১১ ডিসেম্বর ২০২১

মোঃ হা‌বিবুর রহমান ৫ম পর্ব





ইউএন মিশ‌নে হাই‌তিতে গমণ
 ৫ম পর্ব
মোঃ হা‌বিবুর রহমান



অতঃপর নি‌মি‌ষেই আমরা সব অ‌ফিসাররা মি‌নিবাস থে‌কে ঝটপট নামলাম।  বিশাল অট্টালিকাসম ইউএস নেভাল অ‌ফিসার মেসের কারুকার্যম‌ন্ডিত সৌন্দর্য্য ‌দে‌খে সে‌দিন স‌ত্যই মুগ্দ্ধ হ‌'য়ে‌ছিলাম। আজকাল অবশ্য আমা‌দের বঙ্গ‌দে‌শেও সুন্দর সুন্দর  ম‌ডে‌লের বসতবা‌ড়ি কিংবা প্রাসাদসম হ‌রেক রক‌মের ভবন নি‌র্মিত হ‌'চ্ছে আমা‌দের বঙ্গীয় সোনার ছেলে‌দের স‌ক্রিয় তত্বাবধা‌নে। 

যা‌হোক, এখন আমা‌দের জন্য প্রধান ও মূখ্য কাজ হ‌লো ঝটপট স্নানটা সে‌রে ফেলা। নেভাল সা‌র্জেন্ট সা‌হেব আমা‌দের‌কে বিশ্রা‌মের কামরাটা দেখা‌নোর সা‌থেই ব‌লে দিয়ে‌ছি‌লো যে আধা ঘণ্টার ম‌ধ্যেই আমা‌দের রে‌ডি হ‌'তে হ‌বে। একথা বলাও সারা তারপর আর সার্জেন্ট সা‌হে‌বের দেখা মি‌লে‌নি, বু‌ঝি চম্পট দি‌য়ে‌ছে অন্য কোন কা‌জের স্বা‌র্থে। 

মা‌ঝে মা‌ঝে ম‌নে হ‌'য়ে‌ছে এরা বি‌শ্বের সব‌চে‌য়ে ধণাঢ্য দে‌শের সার্জেন্ট, এ‌দের এত কাজ করার দরকার আ‌ছে কি? এরা যেন বাতা‌সের সা‌থে পাল্লা দি‌য়ে সব সময়ই চলাচল ক‌রে। তাই প্রায়ই আনম‌নে বলতাম "মাফ চাই বাবা তোমা‌দের কা‌ছে। তোমা‌দের এক‌বেলা কাজ না কর‌লে আস‌লে কি আর আ‌সে যায়"? অতঃপর, এক অদ্ভূত ব্য‌াপার ঘট‌লো, স্না‌নে ঢু‌কেই আ‌মি শুরু‌তেই যেন একট‌ু হোছট খেলাম। আমার আ‌দি নিবাস চুয়াডাঙ্গার আঞ্চ‌লিক ভাষায় ব'ল‌তে গে‌লে একেবা‌রে যেন ভ্যাঁকা-চ্যাঁকা খে‌য়ে গেলাম আর কি! কিংবা শুদ্ধ ভাষায় বল‌তে পা‌রেন কিংকর্তব্য‌বিমূঢ় হ‌'য়ে গেলাম। ‌

সে এক এলা‌হি ব্যাপার! সেই ১৯৯৪ সা‌লের স্নানাগার যে এত সুন্দর হ‌'তে পা‌রে এখন চিন্তা ক'র‌লেই যেন ঠুঁশ ক‌রে বেহুঁশ হ‌'য়ে যে‌‌তে পারি। হয়ত এই ২৬-২৭ বছর পর সুক্ষভা‌বে বর্ণনা করা আমার প‌ক্ষে ‌ঠিক এমূহু‌র্তে স‌ত্যিই ক‌ঠিন হ‌বে। ত‌বে এক কথায় বল‌তে পা‌রি- অপূর্ব! আ‌মি গোসলকার্য সমাপ‌নের সময় বেশ একটা মু‌স্কিলেই প‌'ড়েছিলাম আর‌কি। বাংলা‌দেশ সেনাবা‌হিনীতে চাক‌ুরী করার স‌ুবাদে তৎকালীন বি‌ড়িআ‌র এ ডেপু‌টেশ‌নের সময় বি‌ডিআর সদর দপ্তর, পিলখানায় পো‌ষ্টিংকালীন তখন 'ফরেন ডে‌লি‌গেশন ডি‌লিংস' কিংবা অন্য কা‌জে অ‌নেকবারই তখন পর্যন্ত ‌দে‌শের পাঁচতারা সবগু‌লো হো‌টেলের অ‌ভিজ্ঞতা‌ তো একপ্রকার হ‌'য়েই গি‌য়ে‌ছি‌লো। 

বাথরু‌মের ফি‌টিং সি‌ষ্টেম বুঝ‌তে আমার বেশ একটা মূল্যবান সময় খরচ ক'র‌তে হ‌'য়ে‌ছি‌লো। বাথরুমে গন্ডা দু'‌য়েক হ‌রেক রক‌মের তোয়া‌লে ঝুলা‌নো, কোনটা রে‌খে কোনটা ছা‌ড়ি তার সিদ্ধান্ত নি‌তেই অ‌নেকগু‌লো মি‌নিট আমা‌কে ব্যয় ক'র‌তে হ‌য়ে‌ছি‌লো। যাক সে সব কথা। বেশ ক‌য়েক‌টি পা‌নির ট্যাপ দে‌খে স‌ত্যিই হিমশিম খে‌য়ে গি‌য়ে‌ছিলাম। কোন প্রকা‌রে গোছল শেষ ক'রলাম।আহ্, সে যেন এক অনা‌বিল আনন্দ!

যা‌হোক, গোছল শেষে রু‌মে এ‌সেই সেই সেনাবা‌হিনীর কা‌লো রং‌য়ের ইউ‌নিফর্ম প‌রে আবার যথারী‌তি ফাই‌টিং ফিট হ‌য়ে গেলাম এবং মনটাও গোছ‌লের পর বেশ চাঙ্গা হ‌'য়ে গে‌লো। ম‌নে তখন ফুরফু‌রে ভাব। ইউ‌নিফর্ম প‌'রেই এ‌ন্টিরুম বা টি‌ভিরু‌মে আসলাম। ‌সে টি‌ভিরু‌মের বর্ণনা দি‌তে গে‌লে বিশাল একটা ফি‌রি‌স্তি  দি‌তে হ‌বে তাই অ‌তি সং‌ক্ষে‌পে দু' একটা কথা না ব'ল‌লেই নাই তাই ব'ল‌ছি আর‌ কি! 

আলীসান টি‌ভিরু‌মের টি‌ভিটা বিশাল সাই‌জের যা‌তে তিনশ'র অ‌ধিক স্যা‌টেলাইট চ্যা‌নেল ছি‌লো। টি‌ভির রি‌মোর্ট দি‌য়ে বেশ কিছুক্ষণ তাই গুতাগু‌তি ক'রলাম। অ‌নেক চ্যা‌নেলই তো দেখলাম কিন্ত‌ু ভারতবর্ষ/দ‌ক্ষিণ এ‌শিয়ার কোন চ্যা‌নেল চো‌খে পড়‌লো না। ‌সেই সময় আমা‌দের দে‌শে বু‌ঝি হা‌তে গোনা ১০-১২ টা স্যা‌টেলাইট চ্যা‌নেল ছি‌ল মাত্র। আমার ম‌নে আ‌ছে, ঐ সময় একটা রব প্রচ‌লিত ছি‌লো যে, প্রাক্তন প্রে‌সি‌ডেন্ট এরশাদ সা‌হেব না‌কি শুধুমাত্র ১০০ টি এ ধর‌নের স্যা‌টেলাইট চ্যা‌নেল দেখার ‌সৌভাগ্য অর্জন ক‌'রে‌ছি‌লেন। 

এরই ম‌ধ্যে সেই সা‌র্জে‌ন্টের আবার হুংকার। কলিং বেল বা‌জি‌য়ে এ‌ন্টিরু‌মে প্র‌বেশ ক‌রে একই কায়দায় বল‌লো " Sir, if you are ready then let's go to downstairs and board on the bus. Your bus is ready and we will move around our Naval Base, okay sir"? যা‌হোক, আমরা আবার সেই মিনিবা‌সে আসীন হ'লাম। যতদূর ম‌নে প‌ড়ে আমা‌দের এই ফ্লাই‌টে সি‌নিয়র এবং জুনিয়র মিলে মোট ১০ জ‌নের মত অ‌ফিসার এক‌ত্রে ভ্রম‌ণ ক'র‌ছিলাম আর বাকীরা অন্যান্য পদবীর ছি‌লো। 

তা‌দেরকে বেই‌জের অভ্যন্ত‌রে অন্য জাগায় (হ্যাংগা‌রে) রাখা হ‌'য়ে‌ছি‌লো এবং দেখভা‌লের জন্য ‌বেশ ক‌য়েকজন সা‌র্জেন্টও নি‌য়ে‌া‌জিত করা হ‌'য়েছিলো। আ‌মি অতঃপর ঐ সা‌র্জেন্ট‌কে নিঃসং‌কো‌চে জি‌জ্ঞাসা ক'রলাম, "Yes Sergeant, where is the actual location of Pearl Harbour"?  However, he smiled a while and told me, "sir, you have asked me the same question for the third time to me so far I can remember. Sir, Pearl Harbour is no more existing but the entire Naval Base itself was the actual location of Pearl  Harbour. Are you happy now sir"?

এখন বুঝ‌তে আর একটুও দেরী হ‌লো কে‌নো এ বেটা পার্ল হারবা‌রের কথা শু‌নে বার বারই ই‌তিপূ‌র্বে আকুন্ঠ মৃদু হে‌সে‌ছে। খাওয়ার কথা‌তো ভু‌লেই গে‌ছি, ত‌বে ১০০ গজ দূ‌রে দূরে হয় কমলা‌লেবুর, কিংবা আ‌পে‌লের বা আনার‌স জুই‌সের জারের সা‌রিবদ্ধতা ‌ছি‌লো লক্ষণীয়। যে কেউ ইচ্ছা ক'র‌লেই ফিল্টার থে‌কে এসব জুইস ফ্রি খে‌তে পা‌রে। 

আর এমআরই‌ তো আ‌ছেই অজস্র। যা‌হোক, শুরু‌‌তেই সার্জেন্ট আমাদের‌কে প্রশা‌ন্ত মহাসাগ‌রের ধা‌রে ‌নি‌য়ে যে‌য়ে নীল পা‌নি দে‌খি‌য়ে নি‌য়ে আস‌লো এবং তারপর এক এক ক‌রে বেইজ ক্যা‌ম্পের গুরুত্বপূর্ণ ইনস্ট‌লেশন ঘু‌রি‌য়ে আবার আন‌লো অব‌শে‌ষে জাঁকজমকপূর্ণ পূ‌র্বের সেই স্বনামধন্য অ‌ফিসার মে‌সে। আহ্ মনটা খুব খারাপ লাগ‌ছে এ মূহু‌র্তে, ভাবলাম এক বছর কিভা‌বে পরবাসী থাক‌বো এভা‌বে বি‌দেশ বিভুঁই‌তে? মুহূর্তের ম‌ধ্যে ছোট বাবু, সহধ‌র্মিনী, স্নেহময় আব্বা ও মার কথা ম‌নে পড়ে গে‌লো। 

এখনও ঘন্টা চা‌রেক বা‌কী। কি করা যায়, শরীরটা ভীষন ক্লান্ত ম‌নে হ‌'চ্ছিল যেন সারা শরী‌রে চোর পিঁটুনী দিয়ে‌ছে কেউ। ই‌তোম‌ধ্যে সেই ইউএস নেভাল সা‌র্জেন্ট আমা‌দের‌কে রে‌খে মি‌নিবাস নি‌য়ে তার আপন জায়গায় প্রস্হান ক‌'রে‌ছে স্হানীয় সময় ঠিক বিকাল চারটায় ফির‌বে জা‌নি‌য়ে। বিশ্রামরু‌মে যে‌য়ে জানালা দিয়ে পূর্ব‌দিকে উ‌ঁকি দি‌তেই চো‌খে পড়লো রাজধানী হনুলুলুর নয়না‌ভিরাম দৃশ্য। 

আর তিন ঘণ্টা বাদ আবারও একটানা ১২ ঘণ্টাব্যাপী একই প্র‌ক্রিয়ায় আকা‌শে উড়তে হ‌বে, ত‌বে এবার খুশীর খবর হলো আকাশ থে‌কে আকাশে অথবা 'Air to air refueling' অর্থাৎ এক প্লে‌ন থে‌কে অন্য প্লে‌নে জ্বালানী সরবরাহ করা লাগবেনা কারণ এ কাজ‌টি এবার হনুলুলু আন্তর্জা‌তিক বিমান বন্দর থে‌কে বিমান কর্তৃপক্ষ সে‌রে নে‌বেন। আমা‌দের পরবর্তী গন্তব্যস্হল পোর্টোরি‌কোর সেনা প্র‌শিক্ষণ কেন্দ্র ক্যাম্প সা‌ন্টিয়া‌গো‌তে। যাই দে‌খি একটু বিশ্রাম নেওয়া যায় কিনা? 


চল‌বে....

অমৃতা চট্টোপাধ্যায় 




যখন বৃষ্টি মাখে শহর 



যখন বৃষ্টি মাখে শহর 
মৃত্যুর দিন মনে পড়ে 
চৌরাশিয়ার বাঁশিতে সুর 
কেউই মুখোমুখি নই  
পাতাগুলো হলদেটে হয় 
ভাঙা নৌকো 
জানি প্রভু, সন্ধেগুলোর নাম অনেক
তবুও মৃত্যুর দিন মনে পড়ে।

নিগার সুলতানা





শিশির বিন্দু জল


মুক্তমনা আকাশ রে তুই
তুই যে আমার পৃথিবী! 
তোর মাঝে পাই যে খুঁজে
হাজার সুখের স্বপ্নগুলি।

পূর্বাকাশের সূর্য রে তুই
মধ্যাকাশের চন্দ্রতারা!
নিত্য দিনের সঙ্গি যে তুই
এই তো জীবন গড়া।

তুই যে আমার রূপের শিখায়
শুভক্ষণের সেরা সখা,
তোকে বিহীন যায়না চলা
অন্ধকার মোর জীবন বৃথা।

নিয়তির পরিহাসে ঝড়ানো
তুই যে আমার বিধির বিধান,
চাওয়া পাওয়ার দুঃখ ব্যথায়
তুই আমার একরাশ অভিমান।

মধুর কন্ঠে বেজে উঠা শিল্পি যে তুই
মিষ্টি সুরের গান!
অধিক সময় মন মাতিয়ে
গাই যে গুণগান।

তুই যে আমার মিষ্টি প্রভাত
শিশির বিন্দু জল!
শেষ বিকেলের আভা রে তুই
 সদ্য ফোটা ফুল।

তুই যে আমার উৎজ্জল প্রদীপ
বকুল ফুলের মালা!
তুই যে আমার গলারই হার
হাতের কাঁকন বালা।

রাবেয়া পারভীন ১০ম পর্ব





স্মৃতির জানালায় 
(১০ম পর্ব) 
রাবেয়া পারভীন




                       এতোক্ষন ধরে একটা কথাও বলেনি শবনম। অন্যান্য দিন মাহ্তাব খেতে বসলে  শবনম জোর করে এটা ওটা পাতে তুলে দিত। মাহতাবের  অন্যমনস্কতা  ভাংগিয়ে দিয়ে  খালাম্মা বললেন  
-কি ব্যাপার মাহতাব  খাচ্চো না কেন ?  শবনম  তুইওতো খাচ্ছিস না,  কি হলো ? 
মাহতাব  তারাতারি বলল 
-খাচ্ছি তো 
খালাম্মা বললেন 
- রাত বেশী হয়ে গেছে তাই ক্ষুধা মরে গেছে। খেতে ভাল লাগছেনা। 
-না না খালাম্মা খুব ভালো রান্না হয়েছে  ভালো লাগছে। কোথায় আর বেশী রাত হল!  আমি তো প্রায়ই  পত্রিকা  অফিস  থেকে  অনেক রাত করে ফিরি,  খেতে খেতে বারোটা বেজে যায়। বেশী রাত করাটা অভ্যাস  হয়ে গেছে। 
খালাম্মা হাসলেন।  বললেন
- এবার  তাহলে  একটা বিয়ে কর বাবা ।  বউ ঘরে আন।  জীবনটাকে একটু গুছিয়ে নেবার চেষ্টা কর
খালাম্মার কথায় মৃদু হেসে মাথা নীচু করে খেতে লাগলো মাহতাব। বাবলু  শিপলু  একসাথে কোলাহল করে উঠল
- মাহতাব  ভাই সত্যি  এবার একটা ভাবী নিয়ে আসুন, আমরাও মাঝে মাঝে গিয়ে একটু আবদার করতে পারবো
খালাম্মাও স্যারকে উদ্দেশ্য  করে বললেন
- শুনছো , এবার ছেলের জন্য  বউ খোজো,
স্যার। বললেন
- হ্যা ভাবছি
ওদের সবার কথার ফাঁকে  শবনম কখন  উঠে চলে গেছে  মাহতাব  টের পায়নি। হঠাৎ মাথা তুলে দেখে শবনম নেই। ততক্ষনে মাহতাবেরও  খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। সে একটা দ্বীর্ঘশ্বাস  ফেলে খাবার টেবিল ছেড়ে উঠে পড়ল।  বেসিনে  হাত ধুয়ে রুমালে হাত মুছতে  লাগলো। খালাম্মাও খাওয়া শেষ করে বেসিনের সামনে  মাহতাবের পাশে এসে দাঁড়ালেন। প্রায় ফিস ফিস করে  মাহতাবের দিকে তাকিয়ে বললেন
- মাহতাব যাওতো বাবা,  শবনমের কি হয়েছে একটু দেখ ,  দুদিন ধরেই দেখছি মন খারাপ করে আছে। ওকে জিজ্ঞেস করো,  ওর কি  এই বিয়েতে মত নেই ?  
হাত মুছে শবনমের। ঘরে এলো মাহতাব।  হাটুতে মুখ গুজে  খাটের  এক কোনে  চুপচাপ বসে রয়েছে শবনম। খাটের অপর প্রান্তে বসে মাহতাব ডাকল
- শবনম,  এই শবনম  কি হয়েছে তোমার ?  
হাটু থেকে মুখ তুলে  মাহতাবের দিকে তাকালো শবনম। অবাক হয়ে মাহতাব দেখল শবনমের। কান্নাভেজা মুখ। বোকার মত  আবার  প্রশ্ন করল
- কি হয়েছে তোমার ?  কা্ঁদছো  কেন ?
ওড়নার  আঁচলে চোখ মুছে  জ্বলে উঠল  শবনম
-লজ্জা করেনা তোমার  এ কথা জিজ্ঞেস করতে ?
মুহূর্তের মধ্যে চুপসে গেল মাহতাব। বুঝতে  পারলোনা কেন শবনম তার সাথে রাগ করছে। কি অপরাধ তার। তাই। আবার বলল
- কেন। আমি কি করেছি ?
বুঝতে যখন পারছোনা  তখন। এখানে  এসেছো কেন।?  কে আসতে বলেছে ?  ও  আমার হাতে  অন্য  লোকে কেমন করে আংটি পরিয়ে  দেয়  তাই দেখে মজা করতে  এসেছো ?
- ছিঃ  শবনম  কি বলছো এসব।?
- ঠিকই বলেছি।  আমার যেদিন। বিয়ে হবে  সেদিন যদি  এই বাড়ী মুখি হও। তো  তোমার কপালে অনেক দুঃখ  আছে।
বলেই। আবার ফুপিয়ে কাঁদতে লাগল শবনম। হঠাৎ একটা দমকা বাতাসে যেন  মাহতাবের। মনের বন্ধ দুয়ার খুলে গেল। শবনমের ঐ কান্নাভেজা মুখ মাহতাবের। মনের পর্দা  সরিয়ে দিল। ছিঃ ছিঃ সে এতো  বোকা !  কেন এতোদিন বুঝেনি ? শবনমের। মত মেয়ে  তার মত এক সাধারণ  যুবক কে যে ভালোবাসতে পারে  এ যেন কল্পনারও অতিত। এতোদিন  নিরবে নিভৃতে সে একাকি শুধু শবনমকে ভালোবেসেছে। বিনিময়ে কিছুই আশা করেনি  শুধু চেয়েছে  শবনম  ভালো থাক  সুখি হোক। ওর মত মেয়ের যোগ্য  কারো কাছেই সে সমর্পিত  হোক। শবনম  যেন এক দামী হীরের ফুল।  এই হীরার টুকরো  সাজিয়ে রাখার মত জায়গা তার কোথায়।?  তাই এতোদিন সে কোন দুঃসাহস দেখায় নি । কত রাত কেটে গেছে নির্ঘুম শুধু শবনমকে  ভেবে। সেইসব  নিস্তব্ধ  রাতের  বেদনার কথা তো  শবনমকে বলা যাবেনা। শবনমের জন্য ই  শবনমকে  আড়াল। করেছিলো সে। তবে কি তার মত শবনমও  তাকে এতোদিন  ভালোবেসেছে ?  মাহতাবের যেন  বিশ্বাস  হতে চায়না।



চলবে......

শামীমা আহমেদ ২৮




শায়লা শিহাব কথন
অলিখিত শর্ত (পর্ব ২৮)
শামীমা আহমেদ 

বেশ কয়েকদিন জ্বরে ভুগে শিহাব আজ বিছানা ছাড়ল। শরীরটা বেশ দূর্বল লাগছে। ঘুম থেকে জেগে ঘরের চারিদিকে চোখ বুলালো। ঘরটা বেশ গোছগাছ করা। শিহাব বুঝতে পারছে না সবকিছু কিভাবে এত সুন্দর পরিপাটি করে রাখা। শিহাব নিজেকে সুস্থ ভাবছে। একবার হাত পা নাড়াচাড়া দিয়ে দেখে নিলো।হ্যাঁ ভালোই লাগছে। তবে বিছানাটা একেবারে এলোমেলো হয়ে আছে।খাটের পাশে বাটিতে পানি রাখা।জলপট্টি দেয়ার কাপড়ের টুকরাটা বালিশের 
পাশে পড়ে আছে।শিহাব বুঝতে পারছে না কিভাবে কি হলো! শুধু এটুকু মনে পড়ছে অফিসে বেশ খারাপ লাগছিল।দুপুরের পর পরই তাই অফিস থেকে চলে আসে।তারপর কোনমতে দরজা খুলে বিছানায় শুয়ে পড়ে।শিহাব দেখছে একটু দুরেই তার জুতা মোজা খোলা। গায়ে সেই দিনের অফিসের পোশাক। শিহাব আর কিছুই মনে করতে পারছে না।শিহাব পাশে রাখা মোবাইলটা হাতে নিলো। একেবারেই চার্জ নেই।শিহাব বুঝতে পারছে না সে কতদিন ঘুমিয়ে ছিল? নাকি সে কী রিপ ভ্যান উইংকেলের মত কয়েকশত বছর ঘুমিয়ে ছিল?
শিহাব বুঝতে পারলো সে প্রচন্ড জ্বরে  পড়েছিল।তবে এখন ভাল লাগছে।একটু ফ্রেশ হতে হবে।অফিসে যেতে হবে।এ'কদিনে অফিসের কী অবস্থা তা আল্লাহই জানেন।
শিহাব হাত বাড়িয়ে বেড সাইড টেবিল থেকে বেন্সনের প্যাকেটটা নিয়ে খুলে দেখলো মাত্র একটি স্টিক অবশিষ্ট!  শিহাব লাইটার ক্লিক করে সিগারেট স্টিকটা জ্বালিয়ে নিয়ে বেশ লম্বা একটা সুখটান দিল।যতকিছুই জীবনে পাওয়া হোক না কেন যারা স্মোক করে তারা জানে পৃথিবীতে এরচেয়ে সুখকর আর কিছু নেই! শিহাবের মনে হলো জীবন থেকে সব দুঃখ ঝরে গেলো!
শিহাব বিছানা ছেড়ে উঠলো। মোবাইলটা চার্জে দিয়ে গিজারটা অন করে বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। চারিদিকে সকালের আলো।গাছের ডালে পাখিদের কিচিরমিচির ডাকাডাকি।শিহাব বুঝলো বেঁচে থাকটাই সবচেয়ে বড় পাওয়া।
দরজায় কলিং বেল।শিহাব দরজার কাছে এগিয়ে গেলো। দেখলো দরজার লক খোলাই আছে।শিহাব বেশ অবাক হলো! তবে কি এ'কদিন দরজাটা ভেরানো ছিল। তবে কী সেদিন আর দরজা লাগানোই হয়নি!
শিহাব দরজা খুলতেই দেখলো কেয়ারটেকার বেলাল দাঁড়িয়ে। হাতে বিশাল একটা ট্রেতে অনেক খাবার দাবার সাজানো। শিহাব অবাক দৃষ্টিতে বেলালেরে দিকে তাকালো। 
বেলাল বললো,নীচতলার অপুর আম্মু ম্যাডামে আপবার জন্য নাস্তা পাঠাইছে। 
এই কয়দিন আপনার কি  বেদম জ্বর! 
সেইদিন আমি ছাদে তালা দিয়া নামার সময় দেহি আপনার ঘরের দরজা খোলা।অনেকবার বেল দিয়াও যখন আপনার কোন আওয়াজ পাই নাই তখন ঢুইক্কা দেখি আপনি জ্বরে বেহুশ।আমি সারারাত আপনার পাশে বইসা ছিলাম।মাথায় জলপটী দিলাম।সেকি জ্বর? আপনি শুধু শায়লা শায়লা করতাছিলেন।আচ্ছা স্যার শায়লা কে? আপনার মাইয়া?
শায়লা! নামটা শুনে শিহাব এবার যেন নিজের মাঝে ফিরে এলো! সে রাতে বেলাল জলপটী দিয়েছিল? তবে যে সে শায়লাকে দেখেছিল।সে শায়লার হাত ধরে রেখেছিল।শিহাবের অনুভুতি বলছে শায়লা তার বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে ছিল।শিহাব গভীর  চিন্তামগ্ন হতে যায়।
বেলাল বলে উঠলো,স্যার নাস্তা রাইখখা গেলাম।ভালোমত পুরাডা খাইবেন।জ্বর থেকে উঠলে খুউব কাহিল লাগে।বেলাল নাস্তার ট্রে ডাইনিং টেবিলে রেখে ঘরে থেকে বেরিয়ে গেলো।শিহাব দেখলো বেশ যত্ন করে সাজানো নাস্তার বাটি পেয়ালা।শিহাব হটপট খুলে দেখল গরম লুচি।সাথে বাটিতে লাবরা সবজি,ঘন করে বুটের ডাল,ডিম পোচ,এক বাটি পায়েশ,দুইপিস পাউরুটিতে বাটার দেয়া।আর একটা ছোট্ট ফ্লাস্কে চা।খুব কিউট একটা ফ্লাস্ক! মনে হচ্ছে একটা পান্ডা বসে আছে।শিহাব পান্ডাটির দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো! হঠাৎ  শায়লার মুখটি ভেসে উঠল।শায়লা থাকলে নিশ্চয়ই ফ্লাস্ক থেকে কাপে চা ঢেলে দিতো।শায়লার কথা মনে হতেই শিহাবের মন চাইল ওকে একটা কল করতে।পরক্ষনেই ভেবে দেখল নাহ! এখন না।অফিসে গিয়ে  সময় নিয়ে কথা বলবে।শিহাব এক কাপ চা ঢেলে নিলো।সাথে সিগারেট স্টিকেও টান চলছে। দুটো শেষ করে শিহাব ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেলো।আহ! কতদিন পর আজ শাওয়ার ছেড়ে গোসল করবে। নিজের প্রিয় সুগন্ধির সাবান শ্যাম্পু দিয়ে আজ ওয়াশরুম সুগন্ধে ভরিয়ে দিবে।এইসব সৌখিনতা শিহাবের বহুদিনের!শিহাব গিজারের সুইচ অফ করে আকাশী নীলরঙা বড় টাওয়েল টা নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে  গেলো।
বেসিনের আয়নায় নিজেকে একবার দেখে নিল। দাঁড়ি গোঁফে মুখ একাকার। চুলও বেশ বেড়েছে।শিহাব বেসিনের কল ছেড়ে চোখ বন্ধ করে   মুখে বেশ কয়েক ঝাপটা পানি ছুড়ে দিলো।মনটা আনন্দে ভরে উঠল! ঠিক এই সময়টায় শায়লাকে খুব কাছে পেতে ইচ্ছে করছে। মনে হচ্ছে শায়লা যদি পেছন থেকে তাকে জড়িয়ে ধরত! ধূর! কি সব  আবোলতাবোল ভাবছে। শিহাব একহাতে  
 শেভিং ফোম স্প্রে আর আরেক হাতে রেজর নিলো।
আর মনে মনে ভাবলো অফিসে যাওয়ার সময় নীচতলার অপুর আম্মু ভাবীকে নাস্তার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে যাবে।

শায়লার প্রতিদিন এই একটিই কাজ। আর তা হলো দুপুরের জন্য রাতেই রান্নাবান্না গুছিয়ে রেখে  দেয়া।আর সকাল হলেই নাস্তা সেরে নিয়ে লিস্টি দেখে শপিংএ বেরিয়ে যাওয়া।
নাস্তার পর শায়লা গোছলের প্রস্তুতি নিলো। 
প্রতিদিন বাইরে যেতে হচ্ছে।ধুলাবালিতে চুলের  একেবারে যাচ্ছেতাই অবস্থা। খুব সুগন্ধযুক্ত শ্যামপু শায়লার পছন্দ। আর এরজন্য তাকে শ্যাম্পু কিনতে গিয়ে অনেকবার ঠকতেও হয়েছে।শায়লা শ্যাম্পুর ঘ্রাণ নিয়েই তার কোয়ালিটি না বুঝেই তা কিনবে। 
শায়লা বেশ সময় নিয়ে গোসল সারলো। তার চুলের ঘ্রাণে ঘর ভরে গেছে।শায়লা চুলের টাওয়েল খুলে আয়নায় সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখছিল। আর টাওয়েল দিয়ে ঘষে ঘষে চুল মুছছিল। হঠাৎ মনে হলো শিহাব তার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে! শায়লা স্পষ্ট শিহাবকে দেখতে পেলো! পরক্ষনেই ভাবলো যাহ! এসব কি ভাবছে? আসলে সারাক্ষণ শিহাবকে ভাবনা থেকে এসব হচ্ছে। কোনদিন কি এটা সম্ভব হবে? শিহাব শায়লার বেডরুমে দাঁড়িয়ে শায়লার ভেজা চুলের ঘ্রাণ নিচ্ছে আর শক্ত করে শায়লার একটা হাত ধরে রেখেছে! 
এসব কি অবান্তর ভাবনা ভাবছে সে! শায়লা নিজে নিজেই লজ্জা পেলো।আজ পর্যন্ত  সে শিহাবে চোখের দিকে তাকিয়ে কথাই বলতে পারেনি তা আবার এত ঘনিষ্ঠতায় তাকে ভাবা। শায়লা ঘড়ি দেখলো।এগারোটা বাজছে। শায়লা আজ মেরুন রংয়ের একটি শাড়ি পরলো। আয়নায় নিজেকে দেখে নিজেই মুগ্ধ হলো! শায়লা মায়ের কাছে থেকে টাকা নিয়ে শপিংয়ের জন্য বেরিয়ে গেলো।

শিহাব অফিসে পৌছে এ ক'দিনের জমানো কাজের মাঝে একেবারে ডুবে গেলো। শায়লাকে আর কল করা হয়নি।দুপুর দুইটা  বাজতেই লাঞ্চ টাইম হয়ে এলো। শিহাবের এবার যেন একটু ফুসরৎ মিললো। হালকা  কিছু একটা খেতে হবে।সকালে যে জম্পেশ নাস্তা হয়েছে।রাতের আগে আর ভারি কিছু খাওয়াই যাবে না। শিহাব শায়লাকে কল দিলো। মোবাইল বেজেই চলেছে। 

শায়লা  কেনাকাটায় ব্যস্ত।ব্যাগের ভিতর ফোন বেজেই চলেছে।হঠাৎ  দোকানের ছেলেটা বলে উঠল, আফা আপনার ফোন বাজতাছে। শায়লা ফোন বের করে দেখলো শিহাবের পাঁচটা মিসকল।হায়! কিভাবে এমন হলো! শায়লা দ্রুতই কল ব্যাক কিরলো। শিহাব এক রিংয়েই ফোন রিসিভ করলো।যেন শায়লার কলের অপেক্ষাতেই ছিল।
কেমন আছো শায়লা? কোথায় তুমি এখন? 
শায়লা জানালো সে ভাল আছে আর সে শপিং এ ব্যস্ত।শায়লা আরো কিছু বলতে চাইল কিন্তু শিহাবের এই একটা দোষ  শায়লার কথা ছাড়া সে আর কিছুই শুনতে চায়না।
শিহাব বললো,অনেকবার কল দিয়েছি।
শায়লা জানতে চাইল,তুমি কোথায়?
আমি অফিসে,তুমি?
আমি এইতো নর্থ টাওয়ারে আছি। 
লাঞ্চ হয়েছে?
না,কিছু একটা খেয়ে নিবো।আজ অনেক কেনাকাটা।
শিহাব বললো, সে হবে,তুমি নর্থ টাওয়ারের নীচে নেমে আসো।আমি আসছি। তোমাকে তুলে নিয়ে একসাথে লাঞ্চ করবো।শায়লা আর কিছু বলার আগেই শিহাব কল কেটে দিল।শায়লার সম্মতি অসম্মতির অপেক্ষা না করেই।
শায়লা কেনাকাটা বন্ধ রেখে লিফটে নীচে নেমে এলো।শিহাবের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো।শায়লার ভেতরে কেমন যেন একটা অনুভুতি হতে লাগলো। বারবার লিফটের বাইরে পায়চারী করতে লাগলো।শায়লা ঠিক বুঝতে পারছে না, শিহাব তাকে নিয়ে কতখানি ভাবছে।খুব বেশিদূর কি? নাকি শুধুই সময়ের বয়ে যাওয়া।
শিহাব চলে এলো। শিহাবের বাইকটা দেখে চেনা গেলো।শায়লা শিহাবের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো বেশ খেয়াল করে।চোখে সানগ্লাস দেয়া শিহাব হেলমেট খুলে  শায়লাকে ইশারায় কাছে ডাকলো। শায়লা কাছে যেতেই ঘাড় ঘুরিয়ে বুঝালো পেছনে বসো।শায়লার কেমন যেন একটা বাধা লাগল।কিন্তু শিহাবের অস্থিরতায় আর অমত করা গেলো না। শিহাব বাইকে স্টার্ট দিলো। শায়লা শিহাবের চমৎকার সুগন্ধিতে কোথায় যেন হারিয়ে গেলো! শায়লা আজ বেরুবার আগে ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি আজ শিহাবের সাথে তার দেখা হবে!আচমকা এমন প্রাপ্তি বেঁচে থাকার ইচ্ছে জাগায়।
সিগনালে বাইক থামতেই শায়লা দেখলো  শিহাব আজ চমৎকার রঙের একটি টি শার্ট পরেছে। কি জানি কোন কারণে শায়লার শিহাবকে খুব আপন মনে হলো।সে  শিহাবকে বেশ শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। আর ভাবতে লাগলো সেই গানটি,,,এই পথ যদি না শেষ হয়,,,,! সিগনালে সবুজ বাতি জ্ব্বলে উঠলো,শিহাব বাইকে স্টার্ট দিলো।


চলবে...

শান্তা কামালী৩৭




বনফুল
পর্ব  (৩৭)
শান্তা কামালী

ডাক্তারের পাঠানো ভদ্রলোক টি ঘরে এসে প্রথমেই দেখে নিলেন সিলিংয়ে হুক লাগানো আছে কি-না। তারপর একটা টেবিল এনে তার ওপর উঠে সেই হুকের সাথে একটা কপিকল বেঁধে দিয়ে, একটা রশি কপি কলের ভেতর দিয়ে টেনে এনে জুঁই য়ের বিছানার মাথার দিকে জানালার গ্রিলের সাথে আরেকটা কপিকল বেঁধে তার ভেতর দিয়ে এনে নিচের দিকে ঝুলিয়ে দিলেন। 
এরপর একটা স্টিলের তৈরি অর্ধচন্দ্রাকার মতো যন্ত্র, যার ভেতর দিকে নরম প্যাড লাগানো, সেটা জুঁই য়ের ঘাড়ে পেছনের দিকে রেখে একটা তিতলী লাগানো স্ক্রু কে আস্তে আস্তে ঘুরিয়ে ঘাড় এবং দুটো থুতনিতে  সাবধানে আলতো করে লাগিয়ে দিলেন।তারপর মাথার ওপর থেকে ঝোলানো রশিটার একটা মাথা যন্ত্র টার সাথে বাঁধলেন। রশির অন্য মাথা টা য় একটা বঁড়শী র মতো হুক বেঁধে দিয়ে,ব্যাগ থেকে কয়েকটা লোহার চাকতি বের করলেন।সেগুলো কোনটা আধ পাউন্ড, কোনটা এক পাউন্ড ওজনের। সেই হুকটায় প্রথমে একটা এক পাউন্ডের চাকতি ঝুলিয়ে দিলেন। 
জুঁই তার খাটের ওপর পিঠের দিকে বালিশ দিয়ে সোজা হয়ে বসে আছে, আর ট্র‍্যাকশানের টানে ঘাড়টা সোজা হয়ে উপরের দিকে টান খেয়ে আছে। ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন, ব্যথাটা কি একটু আরাম হলো। জুঁই বললো, হ্যাঁ অনেক টা, বুকের ভেতরের চাপ টা একটু কম লাগছে। 
ভদ্রলোক বললেন, এরপর আর আপনাদেরকে বেশি কিছু করতে হবে না। এটা এক পাউন্ড দিয়েছি।এরকম ভাবে পাঁচ মিনিট থাকার পরে একটা আধ পাউন্ড ওজন হুকে জুড়ে দেবেন,তার পাঁচ মিনিট পরে আধ পাউন্ড টা নামিয়ে আরেকটা এক পাউন্ড  জুড়ে দেবেন। প্রথম দিন এই ভাবে ই চলুক।তারপর উনি কেমন বোধ করছেন, ফোনে জানাবেন, আমি তখন যে ভাবে বলবো, সেভাবে ওজন বাড়াবেন। এখানে মোট পাঁচ পাউন্ড আছে। দুটো আধ পাউন্ড, চারটে এক পাউন্ড। আর এইভাবে পনেরো মিনিট পরে ঘাড়ের কাছে এই স্ক্রু টা আস্তে আস্তে ঘুরিয়ে ঢিলা করে, এই ক্লাম্প টা কে ঘাড় থেকে খুলে নেবেন। দশ মিনিট বিরতি দিয়ে আবারও পনেরো মিনিট। তারপর উনি উঠে দাঁড়িয়ে নিজের দুটো হাত ঘাড়ে দিয়ে আঙুলের ভেতর আঙুল ঢুকিয়ে চেপে ধরে ঘাড় টা দশবার ডানে,দশবার বামে ঘোরাবেন। এটা দুবেলা ই আধা ঘন্টা সময় নিয়ে করতে হবে,মনে রাখবেন মাঝে দশ মিনিটের বিরতি দেবেন। এরপর বসে থাকতে পারে, বা চিৎ হয়ে শুয়েও থাকতে পারেন। আর হ্যাঁ, ডাক্তার বাবু বলে দিয়েছেন, ঔষধ গুলো ঠিক সময় মতো খেতে হবে। ব্যথার মলম টা ঘষে ঘষে লাগাবেন না।আলতো করে বুলিয়ে লাগিয়ে ব্যথার স্থান টা খোলা রাখবেন, যাতে হাওয়ায় মলম টা শুকোতে পারে।
ভদ্রলোক চলে গেলেন। জুঁই য়ের আব্বু পলাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, এই যে ম্যানেজমেন্টের ছাত্র, ঠিক মতো বুঝে নিয়েছো তো,তোমার ম্যানেজমেন্টের কোর্স তোমাকে ই করতে হবে। আমরা সময় দিতে পারবো না।দুবেলা হাজিরা চাই। 
পলাশ লজ্জা পেলো।চুপ করে  ঘাড় নেড়ে সায় দিলো।
জুঁই য়ের আম্মু সাথে সাথে বললেন, আর দুবেলা র নাস্তা টা একসাথে এখানে ই করবে কিন্তু বাবা।না বলতে পারবে না। পলাশ আরো লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে মাটির দিকে তাকিয়ে আছে। ওনারা নিচে চলে গেলেন।
জুঁই মুচকি হেসে বললো, ঠিক  হয়েছে, বেশ হয়েছে। 
পলাশ বললো, কি ঠিক হয়েছে? 
জুঁই বললো, বুঝতে পারছো না,বাবুমশাই? 
পলাশ বললো,হুমম,বুঝলাম।
কি বুঝলে? 
এখন থেকে দু'বেলা ডিউটি হয়ে গেলো। 
হুম, আমিও দু'বেলা আরো বেশি করে কাছে পাবো তোমাকে। চিন্তা নেই দু'বেলা ই তোমার জন্য গাড়ি থাকবে। তবে, দুঃখ কি জানো?
কি? পলাশ জানতে চায়। 
জুঁই রহস্য করে বলে, দুঃখ একটা ই,গাড়িতে তোমার পাশে আমি থাকবো না।একটা কাজ করো,একটা বড়সড় বার্বি ডল কিনে পাশে বসিয়ে রেখো।কিন্তু তার হাতে কিন্তু.......। কিছুক্ষণ থেমে জুঁই আবার বলে চুক চাক কোরো না। বলেই হেসে ফেলে জুঁই । 
পলাশ বলে,দুষ্টুমি হচ্ছে? ওটা আমি করি,না তুমি? আঙ্কেল আন্টি শুনতে পেলে কি হবে বলোতো? 
জুঁই বলে, ওরা যেন জানে না!
কি বললে,জানেন? পলাশ মাথায় হাত দিয়ে ধপাস করে চেয়ারে বসে পড়ে।


চলবে.....

১০ ডিসেম্বর ২০২১

শান্তা কামালী ৩৬ পর্ব 





বনফুল
( ৩৬ পর্ব ) 
শান্তা কামালী

ব্যথার যন্ত্রণায় জুঁই কাতরাচ্ছে দেখে পলাশের নিজের অজান্তেই চোখে পানি জলে এলো....... 
জুঁই তা দেখতে পেয়ে  বললো তুমি কাঁদছো কেন?  আমার তেমন কোনো কষ্ট হচ্ছে না।পলাশ বুঝতে পারছে শুধুমাত্র শান্তনা দেওয়ার জন্য জুঁই তা বলছে।  এমন অবস্থায় কারো কষ্ট হয় তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।  পলাশ জুঁইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, আর বলছে জুঁই তুমি একটু ঘুমানোর চেষ্টা করো... 
এর কিছুক্ষণের মধ্যেই ময়না জুঁই আর পলাশের নাস্তা নিয়ে রুমে এলো। ময়না টেবিল এগিয়ে দিয়ে নাস্তা, পানি সব গুছিয়ে দিয়ে নিচে নেমে গেল।
 পলাশ উঠে বেসিনে হাত ধুয়ে এসে, দুটো বালিশে জুঁইকে উঠিয়ে হেলান দিয়ে বসিয়ে নাস্তা খাওয়াচ্ছে। জুঁই বারবার বলছে তুমিও এক সাথে খাও, পলাশ বললো আগে তোমাকে খাইয়ে নিই তারপরে আমি খাবো। জুঁইয়ের নাস্তা খাওয়ানো শেষ  করে পলাশ উঠে গিয়ে বেসিনে হাত ধুয়ে এসে জুঁইয়ের মুখ ধুয়ে দিয়ে টিস্যু পেপার দিয়ে মুছে দিলো, তারপর নিজেও নাস্তা খেয়ে নিলো। 
ততক্ষণে ড্রাইভার গিয়ে ঔষধ নিয়ে এলো, পলাশ জুঁইকে ঔষধ খাইয়ে শুইয়ে দিলো। পলাশ  বললো, জুঁই তুমি একটু ঘুমানোর চেষ্টা করো, আমি তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি। এরইমধ্যে জুঁই ঘুমিয়ে পড়েছে দেখে পলাশ নিচে নেমে এসে দেখছে জুঁইয়ের বাবা-মা র মাথায় চিন্তায় যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে। 
পলাশকে দেখে জুঁইয়ের মা হাউমাউ করে কান্না করতে শুরু করলেন।পলাশ বললো আন্টি আপনি কাঁদবেন না, আমরা সবাই আছি জুঁইকে ঠিক সুস্থ করে তুলবো। পলাশের মুখে এই কথা শুনে মনোয়ারা বেগম একটু স্বস্তি পেলেন, ঘড়িতে দশটা বাজতেই অর্থপেডিক টেকনিশিয়ান চলে এলেন। পলাশ ওকে নিয়ে জুঁইয়ের রুমে গেলো, সাথে জুঁইয়ের বাবা-মা ও গেলেন।



চলবে....

সুচিতা সরকার এর কবিতাগুচ্ছ


সুচিতা সরকার এর কবিতাগুচ্ছ



কবিতা সংলাপ 



এক

ঘুমের পাতলা আস্তরণের নীচে,
একটা খরস্রোতা নদী অবিরাম বয়ে চলেছে।
পাহাড়, জঙ্গল, গ্রাম, গঞ্জ পেরিয়ে,
ছুটে চলেছে সে, নীল সাগরের পানে।
একটা মোহনার খোঁজে, 
প্রতি রাতে সে বার বার ফিরে আসে।
প্রতিটা জন্ম যন্ত্রণা তাকে আরও গভীর করে।
কখনও কালো কখনও সাদা চাঁদের আলোয়,
নীলাভ দিগন্ত তাকে হাতছানি দেয়। 

একটা সম্পূর্ণ জীবন যদি,
একটা রাতের সময় পেতো,
হয়তো খুব ভালো হতো। 




দুই



হয়তো কোনোদিন সে চাইবে ফিরে,
ছুঁতে চাইবে ফেরার পথ,
হয়তো সেদিন বৃষ্টি ভেজাবে,
রাঙামাটির মেঠো পথ।
অস্তামিত সূর্যের গায়ে, হয়তো লাগবে,
আগামী ভোরের আলো,
সব ব্যাথা কি মন ভুলে যাবে সেদিন?
না কি বলবে, ধূলাই ভালো। 




তিন



শীতের আস্তরণে ধীরে ধীরে ডুবছে শহর।
আমায় হাতছানি দেয়, 
তোর বুকের উষ্ণতার লহর।
চুপি চুপি ঠান্ডা জমছে মেঘের ঘরে।
ভোরের কাছে এখন শুধুই ওসের খবর।
বৃষ্টির উঠোনে আজ, শুকনো পাতার ঝড়।
ঘরের দোরে ঠায় বসে আমি
দেখছি শুধু  রাত-দিনের  অন্তর।
দূরে কোথাও ভিজে যায় আঁচল,
নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে হলুদ বালুচর।
আমাদের পায়ের চিহ্নগুলি এঁকে যায়, 
নীল জলের গভীর তোড়। 




চার



অখিলে আজ শরতের মেঘ, 
ঢাকের বুকে আবার পড়েছে কাঠি।
মনে পড়ে যায় সেই বাসস্টপ-
তোর সাথে দাঁড়িয়ে দেখা, শেষ রঙিন বাতি।
প্রতি বছর ফেরে পুজো, ধরে শরতের হাত,
আমার আকাশ আর মাখে না নীল রঙ, 
ফোটে না ওতে কাশ। 
একদল ধূসর মেঘ, জমাট বাধে উঠোন কোণে।
ধুয়ে দিয়ে যায় আমার পুজোর সাজ,
প্রতিবার আনমনে।
এবারেও একটা ধূপ জ্বালিয়েছি, মায়ের ঘরে।
গন্ধ পাবি নিশ্চয়ই! আমার মন বলে।

বিশ্বজিৎ মণ্ডল





অভিমান


অভিমানেরও নিজস্ব বারান্দা আছে.....

অনুভব ক্রুদ্ধ হলে,মাশরুমের মত মেলে ধরি
অবুঝ ডানা
ঠিক তখন মানস উপবন বেয়ে একদল দুর্বৃত্ত
ছুটিয়ে যায়___হোর্ডিঙে আঁকা নীল ঘোড়া
 তারপর শহরটা নিকটস্থ হলে
ডাইরি থেকে তুলে আনি,ঈশ্বরকে লেখা
                                       যাবতীয় শব্দাবলি


শামীমা আহমেদ 






শায়লা শিহাব কথন
অলিখিত শর্ত (পর্ব ২৭)
শামীমা আহমেদ 



                                             জ ক'দিন যাবৎ শায়লার খুব ব্যস্ততা যাচ্ছে। একটা সুখবরে তাদের পরিবারে আনন্দের ঢেউ বইছে! অনেকদিন পর শায়লা তার মাকে যেন সেই আগের রূপে দেখতে পাচ্ছে। সেই যে স্কুলে যাবার দিনগুলোতে যেমন করে মা হাসত, মায়ের চোখটা সুন্দর আগামীর স্বপ্ন বুনতো, তেমনি করে মা যেন হাসছে, তার কর্মচাঞ্চল্য ফিরে পেয়েছে। প্রতিদিনই নানান আবদার বায়না আর দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে শায়লার কাছে নানান কিছুর চাহিদা বেড়েই চলেছে। শায়লা খুশি মনেই তা গ্রহন করছে।
গত সোমবার রাতে শায়লার ছোট বোন নায়লা সেই সুখবরটি শুনিয়েছে। মাত্রই তখন নায়লা আর মোর্শেদ  ডাক্তারের কাছে থেকে বাসায় ফিরেছে। খবরটি অবশ্য নায়লার শ্বাশুড়ি, শায়লার মা অর্থাৎ বিয়াইনকে জানিয়েছে।
সুখবর বিয়াইন,আপনি নানী আর আমি দাদী হতে যাচ্ছি!! দুজনের সেকি আনন্দ আর উচ্ছ্বাসের কথোপকথন!!অনেকদিন পর যেন  মায়ের মাঝে প্রাণ ফিরে এলো।

এরপর থেকেই চলছে তার নানান প্রস্তুতি।
শায়লা কাগজে লিস্টিতে একে একে সব লিখে রাখছে। ইতিমধ্যেই দুই পাতার লিস্টি হয়ে গেছে। শায়লা লিখছে আর সাথে নিজের মাতৃত্বের আবেশ আবেগ অনুভব করছে।এ এক অপার আনন্দ,দূর্লভ প্রাপ্তি!

এমন আনন্দের ঢেউয়ের ব্যস্ততায় বেশ ক'দিন হলো শিহাবের কোন খোঁজ  নেয়া হচ্ছে না।শিহাবের দিক থেকেও কোন সাড়া মিলছে না। শায়লা রাতের খাবারের পর সব গুছিয়ে প্রায় রাত এগারোটায় ঘরে এলো। 
ভীষণ ক্লান্তিতে শায়লা ঘুমের কোলে  ঢলে পড়লো। 

উত্তাল সাগরে প্রচন্ড ঢেউয়ের দাপটের মাঝে সাদা ধবধবে একটা বিশাল জাহাজ এগিয়ে চলছে।রাতের আলো আঁধারিতে ঢেউয়ের সাদা ফেনাগুলো যেন ফুঁসে উঠছে! শায়লা জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে। তাকে ঘেষে খুব কাছে শিহাব দাঁড়িয়ে। বাতাসে এলোমেলো চুলে বারবার শায়লার মুখটি ঢেকে যাচ্ছিল।জাহাজের দুলুনিতে শায়লা ভীষণ ভয় পাচ্ছিল! ক্রমশই জাহাজটি প্রচন্ড বেগে চলতে থাকে।শায়লা শিহাবকে খাঁমচে ধরে আছে।কিন্তু শিহাব শায়লার দিকে একেবারেই তাকাচ্ছে না। 
এমন একটি ভয়ার্ত স্বপ্ন দেখে শায়লার ঘুম ভেঙে গেলো!জেগে দেখলো সে ঘেমে নেয়ে একাকার।আজ ফ্যান না চালিয়েই  ঘুমিয়ে পড়েছিল।শায়লা বালিশের পাশে রাখা  মোবাইলটি তুলে নিলো।রাত একটা বাজছে। শায়লা শিহাবকে মেসেজ পাঠালো?
কেমন আছেন? আমি খোঁজ নেইনি বলে কী আমার একটা খোঁজ নেয়া যায় না? 

পাঁচ মিনিট  দশ মিনিট চলে গেলো, শায়লা বারবার মোবাইল স্ক্রিনে তাকাচ্ছে। কোন সাড়া নেই। এভাবে প্রায় তিরিশ মিনিট চলে গেলো। শায়লা বুঝতে পারছে না শিহাব কি কোন কাজে ব্যস্ত নাকি খাবার খাচ্ছে, নাকি ঘুমিয়ে গেছে।যে ক্লান্ত থাকে! একা একা খাবার নিয়ে খেতেও চায়না মাঝে মাঝে ।শায়লার মন মানছে না। এতদিন এভাবে কোন কথা বলা ছাড়া থাকা হয়নি।এবার শায়লা কল  দিল। শিহাব কল রিসিভ করলো।
কিন্তু কন্ঠটা কেমন যেন অন্যরকম লাগছে। 
শায়লার উৎকন্ঠিত জিজ্ঞাসায় উত্তর এলো, আমি খুব অসুস্থ।আজ দুপুর থেকে বেশ জ্বর। গত দুদিন অল্প অল্প ছিল কিন্তু আজ জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে।ঘরে শুধু আমি একা শুয়ে আছি।কিছুই ভালো লাগছে না। আমি সারাক্ষন আপনার একটা কলের অপেক্ষায় ছিলাম।
শায়লার ভেতরে অস্থিরতা খেলে গেলো!  আর বাইরে কপট রাগতঃ স্বরে শিহাবকে শাসনের সুরে বলে চললো, এভাবে ভাবলে কি চলবে? অসুস্থ হলে একটুতো জানাতে হবে,,আমি কি  দৈবক্রমে,টেলিপ্যাথিতে তা জেনে যাবো? শায়লা অভিমানের সুরে বললো, তাছাড়া আমি আপনার কে এমন, যে এতোখানি ভাববো?
শায়লার চোখ দুটো জলে ভরে উঠলো শুধু গড়িয়ে পড়ার অপেক্ষায়।

শিহাবের কন্ঠে যত অনুযোগের সুর ঝরে পড়লো।
কেন শায়লা, আপনি মনের ভেতরে টের পাননি যে আমি অসুস্থ? আপনার অনুভুতিতে কেউ বলেনি,প্রচন্ড তাপমাত্রা আমায় পুড়িয়ে দিচ্ছে,আর ভেতরে ভেতরে আপনার জন্য আমার দহন কয়লার আগুনের মত  জ্বলছে।যার জন্য আপনি এত আকুল হয়ে থাকেন, যাকে দেখার জন্য লোকচক্ষু উপেক্ষা করে ঘন্টার পর ঘন্টা বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকেন, যাকে এক নজর দেখার জন্য কান্নায় ভেঙে পড়েন,যে মাইলের পর মাইল  পথ পাড়ি দিয়ে শত ক্লান্তিতেও আপনাকে দেখার জন্য ছুটে আসে। যে আপনাকে বারান্দায় গ্রীলের ফাঁক দিয়ে শুধু একটু দেখার জন্য নানান বাহানায় সেই চেনা পথটা পেরিয়ে যায়,যে খাবার সামনে রেখে  আপনার উপস্থিতি দেখতে পায়, আপন মনে একা ঘরে অদৃশ্য আপনার সাথে কথা বলে চলে, চোখ বুঁজে কল্পনায় গানের সুরে যে আপনাকে ভেবে চলে,আপনাকে না ছুঁয়েও যে ছুঁয়ে যাওয়ার স্পর্শ টের পায়, যার শূন্য জায়গাটা আপনি পূর্ন করতে চেয়েছিলেন,সেই আপনিই তো বলেছিলেন আমাকে আপনি সম্পূর্ণ বুঝতে পারেন।তাহলে কেন বুঝলেন না আমি একা কেমন আছি।কেন এতদিন নীরব রইলেন।কেন খোঁজ নিলেন না বেঁচে আছি নাকি মরে গেছি?শায়লা কেন এমন নীরব রইলেন?
শায়লা,,,আমি সারাক্ষন ভেবেছি আমার দরজায় তুমি এসেছো।  বিছানার পাশে বসে আমার কপালে তোমার হাত রাখছো।শায়লা আমি তোমাকে কাল রাতে স্বপ্নে দেখেছি। আমার মাথায় তুমি জল ঢালছো আর আমি একদৃষ্টে তোমার মায়াভরা মুখটায় তাকিয়ে আছি।
জানো শায়লা, অনেকদিন হলো কেউ আমায় খুব যত্ন করে মুখে খাবার তুলে খাওয়ায় না,কেউ আমার গোসলের পর টাওয়েল এগিয়ে দেয় না,মাথার ভেজা চুল মুছিয়ে দেয় না, খুব আবেগে কাছে টেনে নেয় না,কিছু চাওয়া পাওয়ার আবদারে অস্ফুট স্বরে অভিমান গলে পড়ে না,কেউ আমার জন্য না খেয়ে দরজার কলিংবেলের  অপেক্ষায় থাকে না,কেউ আমাকে শার্টের সাথে প্যান্টের কালার ম্যাচ করিয়ে দেয় না,কেউ বলেনা আজ তোমার প্রিয় প্রিয় খাবারগুলো রেঁধেছি, তাড়াতাড়ি অফিস থেকে চলে আসো,কেউ আমাকে গরম স্যুপ ফুঁ দিয়ে খাইয়ে দেয়না, টিসু দিয়ে মুখ মুছিয়ে দেয়না।কেউ বলেনা আজ তুমি আমার কাছে থাকবে অফিসে যাবে না,কেউ বলে না তোমাকে ছেড়ে একা থাকতে আমার একটুও ভালো লাগেনা, কেউ বলেনা শুধু তোমাকে পেলেই আমার সব পাওয়া হয়,,শায়লা,
তুমিও আমাকে বুঝলে না।তুমিও আমাকে খুঁজলে না।তোমার মনে সাড়া এলোনা, আমার কষ্ট তুমি টের পেলে না?তবে কি আমার আপন বলে কেউ নেই? তবে কি ভেবে নিবো যার সাথেই হৃদয়ের টান থাকে সেই একসময় স্বার্থপর হয়ে যায়।আমায় ফেলে চলে যায়। কথাগুলো বলতে বলতে শিহাব একেবারে হাঁপিয়ে উঠলো। কিছুতেই থামছিল না।
শায়লা নিজেকে ভীষণ অপরাধী ভাবছে।জ্বরের ঘোরে শিহাব এলোমেলো বলছে।
বিরাট একটা ভুল হয়ে গেলো। শায়লা নিজেকে ধিক্কার দিচ্ছে। আসলেই সে স্বার্থপর হয়ে গেছে।শুধু নিযের উৎকন্ঠার দিনে শিহাবকে দেখতে চাওয়া। শিহাবের কলের জন্য অপেক্ষায় থাকা।শিহাবের কন্ঠ শুনে শিহরিত হওয়া।কখনো তার মনের দিকটা সে  ভেবে দেখেনি।শায়লা বুঝতেও পারছেনা,কবে থেকে শিহাব শায়লার জন্য এতটা আকুল হয়ে উঠলো।সেতো সবসময় নিজের আবেগকে আড়াল করে রাখে।
আজ শিহাব বুঝবে কাউকে আপন করে পেতে চাইলে সেটা তাকে বুঝতে দিতে হয় নয়তো অপর প্রান্তে, না বুঝা মনে কেবল দূরত্বই বাড়তে থাকে। শায়লা খুবই অনুশোচনায় পড়ে গেলো।একদিন অবসরে খোঁজ নেয়া উচিত ছিল।শায়লা দেখেছে  যখনই সে একটু অনত্র ব্যস্ত হয়েছে তখনি শিহাবের একটা ঝামেলা হয়েছে।শায়লার ইচ্ছে হচ্ছে এখুনি  ছুটে শিহাবের বাসায়  যেতে।  ওর পাশে বসে কপালের জলপট্টি বদলে দিয়ে  জ্বরকে বুঝিয়ে দিতে তুমি যতই আবাস নিতে চাও না কেন আমার জাগয়াটা কখনোই ছাড়বো না। পৃথিবীতে পুরুষরা শুধু বদনামেরই ভাগীদার হয়। নারীরা পুরুষের  সহিংসতার শিকার হয়।কিন্তু কত কতজন যে সমাজ সংসারে সম্মান রক্ষার্থে নিজেকে নীরবে নিভৃতে ক্ষয়ে ক্ষয়ে তিলে তিলে  শেষ করে দেয়,তাবৎ পুরুষকুলেরই তা অজানা রয়ে যায়। আবার নিন্দার কালিমা নিয়েও কত জন  উদ্ধত আচরণে নির্লজ্জের মত চলে। কিন্তু শিহাবের ভেতরে যেন একটা নিষ্পাপ শিশুর বাস। শায়লা টের পেলো শিহাব খুব শক্ত করে শায়লার হাতটি ধরে আছে। যেন বলতে চাইছে তোমাকে আমি  কোনভাবেই আর যেতে দিবো না। শায়লার  চোখ থেকে টপটপ করে জল পড়ছে।জ্বরের ঘোরে, গভীর ঘুমের শিহাবের দিকে তাকিয়ে শায়লার খুব মায়া হতে লাগল।ভেতর থেকে কে যেন বলে উঠলো, শিহাব, তোমাকে ছেড়ে আমি কোনদিনই যাবো না। আজীবন আমি তোমার হয়েই থাকবো।খুব আলতো করে শায়লা ঘুমন্ত শিহাবের বুকে মাথা রাখল।পরক্ষণেই আচমকা শিহাব দুহাতে শক্ত করে শায়লাকে তার বুকের সাথে বেঁধে রাখল।



চলবে...

জাফর রেজা'র অণুগল্প

 



মায়ের চিঠি 


খোকা, বাড়ির সাবার সাথে কেমন আছিস, আমারও বেশ কাটছে দিন  বৃদ্বাশ্রমে। প্রতিমাসে একবারও কি আসা যায়না খোকা, আমাকে একটু খানি দেখতে কি ইচ্ছা করেনা ?  তুই কি বুঝিছনা তুই চোখের সামনে না থাকলে আমি কতটা অস্হির হতাম, পৃথিবী অন্ধকার  হয়ে যেতো, আজও হয় মায়ের মনতো বাধঁন ছিঁড়তে পারিনা, আজও এখানে তোর পথ চেয়ে থাকি, সন্ধা গুলো কাটতে চায়না, দাদু ভাইকে নিয়ে সময় কাটানোর সেই সময় গুলো খুব মনে পরে। 
যাক বউমা কেমন আছে ?  আমার রুমে তো বউমার বোনের পড়াশোনার জন্য জায়গা করে দিলি, আমার জায়গা হলো বৃদ্বাশ্রমে। নিশ্চয় ওর পরিক্ষা ভালো হয়েছে।
সত্যি কথা বলতে কি খোকা জানিস সংসারে  যখন কেউ যখন বোঝা হয়ে তখন হয়তো  নিজেকেই নিজের মাঝে মাঝে বোঝা মনে হয়।
ভালো থাকিস সুখে থাকিস দোয়া রইলো খোকা।

মোঃ হা‌বিবুর সাহেব  ৪র্থ পর্ব






ইউএন মিশ‌নে হাই‌তিতে গমণ
( ৪র্থ পর্ব ) 
মোঃ হা‌বিবুর রহমান

যাই হোক, এভা‌বেই আমরা হাওয়াই‌য়ের রাজধানী হনুলুলুর দি‌কে চল‌ছি আর চল‌ছি, পথ যেন আর শেষ হয়না। একসময় আন্তর্জা‌তিক ফ্লাই‌টে ভ্রমণ করার জন্য যেমন‌টি লালা‌য়িত ছিলাম ঠিক আজ এর উ‌ল্টোটিই যেন অনুভব ক'র‌ছি। প্রায় ১৬ ঘণ্টা উ‌ড়ে ফে‌লে‌ছি কিন্ত‌ু কেউ কিছু‌ইতো ব‌'লছে না। 

পুরা ভ্রমণটাই পার ক'রলাম প্রশা‌ন্তের নীল পা‌নি আর সামু‌দ্রিক জাহা‌জের বহর দেখ‌তে‌ দেখ‌তে তাও আবার ক্ষু‌দে আকৃ‌তির সেই যেন ছিপ খান তিন দাঁড় ‌গো‌ছের সমুদ্র জাহাজ। যা‌হোক, আমা‌দের ফ্লাই‌টের সর্ব‌জ্যেষ্ঠ অফিসার সবাই‌কে এরই ম‌ধ্যে এলান ক‌'রে দি‌য়ে বল‌লেন "Gentleman, we are very soon going to land at Honululu International Airport". 

মনে ম‌নে ভাবলাম, যাক, বাঁচা গে‌লো বু‌ঝি তাহ‌'লে বাবা, বিশাল একটা ধক্কল গে‌ছে ই‌তিম‌ধ্যে প্রায় সা‌ড়ে ষোল ঘণ্টা পার ক‌রে‌ছি এই ঢাউসাকৃ‌তির বিশাল আকাশযা‌নে কিন্তু আর কত? ম‌নে হ‌'চ্ছিল আকা‌শের বু‌ঝি স্হায়ী বা‌সিন্দাই হ‌'য়ে যা‌বো, দীর্ঘ সময় থাক‌তে থাক‌তে পুরা প্লেনটাই বু‌ঝি একদম নি‌জের বা‌ড়ি‌তে প‌রিণত ক‌'রে ফে‌লে‌ছিলাম। 

একটু পরেই সম্পূর্ণ হাওয়াই দ্বীপটাই দৃশ্যমান হ‌লো, ই‌তোমধ্যে আমা‌দের হাওয়াই জাহা‌জেরও গ‌তি অ‌নেক ক‌মে এ‌সে‌ছে, পাইলট অ‌ল্টিচ্যুড ক‌মি‌য়ে সঠিকভা‌বে অ‌তি সন্দর্প‌নে ল্যান্ড করার কা‌জে ব্যস্ত। ম‌নের গভী‌রে সেই পার্ল হারবার নামক জায়গা‌টি যেখা‌নে জাপান আ‌মে‌রিকান‌দের তুমুল‌ছে একটা মার দি‌য়ে‌ছিলো সেই জায়গা‌টি বার বার খোঁজার অ‌ভিপ্রা‌য়ে অনুস‌ন্ধিচ্ছু মনটা আমার কাজ ক'র‌ছি‌লো। 

এরই ভিতর কে যেন আমা‌দের পাসপোর্টগু‌লো নি‌য়ে গে‌লো ই‌মি‌গ্রেশন করার নিয়‌তে। ভাব‌ছিলাম, এ ভ্রম‌নের মজাটাই বু‌ঝি এই ইমি‌গ্রেশন এবং পাসপোর্ট করাটা যা এ‌কেবা‌রে টেরই পাই‌নি কে কিভা‌বে কখন সম্পন্ন ক‌'রে ফে‌লে‌ছে।

যা‌হোক, এরই ম‌ধ্যে আমা‌দের গগণতরী বা‌মে কাত হ‌'য়েছে, একবা‌রে ৭০০-৮০০ ফুট উচ্চতায় বু‌ঝি নে‌মে এ‌সে‌ছে, বিশালাকার এক হাওয়াই দ্বী‌পের জল-জ্বলন্ত জীবন্ত ম্যাপটি অক্ষির সম্মু‌খে এখন পূ‌রোদস্তুর যেন ছ‌বির মত দৃশ্যমান। সে এক অভাবনীয় মুহূর্ত। কারণ, এটাই আমার জীব‌নে প্রথম কোন বি‌দে‌শের মা‌টি‌তে পা ফেলা। ধী‌রে ধী‌রে প্লেনটা একবা‌রেই ভূ-পৃ‌ষ্ঠের খুবই কাছাকা‌ছি চ‌'লে এ‌সে‌ছে-এই বু‌ঝি তার প্রথম চাকাটা ফেল‌বে রানও‌য়েতে।

রাজধানী হনুলুলুর ঠিক মাথার উপর দি‌য়ে অ‌তি নীচু দি‌য়ে রান‌ে‌য়েতে তার পা‌ ছোঁয়ার অ‌ভিপ্রা‌য়ে প্লেন‌টি এ‌কেবা‌রে নী‌চে নে‌মে এ‌সে‌ছে, ভয় হ‌'চ্ছিল এই বু‌ঝি কোন এক উঁচু বি‌ল্ডিং‌য়ের সা‌থে বা‌ড়ি খে‌য়ে এখনই আছ‌ড়ে প'ড়‌বে! 

অতি দক্ষভা‌বেই দক্ষতার স্বাক্ষর রেখে দক্ষ পাইলট‌টি অতঃপর ০৬ সে‌প্টেম্বর ১৯৯৪ সাল আনুমা‌নিক বেলা ১০ ঘ‌টিকার সময় হনুলুলুর আন্তর্জা‌তিক ‌বিমানবন্দ‌রে ‌বেশ নীর‌বে-‌নিঃশ‌ব্দে কোনরকম ঝা‌মেলা ছাড়াই ল্য‌ান্ড ক'র‌লো, আলহামদু‌লিল্লাহ্। 

১৭ ঘণ্টা একটানা আকা‌শে উড়লাম অথচ সম‌য়ের একটুও প‌রিবর্তন ঘ'ট‌লো না, এটা যেন একটা অ‌বিশ্বাস্য আর কিছ‌ুটা ভুঁতু‌ড়ে ব্যাপার-স্যাপা‌রের মত ব'ই‌কি?

যা‌হোক, পাইল‌টের এই ঝা‌মেলা‌বিহীন ল্যা‌ন্ডিং‌য়ের ব্যাপা‌রে মুহূ‌র্তের ম‌ধ্যে এটা একটা যেন আ‌লোচনার বিষ‌য়ে রূপ নি‌লো। এটা কিভা‌বে সম্ভব হ‌লো? প্রথমতঃ আকাশ প‌থে অ‌তি দক্ষতার সা‌থে জ্বালানী সরবরাহ অর্থাৎ (Air to air refuelling) এর সময় দ্বিতীয়তঃ ল্যান্ডিং‌য়ের সময় যাত্রী‌দের টের না পাওয়া, এগু‌লো কিভা‌বে সম্ভব হ‌লো ইত্যা‌দি? 

কেউ বল‌তে লাগ‌লো "প্লেন যত বড় হবে ল্যা‌ন্ডিংটা ততটাই আরামদায়ক হ‌বে", ম‌নে হ‌'চ্ছিল সবাই মুহূর্তের ম‌ধ্যেই যেন এক একজন বিমান বি‌শেষজ্ঞ ব‌নে গে‌ছে। আবার অ‌নে‌কে বল‌তে লাগলো যে, দেখোনা মোটা মান‌ু‌ষদের রাগ কম থা‌কে তারা সহ‌জে রা‌গেনা। তাই বু‌ঝি বড় আকৃ‌তির এই প্লেনটি রাগ ক‌'রে আমা‌দের সবাই‌কে আছ‌ড়ে ফে‌লেনি এমন আর‌কি। এখা‌নে বেচারা দক্ষ পাইল‌টটির যেন কে‌ান ভূ‌মিকা কিংবা কে‌ান অবদানই নেই।

‌বেশ সাজা‌নো-গোছা‌নো এয়ার‌পোর্ট। নামার আ‌দেশ আসার সা‌থে-সা‌থেই ভোঁ ক‌রে একটা ফার্ষ্টক্লাস মা‌নের মি‌নিবাস আমাদের মা‌র্কিন নেভাল বেই‌জের প্রাসাদসম একটা বি‌ল্ডিং‌য়ের কা‌ছে না‌মি‌য়ে ‌দিলো। থাক আজ সে বর্ণনায় এখন আর না যাই। 

খানিকক্ষ‌ণের ম‌ধ্যে একজন দৈত্যসম নেভাল সার্জেন্ট এ‌সে হা‌জির হ‌'য়ে বল‌লো " Sir, are you ready? You have 09 hours break here. I will first take you to our Neval Officers' Mess; you will take your bath there and then I will move around along with you guyes and show the important places of our base, OK Sir"?

আ‌মি তা‌কে জিজ্ঞাসা করলাম " পার্ল হারবারটা ঠিক কোন‌দি‌কে? সা‌র্জেন্ট কোন উত্তর না দি‌য়ে একটু মুচকি হাস‌লো। যা‌হোক, তার মুচ‌কি হাসার বিষয়টি ১০ মি‌নিট প‌রেই আমার সম্পূর্ণ প‌রিস্কার হ‌'য়ে গিয়ে‌ছি‌লো, সেটা প‌রে আপনা‌দের‌কে বল‌বো।

ম‌নে ম‌নে বললাম, ভীমাকৃ‌তির বিশালাকার ছয় ফুট দুই ই‌ঞ্চি লম্বাসম মানুষ‌টির কা‌ছে আ‌মি বড্ডই বেমানান এ‌ যেন বাংল‌া সি‌নেমার দৈত্য, "আ‌দেশ ক‌রেন মহাশয়" টাই‌পের কিছু একটা হ‌বে বোধ করি। য‌া‌হোক, সবাই ‌মি‌নিবা‌সে দেয় সময়ের ম‌ধ্যে আসীন হ'লাম। আমা‌দের গা‌ড়ি চ‌লে‌ছে মা‌‌র্কিন নেভাল বেই‌জের অ‌ফিসার মে‌সের দি‌কে। 

রাস্তার দু' পাশ দে‌খে মনে হ‌'চ্ছিল এ‌ যেন সবুজ কোন ঘাসনা? চা‌রি‌দি‌কে বোধ ক‌'রি মা‌র্কিনীরা সবুজ কা‌র্পেট বি‌ছি‌য়ে রে‌খে‌ছে। আমা‌দের মিনিবাস নেভাল অ‌ফিসা‌র মে‌সের খুব কাছাকা‌ছি এ‌সে প‌'ড়ে‌ছে ব‌লেই হঠাৎ ক‌'রে সার্জেন্ট বল‌লো "Sir, let's get down".

চল‌বে.....

রাবেয়া পারভীন ৯ম পর্ব




স্মৃতির জানালায়  
(৯ম পর্ব)  
রাবেয়া পারভীন



                                    তাঁকে দেখেই স্যার স্বস্নেহে  কাছে ডাকলেন। মাহতাব এগিয়ে গিয়ে স্যারের কাছে বসল। রহমান সাহেব মেহমানদের সাথে তাঁকে  পরিচয় করিয়ে দিলেন। বললেন।
- এই হলো মাহতাব। আমার ছাত্র ছিলো খুবই  ভাল ছাত্র। এখন  সাংবাদিকতা  করছে। এখন আর ছাত্র নয় , এখন ও আমার বড়ো ছেলে।
স্যারের কথায়  ওর মনটা হালকা হয়ে গেল। খুব ভালো লাগলো তার।এবার নীচুস্বরে স্যারকে বলল
- স্যার খালাম্মা জিজ্ঞেস করতে বলেছেন, মেহমানদের খাবার আগে দেয়া হবে নাকি আগে মেয়ে দেখা হবে!  
স্যার বললেন
-আগে খাবারের  ব্যবস্থা কর , মেয়ে না হয় পরে দেখানো হবে।
-আচ্ছা  ঠিক আছে , আমি তাহলে উপরে  গিয়ে খবরটা বলে আসি।
মেহমানদের খাওয়া দাওয়া শেষ হয়ে এবার এলো মেয়ে দেখার পালা। যার সংগে শবনমের বিয়ের কথা হচ্ছে  সে ভদ্রলোককে  বারবার আড়চোখে দেখতে  লাগলো  মাহতাব । ভদ্রলোক  দেখতে সুদর্শন , পেশায় ইন্জিনিয়ার।  খুব নমনীয় ভংগীতে  বসে আছেন সোফার এক কোনায়। পরনে ছাই রংগের স্যুট। ঐ ভদ্রলোকের কাছে  নিজেকে খুবই ছোোট  মনে  হলো তার। মনেমনে ভদ্রলোকটির সংগে  শবনমকে  মিলিয়ে দেখল,  সত্যিই বিয়ে হলে  খুব  মানাবে  দুজন কে।  আবার চিন্তার ছেদ পড়ল তার। চেয়ে দেখল  শবনমের মামী আর চাচাত বোন  কনক দুজনে ই শবনমকে  নিয়ে বসার ঘরে প্রবেশ করল।  শক্ত পাথরের মত ঘরের এক কোনে দাঁরিয়ে রইল  মাহতাব। যন্ত্রচালিতের  মত শবনমের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। অবনত  মস্তকে বসে আছে শবনম এবং মৃদুস্বরে  মেহমানদের প্রস্নের উত্তর দিয়ে যাচ্ছে। প্রশ্নের পালা শেষ হলে  পাত্রের বাবা  একটা আংটি  পরিয়ে দিলেন শবনমের আংগুলে। হাসিমুখে স্যারকে বললেন
-ভাই সাহেব,  মাসাআল্লাহ  মেয়ে আমাদের খুবি পছন্দ হয়েছ।
ছেলের বাবার কথা শেষ হতেই  আরেকবার সবার উদ্দেশে  ছালাম জানিয়ে  ঘর থেকে বেরিয়ে গেল শবনম পিছন পিছন কনকও। পাত্রপক্ষের  মেহমানদের বিদেয়  হওয়া  পর্যন্ত স্যারের সাথে সাথে রইল মাহতাব। একে একে সব মেহমান বিদায় হয়ে গেল। মাহতাবও বিদায় নিতে গেল স্যারের কাছে। শবনমকে একবার দেখে যাবার ইচ্ছে হচ্ছিলো  কিন্তু কেন যেন সাহস হচ্ছিল না। যাকগে  কালকে এসে না হয় দেখা করে যাবে। মনে মনে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে স্যারকে বলল
- স্যার আমি আজকে তাহলে যাই!  
স্যার  ব্যাস্ত হয়ে  হাতঘড়ির দিকে তাকালেন। বললেন
-আরে না না  রাত বাজে সাড়ে এগারোটা। এতরাত্রে আর যেতে হবেনা। আজকে এখানেই থাকো সকালে চলে যেও।
স্যারের মুখের উপর না করতে পারলোনা সে। ঘাড় দুলিয়ে বলল
- আচ্ছা  ঠিক আছে।
উপরতলা  থেকে শিপলু চেঁচিয়ে ডাকল
- মাহতাব ভাই আম্মা ডাকছেন আপনাকে,  খেতে আসুন।
দোতলায়। খাবার ঘরে  এসে দেখল টেবিলে  পরিবারের সবাই খেতে বসেছে। একপাশের চেয়ারে চুপ করে বসে আছে  শবনম। তার দৃষ্টি  খাবারের থালার দিকে নিবদ্ধ। শবনমের  ঠিক উল্টোদিকের চেয়ারে বসল মাহতাব। অন্যমনস্ক ভাবে খাবার  নাড়াচাড়া করছিলো শবনম। ডান হাতের আংগুলে চকচক করছে কতক্ষন আগে পড়িয়ে  দেয়া  পাত্রপক্ষের  আংটি। মাহতাবের বুকের  ভিতরটা  মুচড়ে  উঠল।



 চলবে....