০৭ ডিসেম্বর ২০২০

সোহেল রানা'র গল্প


 শিক্ষিত বেকার যুবক 
(উৎসর্গ- নুসরাৎ জাহানকে)


আজ  পিয়ার বিয়ে। পিয়া পড়নে আছে বিয়ের সাজানো গোছানো নতুন বেনারসী শাড়ি। হাতে রুলি ও কাঁচের চুড়ি। আমার দেওয়া চুড়ি ও আংটি টা তার  হাতে ও আঙুলে নাই। এখন শুধু নতুন মানুষের সব নতুন জিনিস পড়ে খুব ভালো লাগছে। তার থেকে বেশি ভালো লাগতো পিয়া  যদি আমাকে ভুল না বুঝে, আমাকে বিয়ে করে – আমার হয়ে থাকতো। “এখন শুধু পথ চেয়ে আছি পিয়া তুমি আমার কাছে ফিরে এসো, ফিরে এসো পিয়া “। 

 আরে  মামা খবর কি? কিছু খবর নাই রে, কেন মামা? আর বলিস না ম্যামের ক্লাস করতে করতে একটা নতুন মেয়েকে ক্লাস করতে দেখলাম। মেয়েটা তোর সাথে ভালো মানাবে, প্রেম- টেম কর। না মামা আর প্রেম, বেশিরভাগই মেয়ে যতক্ষণ প্রয়োজন আছে ততক্ষণ ভালোবাসবে, তারপর ছুঁড়ে ফেলে দিবে। চা খেয়ে চায়ের কাপটা যেমন ছুঁড়ে ফেলে দেয়, তেমনই ফেলে দিবে। মামা এটা বিশ্ববিদ্যালয় নোটস নেওয়ার জন্য তোমাকে জানের থেকে বেশি ভালোবাসবে। চলো ক্যান্টিনে কিছু খেয়ে আসি। 
পিয়া ওইদিকে দেখ দুটো ছেলে বসে আছে ছেলেটাকে চিনিস,আরে আমি তো নতুন কি করে চিনবো বল, চল তোর সাথে পরিচয় করিয়ে দি,না রে পরে করে নিবো। কোনটা ওই মোটাটা,না রে পাতলা করে দেখতে হট হয়ে আছে ছেলেটা। ওর প্রতি আমাদের ডিপার্টমেন্টে সব মেয়েই ক্রাস হয়ে আছে। পড়াশোনায় খুব মেধাবী, আর পাশের টার নাম আজাদ। ওরা মামা ভাগ্নে। ডিপার্টমেন্টে খুব ভয় করে ক্লাসমেট গুলো। ছেলেটার নাম ফারহাদ। এই তুলি  চল, রুমে যাই। ছেলেটা কিন্তু ভালো রে, ওকে ভালো করে চিনি প্রেম করে না, আর তুই তো করিস না। দুজনকেই ভালো মানাবে। 
হায়, ফারহাদ কেমন আছো? 
“ভালো”। তুমি “ভালোই আছি”। 
কি পড়ছো? 
 বৈষ্ণব পদাবলীর পদ। 
আমাকে পদ গুলো বুঝিয়ে দিবে, হ্যাঁ দিবো। 
জ্ঞানদাসের পদ -----
“রূপের পাথারে আঁখি ডুবে সে রইল। 
 যৌবনের বনে মন হারাইয়া গেল।। “
ফারহাদ পিয়াকে জ্ঞানদাসের পদ বোঝাতে বোঝাতে দুজনের মধ্যে পূর্বরাগ থেকে অনুরাগে পরিণত হয়। আস্তে আস্তে পিয়ার সাথে ফারহাদের গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। 

( বছর চারেক পর ) 
“পিয়া M. A, B. Ed শেষ হয়ে গেল, চাকরির কোনো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেনি। টিউশনি ও একটা প্রাইভেট স্কুলে পড়িয়ে কোনো রকমে  হাত খরচটা হচ্ছে। কি করব ভেবে পাচ্ছি না।  পিয়া তোমাকে আর বেশিদিন কাছে পাবো না, মনে হচ্ছে তুমি অন্য কারোর হয়ে যাবে “ । 
“ফারহাদ তুমি কি বলছো, পাগল হয়ে গেছো নাকি, কি ভুলভাল বলছো “। 
“আমার জন্য বাদাম নিয়ে এসেছো, হ্যাঁ এসেছি “। 
“তুমি শুধু রোজ বাদাম খাবে, অন্যকিছু খাবে না। “ তুমি যেদিন চাকরি পাবে সেদিন খাওয়াবে”। 
“এই ফারহাদ শুনো না। বলো ,বাড়িতে বিয়ের কথা বলছিল।আব্বা বন্ধুর ছেলের সাথে”। “তোমার জন্য প্রায় ১৫টা বিয়ে ভেঙেছি “।“ শুধু তোমার জন্য, তোমার হাতে হাত রেখে সারাজীবন কাটাতে পারি, শুধু তোমার জন্য ফারহাদ। “ এই বিয়েটা পরিবারের চাপে করতে হবে। কি করব কিছু ভেবে পাচ্ছি না “। চলো তোমাকে বাড়িতে ছেড়ে আসি। 
পিয়া কালকে দেখা করো, ঠিক আছে, সকাল ১০ টার সময়। তুমি বাড়ি পৌঁছে ফোন করবে ফারহাদ। 
“সাবধানে যেও, হ্যাঁ সাবধানে যাবো। “
ফারহাদ বাড়ি পৌঁছালে, হ্যাঁ। 
তুমি কি করছো, খাওয়া দাওয়া হল দিয়ে, ঘুমাতে এলাম। ঠিক আছে পিয়া তাহলে কাল সকালে দেখা হচ্ছে। 
সকাল ১০টাই সময় দিয়ে ১২ টাই আসতো, এতক্ষণে আসার সময় হল, রাস্তার ধারে কত বখাটে ছেলে কি সব বলছে এই গুলো শুনে থাকতে হবে। আচ্ছা বাবা, sorry sorry sorry. 
আমার বাবুসোনা রাগ করে না, পিয়া এতক্ষণ ধরে রাগ করে থাকবে। আমার প্রাণের প্রিয় রাগ করে না, তোমার জন্য কি নিয়ে এসেছি কুরকুরে, আর আমার বাদাম কই, বাদামও আছে। 
ফারহাদ,“বাড়িতে বিয়ের কথা বলছে, কি করবো ভেবে পাচ্ছি না ফারহাদ। আর সামনের সপ্তাহে বিয়ের দিন ঠিক করেছে “ । বিয়ে ঠিক করেছে তো, তুমি বিয়ে করে নাও, আমার জন্য আর কতদিন বসে থাকবে। পরিবারের ইচ্ছে মতো বিয়ে করে সুখে শান্তিতে সংসার করো। 
ফারহাদ তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচব না, শুধু তোমাকে ভালোবেসেছি, তোমাকেই নিয়ে সারাজীবন কাটাতে চাই। 
“পিয়া আমার সিচুয়েশনটা বোঝার চেষ্টা করো, আমি আজ বেকার, কোনো সরকারি চাকরি করি না, এই সমাজে এমনকি তোমার পরিবারে আমার কোনো মূল্য নেই “। 
“এই বেকারের সব জায়গায় দোষ, খেতে- বসতে- ঘুমাতে-দাঁড়াতে। এমনকি একটা নতুন জামা পড়ে বাড়ি থেকে রাস্তায় বের হলে, লোকে বলতে শুরু করে, এই যে বেকারকে দেখ নতুন জামা পড়ে কত ফুটানি দেখাচ্ছে। যার দু টাকা রোজগার করার ক্ষমতা নেই “ । 
শুনো পিয়া তুমি বিয়ে করে নাও, পিয়া তুমি ভালো থেকো বলে কাঁদতে কাঁদতে ফারহাদ বাড়িতে চলে এলো। 
(পাঁচ দিন পর) 
বিয়ের আগের দিন রাতে, কি রে মা কি করছিস, এখনও ঘুমাসনি,ঘুম আসে না মা, “কোনো কিছু ভালো লাগছে না, আজ জীবনের সমস্ত কিছুই হারিয়ে যেতে চলেছে, যা হয়েছে পুরোনো কথা ভুলে নতুনভাবে সংসার শুরু করে। জীবনের ঘাত – প্রতিঘাত আছে। এই ঘাত-প্রতিঘাত না থাকলে জীবনকে উপলব্ধি করা যায় না। “
রাত অনেক হলো ঘুমিয়ে যা মা, আবার কাল সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতে হবে। ঠিক আছে মা, ঘুমিয়ে যাবো তুমি যাও। 
ফারহাদ কি করছো, “এই ছাদে বসে সিগারেট খাচ্ছি”। কাল আমার বিয়ে আর তুমি সিগারেট খাচ্ছো। 
“তোমাকে বারবার ফোন করা সত্ত্বেও, ফোন রিসিভ করছ না। শালা, কুত্তা, হারামি, কোথাকার কাল আমার বিয়ে, আর তুমি আরামে সিগারেট খাচ্ছো”। 
পিয়া এখন ঘুমাও, অনেক রাত হয়েছে। 
“ফারহাদ তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারবো না”।
 “জীবনের প্রতিটি শ্বাস প্রশ্বাসে শুধু তোমাকে চাই, এক মুহূর্তের জন্য তোমাকে না দেখলে, এমনকি তোমার সাথে কথা না বললে আমি থাকতে পারবো না। “
“ফারহাদ আমি চলে আসছি তোমার কাছে, পালিয়ে বিয়ে করবো, চলো “। 
“ফারহাদ ও পিয়া দুজনেই কাঁদতে কাঁদতে কখন যে পিয়া ফোন কেটে দিয়ে ঘুমিয়ে যায় এবং ফারহাদ বিষ খেয়ে চিরতরে পিয়ার জীবন থেকে হারিয়ে যায় “। 
“এক ফোঁটা চোখের পানি ঝড়ার চেয়ে, এক ফোঁটা রক্ত ঝড়ার অনেক ভালো। কারণ, একফোঁটা রক্ত বের হতে হালকা ব্যথা লাগে, আর একফোঁটা চোখের জল পুরো হৃদয় ছিড়ে বের হয়”। 
শিক্ষিত বেকারের যে যন্ত্রণা, একজন শিক্ষিত যুবকই জানে। চাকরি না পেয়ে  নিজের প্রেমিকাকে অন্যের হাতে তুলে দিতে কতটা যন্ত্রণা সে শত শত ফারহাদের মতো যুবকেরা বুঝে। চাকরি না পেয়ে সকলের কাছে গঞ্জনা খেতে খেতে এবং প্রেমিকাকে না পেয়ে আত্মঘাতী হওয়াটা সমাজের কাছে একটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আরে ওই ছেলেটা তো বেকার, মরলে কোনো দাম নেই। 
সমাজের কাছে শত কোটি অনুরোধ করছি, শিক্ষিত 
যুবকদের কখনো বেকার ও গঞ্জনা করবেন না। তাদেরকে একটু মাথা উঁচু করে বাঁচতে দিন। 


১৮/১০/২০

রিনাৎ সুলতানা



ধাপ্পা 

সোনার অঙ্গ জড়াইছো মনু 

পরের বসন দিয়ে, 

ভাবখানা এমন, ভাজা মাছ ও

খাওনা যে উল্টিয়ে!


উঠতে বসতে সূর্য দেখো 

আকাশ পেলে কই, 

সব ভুলে আজ পেতেছ মনু

চাঁদের সাথে সই।  


তোমার দেশের লতায় পাতায় 

কতই না ফুল ফোটে!

ছলচাতুরী করেই তবে তোমার 

কপালে অন্ন জোটে! 


মেঘবালিকা, জ্যোৎস্না দেখাও 

নেইযে কিছু বাকি, 

যতই দেখাও আকাশ, বাতাস

সবই তোমার ফাঁকি।  


জাতপাত কি পিঠে থাকে 

লেখা পোষ্টারে?

জন্তুর মতো মুখটা তোমার

কুৎসিত অন্তরে। 


সুযোগ পেলেই জায়গামতো 

লাগিয়ে দিবা কদু, 

পাব্লিকে তোমার সবই বোঝে 

সাজতে এসোনা সাধু।

মোঃ রুহুল আমীন



মাথায় পড়ল বাজ

হাটে আইছি বিসাতি কত্তি

      খতে নিয়ে হাতে

পকেটে আছে তিন শ টাহা

      কি হবেনে তাতে?


বউ কয়ে দেছ মিলা কিছু

    আনবা কিনে আজ

সেসব কুতা শুনে আমার

    মাথায় পড়ল বাজ।


নব্বই টাহা পেঁজের কেজি

    ঝাল একপোয়া ষাট

পঞ্চাশ টাহায় আলু কিনে

    পকেট গড়ের মাঠ।


এহন মাছ কেনব কি দিয়ে

     জিরে মশেল্লা নুন

ওষধ পত্তর না কিনলি তো

    হয়ে যাবানে খুন।


বউ যাবে কাল বাপের বাড়ি

    মাইয়ে যাবে সাথে

ছাবাল যাবে কোচিং কত্তি

   কি দিবানে হাতে।


যে কায়দায় বাড়ে চলেছ

    জিনিস পাতির দাম

এসব কুতা ভাবদি গেলি

    ছুটতেছ গার ঘাম।


আমরা যারা গরিব মানুষ

    কামই অনেক কম

আয় আর ব্যায় হিসেব করে

    আটকে যাতেছ দম।

=============================

এম মাহবুবা মিজান পুর্নিমা

নষ্ট দেয়ালে কষ্টের প্রতিচ্ছবি


তোমার শরীর থেকে ভেসে আসবে 

কবি ও কবিতার গন্ধ,

রাজপথ হতে ভেসে আসবে শোকের গানের ধ্বনি

শহরে ভেসে বেড়াবে-নষ্ট দেয়ালের কষ্টের প্রতিচ্ছবি। 


পৃথিবী যখন ঘুমিয়ে যাবে নির্জনে

তুমি একাকীত্বের দরজা ভেঙে ফিরে আসতে চাইবে 

ভয়ে ভয়ে খুঁজবে আঁধারে রাত্রি নিশিতে একা একপক্ষ

ঘুমন্ত নগরীতে কার কাছে যাবে ? 


তোমার কান্নার শব্দে ছেয়ে যাবে আকাশ

চাঁদ ঢেকে যাবে আকাশের মেঘাচ্ছন্নতায়

আকাশও কেঁদে ফেলবে হঠাৎ। 


তোমার ভালোবাসা ফিরে আসবে না আর

ঢের কাঁদলেও না;

ভালোবাসায় চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যাবে শহরের অলিগলি ফুটপাত। 


সময় বেসময়ে শুধু কাঁতরাবে নীরবে

আবেশে জরানো ভালোবাসা আর তোমায় ডাকবেনা

ভালোবাসার কাছে হেরে নিস্তব্ধ হয়ে ঘুমিয়ে পড়বে মন!


শুধু রাজপথ, ফুটপাত,শহরের অলিগলি,টিএসসি চত্বর

আর

প্রিয় ক্যাম্পাসের  নষ্ট দেয়ালে কষ্টের প্রতিচ্ছবি রয়ে যাবে।

হাকিকুর রহমান



পিতঃ


কোথায় খুঁজিবো তোমারে হে পিতঃ

কোথায় খুঁজিবো তবে,

রয়েছো তো তুমি সারা বাংলা জুড়ে

হৃদয়ের অনুভবে।


প্রভাত রবির স্বপ্নে বিভোর

সারা দিনমান জুড়ে,

রক্ত শপথের পতাকা উড়িছে

বঙ্গ বেদীর চূড়ে।


স্বপন দেখিয়া কত যে জননী

করেছেন কোল খালি,

ত্যাগিয়া সেই সূর্য সেনারা

ভরেছেন ফুল ডালি।


তোমারই অমর সেই বাণী শুনি

দামাল হয়েছে দেশ,

লড়েছে সকলে জীবন বাজি রেখে

পৃথিবী হেরিলো অনিমেষ।


ফল্গুধারায় ভরিলো বাংলা

বিজয়ের উৎসবে,

বাহিরিয়া এলো আলোর ঝর্ণা

চেতনার গৌরবে।


রয়েছি বসে হেথা শুনিবার তরে

তব চরণের ধ্বনি,

শতবর্ষ পরে ফের জ্বলুক দীপশিখা

শুনি তার আগমনী।

মমতা রায় চৌধুরী



আমার মা

'মা' শব্দটি উচ্চারণে আনে 

এক অনাবিল প্রশান্তি। 

'মা'-এর মধ্যে নিহিত আছে 

আদি সৃষ্টির শক্তি। 

আর 

আমার মা

আমার কাছে সর্বংসহা ধরিত্রী 

ত্যাগ তিতিক্ষার অপার প্রতিমূর্তি ।

আমার মা 

আমার কাছে প্রশস্ত আকাশে 

প্রস্ফুটিত নক্ষত্র রাজি

যার দ্বারা দূরীভূত হয় 

মনের অলিন্দে ঘনীভূত 

অন্ধকার চোরাবালি। 

আমার মা 

আমার কাছে প্রবাহিত স্রোতস্বিনী

যা সিক্ত ও নির্মল করে 

মনের প্রতিচ্ছবি। 

আমার মা 

আমার কাছে জ্ঞানের প্রথম পাঠশালা 

যার দ্বারা তৈরী করে 

ন্যায় নীতি আর্দশের কারখানা। 

আমার মা 

আমার কাছে এক অনন্ত জ্যোতি 

যা দিশা হারা মনের 

বন্ধু -সখা ও ভালোবাসার প্রতীক। 

আমার মা 

আমার কাছে প্রানের আশ্বাস 

ও মনের আনন্দ দায়ক শক্তি 

যা নিরুৎসাহ চিত্ত কে 

করে অপার শক্তিশালী।

আবার তিনিই আদ্যাশক্তি মহামায়া 

সকল অসুর দলনী শক্তি। 

'মা' - এর অশেষ গুণ মহিমা 

অবর্ণনাতীত ।

কারন

তিনি হোন সকলের বীজমন্ত্র। 

তাই বিশ্ব মাতৃ দিবসে,

তোমার প্রতি রইল অশেষ 

হৃদয়োৎসারিত শ্রদ্ধার্ঘ্য।

০৬ ডিসেম্বর ২০২০

সুচিতা সরকার


মূল্য

অর্ধনগ্ন শরীরটায়,

দাউ দাউ করে জ্বললো আগুন।

ত্রাহি ত্রাহি চিৎকারে ভরলো বাতাস, 

কাঁদলো জমি, ফাটলো গগন।


শয়তানের চোখগুলিতে উল্লাসের অট্টহাসি,

ঘিরে দাঁড়িয়ে জীবন্ত চিতায় ঢালে ঘি ।


দরজার ওপারের কানগুলিতে তখন, 

কালঘুমের পলি।

চোখগুলি অন্ধ, এক একটা অথর্ব প্রাণী।


কালো ধোঁয়ায় আছন্ন ঘর, 

একটু একটু করে প্রাণটা হয় দূর্বল।


অষ্ট বর্ষীয় ছেলেটার চোখে ঘুম নাই।

লক্ষ্মীর ঝাঁপি ভেঙে বাবাকে দেয় অর্থ,

ভয়ার্ত ঠোঁটে কাঁপে এক টুকরো শর্ত-

"আমার লাট্টুর সব মূল্য নাও নিয়ে।

আর মেরো না, এবার মা কে দাও ছেড়ে।"

চৈতালী দে


চিঠি 

স্নেহের মালবিকা ,

                 আজ ভীষন ভাবে মনে পড়ছে তোকে ...... কেন মনে পড়ছে সেটা পরে বলছি । এর আগে তোকে কখনো চিঠি লিখিনি । লেখার কোনো কারণ ও ছিল না ।

বলতে পারিস তোকে আমি অনেকটাই ভুলে গেছিলাম , তবে বোধহয় পুরোটা ভুলিনি ! তাই আজ বহু বছর পর তোকে মনে পড়লো  , মনে পড়লো তোর আর আমার একসাথে বড়ো হওয়া ......


তোকে যখন প্রথম দেখি তখন তুই অনেক ছোটো , আর আমি তোর থেকে একটু বড় । তোর সাথে কেউ খেলতো না বলে আমি রোজ স্কুল থেকে ফিরে তোকে ডাকতে যেতাম খেলার জন্য , আর তুই আমাকে দেখেই খুশিতে আত্মহারা হয়ে হাততালি দিতিস । তারপর তুই আর আমি যেতাম খেলার মাঠে ..... সেখানে তোকে দেখে সবাই ভয় পেতো , কেউ কেউ আবার মজা করে বলতো , " মালা পাগলী এসে গেছে " ..... তুই কিছুই বুঝতিস না , ওদের মজাটা খেলা ভেবে জীব বার করে জোরে জোরে হাততালি দিতিস ! 


আমার খুব রাগ হতো জানিস ! ..... বাড়িতে এসে মাকে নালিশ করতাম , বলতাম " মা ! মালবিকার ওপর সবাই হাসে কেন ? ওর সাথে কেউ খেলে না কেন ? " মা কোনো উত্তর করতেন না , শুধু বলতেন " সন্ধ্যে হয়ে গেছে .... পড়তে বসো " ।


পরের দিন তোর সাথে আমি আবার খেলতে যেতাম । তোর অর্ধেক বলা কথা গুলো আমি পুরো করার চেষ্টা করতাম .... তুই বসার সময় যখন তোর ফ্রক গুটিয়ে যেতো , আমি টেনে সোজা করে দিতাম ..... তুই যখন মুখে আঙ্গুল দিতিস , আমি বার করে দিয়ে বলতাম .... মালবিকা ডোন্ট !! তুই এক গাল হাসতিস ..... পরের দিন এই সব আবার করতিস ..... 


তোর সাথে খেলতে খেলতে কবে বড়ো হয়ে যাই আমি !! .... পড়ার চাপে তোর সাথে খেলা তো দূর , দেখাও অনেক কম হতো । তারপর একদিন শুনলাম তুই আর নেই !  তোকে শেষ বারের মতো দেখতে যাই নি .... মা বলেছিলেন " যা , একবার দেখে আয় " .... কিন্তু যাই নি । পারিনি যেতে ...... ঠায় বসেছিলাম সারাটা সন্ধ্যে । জানি তুই আমায় সেদিন স্বার্থপর ভেবেছিলিস । 


তবে আজ তোকে আমার মনে পড়লো কেনো ? ..... আজ এতদিন পর !! 


আজ তোকে আমি অনুভব করলাম আমার গালে । তুই প্রায়ই আমায় জরিয়ে ধরে চুমু খেতিস । আর আমি বিরক্ত হয়ে বলতাম " এই মালবিকা এমন চুমু খেলে আমি কাল থেকে আসবো না " ..... তুই আনন্দে হাততালি দিতিস । আর পরের দিন আবার জরিয়ে ধরে আমার গাল ভিজিয়ে চুমু খেতিস ....... পরিবর্তে আমি তোকে কখনোই কিছু দিই নি । আজ তোর গালে একটা চুমু দিয়ে বলতে ইচ্ছা করলো " মালবিকা যেখানেই থাকিস আনন্দে থাকিস " ...... 


                                       ইতি ,

                                                চৈতি

মিলন ভৌমিক



বাঁচবো কিভাবে

ভুখাপেটে পরিবার

সব রয়েছে পৃথিবীতে,

নিঃস্ব,নিরন্ন বাঁচবো কিভাবে।

সবল,শক্ত,কম'ঠ হয়ে

রুজি রোজগার নেই  গ্রামে, গ্রামে

দূর্ভিক্ষের চেহারা আনাচে কানাচে।

লেখাপড়া হয়নি অদৃষ্টের পরিহাসে

এ জীবনে ভুল পদে পদে।

জীবন যন্তনা অন্তযা'মী জানে,

সেই কটা দিন থাকবো পৃথিবীতে?.

চোখের সামনে সন্তানদের একমুঠো ভাত নেই পাতে

ইচ্ছা নেই বেঁচে থাকতে এ জগৎ সংসারে।

রোগ,শোক, দুঃখ, বেদনা

সব যাবে ঘুচে

অন্ন  চাই গৃহে।

অলোক দাস



স্বপ্নের সিস্ট্রি 

এ ভুবন জয় হবেই, যখন খোলা সব মোনের জানলা । 

আর নেই বন্ধন, দেহ, মোন ও মুক্তি । 

মুক্তির সন্ধানে যাবো চলে বহুদূর, হয়তো লাল মাটির দেশে, যেখানে শুধু বনাঞ্চল, যেখানে হাট বসে আজও, 

যেখানে সোনা যায় বাউল সংগীত, একতারার সাধনা, 

শান্ত মাটী, শান্ত বাতাস, সেই বটবৃক্ষ, শিশুরা দেয় দোল । আর সব শব্দ নিস্তব্দ । 

ওখানেই আমার নীড়, নাম দিয়েছি "স্বপ্নের সিস্ট্রি '।

লীনা দাস


ফেসবুকে কেন লিখি আমরা?


এই প্রশ্নটা আজকাল খুব মনে আসে।

সত্যিই তো কেন লিখি?

 প্রায় পাঁচ বছর ধরে ফেসবুকে লিখে চলেছি। 

কবিতা, গল্প বা সমাজ সচেতনতার পোস্ট।

পাঠকের সংখ্যা খুব বেশী না। ওঠানামা করে।

 সব লেখা সবাই পড়েন ও না। 

তবু লিখি। মন খারাপ হলে লিখি,মন ভাল থাকলে লেখার ইচ্ছে অন্তত আমার বেশী জাগে। লাইক পেতে ভাল লাগে। অসাধারণ, সুন্দর,দারুণ,অনন্য,ফাটাফাটি  মন্তব্যগুলি ও মন্দ  লাগে না। যদিও বুঝতে পারি  মন্তব্যগুলি না পড়েই করেন অনেকে।সবাই না,অনেকে সুচিন্তিত মতামত দ‍্যান।তাতে এই আপাত উদ্দেশ্যহীন লেখালেখির কিছুটা সার্থকতা খুঁজে পাই।ভাল লাগে মন।

এই ফেসবুক আমাদের মত কিছু শখের লেখিকা লেখকদের জন্য অনেকগুলি দরজা খুলে দিয়েছে। কেউ কবিতা লেখেন, কেউ গল্প বা প্রবন্ধ লেখেন।

আরও অনেকে অনেক কিছু করে। 

আমার মনে হয় ফেসবুকে লেখালেখি মূলস্রোত সাহিত্যের চেয়ে অনেকটাই আলাদা।


কিন্তু সেই প্রশ্ন ,কেন লিখি ?

আমার মনে হয় আমাদের মত লেখকের সবচেয়ে বড় সমস্যা  কেন  লিখি তার উত্তর পাওয়া।

কাজের ফাঁকে, রান্নার ফাঁকে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ফাঁকে যে লিখি কিন্তু কেন? পাঠক সংখ্যা হাতে গোনা।

তাও শুধু ফেসবুকে । ফেসবুকের বাইরে পৌঁছোনো খুব শক্ত । তাহলে কেন লিখি? এর উত্তর জানা আর হবেনা।

আমার মনে হয় লেখা একটা নেশা।অন্তত আমার তাই মনে হয়। আমার নিজের লেখার উদ্দেশ্য কী জানিনা,নেশার ঘোরে লিখে যায়।  লেখারএকটা কারণ হতে পারে যে মানুষের সঙ্গে হৃদয়ের একটা সংযোগ তৈরী হয় । অঙ্কনশিল্প এবং সাহিত্যের এক সুবিধা হল  আজ যা সাহিত্য নয় কাল তা সাহিত্য হিসেবে গণ্য হতে পারে । তবে লেখার শৈলী অধ্যবসায় থেকেই আসে ।  ফেসবুকের যুগে কিছুই ফেলা যায় না । দেয়ালের কোণে জড়ো হতে থাকে । যদি কোনদিন জড়ো করা স্তূপে কাগজের ফুল খুঁজে পায় কেউ।


নিজের জীবনের কাহিনী শুনতে কেউ চাই না।

তাই কাউকে  গল্প বলার চেষ্টা না করে স্মৃতি হাতড়ে যা মনে পড়ে লিখে যাই ফেসবুকে । সবটুকু মনগড়া  নয়। জীবনে ঘটে যাওয়া নানান ঘটনার থেকে নেওয়া টুকরো টুকরো ঘটনা।

অনেকেই হয়ত এমন।

সব কিছু লেখা যায় না,আমি ও লিখিনা যা আমার একান্ত আমার।

লিখি মধুময় সময়ের কথা, সুখস্মৃতি, নীল বেদনার কথা ও এসে যায়! 


লেখালেখি আমার নিজস্ব ভাল লাগার জগৎ।

ভাল লাগা থাকলে লিখে যেতে পারি।

পার্থ ব্যানার্জ্জী


 ফেরাবে

তোমার দু'চোখের আলতো ঢেউ

দেখে ধরতে হাত বাড়ালাম

তুমি পাখি হয়ে উড়ে গেলে,

আকাশকে কতো ডাকলাম

সাড়া দিলো না, চুপচাপ। 

বাতাসকেও ডাকলাম, চুপ।

কাকে ডাকবো, ভেবে পাচ্ছিলাম না,

হঠাৎ মনে পড়লো আলোর কথা,

গাছেদের কথা, পাহাড়ের কথা।

ওরা নিশ্চয় শুনবে, আমাকে বুঝবে,

ভালোবাসার ইচ্ছাকে সমুদ্র হয়ে

বারবার ঢেউয়ের দোলায় দুলিয়ে

ফিরিয়ে ওকে আনবোই,

আনন্দ নিয়ে বাঁচার নাম জীবন,

সেটা ওকে দেখিয়ে দিতে হবে, 

পারবে ওরা, আমার প্রিয় বন্ধুরা,

ওকে হারিয়ে যেতে দেবে না,

পালিয়ে যেতে দেবে না কিছুতেই,

বিশ্বাস বারবার জোর দিয়ে বলছে,

ফেরাবোই প্রিয়ার ওষ্ঠের ললিত স্বর

আর তোমার ভালোবাসা,

দেখেছি ওদের চোখে একরাশ

আশা, ফিরিয়ে আনার ভরসা।

ফিরিয়ে আন বন্ধুরা প্রিয়তমাকে।



: সারাটা রাত এক চাদরে

শ্যামল রায়

আমাকে তুমি চিনতে পারলে না

রোদ্দুরে মোড়া একটি চিঠি পাঠালাম

তুমি একটা আকাশ দিয়ো বৃষ্টি দিয়ো

আমি শিশির বিন্দু তে বৃষ্টি ফোটা দেখব।

তুমি নতুন শাড়িতে, প্রদীপ হাতে

তুলসী তলায় দাঁড়িয়ো--

আমাকে চিনতে পারবে তো?

আমি নীল খামে চিঠি ছিলাম

তোমার পড়ার টেবিলে

ডাইরির ভিতরে সাদা কাগজে

নানান অক্ষরে সেজে উঠেছিলাম।

তুমি আমাকে চিনতে পারোনি

আমি একদিন বিকেল বেলায় গোধূলি লগ্নে

আলপথ ভেঙে দাঁড়িয়েছিলাম নদীর পাড়ে

তুমি চিনতে পারোনি ।

আমি পিছন দিক দিয়ে

তোমার চোখ দুটি আঙ্গুলে জড়িয়ে ছিলাম

বলেছিলাম সবুজ ঘাস আছে

আঁচলটা পেতে দাও

কবিতা হয়ে উঠি পূর্ণিমার জোছনায়

সারাটা রাত চাদরে----।

শ্যামল রায়



কবিতার কাছাকাছি যেতে

কবিতার খুব কাছাকাছি যেতে

রোজ পার হচ্ছি অথৈ জল

কবিতার কাছে আছে আঁচল

কবিতার কাছে  নীল শাড়িতে

যত্নে রাখা আদর রেখা

যাকিনা রংতুলিতে ছবি হয়ে আছে।

কবিতার কাছে সত্য শব্দ সাজাতে

কলম নিয়েছি হাতে

খুঁজে নিতে বাংলা কবিতায় নারীমুখ।

জানি নিভে যেতে পারে সলতে

দিকনির্দেশ হারাতে পারি

তবুও খুচরো সব ঝরা পাতাগুলো

জড়ো করি, উড়িয়ে দিই

খুঁজে নিতে সূর্যের আলোয় পথ।

কবিতার কাছাকাছি যেতে

রোজ পার হচ্ছি অথৈ জল

রোজ ভোর দেখে নিতে।

দুঃখ মুছে দিয়ে পৌঁছে যেতে চাইছি

ভোরের আলোয় ঘেরা ঠিকানাতে

তাই সত্যকে সাদা পাতায় অক্ষর সাজাতে

কলম নিয়েছি হাতে

পৌঁছে যাব, কবিতার খুব কাছাকাছি

শিহরণ জাগাতে,শরীর জুড়ে।