১৫ ডিসেম্বর ২০২১

শামীমা আহমেদ/পর্ব ৩২





শায়লা শিহাব কথন
অলিখিত শর্ত( পর্ব ৩২)
শামীমা আহমেদ 

নায়লার অনাগত সন্তানের আগমনের খবরে রীতিমতো একটনি ট্রাকের সমপরিমাণ জিনিসপত্র  কেনাকাটা করা হয়েছে। মা যেভাবে যা চেয়েছে, এছাড়া শায়লাও ইউটিউব দেখে দেখে মাকে অনেককিছু চিনিয়েছে।আজ সবই কেনা শেষ হলো। আগামীকাল ছুটির দিন। মা রাহাতকে নিয়ে, নায়লাকে দেখতে, নায়লার বসুন্ধরার বাসায়  যাবে। যদিও মাত্রই নায়লার সুখবরটি এসেছে তবুও, মেয়েদের সন্তান হবার খবর বাপের বাড়ি পৌছালে তখন অনেক দায়িত্ব পড়ে যায়।মা বেশ খুশি মনে আজ ঘুমাতে গেলো।কাল কোন শাড়িটা পরে যাবে সেটা যেন শায়লা গুছিয়ে দেয় মা কোমল অনুরোধ রাখল।অনেক কিছু রান্না করেও নেয়া হচ্ছে।মেয়ের এখন এমন সময় কখন কি খেতে চায়,কখন কেমন লাগে,আর জামাইয়ের প্রিয় ভুনা গরুর মাংস , পিঠা পায়েশ,সে এক বিশাল আয়োজন!মায়ের চোখে মুখে সে কি তৃপ্তির হাসি! আর মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে পেরে শায়লাও ভীষণ আনন্দিত! যদিও ভেতরে তার কী বয়ে যাচ্ছে সেটা বাসার কেউই বুঝতে পারছে না। সবকিছুকেই চেপে রেখে শায়লা স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছে। সে খুব করেই  চাইছে,আর যেন মনে  শিহাবের ভাবনা না আসে।আর এলেও সেটাকে প্রশয় না দেয়া।
মা  কাল দুপুরের পর রাহাতকে নিয়ে নায়লার বাসায় যাবে।নায়লার শ্বশুরবাড়ি অবস্থা এমনিতে অনেক ধনী হলেও শায়লাদের পরিবারটিকেও তারা খুবই শ্রদ্ধার চোখে দেখে।
শায়লা রাতের খাবারের সব কিছু গুছিয়ে নিজের ঘরে এলো।কাল রাহাতের অফিস নেই।সকালে একটু ঘুমানো যাবে।শহুরে মানুষদের খুবই কাঙ্ক্ষিত এই ছুটির দিনটি।
শায়লার মনে এক ঝলক শিহাবের ভাবনা ভেসে এলো। কাল নিশ্চয়ই শিহাব জিগাতলার বাসায় যাবে মা বাবা কে দেখতে। ছোট্ট আরাফ সারা সপ্তাহ বাবার জন্য অপেক্ষায় থাকে। সবাইতো যার যার কাজ নিয়ে ব্যস্ত।কেবল শায়লাই একাকী কাটাবে ছুটির দিনটি।আলাদা করে আর দিন উদযাপনের কিছু নেই তার জীবনে।
সেদিনের কথায় 
শায়লা বেশ বুঝে নিয়েছে শিহাবের বক্তব্য  বা শিহাব যা বুঝাতে চেয়েছে। যদি এমনি ভাবনা হবে তবে কেন এতো আবেগে কাছে আসা। সুখ দুঃখের কথা শেয়ার করা।অচেনা অন্য একজন মানুষকে এতটা আপন ভাবা! 
শিহাবের প্রতি শায়লার মনে বেশ রাগ জমা হলো। তাইতো এমনটি ভাবতে কোন দ্বিধা কাজ করলো না।সে ভেবে নিলো অকপটে, 
আসলে এরা এমনি হয়, কিছুদিন কোন মেয়ের কাছাকাছি এসে তারপর একটা অজুহাত দেখিয়ে দূরে সরে যায়।আর আবেগী মেয়েগুলোও এদের কথাকে বিশ্বাস করে মনের খুব গভীরে জায়গা দিয়ে ফেলে। তারপর যা হবার তাই হয়। আঘাতের কষ্ট বুকে নিয়ে নিজেকে তিলে তিলে শেষ করে। শায়লা মনকে শক্ত করলো।সে শিহাবের স্মৃতিগুলো সব ভুলে যেতে চাইছে।ভেবে নিল সে হয়তো কোন ভুল পথে হাঁটছিল।ভালোই হলো অনেক বড় কোন  ভুল করবার আগে শিহাব তাকে সচেতন করে দিলো। যদিও এদিকটায় ভাবতে গেলে শিহাব একটি দায়িত্ববান মানুষেরই পরিচয় দিয়েছে।কিন্তু দিনের পর দিন সে যেভাবে শায়লার সাথে যোগাযোগ রেখে চলছিল তাতে শায়লা কি বুঝে নিবে?তার মনটাতো  কাদামাটির মত নরম ছিল।শিহাবইতো তাকে প্রতিমা গড়ে পুজার আসনে নিজেকে বসিয়েছিল। তার সাথে দেখা করা, সময়ে অসময়ে ফোন করা,শায়লাদের পরিবারের সবার খোঁজ খবর রাখা,শায়লার অতীতের সবকিছু জেনেও মনে ভেতর আশার প্রদীপ জ্বালানো,তাহলে আজ সবই মিথ্যা হলো। 
শায়লা তার অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক ভাবলো।ঘরের বাতি নিভিয়ে বিছানায় শুয়ে আপন মনে ভেবে চলেছে। শায়লার  কোথা থেকে জীবনটা শুরু হলো আর আজ কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে। কেবলি হোঁচট খাওয়া আবার দাঁড়িয়ে পথ চলা। নিজের জন্য কিছুই ভাবেনি।পরিবারের সুখটাকেই বড় করে দেখেছে। রাহাত আর নায়লাকে মানুষ করেছে।আজ নায়লা সুখের সাগরে ভাসছে আর রাহাত জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে রুবানাকে নিয়ে  নতুন জীবনের স্বপ্নে বিভোর।হঠাৎ বুকের মাঝে এক বিশাল শূন্যতা অনুভব করলো শায়লা।ভীষণ একাকী লাগছে নিজেকে।বারবার শিহাবের মুখটা ভেসে উঠছে। মনে হচ্ছে শিহাব এখন তার পাশে থাকলে খুব ভালো লাগতো।নানান ভাবনায় শায়লা অস্থির হয়ে উঠল।অন্ধকারে সে মোবাইলটা হাতরে বেড়ালো।নাহ! কোথাও খুঁজে পাচ্ছে না।সে এখুনি শিহাবকে কল দিবে।এক্ষুনি চলে আসতে বলবে। শায়লার বিছানায় ছটফট করতে লাগলো।সিলিং ফ্যানটি ফুল স্পীডে চলছে। শায়লার চুলগুলো এলোমেলো  হয়ে উড়ছে।শায়লা বেশ ঘামছে।পা দুটো বারবার বিছানায় আছড়ে পড়ছে।শায়লা গোঙানির মত শব্দ করে কেবলই  শিহাবকে নাম ধরে ডেকে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে সে শিহাবকে দেখতে পাচ্ছে।সেই যে সেই প্রথম দেখার দিনের মত পরনে নীল জিন্সের শার্ট, চোখে রোদচশমা,শিহাব বাইকের স্টার্ট বন্ধ করছে।শায়লা নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে।প্রচন্ড বেগে তার হার্ট বিট করছে।হয়তো পালস বেড়ে গেছে।শায়লা চোখ দুটো সেই যে বন্ধ হয়েছে আর খুলতে পারছে না।বন্ধ চোখেও সে শুধু শিহাবকেই যেন দেখতে পাচ্ছে।শায়লা নিজেকে আর সামলে রাখতে পারলো না।একসময় নির্জীব হয়ে বিছানায় স্থির হয়ে রইল। হাতের মুঠোয় মোবাইলটা ধরা ছিল, মনে হচ্ছে এই মোবাইলটাই যেন শিহাবের প্রানভোমরা।শায়লা তাকে শক্ত করে ধরে রেখেছে।কিছুক্ষন পর ঘরটা একেবারে নিঃশব্দে ঢেকে গেলো। দেয়াল ঘড়িতে  তখন রাত তিনটা বাজছে।



চলবে...

হাজেরা কোরেশী অপি






ত্যাগের বিনিময়ে


তব তরে ঋদ্ধ আমি
ওগো জন্মভূমি,
দূর প্রবাসে বসত করে
তোমার চরণ চুমি।

কল্প রাজ্যের গল্পতো নয়
তোমার বিজয় কথা,
কত প্রাণের বিনিময়ে
পেলে স্বাধীনতা।

যাদের খুনের বিনিময়ে
বিজয় এলো দেশে,
অনায়াসে জীবন বিলি
করে দিলো হেসে।

তাদের অর্জন কতটুকু
করছি সম্মান বলো?
হিসেব-নিকেশ করতে বসি
দল বেঁধে আজ চলো।

ওদের ত্যাগের বিনিময়ে
বলছি মনের মতো,
নিত্যদিনই লিখছি কাব্য
বাংলা বোলে যত।

বৃথা যেতে দিওনা গো
ওদের আত্মাহুতি,
সোনার বাংলার দিকে দিকে
ছড়াও সবে জ্যোতি।

নইলে কেহই পাবোনা ছাড়
জবাব দিতেই হবে,
ওদের কান্নায় চারিপাশটা
ভারী হয়েই রবে।

মোঃসেলিম মিয়া 






🇧🇩"১৬ ডিসেম্বর




পূর্ব বাংলা পশ্চিম বাংলা ভূখন্ড দুই নাম,
ভাষাগত জাতি বিভেদ পর্বতের সমান। 
চাকরি বাকরি উচ্চ আসন
সব কিছুতেই পেশির জোর। 
চাপিয়ে দিতে উর্দু ভাষা নিজের মত করে রুল!
শিল্প নীতি শ্রম নীতি সব কিছুতেই খুটির জোর, 
রাজনীতিতে বেজায় চাল 
ভোট ডাকাতির হুলুস্থুল! 
পূর্ব বাংলার উন্নয়নে 
সব কিছুতেই স্থবির রথ,
কথায় কথায় শোষণ পিড়ন 
রক্তে ভেজায় রাজপথ! 
স্বাধীনতার ডাক পেতে তাই
 শেখ মুজিবের উদ্ভব। 
বজ্রকন্ঠে দিলেন ডাক স্বাধীনতার মর্ম বাণী, 
ঝাঁপিয়ে পড়ে আপামর জনতা হটিয়ে দিলেন পাকবাহিনী। 
মুক্তি বাহিনী সম্মুখ যুদ্ধে গড়লেন প্রতিরোধ, 
পিছপা হয়নি জীবন দিয়ে নিয়েছেন প্রতিশোধ। 
বুকের মাঝে মাইন বেঁধে 
উড়িয়ে দিয়েছেন ট্যাংক,
পাক সেনার দল নতজানু 
গুটিয়ে নিয়েছে ভয়ে ঠ্যাং।
নয় মাস যুদ্ধ করে বিজয় যখন ঘরে,
মা বোনদের ইজ্জত বিলিন পাক-সেনাদের তরে।
ত্রিশ লক্ষ নিরীহ প্রাণ 
বুলেটে ক্ষত বিক্ষত!
তাজা রক্তে ভাসিয়ে পথ
হয়নি তবু অনুতপ্ত। 
পূর্ব বাংলা হয়েছে স্বাধীন পেয়েছি  স্বাতন্ত্র মানচিত্র। 
লাল সবুজের পতাকা এখন তরতরিয়ে উড়ে, 
১৬ডিসেম্বর বিজয়ের আনন্দ তাইতো ধ্বনিত প্রতি ঘরে!!!

মমতা রায় চৌধুরী/৬৯






উপন্যাস 
টানাপোড়েন ৬৯

প্রতিবন্ধীর স্বপ্ন

মমতা রায় চৌধুরী



মনোজের এতবার ডাকাতে রেখা একটু বিরক্তিস্বরে এসে বলল" কেন গো এত ডাকছিলে কেন? কি হয়েছে ?কি চাই?'
মনোজ যেন হঠাৎ করে রেখাকে এভাবে কথা বলতে দেখে  একটু বিস্মিত হয়।মনোজ ভাবতে থাকে এ  কোন রেখাকে দেখছে হঠাৎ করে  রেখার ভিতর এমন কি রেখাপাত করলো ?এমন কি দ্বন্দ্ব হলো? যার জন্য এভাবে কথা বলছে?"
রেখা বলল 'হ্যাঁ, করে মুখের দিকে তাকিয়ে কেন বল?"
মনোজ বললো 'না মানে তোমার ফোন?"
রেখা বললা" আমার ফোন কি হয়েছে?'
মনোজ বলল'তোমার ফোন বেজেছে কয়েকবার।'
রেখা বলল 'কে করেছে?'
মনোজ বলল 'আমি দেখি নি।'
রেখা বলল ' তুমি কি ফোনটা কে করেছে দেখলে না?
রেখা একটু গজ গজ করতে করতে ফোনটা ঘেটে দেখল কাকিমার মিস কল হয়ে আছে আর রিম্পাদির 
আরেকটা অচেনা নম্বরের মিসকল হয়েছে।
মনে মনে ভাবছে এই নম্বরটা তো ওর ফোনে সেভ করা নেই ।কে করতে পারে?
মনোজ  বললো  'কি ব্যাপার ফোনটা হাতে নিয়ে মিসকল দেখে এত চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়লে?'
রেখা বলল 'দুটো নম্বর তো চেনা কিন্তু আর একটা নম্বর না আননোন নম্বর?'
মনোজ বলল 'তোমার চেনা কেউ হয় তো। না হলে এত বার মিসকল কেন করবে বলো?' 
রেখা বলল 'আননোন নম্বরটাই বেশি বার রিং হয়েছে। কিন্তু ফোন করব কিনা বুঝতে পারছি না? কি যে করি?'
মনোজ বললো 'একবার করে দেখো যদি কেউ তোমার চেনা কেও হয় ।হয়তো  নম্বরটা চেঞ্জ করেছে এমন হতো হতে পারে?'
রেখা বললো 'তাহলে করেই দেখি? না কি?'
মনোজ ঘাড় নেড়ে  সম্মতি জানালো।
রেখা নাম্বরটা ডায়াল করল********৩২
রেখা ফোন নম্বরটা ডায়াল করার সঙ্গে সঙ্গে রিং হলো
'আমি শুধু রইনু বাকি, যা ছিল গেল দূরে... ।'রেখা মনে মনে ভাবলো এত সুন্দর একটি গান কে হতে পারে ?নিশ্চয়ই তার মনটাও খুব সুন্দর। ভাবতে ভাবতে হঠাৎ একজন সুন্দর সুরেলা কণ্ঠে বলল' 'হ্যালো'।
রেখা একটু হকচকিয়ে গলায় বলল' হ্যালো আমার এই নম্বর থেকে ফোন এসেছিল?'
অপরিচিতা বলল'ম্যাডাম আমি নির্মলা বলছি।'
রেখা একটু অবাক হয়ে  বললো' কোন নির্মলা?'
নির্মলা বলল 'আমি আপনার প্রতিবন্ধী ছাত্রী নির্মলা।'
রেখা একটু মনে কষ্ট পেল ।তারপর বলল কিছু মনে করো না ,আসলে আমি চিনতে পারি নি তো তাই?'
নির্মলা বলল 'না, না ম্যাম ।এত এত মেয়ের মাঝখানে কি সবার কথা মনে থাকে?'
রেখা বললো' এখনও কিন্তু আমার মনে আছে ।তোমার অপরিসীম ধৈর্য, তোমার একাগ্রতা, আর মনোবলের জন্য। আসলে আর একজনের নাম ও তো নির্মলা ছিল ।এজন্য একটু জিজ্ঞেস করেছি গো, কোন নির্মলা? কষ্ট পাও নি তো?'
নির্মালা বলল' না ,না ,ম্যাম ।আপনার কথায় আমি কষ্ট পাব ?সেটা কখনো হয়। আপনি আমার জীবনে কি ?সেটা তো শুধু আমিই জানি।'
রেখা বলল 'না ,না , কি এমন করেছি আমি বলো?'
নির্মালা বলল 'সেটা তো আপনার মহানুভবতা ম্যাম।'
রেখা বলল'নির্মলা ,আমাকে ওই আসনে ফেলো না প্লিজ।'
নির্মালা  এবার হেসে বলল' প্রণাম নেবেন ম্যাম। আর আশীর্বাদ করুন জীবনে যেন অনেক বড় হতে পারি ।আর মানুষের মতো মানুষ হতে পারি।'
রেখা বলল 'কি যে ভালো লাগছে তোমার ফোনটা পেয়ে ,কি বলবো তোমায় ।কিছু মনে করো না তোমার ফোনটা বেজে গেছে ,আমি ধরতে পারি নি ।আমি একটু অন্য দিকে কাজে ব্যস্ত ছিলাম তো?'
নির্মলা বলল 'না আমারও ঠিক হয় নি ।এটা আমার বোঝা উচিত ছিল কাজের টাইম। আসলে আমি একটা খবর দেবার জন্যে আপনাকে ফোনটা করেছি।'
রেখা বলল 'ও তাই?'
নির্মলা বলল' হ্যাঁ ম্যাম ,আপনি যদি না থাকতেন আজকে আমার  এই দিনটা দেখা সম্ভব হতো না।
আমি এতদূর আসতেই পারতাম না।'
রেখা বলল' আমি আবার তোমার জন্য কি করলাম?'
নির্মলা বলল 'সে তো আমি জানি। আমি অতটা অকৃতজ্ঞ নই।'
রেখা বলল 'সে আমি জানি। তুমি কি খবর দিতে চাইছো? যেটা গেস করছি সেটাই কি? তোমার কি ফাইনাল ইয়ার কমপ্লিট হল?'
নির্মলা বলল' আমি' ল' নিয়ে  পড়ছিলাম ।আমার যেটা ইচ্ছে ছিলো , সেটা পূরণ হয়েছে ম্যাম ।আমার ফাইনাল ইয়ার কমপ্লিট হল।'
রেখা বলল 'তাই বুঝি? প্রথমে তোমাকে অনেক অনেক ফুলেল শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই। সঙ্গে আমার স্নেহ ভালোবাসা আর আশীর্বাদ ।তুমি জীবনে আরো অনেক বড় হও ।কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হও। সঙ্গ
সুনামের সঙ্গে তুমি কাজ করো।'
নির্মলা বলল' থ্যাঙ্ক ইউ ম্যাম'।
রেখা বলল 'ও একদিন তুমি আমার বাড়িতে চলে এসো।'
নির্মলা বলল 'যাব ,একদিন ম্যাম ।আপনাকে তো আমায় প্রণাম করতেই হবে ।যাবো সময় করে একদিন যাবো।'
নির্মলা বলল' ম্যাম আজকে আরো অনেক বেশি কথা বলতে ইচ্ছে করছিল কিন্তু আমার একটা আর্জেন্ট কাজ এসে গেছে। আমি যার আন্ডারে প্র্যাকটিস করছি ,ওই স্যারের বাড়ি যেতে হবে।'
রেখা বলল'ও শিওর।'
নির্মলা বলল 'ফোনটা তাহলে রাখছি।'
রেখা বললো 'হ্যাঁ রাখো। ভালো থেকো। সর্বদা আনন্দে থেকো।'
হঠাৎই রেখার মনটা কেমন ফুরফুরে হয়ে গেল। ভাবতে লাগল প্রতিভা মানুষকে পরিচিতি দেয় আর সেই পরিচয় নিয়ে সমাজকে ফুলে ফলে বিকশিত করে তোলে ।সমৃদ্ধ হয় দেশ ।নিকষ কালো অন্ধকার জীবনে উজ্জ্বল আলোর বাতাবরণ তৈরি হয় । প্রতিভার মধ্যে দিয়েই সে রকম একজন প্রতিভাধারী হচ্ছে এই নির্মলা।'
মনোজ বলল 'কি গো ফোনটা কেটে কেমন যেন একটা স্বপ্নের মধ্যে চলে গেলে?'
রেখা বললো 'আজকে আমার আনন্দ করার দিন ।এত আনন্দ আমি কোথায় রাখবো ?আমি জানি না।
মনোজ বলল 'কি হয়েছে?'
রেখা বললো 'আমার একজন  প্রতিবন্ধী ছাত্রী । প্রথমে স্কুলে ভর্তি নেয়া হচ্ছিল না শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে। আমি এর জন্য ভীষণভাবে বরদি কে জোরজবস্তি করেছিলাম এবং অনেকটা লড়তে হয়েছিল বলা যায়। 
মনোজ বলল 'তাই বুঝি? জানো এই মেয়েটি
প্রতিনিয়ত লড়াই করেছে ।সেই লড়াই করার মানসিকতাকে পাথেয় করে ও লড়াকু আর সংগ্রামী হয়ে উঠেছিল।'
মনোজ বিছানায় আধশোয়া অবস্থায় ছিল এবার উঠে বসে বলল'খুবই ইন্টারেস্টিং তো? বলো তুমি এর সম্পর্কে একটু শুনি। জানতে বড় লোভ
 হচ্ছে।'
রেখা বলল'  নির্মলা  ডাক নাম নিমু। জন্ম থেকেই ওর দুটো হাত আর একটা পা অকেজো।
মনোজ বলল 'বলছ কি?'
রেখা বললো 'ঠিকই বলছি ।শুধু তাই নয় জানো তো হাত দিয়ে লিখতে পারতো না, তাই পায়ের সাহায্য নিয়ে লিখত। ৮০শতাংশ প্রতিবন্ধী ,।তাই বলে কিন্তু সহজে হাল ছেড়ে দেয় নি। '
মনোজ বলল 'সঙ্গে ছিল দারিদ্র আর আর্থিক অনটন। এজন্য স্কুলে ভর্তি নেওয়া হলেও সমস্যা হচ্ছিল। তখন আমি নিজের দায়িত্বে ওকে ভর্তি করেছিলাম ।জানো তো আমার একটা চ্যালেঞ্জ ছিল ওকে নিয়ে ।কারণ আমি জানতাম ও পারবে ,ওর ভেতরে আমি সেই আগুনটা দেখতে পেয়েছিলাম ,ওর ভেতরে একটা খিদে ছিল জানো তো?
রেখা আপন মনে কথাগুলো বলে যাচ্ছে। মনোজ কথা বলা রেখার চোখের  দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আর শুনছে।
হঠাৎ রেখা চোখ বোলাতে  বোলাতে বলল 'কি দেখছ তুমি এমন করে ?আমার কথা তুমি শুনছো না?'
মনোজ বলল' শুনছি, তুমি বলো।'
রেখা বললো 'জান ,ওর সেসময় ভর্তির টাকা ,তাছাড়া স্কুলে যে 'যাবতীয় খরচগুলো ছিল ।সেগুলো আমি  বেয়ার করতাম ।তোমাকে বলা হয় নি।'
মনোজ বলল' আমাকে বলো নি কেন? আমি বারন করতাম?'
রেখা বলল 'কি জানি কেন বললাম না তোমাকে?'
মনোজ বলল ' ঠিক আছে ।তার পরের কথা বলো?' রেখা বলল'বলছি ২০১৩ সালে তো আমাদের স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করল কৃতিত্বের সঙ্গে। তারপরে উচ্চমাধ্যমিক তারপর কলেজ ।এরপর বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন :নিয়ে পড়াশোনা করল।'
মনোজ বলল 'তারপর?'
রেখা বলল 'ও একদিন কেঁদে কেঁদে বলেছিল ও প্রতিবন্ধী বলে ওর আশেপাশে যারা ছিল প্রত্যেকেই ওর কাছ থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল ।এমন কি পড়াশোনার ব্যাপারেও স্থানীয় পঞ্চায়েত থেকে শুরু করে ব্লক ,প্রশাসন কেউ  বিন্দুমাত্র কোন সহযোগিতা করে নি ।তারপর একদিন আমার কাছে আসলো । ওর খরচ আমিই চালিয়েছিলাম।
মনোজ বলল 'কলেজের খরচ কে চালাবে?'
বাড়ির লোকজন এই কথাটাই তো বলছিল' একদিন এসে খুব কান্নাকাটি শুরু করলো ।স্কুলের বাইরে আমাকে ডেকে নিয়ে তখন আমি বললাম যে ,তুই কান্নাকাটি করিস না। এই দুর্দিনে তোকে কেউ সাহায্য করুক না ,করুক আমি তোকে সাহায্য করবো ।সেই সময় তুমি জিজ্ঞেস করেছিলে না যে, হঠাৎ করে তোমার এত টাকার প্রয়োজন এসে পড়ল? 60 হাজার টাকার মতো খরচ করেছিলাম ওর পড়ার জন্য ।আজ ও একজন সফল আইনজীবী হতে চলেছে ।এর থেকে গর্বের আর কী হতে পারে বল তো?'
মনোজ বলল 'এটা তো গর্ব করার মতোই।'
রেখা বলল 'জানো আমি চেয়েছিলাম যে প্রতিবন্ধী বলে হেলা ফেলা নয়। যদি প্রতিভা থাকে, মনের জোর থাকে , তাকে বাইরে থেকে আরও বেশি সাপোর্ট করা উচিত ।যেটা ওর ক্ষেত্রে হচ্ছিল না ।ওর বাবা-মা ও ভেঙে পড়েছিল ।'
মনোজ বলল 'তাই?'
রেখা বলল' ওর মা বাবা বলেছিল কি করে মেয়ের পড়াশোনার খরচ টা চালাবে ?তখন আমার কাছে এসেছিলো।'
মনোজ বলল 'তুমি এক মানবিক কাজ করেছো। এটাই করা উচিত ছিল।'
রেখা মনোজকে জড়িয়ে ধরে বলল 'সত্যি বলছো?'
মনোজ  বলল' হ্যাঁ গো।'
রেখা বলল' জানো, আজকে আমার টিচার হিসেবে মনে হচ্ছে , টিচাররা সত্যিই মানুষ গড়ার কারিগর। শিক্ষকতার পেশার মহান ব্রত  নিয়ে এসেছিলাম, তার কিছুটা হলেও করতে পেরেছি।'
মনোজ বলল'একদম ।তুমি ভেবো না ওই মেয়ে অনেক দূর এগোবে।'
রেখা বলল শারীরিক অক্ষমতা জীবনে সাফল্য পাবার জন্য কোন প্রতিবন্ধকতা নয় ।যদি মনের জোর ,অধ্যাবসায়, নিষ্ঠা ,একাগ্রতা এবং ধৈর্য থাকে তাহলে সাফল্যের চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছে যাবেই।'
মনোজ বলল' ১০০ বার।'
রেখা উচ্ছ্বসিত ভাবে বলে উঠলো'দেখো একদিন
 নির্মলা সকলকে তাক লাগিয়ে দেবে । স্বর্ণালী দিনের অপেক্ষায় যেদিন খবরের কাগজে বড় বড় করে হেডিং থাকবে প্রতিবন্ধী ছাত্রী নির্মলা একজন সফল আইনজীবী।'
মনোজ বলল' অবশ্যই ওর এই জীবন সংগ্রামের কাহিনি অন্যদেরকেও  উদ্বুদ্ধ করবে।'

১৪ ডিসেম্বর ২০২১

কবি মতি গাজ্জালী 'র গুচ্ছ কবিতা





যৌবনোত্তীর্ণ_ একজন_ মানুষের_ স্বপ্ন


আমার কৈশোরে একবার একটা প্রসব দৃশ্য দেখেছিলাম--
তারপর--
তার পর--
পঞ্চাশটি বছর-- পাঁচ দশক-- পার।

তার পর, ওই সুস্থ শিশুটি ইথিওপিয়া, রুয়ান্ডা, উগান্ডা--
কখনও ইরিত্রিয়া, সোমালিয়াসহ কত কত--
দুর্ভিক্ষপীড়িত দেশে হেঁটেছে, 
জীর্ণশীর্ণ দেহ, কৃশ মুখাবয়ব নিয়ে--

একটা আকাশ সমস্ত পৃথিবীঘিরে--
একটা সূর্য পৃথিবীর প্রাণ--
একটা চাঁদ রাত্রি-প্রদীপ--
কত কত ঝরনা, হ্রদ, মালভূমি, নদী আর সমুদ্র--
তৃণ-লতাগুল্ম গাছ-বৃক্ষ, কত কত উদ্ভিদ--
কত কত প্রাণ দৃশ্যমান, কতক কতক অদৃশ্য--
শিশুটির যৌবনোত্তীর্ণ সময়েও দেখা পেলো না--
সত্য সুন্দর আর প্রকৃতিজ একটা স্বর্ণালী-বদ্বীপ--

স্বচ্ছতার দেখা পেলো না-- না মানুষে, না শাসনে, না প্রকৃতিতে,
হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত এক যাযাবর জীবন তার--
মাথায় জমেছে বেদনার পাহাড়, হিমালয়ের চেয়েও ভার।

একদিন জিওগ্রাফিক টিভি চ্যানেলে চোখ পড়লো--
আহা! কত কত সুন্দর সুন্দর দেশ। কত কত নান্দনিক প্রাকৃতিক দৃশ্য,
হরেকরকম পশুপাখি, ডালিমের রসের মত টলটলে নদী আর সমুদ্রের পানি,
পাহাড় পর্বত আর জলপ্রবাতের উচ্ছল ছুটাছুটি--
জলীয়বাষ্পের খেলা, চারদিকে আনন্দ উচ্ছ্বাসের মেলা--
যেখানে মানুষ মানুষকে করে না অবহেলা।

হা করে তাকিয়ে আছে-- অবাক বিস্ময় জাগে তার মনে,
ভাবে, এমন মনোরম দেশ, এমন সুষমামণ্ডিত পরিবেশ--
তুলনা করি কোন দেশের সনে?
ক্ষণে ক্ষণে রোমাঞ্চিত হয়, কোথায় যেন বারবার হারায়, 
উদাস চোখে আকাশ দেখে, দেখে হাজার পাখির মেলা,
যেদিকে যায় চোখ, মলিন হয় মুখ বিষাদ বেদনায়,
বুঝতে পারে না-- ভেতর থেকে কে যেন দুচোখে অশ্রু ঢেলে যায়,
কাঁদে খুব করে, অজস্র অশ্রু ধারায়, খেই হারায়--
উল্টো হয়ে সূর্যওঠার দিকে মুখ করে দাঁড়ায়--

ওই যৌবনোত্তীর্ণ মানুষটি আর একবার প্রসব দৃশ্য দেখিবার চায়--






হে_ প্রিয়_ স্বদেশ


এত ভার বয়ে চলতে পারো, পারো না--
কতিপয় সন্তানের ভার বয়ে যেতে। হে মুগ্ধ জন্মভূমি!
জননী তুমি, তুমি স্বর্গসম! এমন অসম দৃষ্টি তোমার,
দুচোখা তুমি, হৃদয় খণ্ডিত, ভালোবাসা খণ্ডিত। বঞ্চিত হয় গর্ভের সন্তান।

কত বোঝা বয়ে চলো, ওই কজন সন্তানের বোঝা পারো না বইতে?
ওরা তো অলস নয়। কাজ চায়। সকালের নাস্তায় একটুকরো রুটি চায়,
না ডিম, না কলা, না বাটার, না মাংসা কিংবা ঘি-ভাজা পরোটা--
স্রেফ নুনপান্তা, উপরন্তু একটা পেঁয়াজ আর একটা কাঁচালঙ্কা!

মায়ের শীর্ণদেহ দেখো, ব্রা নেই, জামা নেই, নেই পেটিকোট, 
মাথায় না-তেল, মুখে না- কসমেটিকস, ঠোঁটে না-লিপিস্টিক--
শুধু তাঁতবুনা একটা বারোহাত কাপড়, পায়ে নেই জুতা-সেন্ডেল,
বাবাকে দেখেছ? রোদবৃষ্টি ঝড়বাদলায়ও ঘানি টানে কলুর বলদের মত,
তার গায়ে না আছে গেঞ্জি, না পাঞ্জাবি বা জামা, পায়ে না আছে জুতা-সেন্ডল--
কদাচিৎ সরিষার তেল মাখে শীতের আগ্রাসনে, 
একটা কমদামি লুঙ্গি আর একটা গামছা-- যেন তোমার বুকে পরগাছা।

হে স্বদেশ! বিদেশ করে যদি সন্তান খোঁজে জীবনের ঠিকানা,
তবে তুমি কী কানা মা? বলো স্বাধীন জন্মভূমি সোনার বাংলা!

বুঝো কী জন্মভূমি! মা-বাবার রিক্তেরবেদন, দিনরাত্রির কাঁদন রোদন?
যার সন্তান ভূমধ্যসাগরে স্বপ্ন ডুবায়ে মরে, ওই ঘরে জ্বলে কী কূপির বাতি?
কিংবা বিদেশের কারাগারে পঁচে মরে, কে ফেরায় তারে, কে তারে ভাবে?
হে স্বদেশ, বুঝো না সন্তানের খেদ, দুঃখকষ্ট আর বিদ্বেষ।

রক্তের বিনিময়ে পাওয়া স্বদেশ-- আর কত মা-বাবার রক্তক্ষরণ?
বুকে টেনে নাও হে প্রিয় স্বদেশ-- বোঝাকে বানাও দেশগড়ার হাতিয়ার, 
ভালোবাসার বন্ধনে সবাই মিলি গড়ি তুলি সোনার বাংলাদেশ।



প্রভাতী -- সুর


নিশুতিরাতের একটা সুর--
যে সুর ভেসে আসে মহাজাগতিক তরঙ্গে তরঙ্গে,
মাটিতে কান পেতে শুনি আরেক সুর, 
বৃক্ষ লতায়পাতায় আর তৃণে অন্যরকম সুর,
চাঁদ আলাদা করে সুর তুলে জোছনার বাঁশিতে,
নদী একরকম, সমুদ্র আরেকরকম-- দিশেহারা মন ব্যাকুল--
রাতজাগা পাখিদের ডানায় জেগে রয় রাত-- 
তখন তোমার ভায়োলিনের সুর ভেসে আসে,
বিভ্রান্তিকর সময় আমার-- কোন্ সুরে মগ্ন হব-- দ্বিধায় পড়ে যাই।

সবকটি সুরে বিরহ, কেবলই দীর্ঘশ্বাসের ঝাঁঝালো মনোবেদনা,
আর সবসুর মিলেমিশে কেমন পাগল পাগল লাগছে নিজেকে,
চোখ বুজে রইলাম। নিজকে বললাম-- সুস্থির হও।
কিন্তু অস্থিরতা বাড়ছেই কেবল-- 
কারণ, ভায়োলিনের সুর আমাকে বেশি কষ্ট দেয়।

তোমার এই বিরহের সুর শুনতে আসিনি, ক্ষমা করো--
সানাই কিংবা ভায়োলিনে ছুঁয়ে-থাকা হৃদয়ে ঝরনার জলতরঙ্গ নেই,
যদি পারো একটা প্রভাতসংগীতের সুর ধরো। 

ভোরের পবিত্র সুরে ফিরে পেতে চাই নতুন জীবন।
বহুরাত গেছে অনিদ্রা আর শোকে, রোদনে, বেদনে।
কেবল ভোরের ওই দোয়েলের শিস আর ভালোবাসার ঠোঁট বেজে ওঠুক জাহান্নামী-রাত শেষে। ৪/১১/২১


চোখ_ আর_ সমুদ্র_ জমজ


চোখের জলে সমু্দ্র--নাকি সমুদ্রের জলে চোখের জন্ম--
এ নিয়ে অনেকবার কথা বলেছ-- নিরুত্তর থেকেছি।

এর একটা জবাব চেয়ে চলেছ দীর্ঘদিন যাবত, যদিও প্রসঙ্গটি এড়িয়ে যাই--
টেনে ধরো বারবার, ভাবছি কী জবাব তার, কি-ই-বা বলি-- অন্য প্রসঙ্গে যাই।

রেহাই নাই। উত্তর চাই-ই চাই তার। মুখ করি ভার, তবুও
নাছোড়বান্দা, এবার সে নিজে নিজে বললো-- সমুদ্র আর চোখ জমজ ভাই। 

রেহাই পেলাম। বললাম-- প্রমাণ দাও। হেসে ওঠলো--
বললো-- যখন হাসি তখন দেখবে আমার চোখে জল, আবার কাঁদলেও জল--
দুরকম চোখের জলের স্বাদ নেবে, তারপর সমুদ্রের জল চাখবে,
দেখবে তিনরকম জলের স্বাদ এক। নোনা স্বাদ।

মেনে নিলাম-- এখন বলো-- কী বুঝাতে চাও--
জবাব-- মানুষ আর সমুদ্র জমজ। একগর্ভে জন্ম।

অদ্ভুত কথা। বললাম-- আরেকটু ব্যাখ্যা করো। 
ধরো, সমুদ্র জন্ম থেকেই দুঃখী, তাই গোঙায় দিনরাত্রি, আর
মানুষও জন্মের পর থেকে দুঃখী, হয় সম্পদে, নয় তো মনোতাপে-- 

তার ব্যাখ্যার বিপরীতে আমার কোনও যুক্তি বা প্রমাণ নেই--
নীরব হলাম, মৌন হলাম, একান্ত নিমগ্নতায় নিজ জীবন ভাবলাম,
সেসাথে যুদ্ধের ইতিহাস, উদ্বাস্তু জীবন, বুভুক্ষু মানুষ, রাষ্ট্রের দুর্বৃত্তায়ন -- ইত্যাদি 
আমাকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরলো। নতজানু হয়ে পড়ে রইলাম।

সে-ও নতজানু হয়ে আমাকে জড়িয়ে নিলো বেশ পবিত্র আলিঙ্গনে--
আমরা কাঁদছি-- দুজনই দুজনার অশ্রুধারায় জিহ্বা রেখে নোনা স্বাদ পেলাম--

দুজন হাঁটি হাঁটি পা পা করে সমুদ্রজলে নেমে এক আঁজলা জল মুখে নিয়ে দ্বৈতকণ্ঠে বললাম---
জীবন মানেই নোনা স্বাদ-- তারপরও জীবন মধুময়--
নোনার মাঝেও সৃষ্টিধারা বেঁচে রয়-- নোনাজলেই ভ্রুণের আশ্রয়--
নতুবা, আমাদের অস্তিত্বই বা কোথায়! চোখ আর সমুদ্রজলের সঙ্গমেই প্রাণের পরিচয়।

অলোক কুমার দাস





পন্ডিত - ভক্তি

আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে শুদ্ধজ্ঞান। 
কে যেনো বললো “আপনি এতো ভুলে যান কেনো? 
আপনার বাস কোথায়? 
আপনার ঠিকানাই বা কি? জানতে পারি, 
হ্যাঁ আমার বাস ধর্মতলায়। আমার নেই কোনো নাম। 
নেই কোনো নামের ‘নেমপ্লেট। প্রতিটি ঘরের সবায়ের হৃদয়ে 
রক্তে মাতৃভাষায় লেখা 
আছে হ্যাঁ আমারই নাম।
খুঁজে নিও আমাকে 
চেনা অচেনার ভিড়ে


শিবনাথ মণ্ডল





জল নিয়ে  জেরবার
     
ভূ গর্ভে জল কমছে
জল নিয়ে জেরবার
জমা জলে দেশ থইথই
রোগে করবে সাবার।
মশা মাছি রোগ ছড়াছে
জিবানুর উৎপাত
বিজ্ঞানিরা ভেবে আকুল
মাথায় পড়েছে হাত।
বরফের চাঁই যাচ্ছে গলে
সূর্যের বাড়ছে তাপ
সমুদ্র থেকে উঠে আসছে
গভীর নীম্নচাপ।
গাছপালা কমছে ভূমে
বাড়ছে পাকা বাড়ি
প্রকৃতি তাই রাগ করে
অক্সসিজেন নিচ্ছে কারি।
পৃথিবীকে মানুষে ভাগ করেছে
টাঙিয়ে ফুটের দড়ি
সময়টাকে ধরে ফেলেছে
দেওয়ালে টাঙানো ঘড়ি।
সুখ শান্তি যাচ্ছে দূরে
হিংসায় ছড়াছড়ি
  ডাক্তারা পায়না খুঁজে
রোগের লুকোচুরি।।

ফাতিমা কানিজ 






আড়ালে আড়ালে 


আমার দগ্ধ জীবনের ছন্দপতনে
কর্কশ কাকেরা গলা সাদে
যদি বদ্ধ ঘরের তপ্ত বাডাস
আমার বেঁচে থাকা বিষিয়ে দেয়
 তোমায় খুঁজবো,ভীষণ রকম খুঁজবো আড়ালে আড়ালে 
আমার দক্ষিণার টাটকা নিঃশ্বাসটুকু
সুর্যের তপস্যায় যদি পুড়ে ছাই হয় কখনো
দুপুরের শুষ্ক ঝরাপাতাগুলো কোমলতা হারায়
শিশিরের মতো নিঃশব্দে গোধুলু না আসে তবে তোমায় খুঁজবো, ভীষণ রকম খুঁজবো আড়ালে আড়ালে। 
স্বপ্নের প্রজাপতি বন্ধি হয় নিয়মের কারাগারযা চাই তা যদি নাই পাই
হেরে যাই মিথ্যার মায়াজালে
জীবনের কানামাছি খেলায় হারিয়ে যাই
ভালোবাসা ফিকে হয় ঝলসিত রোদ্দুরে 
ঠিক তখন তোমায় খুঁজবো, ভীষণ রকম খুঁজবো আড়ালে আড়ালে। 
মেঘের জমাট নরম বুকে
কৃপণ দুপুর হাত বাড়ায়
আমার খোলা আকাশটায় মুক্ত বিহঙ্গ ডানা ঝাপটায়
কিংবা নদীর জল শুকিয়ে চুকিয়ে দেন জীবনের সকল লেনাদেনা 
নিয়ম ভাঙার নিয়মে যদি কখনো জীবনের পান্ডুলিপি  বদলে যায়
কেবল তোমায় খুঁজবো, ভীষন রকম খুঁজবো আড়ালে আড়ালে।

দেলোয়ার হোসেন সজীব



                দৈনিক সাহিত্য পত্রিকা বৃত্ত'র  সম্পাদক কবি দেলোয়ার হোসেন সজীব 



একা স্বপ্ন বিলাস


মাঝে মাঝে মনে হয় হাজার লোকের ভিড়েও খুব একা
যতটা  একা হলে মানুষ সুখের অভাবে পড়ে ঠিক ততটাই একা।
আমার চারিদিকে মানুষ ছুটছে,স্বপ্ন ও ছুটছে...
কেউ ছুঁচ্ছে, কেউ দেখছে কিংবা কেউ ধুঁকছে।

কি এক অদ্ভুত সমীকরণ আমি যেন একা
খুব একা হয়ে দাঁড়িয়ে আছি সমুখে।
কেউ নেই কিছুই নেই,আমার চারপাশে
আমি খুব একা ভীষণ একা স্বপ্ন বিলাসে।

মোঃ মাহমুদুর রহমান





তোমার জন্য 


ভাবনার রাজ্যে অগোছালো অনুভূতি। 

খানিকটা সময় ভাবনার রাজ্যে তোমার অনুপস্থিতিতে
আমার অগোছালো অনুভূতি। 

যখন তখন আপন অস্তিত্বের কথা ভুলিয়ে দিশেহারা 
করে তোলে আমায়। 
স্বপ্নের রাজ্যে আভা ছড়িয়ে দেয় ... 
আমার সুপ্ত হৃদয়ে ভালবাসার স্বপ্ন বুনে যায়। 

তোমার মায়াবী অঙ্গে লাবণ্য 
আগুন রাঙ্গা কৃষ্ণচূড়ার সাজ
কতো রুপ তোমার অঙ্গে খেলা করে অবিরাম
অঙ্গে ভেসে থাকা হিমচাঁপার মিষ্টি সুবাস 
কেয়া-কদমের সৌরভে আর দোলনচাঁপার বাহারি রং
ছড়ায়...
তোমার মায়াবী রূপের এক ঝলক সৌন্দর্যের পূর্বাভাস
স্নান শেষে ভেজা কেশে মেখে থাকা জল
চারিদিকে শিউলি ফুলের স্নিগ্ধ  সুবাস ছড়িয়ে দেয়। 
 
স্বপ্নের রাজ্যে যখন বিরহের 
সুর বাজে...
কিছুটা সময় অনুভব করি 
স্বর্গীয় সাজে কেউ ডাকছে মোরে।

শান্তা কামালী





বনফুল
( ৪০ তম পর্ব ) 
শান্তা কামালী

মাল্টা দেশ টা ইউরোপে,একটা দ্বীপ রাষ্ট্র। রাজধানী ভেল্টা।সিসিলি দ্বীপের থেকে ৯৭ কিলোমিটার উত্তর পূর্বে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত। গরম কাল বেশী সময় ধরে থাকে। শীত কম পড়ে। ভীষণ সুন্দর পরিবেশ। জনসংখ্যা এক কোটি ও নয়।আশি লক্ষের কাছাকাছি। খুব ভালো বাণিজ্যকেন্দ্র। কেউ ওখানে বেকার থাকে না। পড়াশোনার সাথে সাথে চাকরি ও পাওয়া যায়। ইউনিভার্সিটিতে আমাদের দেশের ছাত্রদের খুব ভালো সুযোগ দেয়।ইউরোপের অন্যান্য দেশের থেকে এখানে খরচ কম,কিন্তু এদের সার্টিফিকেট সারা বিশ্বে প্রশ্নাতীত ভাবে কদর করা হয়।ক্যাম্পাসিং থেকেই ছাত্ররা বিভিন্ন মাল্টি-ন্যাশানাল কোম্পানিগুলো তে জায়গা পেয়ে যায় ভালো মায়নার জব এ।থাকার ব্যবস্থা ও ভালো। দু'রকম ভাবে থাকা যায়। ইউনিভার্সিটির নিজস্ব গেস্ট হাউসে সেগুলো অনেক টা দূরে, বাসে আসতে হবে।অথবা হোম,মানে স্থানীয় মানুষের বাড়িতে গেস্ট হিসাবে। যেগুলো ক্যাম্পাসের আশেপাশে। গেস্ট দের রাখতে ওরা বিশেষ কিছু খরচ নেয় না।কিন্তু ইউনিভার্সিটির থাকার জায়গায় খরচ বেশি। মাসে দশ হাজার আটশো ইউরো ভাড়া বাবদ দিতে হয়।ইন্সুইরেন্স পঞ্চাশ ইউরো,খাওয়া খরচ দু'শ ইউরো মাসে।আর স্থানীয় বাড়িতে খরচ পড়ে সারা বছরে পাঁচ হাজার থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার, খাওয়া বাবদ একশো ইউরো মাসে।বাস ভাড়া লাগে না। আর ঐদিকে বাস ভাড়াই মাসে দেড় থেকে দুহাজার ইউরো।
এক ইউরো মানে আমাদের দেশের প্রায় সত্তর পঁচাত্তর টাকা, সেটা তো,মানে....., খুবই কষ্ট সাধ্য ব্যাপার....। 
জুঁই এতোক্ষণ সব মন দিয়ে শুনছিলো। এবারে বললো, ও এটাই তোমার প্রবলেম? 
হুমম,এটা একটা প্রবলেম তো বটেই,তাছাড়া...... 
এটা তো তোমার চিন্তা করার কথা নয়,এটা আমার আব্বুর ব্যাপার। সে কি মানা করেছে?  না-কি না করবে? আমার আব্বুর কাছে এটা কোনো প্রবলেম হবে না, সেটা আমি ভালো করেই জানি। 
আমি আব্বু,আম্মুর সাথে কথা বলবো। সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। 
পলাশ একটা দীর্ঘ শ্বাস ছাড়ে। কিছুটা যেন ভারমুক্ত হলো। 
হ্যাঁ, আরেকটা প্রবলেম কি বললে না তো? জুঁই প্রশ্ন করে। 
সেটা হলো, স্থানীয় বাড়ির থাকার। 
কেন,তারা কি খারাপ মানুষ? 
না না,তারা খুব অতিথি বৎসল। 
তবে প্রবলেম কিসের? 
জানো তো জুঁই, ইউরোপের এই দেশের নারী স্বাধীনতা খুব  বেশী। 
ভালো তো, মেয়েরা পিছিয়ে থাকবে কেন? 
তা নয় জুঁই, তুমি বুঝতে পারছো না, অথবা আমি ঠিক  বুঝাতে পারছি না....
ঠিক আছে, বুঝিয়েই বলো।
একটু লজ্জা করছে যে...
কিসের লজ্জা, আমাকে বলতে?
ওখানকার মেয়েদের পনেরো বছর বয়স হলেই স্বাধীনতা দেয়া হয়,লিভ ইন করার। ওরা স্টে- টুগেদার, লিভ- টুগেদার করে। তারপর ইচ্ছে হলে সংসার করে। না হলে লিভ আউট করে দেয়।
জুঁই চুপ করে যায়।কি যেন ভাবতে থাকে। বেশকিছু সময় দুজনেই চুপচাপ।
তারপর পলাশ ই বললো, হোমে থাকতে গিয়ে যদি নিজেকে হারিয়ে ফেলি,সেটা ই ভয় করছে। 
জুঁই হঠাৎ পরিবেশ টা কে হাল্কা করতে বোধহয়, নিজের ডান হাতটা দিয়ে পলাশের নাক টা টেনে ধরে বলে,ইস্ আমি আছি না! নাক টা ধরে রাখবো,দেখি তো কে লিভ ইন করতে আসে? আমি জানি,আমার পলাশ সাত জন্ম আমার জন্য অপেক্ষা করতে পারে,কিন্তু নিজেকে নষ্ট করতে পারবে না। 
পলাশ অবাক হয়ে জুঁই য়ের মুখ টা দেখে, আর ভাবে কি নিস্পাপ ফুলের মতো একটা মেয়ে,আমার জন্য কি না করতে চায়।
হঠাৎ পলাশের সম্বিত ফেরে, দেখে জুঁই ওর বাঁহাতের কড়ে আঙলে একটা আস্তে করে কামড় দিয়ে বলছে, এই আমি   তোমাকে কেটে দিলাম, আর কেউ তোমার দিকে নজর দেবে না। তুমি মাল্টা তেই হায়ার এডুকেশন নিতে যাবে,ইনশাআল্লাহ। এটা আমার স্বপ্ন তোমাকে ঘিরে। 
পলাশ চুপ করে বসে থাকে। তার বাড়িতে ফেরার সময় পার হয়ে গেছে।

চলবে...

শামীমা আহমেদ/পর্ব ৩১





শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত 
(পর্ব ৩১)
শামীমা আহমেদ

একটি  বিধ্বস্ত বিপর্যস্ত ও বিষন্ন মন নিয়ে শিহাব আজ ঘরে ফিরলো। জরুরী কাজটি  সেরে গুলশান থেকে আবার অফিসে ফিরে, জমে থাকা  হাতের কাজগুলো গুছিয়ে বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত প্রায় দশটা হয়ে গেলো।ঘরে ঢুকে শিহাব বেশ ক্লান্ত বোধ করছিল। আসলে মনের সাথে শরীরের একটা যোগ থাকে। মন ভালো না থাকলে নিজের শরীরটাকেও ভীষণ ভারী মনে হয়। শিহাব ফ্ল্যাটে  ঢুকে দরজাটা সচেতন ভাবেই লাগিয়ে নিলো যেন আবার ভুল না হয়। ঘরে ঢুকে বিছানায় গা এলিয়ে দিলো। এসি রিমোটটা হাতে নিয়ে আঠারোতে সেট করে নিলো। শীতল পরশে যদি মনের অস্থিরতাটা একটু কমে।আজ দুপুরে শায়লাকে বলা কথাগুলো, শায়লার থমথমে বিষন্ন মুখখানি আর সবশেষে  তার চলে যাওয়া শিহাবের বুকের ভেতর  জমাট এক ব্যথা হয়ে বারবার ডুকরে ডুকরে কেঁদে উঠছে। যদিও বাইরে থেকে কেউ বুঝতেই পারবে না তার ভেতরে কী লু হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। বারবার ঢেউয়ের মত আছড়ে পড়ছে শায়লার চোখের জলের সেই কান্নার ঢেউ। বারবার শায়লার মেরুন শাড়ির রংটা চোখের সামনে ভেসে উঠছে। শায়লা আজ খুব সুন্দর করে সেজেছিল। হয়তো শিহাবকে ভেবেই আজ শায়লাকে এত উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। তার কল্পনার স্বপ্ন রাজ্য সে শিহাবকে নিয়েই সাজিয়েছে।হয়তো সে  ঘুনাক্ষরেও ভাবেনি এত চেনা শিহাব আজ এতটা দুরত্ব নেয়ার কথা বলবে।মনে হয় মূহুর্তেই তার ভেতরের সবকিছু উলোট পালোট হয়ে গেছে। আজ ফোন কল মিস হওয়াতে কতটাইনা আফসোসে সে ভেঙে পড়লো। সেদিন শিহাবের জ্বরের কথা শুনে কেমন অস্থিরতায় ভুগেছে।শায়লার মনের প্রতিটি ভাবনার আকাশে শুধুই শিহাবের বসবাস। শিহাব এটা ভালো করেই জানে শায়লার মত করে কেউ তাকে এতটা বুঝেনি।তার সুখ দুখটাকে এমন করে অনুভবে নেয়নি। ভালবাসাতো শুধু একজন মানুষকে ভালবাসা  নয়।ভালবাসাতাতো শুধু তার রূপ সৌন্দর্যকে নয় বরং তার সুখ দুখ, তার পারিবারিক অব্লিগেশন প্রায়োরিটি ইম্পর্টেন্স এমারজেন্সি সেগুলোকেও ভালবাসতে হয়। শায়লা নিজেদের পিতৃহীন সংসারে এটা ভীষণভাবে বুঝে গেছে যে, দুঃখটাকে ভালবাসলে দুঃখ দৌড়ে পালায়। আর সুখকে যত ভালবাসবে সে শুধু পালাতেই  চাইবে।তাইতো শিহাবের সব রকম কষ্টকে সে অনুভব করেছে। শিহাবকে নিয়ে চোখে মুখে তার একরাশ তৃপ্তি খেলে যায়!!
শিহাবের ফোন কলের অপেক্ষায় সে থাকে।শিহাবের কন্ঠস্বর শোনার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠে।শিহাবকে একনজর দেখার জন্য তার প্রোফাইল পিক এ বারবার যেন তাকেই খুঁজে ফিরে।  শিহাব সব বুঝেও নিজেকে, নিজের আবেগকে চেপে রাখে শুধুই তার পিছুটানের কারণে।শায়লা সেটাও ভীষণ করে বুঝে। তবে এ কথাও শিহাবকে স্বীকার করে নিতে হবে ,কত মানুষ সারা জীবন সাধনা করেও এমন হৃদয়ের কাছাকাছি একটা মানুষের সন্ধান পায়না। আর সে শায়লাকে এত কাছে পেয়েও দূরে ঠেলে দিল।তবে  শিহাব এভাবে শায়লার মন ভেঙে দিতে  চায়নি কিন্তু শায়লা যা ভাবছে তাতো একটা অসম্ভব ভাবনা। অবশ্য শায়লা একা না, সেও কি এমনি করে ভাবেনি? সেও কি কল্পনায় তার ঘরে শায়লার চলাচল দেখেনি! আজ যা অসম্ভব সাহসিকতায় জয় করে নিলে  একসময় তা সম্ভব করা যায়। কিন্তু সেখানে বিধাতার সায় থাকতে হবে।সবকিছুতো তিনিই ঘটান। নয়তো রিশতিনার সাথে কেন তার এত অল্প সময়ের জীবন আর কেনইবা রিশতিনা তাদের স্মৃতিচিহ্ন রেখে গিয়ে শিহাবকে বন্ধনে বেঁধে গেছে।শিহাব কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না উপরওয়ালার এই খেলার মানে।আর সেটা সম্ভবও নয়।আর তাইতো এমন কঠোর সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে নিজেকে ফিরিয়ে আনা। 
শিহাব নিজের মাঝে ফিরে এলো।নাহ! উঠতে হবে।নয়তো এভাবেই ঘুমিয়ে পড়বে।
শিহাব উঠে বসে একটা স্টিক ধরিয়ে নিলো। 
হাতে ফোনটা এগিয়ে নিলো। মায়ের মিসড কল। শিহাব সময়টা দেখে নিলো। দুপুর চারটার দিকে।আহ!  তখন সে বাইক চালাচ্ছিল।মাকে কল ব্যাক করা হলোনা। এখন আর সময়ও নেই। রাত এগারোটা ক্রস করে গেছে।মা ঘুমিয়ে পড়েছে।মায়ের কথা মনে হতেই মনে পড়লো আরাফের কথা। অনেকদিন ছেলেটির সাথে কথা হয় না। শিহাব ইচ্ছে করেই কম কথা বলে।ছেলেটা যখন ও প্রান্ত থেকে কথা বলে শিহাবের ভেতরটা একেবারে ছিঁড়েখুঁড়ে যায়।একটা ছোট্ট শিশু বাবামায়ের আদর বঞ্চিত। তবুও ওখানে ও সবার আদর যত্নে ভালোবাসায় মায়ের অভাবটা ভুলে আছে। যদিও শিহাবের মা বারবার শিহাবকে বলেই যাচ্ছেন আবার বিয়ে করবার কথা। বিয়ে করে নতুন জীবন শুরু করতে। কিন্তু শিহাব রিশতিনার স্মৃতি আর শায়লার সাথে পরিচয়ের মাঝে এক দোদুল্যমানতায় দুলছে।একটা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে।অতীত ভুলে সামনে এগুলেও শায়লাকে নিয়ে এককভাবে ভাবাও ঠিক নয়।শায়লা একজনের বিবাহিতা স্ত্রী। যদিও অভিমান অনুরাগের টানাপোড়েনে দুজন দুরত্বে আছে।আইনের বন্ধনকে শিহাব শ্রদ্ধা করে। আর তার স্ত্রী হয়েও রিশতিনা  শত অনিচ্ছাতেও  আজ অন্যের সংসার করছে।শিহাব তো শায়লার ব্যাপারে সেই একই কাজ করতে পারে না।অন্যের স্ত্রীকে নিজের স্বার্থে নিজের করে নিতে চাইবে না।
এই বিষয়টি শিহাব বেশ ঘৃণাই করে।যতই আবেগ আর ভালবাসার জন্ম নেয় না কেনো,শিহাব কখনোই মেয়েদের আবেগ নিয়ে খেলেনি।
তবুও তার জীবনটা আজ এলোমেলো হয়ে গেলো। তবে শিহাব ধৈর্য্য ধরবে।চলুক চলতে থাকুক এমনি করে যতদিন চলে,,,,
এমনি সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে শিহাব সিগারেটটা শেষ করলো।আলসেমি ভেঙে বিছানা ছাড়ল। রাতের ঘুমের প্রস্তুতি নিতে হবে।এখনো রাতের খাবার খাওয়া হয়নি।আর ইচ্ছেও করছে না। এমনিভাবে অনেকরাতই সে না খেয়ে কাটিয়ে দেয়। আর কেইবা আছে তাকে একটু জোর করে খাওয়াবে।খাবার নিয়ে রাত জেগে অপেক্ষায় থাকবে।নাহ! মনকে এভাবে ঘুরালে চলবে না। যদিও এই ক্ষেত্রে কল্পনায় শায়লাকে বহুবার ভেবে নিয়েছে সে কিন্তু আজ যেন সে অধিকারটিও স্বেচ্ছায় খুইয়ে এলো। শায়লাকে ভেবে আর কোন স্বপ্ন সাজানো নয়।শায়লাকে তার নিজের জীবন গুছিয়ে নিতে হবে।শিহাব তাকে কোন পিছু টানে বাঁধবে না।
শিহাব কাপড় পালটে নিয়ে ফ্রেশ হয়ে এসে এক গ্লাস পানি খেয়ে বিছানায় ঘুমাতে চলে এলো। সিদ্ধান্ত নিলো সারাদিনের কোন কিছুকেই আর সে ভাবনায় আনবে না।তাহলে আর রাতে ঘুমই হবে না। সকালে গাজীপুর ফ্যাক্টরিতে যেতে হবে। এ ক'দিনে ওদিকে কি হয়ে আছে কে জানে? শিহাব ঘরের পর্দা ভালভাবে মিলিয়ে দিল। বেড সুইচটা দিয়ে ঘরের বাতি নিভিয়ে দিল। রাস্তার লাইট  থেকে শিহাবের ঘরে বেশ আলো ঢুকে।
ঘরের ভেতর আলো আঁধারিতে এক মায়াবী পরিবেশের সৃষ্টি হয়। শিহাব ঘুমানোর চেষ্টা করলো।



চলবে...

মনিরুল হক মৃধা




ফেরারি বিজয়


চেয়ে দেখ শত ফুলি নেচে গেয়ে রং তুলি 
বিষাদ গিয়েছে ভুলি
খুঁজে তার মানে!
স্বাধীনতা দেখা হল ভোগ তাহা করা হল
ইতিহাস কেন ভুল
কত জনে জানে? 

বিজয়ের জয়গান তার সাথে গাঁথা মান 
নারী যুবা দিল প্রাণ
জয় এলো পুরে।
লাখো নারীর ইজ্জত  ছিনে নিল এ বজ্জাত
নেই কোন জাতপাত 
আজও আছি ঘোরে।

শহিদের এ কন্যারা  না খেয়ে সে পথে খারা
 ভুখা পেটে থাকে মা'রা
 মিছিলে আনন্দ!
এতো স্লোগান ব্যানারে দেখে খুশি এ মনা রে
আছে কত অনাহার
আছে দ্বিধা দ্বন্দ্ব।

জয় গান যত শুনি  ফিরে আসে সেই গুণী! 
আসবেনা কোন দিনই 
দিবস পালন! 
মায়েদের আহাজারি খোকা বুজি এলো বাড়ি
শত মায়ে খারা সারি
সে স্বপ্ন লালন।

এ স্বপ্নের শেষ নয়  তাই বুকে ভীরু ভয় 
ডিসেম্বরে হল জয় 
উনিশশো একাত্তরে। 
হানাদার খেল ধরা লাশ ছিল পথে পড়া
চিল কাকে খেলো মরা 
দেখি জোচ্চোরে।

দেখি আজ কত লোক  হৃদে তার ধুকপুক 
ভোলেনি ক মায়ে শোক
বাঙ্গালী অজয়! 
রাজাকারের এ সন্তান হয় কী হে সে মাস্তান?
এ মাস্তানে নাও জান 
ফেরারি বিজয়।