২৩ মার্চ ২০২২

কবি সুচিতা সরকার এর কবিতা





অন্বেষণ
সুচিতা সরকার 

লক্ষ্যহীন এলোমেলো রাস্তায়,  
আগেও হেঁটেছি বহুবার।
কখনও চৌরাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে,
দীর্ঘ অপেক্ষা করেছি একটা সূর্যোদয়ের।
কখনও আবার হাতড়েছি অন্ধকার গলির বাঁক, 
কিছু নীল জোনাকিদের খোঁজে।
নিকষ কালো নিশিপথ আলো করতে,
শরীরটাতে আগুন দিয়েছি বার বার। 

না! পারিনি আমি।
আলোর অভিমুখ খুঁজতে ব্যর্থ হয়েছি প্রতিবার।
গাঢ়ত্ব বাড়িয়ে আঁধার ধেয়ে এসেছে আরও কাছে। 

তবুও ছাইয়ের স্তূপে দাঁড়িয়ে আজও স্বপ্ন দেখি,
একটা নীলপদ্ম শুধু আমার হবে।

কবি তাহেরা আফরোজ এর কবিতা




মানুষ 
তাহেরা আফরোজ

মানুষের ভীড়ে গিয়েছি অনেক, মানুষ দেখেছি 
বারবার বিভ্রান্ত হয়েছি, 
কে যে কাছের আর কে যে দূরের 
এই হিসাব অংকের চেয়েও জটিল 
যেমন জটিল জঞ্জাল শহরের বৈদ্যুতিক তার। 

মানুষ ভালো লাগে না 
মানুষের মুখোশ ক্রমান্বয়ে খসে খসে পড়ে চোখের সামনে 
কার দোষ বলো ? 
আমার কি দৃষ্টি বিভ্রম হয়েছে ইদানিং ? 
চোখের তীক্ষ্ণ চাহনিতে যে চুম্বকীয় শক্তি ছিল 
সেও নষ্ট হয়ে গেছে আজকাল 
চোখের আলোয় একটা আলোকিত মুখের মূর্তি গড়েছিলাম 
সেই মূর্তিও গুড়িয়ে গেছে 
অথবা আছাড় দিয়ে গুড়ো করে ফেলেছি। 
একটা আলোকিত মুখের সন্ধানে বিজ্ঞাপন দিব 
একটি আলোকিত মুখের সন্ধানে নেমেছি আবার 
একদম নিখাঁদ গড়া মূর্তির সন্ধানে নেমেছি।

কবি সঞ্জয় কুমার বণিক এর কবিতা




প্রতিক্ষা
সঞ্জয় কুমার বণিক

একটি ব্যাংকের প্রতিক্ষা রিমিটেন্স,আমানত 
একজন ধনাট্যের যে কোন উপায়ে ধন সংগ্রহ
ছিনতাইকারীর  প্রতিক্ষা কি উপায়ে বেকায়দায় ফেলে ধন ছিনতাই।
ঘুষখোরের  ফাইল ঠেকিয়ে অর্থ আদায়-
একজন সার্থপরের চিন্তা কি ভাবে ভাল মানুষকে ফাঁসিয়ে নিজের সার্থ আদায়।
একজন হিংসুটের  চিন্তা নিজের নাককেটে
পরের যাত্রা ভংগ করার
একজন শুভাকাঙ্খীর চিন্তা সমাজকে সু্ন্দর পরিচ্ছন্ন করে গড়ে তোলবার।
একজন অনাহারীর চিন্তা দুমুঠো ভাত যদি কেউ সেদে দেয়।
একটি নির্বোধ প্রানির প্রতিক্ষা রেষ্টুডেন্টের ভিতর থেকে কেউ  ছুড়ে দেবে একটু খাবার অথবা দুএকটা হাড় ।
একজন লেখক বা চিন্তাশীলের প্রতিক্ষা কখন এ বিষয়গুলো মানুষের বিবেক সত্যিকারের মানুষ হতে নাড়া দিবে-
প্রতিক্ষা শুধু আমার নয় সবার।

মমতা রায় চৌধুরীর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৪০




উপন্যাস 

টানাপোড়েন ১৪০
এক নারীর পত্র
মমতা রায় চৌধুরী



১১,৩.২২ রাত্রি ২২.৩৮
রেখার জীবনটা তিতিবিরক্ত হয়ে গেল। ক'দিন ধরে রেখা লিখে উঠতে পারছে না ,বাড়িতে এত চাপ। স্কুলের চাপ তো রয়েছেই। কিন্তু তার মধ্যেও লেখা থেমে থাকে নি । এখন এ কি অবস্থা হল বাড়িতে যদি সব সময় একটা খণ্ডযুদ্ধ চলতে থাকে , সব সময় মনের ভেতরে টানাপোড়েন নিয়ে কি করে পেরে উঠবে? এবার মনে হচ্ছে কয়েক দিনের জন্য ওকে নিজের দেশের বাড়িতে গিয়ে থাকতে হবে। এ কথা ভাবতে ভাবতেই হঠাৎই একটা ফোন আসে।রিং হতে থাকে। ফোনের আর্তনাদে তড়িঘড়ি এসে ফোনটা রিসিভ করে বলল"হ্যালো'।
"কি ম্যাডাম লেখা কতদূর?"
"ও আপনি?'
কেন ভূত দেখার মত দেখলেন?
না ,তা ঠিক নয়।
আর হ্যাঁ 
"বেশ কয়েকদিন আমরা লেখা পাচ্ছিনা?"
রেখা একটু চুপ করে থাকে।
আপনার কি কোন সমস্যা হচ্ছে?
রেখা মনে মনে ভাবে নিজের সমস্যা নিজের কাছে রাখাই ভালো ।চার দেয়ালের বাইরে গেলে সেটা সমস্যা থাকে কোথায়? তাছাড়া তার সমস্যার সমাধান নিজেকেই করতে হবে।
অন্যের কাছ থেকে হয়তো কোনো সমালোচিত হতে হবে, নয়তো সহানুভূতি দৃষ্টিতে দেখবে।
"ম্যাডাম?"
"না ,না ,না কোন সমস্যা নেই।'
Ok
সামনে নারী দিবস ।বিশ্ব নারী দিবসে কিন্তু লেখা দিতেই হবে।কবিতা হোক, গল্প হোক, যাইহোক ওটা কিন্তু আলাদাই পাঠাতে হবে আর এটা যেমন লিখছেন ধারাবাহিক লিখতে থাকুন।
Ok
"ভালো থাকবেন।'
"আপনিও ভালো থাকবেন।'
ফোনটা রাখার পর ভাবতে লাগলো।
নারী দিবস, বিশ্ব নারী দিবস। যেখানে প্রতিনিয়ত ক্ষুন্ন হয় নারীর মর্যাদা। প্রতিনিয়ত বেআব্রু হয়, নারী ।যেখানে প্রতিনিয়ত পণ্যে পরিণত হয়
 নারী । যেখানে পবিত্র শিশু পর্যন্ত ধর্ষিত হয়,যেখানে বঞ্চিত, নিপীড়িত শোষিত, পদদলিত  নারী ।সেখানে বিশ্ব নারী দিবস হাস্যকর মনে হয়। শুধু কি তাই নারীকে বঞ্চিত হতে হয় এখনো শিক্ষা-দীক্ষা থেকে। যেখানে নারী তার আপন সগৌরব অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়? যে নারী গৃহের সৌন্দর্য ও শান্তির চির উৎস কেন সেই নারীর জীবনে নেমে আসে অকালমৃত্যুর অভিশাপ! কেন নারী পরিণত হয় বিকিকিনির সহজ পণ্যে? কেন নির্মম, নিষ্ঠুর কোন সামাজিক প্রথা যুগে যুগে নারী জীবনকেই অশ্রুময়ী করে? কেন নিরুপমা দের আজও চিতা জ্বলছে?নারী যে তিমিরে সেই তিমিরেই।
তাই '"বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর অর্ধেক তার করিয়াছে নারী ,অর্ধেক তার নর।" তবে কেন নারীর এরূপ দশা?
'নারীর আপন ভাগ্য জয় করিবার কেন নাহি দিবে অধিকার' এই বার্তা কবে সত্য হবে?
কিছু নারী তো অবশ্যই শিক্ষার আলোকে এসে
তারা দেখিয়ে দিয়েছে তারা পুরুষের সমকক্ষ তারাও পারে শিক্ষিকা ,ডাক্তার ,নার্স , পুলিশ, ইঞ্জিনিয়ার ইত্যাদি ইত্যাদি নিজ নিজ  ক্ষেত্রে আসীন হতে ।
নিজেকে দিয়ে ভালই বুঝতে পারছি। উচ্চশিক্ষিতা, চাকুরিরতা তার পরেও কিভাবে শ্বশুরবাড়িতে লাঞ্ছিতা, নির্যাতিতা।
 এ নির্যাতন না যায় কাউকে বলা না ,যায় সহ্য করা। অথচ একটি গ্রাম্য অশিক্ষিত নারী ও বোধ হয় এরথেকে অনেক বেটার আছে।
আজ উপন্যাসের একটা পর্বে বিশ্ব নারী দিবসের উপর লেখা লিখব। আজকে একটা পত্র লিখব অভিযোগ পত্র । না ঠিক অভিযোগ পত্র নয় নারীর ভেতরের শক্তি যখন জাগ্রত হয় তখন তার উপলব্ধির স্ফুরণ তাই নিয়ে।

প্রিয়তম,
শুরুতেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি প্রিয়তম বলে তোমাকে সম্মোধন করে ।আসলে আজ একযুগ হলো প্রায় এই নামে তোমাকে সম্বোধন করে আসছি। মানুষ তো অভ্যাসের দাস ।তাই।
আমি আজ তোমার প্রিয়তমা নই। আজ আমি একজন নারী হিসেবে তোমার কাছে কতগুলো প্রশ্ন রাখছি। এতদিন আমি চুপ করেছিলাম দেখি তাতে তোমাদের কোন ভাবান্তর হয় কিনা?
না ,তোমাদের বোধোদয় হবে না ।আসলে তোমাদের বোধবুদ্ধির ঊর্ধ্বে গিয়ে শিকড় চলে গেছে মাটির অনেক অনেক গভীরে । তাই তাকে সমূলে উৎপাটিত না করলে কখনোই নিজের দিকে তোমরা ফিরে তাকাবে না।
তুমি হয়তো ভাববে যে ,আজ আমার কি
 হলো ? আজ তোমাদের বাড়ির ছোট বউ এর একি হাল ! আশ্চর্য হচ্ছো না?মনে হচ্ছে না কথাবার্তাতে কেমন  অসংলগ্নতা। যাই বলো না কেন? আজ কিন্তু আমি একটু অসংলগ্ন ই হয়েছি।এবার ভাবতে বসেছ,আজ সকল গণ্ডি পেরতে কে এমন করে বুকে সাহস জোগালো, তোমাদের পুরুষশাসিত সমাজের বাইরে গিয়ে নিজেকে দেখার?তোমাদের হয়তো তাই মনে হবে যে ,একে যা বলেছি এ তাই করেছে। বিচার করার এত ক্ষমতা তো এবারের ছোট বৌ এর ছিল না মনে হতো যেন বোধবুদ্ধিহীন একটা জড়পদার্থ তাই না? এতোকাল তোমরা যা বলতে
তাই করে এসেছি । মুখে কোনও রা কাটি নি। আপ্রাণ চেষ্টা করেছি তোমাদের মন পাবার ।চেষ্টা করেছি কিন্তু পাইনি । আসলে বোধহয় আমারও ভেতরে একটা রক্ষণশীলতার বীজ বোপিত হয়েছিল। তাই মন কাজ 
করছিল মা-বাবার দেখানো আদর্শে বিশ্বাসী হয়ে শ্বশুরবাড়িতে সবার কথাটাকেই মান্যতা দিয়ে আসার। তাই নিজের পরিশ্রম হলেও কষ্ট হলেও, বুকে পাথর চাপা দিয়ে হাসিমুখে চেষ্টা করেছি  সব কাজ একা হাতে করতে। অবশ্য আমার কাজ দেখে তোমরা উপরে হয়তো প্রশংসা করো নি কিন্তু ভেতরে ভেতরে প্রশংসা করেছ, যার জন্য কাজের মেয়ে টুনিকে ছাড়িয়ে দিয়েছ। তোমরা ভেবেছো আমি বোধহয় এসব কিছুই বুঝতে পারিনি। এতটা বোকা কিন্তু আমি নই। সব বুঝতে পেরেছি কিন্তু আমি কিছু বলিনি ।ওই যে শ্বশুরবাড়িতে পা দেবার আগে মা শিখিয়েছিল জীবনটাতে শুধু এড জাস্ট শুধু অ্যাডজাস্ট করে যাবি। তাহলে দেখবি সব থেকে বেশি ভালো থাকবি  ।তাই করার চেষ্টা করেছি কিন্তু আমি আমার মায়ের উদ্দেশ্যে বলছি তোমরা অ্যাডজাস্ট করতে করতে তোমরা তৃণের থেকেও বেশি নরম হওয়াতে তোমাদেরকে পা দিয়ে দলিয়ে , মাড়িয়ে চলে গেছে সবাই। তাই পারলাম না। শেষ পর্যন্ত পারলাম না । কেন বলো তো ? ছোটবেলায়  আমাদের পূর্ব বাংলা থেকে উদ্বাস্তু এক জেঠিমা এসেছিলেন আমাদের বাড়িতে কাজ করতে। দেশভাগের যন্ত্রণা জেঠিমাকে কুরে কুরে খেত। যে দেশকে আপনার করে ভেবেছিল আর তার নিজের রইল না অঝোরে শুধু চোখের জল ফেলতেন। ও দেশের ঐশ্বর্য ফেলে এসে এদেশে ঝিয়ের কাজ করতে হত।কাজ করতে বলতেন প্রায়ই  'মাইয়া হইয়া জন্মাইছ  ব্যাটাছালের পায়ের তলায় থাকইতে অইবো। যতই চেষ্টা কইরো না ক্যান উপুরে কিন্তুক কুনো দিনই উঠবার পাইরবে না । আবার কখনো কখনো বলতেন 'মাইয়া গো জীবন অইতাছে উদ্বাস্তুর জীবন ,যেহানেই যাউক হেইখানে হগল সময় উদ্বাস্তুর মত জীবন কাটাইতে অয়। মাইয়া মানুষের আবার আসল ঠিকানা কি। হগল সময় কারোর না কারোর অধীনে থাকইতে অয়। 'আসলে বাবা আমাকে খুব ভালোবাসতো ,মাও ভালোবাসতো ।মেয়ে মানুষের এই আদর পরিবারের বাকিরা কেউ মেনে নিতে চাইনি ।সেই আদরেই বোধ হয় আমার ভেতরে একটা স্পষ্ট বাদী মনোভাব গড়ে উঠেছিল। যখন কোন কিছুর প্রতিবাদ করতাম তখন জেঠিমা আবার বলতেন ও 'মাইয়া তুমারে কয়ডা কথা কই। মাইয়া হইয়া এত জেদ রাইহ না। কপালের তাইলে কিন্তু অনেক কষ্ট।'
'ছোটবেলায় তখন শুধু ভাবতাম জেঠিমা কি যে বলে সবারই দুটো হাত দুটো পা । তাহলে সব সময় পুরুষ মানুষ যা বলবে তাই মেনে নিতে হবে এটা আমি কিছুতেই মানতে পারব না। প্রতিবাদ করব। তাই দেখতাম আমার ঠাকুমা যখন মায়ের সাথে দুর্ব্যবহার করতেন মা কিন্তু চুপ করে থাক তো। মাকে কতদিন চোখের জল ফেলতে দেখেছি। যখন ঠাকুমাকে মায়ের পক্ষ নিয়ে কোনো কথা বলতাম ঠাকুরমা বলতো 
'এই মাইয়া ঘর করতি পাইরবো না। প্রতিদিনই শ্বশুর বাড়ি থেইকে লোক আইসবো। মাইয়ারে শিক্ষা-দীক্ষা 
দাও । এর তো লাজ-লজ্জা কিছুই নাই। পোলা মানুষের মত সারাদিনে টো টো টো কইরা ঘুইরা বেড়ায়।ঘরের কিছু কাজকর্ম শিখাইতে তো পাইরো?'
 মা কিন্তু চুপ করে থাকতো। মা পরে ভেতরে গিয়ে আমাকে আদর করে বলতো' এসব কথা বলিস না ঝাঁসির রানী' আর কাছে টেনে খুব আদর করত।'
আজ তাই সেই ছোট্টবেলার শক্তিটাকে আবার কাজে লাগাচ্ছি।
দেখলাম আমার ভেতরে যে  শক্তি আছে যার দ্বারা আমিও  প্রতিহত করতে
 পারি ।তাই আজ বাকশক্তির সাহায্যে সেটাকে লেখনি হিসেবে ব্যবহার করলাম আজ তাই প্রতিবাদ করছি।
এর ফল কি হবে আমি জানি।আর আমার ও বাড়ীতে ঢোকা হবে না । আজ যেন সেই জেঠিমার কথাটাই সত্যি হলো "মেয়ে মানুষের জীবন উদ্বাস্তুর মতোই।"আমি জানি আজকের পর থেকে আর তোমাদের বাড়িতে আমার জায়গা হবে না।আমি আমার নিজের আইডেনটিটি  তৈরি করে নিয়েছি । তুমি  খুব অবাক হচ্ছো না? বাবা, আমি এত কথা গুছিয়ে লিখতে পারলাম?আমি জানি তুমি মনে মনে হাসবে। পরে বলি একটা প্রশ্ন তোমার মনে জেগেছে তো ,সেই আইডেন্টিটি  কি? প্রথমে বলি আমি একজন নারী। নারীর ভেতর রয়েছে সেই শক্তি, দেবী দুর্গার রূপ। অসুর দলনী দেবী দুর্গা। নারীর একদিকে রয়েছে অসাধারণ ধৈর্য শক্তি কিন্তু ধৈর্যের অনেক পরীক্ষা দিলাম এই সংসারে,মন তোমাদের জুগিয়ে উঠতে পারলাম না ।আর সম্ভব নয়। তাই আমি এবার 
নিজেকে আবিস্কার করার নেশায় মেতেছি।
' জানো ,তুমি তো জানো আমি আগাগোড়াই নিরীহ অবলা জীবগুলোর প্রতি একটু ভালোবাসা সহানুভূতি দেখাই। এবার ওদেরকে নিয়ে কাজ করব ।তোমরা যে এত কিছু করেছ আমার সাথে তার পরেও বেঁচে থাকার তাগিদ পেয়েছি কোথা থেকে জানতে চাও ?ওই ছোট্ট ছোট্ট স্ট্রীট ডগ  ওদেরকে ভালোবেসে ।এখন দেখলাম মানব জীবন তো একটাই বার বার  পাব না এই জীবন।হয়তো অন্য রূপে আসব। এই জীবনে তুচ্ছাতিতুচ্ছ সাংসারিক কাজ কর্মে নিজেকে নিয়োজিত করে নাই বা ছোট করলাম। এবার আমি সেবার ব্রতে নিজেকে উৎসর্গ 
করলাম ।জানো ,কারা আমার দিকে হাতটা বাড়িয়েছে? এইরকম অনেক অনেক অসহায় নারীরা একত্রিত হয়েছে এই 'নারী শক্তিতে।' কবি শঙ্খ ঘোষের কবিতা টা মনে পরে তোমার
' আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি'। আমরা এখন 'আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি' কেমন অবাক লাগছে না ?এ বাবা এ বাড়ির ছোট বউ । আজ মুখ খুলেছে ভাবছো। জানি বড় পিসিমা গুটিকয়েক গালমন্দ দিচ্ছে আর আমার শাশুড়ি মা হেসে মিছরির ছুরি শানিয়ে তোমাদের বাড়ির ছোট বউ এর বুকে বসাচ্ছেন।
আর কি কথাই না তোমাকে শোনাচ্ছেন
 বলো ?'বলেছিলাম এ রকম মেয়েকে বিয়ে করিস না '।
যদিও পাত্রী তোমাদের অভিভাবকরাই দেখতে গিয়েছিলেন সঙ্গে তুমি গিয়েছিলে ।এক দেখাতেই তোমার পছন্দ হয়ে গেছিলো। সেদিন যে তুমি আমার ভিতরে কি দেখেছিলে  কে জানে! তুমি আজকে ভাবছো তো কি শান্ত ভাবলেশহীন একখানা মুখ আজকে তার ভেতরে প্রতিবাদী সত্তা আমিও না খুব অবাক হচ্ছি ।তবে আমি তোমাকে কোনো দোষারোপ করছি না ।আমি জানি তুমি মায়ের ন্যাওটা  ।যতই তুমি তোমার স্ত্রীকে ভালোবাসার চেষ্টা ক'রো না কেন মায়ের কথার উপরে তুমি উঠতে পারবে ?না, না ,না  আমি কিন্তু একবারও বলছিনা তুমি মায়ের অবাধ্য হও কিন্তু সব থেকে খারাপ লাগে কি জানো? আসলে একটা মেয়ে সে তো তার সর্বস্ব ছেড়ে একটা নতুন পরিবারে আসে। সবাই কে  মানিয়ে নেবার চেষ্টা করে তার সঙ্গে যদি পরিবারের অন্য সবাই যাই করুক না কেন অর্থাৎখারাপ ব্যবহার করুক কিন্তু স্বামী যদি তার সঙ্গ দেয় তাহলে কিন্তু এত কষ্ট লাগে না। না আমার কোন কষ্ট নেই। আমি জানি তুমি চেষ্টা করলে হয়তো প্রতিবাদ করতে পারতে কিন্তু তুমি চেষ্টাই করোনি। শুধু কষ্ট হয় কোথায় জানো ?তোমার জন্য ।আমি তোমাকে ভালবেসেছিলাম । তুমি আমাকে ভালোবেসেছো হয়তো?কিন্তু তুমি বেঁধে রাখতে পারলে না। এজন্য আমার খুব কষ্ট হয় ।আমিও পারলাম না 
জানো ?চিরদিন নিজের নারী সত্তার অবমাননা আমি আর দেখতে পারলাম না । প্রতিনিয়ত কি শুনেছি তোমাদের বাড়িতে বলতো '
বাচ্চা না হওয়ার যন্ত্রনা  ,বাজা মেয়ে ছেলে  ।কিন্তু সত্যি করে বলো তো সত্যি কি আমার কোন দোষ ছিল তাতে ?ওই ব্যাপারটা নিয়ে আমি আর নাড়াচাড়া করতে চাই না। আমি বাজা মেয়ে মানুষ হয়েও কিন্তু কতগুলো অবলা জীব এর মা হয়েছিলাম ।বাড়ির সামনে দেখো নি আমার সন্তানদের?কি সুন্দর আর ওদের কাছে আমি মা হয়ে গেলাম।ওদের  ভালোবাসা মায়ের প্রতি সন্তানের বিশ্বাস ভালোবাসা উজাড় করে দিত ওরা। তোমাদের বাড়িতে ছিলাম আমি এই তৃপ্তি নিয়ে। তাই না পাওয়ার বেদনা আর আমাকে কুরে কুরে খেতো না। যদিও এর জন্য লড়াই করে নিতে হয়েছে ।আজকে যদিও বা আমি থাকতে 
পারতাম ।পারলাম না ।কেন বলতো? সত্যি কথাটা তোমাকে জানাচ্ছি 'তিন্নিকে যেদিন তোমরা মেরে ছিলে।সেদিন তোমাদের ক্ষমা করতে পারিনি।
তোমাকে চিঠি লিখতে গিয়ে আমার বুকের ভেতরটা বারে বারে দুমড়ে-মুচড়ে গিয়েছিল।
 তার থেকেও সাংঘাতিক অন্ধকার বিষণ্ণতার দিন ছিল সেদিন ,যেদিন তোমরা আবারো তিন্নিকে মারলে  আমার উপর রাগ করে।  আমি ওদেরকে আদর করে খাবার খাওয়াতে গেছি কিন্তু সে তোমরা খেতে পর্যন্ত দিতে দিলে না। অমানুসিক কাজটা করেছিলে। সেদিন আমি কিছুই করতে পারলাম না। যদি কিছু করার ক্ষমতা না থাকে তোমাদের বাড়িতে থেকে কি লাভ বল তো ?তাই চলে এলাম। হ্যাঁ ,জানি অনেক রাগ অভিমান তোমাদের থাকবে। যাই থাকুক সেটুকুই আমার জন্য প্রাপ্য ।সেটা মাথায় তুলে নিলাম। তবে তুমি বলেছিলে একদিন ক্যান্ডেল ডিনার করাবে সেখানে শুধু তুমি আর আমি আর ক্যান্ডেল দুজন দুজনার দিকে ওই রকম একটা মায়াবী পরিবেশে তাকিয়ে থাকব পরস্পর পরস্পরকে আপন করে নেবো ,সে অতৃপ্তি আমার থেকে গেল। সে থাক কত আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণ থেকে যায় ।সে নিয়ে আর আফসোস করি না।

আজ আমি নারী এই প্রথম যেন অনুভব করলাম।তাই আমার ভেতরে রয়েছে সেই 
শক্তি । মাতৃশক্তির জয়জয়কার হোক। আমি তার অংশীদার  ।তাই আজ নিজেকে প্রমাণ করার জন্যই বেরিয়ে পড়লাম, পারলে আমাকে ক্ষমা কোরো ।ভালো থেকো ।
তবে অবশ্যই আমি তোমাকে  বলব আমার জন্য যদি তোমার কোথাও একটু সফট কর্নার থেকে থাকে, আমাকে ভুলে গিয়ে তুমি নতুন করে জীবন শুরু ক'রো ।আমি তো বারবার তোমাদের বাড়িতে এটাই শুনে এসেছি আমি আসার পর থেকে নাকি তোমাদের সংসারের সব থেকে বেশি অশান্তি শুরু হয়েছে। অশান্তি যদি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। তাহলে তো শুধু শান্তি আর শান্তি। তোমার ওই হাসি মুখটা দেখতে চাই আর তোমাদের সংসারে যারা তোমার শুভাকাঙ্ক্ষী প্রত্যেকের মুখে হাসি টুকু থাক। 
ওই দেখো শুধু নিজের কথাই বলে যাচ্ছি তোমার কথা কিছু বলবো মাথা থেকেই চলে যাচ্ছে।
শোনো ,তোমার মাঝে মাঝে গ্যাসের প্রবলেম হয় তুমি কিন্তু ঠিক সময়ে খাওয়া-দাওয়া টা করো আর পারলে জলের পরিমাণটা একটু বেশি খেয়ো।
আরেকটা কথা তোমার দিদি বারবার বলত না তোমার দিদির দুঃসম্পর্কের কি রকম ননদ হয় সে নাকি খুব ভাল মেয়ে। এখনো তোমার জন্য ওয়েট করছে। এবার তুমি তাকে গ্রহণ করে ধন্য হও।
শোনো ,তোমার রাত্রিতে অন্ধকারে ভয় লাগে আমি জানি। তাই ব্যালকনির আলোটা জ্বেলে রেখো আর মাঝে মাঝে উঠে তোমার জল খাওয়ার অভ্যাস আছে ।জলের বোতলটা কাছে রেখো।
চিন্তা নেই আইনগতভাবেই তোমাকে ছাড়পত্র দেব। কাগজপত্র রেডি করে আমাকে পাঠিয়ে দিও আমার ঠিকানা তোমাকে আমি দিয়ে দেবো।
এটাই বেশ ভাল হল ।তোমার পক্ষে ও 
ভালো ।আমার পক্ষেও ভালো ।তোমার পরিবারের পক্ষে ও ভালো ।তবে আমার পরিবারের পক্ষে ভাল কিনা জানিনা ।আমার পরিবার বলতে আর কে আছে বল তো ?মা, বাবা সে তো কবেই তারা পর করে দিয়ে চলে গেছে না ফেরার দেশে। মামা মামি তারা তো বরং খুশী হবে ।এত কথা তো তাদের আর শুনতে হবে না ,আর তাছাড়া তাদের আপদ বিদায় হয়েছে। কি ভালো নাম 
না ?তোমাদের বাড়িতে ,মামার বাড়িতে ও আপদ। আজ আর এ সব আমার মনে দাগ কাটে 
না ।জানো ,আগে খুব কষ্ট পেতাম ।কত চোখের জল ফেলেছি। সারারাত হয়তো ঘুমোতে পারিনি কিন্তু তুমি কিন্তু দিব্যি নাক ডেকে ঘুমিয়ে আছো একবারও খোঁজ নাওনি।
আজ আমি মুক্ত ।মুক্তবিহঙ্গ নীল আকাশে ওড়ার পালা। তাই নিজেকে উৎসর্গ করলাম 'নারী শক্তি দুর্গা' তে। ওদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে এরকম অসহায় বিপন্ন নারীদের নিয়ে কাজ করা এবং তাদের 
সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে দিলাম ওদের মত এরকম একটি ভাল কাজের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে নিজেকে খুবই ধন্য মনে হচ্ছে। অন্তত কারোর জন্য তো কিছু করতে পারব? জানি এই নিয়ে তোমাদের বাড়িতে বিদ্রূপের ঝড় উঠবে। সে উঠুক একটা জিনিস তো থাকতেই হবে। তোমাদের মধ্যে না হয় আমি বিদ্রূপ সমালোচনা ঘৃণার পাত্র হয়ে চিরজীবী হয়ে থাকলাম।আর একটা কথা ,যদি কখনো তিন্নি ফিরে আসে। ওকে আর আঘাত ক'রো না। আমি তো তোমাদের বাড়ি ছেড়ে দিচ্ছি
পারলে ওকে আমার নাম করে একটু খেতে দিও।
তবে এইটুকু আমার দাবি যদি মান্যতা দাও,
 দেবে ।না দিলে আর কি করবো? তবে জেঠিমা আমিও উদ্বাস্তু জীবন কাটিয়ে উঠব। এতদিন গলিপথে ঘোরাফেরা করেছি এবার সঠিক রাস্তায় চলবো।
আবার বলি ভালো থেকো, নতুন ভোর কুয়াশার চাদর সরিয়ে তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। সোনালী রোদ্দুর,স্বর্ণালী সন্ধ্যা বার বার ফিরে আসুক তোমার জীবনে। শুরু হোক নতুন জীবন।

ইতি 
তোমার 
কোন এক সময়ের পরিচিতা
৮.৩.২২

কবি সুব্রত চক্রবর্ত্তীর কবিতা




এক মুঠো শান্ত রোদ
সুব্রত চক্রবর্ত্তী

সাত সমুদ্র যদি ডুবে যায় 
অনন্ত শূন্যের গর্ভে --
নিঃসীমে যদি মিলায়ে যায় 
নগর, প্রান্তর, গিরি ;
নিঃশ্বাসের সকল বায়ু
যদি শুষে নেয় ক্রুদ্ধ সূর্যতাপ।
সীমাহীন মহাকাশে সীমাহীন সকল রাত্রি শেষে  একবার দাঁড়াও এসে পৃথিবীর প্রান্তদেশে।

একবার আকাশটাকে দেখো ,
একবার আরশিতে দেখো নিজের হৃদয়
 ভেসে ওঠে কারো মুখ ?
যুদ্ধ চাও ? ধ্বংস চাও যে ধ্বংস তোমার আমার ?

রণোন্মাদ  যুদ্ধবাজের দল ---
তোমাদের আকাশেও তো চাঁদ ওঠে ,
মাটির সবুজে খায় চুমো।
তোমাদের বাগানেও তো ফুল ফোটে। 
শুনেছ কি ঝরা ফুলের পাঁপড়িদের আর্তনাদ ?

চেয়ে দেখো একবার.... 
তোমার সন্তানদের মুখের দিকে !
চেয়ে দেখো --- ওরাও তো 
বাঁচার ঠিকানা খুঁজতে চায় ।
বারুদের ধোঁয়া মেঘ ফুঁড়ে  উড়তে চায়।
ধরতে চায়... 
একমুঠো আলোর আকাশ।
একমুঠো শান্ত রোদ।

কবি জসীম মাহমুদের কবিতা




মুড
জসীম মাহমুদ

সব গাছের মুড সমান নয়।
যে গাছের মুড ভালো
তার সাথেই  ভাব আমার।

পাতাঝরা লিপির বেদনায়
যে বৃক্ষ লেখে বিরহীপত্র
তারেই করি আমি
গৃহের নিত্যকার   শয়নসঙ্গি

সৌখিন আসবাবপত্রের  আলিঙ্গনে !

২২ মার্চ ২০২২

শামীমা আহমেদ ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৭৪




ধারাবাহিক উপন্যাস


শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত (পর্ব ৭৪)
শামীমা আহমেদ 



শায়লার স্বামী নোমা
ন সাহেব কানাডা থেকে খুব শীঘ্রই বাংলাদেশে আসছেন।তার  আসতে হাতে গুনে আর মাত্র তিনদিন বাকী। প্রতিরাতেই তিনি নিয়ম করে শায়লাকে কল দিয়ে যাচ্ছেন। শায়লা তা ইচ্ছা অনিচ্ছায় রিসিভ করছে।
বাংলা ইংরেজির মিশ্রণে কথাগুলো শুনতে শুনতে শায়লা অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। নোমান সাহেব  শায়লার জন্য, শায়লার পরিবারের সবার জন্য অনেক শপিং করেছেন। ভিডিও কলে তা দেখাতে চাচ্ছেন।কিন্তু শায়লা  নিজেকে নীরব রেখে শুধু ওপ্রান্তের সব কথা  শুনে যাচ্ছে।একেবারেই ভিডিও কলে কোন আগ্রহ দেখাচ্ছে না কিন্তু দিনে দিনে নোমান সাহেবের শায়লাকে জানার আগ্রহ বাড়ছেই।তবে শায়লা নিজেকে একেবারে শামুকের খোলসে গুটিয়ে রেখেছে।কিছুতেই শিহাবের বেষ্টনী থেকে সে বেরুতে চাইছে না।শিহাবের আবেশ আবেগ তাকে প্রচন্ডভাবে ঘিরে রয়েছে। শায়লা শিহাবকে ছাড়া তার বাকি জীবন ভাবতে পারছে না।মনে মনে সে বহুবার শিহাবের ঘরে ঘুরে এসেছে। শিহাবের সাথে কাটানো সময়গুলো চোখ বন্ধ করলেই যেন ছুঁয়ে দেখতে পারছে।গতরাতে শিহাবের কথাগুলোতে শিহাব তার মনোভাব খুবই স্পষ্ট করে জানিয়েছে। শায়লাকে তার নিজের করে পাওয়ায় সে যেন একটা সহজ সমাধান বাৎলে দিয়েছে। ওদিকে নোমান সাহেব ক্রমাগত  কানাডার উন্নত  জীবনযাপনের কথা বলে শায়লাকে সুন্দর জীবনের প্রত্যাশা দিচ্ছে। শায়লাকে নিয়ে সে আবার নতুন করে জীবন শুরু করতে চায়।তার বিদেশীনি বউ পামেলা দুটি সন্তান রেখে 
তার বয়ফ্রেন্ডএর সাথে চলে গেছে।এরপর থেকে নোমান সাহেব আর কোন নারীর প্রতি আস্থা রাখতে পারছিল না।যদিও শায়লাকে বিয়ে করেছিল শুধু সন্তানদের কথা ভেবে কিন্তু এখন তিনি বেশ বুঝতে পারছেন ঘর বাঁধতে হলে দুটি মনের বন্ধন ভীষণ জরুরী। আর আমাদের বাঙালি মেয়েরা নিজেদের অনেককিছু বিসর্জন দিয়ে হলেও সংসার সন্তানের জন্য জীবন কাটিয়ে দেয়।এজন্যই নোমান সাহেব শায়লাকে নিজের কাছে নিতে আর দেরি করতে চাইছেন না। নোমান সাহেবের মনের এই পরিবর্তন এখন শায়লাকে দ্বিধাদ্বন্দের মাঝে ফেলেছে। শায়লা বুঝতে পারছে না শিহাবের প্রতি তার ভালবাসা আর নিজের পরিবারের মান সম্মান রক্ষা করা যেন দুটি বিপরীতমুখী অবস্থান নিয়েছে। 
বাসায় আত্মীয়স্বজনেরা আসতে শুরু করেছে।শায়লার বিয়ের আনন্দ যেন এবার সবাই নিতে চাইছে। শায়লার কাজিনরা নানান রকম পরিকল্পনা করছে।তারা ছাদে গায়ে হলুদের আয়োজন করবে।গান নাচ করে আনন্দ করবে।বাসা বাড়িতে চলছে ঘষা মাজা।ঘরে নতুন জামাইয়ের আগমনে উপরে নিচে একেবারে সাজ সাজ রব চলছে!রুহি খালা যারপরনাই বিজয়ের আনন্দে একতালা দোতলা করছে তবে আড়চোখে ঠিকই শায়লার খেয়াল রাখছে।শায়লার গতিবিধি মনিটর করছে।যেন বিশাল এক দ্বায়িত্ব তার কাঁধে। সবাইকে ইশারা ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিচ্ছে শায়লাকে নজরবন্দী রাখতে।শায়লার মা আর রুহি খালা নানান পিঠা পুলি তৈরির প্রস্তুতিতে ব্যস্ত রয়েছে।কাজের বুয়ার কাজের উৎসাহ বহুগুণ বেড়ে গেছে।সে বিদেশি জামাইয়ের কাছ থেকে মোটা বখশিশ চাইবে বলে ঠিক করে রেখেছে।রাহাত চাইছে যে কয়দিন জামাই থাকবে বাড়িতে লাইটিং করা হবে যেন এলাকার মানুষ বুঝতে পারে এই বাড়ির বড় মেয়ের বিয়ে হচ্ছে।রাহাত সারাক্ষণ ঘরের খুঁটিনাটি সারাই করছে। সবাই বিনা কারণেই হৈ হৈ করে কথা বলে বিয়ে বাড়ির আবহ আনতে চাইছে।
নতুন জামাইয়ের জন্য শেরওয়ানী, নাগড়া, পাগড়ি কেনা হয়েছে। সাথে আরো আনুসাঙ্গিক এক সুটকেস বোঝাই দেশি কাপড়।শায়লাকে বলা হচ্ছে অনলাইনে শাড়ি অর্ডার করতে।এখন মার্কেটে যাওয়ার একদম সময় নেই।ইচ্ছে করেই এসব কেনাকাটা শায়লার ঘরে রাখছে যেন শায়লা শিহাবের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে।সে বুঝতে পারে বাড়ির সবাই কী চাইছে। এজন্য নায়লাকেও জানানো হয়েছে যেন তার শ্বশুরবাড়ির সবাইকে নিয়ে উপস্থিত থাকে। 
শায়লা সবকিছুই দেখছে।
অথচ শায়লা নিজেই এখনো কোন সিদ্ধান্তে স্থির হতে পারছে না। শিহাবকে ছাড়া সে কিছু ভাবতে পারছে না। দেড় বছর আগে বিয়ের সময় ও তার পরবর্তী কয়েকটা দিন নোমান সাহেবের সাথে শায়লা হাতে গোণা কয়েকটি  কথা হয়েছে।একবিন্দু কাছে ঘেষা হয়নি।কিন্তু শায়লা শিহাবের  যতটা নিবিড় সান্নিধ্যে গেছে অথচ স্বামী হয়েও নোমান সাহেব শায়লাকে অতটা কাছে ডাকেনি।তাইতো শিহাবের স্পর্শই তার কাঙ্খিত। সে ভাবতে পারছে না কিভাবে সেই অচেনা মানুষের মধ্যে নিজেকে বিলিয়ে দিবে। শায়লার ভেতরের অস্থিরতাটা বাইরে কেউ বুঝতে পারছে না।সকাল হয়েছে।শায়লা বিছানা না ছেড়েই জানালায় তাকিয়ে এমনি শত ভাবনায় ডুবে আছে।খুব ইচ্ছে করছে শিহাবের কণ্ঠস্বরটা শুনতে। কিন্তু এত সকালে সে কি জেগেছে? কিন্তু সেদিন শায়লাকে দেখার জন্যতো ঠিকই চলে এসেছিল।এখন শায়লারও তেমনি ইচ্ছে হচ্ছে।এক ছুটে শিহাবের কাছে গিয়ে তার ঘুম ভাঙাতে।বারান্দায় বসে দুজনে একসাথে চা খেতে ইচ্ছে করছে।শায়লা বুঝতে পারছে না কেমন করে সে শিহাবকে তার মন থেকে সরাবে,নোমান সাহেবকে আপন করবে।শায়লা যেন ভেতর থেকে শক্তি পেলো।নিজে নিজেই বলে উঠলো, না, যে করেই হউক আমি শিহাবের কাছেই চলে যাবো।পৃথিবীর সবকিছু উলটে যাক,শিহাবকেই সে জীবন সঙ্গী করবে। শায়লা মোবাইল হাতে নিয়ে শিহাবকে কল করতে চাইলো।শিহাব অফলাইন হয়ে আছে। শায়লা শিহাবের মোবাইল নম্বরে কল দিলো।রিং হতে লাগল।

রিশতিনা ঘুম থেকে জেগে সরাসরি ড্রইং রুমে চলে গেলো।শিহাব সোফায় গুটিশুটি হয়ে গভীর ঘুমে আছে। ঘুমন্ত শিহাবকে দেখে রিশতিনার খুব মায়া হলো।সে ভেবে নিলো,তার জন্যই আজ শিহাবের জীবনটা এলোমেলো হয়ে গেছে। কেমন বিষন্ন মুখে ঘুমিয়ে আছে। পাশে টেবিলে এস্ট্রেতে সিগারেট ফিল্টার উপচে পড়ছে। রিশতিনা সেটা নিয়ে কিচেনে গিয়ে ক্লিন করে নিলো।রিশতিনা  প্রতিদিন সকালে সুগারফ্রি একমগ গ্রীন টি নিয়ে টিভির সামনে বসে।আজ টিভি দেখতে মন চাইছে না। সে আভেনে একমগ পানি গরম করে গ্রীন টি ব্যাগটা ডুবিয়ে ঘরের জানালার পর্দা সরিয়ে মানুষের চলাচল দেখতে লাগলো। হঠাৎই শিহাবের ফোনে কল এলো।শিহাব গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে আছে। শায়লা এগিয়ে গেলো। মোবাইল স্ক্রিনে ইংরেজিতে  শায়লার
নাম ভেসে উঠেছে। রিশতিনা বুঝতে পারছে না কাল রাতে শিহাবের মেসেঞ্জারে কল এলো মায়া নামে আবার এখন শায়লা নামে।দুজনই কি এক জনই? নাকি ভিন্ন দুইজন! 
না,শিহাব শায়লাকে মায়া নামে ডাকে? রিশতিনার ভাবনায় মোবাইল রিং চলছেই।শিহাবের তাতে এতটুকুও নড়াচড়া নেই। খুবই কৌতুহলবশত রিশতিনা কলটি রিসিভ করলো।


চলবে....

কবি মিতা নূর এর কবিতা




কেউ ডাকবে না 
 মিতা নূর 

অলস দুপুর আমার মুক্তির পথ খুঁজে 
নিরুপায় জীবন আমার একাকীত্বে গুমরে কাঁদে, 
এইযে উঠোন ভর্তি জ্বলন্ত রোদ,
 বুকের চাপা কান্নার অদৃশ্য প্রাচীর। 
পাশেই একটুকরো বারান্দা,
এই  ইট-পাথরের রাজ্যে চাপা পড়ে আছে।
কতো অভিমান,  অপূর্ণ চাওয়া!
অভিযোগ গুলোও  চোখের নালিশে ক্ষয় হতে-হতে,
শুকনো কংক্রিটে আজ  আবদ্ধ!
বুকের গভীরে একটু একটু করে জমিয়ে রাখা কষ্ট গুলো আকাশ ছুঁয়েছে,
তারই কিছু দুঃখ তোমাদের কাছে রেখে!
আজ নীরবে চলে যাচ্ছি কোনো অজানায়, একা।
জানি, অভিমান ভাঙা ছলে কেউ ডাকবে না। 
আর- মিথ্যে আশা করিও না !! 

কবি রুবি রায় এর কবিতা





দেবীর তরফ থেকে

মেঘেদের কোনো নাওয়া-খাওয়া নেই
শুধু ভেসে যায় কালশিটে অভিজ্ঞতা নিয়ে

টুটুল তুমি বেঁচে থাকতে পারে

আঠালো লালারস কীভাবে রেইড দিয়ে
যায়, একটি অকৃপণ ন্যাড়া পেটে
তা শুধু জানে রূপালি পক্ষেরা

তুমি ওর সাথে কালের মতো জড়িয়ে থাকলে না কেন ?

আমিও মেঘ হব, চিন্তা মুক্ত সেই মেঘ 
যে বিদ্যুৎ বুকে জড়িয়ে ঝরে পড়তে জানে
বিপরীতে হাই রেটিংযুক্ত রোমান্টিক গান
       ভিজুক টালির ঘরগুলো 
      ট্রামলাইনের ধার ধরে হেটে যাওয়া 
      দুটো মানুষের মাঝে ঝরব নগ্ন-মৌলিক হয়ে 

গণতান্ত্রিক ট্রুটি-ফ্রুটি আইসক্রিম বুঝুক ঠোটের গৌণ ভাটা
      অচেনা ঠিকানায় ফানুস খুঁজছে 
হাত ।

                 

কবি বিধানেন্দু পুরকাইত এর কবিতা




ভাষার জন্য
বিধানেন্দু পুরকাইত

একটা ভাষা মানানসই
জন্মক্ষণে পাওয়া
বুকের ভেতর হাপর চলে
জাপটে ধরে মায়া। 

জীবন গেল যাদের - তাদের
যেখানে হোক বাড়ি
বাংলা ভাষা বিশ্বজনীন
একুশে ফেব্রুয়ারি। 

রক্ত গেল বুকের থেকে
হিন্দু বা মুসলিম
বাঙালীরা শহীদ হলো
সেটাই বড় ঋণ। 

কাঁটাতারের নকল বেড়া
মানছে না আবেগ
ভাষা দিবস তোমার আমার
পবিত্র সন্দশ।

কবি নাসিমা মিশু'র কবিতা




বিরহ কুহক 
নাসিমা মিশু

আবাস হীন দ্বার আমার  
মাটির বিছানা উন্মুক্ত প্রান্তর 
তোমায় সাধিব সাধ্য কী  আমার
হিম হিম শীতল সমীর আমায় ছুঁয়ে যায় 
খুব সাধ মাটিতে মিশে যাওয়া আমার দেহ
নয়ন জ্যোতি হারাবার ক্ষণ তোমায় দেখে দেখে হারায় 
বড্ড ভালোবাসি তোমায় হে প্রিয় বিরহ বড্ড ভালোবাসি ! 
কে কারে মোরা কতটা করেছি জ্বালাতন 
কত নিশিযাপন ঘুম হীন অপাত্রে করেছি দান
তোমাতে আমাতে নিঃশব্দ অব্যক্ত রোদন আর নয়
নয় দূর অচলের সমতা খোঁজা 
একই বৃন্ত একই সুর তুমি আমি আপনজনা 
নহি দূর  নহি একা !

কবি সুব্রত চক্রবর্ত্তী'র কবিতা




এক মুঠো শান্ত রোদ
সুব্রত চক্রবর্ত্তী

সাত সমুদ্র যদি ডুবে যায় 
অনন্ত শূন্যের গর্ভে --
নিঃসীমে যদি মিলায়ে যায় 
নগর, প্রান্তর, গিরি ;
নিঃশ্বাসের সকল বায়ু
যদি শুষে নেয় ক্রুদ্ধ সূর্যতাপ।
সীমাহীন মহাকাশে সীমাহীন সকল রাত্রি শেষে  একবার দাঁড়াও এসে পৃথিবীর প্রান্তদেশে।

একবার আকাশটাকে দেখো ,
একবার আরশিতে দেখো নিজের হৃদয়
 ভেসে ওঠে কারো মুখ ?
যুদ্ধ চাও ? ধ্বংস চাও যে ধ্বংস তোমার আমার ?

রণোন্মাদ  যুদ্ধবাজের দল ---
তোমাদের আকাশেও তো চাঁদ ওঠে ,
মাটির সবুজে খায় চুমো।
তোমাদের বাগানেও তো ফুল ফোটে। 
শুনেছ কি ঝরা ফুলের পাঁপড়িদের আর্তনাদ ?

চেয়ে দেখো একবার.... 
তোমার সন্তানদের মুখের দিকে !
চেয়ে দেখো --- ওরাও তো 
বাঁচার ঠিকানা খুঁজতে চায় ।
বারুদের ধোঁয়া মেঘ ফুঁড়ে  উড়তে চায়।
ধরতে চায়... 
একমুঠো আলোর আকাশ।
একমুঠো শান্ত রোদ।

মমতা রায় চৌধুরীর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৩৯





টানাপোড়েন ১৩৯
ভয়েস বিভ্রাট (৪)
মমতা রায় চৌধুরী



দিদির ফোনটা আসার পর কল্যান একটু স্বস্তি পেল ক্লান্ত অবসন্ন দেহে যেন একটা টাটকা বাতাস। কি শান্তি, কি শান্তি। এবার ভাবছে  একটু ঘুমাবে গতরাত্রে একদমই ঘুম হয়নি। কি করে টাকা পয়সার অ্যারেঞ্জ করা হবে,? কি করেই বা বিয়েটার সঠিকভাবে সমাধান হবে কিছুই বুঝতে পারছিল না। যে কল্যান বুদ্ধিদীপ্ত বলে পরিচিত সেখানেই তাঁর বুদ্ধিনাশ হতে চলেছে। আবার যেন আস্তে আস্তে মাথার জটগুলো খুলতে শুরু করেছে। এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে চোখটা লেগে এসেছে ।বেশ কিছুক্ষণ পর হঠাৎ কলিংবেলের আওয়াজে ঘুম ভেঙে যায়। ধড়ফড় করে ওঠে বুক। আবার ভাবতে না ভাবতেই,কলিংবেলের আওয়াজ ।ঘড়ির দিকে তাকালো কল্যাণ 'ও বাবা , মাসির আসার সময় হয়ে গেছে তো । ক্লান্ত শরীরকে তুলতে পারছে 
না । তবুও আপন মনে বলল 'যাই দরজাটা খুলি। 'আস্তে আস্তে উঠে দরজাটা খুলে দেখল "সত্যিই যেটা ভেবেছিল তাই মাসি এসে দরজায় কড়া নাড়ছে।
ঘুমন্ত চোখের দিকে তাকিয়ে মাসি বলল'তুমি কি ঘুমিয়ে পড়েছিলে?'
হ্যাঁ,একটু চোখটা লেগেছিলো।'
একটা মস্ত বড় হাই তুলল আবার তারপর"ইশারায় চা দেবার কথা বলল।'
'হ্যাঁ , তুমি বসো আমি দিচ্ছি এক্ষুনি।'
মাসি তাড়াতাড়ি রান্না ঘরে গিয়ে চা করে নিয়ে আসল।
'চায়ের সাথে কিছু খাবে? সন্ধ্যেবেলায় নাস্তা?'
কল্যান জিজ্ঞেস করল' কী খাওয়াবে?'
'একটু পকোড়া ভেজে দেবো? খাবে?'
কল্যান ঘাড় নাড়লো।
কল্যান একটা ম্যাগাজিন উল্টে দেখতে লাগলো।
মাসি কিছুক্ষণের মধ্যেই বাঁধাকপির পকোড়া নিয়ে চলে আসলো। আবার একটু ধনেপাতার চাটনিও করেছে।
কল্যান বললো wow।
কল্যান ইশারায় মাসিকে এক কাপ কফি দিতে বলল।
মাসিও একগাল হেসে কি সুন্দর কফি বানিয়ে নিয়ে চলে আসলো ।সত্যি মাসি আজকাল কল্যাণের ইশারার কথা অনেক  বুঝে গেছে। মাসি বেশ বুদ্ধিমতী।
হঠাৎ একটা ম্যাগাজিনে রসালো গল্প দেখে কল্যাণের মনটা চলে গেল তার বন্ধু বিবেকের প্রেমের পরিণতিতে। সত্যি বিবেকটা বটে নিজের থিসিসের কাজটা দিব্যি বিদেশে গিয়ে হেনরীর সাথে জমিয়ে প্রেম করে তার কাছ থেকে নিজের কাজগুলো হাসিল করে নিল। আবার তাকে কাঁদিয়ে চলে ও এসেছে। আসলে বিবেক যখন পূর্ণবয়স্ক যুবক ।তার শরীরে যৌবনের ঢেউ লেগেছে আর হেনরি র তখন যৌবন মধ্যগগণে এসে 
ঠেকেছে ।
তাই হেনরি নিয়ে জীবনসঙ্গিনী করার কথা ভাবতে পারেনি । শুধু তাই নয় রক্ষণশীল বাঙালি পরিবারে বিদেশি মেনেও নেবে না। তা জেনেও সেই গিয়েছিল। কিছু বুঝতে পারিনি হেনরি এতটা বিবেককে পছন্দ করবে।এটা সে মনে মনে জানত কিন্তু তার থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায়ও নেই। এতটাই তাকে সাহায্য করেছে একটা কৃতজ্ঞতা বলেও তো কিছু 
থাকে ।  কিন্তু এটা ওর মধ্যে বিন্দুমাত্র ছিল না।
তাই কি করে তার হাত থেকে মুক্ত হওয়া যায় সেই উপায় খুঁজছিল। সে হেনরীর কাছে হাঁপিয়ে উঠেছিল।
হেনরি টুকটাক সব কাজ থেকে শুরু করে থিসিসের টাইপিং থেকে শুরু করে সবই করে দিত ।তাইএকদিন একটা ইচ্ছাকৃতভুল করে বিবাহিতা মাসতুতো দিদির ছবিটা  তার পেপার এর মধ্যে রেখে দিয়েছিল যাতে  হেনরীর
খুব সহজেই নজরে চলে আসে। এবং যেদিন সে কাজটি করেছিল সেই দিনই  হেনরির ওখানে
 লাস্ট দিন হয়েছিল । হিন্দি যথেষ্ট আঘাত পেয়েছিল।হ্যাঁ তাকে যথেষ্ট অপমান করেছিল ।বলেছিলি ' সব ইন্ডিয়ানরাই  চিটিং করে। যাই হোক সে কিন্তু কখনো নিজের থেকে আর তার রাগ ভাঙাতে যায়নি তার ভেতরের ক্ষোভগুলোকে সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করেনি কারণ এটাই চেয়েছিল বিবেক। এই গল্প আবার কল্যানদের কাছে বলেছিল।
তখন কল্যান বলেছিল ' সে কাজটি মোটেই ঠিক করেনি ।এতে বিবেক উত্তর দিয়েছিল এতে হয়ত হেনরি তার সঙ্গে তার জীবন সঙ্গিনী হলে হেন রী  ভেসে উঠত কিন্তু তার জীবনটা ডুবে যেত এটা কখনো তাদের পরিবারে মেনে নিত না।
" শুধু পরিবারের দোহাই দিয়ে কি লাভ বল ভাই। তুই কি নিজে মেনে নিতে পারতিস ?
যার জন্যই তো তুই এই সমস্ত কান্ড করেছিস। তবে একটা কৃতজ্ঞতাবোধ বলেও তো কথা 
আছে ।ঠিক ওভাবে না কাঁদিয়ে আসলেই ভালো হতো  কাপুরুষের মতো চলে আসাটা ঠিক হয়নি। 
অনিন্দ্য বলেছিল' সত্যি কথাটা সত্যি ভাবে বলতে পারতে'। 
"কি সত্যি কথা বলতে পারতাম আমি ।
বলতাম" তোমাকে ভালোবাসি না।'
 বিবেকের স্পষ্ট উত্তর কল্যাণ ,অনিন্দ্যরা   ক্ষুব্দ হয়েছিল এবং বলেছিল এই কথাটা স্পষ্ট করে  বরং হেনরিকে বললে ভাল হত।
কল্যাণ বসে বসে 
 কফি খেতে খেতে ভাবছে 'সত্যিই তো । পৃথিবীতে তো একজনই জিতবে ।একজন না হারলে  অন্যজন জিততে পারে না  ।তাইবিবেক জিতেছিল  ।তাই হেনরি হেরেছে। আজ তার জীবনে প্রভা যে কাণ্ডটি করেছে, প্রভা তাকে চিট করেছে। তাই আজকে শিখার মত একটি সহজ সরল মেয়েকে পেয়েছে।,
কল্যান ভাবছে তার অতীত জীবনের কথা শিখাকে বলা দরকার মনের ভেতরে কোন কিন্তু রাখতে নেই।
ভাবতে ভাবতে জানালার কাছে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরালো কি করে বলবে শিখাকে তাহলে কি তাদের প্রথম ভালোবাসার রাতে বলবে এইbকথা? না, না, না তাহলে বরং রাতটাই মাটি হয়ে যেতে পারে।
এমন সময় ফোন বেজে উঠলো। তখনো কল্যান সিগারেটের ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে যাচ্ছে জানলার কাছে দাঁড়িয়ে রাতের নিস্তব্ধতা নিজেকে হারিয়ে ফেলার চেষ্টা করতে চাইছ
আবার ফোন বেজে উঠলো
এবার মাসী রান্না বান্না শেষ করে যাবার পথে বলল" বাবা তোমার ফোন বেজে যাচ্ছে।
তাহলে আমি আসি?
হ্যাঁ ,মাসি এসো।'
এ বাবা ডাক্তার সরকার ফোন করে যাচ্ছেন।
হ্যাঁ নমস্কার ডাক্তার বাবু।
আপনাকে বেশি কথা বলতে হবে না আপনার তো ভয়েস রেস্টে থাকার কথা আমি বলছি আপনি শুনুন।
আপনার সব ঠিক হয়ে গেছে নিশ্চয়ই ।তাহলে শুনুন  সামনের মাসের কিন্তু দু তারিখে আপনার ডেট ফেলা হলো ।
আপনার বিয়ের ডেটটা কবে?
28 তারিখ। খুব চাপ হয়ে যাবে মনে হচ্ছে?
"ঠিক আছে কি আর করা যাবে এটাও তো আপনার জীবনে ভাইটাল।'
'ওকে 'ডাক্তারবাবু।
ফোন রাখতে না রাখতেই আবার ফোন বেজে উঠলো।
'হ্যালো'
হ্যাঁ বলো।
শিখা বলছে কি ব্যাপার বলতো একবারও খোঁজ নিলে না কিছু বললে না। আমি তো কতটা টেন্সড আছি।"
'হ্যাঁগো সব ব্যবস্থাই হয়ে গেছে টেনশনের কোন কারণ নেই।'
"সব ব্যবস্থা মানে।'
'বিয়ে আর আমার অপারেশন।'
শিখা বলল 'ও ও ও ও'
কল্যাণীও খুব বড় করে উচ্চারণ করল ওওও।
'ঠিক আছে তোমায় অত বেশি কথা বলতে হবে না  চুপ করে থাকো ।'
'বাহ্ রে চুপ করে থাকলে তোমার কথা শুনবো কি 
করে ? আমরা কাছাকাছি বসে আছি যে শুধু তোমাকে দেখে যাব।
তবে মনের আয়নাতে দেখতে পাচ্ছি।
আমার কিছু কথা বলার আছে ,শিখা তোমাকে।'
এখন কোন কথা তোমাকে বলতে হবে না ।'
"এই কথাগুলো তোমার জানার দরকার। কারণ তুমি আমার জীবনে আসতে চলেছ। আমি কোন কিছু গোপন রাখতে চাইনা।'
"আমার ও অতীত নিয়ে তোমাকে বলতে চাই 'বলল শিখা।
'কল্যান কেমন চমকে 
উঠল ।অতীত ! শিখারও অতীত আছে ।সে তো কখনো কল্যাণকে বলেনি সে কথা।'
কল্যান বলল 'আগে আমারটা শোনো।'
শিখা বলল 'অতীত  থাক না তাকে ইতিহাসের পাতাতেই  থাকতে দাও ।বর্তমানে টানা হেঁচড়া ক'রো না ।ইতিহাস তোমার স্মৃতি চারণ করাবে বটে নতুন করে কোন বন্ধনে জড়িও না।'
কল্যান ভাবছে ' শিখা কত ভালো ভালো কথা বলছে।'
শিখা মনে মনে ভাবছে 'সে কি তার নিজের অতীত ঢাকার জন্যই কল্যাণকে বারবার নিষেধ করছে।
ঠিক আছে তুমি যখন জানতে চাইছো না আমি আর তোমাকে জোর করব না ।তবে তোমার জানা উচিত ছিল আমি কিন্তু তোমাকে বলতে চেয়েছি।'
শিখা অনেক কষ্টে বলল-আমারও তোমাকে কিছু কথা বলার আছে।'
কল্যান বলল 'কিসের 
কথা ?'
'তোমার যেমন একটা অতীতের কথা বলছ আমারও এইরকম একটা অতীত আছে।'
শিখার বৌদি এসে শিখাকে ইশারায় বলতে নিষেধ করে।
শিখা ফ্যালফ্যাল করে তার বৌদির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।'
কল্যান ভাবতে থাকে শিখারও অতীত আছে,?কি থাকতে পারে শিখার। শিখা ও কি আমার মত পোর খাওয়া।
ভেরি ইন্টারেস্টিং।'
এমন সময় শিখার বৌদি মাধু  বলল 'হ্যাঁরে কল্যাণকে জিজ্ঞেস কর অপারেশন টা কবে?
এখন ঠিক আছে তো আগের থেকে একটু।'
কল্যান সব শুনতে পাচ্ছে।
শিখা বললো' ও তো বলছে সবই অ্যারেঞ্জ হয়ে গেছে।'
"ঠিক আছে তোরা কথা বল।'
ইশারায় শিখার অতীত সম্পর্কে বলতে নিষেধ করে গেল

'আর বেশি কি কথা বলব না । বেশি কথা বললেই তোমার কষ্ট দরকার নেই ।রাখো এখন।'
'"ok'
ফোন কাটার পর সিগারেট ধরালো সিগারেট খাওয়া নিষেধ আছে। তারপর ভাবল এটা শেষ করে আর খাব না।'
আবার ফোন বেজে উঠল সিগারেট হাতে নিয়ে ফোনটা রিসিভ করল' ও বাবা দিদি ফোন করেছে।'
সিগারেট ফেলে দিল।
ফোনটা রিসিভ করল বলল' হ্যাঁ, দিদি বলো।'
'হ্যাঁ রে, ডেটটা ঠিক হলো।'
'হ্যাঁ দিদি ঠিক হয়েছে মাসের দু তারিখে।'
'ঠিক আছে বাবা দুগগা দুগগা করে এখন সবকিছু ঠিক হয়ে যাক। মধুসূদন ঠিক করে দিক। বলেই দুহাত জোর করে কপালে  ঠেকালো।
ঠিক আছে বেশিক্ষণ কথা বলবো না তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়।'
'ওকে দিদি।'
একটু খেয়ে নিল তারপর ভাবলো  সত্যি, রাত জাগা যাবে না।
ক্লান্ত শরীর বিছানায় এলিয়ে দিতেই মায়ের কথা মনে হলো।
এরকম যখন ছোটবেলায় ক্লান্ত লাগত মা তখন কেমন চুলের মধ্যে বিলি কেটে কেটে দিত এভাবেই রোজ রাত্রে ঘুম পাড়িয়ে দিত মা। আজকের মা কোথায় ?মা তো না ফেরার দেশে চলে গেছেন ।শত চেষ্টাতেও তাকে আর ফিরে পাবোনা। একবার দেখে যাও তোমার কল্যাণকে ।দেখো  ,গলার অবস্থা কি?'

সত্যি মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে ।মা কেমন সুন্দর চুলের মধ্যে আঙ্গুল ঢুকিয়ে দিয়ে বিলি কেটে কেটে ঘুম  পাড়িয়ে দিতেন।। আজকে খুব অসহায় মনে হচ্ছে সব সময় খারাপ অবস্থায় মাতার আশীর্বাদ মাথায় রাখতেন। দু'চোখ জলে ভিজে গেল। কষ্টের অশ্রুতে কল্যাণের বালিশ ভিজে যেতে লাগলো।