১৬ জানুয়ারি ২০২২

মমতা রায় চৌধুরী/৯১





উপন্যাস 


টানাপোড়েন ৯১

অবচেতনে  দাগ 

মমতা রায় চৌধুরী





সকাল থেকে নদীর মেজাজটা খাট্টা হয়েছিল। 
আজকের দিনটা কি সকলেই বেমালুম ভুলে গেল?
বাপি মারা যাবার পর থেকেই সবকিছুই যেন কেমন হয়ে গেছে তার জীবনে। মা ও তার কর্ম নিয়ে ব্যস্ত। নদীর কি প্রয়োজন,কি পছন্দ-অপছন্দ
কিছুতেই এসে যায় না ।
মা আজকাল শুধু অফিস আর অফিস। আগের দিনগুলো কত ভালো ছিল ।মায়ের গন্ধ সারা দিনরাত মেখে থাকতো । আজকাল মায়ের গন্ধ
মনে করতে সময় লাগে। কত জ্বরের ঘোরে ভুল  বকেছে, মাকে কাছে পায় নি। অথচ একটা সময় ছিল বৃষ্টির দিনগুলোতে মায়ের কাজ ছাড়া হত না ।শীতের  রাতগুলোতে মায়ের গায়ে গা দিয়ে না শুলে যেন নদীর কিছুতেই ঠান্ডা কাটতো 
না ।আজ কোথায় গেল সেই সব দিনগুলো ?
বাপি অফিস থেকে এসেই প্রথমে নদীর খোঁজ করত ।আজ খোঁজ করার জন্য ঝরনা মাসি। নদীর কাছে আসে ঝরনা মাসি ।এসে জিজ্ঞেস করে   'আর কি লাগবে, না লাগবে? কিন্তু ঝর্ণা মাসির ক্ষমতা কতটুকু তার দাবি মেটানোর? বিশাল সমুদ্রে এক ফোটা জল।'
সারাদিন এলোমেলো ভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে নদী। সে তো 18 বছরে পা দিয়েছে । তার স্বাধীন চিন্তা করার ক্ষমতা নিশ্চয়ই আছে ।সেও তো চায় শীতের রোদ্দুরে গায়ে তাপ নিতে। সেও চায় এরকম নীল আকাশ ,সোনালী রোদ্দুর, তার মনে ভেতরে দাগ কেটে যাক।
হঠাৎই সে ট্রামে চেপে বসে। আজ ভালো একটা নীল লং গ্রাউন্ পড়েছে। যদিও নদীকে ড্রেসটা ওর মা গিফট করেছে।
নদী সদ্য কলেজে গেছে। কলেজে অনেক বন্ধু হয়েছে কিন্তু শৈশবের বন্ধুগুলো যেন কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ।কালেভদ্রে দেখা হয় তিন্নি তৃষার সাথে। ওই হাই, হ্যালো এইটুকু।
তারমধ্যে তো তৃষা চলে গেছে ব্যারাকপুরে ওদের নিজেদের ফ্ল্যাটে ।আজকাল তৃষা ফোনও করে না। এসব কথা ভাবছে বসে বসে এর মধ্যেই তার নজরে আসে,শুধু সদ্য যুবকেরা নয, বয়সী লোক গুলো যেন নদীকে গোগ্রাসে গিলতে চাইছে। অথচ এরাই কখনো দেখা যায় যে কোনো বাড়িতে গেলে কত ভদ্রভাবে কথা বলে কিন্তু ট্রামে বাসে ওদের দৃষ্টিও নেকড়ের ছোবলের থেকেও ভয়ঙ্কর।
হঠাৎ একটি পুরুষ কন্ঠ নদীকে ডাকে"অ্যাই স্বরূপা, স্বরূপা, স্বরূপা।'
নদী প্রথমে ভাবতে পারে নি যে ,তাকে কেউ ডাকছে। ট্রামে  এমন কে আছে যে তাকে
 ডাকবে ?তাই প্রথমে গা করে নি
পরে এক ভদ্র মহিলা বললেন "'এই মেয়ে তোমাকে কেউ ডাকছে?"
নদী পেছনটা ঘুরে তাকায় দেখে' অরুনাভদা।'
অরুনাভ ও আরেকটু এগিয়ে  কাছে এসে দাঁড়িয়ে বলে' কোথায় যাচ্ছ?'
নদী প্রথমত তার নামটা মনে হচ্ছিল ভুলে যেতে ব বসেছিল । নদীর ভালো নাম ধরে কেউ ডাকছে সে যেন একটু নস্টালজিক হয়ে যায়।
তার বাবার দেয়া ভালোবেসে বাবা মায়ের নামের সাথে মিলিয়ে নাম রেখেছিল নাকি?
কিন্তু এখন যেন মনে হচ্ছে এই নামটার অস্তিত্ব ক্রমশ অবলুপ্তির পথে।
আজ নদী নামে সে বেশি খ্যাত। কিন্তু স্কুল-কলেজ সার্টিফিকেটে তো তার সেই নামটি রয়ে গেছে।
অরুণাভ কাছে এসে হাত নেড়ে বলে 'কি ব্যাপার অন্য মনস্ক ?তোমাকে একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলাম বললে না তো?'
নদী বলে 'এলোমেলো ভাবনা। ভাবলাম একটু বেরিয়ে পড়ি ।সামনে নামবো কলেজ স্ট্রিটে।'
অরুণাভ বলে  ভাবনাগুলো কিন্তু থাকা 
ভালো। জানো সব সময় মানুষ ঘড়ি দেখে অর্থাৎ টাইম মিলিয়ে জীবনটাকে যেন একটা ছকে বেঁধে রাখতে চাইছে কিন্তু ছকে বাঁধা জীবনের বাইরে ও আলাদা একটা মাধুর্য আছে ,যে না বেরোবে সে কখনো উপলব্ধি করতে পারবে না।'
নদী একটু হাসে।
অরুণাভ বলে 'আজকে তুমি এত সেজেগুজে এসেছ ?কোনো 'কোন স্পেশাল ডে আছে?'
নদী বলে 'কেন শুধুমাত্র কিছু স্পেশাল দিনগুলোর জন্যই সাজতে হবে ।আমি যদি সেখানে কোন বৈচিত্র আনতে চাই, তাতে কি তোমার কোন অসুবিধা আছে?'
অরুনাভ ও হেসে বলে  'বেশ কায়দা করে উত্তর দিলে তো? গুড। আমার কোনো অসুবিধে নেই। বরং ভালো লাগবে।'
নদী একটু হাসে।
অরুণাভ বলে ' তোমার এলোমেলো ভাবনার সঙ্গে আজকে আমাকে নেবে?'
নদী কোন ভনিতা না করে বলল' না নেওয়ার কি আছে?"
অরুনাভ বলে অরুণাভ বলে তাহলে কিন্তু আমি তোমার সঙ্গে যাচ্ছি।'
স্বরূপা বলে ও শিওর। 
অরুনাভ বলে 'তাহলে চলো, আজ তোমার সাথে বাঁধি নানা ছন্দে।'
নদী বলে ও 'সিওর।'
আজকের বিশেষ দিনটা কি তাহলে এভাবেই বিশেষ হয়ে উঠবে ভাবতে থাকে নদী।
নদীর ধর্ম তো বয়ে চলা, গতি তার জীবন। তাকে আটকে দিলে তার ছন্দপতন ঘটে। তাই 18 বছর তার জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ।এইসব ভাবতে ভাবতে ট্রাম এসে দাঁড়াল কলেজ ট্রিটে।
নদী আগে হাঁটতে শুরু করল, অরুনাভ পেছনে
পেছনে।
অরুণাভ হঠাৎ বলে' এই নদী তুমি আগে আগে হেঁটে চলেছ আমি তো তোমার পেছনেই আছি।'
নদী শুধু হাসলো। তারপর তার ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে তার সানগ্লাসটা বের করে চোখে দিল।
নদী বললো 'একা একা হাঁটার মধ্যে একটা আলাদা মজা আছে।'
অরুনাভ বলে 'তাহলে কি সেই মজায় আমি তোমার ব্যাঘাত ঘটালাম?'
নদী এর কোন উত্তর দেয় না।
নদী মনে মনে ভাবছে 'সারা কলেজের মেয়েদের কাছে যে ছেলেটি হার্ট থ্রব। আজ তারই সঙ্গে পথ চলছে।'
আপন মনে নদী একটু হেসে উঠলো।
অরুনাভ  থমকে দাঁড়ালো। তারপর বলল' হেসে উঠলে কেন ?কিছু অড ব্যাপার ঘটল কি!'
নদী বলল ', না, না।'
হঠাৎই কফি হাউজের সামনে এসে অরুনাভ  বলল 'ঢুকবে কফি হাউসে?'
নদী কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না ।এমন সময়ে নদীর ফোনে ফোন ঢুকলো। রিং হতে লাগলো। নদী ফোনটা রিসিভ করবে কি করবে না ভাবছে।
 এমন সময় অরুনাভ ও বললো 'তোমার ফোন বেজে যাচ্ছে ।দেখো ,আন্টি ফোন করল বোধহয়?'
নদী বলে 'সময় কোথায়?'
অরুনাভ ও বলল 'এভাবে বলছ কেন?'
নদী ভাবছে  'কথাগুলো কিভাবে সে অরুনাভকে বলবে ?জমানো ব্যথাকে তার অংশীদারে সামিল করবে?তাই নিজের দুঃখ নিজের কষ্টগুলো, যন্ত্রণা গুলোকে নিজের মনের ভেতরে রাখতে চায়। কথা না বাড়িয়ে ফোনটা চেক করলো।'
ফোনটা চেক করে দেখলো একটা আননোন নাম্বার।
দুটো মিসকল হয়ে আছে।
নদী ভাবছে ফোনটা কি ঘুরিয়ে করবে, না করবে না ?একটা দ্বন্দ্ব চলছে মনের ভেতরে ।
এমন সময় আবার নদীর ফোন বেজে উঠল।
নদী ফোনের নম্বরটা পরখ করে দেখলো সেভ করা আছে কিনা?'
নদী দেখলো না এই নম্বরে কোন কিছু সেভ করা নেই। তাহলে' কে এমন ফোন করছে বারবার?'
এবার ফোনটা রিসিভ করল বলল' হ্যালো'।
অপরপ্রান্ত থেকে উত্তর আসলো 'কে স্রোতস্বিনী?'
নদী বলল হ্যাঁ। তারপর যখন তার জন্মদিনের উইশ করলো তখন সে আনন্দে লাফিয়ে 
উঠল ।আজকে সকাল থেকে কেউ তাকে উইশ করে নি ।প্রথম মাসীমণি তাকে উইশ করেছে।
'শুভ জন্মদিন ।খুব খুব ভালো থেকো আর অনেক অনেক আনন্দে থেকো।'
নদী বলল ' অনেক ধন্যবাদ মাসীমণি।'
বিপাশা বলল'তোর কি আজকে নেট অফ আছে?'
বিপাশা বলল 'তোকে মেসেজ পাঠিয়েছি।'
নদী বলল' তাই?
বিপাশা বলল'আমি ভাবলাম রাগ করেছিস?'
নদী বললো 'কেন কেন,?'
বিপাশা বলল ' মনে হয়েছে তাই বললাম।'
নদী বলল' ঠিক আছে মাসিমনি।'
নদী মনের ভেতরে অজান্তে কিভাবে কালো পাহাড় গড়ে উঠেছিল। না জেনেবুঝে এভাবে মাসি র প্রতি, মায়ের প্রতি রাগ করা উচিত হয় 
নি ।
বিপাশা বলল 'ঠিক আছে ভালো থেকো কেমন? 'নদী বলল-'হ্যাঁ মাসিমনি আমি তোমার কথা মাথায় রাখবো।'
নদী নিজের মনে অনুতপ্ত হচ্ছে মাসিকে নিয়ে অনেকটা কষ্ট পেয়েছিল ,সেটা মনের ভেতরে রেখেছে কিন্তু এই ভাবনাগুলো একদমই ঠিক হয় নি। মাসির মনের ভেতরে রয়েছে দুঃখের পাহাড় ,যন্ত্রণাগুলো যেন কুরে কুরে খাচ্ছে।
 এবার অরুণাভ বললো ' তোমার কি কোন কারনে আজকে মনটা খারাপ?'
নদী বলল 'কেন?'
হঠাৎই নদী বলল 'আজকে থাক  আজকে কফি হাউসে ঢুকবো না ।একটু বাড়ি যাব।'
অরুনাভ বলল' বাহ খুব ভালো কথা।'
নদী খুব দ্রুত পায়ে বাড়িতে আসার রাস্তা ধরল। তার জন্মদিনেl প্রথম মাসিমনি উইশ করেছে ।সেই আনন্দে রাস্তা চলতে গিয়ে মনে হচ্ছে হে হাজারো পথ অতিক্রম করে ফেলেছে।
অরুনাভর   কাছে ব্যাপারটা কেমন রহস্যজনক মনে হলো।
নদী হাঁটতে-হাঁটতে বাড়ির রাস্তা ধরল।
বাড়িতে এসে কলিং বেল বাজাতে থাকে ঝরনা মাসি হাই তুলে দরজা খুলছে।
দেখলেই বোঝা যায় আরামে ঘুম দিচ্ছিল।
ঝর্ণা বললো' তুমি খাবে তো এসো?'
নদী বলল 'কি রান্না করেছো ?'
ঝর্ণা বললো 'অনেক কিছু রান্না হয়েছে?
আজকে যদি তোমার পছন্দের জিনিস রান্না না করি তাহলে বৌদি এসে আমাকে খুব বকবে তাই?'
নদী কেমন একটা বা অন্য ভাবনার জগতে চলে গেল ।তাহলে কি তারই মনের ভেতরে একটা আলাদা ঘুনের বাসা বেঁধেছিল। তবে কি নদীর আত্মবিশ্বাস হারিয়ে যেতে বসেছিল? তার অবচেতন মনে কি দাগ কেটে যাচ্ছিল, সে সেটাকে আবিষ্কারে নিমগ্ন। এবার শুধু মায়ের অপেক্ষায় থাকে। মা তার জন্যে কী সারপ্রাইজ দেয় সেটা দেখার জন্য।

১২ জানুয়ারি ২০২২

কবি রুকসানা রহমান এর কবিতা





উদীয়মান সূর্য

 রুকসানা রহমান


প্রত্যাশার আশায় দীর্ঘশ্বাস নয়,সভ্যতার ঝরণা ধারায় মনস্তাপের খেলায় বেঁচে থাকা কাঁধে স্মৃতির বোঝা 
আর ধর্মান্ধতার ভিতর হেঁটে যাওয়া, তাম্রতামাশার
ঘুড়ির লাটাই নই। 

ঈশ্বর আপনি ওকি চান ? 
প্রাচীন নারীর মতো ব্রাকেট 
বন্দী হয়ে, জানতে হবে লাউ,চিংড়ি, রুই - ইলিশের
জটিল সমীকরণ ? 

এই আত্মা খোঁজে আকাশ ছুঁয়ে,  মাটির গন্ধ নিয়ে  শব্দ বর্ণের রহস্য ! 
ভাগ্যরেখায়  ত্রাণ বিতরণের মতো সঁপে       
দিবোনা  সম্পদ  নিশুতি খেয়ালি রাতে ?
আমি ভেসে যাবো জোয়ারে,মধ্য গ্রীষ্মের সূচনায়... 

পোড়া বসন্তের হাটে-বাজারে,অপবাদ গ্লানি, গোপন ব্যথা,পঞ্চভুতের
নগ্ন উপহাস অগ্রায্য করে দুঃসাহসী দ্রঢ়ীয়সী  শূণ্যতার  নেকাবের ভিতর  অদ্ভুত স্বপ্নরা ডাকে, ভাঁজখোলা পাহাড়ে উদীয়মান সূর্য, টিউলিপের গন্ধ বিলায়
আমি সেই - মন তিয়াসী তীর্থযাত্রী
এক্সপ্রেস ট্রেনের শব্দ
অপেক্ষা অনন্ত জংশন !

মমতা রায় চৌধুরী /৯০




উপন্যাস 

টানাপোড়েন৯০

খেয়ালী যেন

মমতা রায় চৌধুরী


ঘুম ভাঙার পর অনেকক্ষণ বিছানায় শুয়ে ছিল রুপসা। আজকাল এভাবেই বেশ কিছুক্ষণ চোখ বুজে শুয়ে  নিজেকে একটু আবিষ্কার করার চেষ্টা করে। কেমন যেন সব এলোমেলো হয়ে গেল কিছুই মাথায় ঢুকতে চায় না ।কোথাও কিছু ফাঁকা আছে কিনা সেই মন পাখিটাকে ধরে নিয়ে কল্পনায় নিজেকে তৈরী করার চেষ্টা করছিল।
হঠাৎই ভেতরের ঘরে ফোনটা বেজে ওঠে। বাজতে বাজতে কেটে গেলো ।আবার বাজতে শুরু করলো। বেজেই চলেছে। একটু বিরক্তই হলো এত সকালে কে ফোন করেছে! শব্দটা ক্রমশ তীক্ষ্ণ

হচ্ছে ।ফোনটা তুলছে না কেউ। ঝর্ণা কোথায় গেল? বিরক্তি নিয়ে রুপসা বিছানা থেকে উঠে বসল। নিজের অজান্তেই দেয়াল ঘড়িটার দিকে গেল ।ঘড়িতে তখন ৬.১০। ঝরনাটা তাহলে কোথায় গেল? ও কি  কোন কাজে বাইরে গেছে? ওদিকে নদীও ফোন ধরছে না।'

হাউসকোটটা গায়ে চাপিয়ে বিরস মুখে ফোনটা তুলে বলল 'হ্যালো।'
ও প্রান্ত মুহূর্তের জন্য নীরব। তারপর বলল'আমি সমুদ্র বলছি।'
রুপসা বলল' ও তো এখনও ঘুম থেকে ওঠে নি।
কিছু প্রয়োজন আছে?'
সমুদ্র নদীর বন্ধু। বেশ কয়েকবার বাড়িতে এসেছে। খারাপ লাগেনি। ছেলেটি সহজ-সরল। সব সময় চেষ্টা করে নদীকে হাসি খুশিতে রাখার। 
অথচ আগে নদী ছিল কতটা প্রাণবন্ত, উচ্ছল ছিল তার তরঙ্গ।
সজীব মারা যাবার পর থেকে যেন কেমন হয়ে গেছে। ছাইচাপা আগুন যেন। শুধু গুমড়ে গুমড়ে থাকে।
সমুদ্র বলল' না বলছিলাম..?'
 রুপসা বলল' আমি তো সেটাই জানতে চাইছি, কি বলতে চাইছো,?'
সমুদ্র যেন মাথা চুলকে বলল' না মানে আন্টি ,কথাটা ওকে ...।'
রুপসা বললো ' বুঝেছি কথাটা আমাকে বলবে না তাই তো?'
সমুদ্র নিরুত্তর।
রুপসা বলল 'ঠিক আছে। আমি চেষ্টা করছি ওকে ঘুম থেকে ডেকে দেবার। যদি ওঠে ভালো ।না উঠলে তো আমার কিছু করার নেই বাবা।'
সমুদ্র হেসে বলল 'ঠিক আছে আন্টি।'

রুপসার স্বামী মারা যাবার পর স্বামীর বস কোম্পানিতে জয়েন করতে বলেছেন। তাই স্বাভাবিকভাবেই নদীকে তেমনভাবে সময় দিতে পারে না।
মেয়েটা কেমন যেন একগুঁয়ে জেদি হয়ে যাচ্ছে।
একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে পা বাড়ালো নদীর ঘরের দিকে। প্যাসেজ টপকে নদীর ঘরের ভেজানো দরজাটা আস্তে করে ঠেলল।
ঘরে ঢুকে রূপসা নদীর ঘরের বিশৃঙ্খলা অবস্থা দেখে চমকে ওঠে। এ কি করেছে বৃষ্টি !ঘরটার বই ,খাতা ,পেন, সব খাটের ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখে দিয়েছে। টেডি বিয়ারটা মুখ থুবরে পড়ে আছে।
হঠাৎ দেখলে মনে হবে ঘরটা যেন কেউ তছনছ করে দিয়ে গেছে। রূপসার ত্রস্ত চোখ নির্জন ঘরটায় কয়েকবার পাক খেলেl
ছোটবেলা থেকেই নদীর সখ ছিল প্রিয় খুব কাছের মানুষদের ছবি টানিয়ে রাখা। রুপসা  প্রভাতী আলো  জানলার কাঁচ লাগানো ঝোলা ভারী পর্দা দুটোর  থেকে বেরিয়ে এসেছে। আর মন কেমন করা স্মৃতিগুলো যেন আঁকড়ে ধরছে।


তারপর কাছে গিয়ে নদীর গায়ে হাত দিয়ে ডাকতে শুরু করলো। নদী ,নদী, নদী ওঠো তোমার ফোন এসেছে?'
নদী চোখ দুটো বোজা অবস্থাতেই বলল' কার ফোন? '
রুপসা বলল'একটি ছেলের কন্ঠ। নাম  সমুদ্র।'
নদী ঘুমের ঘোরে বললো ''ওকে একঘন্টা পরে আসতে বল'।
রুপসা অগত্যা সমুদ্রের ফোনটাটা ধরে আস্তে করে বলল। ও তোমাকে পরে ফোন করতে বলl
লো কিন্তু..?'
সমুদ্র বলল' আন্টি ,আপনি ওকে বলবেন খুবই দরকার।'
রুপসা শুধু' হুম বলে  নদীর ঘরের দিকে পা বাড়ায় কিন্তু আশ্চর্য সেখানে গিয়ে নদীকে দেখতে না পেয়ে একটু আশ্চর্য হয়ে যায়।রুপসা গেস করলো 'নদী ছাদে গেছে'।কারণ ওর মন ঠিক করার একটি মাত্র জায়গা হচ্ছে ছাদ। আজ কাল নদী যেন একটু খেয়ালী হয়ে গেছে।'
রুপসাও তরতর করে সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেল ছাদে তারপর আরষ্ট গলায় ডাকলো' নদী তোমার ফোন ।'
সমুদ্র শুনতে পেল ।
রুপসা ছাদে উঠে দেখতে পেল রুপসা আলসেতে ভর দিয়ে আচ্ছন্নের মতো তাকিয়ে আছে। ক্ষণিকের জন্য  রুপসা নদীকে দেখে ভয় পেয়ে গেছিল ।
রুপসা আরষ্ট গলায় বলল 'নদী তোমার ফোন।'
নদী যেন শুনতে পেল না।
রুপসা আবার ডাকল।
এবার নদীকে ধাক্কা দিয়ে রুপসা বলল 'তোমার ফোন আছে?'
কিন্তু নদী যখন রূপসার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল তখন তাকে দেখে মনে হয়েছিল একটা ভাবলেশহীন কিছুটা উদাস দৃষ্টি।
রূপসার ভেতরটা কেমন হু হু করে উঠলো। কি হয়ে গেল তার মেয়েটার ।কেমন একটা উদাসী বাউল মন তার ভেতরটাকে দেখে আঁতকে উঠল।'
শুধু রূপসার কথাতে এবার নদী একটু ফিরে তাকালো।
রুপসা বললো 'সমুদ্র ফোন করেছিল?'
নদী তখনও একদৃষ্টিতে রূপসার দিকে তাকিয়ে। যে নাম শুনলে নদী যেন চঞ্চল অস্থির হয়ে ওঠে একটা কেমন যেন বিদ্যুৎ খেলে যায় তার শরীরের ভেতরে আজ এমন কি হলো?'
তারপর নদী কোন কথা না বলে তরতর করে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল।
রুপসা তার মেয়ের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো আর মনে মনে ভাবতে লাগল আজ যা কিছু হচ্ছে তার অবর্তমানে কিছুতেই তার মেয়েটাকে সে সময় দিতে পারছে 
না ।একদিকে তার কাজের জায়গা অন্যদিকে বাড়িতে মেয়ে। কি করবে সে জীবনে বেঁচে থাকার জন্য তার কর্ম দরকার আজ যদি সজীব থাকতো ,তাহলে তাকে এগুলো চিন্তা করতে হতো না। সজীব  চলে যাবার পর থেকেই সব কিছুই যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
'কি করবে  রুপসা?'
নদী যখন সিঁড়ি দিয়ে নামছিলো পেছন থেকে দেখে রুপসাকে নিজেই চমকে ওঠে ।তার মেয়েটা খুব সুন্দর হয়েছে।গোলাপী আভা তার শরীরে ,মাথা ভরা চুল । টানা টানা চোখ, কালো চোখের পাতা। স্লিম। 
ছোটবেলায় নদীকে নিয়ে কতজনা কত কথা বলতো নদীর পিসি ঠাম্মা বলতো রূপসার ডুবলিকেট ।কেউ কেউ বলতেন নদী হবে ওর বাবার মত দেখতে। এত ছোট অবস্থাতেও যে চেহারা বোঝা যায় এটা ভাবা কঠিন কিন্তু তার শ্বশুরবাড়ির লোকজনে এমনই বলতেন।
তিল তিল করে বড় হওয়া  নদী আজ ১৭+
নদী তখন বাথরুমে রুপসা যখন নদীর ঘরে ঢুকলো  নদী বাথরুম থেকে বেরিয়ে নিষ্পলক রূপসার দিকে তাকিয়ে ছিল যেন মনে হচ্ছে কিছুটা জরিপ করছে মাকে।।
রুপসাও প্রস্তুত মেয়ে এতক্ষণ তাকে  লক্ষ্য করছিল।
রুপসা বলল 'সমুদ্রের সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে?'
নদী র গলার স্বরে পরিস্কার ঝাঁঝ  রয়েছে ।আজকাল মাঝে মাঝে মুখ করে ওঠে ।ভালোভাবে কথা বলতেই চায় না।
নদী বলল 'তোমার সময় আছে ,সেসব শোনার?'
রুপসা সকাল সকাল আর কথা  বাড়ায় না।
এর মধ্যেই দেখতে পায় ঝরনা চলে যাচ্ছে পাশ দিয়ে। রুপসা সমস্ত রাগ ঝরনার ওপর গিয়ে পরলো ।তবুও নিজেকে কিছুটা শান্ত রেখে ডাকলো ঝরনা ঝরনা ঝরনা।
ঝর্ণা বললো  'কিছু বলছ বৌদি?'
রুপসা বললো' কোথায় গেছিলে তুমি না জানিয়ে?'
ঝর্ণা বললো আসলে বলে বেরোবার সে সময় ছিল না।
রুপসা বললো' কোথায় গিয়েছিলে?'
ঝর্ণা বললো' বাজারে গিয়েছিলাম? তোমাকে কদিন ধরেই তো বলছি বাজার নেই। তুমি এত ব্যস্ত..। তাই আজ একটু সময় পেলাম বলে বাজার করে নিয়ে আসলাম।'
রূপসার কথা বাড়ালো না ।ঠিকই তো বাজার না হলে  রান্না হবে কি?'
রুপসা বলল' কি এনেছে বাজার থেকে?'
ঝরনা বলল'কাতলা মাছ, চিকেন, সঙ্গে কিছু সবজি।'
রুপসা বললো আর কিছু আনো নি? দুধ গোবিন্দভোগ চাল কাজু কিসমিস ,খেজুরের গুড়?'
ঝর্ণা বললো ' এনেছি তো বৌদি?'
রুপসা বলল
ঠিক করেছ যাও তাড়াতাড়ি  নাস্তা রেডি করো। আমি বেরোবো।'
ঝর্ণা বললো বেশি সময় লাগবে না বৌদি তাড়াতাড়ি করে নিচ্ছি। তোমমায় কি আজকে টিফিনে ভাত দিয়ে দেবো?'
রুপসা বলল 'না না না ।তুমি আমায় হযlএকটু ভারী করে নাস্তা টা দাও টিফিনে আজকে আমি এখানে খাব না ।আমি বাইরে লাঞ্চ করে নেব।
নদী সবকিছু শুনতে পাচ্ছিলো আজকাল মা একটু ঘনঘন বাইরে লাঞ্চ করে , ও জানলা দিয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। মনে হচ্ছিল বৃষ্টির চোখে মুখে যেন বিষণ্ণতার ছাপ ।জানলা দিয়েছে এই কর্ম ব্যস্ততাকে দেখছিল । ও অনেকদিন হলো তারা গ্রাম থেকে শহরে এসেছে ।যবে থেকে মা কোম্পানিতে জয়েন করেছে আজকে শুধু নদী ভাবছে তার জীবনটা অন্যরকম হতে পারত আজকে তার বাপি বেঁচে থাকলে চারিদিকে রোদ্দুরে ভেসে থাকতে পারতো আজকে একটা বিশেষ দিন সেটা কি মা একদম ভুলেই গেল? ও কিছুই বলল না আজকে কি তার জীবনে নতুন একটা নীল আকাশ আসতে পারত না?
এর মাঝে বাইরে থেকে আওয়াজ পাওয়া গেল যে মায়ের ঘর থেকে একটা ফোনের আওয়াজ আসছে ।একবার ফোন হয়ে কেটে গেল ঝর্ণা বাইরে থেকে বলে গেল বৌদি তোমার ফোন বাজছে রুপসা মেয়ের দিকে তাকিয়ে তারপর বলল হ্যাঁ যাচ্ছি বেরিয়ে গিয়ে সামনের বারান্দার আটকে গিয়ে নিজের ঘরে ঢুকলো ঢুকে দেখছে ফোন করেছে তাদের কোম্পানির বস অরিন্দম ভদ্র। আজকাল বেশিরভাগ দিনই বস ফোন করেন ।রুপসা ভাবতে থাকে কেন কোন কারণ না থাকলেও তার স্যার ফোন করেন ভাবতে ভাবতেই ফোনটা রিসিভ করল বলল' হ্যালো'।
অপরপ্রান্ত থেকে উত্তর আসলো আজকে তোমার কথাটা মনে আছে তো?
রুপসা বলল হ্যাঁ স্যার?
ঠিক আছে তাহলে নির্দিষ্ট টাইমে অফিসে পৌঁছে যেও।তোমার জন্য কি গাড়ি পাঠাবো?'
রুপসা বলল 'না ,না, না আমি ঠিক চলে যেতে পারব।'
এরপর ফোনটা কেটে গেল। রুপসা ভাবতে থাকে সে কি কোন  রাজনীতিতে জড়িয়ে যাচ্ছে নাকি সে ভাবতে পারছে না ?তবে অফিসের বস তার প্রতি কিছুটা দুর্বল তা বোঝা যায়। আজকাল বেশ তার  কথাবার্তা বা ব্যবহারে ধরা পড়ে তাকে টিকিয়ে রাখতে হলে তাকে তো তার সঙ্গে ভালোভাবে কথা বলতেই হবে ।মফস্বল থেকে আসা রুপসা কতটা বদলে গেছে নিজেই মাঝে মাঝে ভাবে এই সেই রুপসা যে একদিন ভালো করে মানুষের সঙ্গে কথা বলতে ভয় পেত ।গ্রামের মানুষ এক রকম সহজ সরল তাদের সঙ্গে হেসে খেলে কাটিয়ে দিতে পারতো কিন্তু সজীব যেন চলে যাবার পর তাকে সবকিছু শিখিয়ে দিয়ে গেল ।এতটাই আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পথ দেখিয়ে দিয়ে গেল শেষ পর্যন্ত তার জীবনটা কোন দিকে যাবে? খড়কুটোর মতো ভেসে যাবে না তো ? তার সংসার তার মেয়েকে নিয়ে সে ঠিক রাখতে পারবে? এই টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়েই আজকাল বেশিরভাগ সময়ে তাকে চিন্তাগ্রস্থ করে তোলে।
মধ্য শীতের ভোরে বারবার তার বিশেষ দিনের স্মৃতিটা ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা করছিল নদী। নদীর জলের গভীরতা মাপার চেষ্টা করছিল। কিন্তু তার মনে হয়েছে এই নদীতে যেন  পাক জমে যাচ্ছে।

কবি ফাতেমা হক মুক্তামনি





অচেনা মেয়ে 
 ফাতেমা হক মুক্তামনি

একদিন আমি ভুল পথ ধরে একা একা হাঁটবো
হাঁটতে হাঁটতে তোমার বাড়ির উল্টো পথ ধরে
 চলে যাবো অনেক দূরে, অন্য কারো বাড়ির পথে।
যেতে যেতে আমি অতীতের সবকিছু ভুলে যাবো,
ভুলে যাবো আমি
 পিছনে ফেলে আসা পুরনো দিনের সব কথা।

একদিন আমি সকলের কাছে খুব অচেনা হবো
আমার পরিচয় আড়াল করে
আমি অন্য গাঁয়ের অচিন পড়শি হবো।
সেখানে আমি আমার নাম দেবো "অচিন মেয়ে"। 
আমাকে তোমরা কেউ কোথাও খুঁজে পাবেনা
কেউ জানাতেও পারবেনা 
আমি অচিন গাঁয়ের, অচিন মেয়ে হয়ে 
কোথায়, কেমন আছি।

আমি জানি 
একদিন তোমরাও আমাকে একদম ভুলে যাবে 
কেউ আর এখনকার মতো
শিওরে রাখবেনা আমার লেখা বইপত্র। 
অযথা বারান্দায় বসে বসে
কেউ আর পড়বেনা, আমারই লেখা অসংখ্য  কবিতা।
মুঠোফোনে আমার লেখা গান বাজিয়ে আনমনা হয়ে, কেউ আর থাকবেনা দক্ষিণের  জানালায় দাঁড়িয়ে। 
কেউ আর ক্ষণেক্ষণে আমাকে ডাকবে না 
সেই চেনা নাম ধরে
আমার দেয়া রুমাল, বুকপকেটে রেখে
 কেউ আর বলবে না,  তুমি এখন কোথায় আছো?

আমি জানি 
একদিন আমি কালের যাত্রায় ভেসে ভেসে
সকলের কাছে ধূসর স্মৃতি হয়ে রবো। 
আমার শূন্যস্থানে শিকড় গেড়ে বসবে
অসংখ্য জানা-অজানা পাহাড়ি বা সমতলের বৃক্ষ ,
আমার অস্তিত্বে শ্যাওলা জমে জমে 
সেখানে ফুটবে অসংখ্য লাল, নীল পদ্ম।
আমার অবর্তমানে 
তোমরা আবার উৎসবে মাতবে
নতুন কারো আগমনে।

কবি সোলেমান রাসেল এর কবিতা





দুঃখিত মৃত্যু'তে
সোলেমান রাসেল 

যদি দুঃখিত মৃত্যুতে হয় অপবাদ 
যাতনার শোকে দাও দেহখানা পুড়ে,
জন্ম সুর চিহ্নে যদি কালো দাগ লেগে 
সন্ধ্যার গহীনে দাও কালো নাম মোড়ে।

যদি বিসর্জন হই সন্ধ্যার তারায় 
তারা হয়ে বেঁচে থাকো আলোক সাড়ায়।

যদি মুখ ফুটে বলি মিছিলের শ্লোক
অভয়ের পাঠ করি সত্যের আশায়,
হলদের ঐ পাতা ঝরি-- বসন্তের ডাকে 
বৈশাখী তুফান হও নির্ভীক ভাষায়। 

যদি অভিযোগ হয়, কোনো একরতি 
জ্বালো না কখনো আর সে মোমের বাতি। 

যদি আগমনি হয়, প্রতিবাদে ফেরা 
ক্ষুধার্ত জীবন হবো- রিক্সার চাকা'য়, 
রক্তের গন্ধ শুকায়ে ঘাম ফোটা ঝড়ি
জেগে ওঠো মানচিত্র স্বপ্নিল আঁকায়। 

যদি ফুল সম ফুটি কুঠির মিনারে 
গুণ হয়ে বেঁচে থাকো- বারাক দীদারে। 

যদি কাষ্ঠে ফাঁসি হয়, মজলুমি কণ্ঠে 
জল্লাদের তৃষ্ণা ছুবো- রশি করে প্রিয়,
পথ হয়ে এঁকে যাই যুগান্ত মুক্তিতে
শহিদের রক্ত ছুঁয়ে স্বীকারোক্তি দিও। 

যদি বুটের আঘাত চেপে ধরে বুকে-
জল হয়ে ঝড়ে যাবো আকাশের চোখে।

শামীমা আহমেদ / পর্ব ৫৩





শায়লা শিহাব কথন 


অলিখিত শর্ত 
(পর্ব ৫৩)

শামীমা আহমেদ 


ওপ্রান্ত থেকে রিশতিনার স্বর ভেসে এলো
---শিহাব তুমি কি আজ আসবে না?আমি তোমার অপেক্ষায়। 
----আমিতো আসার কোন প্রয়োজন দেখছিনা।কেন অযথা  অপেক্ষা করছো?
---তাহলে তোমার জীবনে আমার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে?
---যেটা দুস্প্রাপ্য সেটার আশা ছেড়ে দেয়াই ভালো।আর তুমিতো জানো আমি খুব গোছানো একজন মানুষ। 
---হ্যাঁ,সে আমি জানি আর এও বুঝতে পারছি,তোমার জীবনে এমন কারো আগমন ঘটেছে যে তোমায় এতটা শান্ত রেখেছে।
---তোমার জীবনও নিশ্চয়ই শূন্য হয়ে রয়নি?আর আমার জীবনে যাই ঘটুক,আমার সন্তান আমার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান!
সন্তানের কথা বলাতেই রিশতিনা যেন আরো কিছু জানতে আগ্রহী হয়ে উঠলো! 
আমাদের ছেলে দেখতে কার মতো হয়েছে?
কি নাম রেখেছো তোমরা?
শিহাব খুবই বিরক্তভরা স্বরে উত্তর দিলো,
আচ্ছা রিশতিনা,আমি এখন রাখবো। অনেক কাজ পড়ে আছে।বাই।
রিশতিনাকে আর  কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে শিহাব দ্রুতই কল কেটে দিলো।
রিশতিনা একেবারেই অপ্রস্তুত হয়ে গেলো
শিহাব তাকে এড়িয়ে চলতে চাইছে।অথচ তার জন্য কতইনা ভালোবাসার প্রকাশ ছিল একসময়! অবশ্য এতটা ভালবাসার সঠিক মূল্যায়ন সে করতে পারেনি।পরক্ষণেই রিশতিনা ভাবলো,আমিওতো কম বড় রিস্ক নেইনি।সেই আঠারো বছরের একটি মেয়ে কতটা সাহসিকতা আর বিশ্বাসের উপর ভর করে একজনের হাত ধরতে পারে।তার জন্য বাবা মাকে ত্যাগ করতে পারে।তবে সবই নিয়তি! 
সব কিছুই আজ অতীতের।  ব্যরিস্টার বাবার প্রবল চাপে,জীবনে উচ্চশিক্ষার প্রয়োজনে তাকে বাবা মায়ের করায়ত্ত্ব হতে হয়।নিজের সন্তানকে ফেলে যেতে হয়।এত বছর চোখের দেখাটাও হয়নি। বাবা মায়ের ইচ্ছা পূরনে রিশতিনা ইংল্যান্ডে এল এল বি,এল এল এম কমপ্লিট করেছে। এখন ব্যরিস্টারি ডিগ্রির জন্য বাকী জীবন ন্যস্ত করতে হবে।দূর প্রবাসেও বাবা মায়ের তীক্ষ্ণ নজরিদারির মধ্যে রিশতিনার দিন কাটে।একরকম বন্দী দশায় জীবন কাটানো। ছকে বাধা চলমান জীবনে হঠাৎই একদিন রিশতিনার বাবার কোলন ক্যান্সার ধরা পরে।একেবারে খুবই অল্প সময় চিকিৎসার সুযোগ রেখে তা সারাদেহে ছড়িয়ে পড়ে। বাবার মৃত্যুকে খুব সহসা খুব কাছ থেকেই দেখলো রিশতিনা৷ তিনদিন আগে বাবার মৃতদেহ নিয়ে দেশে ফিরেছে রিশতিনা।কুমিল্লায় গ্রামের বাড়িতে তার দাফন সম্পন্ন হয়।আজ চার বছর পর রিশতিনা দেশে এলো তবে বাবার মরদেহ নিয়ে। কোথায় গেলো আজ সেই দম্ভ আর দাপট! সবই একদিন ফুরায়।মাঝে কেবল কিছু জীবনকে তছনছ করে দেয়া।রিশতিনা  বাবামায়ের একমাত্র সন্তান তাকেই সব দেখতে হচ্ছে। মাকে নিয়ে ওরা গুলশানের নতুন বাসায় উঠেছে।ঝিগাতলার বাড়িটা এখন পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে আছে। রিশতিনার সন্তানকে শিহাবদের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে জাঁদরেল ব্যরিস্টার সাহেব স্ত্রী কন্যাকে নিয়ে লন্ডন প্রবাসী হয়ে যান।রিশতিনার মনে আজ একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খায়। পিতামাতার কাছে উচ্চশিক্ষা আর জীবনে স্ট্যাবলিস্টড হওয়া কি সন্তানদের আবেগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ? অবশ্য
সন্তানকে লালন পালন করে তাদের কাছে পিতামাতার কিছু চাওয়া থাকতেই পারে সেটা কোন অন্যায় কিছু নয় কিন্তু কেন তবে আবেগ এসে সব কিছুকে ওলোট পালোট করে দেয়? রিশতিনা আজো এই দ্বিধা দ্বন্দের কোন উত্তর খুঁজে পায়না। রিশতিনার মায়ের জীবনে তার বাবার ভীষণরকম প্রভাব আর মাও তাতে একেবারেই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। অবশ্য এটা অভ্যস্ত হওয়া নয় এটা একপ্রকারের বশ্যতা।কিন্তু রিশতিনার জীবনে যতটুকু সময়ই সে শিহাবকে পেয়েছে শিহাব সবকিছুর সিদ্ধান্ত রিশতিনার উপরই ছেড়ে দিয়েছিল।রিশতিনার প্রথম প্রেম শিহাব।শিহাবকে ভুলে যাওয়া তার পক্ষে কোনদিনই সম্ভব নয়। এত বছরেও শিহাবকে সে এক মূহুর্তের জন্য মন থেকে সরাতে পারেনি।

শিহাবের প্রস্তাবে রাহাত বেশ ভাবনায় পড়ে গেলো।আপুকে শিহাব ভাইয়া তাদের জিগাতলার বাসায় নিয়ে যেতে চাইছেন। এতে তার সম্মতি থাকলেও মায়ের অনুমতিটা তো নিতে হবে।আর এক্ষেত্রে মাকে এখন পুরো ঘটনা বিস্তারিতভাবে জানানোর সময় হয়েছে।তাছাড়া মাকে তো সব জানতেই হবে। রাহাত অফিস থেকে ফিরে রাতের খাবার খেয়ে নিয়ে মায়ের ঘরে চলে এলো।মা একটু অবাক হলেও বুঝতে পারলো রাহাত কিছু বলতে চাইছে। রাহাতের আগমন, শায়লার লুকোচুরি, রুহি খালার কানাডার খবর নিয়ে আসা, বড় জামাই নোমান সাহেবের দেশে আসা সবকিছুই মায়ের কাছে নান্সন প্রশ্ন চিহ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।  আর সেদিন শিহাব নামটিও শুনেছে।যদিও তার সন্তানদের প্রতি তার অগাধ বিশ্বাস। রাহাত ,শায়লা ও শিহাবের ব্যাপারে মাকে একেবারে আদ্যোপান্ত সব খুলে বললো।একেবারে ওদের পরিচয় থেকে শুরু করে শিহাবের চার বছরের ছেলে আরাফ পর্যন্ত! সব শুনে মা ভীষণ আতংকিত হয়ে উঠলো! একদিকে মেয়ের মনের চাওয়া আরেকদিকে নিচতলার রুহি খালার কাছে তার এতদিনের মাথা উঁচু করে চলা শত সাহায্য নিলেও সম্মানের সাথে তা গ্রহন করা আজ যেন সবই ধুলায় মিশে গেলো।বিবাহিত মেয়ে অন্য পুরুষের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া এতো একরকম ব্যভিচার! রাহাত মাকে ধীরে ধীরে সব বুঝালো।দিনে দিনে এই পরিবারের জন্য আপার কত স্যাক্রিফাইস, সেটার কতটুকু মূল্য আমরা দিয়েছি।কোন কিছু না ভেবেই রুহি খালার কথামতো আপুর চেয়ে অনেক বয়সের ব্যবধানের একজনকে আপুর জীবনসঙ্গী করেছি।আপুর মন মতামত কিছুই জস্নতে চাইনি।রাহাত মাকে বুঝালো আপুর সারাজীবন এখনো পরে আছে।বিবাহিত জীবনে আপু অসুখী হউক সে স্মরা চাইনা মা।তাহলে আমার এত শিক্ষা,চাকরী সম্মান অর্জন সবই বৃথা হবে।
মা যেন কিছুটা বুঝের মধ্যে এলো।
অস্ফুট স্বরে কেবল বললো,নোমান সাহেব কি এটা মানবেন?
দেখা যাক কি করা যায় মা।আপা তাকে ডিভোর্স দিবেন। তার দুটো সন্তান আছে এই তথ্য গোপন করার অভিযোগে। প্রয়োজনে আমরা আইনের আশ্রয় নেবো মা।আপুকে অমন দূরদেশে পাঠিয়ে দুশ্চিন্তায় আমাদের ঘুম হবে না মা।তুমি রুহি খালাকে আমাদের এইসব কথা কিছুই জানাবে না। রাহাতের সরলমনা মা,তক্ষুনি দুহাত উপরে তুলে মহান আল্লাহতায়ালার কাছে সবকিছুর জন্য ক্ষমা চাইলেন আর এইসব জটিলতার সুষ্ঠু সমাধান চাইলেন।

শায়লা শিহাবদের জিগাতলার বাসায় যাওয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে।
একটু আড়ষ্ট লাগছে।কিন্তু শিহাব অভয় দিয়েছে। তাছাড়া আরাফকে দেখতে ভীষণ মন চাইছে।রাহাতের আজ অফিস থেকে ফিরতে বেশ দেরি হচ্ছে।হয়তো অনেক কাজের চাপ পড়েছে।কিন্তু আজ আর কোনকিছু ফোন করে জানায়নি।রাত সাড়ে নয়টা বাজতে চললো। শিহাবের সাথেও আজ সারাদিন কোন কথ্য হলো না।সেই সকালে মেসেজ রেখে গেছে।যাক হয়তো ব্যস্ততা বেড়েছে। খুব শীঘ্রই হয়তো শায়লার জীবনে বিরাট একটা পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। শি্ব এই বিষয়টিতে বেশ সিরিয়াস হয়ে উঠেছে।আসলে একাকীত্ব এক সময় অসহ্য হয়ে উঠে।মানুষকে ক্ষতবিক্ষত করতে করতে তখন নিজ থেকেই স্বস্তি খুঁজে ফেরে।যেই শিহাব পরিচয়ের শুরুতে কিছু অলখিত শর্তে শায়লার সাথে দেখা দিয়েছিল আজ সেই শর্ত যে কোথায় ভেসে গেলো! শিহাব শায়লার জন্য একেবারে মরিয়া হয়ে উঠেছে।শায়লার এক বোবাপ্রাণীর মত দিন কাটাতো।বিয়ের পর নোমান সাহেব কল দিলে শায়লা কি কথা বলবে  কোন কথাই খুঁজে পেতো না আর নোমান সাহেব বাংলায় কথা বলায় অতটা স্বচ্ছন্দ ছিল না। দীর্ঘ দিন বিদেশ জীবনে বাংলা বলা প্রায় ভুলেই গেছে। ভাষার বাধা থাকলে মনের ভাব কি আর প্রকাশ করা যায়? তাছাড়া নোমান সাহেবের তো শায়লার মন বুঝার প্রয়োজন নেই, তার বাচ্চাদের দেখভালের জন্য শায়লাকে প্রয়োজন। শিহাব আর নোমান সাহেবের মাঝে এতটাই পার্থক্য যে শায়লা বুঝে উঠতেভপারেবনা কেন বা কি ভেবে তার মা ভাই তাকে এই বিয়েটায় সম্মতি দিলো? 
দরজায় কলিংবেল হলো।শায়লার এলোমেলো ভাবনায় ছেদ পড়লো।ডাইংএর ঘড়িতে রাত দশটা।বেশ রাত হয়েছে।মাকেও খাবার দিতে হবে। আজ বেশিই দেরি হয়ে গেলো। রাহাত বেশ হাসিমুখে বাসায় ঢুকলো আর শায়লার দিকে তাকিয়ে রহস্যময় হাসি দিতে লাগলো।হাতের ব্যাগটা রেখে শায়লার দুই হাত ধরে আনন্দে দুলতেব্লাগলো! শুধু নাচতে বাকী।মা আর শায়লা রাহাতেরভেই কর্মকাণ্ড দেখে হেসে কুটিকুটি। কি হলো? কি হয়েছে বলবি তো? কি প্রমোশন হয়েছে? শায়লার জিজ্ঞাসায় রাহাত বলে উঠলো হু তবে  তার চেয়েও বেশি কিছু!
মা আর শায়লা মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলো।এবার মা এক কড়া ধমক লাগালো,বলবিতো কি হয়েছে? অমন ব্যাঙের মত লাফাচ্ছিস কেনো? 
এবার রাহাত হুশে এলো! বললো,জানো আপু এতক্ষন কার সাথে ছিলাম আমি? 
এতক্ষন শিহাব ভাইয়ার সাথে ছিলাম।প্রায় দুই ঘন্টা।অফিসের গাড়ি থেকে  এইতো আর্টিসানের উপরে  রেস্টুরেন্টটায় বসে কথা বললাম।ওখানে  টেবিল টপে শিহাব ভাইয়া যেতে বলেছিল।কফি আর ডেসার্ট খাওয়ালো।আরো অনেককিছু খাওয়াতে চাইলো। আমি রাজী হইনি।আপু শিহাব ভাইয়া দারুন করে কথা বলে।খুবই মন খোলা প্রাণ খোলা মানুষ। আজকের দেখা কিন্তু মনে হলো অনেকদিনের চেনা।অনেক আপন হয়ে গেলো খুব তাড়াতাড়ি।তার বাইকে আমাকে বাসায় নামিয়ে দিলো।আসলেও আপু, শিহাব ভাইয়াতো সত্যিই একটা হিরো!! রাহাতের কথায় শায়লা খুবই লজ্জা পাচ্ছিল।মা দূরে দাঁড়িয়ে সব শুনে ঘরে চলে গেলো।ভাইবোনের এই সব কান্ডকারখানায় মা ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলো। 
রাহাত একটু স্বাভাবিকে ফিরে এলো। শান্ত হয়ে বললো, আপু,খাবার দাও।আমি একটু শাওয়ার নিয়ে আসছি। কাল সকাল দশটায় শিহাব ভাইয়া তোমাকে নিয়ে জিগাতলার বাসায় যাবে।তুমি তৈরি থেকো।শায়লার মনের ভেতর এক অনাবিল আনন্দের ঢেউ বয়ে গেলো! বারবার শিহাবের মুখটা মনের মাঝে শায়লার নাম ধরে ডেকে যাচ্ছে।শায়লা রান্নাঘরে খাবার আনতে এগিয়ে গেলো।


চলবে....

মনি জামান



ধারাবাহিক উপন্যাস



সেদিন গোধূলি  সন্ধ্যা ছিল
৩ য় পর্ব 

মনি জামান


খোলা মাঠ মাঝখান দিয়ে একটি সরল রেখা যেন চলে গেছে ট্রেন লাইন,চারিদিক গাছের সারি যেন ওদের সাথে ছুটে চলছে।
গ্রামের পর গ্রাম যেন অতীত হয়ে যাচ্ছে,ঝিরি ঝিরি বাতাস নিলয় আর মেবিনের চুল গুলো এলোমেলো করে দিচ্ছে,বিকেল হয়ে গেলো কখন টের পাইনি ওরা দু'জন,মাঝে মাঝে ট্রেনের ঝাকুনি ওদের কে নাড়িয়ে দিচ্ছে।
মেবিন নিলয়ের গা ঘেঁষে বসলো,নিলয় বাম হাতে মেবিনের গাড়ের উপর হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরছে,ওরা আজ এত কাছাকাছি যে আগে কখনো এভাবে একসাথে হয়নি।সূর্য অস্ত যেতে আর বেশি সময় নেই,ট্রেন ছুটছে গন্তব্য কক্সবার।
ধীরে ধীরে সূর্য ডুবার আয়োজন সম্পন্ন করছে কিছুক্ষণ পর সূর্য ডুব দিলো,আস্তে আস্তে সন্ধ্যা গ্রাস করছে দিনকে,অন্ধকার নেমে আসলো।
দুরের গ্রাম গুলোয় মিটি মিটি আলোর মিছিলে যেন পরিণত হয়ে গেল মহুর্তে,এ যেন এক অপূর্ব আলোর দ্যুতি ওদের চোখ দুটোকে আটকে রেখেছে,মাঠের দুপ্রান্তে গ্রাম আর গ্রাম এমন ভাবে কখনো দেখা হয়নি মেবিন আর নিলয়ের।
আজ দুরের মিটি মিটি আলো গুলো গ্রামের পর গ্রামকে করছে যেন স্বর্গ রাজ্য,
মেবিন নিলয়কে জড়িয়ে ধরে আবেগ ঘন হয়ে বলল,নিলয় আজ এত ভালো লাগছে কেন বলতে পারো ঝিরি ঝিরি বাতাস দুজনকে আজ মাতাল করেছে।দুজন দুজনকে জড়িয়ে আছে,আরো অন্ধকার হলো চারপাশ নিলয়ের ভিতর কি যেন একটা বুনো স্বভাব ধীরে ধীরে মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো এবং সমস্ত শরীরে কি একটা প্রাপ্তির নেশায় সেটার যেন ছুঁয়ে দিতে ব্যাকুল।
নিলয়ের সমস্ত শরীরে বিদ্যুৎ প্রবাহ শুরু হলো মনের অজান্তেই মেবিনের ঠোটে চুম্বন করলো,আজ কোন লজ্জা শরম শান্ত ছেলে নিলয়ের ভিতর নেই,মেবিন ও নিলয়কে জড়িয়ে ধরে চুম্বন করলো মেবিনের ভিতর ও তোলপাড় শুরু হয়েছে।মেবিন নিলয়ের ঠোট দুটি স্পর্শ করলো তারপর পরস্পরকে আলিঙ্গ করলো এক আদিম উন্মাদনায় ডুবলো দুজন,দুজনের শ্বাস-প্রস্বাশ আর বুকের উঠানামা যেন উত্তাপ ছড়াচ্ছে,ধীরে ধীরে দুজন দুজনকে পাগলের মত জড়িয়ে ধরে কাছে আরো কাছে নিতে ব্যাকুল।আজ নিজের মত করে নিলয় অনুভব করলো মেবিন যেন সঙ্গমরত বিষধর গোখরো,দুচোখ মুখ সব লাল হয়ে গেছে,যেন অনন্তকাল ধরে জড়িয়ে আছে নিলয়কে।
নিলয়ের ভিতর ও আজ কোন ভদ্রতা নেই নম্র-স্বভাব গুলো সব অনুপস্থিত,আজ সাহসী এক পুরুষে পরিণত হয়েছে সে।
ট্রেন ঝিক ঝিক শব্দ তুলে তখন রাতের বুক চিরে ছুটে চলেছে,দুরে কোথাও এক ঝাক বুনো শিয়াল হুকাহুয়া চিৎকার করে ডেকে উঠলো,ঝক ঝকে আকাশ মিটি মিটি তারার অপূর্ব মিছিল রাতকে করেছে আরো গাঢ় আরো সুন্দর।
প্রকৃতির সব সৌন্দর্য আজ যেন প্রকাশ করছে অকৃপণের মত প্রকৃতি,কিছুক্ষণের মধ্যে চাঁদ উকি দিল,প্রকৃতি আলোময় হয়ে উঠলো,নিলয় আর মেবিন আজ উন্মাদ ওদের দু'জনের শ্বাস উঠানামা করছে খুব দ্রুত,দুজন দুজনকে এমন ভাবে জড়িয়ে আছে যেন কোন গুল্ম কোন বৃক্ষকে জড়িয়ে আছে অনন্তকাল ধরে।
আজ দুজন দুজনকে নতুন করে আবিস্কার করছে,নিলয় মেবিনের সমস্ত শরীর আস্তে আস্তে স্পর্শ করলো,মেবিনও নিলয়কে আদর করে আরো কাছে টেনে নিলো দুজনে যেন ঠিক এই মুহুর্তটার জন্য এতদিন ধরে অপেক্ষায় ছিল,ঈশ্বর প্রাপ্ত এক আদিম নেশায় পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে সেই চিরচেনা বাসনা পূর্ণ করার সংকল্প নিয়েছে আজ।কতক্ষণ ওরা পরস্পর জড়িয়ে ছিল ওরা নিজেরাই জানেনা,হঠাৎ নিলয় ও মেবিনের কানে ভেসে এলো ভোরের ফজরের আযানের ধ্বনি।
ওরা অবাক হয়ে গেলো সকাল হয়ে গেছে টেরই পাইনি!নিলয় মেবিনকে ডেকে বলল,এই কাক পাখি সকাল হয়ে গেছে ফজরের আযান হচ্ছে আমরা বোধয় পৌছে গেছি।
মেবিন চোখ মেললো এবং ঘড়ি দেখে বলল,আর আধা ঘন্টার ভিতর আমরা পৌছে যাব,নিলয় বলল,আমরা কোথায় উঠব হোটেলে?মেবিন বলল,আমার বান্ধবী চারুদের বাড়ি উঠব চারু আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।
নিলয় বলল,আমাকে আগে বলনি কেন কাক পাখি,মেবিন স্বভাব সুলভ সেই মিচকি হাসি দিয়ে বলল,এটা তোমার জন্য সারপ্রাইজ ছিলো বলে আমার পাগলু।নিলয় একটু অভিমানের সুরে বলল,আমাকে বলতে হতো,মেবিন নিলয়ের নাক টেনে আদর মাখা কন্ঠে বলল, হয়েছে আর পানসে অভিমান নয় এবারতো বললাম তোমাকে।
নিমেষেই নিলয়ের সব অভিমান উধাও হয়ে গেলো,নিলয়ও হেসে বলল,হুম খুব চালাকি আমার সাথে তাই না? বলেই নিলয় মেবিনকে একটু আদর করে চোয়াল টেনে দিলো,মেবিনও বলল,হয়েছে আর না স্যার সারারাত অনেক তো হয়েছে।নিলয় প্রশ্ন করলো মেবিনকে সারারাত কি হয়েছে কাক পাখি,এবার দুজনই হেসে উঠলো,ট্রেন ছুটছে আর মিনিট তিনেক লাগবে ওদের স্টেশনে পৌছাতে,ওরা অপেক্ষায় আছে স্টেশনে কখন থামবে ট্রেন।
মেবিন ঘড়ি দেখে নিলয়কে বলল,এইতো এখন ট্রেন থামবে পৌছে গেছি তুমি ব্যাগ দুটো নাও,বলতে বলতেই ট্রেন স্টেশনে এসে দাঁড়ালো।যাত্রীরা সবাই নামছে মেবিন আর নিলয় ওদের ব্যাগ পত্র নিয়ে নেমে পড়লো স্টেশনে।
নেমেই নিলয় মেবিনকে বলল,চলো যাওয়া যাক কাক পাখি,মেবিন বলল,না এখানে অপেক্ষা করতে হবে চারু গাড়ি নিয়ে আসবে আমাদের নিতে,নিলয় বলল,চলো তাহলে স্টেশনের ঐ বেঞ্চটায় গিয়ে বসি,মেবিন বলল,চলো নিলয়।
মেবিন আর নিলয় বার বার ঘড়ি দেখছে বেঞ্চে বসে,আর অপেক্ষা করছে মেবিনের বান্ধবী চারুর জন্য,চারু কখন আসবে ওদের দুজনকে নিতে।

চলবে...

১১ জানুয়ারি ২০২২

মমতা রায় চৌধুরী 'র ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন" ৯০


পন্যাস 


টানাপোড়েন৯০

খেয়ালী নদী

মমতা রায় চৌধুরী


ঘুম ভাঙার পর অনেকক্ষণ বিছানায় শুয়ে ছিল রুপসা। আজকাল এভাবেই বেশ কিছুক্ষণ চোখ বুজে শুয়ে  নিজেকে একটু আবিষ্কার করার চেষ্টা করে। কেমন যেন সব এলোমেলো হয়ে গেল কিছুই মাথায় ঢুকতে চায় না ।কোথাও কিছু ফাঁকা আছে কিনা সেই মন পাখিটাকে ধরে নিয়ে কল্পনায় নিজেকে তৈরী করার চেষ্টা করছিল।
হঠাৎই ভেতরের ঘরে ফোনটা বেজে ওঠে। বাজতে বাজতে কেটে গেলো ।আবার বাজতে শুরু করলো। বেজেই চলেছে। একটু বিরক্তই হলো এত সকালে কে ফোন করেছে! শব্দটা ক্রমশ তীক্ষ্ণ হচ্ছে ।ফোনটা তুলছে না কেউ। ঝর্ণা কোথায় গেল? বিরক্তি নিয়ে রুপসা বিছানা থেকে উঠে বসল। নিজের অজান্তেই দেয়াল ঘড়িটার দিকে গেল ।ঘড়িতে তখন ৬.১০। ঝরনাটা তাহলে কোথায় গেল? ও কি  কোন কাজে বাইরে গেছে? ওদিকে নদীও ফোন ধরছে না।'

হাউসকোটটা গায়ে চাপিয়ে বিরস মুখে ফোনটা তুলে বলল 'হ্যালো।'
ও প্রান্ত মুহূর্তের জন্য নীরব। তারপর বলল'আমি সমুদ্র বলছি।'
রুপসা বলল' ও তো এখনও ঘুম থেকে ওঠে নি।
কিছু প্রয়োজন আছে?'
সমুদ্র নদীর বন্ধু। বেশ কয়েকবার বাড়িতে এসেছে। খারাপ লাগেনি। ছেলেটি সহজ-সরল। সব সময় চেষ্টা করে নদীকে হাসি খুশিতে রাখার। 
অথচ আগে নদী ছিল কতটা প্রাণবন্ত, উচ্ছল ছিল তার তরঙ্গ।
সজীব মারা যাবার পর থেকে যেন কেমন হয়ে গেছে। ছাইচাপা আগুন যেন। শুধু গুমড়ে গুমড়ে থাকে।
সমুদ্র বলল' না বলছিলাম..?'
 রুপসা বলল' আমি তো সেটাই জানতে চাইছি, কি বলতে চাইছো,?'
সমুদ্র যেন মাথা চুলকে বলল' না মানে আন্টি ,কথাটা ওকে ...।'
রুপসা বললো ' বুঝেছি কথাটা আমাকে বলবে না তাই তো?'
সমুদ্র নিরুত্তর।
রুপসা বলল 'ঠিক আছে। আমি চেষ্টা করছি ওকে ঘুম থেকে ডেকে দেবার। যদি ওঠে ভালো ।না উঠলে তো আমার কিছু করার নেই বাবা।'
সমুদ্র হেসে বলল 'ঠিক আছে আন্টি।'

রুপসার স্বামী মারা যাবার পর স্বামীর বস কোম্পানিতে জয়েন করতে বলেছেন। তাই স্বাভাবিকভাবেই নদীকে তেমনভাবে সময় দিতে পারে না।
মেয়েটা কেমন যেন একগুঁয়ে জেদি হয়ে যাচ্ছে।
একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে পা বাড়ালো নদীর ঘরের দিকে। প্যাসেজ টপকে নদীর ঘরের ভেজানো দরজাটা আস্তে করে ঠেলল।
ঘরে ঢুকে রূপসা নদীর ঘরের বিশৃঙ্খলা অবস্থা দেখে চমকে ওঠে। এ কি করেছে বৃষ্টি !ঘরটার বই ,খাতা ,পেন, সব খাটের ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখে দিয়েছে। টেডি বিয়ারটা মুখ থুবরে পড়ে আছে।
হঠাৎ দেখলে মনে হবে ঘরটা যেন কেউ তছনছ করে দিয়ে গেছে। রূপসার ত্রস্ত চোখ নির্জন ঘরটায় কয়েকবার পাক খেলেl
ছোটবেলা থেকেই নদীর সখ ছিল প্রিয় খুব কাছের মানুষদের ছবি টানিয়ে রাখা। রুপসা  প্রভাতী আলো  জানলার কাঁচ লাগানো ঝোলা ভারী পর্দা দুটোর  থেকে বেরিয়ে এসেছে। আর মন কেমন করা স্মৃতিগুলো যেন আঁকড়ে ধরছে।


তারপর কাছে গিয়ে নদীর গায়ে হাত দিয়ে ডাকতে শুরু করলো। নদী ,নদী, নদী ওঠো তোমার ফোন এসেছে?'
নদী চোখ দুটো বোজা অবস্থাতেই বলল' কার ফোন? '
রুপসা বলল'একটি ছেলের কন্ঠ। নাম  সমুদ্র।'
নদী ঘুমের ঘোরে বললো ''ওকে একঘন্টা পরে আসতে বল'।
রুপসা অগত্যা সমুদ্রের ফোনটাটা ধরে আস্তে করে বলল। ও তোমাকে পরে ফোন করতে বলl
লো কিন্তু..?'
সমুদ্র বলল' আন্টি ,আপনি ওকে বলবেন খুবই দরকার।'
রুপসা শুধু' হুম বলে  নদীর ঘরের দিকে পা বাড়ায় কিন্তু আশ্চর্য সেখানে গিয়ে নদীকে দেখতে না পেয়ে একটু আশ্চর্য হয়ে যায়।রুপসা গেস করলো 'নদী ছাদে গেছে'।কারণ ওর মন ঠিক করার একটি মাত্র জায়গা হচ্ছে ছাদ। আজ কাল নদী যেন একটু খেয়ালী হয়ে গেছে।'
রুপসাও তরতর করে সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেল ছাদে তারপর আরষ্ট গলায় ডাকলো' নদী তোমার ফোন ।'
সমুদ্র শুনতে পেল ।
রুপসা ছাদে উঠে দেখতে পেল রুপসা আলসেতে ভর দিয়ে আচ্ছন্নের মতো তাকিয়ে আছে। ক্ষণিকের জন্য  রুপসা নদীকে দেখে ভয় পেয়ে গেছিল ।
রুপসা আরষ্ট গলায় বলল 'নদী তোমার ফোন।'
নদী যেন শুনতে পেল না।
রুপসা আবার ডাকল।
এবার নদীকে ধাক্কা দিয়ে রুপসা বলল 'তোমার ফোন আছে?'
কিন্তু নদী যখন রূপসার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল তখন তাকে দেখে মনে হয়েছিল একটা ভাবলেশহীন কিছুটা উদাস দৃষ্টি।
রূপসার ভেতরটা কেমন হু হু করে উঠলো। কি হয়ে গেল তার মেয়েটার ।কেমন একটা উদাসী বাউল মন তার ভেতরটাকে দেখে আঁতকে উঠল।'
শুধু রূপসার কথাতে এবার নদী একটু ফিরে তাকালো।
রুপসা বললো 'সমুদ্র ফোন করেছিল?'
নদী তখনও একদৃষ্টিতে রূপসার দিকে তাকিয়ে। যে নাম শুনলে নদী যেন চঞ্চল অস্থির হয়ে ওঠে একটা কেমন যেন বিদ্যুৎ খেলে যায় তার শরীরের ভেতরে আজ এমন কি হলো?'
তারপর নদী কোন কথা না বলে তরতর করে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল।
রুপসা তার মেয়ের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো আর মনে মনে ভাবতে লাগল আজ যা কিছু হচ্ছে তার অবর্তমানে কিছুতেই তার মেয়েটাকে সে সময় দিতে পারছে 
না ।একদিকে তার কাজের জায়গা অন্যদিকে বাড়িতে মেয়ে। কি করবে সে জীবনে বেঁচে থাকার জন্য তার কর্ম দরকার আজ যদি সজীব থাকতো ,তাহলে তাকে এগুলো চিন্তা করতে হতো না। সজীব  চলে যাবার পর থেকেই সব কিছুই যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
'কি করবে  রুপসা?'
নদী যখন সিঁড়ি দিয়ে নামছিলো পেছন থেকে দেখে রুপসাকে নিজেই চমকে ওঠে ।তার মেয়েটা খুব সুন্দর হয়েছে।গোলাপী আভা তার শরীরে ,মাথা ভরা চুল । টানা টানা চোখ, কালো চোখের পাতা। স্লিম। 
ছোটবেলায় নদীকে নিয়ে কতজনা কত কথা বলতো নদীর পিসি ঠাম্মা বলতো রূপসার ডুবলিকেট ।কেউ কেউ বলতেন নদী হবে ওর বাবার মত দেখতে। এত ছোট অবস্থাতেও যে চেহারা বোঝা যায় এটা ভাবা কঠিন কিন্তু তার শ্বশুরবাড়ির লোকজনে এমনই বলতেন।
তিল তিল করে বড় হওয়া  নদী আজ ১৭+
নদী তখন বাথরুমে রুপসা যখন নদীর ঘরে ঢুকলো  নদী বাথরুম থেকে বেরিয়ে নিষ্পলক রূপসার দিকে তাকিয়ে ছিল যেন মনে হচ্ছে কিছুটা জরিপ করছে মাকে।।
রুপসাও প্রস্তুত মেয়ে এতক্ষণ তাকে  লক্ষ্য করছিল।
রুপসা বলল 'সমুদ্রের সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে?'
নদী র গলার স্বরে পরিস্কার ঝাঁঝ  রয়েছে ।আজকাল মাঝে মাঝে মুখ করে ওঠে ।ভালোভাবে কথা বলতেই চায় না।
নদী বলল 'তোমার সময় আছে ,সেসব শোনার?'
রুপসা সকাল সকাল আর কথা  বাড়ায় না।
এর মধ্যেই দেখতে পায় ঝরনা চলে যাচ্ছে পাশ দিয়ে। রুপসা সমস্ত রাগ ঝরনার ওপর গিয়ে পরলো ।তবুও নিজেকে কিছুটা শান্ত রেখে ডাকলো ঝরনা ঝরনা ঝরনা।
ঝর্ণা বললো  'কিছু বলছ বৌদি?'
রুপসা বললো' কোথায় গেছিলে তুমি না জানিয়ে?'
ঝর্ণা বললো আসলে বলে বেরোবার সে সময় ছিল না।
রুপসা বললো' কোথায় গিয়েছিলে?'
ঝর্ণা বললো' বাজারে গিয়েছিলাম? তোমাকে কদিন ধরেই তো বলছি বাজার নেই। তুমি এত ব্যস্ত..। তাই আজ একটু সময় পেলাম বলে বাজার করে নিয়ে আসলাম।'
রূপসার কথা বাড়ালো না ।ঠিকই তো বাজার না হলে  রান্না হবে কি?'
রুপসা বলল' কি এনেছে বাজার থেকে?'
ঝরনা বলল'কাতলা মাছ, চিকেন, সঙ্গে কিছু সবজি।'
রুপসা বললো আর কিছু আনো নি? দুধ গোবিন্দভোগ চাল কাজু কিসমিস ,খেজুরের গুড়?'
ঝর্ণা বললো ' এনেছি তো বৌদি?'
রুপসা বলল
ঠিক করেছ যাও তাড়াতাড়ি  নাস্তা রেডি করো। আমি বেরোবো।'
ঝর্ণা বললো বেশি সময় লাগবে না বৌদি তাড়াতাড়ি করে নিচ্ছি। তোমমায় কি আজকে টিফিনে ভাত দিয়ে দেবো?'
রুপসা বলল 'না না না ।তুমি আমায় হযlএকটু ভারী করে নাস্তা টা দাও টিফিনে আজকে আমি এখানে খাব না ।আমি বাইরে লাঞ্চ করে নেব।
নদী সবকিছু শুনতে পাচ্ছিলো আজকাল মা একটু ঘনঘন বাইরে লাঞ্চ করে , ও জানলা দিয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। মনে হচ্ছিল বৃষ্টির চোখে মুখে যেন বিষণ্ণতার ছাপ ।জানলা দিয়েছে এই কর্ম ব্যস্ততাকে দেখছিল । ও অনেকদিন হলো তারা গ্রাম থেকে শহরে এসেছে ।যবে থেকে মা কোম্পানিতে জয়েন করেছে আজকে শুধু নদী ভাবছে তার জীবনটা অন্যরকম হতে পারত আজকে তার বাপি বেঁচে থাকলে চারিদিকে রোদ্দুরে ভেসে থাকতে পারতো আজকে একটা বিশেষ দিন সেটা কি মা একদম ভুলেই গেল? ও কিছুই বলল না আজকে কি তার জীবনে নতুন একটা নীল আকাশ আসতে পারত না?
এর মাঝে বাইরে থেকে আওয়াজ পাওয়া গেল যে মায়ের ঘর থেকে একটা ফোনের আওয়াজ আসছে ।একবার ফোন হয়ে কেটে গেল ঝর্ণা বাইরে থেকে বলে গেল বৌদি তোমার ফোন বাজছে রুপসা মেয়ের দিকে তাকিয়ে তারপর বলল হ্যাঁ যাচ্ছি বেরিয়ে গিয়ে সামনের বারান্দার আটকে গিয়ে নিজের ঘরে ঢুকলো ঢুকে দেখছে ফোন করেছে তাদের কোম্পানির বস অরিন্দম ভদ্র। আজকাল বেশিরভাগ দিনই বস ফোন করেন ।রুপসা ভাবতে থাকে কেন কোন কারণ না থাকলেও তার স্যার ফোন করেন ভাবতে ভাবতেই ফোনটা রিসিভ করল বলল' হ্যালো'।
অপরপ্রান্ত থেকে উত্তর আসলো আজকে তোমার কথাটা মনে আছে তো?
রুপসা বলল হ্যাঁ স্যার?
ঠিক আছে তাহলে নির্দিষ্ট টাইমে অফিসে পৌঁছে যেও।তোমার জন্য কি গাড়ি পাঠাবো?'
রুপসা বলল 'না ,না, না আমি ঠিক চলে যেতে পারব।'
এরপর ফোনটা কেটে গেল। রুপসা ভাবতে থাকে সে কি কোন  রাজনীতিতে জড়িয়ে যাচ্ছে নাকি সে ভাবতে পারছে না ?তবে অফিসের বস তার প্রতি কিছুটা দুর্বল তা বোঝা যায়। আজকাল বেশ তার  কথাবার্তা বা ব্যবহারে ধরা পড়ে তাকে টিকিয়ে রাখতে হলে তাকে তো তার সঙ্গে ভালোভাবে কথা বলতেই হবে ।মফস্বল থেকে আসা রুপসা কতটা বদলে গেছে নিজেই মাঝে মাঝে ভাবে এই সেই রুপসা যে একদিন ভালো করে মানুষের সঙ্গে কথা বলতে ভয় পেত ।গ্রামের মানুষ এক রকম সহজ সরল তাদের সঙ্গে হেসে খেলে কাটিয়ে দিতে পারতো কিন্তু সজীব যেন চলে যাবার পর তাকে সবকিছু শিখিয়ে দিয়ে গেল ।এতটাই আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পথ দেখিয়ে দিয়ে গেল শেষ পর্যন্ত তার জীবনটা কোন দিকে যাবে? খড়কুটোর মতো ভেসে যাবে না তো ? তার সংসার তার মেয়েকে নিয়ে সে ঠিক রাখতে পারবে? এই টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়েই আজকাল বেশিরভাগ সময়ে তাকে চিন্তাগ্রস্থ করে তোলে।
মধ্য শীতের ভোরে বারবার তার বিশেষ দিনের স্মৃতিটা ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা করছিল নদী। নদীর জলের গভীরতা মাপার চেষ্টা করছিল। কিন্তু তার মনে হয়েছে এই নদীতে যেন  পাক জমে যাচ্ছে।

কবি মনোয়ারুল ইসলাম এর কবিতা




গেরিলা
মনোয়ারুল ইসলাম 


আঁধারের বুক চিরে  দূর পাল্লার ট্রেন
ঝিক-ঝাক, ঝিক-ঝাক
চলে ট্রেন সাথে যায় প্রকৃতি
জানালায় মুখ রাখে উদাস যুবক । 

দৃষ্টির প্রান্তরে
কাশবন, বাঁশঝাড় 
শীর্ণ নদী, ফসলের মাঠ
হয়ে যায় 
গেরিলা যুদ্ধের স্বর্গ ভূমি ।

আকাশের চাঁদ 
প্রেয়সীর চাঁদ মুখ
রণাঙ্গনে মৃত্যুতে ঢলে পড়া 
সহযোদ্ধা ......
দূর আকাশে জ্বল জ্বল করে জ্বলে
দূর নক্ষত্র ।

মেঘ গুর গুর চমকানো বিদ্যুৎ 
ঝলসে উঠা বিমান বিধ্বংসী কামান
দূরে কোথাও বাজ পড়ে 
শব্দে 
সশব্দে ফেটে পড়া মর্টারের  শেল ।

দূর পাল্লার ট্রেন চলে 
ঝিক ঝাক, ঝিক-ঝাক
শব্দে শব্দ মিলে 
হয়ে যায় 
যুদ্ধ-যুদ্ধ
বিপ্লব বিপ্লব
উদাস যাত্রী যুবক 
ফিরে যায়
ছেড়ে আসা রণাঙ্গনে ।

কবি রাবেয়া সুলতানা'র কবিতা




প্রেম বিলাস
রাবেয়া সুলতানা

একখন্ড নির্মোহ নির্ভেজাল প্রেমের তেষ্টা
হৃদয়ে ভীষনভাবে ঘন্টা বাজিয়ে চলে,
প্রেম বিলাসি এ তনুমনে ক্ষণেক্ষণে।

বসন্তে মাতাল আমি,
লিখি যতো অব্যক্ত পদাবলী ;
মুখ আর মুখোশের আড়ালে চলে
প্রেম-অপ্রেমের দিশাহীন টানাটানি।

প্রতিটি জীবনই অপূর্নতায় পূর্ন,
পরতে পরতে সাজানো চৈত্রের দহন ;
ভোগের লীলায় মত্ত বহুরুপীজন।

গোধূলির মায়ায় সাজানো উদ্যানে মিশে যাওয়া
আমার জন্ম জন্মান্তরের অভিলাষ।
চরম ব্যাকুলতায় ভালোবাসার নীলবেদনায়,
দূরে চলে যাওয়াও কল্পনাহীন প্রেম বিলাস।

কবি রাজেশ কবিরাজ এর কবিতা




আবার তুমি 
রাজেশ কবিরাজ

আজ এই সন্ধ্যার আঁধারে, আমি  যদি  আবার
দেখতে পাই তোমারে সেই পুরাতন গলিটির ধারে ;
তুমি কি আবার চলে যাবে ! সেই  প্রথম -
দেখা হওয়ার মতো না-দেখার অভিনয়  করে ?

তুমি কি দেখবে না আমায় ? এই সন্ধ্যার কুয়াশায় !
একদিন আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম এই রাস্তায় তোমার
আশায় । তুমি আসতে অনেকটা পথ  অতিক্রম -
করে, তোমাকে দেখে আমার দু-চোখ যেত  ভরে ।

হয়তো যদি আমি কোনদিন কোন রাতে দেখি
তোমায় স্বপ্নে আবার ! সেই দিন যদি আবার -
মন চায় তোমায় কাছে পাবার ! সেদিনও 
কি  তুমি চলে যাবে, শুনবে'না কথা  আমার ?!

আমার যে কথা ছিল মনে, হয়তো পড়ে  রবে
এই গলিটির কোণে ! এত ভালোবাসার পরও তুমি -
চিনতে পারোনি আমারে,তবুও তোমারে  রাখবো
আমার এই অন্তরে ; দেখব হাজার বছর  ধ'রে ।

মনি জামান/২য় পর্ব

ধারাবাহিক উপন্যাস



সেদিন গোধূলি সন্ধ্যা ছিল
(২য় পর্ব)
মনি জামান

নিলয়ের কয়েকটা রাত কেটেছে এক প্রকার ঘুমহীন কি একটা অনুভূতি তাকে জাগিয়ে রেখেছে কয়েক রাত ধরে, হয়তো এই জেগে থাকাকে ভালবাসার নির্ঘুমতা বলে।
প্রেমিক প্রেমিকাকে প্রেম এমনি ভাবে নির্ঘুম করে দেয়, শূক্রবার রাত্রি শেষে এলো সেই ক্ষাংকিত শনিবার নুতন ভালো লাগার একটি ভোর নিলয় হয়তো এই ভোরটার জন্য এই কয়দিন ধরে অপেক্ষা করেছে।
নিলয় ভোরে উঠলো উঠেই ওয়াস রূমে গিয়ে ব্রাস আর জেল নিয়ে দাঁত ব্রাস করে ফ্রেস হলো তারপর ক্লীন সেভ হয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে পরখ করে দেখে নিচ্ছে,নিলয় আজ নিজেকে দেখলো আয়নার ভিতর অন্য রকম এক নিলয়কে।
নিজেকে এভাবে পরখ করে আর কখনো দেখা হয়নি, রূমে ফিরে ফোনটা হাতে নিয়ে বাটন টিপলো মেবিনের ফোন নাম্বারে,রিং হচ্ছে একটু পর মেবিন ফোনটা রিসিভ করলো,নিলয় বলল,কি করছো কাক পাখি।
মেবিন বলল,এইতো উঠলাম ফ্রেস হলাম এখন ব্যাগ পত্র সব গুছিয়ে নিচ্ছি শোন তুমিও সব গুছিয়ে নাও নিলয়,এখন বাজে আটটা আর মাত্র দুই ঘন্টা সময় আছে আমাদের হাতে দ্রুত সেরে নাও সব কাজ।
নিলয় বলল,ঠিক আছে কাক পাখি আমি এখুনি সব গুছিয়ে নিচ্ছি বলে ফোনটা কেটে দিয়ে রেখে দিলো,নিলয় সব গুছিয়ে নিয়ে আবারও মেবিনকে ফোন করে দুজন দুজনের কথা শেষ করে ফোন কেটে দিয়ে পকেটে ভরে ব্যাগপত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়লো। 
নিলয় ও মেবিন দুজনে নিধারিত স্থানে এসে এক সাথে মিলিত হল তারপর দুজনে একটা রিক্সা ডেকে রিক্সাই উঠে বসলো,মেবিন রিক্সাওয়ালাকে বলল, কমলাপুর রেল ষ্টেশন চলো রিক্সাওয়ালা কলাপুরের দিকে রিক্সা ঘুরালো নিলয় আর মেবিন দুজনে ট্রেনে যাবে কক্সবাজার,ওদের দুজনের দুটো ফাষ্টক্লাস টিকেট আগাম কেটে রেখেছে মেবিনের বন্ধু মরুফ। রিক্সায় নিলয় আর মেবিন দুজন গল্পে মত্ত,রিক্সাওয়ালা প্রায় বিশমিনিট পর এসে পৌছালো কলাপুর। রিক্সাওয়ালা বলল, আপু এসে গেছি কমলাপুর,নিলয় আর মেবিন রিক্সা থেকে নেমে রিক্সার ভাড়া দিয়ে স্টেশনে হেঁটে এলো তারপর দুজনে এসে বসলো একটা যাত্রী বেঞ্চে,ট্রেন ছাড়তে আর মাত্র আধা ঘন্টা সময় আছে,নিলয় মেবিন স্টেশনের পাশের দোকান থেকে আনুসাঙ্গিক প্রয়োজনীয় জিনিষ পত্র গুলো কিনে দুজনে ট্রেনে উঠে ওদের সিটে গিয়ে বসলো।ট্রেন ছাড়ার সময় প্রায় আগত একটু পর ট্রেন স্টার্ট হলো বিকট চিৎকার দিয়ে উঠলো ট্রেন, কারণ যাবার সংকেত দিচ্ছে যাত্রীরা যে যেখানে আছে যেন তাড়াতাড়ি সবাই হুইচেল শুনে উঠে পড়ে ট্রেনে। 
স্টার্ট হয়েছে ট্রেন কাপছে যেন মৃদ ভূমিকম্পন হচ্ছে, ধীরে ধীরে ট্রেন চলতে শুরু করলো নিলয় আর মেবিন পাশাপাশি বসে আছে,নিলয় কেবিনের জানালা খুলে দিল ঝিরি ঝিরি বাতাস ওদের কেবিনে প্রবেশ করছে,মেবিন আজ নীল সেলোয়ার কামিজ পরেছে কপালে ছোট্ট একটা কাল টিপ পরেছে,অপূর্ব সুন্দর লাগছে মেবিনকে, ঝিরি ঝিরি বাতাস মেবিনের মাথার চুল গুলো এলোমেলো করছে, কখনো চুল গুলো আলতো করে ছুঁয়ে দিচ্ছে কপাল চোখ মুখ কখনো বা গ্রীবা।মেবিনের চোখে মুখে আজ একটা আনন্দের ঝিলিক বয়ে যাচ্ছে মনে হয় কিছু পাওয়ার প্রাপ্তির এ ঝিলিক,নিলয় অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে মেবিনের দিকে।
মেবিন নিলয়কে বলল,কি দেখছো অমন করে,নিলয় বলল,তোমাকে দেখছি কাক পাখি।
মেবিন বলল,মনে হয় কখনো দেখনি আমাকে,নিলয় দুষ্টমির হাসি হেসে বলল,না আজ প্রথম দেখছি।
মেবিন বলল,তাই নাকি?তাহলে এতদিন ধরে কাকে দেখেছো?তোমরা ছেলেরা না এমন।
নিলয় মেবিনের হাতটা হাতে নিয়ে বলল, এতদিন ধরে দেখেছি মেবিন নামের একটি মেয়েকে কিন্তু আজ দেখছি আমার স্বপ্নের এক রাজকন্যাকে,সত্যি তুমি অপূর্ব সুন্দর। মেবিন লজ্জায় লাল হয়ে গেলো এমন লজ্জা সে কখনো পাইনি আজ কেন এত লজ্জা লাগছে মেবিন জানে না।নিলয় মেবিনের গ্রীবা স্পর্শ করলো এবং আরো কাছে টেনে নিলো,মেবিন নিলয়ের কাঁধে মাথাটা রাখলো,রাখার পর মেবিনের কাঁধে মনে হল এ কাঁধ কত নির্ভাবনার কতটা প্রশান্তির তা আজ যেন অনুভব করছে মনে মনে।
হঠৎ নিলয় মেবিনকে ছোট্ট করে একটা টোকা দিয়ে আদর করে বলল,এই কাক পাখি দেখো দেখো বাইরে কত অপূর্ব সুন্দর প্রকৃতি কত রূপ যেন দিগন্ত বেষ্টনী দিয়ে ঘিরে রেখেছে সুবজ অরণ্য।
মেবিন দেখ ঐ দেখ তোমার প্রিয় কাশফুঁল মেবিন সেদিকে তাকালো,তখন ট্রেন আপন গতিতে চলছে একের পর এক দৃশ্যপট পরিবর্তন হচ্ছে মাঠ আর মাঠ এ যেন স্বর্গ উদ্যানের বুকে চিরে ওদের কক্সবাজার যাত্রা।
সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে ট্রেনও ছুটছে, দুজন প্রেমিক প্রেমিকা পাশাপাশি বসে অপলক চেয়ে আছে পরস্পরের দিকে, নিলয়ের মনে হলো মেবিনকে আজ প্রথম আবিস্কার করেছে,নিলয় মেবিনকে বলল,এই চুপ কেন কিছু বলো,মেবিন বলল,জানো নিলয় আজ খুব ভালো লাগছে তোমাকে কাছে পেয়ে।
নিলয় বলল,আমারও যে কত ভালো লাগছে তোমাকে বোঝাতে পারবো না,তোমাকে এত আপন করে কাছে পাবো ভাবিনি কখনো,মেবিন নিলয়কে বলল,তোমার মনে আছে চারুর কথা,নিলয় বলল,হ্যাঁ মনে আছে গত বছর তো তোমাদের বাসায় বেড়াতে আসলো তা হঠাৎ চারুর কথা জিজ্ঞেস করলে কেন।মেমিন বলল,চারুর জীবনে একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেলো জানি না চারু এখন কতটা মানুষিক ভাবে সুস্থ আছে,নিলয় বলল,কাক পাখি তুমি ফোনে তো কথা বলো চারুর সাথে কিছু বুঝতে পারো না ওর মনের অবস্থা,মেবিন বলল,মনে হয় সয়ে গেছে ওর কষ্ট গুলো,কক্সবাজার যাচ্ছি শুনে মা বলে দিয়েছে চারুকে যেন ফিরার পথে সাথে করে নিয়ে আসি,নিলয় বলল,ভালোই হবে চারু আমাদের সাথে আসলে।
ট্রেন ছুটছে সবুজ মাঠের বুক চিরে নিলয় মেবিনকে টোকা দিয়ে বলল,এত সুন্দর দৃশ্য আগে কখনো ট্রেনে বসে দেখা হয়নি ঐ সবুজ অরণ্য,ওরা যেন আমাদের সাথে কক্সবাজার যাচ্ছে,মেবিন সেদিকে তাকিয়ে বলল,সত্যি সুন্দর কিন্ত তুমি ইদানীংকাল খুব ফাজিল হয়ে যাচ্ছো।
নিলয় বলল,কি রকম ফাজিল,মেবিন হাহা করে হেসে উঠলো তারপর বলল,ঐ সবুজ অরণ্য আমাদের সাথে কক্সবাজার যাচ্ছে বলে আবার হাসলো।
নিলয় মেবিনের একটু চোয়াল টেনে বলল,বুঝলাম কাক পাখি তবে খারাপ বলেছি কি?মেবিন বলল,মোটেও না একটুও খারাপ বলোনি তবে জানো আমি মা"কে তোমার কথা সব বলেছি, মা তোমাকে নিয়ে যেতে বলেছে আমাদের বাড়ি,এবার কক্সবাজার থেকে ঘুরে এসে তোমাকে নিয়ে যাবো আমাদের বাড়ি।
নিলয় মনে মনে খুশি হলো আবার ভয়ও পেলো,মেবিনের মা যদি পছন্দ না করে তাকে দেখে,তখন কি হবে নিলয় যখন মনে মনে ভাবছে কথা গুলো তখন মেবিন বলল,কি ভাবছো চুপচাপ,মেবিন বলল,নিলয় জানো শীত শীত লাগছে এখন,নিলয় মেবিনকে আরো কাছে টেনে নিয়ে বলল,আমাকে জড়িয়ে ধরে বসো তাহলে শীত চলে যাবে,মেবিন বলল,খুব দুষ্ট হয়ে গেছো ইদানীং তাই না!তখন ট্রেন দুর্বার গতিতে ছুটছে কক্সবাজার অভিমুখে।


চলবে....

শামীমা আহমেদ /পর্ব ৫২




শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত (পর্ব ৫২)
শামীমা আহমেদ 

খুব সকাল সকালই রাহাত অফিসের উদ্দেশ্যে  বেরিয়ে গেলো। যাবার সময় চোখের ভাষায় শায়লাকে বুঝিয়ে গেলো আজ অফিসে গিয়েই শিহাব ভাইয়ার সাথে কথা বলবে।শায়লা একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে স্বস্তির সম্মতি প্রকাশ ঘটালো।ডাইনিংয়ে মায়ের সাথে শায়লা নাস্তা সেরে নিলো।মায়ের অভিব্যক্তিতে বেশ বুঝা যায় মনের ভেতর  অনেক প্রশ্ন জমা।কিন্তু শায়লার কাছে তার কিছুই জানতে চাইল না। শায়লাও আগ বাড়িয়ে কিছুই বলছে না।সবকিছু রাহাত, শিহাব আর সময়ের উপর ছেড়ে দিয়েছে।  শিহাব তাকে বিশ্বাস রাখতে বলেছে আর রাহাত তাকে আস্বস্ত করেছে।এখন সময়ই সব ফায়সালা করবে।
শায়লা পারতপক্ষে মায়ের মুখোমুখি হয় না।পাছে মা আবার কি শুনতে কি শুনবে, বয়স হয়েছে, এতটা কঠিন সিদ্ধান্ত মা মানতে পারবে কিনা আর এর সাথে তো রুহি খালাকে মোকাবেল করাও বিশাল এক  ভাবনার ব্যাপার!
দরজায় কলিংবেল হলো।শায়লা এগিয়ে গেলো।বুয়ার আগমন।পেছনে ইন্টারনেট বিল নেয়ার জন্য ছেলেটি দাঁড়িয়ে। ছেলেটির নাম মাসুদ।প্রতিমাসেই বিল নিয়ে যায়। খুবই ভদ্র গোছের ছেলেটি,স্কুল পড়ুয়া বয়সী,তবুও এই বয়সে কাজ করছে।বুঝা যায় ভালো ঘরের সন্তান নিশ্চয়ই অর্থাভাবে এই কাজ করা।শায়লা ঘরে গেলো বিলের টাকা আনতে।ফিরতেই এরই মাঝে রুহি খালার প্রবেশ ঘটলো।তাকে ঠেকাবার সাধ্য কার? অবশ্য শায়লারা কখনোই সেটা চায় না।ভাড়াটিয়া হলেও খুবই বিপদের আপনজন এই রুহি খালা।
শায়লা বেশ বুঝতে পারছে আগমনের হেতু! চোখে মুখে রাজ্যের প্রশ্নের ভীড়।মাকে তো আগে থেকেই সতর্ক করা আছে। দুজনেই ডাইনিং টেবিলে বসলো।মনে হচ্ছে দ্বিপাক্ষিক কোন আলোচনা শুরু হবে!কাজের বুয়া মরিয়মের মায়ের ঘর ঝাঁট দেয়া চলছে। কেমন আছো মরিয়মের মা? ডাইনিং এ আসতেই রুহি খালার জিজ্ঞাসার  জবাবে কথার তুবরী ছুটলো যেন! এক সেকেন্ড মনে হয় দশটা কথা বলে ফেলে!
--কেরুম আর থাকুম খালা? গরীবের ঘরে মাইয়া হইলো গলার কাঁটা গিলাও যায় না বাইরও করন না। পোলা পোলা কইরা চাইর চাইরটা মাইয়া হইছে।এই শেষ বয়সের পোলা কবে বড় হইব,সংসারের হাল ধরব? বড় মাইয়াডা ডাঙ্গর হইতেই বস্তির মালিকের পোলার জ্বালায় রাহন যাইতে ছিল না। তাড়াহুড়া কইরা বিয়া দিলাম।জামাই সিএনজি চালায়।বছর ঘুরতেই বাচ্চা পেডে।এহন শুনি জামাইয়ের আগে একটা বিয়ে আছে। সেহানে দুইখান পোলাপান। আমার মাইয়া আর তার সংসার করবো না।আইয়া পড়ছে।
ঘরে এত খাওনের মুখ,আবার নতুন আরেকজন লইয়া আইলো।স্বামী  রিকশা চালায়া আর কয় ট্যাকা আনে? আপনেগো বড়লোকের ঘরে মাইয়া বিয়া না দিলেও ক্ষতি নাই, বিয়া দিলেও বাপের বাড়ি থাকার কোন অসুবিধা নাই।আমগো হইছে পুড়া কপাল।মরিয়মের মায়ের বিশাল এক লেকচার গিলতে হলো সবাইকে।যদিও এর প্রতিটি বর্ণই বুকের ভেতর কষ্ট থেকে বেরিয়ে আসা।শায়লা বুঝে নিলো বিয়ের পর সেওতো বাপের বাড়ি থাকছে এটাও তো একটা চিন্তার বিষয়। মরিয়মের মা রান্নাঘরে ব্যস্ত হলো। এবার রুহি খালা মুখ খুললেন।যা সে মনের ভেতর বহন করে এনেছেন।তবে তা যে শায়লার জন্য সুখকর কিছু নয় তা শায়লা বুঝতে পেরেছে।সেদিন শায়লাকে শিহাবের বাইক থেকে নেমে আসাটাতো সে সহজভাবে নেবেনা যেখানে তার সকল তত্ত্বাবধানেই শায়লার বিয়ে হয়েছে।রুহি খালা শায়লার মাকে খুবই সম্মান করে।তাই বেশিকিছু বলে ঘাটালো না।শুধু জানালো এই মাসের পঁচিশ তারিখে নোমান সাহেব দেশে আসছেন।দশদিন থাকবেন।শায়লার যাবতীয় কেনাকাটা গোছগাছ করে তিনি নিজের সাথে করে নিয়ে যাবেন।শায়লা যেন নোমান বাবাজির সাথে কথা বলে।বছর ঘুইরা আসলো বিয়ার। নিজের সংসারে যাওয়াতো উচিত।কথাগুলো বলেই রুহি খালা বিদায় নিলো।শায়লা দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলো তবে ভেঙে পড়লো না।রাহাত আর শিহাব শায়লার অনেক মনোবল বাড়িয়ে দিয়েছে।শায়লা হিসেব করে নিলো আজ পাঁচ তারিখ পঁচিশ হতে আর বিশ দিন।শায়লা মোটেও ভীত নয়।
শিহাবকে একটা কল দিতে হবে।কাল রাতে যে অবস্থা করেছিল সে!! শায়লা হাত বাড়িয়ে মোবাইলটা কাছে আনলো।

একটা দারুন ঘুম দিয়ে  বেশ এক সুখকর অনুভুতিতে শিহাবের ঘুম ভাঙল। মন থেকে সব কালো মেঘ সরে গেছে। শায়লা তাকে মনের শক্তি যুগিয়েছে।আহ! শায়লা, আমার জীবনে তুমি না এলে আমি বোধহয় বাঁচতেই পারতাম না। শিহাব চোখ মেলেই মোবাইলে শায়লার ছবিটা অনেকক্ষন তাকিয়ে দেখলো। নিবিষ্ট মনে শায়লার মেরুন রঙা ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে রইল।শায়লার ঠোঁটেই যেন তার সব আবেদন জমা হয়ে আছে আর কাজল কালো চোখ দুটোই যেন কতকালের তৃষ্ণা। হঠাৎই শিহাবের দৃষ্টিভ্রমে ছবির শায়লা যেন কথা কয়ে উঠলো!
কি দেখছো অমন করে?
শিহাব চমকে গেলো!!৷ নিমেষেই মুচকি হেসে বললো,
তোমাকে,,
আমাকে এত দেখার কি আছে?
বাহ! তুমিই তো ছবিটা পাঠিয়েছো দেখবার জন্যে,আমি দেখবো না?
ও, আমি পাঠিয়েছি বলেই দেখছো? নয়তো....ঠিকাছে ছবি ফেরত পাঠিয়ে দাও।
শিহাবের এবারের মনোকথন যেন আহ্লাদে বলে উঠলো,শায়লা, তুমি ছবি না পাঠালেও তোমার মুখটা সর্বক্ষণ আমার মনের ভেতরে গাঁথা। যতক্ষন জেগে থাকি প্রতিটাক্ষণ দিব্যদৃষ্টিতে তোমায় দেখি। ঘুমকেও দূরে ঠেলে রাখি তোমায় ভাববো বলে। যখন দীর্ঘক্ষণ বাইক চালাই সামনে হয়তো পথ দেখে চলছি কিন্তু আমার মনের আয়নায় পুরোটাই  তুমি,মনে হয় তুমি আমার সাথেই চলছো,আমার পেছনেই বসে,আলতো করে আমায় ছুঁয়ে আছো।তোমার অনুভুতি আমার বাইকটাকে উড়িয়ে নেয় পঙখীরাজ ঘোড়ার মত।নিজেকে মনে হয় স্বপ্নপুরীর ঘোড়সাওয়ার আর দৈত্যবন্দিনীর কাছ থেকে ছিনিয়ে আনা তুমি আমার রাজনন্দিনী! আহ! শায়লা কেমন করে তুমি আমার হলে?
সে এক বিস্ময়!
আমার ঘুম ভাঙানিয়া! আমার কৃষ্ণ যামিনী!

এমনই সুখের ভাবনায় ডুবে থাকলেও  শিহাব আচমকা শায়লার কড়া শাসনের মাঝে  পড়লো! যেন ট্রাফিক সার্জেন্ট  আইন ভাঙার অপরাধে থামিয়ে দিচ্ছে!সহসাই শায়লার কল এলো।
--ঘুম থেকে কি জেগেছো রাজকুমার?আজ অফিসে যেতে হবে না?
আহ! শায়লার এমন বেরসিক প্রশ্নে শিহাবের সম্মোহনী অনুভবটা ছুটে গেলো! নাহ! এরা প্রেমিকা থাকাকালীনই ভালো থাকে, বউ বউ ভাব  হলেই যত আনরোমান্টিক হয়ে যায়।তবে শিহাব খুব গোপনে  সিদ্ধান্ত নিলো  শায়লার জন্য চিরকালই সে রোমান্টিক মুডে থাকবে। 
---হ্যাঁ,এইতো উঠছি।শিহাবের জবাব।আর যাচ্ছি বাবা অফিসে যাচ্ছি। আর শুনে রাখো নন্দিনী, অফিসটা কিন্তু আমারই,কারো অফিসে কিন্তু আমি চাকর নই,আমার যখন ইচ্ছা আমি যাবো,,বুঝলেন ম্যাডাম!! বলেই শিহাব, ওকে,বাই বলেই ওয়াশরুমের এমারজেন্সি কলে এক ভোঁ দৌড় দিলো!
অফিসের জন্য তৈরি হয়ে  শিহাব শায়লাকে মেসেজ পাঠালো,শায়লা,তুমি আমার ফিরে পাওয়া চাঁদ।তুমি আমার মায়া ধরানো নিশুতি রাত!খুব ভালো থেকো।
আহ! জরুরি কথাটাই তো লেখা হলোনা, শিহাব আবার মোবাইল  অন করলো,লিখলো,
তোমাকে নিয়ে  শুক্রবার জিগাতলায়  যাচ্ছি,রাহাত আর মায়ের অনুমতি নিয়ে রেখো। বাই।
মূহুর্তেই শায়লার কাছে মেসেজ পৌঁছে গেলো।শায়লা মেসেজ দেখে মিটিমিটি হাসলো।কোন রিপ্লাই দিলো না, নয়তো অফিস যেতে দেরি হয়ে যাবে।শায়লার চোখে কল্পনায় সে শিহাবকে ভেবে নিলো। নিশ্চয়ই সকালের ফ্রেশ লুকে শিহাবকে অপূর্ব লাগছে।আর সানগ্লাস লাগিয়ে যখন বাইক চালাবে কত মেয়ে যে হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরবে। পরক্ষণেই শায়লা ভাবলো, আচ্ছা আজ  একটা ছবি চাইবো। নয়তো বলবো, অফিসেই একটা সেল্ফি তুলে পাঠাও!
শায়লার ছেলেমানুষিতে সে নিজেই হেসে পরক্ষনেই  ম্রিয়মাণ হয়ে গেলো।এত সুখ এত স্বপ্ন কি আমার জীবনে সত্য হয়ে ধরা দেবে? শায়লার বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠলো।
লাঞ্চের আগে আগেই রাহাত শিহাবকে কল দিলো।এ নিয়ে প্রায় অনেকদিনই কথা হলো শিহাবের সাথে কিন্তু দুজনার আজো দেখা হয়নি।কী অদ্ভুত এক যোগাযোগ। তবে যাই হোক শিহাবকে কিন্তু রাহাতের বেশ ভালো লেগেছে। শুধু আফসোস হয়  আর কিছুদিন আগে কেন আপনি আপুর জীবনে এলেন না?
কেন পরিচয়টা হতে এত দেরি হয়ে গেলো।কিন্তু তবুও মন্দের ভালো যে,আপু এমন একটা সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে।চিরকালইতো ইন্ট্রোভার্ট টাইপের আপু।
শিহাবের সাথে রাহাতের কথা হলো।দুজনেই মার্জিত আর ভদ্রতা প্রকাশে চূড়ান্ত দেখালো।দুজনার মনে একটি কমন বিষয় শায়লা।শায়লাকে সম্মান জানাতে শিহাবের সর্বোচ্চ চেষ্টা আর  আপুকে খুশি করতে যেন রাহাতের প্রানান্তকর ইচ্ছা।
শিহাব জানালো পরশুদিন শুক্রবার তোমার আর মায়ের অনুমতি মিললে আমি শায়লাকে আমাদের বাসায় নিয়ে যেতে চাই।শায়লার কাছে জেনেছো কিনা আমার চার বছরের একটি ছেলে আছে নাম আরাফ।
রাহাত অকপটেই জানালো, হ্যাঁ,আপুর কাছে জেনেছি।
শিহাব বলে চললো, শায়লাকে আমার বাবা,মা, ভাবী আর আমার  আরাফ বাবুর সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে চাই।যদি এতে না তোমাদের কোন আপত্তি থাকে।আর শায়লাই আরাফের মা,আমি আমার ছেলেকে সেটাই জানাবো। আরাফ সারাজীবন শায়লার কাছে মায়ের আদর পাবে আমার শুধু এটাই চাওয়া।
শিহাবের কথা খুবই স্পষ্ট এবং গোছানো। রাহাতের খুবই ভালো লাগে।তাইতো শিহাবকে দেখার জন্য রাহাতও বেশ উদগ্রীব হয়ে উঠলো!  
শিহাব জানালো,নিশ্চয়ই দেখা করবো।আমারতো একই এলাকায় থাকি।তুমি চাইলে যে কোনদিন সন্ধ্যার পর আমি তোমার সাথে দেখা করতে পারি।রাহাত এবার একেবারে পুরোপুরিই শিহাবের ভক্ত অনুরক্ত হয়ে গেলো।দুজনেরই সিদ্ধান্ত হলো বৃহস্পতিবার রাতে দেখা হচ্ছে।জায়গাটা পরে শিহাব জানিয়ে দিবে। 
চমৎকার একজন মানুষ আমাদের পরিবারের একজন হয়ে উঠছেন! রাহাত খুবই আনন্দিত হয়ে উঠলো! আপুর কাছে শুনেছে সে দেখতেও নাকি সালমানখানের জুরুয়া ভাই!! রাহাত মনে মনে পুলকিত হলো বেশ! সে শিহাবের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে অফিসের কাজে মনযোগী হলো।ওপ্রান্তে
শিহাব ফোন রাখতেই রিশতিনার রাতের সেই নম্বরটা থেকে কল এলো। হয়তো গুলশানে সে শিহাবেরই অপেক্ষায়। শিহাব কিছুটা কি যেন ভেবে নিয়ে রিশতিনার কলটা রিসিভ করলো ।


চলবে....