২৬ মার্চ ২০২২

কবি সেলিম সেখ এর কবিতা ""বদেহ





শবদেহ
সেলিম সেখ

বাতাসে মিশে গেছে
পোড়া লাশের গন্ধ,
বুদ্ধিজীবীরা চুপ কেনো
হয়েছে কি তারা অন্ধ?

চারিদিকে খুনোখুনির রাজ 
চলছে বাংলার বুকে,
শান্তির এই বাংলায়
অশান্তি গেছে ঢুকে।

বাংলার মানুষ দেখল
অগ্নিদগ্ধ কত শব,
চোখেতে অশ্রু মোর
জমেছে অনেক ক্ষোভ।

ঘৃণ্য রাজনীতির বলি
তরতাজা কত প্রাণ,
এমন দৃশ্য দেখল দেশ
থাকল কি রাজ্যের মান।

রাজনীতির করালগ্রাস
আনছে ডেকে মরণ,
একে অন্যের নিচ্ছে প্রাণ
এটাই কি রাজনীতি ধরন? 

কত যন্ত্রণায় গিয়েছে প্রাণ
ভাবলে কষ্ট হয়,
করছে যারা এমন কাজ
তারা কি মানুষ নয়!

মানব হয়ে মানব হত্যা
কত যে ঘৃণ্য কাজ,
বুঝলে এমন পাপে 
লিপ্ত হত না আজ। 

রাজনীতি হোক শান্তি প্রিয়
ঝরুক শান্তিধারা, 
জাগ্রত হোক মানবপ্রেম
কেউ যাবেনা মারা।

শামীমা আহমেদ এর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৭৭




ধারাবাহিক উপন্যাস 

শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত (পর্ব ৭৭)
শামীমা আহমেদ 

অফিসে নিজ রুমে পৌঁছাতে  শিহাবের প্রায় সকাল এগারোটা বেজে গেলো। শিহাব দ্রুতই তার মেইল চেক করতে বসে গেলো। গতকাল বেশ কিছু বায়ার ফ্যাক্টরী পরিদর্শন শেষে  মেইলে তাদের মতামত জানাবে বলে বিদায় নিয়েছে।আর এর সাথে শিহাবের ফ্যাক্টরির  জন্য অনেক অর্ডার প্লেস হওয়াও জড়িত। শিহাবের সর্বাত্মক চেষ্টা ছিল তাদের স্যাটিসফাই করার। দেখা যাক,তাদের কেমন রেস্পন্স আসে। তবে এখনো কোন মেইল ইন করেনি। শিহাব অপেক্ষায় রইল। কবির এসে নাস্তার কথা জেনে গেলো।
শিহাব নান রুটি আর বুটের ডাল আনতে বলে একটু রিল্যাক্স ভঙ্গিতে  চেয়ারে গা এলিয়ে দিলো। শিহাব নিজের জীবনের সবকিছু খুব গভীরভাবে ভাবছে। শায়লা  আর রিশতিনা, অতীত আর বর্তমানের মাঝে শিহাব নিজেকে নিয়ে একটা সিদ্ধান্তে আসতে চাইছে। এই একার জীবনের অবসান ঘটাতে চাইছে। নাস্তা আনার আগে কবিরকে এক কাপ কফি দিয়ে যেতে বললো। কবির কফি রেডি করে সামনে দিতেই শিহাব জানতে চাইলো, আচ্ছা কবির তুমি কি আমাকে বলবে জীবনটা কি সহজ না জটিল ? মাঝে মাঝেই শিহাব কবিরের কাছে এমন ভাবনার কথাগুলোর মতামত নেয়। শিহাব জানে,যারা স্বল্প আয়ের মানুষ  তাদের কাছে জীবনের অর্থ খুবই সহজভাবে ধরা দেয়।খুব বেশি চাওয়া পাওয়া তাদের থাকে না।কবির বুঝতে পারলো,স্যারের মনটা আজ বোধহয় ভালো না।কবির জানালো, স্যার জীবনটারে সহজভাবে দেখলেই জীবন সহজ আর জটিলতারেও সহজভাবে নিয়ে সমাধান করলে পেরেশানি কম হয়।কথাগুলো বলে কবির নাস্তা আনতে বেরিয়ে গেলো।  
শায়লাকে একটা  কল করতে হবে। বেশ কয়েকদিন হলো, শায়লার সাথে ঠিকমত কথা হচ্ছে না। শিহাব মোবাইল হাতে নিতেই মেইলের নোটিফিকেশন এলো।শিহাব হাত থেকে মোবাইল নামিয়ে রেখে ল্যাপটপ স্ক্রিনে  চোখ দিতেই মোবাইল বেজে উঠলো।  শিহাব আড়চোখে দেখে নিলো।শায়লার কল।কিন্তু মেইলটা দেখা জরুরি। শিহাব কলটি কেটে দিয়ে কাজে মনযোগী হলো। 
ওপ্রান্তে শায়লা ভীষণভাবে বিব্রত হলো। আজ এতদিনের পরিচয়ে শিহাবতো কখনো তার কল কাটেনি।ব্যস্ততায় রিসিভ করতে না পারলে পরে কল দিয়েছে।শায়লা বুঝতে পারছে না কেন শিহাব এমন করছে ? কেন তাকে এড়িয়ে চলতে চাইছে ?  তবে কি সে রিশতিনার প্রতি কোন সিদ্ধান্তে এসেছে ? শায়লার ভেতরে ক্রমাগত নানান প্রশ্নের জন্ম নিচ্ছে। শিহাবকে না পাওয়ার আশংকায় ভীষণ উৎকন্ঠা হচ্ছে। কিন্তু  যা-ই হউক না কেন, এ ব্যাপারে শিহাবের সাথে তার কথা হতেই হবে। তার কাছ থেকে সরাসরি শুনতে হবে সে কি চাইছে ? সে তার নিজের পরিবারের মান সম্মানের দিকে না তাকিয়ে শিহাবের জন্য কঠিন সিদ্ধান্তে আসতে চাইছে। আর শিহাব  ঘরে রিশতিনাকে  নিয়ে তার সংসার জীবন যাপন করছে ? শায়লা অস্থিরতায় ঘরের এপাশ ওপাশ করছে। শায়লা আবার শিহাবকে কল দিলো। তিনবার রিং হওয়াতেই শিহাব কল রিসিভ করলো। আর হ্যালো বলেই শায়লার উত্তরের
অপেক্ষা না করেই বললো, শায়লা আমি একটু বিজি।একটা টেলি কনফারেন্স চলছে। শেষ হলেই আমি কল দিচ্ছি। বলেই সে কল কেটে দিল।রাগে দুঃখে অপমানে শায়লা ঝরঝর করে কেঁদে দিলো।শিহাব যে একরাতেই এমন করে বদলে যাবে শায়লা তা ভাবতে পারছে না। 
তাদের বাড়িতে তার বিয়ের আয়োজন চলছে। তার জন্য গোটা বাড়ি উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে। যেখানে শায়লার মন পেতে নোমান সাহেব বারংবার শত কাকুতি মিনতিতে শায়লার কান ভারী করে তুলছে আর সেখানে শিহাবের এমন অবজ্ঞা ভরা আচরণ, শায়লাকে ভীষণ অবাক করে দিচ্ছে।  
দীর্ঘ প্রায় চল্লিশ মিনিটের টেলিকনফারেন্স শেষ করে বিভিন্ন দিকে শিহাব তার প্রয়োজনীয় মেইল পাঠালো। ঘড়ির কাটা তখন দুপুর বারোটা পার হয়ে গেছে।টেবিলে নাস্তা পড়ে আছে। শিহাব ওয়াশরুম থেকে  ফ্রেশ হয়ে এসে নাস্তায় হাত লাগাতেই শায়লার কলের কথা মনে পড়লো।শিহাব ভাবলো, একেকদিন যে কেমন ব্যস্ততা যায় ! 
সে নাস্তা খেতে খেতেই শায়লাকে কল করলো। 
এই ফোন কলটি শায়লার ভীষণ রকম কাঙ্খিত  হলেও, শিহাবের প্রতি প্রচন্ড অভিমানে শায়লার চোখের  জল উপচে পড়লো।একবার সম্পূর্ণ কল হয়ে যাবার পর দ্বিতীয় কলে শায়লা রিসিভ করলো।কিন্তু নীরবতায় মনের কষ্ট বুঝাতে চাইলো যেন!
শিহাবই প্রশ্ন করলো, শায়লা আমি দুঃখিত তখন তোমার কলটি ধরতে পারিনি।দেখো, অনেক ব্যস্ততা ছিল। তাইতো এই এখন সকালের নাস্তা করছি। শায়লা ভীষণ অবাক হলো। দুপুরের খাবারের সময় হয়ে এলো,আর শিহাব কিনা এখন নাস্তা করছে ! তাহলে শিহাব তাকে এড়িয়ে যায়নি, সত্যিই ব্যস্ততা ছিল। আর সে কিনা শিহাবকে নিয়ে কতকিছুই ভাবলো। 
কেমন আছো তুমি শায়লা ? 
আমি ভালো আছি কিন্তু আমার মনে হয় তুমি আমার চেয়ে আরো বেশি ভালো আছো !
কেন এমন কথা শায়লা? তোমাকে দূরে রেখে তোমার চেয়ে কেমন করে ভালো থাকবো ? 
কেন? আমাকে ছাড়াওতো ভালো থাকা যায়, আর সেটা দোষেরও কিছু না। শায়লার কণ্ঠে অভিমান ঝরে পড়লো।
শিহাব বুঝতে পারছে না কেন শায়লা তার সাথে আজ এভাবে কথা বলছে?কিন্তু বরাবরই শিহাব শায়লার সাথে সব ব্যাপারে  স্বচ্ছতা বজায় রেখে চলছে।তার বুঝতেই হবে আজ কেন শায়লা তার সাথে এতটা বৈরী আচরণ করছে ? তবে কি সে তার কাছ থেকে সরে যেতে চাইছে ? শিহাবের জানা মতে শায়লার স্বামী শীঘ্রই দেশে আসছে।তবে কি শায়লা তার সিদ্ধান্তে কোন পরিবর্তন এনেছে? নাহ! শায়লার সাথে এ ব্যাপারে সরাসরি কথা বলা প্রয়োজন। শিহাব কথাটি ভাবতেই শায়লার দিক থেকেই প্রস্তাব এলো,শিহাব তুমি আমার সাথে আজ একটু দেখা করতে পারবে।শায়লা দেখলো, শিহাব খুব সুচারুভাবেই রিশতিনার প্রসংঙ্গ এড়িয়ে যাচ্ছে।
শিহাব বললো, অবশ্যই, তবে এখুনি বেরুতে পারবো  না।আমার কিছু ইম্পর্টেন্ট আরো কিছু মেইল আসবে।তুমি চাইলে আমার অফিসে চলে আসতে পারো।চলে আসো। আমার অফিসটা দেখে যাও।একসাথে দুজনে কফি খাই। 
শায়লা শিহাবের কথায় অবাক হলো। শিহাব যদি তাকে এড়াতেই চাইতো তবে তো তাকে অফিসে যেতে বলতো না! মূহুর্তেই শায়লার মনে শিহাবকে নিয়ে সব দ্বন্দ্ব ঘুচে গেলো,তবে রিশতিনার বিষয়টি আড়ালেই রইল।
শিহাব পুনরায় শায়লাকে তার অফিসে আসতে অনুরোধ করলো। শায়লা রাজী হয়ে শিহাবের কাছে প্রস্তুতির জন্য সময় চেয়ে নিলো। কারণ  এখন বাড়ির  বাইরে যেতে হলে বাড়ির লোকজনকে ম্যানেজ করতে হবে। যেভাবে রুহি খালা তাকে নজরবন্দি করে রেখেছে। শায়লা বাইরে যাওয়ার অনুমতি পেতে  রাহাতকে কল করলো।

রাহাত অফিসেই ছিল।শায়লার এমন আব্দারের কল পেয়ে রাহাত বেশ চিন্তিত  হলো। আবার কোন অঘটন ঘটে যাচ্ছে নাতো ? পরক্ষণেই শায়লার উপর তার আস্থা এলো। আপু যদি এমন কিছু করবেতো আর বাইরে যেতে তার অনুমতি চাইতো না। তাছাড়া শিহাব ভাইয়াও খুবই ভাল মানুষ  নিশ্চয়ই তিনি ব্যাপারটা বুঝবেন।ভাল লাগা ভালবাসা হঠাৎই  হতে পারে কিন্তু আমরাতো কেউ সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন নই।ফোন কলের জবাবে রাহাত শুধু এটুকুই বললো, আপু আমাদের পরিবারের মান সম্মান এখন তোমার হাতে আর দুদিন পরেই নোমান ভাইয়া আসছেন।বাড়িতে অনেজ লোকজন আত্মীয়স্বজন।
শায়লা রাহাতকে আশ্বস্ত করলো, এমন কিছুই ঘটবে না যা পরিবারের সম্মান ক্ষুন্ন করবে। শিহাবের সাথে আমার কিছু জরুরী কথা আছে।আমি দ্রুতই  ফিরবো। মনে রেখো, আমি চিরকাল নিজের  সুখের চেয়ে তোমাদের জন্যই বেশি ভেবেছি।
কথাটা শতভাগ সত্য বলে রাহাত একমত হয়ে নিশ্চুপ রইল।
শায়লা রাহাতকে অনুরোধ করলো, ঠিক আছে, মাকে  আর রুহি খালাকে কল করে জানিয়ে দিও যেন আমাকে বাধা না দেয়।আমি পার্লারে যাচ্ছি বলে বেরুবো। 
শিহাব ভাইয়া আর শায়লা আপুর জন্য রাহাতের মনটা কেঁদে উঠলো। রাহাত বেশ বুঝতে পারছে, শুধু তার একটু সহযোগিতা থাকলে আপু আর শিহাব ভাইয়াকে এক হওয়া থেকে কেউ ফেরাতে পারতো না। সবকিছু ভেবে রাহাত নিজেকেই দোষী ভেবে নিলো।
ফোন কল শেষ করে শায়লা তৈরি হওয়ায় ব্যস্ত হলো। ট্রুং করে মোবাইলে ম্যাসেজ এলো। শায়লা মোবাইল মেসেঞ্জার  ওপেন করেতেই মূহুর্তেই তার মনটা আনন্দে উছ্বসিত হয়ে উঠলো!
অফিস এড্রেসের সাথে  দারুণ এক সেল্ফি পাঠিয়েছে শিহাব ! পরনে কালো শার্ট, সামনে কয়েকটি বোতায় খোলা,আহ !  শিহাবকে মনে হচ্ছে যেন কোন মুভির হিরো ! তার অফিসের চেয়ারে বসে তোলা। শায়লা স্থির দৃষ্টিতে ছবিটির দিকে তাকিয়ে রইল।যেন শিহাবের চোখ কথা বলছে,...তাড়াতাড়ি চলে আসো শায়লা। আমি তোমার অপেক্ষায় আছি।


চলবে....

কবি নাসিমা মিশু এর কবিতা "ভালোবাসি"




ভালবাসি
নাসিমা মিশু

ভালবাসি-
তোমার তুমির তুমিকে।
ভালবাসি-
তব না দেখা বিস্মৃতির অতলের তলে 
ডুবে থাকা তোমাকে দেখব বলে ।

ভালোবাসি- 
তব জীবন ধারায় অন্য সুরের মূর্ছনা এসে 
সুখ সুধায় তোমাকে জড়িয়ে নিবে তাতে নয়ন 
জুড়িয়ে নিব বলে ।

ভালোবাসি- 
তোমার তুমিকে নিয়ে দারাপরিবার সহ সুখ বাসরে 
স্থুত তা দেখে তৃপ্ত হবো বলে ।

ভালোবাসি- 
তব সকল আনন্দ ধারায়  আনন্দে তুষ্ট হবো বলে ।

ভালোবাসি- 
তব জীবনীশক্তিতে উজ্জীবিত হয়ে পৃথিবী আলোকিত 
হবে তার দিপ্তী দেখব বলে ।

ভালোবাসি- 
তোমার তুমি তোমরা সুখী গৃহবাসী তার বিচ্ছুরিত বিকশিত বিকিরণ দেখব বলে। 

ভালোবাসি- 
তব ভালো লাগায় ভালোবাসাসম মানস সৌন্দর্যের 
পরিপূর্ণতার পরিস্ফুটন দেখব বলে ।

ভালোবাসি- 
তব অন্ত গহীন হৃদয়ের অব্যক্ত যে আবেগ তার দরদী 
গভীরতায় কতটা গভীর তা অনুভব করব বলে ।

ভালোবাসি- 
তব দেখার যে মমতা মাখা দৃষ্টি আমার তাতে শুধু 
ভালোবাসার অনুভবই অনুভূত হবে বলে ।

এ নয় বাড়াবাড়ি, 
এ পরিশুদ্ধ পরিচ্ছন্ন স্বচ্ছ এক আবেগ ।
এক অস্তগামী অদৃশ্য মানবের আকুতি ।

কবি আমিনা তাবাসসুম এর কবিতা





অথচ রৌদ্রের ঘ্রাণ 

আমিনা তাবাসসুম 

খুবলে খুবলে স্বপ্ন খাও তুমি
বাতাসের চিৎকার
ফুলের চিৎকার
হরিণীর চিৎকার
আগুনের আঁচে চেটেপুটে রোদ শুষে  রোজ

এখানে রূপের রহস্য রাঙা কই মাছ
এবং সমস্ত পৃথিবীর প্রাণে
         সেসবের ঘ্রাণ লেগে থাকে

রাত কেঁদে ওঠলে ঈশ্বর ভুলে যান
ইরা এবং ইরকের কথা

তখনও আমার চোখে অশ্রু থাকে
আর এখনও সেসব
         মিশে আছে চোখের চুমুকে

২৫ মার্চ ২০২২

মমতা রায়চৌধুরীর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৪১




উপন্যাস 

টানাপোড়েন ১৪১
অন্য পৃথিবীর স্বপ্ন
মমতা রায়চৌধুরী

সাতসকালে কলিং বেল বাজছে ''জয় রাধা মাধব জয় রাধা মাধব।" রেখা বাথরুমে থেকে কলিংবেলের আওয়াজ পাচ্ছে কিন্তু বের হতে পারছে না ,বেরোনোর কন্ডিশন নেই। আবার বাজছে' জয় রাধা মাধব, জয় রাধা মাধব ,জয় রাধা মাধব।'
রেখা ল্যাট্রিনের কলটা ফ্ল্যাশ করার পর তাড়াতাড়ি হাত পা ভালো করে ধুয়ে ছুটল দরজা খোলার জন্য।
রেখা মনে মনে বলল যেন যমরাজ নিতে  আসলেও এ সংসারে কাজের জন্য আবার ফেরত আসতে হবে।
দরজা খুলেই তো রেখা অবাক 
'একি মাসি ,তুমি ভোর পাঁচটায় এসে হাজির।'
মাসির চোখ মুখ শুকনো লাগছে, কিছু কি 
হয়েছে ?মনে মনে ভাবছে রেখা।
'আর বোলো না বৌমা ,আমার ছাগলটা বাচ্চা দিতে গিয়ে কি কষ্ট পাচ্ছে বাচ্চা বের করতে পারছি না।'
মাসির চোখ দুটো জলে ভিজে গেল কথা বলতে বলতে।
সেকি মাসি?
তাই একটু তাড়াতাড়ি আসলাম কাজগুলো  করে দিয়ে চলে যাব।
'তুমি ডাক্তারের কাছে যাও ।তোমাকে আজকে কাজ করতে হবে না।'
' মাসি কেমন অবাক হয়ে রেখার দিকে তাকিয়ে থাকলো। তারপর আর যেন চোখের জল  বাগ  মানলো না।
'কি বলছো বৌমা ,কাজ না করে চলে যাব?'
'আমি তো তোমাকে বলছি তুমি চলে যাও। তোমার কাজের থেকে ওর যে প্রাণ বাঁচানো অনেক বেশি জরুরী মাসি।
অনেক কষ্ট পাচ্ছে তুমি তাড়াতাড়ি ডাক্তারের কাছে যাও।'
রেখা বুঝল মাসির পৃথিবীটা ওদেরকে নিয়েই ওদের ভালো থাকা, মাসির ভালো থাকা।
'কিন্তু..?'
'কোন কিন্তু নয়।
তুমি বরং একটু বসো ,চা খেয়ে যাও।'
তুমি যে বলেছ এতেই আমার শান্তি কিন্তু তোমার শাশুড়ি মা যদি  অশান্তি করে।'
'করুক অশান্তি।তুমি তো চেন উনাকে? ওনার কথা অতো ধ'রো না মাসি ।বয়স হয়েছে তো।'

'কত বাড়িতে কাজ করেছি ,তোমার মত করে কেউ কথা বলে না বৌমা। সবাই তাদের কাজটাই বুঝে নিতে চায়।
আসি তাহলে বৌমা?'
যেতে গিয়ে আবার ফিরে এসে বলে
'আমি কি বিকেলে এসে  করে দেবো বৌমা কিছু?'
'তোমাকে বিকেলে আসতে হবে না।'
সারাদিন কি হ্যাপা পোহাতে হবে, কি হবে কে জানে ?ভগবান করুক সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যাক।'
ভগবানের কাছে এই প্রার্থনা একটু ক'রো  বৌমা,আমার এই পোষ্যর জন্য।'
'হ্যাঁ মাসি, সে কথা আর বলতে।
তুমি কোন চিন্তা ক'রো না ।দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে। তাড়াতাড়ি ডাক্তারের কাছে যাও।'
'আচ্ছা বৌমা, আসি তাহলে। তোমার খুব কষ্ট হবে আমি জানি।'
'তুমি সব জানো ।একদিন নয় আমার কষ্ট হবে, কি হবে তো?'
মাসি চলে যাবার পর দরজাটা লাগাতে গিয়ে দেখে ওই দিকের কালী আর তার বাচ্চা এসে হাজির রেখার আওয়াজ পেয়ে ।
আসলে ওই দিকের বাচ্চাগুলো তো রেখা খাবার দিতে যায়। কোন কারনে হয়তো যাচ্ছিল।
লেজ নাড়তে নাড়তে গেটের কাছে আসলো।
রেখা বলল'দাঁড়া, বিস্কিট নিয়ে আসি।
 আট-দশটা ব্রিটানিয়া বিস্কুট নিয়ে এল। রেখাকে দেখে বাচ্চাটা যেন হামলে পরল ।তখন রেখা আদর করে বিস্কিট গুলো খাওয়ালো ।
যা এবার খাওয়া হয়ে গেছে ।তোদের পাড়ায় যা। মিলি ওর বাচ্চা দেখলে কিন্তু চেঁচাবে।'
কি বুঝলো ,কে জানে? সত্যি সত্যি কালী তার বাচ্চা নিয়ে বেরিয়ে গেল। রেখা দরজা বন্ধ করে এসে ভাবতে লাগলো কোন কাজটা আগে করবে।
রেখা একটা ছক করে নিল কারণ স্কুলে যেতে হবে। তাড়াতাড়ি কাজে হাত লাগাবে।
ইতিমধ্যে রেখা বসার ঘরগুলো ঝাট দিতে শুরু করলো ।কোন কারণে  মনোজ টয়লেট যাবে বলে উঠেছে ।রেখাকে কাজ করতে দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল 
'তুমি উঠে কাজ করছ?কি ব্যাপার, মাসি আসবে না নাকি?'
'আজকে মাসি কাজে আসবে না। বলছিল ওর পোষা ছাগলটি নাকি বাচ্চা দেবে .তা ওর খুব সিরিয়াস অবস্থা ।বাচ্চার একটা পা বাইরে বেরিয়ে আছে ,বাকিটুকু সব ভেতরে অনেক টানাটানি করার পরও বাচ্চা বের করতে পারে নি। আহা রে গরিব মানুষ দুটো এসব পশু পুষে গরিবের টানাটানির সংসারে একটু আয়ের চেষ্টা।'
"কাজে এসেছিল মাসি?'
'হ্যাঁ এসেছিল।
আমি মাসিকে বাড়ি যেতে বললাম।'
"ঠিকই করেছ।
 না না চলে যাও ডাক্তার ডাক।'
মনোজ টয়লেট কোরে যাবার পথে একটা বড় হাই তুলে বলল 
"চা করেছ?'
তারপর কি মনে হল বসার ঘর টাতে টিভিটা চালিয়ে দিল।
নিউজ চ্যানেলে দেখাচ্ছে রাশিয়া-ইউক্রেন এর যুদ্ধ। কী ভয়ঙ্কর!
রেখাও তাকিয়ে থাকে। রেখার গা শিউরে ওঠে।
ছিন্নভিন্ন লাশ এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
রেখা হঠাৎ করেই কবিতা আবৃত্তি করে
কবি মৃদুল দাশগুপ্তের কবিতা'
"ক্রন্দনরতা জননীর পাশে
এখন যদি না থাকি
কেন তবে লেখা, কেন গান গাওয়া
কেন তবে আঁকাআঁকি?

নিহত ভাইয়ের শবদেহ দেখে 
না -ই যদি হয় ক্রোধ
কেন ভালোবাসা, কেন বা সমাজ
কিসের মূল্যবোধ!"

মনোজ বলল' কবি মৃদুল দাশগুপ্তের কবিতা আওরাচ্ছ ঠিক আছে।
 কিন্তু তুমিও তো  লেখিকা ।তুমি ও সমসাময়িক বিষয়  তোমার লেখায় স্থান দাও।"
রেখা কেমন অবাক হয়ে গেল। মনোজ রেখার লেখা নিয়ে ভাবছে ।
' ওকে বুঝেই উঠতেই পারে না রেখা ।আসলে কখন যে কি বলে?
মনোজ বলল 'চা দেবে?
 দিদি, মায়েরা তো ওঠেনি।'
ঠিক আছে চা করে আনছি বসো একটু।"
রেখা রান্নাঘরে গেল চা করতে ।এদিকে মাথার মধ্যে ঘুরছে  রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধের ভয়ঙ্কর দৃশ্য।
রেখার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে

'নিহত সব দেহের ওপর দাঁড়িয়ে
কিসের এত উল্লাস?
কত মা তার সন্তান  হারিয়ে
অন্ধ হলো চোখের জলে। 
কত পত্নী স্বামী হারালো
প্রেমিকা   প্রেমিককে।
আর..
 অগণিত সাধারণ মানুষ
প্রাণ দিল অকারণে। 
তবুও  হয় না জাগ্রত বিবেক
নির্লজ্জ অমানুষদের।
জিহ্বা তাদের লকলক করে
ক্ষমতার লোভে বলিয়ান হয়ে।
চালায় অসংখ্য গোলাবারুদ
তাজা প্রাণ ঝরায় অকাতরে।
একবার যদি তাকিয়ে দেখত
 ওই প্রেমিকার  দুটি চোখ
দেখ তো কত ভালোবাসা র
 বীজ লুকিয়ে আছে
সৃষ্টি হতো শত শত।
সৃষ্টির চেয়ে  মহৎ আর
কিছু নেই যে ভবে।
ধ্বংসলীলায় মত্ত হয়ে
কষ্ট শুধু বাড়ে
এই বোধ এই চেতনা যেদিন
আসবে ঘুরে মনে।
তখন..
পৃথিবীটাই অন্যরকম হবে।'

মনোজ বলল' বাহ কি অসাধারণ বললে গো।'
কবিতাটার একটা নাম দিয়ে তুমি পত্রিকায় দিয়ে দাও না।
দূর লিখছি এখন উপন্যাস ।এখন আবার কবিতা?
অনেকদিন পর দুজনে চা খেতে খেতে গল্প করছে।
ভয়ঙ্কর কোনো পরিস্থিতি মানুষকে কাছে এনে দেয় যুদ্ধের এই ভয়ঙ্কর খবরটা শুনে বোধহয় একটা আলাদা রকম রেখার মনোজের জীবনে মাত্রা এনে দিল।
এমন সময় রেখার ননদ শাশুড়ি মা ঘুম থেকে উঠে একই ঘরে দুজনকে দেখে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন কিন্তু মুখে কিছু প্রথমে বললেন না।
মনোজ বলল' দিদি মা এসো চা খাবে?'
 মনোজের দিদি বলল ' না আমাদের ঘরে চা দিতে বল?'
ঠিক আছে।
"রেখা ওই ঘরে গিয়ে চা টা দিয়ে আসো।
মা শোনো আজকে মাসি কাজে আসবে না।
আর  রেখা তো  স্কুলে যাবে। সব রান্না করে উঠতে পারবে না। তোমরা হাতে হাতে করে নিও।'
 রেখা কেমন অবাক হয়ে গেলো 
রেখা ঝটপট চা দিয়ে কাজগুলো গুছিয়ে নিল।
মিলিদের খাবার টা আগেই করেছিল,ওদের খাবারটাও দিয়ে আসলো।
বেসিনে গাদাগুচ্ছ বাসন  জমানো আছে। চটপট হাত লাগাল।
এদিকে জলখাবার করতে হবে।
বাসন মাজার আগে একদিকে পেশার কুকারে ডাল অন্যদিকে আলু চচ্চড়ি বসিয়ে দিলো।
বাসন মাজা হয়ে গেলে পরোটা করে ফেলল।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন টাইম হয়ে যাচ্ছে আর কিছু করতে পারবে না রেখা।
তবে ডাল সাতলে নেবার আগে বেগুন ভাজা করে নিল।

এবার রেখা স্নান করতে গেল। স্নান সেরে এসে ঝটপট পুজোর ঘরে গেল। শাশুড়ি মা তো বলেই খালাস পুজো করবেন। একদিনও পুজো করতে ঢোকেন না।
তাই ওনার ভরসায় না রাখাই ভালো ।বাড়িতে গোপাল আছে।

পুজো সেরে এসে মনোজ কে  বললো 
'তোমার জলখাবার কি এখন দিয়ে দেব?'
'হ্যাঁ দিয়ে দাও।
মা, দিদি তোমরা এখন খাবে নাস্তা?'
', এখন খাব না।'
'ঠিক আছে। রেখা ,তাহলে তুমি খেয়ে নাও।'
 খেয়ে তুমি স্কুলে চলে যাও।'
রেখা অবাক হয়ে যাচ্ছে এই টুকুই তো শুধু চেয়েছে ? অথচ রেখাকে টানাপোড়েনের মধ্যে রাখতেই হবে।কেন যে মাঝে মাঝে মনোজ এরকম করে ওর সাথে ? রোদ্দুর ভরা আকাশে  মাঝে মাঝে মেঘ ঘনিয়ে আসে। বুঝে উঠতে পারে
 না ।সেই মেঘটা যদি সাময়িক হয় ,তাও হয় ।তার স্থায়িত্ব টা অনেক বেশি থেকে যায় ,চারিদিক তখন শুধু মনে হয় অন্ধকার আর অন্ধকার। দিশেহারা রেখা আলোর পথ হাতড়ে বেড়ায়।
সব সময় একটা মানসিক যুদ্ধ মাঝে মাঝে ঠেলে দেয় অন্য জগতে অথচ রেখা চেয়েছে মনোজকে নিয়ে একটা সুন্দর পৃথিবী গড়তে ।সেই পৃথিবীতে শুধু থাকবে চিরশান্তি।

কবি তাহেরা আফরোজ এর কবিতা "শূন্যপুরে"




শূণ্যপুরে 
তাহেরা আফরোজ

নদীর মতো কুলু কুলু শব্দে বয়ে যায় 
প্রেম নাকি বিষাদ বুঝতে পারি না 
কেবল শূন্যতা টের পাই 
যতদূর দৃষ্টির সীমানা, ততোদূর বিস্তৃত শূণ্যতা।
পূর্ণতা দেবার প্রতিজ্ঞায় অবিচল থাকা যে মানুষ 
সেও শূণ্যপুরে টেনে নেয় আমাকে, 
আমার করতলে ফোঁটা সব পদ্ম 
হাওয়ায় উড়ে যায় 
আমি তাকে ধরতে চাই না 
আমি তাকে ধরতে যাই না।

কবি সুপর্ণা চ‍্যাটার্জ্জীর কবিতা




হঠাৎ ভালোলাগা 
সুপর্ণা চ‍্যাটার্জ্জী



কেমন করে হঠাৎ যেন ভালো লেগে গেল
সবকিছুকে।
ভালো লেগে গেল
দূরের সবুজ ও নীল দিগন্তকে।
ভালো লেগে গেল 
বৈশাখ ও  জৈষ্ঠ‍্যের ঝোড়ো হাওয়া 
আর মেঘলা আকাশকে।
কেন জানিনা 
খুব ইচ্ছে করে হাওয়ার সাথে ছুটে চলি
ক্ষেতের পারের আল ধরে।
কে যেন শুধালো কেমনকরে লাগল ভালো?
বলব নাগো সেই কথাটি,
সে যে আমার গোপন ঘরের আসল চাবি কাঠি।
ঐটুকু মোর সম্বল,
কেউ নিওনা কেড়ে 
যা আছে মোর করনীয় 
করব আমি সবার তরে।

কবি গোলাম কবির এর কবিতা





হাসির রাণীকে নিয়ে কবিতা 

   গোলাম কবির


   ফেসবুকে আমার একজন খুব কাছের
   দিদিমণি আছেন, তিনি প্রায়ই লিখেন - 
  " একদিন হারিয়ে যাবো এই অভিনয়ের
   শহর ছেড়ে! " কথাটা ভীষণ সত্যি!
  কিন্তু কিরকম সাবলীল ভাবে লিখেন 
  কথা গুলো ভাবতে অবাক লাগে! 
  এতো হাসিখুশি মেয়ের এই লিখা পড়ে 
  হৃদয় আদ্র হয় প্রায়শই, অথচ তাকে 
   আমি নাম দিয়েছি " হাসির রাণী "!  
  মাঝেমধ্যে ভাবি কি এমন দুঃখ আছে
  ওর যা সকলের কাছেই লুকিয়ে রাখে
  অথচ কী সুন্দর করে মজার মজার 
  পোস্ট দিতেই থাকে অবিরাম! 
  মানুষের মুখ এখনো পড়তে পারলাম না
  ভালো করে, কেউ কি পারে! 
  একটা মানুষ কী সুন্দর হাসে, সংসার করে, 
  কবিতা লিখে, মানুষকে হাসিয়ে মাতিয়ে 
  রাখে অথচ ঝিনুকের মতো নিজের
  ভিতরের কষ্টকে লুকিয়ে রাখে সযতনে, 
  তখন আমারও বলতে ইচ্ছে করে - 
  সত্যিই সেলুকাস, কি বিচিত্র এই দেশ 
  এবং দেশের মানুষ গুলো!

( কবিতাটি কবি বৈশাখী দাস ঝিলিক দিদিমণি কে উৎসর্গ করলাম)

কবি সেলিম সেখ এর কবিতা




যুদ্ধ নয় শান্তি চাই
 সেলিম সেখ

বইয়ের পাতায় পড়েছি মোরা 
যুদ্ধের সেই কথা,
স্বচক্ষে আজ দেখছে বিশ্ব
যুদ্ধের ওই ভয়াবহতা। 

মাথার ওপর উড়ছে বোমারু
পায়না জনমানব ঠাঁই, 
যুদ্ধের ওই রক্ত খেলায়
তাদের অনেক মজা চাই? 

করতে যুদ্ধ মোকাবেলা
নিয়েছে হাতে অস্ত্র, 
ভুখা পেটে চলছে তারা
পরনে ছিন্ন বস্ত্র।

দেশ বাঁচানোর তাগিদে
বেঁধেছে মাথায় কাফন, 
যদি যায় প্রাণটা চলে
হয় যেন তাতে দাফন।

স্কুল-কলেজ বৈদ্যশালা
করেছে লুটোপুটি ধুলায়, 
নতুন সূর্য দেখবে বলে
মনকে সদা ভোলায়। 

যেথা যাই আঁখি মোর
দেখে শুধু শব, 
মাটিতে শিশু নর-নারী
থামে না মোর ক্ষোভ। 

মানুষ হোক শান্তিপ্রিয়
ফিরুক আবার শান্তি, 
পৃথিবী হোক মানবপ্রেমী
কাটুক সকলের ভ্রান্তি। 

থামুক যুদ্ধ ফিরুক শান্তি
করি মিনতি প্রভু, 
এমন দৃশ্য দু নয়নে
চাইনা দেখতে কভু।

শামীমা আহমেদ এর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৭৬





ধারাবাহিক উপন্যাস 


শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত (পর্ব ৭৬)
শামীমা আহমেদ 

বারান্দায় বসে কাপের চা শেষ করে সিগারেট ফিল্টার এস্ট্রেতে গুজে দিয়ে শিহাব অফিসে যাওয়ার তাড়নায় উঠে দাঁড়ালো। ভেবে নিলো দ্রুত শাওয়ার সেরে বেরিয়ে যেতে হবে। বারান্দায় শুকাতে দেয়া নীল তোয়ালেটি খুঁজতেই দেখা গেলো রিশতিনা টাওয়েল হাতে নিয়ে অপেক্ষা করছে। শিহাব একটু চমকেই গেলো ! তবুও নিজেকে সংযত করে এক হেচকা টানে টাওয়েল নিয়ে বেশ বড় বড় পা ফেলে হেঁটে ওয়াশরুমে ঢুকল। রিশতিনা নির্বিকার দৃষ্টিতে শিহাবের দিকে তাকিয়ে রইল।ভাবলো, এই মানুষটা একসময় তারই ছিলো। সে নিজেও  কতটাই না আপন ছিল তার। দুজন দুজনার জন্য সেকি অনুভুতি আবেগের প্রকাশ ছিল।মনে হতো পৃথিবীর আর সব কিছুই তুচ্ছ।রিশতিনার বিয়ের দিনটির কথা ভীষণভাবে মনে পড়তে লাগলো। সেদিন ছিল অক্টোবর মাসের আঠারো তারিখ।দুজনে সকাল দশটায় শিহাবের এক সিনিয়র ভাই এবং বন্ধু নাঈম ভাইয়ের বাসায় যায়।তখন শিহাবকে  খুবই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত লাগছিল। সেখানে সামান্য নাস্তা সেরে সবাই কিভাবে কি করা যায়বতার আলোচনা চলছিল। রিশতিনার মনে আছে সেদিন সে  নীল শাড়ি পরেছিল আর শিহাব কালো শার্ট আর ক্রীম কালারের প্যান্ট পরেছিল।চোখে সানগ্লাস সেঁটে দুপুরে যখন কাজী অফিসের জন্য বেরুলো রিশতিনা অবাক হয়ে শিহাবের দিকে তাকিয়ে ছিল।রিশতিনা মুগ্ধ হয়ে শুধু শিহাবকেই দেখছিল!  শিহাবের কয়েকজন বন্ধুকে সাক্ষী করে   বিয়ে পড়ানো হয়। যদিও শিহাব এভাবে বিয়েটা করতে চায়নি কিন্তু রিশতিনার প্রবল চাওয়াকে বাস্তবরূপ দিতেই শিহাব রাজি হয়েছিল। রিশতিনা একদিকে যেমন বাবামায়ের প্রচন্ড শাসনে দমবন্ধ করা পরিস্থিতি থেকে বেরুতে চাইছিল আরেকদিকে ছিল ভীষণভাবে শিহাবকে হারানোর ভয়। তাইতো তার এত তাড়া ছিল। বিয়ে সেরে গুটিগুটি পায়ে দুজনে শিহাবদের বাড়িতে প্রবেশ করে।শিহাবের মা ভাবী সবাই তাকে সহজভাবে গ্রহন করলেও তাদের সবার চোখে মুখে ছিল এক চাপা ভীতি আর আতংক ! যে কোন মূহুর্তে রিশতিনার বাবার প্রবেশ ঘটতে পারে,ঘটতে পারে যে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা। ভাবী খুব অল্প সময় পেলেও ওদের বাসর ঘরটি ফুলে ফুলে খুব সুন্দর করে সাজিয়েছিল।সারাটা রাত রজনীগন্ধা আর বেলির ঘ্রাণে দুজনের সে এক মাতোয়ারা রাত কেটেছে ! এরপর রাত গভীরে কিছুটা সময় দুজন বারান্দায় নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থেকে একরাতে যতখানি সুখ শুষে নেয়া যায় তাতে পূর্ণ করেছে আর যখন ভোর ঘনিয়ে আসে রিশতিনা শিহাবের বুকে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ে। 
এসব  ভাবতে গিয়ে রিশতিনার চোখে জল ভরে গেলো। অথচ সে এখন শিহাবের বিছানায় একাকী বসে আছে। কাল রাতে একাকী রাত কাটিয়েছে।আর এজন্য শিহাবের মনে এতটুকু দুঃখবোধ নেই। এভাবেই শিহাব নিজেকে দূরে সরিয়ে নিলো ? রিশতিনার মনের ভেতর একটাই প্রশ্ন, কোথায় হারিয়ে গেলো সেই সুন্দর মায়াবী রাত ? বিবাহিত জীবনের দুইটি মাস যেন চোখের পলকে ফুরিয়ে গেছে ! কেমন করে শিহাব এতখানি বদলে গেলো ? সেতো শিহাবের অপেক্ষায় ছিলো কিন্তু শিহাব কেন তারজন্য অপেক্ষা করলো না।কেন তার জায়গায় অন্য আরেকজনকে মনে ঠাঁই দিলো। হঠাৎ ওয়াশরুম খোলার শব্দে রিশতিনা তাকাতেই শিহাবের দিকে চোখ আটকে গেলো। ভেজা শরীরে শিহাবের গায়ে বিন্দু বিন্দু জলকণা, ধবধবে সাদা শরীরে মনে হচ্ছে মুক্তোদানা বসানো ! নিচের অংশে আকাশনীলা টাওয়েল জড়ানো। রিশতিনার চোখে চোখ পড়তেই শিহাব একটু লজ্জিত হলো।এভাবে বেরিয়ে একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলো।হয়তো সে রিশতিনার কথা ভুলেই গিয়েছিল। রিশতিনা পরিবেশটা স্বাভাবিক করতে বিছানা ছেড়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো। নিচে রাস্তায় গাড়ি চলাচল দেখতে লাগলো। শিহাবকে নিজের স্বাধীনমত তৈরি হতে রিশতিনা দূরত্ব নিলো।যদিও বিয়ের পরের দুটি মাস রিশতিনা শিহাবের বাইরে যেতে হলে শার্ট প্যান্ট ম্যাচিং করে গুছিয়ে দিতো। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ছেলেমেয়েরা একটু এডভান্স এসব ব্যাপারে বেশ স্মার্টই থাকে।
শিহাব নিজের মত তৈরি হয়ে নিলো। এখন বেরুতে হবে।হাতে মোবাইল, বাইকের চাবি, হেলমেট সানগ্লাস নিয়ে ঘরের চাবি হাতে নিতেই রিশতিনার কথা খেয়াল হলো। সে বারান্দার দিকে এগিয়ে গেলো,রিশতিনাকে কোন নামে সম্বোধন না করে বললো, আমি যাচ্ছি।  ঘরের চাবিটা টেবিলে রইল। তুমি যাওয়ার সময়  লক করে চাবিটা কেয়ারটেকার বিল্লালের কাছে রেখে যেও। কথাটা শুনে রিশতিনার বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে গেলো, চোখ জলে ভরে উঠলো। 
তবে কি শিহাব চাইছে না যে সে এখানে আর থাকুক।এখনো কি তাকে ক্ষমা করা যায়না ? 
শিহাব আবার বলে উঠলো, আমি যাচ্ছি।
রিশতিনা এবার পিছনে ফিরলো এবং যারপরনাই অত্যাশ্চর্য হয়ে গেলো।শিহাব আজো সেই বিয়ের দিনের কম্বিনেশনের শার্ট প্যান্ট পরা! কালো শার্ট আর ক্রীম প্যান্ট!
শিহাব পিছনে আর না তাকিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে লিফট কল দিলো। মনে মনে ভেবে নিলো, রাতে শায়লার সাথে ভালোভাবে কথা বলা হয়নি। অফিসে গিয়ে কল দিতে হবে।
দরজা খোলাই রইল।রিশতিনা অচেনা এক শিহাবের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে পাথরের মূর্তির মত দাঁড়িয়ে রইল। 


চলবে...

২৪ মার্চ ২০২২

কবি মহুয়া চক্রবর্তীর কবিতা




পরিচয় 
মহুয়া চক্রবর্তী

আমি কে কিবা আমার পরিচয়
 সারাজীবন ভেবেই মরলাম 
কি আছে আমার বিষয়-আশয়।
এই মানবজমি জ্ঞানের অভাবে 
অজ্ঞানেতেই রয়ে গেল
তিল তিল করে এবার 
যাবার সময় যে ঘনিয়ে এলো।
 
যতই আমি আমার আমিকে 
খুঁজে  মরি শত মানুষের ভিড়ে
ততোই আজ একাকিত্ত এসে
ভিড় করে আমার মনের ঘরে।
    
আমি যেন এক আঁধারের পথে 
হেটে চলেছি বহুকাল ধরে
আজ আর কেউ সঙ্গী নেই আমার হাতদুটো ধরবার।

নিজের অহং ত্যাগ করো একটি বার ভাবো
টাকা-পয়সার রূপের ছটা কিছুইতো স্থায়ী নয়
একদিন এই মানব দেহ মাটিতেই বিলীন হয়।

মানুষ হয়ে এই পৃথিবীতে জন্মেছিলেম আমি
আজ মান আর হুশ ভুলে
আমার আমি'তে মত্ত হয়েছি আমি।

জ্ঞানের প্রদীপ জ্বালো এবার
নিজের মনের মাঝে,
প্রভুর নাম স্মরণ করো
ও মন তুমি সকাল সাঁঝে।
তবেই তুমি হবে পার এই ভবসিন্ধু হতে
এক টুকরো সাদা কাপড় ছাড়া
কিছুই যে যাবেনা তোমার সাথে।

কবি নওশাদ আলম এর কবিতা





দুর্বৃত্তের কবলে জিম্মি
নওশাদ আলম 

দুর্বৃত্তের কবলে জিম্মি স্বাধিকার স্বাধীনতা,
স্বাধীনতা চিপে খাচ্ছে রক্ত ভুলেগিয়ে জাতিপ্রথা।
রুচিটা তাদের কত নিকৃষ্ট ভাবলে আসবে ঘৃণা,
হারামের থালা চেটেপুটে খায় সেই মনুষ্যহীনা।
জনগণ কাঁদে ভাগ্য লুকিয়ে স্বাধীনতা কিনে দামে,
নাভিশ্বাস ছাড়ে দিনমজুররা, শরীর ভেজায় ঘামে।
নির্ঘুম রাতে হতাশায় ডোবে স্বাধীনতা আনে যারা,
তাঁদের স্বপ্ন করছে হত্যা পেলো কোথা' আস্কারা?
মুক্তির রাহে জীবন দিয়েছে অজস্র বীরসেনা,
তাঁদের রক্তে হোলি খেলে যায় সম্মান করে ফেনা।
যেদিকেই দেখি সেদিকেই শুধু দুর্বৃত্তের ছায়া,
অফিস কাছারি জিম্মি করছে দলীয় সব বেহায়া।
খোলা ময়দানে চাঁদা তোলে দেখো দুর্বৃত্তের দলে,
পুলিশের সাথে খাতির জমিয়ে লেনাদেনা তলেতলে।
চার্দিকে ওই সাঙ্গপাঙ্গ জিম্মি করেছে ধরা,
অগ্নি উত্তাপ পড়ছে ভীষণ স্বাধিকার মাঠে খরা।
দুর্বৃত্তের হিংস্র কবলে রবো কতোকাল আর?
নেংটি ইঁদুরে মানচিত্র কেটে করলো যে সাবাড়।
দুর্বৃত্তের মদদ যোগাচ্ছে বড় মগডালে বসে,
নিজের দেশকে ধ্বংস করছে মেলে না অঙ্ক কষে।
সোনালি স্বপ্ন ঝিমিয়ে পড়েছে অন্তিম সূর্যের মত,
খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে সততাকে মেরে নেশার বতলে রত।
অবশানের ঐ পেখম গজাবে কখন বাংলাদেশে?
দুর্বৃত্তের প্রাচীর মাড়িয়ে উড়বো পাখির বেশে।

শামীমা আহমেদ ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৭৫




ধারাবাহিক উপন্যাস 


শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত (পর্ব ৭৫)
শামীমা আহমেদ 

,,খুবই কৌতুহলবশত রিশতিনা শায়লার কলটি রিসিভ করে দ্রুতই বারান্দায় চলে গেলো।যে কোন মূহুর্তে শিহাবের ঘুম ভেঙে যেতে পারে। তখন ব্যাপারটা অন্যরকম হয়ে যেতে পারে। যদিও শায়লাকে নিয়ে শিহাবের কোন রাখঢাক নেই। আর শিহাব বরাবরই এমন। সবকিছুতে তার স্বচ্ছতা থাকে।কিন্তু রিশতিনারও কিছু বলবার আছে । তবে কলটি ধরে রিশতিনা নীরব রইল।ওপ্রান্ত থেকে শায়লার কন্ঠ ভেসে এলো। খুবই আবেগী আদুরে গলায় সে শিহাবকে ডেকে যাচ্ছিল।এ প্রান্ত থেকে কোন সাড়া না পাওয়াতে এরপরের কন্ঠস্বরে বেশ উৎকন্ঠা ঝরে পড়লো। শিহাব ঘুম ভাঙালাম নাকি ? শিহাব তুমি কেমন আছো ? ভালো তো ? কি হয়েছে ?  রাতে ভালো ঘুম হয়েছে তো ? তোমাকে খুব দেখতে মন চাইছে।রাতে ঠিকমত খাবার খেয়েছিলে তো ?
এবার রিশতিনা যেন তার জবাব খুঁজে পেলো। 
বেশ স্পষ্ট কন্ঠেই উত্তর দিলো,হ্যাঁ,রাতে ঠিকমত খেয়েছে। আর আমি নিজ হাতে তাকে বেড়ে খাইয়েছি।
এ প্রান্তে নারী কন্ঠ ! শায়লার কাছে তা যে অত্যাশ্চর্য কিছু ! তাও আবার এত  সাত সকালে ? আবার জানালো,রাতে সে নিজে হাতে খাবার খাইয়েছে।তবে সে কে ? বাসায় কোন অতিথি এসেছে নাকি ? কই,শিহাব রাতেতো কিছু বললো না।শায়লা নিজেকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে জানতে চাইলো, আপনি কে বলছেন ?
রিশতিনা যেন নিজের পরিচয়টা শক্তভাবে দেয়ার একটা সুযোগ খুঁজে পেলো,সে দৃঢ় কন্ঠে বললো, আমি রিশতিনা। শিহাবের স্ত্রী। গতকাল আমি এসেছি। এখনো আছি।এবং বাকী জীবন থাকবো।
কথাগুলোতে শায়লা নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলো না। তার মাথা ঘুরছিল। পায়ের নিচের মাটি সরে যাচ্ছিল। এমনিতেই সে নানান যোগ বিয়োগে একেবারে অসহায় বোধ করছিল। শুধু শিহাবের ভালবাসাকে শক্তি করে মনের দিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছিল।
শায়লা ভেবে নিলো, রিশতিনা তবে রাতেও শিহাবের সাথে ছিল ? তাইকি রাতে শিহাব ক্লান্তির কথা বলে তার সাথে কথা কমিয়ে দিয়েছিল। দ্রুত ফোন রাখতে চাইছিল ?
শায়লা আর কিছুই ভাবতে পারছে না। তবে শিহাবের মুখ থেকে তার সবকিছু শুনতে হবে। হতে পারে অন্য কেউ রিশতিনা সেজে তাকে ধোকা দিচ্ছে।কিন্তু এত সকালে শিহাবের ঘরে একজন নারীর উপস্থিতি !  তবে সেই বা কে ? 
শায়লা রিশতিনাকে সরাসরি প্রশ্ন করলো, শিহাব কোথায় ?  মোবাইলটা ওর হাতে দিন।আমি কথা বললো।
রিশতিনার মনে শিহাবের প্রতি তার অধিকারটা যেন বেশি মাত্রায় ছাপিয়ে গেলো, সে মিথ্যে করে বললো, এইতো শিহাব আমার পাশেই ঘুমিয়ে।কাল আমরা অনেক রাত পর্যন্ত জেগে ছিলাম। তাই শিহাব এখন অঘোরে ঘুমাচ্ছে।
শায়লার বুঝতে আর কিছু বাকী রইল না। তবে সে রিশতিনাকে গ্রহণ করেছে ? তাহলে কেন রাতে তাকে জানালো না। রিশতিনাকে নিয়ে তারতো কোন দ্বিমত নেই। রিশতিনা তার স্ত্রী। যে কোন সময়ই তাদের মান অভিমান ভাঙতে পারে।ভুল বুঝাবুঝির অবসান হতে পারে। তাদের একটা সন্তান আছে।তাই আবার তারা এক হতে পারে। কিন্তু পরক্ষণেই  সময়ের সাথে সাথে শিহাবের প্রতি তার যে বিশ্বাস জন্মেছে,শিহাবের কাছ থেকে যে আশ্বাস মিলেছে, গতরাতেও যে শায়লাকে চলে আসতে বলেছে,তাকে তৃতীয় কারো কথায় কিভাবে অবিশ্বাস করবে ? শিহাবের সাথে তার কথাবলা ভীষণ প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ালো।শিহাবের মুখ জবানীতে সব শুনে শায়লা নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিবে।
বেশ অনেকটা সময় দুই প্রান্তে দুজন পিনপতন নীরবতায় শিহাবের প্রতি দুজনার ভালোবাসার গভীরতা যাচাই করে নিচ্ছিল।
শায়লা কথা বলে উঠল,ঠিক আছে। শিহাব ঘুম থেকে জাগলে আমাকে কল করতে বলবেন। জানাবেন, মায়া কল দিয়েছিল।আর তাতেই সে বুঝে নিবে।
মায়া ? কিন্তু কলেতো আপনার নাম শায়লা দেখতে পেলাম!
হ্যাঁ, সেটাও আমারই নাম।তবে শিহাব আমাকে ভালোবেসে মায়া নামে ডাকে।
আজ যেন রিশতিনার কথার জেদ চেপে বসেছে।সে শায়লাকে কথার পৃষ্ঠে কথা দিয়ে ঘায়েল করতে চাইছে।
সে শায়লাকে স্মরণ করিয়ে দিলো, জানেন তো মায়া জিনিসটা ক্ষণিকের। কিছুদিনই তার রেশ থাকে।আর যাদের মনে খুব দ্রুত মায়া জন্মায় আবার খুব দ্রুতই তাদের সে মায়া কেটে যায়।
শায়লা রিশতিনার কথাগুলো আর নিতে পারছিলো না। শুধু জানালো, ঠিক আছে আপনার বলতে হবে না।আমিই পরে আবার কল করবো।
ফোন কেটে দিয়ে শায়লা কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো! তার মনে হলো, বিশাল জলরাশির উত্তাল সাগরে তার ডিঙ্গি নাওখানি এখুনি ডুবে যাবে! আর সে বাঁচবার আকুতিতে শিহাব, শিহাব বলে চিৎকার করে যাচ্ছে।
ফোনে কথা বলা শেষ করে রিশতিনা খুবই নীরবে পদধাপে ঘরে চলে এলো।নাহ! শিহাব জাগেনি।ঠিক আগের মতই ঘুমাচ্ছে। রিশতিনা কলটি ডিলিট করে মোবাইলটা শিহাবের পাশে সেন্টার টেবিলটায় রেখে দিলো।
রিশতিনা বুঝে নিলো, এভাবেই একটু একটু করে আগাতে হবে।শিহাবের মন থেকে মেয়েটির নাম মুছে ফেলতে হবে। গতরাতে শিহাবের করা অপমানে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও এখন তার সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আনলো।শিহাব যত অপমান আর যতই চলে যাওয়ার কথা বলুক,রিশতিনা তার অধিকার ছাড়বে না। কিছুক্ষন পর রোমেল ভাইয়াকে কল দিয়ে সব আপডেট জানাবে।আর এরপর করণীয় কি তার গাইডলাইন নিবে।
রিশতিনা শিহাবের বেড রুমে চলে এসে ঘুমের ভান করে পড়ে রইল।
বেশ বেলা করেই শিহাবের ঘুম ভাঙল।ঘুম থেকে জেগে নিজেকে সোফায় দেখতে পেয়ে একে একে রাতের সব ঘটনা মনে পড়তে লাগল।বাসায় রিশতিনার উপস্থিতির কথা মনে পড়তেই সে এক ঝটকায় সোফায় উঠে বসলো। টেবিল থেকে মোবাইল নিয়ে অনলাইন হলো। নাহ! ধায়লার কোন কল বা মেসেজ নেই। শিহাব উঠে দাঁড়ালো। এক কাপ চায়ের তেস্টা সেই গতকাল রাত থেকে।
শিহাব বেডরুমের দিকে তাকালো।বিছানা খালি পড়ে আছে। তবে কি রিশতিনা চলে গেছে? শিহাব চিন্তিত হলো।এই সাত সকালে মেয়েটি কোথায় বেরিয়ে গেলো ? বহুদিন দেশের বাইরে থাকা সে কি আর দেশের অবস্থা বুঝবে ? এদেশে যে সিএনজি ওয়ালারাও মেয়েদের উপর সুযোগ নেয়।  শিহাব বেশ চিন্তিত হয়ে উঠে দাঁড়ালো। কোথায় যাবে মেয়েটি?মায়ের সাথেও সম্পর্ক ছিন্ন করে এসেছে। শিহাব মনে মনে  নিজেকে একটু দোষারোপ করলো।কালরাতে রিশতিনাকে বেশ কিছু কড়া কথা শুনিয়েছে। কি জানি আবার কিছু ঘটিয়ে বসে কিনা ? হায়, তাহলেতো সবার আগে সে-ই ফেসে যাবে। শিহাব দ্রুত মেইন দরজায় এগিয়ে গেলো।নাহ! ভেতর থেকে দেয়া ছিটকিনি তেমনি আছে! উফ! শিহাব যেন একটু নিশ্চিন্ত হলো। সে কিচেনের দিকে এগুতে পিছন ঘুরতেই দেখতে পেলো, এক কাপ চা হাতে নিয়ে রিশতিনা দাঁড়িয়ে আছে। শিহাব রিশতিনাকে কাপটি টেবিলে রাখতে বললো।সে নিজে হাতে তা গ্রহন করলো না।রিশতিনার প্রতি তার অবহেলাটা বুঝাতেই যেন শিহাব দূরত্ব রাখছে। শিহাব চায়ের কাপ আর সিগারেটের প্যাকেট,লাইটার নিয়ে বেডরুমের দিকে এগুলো। ভেবে নিলো,গিজারটা অন করে বারান্দায় বসে চা আর ধুম্র পান চলবে। তবে, রিশতিনাকে যতটা এড়িয়ে চলা যায়, তার সে চেষ্টাটাই থাকবে। গিজার সুইচে হাত দিতেই সেটা আগে থেকেই অন হয়ে আছে! শিহাব রিশতিনার দিকে তাকালো।তবে কি কাল রাতে থেকেই অন হয়ে আছে না সকালে রিশতিনা অন করেছে?
রিশতিনা চোখের ভাষায় সেটাই বুঝিয়ে দিতে চাইল।শিহাব বারান্দায় এগিয়ে গেলো।
 শিহাব মোবাইলের গ্যালারিতে থাকা  শায়লার মেরুন রঙের শাড়ি পরা  সেই পড়ন্ত বিকেলে সূর্যের মিষ্টি আভায় উজ্জ্বল  ছবিটির দিকে নিবিষ্ট মনে তাকিয়ে রইল।
 রিশতিনা  কোন কথা না বলে খুবই  নীরবে শিহাবের পিছনে এসে দাঁড়ালো।


চলবে....