০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২

কবি শিল্পা ম্যাক এর কবিতা





একা
শিল্পা ম্যাক

অবশেষে মানুষ জেনেছে
 অনেক ভিড়েও মানুষ একা
কেউ কেউ খুব একা
নিরাকার অন্ধকারের মতো
বিধবার হাহাকারের মতো
দূর আকাশের উড়ন্ত চিলের মতো
অমাবস্যার দ্বিপ্রহরে করুণ সুরে ডাকা কুকুরের কান্নার মতো
ঝুম দুপুরের নির্জনতার মতো
ভরা পূর্ণিমায় উছলে পড়া 
জোছনার মতো
কুয়াশা ভেজা ঘাসের ডগায়
এক বিন্দু শিশিরের মতো
নিঃসঙ্গতায় ছেয়ে থাকা হলদে রঙের 
পড়ন্ত বিকালের মতো
সন্ধ্যা নামার মুখে পশ্চিমের আকাশে
হেলে পড়া ডুবন্ত সূর্যের মতো
ঘোর নিশিতে নিয়ন আলোয় 
ঠায় দাঁড়ানো অসহায় ল্যাম্প পোষ্টের মতো
কেউ কেউ খুব একা
বুকের মধ্যে না বলা কষ্টের মতো 
একলা একা
ভীষণ একা ।

কবি হা‌বিবুর রহমান হা‌বিব'র কবিতা                   




দ্বীপ জ্বে‌লে                                    
হা‌বিবুর রহমান হা‌বিব                       


জীবন যন্ত্রণার আ‌বেশ আমার ছিল ভূবন ভরা,                   
তু‌মি ডে‌কে ছি‌লে আর ডে‌কো না।                                       
চ‌লে যাব বহু দূ‌রে রেখ না স্মৃ‌তি আর,                                      
নি‌ভির আঁধা‌রে একা ফে‌ল না আঁ‌খি জল,                                
চির নেভা দ্বীপ আর জ্বে‌লো না,                                                   
মায়াময় যন্ত্রণার আ‌বেগ আর পর‌শে।                                  
অকার‌ণে বাড়া‌বে জা‌নি তোমার ব‌্যাথার মায়া,                       
দেখা হ‌বে না কোন নি‌ভির প্রান্ত‌রে,                                           
উজ্জল অনন্ত শিখা হৃদয় বৃ‌ন্তে তোমার,                                                   
বেদনার হা‌সির মায়ায় ছলনা রে‌খো না ম‌নে,                      
ফি‌রে চে‌য়েও না পিছু আর।               
জা‌নি ভুল‌তে পার‌বে না জীবন নদীর স্রো‌তে,                          
যে পথ চির‌চেনা গেলাম তা‌রে আজ ভু‌লে।                           
নিঃশ্বা‌সে ভিল না বিষ বিশ্বাস ছিল বহু দূর,                      
তীর বৃদ্ধ জীবন অঙ্কু‌রে আমার ক্ষয়,                                   
সন্ধ‌্যা তারার ম‌তো এ‌সে‌ছিলাম,                                      
নি‌ভে গেলাম রা‌তের আঁধা‌রে,আঁধা‌রে ।

কবি বর্নালী সেনগুপ্ত'র কবিতা




উন্মোচন
 বর্নালী সেনগুপ্ত

উষ্ণতা দিয়ে মাপতে চাও পুরুষ,নারীত্বকে !
বেশ নগ্ন করে দিলাম
তোমার সামনে,
ওই দেখো তোমার জন্মস্থান,মাতৃযোনী।
দেখতে চাও পাহাড় কেমন উঁচু ?
উন্মুক্ত বক্ষে দন্ডায়মান 
তোমার সহোদরা,
দেখো,উপভোগ করো যতখুশি।
কেন নত তোমার মুখ?
যৌনতা পাচ্ছোনা বুঝি সুখ?
নানান বাহনায় হাত দাও ,বাসে ,ট্রেনে,
তবে? কিসের দ্বিধা ?
ধর্ষক না হলে পৌরুষের পরাজয় !
এইখানেই তোমার চিরকালের পরাজয়।
হায়,পুরুষ স্তন দেখলে,
দেখলেনা শিশুর প্রথম আহার !
যোনীকে মাপলে নীল ছবিতে,
তোমার জন্ম ওই গভীরতাতে !
ভুলে যাও কি অনায়াসে !
পুরুষ নামে নির্ভয়াদের ঘৃণা আসে।

কবি সজল কুমার মাইতি'র কবিতা





মায়ের  উষ্ণতা 

সজল কুমার মাইতি



একটি কুকুর 
                 তার চারটি ছানা 
নিত্য নতুন খেলা করে 
                   কেউ করেনা মানা।
মা তাদের আদর করে 
                       বুকের দুধে পালন করে 
হেথা হোথা ঘুরে বেড়ায় 
                     শাসন তাদের নেইকো জানা।
মাঠের কোনে গাছের তলায় 
                      মায়ের বুকে জড়িয়ে সবাই 
শীত গ্রীষ্মের বালাই নেই 
                      ঘুমের দেশে দেয় যে হানা।
সকাল সন্ধে স্বাস্থ্য খোঁজে 
                       মানুষজনের আনাগোনা 
লোভী মানুষ তাদের মাঝে 
                        উধাও করে একেক ছানা।
পাগল মা খুঁজে বেড়ায় 
                       মানুষ দেখলে কামড়ে তাড়ায়
মায়ের বুকে ওম খোঁজে 
                      একটি কেবল কুকুর ছানা।

০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২

মমতা রায় চৌধুরীর' উপন্যাস পার্ব ১০০






উপন্যাস 

টানাপোড়েন১০০
রেখার ইতিকথা
মমতা রায় চৌধুরী


রেখা সারা রাত দু চোখের পাতা এক করতে পারে নি। রিম্পাদি ট্রান্সফার হয়ে যাবার পর স্কুলে যেতে ইচ্ছে করছে না। দীর্ঘদিন পাশাপাশি বসা কত কথাই না  রিম্পাদির সঙ্গে বলেছে। একটা আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। এসবই ভেবে ভেবে রাত গভীর হয়, দু চোখ ক্লান্ত তবুও চোখের পাতা এক হতে চায়না। এক আকাশ বুকে আশা নিয়ে প্রহর কাটে তার।আজকাল মনোজ ও খুব বেশি একটা কথা বলে না। পুরোপুরি জীবনটা কেমন যেন বিবর্ণ হয়ে যেতে বসেছে। বেঁচে থাকার মধ্যে আছে তার লেখা। আজকাল লেখাটাই রেখাকে প্রাণ দেয়। আরে বাবা দেবেই বা না কেন 'সিড়ি'ত্রিকার সম্পাদক রেখাকে তাড়া দিয়ে লেখা আদায় করে নেন। সত্যি লেখায় যেন একটা আলাদা অনুপ্রেরণা খুঁজে পায় রেখা ।
আজকাল মনোজও বেশিরভাগ সময়টা ড্রইংরুমে কাটায়। বলে তো অফিসের চাপ বেড়েছে। রেখা চিরকালই কারোর কোন পার্সোনাল ব্যাপারে মাথা ঘামায় না। মনে পড়ে যায় যখন প্রথম বিয়ে হয়ে এ বাড়িতে  আসে ।রেখার শাশুড়ি মা অবশ্য প্রথম থেকেই রেখাকে পছন্দ ছিল না। শুধুমাত্র ছেলের পছন্দ বলে নাও করতে পারেন নি।  
ননদ সে তো বলেই দিয়েছিল 'কি দরকার ছিল ভাই, তোর অন্য কাস্টে বিয়ে করা? আমাদের কালচারের সঙ্গে মিলাতে পারবে?'
যদিও রেখাকে এই কথাগুলো মনোজই বলেছিল।
বিয়ের পর থেকে রেখা হাড়েহাড়ে বুঝতে পেরেছিল সত্যি অন্য কাস্টে বিয়ে করাটা ঠিক হয়নি।
বিয়ের পর ফুলশয্যার পরের দিন শাশুড়ি মা রেখা কে যেভাবে বলেছিল'কাজের মেয়ে মামুনকে দিয়ে
আজও মনের ক্যানভাসে রং তুলি নিয়ে আঁচড় কেটে যায়। এইতো ফুলশয্যার পরের দিন
রেখা  খুব তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠেছিল। নতুন পরিবেশ, নতুন বাড়ি কেমন যেন একটা সবসময় ভয় ভয় কাজ করছিল। এত বড় জয়েন্ট ফ্যামিলি সকালে উঠতেই হবে। রেখাকে কিন্তু কেউ কিছু বলেই দেয় নি, কি করতে হবে, না করতে হবে। যেন দূরে সরিয়ে রাখার একটা প্রবণতা। কত আশা নিয়ে শ্বশুর বাড়িতে এসেছিল। ফুলশয্যার পরের দিনই বুঝতে পেরেছিল এই আশা আদপেও  বাস্তবায়িত হবে না। তবুও 'বৃথা আশা মরিতে মরিতেও মরে না।'
রেখা ভেবেছিল' সে তো একজন শিক্ষিকা এত বড় একটা পরিবেশে সকলের সঙ্গে মানিয়ে ,স্টুডেন্টদের সঙ্গে বোঝাপড়া করে স্নেহ দিয়ে ভালোবাসা দিয়ে তাদেরকে মানুষ গড়ার কারিগর হতে পারে। তবে,এই সংসার টা বাদ যাবে
 কেন? 'যতই তারা দূরে ঠেলে দিক রেখা ভালোবাসা দিয়ে সকলকে মনের বন্ধনে বেঁধে রাখবে। ভালোবাসায় সব হয়। কিন্তু এই আশা আর কবে বাস্তবায়িত হবে?
বিয়ের পর থেকেই দেখে এসেছিল এ বাড়িতে কাজের মেয়ে সংখ্যা কম নয়। কিন্তু বাস্তবে তার সঙ্গে কি হয়েছে? ফুলশয্যার পরের দিনই তাকে ঝাটা ধরতে হয়েছে।
আজও মনে পড়ে সেই দিনটার কথা
'এতটা বেলা হয়ে যাওয়ার পরেও রেখা যে ঘরে থাকে মানে যে ঘরটাতে থাকতে দেয়া হয়েছে, সেই ঘরে কেউ ঝাট দিতে আসেনি বা ঘর কেউ মুছতে ও আসেনি।'
রেখা একটু অবাক হয়ে গেল নতুন বিয়ে হয়েছে । কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করতেও পারছে 
না ।কেমন একটু সংকোচ বোধ হচ্ছে।
এমন কি কেউ চা খাবার জন্যও  ডাকছেন  না।
মনে দ্বিধা নিয়ে রেখা  বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিজে একটা কোনরকমে ঝাটা খুঁজে পেল সেটা দিয়েই ঘরটাকে ঝাট দিল। এরমধ্যে দেখতে পেল তাদের ঘরটা বিয়ের আগে নুতন করা হয়েছে কিন্তু সেই ঘরের ভেতরে দেওয়াল আলমারিতে সিমেন্ট বালি লেপ্টে আছে। রেখা মনে মনে ভাবছে তাইতো এইগুলোতে এত নোংরা পড়ে আছে কিছুটা পরিষ্কার করে নি।
যেইনা ভাবা অমনি কাজ। একটা ন্যাকড়া জোগাড় করে  মোছামুছি করছে ঠিক সেইসময় কাজের মেয়েটি এসে বলল 'বৌদি কি করছো?'
রেখা বলল 'এইতো ভাই ঘরটা একটু ঝাট দিলাম আর এইগুলো একটু পরিষ্কার করছি।'
মামুন জিজ্ঞাসু কন্ঠে বলল'ও তাই?'
এরপর মামুন দ্রুত ছুটে চলে গেল নিচে।
তখনো জানে না রেখা যে নিচে এত বড় একটা ঘটনা ঘটে গেছে ।রেখাকে নিয়ে সারাবাড়ি তোলপাড় হয়ে গেছে। হঠাৎই একটা কথা কানে আসলো'রেখা র শাশুড়িমা মামুন মেয়েটাকে বলছেন 'এবাড়িতে এসব চলবে না ।এবাড়িতে কিছু সংস্কার আছে। বাসি কাপড়ে কেউ ঘর ঝাট দেবে না বা অন্য কাজ করবে না।  গিয়ে বল ।'
একটু পরেই মামুন বলে মেয়েটি ছুটতে ছুটতে আসে সিঁড়ি দিয়ে। এরপর এক হাত জিভ বের করে হাঁপাতে 
থাকে।  হাঁপাতে হাঁপাতে বলে  'বৌদি তোমাকে বাসি কাপড়ে এই সমস্ত কিছু করা যাবে না।'
রেখা বলল' আমি বাসি কাপড়ে নেই 
গো। আমি কাপড় চেঞ্জ করেছি ফ্রেশ হয়ে।
তারপর রেখা বললো তুমি জানো এই ঘর এই মাসি টা কি মুছতে আসবে গো? মামুন বলল না না মনে হয় কেউ মুছতে আসবেনা জানো বৌদি।
রেখা বলল আমি কি করে জানব ভাই আমিতো বাড়িতে নতুন তাই তোমাকে জিজ্ঞেস করছি।'
মামুন আর কিছু না বলে সরাসরি নিচে চলে যায়।
 একটু পরেই রেখা খেয়াল করে তাদের পাশের ঘরটাতে ওর শাশুড়ি মা থাকে সেই ঘরটা মুছে ওই মাসি বেরিয়ে চলে যাচ্ছে। কিন্তু রেখার ঘর বা রেখার ঘরের সামনের বারান্দা কিছুই মুছলো  না।
অথচ এ বাড়িতে আসার পর শাশুরি মা কিন্তু কিছুই বলে দিলেন না    কি করতে হবে ,না করতে হবে। রেখা তো  নতুন তাকে শিখিয়ে পড়িয়ে নেবে কিছুই বলেনা।
অথচ রেখা যখন নিজের ঘরে নিজে কাজ করতে যাচ্ছে তখনও খুঁত ধরে ধরে বেড়াতে লাগলেন।
যাইহোক একটু পরে আবার সেই মেয়েটি উঠে আসে এবং বলে 'বৌদি তুমি কিন্তু এখন এসব কিছু করতে ব'সো না। '
রেখা বলে' তাহলে কি ঘর এরকমই পড়ে থাকবে?'
মামুন বলে সেটাও আমি বলতে পারব না।'
রেখা স্নান করে নিজেই একা নিচে নেমে গেল।শাশুড়ি মা যে ঘরটা বসেন সেই ঘরে গিয়ে বসলো। ঘরে ঢুকতেই ননদ আর আর শাশুড়ি মা একান্তে কি কথা বলছিলেন , কে জানে? রেখাকে দেখে চুপ করে গেলেন। আর রেখার দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকালেন যেন মনে হল রেখা কত বড় একটা অপরাধ করে ফেলেছে।
এসব ভাবছে হঠাৎই রেখার ফোনে একটি ম্যাসেজ এসেছে'মনের জানালা খুলে রেখে দেখো তাকিয়ে সোনা ঝরা রোদ্দুর উঁকি মারছে তোমায় ডেকে।'সুপ্রভাত
রেখা মেসেজটা পড়ে একটু চমকে যায়' বাহ খুব সুন্দর লেখা তো ?কে পাঠালেন?'
আজকাল বেশ সুন্দর সুন্দর মেসেজ আছে সকালবেলা মনটাই ভালো হয়ে যায় রাত্রির ক্লান্তি ,অবসাদ নিশীথের মতো গভীরতা নিয়ে রেখার মনে দাগ কেটে যায় সকালের ভোরের আলোয় আবার নতুন করে খুঁজে পায় তার নতুন ঠিকানা। ভাবতে ভাবতেই মেসেজটা খোলার পর দেখছে এটা এসেছে পত্রিকার সম্পাদকের কাছ থেকে।
রেখা সত্যিই মনে মনে খুব খুশি হলো। তার মরে যাওয়া ইচ্ছে গুলোর মাঝে যেন বেঁচে ওঠার এক চিলতে রোদ্দুর।
আবার ভাবতে থাকে রেখা সেই অতীতের কথা। শ্বশুর বাড়ির লোকজন বোধহয় মেয়েদের কোনদিন আপন হয় না আপন করতে চাইলেও। রেখার জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা বারবার প্রমাণ করে
 দেয় ।এইতো বিয়ে হয়েছে শীতকালে শ্বশুরবাড়িতে তখন গরম জলের ব্যবস্থা ছিল নিচে। শাশুড়ি মার বাথরুমে। গরম জলে যারা স্নান করবে তাদের ওখান থেকে নিয়ে ই করতে হবে। এটা জানাই ছিল না রেখার।
পরপর কদিন ঠান্ডা জলে স্নান করে ঠান্ডা লেগে যায় রেখার। কি করবে কাকে বলবে? মনোজও  তো কিছু বলছে না। মাসি শাশুড়ি রা সেই বিয়ের আগে এসেছেন তখন অব্দি রয়ে গেছে ন। এখানে ঠান্ডা লাগা দেখে শুক্লা মাসি বললেন'কি করে খা তুমি ঠান্ডা জলে স্নান করো?
রেখা কি বলবে ভেবে না পেয়ে চুপ করে থাকে।
শুক্লা মাসি বলে কেন নিচের থেকে গরম জল নিয়ে আসবে? এ বাড়িতে কাজের লোক অব্দি গরম জল পায় আর তুমি বউ হওয়া সত্ত্বেও গরম জল…?
সন্ধ্যা মাসি বলে' কালকে অবশ্যই গরম জল নিয়ে আসবে কেমন?
এদিকে এমন খিদে পেয়েছে কাউকে কিছু বলতেও পারছে না। এ বাড়িতে নাকি নিয়ম আছে পুরুষদের সবার খাওয়া হবে তারপর মহিলাদের।
রেখা মনে মনে ভাবছিল যদি নিজের বাড়ি হত তাহলে কখন মা খাবার দিয়ে যেত। শুধু জলের বোতল থেকে জল খাচ্ছে।
এমনি করেই দিন কেটে যাচ্ছিল কিন্তু ঝামেলা বেধে গেল। পরেরদিন এত ঠান্ডা জমে যাওয়ার উপক্রম। রেখা ভাবল মাসিরা তো বলেছিল গরম জল নিয়ে আসতে। তাহলে একবার গেলে কেমন হয় নিয়েই আসা যাক।
একটা বালতি নিয়ে নিচে গেল গরম জল আনতে। মামুনকে গিয়ে বলল'কোথায় গরম জল আছে আমাকে একটু ঢেলে দাও তো?'
কথাটা শুনতে পেয়ে শাশুড়ি মা মামুনকে বললেন 'গরম জল সব সময় পাওয়া যাবে না।
এই কথা শোনার পর
রেখা গরম জল নেবার সময় মন চাইছিল না।
শ্বশুরবাড়িতে এরপরও রেখা   নতুনভাবে মেলে ধরার অবকাশ চাইছিল। সে জানে কালো মেঘ সরে গিয়ে নিশ্চিত এক মুঠো রোদ উঠবেই।

মমতা রায়চৌধুরী'র উপন্যাস পর্ব ৯৯



উপন্যাস 

টানাপোড়েন ৯৯
আত্মশুদ্ধি


মমতা রায়চৌধুরী



কতক্ষণ যে মায়ের বুকে মাথা রেখে নদী নিজেকে আবার নতুনভাবে আবিষ্কার করার চেষ্টা করছিলো সে ভুলেই গিয়েছিল সে কথা। হঠাৎই ঝর্ণা মাসির ডাকে চমক ভাঙ্গে। ঝরনা মা মেয়ের এই দৃশ্য দেখে চোখে জল এসে গেছে।
 কত ভুল বুঝাবুঝিই না হলো মা মেয়ের। ঝরনা মনে মনে চেয়েছিল এই মা-মেয়ের ঝামেলা মিটে যাক। ঝরনা  জানে এ যন্ত্রণা ।সন্তান দূরে থাকলে কি যে যন্ত্রনা ।সে প্রতি পলে পলে উপলব্ধি করতে পারে ।তারও একটা অন্য জীবন ছিল। আজ সমস্ত কিছুকে ছাপিয়ে চারিদিকের উদ্দাম কোলাহলের  মধ্যে শুধু নিজের হৃদয়টাকে একটা নির্জন দ্বীপ করে রেখেছে ।একলা নিশুতি রাতের মতো সেই যন্ত্রণাকে চেপে।
ঝরনা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ডাকলো 'মামনি ,মামনি, মামনি চলো আমরা যাই। গাড়ি এসে গেছে। মিস্টার মালহোত্রা সাহেব গাড়ি পাঠিয়েছেন।'
নদী কখন যেন একটা নিশ্চিত নিরাপদ আশ্রয় নিয়েছিল তার মায়ের বুকে ।  চোখ লেগে গেছিল বুঝতেও পারেনি। হঠাৎই চমক ভেঙ্গে গেল। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলো ঝরনার দিকে।
ঝরনা চোখের কাছে হাতটা নাড়িয়ে বলল ' কি হল মামনি, চলো আমরা যাই। কালকে তো আবার আসতে হবে তাই তো? মা তো এখন একটু ভালই আছেন চলো ।'
রুপসা ঝরনাকে বলল' চলে যাচ্ছ?'
ঝরনা রুপসার কাছে গিয়ে দুই হাত ধরে বলল 'এখন যাই বাড়িতে ওদিকটা সামলাতে হবে তাই
 না ?বাড়িটা ফাঁকা ফেলে রেখে এসেছি কালকে আবার আসব ।ঠিক আছে। তুমি কিন্তু সাবধানে বেশি টেনশন করবে না।'
নদী বলল "ঠিক আছে চলো'।
নদী যাবার সময় মায়ের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। সেই দৃষ্টিতে ছিল যেন কত দিনের আশা ,ভরসা, বিশ্বাসের একটা জায়গা।
রুপসা ঝরনা নদীর উদ্দেশ্যে হাত নাড়লো।
নদী আর ঝর্ণাও রূপসাকে  হাত নাড়লো।
নদী কিন্তু বেশি কথা বলে নি মায়ের সঙ্গে ,যেটুকু বলার সেটুকুর মধ্যে বুঝিয়ে দিয়েছে। তার অভিমান, ক্ষোভ,রাগ সমস্ত কিছুই যেন নিমেষের মধ্যে কর্পুরের মত উবে গেছে।
গাড়িতে বসে বসে নদী ভাবছে' সে যে কাজটা করেছে সেটা কি ঠিক করেছে? সে নিজেকে নিয়ে এখন আত্ম সমালোচনা করছে। কেন মিছে মিছে মায়ের সামনে এতটা রাগ করেছে। মায়ের বয়স কত হবে বড়জোর 40 -42,
বাপি মারা গেছে। কিন্তু তার মা যদি নতুন ভাবে বাঁচার চেষ্টা করে সেটা তো দোষের নয়। তবে কি সে অনেক বেশি স্বার্থপর হয়ে উঠেছিল? বাপির জায়গাটা এতটাই সেনসিটিভ হয়তো সে জন্যেই মিস্টার মালহোত্রাকে সহ্য করতে পারে নি।
আর পরিবার পরিবেশটাও যেন সেরকমই তৈরি হয়ে গেছিল। বন্ধুবান্ধব, আশেপাশের লোকজন প্রত্যেকে যেন কেমন একটা কৌতুহলী দৃষ্টি হাসাহাসি, বিদ্রুপ তার মাকে নিয়ে । সে এসব মেনে নিতে পারে নি। বোধহয় তার নৈতিকতায় বেঁধেছিলো।
এইতো আজই হসপিটালে তার বন্ধুদের কথাতেই তাদের অদ্ভুত হাসিতে ধরা পড়ে কত কথা। আজ তো কোন কথায় নদীর গায়ে কোন জ্বালা ধরে নি বা ফোস্কা  পড়ে নি। তবে কেন মিছিমিছি সেসব কথায় নিজের মেজাজটাকে নষ্ট করেছে  । আর মাকে ঠেলে দিয়েছিল অজানার দেশে।'
 থ্যাংকস গড'
 এরকম আর কিছু হতে দিতে চায় না।
 জীবন তো একটাই। এ জীবনে উপভোগের যদি সুযোগ থাকে, মানুষের যদি তার আয়ত্তে থাকে সেটা কেন সে উপভোগ করবে না?'
হঠাৎই ঝরনা মাসি বলল ', মামনি?
নদী বলল কিছু বলছো মাসি?
ঝর্ণা বললো 'এত কি ভাবছো?'
নদী ভাবলেশহীনভাবে ঝরনার দিকে তাকিয়ে হাসল।
ঝর্ণা বললো 'বৌদি ঠিক হয়ে যাবে
দেখো ।কোন চিন্তা ক'রো না। আর তাছাড়া বৌদির বস যেভাবে বিষয়টাকে ট্রাকে ল করলেন ,সত্যিই ওনাকে ধন্যবাদ  দেয়া দরকার।'


ঝরনা কথাটা বলে নদীর প্রতিক্রিয়াটা বোঝার চেষ্টা করতে চাইছিল মুখ দেখে।
নদী ও ঘাড় নাড়লো। পরক্ষণেই গাড়িতে জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল।
ঝর্ণা বললো' মামনি রাতে কি খাবে?'
নদী বলল' কিছু খাব না মাসি?'
ঝর্ণা বললো 'কেন খাবে না মামনি, মায়ের কথা চিন্তা করছো?'
নদী কিছু বলল  'না?
ঝরনা নদীকে কাছে টেনে বললো' মায়ের মত কেউ হবে না ।যতই মাকে ভুল বোঝ না কেন? সন্তানের ভালো-মন্দ মায়ের থেকে আর ভালো কেউ বোঝেনা ।তুমিও যেদিন মা হবে ,তুমি সেদিন বুঝতে পারবে?'
নদী ও বলল' তুমি কি করে বুঝবে ঝরনা মাসি ।তোমার বাচ্চা আছে?'
ঝর্ণা নদীর এই কথাটায় প্রথমদিকে হকচকিয়ে যায় ।তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলে সন্তান থাকুক বা না থাকুক  , এটা উপলব্ধির বিষয়  ।
তারপরই হঠাৎ  ঝরনা নিজের মনে ভাবতে থাকে 'তার মা থাকলে তার বাবা কি পারতো তার সৎ মায়ের কথায় তাকে বিক্রি করে দিতে?'
একসময় লম্বা বেণী দুলিয়ে সে স্কুলে গেছে। আজ তা ইতিহাস। যাদের বর্তমান নেই, তা তো ইতিহাস হয়ে যায়।
গাড়ি এসে থামল নদীদের বাড়ির কাছে।
ড্রাইভার বলল' আপনারা নামুন।'
নদী অন্যমনস্কভাবে জানালা দিয়ে তাকিয়ে। হঠাৎ গেটের আওয়াজে নদী তাকায়  দেখছে ঝরনা মাসিকে গেট খুলে দিয়েছে ড্রাইভার। ঝরনা মাসি নেমে 
পড়ল ।এবার আস্তে আস্তে গাড়ি থেকে নদী নামল।
ড্রাইভার বলল' কালকে কখন যাবেন একবার স্যারকে ফোন করে 
দেবেন ।তাহলে গাড়ি পাঠিয়ে দেবেন?'

ঝরনা নদীর দিকে তাকাল, নদী নির্বাক দৃষ্টিতে ঝরনার দিকে তাকিয়ে ।
ঝরনা ড্রাইভারকে বললো 'ঠিক আছে।'
ড্রাইভার ওকে বলে গাড়ি স্টার্ট 
করল ।গাড়ি বেরিয়ে গেল। নদী আর ঝর্ণা সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে আসার চেষ্টা করল।
ঝরনা তাড়াতাড়ি তালা খুলে ভেতরে ঢুকে গিজার চালিয়ে দিল।
তারপর ভালো করে হ্যান্ড ওয়াশ দিয়ে হাত ধুয়ে নিল।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে নদীকে বলল 'মামনি তুমি এখন আর ওপরে যেও 
না ।একেবারে ফ্রেস হয়ে খেয়ে ওপরে চলে যেও।
নদী বলল 'না ঝরনা মাসি, তোমার লেট হয়ে যাবে। তুমি এখানে ফ্রেশ হয়ে 
নাও ।আমি ওপরে গিয়ে গিজার চালিয়ে নিচ্ছি কেমন?
ঝর্ণা বললো 'কথাটা অবশ্য ঠিক। আমি আগে ফ্রেশ না হলে তো আমি কিছু করতেও পারবো না। ঠিক আছে, তাই হোক।
নদী নিজের রুমে চলে গেল।
ঝরনা ফ্রেশ হয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে বলল' মামনি  পাস্তা বানাবো?'
নদীর ওপর থেকে বলল' আমার কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না মাসি?'
ঝর্ণা বললো 'এভাবে বললে হবে না মামনি। তোমার প্রিয় নাস্তা আমি বানাচ্ছি পাস্তা ,ঠিক আছে?'
নদীর ওপর থেকে ঝুঁকে সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে বলল' ঠিক আছে ,তাই করো।'
ঝরনা ঝটপট পাস্তার জন্য সবজিগুলো গাজর ,বিনস, ক্যাপসিকাম, টমেটো ,বাঁধাকপি সব গুছিয়ে কেটে
 ফেললো ।কাঁচা লঙ্কা ,পেঁয়াজ কুচিয়ে ফেলল ।অন্যদিকে একটা পাত্রে পরিমাণমতো পাস্তা নিয়ে তাকে জল দিয়ে ধুয়ে, ফুটন্ত জলে পাস্তাগুলো দিয়ে দিল । পাস্তা সেদ্ধ হয়ে গেলে জল ঝরিয়ে রেখে দিল। দুটো ডিম ফেটিয়ে নিল। এরপর ননস্টিক প্যানে তেল দিয়ে   ভেজে নিল ।তারপর আস্তে আস্তে  ননস্টিক প্যানে বাটার দিয়ে প্রথমে পেঁয়াজ গুলোকে হালকা করে নেড়ে চেড়ে নিল, এরপর একে একে সবজি গুলো নুন দিয়ে নেড়েচেড়ে নিল, তারপর সামান্য ভাজা ভাজা হলে, চিলি সস, সয়া সস, টমেটো সস দিয়ে দিল ।এরপর পাস্তাগুলো তার ওপর দিয়ে 
দিল ।পরিশেষে ভেজে রাখা কুচো ডিম এড করে ,রেডি করে ফেলল পাস্তা।
ঝরনা মনে মনে খুব খুশী হলো যাক শেষমেষ নদী খেতে রাজি 
হয়েছে  ।এমনিতেও ওর এগ পাস্তা খুবই প্রিয়।
ঝরনা নিচে থেকে ডাকলো "মামনি মামনি মামনি. ই.ই.ই..।'
নদী তখনও শাওয়ার এর নিচে ,কি জানি হিমশীতল রাতে আজকে কেন সে এতটাই উষ্ণ হয়ে উঠেছে। ভাল করে স্নান করছে ।মনে হচ্ছে যেন আজকে তার শুদ্ধিকরণ হচ্ছে। শাওয়ারএর জলে স্নানের সময় ঝরনার গলার আওয়াজটা স্পষ্ট শুনতে পায়নি ।সাওয়ার বন্ধ করার পর আওয়াজটা কানে গেলে, নদী চিৎকার করে বললো 'আমি বাথরুমে আছি মাসি।'
ঝর্ণা বললো ' আচ্ছা ঠিক আছে। তুমি ফ্রেস হয়ে নিচে এসো ,তোমার পাস্তা রেডি।'
নদী ফ্রেস হয়ে বেড়িয়ে মায়ের দেয়া করসুলের হাউসকোটটা পরে নিচে আসলো।
নীল রঙ্গের করসুলের হাউসকোট পরে নদীকে সত্যিই একটা অন্যরকম 
লাগছিল ।ঝরনা তো দেখে অবাক  হয়ে গেছে  হাউসকোটটা কেনার পরে একদিনও নদী গায়ে তোলেনি। আজ সেই হাউসকোট-টাই পরেছে।
ঝর্ণা বললো' তোমায় কি সুন্দর লাগছে মামনি। বৌদির দেওয়া হাউসকোটে।'
নদী শুধু' হাসলো।"
বৌদির কিন্তু চয়েজ আছে। তুমি একদিনও পরো নি বলে ,বৌদি কি কষ্ট টাই না পেয়েছিল। আজকে যদি দেখতো কত খুশিই না হতো।'
নদী জিজ্ঞাসু নেত্রে বলল' তাই  মাসি ?তা এতদিন পরিনি ।আজকে তো 
পরলাম ।ঠিক আছে এসো আমরা দুজন একটা সেলফি তুলি ।মাকে ওটা পরে তুমি দেখিয়ে দিও।
ঝর্ণা বললো "বাহ রে আমার বয়েই
 গেছে ।তোমাদের মা বেটির ব্যাপার 
তোমরা বুঝে নাও। আমি তৃতীয় ব্যক্তি...।
নদী বলল' মাসি তুমি তৃতীয় ব্যক্তি কথাটা মনে রেখো কিন্তু..?
ঝরনা হেসে ফেললো।
নদী বলল' মাসি তুমি খাও। তোমার জন্য কর নি?'
ঝরনা চুপ করে আছে।
নদী বলল ' তা বললে তো হবে না  আমি এতটা পাস্তা খাব না ।তোমাকে খেতেই হবে এখান থেকে। নদী  খানিকটা পাস্তা প্লেটে করে নিয়ে ঝরনার মুখের কাছে গিয়ে বলল" হাঁ করো আগে, হা  
করো ।'
ঝর্ণা বললো' আমি খেয়ে নেব ।'
নদী বললো' না ,না ,না ,আগে আমার হাত থেকে খাও, তারপর অন্য কথা।
ঝর্ণা বললো' বাপরে আমি তোমার সঙ্গে কেন পারব !ঠিক আছে এই হা  করলাম। ঝর্ণা বললো 'দেখতো হাঙ্গর মাছের মত আমি হাঁ করেছি। গোটা মানুষ খেয়ে নিতে পারব না?"
নদী হেসে ফেললো বললো 'তুমি পারোও মাসি।"

৩১ জানুয়ারি ২০২২

কুকুরটা

দেবব্রত সরকার

হালকা শীত। থোকা থোকা কোয়াশার ঝাঁক। মাঝে মাঝে দলা পাকিয়ে ভাসছে। রাস্তায় লোকেদের আনাগোনা কম। ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকাতেই দেখি সাতটা।

তাড়াহুড়ো করে শরীরে জামাটা গলিয়ে ঘরের দরজায় তালা ঝোলাতেই কয়েকটি কুকুরের বাচ্চা সাথে তাদের মা, আমার চারপাশে এসে কুঁ কুঁ, কেউ-কেউ শুরু করে দিয়ে ল্যাজ নাড়ছে। তাদের দিকে অশ্রুপূর্ণ নজর রেখে সোজা হ্যান্ডেল সাইকেলটাই চরে বসি। একশো মিটার দূরত্ব পর্যন্ত কুকুরের বাচ্চাগুলো আমার সাইকেলের পিছন পিছন ছুটে আসে। এটা এখন নিত্য দিনের ঘটনা। বহরমপুর গোরাবাজার নিমতলায় দাঁড়িয়ে ‘অমি’কে একটা ফোন করি। তৎক্ষণাৎ অমি তার মেস ছেড়ে একটি ক্যারিব্যাগ হাতে নিয়ে এগিয়ে আসে।

শীতের সন্ধ্যা। অমি'র গায়ে একটি চাদর। আমি কেবল মাত্র ফুলপ্যান্ট আর একটি কমদামি টেরিভয়েলের জামা পড়েই চলে এসেছি। চারদিকে ঘন অন্ধকার। শীতের কুয়াশার দল আমাদের দু'জনকে আহ্বান করছে ঠোঁটে ঠোঁট মিলতে। লাইটপোস্টের আলোগুলো বেজায় জোর। সদ্য ভেপারের বাল্ব পরিবর্তন করে গেছেন স্থানীয় পুরসভার কর্মী। 

অমি আর আমি দু'জনে গল্প করতে করতে এগিয়ে গিয়ে ভাগীরথীর ধারে ছাতিম গাছের নীচে সান বাঁধানো সিঁড়ির উপর বসি। কিছু মুহূর্ত দুই হৃদয়ের প্রেমালাপ জমে উঠতেই ক্যারিব্যাগটা থেকে একটা টিফিন বাক্স বার করে অমি। অমি'র হাতের তৈরী সব খাবারই আমার খুব ভালো লাগে। ওর নিজের হাতে তৈরী করে আনা চাওমিন দুইজন মিলে গভীর সুখে তৃপ্তির সাথে একে অপরকে খাইয়ে দিই। আস্তে আস্তে অন্ধকার থেকে গোল চাঁদ কুয়াশাশরীর ভেঙে মৃদু আলো বিকিরণ করে। 

ভাগীরথীর পবিত্র জল কলতান তুলে ছোটো বড় মাছ শুশুকদের নড়ে ওঠার দৃশ্য আমাদের মধুর মিলনের চিহ্ন হয়ে উঠছে। অমি'র কোলে মাথা রেখে অনেক দুর গগনের স্বপ্ন দেখি। ছাতিম গাছের পাতার ফাঁক ভেঙ্গে মৃদু জ্যোৎস্নালো এক নব জীবন নিয়ে আমার দিকে ধেয়ে আসে। ভাগীরথীনদীবুকে জলে ডিঙি বেয়ে ফাঁস জাল পেতে কোন এক অচেনা জেলে তার আপন লক্ষে এগিয়ে যাচ্ছে ঝিলমিল জ্যোৎস্না গায়ে।  

অমি, আমাকে হঠাৎ-ই বলে ওঠে তার মা-বাবার কথা, দিদির কথা, এমন কিছু গোপন...কথা যার কারণে তার চোখে জল এসে যায়। টানা সজল চোখে টলটল জল জ্যোৎস্নার আলোয় এক নতুন দিশার চেতনা তৈরী করছে। 
তার কোঁকড়ানো চুলগুলি ঘাড় থেকে ক্রমশই এগিয়ে আসছে আমার চোখে। তার চোখের জল আমার ঠোঁটে এসে পড়ে। হৃদয়ে অদ্ভুত আঘাত এসে ধাক্কা মারে। তর্জনী আঙুল দিয়ে তার চোখের জল মুছে আমার জিভে তুলে নিই । সঙ্গে সঙ্গে সেই কষ্টের মুখে প্রেমহাসি হেসে অমি কি যেন আহ্বান করে আমার কাছ থেকে। হৃদয়ন্তরটা বার বার নড়ে ওঠে। ওর হৃদয়টা কি বলতে চায় তা একান্তে আমার হৃদয়ের গোপনযাদুতে মিশে যায়। অমির চোখ দুটি মুছিয়ে দিয়ে ঘাড়টা কাত করে ঠোঁটে আলতো ঠোঁট দিয়ে স্পর্শ করি। এ যেন শরীরের নবউন্মোচন। নিত্যপ্রবাহে ভেসে ওঠে। কোথায় আকাশ, কোথায় বাতাস, কোথায় মাটি সব যেন ভর শূন্য যাদুতত্ত্বে প্রবেশ করছি। যা কেবলই আনন্দ। মূহুর্তের আনন্দ। সব চাওয়া পাওয়ার থেকে অনেক দুরে। যেখানে কেবল প্রেম খেলা করে। কুয়াশা ছাড়া মেঘ নতুন হয়ে ডেকে আনছে পুষ্পদল। কয়েকশো মাইল দূরের হিমালয় যেন তার ভূষার বর্ষণ করে আহ্বান করছে তার দরবারে। বলছে সু-স্বাগতম প্রেমোদেবমৃতা। নিমিষেই সমস্ত দুঃখ কষ্ট দূরে বহুদুরে মিলিয়ে গেল। সে বলে উঠল-'এ ভাবেই চিরদিন তুমি আমার পাশে থাকবে তো! কখনও আমাকে ধোকা দিয়ে চলে যাবেনা তো তুমি? তোমার জন্য আমি সমস্ত কিছু করতে... পারি। শুধু তুমি যেন আমার থেকে দূরে সরে যেওনা।

এমন সব প্রশ্নের কি উত্তর হয় হে সর্বপ্রেমময় পুরুষ প্রেমী পুরুষ তা সবই তোমাদের জানা। আমি তাকে সেই মুহূর্তে উত্তর করি –‘তুমি যদি না যাও আমি তোমার প্রেম ছেড়ে কখনই যাবো না। বাতাস যেন মধু মন্থন করলো এই যুগলের। খুশি হল প্রকৃতি। নব চেতনায় মুখরিত হল চার দিক। নতুন প্রেমপর্বের সূচনা হল এই চিরাচরিত পৃথিবীর বুকে। যে প্রেমে কোন মোহ নেই কোন ক্ষুধা নেই ঋপুর ধারক, ঋপুর বাহক সেই প্রেমধর্মে অধিকার কেবল অঞ্জলিব্রতপ্রেমিক প্রেমিকার।

ভাগীরথীর জল হতে দলা দলা শিশির ধোয়া ধেয়ে আসে আমাদের দিকে। ওপারে ভেসে ওঠে সাদা আলো। অমির স্বপ্ন সে টিভিতে খবর পড়বে। কোন এক দিন পড়বেই। কিন্তু তার পরিবারে বাঁধা। কারণ বর্ধিষ্ণু পরিবারে বড় হয়েছে মেয়ে। বিয়ে দিতে হবে। আর এই ঘরের মেয়ে কখনই কোনদিন এমন কাজ করবে তা ভাবাই পাপ। সৎ চরিত্রবান মেয়ে সরলতায় মোড়া চুলের ডগা থেকে নোেখ। আর ইচ্ছা যে ইচ্ছা পূরণ করা খুব সহজ হয়। এই ইচ্ছার বিরুদ্ধে সামাজিক কোন আইন এই বাঁধা সৃষ্টি করতে পারেনা। অতএব সে টিভি তে খবর পড়বেই। তা যে কোন ভাবেই হোক । তার জন্য পরিবারে বাবার সঙ্গে নিত্যদিন বচসাও হয়। আমার কপাল বেয়ে তার নরম হাতের আঙুলগুলি স্পর্শ করে ছোট্ট ছোট্ট চুলে। নরম আঙুলের নোখ দিয়ে বিলি কেটে দেয় সেই। ভাগীরথীর জলের দিকে দু'জনে শপথ নেয় যে-যত কষ্টই হউক কেউ কাউকে কোন দিনই ভুল বুঝবোনা। একে অপরকে ছেড়ে কোন দিনও যাবোনা। কখনওই না, কোন দিনও না। তার শরীরে ঢাকা চাদরটি আমার শরীরও ঢেকে নেই। এক চাদরের ভেতর উঠতি যুবক যুবতি। আমার বুকের ভিতর মাথা গুঁজে বিড় বিড় করে কি যেন বলতে থাকে। আর তখনই শরীরের বয়ে চলা রক্তস্রোত ভাগীরথীর বয়ে যাওয়া জলের মত কলতান তোলে। রাস্তার ভেপারের আলো যে ভাবে ধিরে ধিরে হিট তৈরী করে আলো প্রদান করে ঠিক যেন সেভাবেই আমার শরীরে আলো জেগে উঠছে। এখন আমার শরীর সকালের উদিত সূর্যের তেজের মত ক্রমশ বেড়ে চলেছে মধ্যাহ্নে প্রহরে। জানিনা তার কীরূপ অনুভূতি তবে এটুকু বুঝতে পারছি। কোন এক খালি পাত্র খানি জল ঢেলে পূরণ করতে চাই। যেমন ফাঁকা কলসি জল পূর্ণ হলে তার আত্মতৃপ্তি ঘটে। মরা নদীতে জল এলে যেমন খুশীতে ভেসে ওঠে। ফাটা পুকুরগুলি যে ভাবে জল পেলে বেঁচে ওঠে। বারি বর্ষণ হলে ধরা যে তৃপ্তি যে আনন্দ লাভ করে। ভীষণ খরায় তৃষ্ণার্ভ প্রাণের খালি অংশ জল দ্বারা পূর্ণ করে আনন্দ উপভোগ হয়। পূর্ণিমার আলোর মত তার শরীরে জেগে উঠেছে শরীরীবাহার।

চোখে-চোখে, মুখে-মুখে, বুকে বুকে, কিছু ক্ষয়ের জন্য একে অপরের নিবিড় সান্নিধ্য লাভ। দুটি মনে, দুটি প্রাণে, দুটি দেহে, জাগিয়ে তোলে আনন্দহিল্লোল। চোখের তারায় নামে সুখের বিহ্বলতা। শ্বাস প্রশ্বাসে ছড়িয়ে পড়ে পারিজাতের সৌরভ...। দুই ভিন্ন লিঙ্গ ক্রমশই উত্তেজিত হয়ে ওঠে। হঠাৎ দমকা হাওয়ায় শরীরের সমস্ত অঙ্গের বিষ তুলে। শরীরের বয়ে চলা শূন্যবলয়ের ক্ষিপ্ত সমুদ্রের সমস্ত ঢেউ সামলে, অমি কে বলে উঠি-‘এবার আমাদের বিয়েটা সেরে ফেলা উচিৎ। আমি আমার বুকের ওপর থেকে হাত সরিয়ে নেয়।' বলে ওঠে-'আমার পরিবার কিছুতেই মেনে নেবে না!” –চলনা আমরা দুজনে মিলে কিছু একটা উপায় খুঁজে বার করি। এক কাজ করি আমরা দু'জনেই তোমার বাবা-মা কে আমাদের

সম্পর্কের কথা বলি।

-না তা হয়না। বাবা তাহলে আমাকে আর এখানে রাখবেনা।

এক চা ওয়ালা চা...! চা...! করে হাঁক ছাড়তে ছাড়তে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। ভেপারের আলোয় চা-ওয়ালার মুখটা ভেসে উঠতেই তা দেখে চাদরে মুখ ঢাকে অমি। আমি জিজ্ঞাসা করি – “কি হল। চা ওয়ালাকে দেখে এমন করে মুখ ঢাকলে যে?? ফিস্ ফিস্ করে বলে উঠল- এই চা কাকুটা আমাদের বাবাদের অফিসে চা বিক্রি করতে যায়। ও আমাকে ভালো ভাবে চেনে। আর এ ভাবে দেখে ফেললে বাবাকে কাল বলে দেবে।

এভাবে প্রতিদিন কি ভাবে যে নটা বেজে যায় দু'জনে বুঝতেই পারিনা। সেদিনের মত ভাগীরথী, ভাগীরথী ঘেষে বয়ে চলা রাস্তা, ছাতিমগাছ, ভেপারআলো, স্নিগ্ধ বাতাস, মনমুগ্ধ জ্যোৎস্না, ছাতিমজোনাকি, দল বাঁধা কুয়াশাকে বিদায় জানিয়ে উঠে পড়ি। এক হাতে সাইকেল আর এক হাতে অমির হাত পথ চলছি। ওকে ওর মেসে পৌঁছে দিয়ে আমি এগিয়ে যেতে যায়। তখনই ওর গায়ের চাদরটি আমাকে দিয়ে বলে এটা ঠিক ভাবে গায়ে জড়িয়ে তারপর যাও। আর কাল থেকে এভাবে শীতের পোষাক না নিয়ে বেড়বে না। হৃদয় প্রিয়া মানে প্রেয়সীর কথা আমি কি ভাবে ফেলি—“যো আজ্ঞা ম্যাডাম!” ও মেসে চলে যায়। আমি ইন্দ্ৰপ্রস্থে গৌতমের চায়ের দোকান হয়ে ঘরে ফিরি। দরজার কাছে এসে সাইকেল থামিয়ে ঘরের তালা খুলতেই কুকুরের বাচ্চাক’টি তার মাকে সঙ্গে নিয়ে ল্যাজ নাড়তে নাড়তে হাজির। কেউ...কেউ... করতে থাকে । পাচেটে আদর করে। কেউ প্যান্ট কামড়ে আবার কেউবা দু’পা উঠিয়ে দেয় গায়ে। কুঁ... কুঁ...! করতে থাকে। ঘরে ঢুকে বয়াম থেকে কয়েকটি বিস্কুট তাদের ছুঁড়ে দিই তারা মহা আনন্দে, খুশি হয়ে সেগুলি কাড়া কাড়ি করে খাচ্ছে।

এমন ভাবেই দিন কাটে। মাস যায়। অমি'র খবর পড়ার সুযোগও হয়ে যায়। ভুল বোঝাবুঝির কারণে, কাজ কৰ্ম্ম নিয়ে মাঝে মধ্যে মন কষাকষি। ফোনে একাধিক বার বচসাও বাঁধে। ও অফিস থেকে বেড়িয়ে এলে পায়ে পায়ে পথ চলি। একদিন চোয়াপুর সেরিকালচারের ভিতর দিয়ে দু'জনে হাত ধরে আসছি। এমন সময় আবদার করে সরকারী চাকুরীর কথা উল্লেখ করে অমি। আমার মুখ থেকে আনন্দ হাসি দেখে খুশিও হয়। বচসার রেশ থেকে যায়। এভাবেই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মনেরও পরিবর্তন ঘটতে থাকে তার। ফেলে আসা স্মৃতি গুলি অমিকে ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি। ব্যর্থ হই। আমি এখনও বেকার তবুও পূর্ণপ্রেমিকপুরুষ তার জন্য চকলেট কিংবা বিস্কুট, কেক ইত্যাদি নিয়ে যেতে ভুলি না। একদিন অমি বলে ওঠে-“ এসব এনে মায়া সৃষ্টি করবার চেষ্টা করছো!

আকাশ ভেঙে পড়ে মাটিতে। তার কথার ধাক্কায় বুকের পাঁজড় ছেড়ে যায়। খুব কষ্ট পাই, বুঝতে দিইনে। মনে মনে ভাবি আর প্রার্থনা করি হে বিধাতা ওর শুভ হোক। ওর জীবন রঙিন স্বপ্নে ভরে উঠুক, ওর যাতে আনন্দ লাভ হয় ও তাই করুক । ওকে কখনও কষ্টে রেখোনা প্রভু। ওর কষ্ট যদি হয় তাহলে তোমার সাথে আমার হবে। এই সমস্ত কথা ভাবতে ভাবতে ঘরে ফিরি। সেই সমস্ত নিশুতি জাগা কুকুরগুলি আমাকে সঙ্গ দেয়। অঝর অশ্রু আর হৃদকাপা বদ্ধ কন্ঠস্বর আমাকে প্রবল ধাক্কা মারতে থাকে । সেই ধাক্কা খেতে খেতে সাইকেলটা থেকে নেমে ঘরে ঢুকে বয়াম থেকে কয়েকটা বিস্কুট নিয়ে এসে রাস্তায় ছড়িয়ে দিই। তারা মহা উল্লাসে কাড়াকাড়ি করে খেতে থাকে।

হঠাৎ জীবনে ঝড় ওঠে, অমি’র ক্ষোভ অভিমান। সমস্ত প্রতিশ্রুতির কথা ভুলে এখন অন্য পথ দিয়ে হেঁটে যায়। আমার পথ আর ওর পথ এখন আলাদা। ও সরকারী চাকুরীর... খোঁজে...। আর আমি অমির খোঁজে একে অপর দিকে হারিয়ে যায়। দিন কাটে মাস কাটে বছর ঘুরে যায়। অমির আর ফোন আসে না। অমি আর চুলে বিলি কাটেনা। আমি আর সেই আদুরে ভাষা দিয়ে বুকে টানেনা। কিন্তু, সেই কুকুর গুলি এখন যুবক। কয়েকটা কুকুর রোগে ক্ষুধার জ্বালায় মারা গেলেও যে কুকুরটি জীবিত ছিল সে প্রতিদিনই আমার দরজার সামনে সে কেউ... !কেউ...! করে ডাক ছাড়ে আর আমি দরজা খুলে বয়াম থেকে বিস্কুট বার করে দিই। সে উল্লাসে মহাআনন্দে ল্যাজ নাড়তে নাড়তে কুরমুর করে চিবিয়ে যায়...।
@@@@@@@
কুকুরটা @@@

২৯ জানুয়ারি ২০২২

শ্রীমতী সুপর্ণা চ্যাটার্জী'র মুক্ত্যগদ্য




অতিমারির ইতি

শ্রীমতী সুপর্ণা চ্যাটার্জী


                                   শৈশব,কৈশোর ও যৌবন পেড়িয়ে যখন অবসরের প্রাক্কালে তখন এক ভয়ংকর অতিমারি ‘করোনা ভাইরাস’ এর আবির্ভাবে কোভিডের স্বীকার আমরা সবাই।।সারা বিশ্ব আজ জর্জরিত। গবেষণা করে জানা গেছে এ এক ভাইরাসজনিত অসুখ।পৃথিবীর জনংখ্যা কমানোর জন্য এ এক আধুনিক ব্যবস্থা বিশ্বের সবকটি স্বাস্থ্যসংস্থার যৌথ উদ্যোগে।আজ প্রায় দুবছর যাবৎএই মারণ রোগের কবলে ধনী দরিদ্র সকলে। 
       সারা পৃথিবীতে বিপুল সংখ্যক মানুষের সংখ্যা হ্রাস পেতে পেতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীবৃন্দ আজ অসহায় ও মৃত্যুমুখী।কে কাকে দেখবে। এর আবার তিনটি ভেউ।প্রথম ও দ্বিতীয় ঢেউয়ে হারাতে হলো কত প্রিয়জনকে সারা বিশ্ব জুরে। আর এখন যখন তৃতীয় ঢেউ চলছে তখন আবার সেই একই আতঙ্ক সকলের চোখে মুখে। 
   বহু গেষণাও এর উৎস সন্ধানে ব্যর্থ। তবে উপায় একমাএ লকডাউন। কিন্তু তাতে সারা দেশের অর্থনীতিতো একেবারেই ভেঙে পড়ছিল। এমতাবস্থায় মানুষ মরিয়া হয়ে উঠল। সকল বিধিনিষেধকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চিকিৎসা ব্যবস্থাকে কিছু অসচেতন মানূষ সম্পূর্ণ পঙ্গু করে ফেলল। তাই সরকারি ও বেসরকারি তরফে প্রচার শুরুহলো এ রোগের চিকিৎসা বাড়িতে থেকেই সম্ভব।কারণ হসপিটালে বেড খালি নেই। নিজেকে একেবারে নির্বাসন দেওয়াই একমাএ সুস্থ্য হয়ে ওঠার অবলম্বন।
    আসলে একটা চলতি কথা আছে, যার যায় তার যায় মানুষ করে হায় হায়।আসল সত্যটা যে কী তা না জেনে না বুঝে আমরা মুর্খের স্বর্গে বাস করছি,শুধু বাঁচার তাগিদে।
      শুধু যদি মাস্ক পড়লে,দূরত্ত বজায় রাখলেই এর মারণ ভাইরাসের হাত থেকে যদি রক্ষা পাওয়া যেত তাহলে তো যারা একেবারেই বাড়ি থেকে বেরোয় না,পরিবারে কত্তা গিন্নী দুজন,তারা কেন আক্রান্ত হচ্ছে?
     সত্যই এ এক বড়ো জিজ্ঞাসা।আবার এমন দৃষ্টান্তও বিরল নয় যারা যাযাবর,পথেই যাদের জন্ম,মৃত্যু ও বেঁচে থাকা কোই তাদের মুখেতো মাস্ক নেই, সামাজিক দূরত্ত্বের ধার ধারেনা তাহলে তারা কিভাবে এই ভাইরাসের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে!!
    সত্যই এই দুইয়ের মধ্যে মিল খুঁজে পাওয়া বড়ই দুষ্কর। সমগ্র বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে আমার একটাই আবেদন, সারা বিশ্বের জন সংখ্যা হ্রাসই যদি তাদের একমাএ উদ্দেশ্য হয় তাহলে মানুষকে এতো যন্ত্রণা না দিয়ে এমন কোনো ওষুধ আবিস্কার হোক যা সেবন করলে বয়স্ক এবং মধ্যবয়স্ক মানুষ স্বেচ্ছামৃত্যুর পথ বেছে নিতে পারে যাদের প্রয়োজন সমাজের কাছে একপ্রকার ফুরিয়ে গেছে।তাহলে অন্তত আগামী ভবিষ্যতে আমাদের বতর্মান প্রজন্ম নির্ভয়ে বাঁচার পথ খুঁজে পাবে।আর আরও নতুন নতুন গবেষণার দ্বারা এই মারণ ভাইরাসকে পৃথিবীর বুক থেকে একেবারে  নিশ্চিহ্ন করে এক নতুন পৃথিবীর জন্ম দেবে। আশা করি এই ত্যাগ স্বীকারের জন্য আমাদের মতো মধ্যবয়স্ক ও পূর্ণ বয়স্ক প্রতিটি মানুষই যারা আজ দাদু ঠাকুমা,দিদিমার আসনে অধিষ্টিত সকলেই রাজি হবেন।
   

২৪ জানুয়ারি ২০২২

কবি রুকসানা রহমান এর কবিতা



আমাদের কোন বসন্ত নেই

রুকসানা রহমান


আজ বসন্তেরজোয়ারে হলুূূদ আর লাল আবিরের প্রজাপতির ঢেউএর মিছিল শহর ময়। 
আর ঐ -ফুটপাতের মেয়েটি মাকে বললো ওরা একটা ফুল দিলোনাগো মা। 
মাথায় হাত রেখে বলে -ঐদিকে  তাকিওনা,এই যে দেখছো আকাশ
 সেই ছাদের নীচে ধুলো মাটি আবর্জনা আমরা
আমাদের আকাশের রঙ নেই,স্বপ্ন নেই। 

ওদের সাথে আকাশ আর মাটির মতন দুরন্ত
 ঐযে চাঁদ, ওটা ও ফ্যাকাসে আত্মার আলো নেই।

 এই শহরের, ঝলমলে রাতের শহর ও অন্ধকার  ঐযে দেখছো, ভদ্রলোক যারা
আমাদের ঘৃণা করে ওরাই রাতের আঁধারে নারী খেকো হায়না।কখন যে তোকে আমাকে ছিঁড়ে খাবে তাও জানিনা।
আমাদের সম্বল শুধু নিংশ্বাস।
তাই আমাদের জীবনে কোন বসন্ত কোনদিন আসবেনা।

কবি মীরা সুলতানা'র কাবিতা




আধখান শশ
মীরা সুলতানা 

দিগন্তে বালিয়ারীতে হেঁটে যায় সতর্ক পা চোরাবালির নিমগ্ন  হাতছানি দিগন্ত জোড়া

সৌরকিরন  ভরে রাখে  বুক পকেটে 
আহ্লাদী জ্যোৎস্নায় গা ভাসিয়ে কেউটেরা আনন্দ খুঁজে!

একাকী রাতের প্রহর তাঁরা অবিচল     স্তব্ধতায় খাবি খায় ষোড়শী ঢল!

সামুদ্রিক  ফেনা রাশির  ধেয়ে আসা ঘাম
শুদ্ধতার প্রমান নিয়ে  এলো নীল খাম। 

মায়াবী আকাশের ভেজা ঠিকানায় 
আদ্রতা শুষে নেয়া ডাকপিয়ন, নিমিষে  পৌছায়;
 
মধ্য বয়সী নারীর হৃৎপিন্ডে বুলেট বিঁধে কাঁপে থরথর ,
করতলে ধীর পায়ে হেঁটে চলে  কুয়াশা যাযাবর। 

 পৃথিবীর  বুক ঘেষে বয়ে চলা এক সরীসৃপ পাল,
 কস্মিন কাল ছুঁয়ে বয়ে আসে এক অতীত মহাকাল! 

কেউটেরা স্বর্বেস্বর্বা সর্ব জ্ঞানী, মহাঋষী
আঙ্গুলের ফাঁক  গলে  উঁকি মারে  আধখান শশী ।

কবি নীলাঞ্জন কুমার এর কবিতা




অভাব 

নীলাঞ্জন কুমার 

অভাবের ভেতর থেকে যদি 
জমে ওঠে হতাশা 
তবে নিঃস্ব হওয়ার চিত্রকলা 
চোখের সামনে ভেসে ওঠে ।


অভাবী জীবন নিয়ে আমাকে 
কেউ কোন কথা বলে না।
শুধু ছুঁয়ে থাকে চোখ বাসনায় 
যা অবলীলায় ধরা পড়ে যায় ।




উপন্যাস 


টানাপোড়েন৯৮

দুঃসহ আঠারো বছর

মমতা রায়চৌধুরী


নদী অনেকক্ষণ একদৃষ্টিতে মায়ের কেবিনের দিকে তাকিয়েছিল, কখন ডাক্তারবাবু বেরোবেন একটা মনের ভেতরে অশান্ত উদগ্রীব কাজ করছিল ।  তবে  যাই করে থাকুন না কেন মায়ের এই কন্ডিশনে উনি তো পাশে আছেন ।আজকে আর কোনো বিরক্তি, ঘৃণা কিছুই নেই ,লোকটার প্রতি ।আজকে শুধু মনের ভেতরে একটাই প্রতিক্রিয়া তার মায়ের সুস্থ হওয়া।
হঠাৎই ডাক্তারবাবুর কথা কানে আসলো মিস্টার মালহোত্রা জিজ্ঞেস করলেন  'কী বুঝছেন ডাক্তারবাবু?'
ডাক্তারবাবু বললেন 'আপনাদের তো আগেও বলেছিলাম যে ঠিক আছে, উনাকে এখন টেনশন মুক্ত রাখুন ।কোন অবস্থাতেই যেন কোনো টেনশন না কাজ করে ,হাসি খুশিতে রাখুন আর আমরা তো নার্সিংহোমে রয়েছি..।'
মিস্টার মালহোত্রা বললেন ' এবার কী আমরা ভেতরে ঢুকতে পারি?'
ডাক্তারবাবু বললেন 'অবশ্যই পারেন তবে এক সঙ্গে কেউ জটলা করবেন না?'
 মালহোত্রা বলেন' থ্যাংক ইউ ডাক্তারবাবু।'
মিস্টার মালহোত্রা ডাক্তার বাবুর সঙ্গে কথা বলার পর প্রথমে তিনিই এগোতে লাগলেন মায়ের কেবিনের দিকে।
নদী  সব দেখতে লাগল। কিন্তু আজ যেন নদী প্রতিবাদ করতে পারলো না  ।নদীর প্রতিবাদী হওয়া উচিত ছিল ,সেই প্রথম মায়ের কাছে যাবে বলে ।কিন্তু আজকে  সমস্ত বিরক্তি, রাগ , দ্বেষ, ঘৃণা, আক্রোশ, কোথায় ধুলিস্যাৎ হলো ?শুধু মনের ভেতরে রয়ে গেল মায়ের জন্য শুভকামনা।'

মিস্টার মালহোত্রা কেবিনে একা ঢুকেছেন ।মায়ের সঙ্গে কি কথা হচ্ছে ,নদী সেসব ভাবতেই চাইল না।
তারপর নদীর বন্ধুরা বলল' হ্যাঁ রে, নদী ,আমরা তাহলে চলি । আন্টি তো আগের থেকে ঠিক আছেন। কালকে খোঁজ নেব কেমন থাকেন না থাকেন।
 বন্ধুরা সবাই বলল' 'প্রয়োজন হলে ডাকিস কেমন, কোন দ্বিধা করিস না?'
এরমধ্যে বন্ধুরা ফিসফিস করে কথা বলতে লাগলো, যেটা নদীর কানে আসলো ।
রথীন বলল ' হ্যাঁ রে মালটা কে রে আন্টির কেবিনে ঢুকলো?'
তীর্থ বলল 'আরে বাবা, আন্টি যে অফিসে কাজ করেন ,সেই অফিসের বস।'
প্রত্যেকে কেমন যেন একটা আলাদা ইঙ্গিতে হেসে উঠলো। সমুদ্র অবশ্য ওদের কথায় কোন রেসপন্স করে নি।
নদীর কানটা যেন গরম হয়ে উঠলো কথাগুলো শুনে কিন্তু তারপরও নদী যেন কেমন নিষ্প্রাণ,নির্বাক হয়ে রইল। তার ভেতর থেকে যেন কোন কথা বের হয়ে আসলো না।
রথীন তীর্থ সবাই সমুদ্রকে বলল  'কিরে তুই কি এখনো তীর্থের কাকের মত বসে থাকবি?'
সমুদ্র কি বলতে যাবে তার আগেই রথীন বলে উঠলো 'না না তুই একটু থাক। আমরা এগোতে থাকি ।একটা অদ্ভুতভাবে হেসে উঠলো।'
নদীর এ কথাগুলো হজম করতে বেশ সময় লাগলো।
সমুদ্র রথীনদের উদ্দেশ্যে বলল  'আমিও তো যাবো ,ওয়েট কর না একটু।'
সমুদ্র নদীকে বলল  'আমি চলে যাব নদী ,নাকি থাকবো ?
তোকে বাড়ি পৌঁছে দেব?'

নদীর মনে মনে তার বন্ধুদের কথা ভাবছিল এরা তার প্রকৃত বন্ধু না। এরা প্রকৃত বন্ধু হতে পারে 
না ।সাময়িক হতে পারে। যদিও সমুদ্র ওদের থেকে অনেকটাই আলাদা। সমুদ্রর খামখেয়ালিপনা রয়েছে ভেতরে। মাঝে মাঝে বড্ড
ছেলে মানুষি কাজ করে ফেলে সমুদ্র।
নদী শুধু একটুখানি হাসল সমুদ্রের প্রতি আর মনে মনে ভাবল,তবু সমুদ্রের ভেতরে একটা সরলতা আছে।
নদী শুধু ঘাড় নেড়ে  সম্মতি জানালো ।
এর মধ্যেই ঝরনা মাসি বলে ওঠে' মামনি ,মামনি , আমরা কিসে ফিরব?
নদী কেমন অবাক হয়ে যায় ।কিসে ফিরবে মানে, অ্যাম্বুলেন্সে এসেছিলে তো?
ঝর্ণা বললো' হ্যাঁ?
নদী বলল 'হয় কোন ট্যাক্সি ধরব, না হলে বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে যেতে হবে।'
এরমধ্যে মিস্টার মালহোত্রা বেড়িয়ে আসলেন।
মিস্টার মালহোত্রা বললেন 'নদী তুমি তোমার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে যাবে?'
নদী শুধু ঘাড় নেড়ে তার মতামত জানাল।
মিস্টার মালহোত্রা বলল ' ঠিক আছে যাও। তুমি গিয়ে তোমার মাকে দেখে এস আর তোমাদের বাড়ি ফেরার জন্য একটা গাড়ি বলে দিচ্ছি কেমন?'
নদী শুধু ঘাড় নাড়লো আরেকটু ম্লান হাসলো।
মিস্টার মালহোত্রা বেরিয়ে গেলেন যাওয়ার সময় ঝর্নাকে বলে গেলেন আপনাদের জন্য গাড়ি ওয়েট 
করবে। আপনারা বাড়িতে চলে যাবেন।'
 ঝরনাও ঘাড় নাড়লো 
মিটার মালহোত্রা চলে যাওয়ার দিকে ঝরনা আর নদী একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল।
 ঝর্না এবার নদীকে কাঁধ ধরে ঝাঁকালো ', চলো, চলো মামনি, তোমার মায়ের কাছে।
নদীর যেন চমক ভাঙ্গলো তারপর বলল 'হ্যাঁ, মাসি চলো।'


ঝরনা আর নদী পর্দা সরিয়ে কেবিনের ভেতরে ঢুকলো।
নার্স বললেন' বেশি কথা বলবেন না আর আপনারা একসঙ্গে দুজন ঢুকলেন কেন?'
ঝরনা আর নদী রুপসার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো।
কেবিনে ঢুকতেই নাকে একটা মৃদু ওষুধের গন্ধ কেমন যেন একটা নীল চাদরে ঢাকা রূপসার লম্বা গোলাপি ফর্সা শরীর বিছানায় যেন অসহায় নিষ্প্রাণ। জানলার দিকে মুখ করে আছে।
কেবিনে ঢুকে ঝর্ণা বললো' বৌদি, ও বৌদি?'
রুপসা মুখ ফেরাল ঝরনা আর নদীর দিকে।
ঝরনা আর নদীকে দেখে রুপসা হাসার চেষ্টা  করলো
ঝর্ণা বললো 'এখন কেমন?'
রুপসা ঘাড় নেড়ে জানাল একটু ভালো।
রূপসা নদীর দিকে তাকিয়ে। নদী মায়ের দিকে তাকাতে পারছে না। কেন যে সেদিন মাকে এতগুলো কথা বলতে গেল নদী এটাই বারবার ভাবছে।
রুপসা ঝর্ণার দিকে ইঙ্গিত করল মেয়েকে কাছে আসার জন্য।
ঝর্ণা বললো' মামনি, মায়ের কাছে
 যাও । একটু  বসো মায়ের কাছে।'
ঝর্ণা নদীকে হাত ধরে টেনে মায়ের কাছে বসালো।
নদী মায়ের কাছে বসলে রুপসা নদীর হাত দুটোকে চেপে ধরল।
নদীর দুচোখ বেয়ে তখন জল পরছে। নদী শুধু বলল _ব্যাথাটা এখন কম?'
রুপসা একটু অন্যমনস্ক ভাবে ঘাড় নাড়ল।
রুপসা তখনও নদীর হাতদুটো বুকের কাছে নিয়ে আছে। রুপসা কেমন অসহায় ভাবে নদীর দিকে তাকিয়ে আছে। নদী মাকে দেখার পর কেমন যেন একটা অনুভুতি হল।
নদীর চোখে জল দেখে রুপসা হাত দিয়ে জল মোছার চেষ্টা করল।
নদী মায়ের হাত দুটো চেপে ধরল। এই দুটো হাত পরস্পর পরস্পরের কাছে এতটাই চেপে বসে আছে যে অসহায় দুটো জীব যেন পরস্পর পরস্পরের কত কাছে একে অপরের ভরসার পাত্র হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে।
নদী মায়ের মাথায় হাত দিয়ে বলল ' একটু বেটার?'
রুপসার যেন মনে হলো তার গোটা আকাশটা তার ওইটুকু মেয়ের 
ভেতরে ,সেটাই হাতের মুঠোয় ধরার চেষ্টা করতে লাগলো। তার ওইটুকুই আকাশের ফালি নিয়ে সে সারাটা জীবন বাঁচতে চায়।
রূপসার ভেতরে যে মেয়েকে নিয়ে ভয়ের একটা আলোড়ন তৈরি হয়েছিল, একটা যন্ত্রণা সেটা দাঁতে  ঠোঁট কামড়ে সমস্ত শক্তি দিয়ে নিজেকে লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করছিল।
আর নদী ও তার চোখের সামনে দেখতে পেল তার সামনে রাখা ক্যানভাসে মায়ের অভিব্যক্তি যেন একটা দুটো রঙের
 আচড়কাটছে, তুলিতে ধরা দিতে
 চাইছে। সে আছে তার মায়ের ,মা আছে তারই সঙ্গে ।দুটো চোখ একে অপরের দিকে পলকহীন । কোন নেশা তার বুকের ভেতরে চেপে বসেছিল মাকে না মানার। 
মনে পড়ে যায় কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতা লাইন
'' আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ,
স্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি।
আঠারো বছর বয়সেই অহরহ,
বিরাট দুঃসাহসেরা দেয়উঁকি।
আঠারোবছর বয়সের নেই ভয়
পদাঘাতে চায় ভাঙতে পাথর বাধা,
এ বয়সে কেউ মাথা  নোয়াবার নয়।
হয়তো এই বয়সের জন্য এসে করেছি ভুল মায়ের প্রতি বিশ্বাস আস্থা সব এক নিমেষে হয়েছিল বিলীন।
তাই আজ মাশুল দিতে হচ্ছে প্রতি পদে পদে শুধু মাকে হারানোর ভয়। দুচোখ তাই জলে ভরে ওঠে। চোখের ভাষাতে সেকথাই সে বোঝাতে থাকে।
রুপসা মেয়ের চোখের ভাষা বুঝতে পারে তাই মেয়েকে তার বুকের কাছে টেনে নিতে চায়। তাই আচমকাই নদীর বুক যেন হুহু করে ওঠে ।নিজের খেয়ালে 18 বছরের  নদী একটা খেলা খেলতে চেয়েছিল ।আজ তাই তার বুকে বুমেরাং হয়ে গেছে ।তাই নির্ভয়ে চোখ শুধু বিশ্ব ঘুরে এসে দেখছে তার কাছের , ভরসার  শৈশবের সেই মাকে খুঁজে পেতে চাইছে।

মনি জামান এর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৬





ধারাবাহিক উপন্যাস

সেদিন গোধূলি সন্ধ্যা ছিল
মনি জামান
(পর্ব ছয়)

আজ সকাল থেকেই যেন মেঘের আনা গোনা গোটা আকাশ জুড়ে,নিলয় মেবিন আর চারু সকালের নাস্তা সেরে নিয়েছে। চারু ড্রাইভার কে ফোন করলো গাড়ি বের করতে,তারপর মেবিন ও নিলয়কে গুছিয়ে নিতে বলে চারু নিজের রূমে চলে গেল।একটু পরে ওরা তিনজন নিচে নেমে এলো ড্রাইভার অপেক্ষা করছিল ওরা এলে গাড়ির দরজা খুলে দিলো সবাই গাড়িতে উঠে সীটে বসে বেল্ট পরলো,ড্রাইভারঃ আপুমনি কোথায় যাবেন,
চারুঃ মার্কেটে যাব।
গাড়ি স্টার্ট হলো এবার চলতে শুরু করল প্রায় বিশ মিনিট পর গাড়ি মার্কেটে এসে পৌছাল,নিলয় মেবিন আর চারু গাড়ি থেকে নেমে চারুঃ নিলয় এসো ভিতরে ওরা মার্কেটের ভিতরে একটি দোকানে গিয়ে কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনলো তারপর বাইরে বেরিয়ে এলো তিনজন, তখন আকাশ মেঘে অন্ধকার হয়ে আছে মাঝে মাঝে বিকট গর্জন করছে আকাশ।
চারুঃ মেবিন আকাশের অবস্থা খুব খারাপ চল তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরি,
মেবিনঃ চল ঝড় বৃষ্টি হতে পারে,আকাশের অবস্থা খারাপ দেখে ওরা সবাই গাড়িতে উঠে বসলো,ড্রাইভার গাড়ি ছেড়ে দিল আধাঘণ্টা পর ওরা বাসায় ফিরে এলো।তখন গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি শুরু হয়েছে বিদ্যুত্ চমকাচ্ছে আর বিকট শব্দে বজ্রপাত হচ্ছে।বাসায় এসে ওরা তিনজন ফ্রেস হয়ে ওয়েটিংরুমে গল্প শুরু করলো,আজ যেন কোথাও হারিয়ে যেতে মানা ওদের।
আস্তে আস্তে মুসুল ধারে বৃষ্টি শুরু হলো প্রায় দুই ঘন্টা মত বৃষ্টি হয়েছে ওরা আজ আর কোথাও বেরুতে পারলো না।
দুপরের খাবার খেল সবাই আকাশ একটু একটু ভালোর দিকে যাচ্ছে,কিছুক্ষণ পর আকাশ পরিস্কার হয়ে গেল।
চারুঃ যাক অবশেষে আকাশ ভালো হয়ে গেল এবার চলো আমরা সমুদ্র সৈকত দেখতে বেরোয়,
মেবিনঃ হ্যাঁ চল বলে ওরা তিনজন যার যার রূমে গিয়ে সব গুছিয়ে নিতে নিতে প্রায় দুইটা বেজে গেলো,ড্রাইভার এলো গাড়ি নিয়ে ওরা তিনজন গাড়িতে উঠলো।চারুঃ ড্রাইভারকে বলল সমুদ্র সৈকত যাব আপনি গাড়ি ছাড়েন,ড্রাইভার গাড়ি ছাড়লো প্রায় ঘন্টাখানেক সময় লাগলো ওদের সমুদ্র সৈকতে পৌছাতে।গাড়ি থেকে নেমে ওরা হাটা শুরু করলো সমুদ্র সৈকতের বালুর উপর দিয়ে হালকা হালকা ঢেউ এসে যেন ওদের পা দুটো ছুঁয়ে দিয়ে গেলো।
চারুঃ মেবিন তুই আর নিলয় তোরা ঘুরে দেখ আমি কিছু কিনে তারপর আসছি বলেই হন হন করতে করতে অন্য প্রান্তে চলে গেলো।
নিলয় মেবিনের হাতটা ধরে হাঁটছে খালি নগ্ন পা ওদের দুজনের অন্যরকম এক অণুভূতি হচ্ছে আজ দুজনের ভিতর,সমুদ্রের পাগলা হাওয়া ওদের চুল গুলো এলোমেলো করে দিয়ে যাচ্ছে কখনো বা দুর্বার গতিতে ধেয়ে আসা সমুদ্রের বিশাল ঢেউ ওদের পা ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে, অপূর্ব সুন্দর মূহুর্তটা দুরে ঝাউ বন যেন সবুজ বেষ্টনী দিয়ে রেখেছে।
জল কবুতর আর গাঙচিলের আনা গোনা অদ্ভূত ভালো লাগার একটা পরিবেশ
ওদের দুজনকে আড়োলিত করলো, সমুদ্রের গর্জন আর একটার পর একটা ঢেউ আচড়ে এসে পড়ছে,
মেবিনঃ নিলয় তুমি আর এই সমুদ্র আমার কাছে এক মনে হচ্ছে,
নিলয়ঃ কেমন সেটা কাক পাখি।
মেবিনঃ তুমি যেমন আমার সবচাইতে প্রিয় মানুষ তেমনি এই সমুদ্রটাও আমার কাছে আজ খুব প্রিয় লাগছে,
নিলয়ঃ একগাল হেসে তোমার দর্শনটা ভালো দেখো আবার যেন দার্শনিক না হয়ে যাও।
আজ সকালের বৃষ্টি শেষে আকাশটা লাল আভা ছড়াচ্ছে অপূর্ব সুন্দর লাগছে আজকের সমুদ্র সৈকতের বিকেলটা,
নিলয় আর মেবিন হাঁটতে হাঁটতে সমুদ্র সৈকতে একটা সি বেঞ্চে বসলো দুজন। সমুদ্র জয়ের উন্মত্ত বাসনায় গাঙচিলের উড়া চলা সারা সমুদ্র জুড়ে,এটা নিলয় আর মেবিন অপলক দৃষ্টিতে দেখছে।
একের পর এক ঢেঁউ আছড়ে পড়ছে ওদের পায়ের উপর,যতদুর ওদের দৃষ্টি প্রসারিত হচ্ছে ততো দুর শুধু দেখতে পাচ্ছে সমুদ্র আর ঢেউ যেন এক সাথে মিলে মিশে একাকার।
আকাশ আজ গোধূলি রঙ ছড়াচ্ছে নিজের মত করে,সমুদ্রের নীল জলরাশি আজ ভয়ানক উত্তাল এক একটি দানব যেন ঢেউ হয়ে ধেয়ে আসছে তীরের দিকে।
অদ্ভূত রোমাঞ্চ জাগিয়ে দিচ্ছে নিলয় আর মেবিনকে,পরস্পর গা ঘেঁসে বসে আছে ওরা দুজন আর সমুদ্রের নোনা জলের স্পর্শ মাখছে দু'পায়ে।
হঠাৎ মেবিন দেখতে পেল কি যেন একটা লাশের মত ভাসছে ঢেঁউয়ের সাথে এবং ওদের দিকে ভেসে আসছে।
মেবিনঃ নিলয়কে ডেকে বলল এই দেখ ঐ যে ওটা কি?নিলয় মেবিনের আঙুল অনুসরণ করে ভাল করে লক্ষ করে দেখে বললঃ মনে হয় এটা কোন মানুষের লাশ।ঢেউয়ে ঢেউয়ে ভাসতে ভাসতে ওরা যেখানে বসে আছে ঠিক তার সামনে এসে বালুর উপর আটকে পড়লো লাশটা,নিলয় ভাল করে খেয়াল করে দেখে মেবিনকে বললঃ এটা একটা বিশ পঁচিশ বছর বয়সী একটা মেয়ের লাশ হবে,লাশটা এখনো প্রায় অক্ষত কিন্তু ফুলে গেছে কিছু কিছু জায়গায় পচন শুরু হয়েছে,কোথাও কোথাও খুবলে খেয়েছে জলজ মাংসাশী কোন প্রাণীরা।
মেবিনঃনিলয়কে বলল কি জানি কোন হতভাগী কোন মেয়ের লাশ হবে হয়তো এটা,কোন নির্যাতন সইতে না পেরে হয়তো আত্মহত্যা করেছে অথবা যৌতুকের বলি হয়ে হয়তো কোন পাষণ্ড স্বামী হত্যা করে নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছে।
নিলয় বললঃ হয়তো হবে তবে এই মৃত লাশ দেখে আমার আজ একটি কাহিনীর কথা খুব মনে পড়ছে,আমি দৈনিক কাগজে পড়েছিলাম খুব মর্মান্তিক ছিল সে কাহিনী।
মেবিনঃ তাই!বলো কি সেই কাহিনী আমি শুনবো,
নিলয়ঃ ঠিক আছে বাসায় ফিরে বলবো,
মেবিনঃ না এখন বলো আমি শুনবো,
নিলয়ঃ পরে এক সময় তোমাকে সব বলবো। 
কিন্তু মেবিন নাছোড়বান্দা সে কাহিনীটা শুনবেই,
নিলয়ঃ এই কাক পাখি এই জন্য তোমাকে আমি কাক পাখি বলি,বলছি তো বাসায় যেয়ে সব বলবো।
মেবিনঃ অভিমানের সুরে বলল ঠিক আছে আমি আর শুনবো না তোমার সেই কাহিনী,বলেই মুখটা ভার করে বসে রইলো অন্য দিকে মুখ করে।
নিলয়ঃ মেবিনকে কাছে টেনে নিয়ে আর অভিমান করতে হবে না সোনা পাখি আমার দিকে ফিরে তাকাও আমি বলছি।
মেবিন নিলয়ের বুকে আলত করে মাথাটা রেখে আবেগ মাখা কন্ঠে মেবিনঃ বলো নিলয়,
নিলয় মেবিনের মাথায় হাতটা রাখলো এবং চুলের ভিতর আঙুল গুলো খেলা করতে শুরু করলো,মেবিনের মনে হলো পৃথিবীতে বোধহয় ভালোবাসার মানুষের বুকটাই একমাত্র নির্ভাবনার,এ বুকে যেন সারাজীবন সে এমনিভাবে মাথাটা রাখতে পারে,নিলয়ের ভালবাসা মেবিনকে এতটাই আপ্লুত করেছে যেন যুগ যুগ ধরে এই দিনটার জন্য অপেক্ষা করছিল মেবিন।
নিলয়ঃ কাহিনীটা তুমি শুনলে কাঁদবে না তো আগে বলো,
মেবিনঃ কেন কাঁদবো আমি কি শিশু !নিলয় আদর করে মেবিনের চোয়ালটা আলতো করে টেনে দিয়ে বললোঃ এই জন্য তোমাকে এত ভালোবাসি,মেবিন নিলয়কে আজ খুব আদর মাখা কন্ঠে বললঃ প্লীজ বলনা সেই কাহিনীটা আমি শুনবো,
নিলয়ঃ ঠিক আছে কাক পাখি বলছি তবে আমাকে একটু আদর করে দাও,
মেবিনঃ হেসে বললো তুমি ইদানিং খুব দুষ্ট হয়ে গেছো,বলার সাথে সাথে নিলয় হেসে উঠলো এবং বললঃ তাহলে কাহিনী শোন,নিলয় কাহিনীটা বলতে শুরু করলো,ভবদা গ্রামে আসমা নামের এক মেয়ের করুন কাহিনী।


চলবে....