেখা রাজি মিষ্টি নিয়ে ছিল দুই সেটা দিল।
সতী বলল "এইডা কে?'
কাকিমা বলল "আমার মেজো  ভাসুরের মেয়ে ।'
"কি মিষ্টি মাইয়া ,যেন চান্দ নাইমা আইছে।'
তারপরেই আবার বাংলাদেশের কথা আপন মনে বলছে।
"কি দ্যাশ ছাইরা কি দ্যাশে আইলাম।'
রেখা মনে মনে ভাবে নাড়ির টান এমনই। ও দেশ থেকে ছিন্নমূল অবস্থায় এসেও এ দেশটাকেও নিজের দেশ ভাবতে পারল না।। ও দেশের কথা মনের ক্যানভাসে স্বর্ণাক্ষরে আটকে আছে।
তারপর আপন মনে গান গাইতে থাকলো'আমার হাত বান্ধিবী, পা বান্ধিবী মন বান্ধিবী কেমনে ….. পরান বান্ধিবী কেমনে।'
কাকিমা বলল ছেলেটাকেও হারিয়ে স তী যেন আরো একা হয়ে গেছে।
সতীর দিকে তাকিয়ে রেখা ভাবতে লাগলো সত্যিই তাই শিকড়ের অস্তিত্ব মাটির অনেক গভীরে চলে গেছে তার থেকে উপ ড়ে ফেলা অতো সহজে নয়।।
রেখার ও অস্তিত্ব এই গ্রামের সাথে এই মাটির সাথে এমন ভাবে মিশে গেছে, যার টানে বারবার ফিরে আসে।
কাকিমা বলল ননী, আয় মা ফ্রেশ হয়ে নে।

কবি শেখ রাসেল এর কবিতা "বলি শোন"




বলি শোন 
শেখ রাসেল 

বলি ঐ শোনরে জালিম
              দম্ভ মিছে বক্ষ জুড়ে, 
যদি চায় ফেলবে তোকে
             স্রষ্টা তবে গগণ ফুঁড়ে। 

মুখে যাঁর ঈমান তব
           আল্লাহ নাম শক্তি ভরা,
যাবে কি দমন কথায়
            অগ্নি নামের দগ্ধ খরা।

বলি ঐ শোনরে কাফের 
          ঈমান ভিতে রক্ত তাজা,
দলি তোর কপাল জুড়ে 
       নেশায় গিলা তিক্ত গাঁজা। 

কেন তোর হুঁশ থাকিতে 
             এই ধরাতে রুষ্ঠ বীণা,
চেয়ে দেখ বিশ্ব বাসির
               কন্ঠে তব তিক্ত ঘৃণা। 

বলি ঐ শোনরে বেকুব 
            তুচ্ছ কেন বাক্যে নারী,
তবে তোর জন্ম মিছে
        গর্ভে যেজন ধরছে তারি।

চোখে তোর নগ্ন ধূলায়  
             মূর্তি আঁকা প্রতিচ্ছবি, 
দেখে মন আঁতকে উঠাস
            আল্লাহু নাম দীপ্ত রবী।

কবি মিতা নূর এর কবিতা "মা'গো তোমার হাসিতে জান্নাত




মা'গো তোমার হাসিতে জান্নাত 
 মিতা নূর 



স্বার্থপর এই পৃথিবীতে,
সবাই সবাইকে ছেড়ে চলে যায়, 
সবাই সবাই'কে  যায় ভুলে।
শত আঘাত শত ব্যথা পেয়েও 
শুধু একজনই আঁকড়ে ধরে রাখে 
পাঁজরের পাঁজর করে,দেয়না ছুড়ে ফেলে।

মৃত্যু'কে করে জয় যে দিয়েছে জান।  
সে তো আমার মা, আমার জননী, 
এই ভুবনে মাগো  অসীম তোমার  দান।
যতই দুঃখ আসুন, আসুক  তুফান, 
মা'গো বলে জড়িয়ে ধরলে জুড়ায় আমার প্রাণ।

মা'গো গুটি গুটি হাত ধরে শিখিয়েছ পথ চলতে।
শিখিয়েছ হোটচ খেয়েও উঠে দাঁড়াতে, 
শিখিয়েছো দুঃখ পেলেও হাসি মুখে কথা বলতে।
মা'গো তুমিই আমার বড়ো শিক্ষক, 
শিখিয়েছ আমায় কঠিন জীবন গড়তে। 

মা আমার মা- কতো মধুর ডাক, 
তুমিই আমার সব, অল্প থেকে অনেক। 
মা'গো খোদার পরে  তোমার আসন, 
আসমানের সমান।

মা'গো পাপী আমি,করিও আমায় ক্ষমা।
তুমি আমার মা'জননী, তুমি আমার-মা,
অজান্তে,কতই না দিয়েছি তোমায় আঘাত। 
তোমার কান্নায় মা'গো আরশ উঠে কেঁপে, 
মা'গো- তোমার হাসিতে জান্নাত।




১০/০৪/২০২২--ইং-- রাতঃ--১০ঃ৩৪,

শামীমা আহমেদএর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৮৬






ধারাবাহিক উপন্যাস

শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত (পর্ব ৮৬)
শামীমা আহমেদ 

শিহাব তার বাইক ছুটিয়ে ধানমন্ডি সেন্ট্রাল হাসপাতালের দিকে চলছে। উত্তরা থেকে চার চারটি ট্রাফিক সিগন্যাল পেরিয়ে হাসপাতালে পৌঁছতে তার প্রায় দুপুর সাড়ে বারোটা বেজে গেলো। ব্যস্ত শহরের ব্যস্ততায় চলাচল করা গাড়িগুলোর ট্রাফিক সিগন্যালে বসে থাকা যেন এক ভয়াবহ শাস্তি। ভেতরে উৎকন্ঠা  নিয়ে শিহাব হাসপাতালের গেটে এসে বাইক থামালো।বাইক পার্কিংএর জায়গায়  শিহাবের  জন্য তার বাবা দাঁড়িয়ে আছে।শিহাব দেখলো,বাবার চোখে মুখে থমথমে ভাব।প্রায় কেঁদে দেয়া অবস্থা। যেন সে তার কোন ভুলের জন্য ছেলের কাছে ক্ষমা চাইছে। শিহাব খুব ভালো করেই জানে, আরাফ এই পরিবারের সবচেয়ে মূল্যবান  সম্পদ।শিহাবের বাবা মা ভাই ভাবী সবাই আরাফকে অতি যত্নে আদর ভালোবাসায় বড় করে তুলছে। দূরে থেকেও শিহাব যেন নিশ্চিন্ত থাকতে পারে সে ব্যাপারে সবার সজাগ দৃষ্টি ছিল।কিন্তু কিভাবে কি হয়ে গেলো!  সবাই যেন অপরাধ বোধে ভুগছে।শিহাব  তার বাবাকে সান্ত্বনা  দিয়ে বাবার হাত ধরে লিফটে তিনতলায় উঠে গেলো।তিনশ চার নম্বর কেবিনে আরাফকে রাখা হয়েছে। কেবিনে ঢুকতেই দেখা গেলো মা ভাবী আরাফের বিছানায় ওর মাথার পাশে বসে আছে।শিহাবকে দেখে মা কেঁদে উঠলেন।ভাবী ভীত হরিণীর মত শিহাবের দিকে তাকালো। তিনি যেন আরাফের দূর্ঘটনার জন্য নিজেকে দায়ী ভাবছে। শিহাব সবাইকে শান্ত করতে স্বাভাবিকভাবে আরাফের কাছে এগিয়ে গেলো।আরাফ গভীর ঘুমে।সম্ভবত ঘুমের ইঞ্জেকশন দেয়া হয়েছে। আরাফের কপালের কোনায় ব্যান্ডেজ দিয়ে রাখা।সেখানে তিনটি সেলাই পড়েছে। শিহাবের মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবী ডুকরে কেঁদে উঠলেন! কাঁদো কাঁদো গলায় বলে উঠলেন, আমার জন্যই আজ ছেলেটা ব্যথা পেলো।আমি সকালে মায়ের সাথে দেখা করে নেমে আসছিলাম। ও আমার সাথে আসতে চাইলে আমি বললাম, ঘরের কাজ গুছিয়ে তোমাকে একটু পরে নিয়ে যাবো।কিন্তু ও যে একা একা আমার পিছু পিছু এসেছে তা বুঝতে পারিনি। শিহাব,তুমি আমাকে ক্ষমা করো।তখন যদি আমি ওকে নিয়ে আসতাম তবে এই দূর্ঘটনা হতো না।বলেই সুমাইয়া  আরো আবেগী হয়ে উঠলেন।আরাফের জন্য ভাবীর সবসময়ই  এরকম মাতৃসুলভ  আচরন। শুধু সে আরাফকে নিজে পেটে ধরেনি তবে তার কাছে আরাফ  তার পেটের সন্তানদের চেয়েও বেশী।শিহাবের ভাবী সুমাইয়া যেন এক মায়াবতী নারী।
শিহাব ভাবীকে শান্ত করতে বললো,  না ভাবী এভাবে ভেবোনা। ছোট শিশুদের এমনিভাবে দূর্ঘটনায় রিস্ক সবসময়ই থাকে।তুমি তো ওকে কত যত্নেই আগলে রেখেছো। ঠিক আছে ভাবী, আরাফ এখন ঘুমাচ্ছে, তুমি একটু শান্ত হউ।সব ঠিক হয়ে যাবে। ডাক্তাররা কি বলেছেন? 
এখনো রিপোর্ট পাইনি।আমরা ইমার্জেন্সিতে আসলেই ওরা ওটিতে পাঠিয়ে দেয়।অনেক রক্ত পড়ছিল।আরাফ ভীষণ কাঁদছিল।বাবা বাবা করে ডাকছিল। এরর হঠাৎই সুমাইয়া কড়া গলায় বলতে লাগলেন,শোন শিহাব,ইনশাআল্লাহ এবার আরাফ সুস্থ হয়ে উঠলে হয় তুমি এখানে এসে ওর কাছে থাকবে, নয়তো ওকে তোমার কাছে নিয়ে যাবে।সুমাইয়ার এমন শক্ত কথায় শিহাবের মা বাবা দুজনেই চমকে উঠলেন! আজ পর্যন্ত সুমাইয়া কখনোই আরাফকে নিয়ে বিরক্ত হয়নি অথচ আজ! 
সবার অভিব্যক্তিতে সুমাইয়া বুঝে নিলো, এই সময় এই কথাগুলোর জন্য কেউ প্রস্তুত ছিল না। কিন্তু সুমাইয়া ভাবলো, আজ তাকে এই শিশুটির ভবিষ্যতের জন্য কঠোর হতে হবে। বাবা মায়ের আদর ভালোবাসা ছাড়া একটা  শিশু কখনোই পরিপূর্ণ মায়া মমতায় বড় হতে পারে না। ভাবী শিহাবকে আদেশের সুরে বললেন, আমি কিছু বুঝতে চাইনা শিহাব, তুমি এবার ওর মা এনে দিবে, সে যেই হউক।আমি আর কিছু জানিনা।
সুমাইয়া আসলে কি বলতে চাইছে শিহাব তা ঠিকই বুঝতে পারছে।আর এজন্যই তো সে শায়লাকে আপন করে নিতে এতটা অস্থির হয়ে উঠেছে। কিন্তু ভাগ্য যেন কিছুতেই তার প্রতি সুপ্রসন্ন হচ্ছে না।যতবারই শায়লাকে নিজের করে আনতে চাইছে ততবারই  নিয়তি যেন তার বিপক্ষে যাচ্ছে। শিহাব মায়ের দিকে এগিয়ে গেলো,মাথায় হাত রাখলো।ওদের কথার মাঝে মা অবিরত  কেঁদেই যাচ্ছেন।বাবা বৃদ্ধ মানুষ,সবকিছু একসাথে নিতে পারছেন না।কেমন যেন অগোছালো হয়ে যাচ্ছেন।
শিহাব আরাফের মুখটির দিকে তাকাতেই তার ভেতরটা  দুমড়ে মুচড়ে গেলো।সে ভাবতে লাগলো, বেচারাকে আমরা খেলার ছলে পৃথিবীতে এনে আজ এতটা কষ্টের সাগরে ফেলেছি। শিহাবের চোখের ভাবনায় শায়লা-আরাফ আর নিজেকে নিয়ে একটা কল্পিত সংসারের  ছবি যেন ভেসে উঠলো !  শায়লা তোমাকে যে আজ আমার আরাফের জন্য, আমার জন্য ভীষণ প্রয়োজন। আমি খুব করে জানি তুমি এলেই আমার আরাফের আর কোন কষ্ট থাকবে না। ও দিনে রাতে সারাবেলা  তোমার বুকে নিশ্চিন্তমনে মুখ লুকাবে। তুমি তোমার নিজ হাতে ওকে খাইয়ে দিবে। আরাফকে তুমি বুকের মাঝে আগলে রাখবে। 
কিন্তু এত ভাবনা কি সত্য হবে ? আজ শায়লার জীবন অন্যদিকে মোড় নিচ্ছে। সেকি পারবে সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে। 
শিহাব ভাবলো, শায়লার একটা খোঁজ  নিতে হবে।পার্লার থেকে বেরিয়ে নিশ্চয়ই আমাকে খুঁজেছে।আমাকে দেখতে না পেয়ে মনটা ভেঙে গেছে। কিন্তু তারতো কিছুই করার ছিল না। তবে রাহাতকে সে এই শেষ  সময়েও অনেক অনুরোধ করে এসেছে। যদি তারা শায়লাকে ভালো রাখতে চায় তবে শিহাবের কথাগুলো রাহাতের খুব গভীর ভাবে ভাবতে হবে। শিহাব মোবাইলে শায়লার মেসেজ দেখতে পেলো।
আমি আজীবন তোমার অপেক্ষায় থাকবো। আরাফের খবর জানিও।চিন্তায় থাকবো।শায়লার মেসেজে শিহাব ভীষণ আবেগতাড়িত হয়ে গেলো। সে কেবিনের বাইরে চলে এলো। বারান্দায় দাঁড়িয়ে কাঁচের বাইরে নিচে গাড়ি চলাচল দেখতে লাগলো।
শায়লাকে এমন একটা অবস্থায় রেখে এসে তারও ভাল লাগছে না। আজ অফিসেও যাওয়া হবে না। অফিসে কবিরকে সবকিছু জানাতে হবে। আজ অফিসে কিছু পাওনাদার আসার কথা।কিছু বিল তারা আজ বুঝে নিবে। শিহাব  কবিরকে ফোনে জানিয়ে দিলো, তার টেবিলের বাঁ পাশের ড্র‍য়ারে দুটো  ব্ল্যাংক চেক সাইন করা আছে। 
দুটোতে এক এক দুই লাখ টাকার একাউন্ট বসিয়ে যেন সোবহান আর মামুন সাহেবকে দেয়া হয়। শিহাব কখনোই কোন বিল আটকে রাখার পক্ষে নয়। সবকিছু সময়মত দেনা পাওনা  মেটানো ব্যবসার ক্ষেত্রে কমিটমেন্ট রক্ষায় সততার পরিচয় পাওয়া যায়। শিহাব বুঝতে পারছে আজ আর তার অফিসে যাওয়া হবে না।আরাফের সাথে সারাদিন থাকতে হবে। ওর ঘুম ভাঙলে কাছে থাকতে হবে। শিহাব জানেনা ওদিকে শায়লার বাড়িতে কী ঘটে যাচ্ছে। শিহাব শায়লাকে মেসেজের উত্তর জানালো, আরাফ ভালো আছে। কপালে তিনটা সেলাই পড়েছে । এখন ঘুমাচ্ছে । তুমি কেমন আছো শায়লা ? আমি চিন্তায় আছি।

শায়লার বাসায় এয়ারপোর্টে যাওয়ার জন্য কয়েকজন মুরুব্বি গোছের মানুষ, সাথে রুহি খালার হাজবেন্ড, রাহাত আর শায়লার সঙ্গী করে বুবলীকে নেয়ার জন্য প্রস্তুতি চলছে। যদিওবা এরই মধ্যে চোখের ভাষায় শায়লা এয়ারপোর্টে না যাওয়ার অনীহা প্রকাশ করেছে তবে তা বাড়ির লোকজনকে  বুঝতে দেয়া যাবে না একেবারে। রুহি খালা  শায়লাদের বাসায় ঘুরঘুর করছে। তার ইচ্ছা শায়লা লাল শাড়ি পরে বউয়ের মত সেজেগুজে যেন নোমান বাবাজিকে আনতে যায়। কিন্তু শায়লা তাতে একেবারেই আগ্রহ দেখাচ্ছে না। আবার খালি বাসায় শায়লাকে রেখে যেতে রাহাত ভরসা পাচ্ছে না। 
শায়লা রাহাতের ভাবনা বুঝতে পেরে রাহাতের ঘরে এগিয়ে গেলো।ভাই বোন মুখোমুখি হতেই রাহাতের অপরাধবোধ যেন আরো স্পষ্ট হয়ে উঠলো। শায়লা  সেদিকে একেবারেই খেয়াল না দিয়ে নিজের মতামত জানিয়ে দিলো।
তোমরা নতুন অতিথিকে আনতে এয়ারপোর্টে যাচ্ছ যাও, তবে আমি যাবো না।আর এ নিয়ে তুমি ভয় পেয়োনা। আমি পুরোটা সময় মায়ের ঘরে মায়ের পাশে বসে থাকবো। তুমি নিশ্চিন্ত থেকো। আমি একা কোথাও যাবো না। আমি নিশ্চিত শিহাব  আরাফকে সুস্থ করে সে নিজে এসে আমাকে নিয়ে যাবে।
কথাগুলো বলেই শায়লা রাহাতের উত্তরের অপেক্ষা না করে মায়ের ঘরে চলে গেলো। রাহাত বুঝতে পারছে না, আজ বাসায় কী ঘটতে যাচ্ছে। সবকিছুর জন্য সে নিজেকে ক্ষমা করতে পারছে না। বুবলী রাহাতের ঘর থেকে শায়লাকে বেরিয়ে যেতে দেখলো। শায়লা আপুকে খুব একটা স্বাভাবিক লাগছে না। ভাইবোনের মাঝে কিছু একটা দ্বন্দ চলছে সেটা বুবলীর বুঝতে আর বাকী রইল না।পার্লারের সামনে ভাইবোনের অমন ইতস্ততভাব বুবলীর মনে প্রশ্ন এনেছে।কিন্তু সে ঠিক বুঝতে পারছে না, এদের কি হয়েছে? বুবলী রাহাতের সামনে এসে দাঁড়ালো। রাহাতের করুন চাহনীতে বুবলী চমকে গেলো! কিন্তু রাহাত মুখ ফুটে কিছুই বলতে পারছে না।
অত্যন্ত বুদ্ধিমান বুবলী রাহাত আর শায়লার মাঝে কি কথা হলো তা জানতে রাহাতকে তার চাহনীতে দূর্বল করে দিলো। রাহাত বুবলীর হাত ধরে বললো, বুবলী আমি খুব সমস্যায় পড়েছি। কি করবো বুঝে উঠতে পারছি না।  কিন্তু কাউকে না কাউকে এর সমাধান করে দিতে হবে। যদিও ওরা আমার কাছেই সমাধান চেয়েছিলো। 
ওরা ? মানে কারা ? রাহাত ভাইয়া ?
এবার রাহাত বুবলীকে সব খুলে বললো। সবকিছু শুনে বুবলী  বললো, রাহাত ভাইয়া তুমি চিরকালই ভীতু রইলে। তাইতো কোনদিন সাহস করে আমার চোখের ভাষাও বুঝনি।আর শায়লা আপুর বিষয় টা এতদূর গড়ানো তোমার ঠিক হয়নি। আগেই নোমান দুলাভাইকে সব জানানো উচিত ছিল। তাহলে সে আর দেশে এসে এই পরিস্থিতে পড়তো  না। 
বুবলী  এখন কি করবো ? শায়লা আপু এয়ারপোর্টে যেতে চাইছে না। রাহাতের আকুল জিজ্ঞাসা। পরক্ষণেই বুবলীর সাহসী উত্তর, চিন্তা করোনা। অপেক্ষা করো। দেখি, কি করা যায়। শায়লা আপুর মনটা তোমার বুঝা উচিত ছিল। এখন যতটা পারা যায়, আপু আর নোমান ভাইয়ার এটাচমেন্ট কম করতে হবে। তবে এখনতো এয়ারপোর্টে তাকে রিসিভ করতে যেতে হবে।
চলো, আমি যাচ্ছি তোমার সাথে সাথে। শায়লা আপুর হয়ে আমি প্রক্সি দিচ্ছি নোমান  ভাইয়াকে। 
নীচে মাইক্রো এসেছে, যারা  এয়ারপোর্টে যাবে তারা প্রস্তুত হয়ে ডাইনিং এ এসে দাঁড়ালো।বিয়ে বাড়ির ছোট ছোট  ছেলেমেয়েদের নতুন জামাই বরণ করার সবকিছু গুছিয়ে নিচ্ছে।মায়ের ঘরে মায়ের পাশে বসে শায়লা শিহাবের মেসেজের উত্তর দিল, শিহাব,
তুমি আরাফের কাছে থাকো।ওকে সুস্থ করে তবেই আমাকে নিতে আসবে।আমি অপেক্ষায় থাকবো।
চলবে....

কবি শক্তি অধিকারী এর কবিতা "এলোমেলো আজকে ভীষণ তুই"




এলোমেলো আজকে ভীষণ তুই
শক্তি অধিকারী
         
এলোমেলো আজকে ভীষণ তুই...
হয়তো মনে বইছে ঝোড়ো হাওয়া !
পারবি কি তুই ভিরতে খেয়াঘাটে ?
উজানস্রোত কঠিন বড়ো বাওয়া!

মনের কোনে তুফান সেদিন ছিলো..
ঝড় হবে তা, বুঝবো কেমন করে !
আজ যদি সে সর্বনাশী হয়...
পারবি তাকে রাখতে বুকে ধরে ?

ইচ্ছেগুলো ঘুর্ণি হয়ে নয়-
যাক ভেসে আজ মিথ্যে বাঁধন ছিঁড়ে..
তটের পরশ লাগবে তবু গায়-
মিশবি যখন, সাগর ফেলে তীরে...

তাণ্ডবে তার, অতীত হবে সব
পড়বে ছিঁড়ে স্বাধের খোলসখানি...
পিছনফিরে তাকাসনা আর তুই
বইবে চোখে, অশ্রু তোরও জানি!

১০ এপ্রিল ২০২২

মমতা রায় চৌধুরীর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৪৯





উপন্যাস 


টানা পড়েন ১৪৯
খুশির হাওয়ায় লাগল নাচন
মমতা রায় চৌধুরী
২৫.৩.২২ রাত্রি ৮ ২৩.


গতকাল এত রাত হয়ে গেছিল শুতে, যে ভোরবেলা আর উঠতে ইচ্ছে করছে না কিন্তু উঠতে তো হবেই আজকে তো দেশের বাড়িতে যেতে হবে। ঘুমের চোখে হাতরে হাতরে মোবাইলটা বের করল টাইম টা দেখলো। ভোর ৪:৩০ বাজে। একবার রেখা মনে মনে ভাবল মনোজকে ডেকে তুলবে? পরক্ষণে ভাবল না ,না ওকে ডাকলেও কুম্ভকর্ণের ঘুম ভাঙবে না। বরং অকালে ঘুম থেকে তুলে সমস্ত কিছুই বন্ধ হয়ে যাবে। থাক ও ঘুমাক। কিন্তু এটা তো শিওর হতে হবে আদপে  যাবে কিনা? দোমনা করে মনোজকে গায়ে হাত দিয়ে একটু ধাক্কা দিয়ে ডাকলো'কি গো, অ্যা ই 
আজ যাবে তো কাকু কাকিমার ওখানে।"
"হু'।
কিন্তু ঘুমের ঘোরে কথা তো বিশ্বাস করাও যায় না। সকালে উঠেই হয়তো মত পাল্টে দেবে।
রেখা আবার মনোজকে ধাক্কা দিল আবার ডাকলো" কি গো শুনতে পাচ্ছ?
আজ যাবে তো কাকু কাকিমার ওখানে? ঠিক করে বলো, তাহলে তো আমাকে উঠে সেভাবে কাজ গোছাতে হবে।
হু।
এ বাবা আবার ঘুমিয়ে পড়ল ।তারপর ভোস ভোস করে নাক ডাকতে শুরু করল।
একে জাগানো সম্ভব নয়। ঘুম থেকে উঠলে তবেই একে বলতে হবে।
রেখাও আর একটু ঘুমানোর চেষ্টা করল।
এ বাবা সেই ঘুম যে একেবারে মাসির কলিংবেলের আওয়াজে ভাঙবে সেটা কল্পনাও করতে পারেনি রেখা।
বাইরে কলিং বেজে যাচ্ছে। "জয় গনেশ ,জয় "গনেশ জয় ,গনেশ দেবা'। কানে যাচ্ছে কিন্তু উঠতে ইচ্ছে করছে না। আবার কলিং বেলের আর্তনাদ। রেখা কান খাড়া করে ভাবলোএটা তো স্বপ্ন নয় এতো বাস্তব ।রেখাদের বাড়িতেই বাজছে। রেখা ধড়ফরিয়ে উঠে পড়লো। এ বাবা কত বেলা হয়ে গেছে। মনোজকে ধাক্কা দিয়ে দুচার ঘা  কিল মেরে দিল। এ বাবা কি করছো তুমি? দু চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল মনোজ।
তাকিয়ে দেখছো কি? তোমার জন্য আজকে আমার কত বেলা হয়ে গেল।.
মনোজ  কিছু বুঝে ওঠার আগেই বলল'এখানে আমার কি দোষ বলো?'
'বাহ রে, আমি তখন তোমাকে ধাক্কা দিলাম। ওঠার জন্য। উঠলে না। আর আমি ও ঘুমিয়ে পড়লাম।'
ওদিকে আবার কলিং বেল বাজছে।
'না ,এবার আমি গিয়ে দরজাটা খুলি। নাহলে মাসিও চলে যাবে খাটুনির শেষ থাকবে না।'
মাসি জিজ্ঞেস করল' কি গো বৌমা আজকে এত দেরি করলে?'
'আর বোলো না ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
'"মাসি তাড়াতাড়ি কাজগুলো করে নাও।'
কোথাও যাবার আছে?'
'হ্যাঁ ঠিক তো করেছি। জানি না যেয়ে উঠতে পারব কিনা?'
"কোথায় যাবে বৌমা?"
'ভেবেছিলাম একটু কাকু কাকিমার কাছে যাবো দেশের বাড়ি।'
"কিন্তু কিন্তু করছ কেন যাও না?'
'তোমার বাচ্চাগুলোকে নিয়ে তো অসুবিধে নেই আমি আছি।'
হ্যাঁ সে তো জানি। তিনি যাবেন কিনা দেখো।'(মনোজকে ইঙ্গিত করে কথা।)
"ছেলেকে গিয়ে তোলো।'
"ঠিক বলেছ?'
রেখা আনন্দ উচ্ছ্বসিত হয়ে মনোজের ঘরে গিয়ে ডাকে"কিগো যাবে তো?"
'সকাল সকাল কানের কাছে এরকম বাজখাই  গলায় কথা বললে না ,ভীষণ বিরক্ত লাগে।'
"এ বাবা এ আবার কি কথা?
রাতে একরকম কথা সকাল হলেই চেঞ্জ?
ফ্রিজে,মাছটা পড়ে আছে, তাহলে কি হবে?
তুমি যদি না যাও বল আমি পার্থকে গাড়ির কথা বলব?'
মনোজ আড়মোরা কেটে বলে
"হ্যাঁ,রে বাবা যাব।"
রেখার হৃদয় আনন্দে ময়ূরের মত নেচে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে লাফাতে লাফাতে রেখা ছুটে এসে 
বলল "ঠিক আছে ,তাহলে আমি মাসিকে বলে দিচ্ছি কিন্তু।'
মনোজের উত্তরের প্রত্যাশা না করে রেখা মাসিকে এসে বলল 'মাসি তুমি তাড়াতাড়ি কাজ করে তোমার যা বাড়িতে গুছিয়ে আসার দরকার গুছিয়ে চলে এসো।'
'ঠিক আছে বৌমা।'
'সত্যি, কি আনন্দই না লাগছে। '
মাসি বললো এটাই বাবার বাড়ির টান বুঝেছ বৌমা?
রেখার এক ঝটকায় মনটা চলে গেল সেই নিজের দেশের বাড়ি, গ্রামের বাড়ি সেখানে যে জেঠিমা কাজ করতে এসেছিল বাংলাদেশ থেকে উদ্বাস্তু হয়ে। সে মাঝে মাঝেই বলতো'মাইয়াদের বাবার বাড়ি যে কি তা বিয়ার পরেই বুঝা যায়?'
সঙ্গে সঙ্গে ঠাকুমা বলতেন, একেবারে হক কথা কইছো।'
 সত্যি সেই জেঠিমার কথাটি রেখার মনেপ্রাণে গেঁথে রয়েছে। আজ বুঝতে পারে "মেয়েরা কেন বাবার বাড়ি যেতে চায়? এ যে নারীর টান।'
রেখা তাড়াতাড়ি রান্নাঘরে গিয়ে চা বসিয়ে দিল মাসির জন্য ।তারপর ফ্রিজ থেকে ময়দা বের করে ঝটপট পরোটা বানিয়ে ফেলল ।মাসিও তো আজকে খাবে। অন্যদিকে ক্যাপসিকাম আলু ভাজা করবে বলে তরকারি কেটে ফেললো।
চা নামিয়ে মাসিকে চা আর বিস্কিট দিল।
আর বলল "মাসি তুমি পরোটাটা এসে খাবে, না নিয়ে যাবে?'
মাসি চুপ করে আছে।
রেখা বুঝতে পারল কেন চুপ করে আছে? মাসির সংসারে অভাব পরোটা নিয়ে গেলে নাতি-নাতনিদের ভাগ করে দিতে পারবে।
শুনেছে ।মাসির ছেলেটা নাকি দু-দুবার স্টোক হয়েছে তার ফলে কাজ করার ক্ষমতা হারিয়েছে, একটা দিক তো পুরো  প্যারালাইজড হয়ে গেছে।
এই বয়সে মাসিকে খাটতে হচ্ছে অভাবের সংসার বলে। মাসির বৌমাকেও কাজ করতে হয় তবে বেশি বাড়ীতে কাজে দেয়নি বৌমাকে কারণ ছেলেমেয়েগুলোকে লেখাপড়া জন্য ঠিক টাইমে ভাত রান্না করে দেওয়া এগুলো বৌমাকে করতে।
কথায় কথায় কত কথা বলছিল মাসির দিকে তাকিয়ে রেখার মনের ভেতরটা কেমন হু হু করে উঠলো আর ভাবল আহা এই বয়সে কি কাজ করার বয়স তবুও কাজ করছে কত নিষ্ঠার সাথে।  দীর্ঘশ্বাস ফেলে রেখা বলে" ঠিক আছে, তুমি দুটো পরোটা এখানে খাও আর দুটো নিয়ে যাও কেমন?'
মাসি বলল আচ্ছা।
রেখা খেয়াল করল মাসির চোখমুখে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল ।কতটা খুশি হয়েছে তা বুঝা গেল চোখ মুখ দেখে।
মাসি ঝটপট কাজ গুছিয়ে দিয়ে বলল' বৌ মা আমি আসি তাহলে।'
রেখা বলো হ্যাঁ মাসি, এসো।।
যেতে গিয়ে মাসে আবার থমকে দাঁড়ালো। প্রথম দিকটা খেয়াল করেনি পেছন ফিরে গ্যাসে মিলিদের রান্না চাপাচ্ছিল 
হঠাৎ রাক থেকে খুন্তি টা নেবে বলে পেছনের দিকে তাকালো। রেখা চমকে উঠে বলল'একি তুমি যাও নি!"
"আরেযেতে গিয়ে মনে পড়ল শীতলা পূজা আছে কিন্তু। পুজো পাঠাবে? সেই জন্য তোমাকে মনে করালাম।।
'কবে আছে?
"আগামীকাল।'
"ও বাবা তাহলে তো আজকেই তোমাকে টাকা দিয়ে রাখতে হবে।'
'হ্যাঁ বৌমা।'
'তো তুমি কি এখনই নিয়ে যাবে? নাকি এসে নেবে?'
'যা বলবে।'
দাঁড়াও নিয়ে যাও কারণ তুমি তো বললে তোমাদের পাড়ার থেকে যারা যাবে তাদের কাছে তোমাদের পুজো পাঠাবে তাহলে আমারটাও ওদের কাছেই দিতে পারবে।"
"ঠিক আছে।'
'রেখা ৫০ টাকা কিছু কিনে নিতে বলল আর ১১টাকা দক্ষিণা হিসেবে. দিতে বলল।'
মাসি বেরিয়ে গেল।
"ও মাসি দাঁড়াও দাঁড়াও নাম গোত্র এগুলো সব লিখে দিই।'
"হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিক বলেছ। নাহলে তো মনে করতে পারব ন।'
রেখা দ্রুত বসার ঘরে গিয়ে রাইটিং প্যাড থেকে একটা পাতা ছিঁড়েনিয়ে খসখস করে লিখলো।
তারপর হাত বাড়িয়ে কাগজটা মাসিকে দিল।
মাসি চলে গেল।
দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে এসে রান্না ঘরে ঝটপট মিলিদের খাবারটা নামিয়ে ফেলল।
অন্যদিকে ফ্রিজ থেকে মাছটা বের করে ফুলকপি আলু দিয়ে মাছের ঝোল করবে বলে মাছগুলোকে ভেজে নিল। ঝোল চাপিয়ে দিয়ে রেখা কয়েকটা কাজ এদিক ওদিক করতে লাগলো।
রেখা খুব তাড়াহুড়ো করছে বুকের ভিতর একটা উত্তেজনা কাজ করছে। বলতে বলতেই  কলিংবেল আবার বেজে ওঠে।
মনোজ কলিংবেলের আওয়াজে উঠে পড়ে।
রেখাকে উদ্দেশ্য করে বলে 'কি গো চা জল দেবে?'
'হ্যাঁ দেবো।'
'কে আসলো গো?'
পেপার দিয়ে গেল।
'পেপার টা দাওনা একটু চোখ বুলাই।'
রেখা পেপারটা দিয়ে রান্নাঘরে এসে চায়ের কাপে চা ঢেলে মনোজকে দিয়ে আসলো। মনোজ বললো কটায় বেরোবে?
'তুমি বলো?'
'তোমার এদিকে সব রেডি?খাবারদাবার বানানো হয়ে গেছে?'
রেখা বলল ' হ্যাঁ।'
তাহলে চলো, ১১:৩০টার মধ্যে বেরিয়ে পড়ি।
Ok
রেখা দ্রুত পদে রান্নাঘরে গেল। তারপর স্নান করতে ঢুকলো। বাথরুমে থেকে চেঁচিয়ে বললো' পামপটা চালিয়ে দাও।'
দিচ্ছি।
রেখা স্নান করতে করতে আপন মনে গেয়ে উঠল" আমার ভিতর ও বাহিরে অন্তরে অন্তরে আছো তুমি.…।'


মনোজ মনে মনে ভাবল রেখার বাপের বাড়ি যাওয়ার কথা শুনলেই কেমন মনটা আনন্দে নেচে ওঠে ।তাই কি সুন্দর গান গাইছে। আসলে সব মেয়েদেরই বোধহয় বাপের বাড়ির প্রতি একটু উইক আছে।
আবার কখনো কখনো কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতা আওরাছে
"আবার আসিব ফিরে এই ধানসিঁড়িটির তীরে এই বাংলায়' ..।"আজ রেখার মন খুশিতে পাল তুলেছে। চোখে মুখে ফুটে উঠেছে তার অভিব্যক্তি।

কবি দীনবন্ধু ঘোষ এর কবিতা "চিড়িয়াখানা"




চিড়িয়াখানা
দীনবন্ধু ঘোষ
                    ‌
চিড়িয়াখানা  চিড়িয়াখানা‌ 
কলকাতার ই   চিড়িয়াখানা ,
সকাল থেকেই চলতে থাকে 
কত লোকের আনাগোনা ।

শিশু থেকে  বড়ো সবাই
ছুটে আসে চিড়িয়াখানায় 
খা‌ঁচাবন্দি  বন‍্য দেখে 
জুড়াই  যদি জীবনখানাই।

হঁংস থেকে হস্তি দেখি
বাঘ ভল্লুক নানান পাখি
জেব্রা জিরাফ হরিণ কুমির
দেখছে সবাই ভরিয়ে আঁখি।

ওদের দেখে খিলখিলিয়ে কেবল হাসে সবে,
কি মজাই না আজ পেয়েছি আনন্দ এই ভবে!
দূর হতে আকাশ হয়ে অতি হতাশ 
বর্ষায় অশ্রু নিশীথে নিরবে।


কেউ জানেনা কষ্ট ওদের ,
বোঝে শুধু আমোদ নিজের
বিনা দোষেই বদ্ধ ওরা জেলখানার  ঐ   নামান্তরে
স্বপ্নে ওরা আমায় বলে,"আমরা সুখী বনের দ্বারে"।

শামীমা আহমেদ এর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৮৫




ধারাবাহিক উপন্যাস 


শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত (পর্ব ৮৫)
শামীমা আহমেদ 

শিহাব মোবাইলে কথা বলা শেষ  করে উৎকণ্ঠিত রাহাতের দিকে তাকালো। শিহাবের চোখে মুখে বেদনার ছাপ স্পষ্ট হয়ে আছে । তার সামনে রাহাতের জিজ্ঞাসু দৃষ্টি!  শিহাব যেন কিছু বলবার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। এমনিতেই শিহাবের ভেতরে শায়লাকে পাওয়া না পাওয়ার দ্বিধান্বিত ভাবনা আবার এর সাথে যোগ হলো শিহাবের হৃদয়ের রক্ত ক্ষরণ। ফোন কলটি যেন শিহাবের জন্য বিনা মেঘে বজ্রপাত হয়ে এলো।
রাহাত শিহাবকে ভাবনার জগৎ থেকে বের করে আনতে প্রশ্ন করলো,
কী হয়েছে শিহাব ভাইয়া ? কোন খারাপ খবর ? আপনার বাসার  সবাই ভালোতো ?
শিহাব এবার একটু স্বাভাবিকে এলো, বিড়বিড় করে বললো, ভাবীর কল এসেছিলো।আমার ছোট্ট আরাফ সিঁড়িতে পড়ে গিয়ে মাথায় প্রচন্ড আঘাত পেয়েছে। কপালে কেটে গেছে। খুব রক্ত ঝরছে। সবাই হাসপাতালে নিয়ে গেছে।সে বাবা বাবা বলে কাঁদছে। কথাগুলো বলতে গিয়ে শিহাবের ভেতরে  কান্নার ঢেউ এলেও এমন খোলা যায়গায় সে নিজেকে খুব কষ্ট করে সংযত রাখলো।
তাহলে তো আপনার এখুনি যাওয়া উচিত শিহাব ভাইয়া। দেরি করবেন না।
শিহাব কথাটি ঠিক শুনলো কিনা! সে মোবাইলে কিছু টাইপ করছে যেন।
শিহাব শায়লাকে মেসেজ পাঠিয়ে দিতে চাইলো কিন্তু পরক্ষনেই ভাবলো পার্লারে এখন ও নানান প্রস্তুতিতে আছে।এখন কিছু জানলে ও বেরিয়ে আসতে চাইবে।  আবার  শিহাবের এতটা সময় অপেক্ষা করাও সম্ভব না?  তার আরাফের জন্য মন মানছে না। এমনিতেই শিশুটি মা বাবার আদর ছাড়াই বড় হচ্ছে।  ওর কোন বিপদ শিহাবের মনে অনেকখানি ব্যথায় ভরিয়ে দেয়। ধি্বে অন্তরে  ভাবনা ঢেউ,নিশ্চয়ই আরাফ ব্যথায় খুব কাঁদছে। নিশ্চয়ই তাকে দেখতে চাইছে !
শিহাব ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না সে কি করবে ? 
তবুও তাকে একটা সিদ্ধান্তে আসতে হবে। শিহাবের এই একটা চমৎকার গুন। সে সব অবস্থাতেই নিজেকে স্থির রেখে করণীয় দ্বায়িত্ব কর্তব্যের ছক কেটে নিতে পারে। তাকে এখন দুই দিকই সামাল দিতে হবে।
যদিও শায়লা সবই সহজভাবে নিবে চাইকি জানতে পারলে সে এখনই আরাফের জন্য ছুটে যাবে ! 
আবার শিহাব এটাও জানে,  ভালবাসায় ভুল বুঝাবুঝি দুজনার মাঝে  আনতে পারে বিস্তর ফারাক।এতে দুজনার প্রতি দুজনার বিশ্বাস হারায়।  তাই শিহাব আর দেরী না করে,মেসেজে সে তার প্রকৃত অবস্থা  শায়লাকে  জানিয়ে দিলো। শায়লার প্রতি তার শুধু এটুকু  মিনতি রইল, শায়লা তুমি আমার অপেক্ষায় থেকো। আমি আরাফকে সুস্থ করে তোমার কাছে ফিরবো। শায়লার প্রতি শিহাবের অনেক আস্থা। সে তার যে কোন কিছুকে খুব সহজভাব নিবে। রিশতিনা বা আরাফের বিষয়টিতে সে কোন প্রশ্ন আনেনি কোনদিন।কারণ শিহাবের প্রতি তার অগাধ বিশ্বাস  আর অপরিসীম ভালবাসা। শিহাব মেসেজ সেন্ড করে  সময় দেখে নিলো।এগারোটা বাজছে।শায়লার আরো একঘন্টা  লাগবে।এদিকে জিগাতলা থেকে আবার মায়ের ফোন এলো। মা কাঁদছে। শিহাব আর নিজেকে স্থির রাখতে পারলো না। সামনে যে রাহাত দাঁড়িয়ে আছে শিহাব তা একেবারেই ভুলে গিয়েছিল।শিহাব বাইক স্টার্ট  দিয়ে আবার থামল। সে হঠাৎই   রাহাতের  হাত ধরে অনুরোধের সুরে বললো, রাহাত আমি যাচ্ছি।সন্তানের ডাক সে এক অন্যরকম অনুভুতি। যেন এক সাগর সাঁতরে যেতেও কোন কষ্ট বোধ নেই। শুধু অনুরোধ রইল, তোমার আপুকে কানাডা যেতে দিও না। ওখানে গেলে ও বাঁচবে না। আমার  শূন্যতা ওর কাছে এক অপূরণীয় অনুভুতি। আমার অনুপস্থিতি যেন জলবিহীন মরুদ্যান।
আমি ওকে খুব করে চিনেছি রাহাত।আমাকে ছাড়া ওর জীবনীশক্তি হারিয়ে যাবে। আর আমিও এদিকে একাকীত্বের বেদনায় ডুবে যাবো। তোমরা ভুল করোনা। শায়লাকে আমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিও না।শিহাব আর কিছু বলতে পারছে না। তার মনের ভেতর প্রচন্ড এক ঝড় বয়ে যাচ্ছে। রাহাতের কাছে সকল আর্জি  জমা রেখে গেলো। শিহাব হেলমেট পরে বাইক স্টার্ট দিয়ে উচ্চরবে হর্ণ তুলে ঢাকা এয়ারপোর্ট রোডের জনারণ্যে মিশে গেলো। রাহাত কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বারবার তার একই পরীক্ষায় পড়তে হচ্ছে।একদিকে পরিবারের মান সম্মান আরেকদিকে দুটি সুন্দর মনের কাছে আসার আকুতি। সে এখন বেশ বুঝতে পারছে রুহি খালার কথা শুনে তার মত বদলে ফেলা উচিত হয়নি। শায়লা আপু শিহাব ভাইয়া তো তার কাছেই সমাধানের জন্য এসেছিলো। তার নিজেকে বদলে ফেলা উচিত হয়নি।  এতদিনে ডিভোর্সের  কাগজপত্র এগিয়ে নিলে নোমান ভাইয়াকেও ঠেকানো যেতো। রাহাত আর কিছু ভাবতে পারছে না। বিষয়টি ভীষণ জটিল হয়ে গেলো। শায়লা আপুকে সুখী দেখাইতো তার চাওয়া ছিল। আপুর চোখের ছায়ার সর্বদাই শিহাব ভাইয়া। আর শিহাব ভাইয়াও আপার জন্য যেভাবে বারবার ছুটে আসছে এমন একটা  বন্ধন এক হতে না দিলে রাহাত সারাজীবন  নিজেকে ক্ষমা  করতে পারবে না। কিন্তু  এখন অনেক দেরী হয়ে গেছে।আর কিছুক্ষণ পরে আপুর হাজবেন্ড নোমান ভাইয়ার বিমান ল্যান্ড করবে। আপুকে নিয়ে তাকে রিসিভ কর‍তে যেতে হবে।কিন্তু শিহাব ভাইয়ার এই খবর জানলে আপুকেতো কিছুতেই শান্ত রাখা যাবে না। উফ ! আমি আর ভাবতে পারছি না। রাহাত সবকিছু নিয়তির উপর ছেড়ে দিল। চারপাশের মানুষের এত কোলাহলেও সে নীরব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

ভেতরে শায়লা  নানান প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।তক্ষুনি তার  শিহাবের মেসেজ দেখাটা তার সম্ভব হলো না। সবকিছু শেষ হতে প্রায় বারোটা বেজে গেলো। শায়লার নিজেজে বেশ ফুরফুরে লাগছে। সে বুঝতে পারছে বাইরের সৌন্দর্যও  মনের প্রফুল্লতা অনেকখানি বাড়িয়ে দেয়। অবশ্য সে এতদিন এসবকিছুর দিকে একেবারে খেয়াল দেয়নি।পুরোটা সময় সে শিহাবের ভাবনায় ডুবে থাকতো। আয়নায় নিজেকে খুব ভাল করে দেখতে লাগলো।নিজের কাছে নিজেকে অচেনা লাগছে। আগের চেয়েও আরো আকর্ষণীয় লাগছে।কিন্তু শিহাবের চোখে কি তা ধরা পড়বে ? শিহাবের কথা মনে হতেই সে ভেবে নিলো নীচে শিহাব অপেক্ষায় আছে দ্রুত বেরুতে হবে। সে বুবলীকে খুঁজতে লাগলো। হঠাৎই বুবলী সামনে এসে দাঁড়ালো। দারুণ এক হেয়ার স্টাইলে তাকে চেনাই যাচ্ছে না। 
চটপটে বুবলী নিজেকে আড়াল করে শায়লার প্রশংসায় একের পর এক বাক্য ব্যয় করে যাচ্ছে। ওয়াও আপু তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে।দুলাভাই আজ এসে তোমাকে চিনতেই পারবে না। 
শায়লার ভেতরে শিহাবের জন্য মনটা খচখচ করছে। কতক্ষণে সে নীচে নামবে। আর যেভাবেই হউক রাহাতকে এড়িয়ে তাকে শিহাবের কাছেই যেতে হবে।আর সে যদি তা না পারে তাহলে আজীবনের মত সে শিহাবকে হারাবে।মনে মনে সে নিনেকে তৈরি করে নিলো। বুবলীকে দ্রুত বিল মিটিয়ে নীচে নামতে বললো। বুবলী ধরেই নিলো, দুলাভাইয়ের জন্য আপুর আর ত্বর সইছে না।
বিল হিসেব পত্র করে বুবলী টাকার লেনদেন সেরে নিলো।  পার্লারের একটি মেয়ে শায়লাকে একটা ফুলের তোড়া উপহার দিয়ে তার সুন্দর দাম্পত্য জীবনের জন্য অভিনন্দন আর শুভকামনা জানালো। শায়লা এক ঝলক শিহাবকে ভেবে লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠলো!   
দুজনে লিফটে নীচে নেমে এলো। শায়লার উৎসুক চোখ  শিহাবকে খুঁজছে।  নিশ্চয়ই শিহাব তাকে দেখে এগিয়ে আসবে।শায়লা শিহাবের লাল বাইকটি খুঁজছে। শায়লা আশেপাশে তাকাচ্ছে।বুবলী বুঝতে পারছে না আপু কাকে খুঁজছে ! ঐতো রাহাত ভাইয়া দাঁড়ানো। শায়লাকে রেখেই বুবলী রাহাতের দিকে এগিয়ে গেলো। 
ভাইয়া এইতো আমরা। গাড়ি কোথায় ? 
রাহাত শুধু শায়লার চোখের দিকে তাকিয়ে।
তবে কি শিহাব ভসিয়া আপুকে জানিয়ে যায়নি ? আপু কেন তবে শিহাব ভাইয়াকে খুঁজছে । সামনে বুবলী দাঁড়ানো, রাহাত স্পষ্ট করে কিছু বলতে পারছে না। কিন্তু শায়লার ব্যথাক্লিষ্ট মনের ছাপ শায়লার মুখে যেন ভেসে উঠেছে !  রাহাত আপুর মনে অবস্থা খুবই বুঝতে পারছে।শিহাবের অনুরোধের প্রতিটি কথাই তার কানে বাজছে।
রাহাত এগিয়ে এসে বললো, আপু বাসায় চলো। আমাদের এয়ারপোর্টে যেতে হবে।
কিন্তু শায়লার চোখে  রাহাতের প্রতি  তীক্ষ্ণ প্রশ্নবান যেন আক্রমণ ক্রতে চাইছে।
নিশ্চয়ই রাহাত শিহাবকে এমন কিছু বলেছে তাই শিহাব চলে গেছে। কিন্তু পরক্ষণেই সে ভাবলো,শিহাব তো কারো কথায় চলে যাওয়ার মত ছেলে নয়! তবে সে কোথায় গেলো ? 
রাহাত আর শায়লার মাঝে দাঁড়িয়ে বুবলী কিছুই বুঝতে পারছে না। কেন আপু গাড়িতে উঠছে না আর কেনইবা রাহাত ভাইয়া আপুকে গাড়িতে তুলছে না। 
শায়লা শিহাবকে কল করতে চাইলো। কেন সে এখানে নেই ? সে তাকে রেখে কেন চলে গেছে ? এসব জানতেই শায়লা ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করতেই শিহাবের মেসেজ দেখতে পেলো। সবটা জেনে শায়লার যেন দেহে প্রাণ ফিরে এলো। সে মনে মনে বলে উঠলো, শিহাব আমি তোমার জন্য আজীবন অপেক্ষায় থাকবো।তবে আরাফের শায়লার জন্য মনটা কেঁদে উঠলো। 
রাহাত এগিয়ে এসে শায়লার হাত ধরলো। আপু চলো,বাসায় যাই।
শায়লা তার অনাগত পরিস্থিতিতে নিজেকে সঁপে দিলো। নিয়তির কাছে সমর্পণ করলো তার ভবিষ্যৎ । সে ধীর পায়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলো। শায়লার চোখে তখনো আজ সকালে দেখা মেরুণ রঙা শার্টের শিহাবের মুখটা মুখটা যেন মিশে আছে। 
শায়লা মনে মনে বলে চললো,  শিহাব তুমি যেখানে যেভাবে বা যতদূরেই থাকো তুমি আমার মনের সবটা জুড়ে। আমি তোমারই অপেক্ষায় আছি। 
ভাইয়া, ফুলের অর্ডার দেয়া ছিল। ওরা কি কিছু জানিয়েছে ? আপুর হলুদের জন্য ফুলের গয়না দেয়ার কথা  আর ফুল দিয়ে ঘর সাজিয়ে দিয়ে যাওয়ার কথা। 
রাহার ভাইয়া ওরা কি যোগাযোগ করেছে ? 
 দায়িত্বশীল বুবলীকে সবদিক দেখতে হচ্ছে।কিন্তু বুবলীর প্রশ্নে রাহাত নিরুত্তর হয়ে রইল।
শায়লা আর রাহাতের মনের ভেতর যেন এক ঠান্ডা যুদ্ধ চলছে। যেখানে রাহাত স্বেচ্ছায় পরাজয় বরন করে নিতে চাইছে।
গাড়ি যানজট কাটিয়ে সেক্টর সাতের দিকে এগিয়ে চললো।
চলবে....

কবি রজেশ কবিরাজ এর কবিতা "প্রতিজ্ঞা"




প্রতিজ্ঞা
রজেশ কবিরাজ

আমাকে দুর্বল করে না প্রবল ঝড়
যবে ছেড়ে এসেছি ঘর।
নিয়েছি কতজনকে আপন করে 
সবাই ভেবেছে আমাকে পর।
নেইকো আমার ক্ষুধার জ্বালা 
নিভৃতে কাটিয়েছি কত বেলা,
খেলেছি কতজনের সাথে কত খেলা !
তবুও আমাকে কেউ পরায়নি প্রেমের মালা।
আমার অন্ধকার প্রতিটা রাত 
কাটে স্বজনহারা বিষাদে ;
মনে হয় আমি ফিরে যাই -
আবার আমার আপন স্বদেশে।
আমি হেঁটে যাই নিঃশব্দে 
কাঠফাটা রোদ্দুর দুপুরে কিংবা রাত্রে,
কত জনকে ভিক্ষা দিয়েছি সযত্নে ;
তবুও মনে হয় আমি কি -
ভুল করছি প্রতিটা ক্ষেত্রে ?!
এই আলোয় ভরা ধরার মাঝে
সেজেছি কতভাবে কত সাজে !
তবুও ভুলিনা কত শত আঘাতের ক্ষত
ভেসে ওঠে সেই ক্ষত মাঝে মাঝে।
দেখেছি চোখের সামনে কত মানুষ
বলেছে এসে মধুর কথা,
তাদের ভালোবেসে দেখেছি আমি 
তারাই দিয়েছে আগে শত শত ব্যথা।
চোখ মেলে দেখেছি এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে
পড়েছে লাশের পরে লাশ,
তবুও একজন কেউ দেখিনি 
কাউকে ভালবেসে নিতে মনুষত্বের শ্বাস।
যতদিন আছি পৃথিবীতে বেঁচে 
পারব কি দেখে যেতে মানবতার বিকাশ !
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হবো আজ, যতই পাই যত ব্যথা
করে যাব মানুষের জন্য কাজ।
আমি চাই আপন হতে সবার,
চাইনা হতে ইতিহাসের পাতায় অমর।

কবি ইসলাম'রবি এর কবিতা "অদৃশ্য গোপন চিঠি"




অদৃশ্য গোপন চিঠি
ইসলাম'রবি

সারাদিনের কর্মব্যস্ততা শেষে 
ক্লান্ত দেহ নিয়ে বাসায় ফিরে ,
খাবার আর তারা দেখে বিছানার চাদরে 
শরীল যখন এলিয়ে দেই ,
একটি শূন্যতা তোমায় মনে পড়ে
বহুদূরে আম্মা তবুও আছো মনের ঘরে ,
অবশেষে রাতের আকাশকে প্রশ্ন করি 
আম্মা তুমি কেমন আছো বিধাতার কাছে ?
জাগতিক সব স্মৃতি জেগে ওঠে তখনই 
এক বুক হাহাকার সাধ্য কার সান্তনা দেওয়ার ,
সবার কাছে অনেক বড় মানুষ আমি
তুমি একমাত্র এখনো ছোট মনে করেছ 
তোমার ছোট্ট রাগের জাহাজকে ,
যেখানে আছি যেভাবে আছি 
আম্মা তুমি আছো মস্তিষ্কের অলিগলিতে 
এই জগত সংসারে ছায়া তরু হয়ে ,
আম্মা তোমার মত আর কেউ হয় না
তোমার তরে চিঠি লিখি আমার সময়ে
সুখের সব মূহূর্ত এসে হাজির হয় বসলে ,
চিঠিকে বলি উড়ে যা অদৃশ্য হয়ে আম্মার কাছে 
আর আমার সালাম দিস আম্মার তরে,
আম্মা তোমার সাথে আমার প্রেমের রচনা নাই 
কিন্তু তোমার সাথে আমার আত্মার আত্মার সম্পর্ক !